রবিবার, ৩১ ডিসেম্বর, ২০২৩

২০২৩ ও ২০২৪ – সন্ধিক্ষণ ।

স্মরণে থাকুক ২০২৩ 
___________________

আশা-ভাষা-ভালোবাসা অপূর্ণ রেখে তেইশে ছেড়ে গেল 
 যারা, তারা 'নাই' হোল কি চিরতরে, অতীতের নীরব 
 অন্ধকারে ? হায় স্মৃতি, তুমি কি শুধু বেদনার ? 

কবিতাটি মুক্তদল ছন্দে, বিলম্বিত লয়ে রচিত। একান্তে 
 পড়ুন। পরিচিত জনদের পড়ান। স্মরণীয়দের স্মরণ 
 করুণ। শুধু দুটি বছরের নয়, বিগত ও আসন্ন দিনের 
 সন্ধিক্ষণ। শুভায়ঃ ভবতু ।

ভুলো না, ভুলায়ো না 
----------------------------

ভুলায়ো না, আমায় ভুলায়ো না,
সাঁঝের আঁধারে যারা গেল ডুবে স্মৃতি তাদের পোড়ায়ো না। 

কত সুখে-দুখে, কান্না হাসিতে, 
এক সুরে বাঁধা এক সঙ্গীতে, 
পেয়েছি যাদের জীবনের পথে - 
হে অতীত, তুমি বিস্মৃতি সাগরে তাদের সে গীতি হারায়ো‌ না। 

কিছু কথাকলি, সবে ফুটেছিল, 
কিছু কিছু তার ফুটি ফুটি ছিল, 
সে প্রেমের বাণী, সেই গানখানি 
সন্ধ্যা তারার আলোকের সাথে গহন নিশীথে দিও‌ রেখে। 


   বিনিদ্র রাতের স্বপ্ন আভাষে 
হৃদয়ে আমার তারা যেন ভাসে, 
শেষ সুখহাসি যায় যেন হেসে, 
যে ফোঁটা-দুই বাকী ছিল চোখে সেই জলটুকু যাবো
দেখে। 

হয়েছ বিগত,  হয়েছে কি গত ? 
কিছু কি রাখেনি‌ চির অক্ষত ? 
যে ভালোবাসা দি‌য়েছিল তারা 
চিহ্ণটি তার রেখে দিও নিশা জ্যোৎস্নার আলো-চন্দনে। 

ধরার ধূলায় যদিও অধরা, 
তারাদের সাথে জেগে থাক্ তারা, 
বুকের আবেগ পাবো বরষায় – 
 আনন্দ বিষাদে‌ প্রাণের পরশ, অথবা বিরহ ক্রন্দনে ।। 

(কবিতাটি পুনঃপ্রকাশিত) 

 দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় 
৩১/১২/২০২৩ 
রাত্রি ১২টা 
কলকাতা। 







 

শনিবার, ৩০ ডিসেম্বর, ২০২৩

বৎসরান্ত

বৎসরান্ত 
                                বৎসরান্ত 


কত যে বছর এল, ফিরে গেল বিস্মৃত অতীতে। 
সূর্যস্নাত নব ঊষা ঢলে পড়ে বিষন্ন সন্ধ্যায়। 
জীর্ণ জরা প্রত্যাশার ভার বয়ে বয়ে ফুরায় জীবন। 
যখনই হাতে আসে কামনার ধন, আসে সুখের 
জোয়ার কূলপ্লাবী ; অকস্মাৎ ভাটার প্রবল টান 
টেনে নেয় খরস্রোতে প্রিয়তমা প্রেয়সী প্রতিমা ! 
স্বপ্নভাঙা ভোরে উঠে দেখি আমারই সে লালসার 
কাদা মেখে পড়ে আছে বাঁশ দড়ি খড়ের কাঠামো। 
দুদিনের বিলাপ দেখাই -- আত্মপ্রবঞ্চনা। তারপর 
আগামী বছর। আবারো সংগ্রহ দুরাশার, আবারো 
অতৃপ্তির সেই বিবমিষা। 

অনাগ্রহ অবশেষে, ভোগান্তি বা ভোগ-অক্ষমতা। 
অনাসক্তি, শ্রান্তি, ভ্রান্তি -- সব নিয়ে অসহায় 
আত্মসমর্পণ নিয়তির পদপ্রান্তে। এই তো জীবন ! 
উপেক্ষায় রয়ে গেল ঐশ্বর্য বিপুল আপনারই 
হৃদয়ের গোপন ভাণ্ডারে, অবরুদ্ধ দ্বারে। 
হারিয়ে ফেলেছি চাবি তার মহামোহঘোরে। 
আজও অন্ধকারে লুপ্ত হোল আরেকটি বছর। 
নিয়ে গেল যা নেবার, দিয়ে গেল দুরাশার 
মায়া মরীচিকা। আবারও অশ্রান্ত যাত্রা 
বিভ্রান্তির পথে ; ওই বুঝি পারাবার--তৃষ্ণা মিটাবার ! 

(কবিতাটি  পরিমার্জিত ও‌ পুনঃপ্রকাশিত)

দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় 
৩১শে ডিসেম্বর, ২০২৪ 
কলকাতা। 

বুধবার, ২৭ ডিসেম্বর, ২০২৩

ফিরায়ো না

ফিরায়ো না


যদি বল তবে বাকি দুটো দিন থেকেই যাই 
তোমার সাথেই। ভালোবাসার কথা দুটো বলি, 
তুমি সাড়া না দিলে মুক্তি আমার শূন্যতায়। 
ফিরে যাব আবার নির্জন পথে দিয়ে পাড়ি 
নির্বান্ধব পুরে। ছিল চেনা, ছিল জানাশোনা 
যে দেশ, যে ভূবন-ভবন এতকাল, আজ পরবাস। 
নাড়ি-বাঁধা জন, মুঠি-বাঁধা ধন একান্তই আপনার 
ছড়িয়ে, হারিয়ে গেছে কোথায় কখন ! 

ফিরে  পাওয়া  নিতান্তই -- 'না'। 

মঞ্চের প্রস্থানদ্বারে নাটকের অন্তিম সংলাপ ! 

তাইতো তোমার কাছে মিতা। 

তোমার এ ঘর আমার জীবন পথের শেষ পান্থশালা। 
এসেছে ঘনায়ে সন্ধ্যা, পশ্চিম দিগন্তের পারে 
ক্ষীণ রশ্মিরেখা, মনে হয়, তোমারই আশ্বাস। 
এখনও বিশ্বাস তোমার প্রেমেই -- নিষ্প্রশ্ন শরণ। 
তোমাতেই সমর্পণ এখনো যা কিছু রয়েছে সঞ্চয় 
আমার 'আমি'র অহমিকায়, হোক্-না তারও বিলয়। 

দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
২৭/১২/২০২৩
কলকাতা।

দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
২৬/১৩/২০১২
কলকাতা।
_______________________________________________



সোমবার, ২৫ ডিসেম্বর, ২০২৩

La Pieta


                    La Pieta            


Incomparable Marble sculpture of Jesus Christ and Mother Mary at mound Golgotha which represents the 'Sixth sorrow' of the blessed Virgin Mary, by Michel Anjelo Buonarroti. This great creation is now in Saint Peter's Basilica, Vatican City.

La Pieta, one of the greatest works of the Renaissance in Italy. The lifeless body of Christ  which Virgin Mary cradling on her lap. The sculpture reflects the classical principle and balance and harmony with a compelling and naturalistic portrayal of both fingers.
This portrayal is of the Mother's Sixth  Sorrow.  When the Crucification ended Jesus was pierced  in the side with a spear, outletting  stream of blood and then placed in the arms of His Mother who endured such deadly pain as she had no tears to shade. This stonified tears is the (La Madona della Pieta) Pieta.

Today, 25th December is the holy Christmas. We remember the Divine Arrival of Jesus, embodiment of love and forgiveness. But we must not forget The Holy Mother's pain which was borne not only by the Virgin Mary but also is , till being endured by the "Universal Famine that holds us above." 

Dulal Chandra Bandopadhyay
25th December, 2023
Kolkata.
_______________________________________________

রবিবার, ২৪ ডিসেম্বর, ২০২৩

লা পিয়েতা

লা পিয়েতা 
পুঞ্জীভূত অশ্রুজল 
____________________

মাইকেলেঞ্জেলো, স্বয়ং স্রষ্টার অবতার, 
কোথা তুমি এ দুর্দিনে ? পৃথিবীটা ভালো নেই। 
আজও অজস্র মা, জমাট শোকের প্রতিমা। 

সহস্র শিশু যীশুর মতন বিদ্ধ হয় অগ্নিবর্ষী তীরে!

হতভাগ্য শিশুরা শুধু কি ?  যুবক ঈশারই মতো 
ক্ষতবক্ষ হতপ্রাণ নিথর সেনারা ফিরে আসে 
মা'র  কোলে। হিংস্রতার হয়নি অবসান। 
যুগ যুগান্তর ধরে 
শোণিত পিয়াসী অমানবিকতার শেষ পরিণাম, 
জন্মদাত্রী জননীর গাঢ় অশ্রুবারি অঞ্জলী ভরে 
ধারণ করেছো কতকাল ? নিরালায় ? একান্ত সাধনে 
পাষাণে দিয়েছ রূপ? অসহ সে ব্যথা ! 
হৃদয় পোড়ানো শোক তোমার পিয়েতা। 

দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় 
২৪/১২/২০২৩ 
কলকাতা।




মঙ্গলবার, ১৯ ডিসেম্বর, ২০২৩

পথের মা ও পথশিশু

(কলকাতার রাস্তায় হেঁটে হেঁটে যাই। যত রাত বাড়ে ততই ফুটপাথগুলোর  দৃশ্য পাল্টে যায়। শিশু কিশোরদের বুকে জাপটে ধরে মায়েরা যেভাবে শুয়ে থাকে তা দেখি। একটি অসহায় কষ্টের অনুভূতি বুকে বয়ে ঘরে ফিরে আসি। অক্ষমতা ঢাকি কাগজে কলমে। )

পথের মা ও পথশিশু 

ফুটপাথে দেখি ঘুমিয়ে রয়েছে 
মায়ের বুকে ছেলে। 
নিঃসাড় ঘুম শিশুর চোখে 
মায়ের পাঁজর জ্বলে। 
এই শিশুকাল পেলি ওরে বাপ্ -- 
পায়ের তলায় ঘর, 
ভিড় রাস্তায় বুকে ধরে রাখি 
নিত্য মরণ ডর। 
তন্দ্রায় দেখি হোগলার কুঁড়ে, 
ছেঁড়া-কাপড় দোলনা, 
কেমনে গেল, কোথায় হারালো 
ভাঙা-ফুটো দুটো খেলনা। 
কোথায় সে জনা, কেন বা উধাও 
আমি কেন বাঁচি প্রাণে, 
যমের অরুচি হয়ে বেঁচে আছি 
কুকুরে কাপড় টানে। 
নাই পরিবার, নাই পরিজন 
নাই স্নেহ মায়া দয়া। 
এত যে মানুষ, এত বাড়ি গাড়ি 
চোখে দেখি কালো ছায়া। 

এমনি লক্ষ হারা-ঘর মা'রা 
পড়ে আছে পথে পথে, 
রেলপথ ধারে, মরা-নদী পাড়ে 
বাদলে হিমেল রাতে। 
হয়তো কোথাও ঝুপড়ি করেছে 
ছিন্ন চটের গুহা, 
তাও প্লাস্টিক -- ঠান্ডা গরম 
কিছুই যায়না সহা। 
সেখানেই মরে, মরে' মরে' বাঁচে 
জীবন তাদের নাই। 
শুধু দিনে রাতে উদর ভরাতে
এঁটো কাঁটা খুঁটে খায়। 
হায় রে এ দেশ, মা-শিশুদের 
জীবন্ত নরকবাস। 
কোথাও বিলাস, কোথাও যুদ্ধ 
বিপুল নিরাশ্বাস ! 
বুকে ক্ষয়রোগ, চোখেতে পিচুটি
নগ্ন জীর্ণ দেহ, 
নাইকো শিক্ষা, নাইকো পুষ্টি, 
নাই সমাদর স্নেহ। 
শুধু চেয়ে দেখে ভিখারিনী মা-কে 
ন্যাকড়ার  কঙ্কাল, 
মৃত জীবনটা রাখার তাগিদে 
ঘেঁটে মরে জঞ্জাল। 

লেখায় ভাষণে, সভা, সেমিনারে 
সহানুভূতির ঝুড়ি, 
রাস্তার ধারে পড়ে থাকে তারা 
--- সুতো ছেঁড়া ফাটা ঘুড়ি। 

দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
১৯/১২/২০২৩
কলকাতা

_______________________________________________





শুক্রবার, ১৫ ডিসেম্বর, ২০২৩

Happy Birthday to Shivaom

From breakfast to dinner
You're having great pleasure.
But nobody knows
That the wind 🍃 that blows
Directly from there to here
Brings the flavour of the gigantic cake
Which your tongue is waiting for and
watering to take.

My good wishes to you and your company.
Dadubhai. 

রবিবার, ১০ ডিসেম্বর, ২০২৩

"কাঁদালে তুমি মোরে" গানটির ইংরেজি ভাবানুবাদ।

"কাঁদালে তুমি মোরে" গানটির ইংরেজি ভাবানুবাদ। 

আমার অন্তরের নিত্য প্রয়াস থাকে, আমি যতটুকু পড়ি
যা ভাবি, যে ভাব কিংবা আবেগ অনুভব করি, লেখা দিয়ে বা আলোচনা করে আমার পাঠকদের সে সকল কথা বলি। তাঁদের  ভালো মন্দ বিচার আমাকে ঋদ্ধ করে, সান্ত্বনা দেয়। তাঁদের অজান্তেই তাঁরা আমার জানার পিপাসা বাড়িয়ে তোলেন। আবার হৃদয়ে সুহৃদের নৈকট্যও  সাধন করেন।
আজ রবীন্দ্রনাথ। যিনি আমার কাছে সেই অতলান্ত রসসমুদ্র এবং 'প্রাণঘাতী' সৌন্দর্য যে, তাঁর কাছে এলেই আমি William Somerset Maugham-সৃষ্ট Thomas Wilson - য়ের মত 'Lotus Eater' হয়ে যাই। রবীন্দ্র সঙ্গীত শুনতে শুনতে ওই যে গান "কাঁদালে তুমি মোরে ভালোবাসারই ঘায়ে" -- শুনলাম এবং আবারও পড়লাম।
ই গানটি ইংরেজিতে অনুবাদ করে আপনাদের কাছে পাঠানোর ইচ্ছা হোল। পড়ুন পড়ান আর আলোচনা করুন। 

_____________________________________________

কাঁদালে তুমি মোরে 

কাঁদালে তুমি মোরে ভালোবাসারই ঘায়ে -- 
নিবিড় বেদনাতে পুলক লাগে গায়ে।। 
তোমার অভিসারে   যাব অগম পারে --- 
চলিতে পথে পথে বাজুক ব্যথা পায়ে।। 
পরাণে বাজে বাঁশি   নয়নে বহে ধারা -- 
দুঃখের মাধুরীতে করিল দিশাহারা। 
সকলই নিবে কেড়ে   দিবে না কিছু ছেড়ে, 
মন সরেনা যেতে ফেলিলে এ কি দায়ে।। 


For Your Love 

Your love wounds me
Brings tears to my eyes. 
I feel pain unbearable -- yet 
A sense of Joy stirs my self. 

I'll trudge the way infinite 
With my feet bleeding to see your face. 
My heart hears your flute and weeps. 

Sorrow, as if, has its beauty soul ravaging 
Know I, 'Me' 'll die when l meet You, though ! 
Yet, I can not but respond to your call --- 
O, My Dear, My Friend, My Love and My All
______________________________________________

স্বপ্নকেনা

 স্বপ্ন কেনা


বিনি পয়সায় স্বপ্ন কুড়ায় সবাই। 
পয়সা দিয়ে স্বপ্ন কেনে নিমাই। 
সাতটা বছর হয়েছে সবে বড়, 
এর মধ্যেই করেছে সে জড়ো 
সাতটি রাজার ধন-রত্নগুলি। 
দুটো বাক্স, দুটো মোটা থলি, 
একটি খাট পুরো, অর্ধেকটা ঘর 
সোফা টেবিল আছেই এরপর। 
শ'খানেক টেডি, শ'তিনেক 'কার' 
চিড়িয়াখানার সমস্ত জানোয়ার 
এরোপ্লেন, রকেট গড়াগড়ি, 
বন্দুক ? তাও আছে কাঁড়ি কাঁড়ি। 
বলাবলি করে কিছুবা নিন্দুকে, 
হীরা, নীলাও আছে নাকি সিন্দুকে। 
হতে পারে মার্বেল বা রাঙাগুলি, 

রাখা  আছে গোপনে সকলই। 

থাকে নিমু এ সবেরই সাথে, 
বিড় বিড় বকে দিনে রাতে। 
জীবন্ত বান্ধব এরা তার-- 
দুঃখ সুখ আনন্দ অপার। 
এ বিপুল ঐশ্বর্য সম্ভার 
দাম দিয়ে কেনা স্বপ্ন তার। 

দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়

১৩/১২/২০২৩ 

কলকাতা। 

______________________________________________












শনিবার, ২ ডিসেম্বর, ২০২৩

প্রাণধাত্রী ধরিত্রী

প্রাণধাত্রী ধরিত্রী 


(প্রাণের প্রথম ও আদি জন্মদাত্রী জননী বসুন্ধরা। মাতৃগর্ভচ্যুত প্রাণকণিকার প্রথম ধাত্রীও এই ধরিত্রী মাতা। আন্তর্জাতিক নারীদিবসে তারই উদ্দেশে এই কবিতাটি)। 


অন্তহারা সে সুদূর অতীত হবে 
বসুধার মুখে আলো পড়েছিল যবে, 
প্রাণের প্রদীপ জ্বালালো বসুন্ধরা 
বিশ্বভূবনে বন্ধ্যা পাষাণে ঝর ঝর জলধারা 
প্রাণের অমৃতে ভরা। 
কত যুগ কত যুগান্ত অবসান 
স্ফটিক পাথরে মৃত্যুগরল নিত্য করিয়া পান 
শাশ্বত প্রাণের মহিমা উঠেছে জ্বলে 
আকাশে বাতাসে মরুময় দেশে ভূধরে জলে স্থলে। 
যুগসন্ধির রহস্য আলোর সাজে 
অপাপবিদ্ধ নর নারী এলো বিধাতার দেওয়া কাজে। 
দেহমন্দিরে তার 

