বৃহস্পতিবার, ২২ মে, ২০২৫

Call of Innocence

Call of Innocence

The blooming of lotuses early at dawn,
The melodious morning songs of birds,
The solacing tune of the Sanai in the Vairabi,
The golden tips of the rising sun at the farthest hilltops.
The crimson shyness that adorns veils
Of newly-married belles in their dreams.
And the mother's call, "Get up my child,
See Gopal, your friend, is set for school." 

Memories of these all written in golden letters
Still illuminated, flash before my eyes and
Like morning dew tears soak my soul.
And I roam about in quest of those by-gone days.
And suddenly I heard a gaggle of lads and lasses,
Cooing, laughing and dancing in a perk.
Their joyous crackle filled my heart with hope and bliss.
Within their rapture I regained my long-lost world of innocence.

Dulal Chandra Bandyopadhyay
22/05/2025
Kolkata
__________________________________________ 

বুধবার, ২১ মে, ২০২৫

মুণ্ডক উপনিষদের একটি মন্ত্র

মুণ্ডক উপনিষদের একটি মন্ত্র

"যঃ সর্বজ্ঞঃ সর্ববিদ্ যস্যৈষ মহিমা ভুবি
দিব্যে ব্রহ্মপুরে হ্যেষ ব্যোম্ন্যাত্মা প্রতিষ্ঠিতঃ।
মনোময়ঃ প্রাণশরীরনেতা প্রতিষ্ঠিতোহন্নে 

হৃদয়ং  সন্নিধায় তদ্বিজ্ঞানেন 

 পরিপশ্যন্তি ধীরাঃ আনন্দরূপংম্ 

অমৃতং যদ্বিভাতি ---"

যিনি সব জানছেন, সব দেখছেন, এই বিশ্ব তাঁর মহিমা। তার মহিমা শুধু বাহ্যপ্রকৃতিতে নয়, শুধু দেশ কালে ব্যাপ্ত প্রকৃতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, তাঁর মহিমা মানুষের অন্তরেও, মানুষের সত্তার গভীরেও বিকশিত। তিনিই আত্মা। সেই আত্মা, মানবের অন্তরে যিনি মানবাত্মা যা ব্রহ্মের জ্যোতির্ময় পুরী, সেখানেই বাস করেন। তিনি মন ও চিন্তারূপে অভিব্যক্ত হন, মানবের মন ও প্রাণের যে শক্তি  তিনি তার মধ্যে বা মাধ্যমে, হৃদয়ে অবস্থিত থেকে,  মানবের জড়দেহে কর্মের উদ্যোগ নিয়ে আসেন। বিবেকবান প্রজ্ঞাবান লোকেরা তাঁকেই ভিতরে বাইরে সর্বত্র উপলব্ধি করেন। তিনিই আনন্দস্বরূপ, অমৃতস্বরূপ, যার মহিমা দৃশ্যমান বিশ্বে উপচে পড়ছে।‌ 


সৃষ্টি এবং স্রষ্টার মধ্যে একটি অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক আছে। সেইটি যিনি উপলব্ধি করেন তিনিই ধার্মিক, তিনিই সাধক, তিনিই কবি। একথা ঠিক যে, ধর্মের মূলে দুটি বিভাগ আছে। একটি দর্শন বিভাগ, অন্যটি আচরণ বিভাগ। দর্শন বিভাগটিকে 'শ্রুতি'  এবং 'আচরণীয়' ভাগটিকে 'স্মৃতি' বলাই যুক্তিযুক্ত।
শ্রুতি বিভাগটি সমস্ত ধর্মের ক্ষেত্রে প্রায় একই। ঈশ্বর এক, অদ্বিতীয়। তিনি এই সৃষ্টির স্রষ্টা, পালনকর্তা, রক্ষাকর্তা এবং সংহারকর্তাও। বিশ্বে যত বড় বড় ধর্ম বা 'ঈশ্বরসংক্রান্ত' বা 'সৃষ্টি ও স্রষ্টা- কেন্দ্রিক'  মতবাদের জন্ম হয়েছে, যেমন পারসিক, ইহুদী, খ্রীষ্টান, ইসলাম--- এই সকল ধর্মমতগুলির যাঁরা জন্মদাতা বা প্রবর্তক যেমন জরাথুষ্ট্র, মোসেস, যীশু খ্রীষ্ট, হজরত মোহম্মদ --- এঁরাই পরবর্তীতে 'ঈশ্বরপ্রমান' হয়ে গিয়েছেন। তাঁরা বলেছেন তাঁরা ঈশ্বরের দূত বা ঈশ্বরের সন্তান বা ঈশ্বর-প্রেরিত পুরুষ --- পয়গম্বর বা অবতার বা ঈশ্বরের সন্তান। রবীন্দ্রনাথ এই সমস্ত 'ঈশ্বরপ্রমাণ' মানুষদেরকে স্বর্গের দূতরূপেই সম্বোধন করেছেন। 


"ভগবান তুমি যুগে যুগে দূত পাঠায়েছ বারে বারে
দয়াহীন সংসারে।
তারা বলে গেল ক্ষমা করো সবে, বলে গেল ভালবাস,
অন্তর হতে বিদ্বেষবিষ নাশো ...." 

