রবিবার, ২৭ আগস্ট, ২০২৩

ডাক

ডাক  

                   "  ..........Last scene of all

That ends this strange eventful history, 

Is second childishness and mere oblivion ; 

Sans teeth, sans eyes, sans taste, sans everything."  

Shakespeare 

(As You Like It _ Act ।।, Scene v।।.)


ধরণীর রঙ্গমঞ্চে মাতৃ-অঙ্কে নন্দিত প্রবেশ।
তারপর কত যে পেয়েছি ডাক কত দিক হতে
জীবনের ঊষাকাল থেকে। স্নেহ সুধা মাখা ডাক,
"আয় বাছা ফিরে আয়, ফিরে আয় ঘরে।"
"এখনি যেয়ো না চলে", সুমধুর প্রণয় আহ্বান
গীতধ্বনিময়। "দিয়ে যাও", পরস্ব যা করেছ হরণ,
"নিয়ে যাও", তোমার যা আছে অধিকার,--
বিচারক নিরাবেগ দিয়েছে এমনি ডাক
সুকঠোর স্বরে কত শত বার -- নাই তার
হিসাব নিকাশ। এবার এসেছে ডাক তার,
বন্ধু যে আমার --- সুখে দুখে, আলোকে আঁধারে,
পথে ও বিপথে, বিরহ-মাথুরে কিংবা মিলন বাসরে,
"ফিরে এসো, মুছে দিয়ে ভ্রান্তির চরণচিহ্ন
ব্যাকুল সন্তাপে।" পঞ্চম অঙ্কের এই পালা
জীবন নাট্যের অবশিষ্ট রজনীর শেষ অভিনয়।
নিভু নিভু বাতি, ছায়া ছায়া মঞ্চজুড়ে একা আমি।
দর্শক আসন শূন্য, বিষন্ন বাঁশিতে বাজে মাড়োয়ার ধুন।
শিথিল হয়েছে সজ্জা, ঘামে ধুয়ে গেছে রঙ,
মুকুট পড়েছে ঢলে, অঙ্গে অঙ্গে ক্লান্তিভার ---
রাজবেশে পাট শেষে বিপন্ন প্রস্থান। 
ভুলের পায়ের ছাপ খুঁজি -- এ কী ! এ যে অগনন !
জীবনের সাজঘরে আরবার হবেনা কি ফেরা ? 


(উত্তর ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের একটি বিশেষ রাগ মাড়োয়া , রাগটি সান্ধ্যকালিন।  

সুতীব্র দুঃখের আবেশের শেষে বৈরাগ্যের প্রসন্নতা সৃষ্টি করে এই রাগাশ্রয়ী সঙ্গীত)।

দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
২৭/০৮/২০২৩
ব্যাঙ্গালোর।










সোমবার, ২১ আগস্ট, ২০২৩

সব ভালো ?

সবই ভালো। 



দুপুরের মেঘ, বৃষ্টি, মাঝে মাঝে ঘাম-গলা সূর্যের আলো।
মঞ্চে সুপ্রাচীন গ্রীসের বাঙ্ময় বাগ্মীকুল নব অবতারে -

 ডেমসস্থিনিসসহ আলেকজান্দ্রিয়ার দশাধিক বাক্যবীর। 

সম্মুখে উত্তাল, উন্মত্ত, ছাতা-মাথা মানুষের সমুদ্র সফেন।

বিদ্রোহ, বিপ্লব, ক্ষোভ,  ঘৃণা, হিংসার বিষমাখা বাণী। 

   ধর্মকথা ? তাও আছে --- "সংঘম্ শরণম্ গচ্ছামি।"

ঔজস্বী, তেজোদীপ্ত বাক্যের তরঙ্গলহরী ছন্দ-লয়হারা।
সবই ভালো, কেননা এ সকলি আগামীর মঙ্গল ইঙ্গিত।

ক্লান্ত ইতিহাস দুদিনেই ভোলে, সাক্ষী থাকে ধর্মভূমি --
লক্ষ পদচিহ্ন-ক্ষত বয়ে চলে বছরে বছরে,
নির্বিকার দশক শতক।
  তীর্থঙ্কর যাঁরা, ফিরে যান তাঁরা তুষার শীতল অবকাশে, 

