রবিবার, ২৭ এপ্রিল, ২০২৫



উপনিষদে কি আছে সেটি প্রাচীন ও অর্বাচীন মিলে প্রায় শ' দুয়েক উপনিষদ পড়েও বলা দুঃসাধ্য। তবে ভগবান শঙ্করাচার্য থেকে আরম্ভ করে বহু ব্রহ্মবিদ টিকাকার  উপনিষদীয় মন্ত্রগুলির সাধারণ ও গূঢ় ব্যাখ্যা করে গিয়েছেন। মহান সাধক ও উপাসকমণ্ডলী সে সকল ব্যাখ্যার স্বাদ পেয়েছেন। তাঁদেরই একজন্য পূজ্যপাদ স্বামী রঙ্গনাথানন্দ মহারাজ, যাঁর 'উপনিষদের সন্দেশ' গ্রন্থটি নিয়েই আমরা আলোচনা আরম্ভ‌ করেছি এবং করে চলেছি।‌ কিন্তু 'গ্রন্থটির আলোচনা' শব্দদ্বয়ের মধ্যে অতিরঞ্জনের এবং প্রচ্ছন্নভাবে হলেও ধৃষ্টতার ইঙ্গিত দৃশ্যমানভাবেই প্রকট। তার জন্য আমি অবনতচিত্তে, গ্রন্থকারের শ্রীচরণ স্মরণ করি ; আর পাঠকবৃন্দের কাছে করজোড়ে ক্ষমা প্রার্থনা করি। সম্পূর্ণ গ্রন্থটির আলোচনা    পঙ্গুর গিরিলঙ্ঘন বা পিপীলিকার সাগর-সন্তরণের মতই  কল্পনাতীত। তবুও এমত ধৃষ্ট প্রয়াস এই কারণেই যে সুধী পাঠকদের মূল গ্রন্থটির উপর আবারও ঔৎসুক্য বর্ধিত হবে। 

(পূজ্যপাদ স্বামী রঙ্গনাথানন্দ মহারাজের 'উপনিষদ সন্দেশ' গ্রন্থটির সাথে পুজ্যপাদ স্বামী লোকেশ্বরানন্দ মহারাজের 'উপনিষদ ব্যাখ্যা' গ্রন্থটিরও ভাবসম্পদ এই আলোচনায় গৃহীত হয়েছে।) 

যাই হোক্ আমরা পঞ্চম পর্বের শেষে‌ উপনিষদের মহাবাক্য চতুষ্টয় নিয়ে আলোচনা করবার কথা বলেছি। এই মহাবাক্য চতুষ্টয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে, হয়ে চলেছে হাজার হাজার বছর ধরে। শুধু এ দেশে নয়, বিদেশেও ---- সমস্ত বিশ্বজুড়েই। "শেষ নাহি যে শেষ কথা কে বলবে।" তবু আমাদের মত সামান্য সাধারণ মানুষের কাছে এই মহাবাক্যগুলি কিরূপ অভিব্যঞ্জনা প্রকাশ করে তাই নিয়ে কিছু আলোচনা। 

প্রথম বাক্য ---- অয়ম্ আত্মা ব্রহ্ম।
                                    (মাণ্ডুক্য উপনিষদ) 

এটি মহাবাক্য কেন ? এমন একটি পাঁচ শব্দের, বারটি অক্ষরের (অ+য়+ম্ আ+ত+ম+আ ব+র+হ+ম+অ) বাক্যে কি এমন বিরাটত্ব নিহিত আছে ?  আছে। প্রথম শব্দ অয়ম্', দ্বিতীয় শব্দ আত্মা --- বিশেষণ ও বিশেষ্য নিয়ে‌ গঠিত' শব্দ যুগলের অর্থ 'এই আত্মা এবং 'অয়ম্ আত্মা ব্রহ্ম ' বাক্যটির অর্থ দাঁড়ালো -- এই আত্মাই ব্রহ্ম। 

দ্বিতীয় বাক্য -- প্রজ্ঞানম্ ব্রহ্ম।
                              (ঐতরেয়-উপনিষদ) 

