বিশ্ব স্বামী প্রশংসা দিবস
স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যেকার সম্পর্কের দুটি ধারা। একটি কল্পনায় গড়া প্রতিমা, অন্যটি ব্যবহারিক জীবনে পাওয়া অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সমন্বিত নারী। প্রথমটির জন্য রবীন্দ্রনাথ,
"তুমি সন্ধ্যার মেঘমালা আমার সাধের সাধনা
মম শূন্যগগনবিহারী।
আমি আমার মনের মাধুরী মিশায়ে তোমারে করেছি রচনা ;
তুমি আমারই তুমি আমারই,
মম অসীমগগনবিহারী।।"
আর দ্বিতীয়টির জন্য আসুন জয়দেব,
"স্মরগরল খন্ডনম্ মম শীরসি মন্ডনং
দেহি পদপল্লব মুদারম্।।"
আমার কামরূপী বিষ থেকে আমাকে মুক্ত কর, তোমার পদযুগল আমার মাথায় রাখ। (ইচ্ছা হলে)পা দিয়েও স্পর্শ কর দেবী, তবু মান করে আর দূরে দূরে থেকো না।
আদিম সমাজ ব্যবস্থায় সম্পর্কটি এমনই ছিল। আমাদের দেশে ঋকবেদের সময়কাল থেকে পৌরাণিক কাল পর্যন্ত সুসন্তান লাভ করার প্রত্যাশাই ছিল নর ও নারীর মিথুনত্ব, যে মিথুন সম্পর্কটি ধীরে ধীরে স্বামী-স্ত্রী সম্মন্ধ-বন্ধনের সামাজিক স্বীকৃতি লাভ করে। প্রাচীন ভারতের এই 'মিথুন' সম্পর্ক ও 'মৈথুন ক্রিয়া'র ফলাকাঙ্ক্ষা ছিল সন্তান উৎপাদন। ছান্দোগ্য উপনিষদে 'বামদেব্য' ব্রতের কথা আছে। এই ব্রত হোল একান্তভাবেই মিথুনব্রত বা মৈথুনক্রিয়ার উজ্জাপন। এই মিথুন ব্রত থেকে কি কি পাওয়া যাবে ?
"মিথুনাৎ মিথুনাৎ প্রজায়তে সর্বং আয়ুঃ এতি জ্যোক্ জীবতি মহান্প্রজয়া পশুভির্ভবতি মহান্ কীর্ত্ত্যা ।।
পাওয়া যাবে -- সন্তান, পূর্ণ জীবন ; পাওয়া যাবে পশু এবং মহান কীর্তি।
এখানে বিশেষ করে যে দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করছি, তা হোল উপনিষদের ঋষি মৈথুনকে শুধুমাত্র সন্তান উৎপাদনের উপায় মনে করছেন না, সেই সঙ্গে ধনোৎপাদনের উপায় বলেও বর্ণনা করছেন। উপনিষদের যুগেও অর্থনৈতিক পরিস্থিতিটা অনেকখানিই পশুপালনমূলক। তাই ধনোৎপাদন বলতে বোঝাত পশুবৃদ্ধি ( increasing of livestock). আর এই ধারণার দরুন মিথুনকে এতখানি জরুরী মনে করা হচ্ছে যে ঋষিগণ মিথুনের বিভিন্ন স্তরকে হিঙ্কার, প্রস্তাব, উদ্গীথ, প্রতিহার -- পঞ্চবিধ সামগানের সঙ্গে এক বলে বর্ণনা করেছেন। আবার এখানেই তারা থেমে থাকলেন না, উপদেশ দিচ্ছেন,--- ন কাঞ্চন (=কাম +চ = কোন স্ত্রী লোককে) পরিহরেৎ তদ্ ব্রতম "---- কো স্ত্রীলোককেই (পরিহার) পরিত্যাগ করবে না, ইহাই ব্রত।
আমাদের বেদ, ব্রাহ্মণ, উপনিষদ ও পুরাণ কাহিনীগুলিতে নারী পুরুষ (স্বামী স্ত্রীও হতে পারে) সম্পর্কটি ছিল একেবারে বাস্তবানুগ। রামায়ণ মহাভারত থেকে তো এমন অজস্র উদাহরণ দেওয়া যায়।
কৌরব পাণ্ডবদের বংশই থাকত না যদি 'নিয়োগপ্রথার' ব্যবস্থা না করা হোত।
এবার দেখা যাক্ পরিবর্তনটা কেমনভাবে ঘঠল।
"পূর্বকালে উদ্দালক নামে এক মহর্ষি ছিলেন। তাহার পুত্র শ্বেতকেতু। একদা পিতা পুত্র বসিয়া আছেন। এমন সময়ে এক ব্রাহ্মণ আসিয়া শ্বেতকেতুর জননীর হস্ত ধারণ করিয়া কহিলেন, "আইস, আমরা যাই।'' পিতার সম্মুখেই মাতাকে বলপূর্বক লইয়া যাইতে দেখিয়া শ্বেতকেতু সাতিশয় ক্রুদ্ধ হইলেন। মহর্ষি উদ্দালক পুত্রকে তদবস্থ দেখিয়া কহিলেন, বৎস, ক্রোধ করিও না, ইহাই নিত্যধর্ম -- এষঃ ধর্মঃ সনাতনঃ। (সনাতনপন্থীরা ভেবে দেখবেন)। গাভীগণের ন্যায় স্ত্রীগণ শত সহস্র পুরুষে আসক্ত হইলেও উহারা অধর্মলিপ্ত হয় না। "
এই ছিল উদ্দালকের সময়কাল পর্যন্ত স্বামী স্ত্রীর সামাজিক অবস্থান।
(এবার দেখা যাক্ কাহিনীটির ক্রমবিবর্তন)
ঋষিপুত্র পিতার বাক্য 'সনাতন' বলে স্বীকার করলেন না। ভয়ঙ্কর রুষ্ট হয়ে এক নূতন নিয়ম স্থাপন করলেন। "অদ্যাবধি যে স্ত্রী পতি ভিন্ন পুররুষান্তর সংসর্গ করিবে এবং পুরুষ কৌমারব্রহ্মচারিণী বা পতিব্রতা স্ত্রীকে পরিত্যাগ করিয়া অন্য স্ত্রীতে আসক্ত হইবে, ইহাদের উভয়কেই ভ্রূণহত্যা-সদৃশ ঘোরতর পাপপঙ্কে নিমজ্জিত হইতে হইবে।"
(কালিপ্রসন্ন সিংহের মহাভারত।)
আজ 'বিশ্ব স্বামী প্রশংসা দিবসে' স্বামীদের কি করণীয় তা নির্ধারণ করুন তাঁদের কৌমারব্রহ্মচারিণী প্রণয়িনী অথবা পতিব্রতা স্ত্রীগণই।
দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
৬ই মে, ২০২৫ ।
_____________________________________________
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন