মঙ্গলবার, ৩০ জুলাই, ২০২৪

গদ্যের কড়া হাতুড়ি

"হে মহাজীবন, আর এ কাব্য নয়, 
এবার কঠিন কঠোর গদ্য আনো, 
পদ-লালিত্য-ঝঙ্কার মুছে যাক্, 
গদ্যের কড়া হাতুড়িকে আজ হানো।" 
                            কিশোর কবি --সুকান্ত ভট্টাচার্য। 
                          (১৫-০৮-১৯২৬ -- ১৩-০৫-১৯৪৭
____________________________________________
গদ্যের কড়া হাতুড়ি  

ছন্দছিন্ন লালিত্যহীন সহস্র গদ্যের হলাহল স্রোত 
হড়পা বানের ঢেওয়ের মত আছড়ে পড়ছে বাংলায়। 
ভাঙছে নদীর পাড়, খল খল হেসে কল কল গ্রাসে 
গিলে খাচ্ছে শত বাস্তুভিটা। জ্বলছে আগুন দাও দাও, 
'আরো দাও', নরক জিহ্বায় চেটেপুটে নেয় আস্ত বস্তিগুলো। 
তরুণ যুবক গুলি খেয়ে পড়ে আছে চৌমাথার মোড়ে, 
তরুণীর কুসুমিত দেহপট ভাঙাচোরা প্রতিমার মত 
দেখে যাও টিভির পর্দায়, লাজবস্ত্রে নয়, রক্তবস্ত্রে ঢাকা। 
আবারো কিছুবা পাবে খুঁজে চুল্লুর ঠেকে, ঢুলু ঢুলু, 
উদাসীন সুখে দুঃখে, তুরিয়ানন্দে বিমূঢ় বেকার যুবক। 
এ-সকলে মিলে সমাজের গঠন বন্ধন সুদীর্ঘ দিনের। 
স্বপ্ন কল্পনাগুলো কুণ্ঠাভরে' জড়োসড়ো ভাষার সন্ত্রাসে। 
গদ্যের কড়া হাতুড়ির নিত্যদিন সশব্দ আঘাতে 
 বিচারের বাণী কেঁপে কেঁপে উঠছে আদালতে, 
চলছে  বহাস টিভির পর্দায়, কানের পর্দা ভাঙে 
গদ্যের 'হাতোড়া'- দাপটে, মিছিলে মিটিং-য়ে, 
জনতার অবিরাম স্রোতে, মহাসভা মহা-সমিতিতে, 
'মায়াবল' বিস্ফোরণে কিশোরের লাশে, গলা-কাটা 
 কিশোরীর স্তব্ধ বীভৎসায় -- কোথাও পাবেনা তুমি 
কবিতার সুরের সুষমা, ছন্দোবদ্ধ সঙ্গীত ঝঙ্কার। 
ফেনিল ঢেওয়ের মত পাড়ভাঙা শব্দের গঙ্গায় 
বিসর্জন দেব কবিতাকে, বাঙলাটা থাক্ গদ্যময়। 

দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় 
৩০/০৭/২০২৪
ব্যাঙ্গালোর।‌











বুধবার, ১৭ জুলাই, ২০২৪

অমাদিন


অমাদিবস

হে রাত্রি, তোমার আধাঁরের মায়া জানি, 
মানিও তোমার ভীষণা রূপের লীলা ; 
কিন্তু যদি ওই কালিকালো আবরণ 
গায়ে ঢেকে আসে দিন --- 
আসে সূর্যবিহীন, শশীতারাহীন বেলা ! 
আসে ঊষা-আশাহারা ভীষণামূর্তি কাল, 
এমন লগ্ন যখন হবে না পূজা, হবে না সন্ধ্যা-আরতি, 
হবে না শঙ্খ বাজানো কিংবা অর্ঘ্য সাজানো, 
ভৈরবী সুরে সানাইয়ের সাথে 
বৈতালিক গান গাওয়া। 
চারিদিকে শুধু বেঘোরে রয়েছে 
অঘোরপন্থী নিশা, 
শুধু শ্বাপদের বিকৃত স্বরে 
সত্যমিথ্যা গুলানো, 
মানবতা-কাটা-রক্তের দাগ মোছানো 
কোন হাসি-তাতাদের অশ্রু গলানো বেদনা 
ভাগিরথী তীরে প্রশ্ন করেনা, "এতো রক্ত কেন ?" 
রবিকরস্নাত, শিশিরধৌত, মেঘছায়াঢাকা দেশে 
শ্যাম তৃণাসনে শোয়ানো রয়েছে 
শতাব্দীজুড়ে শতকোটি শব -- 
(স্বর্গলাভের অকাল মরণ-সাধনা!) 
সকলই কি তার নিয়তির লাঞ্ছনা‌ ? 
কুরু পাঞ্চাল যদুবংশের বীভৎস পরিণাম --- 
আত্মহনন ভ্রাতৃনিধন আজও অব্যাহত। 
দেশ কাটা হোল, দাঙ্গা ফুরালো, জুড়াইনি ক্ষতদাহ। 

