বুধবার, ৩০ নভেম্বর, ২০২২

ত্রাসন

ত্রাসন 


অভ্রভেদী বিজয় তোরণ, 
বিপুল বিস্ময় এক দূর্গ প্রাসাদ 
জীর্ণ, দীর্ণ --- কালের কালিমা মেখে' 
অবজ্ঞায় অনাদরে জেগে আছে বিবর্ণ ভূমিতে। 
হঠাৎই পড়ল চোখে পরিত্যক্ত বৃদ্ধ ষাঁড় আছে বসে--- 
বুজে যাওয়া পরীখার তৃণাসনে, আধবোজা চোখ, 
রোমন্থন নির্বিকারে। ঘিরে চতুর্দিক তার ভন ভন 
করে ডাঁশ, দুটো কাক ডাকে আর নাচে অকারণে 
দেহে তার। মুখ চেটে চলে গেল নধর গাভিটি। 

কি জানি কি দিবাস্বপ্ন দেখি আমি সায়াহ্ন সন্ধ্যায় -- 
এই বৃষরাজই ছিল মহারাজা এ দূর্গপ্রাসাদে, 
 অমিতবিক্রম, মূর্ত রূপ ত্রাস সন্ত্রাসের। 
ছিল বাস অফুরন্ত ঈশ্বর্যের দুষ্প্রবেশ্য যক্ষপুরে, 
বিলাস নিকুঞ্জে ছিল সুর সুরা সুন্দরীর বাসব বাসর 
 দেখা তার পেত দেবতারা। 
নাম তার ভয়ঙ্কর -- দুঃস্বপ্নেরই নামান্তর ছিল রাজা 
তার রাজ্যজুড়ে। 

অদৃশ্য কালের ঢেও ওঠে আর পড়ে, 
ভাটিয়ালি গান গেয়ে, খেয়া বেয়ে চলে যায় বর্তমান, 
 পড়ে থাকে ভূত, পড়ে থাকে উৎসবের অবশিষ্ট, 
পাদপিষ্ট কুসুমের মালা, 
শ্মশান শ্বাপদ চাটে রাজার উচ্ছিষ্ট-ভরা অপবিত্র থালা। 

কালান্তরে বসে আছে সেই রাজা। সিংহজন্ম দেয়নি 
 বিধাতা---তাই বৃষরূপ, তাই এই স্মৃতি রোমন্থন। 
অতীত কয়না কথা, চিরমৌন কালের গহ্বরে যায় 
ডুবে বর্তমান, প্রত্যাশার অন্ধকারে থাকে ভবিষ্যৎ। 
সব জেনে উদাসীন মহাকাল শিবের বাহন। 
প্রণাম করেছি তাকে, জেনেছি সত্যের রূপ নির্মম 
কঠিন। 
" কঠিনেরে ভালো বাসিলাম---- 
সে কখনো করেনা  বঞ্চনা।" 

(শেষ বাক্যটি রবীন্দ্রনাথের 'শেষ লেখা' কাব্যগ্রন্থের
"রূপ-নারায়নের কূলে" কবিতাটি থেকে উদ্ধৃত।)

দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
২৮/১১/২০২২ 
মহীশূর।











শুক্রবার, ২৫ নভেম্বর, ২০২২

মুশকিল আসান

সকাল থেকে কেঁদে কেঁদে আকুল খুকুমণি, 
কোথায় কখন হারিয়ে গেছে 'পুতুল পরিমণি।' 
 হন্যে হয়ে খুঁজে খুঁজে মরছে সবাই ঘরে, 
হুলো বিড়াল 🐱ভোলা কুকুর 🐕পালিয়ে গেছে ডরে। 
দাদা দিদি মা'য়ের বকা  খেয়েই হোল সারা, 
তাদের যত খেলনা দিয়েও পার পেলনা তারা। 
ঠাম্মা বলে, ''বানিয়ে দেব তেমনি ছিল যেমন'', 
পিসি বলে, "কিনব মেলায় এক্কেবারে নূতন।'' 
কোন কথায় হোল না কাজ কান্না অবিরল, 
বসেই আছে মাঝ আঙিনায়, চোখে অগাধ জল। 