এনাদের বাদ দিয়েও জৈনমুনি মহাবীর বর্ধমান, শাক্যমুনি তথাগত গৌতম বুদ্ধ, প্রেমাবতার মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্যদেব, সর্বধর্মসমন্বয়ী শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব --- তাঁরাও তো এই মাটির পৃথিবীতেই বিচরণ করে গিয়েছেন। তাঁরা কেউই এই  বস্তুজগৎ ও প্রাণময় জগৎ-প্রপঞ্চকে  অস্বীকার করে' আপন আপন মোক্ষলাভের আকাঙ্ক্ষায় সংসার-বিবিক্ত, মানবতা-নিরপেক্ষ জীবনাচরণ অবলম্বন করেন নি। গৃহত্যাগ করেছেন, সন্ন্যাস নিয়েছেন, কঠোর কঠিন সাধনায় মগ্ন থেকেছেন জীবনের উর্বর সময়কালে। সর্বস্ব ত্যাগ, অপার তিতিক্ষার মধ্য‌ দিয়ে, দু্ঃখময় সংসার থেকে মুমুক্ষুত্ব অস্বীকার করে সে সকল মহামানব মানুষকে মনুষত্ববোধে উদ্বোধিত করবার সাধনায়, মানুষের সঙ্গে থেকেই জীবনপাত করে গিয়েছেন। তাঁরা সকলেই 'একটিই' এবং বিশেষরূপে একটিই অমৃত বাণী, সাধনালব্ধ সত্য উচ্চারণ করেছেন, "হে মানব, দেখ তুমিই ঈশ্বর, তোমার মধ্যেই স্রষ্টার ও তাঁর  সৃষ্টির ঐশ্বর্য রয়েছে। উপলব্ধি কর।"
মানুষের মধ্যেই স্রষ্টার ও সৃষ্টির সমস্ত গুণ যে বিদ্যমান তা উপলব্ধি করেন 'বিবেকবান ও প্রজ্ঞাবান' যাঁরা ; কিন্তু তাঁদের স্তরের বাইরে যারা আছে, আমাদের মত জৈবিক জীবনের ক্ষু্ৎপিপাসা নিয়েই নিরন্তর সংগ্রামরত, তাদের আত্মোপলব্ধি উপায় কি ? তাদের উপায় তাই করা যা তাদের জীবনধারণের সহায়ক। এবং তাই মানুষ করে। বিশ্বপরিব্যপ্ত মানবসংসারে নিত্যদিনের যে কর্মধারা তা ওই জীবনধারণের জন্যেই। কিন্তু এখানেই একটি সূক্ষ্ম ব্যতিক্রম আছে। বেঁচে থাকার জন্য যে যে কাজ মানুষ করে -- কৃষিকাজ, পশুপালন, আবাস ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী নির্মাণ (ঘরামী, কুম্ভকার, কর্মকারদের কাজ) ছাড়াও এমন অনেক সৃজনশীল কাজ মানুষ করে, যা শুধুমাত্র জৈবিক জীবনের প্রয়োজনে নয়, আত্মিক সত্তার আনন্দ লাভের তাগিদে। এই 'তাগিদ' প্রাণরক্ষার কর্মপ্রবনতার চাইতেও তীব্রতর এবং তাই বা তার জন্যেই প্রকৃতির দেওয়া পৃথিবীটাকে মানুষ নিজের মত করে গড়ে নিয়েছে, গড়ে নিচ্ছে। সঙ্গে সঙ্গে দেহাতিরিক্ত যে মননজগৎ, আবেগময় হৃদয়পুর সেখানেও তার অহেতুক লীলাবিলাস -- অপরূপ সাধনা। শিল্প সাহিত্য স্থাপত্য  ভাস্কর্যের সৃজনপ্রয়াস। 


