রবিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২১

Francesco Petrarch (1304--1374), the Renaissance Bard. ফ্রান্সিসকো পেত্রার্কা, নবজাগরণের রাজকবি ।


Francesca Petrarch (1304 - 1420), Bard of the  Renaissance.‌‌
ফ্রান্সিসকো পেত্রার্কা, ইউরোপীয় নবজাগরণের 
রাজকবি। 

ইউরোপের ইতিহাস রচনা করেছেন যে ইতিহাসবিদগণ তাঁরা প্রায় সকলেই একমত পাঁচ শ' খৃষ্টাব্দ থেকে এগারো শ' খৃষ্টাব্দ পর্যন্ত ছিল অন্ধকারময় যুগ। এই সময়কালটিকে মধ্যযুগের 'অন্ধকার' কেন বলা হয়ে থাকে তার উত্তর দেওয়ার দায় ইতিহাসের। আমি যাবো সাহিত্য-শিল্প ভূমিতে।
তবে একটি কথা বলে রাখি , 'মধ্যযুগ' শব্দটির মধ্যেই লুকিয়ে আছে মানবেতিহাসের কিছু অমানবিক, কলঙ্কিত ঘটনার সংঘটন,
--বর্বর-আক্রমন, বর্বরতা, ধর্মান্ধতা, কুসংস্কার, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান (church, cathedral, monestry)- গুলির এবং ধর্মপ্রচারকদের (prisest to The Pope)-দের দ্বারা মানুষ, মানুষের মানবিক প্রবনতা ও মানব-সমাজয়ের উপর নিষ্ঠুর নিয়ন্ত্রণ।
পশ্চিম রোম সাম্রাজ্যে অবসান ঘটে পঞ্চম শতাব্দীতে। (ভিসিগথদের রাজা অ্যলারিকের আক্রমণে ৪১০খৃষ্টাব্দে)।

এসব সত্ত্বেও পূর্ব রোম সাম্রাজ্য বা Byzantine Civilization আরও এক হাজার বছর ইউরোপের জাতিগোষ্ঠীগুলিকে প্রত্যক্ষভাবে বা পরোক্ষভাবে প্রভাবিত করে রেখেছিল। অবশেষে ১৪৫৩খৃষ্টাব্দে  অটোমেন তুর্কীদের সর্বধংসী আক্রমণে Constantinople-য়ের পতনের পর রোমান শাসনতন্ত্রের বিনাশ সম্পূর্ণ হয়। এইভাবে গ্রীক সভ্যতা,(খৃষ্টপূর্ব অষ্টম শতাব্দী থেকে?),  ল্যাটিনিয়াম বা রোম সভ্যতা-- প্রায় দু'হাজার বছরের ঐতিহ্য নিয়ে গড়ে ওঠা ইউরোপীয় সভ্যতার চলমানতা বার বার বাহ্যিকভাবে রক্তাক্ত হয়েছে একথা ঠিক, কিন্তু সে ঐতিহ্যের অন্তর-সম্পদ প্রদীপের শিখার মতো অনির্বাণ ছিল বংশ-পরম্পরা, লোক-পরম্পরায়, মানুষের মানসবৃত্তির অদৃশ্য গর্ভগৃহের অভ্যন্তরে। 
যুদ্ধ, দাঙ্গা, সাম্রাজ্যের উত্থান,পতন, প্রকৃতির তাণ্ডব কোন বিপর্যয় -ই  মানুষের অন্তরে লালিত শুভকে, কল্যাণবোধকে
চিরকালের মতো নিঃশেষিত করে দিতে পারে না। বসন্তের অনুকূল বাতাসের কবোষ্ণ স্পর্শে শীতের সুপ্ত কুসুমকলি যেমন পাপড়ি মেলে ধরে ঠিক তেমনি ভাবে মানুষের মানসবৃত্তির অবরুদ্ধ ভাব ও ভাবনাগুলি শিল্প, সাহিত্য, সঙ্গীত, লোক সংস্কৃতির বিচিত্র মাধ্যমে প্রকাশিত হয় ।
                     
  এলো চতুর্দশ শতাব্দী। রোম রাজত্বের রাজধানী 
ল্যাটিনিয়াম সভ্যতার আদি ভিত্তিভূমি ইটালিই প্রথম জেগে উঠল মধ্যযুগের তুষার-চাপা জড়তা কাটিয়ে। তের শ' খৃষ্টাব্দের ঊষা লগ্নে ভূমধ্যসাগরের এই উপদ্বীপটিতে বয়ে গেল বসন্তের উষ্ণ মলয়ানীল তরঙ্গ। ফুটে উঠল সাহিত্য সঙ্গীত শিল্পের পুষ্পমঞ্জুরী। ফ্লোরেন্স নগরীর মেডিসি পরিবার, এই নগরীর শাসনভার ছিল যাদের হাতে তাঁরাই নবজাগরণের পথিকৃৎ। পরে, এই জাগ্রত চেতনার আলো ছড়িয়ে পড়লো
মিলান, বোলোগ্না, ফেরারা, রোম, ভেনিস শহরগুলি ছাড়িয়ে ইউরোপের দূর-দূরান্তের দেশে এবং দেশান্তরেও।
সলতে পাকানোর কাজ শুরু হয় তারও আগে ত্রয়োদশ শতকের দ্বিতীয়পাদ দান্তে অলিগিরির সময়কাল (১২৬৫-১৩২১) থেকেই। আরো আরো পূর্বে ১১শ' খৃষ্টাব্দের মধ্যভাগে ত্রুবাদূরদের কাহিনীকাব্যের গীতধ্বনিময় সঙ্গীত মূর্ছনায় ছিল নূতন সাহিত্য সঙ্গীত সৃজনের কলকাকলি। 
সে এক দীর্ঘ, গভীর, ব্যপ্ত, কলাসৌন্দর্যের ইতিহাস, যার অবলুপ্তি ঘটে চতুর্দশ শতকের দ্বিতীয়পাদ ১৩৪৮ খৃষ্টাব্দের সময়কালে Black Death- মহামারীর দুঃসময়ে। 
কিন্তু তার অন্তর্লীণ ফল্গুধারার প্রভাব নবজাগরণের স্বপ্ন সাধ্য সৃজন প্রতিভাকে অনুপ্রাণিত করেছিল। ইউরোপীয় নবজাগরণের ঊষালগ্নের বৈচিত্র্যময় কলাজগতের কয়েকটি চিরভাস্বর নক্ষত্র : 

দোনাতেলো, মাইকেল এন্জেলো, গিয়েতো ,লিয়োনার্দো দ্য ভিন্সি। বোকাচ্চো,পেত্রার্কা,এরিষ্টো, ম্যাকিয়াভেলি। বিজ্ঞান,প্রযুক্তি,স্থাপত্যবিদ্যর বিপ্লবাত্মক উন্নতির কথা?-সে তো লক্ষ পাতার বৃত্তান্ত --তা এখানেই থাক্ । আমরা আসি পেত্রার্কায়।
এই মহান কবি, মানব প্রেমিক লিখেছেন দুটি বই ---
1.Canzoniere(a collection of vernacular poems, about Laura, his Fiance').
2. Africa(an epic, concerning the second Punic War.
কবি তাঁর প্রেমিকা 'লরা' সম্পর্কে বলছেন :
"Laura, famous for her own virtues, and so long celebrated in my verses, was first seen by me in my early youth,in the year of our Lord 1327, on the sixth of April, in the church of St. Clare at Avignon, in the morning hour: and that light was taken from daylight in the same city,in the same month on  the same sixth day,in the same first  morning hour, but in the year 1348(after 21years) when l
Chanced to be in Verona, sadly unaware of my FATE ."
প্রেমিক পাঠক,  আবেগ-সিক্ত হৃদয়ে বাকিটুকু হৃদয়ঙ্গম করে নিয়েছেন এতক্ষণে--ব্যাখ্যা করার দরকার কি ?
বুকের পাঁজরে , তিন শ' ছেষট্টিটি হিরকখণ্ড দিয়ে লরার যে স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করেছেন কবি তার সম্পূর্ণটুকু দেখার জন্য যে জ্যোতির্ময় দৃষ্টি , নীলাকাশ -সন্নিভ চিত্তপট,
অতলান্ত আবেগ-সরোবর, যে বিশ্বপ্লাবী মহাভাব প্রয়োজন তার কতটুকু আছে এখন --এই জৈবযন্ত্রণাক্লিষ্ট , ভোগসর্বস্ব জীবনে !
মহাসমুদ্র পাড়ি দিয়ে বন্দরে পৌঁছাতে হলে দিকনির্দেশনার জন্য মানচিত্র অঙ্কন করা দরকার ছিল।হোল কিছুটা, অর্থাৎ নাতিদীর্ঘ একটি ভূমিকা । এবার কবিকুল- আরাধ্য কবি, আমাদের আলোচিত পেত্রার্কার একটি কবিতা--
ONE of his three hundred sixty six sonnets-
        Sonnet (Where the green leaves exclude...)

Where the green leaves exclude the summer beam,
And softly bend as balmy breezes blow,
And where,with liquid lapse,the lucid stream
Across the fretted rock is heard to flow,
Pensive I lay : when she whom Earth conceals,
As if still living ,to my eyes appears,
To say-- unhappy Petrarch,dry your tears.

Ah! Why sad lover! Thus before your time,
In grief and sadness should your life decay
And like a blighted flower, your manly prime
In vain and hopeless sorrow fade away?
Ah! yield not thus to culpable despair,
But rise thine to heaven - and think--
 l await thee there.
                  Translated into English by
                             Charlotte Smith .

                    ____পেত্রার্কীয় সনেট____
      সনেট (আজ কবরে রয়েছে প্রেয়সী আমার!)
 ‌‌‌‌‌                  
মন্দ বাতাসে তরুশাখাগুলি আনত রয়েছে যেখানে,
ঘনপল্লবে সূর্যের আলো উঁকি দেয় শুধু এখানে,
ক্ষীণধারা এক তটিনী চলেছে পাষাণের বুকে গেয়ে গান-
বিষাদমগ্ন আমার 'আমি'টা শুয়ে আছে হেথা মৃতপ্রাণ।
এ-ধরণী যারে লুকিয়ে রেখেছে সে প্রিয়া আমার অ-মরা-
হঠাৎ এখানে শুনি তার গান - যদিও রয়েছে অধরা ।
দেবদূতদের মায়া-মেঘ ছিঁড়ে আসে তার বাণী করুনার:
"নয়নের জল মুছে ফেল কবি কিবা প্রয়োজন কান্নার?

বন্ধু আমার,বিষন্ন কুসুম,খেদ ক্ষয় কেন জীবনে?
আছে পৌরুষ,প্রবল শৌর্য্য, আমারে রেখেছো স্মরণে।
আলোকোজ্জ্বল অ-মৃতধামে, নিরাশার নিরালোক নাই--
বিরহ-বিহীন,দুখ-নিশাহীন চিরমিলনের সুখ ঠাঁই ।
হে প্রিয়তম,মরণের পায়ে অর্ঘ্য দিও না নিজেরে --
আমি যে তোমারই, প্রতীক্ষায় আছি দাঁড়ায়ে স্বর্গ দুয়ারে।।
                       
                         বাংলা ভাষায় ভাবানুবাদ -
                              দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় ।
                                                      
                 পেত্রার্কার কবিতা প্রসঙ্গে।
            ..............................................
About Petrarch's legacy the poet J.D.Mc Clathy has said,
"True love---or rather the truest---is always obsessive and unrequited.No one has better dramatized how it scorches the heart and fires the imagination than Petrarch did centuries ago.
He dipped his pen in tears and wrote the poems
that has shaped our Sense of Love---its extremes of longing and loss ever since."
মুগ্ধ পাঠকের এতক্ষণে স্মরণের আলো- ছায়ায় ভেসে উঠেছে প্রেমরসসিক্ত বৈষ্ণব পদাবলী,
"রজকিনী প্রেম নিকষিত হেম কামগন্ধ নাহি তায়।"
--unrequited love.
বঙ্গভারতীর প্রিয়তম সন্তান, বিশ্ব-ভারতীর বরপুত্র ,হোমার-ভার্জিল,ব্যাস-বাল্মীকি-মিল্টন-বাইরন-শিষ্য,মধুকবি তাঁর চতুর্দশপদী কবিতার গুরু পেত্রার্কার বন্দনাগান গাইছেন,

                   শীর্ষনামহীন চতুর্দশপদী
            .............................................
          ইতালি, বিখ্যাত দেশ,কাব্যের কানন ।
          বহুবিধ পিক তথা গায় মধুস্বরে,
           সঙ্গীত সুধার রস করি বরিষণ,
           বসন্ত আমোদে মন পুরি' নিরন্তর;--
            সে দেশে জন্ম পূর্বে করিলা গ্রহন
             ফ্রাঞিস্কো পেতরাকা কবি;বাকদেবীর বলে
             বড়ই যসস্বী সাধু,কবিকুল ধন
             রসনা অমৃতে সিক্ত,স্বর্ণবীনা করে।

            কাব্যের খনিতে পেয়ে এই ক্ষুদ্র মণি,
             স্বমন্দিরে প্রদানিলা বাণীর চরণে 
             কবীন্দ্র: প‌্রসন্ন ভাবে গ্রহিলা জননী
            ( মনোনিত বর দিয়া) এ উপকরণে।
             ভারতে ভারতীপদ উপযুক্ত গণি,
            উপহার রূপে আমি আরোপি' রতনে।।

বাংলা ভাষায়, বাংলা সাহিত্যে অনাস্বাদিতপূর্ব "এই ক্ষুদ্র মণি" , মণিখণ্ডের মতোই দীপ্তোজ্বল । গঠন প্রকৃতিতে দৃঢ়বদ্ধ, রূপে কান্তশ্রী-সুন্দর , ভাবে গাঢ় --একমুখী। ছন্দ-অলঙ্কার ব্যাকরণসিদ্ধ ।
(২১.৯.'২১).