এখনো হিংসা রক্তের খোঁজে অবিরাম সিঁধ কাটে 
মাতৃজঠরে, প্রিয়ার বক্ষে --- শান্তির গৃহনীড়ে। 
 বঙ্গ, তোমার ললাট লিখনে শুধু কি শোণিতরেখা ? 
রবিকরসুধাসিঞ্চিত-প্রেম কখনো যাবে না দেখা ? 
___________________________________________

এই কবিতাটি লেখার পটভূমিকায় আছে বাঙলার (অবিভক্ত বাঙলা) শতাব্দীব্যপ্ত ইতিহাস আর মননে আছে অশ্রুসজল বেদনার আশাহত আর্তনাদ। বাঙলা ভালো নেই, ভালো নেই কয়েক 'শ বছর। ১৭৭৬ বা ৭৬-য়ের মন্বন্তর থেকে ১৯৪৬ বা  '৪৬--'৪৭-য়ের দাঙ্গা, দেশভাগ, দুর্ভিক্ষ --- এই দুই থেকে আড়াই শতাব্দীব্যাপী বাঙলার অন্তরাত্মার ক্রন্দন থামেনি। যদিও তার আগেও, দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের  (১৯৪৯ --১৯৪৫) পৃথিবী-পোড়ানো আগুনের লেলিহান শিখা ঝলসে দিয়েছিল ভারতসহ বিশ্বের সমস্ত ইউরোপীয় উপনিবেশগুলিকে।
সভ্যতার মহাসঙ্কটের সেই বিপুল বিরাট অধ্যায়ে প্রবেশ করলে একটি মহাভারত সৃষ্টি হবে ; এস্থলে তার প্রয়োজন নেই। আমরা, আমাদের জীবদ্দশার কিছু পূর্ব হতে যা পড়েছি, শুনেছি এবং যা স্বচক্ষে দেখছি বাঙলার সেই ইতিহাস সামগ্রিকভাবে অহিংস থাকেনি কোনদিনও। এই ইতিহাস বার বার হি়ংসার তান্ডবে রক্তরঞ্জিত। স্বাধীনতার পরে চল্লিশ পঞ্চাশের দশক দেখেছে গঙ্গায় পদ্মায় রক্তের স্রোত, দেশছাড়া গৃহহারা উদ্বাস্তুদের দিশাহারা, অসহায় হাহাকার, "ফেন দাও মা" -- আর্তনাদ, ক্যাম্পে ক্যাম্পে পাশব জীবন, শিশু-বৃদ্ধ -- সহস্র সহস্র নরনারীর অকাল মৃত্যু। তারপর ষাটের দশকের শেষভাগ থেকে আজ পর্যন্ত , অর্ধ শতাব্দীর অধিক কাল ধরে  --- কি দক্ষিণ পন্থী, কি বামপন্থী --- সমস্ত চরিত্রের শাসকের শাসনকালে সংঘঠিত হয়েছে সংগঠিত হত্যালীলা, কখনো গোপনে কখনো প্রকাশ্যে। এ সকলই ঘটেছে আমার বর্তমানতায়।
আজ আবার এই বাঙলার বহু জাতিসত্ত্বা ও ধর্মধারণার জনসমাজে সাম্প্রদায়িক বিভাজনের অমানবিক প্রবনতা প্রকটভাবে দৃশ্যমান। মহাপ্রভু চৈতন্যেদেব থেকে শ্রীরামকৃষ্ণ --- এ সকল যুগাবতার, চন্ডীদাস থেকে রবীন্দ্র- নজরুল -- এই সব প্রেমাবতারদের "আজি দুর্দিনে ফিরানু তাদের ব্যর্থ নমস্কারে।"
তাই একবুক হতাশার গর্ভ থেকে জন্ম নিয়েছে আমার এই কবিতাটি --- 'অমাদিন'।
(কবিতাটি গদ্য কবিতা এবং সংস্কৃত ছন্দশাস্ত্রের একটি বিশেষ ছন্দে লেখা হয়েছে কবিতাটি। পড়ুন,পড়ান এবং আপনাদের মতামত লিখুন।)

দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
জুন ১৭, ২০৩৪
ব্যাঙ্গালোর।‌ 
___________________________________________











শনিবার, ১৩ জুলাই, ২০২৪

দিদিমণিদের জন্মদিন

দিদিমণিদের জন্মদিন 


জন্মদিনে জন্মদিনে ডাগর হচ্ছে যত, 
ভয়ে ডরে অন্ধকারে লুকাই আমি তত। 
অনেক লেখা, অনেক পড়া নিত্য করে তারা, 
অবাক হয়ে দূর থেকে চাই, দুচোখ পলকহারা। 
জানা-চেনার ছোট্ট ঘরে আমার স্থবির বাস, 
জ্ঞানের বিপুল বিশ্বনীড়ে ওদের অধিবাস।‌‌ 
কোমল মুখে মিষ্টিকথা 'খই'-য়ের মত ফোটে, 
অর্থহারা আমার কথায় হেসেই পড়ে লুটে। 
থাক্ সে হাসি আনন্দরাশি সুভাষিত চিরদিন, 
তিন্নি ও তিতি -- প্রীতি সম্প্রীতি থাক্ চির অমলিন। 
নব বরষার শ্যামল মেঘের অমৃতধারার মতো, 
তোমাদের 'পরে দৈব আশিষ ঝরে যেন অবিরত। 