এইখানেই মানুষ আর ঈশ্বরের একত্বের ভাব। তবে এই 'একত্ববোধ' সাধনসাপেক্ষ। এই সাধনার পথ যিনি দেখান, জ্ঞানরূপ পাথেয় যিনি দান করেন তিনিই ঈশ্বরের দূত, তিনিই অবতার বা 'ঈশ্বরপ্রমাণ' মানুষ। তিনি সাধারণ মানুষের মধ্যে অজ্ঞান-তিমিরে আচ্ছন্ন চৈতন্যসত্তাটিকে জাগিয়ে তোলেন। কিন্তু তাই কি মানবসমাজে হয়েছে বা হয় ? হয় নি এবং হয় না।
এমন 'পত্রপাঠ' অস্বীকার নির্বিচারের সমার্থক মনে হলেও  এই 'অ-স্বীকৃতি' সত্য। কেননা মানুষের অন্তরের ভিতরকার সুপ্ত দেবত্বকে জাগ্রত করবার শিক্ষা থেকে আমরা আলোকবর্ষ দূরে রয়েছি। যে শিক্ষা শুধুমাত্র জৈবিক জীবনধারণের 'উপায়গুলির' সন্ধান দেয়, জীবনাচরণের, জীবনানুসন্ধানের অনুসন্ধিৎসায় প্রাণিত করে না, তেমন শিক্ষাব্যবস্থা রূঢ় বাস্তবতার পক্ষেই সওয়াল করে, দৃশ্যমান জগতের কথা বলে। কিন্তু কঠোর বাস্তবতা নিরপেক্ষ, দৃষ্ট-জগতের অতীত এমন কিছু স্বপ্ন-কল্পনা, আবেগ-অনুভূতি আছে যেগুলি না থাকলে মানুষ ও মনুষ্যেতর প্রাণীর মধ্যে পার্থক্য থাকে না। স্বপ্ন ও কল্পনাই মানুষের সৃজনশীলতার উৎস যা সভ্যতার পথে মানুষকে উত্তরোত্তর ক্রমোত্তরণের সীমান্তপারে পোঁছে দিয়েছে এবং অন্তরের আবেগ ও হৃদয়ের অনুভূতি মানুষের সেই অদৃশ্য চিত্তধর্ম যা মানুষকে বিশ্বমানবতার সঙ্গে যুক্ত করেছে, জৈবিক দেহাতিকা বোধের গন্ডীবদ্ধতা থেকে মুক্ত করেছে। বাস্তবানুগ শিক্ষায় আজ মানুষ জল-স্থল-আকাশ-বিজয়ী, কিন্তু অদৃশ্য চিত্তধর্মের শিক্ষায় আমরা আত্মজয়ী হতে পারিনি। যে আত্মজয়ের দ্বারা মানুষ তার সমস্ত হীনতা, দীনতা, সংকীর্ণতার নাগপাশ ছিন্ন করে বলতে পারবে,
শৃন্বন্তু বিশ্বে অমৃতস্য পুত্রাঃ।
আ যে দিব্যানি ধামানি তস্থু ।।
পরাহমেকং পুরুষং মহান্তং।
আদিত্যবর্ণং তমস পরস্তাৎ।।
হে বিশ্বের অমৃতের পুত্রগণ, তোমরা শোন  ; সমস্ত তমসার (অন্ধকারের)পরপারে আদিত্য বর্ণের যে জ্যোতির্ময় মহান পুরুষ বিরাজমান, তোমরা তাঁরই সন্তান।  

জগৎসংসারের সকল মানুষ 'অমৃতস্য পুত্রাঃ' --- তপোবন-ভারতের ঋষিমুখ-নিঃসৃত এমন শিক্ষার দ্বারা যদি এই বোধ জাগ্রত হয় তবে তো বর্তমান (সভ্যতাকে যিনি সংকটাপন্ন দেখে গিয়েছেন) ভারতের ঋষিকবিকে এমন ভর্ৎসনার বাণী উচ্চারণ করতে হোত না,                           
                                  "ক্ষুব্ধ যারা, লুব্ধ যারা
মাংসগন্ধে মুগ্ধ যারা, একান্ত আত্মার দৃষ্টিহারা,
শ্মশানের প্রান্তচর, আবর্জনা-কুণ্ড তব ঘেরি
বীভৎস চীৎকারে তারা রাত্রিদিন করে ফেরাফেরি,
নির্লজ্জ হিংসায় করে হানাহানি।" 

আমাদের 'উপনিষদগুলি' এমন শিক্ষা দান করেন যা মানুষকে পশুত্বের প্রবৃত্তি থেকে মুক্তি দেয়, তার অন্তরের দেবত্বকে জাগ্রত করে। এই মুণ্ডক উপনিষদ এতদূর পর্যন্ত বলেছেন যে মানুষ তার মনুষত্বের সাধনায় স্বয়ং ঈশ্বরের 'ঐশ্বর্য' লাভ করতে পারে। সে বলতে পারে,
"অয়ম্ আত্মা ব্রহ্ম।"
                                    (ক্রমশঃ)

দুলাল চন্দ্র বন্দোপাধ্যায়
২০ মে ২০২৫
কলকাতা।



শনিবার, ১৭ মে, ২০২৫

দেশপ্রেম, শহীদ ও শিশু

দেশপ্রেম, শহীদ ও শিশু 

(ভয়ে বিস্ময়ে চেয়ে চেয়ে দেখে চার বছরের মণি। সে
বুঝতে পারে না ঠাম্মা, মা, দাদু কেন যে বাবার ছবিটা বুকে জড়িয়ে জড়িয়ে ধরছে, দেওয়ালে মাথাগুলো ঠুকছে। কখনো চিৎকার করে সব্বাই মিলে বাবাকে ডাকছে। বাবা কোথায় গিয়েছে !)

হাজার হাজার বছর ধরে এই ছবি দেখে মণিরা।
বুঝতে পারেনা, বোঝাতে পারেনা কী কষ্ট পায় তারা।
দুর্গম কোন্ সীমান্ত দেশে, দুর্বোধ্য কোন্ ডাকে,
যায়‌ যে বাবারা ফিরে না তো তারা মণিরা অনাথা থাকে।
কিসের যুদ্ধ, কে‌ কার শত্রু জানে জগতের রাজারা,
শুধু শুধু কেন না-জানা কারণে শোকে মরে সব শিশুরা ?
মরণোৎসবে বলি হয় যারা, না হয় 'স্বর্গে' গিয়েছে,
চিরদুঃখের নরক-আবাসে শিশুরা কি সুখ পেয়েছে ?
তাদেরই জন্য পৃথিবীটা নাকি হিংসামুক্ত করা,
তাদেরই জন্যে জগৎটা নাকি আশার আলোকে ভরা,
না থাকলে‌ তারা বৃদ্ধ-আবাস হয়ে যাবে সংসার ?
নির্জলা এক মরুভুমি হবে জীবনের পারাবার !
শিশুরাই নাকি বসুন্ধরার সোনার ভবিষ্যৎ  ?
কেন তবে এই অস্ত্র সৃজন, নিঠুর মারণ-ব্রত ?
যত কোটি প্রাণ সমরাঙ্গনে তোমরা দিয়েছ বলি,
তার সমগুণে অনাথিনী মা'র কোল হয়ে গেছে খালি,
অনন্ত কত অসহায় শিশু কেঁদে ফিরে দিশাহারা' ---
যুদ্ধকে যারা ধর্ম ভেবেছে নেবে কি সে দায় তারা ?