সুরক্ষিত আবেষ্টনে।

তীর্থযাত্রী ফিরে যায় গ্রামে, গঞ্জে, গ্রামান্তরে,
দূরে দূরে বাসে ট্রেনে কিম্বা হেঁটে হেঁটে নদ-নদী পারে --
শুধু দেহে নয়, মনেও বহন করে'
মারণরোগের সংক্রমণ।  
ছড়িয়েও পড়ে কুটীরে কুটীরে।
হঠাৎই আগুন উঠে জ্বলে।
শ্যামল শস্যের ক্ষেতে, হোগলার ঝোপে, নদী পাড়ে
ক্ষতচিহ্নলাঞ্ছিত কিছু বোকা বোকা লাশও থাকে পড়ে।
কালো কালো পোড়া ঘর, ঝামা ইঁটের মতো রঙ
রক্তের দাগ থাকে দুটো দিন।
সইতে পারে না তাই, শ্রাবণের মেঘ
অঝোরে কেঁদে কেঁদে
ধুয়ে দেয় অমঙ্গলের অলক্ষুণে
ক্ষত ও ক্ষতির চিহ্ন যত --- মাটি হতে ;
তবে মা'টির বা বৌ'টির বা বোনটির
বুকে তারা থাকে আরো কিছুকাল বেঁচে কোনমতে।
তারপর বিস্মরণ !
মানুষের ইতিহাসে উপেক্ষিত মানব দেবতা।

                                         দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
০১/৮/২০২২
শিলিগুড়ি।


 





মঙ্গলবার, ১৫ আগস্ট, ২০২৩

স্বাধীনতা


স্বাধীনতা দিবস 


স্বাধীনতা নীরে স্নান করে নাও অবাধ সূর্যালোকে,
স্বাধীনতা আছে বর্ষাধারার স্নিগ্ধ শীতল সুখে।
স্বাধীনতা আছে আকাশে বাতাসে বিমল তটিনী স্রোতে।
স্বাধীনতা আসে চাঁদের কিরণে, আকাশগঙ্গা হতে।
স্বাধীনতা ভাসে পাখীর পাখায়, ফুলেদের সৌরভে,
স্বাধীনতা হাসে কচি কাঁচাদের তারুণ্য গৌরবে।

(কেন) মুক্তির এই মুক্ত প্রহরে স্তব্ধ হয়েছে গীতি,
বলির খড়্গ রক্তে ডুবানো, জাগায় মারণ ভীতি।
সন্দেহ ঘেরে মানুষের মন --- অদৃশ্য নাগপাশে,
আনন্দ- সুর বিষাদ মেদুর স্মৃতির দীর্ঘশ্বাসে !
মুক্তির সাধ, মুক্তির স্বাদ, মুক্তির আরাধনা
অন্তরতম মনুষত্বের আলোকিত সুচেতনা।
যেদিন বদ্ধ কারা প্রাচীরের অন্ধ অন্তরালে,
স্বাধীনতা তার শাশ্বত কালের দীপ্র মশাল জ্বালে
থাকেনা সেদিন দীনতা নীচতা, থাকেনা মৃত্যু ভয় ;
মুক্তি সেদিন নূতন যুগের নব জীবনের জয়।

দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
১৫ই আগষ্ট, ২০২৩।




স্বাধীনতা

স্বাধীনতা দিবস 


স্বাধীনতা নীরে স্নান করে নাও অবাধ সূর্যালোকে। 

স্বাধীনতা আছে বর্ষাধারার স্নিগ্ধ শীতল সুখে।

স্বাধীনতা আছে আকাশে বাতাসে বিমল তটিনী স্রোতে।
স্বাধীনতা আসে চাঁদের কিরণে, আকাশগঙ্গা হতে।
স্বাধীনতা ভাসে পাখীর পাখায়, ফুলেদের সৌরভে,
স্বাধীনতা হাসে কচি কাঁচাদের তারুণ্য গৌরবে।

কেন মুক্তির এই মুক্ত প্রহরে স্তব্ধ হয়েছে গীতি,
বলির খড়্গ রক্তে ডুবানো, জাগায় মারণ ভীতি।
সন্দেহ ঘেরে মানুষের মন --- অদৃশ্য নাগপাশে,
আনন্দ- সুর বিষাদ মেদুর স্মৃতির দীর্ঘশ্বাসে !
মুক্তির সাধ, মুক্তির স্বাদ, মুক্তির আরাধনা
অন্তরতম মনুষত্বের আলোকিত সুচেতনা।
যেদিন বদ্ধ কারা প্রাচীরের অন্ধ অন্তরালে,
স্বাধীনতা তার শাশ্বত কালের দীপ্র মশাল জ্বালে
থাকেনা সেদিন দীনতা নীচতা, থাকেনা মৃত্যু ভয় ;
মুক্তি সেদিন নূতন যুগের নব জীবনের জয়।

দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
১৫ই আগষ্ট, ২০২৩।

















স্বাধীনতা নীরে স্নান করে নাও অবাধ সূর্যালোকে,
স্বাধীনতা আছে বর্ষাধারার স্নিগ্ধ শীতল সুখে।
স্বাধীনতা আছে আকাশে বাতাসে বিমল তটিনী স্রোতে।
স্বাধীনতা আসে চাঁদের কিরণে, আকাশগঙ্গা হতে।
স্বাধীনতা ভাসে পাখীর পাখায়, ফুলেদের সৌরভে,
স্বাধীনতা হাসে কচি কাঁচাদের তারুণ্য গৌরবে।

(কেন) মুক্তির এই মুক্ত প্রহরে স্তব্ধ হয়েছে গীতি,
বলির খড়্গ রক্তে ডুবানো, জাগায় মারণ ভীতি।
সন্দেহ ঘেরে মানুষের মন --- অদৃশ্য নাগপাশে,
আনন্দ- সুর বিষাদ মেদুর স্মৃতির দীর্ঘশ্বাসে !
মুক্তির সাধ, মুক্তির স্বাদ, মুক্তির আরাধনা
অন্তরতম মনুষত্বের আলোকিত সুচেতনা।
যেদিন বদ্ধ কারা প্রাচীরের অন্ধ অন্তরালে,
স্বাধীনতা তার শাশ্বত কালের দীপ্র মশাল জ্বালে
থাকেনা সেদিন দীনতা নীচতা, থাকেনা মৃত্যু ভয় ;
মুক্তি সেদিন নূতন যুগের নব জীবনের জয়।

দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
১৫ই আগষ্ট, ২০২৩।
















মঙ্গলবার, ৮ আগস্ট, ২০২৩

হুতোম প্যাঁচার নক্সা

পর্ব ১

"পাঠক, কতকগুলি আনাড়িতে রটান, হুতোমের নক্সা অতি কদর্য বই, কেবল পরনিন্দা, পরচর্চা, খেউড় ও পঁচালে পোরা। শুদ্ধ গায়ের জ্বালা নিবারণার্থে কতিপয় ভদ্রলোককে গাল দেওয়া হয়েছে।"

বস্তুত ১৮৬৩- ১৮৬৪ সালে, কালীপ্রসন্ন সিংহ যখন তাঁর হুতোম প্যাঁচার নক্সা প্রকাশ করেছেন তখন কলকাতার সমকালীন স্বল্প শিক্ষিত, শিক্ষিত এবং আত্মমন্যতা-গর্বী শিক্ষিত সমাজের গলায় পাঁঠার মাংসের কাঁটা আটকে গেল ; না যায় গেলা, না যায় ফেলা।
আসলে এই সময়কালের বাঙলার, বিশেষ করে কলকাতার --- গ্রাম্যতা-দোষ লালিত নাগরী শহরের --
সমাজ সংস্কৃতির যে ছবি আঁকা হয়েছে এই নক্সাটিতে তার পটখানি বেশ কৌতুহলোদ্দীপক। রাজা রামমোহন রায় তখন সবে (১৮৩৩ সাল) গত হয়েছেন। ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগর মহাশয়ের বিদ্রোহী চিন্তা- চেতনা উজাগর, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (১৮৩৮-'৯৪) বাঙলা সাহিত্যের ( উপন্যাস, প্রবন্ধ, গীতাভাষ্য) যুগান্তকারী সৃষ্টিকর্মে নিমগ্ন। মাইকেল মধুসূদন দত্ত (১৮২৪-'৭৩) বাঙলা কাব্য সাহিত্যের কান্তকোমল গীতধর্মীতা ভেঙে অমিত্রাক্ষর ছন্দের শঙ্খস্বরে মত্ততা জাগিয়ে তুলেছেন। সিপাহী বিদ্রোহের তপ্ত তাপ, নীল বিদ্রোহীদের অসম যুদ্ধের মরণপণ হুঙ্কার কলকাতায় ধেয়ে আসছে। হিন্দু ধর্মের নবরূপায়ণের সাধনা চলেছে দুই দিক থেকে। এক দিকে রামমোহন রায় প্রতিষ্ঠিত ব্রাহ্ম সমাজের দুই কান্ডারীর (দেবেন্দ্র নাথ ঠাকুর, ১৮১৭-১৯০৫, কেশব চন্দ্র সেন ১৮৩৮-'৮৪) সাধনপথের দ্বন্দ্ব ; অন্য দিকে দক্ষিনেশ্বর মন্দির প্রাঙ্গনে শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংস দেবের ভবতারিণী আরাধনা। 