দাদুভাই ঠাম্মা
১৪-০৭-২০২৪
ব্যাঙ্গালোর




মঙ্গলবার, ৯ জুলাই, ২০২৪

রামায়ণে অবিচার -- পর্ব পাঁচ

রামায়ণে অবিচার --- পর্ব পাঁচ 



যাই হোক্, জনকনন্দিনী হয়েও জনমদুঃখিনী সীতা, পাতিব্রত্যের পরাকাষ্ঠা হয়েও অযোধ্যার রাজা, রাজ পরিবার ও অযোধ্যার প্রজাকুলের সন্দেহ-সঞ্জাত অবমাননার অগ্নিবানে জর্জরিতা, দগ্ধা সীতা আত্মহননের পথ অবলম্বন করতে বাধ্যই হলেন।
"মনসা কর্মণা বাচা যথা রামং সমর্চয়ে।
তথা মে মাধবী দেবী বিবরং দাতুমর্হতি।।"
আমি আগেই আলোচনা করেছি,  সীতাদেবী "বিবরং দাতুমর্হতি" প্রার্থনাটি পরপর তিনবার উচ্চারণ করলেন। 

"বাচা দুরুক্তং বীভৎসং ন সংরোহতে বাক্ ক্ষতম।।"
বাক্যের ক্ষত বীভৎস, নিরাময়ের ঔষধী থাকে না।
(মহাভারত -- কচ দেবযানী উপাখ্যান) 

ধরিত্রী গর্ভ হতে স্বর্ণ সিংহাসন উত্থিত হোল।  সীতাদেবী অন্তর্হিতা হোলেন। 

(এ প্রসঙ্গে পাঠকদের স্মরণে আনতে চাই রাম কিন্তু সীতা ব্যতিত অন্য ক্ষেত্রগুলিতে এমন চরম রক্ষণশীলতা বা নৈতিকতার কঠোরতা প্রদর্শণ করেন নি।বালির পত্নী শুদ্ধচরিত্রা তারাকে সুগ্রীবের সঙ্গে , রাবণের  মৃত্যুর পর পরম বিদুষী মন্দোদরীকে বিভীষণের সঙ্গে অসম মিলন ঘটাতে তিনি দ্বিধা করেন নি। অথচ বালি বধের কারণ হিসাবে সুগ্রীবজায়ার প্রতি বালির ব্যাভিচারের কথাই উল্লেখ করেছিলেন।)

এর পর মহাকবি বাল্মীকির মনোভূমিসঞ্জাত  রামচন্দ্রের মহাকাব্যিক চরিত্রটিকে সমকালিক ও  আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গিতে পুনর্বিচার করবার চেষ্টা করব।
সীতাদেবীর সেই মর্মান্তিকভাবে অপমানজনক অন্তর্ধানের পর রাজা রামচন্দ্র শোকে বিবশ এবং একই সঙ্গে উন্মত্ত হয়েও উঠেছিলেন। এমনকি ধরিত্রীকেও ছিন্ন, বিখণ্ডিত করতে চেয়েও ছিলেন। কিন্তু সেই সাময়িক শোকচ্ছ্বাস তার চরিত্রের পক্ষে অশোভনীয় উপলব্ধি করে তিনি পুনরায় প্রকৃতস্থ হন এবং  মহাকবি লিখছেন, তারপর রাজা রামচন্দ্র "বহু সহস্র বৎসর" যাগযজ্ঞ, রাজকীয় ক্রিয়াকর্ম সম্পাদনায় অতিবাহিত করেন। 
এই সুদীর্ঘ সময়কালটিতে বাল্মীকি রামায়ণের উত্তরা খন্ডে আর একবারও রাজা রামচন্দ্র বা তাঁর সভাসদ, অমাত্য, আত্মীয় --- কারো মুখেই সীতাদেবীর নাম উচ্চারিত হয় নি। শেষের দিকে ওই একবার অশ্বমেধ যজ্ঞের সংকল্পের সময়ে, যেহেতু যজমানকে সস্ত্রীক সংকল্পবদ্ধ হতে হয় তাই সীতাদেবীর কথা উঠেছিল ; কিন্তু সে প্রয়োজন সাধিত হয়েছিল কাঞ্চনময়ী সীতা নির্মাণ করে। (এ সম্মন্ধে বিগত পর্বে আলোচনা করা হয়েছে)।
সীতাদেবীর গর্ভে, আপন ঔরসজাত পুত্রদেরকে তিনি  চিনতে পারলেন, গ্রহন করলেন কিন্তু তাদের গর্ভধারিণী মাকে, তাদেরই সম্মুখে প্রথমে বিসর্জন এবং পরে আত্মহননে প্ররোচিত করে রাজকন্যা, রাজকুলবধূ বৈদেহীকে তাঁর নিজস্ব জীবন, রাজমহিষীর গৌরব, রাজৈশ্বর্য থেকে সম্পূৰ্ণরূপে উৎপাটিত করার তাগিদ এসেছিল কোন্ সংস্কার থেকে ? এখানে কোনটি  প্রবলতর ? পুরুষোচিত দম্ভ, না কি শুধুমাত্র লোকাবাদের কলঙ্কভীতি ? এবারেও তো (লঙ্কায় অগ্নিপরীক্ষা, অযোধ্যার এসে স্বামীত্বের সুখ-সম্ভোগ এবং পত্নীর অন্তঃসত্ত্বার লক্ষণ অবহিত হয়েও বিসর্জন), এই তৃতীয় বারেও বিকল্প মহান কিছু ছিল, যেখানে রাজা শ্রীরাম 'রাজর্ষি রামচন্দ্রে' বিবর্তিত হয়ে নব অবতারে অবতীর্ণ হতে পারতেন, সাধারণ মানুষের মত সীতাদেবীর প্রেমকে মহত্তম মহিমা প্রদান করে' বলতেই তো পারতেন, "তোমার প্রেমে হব সবার কলঙ্কভাগী।"
পুত্রদ্বয়কে যখন স্বীকৃতি দিলেনই তখন তাদের জন্মদাত্রীকে রাজকীয় পুরুষাকারের আত্মম্ভরী দাম্ভিকতার ক্ষমতাবলে (এক 'অবলা নারীকে') নির্মম অবমাননায়, গ্লানিময় অমর্যাদায় ধ্বিকৃত করে, মৃত্যুর মুখে ঠেলে না দিয়ে,  ভরতকে অভিভাবক রেখে, দুই সর্বগুণসম্পন্ন সন্তানের হাতে রাজ্যভার সমর্পণ করে, চিরদুঃখিনী প্রণয়াস্পদাকে সঙ্গে নিয়ে বানপ্রস্থে গমন করতেই পারতেন। যদি তিনি পূর্ণব্রহ্ম নারায়ণের অবতারও হন তবুও নরলীলায়  তাই তো স্বাভাবিক ছিল।