দুলাল চন্দ্র বন্দোপাধ্যায় 
১৭ই মে, ২০২৫
কলকাতা।
_____________________________________________




রবিবার, ১১ মে, ২০২৫

জাত্যাভিমান, ধর্মান্ধতা ও গান্ধী

জাত্যাভিমান, ধর্মান্ধতা ও গান্ধী 

আজ ২রা অক্টোবর।

পর পর কয়েকটি পৌরাণিক ও ঐতিহাসিক বাণী উদ্ধার করতে চাই এই কারণেই যে সুধী পাঠকবৃন্দের অন্তঃকরণে স্পষ্ট প্রতিভাত হয়ে উঠবে ধর্মান্ধতা, জাতিবাদ ও রাষ্ট্রবাদের মূল উৎসটি কি ও কোথায়‌। মানুষের আবির্ভাবের উষালগ্নে 'ধর্ম' ছিল মানবতা। ভীষণা প্রকৃতির মারণলিপ্সার বিরুদ্ধে নিজেকে রক্ষা করবার জন্য যেমন নিরন্তর সংগ্রাম ছিল তেমনি ছিল নিজের গোষ্ঠীর সকলকে বাচাঁনোর দায়। সেই 'সংগ্রাম' সেই মানবিক 'দায়' ছিল মানুষের ধর্ম।‌ 

"মহাভারতের শান্তিপর্বে পিতামহ ভীষ্ম বলছেন, সর্বপ্রথমে পৃথিবীত রাজ্য, রাজা, 'দণ্ড', দণ্ডার্হ ব্যক্তি কিছুই ছিল না। মানুষেরা একমাত্র ধর্ম অবলম্বন পূর্বক পরস্পরকে রক্ষা করিত। মানবগণ এইরূপে কিছুদিন কালযাপন করিয়া পরিশেষে পরস্পরের রক্ষণাবেক্ষণ নিতান্ত কষ্টকর বোধ করিতে লাগিল। ওই সময়েই 'মোহ' তাহাদিগের মনোমন্দিরে প্রবিষ্ট হইল। মোহের আবির্ভাববশতঃ ক্রমশঃ জ্ঞান ও ধর্মের লোপ হইতে লাগিল এবং মানবগণ ক্রমে ক্রমে লোভপরতন্ত্র,  পরধনগ্রহণতৎপর, কামপরায়ণ, বিষয়াসক্ত ও কার্যাকার্য-বিবেকশূন্য হইয়া  উঠিল।। এই অবস্থার হাত  হইতে মানুষকে মুক্তি দিবার জন্যে সৃষ্টি হইল রাজা, রাজধর্ম, রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রনীতি।"
      

"আজ সঙ্ঘ পরিবার যে দাবি তুলছে তার অনেকগুলির উৎস গত শতাব্দীর ত্রিশের দশকের হিন্দু সত্তাসংকটে। হিন্দু মহাসভা বলতে থাকে ভারতীয় সংস্কৃতি ও হিন্দু সংস্কৃতি সমার্থক। ভারতীয় জাতীয়তাকে হিন্দু জাতীয়তা হতে হবে। সাভারকার বললেন,  হিন্দুস্থানকে শুধু পিতৃভুমি মানলে চলবে না, পুন্যভূমি বলেও মানতে হবে। এর অর্থ যে মুসলিমরা হবে দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক, তা অনুল্লেখ্য কিন্তু স্পষ্ট।"
                                       -----------অমলেশ ত্রিপাঠী।

১৯৩৯ সালে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের গুরু গোলওয়াকার এক পুস্তিকায় লেখেন ----
"The non-Hindu peoples in Hindustan must either adopt the Hindu Culture and language, must learn to respect and hold in reverence the  Hindu religion, must entertain no ideas but those of glorification of the Hindu race and culture. ... In one ward, they must cease to be foreigners, or may stay in the country, wholly subordinated to the Hidu Nation, claiming nothing, deserving no privileges ----- far less any preferential treatment ----- not even citizen's rights."
         (------We or Our Nationhood Defined) 