এটি আবার আরো সংক্ষিপ্ত। মাত্র দুটি শব্দের বাক্য।‌একটি বিশেষ্য (কর্তা) প্রজ্ঞানম্, অন্যটিও বিশেষ্য ব্রহ্ম। অকর্মক ক্রিয়াটি 'হয়' এখানে উহ্য। প্রজ্ঞাই ব্রহ্ম। প্রজ্ঞা অর্থে প্রকৃষ্ট জ্ঞান। যে জ্ঞান একমাত্র মানুষরূপী জীবেরই অধিগত। চৈতন্যসত্তা। অতএব 'প্রজ্ঞানম্ ব্রহ্ম' উচ্চারণে ঐতরেয় উপনিষদ বলছেন 'ব্রহ্ম হলেন শুদ্ধ চৈতন্য।' 

তৃতীয় বাক্য-- 'তৎ ত্বম্ অসি'
                             (ছান্দোগ্য উপনিষদ) 

এখানে আবারো একটি সংক্ষিপ্ত বাক্য। 'তৎ' তিনি, ত্বম্ তুমি। অর্থাৎ তিনিই 'তুমি' বা তুমিই 'তিনি'।
মানুষের মধ্যে (তার সৎ স্বরূপের মধ্যে) তিনি অর্থাৎ ব্রহ্ম বিরাজমান। ব্রহ্মের সঙ্গে মানবের একত্ববোধের এই যে ঘোষণা উপনিষদ করেছেন তা সুগভীর তাৎপর্য্যবাহী। 

চতুর্থ বাক্য -- অয়ং ব্রহ্মাস্মি।
                        (বৃহদারণ্যক উপনিষদ) 

এই বাক্যটির উদ্ঘোষণা তিনিই করতে পারেন যিনি ব্রহ্মবিদ্। সাধন সাধ্য সাধক যেখানে একাকার। এমত অবস্থা অবর্ণনীয়, অব্যাখ্যনীয়। তবুও উপনিষদ এই 'অবাঙ্মমনোসোগোচর' যিনি তাঁর কথা যা বলেছেন, আমরা তার অতি অতি সামান্যটুকুই প্রতিধ্বনি করছি মাত্র।

এই মহাবাক্য চতুষ্টয়ের টিকা, ভাষ্য, ব্যাখ্যা হয়েছে, হয়ে চলেছে হাজার হাজার বছর ধরে। সমস্ত আলোচনাগুলি উদ্ধার, সংকলন, অধ্যয়ন এবং তাদের মধ্যে নিহিত অধ্যাত্মদর্শনের মূল প্রতিপাদ্য উপস্থিত করা ভগবান বেদব্যাসের মত ঈশ্বরিক প্রতিভার পক্ষেই সম্ভব। (স্মরণীয়, অসংহত, বিক্ষিপ্ত শ্রুতিমন্ত্রগুলিকে  কৃষ্ণদ্বৈপায়ন ব্যাসদেবই সংহত করে, প্রথম তিনটি বেদসংহিতায় সন্নিবিষ্ট করেন এবং ঋকবেদ সংহিতা, সামবেদ সংহিতা ও যজুর্বেদ সংহিতা সংকলন করেন। অথর্ববেদ পরবর্তী কালে সংকলিত হয় এবং বেদ সংহিতার মর্যাদায় উন্নিত হয়)।
কেননা এই মহাবাক্যগুলির টিকাকার ও ভাষ্যকারগণ নানাভাবে, আপন আপন বোধ অনুযায়ী ভাষ্য রচনা করেছেন। এই মহাবাক্যগুলি একক ভাবে উদ্ধার করা হলেও এর এক একটি ওই প্রাসঙ্গিক উপনিষদের অমৃতকথার মন্থনসঞ্জাত শেষ মীমাংসিত সিদ্ধান্তবাণী। তাই বাক্যগুলির অর্থ (গূঢ়ার্থ) সম্যক অনুধাবন করতে হলে উপনিষদসমুহের পূর্বাপর আলোচনা আবশ্যিক।
সমস্ত ভাষ্যগুলির মর্মার্থ কিছুটা অনুধাবন করা যায় যখন পরম পূজার্হ স্বামী রঙ্গনাথানন্দ মহারাজ সকল উপনিষদের সংক্ষিপ্তসার সম্মন্ধে বলেন, 