কিন্তু এখানেই আমাদের সর্বযুগের শ্রেষ্ঠতম মহাকবির  সৃজন-প্রতিভা। তিনি এই রাম চরিত্রটির মধ্য দিয়ে একদিকে যেমন  সমকালের (মনে রাখতে হবে প্রায় তিন হাজার বছর আগে, চতুর্বর্ণে বিভাজিত, ব্রাহ্মণ্যবাদের দ্বারা শাসিত ভারত) সমাজচিত্রটিকে উৎকীর্ণ করেছেন, অপরদিকে তেমনি রাজকীয় গুণসম্পন্ন কিছু ব্যক্তিত্বের প্রকৃতিগত স্বাতন্ত্র্যের মহিমা কীর্ত্তন করেছেন। শুধু আমাদের দেশের পুরাণ কাহিনীগুলিতে নয়, গ্রীক রোমান সুমেরীয় প্রভৃতি পুরাণ কাহিনীগুলিতেও এমন ব্যক্তিত্বের অসংখ্য উদাহরণ লক্ষ করা যায়। তাছাড়া মধ্যেযুগ, এমনকি আধুনিক যুগেও তেমন চরিত্রের অস্তিত্ব দুর্লভ নয়।

("Heroes through the ages"--- যাঁরা জগতসংসারে অক্ষয় সাক্ষর রেখে গিয়েছেন, যেমন ভগবান শ্রীকৃষ্ণ, গৌতম বুদ্ধ, যীশুখৃষ্ট, মহাপ্রভু চৈতন্যেদেব প্রভৃতি অবতার ; নীরো, আলেকজাণ্ডার, অশোক, রাজা হেনরি, আকবর প্রভৃতি সম্রাট ; মহাত্মা গান্ধী, মার্টিন লুথার কিং, ভগিনী নিবেদিতা মাদার টেরেসাদের মত জনসেবক--- তাঁদের জীবনাচরণ স্মৃতিশাস্ত্রসম্মত ভাবে (under the domain of eternally established Social Law and Justice) বহমান হয় না, হতে পারে না।) 