আনন্দময় মানবমূর্তি বিমূর্ত চেতনার। 

তারপর ? ইতিহাস কথা কয় -- 
যুগে যুগে এলো কত সভ্যতা, শত সভ্যতা লয়। 
লয় শুধু নয়, প্রকৃতির শাপে সঞ্চিত যত শৌর্য, 
ক্ষয়ে ক্ষয়ে হারা কীর্তিস্তম্ভ, দম্ভের মাৎসর্য। 
পশুত্ব-স্বভাব পশুরা তো ছিল, এখনো কিছুবা আছে। 
পাখীরা রয়েছে, গান গেয়ে বাঁচে, প্রকৃতির তালে নাচে। 
তারা পৃথিবীর ভালোবাসা বোঝে, জ্ঞানের গরিমা-হারা 
শুধু মানুষের লালসা আগুনে দগ্ধ বসুন্ধরা। 
যুগে যুগে সে জ্বেলেছে আগুন, নিজেও জ্বলেছে চিতায় 
দ্যুলোকের বাণী ধ্বনিত নিয়ত শোনেনি অহমিকায়। 
মহাকবি বলে, "হে অতীত, তুমি কথা কও কথা কও"-- 
আমি বলি, "ওগো গতকাল, তুমি বিস্মৃত হয়ে রও।" 
ভালো যত আছে তার চেয়ে কালো দেখি সহস্রগুণে, 
অবোধ অবুঝ নিহত নিত্য কুটিল রণাঙ্গনে। 
বিদ্যুৎ ঝলে ঝঞ্ঝার মেঘে তারেও অভয় মানি। 
অসহায় বুকে হাহাকার আনে অস্ত্রের ঝলকানি। 
সাগরের কূলে, মরুপ্রান্তরে শ্যামল সজল ধরায় 
মৃত নরনারী, শিশুদের দেহ শোণিত পঙ্কে লুটায়। 
মনে করে দেখ কুরুক্ষেত্র, -- মহাযুদ্ধের অবসানে 
অস্তসূর্য স্থির অপলক নিষ্প্রাণ প্রাঙ্গনে। 
কুরুপাণ্ডব আরো যত শব আঠারো অক্ষৌহিনী -- 
রথী মহারথী কুশলী সারথি অশ্ব-হস্তিবাহিনী, 
সব যবে শেষ শুধু অবশেষ মূর্ত শোকের হাহারব -- 
ছুটে সুভদ্রা পাগলিনী মাতা খুঁজে খুঁজে ফিরে কার শব ! 
হঠাৎ যেখানে দাঁড়ালেন এসে -- বাহ্য-চেতন হারা -- 
অভিমন্যুর মৃতদেহ কোলে বসে আছে উত্তরা ! 
শূন্য দৃষ্টি শূন্যের দিকে, গর্ভে রয়েছে প্রাণ ! 
মরণের পায়ে জীবনকে রেখে নারীত্ব বলিদান ! 

এমনি নিযুত ভ্রাতৃহনন আত্মহনন শেষে 
আজিও মানুষ নির্বিণ্ণ নয় আত্ম-সর্বনাশে। 
ঝটিকা, প্লাবন, দাবানল যত প্রকৃতির তাণ্ডবে 
ভেঙেছে আলয় আবার গড়েছি নব নব অনুভবে। 
যে বিশ্বমারি মড়কে মরেছে লক্ষ লক্ষ প্রাণ 
মানুষেরই জ্ঞানে, দুঃসাধ্য সাধনে তারও হবে অবসান।

 কিন্তু যে পাখি বুকে-বেঁধা তীর আফগানি গুলবাগে 

থামালো গজল হঠাৎ মরণে 'সোমেতে' ফেরার আগে। 
নির্বোধ শিশু প্রাণহীন যীশু মধ্য সাগর তীরে 
কোথা তার গৃহ, পিতা মাতা স্নেহ, দেখল না কেউ ফিরে। 
কার পাপে হেন, কোন্ অভিশাপে নির্মম পরিণাম ? 
'ফরিস্তা' চুকাবে জীবন মূল্যে অমানবিকতার দাম ? 

আঁধি ব্যাধি আর দৈব বিধান সমস্ত জয় করে' 
স্বকৃত পাপের তরবারি নিয়ে মানুষ মরে ও মারে। 
নূতন নূতন ধর্ম-সৃজন, সেই ধর্মের অজুহাতে 
দেশে দেশে যত ঘাতকের দল রক্ত-সিনানে মাতে। 
মুনাফার ঘোরে উল্লাসে নাচে অস্ত্রের কারবারি 
ধরাধামে সুখ স্বপ্নের ইতি, ভিন্ গ্রহে দিবে পাড়ি। 
নেশাখোর আশা হয়েছে দুরাশা অন্তিম আসে ঘনায়ে -- 
অবলুণ্ঠিতা কুণ্ঠিতা ধরা সে কথা দিয়েছে জানায়ে। 
সভ্যতা, তুমি রোগাক্রান্ত -- এখন এবার থামো। 
প্রাণধাত্রী ধরিত্রী জননী, বল তারে, "নমো নমো"। 
ক্ষমা কোরো মাগো সর্বংসহা, এ বিশ্ব সংসারে 
তুমিই রয়েছ প্রাণদীপ জ্বেলে লোকে ও লোকান্তরে। 
সকল জীবের শ্রেষ্ঠ মানব --  জন্মদাত্রী তুমি, 
তোমার বিপুল স্নেহভরা কোল সবার জন্মভূমি। 
যুগে যুগে এল শান্তির দূত অমৃত মন্ত্র নিয়ে, 
বরণ করেছে অকাল মরণ আমাদের পাপ ধুয়ে। 
শোণিত-পিয়াসী যে অসুর জাগে মানুষের অন্তরে -- 
মানবতাহীন ধর্ম সাধন কাপালিক উপচারে। 
নরবলিদান হবেনা বন্ধ ? হবেনা কি প্রেমদান ? 
নব প্রভাতের রবিকর-দীপ, নব রাগ, নব তান ? 

একই পৃথিবী, এক মহানীড়, এক সুরে গান গাই। 

সবার উপরে জননী সত্য তাহার উপরে নাই ।। 


(পরিমার্জিতরূপে পুনঃপ্রকাশিত 

০৮/০৩/২০২৪)


দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
০২/১২/ ২০২৩
কলকাতা।




বুধবার, ২২ নভেম্বর, ২০২৩

শালুক বনের উপকথা। 

শালুক ফোটে রাতের বেলা,
পদ্ম ফোটে দিনে। 
রাতে-কানা ভ্রমরগুলো 
সে কথা ঠিক জানে। 

"A thing of beauty is a Joy forever." 
                              Endymion, -- Keats. 
______________________________________________

শালুক বনের উপকথা 

লাল নীল সাদা শালুকের মেলা 
দেখি নাই কতো দিন, 
বন্ধু আমায় ছবি পাঠিয়েছে -- 
স্বীকার করেছি ঋণ। 
ঘট পুকুরের স্বচ্ছ সলিলে 
জল থৈ থৈ শরতে, 
দেখার নেশায় ছুটে ছুটে গেছি 
পাখি-ডাকা ভোর বেলাতে। 
ধুয়ে মুখ তারা শিশির ফোঁটায় 
হেসে হেসে মাথা দোলাতো, 
ঘুম-ভাঙা চোখে বিমল রূপের 
স্নিগ্ধ মাধুরী বিলাতো। 
আলো ফুটতেই ভ্রমরের দল 
গান শোনাবার ভানে, 
পাপড়ি পিঁড়িতে বসতো, আসলে 
মধুর গোপন টানে। 
যাবার বেলায় হুলের আঘাতে 
কোরক চূর্ণ করে' 
কমলিকা খোঁজে বনের পুকুরে 
বেমালুম যেতো উড়ে। 
বিক্ষত বুক শাপলার দুখ 
দেখেছি নিজের চোখে -- 
জলতলে ঢলে' লুকাতো শ্রীমুখ 
গভীর বিষাদে শোকে। 
হায়, তারা যেন ব্রজগোপীকুল, 
প্রেমবঞ্চিতা বালা ! 
কৃষ্ণ-কাঁটায় বিদীর্ণ হিয়া-- 
মধুপুরে গেছে কালা।। 

দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় 
২২/১১/২০২৩ 
কলকাতা। 






শনিবার, ১৮ নভেম্বর, ২০২৩

স্বপ্ন বিলাস

স্বন বিলাস 

ভোরের বেলা এলো 🐦 পাখি 
খোকনকে সে বলল ডাকি', 
আমি এখন যাচ্ছি বনে 
যাবি আমার ঘরে ? 


বলে খোকন বলেছে মা 
বনে আছে  🐅 বাঘমামা 
আমায় যদি রাখে ধরে 
ফিরব কেমন করে ? 


ডানার উপর তুলে তোমায় 
নিয়ে যাব আমার বাসায়, 
বনের ফল পাবে তুমি, 
দেব নদীর জল। 


ভাবছে খোকন বেশ হবে তা, 
খুঁজে আমায় পাবেনা মা, 
"দাদা দিদি বকা খাবে, 
খোকন কোথায় বল।" 


জানলা খুলে ডাকল যে কে, 
হঠাৎ আলো পড়লো চোখে 
দেখে খোকন দুচোখ খুলে 
উড়ছে একটি পাখি। 


হোল না তার বনে যাওয়া, 
বনের মিষ্টি ফল খাওয়া
স্বপ্ন দেখার সময়টিতেই 
এমন ডাকা ডাকি ! 

দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
১৮/১১/২০২৩
কলকাতা।
____________________________________________











বুধবার, ১৫ নভেম্বর, ২০২৩

ভাইফোঁটা

ভাইফোঁটা 

ঘরে ঘরে আজ উলুধ্বনি আর শঙ্খস্বর শুনে
বলে সকলে আজ সকালে ভাইফোঁটা দেয় বোনে।
এত সুন্দর, পবিত্রতম উৎসব দেখি নাই, 
ভাইয়ের কপালে ফোঁটা দেয় বোন, 'তুমি সুখে থাকো ভাই।" 
শীতল শিশিরে চন্দন বাঁটে মঙ্গল কামনায়।
মৃত্যুঞ্জয়ী মন্ত্র বলে সে জীবন জুড়ানো ভাষায় --
"যমুনা দেয় যমকে ফোঁটা, আমি দি' ভাইকে ফোঁটা,"
-- নিরলঙ্কার বাণীর মন্দ্রে যেন পারিজাত ফুল ফোটা।
সব দুখ শোক অপনিত হোক্ ধান দূর্বার ছোঁয়ায়,
আমার আয়ু তোমায় দিলাম "শতজীবী হও ভাই।"
আজ ভ্রাতা ভগিনীর মিলনমেলায় সংসার গীতিময়,
মঙ্গলময়ী ভ্রাতৃ দ্বিতীয়া যুগে যুগে অক্ষয়।

দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
ভ্রাতৃ দ্বিতীয়া,১৪৩০।








মঙ্গলবার, ১৪ নভেম্বর, ২০২৩

Children's day

 Children's day 

The stars that shine and the moon that smiles
Are of less use than your giggles.
The dew that falls and the rain 🌧️ that showers
Scarcely as soaking as your 😿 tears.
Pranks you play and shout you cry in vain,
You lose nothing but lots ❤️ I gain.
When, of a sudden, run away with my spakes
You find nothing but I can catch the hakes.
Be with me Sir, or l'll teach such a lesson
That you can't even to your parents mention.

Thank you & your company'
The grandpa
Dulal Chandra Bandyopadhyay.
14/ 11/2023


সোমবার, ৬ নভেম্বর, ২০২৩

হৈমন্তী

হৈমন্তী 


দিগন্তজোড়া হেমন্ত ক্ষেতে স্বর্ণ সুষমা দেখি 
আর ভাবি মনে, কত অশ্রু, কত রক্তের ছিটা 
প্রতিটি কণায় আছে। গ্রীষ্মের তাপ, বর্ষার ধারা, 
অভাব জ্বালায় জ্বলে জ্বলে, গুলে গুলে কাদা মাটি 
পাথরের ক্ষত পা'দুটোতে বয়ে গুছি গুছি চারা পুঁতে 
সৃষ্টি করেছে বাঙলার মাঠে যারা এ সোনার ধান 
নেপথ্যে কেন রয়ে যায় তারা উলঙ্গ অপমানে ? 
ঘূর্ণীঝটিকা সাগরের জল চলোর্মি নাচ নাচে 
তাণ্ডব তার ধূয়ে নিয়ে যায় যাদের মাটির ঘর, 
বিদ্যুতে পোড়ে, বাজ পড়ে মরে, সাপের ছোবল খায়, 
মানহারা যত দুর্দিন কাটে খোঁয়াড়ে খোঁয়াড়ে ঢুকে, 
নবান্নে যাদের নূতন অন্নে ভরেনা টিনের থালা, 
তাদের নিত্য মরণের দামে সোনা দিয়ে মাঠ মোড়া -- 
সোনালী আলোর স্বপ্নাভরণে প্রকৃতি স্বয়ম্বরা। 

বাঙলার এক পল্লীপ্রান্তে ছোট এক নদী পাড়ে, 
কনক আসনে কঙ্কন-পরা স্বর্ণাঞ্চলা কে গো ? 
হেমন্ত দিনের বিমল সকালে লক্ষ্মী প্রতিমা জাগে। 
চিত্ত আমার বিনত মুগ্ধ শিল্পীর অনুরাগে। 

দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
০৬/১১/২০১৩
কলকাতা।








হৈমন্তী

দিগন্তজোড়া হেমন্ত ক্ষেতে স্বর্ণ সুষমা দেখি
আর ভাবি মনে, কত অশ্রু, কত রক্তের ছিটা
প্রতিটি কণায় আছে। গ্রীষ্মের তাপ, বর্ষার ধারা,
অভাব জ্বালায় জ্বলে, গুলে গুলে মাটি ধূলা,
পাথরের ক্ষত পা'দুটোতে বয়ে গুছি গুছি চারা পুঁতে
সৃষ্টি করেছে বাঙলার মাঠে যারা এ সোনার ধান
নেপথ্যে কেন রয়ে যায় তারা উলঙ্গ লজ্জায় ?
ঘূর্ণীঝটিকা সাগরের জল চলোর্মী নাচ নাচে
তাণ্ডব তার ধূয়ে নিয়ে যায় যাদের মাটির ঘর,
অসহায় যারা দুর্দিন কাটে খোঁয়াড়ে খোঁয়াড়ে ঢুকে,
নবান্নে যাদের নূতন অন্নে ভরেনা টিনের থালা,
তাদের নিত্য মরণের দামে সোনা দিয়ে মাঠ মোড়া।

বাঙলার এক পল্লীপ্রান্তে ছোট এক নদী পাড়ে,
কনক আসনে কঙ্কন-পরা স্বর্ণাঞ্চলা কে গো ?
হেমন্ত দিনের বিমল সকালে লক্ষ্মী প্রতিমা জাগে।
চিত্ত আমার বিনত মুগ্ধ শিল্পীর অনুরাগে।

দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
০৬/১১/২০১৩
কলকাতা।








শুক্রবার, ৩ নভেম্বর, ২০২৩

জীবন লীলা

জীবন লীলা


কোন সে কিশোর কালে ফেলে আসা দিনে
কুয়াশার ঘোমটা-পরা শীতল সকালে
স্বচ্ছ নীল ক্ষীণস্রোত অজয়ের পাড়ে
বসে আছি একা। নৌকাটি রয়েছে বাঁধা
বালির চড়ায়, মাস্তুলে তার আছে বসে
মাছরাঙা, কী অপূর্ব রঙ ! গাঢ় নীল ডানা,
নীল পুচ্ছ জ্বল জ্বল প্রভাতী আলোয়।
নীল জলে ছায়া নাচে, নীলাকাশে মায়া
ভাসে তার।
                অকস্মাৎ ঝুপ করে ঝাঁপ, ডুব,
চঞ্চুপুটে মীন ছানা -- উড়ে গেল 'সুন্দর'
ওপারের শ্যাওড়ার ঝোপে। ভেবেছি সেদিন
কত ভালো হোত যদি ও 🐦 পাখির মতো
হতে পারি আমি। আজ মনে জাগে শিহরণ ---
কি করুণ ছবি জীবনের মরণের এক পটে বাঁধা !
সৃষ্টির নিষ্ঠুর সত্য প্রকৃতির অমোঘ বিধান
এক প্রাণ লুপ্ত হয় জাগে অন্য প্রাণ।

দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
০৩/১১/২০২৩
কলকাতা।









শনিবার, ২৮ অক্টোবর, ২০২৩

কোজাগরী

কোজাগরী

 


চারিদিকে কোলাহল, যেন সমুদ্র মন্থন ! ওঠে বিষ। 

অমৃত কখনো বা ; কিন্তু তার ভাগ নাই সকলের।

  হলাহল আকাশে বাতাসে, শহরের গুহা হতে পল্লীর 

 উন্মুক্ত প্রান্তরে। 

চাও বা না চাও তুমি বিষপান নিয়তি নির্দেশ। 

আজ থাক্ সে সকল ক্লিন্ন খিন্ন কথা বেদনার। 
এসো আজ ভাসি গঙ্গায়, উজানে বা ভাটিতে ভাসাই 
ছেঁড়া পাল ভাঙা হাল পুরানো পানসি। দেখি বাঙলার 
স্বর্ণশীর্ষ আনমিত ধান অফুরান, দিগন্ত প্রসারী 
দুই তীরে -- 'গায়ে হলুদ'য়ের শাড়ি-পরা, লজ্জারুণ 
কন্যাটি যেমন। চেয়ে চেয়ে দেখি দিনভর অপলক। 
রঙ বদলায় এখন তখন -- জ্বল জ্বল করে ওঠে 
সাতরঙে সাতনরী হার তটিনীর, কী অপরূপ রূপ জাগে 
সূর্যঢলা দিনান্ত বেলায় ! অভিসিক্তা বঙ্গবালা 
বধূরূপে দাঁড়ায় অঙ্গনে, কাঁখে তার সোনার কলস। 