পর্ব - ২
এই সময়টিকে আমরা বাঙলার 'নবজাগরণের কাল' নামে অভিহিত করে থাকি। পূর্ব আলোচিত সমস্ত ঘটনা সত্য এবং তার প্রভাব জনমানসে বিপ্লবাত্মক বিবর্তন এনেছিল -- নূতন উন্মাদনা ও উত্তেজনার সৃষ্টি করেছিল, একথা অস্বীকার করবার কোন উপায় নেই। কিন্তু এই সকল নবচেতনার আলোকবর্তিকার তলার অন্ধকারে, নবায়িত নগরী কলকাতার সামাজিক রুচি, রীতিনীতি, সংস্কারাচ্ছন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালনের যে বিকৃতি, বিচ্যুতি সংঘটিত হোত তার বিচিত্র চিত্রগুলি ধরা পড়েছে নিশি জাগরণে অভ্যস্ত হুতোম প্যাঁচার। যেমন দেখছেন, তেমনি লিখছেন।
আর যদি সেই লেখায় বিদ্যাসাগরী, বঙ্কিমী, দেবেন ঠাকুর বা কেশব চন্দ্রীয় কলমের আঁচড় দেওয়া হোত তবে তো নক্সাটি কাল্পনিক রেখাচিত্রের 'পেইন্টিং' হয়ে উঠতো। সেখানে তো আমরা সমকালীন আসল কলকাতাকে হারিয়ে ফেলতাম চিরকালের জন্য। এই চিরকালের জন্যই একটি ঐতিহাসিক সাহিত্য গ্রন্থ রেখে গিয়েছেন সল্পায়ু কালীপ্রসন্ন সিংহ। 


কিন্তু তাঁর লেখনীর সে ক্ষমতা ছিল যে ঐ চিত্রপটে সমকালের উচ্চবর্গীয় সাহিত্য রচয়িতাদের মত সাধু বা সুমার্জিত ভাষার রঙ বুলাতে পারতেন। তিনি বইয়ের গৌরচন্দ্রিকায় বলছেন, 


"জগদীশ্বরের প্রসাদে যে কলমে হুতোমের নক্সা প্রসব করেছে, সেই কলমই ভারতবর্ষের নীতি প্রধান ধর্ম্ম ও নীতিশাস্ত্রের প্রধান উৎকৃষ্ট ইতিহাসের ও বিচিত্র বিচিত্র চিত্তোৎকর্ষ বিষয়ক, মুমুক্ষু, সংসারী, বিরাগী ও রাজার অনন্য অবলম্বনস্বরূপ গ্রন্থের অনুবাদক (এখানে তাঁর অনন্য কীর্তি মহাভারত অনুবাদের কথা উল্লেখ করেছেন) ; সুতরাং এটা আপনি বিলক্ষণ জানবেন অজগর ক্ষুধিত হলে আরসুলা খায়না ও গায়ে পিঁপড়া কামড়ালে ডঙ্ক ধরে না। হুতোমে বর্ণিত বদমাইশ ও বাজে দলের সঙ্গে গ্রন্থকারের সেই সম্পর্ক।
তবে বলতে পারেন, কেনই বা কলকেতার কতিপয় বাবু হুতোমের লক্ষ্যান্তর্ব্বতী হলেন ; কি দোষে বাগাম্বর বাবুকে, প্যালানাথকে, পদ্মলোচনকে মজলিসে আনা হল ; কেনই বা ছুঁচো শীল প্যাঁচা মল্লিকের নাম করলে ; কোন দোষে অঞ্জনা রঞ্জন বাহাদুর ও.... হুজুর আলি, আর পাঁচটা রাজা রাজড়া থাকতে আসোরে এলেন ? এর  উত্তর এই যে হুতোমের নক্সা বঙ্গ সাহিত্যের নূতন গহনা ও সমাজের পক্ষে নূতন হেঁয়ালি।" 