কবিগুরু বাল্মীকি কাব্যর আরম্ভকাল থেকেই রামচন্দ্রকে পুরুষোত্তম, নরোত্তম, নরচন্দ্রমা ইত্যাদি অভিধায় অলঙ্কৃত করেছেন। এবং এখানেই রাজা রামচন্দ্র স্বতন্ত্র। তিনি কালোচিত সমাজোচিত এবং একই সঙ্গে রাজোচিত স্বতন্ত্র স্বধর্ম পালন করেন। "রামায়ণে অবিচার" সন্দর্ভটিতে প্রথমাবধি যতগুলি ঘটনা, কর্মসম্পাদনা রামচন্দ্র কর্তৃক কৃত ও অনুষ্টিত হয়েছে সবগুলিই উপরোক্ত স্বধর্মের উদাহরণ। বনবাস প্রত্যাগত রামচন্দ্রের মধ্যে নরাধিপতিসুলভ আচরণ প্রবলতররূপে লক্ষণীয়। "কেননা এখন তিনি আর বনবাসী, পরবলনির্ভর (হনুমান, সুগ্রীব, বিভীষণ, বানরসৈন্য এবং দৈব দাক্ষিণ্যের উপর নির্ভরশীল) নন, এখন তিনি লঙ্কাবিজয়ী অযোধ্যার রাজা। মহাকাব্যের মহাকবি বহুবিধ মহিমান্বিত বিশেষণে তাঁর ব্যক্তিত্বকে বিভূষিত করেছেন, --- প্রজানুরঞ্জন, প্রজাবৎসল, পতিতপাবন, মহদধর্মা ইত্যাদি, আরও কত। কিন্তু যে ঘটনা পরম্পরা ---- বালি বধ, ঘরভেদী বিভীষণের সঙ্গে মিত্রতা স্থাপন, সীতাদেবীকে তিন তিন বার নির্মম নিষ্ঠুর অবমাননায় ধিক্কৃত করা, সংস্কারাচ্ছন্ন ব্রাহ্মণদের প্ররোচনায় বিচার না করে তপস্যায় রত শম্বুকের মস্তকছেদন --- রামচন্দ্রের দ্বারা অনুষ্টিত ও সম্পাদিত কর্মগুলি তাঁর দেবসুলভ, মহতী চরিত্রের পক্ষে শ্লাঘনীয় হতে পারেনা  ;  বরং নিন্দনীয় বলেই বিবেচিত হতে পারে। তাঁর চিরানুগত, ভ্রাতৃপ্রেমের শাশ্বত মূর্তি লক্ষ্মণের একটি উক্তি স্মরণীয়,  যখন সীতাদেবীকে নির্বাসনে রেখে ফেরার পথে তিনি সারথি সুমন্ত্রকে বলছেনঃ
পৌরজনের কথায় রাম এমন "নৃশংস ও অযশস্কর কর্ম কী করে করতে পারলেন ? এতে কোন ধর্ম রক্ষিত হ'লো ?" সীতা বর্জন প্রসঙ্গে রাজপুরবাসী আত্মীয়কুলের মধ্যে মাত্র একজনের প্রতিবাদ এইভাবে উচ্চারিত হয়েছিল। কিন্তু আশ্চর্যভাবে রামের সম্মুখে এমন বিরূপতা দেখা যায়নি। (এই হৃদয়হীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে রাম তাঁর ভাইদেরকে ডেকে নিষেধ করে দিয়েছিলেন তারা যেন কোন প্রশ্ন না করে)।
এ-সবই প্রমাণ করে পদ্মপলাশলোচন, নবঘনশ্যামমূর্তি  রামচন্দ্রের আপাতকোমল বহিরঙ্গের অভ্যন্তরে একজন বজ্রকঠিনবক্ষ স্বরাট বাস করতেন৷ সেইটিই তাঁর স্বধর্ম।

পরবর্তী কালের বহু কবি, মহাকবি, নাট্যকার এই মহানায়কের প্রেম-মেদুর, বিরহ বিধুর, করুণাঘন,  দয়াময়  রূপ অঙ্কন করেছেন, যাঁদের জন্যই আমরা একজন মানুষী দোষ-গুন সম্পন্ন 'নরনারায়ণ' রামচন্দ্রকে পাই। সে রাম অহল্যার রাম, সে রাম গূহকের রাম, সে রাম শবরীর রাম। সে রাম কালিদাশের (রঘুবংশ ), ভবভূতির (উত্তর রামচরিত), তুলসীদাসের  (রামচরিত মানস) কৃত্তিবাসের (শ্রীরাম পাঁচালী) জানকীবল্লভ  রামচন্দ্র  --- স্নেহে-প্রেমে-প্রণয়ে-ভ্রাতৃবাৎসল্যে বিগলিত-তনু রাজীবলোচন। 

এখানে প্রশ্ন একটি থেকেই যায়। তাহলে কি বাল্মীকির রামচরিত্র অন্যরকম হলে ভালো হোত ? সেই রকম, যে রকম উক্ত বাল্মীকি-পরবর্তী কবিরা তাঁর রূপান্তর ঘটিয়েছেন ?
না, তাহলে রাম চরিত্রটির ঐতিহাসিক মহিমা লঘুতায় পর্যবসিত হোত। সুন্দর পারিবারিক সম্পর্ক, আত্মীয়তার বন্ধন, সখ্য-স্নেহ-প্রেমের পরিবেশ এবং গার্হস্থ্য ও বৃহত্তর সামাজিক ধর্ম রামায়ণের মূল সুর, আদর্শ রূপে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে -- এমন একটি বিশ্বাস আমাদের বদ্ধমূল হয়ে আছে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ও দীনেশ চন্দ্র সেন (রামায়ণী কথা ,যার ভূমিকা লিখেছেন রবীন্দ্রনাথ) মহাশয়ের রামায়ণী আলোচনা পাঠ করে। কিন্তু এই বিশ্বাস আঘাতপ্রাপ্ত হয় যখন বিশ্বসাহিত্যের মন্থক, সমালোচক বুদ্ধদেব বসু বলছেনঃ 