সন্ধ্যা নামে, চাঁদ ওঠে (যেমন সে উঠেছিল সৃষ্টির  আদিম প্রয়াসে), 
জ্যোৎস্নার বান-ডাকা বাংলার দুয়ারে দুয়ারে 
চির সাধনার জীবন্ত প্রতিমা, ঐ দেখ, রয়েছে  দাঁড়ায়ে। 
শঙ্খে শঙ্খে মঙ্গল গান, "এসো মা লক্ষ্মী, বোসো ঘরে"। 

নবান্নের গন্ধমাখা শিশির শীতল বিভাবরী -- 
সোনার স্বপন-বোনা উজাগর থাকো কোজাগরী। 

দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় 
কোজাগরী লক্ষ্মী পূর্ণিমা, ১৪৩০
কলকাতা।











বৃহস্পতিবার, ২৬ অক্টোবর, ২০২৩

দুগ্গা গেল শ্বশুরবাড়ি

ফ্লাট নং -- ০০

"দুগ্গা গেল শ্বশুরবাড়ি'', মিথ্যা বলিসনে।
বলতো দেখি দুগ্গা মায়ের শ্বশুরমশাই কে ?
শ্বশুর নাই, শাশুড়ি নাই, ঘর সে পাহাড় চূড়া।
সোয়ামী আছে কিন্তু সে তো আদ্দিকালের বুড়া।
ছেলে মেয়ে আছে বটে, তারা আবার বেকার।
অন্নপূর্ণা জননী তাই অন্ন জুটে সবার।
বলতে পার ফ্লাটটা শিবের আকাশ ফোঁড়া ঘর,
সিদ্ধি খেয়ে বৌয়ের দয়ায় থাকেন দিগম্বর।

দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় 
২৬/১০/২০২৩


মঙ্গলবার, ২৪ অক্টোবর, ২০২৩

পোহায় নবমী নিশি


পোহায় নবমী নিশি 


নবমীর রাত্রি হোল শেষ, চাঁদ ডুবে গেছে বহুক্ষণ। 
বিষন্ন ভোরের তারা কুয়াশায় ম্লান, আছে চেয়ে 
কন্যা বিদায়ের কালে অশ্রুমতী জননী যেমন 
 থাকে চেয়ে বাঙলার দুয়ারের চৌকাঠ ধরে'। 
কখন সে এসেছিল প্রতীক্ষার আনন্দের বান ! 
উচ্ছ্বাসের তীরপ্লাবী ভরা সে কোটাল -- 
অকস্মাৎ কোথা হোল হারা ? বিদায়-ভাটির সু্রে 
 বাজে ঢাক, কাঁসরের করুণ কাঁদন মন্দিরে মন্দিরে। 

মৃণ্ময়ী প্রতিমা নয় উমা হৈমবতী, তনয়া সে প্রাণময়ী 
 আবেগের রক্তরাগে সৃষ্টি ওই মায়াভরা চাঁদমুখ, 
 প্রসন্ন-সুন্দর দৃষ্টি, চিরন্তনী জননীর বুকের বাসনা 
 মূর্ত হয়ে মূর্তি ধরে' ছিল তিন দিন। নয় স্বপ্ন, সত্য 
 ছিল ; তাই বিচ্ছেদের এত দুঃখ, এমন বেদনা 
ঊষার বাতাসে ভাসে বিজয়ার বিধুর সংগীত। 

দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় 
৬ই কার্তিক (ভোর) ১৪৩০।





 









সোমবার, ২৩ অক্টোবর, ২০২৩

নবমী নিশার শেষে

নবমীর রাত্রি হোল শেষ, চাঁদ ডুবে গেছে বহুক্ষণ। 
বিষন্ন ভোরের তারা কুয়াশায় ম্লান, আছে চেয়ে 
কন্যা বিদায়ের কালে অশ্রুমতী জননী যেমন 
থাকে চেয়ে বাঙলার দুয়ারের চৌকাঠ ধরে। 
এই তো সে এসেছিল -- প্রতীক্ষার আনন্দের বান ! 
উচ্ছ্বাসের তীরপ্লাবী ভরা সে কোটাল -- 
অকস্মাৎ কোথা হোল হারা ? বিদায়-ভাটির সু্রে  বাজে ঢাক, কাঁসরের করুণ কাঁদন মন্দিরে মন্দিরে। 

মৃণ্ময়ী প্রতিমা নয় উমা হৈমবতী, তনয়া সে প্রাণময়ী।  আবেগের রক্তরাগে সৃষ্টি ওই মায়াভরা চাঁদমুখ,  প্রসন্ন-সুন্দর দৃষ্টি ; চিরন্তনী জননীর বুকের বাসনা 
মূর্ত হয়ে মূর্তি ধরে' ছিল তিন দিন। নয় স্বপ্ন, সত্য  ছিল, তাই বিচ্ছেদের এত দুঃখ, এমন বেদনা। 
ঊষার বাতাসে ভাসে বিজয়ার বিধুর সংগীত। 


দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
৬ই কার্তিক (ভোর) ১৪৩০।











শনিবার, ২১ অক্টোবর, ২০২৩

আলী সাহেব -- মৃৎশিল্পী জীবনশিল্পী।

আলী সাহেব -- মৃৎশিল্পী জীবনশিল্পী



ছেলে মেয়ে বড় হয়েছে। আমরা বুড়ো হয়েছি। সন্তানদের সংসার হয়েছে। আমরা তাদের সংসারে আত্মসমর্পণ করে দিয়েছি। ছেলেদের, বৌমাদের, নাতি নাতনীদের সেবা পাই, বকাঝকা খাই, দেখি শুনি সবই কিন্তু 'মন নাই মোর কিছুতেই'। কাজ কম্ম, দায় দায়িত্ব কিছুই নাই। এসব নাই বলেই শরতের শ্যামল সতেজ তৃণ-প্রাচুর্য-পরিপূর্ণ চারণভূমি পরিভ্রমণ করার পর কৃষকের বৃদ্ধ বলদ যেমন দিনান্ত বেলায় গাছের ছায়ায় বসে থাকে, রোমন্থন করে আধবোজা চোখে, আমার আজকের অবস্থা তেমনি। স্মরণের পথ পাড়ি দিয়ে মন চলে গেল সুদূর অতীতে, সত্তর বছর আগে, উনিশ শ' বাষট্টি তেষট্টি সালে, এমনি এক দুর্গোৎসবের ষষ্ঠীর দিনের পড়ন্ত বিকাল বেলায়।
অজয় নদের (আমরা নদীই বলি) উজান বেয়ে যতই পশ্চিমে যাবে ততই ছোটনাগপুরের আদিমতামাখা মালভূমির রূপ -- পাথুরে পাহাড়, ঢিপি, টিলা, ঝোঁপ- ঝাড়, বন-জঙ্গল। এমন এক রুক্ষ শুষ্ক দেশে, অজয় নদীর পাড়ে আমার জন্ম। বাল্য, কৈশোর কেটেছে সেখানেই। আমাদের গ্রাম, 'পাথর ডিহি', ছিল ছোট একটি বসত। চাষা ভুষাদের বাস। মাঝখানে আমাদের পাঁচঘর বামুন। সামনে নদী, ডাইনে বাঁয়ে শাল মহুয়ার বন, পিছনে দিগন্তজোড়া মাঠ, পাথুরে পাহাড়ের সীমানা দিয়ে খণ্ডে খণ্ডে বাঁধা। চাষের জমির ধান ছিল, পুকুর ডোবার মাছ যৎসামান্য হলেও ছিল কিন্তু বিদ্যার বালাই মোটেও ছিল না। একটি পাঠশালা ছিল। একজন মাষ্টারও ছিল। একটি ভাঙা কাছারি ঘরে তিনি থাকতেন, সেখানেই পড়াতেন। সে পাঠশালায় গেলে যাও, না গেলে না যাও। বর্ষাকালে সেও থাকত বন্ধ।
হঠাৎই গ্রামজুড়ে কী যেন চঞ্চলতা, কানাকানি। ''খুব ভালো, খুব ভালো", "না না ঠিক নয়, ঠিক নয়" -- এমনি নানা কথা বলাবলি। কারণটা জানতে পারলাম যখন একদিন সন্ধ্যা বেলায় একজন নূতন মানুষ আমাদের উঠোনে এসে দাঁড়ালেন। অনেক লম্বা। যেমন লম্বা তেমন ঝোলা সাদা জামা, মাথায় সাদা টুপি। বাবা এগিয়ে গেলেন। কি সব কথা হোল। তারপর জোড়হাত। মাথা নোয়ালেন, চলে গেলেন।
বাবা মায়ের কথাবার্তার সমস্তটা সেদিন বুঝতে পারি নি, তবে জেনেছিলাম তিনিও একজন মাষ্টার। নূতন এসেছেন। এখানকার পাঠশালা আর থাকবে না। ইস্কুল হবে। বড় ইস্কুল। গ্রামের সকল ছেলেদের পড়তে যেতেই হবে। মেয়েদেরও।
মা বলেছিল,
--- তবে আর বিবেককে বীণপুর পাঠিয়ে কি লাভ ?
--- এখানে পড়াশুনার চাষ কোনদিনও হবে না। কলু, বাউরি আর মুসলমান ছেলেরা করবে লেখাপড়া ?

বলেছিলেন বাবা।

সে বছরই, আমাকে, আমার মামাবাড়ি, বর্ধমান জেলার দামোদর নদের পাড়ে বীনপুর গ্রামে পাঠিয়ে দেওয়া হোল। বড় গ্রাম, বড় ইস্কুল। আমি যেহেতু বাবার কাছে বর্ণপরিচয় প্রথম ভাগ, দ্বিতীয় ভাগ পড়েছিলাম, যোগ বিয়োগ গুণ ভাগ শিখেছিলাম, তাই আমি দ্বিতীয় শ্রেণীতে ভর্তি হয়ে গেলাম। এখানে শুধু নিয়মিত ইস্কুলে যাওয়া, পড়া আর পড়া। মেজ মামার ভয়ে পুতুলের মত থাকা। একা একা বাইরে যাওয়া মানা।
এমনি চলতে থাকে। বছর বছর কেটে গেল। আমার পাথর ডিহিতে ফেরা হয়নি। মা আর বোন মাঝে মাঝেই আসে, থেকেও যায় বেশ কিছুদিন ধরেই। চার বছর পর, ষষ্ঠ শ্রেণীতে উঠেছি, পূজার সময় খুব জিদ ধরলাম, আমি পাথর ডিহি যাবই। মেজ মামার কি জানি কি হোল, বলল,
--- চল, আমিও যাই। শুনছি নাকি তোদের গ্রামেও গত বছর থেকে দুর্গা পূজা হচ্ছে।
অস্থির হয়ে উঠলাম ভিতরে ভিতরে। দিন আর কাটে না। রাতে ঘুমাতে পারি না। কতদিন পর অজয় নদী দেখব, বন্ধুদের দেখব। আর ওই যে নূতন মাষ্টার !

দুর্গা পূজার ষষ্ঠীর দিন সন্ধ্যায় পোঁছে গেলাম। মনে হচ্ছিল তখনি বেরিয়ে পড়ি গ্রামের এ-প্রান্তে, ও-প্রান্তে। বাবা আর মেজ মামার ভয়ে তা হোল না। রান্না ঘরে মায়ের কোলের কাছে গিয়ে বসলাম। মা বুকে ধরে এক হাতে জড়িয়ে রইল আমাকে, অন্য হাতে খুন্তি। মা আপন মনে কত কিছুই যে বলে গেল। সারা গাঁয়ের খবর। আমি আর থাকতে না পেরে ওই চার বছর আগের দেখা মাষ্টারের কথা জানতে চাইলাম।
বলছি সে গল্প। তুই তো এখন বড় হয়েছিস, বুঝবি।
ওই মাষ্টারকে নাকি সরকার পাঠিয়েছিল। এক বছর ধরে ছেলে মেয়ে জোগাড় করে পড়াতে হবে। তবেই সরকার ইস্কুল করে দেবে। মাষ্টার সে কথা বলেছিল। মুসলমান পাড়ার লোকেরা ছেলেদের পাঠালো না। তারা তাদের পাঠশালা, মাদ্রাসা খুলেছিল আগেই।
বাকিরা --- বামুন, বাউরি, কলু, গোয়ালা , সকলে বলে দিল মুসলমান মাষ্টারের কাছে তারা ছেলে মেয়ে পড়াবে না।
মাষ্টার কিন্তু গেল না।
মাষ্টার কি করল, পাড়ায় পাড়ায় ঘুরতে আরম্ভ করল। সবার ঘরে যায়। উঠানে গিয়ে বসে। খাবার চেয়ে খায়। মুসলমানদের পাড়ায় গিয়ে নামাজ পড়ে, আজান হাঁকে। আমাদের ঘরে এসে সত্য নারায়ণ পূজার সিন্নি, বাতাসা খায়। যেন ঘরের মানুষ। মিষ্টি মিষ্টি কথা বলে, গলা ছেড়ে গান গায়। মাটি দিয়ে একটি ঘরও বানাতে লাগল নিজে নিজেই। এমনি করে অনেক দিন কাটানোর পর গত বছর, একদিন  সবাইকে ডেকে বলল,
--- আপনাদের গাঁয়ে তো দুর্গাপূজা হয় না। দুর্গাপূজা করুন। আমি প্রতিমা গড়তে জানি।
'না' বলতে পারল না কেউ। অল্প বয়সের ছেলেরা আনন্দে লাফাতে শুরু করল। বামুনদের বুড়োরা খুব রেগে গেল। বলতে লাগল,
--- এবার কি ম্লেচ্ছ দুগ্গার পূজা করতে হবে ?
--- তাই হবে, তাই হবে', বলে চিৎকার করে উঠল সবাই।
মাষ্টার কী সুন্দর ঠাকুর গড়েছিল বাবু ! তোর দাদুই তো পূজার সমস্ত অনুষ্ঠান করেছিলেন পরে। মাষ্টার কত যে খরচ করেছিল। শহর থেকে কিনে এনেছিল  এতো এতো গেঞ্জি আর গামছা। গাঁয়ের সকল ছেলেদের একটি করে গেঞ্জি, মেয়েদের একটি করে গামছা বিলি করেছিল নিজের হাতে। মুসলমান পাড়ার ছেলেরাও এসেছিল। খুব আনন্দ হয়েছিল।
এ বছর আরো জমকালো পূজা হচ্ছে শুনছি। ধুতি শাড়িও দেওয়া হচ্ছে। কাল ভোর বেলা সপ্তমী পূজা। তোদেরও নিয়ে যাব।
হ্যাঁ, পরের দিন খুব সকালবেলায়, ভাঙা নয় এখন,  সাজানো গোছানো নিকানো কাছারি ঘরের উঠানে গিয়ে দেখি মা দুর্গা, সঙ্গে কার্তিক গণেশ লক্ষ্মী সরস্বতী। অসুর হাঁটু গেড়ে বসে আছে নিচে। এক হাতের কনুই তার সিংহের মুখে, অন্য হাতে তলোয়ার। দুর্গা মায়ের ত্রিশূল তার বুকে বিঁধে আছে। পেট ফাটা মহিষ। রক্ত ঝরছে, রক্ত গড়িয়ে গড়িয়ে পড়ছে। এসব গুলো মনে ধরেছে না। চোখ চলে যাচ্ছে দুর্গা মায়ের মুখের দিকে। কি সুন্দর, কি যে সুন্দর। আমার মায়ের মতই। হঠাৎই চমকে উঠলাম। পেছনে কার হাতের ছোঁওয়া। পেছনে ফিরে দেখি লম্বা জামা গায়ে, মাথায় সাদা টুপি একটি আমার বয়সের ছেলে।
--- এসো আমার সঙ্গে।
কাছারি ঘরের পিছনেই নতুন ঘর। রঙ দিয়ে লেখা, পাথর ডিহি প্রাথমিক বিদ্যালয়। এখনো পুরোটা হয় নি। তার বারান্দার শেষে গিয়ে দেখি মাষ্টার। অমনি ঝোলা জামা, সাদা টুপি মাথায়, বুক পর্যন্ত লম্বা ছুঁচলো দাড়ি। দাঁড়িয়ে আছেন। সামনে, বড় একটি চৌকিতে গাদা-করা নূতন কাপড়।
---- বিবেক বাবু, (আমার ভালো নাম বিবেকানন্দ), কাল সন্ধ্যায় এসেছো ? শুনেছি। এসো, তোমাদের পাওনাগুলি নিয়ে যাও।
এই বলে আমার হাতে এক থাক কাপড় তুলে দিলেন।

আয়ুষ্কাল থেকে সাড়ে তিন কুড়ি বছর বিদায় নিয়েছে। উৎসভূমি অগম্য, দুরত্যয়া। জীবনের পাকদন্ডী পথ বেয়ে আজ ক্ষণকালের আরো এক পান্থশালায় আশ্রয় পেয়েছি, যেখান থেকে আমার ওই পাথরডিহি গ্রাম হাজার যোজন দূরে। মা বাবা আত্মীয় স্বজন, সে গাঁয়ের সেদিনের সে সকল প্রাণ, ভালো মন্দ, সুখ দুঃখ, কথা ও কাহিনী আজ শুধুই স্মৃতি। যে কয়েকটি মুখ, শরতের নির্মল আকাশে প্রভাত কিরণে সমুজ্জ্বল খণ্ড খণ্ড মেঘের মত ভাসে তাঁদেরই একটি ওই আলী মাষ্টার--- শামসুর  আলী। মাটির ঘর, মাটির মূর্তি গড়েছিলেন অপূর্ব।

দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় 
২১/১০/২০২৩
মহাসপ্তমী,১৪৩০।















সোমবার, ১৬ অক্টোবর, ২০২৩

বিনা মেঘে বজ্রপাত

বিনা মেঘে বজ্রপাত 


বিনা মেঘে বজ্রপাত 


(যুদ্ধ বিধ্বস্ত মধ্যপ্রাচ্যের আহত নিহত শিশুদের স্মরণে।) 