মহাভারত অনুবাদক তো মহাকাব্যের আঙ্গিক, শৈলী জানতেন এবং সংস্কৃত ভাষায় পারঙ্গমও ছিলেন। তৎসম শব্দ-প্রধান বিদ্যাসাগর বা বঙ্কিমচন্দ্রের রচনার ন্যায় কিছু অনন্যসাধারণ সৃষ্টি আমাদের দিয়েও যেতে পারতেন কিন্তু তিনি সেই পথ স্বেচ্ছায় পরিত্যাগ করে বাঙলার সাহিত্য ভান্ডারে যা রেখে গিয়েছেন তা সত্য সত্যই নূতন গহনা। বাঙলা চলিত ভাষারীতির, বাঙলার কৃত্রিমতা- হীন রসসাহিত্যের উদ্বোধন হোল তাঁরই হাতে। আর তাঁর ব্যবহৃত যে শব্দগুলির প্রতি অশ্লীলতা, রুচিহীনতার কলঙ্ক আরোপিত হয়েছে সেগুলি তো তাঁর নক্সায় যথাযথ, সামান্য পরিমার্জিত হলে রসভঙ্গ হোত। 


" কোথাও পাদরী সাহেব ঝুড়ি ঝুড়ি বাইবেল বিলুচ্ছেন, কাছে ক্যাটিকৃষ্ট সুবর্ব্বন চৌকিদারের মত পোশাক --- পেন্টুলেন, ট্যাংট্যাঙে চোপকান, মাথায় কালো রঙের চোঙাকাটা টুপী --- আদালতী সুরে হাত মুখ নেড়ে খ্রীষ্ট ধর্মের মাহাত্ম্য ব্যক্ত করছেন ---- হঠাৎ দেখলে বোধ হয় যেন পুতুল নাচের নকীব। কতকগুলা ঝাঁকাওয়ালা মুটে,  পাঠশালের ছেলে ও ফ্রিওয়ালা একমনে ঘিরে দাঁড়িয়ে রয়েছে। ক্যাটিকৃষ্ট কি বলছেন কিছুই বুঝতে পারছেন না। পূর্বে বওয়াটে ছেলেরা বাপ মার সঙ্গে ঝগড়া করে পালিয়ে যেতো, নয় খ্রীষ্টান হোত, কিন্তু রেলওয়ে হওয়াতে পশ্চিমে পালাবার বড় ব্যাঘাত হয়েছে, আর দিশী খৃষ্টানদের দুর্দশা দেখে খ্রীষ্টান হোতেও ভয় হয়।" --- 

- এই যে নগরীর গলিতে গলিতে, রাজপথে, পাড়ায় পাড়ায়, মহল্লায় মহল্লায় বিচিত্র, চিত্তোৎকর্ষক চিত্র প্রদর্শনী, তার জন্য হুতোমী ভাষা একমাত্র, যোগ্যতম, একমেবাদ্বিতীয়ম্। 


এই ঐতিহাসিক সময়কালের পর বাংলা সাহিত্যের মন্দির প্রাঙ্গনে নবযৌবন-সমুদ্ভাসিত বিশ্বকবির আবির্ভাব। বাংলা ভাষা ও বাংলা শব্দ সৃজনের দেবদূত রবীন্দ্রনাথের পরিশীলিত, পরিমার্জিত সাহিত্য --- কাব্য, প্রবন্ধ, উপন্যাস, নাটক, গীতিকবিতা --- পাঠের রুচি, রসানুভূতির নিরিখে বিচার করে হুতোমের নক্সাকে 'নিম্নরুচির রচনা' আখ্যা দিয়ে, সাহিত্যের ঐতিহাসিকতাকে, সর্বত্রগামীতাকে অস্বীকার করবার প্রয়াস সাহিত্যিকের প্রতি শ্রদ্ধাহীনতার নামান্তর। 