বিগত শতাব্দীর সেই ত্রিশের দশকের বিশ্বধংসী বিবাদ। স্লাভ ও ইহুদী জাতিকে অবদমিত করে বিশুদ্ধ আর্যত্বের শ্রেষ্ঠত্ব-ঘোষণা। হিটলার বিষাক্ত শাণিত বক্তব্যে প্রচার করতে লাগলেন সেমেটিক জাতির ষড়যন্ত্রে  আর্য জার্মানী বিপন্ন। ভারতেও সেই একই উচ্চারণ, একই ঘোষণা ! আর এস এস-এর মুখপত্রে সেই একই আসন্ন জাতিদাঙ্গার নরমেধ যজ্ঞে ঘৃতাহুতি ! হিন্দু জাতি, হিন্দু সংস্কৃতির, হিন্দু ধর্ম বিপন্ন ! অপরদিকে, প্রথম দশক থেকেই সৈয়দ আহমদের প্রচার। তার আলীগড় দলের দাবী,--- পৃথক নির্বাচন, বিশেষ গুরুত্ব (weightage). নূতন করে মাথাচাড়া দিয়ে উঠল কুড়ি ও ত্রিশের দশকে। আরও তীব্র, তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল সাম্প্রদায়িক বিভাজন। এখানে উল্লেখ করা দরকার সেই ১৯০৫/'০৬ সাল থেকেই ইংরেজদের divide and rule. কার্জন, মিন্টো, রিজলেদের চক্রান্ত।  ফল হাতে হাতে। ১৯০৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল মুসলিম লিগ, পরের বছর হিন্দু মহাসভা। (প্রাতিষ্ঠানিক নামকরণ ১৯২১, রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ, ১৯২৫)। এর পরেকার ইতিহাস বিসর্পিল, জটীল এবং অমানবিক।

এইভাবে ভারত স্বাধীন হওয়ার বহু পূর্ব-সময়কাল থেকেই ভারতবাসীর ভাগ্য নিয়ন্ত্রণের দায় যাঁরা নিয়েছিলেন তাঁদের অবিমিশ্রকারিতা ও অদূরদর্শিতার  ফলে সাম্প্রদায়িকতা ধীরে ধীরে এমন এক নারকীয় পরিবেশ সৃষ্টি করল যার শেষ, বীভৎস পরিণতি এল ১৯৪৬-সালে। ওই বছর অক্টোবরে মহম্মদ আলি জিন্নার প্রত্যক্ষ সংগ্রামের ডাক, কলকাতার দাঙ্গা, বিহারের দাঙ্গা এবং সমুহ সর্বনাশ --- বাঙলার ইতিহাসের বীভিষিকা নোয়াখালীর গণসংহার---- লুণ্ঠন,  নারীধর্ষণ, শিশু-কিশোর-তরুণ-বৃদ্ধদের নির্বিচারে হত্যা --- ভারতের বুকে দুর্মোচনীয় ভেদরেখা এঁকে দিয়ে দিয়ে গেল চিরকালের জন্য। দাঙ্গা বন্ধ করার তাগিদ নিয়ে, দাঙ্গাবিধ্বস্ত মানুষের আর্তনাদ শোনার আন্তরিকতা নিয়ে, দেশের কোন হিন্দু বা মুসলমান নেতৃত্ব যান নি সেদিন। গিয়েছিলেন আশাহত, বিধ্বস্ত বৃদ্ধ গান্ধী আর দেশের মাতৃসমা নারীনেত্রী সুচেতা কৃপালিনী। কিন্তু তাঁদের দৌত্যও ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছিল কেননা গান্ধীজীর অনুপস্থিতিতেই কংগ্রেস তখন মেনে নিয়েছিল দেশভাগ। মারণলিপ্সার নরমেধ যজ্ঞে পূর্ণাহুতি ! বাঙলা আর পাঞ্জাবের উদ্বাস্তুদের জীবন হয়ে উঠল জীবন্ত নরক। 

(বাঙলার এই মর্মান্তিক ইতিহাসের পুনরাবৃত্তির অবকাশ এখানে নেই। একটি স্বতন্ত্র প্রবন্ধে সেটি লেখার ইচ্ছা রইল)। 

" দেশ স্বাধীন হল, দেশভাগ হল --- রেখে গেল কি গ্লানিময় পঙ্কসয্যা ---- দেশ হারাবার, প্রিয়জন বিচ্ছেদের, গণহত্যা, নারীধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ, লুণ্ঠনের কী দুর্মর দুঃস্বপ্ন ! এই দুঃস্বপ্নের‌ দুর্মোচনীয় অভিশাপ ভারতের  ধর্মীয় রাজনীতিকে পরিপুষ্ট করছিল, (আজও করে চলেছে)। 
গান্ধীর দিকে আঙুল তুলে সেদিন আর এস এস বলেছিল‌, 'হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের কথা বলে দেশের প্রতি সবচেয়ে বিশ্বাঘাতকতা করেছেন তিনি।''
তাই কি 'হিন্দুদের ঈশ্বরের দূত' হয়ে এসেছিলেন তিনি, যিনি তাঁকে তাঁর উন্মুক্ত বুকে গুলি করলেন প্রার্থনা মন্দিরে ? যুগ যুগ আচরিত সনাতন ধর্মের ফরমান নিয়ে ? অহিংসার পূজারীর শোণিতার্ঘ্য দানের পরেও কি দেশমাতৃকার আরও বলি চাই ? আরও রক্তাঞ্জলি ?!
সে দিনের পর থেকে বর্তমান সময়কাল পর্যন্ত দেশের বিধাতৃ যাঁরা, ঈশ্বরের দূত যাঁরা‌, তাঁরা গান্ধীজীর জন্মদিনে, মৃত্যুদিনে তাঁর‌ সমাধিস্থলে‌‌ পুষ্পস্তবক রাখেন, মালা দেন, নীরবতা পালন করেন।  তা অনুতাপের, না স্বস্তির  ? বোঝা যায়না। 