হাজার পদ্ম ফুটে আছে পদ্মদীঘির জলে, 
প্রভাত আলোর কোমল ছোঁয়ায় খুশির হাওয়ায় দোলে। 
কালো ভ্রমর এসে বলে' "বন্ধ কর দোলা, 
মধু খাওয়ার সময় আমার, 'ব্রেক ফাস্টের' বেলা।" 
মৌমাছিরা গান ধরেছে, প্রজাপতি নাচে, 
উতল ঢেউয়ের নাচন দেখে কেউ আসে না কাছে। 
মধুর লোভে যে যার মত শাসন তোষণ করে। 
দ্যুলোক ভূলোক উঠলো মেতে জলতরঙ্গ সুরে। 
ফুল পাখি শিশুর ভূবন আনন্দ সরোবর  ; 
অবোধ হৃদয়, নিষ্পাপ প্রাণ জানে না আত্মপর। 

অকাল মেঘে ঢাকলো হঠাৎ স্নিগ্ধ সকাল বেলা, 
বজ্রপাতে ঝলসে গেল ফুল্ল ফুলের মেলা। 


দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় 
১৬/১০/২০২৩
কলকাতা।








শনিবার, ১৪ অক্টোবর, ২০২৩

তর্পণ

তর্পণ 


"ময়া দত্তেন তোয়েন তৃপ্যন্তু ভূবনত্রয়ম্।"

ক্ষণিকের আলয় ছেড়ে মহালয়ে চলে গেল যারা
বুকে নিয়ে পিপাসার মহামরুভূমি, জল দাও।
শান্ত হোক্ কামনার চিরবহ্নিজ্বালা।
এমত কি আছে কোন এ মর্তের প্রাণ,
পরিতৃপ্ত জীবনের করে' সুধা পান মরণের কোলে
সে নিয়েছে আশ্রয় ? যোগী, ভোগী, অনুরাগী,
বিবাগী বিলাসী -- না-পাওয়ার তৃষ্ণা বুকে নিয়ে
ফিরেছে সবাই দেশশূন্য, কালশূন্য অজ্ঞাত আলয়ে।
আর যারা পেয়েছিল অমৃতের স্বাদ পৃথিবীতে,
ঈর্ষা হিংসা জিঘাংসার অস্ত্রাঘাতে ব্যর্থপ্রাণে
নিয়েছে বিদায়। আছে আছে আছে কিংবা নাই নাই,
যা সত্য তাই, আজ এই প্রভাতের সূর্যকরস্নাত
আকাশের মত থাকে যেন সুনির্মল প্রশান্ত সুন্দর।
আমার অঞ্জলি-জলে তৃপ্ত হোক বিশ্বচরাচর।

দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
মহালয়া, ১৪৩০।







শুক্রবার, ৬ অক্টোবর, ২০২৩

তুমি কোন ভাঙনের পথে এলে

 তুমি কোন ভাঙনের পথে এলে 

একটি মর্মান্তিক মৃত্যু ! জীবন-বাঁচানোর সেবা-মন্দিরে তরুণী জীবনধাত্রীকে পৈশাচিক ধর্ষণ ও‌ খুন। ভীতি, বিমূঢ়তা গ্রাস করল জাতিকে, সমাজকে, দেশকে, এমনকি বিশ্বকেও। কিন্তু এ তো শুরু বা শেষ নয়। এ-যে সারা দেশে, জনপদে জনপদে নিত্য নিয়ত সংঘঠিত বিকৃত-মনন, অর্থলিপ্সু, নির্বিবেক মানুষরূপী শ্বাপদদের পশ্বাচারের অসংখ্য উদাহরণের একটি এবং বিশেষ একটি। সাময়িক শোকচ্ছ্বাসের বিহ্বলতা কাটিয়ে মানুষ জেগেছে। কিন্তু সেই হঠাৎ জাগরণের দিশাহীনতাও এতটাই প্রকট যে সমাজচেতনা আজ উদভ্রান্ত, বিভ্রান্ত। বিশ্বাসহীনতার অন্ধকারে সবই যেন বিলুপ্ত। সরকার, বিচার ব্যবস্থা, নীতি আদর্শ গুলি -- যা সমাজবন্ধনের, মৈত্রী সম্মন্ধের বন্ধনডোর -- সেগুলি যেন বেহালার (বে-হাল) ছিন্ন তার। 

এদিকে শরৎ এসেছে আবার। সমাসন্ন দুর্গোৎসব। সচ্ছল যাঁরা তাঁদের আনন্দের প্রত্যাশা, অসচ্ছল যাঁরা তাঁদের রুজি রোজগারের আশা। বিপণি-পণ্য- বিপণন, শিল্প-শিল্পী সম্পর্কের সন্ধিকালও এই সময়। 

 কিন্তু তুমুল বর্ষা অকস্মাৎ। বাঙলার বুকে দর্গতির, দুর্ভাগ্যের, প্রতি বছরের মত এবারও, মারণ আঘাত। নদীর পাড়ের গ্রামের পর গ্রাম তলিয়ে যাচ্ছে নদীগর্ভে, বাঁধ ভাঙা প্লাবনে ডুবে গেছে দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা, পূর্ব মেদিনীপুরের শত শত জনবসতি। ধ্সে  পড়ছে গাঁয়ের, শহরতলীর কাঁচা ঘর। বাঁকুড়া বিষ্ণুপুরের ঘটনা তো সহ্য করা যায় না -- মর্মবিদার। মনে হয় আমি বা আমরাও কেন বেঁচে আছি এখনও। ঘরের দেওয়াল ধসে তিনটি ঘুমন্ত শিশুর জীবন্ত সমাধি। কোথাও বা বৃদ্ধ বৃদ্ধারাও ভেঙে-পড়া ঘরের ধংস স্তুপের ভিতরে শেষ নিঃশ্বাসটুকুও নিয়ে যেতে পারেনি। দক্ষিণ বঙ্গের আটখানা জেলার, বিশেষ করে গ্রামাঞ্চল ও শহরতলি কোথাও হাঁটু, কোথাও গলা পর্যন্ত বন্যার দূষিত, আবর্জনাক্লিন্ন জলে নিমজ্জিত। উত্তরবঙ্গে, সিকিমে কী ঘটছে বা ঘটবে তা জানেন শৃঙ্খল-ছিন্ন উন্মত্ত প্রকৃতি। 

প্রতিবিধান ?

বাঙলার এবং ভারতেরও ভাগ্য নিয়ন্ত্রণ যাদের হাতে তারা শ্মশান শ্বাপদের লালাসিক্ত রসনায় আত্মকলহে উন্মাদ। ওই নিরপরাধ, অবোধ-নির্বোধদের হাহাকার-য়ের, অকাল মৃত্যুর হাতে-পাওয়া মূলধন কে কতখানি রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলে কাজে লাগাবে তারই জন্য ছোটাছুটি। কেও যদি এক টুকরো 'শোক', মৃত শবের শরীর থেকে ছিঁড়ে-নেওয়া মেদখণ্ডের মত ছিনিয়ে নিয়ে স্থলপথে পালিয়ে গেল, অমনি আরেকজন আরেক টুকরো আহরণ করে, রক্তনয়নে  হুঙ্কার ছেড়ে আকাশে লাফ দিয়ে পোঁছে গেল কাপালিক গুরুর গুহায়। মানুষের দারিদ্র্য, বিপর্যয়, দুর্গতি -- এগুলি রাজনীতির নির্মম ব্যবসায়ীদের কাছে Sustainable and substantial Capital. 

বছরের পর বছর পেরিয়ে জীবনের শেষ ধাপে আজ পৌঁছেছি, বহু রাজনৈতিক নেতাকে দেখেছি, যাদেরকে দেখিনি তাদের জীবনী পড়েছি --- মাত্র কয়েকজন ব্যতিক্রমী ব্যক্তিত্ব ছাড়া বেশীর ভাগই ওই (Julius Caesor.) মার্কাস ব্রুটাসের সেই বিখ্যাত উক্তির মূর্ত মূর্তি। 


"The abuse of greatness is young ambition's ladder ;
Whereto the climber upward turns his face,
But when he attains the upmost round,
He then unto the ladder turns his back
Looks in the clouds scoring the base degrees
By which he did ascend." 


স্বভাব-সরল সাধারণ মানুষকে সিঁড়ির মত ব্যবহার করে সদ্যজাত 'উচ্চাকাঙ্ক্ষা' (উচ্চাকাঙ্ক্ষী নেতা) যখন শাসন ক্ষমতার উচ্চতম মঞ্চে নিজেকে অধিষ্ঠিত করে তখন তার দৃষ্টি মেঘেদের উপর। সিঁড়ির দিক থেকে শুধু যে সে মুখ ফিরিয়ে নেয় তাই নয়, তার ওই ক্ষমতার উৎসের প্রতিও তার ঘৃণা, তার বিতৃষ্ণা প্রদর্শন করে।
জগৎ ও জীবনের মহা নাট্যকার, মহাকবির এই উচ্চারণ সত্যের আলোয় চির ভাস্বর। বিদেশ বিভূঁইয়ের কথা থাক্, আজ আমাদের দেশের রাষ্ট্র-  যন্ত্রের, রাষ্ট্র তন্ত্রের দিকে তাকিয়ে দেখলেই এই ছবি সুস্পষ্ট। 

ভূমিকম্প বিধ্বস্ত মরোক্কো, তুরস্কের ধ্বংসস্তূপে কিংবা মধ্যপ্রাচ্য, ইউক্রেনীয় যুদ্ধে বিধ্বস্ত নগর শহরে চাপাপড়া নর-নারী-শিশুদের শেষ আর্তনাদ দূরাগত বলে কানে আসে না ঠিকই, কিন্তু আমার দেশের শহরগুলি থেকে দু-পা দূরের গ্রাম, গঞ্জ, বস্তি --যেগুলি দেশনায়কদের ঈশ্বর্য, দম্ভ, অপ্রতিহত শক্তির উৎস সেইসব অকুস্থলে যখন জীর্ণ ঘরগুলো ধসে ধসে পড়ছে, জীবন্ত চাপা পড়েছে ঘুমন্ত শিশু, বৃদ্ধ বাবা মা ঠাকুমা দিদিমা তখনও দেখি তারা হয় অন্ধ, নয় বধির ; অথবা অপ্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠার মত্ত বাসনায় সমগোত্রীয়দের সাথেই নির্লজ্জ বিতন্ডায় অবতীর্ণ। তখন তাদের নখ দন্তের উলঙ্গ আস্ফালন কলহে-লিপ্ত, শবভুক  শ্মশানচারী চতুস্পদেরও লজ্জা দেয়।
দুঃখে দারিদ্র্যে, রোগে শোকে, প্রকৃতির বিপর্যয়ে যে অসহায় প্রাণ অকালেই ঝরে যায়, ধ্সে চাপা পড়ে, প্লাবনে ভেসে যায় -- 

"জানে না সে কোথা যাবে,
কার দ্বারে দাঁড়াইবে বিচারের আশে,
দরিদ্রের ভগবানে বারেক ডাকিয়া দীর্ঘশ্বাসে
মরে সে নীরবে...." 

এই মানবসমাজ চিত্র দিনে দিনে আরো দুর্বিসহ হয়ে উঠেছে সকলের চোখের সামনেই। অপর দিকে ধরিত্রীর প্রাকৃতিক সম্পদের লুণ্ঠন চলছে অব্যাহত গতি। শুধু আমাদের দেশে নয়, পৃথিবী জুড়ে। ভারতসহ দক্ষিণপূর্ব এশিয়া, মধ্য এশিয়া, আফ্রিকা, ল্যাটিন আমেরিকার ভূগর্ভ, পর্বত-অরণ্য, নদী-হ্রদ এমনকি মানুষের শরীরের, নারীদের গর্ভস্থ ভ্রূণেরও রেহাই নেই --- লুণ্ঠন লুণ্ঠন। বাধা পড়লেই সশস্ত্র তান্ডব। পরিণাম -- যুদ্ধ, মৃত্যু, মহামারী। তা হোক্। ভোগের সর্বগ্রাসী লালসার মুখে সভ্যতা যেন তান্ত্রিকের হাঁড়িকাঠে পোরা ছাগশিশু। আরো চাই, আরো আরো ! মিলিয়নিয়ার, বিলিয়নিয়ার, ট্রিলিয়নিয়ার, জিলিয়নিয়ার.... হওয়ার জন্য যা কিছু করবার করে চলেছে ভোগসর্বস্ব ধনবাদ। এ যেন ছিন্নমস্তার রক্তপিপাসা ! 

আজ থেকে প্রায় পঁচাশি বছর আগে, আসন্ন শেষ বিদায়ের আগে, মানবধর্মের দেবদূত রবীন্দ্রনাথ ভগ্ন-  বিশ্বাসে আর্তনাদ করে উঠেছিলেন,
                    " ...... শুনি তাই আজি
মানুষ জন্তুর হুহুঙ্কার দিকে দিকে উঠে বাজি।"
"লুব্ধ যারা, ক্ষুব্ধ যারা, মাংসগন্ধে মুগ্ধ যারা" --সেই "একান্ত আত্মার দৃষ্টি হারা" নরপশুদের যে ভাষায় তিনি ধিক্কার দিয়ে গিয়েছেন তা তাঁর আজন্ম লালিত জীবনধর্ম ও সাধিত সংস্কারের সম্পূর্ণ পরিপন্থী -- সন্দেহ নেই ; কিন্তু আমরা ভেবে শিহরিত হয়ে উঠি, ত্রিকালজ্ঞ ঋষিকবির এহেন উচ্চারণ উদ্ঘোষিত হয়েছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের নরমেধ যজ্ঞারম্ভের প্রাক্  মুহূর্তে।

সেই পৈশাচিক নরমেধ যজ্ঞে আজও পূর্ণাহুতি  পড়েনি। খনিগহ্বরে-জ্বলা নরকাগ্নির মত ভোগবাদের অন্তরে লোভের সেই আগুন অনির্বাণ। কখনো অদৃশ্য, কখনো উপরিতলে ধূমায়িত, কখনো বা খনিমুখ থেকে বেরিয়ে আসে তার লেলিহান শিখা। ইউরোপখণ্ডের আভ্যন্তরিণ ফাটলে দাও দাও জ্বলে উঠেছে সেই শিখা --- সমাপ্তির পূর্ণাহুতি হয়তো বা হতে পারে পরমাণু ঘৃতপিণ্ডে।
ভাবনার পথে অনেক দূর চলে গিয়েছি ঠিকই কিন্তু তা অপ্রাসঙ্গিক নয়। একটি দেশের বা একটি রাজ্যের প্রত‌্যন্ত কোন গ্রামের কিছু জীর্ণ ঘরে দরিদ্র, সহায়-সম্বলহীন মানুষ মাথা গুঁজে থাকেন। সে গ্রামের যে মাথা, ওই হতদরিদ্র মানুষদের সমর্থনে যে শাসক --  গ্রামপ্রধান, তার নিজস্ব ভোগস্পৃহা, তার স্বার্থপরতা, তার প্রবঞ্চনায় যদি জীর্ণ ঘরের দেওয়াল চাপা পড়ে শিশুদের মরতে হয় তবে তার অপরাধ, আর যুদ্ধবাজ, নির্মম রাষ্ট্রপ্রধানদের অপরাধ একই। লালসার জিভ লম্বায় ছোট বড় হতে পারে কিন্তু শোষণে সমান পারদর্শী। অগ্নিশিখার দহনক্ষম আগ্রাসন ততখানি প্রসারিত যতখানি তার আয়ত্বাধীন, ভাগাড়ে গৃধ্রের চঞ্চু ততখানিই যায় মৃত পশুর যতখানি অংশ সে ছিঁড়তে পারে। যেমন ছেঁড়া চটের আস্তানা থেকেও চুরি হয়ে যায় ভিক্ষুক, হারিয়ে যায় বেমালুম (কেননা তার দেহেও রত্ন আছে --- দশ বিশ লক্ষ টাকা মূল্যের), ঠিক তেমনি রাজকোষ থেকে উধাও হয়ে যায় রাষ্ট্রের মূলধন যে 'মূলধন' কোষাগারে পৌঁছায় দেশের বৃহত্তম জনসম্পদ কৃষিজীবী, শ্রমজীবী মানুষের অশ্রু ঘাম রক্তের নিরন্তর চলমান স্রোতধারায়। এসব কথায় রাজনীতির রঙ লেগে আছে -- এমন একটি ধারণা গড়ে তোলা যেতে পারে কিন্তু তা সত্য নয়। মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসা যদি রাজনীতি, রাষ্ট্রনীতি এবং সমাজবন্ধনের সমস্ত আদর্শের ভিত্তি না হয় তবে কোন সংবিধান, কোন 'মেনিফেস্টো', কোন 'ডিক্লেয়ারেশন' সর্বজনীন কল্যাণ প্রতিষ্ঠার 'বিশ্বাস' সৃষ্টি করতে সমর্থ হবে না --- অব্যর্থভাবে ব্যর্থ হবে। সভ্যতার ঘনঘোর সঙ্কটের মাঝখানে দাঁড়িয়েও যিনি মৃত্যুহীন আশায় বুক বেঁধে বলেছিলেন, "মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ'', তিনিও বিদায়বেলায় প্রশ্ন রেখে গিয়েছেন এই 'বিশ্বাস' য়ের উপর। আজ 'বিশ্বাস' শব্দটি তার অর্থ হারিয়েছে। সে প্রবঞ্চনার নামান্তর। তাই মানুষের সঙ্গে মানুষের প্রেমের সম্পর্ক যতক্ষণ না সাধিত হবে, যতক্ষণ না সহমর্মিতা বোধ জাগ্রত হবে, যতদিন হিংস্রতা, ক্রূরতা, স্বার্থপরতা  সমাজে বিরাজ করবে এবং সর্বোপরি ভোগসর্বস্ব জীবনের প্রতি লালসার প্রশমন যতদিন না হবে ততদিন বিপুল নৈরাশ্যের ভার বহন করে যেতেই হবে। 

ঈশ্বর, ভগবান বা কোন দৈব বিধান ( Providential Dispensation), কোন গনতান্ত্রিক, সমাজতান্ত্রিক, জনগণতান্ত্রিক, সশস্ত্র বা নিরস্ত্র আন্দোলন সর্বস্তরের মানুষের কল্যাণ সাধনে সফল হবে না যতদিন না মানুষের চেতনা, সমাজের বিবেক জাগ্রত হবে। 

(লেখাটি পরিমার্জিত ও পুনঃপ্রকাশিত।) 

দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় 

২৬/০৯/২০২৪ 

কলকাতা।
 








শনিবার, ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৩

রাখাল


রাখাল

দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়

"হায় রে হৃদয়
তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়
নাই নাই নাই যে সময়।"