কাব্য বহুধা। আকারে-আকৃতিতে,রসে-রূপে-ভাবে বৈচিত্র্যময়। এমনকি গল্প, উপন্যাস,নাটক, কবিতা,গীত বা বাণীবদ্ধ সঙ্গীত,যন্ত্রসঙ্গীত--সমস্ত সৃষ্টি,   সাহিত্য ও শিল্পের 
সৃজন,  'কাব্য' এই অভিধায় অভিহিত করা যায়।শেক্ষপিয়ারের (Shakespeare),মার্লোর( Christopher Marlowe) নাটক,  বিঠোভেন   (Ladwig Van Beethoven),মোজার্ট (Wolfgang Amadeus Mozart),
সেবাস্টিয়ান (Johann Sebastian Bach),হাইডেন (Joseph Haydn)---এ সকল সঙ্গীত স্রষ্টাদের সুরমূর্ছণা
(Symphonic modulation), বিশ্বসাহিত্যের শ্রেষ্ঠ উপন্যাসগুলি,কোঁ ঠাসা (Guy De Maupassant),
রবীন্দ্রনাথের ছোট গল্পগুলি ---সবই তো কাব্য ।(একটি, দুটি উদাহরণ মাত্র)।

সাধারণ ধারণায় যে  'কাব্য',   তার দুটি ভাগ :
মহাকাব্য আর গীতিকাব্য । ব্যাস, বাল্মীকি,হোমার, ভার্জিল,তাসো (আদি মহাকবি), মিল্টন, মাইকেল মধুসূদন 
(পরবর্তী কালের মহাকবি?)। মহাকাব্য, মহাকবিদের এই উল্লেখ সাগর জলের তিলক মাত্র। ইঙ্গিত দিয়ে উদ্দিষ্ট প্রসঙ্গে ফেরার কৌশল।
মহাকাব্যের বহুধা, বহুবিধ, বিচিত্র চরিত্রের অরণ্যে মহাকবি স্বয়ং যান হারিয়ে।সেক্ষপিয়ারের মতো নাট্যকারের ক্ষেত্রেও
অবশ্য এ কথা বলা যায়।

গীতিকবিতার শব্দ-পদ-বাক্য কিন্তু কবির আপন অন্তরাত্মার অভিব্যক্তি। আর কবিতার কল্পমূর্তিগুলি তাঁর চিত্তমৃত্তিকা দিয়ে গড়া , প্রেমের স্বপ্নপ্রতিমারা ছায়াময়ী থেকে কায়াময়ী হয় কল্পনায়--
                     "অর্ধেক মানবী তুমি অর্ধেক কল্পনা।"

দান্তের বিয়াত্রিস(Beatrice), সেক্ষপিয়ারের(Shakespear)
কালো মেয়ে ( Dark lady, in some sonnets) ,  আমাদের আলোচিত কবি পেত্রার্কার লরা(Laura) - এরা সকলেই কবি মানসী।
 বিরহী প্রেমিক, দান্তে( তাঁর সৃষ্ট অধোলোক, শুদ্ধিলোক-- মানুষের মানসবৃত্তির দুর্গতির পরিণামে অবধারিত পাপযন্ত্রনা,পাপস্খালনের জন্য প্রায়শ্চিত্ত দেখে দেখে চলেছেন।   প্রেমান্ধ আবেগে , অপ্রাপ্তির যন্ত্রণা বুকে নিয়ে তার মানসীর অন্বেষণে তাঁর যাত্রা। পার্থিব জীবনের এই  তামসিক প্রেম কাব্যে সুগুপ্ত রেখেছেন কবি অনন্যসাধারণ আলঙ্কারিক (রূপকে) দক্ষতায়।স্বর্গ থেকে আলোকময়ী বিয়াত্রিস নেমেছেন। ভার্জিলকে নিযুক্ত করেছেন কবিকে তীর্থযাত্রায় সাহায্য করতে। অবশেষে, শুদ্ধিলোক(purgatorio) পেরিয়ে স্বর্গদ্বার ; সেখানে দাঁড়িয়ে তাঁর 'জীবন-মরণ বিহারী' বিয়াত্রিস --প্রেমালোকে শুদ্ধ , আলোকোজ্জ্বল প্রতিমা ।
"I lifted up mine eyes
And saw her, as she herself a crown
Reflecting from herself the Eternal Rays ."

এবার কবিকুলপতি পেত্রার্কা । তাঁর ১৫ নং কবিতার শেষ পঙক্তিদ্বয় :
"Ah! Yield not thus to culpable despair
But rise thine to heaven, and think
                              I await thee there ."
হে প্রিয়তম মরণের পায়ে অর্ঘ্য দিও না নিজেরে,
আমি যে তোমারই, প্রতীক্ষায় আছি দাঁড়ায়ে স্বর্গদুয়ারে।
                                 ( ভাবানুবাদ মৎকৃত)
ভাবে-রসে-ব্যাঞ্জনায় যেন এক --নির্দ্বন্দ্ব ।
                    
                 
Beatrice,    Dante's Fiance`(Divine comedy)

 কিন্তু না। উত্তরসূরী মহাকাব্যকার দান্তের মতো শুধুমাত্র একান্ত ধর্মবিশ্বাস ও ধর্মবোধ অনুসরণ করে' মহাপ্রস্থানের
পথে, পার্থিব অনুরাগের সবটুকু বিসর্জন দিয়ে নিষ্কলুষ প্রেমের আলোয় চিরকালের জন্য মুক্তি বা মোক্ষলাভ এমন
"বৈরাগ্য সাধনে" বিরহ-বেদনা থেকে সম্পূর্ণ অব্যাহতি-- পেত্রার্কার কাম্য ছিল না । তাই ,
"He dipped his pen in tears and wrote his poems." 

(Laura ) লরা তখন জীবিত,(During the life of Laura).
Sonnet no. XV
........................

Tears, bitter tears fall in a bitter rain,
And my heart trembles with a strorm of sighs
When on your beauty bend my burning eyes,
For whose sole sake the world seems flat and vain.
But ah, when I can see that smile again,
That chaste, sweet, delicate smile,then passion dies
Withered in its own flaming agonies
Gazing upon you, passion is lost and pain.
But all too soon my very soul is rocked
When you depart and with your passing dear
Pluck from my perilous heaven my stars,O Sweet!
Then at the last,by Love's own keys unlocked,
My soul from out my body leaping clear
On wings of meditation finds your feet.

Translated by Joseph Auslander Longmans, Green &Co.,New York, 1932. 

                     ___সনেট ১৫___
                চোখের আড়াল হলে তুমি   
                   ( লরা তখন জীবিত )

ওগো অপরূপা,নোনা জল ঝরে ঝরে পড়ে চোখ বেয়ে,
বুকে ওঠে ঝড়--অতৃপ্ত কামনার উষ্ণ দীর্ঘশ্বাস।
বড়ই ধূসর এই পৃথিবীটা এবং অর্থহীন মনে হয়।
কামনার জ্বালা মিটে না, মিটে না মনের আশ।
কিন্তু ওহো!  যেই শ্রীমুখের হাসি ফুটে সুন্দর-
অমল,বিমল, শান্ত---পবিত্র, মনোহর।
দুই চোখ ভরে' দেখি তা তখন আমি --
কামনা-বেদনা,দেহজ যন্ত্রনা হয়ে যায় দূর।

হঠাৎ যেই না, চোখের আড়ালে যাও তুমি সরে সরে
মনে হয় যেন আমার আকাশে সব তারা গেছে মরে।
বিপর্যয়ের সে ঘোর অন্ধকারে,হে প্রিয়তমা,
দেখায় মুক্তির আলো প্রেমের দেবতা,  তাই-
দেহপিঞ্জর ভেঙে উড়ে যাই আমি, কল্পনা-পাখনায়--
চরণে তোমার নিতে একান্ত আশ্রয়,পরম সান্ত্বনায়।।

(Bitter tears =তিক্ত নয়, লবনাক্ত অশ্রুধারা, ইংরেজি সাহিত্যে এমনি ব্যঞ্জনা)।
বাংলা ভাষায় ভাবানুবাদ :
              ---দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় ।

দেখার বিষয় হলো, পার্থিব জীবনের সংরাগ ধীরে ধীরে যেন
গাঢ় হয়ে আসছে। ধর্মান্ধ রক্ষণশীলতার রক্তচক্ষুর ভয় কাটিয়ে মানুষের মানসবৃত্তির অবরুদ্ধ ভাবগুলির প্রকাশ ঘটছে সাহিত্যে, শিল্পে   যা নবজাগরণের চরিত্রধর্ম । এই নবজাগ্রত চেতনার চরিত্র বৈশিষ্ঠের অন্যতম পুরোধা-- ফ্রান্সিসকো পেত্রার্কা ।
    ২৪/৯ /'২১ 

 ‌‌‌‌                            দ্বিতীয় পর্ব
          ................................................
কবি পেত্রার্কার আলোচনা প্রসঙ্গে কবি J.D McClatchy বলেছেন (এই কথিকাটির আরম্ভের কালেই উল্লেখ করা হয়েছে) যে তিনি,পেত্রার্কা "dipped his pen in tears and wrote the poems that shaped our Sense of Love---its extremes of longing and loss ever since."
 কথাগুলি সেই সময়কালে, ইউরোপীয় সাহিত্যের ক্ষেত্রে কিছুটা হলেও সত্য ,কিন্তু ভারতবর্ষের সাহিত্য সৃজনের পটভূমিতে এবং  বাংলার সাহিত্য সৃষ্টির ইতিহাসে এই Sense Of Love  একেবারে গোড়ার কথা।
ইউরোপ খণ্ডে যখন মধ্যযুগ বা মধ্যযুগের  অভ্যন্তরে অন্ধকারময় যুগ, বঙ্গদেশে--বৃহত্তর বঙ্গদেশ, পূর্বে আসাম দেশ থেকে পশ্চিমে মিথিলা, উত্তরে হিমালয় থেকে দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর --তখন কবি জয়দেবের গীতগোবিন্দ। 

                     "স্মরগরল খণ্ডনম্
                     মম শীরষী মণ্ডনম্
                    দেহি পদপল্লব মুদারম্।।"

বৈষ্ণব সাহিত্যের রসনির্ঝর ধারার সেই যে  শুরু তার যেন আর শেষ নাই । গুপ্ত, পাল ,সেন রাজাদের পর থেকে রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের রাজসভা(সভাকবি রায়গুণাকর ভারতচন্দ্র, রামপ্রসাদ)--এই বিপুল কালখণ্ড জুড়ে তৎসম, তদ্ভব ,অবহট্, মৈথিলী, বাংলা--ক্রমবিবর্তিত ভাষায় যত সাহিত্য রচিত হয়েছে ভাবের প্রকৃতিতে, রসের বৈচিত্রে তারা এতই বর্ণময় যে  রক্ষণশীলতার একমুখীনতা সেখানে কোথাও গ্রাহ্য তো হয়ই নি বরং কোথাও কোথাও কৌতুকের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে । শিব,কালী, কৃষ্ণ,বিষ্ণু দুর্গা (অন্নদা), দেবী দুর্গার ছেলে মেয়েরা --সকলেই মানবিক প্রবনতা ও প্রবৃত্তিগুলি সঙ্গে নিয়ে যেন মানুষের সমাজেরই অঙ্গীভূত।
ষড়রস বা বৈষ্ণব সাহিত্যের নবরসের অজস্রধার সুরধুনী- ধারায় সে সকল কাব্য-কবিতাগুলি পরিসিক্ত।
প্রেম, পূর্বরাগ, অনুরাগের ভাষা তো নিরামিষ,বেশিরভাগ 
ক্ষেত্রেই রচনাগুলি দগদগে শৃঙ্গার রসে সংরক্ত ।