মাঠ-ফেরতা দাদু এসে নিলেন বুকে তুলে, 
"আয় দিদি ভাই, দেখি পরি কোথায় গেল চলে।" 
নিয়ে গেল সেই বাগানে যেথায় শতেক ফুল 
ফুটে আছে গাছের শাখায় হাওয়ায় দোদুল দুল। 
একটি মস্ত প্রজাপতি 🦋 ফুলে ফুলে ওড়ে' 
দাদু তাকে তাড়া করে' এই ধরে, সেই ধরে। 
"ধোরো না ওকে, ভাঙবে পাখা, উড়বে কেমন করে?'' 
"এইতো পরি, পেয়েছে পাখা, তাই থাকেনা ঘরে। 
--"ও, দাদুভাই, থাক্ এখানেই, রাতের বেলায় যাবে,‌‌‌‌‌ 
খাবে না হয় ফুলের 🍯 মধু, কিন্তু কোথায় শোবে ? 

কান্নাবিধুর সেই নাতনি কোথায়, কাঁদন-হরা দাদু ? 
কোথায় এমন পুষ্প কানন শতেক রঙের যাদু ? 
পরিরাণী প্রজাপতি, যার রঙিন পাখনা মেলা ? 
 সুরভী আশায় কুসুম শাখায় বাতাসের ঢেও তোলা ? 
দাদা দিদি পিসি আজ বনবাসী, দাদুরা সঙ্গীহারা, 
টিভি পর্দায় নাচে পরিরাণী  কিন্তু পড়ে না ধরা। 


দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় 
২৫/১১/২০২২ 
ব্যাঙ্গালোর।  
 



 



 






 
 

শনিবার, ১৯ নভেম্বর, ২০২২

জীবন সঙ্গীত

নিশান্ত প্রহর, নিস্তব্ধ জগৎ, 
সুদূর দিগন্তপারে গৈরিক আলোকবেনু বাজে। 
আশাবরী রাগিনীর প্রথম আলাপ। 
ফুলের কোরকে, পাখীর পাখায়, মানব সংসারে, 
স্থলে জলে শান্ত শিহরণ। বিশ্বময়ী সুচেতনা 
ওঠে জেগে। শ্রুত অশ্রুত ধ্বনি, মর্মরিত সে সঙ্গীত 
দিগ্বিদিকে, দ্যুলোকে ভূলোকে, অনাদ্যন্ত কালের 
তন্ত্রীতে। স্পর্শ তার প্রাণের সংবিৎ, জীবনের স্বর, সুর। 
ছন্দ তার বাজে তালে লয়ে। বাদি, সম্বাদি স্বর-- 
তাও থাকে, সুর পাই কড়ি ও কোমলে ; তবু তান 
সোমে আসে ফিরে। এ জীবন শাশ্বতিক সৃষ্টির সঙ্গীত। 
প্রলয়ের রাত্রি আসে বার বার, বার বার বাঁধ তুমি, 
সুচেতনা, ভ্রষ্ট নষ্ট সেতারের তার-- নিয়ত প্রত্যূষে 
অনন্ত আকাশ মঞ্চে আলোকের মন্দাকিনী তীরে।। 

('শাশ্বতিক' শব্দটি প্রাচীন, বাঙলা অভিধান সম্মত।) 

দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় 
২০/১১/২০২২ 
ব্যাঙ্গালোর। 



মঙ্গলবার, ১৫ নভেম্বর, ২০২২

অভাগীরদের কাঙালীরা (শিশুদিবসে)

ইষ্টিশনে পড়েই থাকে যারা, 
গরঠিকানায় যারাই ঘরছাড়া, 
ফুটপাতে যারা জীবন্ততে মড়া 
তারাও জেনেছে আজকে তাদের পাওনা পাবার দিন। 

সকাল থেকেই নানা লোক আসে, 
কত কি যে দেয়, কত ভালোবাসে, 
ছবি তোলে কেও ডেকে নিয়ে পাশে--- 
মনে হয় যেন শোধ দিতে আসে পুরানো দেনার ঋণ। 


হলুদ দাঁতের দেঁতো হাসি হাসে, 
কথার বদলে হাসে আর কাশে,  
কালো, ছেঁড়া-ফাটা থলি নিয়ে আসে, 
যা পায় তা লুকাবে কি করে ভেবেই আকুল তারা। 

তিনটা কুকুর চেয়ে আছে ঠায়, 
 কেঁদে মিউ মিউ বিড়ালটাও চায়, 
 ইঁদুরও আসবে রাতের বেলায়, 
আবার আছে ভোর না হতেই পুলিশ কাকুর তাড়া। 