চেয়েছি, মনে প্রাণে চেয়েছি। সেই স্মৃতির সঞ্চয় জীবন পথে ফেলে দিতে চেয়েছি, ভুলে যেতে চেয়েছি। পারি নি।

রবি ঠাকুরের কবিতা দিয়ে শুরু করলাম এই কারণেই যে সেদিনও ছিল ২৫শে বৈশাখ। চল্লিশ বছর আগের বিশ্বকবির আরেক জন্মদিন।
পশ্চিমবঙ্গের পশ্চিম প্রান্তে, অজয় নদের ওপারে, ঝাড়খণ্ড সীমানায় একটি বর্ধিষ্ণু গ্রামের মাঝামাঝি,  কালী পুকুরের পশ্চিম পাড়ে, এক মাটির  দোতলা কোঠাবাড়ির উপর তলায়, ট্রাণজিস্টারে রবীন্দ্র সঙ্গীত শুনতে শুনতে রুদ্র গ্রীষ্মের উত্তপ্ত দিনান্তবেলার সান্ধ্য তন্দ্রাচ্ছন্নতার মৌতাত উপভোগ করছি। শুয়ে আছি তালপাতার চাটাইয়ে। হঠাৎই আমার বাহাত্তুরে মা-জননীর ডাক (আহা! মধুরতম সে ডাক হারিয়ে গিয়েছে জীবন  থেকে),
-- বাবু, দেখ তো কিসের কোলাহল। সনকা ছুটতে ছুটতে  ওপাড়ার দিকে দৌড়াল! কাউকে কিচ্ছুটি বলবি না। শুধু দেখবি সনকা মাসির কি হোল।

বাউরী পাড়ার সনকা। ফসল ক্ষেতে কাকতাড়ুয়ার গায়ে  সাদা শাড়ি লেপ্টে দিলে যেমন দেখাবে সনকা মাসিকে  দেখতে অবিকল তেমনি। শুধু মুখের হাসিটি তার দেহের সৌন্দর্য, তার অনাবিল মনের প্রকাশ। আমাদের ঘরের  সমস্ত রকম দায় তার উপর। মা'য়ের, শুধু রাতটুকু বাদ  দিয়ে, সর্বক্ষণের সঙ্গী। তার একমাত্র পিতৃহারা সন্তান খোঁড়া গাঁয়ের বাগাল। খোড়াঁ-ই তার নাম ; কেননা জন্ম হতেই তার একটি পা ছোট। খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়েই তার জীবন শুরু এবং এখনও চলমান --গরু, মোষ, ছাগল, ভেড়াদের সাথে, সমান তালে।
কোলাহলটি এ পাড়ারই, এই বামুন পাড়ার উপর মুড়ার দিক থেকেই আসছে। সঠিক অনুমান করেই এগিয়ে চললাম। কেষ্ট রায় (কৃষ্ণ চন্দ্র রায়)-দের বাড়ির কাছাকাছি এসে দেখি সিংহ দরজার বাইরে বাউরী বাগদি, ডোমপাড়ার সমস্ত ছেলে-বুড়া-মিয়া-মরদ। ভিড় ঠেলে ভিতরে ঢুকে যা দেখলুম তাতে ভয়ে কাঁপন ধরে গেল। হাত-পা বাঁধা খোঁড়া পড়ে আছে। হাত দুটো বাবুই দড়ি দিয়ে এমন ভাবে বাঁধা যে দড়ির দুদিকের ডগা লম্বা টেনে ওই দড়ি দিয়েই দুই পা মুড়ে বেঁধে দেওয়া। পায়ের ছোট বড় হাঁটু দুটো জোড়া হয়ে উঠে আছে খুঁটার মতন।কশাইখানায় গরু মোষ কাটার আগে যেভাবে পা বেঁধে ফেলে রাখা হয়, তেমন। মোষের সঙ্গে তুলনাই ঠিক, খোঁড়া মোষের মতই কালো। চিত করে রাখা হয়েছে দুপাশে দুটো ইঁট রেখে। হাঁ মুখ, শুকনো লালার সুতা ঠোঁটের দুই কোণায়।
কেষ্ট রায়ের ব্যাটা অকা (ঠিক নাম অক্রূর), বছর তিরিশের জোয়ান, পাতলুন-পরা, খালি গা, লোমশ বুকে ছাগল বাঁধা রশির মতন মোটা সোনার চেন। বাবরি কাটা চুল ঝাপুড় হয়ে নেমেছে চোখ মুখ ঢেকে। তারই ফাঁক দিয়ে বড় বড় চোখ, লাল যেন কাঠ-কয়লার আঙার, পুড়িয়ে দিতে চাইছে খোঁড়াকে। পাগলা কাড়ার মতন হুঁকরে উঠছে থেকে থেকে,
--- বল্ শালা, কোন্ ব্যাপারিকে বিকেছিস্ , বল্। 

সনকা লম্বালম্বি উবুড় পড়ে আছে তার পায়ের কাছে। ঠিক যেমন স্কুল মাস্টার রামধন তেওয়ারীর গিন্নি ছট্ পূজার সময় হত্যা দিয়ে পড়ে থাকে। সারা গাঁয়ের লোক দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছে, কিন্তু কিচ্ছুটি বলার সাহস কারোর নাই। অকার বাবা মুখিয়া, আবার বড় নেতাও। জজ সাহেব থেকে থানার দারোগা, সকলেই তাদের বৈঠকখানায় আসেন, বসেন, গল্প করেন।
হঠাৎই সনকা উঠে বসল, সর্বাঙ্গে ধূলা, শাড়ি খুলে গিয়েছে, কান্নাভাঙা গলা, হাত জোড় করে বলছে,
---হেই বাবা, জল, একটুকুও জল খেতে দাও খোঁড়াকে। অকা নির্বিকার। সনকা শাড়ি বুকের উপর চেপে ছুটতে লাগল। ঘরে ঘরে ঢুকছে, কেউ জল দেয়নি হয়তো। এবার নিজের ঘরের দিকে। কিছুক্ষণ পর আবার ফিরে এলো -- হাতে পিতলের ঘটি, ঘটিভর্তি জল। খোঁড়ার হাঁ মুখে ঢালতে গেল, অমনি অকার লাথি। ঘটি উড়ে গিয়ে একজনের বুকে... তারপর মাটিতে...কাত হয়ে গলগল জল গড়াতে থাকল মাটিতে। স্থির চেয়ে রইল সনকা, চেয়ে রইল, কম হলেও, দুকুড়ি চোখ।
দৃশ্যটি আমার কাছে অসহ্য হয়ে উঠেছে। এতো বড় অন্যায়, একজন পঙ্গু রাখাল, তার উপর এমন নিষ্ঠুর অত্যাচার ! আর আমি কাপুরুষের মতো দাঁড়িয়ে আছি, দেখছি। ওদিকে মায়ের কঠোর আদেশ, 'কোন ঝামেলায় জড়াতে যাবি না।' তা যুক্তিযুক্তও বটে। আমার আদর্শবান, স্কুলশিক্ষক, প্রতিবাদী বাবা অন্যায়, অবিচারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে করতে, মামলা মোকদ্দমায় জড়িয়ে, সর্বস্বান্ত, হতাশায় বিধ্বস্ত হয়ে অকালেই চলে গিয়েছেন বছর তিনেক আগে। মা বেঁচে আছেন শুধু আমার মুখ চেয়ে। আমি বাঁকুড়া খৃষ্টান কলেজের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র। ঘরে এসেছি গরমের ছুটি পড়েছে তাই। মায়ের ধারণা, গ্রামের জটীল, কুটীল সমাজের রীতি নীতি আমি বুঝি না। মায়ের এই ধারণা, যত বয়স বাড়ছে ততই দিবালোকের মতো স্পষ্ট হয়ে উঠছে আমার কাছে।
সব কিছু জেনেও থাকতে পারলাম না। এগিয়ে গেলাম অকাদার কাছে। আমার উদ্দেশ্য আন্দাজ করে, আমার দিকে এমন ভাবে চেয়ে রইল যে, আমার মুখ থেকে কথা বার হওয়া তো দূরের কথা, গলা শুকিয়ে কাঠ। মনে হলো ও যেন , তার গরিলার মতো লোমশ হাত দুটো দিয়ে আমার টুঁটি চেপে ধরেছে। 


হঠাৎই ভিড়ের মধ্যে ছটফটানি, সবার কান খাড়া। দূর থেকে গুম গুম শব্দ। দৌড়, যে যেদিকে পারে । মুহূর্তে ফাঁকা হয়ে গেল সেই অকুস্থান ; অকা আর আমি মুখোমুখি, মাঝখানে দড়িবাঁধা, মরা মোষছা-য়ের মতো পড়ে আছে খোঁড়া। অকার চোখ মুখ সাংঘাতিক ভাবে পাল্টে গেল। চ-কার উপসর্গ দিয়ে 'মারাণি' বলে' উৎকট চিৎকার করে উঠল। বুঝতে পারিনি সম্বোধনটি আমাকে করা। পরের কথাটিতে বুঝলাম,
-- এর দড়িটা খোল শালা,....বলে নিজেও হাত লাগালো। দড়ি খোলা হতেই খোঁড়ার মাথার চুল ধরে তুলে, আমাকে ইঙ্গিতে দেখালো পা ধরে তুলতে। চ্যাংদোলা করে 'সিংহ দুয়ারের' ভিতরে, বাঁদিকের একটি ঘুপচি ঘরে ঢুকিয়ে মেঝেতে ফেলেই দেওয়া হোল প্রায়।
-- পাহারা দে শালা...।
অস্থির হয়ে উঠেছে, ভয় পেয়ে যেমন হয়, তেমনি। বেরিয়ে গেল।
আমি হতভম্ব, স্তব্ধবাক। পেছনে ফিরে দেখি কোণায় মাটির কলসি, ঢাকনার উপর একটি টিনের গেলাসও রাখা। 'যা হবে দেখা যাবে' -- গেলাসে জল নিয়ে ঢেলে দিতে থাকলাম খোঁড়ার মুখে। মনে হোল যেন তপ্ত বালিতে জল পড়ছে। দু-গেলাস জল শুষে নিল খোঁড়া।  জামা খুলে ঝটিতি মুখটা দিলাম মুছে। ভাবছি, পালিয়ে যাব ! না, না, দেখি, খোঁড়াকে কি করে। ভাবতে ভাবতে অকা ঘরে ঢুকল, সঙ্গে চারজন মুনিষ, একটি খাটিয়া। তারা ধানের আঁটির মতো খোঁড়াকে তুলে দিল খাটে।
-- পেছন দরজা দিয়ে নিয়ে যা। ওদের উঠানে ফেলে, খাট নিয়ে তুরন্ত ফিরে আসবি। কাল হারামিকে কবুল করাবই। শালা দারোগা আবার এসেছে বাপের কাছে।
খোঁড়াকে তুলে নিয়ে যেতেই অকা এসে দাঁড়ালো ঠিক আমার মুখের সামনে।
-- এই যে বাপের সুপুত্তুর, এই ঘটনা নিয়ে কোথাও যদি মুখ খুলেছিস তবে তুইও তোর বাপের মতন উপরে  ...বুঝলি? বেরিয়ে যা ।
ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বড় দরজার বাইরে বার করে দিল আমাকে।
                           দুই

মনে প্রাণে বিধ্বস্ত , বাড়ির দিকে ফিরছি পুকুরের পাড় ধরে। সূর্য ডুবেছে বেশ কিছুক্ষণ। মু-আঁধারি সন্ধ্যা। তবুও পশ্চিম আকাশে দিগন্ত রেখা বরাবর একটি জমাট মেঘের স্তর । অস্তগত সূর্যের লাল আলো পড়েছে তার উপর। মহিষাসুরের দ্বিখন্ডিত দেহের রক্তস্রোত, গলগল গলে গলে পড়ছে এসে এই পুকুরের জলে। যেন দান্তে সাহেবের ইনফারনো !
একী ? এসব কী ভাবছি ! পুকুর পাড়ের ঢাল বেয়ে নীচে নামতেই দেখি বট গাছটার তলায়, অন্ধকারে অনেক মানুষের জটলা। আমাকে দেখেই সেখান থেকে ছুটে এলো সনকা মাসি। উন্মাদ হয়ে গিয়েছে।
-- ও বাবু, বাবুরে, ওরা কি খোঁড়াকে দারোগার হাতে  দিয়ে দিয়েছে ? মেরে দিয়েছে? বল্ বাবা, বল্।
না, মুখ বুজে সহ্য করা ঘোরতর অন্যায় হবে। মাসিকে খুলে বলে দিলাম সমস্ত কিছু। শুনে মাসি ছুটতে লাগল ঘরের দিকে। মাসির পেছনেই এসে দাঁড়িয়েছিল বলাই, মাসির ভাইপো। সব শুনে বলল সে ,
--- কাল আবার অশান্তি হবে গাঁয়ে।
আমি তার কাছে জানতে চাইলাম, কারণটা কি? সে যা জানালো তা তো আমার কাছে অভূতপূর্ব। এমত বিষয় এতখানি জীবনে এই প্রথম শুনছি।

কেষ্ট রায়ের ব্যাটা অকা বছর চারেক আগে একটি সদ্য বিয়োনো ভাগলপুরী গাই কিনেছিল। বাছুরটি ছিল বকনা। একমাস না যেতেই গাইটি গেল মরে। বাছুরটিকে দেখভাল করার দায়িত্ব পড়েছিল খোঁড়ার উপরেই। খোঁড়ার মায়া পড়ে গেছিল বাছুরটির উপর, বাছুরটিও খোঁড়ার গায়ে গায়ে সেঁটে থাকতো। গোয়াল ঘর থেকে ছাড়া পেয়েই সে দৌড়ে চলে যেতো খোঁড়াদের উঠানে। এখন বড় বকনা। শম্ভু লেগেছে উয়ার পিছনে। বাস্, ছটফটানি শুরু। এদিক ওদিক ছুটে বেড়ায়। ভিতর বনে, নদীর ধারে, দূরে দূরে। এমনিই তো হয়, গাবিন না হওয়া তক্। কিন্তু কেউ বলে দিয়েছে অকাকে যে খোঁড়া বকনটি বেচে দিয়েছে ব্যাপারীদের কাছে। এমনও হয়, যারা গরু কাড়ার কারবার করে, তারা বাগালদের হাতে কিছু পয়সা দিয়ে গরু কাড়া নিয়ে পালায়। কিন্তু খোঁড়াদাদা সেটি করে নাই, সে সকল গরু, কাড়া, ছাগল ভেড়াদের ভালবাসে, বকনটিকে তো নিজের বিটি মনে করে। তার নামও রেখেছে---  'বকুল'। আমার বাবা তাকে নিয়ে যেতে চেয়েছিল নদীপারের ইটভাটাতে। খোঁড়াদাদা যায় নাই। বলেছিল,
'বকুলকে কে যতন করবে ? আহা, মা-মরা ছা।'
--- আচ্ছা, শম্ভুটা কে ?
-- তুমি জান না ? শম্ভু আমাদের গাঁয়ের ষাঁড়। এক এক পালে একটি একটি করেই ষাঁড় থাকে। দুটা হলেই তো লড়াই -- রক্তারক্তি ! আমাদের শম্ভু এমনিতে শান্ত কিন্তু সে যদি কোন বকন ধরে, তবে তার খোরাক কেউ ছিনতে পারে না। দেখেছ তার সিং --- বাপ্ রে !  সেইটি তো খোঁড়া কাল থেকে বলে আসছিল। তা ছাড়াও, জংলা, খোঁড়ার কুকুর, খোঁড়ার পাল পাহারা দেয়। তার চোখকে ফাঁকি দিয়ে কেউ ভটকাতে পারবে একটি গরু-মোষ ? সে ওই মিশকালো গতর নিয়ে যখন ভুখে, তখন ভয়ে বাঘ পালায়। অকা কিছুতেই মানতে চায় না। কেবলই বলছে, 'খোঁড়া বেচে দিয়েছে, শালাকে মেরেই ফেলবো।' 