 আমি ঝাড়খণ্ডের মানুষ। 

______________________________________________

২২শে শ্রাবণ

রবীন্দ্র স্মরণ

এত কথা, অবিরাম ছন্দোবদ্ধ মুখরতা,
ব্যাকুলতা প্রকাশের শব্দের সৃজন,
আনন্দ ধারায় ভেসে মন্দার চয়ন,
পারিজাত মালা গেঁথে,
সুরঙ্গমাদের সাথে,
সুরধুনী তীরে
নন্দন বনের ধারে সুন্দরের বন্দনা সঙ্গীত।

আবার দুঃখের নিরন্ধ্র অন্ধকারে,
শোকের অতল গহ্বর খুঁড়ে বুকের ভিতরে,
জ্বালিয়েছ মণিদীপ।
গীতবিতানের পত্রপুটে ব্যথার কুসুম,
গীতিমাল্যে গীতাঞ্জলি দিয়ে
নৈবেদ্য সাজিয়ে
পূজারতি বিশ্ববিধাতার --
হে পূজারী কোন মন্ত্রে তোমার স্মরণে
আজ করি নমস্কার !

হে বিশ্বপথিক,
তোমাকে বাঁধেনি কোন দেশ,
আবদ্ধ করেনি খণ্ডকাল।
সোনার তরণী বেয়ে নিত্য নিরুদ্দেশ।
"আমারে তুলিয়া লহ অয়ি বসুন্ধরে" ;
কিন্তু তার পরে,
মুছে দিয়ে বসুধার দিকচক্রবাল
যাত্রা তোমার দূর থেকে দূরে, মহাশূন্যে,
আকাশগঙ্গার পরপারে
আলোকের মহাপারাবারে।

তোমার কথিত কথা, কথকথা, গানে ---
প্রাণময় ভূবনের মহাকলতানে
বিশ্ব বীণার বেতার ঝংকারে,
অরূপের রূপ জাগে।
আমার যে 'আমি', সে হারায়
শ্রাবণের ধারায় সিক্ত যূথীর ওই সৌরভ-সুধায়।

অনাদি এ মহাকাল সীমাহারা জগৎ সংসার,
তার সারাৎসার যে চৈতন্য-শিখা,
ক্বচিৎ বা দেয় দেখা বিদ্যুৎ আলোকে।
জাগায় এ চেতনায় সত্যের কঠিন রূপ।
জীবনের সাধনায় পেলে তাঁর ধ্রুব পরিচয়।
তাঁর কাছে পাওনি বঞ্চনা।
তাই সত্য তুমি, সুন্দর তুমি, আলোর পথিক,
মৃত্যুঞ্জয়, অমৃত পুরুষ।
হে স্রষ্টা, অন্তরতম, বেদনার মহাকবি,
আজি এই অশ্রু-ঝরা শ্রাবণ সন্ধ্যায়
প্রণমি তোমায় রবি।

দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়,
২২শে শ্রাবণ, ১৪৩০
ব্যাঙ্গালোর।

রবিবার, ৬ আগস্ট, ২০২৩

মানুষই দেবতা গড়ে

মানুষই দেবতা গড়ে 


নির্জন মন্দিরে, একা আছি বসে,
একটি প্রদীপ জ্বলে মন্দদীপ্তিশিখা।
দেববিগ্রহ, করুণামূর্তি, শ্রীমুখে অমল হাসি।
নিখিলের কোলাহল তন্দ্রাচ্ছন্ন স্তব্ধ মাঝখানে।‌
এমনিই কাটে যদি অবশিষ্ট কয়েকটি প্রহর ,
এ প্রাণের অর্থ কিছু পারি বুঝে নিতে।
মন্দির প্রাঙ্গন ছেড়ে অসীম সংসার--
সমুদ্রমন্থন। অমৃত লালসামত্ত যুদ্ধ দেবাসুরে।
বিষপায়ী নীলকণ্ঠ নিস্পন্দ শ্মশানে।
মানুষ কোথায় সেথা, কোথায় ঈশ্বর ?
যে মূর্তির এত রূপ, দিব্য ভাব, প্রশান্ত সুষমা,
সে কি সৃষ্টি মানুষের, না কি তার আছে বাস
মানব অন্তরে, মূর্তরূপে মন্দিরের আরাধ্য দেবতা ?

দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় 
০৬/৮/২০২৩
ব্যাঙ্গালোর।













Recently published

অমূল্য

He ( Tagore) who sees all things in his own self and his own self in all things, he does not remain unrevealed.                     ...