 "পারিবারিক সম্পর্ক বলতে আমরা যা বুঝি (এবং দীনেশচন্দ্র যা বুঝেছিলেন), সেগুলি রামের পক্ষে বড়ো স্বল্পায়তন ;মহত্বের দ্বারা মন্ডিত করে নিয়ে তবে তিনি গ্রহণ করতে পারেন সেগুলিকে ; কোন কঠিন ত্যাগ বা দুঃসাধ্য সংগ্রামের উপলক্ষ হিসাবেই তাঁর কাছে আত্মীয়তাবোধ মূল্যবান। যেখানে তিনি পুত্র বা পতি বা ভ্রাতা সেখানেও তিনি প্রভাবশালী লোকনায়ক, এ-কথাটা তিনি নিজে কখনো ভুলেননি, আমাদেরও ভুললে চলবে না।"
এইটি মহাকাব্যোচিত চরিত্রের উপযুক্ত কথা। তিনি রাজা, তিনি নায়ক, তিনি সাধারণ্যের ঊর্দ্ধ্বে বাস করেন, বিচরণ করেন। তিনি উদ্গাতা (শ্যামবেদীয় মন্ত্র-গীতকারী), অন্যজনেরা হোতা (ঘৃত অর্পণকারী)। লক্ষ্মণ যিনি তাঁর 'দ্বিতীয় প্রাণ', অযোধ্যা কান্ডের পর রেখে তিনি আজ্ঞাবহ সেবক, ভরতের প্রতি তাঁর প্রচ্ছন্ন সন্দেহ মাঝে মাঝেই বিসদৃশরূপে প্রকটিত, পিতার মৃত্যুর জন্যে নিজেকে কিছুটা দায়ী করা যুক্তিসঙ্গত ছিল --- রাম তা করেননি। সীতাদেবীকে বিসর্জনকালে তাঁর কঠোর নির্লিপ্তি ও হৃদয়-দৌর্বল্যহীন অবিচার এতদিনে আমাদের সহ্য হয়ে গিয়েছে কিন্তু যা কঠোরতর তা হোল কুশ ও লব পুত্রদ্বয়কে রামায়ণ গানের গায়ক রূপে যেভাবে গ্রহন করলেন, অন্তর্হিতা সীতাদেবীর (মাতৃহীন) সন্তানরূপে, সকরুণ বাৎসল্য-বিগলিত পিতৃবক্ষের আবেগ দিকে তেমনভাবে বরণ করলেন না। শুধুমাত্র রাজোচিত বিধি ও নৈতিকতার বশবর্তী হয়ে তাদেরকে অযোধ্যা রাজ্যের উত্তরাধিকারী নির্বাচিত করে গেলেন। নইলে রঘুবংশ নয়, নিজস্ব নামের পরম্পরা যে বিলুপ্ত হয়ে যাবে !   

রামায়ণের ঐতিহাসিকতা বা ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট নিয়ে যে পণ্ডিতসমাজ আলোচনা করেছেন বা করেন বাল্মীকির রামচরিত্র অনুধাবন করা ও অনুধাবন করানো তাঁদের কাছে সহজতর। তাঁরা একটি সিদ্ধান্তে উপনিত হওয়ার প্রয়াস পান যে রামায়ণের কাহিনীর অভ্যন্তরে সাংকেতিক ভাবে লুকিয়ে রয়েছে আর্য সভ্যতার দাক্ষিণাত্য বিজয়ের আখ্যান। অযোধ্যার রাজা দশরথের পুত্র রামচন্দ্র উত্তর থেকে ক্রমশঃ দক্ষিণ দিকে অগ্রসর হয়ে 'চন্ডাল', 'বানর', 'ভল্লুক', ব্যাধ' প্রভৃতি গোষ্ঠীপতিদেরকে হয় বাহুবলে, নয় কূটনৈতিক কৌশলে জয় করে লঙ্কাধিপতি প্রবল প্রতাপান্বিত রক্ষোরাজ রাবণকে আক্রমণ করেন এবং সেখানেও তাঁর মনোনিত ও বশংবদ রাবণভ্রাতা, সিংহাসনকামী বিভীষণকে প্রতিষ্ঠিত করেন। রাবনের সীতাহরণ এবং রামচন্দ্রের সীতা উদ্ধার দাক্ষিণাত্য অভিযানের উপলক্ষ, অজুহাত বা বিরাট ঘটনাটির অনুঘটক মাত্র। বিশ্বসাহিত্যের অপরাপর মহাকাব্যগুলিতেও মহাযুদ্ধের হেতু বা মূল কারণ হিসাবে এই নারী। যাই হোক্ সে আলোচনা বারান্তরে করার ঈচ্ছাটি বর্তমানে অবদমিত রেখে বাল্মীকি রামায়ণের রামচন্দ্রকে সম্যক বুঝে নেবার আরও সামান্য চেষ্টা করাই আপাত কর্তব্য।
এতক্ষণ মহাকবি বাল্মীকির রামচরিত্র অনুধাবন করবার যতটুক প্রয়াস পেয়েছি তাতে এই সিদ্ধান্তে আসা বাতুলতা বলে গণ্য হবে না যে অযোধ্যাধিপতি রাম ছিলেন প্রকৃত অর্থেই রাজা রামচন্দ্র, স্বভাবে ব্যক্তিত্বে স্বতন্ত্র একজন মহাকাব্যিক নায়ক যিনি অনুসরণ করেন না, যিনি অনুসৃত হন। যাঁর বক্তব্য বেদবাক্য, যাঁর সিদ্ধান্তই নীতি, যাঁর বিচারই শেষ বিচার। তিনি ধর্মে, কর্মে, শাস্তিদানে, প্রশস্তি উচ্চারণে অননুকরণীয় উদাহরণ হয়ে থাকবেন। প্রচলিত সার্বজনীনতার ঊর্দ্ধ্বে তিনি বিরাজমান। 