আমি বললাম, 'তোমরা গাঁয়ের লোক সকলে মিলে একথা তাদের বলছো না কেন?' বলাইয়ের কথা, 'কেউ বলতে পারবে না দাদা। যে বলতে যাবে হয় তার ঘর পুড়বে, নয় তাকে ঘর ছাড়তে হবে।'
বলাই এদিকে ওদিকে নজর ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে চলে গেল। বটগাছের তলাটাও ততক্ষণে ফাঁকা হয়ে গিয়েছে। আমিও ঘরের দিকে। ঘরে ঢুকতে গিয়ে দেখি মা হ্যারিকেন নিয়ে বেরোবার জন্য তৈরি।
-- কি বাবা, এতো দেরি ? চিন্তায় আকুল হয়ে পড়েছি। শুনলাম খোঁড়াকে রায়েরা ধরে রেখেছে। কেন, কি করেছে সে ?
--- মা, ঘরের ভিতরে এসো, বলছি সব।
বললাম ; শুনতে শুনতে মায়ের চোখদুটো রক্তাভ হয়ে উঠল। মা অক্রোধী, সুখে দুঃখে অবিচল ; কিন্তু আজ মনে হোল সংযমের বাঁধ ভেঙে গিয়েছে তাঁর। নির্বাক, কি যেন ভাবলেন স্বল্পক্ষণ। ঘরের ভিতরে গেলেন, বেরিয়ে এলেন থলিভর্তি কি যেন নিয়ে। আমার হাতে দিয়ে বললেন,
--- চল।
থলি হাতে নিয়ে বুঝতে পারি টিফিন ক্যারিয়ার। বেশ ভারি। এ সেই টিফিন ক্যারিয়ার যাতে বাবা খাবার নিয়ে যেতেন। মা হ্যারিকেন নিয়ে আগে আগে। দৃপ্ত সাহসী ভঙ্গিমা। সোজা সনকার ঘর। ঘর নয় -- উন্মুক্ত উঠানের পর খড়ের ছাউনি দেওয়া, দেওয়ালভাঙা কুটীর। দুয়ারে কপাট নাই, ভাঙা টিনের পাত দিয়ে আড়াল করার চেষ্টা ছিল হয়তোবা, সেটিও পড়ে আছে কাত হয়ে।
--- সনকা .... সনকা....!
কোন সাড়া নাই ! মা হ্যারিকেনটি সামান্য উস্কে ভিতরে ঢুকলেন। পিছনে আমিও।
---'আবার কেনে!'--- মারণ ভয়ে আর্ত চিৎকার!
--- আমি, আমি বাবুর মা...
মা আলো নিয়ে সামনে এগিয়ে যেতেই যে দৃশ্যটি আলো  -অন্ধকারের অদ্ভুত অস্পষ্টতায় প্রত্যক্ষ করেছিলাম , মনে হয়েছিল যেন সেই অমর ভাস্কর্য-- মাইকেল এঞ্জেলোর পিয়েটা। ক্রুশে বিদ্ধ ক্ষতবিক্ষত যীশুর মৃতদেহ-কোলে মা মেরী ---  পাথরের পাটাতনে বসে আছেন। সোমত্ত সন্তানের দীর্ঘ, অর্ধনগ্ন নিষ্প্রাণ শরীর কোলের ওপর, অবিন্যস্ত কেশরাশী সম্বলিত মাথা, আর উলঙ্গ পা দুটি দুই প্রান্তে ঝোলা, নিথর। মা মেরীর মুখ অবনত। কান্নার নৈঃশব্দ্য নাকি নৈঃশব্দ্যের কান্না-- মহাশিল্পী তা দেখাতে চান নি।
এখানেও সেই চিরন্তন প্রাণের প্রস্তরিভূত ভাস্কর্য। খোঁড়া , ওই মরা যীশুর মতোই দীর্ঘ, নির্মেদ অস্থির কাঠামো, শুধু একটি পা খাটো এইযা, চিৎ মেরে আছে পড়ে, মায়ের কোলে নয়, ছেঁড়া তালপাতার চাটাইয়ে। আর মরে নাই হয়তো, ঘুমিয়ে আছে নিঃসাড়।  সনকা একবার শুধু চোখ তুলে আর্ত স্বরে জানতে চেয়েছিল কে ঢুকেছে ঘরে ; তারপর স্থির দৃষ্টি আবার ছেলের উপরে, ঠিক যেমন মা মেরী। (ধুৎ, কী যে ভাবছি ! এই আমার সমস্যা। ঘটনা, দুর্ঘটনা -- যাই দেখি মন চলে যায় উপমা খুঁজতে।)
আমার মা থলিটি নিলেন, খুললেন, তুললেন টিফিন ক্যারিয়ার, রাখলেন সনকার সামনে। সনকা নির্বিকার। উঠে গিয়ে খোঁড়ার মাথার কাছটিতে গিয়ে বসলেন, মাথায় হাত রেখে বিড়বিড় করে কি যেন বলছেন-- শোনা যায় না। তবে উঠে দাঁড়িয়ে যা বললেন শুনতে পেলাম,
--- খোঁড়া উঠলে মা-ব্যাটায় খেয়ে নিবি। বাতিটাও রইলো। ভয় পাবি না।

আমরা যখন ঘরে ফিরে এলাম তখন রাত গাঢ় হয়েছে। গ্রামের বামুন পাড়ায় 'রাখালরাজ বংশীবদনের' মন্দিরে সন্ধ্যারতির কাঁসর ঘন্টা সবে স্তব্ধ হয়েছে। পেছনের বাঁশ বাগানে শিয়ালদের প্রথম প্রহরের ঘোষণা শেষ।
মা বললেন, 


--- আজ আর কিছু রান্না করবো না বাবু। আয়, গুড় মুড়ি খেয়ে ঘুমিয়ে পড়। কাল সকালবেলা আমরা দুজনেই যাব। খোঁড়াকে বাঁচাতেই হবে। আজ তোর বাবা বেঁচে থাকলে কি ঘরে বসে থাকতেন ?
শরীরের মনের ক্লান্তি ছিল। শুয়ে পড়লাম। ঘুম আসছে না। আচ্ছন্নতায় বার বার খোঁড়ার ওই দড়িবাঁধা, ঘামে ভেজা, ধূলি-কাদায়-লেপা আধনাঙা শরীর ; ওই তৃষ্ণাকাতর হাঁ-মুখ, ওই অসহায় চাহনি চোখের সামনে ভেসে ভেসে উঠছিল। ভোরের দিকে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম অঘোরে। চমকে জেগে উঠলাম মায়ের ডাকে। মায়ের সমস্ত কাজ সারা, যাবার জন্য প্রস্তুত। আমিও ঝটিতি তৈরি হয়ে নিলাম।
কিন্তু যেতে হোল না আমাদের। বাড়ির দরজা খুলতেই দেখি দাঁড়িয়ে আছে বলাই। এক হাতে হ্যারিক্যানটি আর অন্য হাতে টিফিন ক্যারিয়ারসহ থলিটি।
মা--- কি রে বলা, তুই ? তুর জেঠিমা, খোঁড়া ?
বলাই---তখন অনেক রাত, জেঠিমা আমদের ঘরে এই জিনিসগুলা দিয়ে বলে গেল তোমাকে দিতে। তারা চলে গেল। অন্য লোক যেন না জানতে পারে --- তাই কিচ্ছুটি বলে নাই।
আর কি হয়েছে জানো কাকিমা ? বকুল ফিরে এসেছে, সঙ্গে শম্ভুও। জেঠিমার উঠানে শম্ভু বসে বসে জাবর কাটছে আর বকুল দুয়ারে দাঁড়ায়ে। মাঝে মাঝে হাম্বা, হাম্বা --  খোঁড়া দাদাকে ডাকছে। গাঁ ভেঙে লোক--- দেখে তো অবাক। 
বলাই চলে গেল। মা নিশ্চুপ। একটি দীর্ঘ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বসলেন। আমি, একমাত্র আমিই জানি এই নীরবতা, এই দীর্ঘশ্বাস কতখানি গভীর অন্তর্বেদনার অভিব্যক্তি। সনকা মাসি, তার ছেলে -- তারা কাজের লোক ও বাগাল ছিল না, তারাই একমাত্র আপনাজন ছিল মায়ের কাছে, বহুদিনের সুখ-দুখের সাথী।
গাঢ় বিষাদঘন নৈঃশব্দ্যের নিশ্চলতা। কী করি ? রেডিওটাই খুলি। 

'আপনারা শুনছেন রবীন্দ্রসঙ্গীত ;  শিল্পী সন্তোষ সেনগুপ্তঃ
"দূরদেশী সেই রাখাল ছেলে।
আমার বাটের বটের ছায়ায় সারাবেলা গেল খেলে ...।'' 

অকস্মাৎ 'হো হো, হায় হায়' বুক কাঁপানো বহুকণ্ঠের আওয়াজ ! সনকা আসবে না। মা উঠোন ঝাঁট দিতে চাইছিলেন, আমিও চাইছি --এই নিয়ে মা-ব্যাটায় দ্বন্দ্ব চলছিল। থেমে গেল। দুজনেই ভয়-চকিত। অনড় দাঁড়িয়ে উঠানে। বেরোতে চাইছিলাম, মা ধরে রইলেন। আবারও উন্মত্ত চিৎকার, 'সব্বনাশ, সব্বনাশ', 'মরে গেল রে, মেরে দিয়েছে রে' -- বিকট, উৎকট সব মারণ রব ভেসে আসছে !  আমি বাইরে যাবার জন্য যতই ছটফট করছি মা ততই আমাকে দুই হাত দিয়ে টেনে নিয়ে আসতে চাইছে ঘরে।
একি ! দুটো ছোট ছোট, বছর সাত আট হবে, উলঙ্গ শিশুকে নিয়ে বলাইয়ের মা উন্মাদিনীর মতো ঢুকে পড়ল।
-- ও দিদি, দিদি গো, ঘরের ভিতরে চল গো। ও বাবু, বাবুরে, বাইরে যেয়ো না, দরজা বন্ধ করে দাও। আজ যে কি হবে, আরো মানুষ মরবে, গাঁ জ্বলবে !
-- হয়েছে কি, সেকথা তো বলবে !
মায়ের ধমক খেয়ে মাটিতেই বসে গেল বিমলা মাসি, বলাইয়ের মা। হাতের ইঙ্গিতে দেখালো 'জল দাও' ।  ঘটিভর্তি জল গলায় ঢেলে মাসি যা বলে গেল তা বিশ্বাস অবিশ্বাসের সীমাছাড়া, 

 
-- বলো না দিদি কাওকে। মাঝ রাতে তো চলে গেল সনকা আর খোঁড়া। সেটিও ভয়ের, চিন্তার। এবারে যা হোল, শুন,
তখনো ভুরকা তারা (ভোরের তারা) ডুবে নাই। 'হাম্বা হাম্বা' ডাক। আমরা উঠে দেখি, ওই বেপাত্তা বকুল সনকার উঠানে দাঁড়ানো, হামালছে একনাগাড়ে, আর তার পেছনেই শম্ভু। সে পা দিয়ে মাটি খুঁড়ছে -- পাগলা ষাঁড় যেমন করে। পাড়ার বেবাক লোক এসে হাজির। এসে দেখে ঘর খাঁ খাঁ। ঘরের দুয়ারে আগুড় ঠেসানো। সনকা, খোঁড়া নাই।
চৌকিদার এলো। রায়দের খবর দিতে গেল। অকা তার দলবল নিয়ে, হাতে লম্বা ছড়ি ঘুরাতে ঘুরাতে এসে দাঁড়াল। খুব জোরে জোরে বকতে থাকল। 'শালা ঠিক বেচেছিল, ভয়ে ফিরিয়ে এনেছে। কোথা পালাবে শালা। হয় মরাব, নয় জেলের ভাত খাওয়াব। আসছে আজ  দারোগা।'
এই সব বলতে বলতে ছড়িতে সাঁই সাঁই শব্দ করে বকনটিকে মারতে যায়। সবাই একসাথে চেঁচাতে লাগলো, 'যাবে নাই, যাবে নাই। ষাঁড় ক্ষেপে আছে। বকনা এখানেই থাক্, এখন ঘরে তাকে নিয়ে যেয়ো না। খোড়াকে নিয়ে আসো, ও ঠিক সামলাবে।'

শুনল না অকা। যেই বকনাটাকে এক ছড়ি মেরেছে অমনি শম্ভু খরিষ সাপের মতন ফুঁসতে ফুঁসতে তেড়ে  গেল ! ....ও মা গো, চোখে দেখা যায় না গো ! ওই শাবলের মতন সিং.. ফুঁড়ে দিল গো, ফেড়ে দিয়েছে গো ! বুক পেট ফাঁক করে দিল যে গো ! রক্তে রক্তে উঠান ভিজে গেল গো ! ওই দেখ, লোকেরা সবাই ছুটছে। কে কোথা যাবে জানে না। ছোট ছোট ছেলে পুলে ভয়ে কাঁপছে, হাঁও মাঁও কাঁদছে ! যদি খোঁড়া থাকত এমন বিপদ হোত নাই গো !
কি হবে দিদি? আমাদের ঘর পুড়বে, আমাদের মানুষ মরবে, আমাদেরকেও গাঁ ছাড়া হতে হবে গো দিদি !
আমার মাও মাথায় দুই হাত রেখে বসে পড়লেন বিমলা মাসির সামনে, বার বার শুধু একই কথা বলে গেলেন,
--- অক্রূর, একি করলে তুমি বাবা ! কেন খোঁড়াকে শাস্তি দিলে ? সে যে দেবতার চাইতেও ভালো মানুষ ! সে থাকলে শম্ভুকে ঠিক বশে রাখতো। 

আমি এই ঘটনার একটি উপমা খুঁজতে চেষ্টা করলাম ; কিন্তু বৃথাই !

দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
০৬-০৬-২০২২
শিলিগুড়ি।     
_____________________________________________















































শনিবার, ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৩

চরণ রেখা তব

চরণ রেখা তব 


(ঝরা ফুলের স্মৃতি)  


বহুশ্রুত এই রবীন্দ্রসঙ্গীতটি নিয়ে দু-চার কথা  বলবার  ইচ্ছা চেপে রাখতে পারলাম না। একে তো  সমস্ত রবীন্দ্রসঙ্গীতই বিশ্বসাহিত্যের শ্রেষ্ঠতম  গীতিকবিতা, তার উপর এমনিধারার কয়েকটি গান  সাহিত্য ও সঙ্গীত জগতের অপার্থিব সৃষ্টি।  আকাশের  নক্ষত্রের মতো চিরজ্যোতির্ময়। এই  গানটি প্রকৃতি পর্যায়ের। রচিত হয়েছিল ৩রা মার্চ,  ১৯২৭। ফুলের আগুন-লাগা ফাগুনে, সম্ভবত ১৯শে  ফাল্গুন। কবির  বয়স তখন তিন কুড়ি ছয়।  আমাদের  চোখে কবির বয়স বাড়েও নি, আবার  কমেও নি কোন কালেই। কেনই বা বাড়বে ? তিনি যে অখিলরসামৃতসিন্ধু। ওই শুভ্র শ্মশ্রুগুম্ফশোভিত মুখশ্রীমায়া, ওই আকর্ণপুরিত  চিরপ্রসন্ন চোখের আকাশগহন দৃষ্টি, ওই আ-চরণ  প্রলম্বিত জোব্বা আমাদের অন্তরাকাশে, রবিকরোজ্বোল শরতের মেঘাস্তরণের মতো এমনই দীপ্তিমান হয়ে আছে যে তাঁর কৈশোর কালের তাঁর যৌবন কালের গন্ধর্বনিন্দিত রূপ স্মরণেই আসে না। 
যাই হোক্, এই ছেষট্টি বসন্তের 'বসন্তসখা' গাইলেন  ওই গান। সম্পূর্ণ গানটি এই রকম --- 

"চরণ রেখা তব যে পথে দিলে লিখি  
চিহ্ন আজি তারি আপনি ঘুচালে কি।। 
অশোক রেণুগুলি  রাঙালো যার ধূলি  
তারে যে তৃণতলে আজিকে লীন দেখি।। 
ফুরায় ফুল -ফোটা,পাখীও গান ভোলে, 
দক্ষিণ বায়ু সেও উদাসী যায় চলে।। 
তবু কি ভরি তারে অমৃত ছিল না রে --- 
স্মরণ তারো কি গো মরণে যাবে ঠেকি।।" 

গানটির আঙ্গিক রবীন্দ্রনাথের সঙ্গীত রচনা  বৈশিষ্ট্যের পূর্ণ রূপ পেয়েছে। চারটি 'তুক' চারটি  কলি  (যুগল বাক্য)-তে বিভক্ত। আস্থায়ী, অন্তরা,  সঞ্চারী, আভোগ। "তুই ফেলে এসেছিস কারে"-এই  রকমের গানের মত একাধিক অন্তরা এ গানে নেই।  আটখানি পংক্তি, প্রতি পংক্তিতে দৌদ্দটি অক্ষর  (যুক্ত বা একক বর্ণের)। স্বরলিপি করেছেন দীনেন্দ্র  নাথ ঠাকুর। গানটি ভৈরবী রাগাশ্রয়ী এবং তাল  দাদরা। এই গান রবীন্দ্রসঙ্গীত সাধনায় মগ্নচিত্ত  শিল্পীদের কণ্ঠে আমরা শুনেছি। অনিতা সেন,  রাজশ্রী দত্ত, কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়, সুচিত্রা মিত্র,  সাগর সেন, অরবিন্দ বিশ্বাস, চিন্ময় চট্টোপাধ্যায়--  এমনই আরও কত। কিন্তু তবুও, যাঁর কণ্ঠে এই  গানটি  বাঙলার আকাশে বাতাসে সুধারসধারা  সিঞ্চন করে চলেছে দশকের পর দশক ধরে তিনি  আমাদের হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। আপনারা শুনেছেন,  আবারো শুনবেন আজীবন। 
এ গান ভৈরবী রাগে আশ্রিত হলেও আস্থায়ীর প্রথম  সু্র আমাদের বিস্মিত করে দেয়, দ্বিধান্বিত করে  রাখে। সুরের মূর্ছনায় এমনি বিহ্বলতা সৃষ্টি করে যে  মনে সুখের 'দুঃখবিলাস' জেগে ওঠে। শুদ্ধ স্বরের  চলনে অকস্মাৎ 'তীব্র মধ্যমের' ছোঁওয়া। তখন 'যে  পথে দিলে লিখি' -- 'দিলে' --- কাল নির্বাচনে যদি  অতীত কাল হয়, এমনকি পুরাঘটিত বর্তমানও হয়  তবে তো শ্রোতার কাছে সাংঘাতিক ! আর তা সত্যও।   
পরের অন্তরা এবং সঞ্চারীতে একই রকম কী-যেন-  হারানোর বেদনা ! পথে তোমার চরণচিহ্ন কোথায় ?  পথের যে ধূলিকণাগুলি অশোকরেণুর আলপনায়  রঙিন হয়ে উঠেছিল তারা দেখি আজ তৃণাস্তরণে  ঢাকা। ফুল-ফোটার প্রহর হোল কি শেষ ? পাখীরা  ভুলে গেল গান গাওয়া ? দখিনা বাতাস উদাস বাউল  হয়ে গেল হঠাৎই ! 