তবু তারা চায় এমন দিনটা আসুক বছর বছর--- 
কেক চকোলেট পাবে গোটা গোটা, আরেকটু পাবে আদর।
দুরন্ত গতি গাড়ি, রেলগাড়ি আধুনিকতায় ঠাসা, 
সব কাঙালীরা বুকে বয়ে চলে শিশু দিবসের আশা। 

দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
১৪ই নভেম্বরের, ২০২২ 
ব্যাঙ্গালোর। 

 


 


সোমবার, ১৪ নভেম্বর, ২০২২

শিশু দিবসের স্মৃতি

নাই আবরণ, নাই আভরণ তবু সুন্দর ফুল -- 
উলঙ্গ-দেহে, নিলাজ নাচনে অনিন্দ্য শিশুকুল। 
হাসিরাশি মুখ, জলভরা চোখ, কাদামাটি মাখা পা। 
আঙিনায় ঘোরে, ওঠে আর পড়ে যশোদা মায়ের ছা। 
নাড়ু হাতে নিয়ে হাসে খলখল খায় যত তত ফেলে, 
কাক এসে যেই নিয়ে গেল কেড়ে গলে গেল আঁখিজলে। 
পিসি কোলে তুলে মোছায় আঁচলে, দিদি এসে দিল বকা, 
 মা এসে যেই সামনে দাঁড়ায় দুহাত বাড়ায় খোকা। 
 ঠাকুমার হাতে নাড়ু দেখে শেষে ফোকলা মুখের হাসি-- 
ভূবন ডাঙায় কে বাঁশী বাজায়, ''ভালোবাসি, ভালোবাসি।" 

স্মৃতির আকাশে এই ছবি ভাসে, হারালো সে কত দূরে, 
কোন্ নদী পারে, পল্লীকুটীরে দুখভরা সুখপুরে। 
আজ দেখি ওই নীলিমা নিলয়ে খোলা জানালার ধারে 
শৈশব কাঁদে শাসনের ফাঁদে নীরব অশ্রু নীরে। 
খেলনার স্তুপ মরুবালুরাশি, দূরদর্শনশিখায় 
কোমল বুকের আবেগের স্রোত 'মাইক্রোওভেনে' 
 পোড়ায়। 
'ভালো ছিল' বা 'ভালো নয়', আপ্তবাক্য--অর্বাচীনের কথা।  
সভ্যতার দাবি মেনে নিতে হবে, নাই তার অন্যথা।। 

দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
১৪ই নভেম্বর, ২০২২ 
ব্যাঙ্গালোর।




      

 

শুক্রবার, ১১ নভেম্বর, ২০২২

রবীন্দ্রনাথ ও বর্ষা

বর্ষা ও রবীন্দ্রনাথ 


গীতবিতান -য়ের প্রকৃতি পর্যায়ের আটটি (গীতাষ্টক)  অনন্যসাধারণ গান অবলম্বন করে এই আলোচনা। এই আলোচনার হেতুটি নিজের উপলব্ধি ও অনুভবকে একমাত্র সত্য বলে' প্রতিষ্ঠা করা নয় ; শুধু আমার চেতনার সীমিত পরিসরে  ততটুকু ধরা পড়েছে তাই আমার পাঠকদের কাছে নিবেদন করা। রবীন্দ্রনাথ বিশ্বকবি। বিশ্বকবি এই কারণেই যে, যে দেশের যে মানুষ  রবীন্দ্রনাথ পড়েছেন, রবীন্দ্রনাথের গান শুনেছেন, তিনিই ভেবেছেন, 'এ তো আমারই কথা'। তিনি ম্যাকমিলন হোন, ইয়েটস হোন, রোমা রঁলা বা  ভিক্টোরিয়া  ওকাম্পো। জগদীশ বোস বা শঙ্খ ঘোষ। (কোটিতে গুটি কয়েক নাম)। আমি বা তুমি। একই  রবীন্দ্রনাথ অনন্ত হৃদয় মুকুরে অন্তহীন বিচিত্র রূপে  প্রতীয়মান। তাঁর ভাবদ্যুতি রবিকরসন্নিভ বিশ্বচরাচরে পরিবব্যাপ্ত। তবে সূর্যালোক তৃণদলস্থিত শিশিরবিন্দুতে যতটুক ধরা দেয়  সেটুকুই তৃণের সম্পদ, তার ঐশ্বর্য। 