বোঝা না গেলেও এটুকু উপলব্ধি করা যায়‌ যে 'হিন্দু' আর 'মুসলমান' এই শব্দ দুটিকে দুটি সম্প্রদায়ের 'প্রতিনিধি' করে রঙ্গমঞ্চে এক ভয়ঙ্কর ও উত্তেজনাকর যাত্রাপালা আরম্ভ হয়েছে আবারও। এই যাত্রাপালার কুশী-লবদের দুটি পক্ষ। এক পক্ষ 'সনাতনী' বা 'হিন্দু' নামে, অপরপক্ষ 'ইসলাম বা মুসলিম বা মুসলমান' বলে‌ নিজেদের অস্তিত্ব ঘোষণা করেন।
গভীরভাবে যদি এই কুশী-লবদের বাস্তবজীবনের আলোচনা করি তবে দেখব তাদের উভয়েরই জন্মভূমি, কর্মভূমি একই ; সাধন ভূমি, অর্থাৎ জীবনাচরণের ঠাঁইও এক। জন্ম এই মাটিতে এবং ছাত্রাবস্থা, গার্হস্থ্য, প্রৌঢ়ত্ব বার্ধক্য পেরিয়ে একই মাটিতে--- চিতায় বা কবরে শেষ আশ্রয়। তাহলে 'হিন্দু' ও 'মুসলিম'- দের মধ্যে এই বিদ্বেষ, বিভাজন ও হিংস্রতার কারণ ? কারণ ধর্মকে অস্ত্ররূপে, পন্যরূপে, শোষণের জাদুদণ্ডরূপে ব্যবহার করবার প্রবনতা। 

(এ বিষয়ে বিশদে আলোচনা আছে  মৎরচিত 'ধর্মসংকটের বলি মানবতা' প্রবন্ধে, গ্রন্থ-- 'বিন্দুতে সিন্ধু দর্শন'।) 

আধিপত্য বিস্তারের প্রয়াসে ধর্ম কিভাবে রাজা, সম্রাট, রাজনীতির নায়কদের তথা শাসকের হাতের অস্ত্র হয়ে উঠেছিল (এবং উঠেছে) তার অমানবিকতার, নির্মমতার ইতিবৃত্ত রোমান ক্যাথলিকদের 'ইনকুইজিশন'- এ, ক্রুশেড যুদ্ধের সময়কালে এবং খ্রীষ্টান রাজশক্তির ক্রমসম্প্রসারণের উদগ্র অভিযানে সভ্যতার কলঙ্কিত কালিমায় লিপিবদ্ধ আছে।  বিশেষ করে এশিয়ার ও‌ ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলিকে শাসনে, ত্রাশনে রাখার জন্যে, শোষণের‌ শাসনতন্ত্র কায়েম করবার উদ্দেশ্যে ধর্মকে অস্ত্র হিসাবে যেভাবে তারা ব্যবহার করেছে তাতে সে সকল দেশের কত যে অবোধ প্রাণ, মৌলিক সংস্কৃতি, ভাষা ও আদিম সমাজব্যবস্থা ধংস হয়ে‌ গিয়েছে তার ইয়ত্তা নাই।
আর আমাদের দেশে এই দুটি জাতির ধর্মবিশ্বাসের মধ্যে সহনশীল সহবস্থানের চেষ্টা চলেছে প্রায় এক হাজার বছর ধরে। দুটি ধর্মধারণার কঠোরতা ভেঙে, মিলনাত্মক ধর্মবোধের সৃষ্টিও হয়েছে, (যেমন পীর, সত্যপীর, ফকিরী, মুরশেদী, আউল বাউল প্রভৃতি---) কিন্তু ধর্মগুরুদের, ধর্মের মোরসীপাট্টা যাদের হাতে, তারা তাদের নিহিত বা কায়েমি স্বার্থের চিরকালিন প্রভুত্ব হারাবার আতঙ্কে ধর্মের বিচারহীন মৌলবাদি কাঠামোটিকে রক্ষা করবার অজুহাতে, প্রচ্ছন্ন বা অপ্রচ্ছন্নভাবে ঐ মানবিক‌ মিলনপ্রয়াসী লোকায়ত ধর্মভাবগুলির বিরুদ্ধে নিষ্ঠুর আঘাত হেনেছে, যুগে যুগে। এই আঘাত দুই দিক থেকে। প্রথম রাজা বা শাসনতন্ত্রের সাহায্য নিয়ে ; আর দ্বিতীয় সামাজিকভাবে ঘৃণা ছড়িয়ে এবং হিংস্র অত্যাচারের মাধ্যমে।
দূর বা অনতিদূর ইতিহাস স্মরণে না এনেও একেবারে বর্তমান ভারতবর্ষের প্রেক্ষাপটে বিচার করলে স্পষ্ট হয়ে উঠবে এই ভয়ঙ্কর সত্য। ভারতবর্ষের অভ্যন্তরিণ সমাজ পরিবেশে হিন্দুত্বের উগ্র উন্মাদনাপ্রসূত অ-হিন্দুদের প্রতি ঘৃণা প্রদর্শন এবং বহিরাগত ঐশ্লামিক কট্টরপন্থীদের দ্বারা নিরস্ত্র, নিরীহ, পর্যটকদের অচিন্তনীয় বিভীসিকাময় গণহত্যা। 