আমরা বিশ্বসাহিত্যের মহাসাধক বুদ্ধদেব বসু মহাশয়ের লেখা থেকে কয়কটি বাক্য উদ্ধার করে এই সন্দর্ভটির সমাপ্তি রেখা টানতে চাইঃ 


রাম বিসর্জন দিয়েছিলেন সীতাকে, আগামেমনন তার নিজ তনয়ার কন্ঠচ্ছেদ করেছিলেন, প্রেমিকা ডিডোর আত্মহননের কারণ হয়েছিলেন ঈনিয়াস -- সবই ধর্মের বা স্বধর্মের কারণে। রাজা, সেনাপতি, সাম্রাজ্যস্থাপক যথাক্রমে এই তিন ভুমিকার সম্পূর্ণ দাবি মেটাবার জন্য সমস্ত বাধা এঁদের অতিক্রম করতে হয়েছে -- যে কোন মূল্যে, বিনা শোচনায়।
এখানে আরও একটি বিষয় অনুধাবনীয় --- সীতা বাল্মীকি রামায়ণের মূল চালিকাশক্তি, সীতা রামায়ণ মহাগ্রন্থের মহানায়িকা, সীতা ক্ষাত্রসূর্য রামচরিত্রের শৌর্য, বীর্য, ঐশ্বর্য, গরিমা ও মহিমার প্রদীপ্তি। সীতা দেব-দৈত্য-নরত্রাস, ত্রিভুবনজয়ী লঙ্কেশ্বরের কালাগ্নিস্বরূপা, সীতা ক্ষাত্রসূর্য রামচরিত্রের শৌর্য, বীর্য, ঐশ্বর্য, গরিমা ও মহিমার প্রদীপ্তি। সীতা দেব-দৈত্য-নরত্রাস, ত্রিভুবনজয়ী লঙ্কেশ্বরের কালাগ্নিস্বরূপা। 


(লঙ্কেশ্বর রাবন কিন্তু সীতার 'সতীত্ব ও পাতিব্রত্য -সাধিত পরমা শক্তির'' প্রতি অন্তরে সশঙ্কিত ও শ্রদ্ধান্বিত ছিলেন। এস্থলে আমাদের আধুনিক মহাকবির শরণাপন্ন হওয়া  অপ্রাসঙ্গিক হবে নাঃ 


"সম্মুখ সমরে পড়ি বীরবাহু চলি
যবে গেলা যমপুরে অকালে" 

তখন রক্ষোরাজের সেই অনুতপ্ত শোকচ্ছ্বাস,

" ..............................হায় সূর্পনখা, 
কি কুক্ষণে দেখেছিলি, তুই রে অভাগী, 
কাল পঞ্চবটীবনে কালকুটে ভরা 
এ ভুজগে ? কি কুক্ষণে (তোর দুঃখে দুঃখী) 
পাবক-শিখা-রূপিনী জানকীরে  আমি 
আনিনু এ হৈমগেহে ?") 

জানকীর অন্তর্ধানের পর জানকীবল্লভ রামচন্দ্র, মহাকবির সৃষ্টিশীলতার প্রেরণা (মূল প্রেরণা বেদনার অগ্নিকুণ্ড-বিজয়িনী বৈদেহী) অন্তর্হিতা হবার জন্যই হয়তো'বা, ধীরে ধীরে অস্তায়মান সবিতৃদেবতার মতই মন্দতাপ, ঔজ্জ্বল্যহীন হতে হতে কালোচিত পরিণতি প্রাপ্ত হলেন -- 


সেইটিই বীরশ্রেষ্ঠ, পুরুষোত্তম, রঘুকুলপতি রামচন্দ্রের বিষাদপাণ্ডুর জীবনের 'অনিশেষ' পরিসমাপ্তি।
'অনিশেষ পরিসমাপ্তি' --- এই বিষম অলঙ্কার বাক্যবন্ধটির প্রয়োগ এই কারণেই যে মহাকবির মনোভূমিপ্রসূত, আদি মহাকাব্যের মহানায়ক 'রাম' সহস্র সহস্র বৎসর ধরে আজিও ভারতবর্ষ নামক এই বিপুল ভূখন্ডে শুধু নয়, সমগ্র বিশ্বের কোণায় কোণায় প্রাণময় দেবতারূপে পূজিত এবং বিশেষভাবে এই 'মহাভারতের' বিবিধতা ও বৈচিত্রমন্ডিত যে চিরপ্রবহমান মানব সমাজ, তার নীতি-নৈততিকতার  প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে মহান নিয়ন্ত্রক। বাস্তবতা-অবাস্তবতা, বিশ্বাস -অবিশ্বাস, আস্তিকতা ও  নাস্তিকতার ঊর্দ্ধ্বে পতিতপাবন রাম ও কলঙ্কবিমোচিনী  'জন্মদুঃখিনী' সীতা চির-আরাধিত দেব দেবী রূপে ভারতবর্ষের মানসভূমিতে বিরাজমান, অক্ষয় অবিনশ্বর ও অবিস্মরণীয়।  