আমাদের এই মর্ত্যজীবনের সর্বব্যপ্ত অর্থহীনতার, হারিয়ে-ফেলার রবীন্দ্রনাথসুলভ রূপকল্পগুলি, কল্পচিত্রগুলি প্রভাতী বৈতালিকে 'ইমন বা মাড়োয়ার' ঔদাসীন্যভরা বেদনাবোধের বা নিরাসক্তি-র আবেশ সৃষ্টি করে না কি ? বসন্ত তো কবির প্রিয়তম ঋতু, তাঁর জীবনের  চিরদিনের 'রাজা'। তবে কেন এই মাঝ ফাল্গুনে যখন "বাজায়ে ব্যাকুল বেণু, মেখে পিয়াল ফুলের রেণু " সগৌরবে, সুরে সৌন্দর্যে সৌরভে তার আসবার  কথা, মঞ্জরিত শালতরুনিকুঞ্জে নৃত্য করবার কথা,  তখন তার অকাল অন্তর্হিত হবার কারণই বা কি ?  নাকি 'বসন্ত'ই হারিয়ে গেল কবির জীবন থেকে।  তাও তো সত্যি নয়। "শেষের কবিতা"-র দিন তো এখনো অনাগত। আসলে ১৯১৯ সাল থেকে ১৯৩০  সাল, এই সময় কালটি, যা আমরা আরেক  নোবেলজয়ী সাহিত্যিক, সুইজারল্যান্ড প্রবাসী রোমা  রঁলার সঙ্গে কবির চিঠি পত্র আদান-প্রদানের মধ্য  দিয়ে জানতে পারি, তাঁর (রবীন্দ্রনাথের) কাছে ছিল  বিশ্ব সভ্যতার সঙ্কটের কাল, নিষ্ঠুর রাষ্ট্র ক্ষমতার কাছে উদার মানবতাবোধের পরাভবের রক্তরাঙা সান্ধ্য দুঃসময়। 

মহাজীবনের সেই দীর্ঘ ইতিবৃত্ত আজ এখানে থাক্ ;  শুধু বলি ওই কালখণ্ডটির অসহ বেদনাবোধ  আমাদের আলোচিত সঙ্গীতটির সু্রে প্রচ্ছন্ন আছে।  কিন্তু আভোগ-য়ে এসে একটি সকৃতজ্ঞ প্রশ্ন, তবু কি  "ভরি তারে অমৃত ছিল না রে" - পাঠক বা শ্রোতাকে  আবিষ্ট করে দেয়, প্রকৃতির প্রতি প্রেমে মুগ্ধ করে  রাখে। উত্তর প্রৌঢ়কাল পর্যন্ত প্রকৃতির কাছ থেকে  যে  অমৃতরস তিনি আস্বাদন করেছেন সেই স্মৃতিও  কি "মরণে যাবে ঠেকি ?" এমন এটটি সুধাসিক্ত  অথচ  চিত্ত-আকুল-করা বাণী রবীন্দ্রনাথের অমর্ত্য  লেখনীই লিখে দিয়ে যেতে পারেন। অবর্ণনীয় ! শুধু  অনুভবের, শুধু হৃদয়ে সঞ্চয়ণের। 

এবার আসি প্রকৃতি পর্যায়ের এই গীতিকবিতাটির  কাব্যসুষমায়। প্রতিটি শব্দের কী অপার ব‌্যঞ্জনা, কী  মোহিনী মায়া ! চরণ রেখা এঁকে দিয়ে নয়, 'লিখে'  দিয়ে বিদায় নিল যে বসন্ত তার লিখন লীন হয়ে  রইল  'তৃণতলে' ; কিন্তু চির অমলিন হয়ে রয়ে গেল  মহাকালের শাশ্বত কাব্যের পত্রপুটে। 

(এই গানটির উপর সঙ্গীতজ্ঞ ও সঙ্গীত আলোচকদের  আলোচনা এবং সমালোচনা প্রার্থনা করি।) 

দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় 
১৬/০৯/২০২৩ 
ব্যাঙ্গালোর। 















সোমবার, ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৩

শাশ্বত প্রেম

শাশ্বত প্রেম 


আজ আমার পাঠকদের বিশ্বসাহিত্যের শরৎ প্রভাতের তৃণদলশীর্ষে সূর্যকরোজ্বল শিশিরকণার মত একটি কাব্যকণা উপহার দিতে চাই। উচ্চতর বিদ্যালয়ের ছাত্রমাত্রেই ইউরোপীয় নবজাগরণের ইতিহাস পড়েছেন এবং ইতালীয় শিল্পী সাহিত্যিকদের নামও জেনেছেন। তাঁদেরই একজন পেত্রার্কা, যাঁর 'সনেট' অনুসরণে আমাদের মধুকবি (মাইকেল মধুসূদন দত্ত) বাঙলায় চতুর্দশপদী কবিতা সৃষ্টি করে গিয়েছেন।

Francesco Petrarch, the poet is famous for his Sonnets. One of his Sonnets goes ---
(Sonnet xv, translated in English by Charlotte Smith.)

Where the green leaves exclude the summer beam,
And softly bend as balmy breezes blow,
And where, with liquid lapse, the lucid stream,
Across the fratted rock is heard to flow,
Pensive l lay : when she whom Earth conceals,
As if still living, to my eyes appears,
And piling Heaven her Angel from reveals,
To say -- Unhappy Petrarch, dry your tears.

Ah ! Why sad lover ! Thus before your time,
In grief and sadness should you life decay,
And like a blighted flower, your manly prime
In vain and hopeless sorrow fade away ?
Ah ! Yield not thus to culpable despair. 
But rise thine to heaven, and think I wait thee there.

মৎকৃত বাঙলা অনুবাদ --

             শাশ্বত প্রেম

মলয় বাতাসে তরুশাখাগুঋলি আনত রয়েছে যেখানে,
ঘনপল্লবে সূর্যের আলো উঁকি দিয়ে যায় সেখানে।
ক্ষীণধারা এক তটিনী চলেছে পাষাণের বুকে গেয়ে গান --
বিষাদমগ্ন আমার 'আমিটা' শুয়ে আছে সেথা মৃতপ্রাণ।
এ ধরণী যারে লুকায়ে রেখেছে আমার চোখে সে অ-মরা ;
হঠাৎ এখানে শুনি তার গান -- যদিও রয়েছে অধরা।
দেবদূতদের মায়ামেঘ ছিঁড়ে আসে তার বাণী করুণার, 
"নয়নের জল মুছে ফেল কবি, নাই প্রয়োজন কান্নার।"

বন্ধু আমার, বিষন্ন কুসুম, খেদ-ক্ষয় কেন জীবনে ?
আছে পৌরুষ, প্রবল শৌর্য, আমারে রেখেছ স্মরণে।
আলোকোজ্জ্বল অমর্ত্যধাম নিরাশার নিরালোক নাই,  
বিরহবিহীন দুখনিশাহীন চিরমিলনের সুখঠাঁই।
হে প্রিয়তম, মরণের পায়ে অর্ঘ্য দিওনা নিজেরে,
তোমারই তো আমি প্রতীক্ষায় আছি দাঁড়ায়ে স্বর্গ দুয়ারে। 


(এ কথা মনে রেখে পাঠ করতে হবে যে পেত্রার্কা চতুর্দশ শতকের কবি। 

তাঁর কবিতাগুলি রচিত হয়েছে আজ থেকে ন'শ বছর আগে।)

দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
১০/০৯/ ২০২৩
ব্যাঙ্গালোর।





রবিবার, ১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৩

কবিতা দিবস




কবিতা  দিবস 


সভ্যতার বর্জ্য বয়ে অকাল মরণ হতে বাঁচার প্রয়াস।

আজ নাকি কবিতার দিন ? 
তবে তাই হোক্, হৃদয় নিকুঞ্জে সমাসীন 
থাকো তুমি 'কবিতা কল্পনালতা,' একান্ত গোপনে। 
শুধু তুমি আর আমি -- সৃষ্টি হোক্ লয়, 
মসীকৃষ্ণ অন্ধকারে নামুক প্রলয়। 
 যদি পাপ নৃত্য করে প্রদীপ্ত আলোয়, 
পুন্য যদি ঢাকে মুখ নিশার কালোয়, 
যদি প্রেম রক্তসিক্ত নিষ্ঠুর ধর্ষনে, 
যদি সুর ভ্রষ্ট হয় দানব গর্জনে, 
শ্যামলিমা দগ্ধ হয় লালসা শিখায়, 
সভ্যতার ধূমকেতু জ্বলে নিলীমায় -- 
তবে কেন খুঁজে ফিরি আপনার জন, 
আত্মার আত্মীয় প্রাণ বন্ধু স্বজন ? 

আত্মনির্বাসনে থাকি আপন অন্তরে, 
নিভৃত নিলয়ে -- স্বপ্নময় নির্জন কুটীরে, 
তুমি আর আমি -- ছন্দোবদ্ধ গীতে আলাপন। 
সাজাবো সেই আগামীর স্বপ্নের ভূবন 
যেখানে আকাশে আকাশই হবে বাতাসে বাতাস, 
দিগন্ত বিস্তারী দৃষ্টি, বুকভরা শ্বাস। 
লুঠেরার আস্ফালন, লুন্ঠিতের হাহাকার রব, 
বিলাসের অপব্যয়, হিংসার জিঘাংসায় পুঞ্জীভূত শব, 
ছলনার কাষ্ঠহাসি, চৌর্যের ছদ্মবেশে সাধুতার মায়া, 
দহনের জ্বালা ঢাকে মেঘরূপী চিতাধূম ছায়া, 
'সভ্যতার' বর্জ্য বয়ে, অকাল মরণ হতে বাঁচার প্রয়াস, 
'স্বর্গরাজ্য আসে ওই',-- উচ্চনাদী নিয়ত আশ্বাস -- 
ডাকিনীর এই হাতছানি, আলেয়ার দিশাহারী শিখা-- 
রেখোনা রেখোনা প্রিয়া, আমদের নূতন জগতে। 

শুধু সুখ--তাও চাইবনা, নিয়তির দেওয়া দুখ, তাও থাক্ সাথে ; 
বিরহের বিষাদ থাক্, অপূর্ণ প্রত্যাশা থাক্ মিলনের। 
কিন্তু যেন পাই রাশি রাশি হাসি মুখ সুন্দর শিশুর, 
যৌবনের নিঃস্বার্থ গরীমা, বার্ধক্যের কণ্ঠভরা ভৈরবীর সুর। 
কবিতা, প্রেমের আরাধ্যা দেবী, তোমার সঙ্গীতে 
কল্পনার স্বর্গ হবে গড়া ছন্দে লয়ে তানে, নব নব বাণীর ভঙ্গিতে। 

দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
২১/০৩/২০২৩ 









মঙ্গলবার, ৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৩

আনন্দ


আনন্দ 

আনন্দধারা বহিছে ভুবনে  


সূচনা

কলা বিদ্যায় আমরা মুখ্যত নবরসের অভিব্যক্তি লক্ষ্য করে থাকি। শৃঙ্গার, বীর, করুণ, অদ্ভুত, ভয়ানক, বীভৎস রৌদ্র ও হাস্য। বাৎসল্য যোগ করলে দশটি। তাহলে "আনন্দধারা বহিছে ভুবনে" -- রবীন্দ্রনাথের এই মহাভাবের একটি গীতিকবিতার প্রথম বাক্যটি যখন আলোচনার বা একটি রচনার বিষয় নির্ধারিত হয় তখন সেই রচনাকে কোন্ 'রসাশ্রিত' বলে আলোচনায় অগ্রসর হওয়া যায় ? এখানে হাস্যরসের সীমাবদ্ধতায় ওই মহাবাণীর অন্তর-নিঃসৃত ব্যঞ্জনাটি অধরাই থেকে যাবে। এবং সে জন্যই আমাদের এই গীতিকবিতাটির কথা আপাতত ভুলে শুধুমাত্র বাক্যটির  আক্ষরিক ও আলঙ্কারিক অর্থটি রচনার বিষয়বস্তুরূপে চিহ্নিত করাই শ্রেয় ; কেননা এই রবীন্দ্রসঙ্গীতটি গ্রহণ করা হলে আমাদের চেতনা রবীন্দ্রনাথের 'আনন্দবাদেই' এমন সমাচ্ছন্ন হয়ে যাবে যে 'আনন্দ' শব্দটি নিয়ে লেখা রবীন্দ্র রচনাবলীর অসংখ্য উদাহরণ শরৎকালের সূর্যকরোজ্বল খণ্ড খণ্ড জ্যোতির্ময় মেঘের মতই চিত্তাকাশে ভেসে ভেসে উঠবে। অবশ্য তাঁর থেকে নিষ্কৃতি পাওয়া সুকঠিন হবে জেনেও আমরা এই 'আনন্দধারার' উৎসে যাবার চেষ্টা করি।
এক

তৈত্তিরীয় উপনিষদ এই সত্য ঘোষণা করছেন যে
"আনন্দো ব্রহ্মেতি ব্যজনাৎ। আনন্দাদ্ধ্যেব খল্বিমানি ভূতানি জায়ন্তে। আনন্দেন জাতানি জীবন্তিঃ। আনন্দং প্রযন্তাভিসংবিশন্তীতি।।"
আনন্দই ব্রহ্ম, আনন্দ হতেই এই সকল ভূতগণ জন্মলাভ করে, আনন্দ দ্বারাই বর্ধিত হয়, এবং শেষে আনন্দেই প্রতিগমন করে।
শুধু মানুষ নয়, এই বিশ্বচরাচরের সমস্ত প্রাণ, এমনকি অপ্রাণও এক বিরাট, বিপুল, নিরন্তর চলমান আনন্দধারায় সমুদ্ভুত হয়ে, চির বহমানতার তরঙ্গস্রোতে ধাবিত হয়ে, পরিশেষে অসীম আনন্দসাগরে বিলীন হয়ে যায়।
তাই যদি নাই হোত তবে, জীব কি বাঁচার প্রেরণা পেত ?
উপনিষদ আবারও বলছেন,
"যদ্বৈ তৎ সুকৃতম্। রসো বৈ সঃ। রসং লব্ধ্বাহ আনন্দী ভবতি। কো হ্যেবানাৎ কঃ প্রাণাৎ। যদেষ আকাশ আনন্দো নস্যাৎ। এন হ্যেবাহহনন্দয়তি।।"
সুকৃতরূপে তিনি (ব্রহ্ম) আনন্দস্বরূপ। এই আনন্দস্বরূপকে যিনি লাভ করেছেন তিনি আনন্দমগ্ন, তিনি সুখী। আমাদের অন্তরের আত্মাই আনন্দের উৎস। এই আনন্দ না থাকলে কেউ কি বাঁচতে চাইত, একটি নিঃশ্বাসও কেউ গ্রহণ করত ?

এই হোল 'আনন্দধারা বহিছে ভূবনে' বাণীর যথার্থ অভিব্যক্তি। ভারতবর্ষের সুদূর অতীতে, তপোবন আশ্রমে, জ্ঞানতাপস মহর্ষিদের ধ্যানে লব্ধ, জীবনাচরণে উপলব্ধ এবং অনুশীলীত এই বোধ আমাদের জৈবিক ও বাস্তব জীবনে গ্রহণ করা দুরূহ ; অসম্ভব বলেই মনে হয়। কেননা সাধারণভাবে আমার কামনার বস্তুগুলি আহরণ ও সম্ভোগের মধ্যেই আনন্দ খুঁজি। ইন্দ্রিয়গুলির (কর্মেন্দ্রিয়, জ্ঞানেন্দ্রিয় এমনকি অন্তরিন্দ্রিও) মধ্যদিয়ে জৈবিক প্রবৃত্তির নিবৃত্তি লাভের প্রচেষ্টায় ও সফলতায় আমাদের আনন্দ। এই প্রবৃত্তি বা বাসনা বাধাপ্রাপ্ত হলে, অপূর্ণ থাকলে আনন্দ লুপ্ত হয়ে যায়। পরিবর্তে নিরানন্দ ঘিরে ধরে, বাঁচার ইচ্ছাটিকে নিরুৎসাহিত করে তোলে।
জরা, ব্যধি, মত্যু -- জীবনের অবধারিত এই পরিণাম থেকে তো নিস্কৃতি পাওয়ার উপায়ও নাই। তারপর আছে আধিভৌতিক, আধিদৈবিক, আধ্যাত্মিক বিপর্যয়। তাই শোক, দুঃখ, যন্ত্রণা, বিষাদ জীবনের নিত্য দিনের সঙ্গী ; কত যে পরাভব, কত অপূর্ণতা।
প্রাচীন গ্রীসের মহান তিন নাট্যকার ইউরিপিদিস, এসকাইলাস, সোফোক্লিস। তাঁদের বিয়োগান্তক নাটকগুলিতে (Tragedies) মানবজীবনের যে পরিণাম দৃশ্যগ্রাহ্য এবং অনুভবগম্য করে দিয়েছেন সেখানে তো নিষ্প্রশ্ন দুঃখবাদই (Pessimism) প্রতিষ্ঠিত ; এমনকি 'Catharsis'-য়েরও অবকাশ নেই। অস্কার ওয়াইল্ড তাঁর একটি কবিতায় ইউরিপিদিসকে বলেছেন, "প্রশস্ত অশ্রুনদী''। ইউরিপিদিস নিজেও তাঁর সৃজনধ্যানে স্বীকার করেছেন, "জীবনে কেউ সুখী নয়, ইহাই ট্রাজেডি (tragedy)."
পাশ্চাত্যের গ্রীক, হিব্রু, রোমান সাহিত্যে, দর্শনে, ধর্মধারণায় এবং শিল্পকলাতেও নৈরাশ্যবাদ যে কী পরিব্যপ্তভাবে ছেয়ে আছে তা সাহিত্য ও দর্শনের পাঠকমাত্রই জানেন। সম্পূর্ণ অস্বীকারও করা যায় না। নগন্যতম মানুষও বিপুল সম্ভাবনা নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। অথচ বিরাট সে সম্ভাবনার ভগ্নাংশের ভগ্নাংশ মাত্র রূপায়িত হয় তার অক্ষম সাধনায়, এবং অবন্ধু প্রাকৃতিক ও মানবিক পরিবেশে। শেষের দিকটায় মনে হয়, Life is an encounter with Nothingness.
"হতাশার ভিড় যেন আর না বাড়ে,
ছাই হয়ে যাবে যে স্বাদুতা আমার --
বিফল প্রয়াসে এখনো রয়েছে তা।"
                                           ----------- গালিব।
ঠিক এখানেই 'আনন্দধারা বহিছে ভুবনে' বাণীর উদ্ঘোষণা। জীবন সংগ্রামের সমস্ত ক্ষয় ক্ষত ক্ষতিকে তুচ্ছাতিতুচ্ছ ভেবে উপেক্ষা করবার মন্ত্র আমরা লাভ করেছি আমাদের পূর্বপুরুষদের --- ব্যাস, বাল্মীকি, বশিষ্ঠ, যাজ্ঞবল্ক প্রভৃতি মহান ঋষি ; গার্গী, মৈত্রেয়ী, অরুন্ধতী প্রভৃতি মহতী বিদুষীগণের কাছ থেকে, জন্ম জন্মান্তরের সুকৃতির ফলে। আমরা তাঁদেরই সন্ততি। ছান্দোগ্য উপনিষদে আমরা পরিচিত হয়েছি সত্যকাম, শ্বেতকেতু ও নারদ ঋষির মতো সুগভীর সত্যানুসন্ধিৎসুদের সঙ্গে, এবং আরুণি, সনৎ কুমার ও প্রজাপতির মতো শ্রেষ্ঠ আত্মবিদ্ আচার্যগণের সঙ্গে। গুরু শিষ্যের কথপোকথনের মাধ্যমে এই উপনিষদ্ আমাদের সৎ স্বরূপকে সৃষ্টির আপেক্ষিক বিকার থেকে পৃথক করতে শিখিয়েছেন। এতে গভীর আধ্যাত্মিক ও দার্শনিক তাৎপর্যপূর্ণ মহাবাক্য চতুষ্টয়ের অন্যতম --তৎ ত্বম্ অসি" -"তুমিই সেই"-- বাক্যটিতে সঙ্গীতের ধুয়ার মতো মানবের দেবত্ব কীর্তিত হয়েছে।
এতে জীবনের গভীর দুঃখগুলির নিবৃত্তির জন্য মানবের জন্মগত দেবত্ব জ্ঞানের উপদেশ দেওয়া হয়েছেঃ  "তরতি শোকম্ আত্মবিৎ। " আপন সত্তাকে, আপন অন্তরাত্মাকে যিনি সম্যকরূপে জেনেছেন, যিনি আপন জীবাত্মাকে স্রষ্টা পরমাত্মার সঙ্গে 'এক' করে ভাবতে পেরেছেন তিনি 'আত্মবিৎ' এবং তিনি জীবনের সমস্ত প্রকারের শোক দুঃখ যন্ত্রণা থেকে মুক্ত হয়ে চির আনন্দে আত্মস্থ হতে পারেন।
কিন্তু জীবনে ও জগতে এরূপ আনন্দ লাভ তো মহাজ্ঞানী, মহাসাধকদের ধ্যানলব্ধ। আমাদের মতো সাধারণ মানুষের আনন্দ লাভের উপায় কি ? এখানেই জীবাত্মা ও পরমাত্মার ভাবনা, দ্বৈত এবং দ্বৈতাদ্বৈত দর্শন। পরমাত্মা হলেন সাধকের কাছে ব্রহ্ম আর সাধারণ্যে তিনি ঈশ্বর বা ভগবান। এই ঈশ্বর বা ভগবান, তাঁকে স্বীকার করলে, আমার আমিত্বের অহং উৎসর্গ করলে চরাচর-প্লাবিত পরমানন্দ --- এই বিরাট সৃষ্টির অপরিমেয় রূপ এবং রসের ভোক্তা এই জীবাত্মা, এই আমি। আমার কাজ তাঁকে জানা, তাঁর 'চরণে' আত্মনিবেদন।
"তদ্বিজ্ঞানেন পরিপশ্যন্তি ধীরা।
আনন্দরূপম্ অমৃতং যদ্বিভাতি।।" 