এই যে বিদ্বেষ ও ঘৃণা, হিংসা ও হত্যা --- উক্ত ধর্মগুলির শাস্ত্রও নাকি সমর্থন করে। শুধু সমর্থনই করে না, পুরস্কারের প্রতিশ্রুতিও দেয়। যারা নিজ নিজ 'ধর্ম'কে ঐরূপ নির্দয়তার সঙ্গে পালন করবে তাদের জন্য মহান স্রষ্টা বা দেবতা ও দেবতারা চিরবসন্তবিরাজিত, জরা-মৃত্যু- ব্যাধিহীন, ভোগবিলাসের উপকরণসমন্বিত অক্ষয় স্বর্গলাভের ব্যবস্থা করেই রেখেছেন।
এমত বিশ্বাস যদি ধর্মবিশ্বাসীদের মনের মধ্যে একবার দৃঢ়ভাবে প্রোথিত হয়ে যায় তবে তাদেরকে প্রতিহত করা, প্রতিরোধ করা দুরূহ ; স্বয়ং ঈশ্বর (যদি নিখিল বিশ্বের অনাবিস্কৃত কোন জ্যোতিরর্মণ্ডলে থেকেও থাকেন) ধরাধামে সকায়ে অবতীর্ণ হলেও তাঁর পক্ষেও সম্ভব হবে না। তিনিও নির্ঘাত ব্যর্থ হবেন ; যেমন ব্যর্থ হয়েছেন মানব চৈতন্যের মূর্ত মূর্তি গৌতম বুদ্ধ, জৈনমুনি, মুশা-ঈশা- মহম্মদ, শ্রীচৈতন্য, শ্রীরামকৃষ্ণ তেমনই ব্যর্থ অহিংসার পূজারী মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী।
তেমনই আবার আমাদের, জাতি-ধর্ম-বর্ণ-হারা যারা, তাদেরও ক্ষীণ, রুগ্ন, সন্ত্রস্ত মানবিক প্রার্থনা অশ্রুতই থেকে যাবে আততায়ীর বুলেট-বোমা-বারুদের কর্ণবিদারী মারণনাদের তাণ্ডবে, কিংবা পঞ্চ 'ম'-কারের উন্মত্ত, উন্মাদ, আত্মা-আত্মহারা 'আন্দোচ্ছ্বাসে' যা মানবতাবাদী বিবেকের অপমত্যুর নামান্তর। 

আজ আবার শারদোৎসবের পরিসমাপ্তি --- বিজয়ার 'মিলনসন্ধ্যা'। এর মাঝখানে আবার রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের শতবার্ষিক জন্মলগ্নও। শধুমাত্র বাংলায় নয়, দেবব্যাপী বিভিন্ন উৎসব, অনুষ্ঠানের কোলাহলে মহাত্মা গান্ধীর জন্মদিনটি (২রা অক্টোবর) দিনান্তের অন্ধকারে মুখ লুকালো। 'অর্ধ-উলঙ্গ ফকির' এই গান্ধী কে ছিলেন, কেমন মানুষ ছিলেন, কেন ছিলেন এই ভারতবর্ষ নামক দেশে তা আজ গবেষকদের বিষয় হলেও, তাঁর মানবপ্রীতি, তার দেশহিতৈষণার কর্মব্রত, তাঁর সত্যান্বেষী লেখনীর সৃষ্টিসম্পদ আজ কোন এক ভীতিপ্রদ ভ্রুকুটীভঙ্গে যবনীকার অন্তরালে অন্তর্হিত। 

শান্তি নয়, ধংস চাই !

নিয়তি কেন বাধ্যতে।

দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
৩১শে জানুয়ারী,২০২৫
কলকাতা।
___________________________________________

মঙ্গলবার, ৬ মে, ২০২৫

বিশ্ব স্বামী প্রশংসা দিবস

বিশ্ব স্বামী প্রশংসা দিবস

স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যেকার সম্পর্কের দুটি ধারা। একটি কল্পনায় গড়া প্রতিমা, অন্যটি ব্যবহারিক জীবনে পাওয়া অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সমন্বিত নারী। প্রথমটির জন্য রবীন্দ্রনাথ,
"তুমি সন্ধ্যার মেঘমালা আমার সাধের সাধনা
             মম শূন্যগগনবিহারী।
আমি আমার মনের মাধুরী মিশায়ে তোমারে করেছি রচনা ;
  তুমি আমারই তুমি আমারই,
                মম অসীমগগনবিহারী।।" 

আর দ্বিতীয়টির‌ জন্য আসুন জয়দেব,
"স্মরগরল খন্ডনম্ মম শীরসি মন্ডনং
দেহি পদপল্লব মুদারম্।।" 

আমার কামরূপী বিষ থেকে আমাকে মুক্ত কর, তোমার পদযুগল আমার মাথায় রাখ। (ইচ্ছা হলে)পা দিয়েও স্পর্শ কর দেবী, তবু মান করে আর দূরে দূরে থেকো না। 

আদিম সমাজ ব্যবস্থায় সম্পর্কটি এমনই ছিল। আমাদের দেশে ঋকবেদের সময়কাল থেকে পৌরাণিক কাল পর্যন্ত সুসন্তান লাভ করার প্রত্যাশাই ছিল নর ও নারীর মিথুনত্ব, যে মিথুন সম্পর্কটি ধীরে ধীরে স্বামী-স্ত্রী সম্মন্ধ-বন্ধনের সামাজিক স্বীকৃতি লাভ করে। প্রাচীন ভারতের এই 'মিথুন' সম্পর্ক ও 'মৈথুন ক্রিয়া'র ফলাকাঙ্ক্ষা ছিল সন্তান উৎপাদন। ছান্দোগ্য উপনিষদে 'বামদেব্য' ব্রতের কথা আছে। এই ব্রত হোল একান্তভাবেই মিথুনব্রত বা মৈথুনক্রিয়ার উজ্জাপন। এই মিথুন ব্রত থেকে কি কি পাওয়া যাবে ? 