                                 দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়


সংস্কৃত, মৈথিলী ও বাঙলা সাহিত্যে বর্ষা এসেছে একটি স্বতন্ত্র বিষয় রূপে। তার নিজস্ব ভাব আছে,  ছন্দ আছে, রস আছে, 
 
 "তিমির দিক ভরি ঘোরা যামিনী 
অথির বিজুরিক পাঁতিয়া। 
বিদ্যাপতি কহ কৈছে গোঁয়ায়বি 
হরি বিনা দিন রাতিয়া।।" 
 এখানে বিদ্যুৎদীপ্তিপ্রজ্বলিত, বজ্রনিনাদিত, ঘনঘটা-সমাচ্ছন্ন, অন্ধকার-ঘোর বর্ষারাত্রির কথাই  প্রধান। হরি---যিনি প্রভূ, প্রিয়, প্রেমিক ---তিনিও অপ্রধান নন। তাঁকে প্রয়োজন, কিন্তু এই ‌'বর্ষার' অনুসঙ্গ ছাড়া তিনি  যে নিরাবলম্ব। 
তাই বলা, বর্ষা, বাঙলা দেশের, বাঙলার সাহিত্য  সৃজনের একটি অনন্য ও অনুপেক্ষণীয় বিষয়। এই  শ্যামলাঞ্চলা বঙ্গভূমিতে তাপদহনদগ্ধ গ্রীষ্মের  অন্তিমে ভৈরব হর্ষে, ঘনগৌরবে নবযৌবনা বরষার সমাগম ঘটতেই এই বাঙলার শতেক যুগের  কবিদল মিলে রচনা করে এসেছেন শতেক যুগের  গীতিকা। এই শত শত যুগের, শত সহস্র কবির, বর্ষণধারা অভিসিঞ্চিত কাব্যস্রোত যে যুগন্ধর  মহাগীতিকবির সৃষ্টিতে মিলিত হয়ে বাঙলা  সাহিত্য-সমুদ্রে অতলান্ত গভীরতা ও আকাশচুম্বি  রসোচ্ছ্বাস সৃষ্টি করেছে, তিনি রবীন্দ্রনাথ।  রবীন্দ্রনাথের বর্ষাকে বা বর্ষার রবীন্দ্রনাথকে তাই, ভাষায় নবনির্মান করা আর পদ্মা-মেঘনার  শ্রাবণ-প্লাবনে ভেসে যাওয়া সমার্থক। যে ভাবে, যে ভাষায়, যে ছন্দ-অলঙ্কার-ধ্বনির ঐশ্বর্য দিয়ে কবি  বর্ষাবরণ করেছেন, বর্ষাবর্ণন করেছেন, কখনো  কখনো মনে হয় তা যেন ঐশ্বরিক। কথা থেমে যায়  মুগ্ধতার আবেশে। 
আবার 'বর্ষা ও রবীন্দ্রনাথ' -- এই বিষয়টি নিয়ে  কিছু বলবার ইচ্ছাটিও আছে, কিন্তু ভেবে দেখলাম  আকাশগঙ্গার উৎস খুঁজে, সেখান থেকে সঙ্গম  পর্যন্ত মানসভ্রমন এক জন্মের সাধনায় সম্ভব নয়, শত জন্মের তপস্যা। তাই ছেড়ে ছেড়ে যাই। তাঁর  কাব্যে, তাঁর ছোট গল্পে, উপন্যাসের প্রক্ষিপ্ত স্থানে,  প্রবন্ধে বর্ষার যে রঙ, যে ভাব , যে সৌন্দর্য রূপে  রসে উদ্ভাসিত সেগুলি মাথায় তোলা থাক্। আমি  বরং ''গীতবিতান''-য়ের দিকে দৃষ্টিপাত করি। না না, 
 গীতবিতান মহাসাগর নয়, তার কূলে বসে কয়েকটি ঝিনুক কুড়াই। দেখি তো, ভাগ্যে মুক্তা জোটে কিনা। জুটলেও চিনতে পারি, কি পারিনা!  