এই সাহিত্য (উপনিষদগুলি একাধারে দর্শন ও সাহিত্যরসের মানস সরোবর)পর্যালোচনা করলে আমরা পাই চিন্তায় চিন্তায় মাধুর্যপূর্ণ দ্বন্দ্ব ----আর তাই থেকে উদ্ভূত হচ্ছে নূতন নূতন চিন্তা যা আরো যুক্তিপূর্ণ ও গভীরতর অনুভূতির অনুমোদনযোগ্য এবং বিনা অশ্রুপাতেই বর্জিত হচ্ছে পূরাতন চিন্তাগুলি। ... এইভাবে পথ করে নিয়ে 'চিন্তা 'এগিয়ে চলেছে মানবের ও যে-বিশ্বে-সে রয়েছে তার রহস্য উদ্ঘাটনের উদ্দেশ্যে ; আমরা দেখতে পাব চিন্তার প্রসারকার্য কিভাবে চলেছে, আর আমাদের যথেষ্ট সূক্ষ্মানুভূতি থাকলে চিন্তার স্রোতের টানে ভাসতে ভাসতে "সত্য-সুন্দর-আনন্দ সমুদ্রে পৌঁছানোর পথে অগ্রগতির অভিজ্ঞতা হবে এবং অনুভব করব বহুর পেছনে যে 'এক' তাতে একীভূত হয়েছি।" 

যেমন মুণ্ডক উপনিষদ বলছেন,
যথা নদ্যঃ স্যন্দমানাঃ সমুদ্রে
অন্তং গচ্ছন্তি নামরূপ বিহায়।
তথা বিদ্বান্ নামরূপাৎ বিমুক্তঃ
পরাৎপরং পুরুষমুপৈতি দিব্যম্।। 

'প্রবহমান নদীসমুহ যেমন পৃথক পৃথক নাম ও রূপ ত্যাগ করে সাগরের সঙ্গে এক হয়ে যায়, তেমনই জ্ঞান (আপাতদ্বন্দ্বময় হলেও) এবং জ্ঞানী (আপাত ভিন্ন মতের হলেও) নাম রূপ থেকে মু্ক্ত হয়ে, পরম বা অব্যাকৃত প্রকৃতিরও পারে, চরম অবস্থায় স্বয়ংজ্যোতিঃ পরমাত্মাকে প্রাপ্ত হয়।'
চারটি উপনিষদের চারটি মহাবাক্যের অন্তর্গত মিল বিস্ময়কর। মনে হতেই পারে সত্যের এই চার প্রকার অভিব্যক্তি তো 'অন্তিমে সব একাঙ্গী'। 

এই আত্মাই ব্রহ্ম, প্রজ্ঞানই ব্রহ্ম, তৎ ত্বম্ অসি, এবং অহম ব্রহ্মাস্মি ----- এই বাক্যগুলির অর্থ, ব্যঞ্জনা, দ্যোতনা তো একই। শুধু মাত্র 'তৎ ত্বম্ অসি' বাক্যটির ব্যঞ্জনা সামান্য ভিন্ন। বাক্যটির লক্ষ্য সামান্য ভিন্ন। 

তবে আমরা ছান্দোগ্য উপনিষদের এই 'তত্বমসি' বাক্যটিকে  আশ্রয় করে যদি অগ্রসর হতে পারি তবে অন্য তিনটি মহাবাক্যের কিছুটা হলেও অর্থদ্যুতির ঝলক পাব। 

('ঝলক্' শব্দটি সজ্ঞানেই ব্যবহার করেছি এই কারণেই যে ঝলকের সঙ্গে আমাদের পরিচয় আছে। বৃন্দাবনে, প্রহরে প্রহরে নবসাজে সজ্জিত গোবিন্দের ঝলক দর্শন হয়। আবার যাঁরা বড় বড় সব দেব মন্দিরে গিয়েছেন তারা জানেন ভৌরবেলা থেকে পুন্যার্থীদের সারিতে দাঁড়িয়ে, আঁকা বাঁকা গোলকধাঁধা পথ পেরিয়ে যখন আমরা অভীপ্সিত দেবমূর্তির সম্মুখে আসি তখন মূর্তির উপর চোখ পড়তে না-পড়তে প্রবল ধাক্কায় বহির্গমন। সেটিও ঝলক দর্শন)। 