"মিথুনাৎ মিথুনাৎ প্রজায়তে সর্বং আয়ুঃ এতি জ্যোক্ জীবতি মহান্‌প্রজয়া পশুভির্ভবতি  মহান্ কীর্ত্ত্যা ।।‌ 

পাওয়া যাবে -- সন্তান, পূর্ণ জীবন ; পাওয়া যাবে পশু এবং মহান কীর্তি। 

এখানে বিশেষ করে যে দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করছি, তা হোল উপনিষদের ঋষি মৈথুনকে শুধুমাত্র সন্তান উৎপাদনের উপায় মনে করছেন‌ না, সেই সঙ্গে ধনোৎপাদনের উপায় বলেও বর্ণনা করছেন। উপনিষদের‌ যুগেও অর্থনৈতিক পরিস্থিতিটা অনেকখানিই পশুপালনমূলক। তাই ধনোৎপাদন বলতে বোঝাত পশুবৃদ্ধি ( increasing of livestock). আর এই ধারণার দরুন মিথুনকে এতখানি জরুরী মনে করা হচ্ছে যে ঋষিগণ মিথুনের বিভিন্ন স্তরকে হিঙ্কার, প্রস্তাব, উদ্গীথ, প্রতিহার -- পঞ্চবিধ সামগানের সঙ্গে এক বলে বর্ণনা করেছেন। আবার এখানেই তারা থেমে থাকলেন না, উপদেশ দিচ্ছেন,--- ন কাঞ্চন (=কাম +চ = কোন স্ত্রী লোককে) পরিহরেৎ তদ্‌ ব্রতম "---- কো স্ত্রীলোককেই (পরিহার) পরিত্যাগ করবে না, ইহাই ব্রত। 
আমাদের বেদ, ব্রাহ্মণ, উপনিষদ ও পুরাণ কাহিনীগুলিতে নারী পুরুষ (স্বামী স্ত্রীও হতে পারে) সম্পর্কটি ছিল একেবারে বাস্তবানুগ। রামায়ণ মহাভারত থেকে তো এমন অজস্র উদাহরণ দেওয়া যায়। 

কৌরব পাণ্ডবদের বংশই থাকত না যদি 'নিয়োগপ্রথার'  ব্যবস্থা না করা হোত। 

এবার দেখা যাক্ পরিবর্তনটা কেমনভাবে ঘঠল।
"পূর্বকালে উদ্দালক নামে এক মহর্ষি ছিলেন। তাহার পুত্র শ্বেতকেতু। একদা পিতা পুত্র বসিয়া আছেন। এমন সময়ে এক ব্রাহ্মণ আসিয়া শ্বেতকেতুর জননীর হস্ত ধারণ করিয়া কহিলেন, "আইস, আমরা যাই।'' পিতার সম্মুখেই মাতাকে বলপূর্বক লইয়া যাইতে দেখিয়া শ্বেতকেতু সাতিশয় ক্রুদ্ধ হইলেন। মহর্ষি উদ্দালক পুত্রকে তদবস্থ দেখিয়া কহিলেন, বৎস, ক্রোধ করিও না, ইহাই নিত্যধর্ম -- এষঃ  ধর্মঃ সনাতনঃ।  (সনাতনপন্থীরা  ভেবে দেখবেন)। গাভীগণের ন্যায় স্ত্রীগণ শত সহস্র পুরুষে আসক্ত হইলেও উহারা অধর্মলিপ্ত হয় না। " 

এই ছিল উদ্দালকের সময়কাল পর্যন্ত স্বামী স্ত্রীর সামাজিক অবস্থান। 

(এবার দেখা যাক্ কাহিনীটির ক্রমবিবর্তন)
ঋষিপুত্র পিতার বাক্য 'সনাতন' বলে স্বীকার করলেন না।  ভয়ঙ্কর রুষ্ট হয়ে এক নূতন নিয়ম স্থাপন করলেন। "অদ্যাবধি যে স্ত্রী পতি ভিন্ন পুররুষান্তর সংসর্গ করিবে এবং পুরুষ কৌমারব্রহ্মচারিণী বা পতিব্রতা স্ত্রীকে পরিত্যাগ করিয়া অন্য স্ত্রীতে আসক্ত হইবে, ইহাদের  উভয়কেই ভ্রূণহত্যা-সদৃশ ঘোরতর পাপপঙ্কে নিমজ্জিত  হইতে হইবে।"
                               (কালিপ্রসন্ন সিংহের মহাভারত।) 


আজ 'বিশ্ব স্বামী প্রশংসা দিবসে' স্বামীদের কি করণীয় তা নির্ধারণ করুন তাঁদের কৌমারব্রহ্মচারিণী প্রণয়িনী অথবা পতিব্রতা স্ত্রীগণই।

দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
৬ই মে, ২০২৫ ।

_____________________________________________

Recently published

অমূল্য

He ( Tagore) who sees all things in his own self and his own self in all things, he does not remain unrevealed.                     ...