ভিন দেশী সাহিত্যের আলোচনার মাঝখানে হঠাৎই বাংলার ঐতিহাসিক কালের সাহিত্য ও সাহিত্য- রসের পটঘট নিয়ে বসা কেন? 
কারণ হলো ওদেশে ধ্রুপদী সাহিত্য --(গ্রীক, হিব্রু, ল্যাটিন ভাষার সাহিত্য-সমৃদ্ধির যুগ-- খ্রী:পূ:সপ্তম-অষ্টম থেকে চতুর্থ- পঞ্চম খ্রীষ্টাব্দ), তার পরবর্তী যে হাজার বছর ইউরোপের মধ্যযুগীয় বন্ধ্যত্ব দশা, তখন , এই বাংলায় আমরা আমাদের সাহিত্যে সমস্ত মানবিক , জৈব-জীবনের অম্ল,মধুর, তিক্ত, কটু, কষা,রাগ-সংরাগগুলি প্রাণ ভরে' উপভোগ করে চলেছিলাম।
কিন্তু, একথা সত্য যে তার পরিসর ছিল অত্যন্ত সীমাবদ্ধ।
শিক্ষাহীনতা, শিক্ষাক্ষেত্রে নারী সমাজের অনধিকার, নির্মম কুসংস্কার, অন্ধবিশ্বাস, ধর্মান্ধতা, বাংলার বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে ক্লীবত্বের জড়তায় এমনই অসাড় করে রেখেছিল যে আমাদের সুদীর্ঘ চর্চিত সাহিত্য সাধনার যে উদার মানসিকতার  মানবিক প্রবনতা, সেটি সর্বত্রগামী হয়ে ওঠেনি ।
এই জড়তা থেকে মুক্তি পাওয়ার অবদমিত ইচ্ছাটি প্রবলভাবে দেখা গেল ইউরোপীয় জাতিগুলির এদেশে আসার পর থেকে। তাদের মধ্যে তখন ইউরোপীয় নবজাগরণের চেতনার উচ্ছ্বাস, বানিজ্য ও সাম্রাজ্য বিস্তার করার অদম্য লালসা, সঙ্গে সঙ্গে নিয়ন্ত্রিত দেশের সামাজিক, সাংস্কৃতিক রাজনৈতিক ,ধর্মীয় আন্দোলনে প্রভাব বিস্তার করা,  যা ত্বরান্বিত করেছিল বঙ্গসমাজের মানসিক বিকাশ ও বিবর্তন। সাহিত্যেও এসে গেল অতলান্তিক মহাসাগরের তরঙ্গবিক্ষোভ। মাইকেল মধুসূদন দত্তের মহা প্রতিভায় ভর দিয়ে এলেন হোমার,ভার্জিল, তাসো, মিল্টন--

         "... তুমিও আইস দেবী,
      তুমি ,মাধুকরী কল্পনা,কবির চিত্ত-
      ফুলবনমধু লয়ে' রচ' মধুচক্র
     গৌড়জন যাহে আনন্দে করিবে পান
        সুধা নিরবধি ।"

বিহারীলাল, রবীন্দ্রনাথের হাত ধরে এসে গেল ইংরেজ রোমান্টিক কবি আর বাঙলার বৈষ্ণব কবিদের সুললিত গীতিকবিতার সুরলহরী।
গল্প-উপন্যাসের কথা এখানে থাক্।

কাব্য-কবিতা-সঙ্গীত সৃষ্টিতে একা রবীন্দ্রনাথ বাংলা সাহিত্যের গঙ্গায় পদ্মায় নিয়ে এলেন শারদপূর্ণিমার ভরা কোটাল।
(---এ-কথা কিছু পরে )।


ক্রমশঃ ঊনবিংশ শতকের দ্বিতীয়পাদ।মুদ্রণ বা মুদ্রাযন্ত্রের প্রচলন, বিদ্যালয়-বিশ্ববিদ্যালয়ের পঠনপাঠন ব্যবস্থার বিবর্তন, থিয়েটার-নাটক-যাত্রাপালা, কীর্তন-কবিগান- রামলীলা-কৃষ্ণলীলা, রামায়ণ-মহাভারত-সংকলন ও প্রচার,ধর্মধারণায় ব্রাহ্ম ধর্মের অসাম্প্রদায়িকতা, শ্রীরামকৃষ্ণ দেবের "যত মত,তত পথ"-য়ের উদার মানবতাবাদী চিন্তা-চেতনার সর্বত্রগামী পরিব্যপ্তি -- বর্ণাশ্রম--বিভাজিত, সংস্কারাচ্ছন্ন বাঙলার 'তাসের ঘরে' কালবৈশাখীর ঝড় এনে দিয়েছিল।ভাঙা ঘরের বাইরে উন্মুক্ত আঙিনায় এসে ,  "আপন হতে বাহির হয়ে বাইরে" দাঁড়ালো বাঙলা। সাড়া পেল সে বিশ্বলোকের ।


পেত্রার্কার অবিস্মরণীয় ও ঐতিহাসিক সাহিত্য (সনেট) সৃজনের পূর্ববর্তী এবং সমকালীন ইউরোপের অতি সংক্ষিপ্ত ইতিবৃত্তান্ত বলার চেষ্টা করেছি যাতে সেই সময়ের সাহিত্যের অভিব্যক্তি বোধগম্যতার মধ্যে ধরা পড়ে। আবার আমাদের বাঙলার  সাহিত্য বিকাশের ক্রমবিবর্তনটিও সংক্ষিপ্ততম আকারে (সপ্ততীর্থের জল এক গণ্ডুষপ্রমান) উপস্থাপিত করে বলতে চেয়েছি .. কিভাবে বিশ্বসাহিত্যের সৌন্দর্য-সৌরভ বাংলা সাহিত্যকে শতদলের গরিমা দান করেছিল।

Blank verse বা অমিত্রাক্ষর ছন্দের প্রবর্তক মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত।, বাংলা ভাষায় এলো  দ্বিপদী, ত্রিপদী ইত্যাদি পয়ার ছন্দের তালে তালে অমিত্রাক্ষর ছন্দের সমুদ্র তরঙ্গের উচ্ছ্বসিত কলতান । মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত , তাঁর মূর্তিমান প্রেরণা মিল্টনের মতো যতিচিহ্নের যথেচ্ছ অথচ সুপরিকল্পিত ব্যবহার এবং  অন্তর্লীণ ছন্দের লয়-য়ের সাহায্য নিয়ে দেখিয়ে দিলেন কিভাবে সংস্কৃত মহাকাব্য-সমগোত্রীয় বীররসের সঞ্চার সম্ভব-- বাংলা ভাষার পেলব -কোমল দেহ- কাঠামোর বহিরঙ্গে শুধু নয় ,আবেগ -মথিত অন্তরঙ্গেও।
সঙ্গে সঙ্গে বিদেশী সাহিত্যের অনুসরণ, অনুকরণ ও অনুবাদের মাধ্যমে নতুন আঙ্গিক, নতুন ভাব-ভাবনা এবং বিষয়-বস্তুর সঙ্গে পরিচয় হলো বাংলাভাষার।
এলো অমিত্রাক্ষর ছন্দ(blank verse), এলো গাথা(ode), এলো চতুর্দশপদী কবিতা(sonnet).

(এই আলোচনা শুধু কাব্য ভাষা, কাব্য রচনার গণ্ডীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ)।

এই বার ‌। এইবার আমরা পেত্রার্কার অবিস্মরণীয় একটি sonnet- য়ের (ইংরেজি অনুবাদ) ‌স্বাদ নিয়ে Shakespearean sonnets-গুলি দেখবো।

                     Sonnet- Xll
           (During the life of Laura)
When Love his flaming image of her brow
Enthrones in perfect beautiy like a star,
As far as she outshines the rest,so far
I feel the blaze of passion surge and grow.
Yet still l bless the place, the hour when so
Supremely high,at light so singular
I dared to look."O heart, you blessed are
To gaze upon that pure, that golden glow,"
I murmur."She inspired the splendid thought
Which points to heaven and teaches honest eyes
All worldly lures and winnings to despise:
Through her that gentle grace of love is taught
Which by the straight path leads to Paradise,
And even here hope's holy crown is wrought."


               বাংলায় ভাবানুবাদ
               দুলাল বন্দোপাধ্যায়
   "সুন্দর হৃদিরঞ্জন তুমি নন্দনফুলহার"

সৌন্দর্যের আলোকোজ্জ্বল তারা যেন আছে কপোলে,
বিকিরিত তার রশ্মিছটায় ম্লান দেখি বাকী সকলে;
আবেগ আমার জ্বলে ওঠে--বক্ষে পাবোনা জানি ,
তবু এই ভূমি,এ-শুভ লগন ভাগ্য বলেই মানি।
 হৃদয় আমার, নিষ্কামনার দৃষ্টিতে দেখ এই পবিত্র বিভা,
ওই সুন্দর স্বর্গীয় প্রেম গোধূলি আলোর শোভা --
ও-প্রেমের শিখা পোড়ায় ভ্রান্ত দৃষ্টির  বিহ্বলতা ,
ও প্রেমের আলো ধুয়ে দেয় কালো বাসনার মলিনতা।
প্রিয়ার আমার প্রেমের কিরণ এমনি সান্ত্বনার ,
ছটায় যে তার ঘুচায় আমার সকল অহংকার ।
"পার্থিব যত লালসার আর বিজয়ীর বিজিগীষা,
ঘৃণা করে সব দূরে দাও ফেলে,পাবে স্বর্গের দিশা।
এই ধরাধামে আশা মহিয়সী, জীবনের মহারাণী,
তারও মুকুট 👑 গড়ে দেয় প্রেম, দেবলোক বিজয়িনী।।"

(নামকরণ, রবীন্দ্রসঙ্গীতের একটি বাক্যবন্ধ)

এখানে রবীন্দ্রনাথের 'কড়ি ও কোমল' কাব্যগ্রন্থ থেকে 'স্মৃতি' সনেটটি উদ্ধার করি :

ওই দেহ-পানে চেয়ে পড়ে মোর মনে
যেন কত শত পূর্ব-জনমের স্মৃতি।
সহস্র হারানো সুখ আছে ও নয়নে,
জন্ম-জন্মান্তরের যেন বসন্তের গীতি।
যেন গো আমারই তুমি আত্মবিস্মরণ,
অনন্ত কালের মোর সুখ দুঃখ শোক,
কত নব জগতের কুসুম কানন ,
কত নব আকাশের চাঁদের আলোক।
কত দিবসের তুমি বিরহের ব্যথা,🌻
কত রজনীর তুমি প্রণয়ের লাজ--
সেই হাসি সেই অশ্রু সেই-সব কথা
মধুর মূরতি ধরি দেখা দিল আজ।
তোমার মুখেতে চেয়ে তাই নিশিদিন
জীবন সুদূরে যেন হতেছে বিলীন।।

 গঠন শৈলীর দিক থেকে পাওয়া যাচ্ছে না কী পেত্রার্কীয় প্রভাব ? তবে এ তো প্রভাত রবির মেদুর, কুণ্ঠিত আলো বিচ্ছুরণ। পরে নৈবেদ্য, চৈতালীতে গিয়ে আমরা পাব রবীন্দ্রসৃষ্ট অনবদ্য সব চতুর্দশপদী ।
                           (ক্রমশঃ)
 .......................................................................
 এখানে একটি অন্যরকম লেখা লিখে আবার ধারাবাহিক
আলোচনাটি আরম্ভ করবো। দূর আকাশে চাঁদ উঠেছে। ওই দূরদেশে আমার প্রবাসিনী দিদিভাইয়ের হাসি চুরি করেছে সে। দিদিভাইয়ের চলচ্ছবি দেখে তেমনি মনে হোল আমার। তাই আজ লিখব সেই পরীরাণীর কথা।
................................................................................
                       কথাবলা পুতুল
                     ( একটি চতুর্দশপদী)
                           দুলাল বন্দোপাধ্যায়

এ কোন্ মাটিতে গড়া প্রবাসী পুতুল ?
দেখে তারে কবিমন আনন্দ- উতোল।
দেখা নয় শুধু , তার মধুমাখা স্বর ,
দিগন্তিকা বনানীর পাতার মর্মর।
 ছন্দে দোলায়িত ছবি নয়ন-লোভন,
সুরের মায়ায় মুগ্ধ স্নেহ‌-সিক্ত মন ।
ভিন্ন দেশ, ভিন্ন ভাষা, বিচিত্র জীবন--
ফুল পাখি প্রজাপতি,ভ্রমরগুঞ্জন ।

তার মাঝে চেনা মুখ, বাণী-সুর-গীতি,
প্রসন্ন প্রতিমা যেন অমরার  দূতি। 
বাংলার লাবন্য মাখা কোমল বালিকা-
ধরিত্রী-সরসী-নীরে কমল-কলিকা।
অমলিন কমলের বিমল সৌরভে-
সৌন্দর্যে,শোভায় থাকো অজেয় গৌরবে।
...........................................................