গীতবিতানে প্রকৃতি পর্যায়ে বর্ষার গান আছে মূলত  ১১৪টি। যদিও গীতবিতান-য়ের বিভিন্ন সংস্করণে (এখন  তো জানা অজানা বহুবিধ প্রকাশনা সংস্থা বিচিত্র সব  গীতবিতান প্রকাশ করে চলেছে) সংখ্যাটির ইতর বিশেষ  রয়েছে। এইসব বর্ষার রবীন্দ্রসঙ্গীত, বা রবীন্দ্রনাথের বর্ষার গানগুলির মধ্যে কয়েকটি গানের বাণী শুনি। 
বাণী -- রবীন্দ্রনাথের গানের বাণীতেই আমাদের  মতো সাধারণ রবীন্দ্র ভক্তদের সামান্য অধিকার। সুর কানে বাজে, বাণী বুকে তোলে আনন্দ বেদনার তরঙ্গ কল্লোল। যাঁরা সঙ্গীত শিল্পী তাঁরা আরও গভীরে ডুব দিতে পারেন। কোন্ রাগে সে গান আশ্রিত, কোন্ সে তাল, অন্তরা, সঞ্চারী, আভোগের বিভাজন, ছন্দ-লয়-মিড় --  এ সমস্ত  আঙ্গিকের সুষম বিন্যাসে ও ব্যঞ্জনায় যাঁরা গানের  মূর্তি গড়ে তোলেন এবং আপন কণ্ঠমাধূর্যে শ্রোতার  হৃদয়-শতদলে প্রতিষ্ঠা করেন তাঁরা রবীন্দ্রসঙ্গীতের  প্রকৃত রসভোক্তা। আমাদের আলোচনা বাণীর  মধ্যেই সীমাবদ্ধ। তাও আবার মাত্র কয়েকটি (নিয়েছি আটটি গান) গানের বাণী, যেগুলি শুধুই  বর্ষাপ্রকৃতির রূপ চিত্রায়নের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়।  এই গানগুলিতে কবির সঙ্গে কেউ আছেন বা নেই।  "এসেছিলে তবু আস নাই, জানায়ে গেলে।" কে তিনি ? 
 
১) 'আমার দিন ফুরালো ব্যাকুল বাদল সাঁঝে' ---গানটিতে শেষের অন্তরা, 

"দূরের মানুষ যেন এলো আজ কাছে , 
তিমির আড়ালে নীরবে দাঁড়ায়ে আছে। 
বুকে দোলে তার বিরহ ব্যথার মালা 
গোপন-মিলন-অমৃতগন্ধ ঢালা। 
মনে হয় তার চরণের ধ্বনি জানি 
হার মানি তার অজানা জনের সাজে।।" 

কে এই "দূরের মানুষ", কোন্ সে সাজে এসেছে সে,  যে আবরণ, যে আভরণ কবির কাছে অচেনা ? আবার তার চরণের ধ্বনি জানা ! অপরিচিতের বেশ ধরে যে এসেছে সে দূরে গিয়েছিল চলে।  কেনই বা ? এতো কালের বিরহ ব্যথার অবসান  হোক, এই হৃদয়ের আকুতি নিয়ে "গোপন-  মিলন-অমৃত-গন্ধ-ঢালা" ফুলমালা বুকে নিয়ে  এসেছে সে বাদল সন্ধ্যার অন্ধকারে ! এই 'দূরের  মানুষ' তো বৈষ্ণব পদাবলী সাহিত্যের কবি  চণ্ডীদাসের (অভিসার অভিলাষিণী রাধার) প্রেমাস্পদ নন। 

"এ ঘোর রজনী মেঘের ঘটা কেমনে যাইব বাটে। 
 আঙিনার মাঝে তিতিছে বঁধুয়া দেখিয়া পরাণ ফাটে।।" 

 তা হলে ? 
এবার আরেকটি গানে যাই, 

২) "তিমির অবগুণ্ঠনে বদন তব ঢাকি' 
কে তুমি মম অঙ্গনে দাঁড়ালে একাকী।" 
                                (রাগ- হাম্বির) 
গানের শেষ, আভোগ--- 
"রয়েছি বাঁধা বন্ধনে, ছিঁড়িব, যাব বাটে --- 
যেন এ বৃথা ক্রন্দনে এ নিশি নাহি কাটে। 
কঠিন বাধা লঙ্ঘনে দিব না আমি ফাঁকি।" 

মনে হবে এ যেন বৈষ্ণব কবি গোবিন্দ দাসের পদ, 
"দশ দিদি দামিনী দহন বিথার /হেরইতে উচকই লোচন তার/ইথে যদি সুন্দরী ত্যজবি গেহ/ প্রেমক লাগি  উপেখরি দেহ।।" 