তাই 'আপন আত্মাই ব্রহ্ম, পরম জ্ঞানই ব্রহ্ম কিংবা আমিই ব্রহ্ম' ----- বলতে পারা সহজ কিন্তু আপন আত্মনের উপলব্ধি, জ্ঞান সাধনার অত্যুচ্চ চুড়ায় অবস্থান করবার পর বিশ্বচরাচরের সৃষ্টির মূল কারণ অনুসন্ধান করা এবং সেইখানে এই 'সূর্য-চন্দ্র-গ্রহ-নক্ষত্র-নীহারিকা'-র জ্যোতির্উৎসের (জ্যোতিঃ উৎসের) গোমুখে নিজেকে স্রষ্টার আসনে প্রতিষ্ঠিত করে বলা -- "ব্রহ্মাস্মি, আমিই ব্রহ্ম"--- সহজ কি ? 'এ সাধনা তো এক জনমের নহে।' তবু এই অনন্তের সাধনা থেকে সরে এসে মানুষ ঐহিক জীবনের অশাশ্বত সুখ-দুঃখ, লাভ অলাভের মধ্যেই গণ্ডিবদ্ধ হয়ে থাকতে চায় নি। গণ্ডিবদ্ধতা ছিন্ন করে, জৈবিক জীবনের দাসত্ব, ইন্দ্রিয়গুলির শৃঙ্খল-মুক্ত হয়ে মহত্তর,মহত্তম চৈতন্যলোকের (ব্রহ্মলোক) সন্ধানে সে নিরন্তর সাধনরত। যদিও পথ 'ক্ষুরস্য ধারা নিশিতা দুরত্যয়া'। আমাদের উপনিষদ সেই পথের সন্ধান করেছেন, সন্ধান পেয়েছেন, সন্ধান দিয়েছেন  ; এবং সঙ্গে সঙ্গে সেই দুস্তর পথের পাথেয়ও হাতের মুঠিতে ধরিয়ে দিয়েছেন।
দুস্তর সে পথের 'পাথেয় বাণী' নিত্যকার ধ্যানের মন্ত্র এই ছান্দোগ্য উপনিষদে উদ্ঘোষিত 'তত্বমসি' মহাবাক্যটির আলোচনা সামান্য হলেও সহজবোধ্য এই কারণেই যে ব্রহ্মর্ষি আরুণি পুত্র শ্বেতকেতুকে 'আদেশ' দান করছেন। সঙ্গে সঙ্গে মন্ত্রদ্রষ্টা ঋষি (আরুণি) মন্ত্রটির ব্যাখ্যাও করছেন। 

তাই এখন আমরা ছান্দোগ্য উপনিষদের সন্নিকটে যাব। আলোচ্য মন্ত্রটি ছান্দোগ্য উপনিষদে বিধৃত আছে। ছান্দোগ্য উপনিষদটির অতি সংক্ষিপ্ত একটি পরিচয় দিলে সুধী পাঠকদের (অবশ্যই তাঁদের অধিগত) স্মৃতি জাগরুক হবে। সামবেদের ছান্দোগ্য ব্রাহ্মণের মোট দশটি অধ্যায়ের শেষ আটটি অধ্যায় নিয়ে ছান্দোগ্য উপনিষদ। সামবেদ হোল ছন্দস্। এই ছন্দস্ যিনি গান করেন তিনি ছন্দগ্। সামবেদ অনুসারী যাঁরা তাঁরা ছান্দক  ; আর ছান্দকদের ধর্মমত ও অনুষ্ঠান নিয়ে ছান্দোগ্য উপনিষদ। 

আমাদের উপনিষদ শাস্ত্র আক্ষরিক অর্থেই 'আদরবতী'। স্নেহময়ী মাতা, স্নেহময় পিতা যেমন করে হাত ধরে সন্তানকে পথ দেখিয়ে জীবন পথে এগিয়ে নিয়ে যান, এই শাস্ত্রও তেমনটি। আমাদের হাত ধরে সত্যোপলব্ধির লক্ষ্যপথে আমাদের চালিত করেন‌ উপনিষদ। এই ছান্দোগ্য উপনিষদে আমরা তেমনই দেখব। এই উপনিষদের দশ দশটি অধ্যায়ের প্রত্যেকটিতে অমৃতক্ষরা বাণী আছে। কিন্তু সমস্তটির আলোচনার বিশালতার কথা চিন্তা করে আমরা আমাদের উদ্দিষ্ট মহাবাক্যটির কাছে আসি,---- 


"স  য এষ অণিমা ঐতদাত্ম্যমিদং সর্বং তৎ সত্যং স আত্মা  তত্বমসি  শ্বেতকেতো ইতি।"
                                         (অষ্টম খণ্ড, মন্ত্র সাত) 