  English version of the above poem--
              A doll that sways
                            Dulal Bandyopadhyay.

A doll, a lively image --beauty embodied,
Whatever that be, sways in tune--
A poet cannot but be gay having such fortune.
She sings her songs and that resonance
Brings the murmur of the woods farthest.
Unknown to me the land in she lives
Unknown to me those flowers and elves.
Unheard the humming of those bumblebees,
Yet I think, there sings, our doll, the sweetest,
With a propitious , divine countenance,
All loveliness and with the voice softiest.
A lotus of our pool now in bloom in the lake,
Pray, wherever may that princess-flower be
Ever sacred, fragrant and radiant with beauty.
..,.............................................................................
................................................................................


                            🌻🌻
                           সূর্যমুখী
                                  দুলাল বন্দোপাধ্যায়

        সৃষ্টি-ঊষার ষষ্ঠীর দিনে 
             কন্যা বসুধা রাণী,
    স্রষ্টা পিতার পেয়েছিল বর
               আকাশে দৈব বাণী :
    "সূর্য সোহাগী হয়ে থাকো, মাগো,
                 চিরায়ুষ্মতী হও,
   'প্রাণের' আশিষ দিলাম তোমায়
                প্রাণের কথাটি কও।"
    সেই থেকে ধরা নবারুণ মুখ
              রোজ দেখে প্রত্যুষে,
   তার শরমের আভাটুকু নিয়ে
                    সূর্যমুখীরা হাসে।
   এসকল অতি  গোপন তত্ত্ব--
              প্রেমের লীলাও বটে।
   তোমরা জানো না,জানে শুধু কবি
               ফুলেরা গোপনে রটে'।
    অলি-কলি-আলো, কবি-প্রজাপতি
                 একসাথে বাস করে,
      মিথ্যা মায়ার জ্যোৎস্না ছড়ায়
               দুখের আঁধার  ঘরে ।
  _______________০____________         


 


            


                             

সোমবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২১

কামিনী রায়ের জীবন একটি কবিতা--অকৃত্রিম ।

কামিনী রায়ের জীবন একটি কবিতা, অকৃত্রিম 


রবীন্দ্রনাথের সমকালীন বাংলার এক মহিলা কবি সনাতন বাঙলার সাহিত্য ভূমিতে যে পুষ্পোদ্যান সৃষ্টি করে গিয়েছেন তার প্রতিটি ফুলের বর্ণ, সৌরভ, সৌন্দর্য অকৃত্রিম। ইনি কামিনী রায়। জন্ম ১৮৬৪সালে, মৃত্যু ১৯৩৩ সালে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম মহিলা স্নাতক। বিদ্যার বৈভব তাঁর মননশীলতার পরিধিকে, অতিকল্পনা এবং পণ্ডিতমন্যতাকে প্রশ্রয় দিতে পারেনি।
প্রথমে তাঁর কাব্য গ্রন্থগুলির (যেগুলির জনপ্রিয়তা একসময় তেমনিই ছিল, যেমন ছিল সেকালের অগ্রগন্য লেখকদের) নাম: 

---আলো ও ছায়া, পৌরাণিকী, দ্রোণ- ধৃষ্টদ্যুম্ন, অম্বা(নাট্যকাব্য), দীপ ও ধূপ, মাল্য ও নির্মাল্য, একলব্য প্রভৃতি। এছাড়াও সনেট, (অশোক সঙ্গীত, জীবন পথে) , অমিত্রাক্ষর ছন্দে রচিত কবিতা এবং নাটক অম্বা।  'গুঞ্জন' নামে শিশুদের জন্য কবিতা সঙ্কলন তাঁর একটি অভূতপূর্ব প্রয়াস। বালিকা শিক্ষার আদর্শ, ঠাকুরমার চিঠি অনন্যসাধারণ লেখাগুলি। 
বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ-য়ের সদস্য, সাহিত্য সম্মেলন-য়ের সহ-সভাপতির আসন অলংকৃত করেছেন। সাহিত্যে অবদানের জন্য কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের'জগত্তারিণী স্বর্ণপদক' লাভ করেছিলেন।
অবিচল সৃষ্টিশীলতা, অনলস জ্ঞানসাধনা, বিদ্যাদান এবং একই সঙ্গে অপাঙক্তেয় মানবজীবনের অঙ্গীভূত হয়ে, 'ওপাড়ায়' গিয়ে বলা, 
"আমি তোমাদেরই লোক।"

'নারী কল্যান'- এই কর্মব্রতে আত্মোৎসর্গ করেছিলেন।
নারী শ্রমিক তদন্ত কমিশনের সদস্য ছিলেন।
প্রগতিশীলা, নারীবাদী, সমাজমনষ্ক ইত্যাদি বিশেষণ তাঁর নামের আগে প্রযুক্ত হয়ে আসছে এতকাল। আদর্শ শিক্ষয়িত্রী, জনহিতব্রতী এবং সুচারু গৃহাঙ্গনা--এই সমস্ত চরিত্র বৈশিষ্ট্যগুলির অন্তরালে তাঁর কবিসত্বার যে অভিব্যক্তি সেখানে রয়েছে একটি অননুকরণীয় মৌলিকতা।
বাঙলার মহিলা কবিকুল যেমন গিরীন্দ‌্র মোহিনী দাসী,
প্রিয়ম্বদা দেবী, তমাল লতা বসু, রাধারাণী দেবী, মৈত্রেয়ী দেবী, রাবেয়া খাতুন, মৃণালিনী গুপ্তা,অনুরূপা দেবী, কুমারী তপতী রাণী, কুমারী চম্পা ঘোষ এবং আরো অনেক "না বলা বাণীর ঘন যামিনীর" অন্ধকারে থেকে যাওয়া 'গার্গী মৈত্রেয়ী'----- তাঁদেরও সম্যক, সার্থক মূল্যায়ন হয়নি।

এখানে সামান্য প্রসঙ্গাগান্তর হলেও বলি, Virginia Woolf (1882-1941)-য়ের জীবন যুদ্ধের কাহিনী স্মরণে আসে। ইংরেজি সাহিত্যের এই স্মরণীয় উপন্যাসিক বলেছেন,
" A woman must have money and a room of her own if she is to write fiction."
"Of her own" --এই কথাটির মধ্যে নিহিত রয়েছে নারীদের মর্মান্তিক পরাধীনতার অসহায়, অশ্রুত  দীর্ঘশ্বাস।
 Jane Austen-(1775-1817) -য়ের বিখ্যাত উপন্যাসগুলিতে, (যেমন Sense and Sensibility, Pride and prejudice, Emma) যে সামাজিক চিত্র ফুটে উঠেছে, সেখানেও নারী-পরাধীনতার সুষ্পষ্ট উচ্চারণ --
Dependence (What a humiliation!) of a woman on marriage in the persuit of social standing and economic security. 

ফিরে আসি কামিনী রায়ের কাছে। পারিবারিক প্রতিকূলতা, অর্থের অসচ্ছলতা তাঁর ছিল না, ছিল না পৃষ্টপোষকতার অভাব। পিতা চণ্ডীচরণ সেন, স্বামী কেদারনাথ রায় উভয়েই ছিলেন সমকালের বিদ্বান, ধনবান এবং বাংলার নবজাগরণের আলোকপ্রাপ্ত ব্যক্তিত্ব। কিন্তু কামিনী রায়ের দৃষ্টি ছিল আপন পরিবারের পরিমণ্ডলের বাইরে---সবার নীচে, সবার পিছে, সবহারাদের মাঝে। তাঁর কথায়, 
"সুখ, দুঃখ,ক্ষুধা, তৃষ্ণা, আশা, আকাঙ্ক্ষা, গভীর আনন্দ ও তীব্র বেদনা---এই সকল দিয়ে যে মানবজীবন, তাহার একটি জাগ্রত অস্তিত্ব আছে এবং তাহার একটি সফল প্রকাশের কবিতা আছে এবং থাকবে।" 

Virginia Woolfও ঠিক এমনই কথা বলেছেন তাঁর আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ 'Am I a snob'--র মধ্যে, তীক্ষ্ণ ব্যাঙ্গাত্মক ভাষায়। কিন্তু কামিনী রায়ের ভাষায় কী অপূর্ব কমনীয়তা, ধন-মান-গর্বী, বর্ণাভিমানী, আত্মম্ভরী 'উচ্চকোটি'র ভাগ্যবানদের কাছে তাঁর আর্ত নিবেদন,

"পতিত মানব তরে   নাহি কি গো এ সংসারে
     একটি ব্যথিত প্রাণ, দুটি অশ্রুধার।
পথে পড়ে অসহায়   পদে তারে দলে যায়--
      দুখানি স্নেহের কর নাহি বাড়াবার ?"

মানুষের মনুষ্যত্বের দরবারে সরাসরি আবেদন।দ্রোহ-দ্বন্দ্ব, অভিযোগ নেই, আছে বিনীত অনুরোধ, শুধু সুরটি অনুযোগের।

"আপনারে লয়ে বিব্রত রহিতে আসে নাই কেহ অবনি পরে
সকলের তরে সকলে আমরা প্রত্যেকে মোরা পরের তরে।"

কবি সার্বভৌম রবীন্দ্রনাথের সেই উত্তঙ্গ ভাবের সঙ্গীত স্মরণ করুন:
"আনন্দধারা বহিছে ভুবনে...।"
দ্বিতীয় অন্তরা--
"পান করে রবি শশী অঞ্জলী ভরিয়া,
সদা দীপ্ত রহে অক্ষয় জ্যোতি,
নিত্য পূর্ণ ধরা জীবনে কিরণে।।"
তারপর?
"বসিয়া আছো কেন আপন মনে,
স্বার্থ নিমগন কী কারণে , 
চারিদিকে দেখ চাহি হৃদয় পসারি'
ক্ষুদ্র দুঃখ সব তুচ্ছ মানি,
প্রেম ভরিয়া লহ শূণ্য জীবনে।।"
এই আভোগে (concluding lines of a verse/song) এসে সেই মহাভাব জৈবিক কামনায় 
তাড়িত মানুষের দুয়ারে দাঁড়িয়ে রইল কাতর আর্তি নিয়ে !
কেন এই anticlimax ?
উত্তর--মানবকল্যাণ।
তাঁর স্বদেশ পর্যায়ের সঙ্গীতে, নৈবেদ্য-য়ের কবিতায় প্রধান বিষয়বস্তু তো মানুষ।
"সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপর নাই।" 
             ‌       ‌                               --–----চণ্ডীদাস 

তাহলে কবি কামিনী রায়ের সীমাবদ্ধতা কোথায় ? ভাষার সাধারণত্ব ? প্রকাশ ভঙ্গিমার সারল্য ?  
এইতো তাঁর অভিনবত্ব,--সমাজের অপাঙক্তেয় মানবজীবনের কল্যাণ কামনার স্তোত্রপাঠ। 
এইখানেই কামিনী রায়ের কবিতার বিশেষত্ব,স্বাতন্ত্র্য। 

তাঁর সৃষ্টির বিভিন্ন এবং বিচিত্র গড়ন-গঠন-য়ের দিকে দৃষ্টি ফেরাতেই দেখা যায় চেনা শব্দের অভ্যন্তরে অচেনা, অজানা ধ্রুপদী বিশ্বসাহিত্যের ঝলক। শব্দের ঝঙ্কার তোলেন নি বলেই কি ? সংস্কৃত সাহিত্যের পরিব্যপ্ত পরিমন্ডলে তাঁর বিচরণ, তবুও কী অপার সংযম। তুলে নিয়েছিলেন মাটির ভাষা। এই 'মাটির ভাষা' 'মা-টির' ভাষায় রূপ দিয়ে যে কবিতাটি তিনি রচনা করেছেন সেটির তুলনা বিশ্বসাহিত্যে বিরল :
              
                      কত ভালবাসি
                 --------------------------    
জড়ায়ে মায়ের গলা শিশু কহে আসি
"মা, তোমারে কত ভালবাসি!"
"কত ভালবাস ধন?" জননী সুধায়।
"এ--ত।" বলি দুই হাত প্রসারি' দেখায়।
"তুমি মা আমারে ভালবাস কতখানি?"
মা বলেন, "মাপ তাঁর আমি নাহি জানি।"
"তবু কতখানি, বল।"
           "যতখানি ধরে, তোমার মায়ের বুকে।"
                      "নহে তার পরে?"
"তাঁর বাড়া ভালবাসা পারি না বাসিতে।"
"আমি পারি।" বলে শিশু হাসিতে হাসিতে ! 