কেন প্রেমের টানে দেহের মায়া উপেক্ষা করে বরিষণ  বিঘ্নিত পথে যাত্রা করতে হবে প্রিয়তমের উদ্দেশে; কেন  না, "হরি রহু মানস সুরধুনী পার।" 
কঠিন কঠোর বাধার বন্ধন ছিন্ন করে কবিকে যেতে হবে কোথায় ? কবি 'বাটে' শব্দটি প্রয়োগ করে কোন্  প্রেমাভিসারের ইঙ্গিত দিয়েছেন এখানে? মানস সুরধুনী পারে , বৈষ্ণব পদকর্তা কল্পিত 'হরি'-ই কি কবির উদ্দিষ্ট জীবনবল্লভ ? না, তা নয়, তা নয়। 

৩) "আজি বরিষণ মুখরিত শ্রাবণ রাতি।" 
(রচনা ১৯৩৫, তাল কাহারবা, রাগ পঞ্চম) 

"আজি বরিষণ মুখরিত শ্রাবণ রাতি, 
স্মৃতি বেদনার মালা একেলা গাঁথি।" 
এই গানটির দ্বিতীয় অন্তরা--- 

আজ কোন ভুলে ভুলি আঁধার ঘরেতে রাখিনু দুয়ার খুলি, 
 মনে হয় বুঝি আসিছে সে মোর দুঃখ রজনীর সাথী। 
 .....আজি বরিষণ মুখরিত ....।। 
 
প্রতীক্ষা, প্রতীক্ষা! সে, আমার দুঃখময় রাত্রির নির্জন  একাকীত্বের এক মাত্র সাথী । সে আসবেই, তাই খুলে  রেখেছি ঘরের দুয়ার। 

"ওই আসে, ওই আসে, সে যে আসে। 
(আমার)বেদনার মাঝে সান্ত্বনা হয়ে চিরপ্রশান্ত আসে।।" 
 
বৈষ্ণব সাধনার এই অনন্যা, অবিচলিত ভক্তি দ্বারা  অর্জিত একান্ত বিশ্বাসের অনুরণন পাই না কি এই  গানটিতে ? তা হোলে রবীন্দ্রনাথের অধ্যাত্ম দর্শন  কি বৈষ্ণব সাধনার সমগোত্রীয় ? না, তেমনটি তো  নয়। 

৪) "ওগো আমার শ্রাবণ মেঘের খেয়া তৈরীর মাঝি," 
 অশ্রুভরা পূবের হাওয়ায় পাল তুলে দাও আছি।" 

গানের শেষ পঙক্তি, 
"আকাশভরা বেদনাতে রোদন উঠে বাজি।" 
এখানে আবার ভোর বেলাকার সাথী-হারা কবির বিরহ বেদনা আকাশের বাদল মেঘের খেয়ায় পরিব্যপ্ত  আকাশে আকাশে, বিশ্ব চরাচরে। কে সে? কার জন্য এই আকাশ ভরা মেঘের মতো অসীম রোদন? সে কি শুধুই বন্ধু ? যাকে তিনি অন্য একটি গানে বুকভরা  আর্তি নিয়ে বলছেন ---- 

৫) "বন্ধু, রহো রহো সাথে।" 

"বন্ধু রহো রহো সাথে  
আজি এই সঘন শ্রাবণ প্রাতে  
ছিলে কি মোর স্বপনে সাথী হারা রাতে। " 
স্বপ্নে পাওয়া বন্ধুর জন্যই কি বিরামহীন বারিধারা- বিধৌত শ্রাবণ দিন ব্যর্থ হয়ে যায় ? এবার দেখি অন্য  একটি গানের বাণী ---- 

৬) "ঝরে ঝর ঝর ভাদর বাদর, বিরহকাতর শর্বরী।" 
"ঝরে ঝর ঝরো বাদর ভাদর বিরহকাতর শর্বরী। 
 ফিরিছে এ কোন অসীম রোদন কানন কানন মর্মরি।" 