দুই

এই দ্যুলোক ভূলোক পরিব্যপ্ত 'বিশ্বরূপ' - য়ের নিকট সম্পূর্ণ আত্মনিবেদনের একমাত্র শর্ত প্রেম। আর প্রেম যখন আসে তখন জোয়ারের জলতরঙ্গের মত আমাদের জীবন-নদীর সকল মালিন্য, আত্মপর ভেদ ধুয়ে দিয়ে যায়। একটি অতিমানবীয় ভালোবাসার বোধ জাগে, ভালোবাসার দৃষ্টি দিয়ে জগতের রূপ দেখতে পাই। আর এই সৃষ্টির যিনি স্রষ্টা, যিনি নিয়ন্তা, তাঁকে পাবার, তাঁর সঙ্গে একটি মধুর সম্পর্ক স্থাপন করবার জন্য দেহ মন চিত্ত ব্যাকুল হয়ে ওঠে। সমস্ত অন্তঃকরণ জুড়ে সেই প্রেমময়ের উপস্থিতি।
জগতের সঙ্গে প্রেমের যোগ সাধিত হলেই আনন্দ।  তখন আমার ক্ষুদ্র আমিত্বের বিনাশ ; বৃহতের মধ্যে 'আমি'র মুক্তি।
এবার আবার সেই বিশ্বাত্মা বিশ্বকবির ওই মহাবাণীর শেষ কথাগুলি অপরিহার্য হয়ে উঠলো, 
"চারিদিকে দেখ চাহি হৃদয় প্রসারি,
ক্ষুদ্র দুঃখ সব তুচ্ছ মানি 
প্রেম ভরিয়া লহ শূন্য জীবনে।। 
আনন্দধারা বহিছে ভুবনে.." 

ওই যে কথা আরম্ভের প্রথম উচ্চারণে রসের প্রসঙ্গ এসেছে তাই আনন্দ এবং এই জীবনে লাভ করবার যে আমিত্ব-মোহশূণ্য বাসনার নামই প্রেম। পাশ্চাত্যের বস্তুবাদী দর্শনে এমন নিষ্কামনার প্রেমের তেমন উচ্চমার্গীয় 'মীমাংসা' না থাকলেও পাশ্চাত্য সাহিত্যর রোমান্টিক অভিব্যক্তির মধ্যে বিমল আনন্দরসের নিঃসরণ আমরা পেয়েছি। কবি Wordsworth, Shelley, John Keats, Lord Tennyson এবং জার্মান মহাকবি Goethe -র কাব্য সম্ভারে বিষাদ ও বিরহের মধ্যেও আনন্দরসের ফল্গুধারা পরিদৃশ্যমান। এই যে বেদনার অভ্যন্তরে আনন্দবোধ এইটি রবীন্দ্রনাথ তাঁর উপনিষদীয় প্রজ্ঞার আলোকে অনুভব করেছেন এবং তার সাহিত্য দর্শনে সত্যরূপে, শাশ্বতরূপে, সুন্দররূপে প্রতিষ্ঠা করেছেন।
পরিশেষে তাঁরই কথা লিখে এই কথকথা শেষ করি,
"আনন্দ আজ কিসের ছলে
কাঁদিতে চায় নয়নজলে,
বিরহ আজ মধুর হয়ে 
করেছে প্রাণ ভোর।" 

                   সমাপ্ত
_____________________________________________



শনিবার, ২ সেপ্টেম্বর, ২০২৩

বেতো মাস্টার

বেতো মাস্টার

টাড়রা-মোহনপুর গ্রাম। পশ্চিম বর্ধমানের একেবারে প্রান্ত অঞ্চলে, যেখানে চিত্তরঞ্জন রেলইঞ্জিন কারখানা গড়ে উঠেছে, তারও পরে পূর্বমুখী অজয় নদের উত্তর পাড়ের এই জনবসতি। উপরোক্ত দুটি গ্রাম ভিন্ন ভিন্ন হলেও দুই গ্রামের রাস্তা, কুঁয়ো-পুকুর, মাঠঘাট, খেলার মাঠ, কালিমন্দির , চণ্ডীমণ্ডপ -- সকল কিছুই এমনভাবে সর্বজনীন যে লোকে একবাক্যে, একসঙ্গে দু-গ্রামের নাম উচ্চারণ করে। এই অঞ্চল বিহার প্রদেশের অন্তর্ভুক্ত ছিল, এখন ঝাড়খণ্ডের।
আজ থেকে ষাট পঁয়ষট্টি বছর আগে এই গ্রামদেশ ছিল বনজঙ্গলে ঢাকা। যানবাহন বলতে পা দুটো আর গরু বা  মোষের গাড়ি। শিক্ষার ব্যবস্থা ছিল আশেপাশের পাঁচ গাঁয়ের একটি পাঠশালায়। দূর কোন বর্ধিষ্ণু পল্লী থেকে বা শহর থেকে একটি 'মাষ্টার' আসতেন, পড়াতেন। মেয়েদের পড়াশোনা কল্পনাতেও আনতো না কেও। শিশু কিশোর ছেলেরাই যেতো সেই পাঠশালায়। বই পত্তর বলতে বর্ণ পরিচয় প্রথম ভাগ, দ্বিতীয় ভাগ, একটি ধারাপাত, কোণা ভাঙা, তেলচিটে শ্লেট, ছোট ছোট টুকরা টুকরো খড়ি পেনসিল --- এই সমস্ত একখণ্ড ছেঁড়া চটে মুড়িয়ে এ-গ্রাম, ও-গ্রামের গোটা বিশেক ছেলে আমরা, সকালের জলখাবার খেয়ে হাজির হোতাম ঐ ছাত-ফাটা কাছারি ঘরের উঠোনে। মাস্টার যেদিন আসতেন সেদিন দুপুর পর্যন্ত থাকা, নইলে আম জাম পেয়ারা, যখন যেটা ফলে সেই বাগানের দিকে দৌড়। মাঝে মাঝে
মাসাবধিকাল আসতেনই না মাস্টার।
আমার আজ বেশ মনে পড়ে, সেটা ছিল শীতের সময়। সন্ধ্যাবেলায় ঘরে ফিরে খবর পেলাম দেশের ঘর থেকে মাস্টার ফিরে এসেছেন। কাল থেকে আবার পাঠশালায় যেতে হবে। রবিবার বা ছুটির দিন এসব ব্যাপার ছিল না।
তা, পরের দিন যথাসময়ে পাঠশালায় আমরা হাজির। বেতো মাস্টার (বাত নয়, তাঁর হাতে থাকতো এক লিকলিকে বেতের ছড়ি) আমাদের বললেন,
--- শোন্ তোরা, আজ একটি বিশেষ দিন, প্রজাতন্ত্র দিবস। আমি যা বলছি, মন দিয়ে শুনবি।
এরপর তিনি যে সব কথা বলতে আরম্ভ করলেন সে কথাগুলি আমরা আগে কোন দিন শুনিনি। ভারতবর্ষ, বিদেশি শাসন, স্বাধীনতা যুদ্ধ, স্বাধীনতা লাভ --- এমনি কত কথা তিনি বলেই গেলেন বহুক্ষণ ধরে। আর শেষে বললেন,
---  এতসব জানতে হলে এখানকার এই গ্রামের পাঠশালায় হবে না। শহরে যেতে হবে। তোদের মধ্যে যারা বড়, প্রথম ভাগ, দ্বিতীয় ভাগ শেষ করেছিস, যোগ বিয়োগ গুণ ভাগ জেনেছিস তাদেরকে আমি চিত্তরঞ্জনের
স্কুলে ভর্তি করব। ওখানকার শিক্ষকদের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। যাতায়াত করতে হবে নদী পেরিয়ে।
পারবি তো ?
আমরা কোন উত্তর দিতে পারিনি।

সেদিন সন্ধ্যায় দেখি, তিনি গ্রামের ঘরে ঘরে ঢুকছেন আবার বেরিয়ে আসছেন।
একদিন পরেই খুব সকালবেলা  আমাদের আটজন ছেলেকে আর কারো বাবা, কারো কাকা--- তাদের সঙ্গে নিয়ে বেতো মাস্টার চলতে লাগলেন।
মাঠের আলের উপর দিয়ে নদীর পাড়। এতদূর রাস্তা আমাদের জানা, কিন্তু নদী পেরিয়ে এক অন্য জগৎ। পাকা, কালো কালো পরিস্কার রাস্তা। দুপাশে কেমন সুন্দর সুন্দর ঘর। মানুষগুলো অন্যরকম যেন। ভালো ভালো জামাকাপড় পরে আছে।
গিয়ে দাঁড়ালাম যেখানে সেখানে এক মস্ত বড় ঘর। আমাদের গ্রামের ঠাকুর দালানের চাইতেও বড়।
আমাদেরকে বাইরে রেখে মাষ্টার সেই ঘরে ঢুকে গেলেন।
হঠাৎ শুনি ঢং ঢং ঢং শব্দ। একদল আমাদের মতই ছেলে হৈ হৈ করে বেরিয়ে এল। অবাক কাণ্ড, মেয়েরাও আছে।
মাস্টার বেরিয়ে এলেন, আমাদেরকে নিয়ে চললেন। একটি ঘরের ভিতরে ঢুকলাম আমরা সবাই। কী সুন্দর সাজানো ঘর। চৌকির (পরে জেনেছি টেবিল) ওপারে চেয়ারে বসে একজন, সাদা ধুতি, সাদা জামা পরা লোক।
বিস্ময়ের ঘোর, বিমূঢ়তায় আচ্ছন্ন (এ শব্দগুলি আজকের, সেদিন জানতাম না) আমরা ফিরে এলাম এবং পরের সোমবার থেকে আমাদের যাত্রা হোল শুরু।

বেতো মাস্টার তার পরও তিন বছর কি চার বছর থেকেছেন আমাদের গ্রামে। বছরে বছরে নূতন নূতন ছেলের দল পাঠিয়েছেন শহরের স্কুলে। তখনো আমরা ছোট, হঠাৎই গ্রামে আলোচনা, মাস্টার চলে গিয়েছেন। আর ফিরে আসবেন না।
বড় হয়ে বাবা, কাকাকে, অন্য বয়স্ক মানুষদের জিজ্ঞাসা করেছি, কেন মাষ্টার চলে গিয়েছিলেন। কেউই উত্তর দেন নি। আমার এই ঔৎসুক্য লক্ষ্য করে মা আমাকে চুপি চুপি একদিন বললেন,
--- মাস্টার নিজে থেকে চলে যান নি। তাঁকে গাঁয়ের লোক একজোট হয়ে তাড়িয়ে দিয়েছিল।
---কেন মা, ওনার হাতে একটা বেতের ছড়ি থাকতো ঠিকই, কিন্তু উনি তো কোন দিন কাউকে মারতেন না, এমন কি বকতেনও না।
------ উনি গ্রামসভায় জানতে চেয়েছিলেন, মেয়েদের কেন পাঠশালায় পাঠানো হয় না। মোড়ল বিনোদ মিশ্রর সাথে নাকি তর্কাতর্কিও হয়েছিল।
আমি হতবাক। ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগর মহাশয়ের কথা মনে পড়ল। মনে হোল, এদেশে শুধু একজন বিদ্যাসাগর জন্ম গ্রহণ করেন নি। গ্রামে গ্রামে, জনপদে জনপদে কত শত সহস্র বিদ্যাসাগর জন্ম নিয়েছেন, হারিয়েও গিয়েছেন ব্যর্থ প্রয়াসের গ্লানি বহন করে। তাঁদের মঙ্গলময় কর্মের ফল তাঁরা ভোগ করে যেতে পারেন নি, কিন্তু আজ সমগ্র সমাজ সে ফলের অমৃতরস আস্বাদন করে চলেছে।

সেদিনের সেই স্বল্পজ্ঞাত বেতো মাস্টারের মূর্তি আমার অন্তরজুড়ে ভাস্বর হয়ে উঠল। শিক্ষা-দীক্ষাহীন এই
পাণ্ডববর্জিত গ্রাম দেশে, অর্ধ শতাব্দী আগে, শিক্ষার আলোক বর্তিকা হাতে, অবোধ নির্বোধ কিশোর শিষ্যদের সঙ্গে নিয়ে, এক মাস্টার মশাই, উপনিষদের ঋষির মত এগিয়ে চলেছেন সেই সময়ের সুদুর্গম শিক্ষা তীর্থের পথে। 
আনত মস্তকে, ভক্তিবিহ্বল চিত্তে মনে মনে বললাম,
--- ওই বর্ণপরিচয়, ওই যোগ-বিয়োগ, গুণ-ভাগের যে  পাথেয় আপনি দিয়ে গিয়ে গিয়েছিলেন তাই আজও আমার বেঁচে থাকার সঞ্জীবনী। প্রতিদানে কিছুই দেওয়া হয়নি। মাস্টার মশাই, আপনি যেখানেই থাকুন,‌ দ্যুলোকে-ভূলোকে, আমার প্রণাম যেন পৌঁছাতে পারে আপনার চরণপ্রান্তে।

দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
২৬-০৮- ২০২৩
ব্যাঙ্গালোর।






রবিবার, ২৭ আগস্ট, ২০২৩

ডাক

ডাক  

                   "  ..........Last scene of all

That ends this strange eventful history, 

Is second childishness and mere oblivion ; 

Sans teeth, sans eyes, sans taste, sans everything."  

Shakespeare 

(As You Like It _ Act ।।, Scene v।।.)


ধরণীর রঙ্গমঞ্চে মাতৃ-অঙ্কে নন্দিত প্রবেশ।
তারপর কত যে পেয়েছি ডাক কত দিক হতে
জীবনের ঊষাকাল থেকে। স্নেহ সুধা মাখা ডাক,
"আয় বাছা ফিরে আয়, ফিরে আয় ঘরে।"
"এখনি যেয়ো না চলে", সুমধুর প্রণয় আহ্বান
গীতধ্বনিময়। "দিয়ে যাও", পরস্ব যা করেছ হরণ,
"নিয়ে যাও", তোমার যা আছে অধিকার,--
বিচারক নিরাবেগ দিয়েছে এমনি ডাক
সুকঠোর স্বরে কত শত বার -- নাই তার
হিসাব নিকাশ। এবার এসেছে ডাক তার,
বন্ধু যে আমার --- সুখে দুখে, আলোকে আঁধারে,
পথে ও বিপথে, বিরহ-মাথুরে কিংবা মিলন বাসরে,
"ফিরে এসো, মুছে দিয়ে ভ্রান্তির চরণচিহ্ন
ব্যাকুল সন্তাপে।" পঞ্চম অঙ্কের এই পালা
জীবন নাট্যের অবশিষ্ট রজনীর শেষ অভিনয়।
নিভু নিভু বাতি, ছায়া ছায়া মঞ্চজুড়ে একা আমি।
দর্শক আসন শূন্য, বিষন্ন বাঁশিতে বাজে মাড়োয়ার ধুন।
শিথিল হয়েছে সজ্জা, ঘামে ধুয়ে গেছে রঙ,
মুকুট পড়েছে ঢলে, অঙ্গে অঙ্গে ক্লান্তিভার ---
রাজবেশে পাট শেষে বিপন্ন প্রস্থান। 
ভুলের পায়ের ছাপ খুঁজি -- এ কী ! এ যে অগনন !
জীবনের সাজঘরে আরবার হবেনা কি ফেরা ? 


(উত্তর ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের একটি বিশেষ রাগ মাড়োয়া , রাগটি সান্ধ্যকালিন।  

সুতীব্র দুঃখের আবেশের শেষে বৈরাগ্যের প্রসন্নতা সৃষ্টি করে এই রাগাশ্রয়ী সঙ্গীত)।

দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
২৭/০৮/২০২৩
ব্যাঙ্গালোর।










Recently published

অমূল্য

He ( Tagore) who sees all things in his own self and his own self in all things, he does not remain unrevealed.                     ...