শব্দচয়ন, কল্প-ছবি, ছন্দ, অনুচ্চারিত বাক্যালঙ্কার--
(এ--ত........প্রসারি' দেখায় ।)
মর্ত কায়ায় অমর্ত্য শৈশব-সারল্যের নিরাবরণ ছবি!
আবারো:  
"তুমি মা আমারে ভালবাস কতখানি?"
মা বলেন, "মাপ তার আমি নাহি জানি।"
মাতৃ হৃদয়ের স্নেহ-সুধাপূর্ণ, অপার্থিব রূপ মূর্তি লাভ করেছে। সত্যই তো, 

"সমুদ্রের পার আছে,তল আছে তার--
অতল, অপার মাতৃস্নেহ পারাবার।"

মাইকেল মধুসূদন দত্তের, তাঁর কাব্যশৈলীর ধারায় সিক্ত কবি হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের আশীর্বাদধন্যা এই কবি অমিত্রাক্ষর ছন্দে দীর্ঘ কবিতা রচনা করেছেন। 'সনেট' আঙ্গিকের আদি স্রষ্টা ইতালির পেত্রার্কার 'ভাব ও রূপ' অনুসরণ করে রচনা করেছেন শতাধিক সনেট। সে সকল সনেটের Octave (অষ্টক)ও sextet/sestet (ষটক) এতোই নিখুঁত যে মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের চতুর্দশপদীর কাঠামোর সঙ্গে হুবহু মিলে যায়। 

স্মরণীয় "সহযাত্রা" সনেটটি। 

 "গান শুনে তবে মোরে ভালোবেসেছিলে...।" 

বিশুদ্ধ ইতালিয় গঠন (form). Fourteen hendecasyllabic lines in purely Petrarchan style.
আর ভাবের দিক থেকে Renaissance love.
বাংলা ভাষায়, একজন নারীর কলমে যুগান্তকারী। সেই সময় কালের কাব্যিক বিপ্লব। 
সঙ্গে সঙ্গে সমকালীন প্রচলিত ছন্দ, অলঙ্কার তাঁর কবিতায় অপ্রতুল, এমন দৃষ্টান্তও নেই। প্রবহমান পয়ার, যতিপ্রান্তিক ত্রিপদী, চৌপদী, কলামাত্রিক এবং (রবীন্দ্রনাথের অনুসরণে) সমিল প্রবহমান পয়ার।

তবুও বেশিরভাগ সাহিত্য সমালোচক কামিনী কবির কবিতার বৈচিত্র্যময়তা স্বীকার করেন না। তাঁরা প্রমান করতে চান, যেহেতু তিনি পেশাগত জীবনে শিক্ষকতার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তাই তাঁর কাব্যভাব নীতিবোধ ও আদর্শকেন্দ্রিক। মূল্যায়নের এই অপূর্ণতার একমাত্র কারণ তাঁর সৃষ্টির সমগ্রতাকে অনুধাবন না করা ।

বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চতর শিক্ষা লাভ, (সংস্কৃত ভাষায় স্নাতক), শিক্ষকতা, অধ্যাপনা এবং ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় নিবিড় অধ্যয়নের মধ্য দিয়ে তিনি নিজের নারীসত্বাকে এমন একটি স্তরে উন্নীত করেছিলেন, যা একমাত্র বাঙলার নয়, সমগ্র দেশের নারী সমাজের কাছে ধ্রুবতারার মতো দিকদিশারী।
অন্তর-সত্বায় তিনি  Virginia Woolf, Jane Austen, Marie Corelli এবং নিত্যদিনের জীবনাচরণে একাধারে গৃহিণী, জননী, সমাজহিতৈষণার কর্মব্রতে নিবেদিত -প্রাণ।

তবুও আপন অন্তর্প্রকৃতি ও বহির্প্রকৃতির কাছে চুড়ান্ত  অসহায়ত্বই কী নারীত্বের বিজয়-গৌরব ? কেননা, নারীত্ব যে বহুমাত্রিক --- জায়া, জননী, ধাত্রী, 'ধরিত্রী'। আপনার অন্তরাত্মজ সৃষ্টির মুখে সুধার পাত্র তুলে ধরার ভার তারই উপর দিয়ে রেখেছেন তার ভাগ্যবিধাতা। তাই তাকে মা হতে হয়, স্বামী-সন্তান-আত্মীয়-পরিজন সমন্বিত সংসার-মন্দিরে নিত্যদিনের সেবার নৈবেদ্য-নির্মাল্য দান করতে হয়। তারপরও "আপন ভাগ্য জয় করিবার" সুদুর্গম, "ক্ষুরস্য ধারা দূরত্যয়া" পথে যে 'কামিনী' যাত্রা  করেছেন তিনি কী শুধুমাত্র 'নারীবাদী' লেখিকা, সমাজকর্মী ? সৃজনশীল সাহিত্য-সাধনায় আজীবন নিমগ্ন, মানব-কল্যাণ ব্রতে উৎসর্গিত প্রাণ, আবহমান বাংলার জননী কবির উদ্দেশে শতাব্দী-পারের এক অক্ষম কবি-সন্তানের শ্রদ্ধাঞ্জলী----

            স্মরণে আসে কবি কামিনী 
                    --দুলাল চন্দ্র  বন্দোপাধ্যায়

নয়নলোভন, হৃদয়হরণ, ভুলানো জীবন যাতনা
আকঁঁ নাই তুমি মেদুর এ ছবি--লেখনীর আলপনা।
মরমের কথা, নয় যদিও তা কল্পিত, মনোহর ; 
তবুও রয়েছে কাব্য কলার সত্য ও সুন্দর।
ব্রাত্য যে জন সমাজে রয়েছে শতেক যোজন দূরে,
যাদের কপালে শুধু ধিক্কার, বাঁচে না কেবলই মরে।
কাব্যে তাদের দিয়েছো আসন, পূজেছ বেদনা-ফুলে।
শরমের জ্বালা, মর্মবেদনা হৃদয়ে নিয়েছ তুলে।
অবগুণ্ঠিত পুর ললনার কুণ্ঠিত কথাকলি
বাংলার বাণী-মন্দিরে নব কুসুমের অঞ্জলী--
মা হওয়ার ব্যথা, শিশুদের গাথা, স্নেহ মায়া মমতার
অশ্রুসিক্ত বাণী যেন তারা অচল মৌনতার।
ছন্দে তোমার, ধ্বনিতে তোমার, কর্মে তোমার কবি--
অবলা প্রাণের না-বলা ভাষার মুখরিত চলছবি ।।

১২/৯/২০২১
ব্যাঙ্গালোরু

১।"সমুদ্রের পার আছে......মাতৃ স্নেহপারাবার।"
'ধাত্রী পান্না' কবিতা থেকে নেওয়া।
কবি --যদুগোপাল মুখোপাধ্যায় (?)।ন
২। চলছবি, (চলৎ+ছবি=চলচ্ছবি, এমনও লেখা যেতে পারে)
দুলাল বন্দোপাধ্যায়
১৫/৯/'২১









শুক্রবার, ১০ সেপ্টেম্বর, ২০২১

আমার বিয়াত্রিস্

"Divina Commedia" 
.                          ------Dante Aligheri . 

(বইটি যতবার পাঠ করেছি ততবারই আরও আরও  বিস্ময়ে, বিহ্বলতায় নীরব, নির্বাক হয়ে গিয়েছি। এই  কবিতাটি আমার সেই বিমুগ্ধ ভাব-বিহ্বলতার  ভাষামূর্তি।) ‌‌

আমার বিয়াত্রিস্ 
                      দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় 

তখন কৈশোর কাল, 
ঝলমল আলো নিয়ে এসেছিল শরৎ সকাল। 
তৃণকোণে ফুলদলে এসেছিল নেমে 
কিরণ হীরক কণা । সুরভিত প্রেমে 
বয়েছিল যে বাতাস, তার সে ছোঁওয়ায় 
চরাচর ভরেছিল মোহন মায়ায়। 
ভোরের দীঘির জলে ভরে' ঘটখানি, 
সেদিনের আমার আমিত্ব বিজয়িনী 
শতদলদল হাতে সযতনে তুলে 
একটি পদ্মের কুঁড়ি সাহসিকা ভুলে 
আমার পথের ধারে গিয়েছিল রেখে 
কি আশায়, কোন স্বপ্ন দেখে ? 

যা ছিল আমার সমস্ত তাকে দিয়ে 
মায়াভরা হাসিটুকু নিয়ে, 
মরু কান্তার মেরু পারাবার পারায়ে, 
জীবনের যত সুখ সান্ত্বনা হারায়ে 
হৃদয়ের স্বর্ণ সিংহাসনে 
প্রেমের আরতি যার, করেছি গোপনে, 
এতদিন নিশিদিন স্মরণে সাধনে, 
ঘুমে জাগরণে 
ছায়া ছায়া দেখি শুধু তাকে। 
"এসো, এসো", নিশিডাকে ডেকেছে আমাকে। 

আজ, দিনান্তের আসন্ন আঁধারে 
কামনার রশ্মি রেখা ডুবে যায় অস্তসিন্ধু পারে--- 
অকস্মাৎ মূর্ত মূর্তি তার 
সহাস্যে দাঁড়াল এসে খুলি স্বর্গদ্বার। 
পারিজাত মালা দেবী আজ যে সুদূর 
ধরার কমলকলি থাক সুমধুর। 

An endeavour to bring in a pinch of reflection from - Paradise (the Divine Comedy) 

দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
২৪/০৮/২০২২ 
কলকাতা। 

এ কী দশা গণেশের !


উমা উমেশ ষাঁড় পেয়েছে 
লক্ষ্মী পেল পেঁচা।
কেতো ছোঁড়া উড়ায় ময়ূরৌ
গণশাকে দাও খোঁচা ?
সরস্বতী শান্তমতি
হাঁসের ডানায় ভাসে ,
মা'য়ের সাথে নাই বা এলো
আসবে তো মাঘ মাসে ।

নাক-উঁচু যার ,বিশাল বপু
দাও তাঁকে কপ্টার –
"নেংটি ইদুর, দু-ঠ্যাঙ গাড়ি"
এ-সব কেমন  ব্যবহার ?
গণাটাকেও বলবো কি আর
CA পাশ্  টাশ্ করে–
Job একটা জুটেই যেতো
মমতাদি'কে  ধরে'।
লক্ষ্মী বোনের ভাঁড় ভরে' সে
ঘটা করে পূজা। 
এই বাঙলার ঘরে সে তো
দ্বিতীয় দশভূজা। 

দুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়
১০/৯/'২১
ব্যাঙ্গালোর ।

বৃহস্পতিবার, ৯ সেপ্টেম্বর, ২০২১

আধুনিক বাংলা কবিতা,বাঙলা কবিতার আধুনিকতা এবং ফরাসী কবি Charles Baudelaire .



আধুনিক বাংলা কবিতা, বাংলা কবিতার আধুনিকতা ও 
ফরাসি কবি চার্লস বোদলেয়ার। 
Charles Pierre Baudelaire (1821- 1867) 

বা পুরাতনী যা কিছু, তা নিত্য ব্যবহার্য সামগ্রী হোক বা বিমূর্ত ধ্যান ধারণাই হোক তার প্রতি  আমাদের হয় করুণা, নয় বিতৃষ্ণা থাকেই থাকে। থাকা  অস্বাভাবিক তো নয়ই, অনভিপ্রেতও নয়। বরং  অভিপ্রেত, অনেকাংশে গ্রহনীয়ও। বাঙলা আধুনিক কবিতার আমি বিরুদ্ধ সমালোচক  
নই। আধুনিক সভ্যতার চলমানতা যেমন বহুমাত্রিক, জটিল এবং সকলের কাছে সহজবোধ্য নয়,  (যন্ত্রগণকের ভাষা--- একটি উদাহরণ) ঠিক তেমনি  আধুনিক সাহিত্যের পরিভাষাও অনেক সময় অনেকের  কাছেই দুর্বোধ্য ঠেকে। এই 'অনেকের' মধ্যে আমি একজন। এই ---আজকের যে 'আধুনিকতা', বাঙলা  সাহিত্যে, বিশেষ করে কবিতায় তারও জন্মকাল আছে,  তারও জন্মদাতা বা স্রষ্টারা আছেন। তাঁদের দু-এক  জনের কথা বলা যাক্। তাঁরা কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী কালের কিংবা চন্দ্রাভিযান, গ্রহান্তর যাত্রার পরেকার, দ্বাবিংশ ত্রোয়োবিংশ শতকের কবি নন ; তাঁরা  ফরাসী বিপ্লবের সামান্য কয়েক বছর পরের উনবিংশ শতকের কাব্য রচয়িতা। যেমনঃ 


Charles Baudelaire, বিশ্বের মহান কবিদের একজন, জন্মগ্রহন করেন ১৮২১ খৃষ্টাব্দে, প্যারিসে। 
মৃত্যু ১৮৬৭ খৃষ্টাব্দে,ঐ প্যারিস শহরেই। 
তাঁর চাইতে ২১ বছরের  ছোট ছিলেন Stephane  Mallarme (১৮৪২--১৮৯৮ )।এই দুজনের নাম এক  সঙ্গে উচ্চারিত হয়, কারণ, যখন কবিতায় আধুনিকতার  কথা উঠে তখন এঁরা অপরিহার্য। যেমন ছোট গল্পের  প্রসঙ্গে Guy de Maupassant (১৮৫০-১৮৯৩)। 

এবার ভাবতে হবে ঊনবিংশ শতকের মাঝামাঝি বা  সামান্য আগে-পরে যে কবিদের লেখনী সৃষ্টি করেছিল  অসামান্য সব কাব্য-কবিতা সেগুলি আধুনিক ! তাঁদের  সৃষ্টির চমৎকারিত্ব একবিংশ শতকের, তার পরবর্তী  কালের বঙ্গ কবিদের -ও প্রভাবিত করে ? করে বৈকি।  না  করলে এই বাঙলাদেশটার, রবীন্দ্রনাথের সমকালও পরের কালের ঝাঁকে ঝাঁকে কবি প্রাণপণ চেষ্টা করে গেছেন, প্রাণপাত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন রাবীন্দ্রিক প্রভাবমুক্ত কবিতা রচনা করার প্রয়াসে। 

এবার দেখা যাক, কেমন এই ফরাসী কবিদের, বিশেষ  করে আজকের আলোচিত Baudelaire- য়ের কবিতা : 
তাঁর (ইংরেজিতে ভাষান্তরিত The Flowers Of Evils থেকে) একটি অসাধারণ সৃষ্টি--- 
 
            The Joyous Defunct 
...................................................