কার বিরহের অসহ বেদনায় দুখ-নিশি ভোর হয়েছে কবির? এ কী প্রিয়তমের সান্নিধ্যবঞ্চিত কৃষ্ণহারা  শ্রীরাধার সেই বিরহ বেদনার হাহাকার, 
'এ ভরা বাদর মাহ ভাদর শূণ্য মন্দির মোর।' 
তাও নয়। 
রবীন্দ্রনাথের প্রায় আড়াই হাজার গান অদ্যাবধি  সঙ্কলিত। সমস্ত গানই এক একটি অতুলনীয়  গীতিকবিতা। বিশ্বের কোন কবি, কোন সঙ্গীতস্রষ্টা এমন বিস্ময়কর সৃষ্টি রেখে যেতে পারেন নি। প্রতিটি গীতিকবিতা অনাস্বাদিতপূর্ব ভাবের ব্যঞ্জনায় অসীমের বাহন, মহাকাশের চিরপ্রভ  নক্ষত্রের মত প্রদীপ্ত। এই নক্ষত্রমণ্ডলীর মধ্যে  কয়েকটির অন্তর্নিহিত তাৎপর্য ও দ্যোতনা উপলব্ধি  করবার জন্য যে তন্ময়তা ও সাধকোচিত তপস্যার  প্রয়োজন তা আমাদের সাধ্যাতীত। প্রকৃতি  পর্যায়ের, বর্ষা পর্বের গানগুলির মধ্যে তেমনিই  একটি গান---- 

৭) "শ্রাবণ ঘন গহন মোহে গোপন তব চরণ ফেলে," 
গানটির শেষের দুটি স্তবক--- 

"কূজন হীন কাননভূমি দুয়ার দেওয়া সকল ঘরে। 
একেলা কোন্ পথিক তুমি পথিক হীন পথের 'পরে ।। 

হে একা সখা, হে প্রিয়তম, রয়েছে খোলা এ ঘর মম 
 সমুখ দিয়ে স্বপন সম যেয়ো না মোরে হেলায় ঠেলে।।" 

কে এই 'সখা' , 'প্রিয়তম' সম্বোধিত একলা পথিক ? 
তা হোলে, বঙ্গদেশের লোকায়ত দর্শনের যে ভক্তিবাদ, পরম বৈষ্ণব কৃষ্ণদাস কবিরাজ রচিত শ্রী শ্রীচৈতন্য  চরিতামৃত বর্ণিত, ভাগবতীয় ভক্তিযোগের সঙ্গে  রবীন্দ্রনাথের ধর্মদর্শনের যোগ আছে কি ? থাকার  কথাও, কেন না, ভক্ত রবীন্দ্রনাথের রূপ তো মহাপ্রভূ  শ্রীচৈতন্যদেবের সঙ্গেই তুলনীয়। 

''তব দয়া দিয়ে হবে গো মোর জীবন ধুতে'', ''মাঝে  মাঝে তব দেখা পাই'', '"তোমার পূজার ছলে তোমায় ভুলে থাকি'',  "প্রভূ আমার, প্রিয় আমার,  পরমধন হে", ''নয়ন '"তোমারে পায় না দেখিতে  রয়েছ নয়নে নয়নে," প্রভৃতি (মাত্র কয়েকটি  উদাহরণ) গানে ভক্ত হৃদয়ের যে আকুতি, যে দরবিগলিত ভক্তিরসধারা বর্ষণধারার মতো ঝরে পড়ে সেই রবীন্দ্রমনন ভক্তিমার্গের কোন্ অত্যুচ্চ  চূড়ায় অবস্থান করে তা কি অনায়াসে অনুমেয় ?  

তবুও রবীন্দ্রনাথ বৈষ্ণব নন, তিনি শাক্ত তো নৈব  নৈবচ। তিনি, একথা যেন ভুলে না যাই যে, মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের সন্তান। রাজা রামমোহন রায়ের ভাবশিষ্য, ব্রাহ্ম ধর্ম নির্দিষ্ট, ব্রাহ্ম সমাজ অনুসৃত, উপনিষদ বর্ণিত নিরাকার ঈশ্বর বিশ্বাস  তাঁর রক্তে, তাঁর সংস্কারে। তবে কে তাঁর সখা,  প্রিয়তম, প্রেমাস্পদ? শুধু ঘরের দুয়ার নয়,  মেঘমন্দ্রিত আষাঢ়ে, বর্ষণধারা পরিপ্লাবিত শ্রাবণে,  'ভরা বাদর মাহ ভাদরে', ঘনান্ধকার রাত্রিতে,  রবিকরলুপ্ত দিনে তাঁর একান্ত আপনজনটি কে? তার কী  বা রূপ দেখেছিলেন সেই কবি যে কবি সকল রূপের  সীমানা ছাড়ায়ে অরূপরতন খুঁজেছেন  জীবনভর ? 
রবীন্দ্রনাথ তাঁর মধ্য জীবনে ব্রাহ্ম সমাজ থেকে  বেরিয়ে এসে আরো কঠোরভাবে বৃহত্তর ও প্রাচীন  রক্ষণশীল হিন্দুত্ব ও হিন্দু সমাজকে আঁকড়ে ধরেছিলেন। কিন্তু তিনি যে রবীন্দ্রনাথ। 'চরৈবেতি' মন্ত্র যে তাঁর অন্তর বলাকার। এবারে সোজা গিয়ে ঢুকলেন তাঁর গোপন বিজন হৃদয়কক্ষে, আত্মমগ্ন  হলেন সেই মরমিয়া সাধনায় যাতেঃ 