"জগদ্রাম সূত রামপ্রসাদেতে গায়। 
সীতা রাম খেলা কর আমার হিয়ায়।।" 

_______________________________________________

ঋণ স্বীকারঃ
মূল বাল্মীকি রামায়ণ,
কালিদাশ, ভবভূতি, কৃত্তিবাস,
জগদ্রাম রায়, মাইকেল মধুসূদন,
রবীন্দ্রনাথ প্রভৃতি পূজার্হ কবিগণ
এবং বুদ্ধদেব বসু, দীনেশ চন্দ্র সেন
প্রভৃতি প্রণম্য সাহিত্যসাধক ও গবেষকবৃন্দ। 

দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
০৯-০৭-২০২৪
ব্যাঙ্গালোর।



______________________________________________










শনিবার, ৬ জুলাই, ২০২৪

রথযাত্রা

রথযাত্রা 

গতির তরঙ্গভঙ্গে জেগেছে উচ্ছ্বাস দিকে দিকে 
আকাশে বাতাসে সাগরের উথালে পাথালে, 
তটিনীর দুরন্ত প্লাবনে, পাহাড়ের বুকফাটা 
 ঝর ঝর ঝর্ণায়, মেঘভাঙা বৃষ্টিধারে, অগ্নিস্রাবী 
বিদ্যুতের জ্বলন্ত আলোয়। নক্ষত্রের লক্ষ দৃষ্টিবানে 
শঙ্কিত যে রূঢ় অন্ধকার তা'রো আছে দ্রুতি। 
মহারথ জগত সংসার, গতিচক্রে নিত্য তার ধাওয়া 
সীমাহারা সীমা হতে অসীম অনন্ত কোন্ কালের গহ্বরে। 
রথ আছে, আছে রথি, সারথির পাইনি  ঠিকানা। 

আজ রথযাত্রা মহোৎসব, জনপদে জনপদে 
ভক্তদের উল্লসিত জয়ধ্বনি, "জয় জগন্নাথ"। 
রথরশি নররূপী নারায়ণ গণদেবতার হাতে। 
রথারূঢ় ভগিনী সুভদ্রাসহ কৃষ্ণ বলরাম --- 
অসম্পূর্ণ অঙ্গধারী কাঠের প্রতিমা। এতোক্ষণে 
'সারথির পেয়েছি ঠিকানা', অজানার মিলেছে সন্ধান। 
বিশ্বব্যপ্ত চৈতন্যের বিরাট পুরুষ লক্ষ কোটি জনতায় 
আছে অন্তর্লীন, সংসার রথের রশি তারই হাতে ! 
"জগতের নাথ কর পার হে", ওঠে ধ্বনি বর্ষণসন্ধ্যায়। 

দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় 
০৬-০৬-২০২৪
ব্যাঙ্গালোর।
_________________________________________















মঙ্গলবার, ২ জুলাই, ২০২৪

শূন্য হাতে শূন্যে লীন

মাতৃজঠরের গন্ধ উবে গেছে কবে। 
মাথার উপরে ছিল আলো, দেখি নাই। 
পায়ে নিয়ে পাঁক, মরুতৃষা বুকে 
এসেছি পশ্চিম সাগর কূলে, একা, 
আসন্ন সন্ধ্যায় নিয়তি নির্দেশে ___ 
বিস্ময়-বিপন্ন দৃষ্টি, অবশ চরণ। 
ওই যায় ডুবে দিনান্তের শেষ রশ্মিরেখা 
অন্ধকার রাহু ঢেওয়ের নিয়েছে রূপ ! 
অস্তিত্ব-বিনাসী 'না' যেন সর্বগ্রাসী 'হ্যাঁ' মেলে আছে। 
অমানবিকতার পাপ ধোওয়া হোল না আমার, 
হোল না সিন্ধু-স্নান, হোল না পান এক বিন্দু ; 
লবনাক্ত সিন্ধুজল -- প্রাণান্ত পিপাসা। 

কি চেয়েছি সারাটি জীবন, পেয়েছিই বা কি ? 
চাওয়া ও পাওয়ার মাঝে এত গরমিল ? 
না-চাওয়ার ছিল যা পেয়েছি ত সবই, 
পাওয়া যা এসেছে হাতে, ভুল ছিল তাতে। 
ভুলের ফসল বয়ে কেটে গেল কাল। 
সঞ্চয় জীবনে শুধু শবের জঞ্জাল  ! 
"জীবনকে দিলিটা কি ? শুধায় প্রাণেশ", 
'একটি মরণ' মাত্রা, যা আছে অবশেষ। 

দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় । 

(প্রথম রচনা 
২২-০১- ২০২২) 
পরিমার্জিত 
০২-০৭-২০২৪ 
ব্যাঙ্গালোর।




,

Recently published

অমূল্য

He ( Tagore) who sees all things in his own self and his own self in all things, he does not remain unrevealed.                     ...