Where snails abound---in a juicy soil, 
I will dig for myself a fathomless grave, 
Where at leisure mine ancient bones I can coil 
And sleep--quite forgotten--like a shark 'neath  the wave. 

I hate every tomb--I abominate wills, 
And rather than tears from the world to  implore, 
I would ask of the crows with their vampire bills 
To devour every bit of my carcass impure. 

Oh worms, without eyes, without ears, black friends! 
To you a defunct-one, rejoicing, descends, 
Enlivened Philosophers--offspring of Dung ! 

Without any qualm, o'ver my wreckage spread, 
And tell if some torment there still can be wrung 
For this soul-less old frame that is dead 'mdst 
the dead ! 

                  Translated into English verse 
                                     By
                             Cyril Scott
...............…..................................................
বাঙলা অনুবাদ
অনুবাদক-- দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় 

          কবরে উল্লাস
_______________________

শামুক যেখানে গাদা গাদা, আর গদগদে কাদা, 
সেখানে খুঁড়বো আমি সপ্তনরকের গাঁড়া-- 
আমারই কবর। আহা, কী আরাম ! 
পুরাণো হাড়ের অনড় কুণ্ডলী, বিস্মৃত-অস্তিত্ব আমি, 
মাটি-চাপা মমি ; 
কিম্বা সাগরের তলে ঢোকা হাঙরের কঙ্কালের পারা। 

স্মৃতিসৌধ ? ঘেন্না করি... ঘেন্না করি আমি। 
মরণত্তর ইচ্ছাপত্র ? শুনলে আসে বমি। 
জগৎ-সংসার থেকে চেয়ে কিছু,-- কাঁদা ? 
তার চেয়ে ভালো ওই বয়স্য বায়সদের সাধা -- 
তারা রক্তচোষা ঠোঁট দিয়ে ছিঁড়ে ছিঁড়ে, 
গিলে গিলে খাবে গব্ গব্ 
আমার এই সত্বহারা, অপবিত্র শব। 

চোখ নাই, কান নাই-- 
চির-অন্ধকারে-থাকা, হে আমার কীট ক্রিমি ভাই, 
তোমাদের কাছে এই মড়া-- 
তোমাদের নব্য-দর্শনে পড়ে ধরা-- 
স্বর্গ থেকে ছুঁড়ে ফেলা পশুত্বের বিষ্ঠার সন্তান। 

সাম্রাজ্য বিস্তার কর্ এই মরা ধড়ের উপর 
নির্ভয়ে, নির্দ্বিধায়, বন্ধুরা আমার। 
শুধু একবার নিঙড়ে, ঝেড়ে দে-- 
ভিজা, ছেঁড়া কোটটার মতো, 
আত্মা-আমিত্ব-হীন দেহটাকে, 
রয়েছে যে পড়ে স্তুপাকার মৃতদের মাঝে, 
এবং বলে দিস্ মড়াটাকে 
এখনও সামান্য কিছু থাকতে পারে কি না 
কোন কান্না বিগত দিনের, 
কোন ক্ষতি, ক্ষয়, হাহাকার, ক্ষতের যন্ত্রনা ! 

                         (বায়স=কাক, crow)

ফরাসী ভাষা, চসারের সময়কাল থেকে ইংরেজি ভাষা, দান্তের সময়কালের ইতালি ভাষার মতোই আমাদের বাঙলা ভাষাও বৈষ্ণব পদাবলীর রচনাকাল থেকেই  সমস্ত রকম ভাবের, রসের, সংবেদনশীলতার পরিবাহী, নমনীয়, কমনীয় এবং ধ্বনি-অলঙ্কার সমৃদ্ধ শব্দসম্ভারে পরিপূর্ণ। 
বঙ্গভারতী সৌন্দর্যে, লাবন্যে রাজরাজেশ্বরী-- 

"হে বঙ্গ, ভাণ্ডারে তব বিবিধ রতন...।" 
তাই, বাঙলা ভাষান্তরে এই সত্যটি প্রতিষ্ঠা পেয়েছে যে  নিরীশ্বরবাদী, যুদ্ধ-দাঙ্গা, অবিশ্বাস-দ্বন্দ্ব বিধ্বস্ত বিংশ  শতকের বঙ্গকবিরাও --বুদ্ধদেব বসু থেকে  শঙ্খ ঘোষ--Baudelaire  দ্বারা প্রভাবিত। (Mallarme-র  আলোচনা পরবর্তী পর্বে )। তা সত্ত্বেও সনাতন  ভারতবর্ষের বেদ-উপনিষদীয় আনন্দবাদের মূর্ত বিগ্রহ রবীন্দ্রনাথের জ্যোতির্বলয়ের দিগন্তরেখা তাঁরা অতিক্রম  করতে পারেন নি। সেই জন্য বুদ্ধদেব বসুকে বলতে হয়, 

"রবীন্দ্রনাথ আমাদের কাছে দুর্বহ ভার।" 
কবি শঙ্খ ঘোষ মহাশয়ের আরো বড় পরিচয় তিনি  মহান রবীন্দ্র-গবেষকদের অন্যতম। 
এখন নূতন প্রজন্মের কবিদের সৃষ্টি বিস্ময়কর ভাবে  বৈচিত্র্যময়, তবুও আমার নিবেদন তাঁরা যেন (যদি কেউ  না পড়ে থাকেন) আবু সৈয়দ আইয়ুব মহাশয়ের  'আধুনিকতা ও রবীন্দ্রনাথ' গ্রন্থটি পাঠ করেন। 
 Baudelaire-য়ের জীবনের উচ্ছৃঙ্খল, তামসিক  দিকটির গভীর গহ্বরে নিহিত আছে তাঁর কাব্য সাধনার  যজ্ঞকুণ্ড। সেই অগ্নিদহনের জ্বালায় আর্ত যে কবিসত্বা  তারই  অভিব্যক্তি আছে তাঁর সৃষ্টিতে। বাঙলা ও  বাঙালির কোমল, আবেগ-আর্দ্র অন্তর্জগতে তা যে  দুর্বিসহ, অকল্পনীয় এবং অসহনীয়ও। 

তবু সমর সেন, জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী, সুধীন দত্ত, বিষ্ণু দে, জয় গোস্বামী, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, নীরেন্দ্র নাথ চক্রবর্তী, শামসুর রহমানদের মত বাঙলার আধুনিক কবি যাঁরা‌ তাঁদের কবিতার বিষয়, ভাব ও ভাষা উচ্ছ্বসিত ও উচ্ছল নান্দনিকতা থেকে মুক্ত। শঙ্খ ঘোষ মহাশয়ের শেষের দিকের কবিতাগুলি সমকালিক রাজনীতি, রাষ্ট্রনীতি ও সামাজনীতির তির্যক সমালোচনায় নিরলঙ্কার। মূল্যবোধের অবক্ষয়ের দিকটিও উলঙ্গভাবে প্রকাশিত তাঁর ন্যারেটিভ কবিতাগুলিতে। এই সকল কবিতাগুলি কেমন যেন তেল নুন কাঁচালঙ্কা ছাড়া মুড়ি চেবানোর মত। যুবকদের জন্য ঠিক আছে কিন্তু আমাদের, বুড়ো বাঙালিদের মুখে বড়ই বিস্বাদ লাগে। 
নান্দনিকতা ছাড়া, রসাবেশঋদ্ধ অলঙ্কার ছাড়া বাংলা কবিতা মূলছেঁড়া ফুলগাছ। আবার ঊনবিংশ শতকে বোদলেয়ার সাহেব যে আধুনিক কবিতা লিখে গিয়েছেন, একবিংশ শতকেও তেমন কবিতা লিখবার হিম্মত বঙ্গ কবিকুল দেখাতে পারেননি, পারবেনও না -- এ কথা আমি হলপ করে বলতে পারি। বোদলেয়ার-য়ের 'A Carcass' কবিতাটির দুটি স্তবক, উদাহরণ স্বরূপ তুলে ধরছি : 

A Carcass 

"Remember my love, the object we saw 
That beautiful morning in June: 
By a bend in the path a carcass reclined 
On a bed sown with pebbles and stone ; 

Her legs were spread out like a lecherous whore, 
Sweating out poisonous fumes, 
who opened in slick invitational style 
Her stinking and festering womb. ..." 

কোন বঙ্গকবির লেখনী কী এতখানি উলঙ্গ বাস্তবতাকে নিরাবরণ ভাষায় কাব্য সুষমা দিতে সক্ষম হবে ? 
এই কবিতার বাংলা অনুবাদ পরে আমার ব্লগ (blog)-য়ে  দেওয়া হবে। 

(বোদলেয়ারের কবিতাগুলি মূল ফরাসী ভাষা থেকে ভাষান্তরিত। ফরাসী ভাষা অনেকের কাছেই অজানা, তাই ইংরেজি অনুবাদটি দেওয়া হোল। বাংলায় ভাবানুবাদ মৎকৃত)। 
(পরিমার্জিত ও পুনঃপ্রকাশিত।) 

দুলাল বন্দোপাধ্যায়
০১-১০-২০২৪
ব্যাঙ্গালোর ।

সোমবার, ৬ সেপ্টেম্বর, ২০২১

শিক্ষক দিবস


"তুই ফেলে এসেছিস কারে"  


(জীবনের ঊষা লগ্নে বাগ্দেবীরূপে যাঁর আশীর্বাদ আমরা লাভ করি তিনি জন্মদাত্রী। তারপর শিক্ষকরূপে জন্মদাতা, প্রথম শিক্ষাগুরু। জগৎ সংসারের সকল জনক জননীর প্রতি আমার অবনত চিত্তের প্রণতি।) 



ঠিক ছয় দশক আগের সেই দিন। এমনি শেষ বর্ষার  মাস। মাসের নাম জানতাম না তখন। 

 বর্ষার পুরোপুরি যায়নি তখনও। সেদিন ঘন বাদল। দমকা হাওয়া। মাঝে মাঝে বৃষ্টি কমছে, আবার  ঝরছে অঝোরে। মেঘও ডাকছে ঘন ঘন। অজয় নদে উথালি পাথালি বান। ঝিমঝিম বৃষ্টি মাথায় নিয়ে আমি দুপুর থেকেই অজয়ের পাড়ে। ভয়ঙ্কর স্রোত ভেঙে, ঢেওয়ের সঙ্গে যুদ্ধ করে, পাল ছেঁড়া নৌকা এপার ওপার পাড়ি দিয়ে  চলেছে ঘন ঘন। আমার দৃষ্টি ওই নৌকার উপর। ওই বুঝি বাবা ওপারে দাঁড়িয়ে। এই, এবার, হ্যাঁ তো বাবাই উঠেছে। 'অজয় ঠাকুর', তুমি বড় বড় ঢেও তুলো না। আমার বাবা আমার মত সাঁতার জানে না। ওই যে নৌকা এপারে এল। বাবা নেমে আসছে। 

মেঘ-বাদলের অন্ধকারে, জলকণায় ঝাপসা চোখের  কষ্টের দৃষ্টি দিয়ে চেয়ে চেয়ে, অসহ্য অপেক্ষার পর বাবাকে পেলাম। ছাতায়-ঢাকা মুখ দাঁড়িয়ে আছে আমার মুখের  সামনে। 