"তুমি একা আর আমি একা, কঠোর মিলন -মেলা।" 

এই 'তুমি '- সাথে বিরহ-মিলন, মান-মাথুর-রাস  লীলা বাকী সারাটি জীবন।"সঘন গহন রাত্রি"-তেই  প্রিয়তমের জন্য এমন অসহ ব্যাকুলতা। 
"আকাশ কাঁদে হতাশসম, নাই যে ঘুম নয়নে মম-- 
দুয়ার খুলি হে প্রিয়তম, চাই যে বার বার। 
আজি ঝড়ের রাতে তোমার অভিসার।।" 
৮) আরেকটি গান আমাদের ভাবনার জগৎটিকে  আলোড়িত করে তোলে। সেটি হলো গীতাঞ্জলির এক শত সংখ্যক গানঃ 

"আজ বরষার রূপ হেরি মানবের মাঝে।" 

মানুষ নয় 'মানব'। 'মানব' বলতে দেবতার বিপরীতে জীবশ্রষ্ঠ, বিশ্বপরিব্যপ্ত এক মহান চৈতন্যসত্বার প্রাণময় পার্থিব মূর্তি চোখের সামনে  ভেসে ওঠে। দেবতার কথা যখন মনে হয় তখন সে  তো বিমূর্ত সত্বা, বাস তাঁর কল্পনার স্বর্গধামে। এই  মাটির পৃথিবীতে 'শ্যাম  গম্ভীর সরসা' বর্ষণধারার সঙ্গে  সেই স্বর্গবাসী, চিরবসন্ত-বিলাসী দেবতা বা দেবতাদের সম্পর্ক কোথায়? বর্ষা তো এই ধরিত্রীর  বুকে সৃজন রস। বর্ষার ---"ঘন গৌরবে নবযৌবনা বরষার" ছায়াময়ী কায়ার মায়াময়ী রূপ, এই  পৃথিবীর অনাদিকালের মানবের --- জন্মের পর  জন্মের মধ্য দিয়ে অন্তহীন প্রাণের বিকাশ তীর্থে  যাত্রা করে চলেছে যে মানব --- তার নিত্য নব সৃষ্টির, এমনকি আত্মসৃষ্টিরও মূর্তিমতী প্রেরণা। 
গানের শেষ স্তবকে, আভোগ অংশে গীতিকার  বলছেন, 

দিগন্তরালে কোন্ ভবিতব্যতা 
স্তব্ধ তিমিরে বহে ভাষাহীন ব্যথা --- 
কালো কল্পনা নিবিড় ছায়ার তলে 
ঘনায়ে উঠিছে কোন আসন্ন কাজে।। 
আজ বরষার রূপ হেরি মানবের মাঝে...।। 

সুধী পাঠক, ভাবুন। আপনার ভাবনাতেই ধরা পড়বে কবির এই মহাভাব । 
একেই বলে সৃষ্টির অতল রহস্য। সেই সময়কার  রচয়িতার মনের নিগূঢ় অনুভব এতে প্রকাশ পেয়েছে। শুনে আমরা মুগ্ধ হই কিংবা ভেদ করতে পারিনা সৃষ্টি বীজের আবরণ। 

                         ক্রমশঃ 
(এই প্রবন্ধটি পত্রিকায় যাঁরা পড়েছেন তাঁদের অনেকের  অনুরোধে রবীন্দ্রনাথের গান নিয়ে দীর্ঘ আলোচনার  ইচ্ছা রইল।)

দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় 
১১ই অক্টোবর ,২০২২ 
শিলিগুড়ি।________________________________________







              



















শনিবার, ৫ নভেম্বর, ২০২২

Sabitri

যদি ঈশ্বরের করুণা পাই তবে এই মহাগ্রন্থটির কিছু অংশ কবিতায় অনুবাদ চেষ্টা করব।

Recently published

অমূল্য

He ( Tagore) who sees all things in his own self and his own self in all things, he does not remain unrevealed.                     ...