--কেন বাবা, ভিজে ভিজে, এতো দূরে এসে, নদী-পাড়ে.... এমন বর্ষা, বাজ- বিদ্যুৎ ! 
 বলে চলেছেন বাবা আর তাঁর ধুতির অর্ধেকটা খুলে আমার মাথা, গা মুছে দিচ্ছেন। 

তারপর?
তারপর সারা পথ নিজে ভিজে, আমার মাথায় ছাতা  ধরে, বাবা হাঁটতে লাগলেন। নিজে ভিজছেন, খেয়াল  নেই। থলি থেকে বার করছেন লেবুর কোয়ার মত  লজেঞ্জুস, পাকা কলা। আমার মুখে পুরে দিতে দিতে  বলছেন,
--এবার তোমাকে পড়াশোনা করতে হবে যে, বাবা। 
ঘরে চল, দেখবে, তোমার জন্য কতো বই এনেছি, শ্লেট,  পেন্সিল। 

আমার এতক্ষণের খাবারগুলি সব যেন বিস্বাদ হয়ে  গেল। তাহলে কি আমারও দশা অমনি হবে, ওই পশ্চিম  পাড়ার রায়জেঠুর ছেলে সতনার মত। সকাল বেলায় তার মাস্টার আসে, তারপর সে পাঠশালায় যায়। সন্ধ্যা  বেলাতেও আরেক মাস্টার। খেলতেও আসে কম। সব  চাইতে খারাপ, মাছ ধরতে যায় না মোটেও। 

ঘরে ঢুকলাম।

বাবা এসেছে। বড়দিদি, ছোট ভাই সবার কী আনন্দ।  ঘরে কতো ভালো ভালো খাবার। আমার কিচ্ছু ভালো  লাগছে না। বাবার কাছে যেতে ভয় লাগছে আমার।  আমি বাগানের ভিতরে ঢুকে পড়লাম। পেয়ারাও  পাড়লাম। কিন্তু না, খাবার ইচ্ছাই নাই। সামনের মাঠটায় মনা, ধনা, জগা, শ্যামলা ডাং-গুলি  নিয়ে এসেছে।  ওখানে যাই .....না, থাক্। 

শা‌ঁখের আওয়াজ। সন্ধ্যা হয়ে এলো। সঙ্গে সঙ্গে দিদির  ডাক ,
--- সুবল, ঘরে আয়। 

গলা শুকিয়ে গেলো, পা-দুটো অবশ লাগছে। কি করি,  অন্য দিন হলে কাকুর ঘরে ঢুকে পড়তাম। মুড়ি খেতাম কাকিমার মার কাছে। কিন্তু আজ তো বাবা রয়েছে ঘরে। 
ঘরেই গেলাম। 

গিয়ে দেখি,-- হ্যারিকেন জ্বালানো, চটের বস্তা পাতা,  বাবা বসে, সামনে.....।
-- খোকা আয়, বোস এখানে । 
প্রথম ভাগ, ধারাপাত, একটি অন্য রকম বই। বড় শ্লেট,  লম্বা চক পেন্সিল। দিদি ঝুঁকে পড়ে দেখছে, ছোট ভাই হাতে নিতে চাইছে। আমি বসতেই বাবা বললেন, 
-- মা সরস্বতী। প্রণাম করে আরম্ভ কর। 
বাবা-ই মন্ত্র বলে গেলেন, আমি ঠোঁট দুটো নাড়ালাম। 

"শ্বেতপদ্মাসনা দেবী, শ্বেতপুষ্পে শোভিতা। 
শ্বেতবীণাধরা দেবী শ্বেতালঙ্কারভূষিতা।। 
সরস্বতৈঃ মহাভাগে বিদ্যে কমললোচনে। 
বিশ্বরূপে বিশালাক্ষী বিদ্যাং দেহি নমস্তুতে।" 

এরপর বইগুলি খুলে খুলে দেখাতে লাগলেন। এমনি করে পড়তে হবে। বার বার লিখতে হবে... 

রাত্রি হলো। মায়ের ডাক,
  --  এসো সবাই, খেয়ে নাও। 
বাবা বললেন, 
-- কাল থেকে ভোরবেলা উঠবে, পড়বে। শুধু খেলাধুলা করে সময় নষ্ট করবে না। সামনের মাসে এসে তোমাকে রতন মাস্টারের পাঠশালায় ভর্তি করবো । 

  সেই একটা মাস আমার জীবনের পরম দুঃখের সময়। 
এমনও মনে হোত, বাবা যেন কোন দিনও না আসে।  (আজ একথা মনের হতেই চোখ ভেঙে জল আসছে) আর এলেও লজেঞ্জুস, বিস্কুটগুলো দিয়েই যেন চলে  যায়। 
ঠিকই, পরের মাসে বাবা আসতে পারেন নি। মালিকের আদেশে কোথায়ও যেন কাজে গেছে। সে যে কী মুক্তি আমার। আবার নূতন উদ্যমে খেলা শুরু। মাছ ধরার ছিপ তৈরী। বই, শ্লেট বস্তায় জড়ানো, উঠেই রইল কুলুঙ্গিতে। 

বাবা তিন মাস পরে ঘরে এলেন। কাজের জন্য দূরে দূরে  নাকি যেতে হয়েছিল। এসেই আমার পড়ার খবর নিলেন। 

কিছুক্ষণের জন্য চুপ। বসে রইলেন। সারা ঘরে ভয়।
 থম্ -থমে পরিবেশ ! 
হঠাৎ উঠে দাঁড়ালেন। দীর্ঘশ্বাস ফেলে। কুলঙ্গিতে রাখা,  আমার বই-শ্লেট জড়ানো চটের আসন ছুঁড়ে ফেলে দিলেন উঠানে। 
--দোষ আমার ! দোষ আমার দরিদ্রতা ! প্রবাস আমার ললাট-লিখন। মূর্খতা ছেলের ভবিতব্য ! বলছেন, আর নিজের কপালে থাপ্পড় মারছেন বারবার। সারা বাড়ি নিস্তব্ধ, নিথর ! 


পেরিয়ে গিয়েছে বছর ! না না, যুগ ! 
কিছুতেই ভুলতে পারি না, সে দৃশ্য, বাবার সেদিনের ওই  আর্তনাদ। 

বেঁচে আছি। সংসার, সম্পদ, আত্মতুষ্টি, অহঙ্কার নিয়ে বেঁচে আছি ...না না না ! জীবন বয়ে চলেছি এতকাল ! 
জ্ঞানহীন, বিদ্যাহীন, বিবেক-বিবেচনাহীন জৈবিক দিন  যাপনের গ্লানি নিয়ে কোন্ পরিণামের প্রতীক্ষা ? এই কি জীবন ! নিশাচরদের সঙ্গে এর পার্থক্য কোথায় ? 

গ্রন্থ, গ্রন্থাগার, বিদ্যালয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে পরিব্যপ্ত রয়েছে যে জ্যোতির্ময় জগৎ, পল্লী প্রান্তের জীর্ণ মাটির ঘরে তার প্রদীপ শিখাটি প্রথম জ্বালিয়ে দিতে চেয়েছিলেন বাবা, আমার জীবনের উপেক্ষিত শিক্ষক।  সেখান থেকে, তাঁর ধুতির স্পর্শ থেকে দূরে, বহুদূরে, অজ্ঞান-তিমিরের অন্ধকূপে আপনাকে আবদ্ধ রেখে  অর্থসর্বস্ব, পরমার্থ-শূণ্য জীবনের নিরর্থকতার উপলব্ধি আজ ? এতোদিন পরে ?
হে স্রষ্টা, হে পিতা ! 
-- আমার জীবনে শিক্ষক দিবস অনুতাপের অশ্রুজলে ভিজে গেছে বাবা, দেখ। 
-- আরেকটি বার মুছে দিতে আসবে না, বাবা ? 

সুদূরের সেই ফেলে আসা স্মৃতি আজও যেন জীবন্ত ; কিন্তু তার বেদনার ভার দুর্বিসহ। সেই পিতৃহৃদয়ের স্নেহবিগলিত রসধারা, সেই বর্ষণ-স্ফীত অজয়ের উচ্ছ্বাস, খেয়াঘাট, রূপন মাঝী (রায়), কাশ- ঝোপে- ভরা নদীর পাড় ; সেই বাদল-ঝরা সান্ধ্য-অন্ধকার, কাঁচ-ভাঙা লণ্ঠনের মৃদু আলো, বিদ্যাসাগরের প্রথম ভাগ, অবাক চাহনি, দুঃখী বাবা, দুঃখিনী মায়ের শাসনের সোহাগের  করস্পর্শ... আজ দিগন্তের ওপারে বিলীন । 

বুকভাঙা হাহাকার !
----- বাবা, তুমি এসো, আমি পড়বো। 

একটি বিশ্বগ্রাসী ''না"-মেঘের ''হাঁ-মুখ'' জমাট কালো রাহুর মতো, অস্তগামী সূর্যের শেষ আলোর লেখাটুকুও গিলে খেয়ে অন্ধকারে ঢেকে দিল আমার জগৎ। বৃষ্টি নামলো অঝোর ধারায়। 

                    (গল্পটি পুনঃপ্রচারিত)

দুলাল বন্দোপাধ্যায়
৫/৯/'২১
ব্যাঙ্গালোর 
 


এসেছে শরৎ

এসেছে শরৎ
........…...........

আমার নাতী ও‌ নাতনীদের উদ্দেশে।


শ্রান্ত শ্রাবণ- অন্তে ভাদ্র এসেছে ভদ্র সাজে ,
সারা দিনমান ধারা বর্ষণ ক্ষান্ত হয়েছে লাজে ,
শরৎ-প্রভাতে কোমল আলোর সুরে তানে  বিহ্বল –
ভরা- দিঘী জলে ঘুম-ভাঙা ছলে 
চোখ খোলে শতদল ।
অজয় নদীর দুই পাড়ে ‌ হাসে 
গুচ্ছ গুচ্ছ কাশ,
কৃষ্ণবর্ণা মেঘ বালিকারা
পরেছে শুভ্র বাস ।
সুনীল আকাশে বলাকার মালা
পাখায় আলোর গান,
শ্যামলাঞ্চলা ধরণীর বুকে
উৎসব ‌কলতান ।

আজ থাকো সুখে , ভুলে যাও গত
কূলভাঙা মহা  -বন্যা –
পদ্মে শালুকে গাঁথুক মালিকা
রূপসী শরৎ-কণ্যা ।

দুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়
৩/৯/'২১
কলকাতা ।

বৃহস্পতিবার, ২ সেপ্টেম্বর, ২০২১

বই

বই

দুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়

বই,পুস্তক, গ্রন্থ   –  নাম শুনলেই শিক্ষিত অশিক্ষিত নির্বিশেষে সকলের মনে গভীর এক শ্রদ্ধা ও ঔৎসুক্য জেগে ওঠে । পুঁথি বলতেই সোঁদা-গন্ধ-মাখা , পূরাতন বই , কাগজে, তালপাতায় লেখা পাণ্ডুলিপির কল্পচিত্র  চোখের উপর ভাসে । মুদ্রণযন্ত্র আবিস্কারের আগে হস্তলিখিত পুঁথিসাহিত্যই ছিল বিশ্বের সমস্ত দেশের জ্ঞানভান্ডার , সাহিত্যিক ও সাহিত্য পিপাসুদের অবলম্বন । সেই সকল গ্রন্থের রক্ষণাবেক্ষণ হতো নানাবিধ উপায়ে ।
কিন্তু মুদ্রিত গ্রন্থের আগমনে গ্রন্থাগার, গ্রন্থ সংরক্ষণ, গ্রন্থ- সজ্জার রীতি শিল্পের পর্যায়ে উন্নিত হোলো । গ্রন্থপ্রেম একটি আভিজাত্যপূর্ণ আবেগে পরিণত
হয়েছিল । ব্যক্তিগত গ্রন্থাগারগুলি, বিশেষ ভাবে বিদেশে , ফ্রান্স-ইংল্যান্ড-ইটালি  প্রভৃতি দেশে হয়ে উঠেছিল দর্শনীয় , লোভনীয় এবং  আকর্ষণীয়, যা গৃহ-শোভাবর্ধক এবং রুচিশীলতার পরিচায়ক ছিল ।

এইখানেও রবীন্দ্রনাথের শ্রী ও সৌন্দর্য চেতনার কাব্যময় প্রকাশ, 

'মেঘ ও রৌদ্র' , অবিস্মরণীয় ছোট গল্পটিকে স্মরণ করুন –

" তিনি (শশিভূষণ) যে ঘরে আসিয়া বসিলেন, সে ঘরের চারি দিকেই বড়ো বড়ো কাচের আলমারিতে বিচিত্র বর্ণের মলাটের সারি সারি বই সাজানো।সেই দৃশ্য দেখিবামাত্র তাঁহার পুরাতন জীবন দ্বিতীয় বার কারামুক্ত হইয়া বাহির হইল । এই সোনার জলে অঙ্কিত, নানা বর্ণে রঞ্জিত বইগুলি, আনন্দলোকের মধ্যে প্রবেশ করিবার সুপরিচিত রত্নখচিত সিংহদ্বারের মতো তাঁহার নিকটে প্রতিভাত হইল ।
টেবিলের উপরেও কী কতকগুলি ছিল ।শশিভূষণ তাঁহার ক্ষীণদৃষ্টি লইয়া ঝুঁকিয়া পড়িয়া দেখিলেন,একখানি বিদীর্ণ স্লেট তাহার উপরে গুটিকয়েক পুরাতন খাতা,একখানি ছিন্ন- প্রায় ধারাপাত,কথামালা এবং কাশিরামদাশের মহাভারত ।
স্লেটের কাঠের ফ্রেমের উপর শশিভূষণের হস্তাক্ষরে কালি দিয়া খুব মোটা করিয়া লেখা –গিরিবালা দেবী । 
খাতা ও বইগুলির উপরেও ঐএক হস্তাক্ষরে এক নাম লিখিত । "

এই ছোট গল্পটির আবেদন যেমন অবর্ণনীয় , তেমনই রবীন্দ্রমননে রুচিশীলতার শিল্পীত বিন্যাসটি অননুকরণীয়।

দুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়
২/৯/'২ ১
কলকাতা ।

'সুপ্রভাত-' য়ের প্রত্যাভিবাদন

'সুপ্রভাত-' য়ের প্রত্যাভিবাদন 

দুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়

আজকের প্রভাতটির সঙ্গে 'সু' বিশেষণ খুব মানানসই । অন্য হোতা, অন্য কোনখানে  কেমন সে প্রকৃতি ,কেমন সে পরিবেশ জানি না , তবে আমাদের এই কলকাতা নামক  বিপুল , প্রাচীন জনপদটি আজ আলোকোজ্বল ।
মেঘেরা আছে আকাশে , কিন্তু তারা যেন পূজা-শেষ , ফিরতি-পথের তীর্থযাত্রীদের মতো দলে দলে ভাগ হয়ে , ধীর লয়ে , মন্দাক্রান্তা ছন্দে , উড়ে চলেছে তাদের বসতভিটার ঠিকানায় –
ওই আকাশমুখী 'হিম -আলয়ের'
চূড়ায় চূড়ায় । যাবার পথে করুণার শীতল ছায়া , সঞ্চিত-পুণ্যের আশীর্ব্বাদ, ছড়িয়ে দিয়ে চলেছে 
মারী ,বন্যায় যন্ত্রণা-কাতর এই নগরী-বাসবদত্তার দীর্ণ দেহপটে ।

আজ, এই নিসর্গের আশিষ-ধন্য শরৎ-প্রভাতে আমার প্রার্থণা –

"আরো আলো ,আরো আলো
এই নয়নে প্রভু  ঢালো।
সুরে সুরে বাঁশী  পুরে
মোরে আরো আরো আরো দাও তান।"
            –  –   রবীন্দ্রনাথ ।


দুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়
৩১/৮/'২১
কলকাতা ।

'সোনার তরী' প্রসঙ্গে


(কবিগুরুর মহাপ্রয়াণ দিবস সমাসন্ন। শ্রাবণ মাস, বর্ষা, নদী, বাঙলা দেশ ও রবীন্দ্রনাথ।) 

-'সোনার তরী' কবিতাটি নিয়ে দুটো কথা। 

দুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়


বাঙলা ভাগ হয়েছে কিন্তু বাঙলার মাটি, বাঙলার জল, বাঙলার আকাশ, বাঙলার আবেগ আর বাঙলার রবীন্দ্রনাথ বাঙালীর 'এজমালি সম্পত্তি' ; ভাগ হয়নি, ভাগ হবেও না কোনকালে। 'সোনার তরী, মানসী' পর্বের অধিকাংশ কবিতার রচনার কাল ঊনবিংশ শতকের নয়ের দশক এবং স্থান বাঙলা দেশ -- দেশবিভাগপূর্ব মাটি ও সময়কাল। 
'সোনার তরী ও মানসীর' কয়েকটি কবিতা নিয়ে আলোচনা করবার ইচ্ছা আছে। আজ সোনার তরীর প্রথম কবিতা 'সোনার তরী'। 






সোনার তরী' কবিতাটি- তে অনেক রবীন্দ্র গবেষক দার্শনিকতা খুঁজে পেয়েছেন। সমকালের পণ্ডিতগণ প্রশংসা‌ করেছেন,  আবার বিরুদ্ধ সমালোচনাও করেছেন । 

বিরুদ্ধবাদীদের মধ্যে দ্বিজেন্দ্রলাল রায় ছিলেন কঠোরতম। তিনি লিখলেন,
"......এই কবিতাটি দুর্বোধ্য নয়, অবোধ্য -ও নহে– একেবারে অর্থশূণ্য ।" 
সেই শুরু, তারপর থেকে আজোও এই কবিতাটি নিয়ে আলোচনা চলছেই। 
'সোনার তরী' যখন লেখা হয় তখন কবির বয়েস একত্রিশ , ১২৯৮ সাল । 'সোনার তরীর' অব্যবহিত পূর্বেকার কাব্যগ্রন্থ 'মানসী'। 
এই 'মানসীর' কথা বলতে গিয়ে কবি নিজে বলছেন , এবার 'কবির সঙ্গে যেন এক শিল্পী যোগ দিল ।'
তাই 'মানসী , সোনার তরী'র  সময় কাল থেকেই সেই অদৃশ্য কবিসত্ত্বার অমর্ত্য সঙ্গ, সঙ্গীত, সুর ও বাণী, একটি মাত্র বিমূর্ত , দৈবী প্রেরণারূপে কবির সমস্ত সৃষ্টি কর্মের সঙ্গে একাত্ম । 

তারপর সারা জীবন ধরে এই মানস-সঙ্গিনীর সঙ্গে নিরুদ্দেশ যাত্রায় চলেছেন কবিকুলগুরু রবীন্দ্রনাথ ।
শেষে বলবেন –
"আধাঁর রজনী আসিবে এখনি
             মেলিয়া পাখা,
সন্ধ্যা-আকাশে স্বর্ণ -আলোক
        পড়িবে ঢাকা ।
শুধু ভাসে তব দেহসৌরভ,
শুধু কানে আসে জল-কলরব,
 গায়ে উড়ে পড়ে বায়ুভরে, তব
                           কেশের রাশি ।
বিকল হৃদয় বিবশ শরীর
ডাকিয়া তোমারে করিব‌ অধীর,
'কোথা আছ ওগো, করহ পরশ
                             নিকটে আসি ।'
কহিবে না কথা, দেখিতে পাবনা
               নীরব হাসি ।"

এই যে কবির মানস-সঙ্গিনী, ছায়া-সঙ্গিনী, মায়া-সঙ্গিনী, জীবন কালের যাত্রা-সঙ্গিনী তারই  সঙ্গে গূঢ় পরিচয়ের প্রথম আলাপকালের হৃদয় আলোয় দেখা, লেখা  এই 'সোনার তরী'।

এই কবিতাটির 'ভাবে' যে দার্শনিক মনন খুঁজে নেওয়ার প্রবনতা দেখা যায় তা কবি স্বয়ং ইঙ্গিত দিয়ে গিয়েছেন। 'শান্তিনিকেতন' গ্রন্থে 'তরী বোঝাই' প্রবন্ধে কবি বলছেন 
– 'মানুষ সমস্ত জীবন ধরে ফসল চাষ করছে। তার জীবনের ক্ষেতটুকু দ্বীপের মতো , চারিদিকেই 
অব্যক্তের দ্বারা বেষ্টিত, ওই একটুখানি তার কাছে ব্যক্ত হয়ে আছে। সেইজন্য গীতা বলছেন – 

"অব্যক্তাদীনি ভূতানি ব্যক্তমধ্যানি ভারত ।
অব্যক্তনিধনান্যেব তত্র কা পরিদেবনা ।।"

যখন কাল ঘনিয়ে আসছে, যখন চারিদিকে জল বেড়ে উঠছে, যখন আবার অব্যক্তের মধ্যে তার ওই চরটুকু তলিয়ে যাবার সময় হোল –তখন তার সমস্ত জীবনের কর্মের যা কিছু নিত্যফল তা সে ওই সংসারের তরণীতে বোঝাই করে দিতে পারে। সংসার সমস্তই নেবে, একটি কণাও ফেলে দেবে না । কিন্তু যখন মানুষ বলে ওই সঙ্গে আমাকেও নাও, আমাকেও রাখ, তখন সংসার বলে,  "তোমার জন্য জায়গা কোথায় ?"
 
এই তত্বগত আলোচনার সূত্রধর কবি নিজেই, তবু মনে  রাখতে হবে , পাঠকের চাহিদা হলো রস। কাব্য সাহিত্য  পাঠের মূল উদ্দেশ্য রসাস্বাদন । 

ক্ষেত, চাষ ,চাষী –এসকল রূপকল্প বাঙলার মাটিতে, 
 সমাজ-ভূমিতে, সর্বোপরি বাঙলা সাহিত্য -সংস্কৃতিতে  অনাদিকালের প্রবনতা –  চর্যাগীতি থেকে মঙ্গল- কাব্য,  বৈষ্ণব সাহিত্য থেকে শাক্ত- সাহিত্য । আধুনিক বাঙলা  সাহিত্যেও বর্ষা, মাঠ ,ধান, লাঙ্গল-কাস্তের অনুসঙ্গ  অপ্রতুল নয় । 

রামপ্রসাদের বিখ্যাত সেই গান –

"মন তুমি কৃষি-কাজ জান না
এমন মানব -জমিন রইল পতিত
   আবাদ করলে ফলতো সোনা ।"
এগানের শেষ অন্তরা ,

"অদ্য অব্দশতান্তে বা,
    বাজাপ্ত হবে জান না ।
এখন আপন ভেবে যতন করে
চুটিয়ে ফসল কেটে নে না ।"

চাষ হবে, ফসল কাটাও হবে, জীবন-তরীতে সঞ্চয় হবে কিন্তু তার পরে? 

কাল-রূপা, কাল-রূপিনী পাটনী
বা কর্ণধারের  কাছে তা গচ্ছিত রেখে ,

"শূন্য নদীর তীরে রহিনু পড়ি
 যাহা ছিল নিয়ে গেল সোনার তরী।"

এই 'শূণ্য' শব্দটির ব্যঞ্জনার মধ্যে অভিব্যক্ত হয়েছে যে বিষাদ-করুণ সুর সেই মর্মচ্ছেদী বেদনার অনুভূতিটুকুই পাঠকের সারা জীবনের সম্বল ।

দুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়
৩০/৮/২০২১
কলকাতা ।

বীরপুরুষ

ছোটদের জন্য লেখা একটি ছড়া ,একটি ছেঁড়া কাগজে লিখে ছিলাম কবে ।হঠাৎই পেলাম খুঁজে।
           বীরপুরুষ
       .…..................
দুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়

মা–
কোথায় ছিলে সোনা ? 
সন্ধ্যা হোল ,সূয্যি গেল পাটে,
দুয়ার পানে চেয়ে চেয়ে
কতোই প্রহর গোনা !

খোকন সোনা–
জানো মা ,
পুকুরের পাড়ে মোটা সাপ এক
       ধরেছিলো কোলা ব্যাঙ।
খুব হোল রাগ, তুলে বাঁশ গাছ
        ভেঙেছি সাপের ঠ্যাঙ ।
মটু ভোলা ভয়ে কেঁদে কেঁদে মরে,
         আমি তাকে তুলে নিয়ে
"কোনও ভয় নাই", বলে বার বার
         ওর ঘরেই এলাম দিয়ে ।
        তাই দেরি হোল ,মা,
       তুমি আর কেঁদো না ।

রাত্রি হোল,

মা–
খেয়ে নাও সোনা, শুয়ে পড় গিয়ে
         কতো কাজ আজ করেছ,
মনে মনে বনে ঘুরে ঘুরে একা
         সাপ,ব্যাঙ,পাখি  ধরেছ।
কাল আবার যাবে কোন্ দূর দেশ
          ধরবে পরীর ডানা ,
পঙ্খীরাজের পিঠে উড়ে যাবে
          শুনবে না কারও মানা ।

খোকন সোনা –
ও মা ,
আমি একা ঘরে যাবো নাকো,
ওই চামচিকাটাকে দেখ,
ঘরে আছে টিকটিকি–
এখন তোমার কোলেই থাকি ।

দুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়
২৯/৮/'২১
কলকাতা ।

Recently published

অমূল্য

He ( Tagore) who sees all things in his own self and his own self in all things, he does not remain unrevealed.                     ...