পিতা অরুণি পুত্র শ্বেতকেতুকে বলছেনঃ
এই যে সূক্ষ্মতম বস্তু ('প্রাণ'), ইনি -ই সমস্ত জগতের অন্তরাত্মা (এককভাবে), আবার ইনিই আত্মা (এক এক ভাবে)। ইনিই সত্য, ইনি সৎ। সমস্ত জগতের ইনি আত্মা, তাই জগৎ আত্মবান, আবার এক এক ভাবে তোমার আমার আত্মা ইনিই, তাই আমরা আত্মবান। তুমিই সেই,  শ্বেতকেতু।
এই 'সূক্ষ্মতম বস্তু' প্রাণ, যিনি চৈতন্যস্বরূপ তিনি সৎরূপে, সত্যরূপে, শাশ্বতরূপে, একদিকে যেমন বিশ্বচরাচরে বিরাজমান, তেমনই  তিনি কণারূপে (চৈতন্যকণা) তোমার অন্তরেও বিরাজমান।
অতএব চরাচরপরিব্যপ্ত বিশ্বচৈতন্যের সঙ্গে তোমার যোগ অচ্ছেদ্য। তুমিই সেই মহাচৈতন্য, সৎ, সত্যরূপ, শাশ্বত ও সনাতন।
স্বয়ং অরুনের সন্তান উদ্দালক আরুণি পুত্র শ্বেতকেতুকে বার বার বলছেন, তুমিই সেই  ; কিন্তু শ্বেতকেতুর বোধগম্য হচ্ছে না কিছুতেই। শ্বেতকেতুও বার বার পিতাকে অনুরোধ করেই চলেছেন,
"ভূয় এব মা ভগবান্ বিজ্ঞাপয়ত্বিতি তথা সোম্য ইতি উবাচ।"
                                       (দ্বাদশ খণ্ড, মন্ত্র দুই ও তিন) 

পিতা উদ্দালকের ধৈর্য অসীম। তিনিও পুত্রের সংশয়ের নিরসনের প্রয়াসে ক্লান্তিহীন। সূক্ষ্মতম যে আত্মা অদৃশ্য, তার থেকে জগৎ ! এবং তাইই একটি ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র প্রাণ, চৈতন্যকণা ! তাই আবার নিখিল বিশ্বে পরিব্যপ্ত পরমাত্মা, ব্রহ্ম! সেই পরমাত্মার সত্তা আমার মধ্যে !
এই প্রজ্ঞা তো সহজবোধ্য নয়। কিন্তু সন্তানকে তো আত্মজ্ঞানে দীক্ষা দিতেই হবে।
এখানেই, উদ্দালক আরুণি যখন দেখছেন পুত্র কোন মতেই নিঃসংশয় হতে পারছে না তখন তিনি বুঝলেন সাধন ব্যতিরেকে এই উপলব্ধি সম্ভব নয়। তিনি পুত্রকে আদেশ দিলেন, "যাও, ঐ বটগাছের একটি ফল নিয়ে এসো।"
শ্বেতকেতু বটগাছের ফল নিয়ে এলেন। পিতা তাঁকে সেটি ভাঙতে বললেন। শ্বেতকেতু তা ভাঙলেন। পিতা জিজ্ঞাসা করলেন, "কি দেখতে পাও ?" শ্বেতকেতু বললেন, "অণ্ব্য ইব ইমাঃ ধানাঃ।" অণুর মত সব বীজ। পিতা পুত্রকে আবার বল্লেন, "একটি বীজকেও ভাঙ এবং কি আছে দেখ।" পুত্র জানালেন আর তো কিছু দেখা যায় না।
মহর্ষি উদ্দালক আরুণি তখন উচ্চারণ করলেন,
"সোম্য এতম্ বৈ অনিমানম্ যম্ ন নিভালয়স এতস্য বৈ অণিম্নঃ এস মহান্যগ্রোধঃ এবম্ তিষ্টতি।
সোম্য শ্রদ্ধৎস্ব।।"

উদ্দালক পুত্রকে তখন বললেন, হে সোম্য, বীজের মধ্যে যে সূক্ষ্মতম অংশটিকে তুমি দেখতে পাচ্ছ না, একটি বিশাল বটগাছের সম্ভাবনা অদৃশ্যভাবে তার মধ্যেই রয়েছে। শ্রদ্ধাবান হও, বিশ্বাস কর, এই বীজের মধ্যে দৃশ্যাতীত প্রাণকণিকারূপ চৈতন্য আর অনন্ত এই জগতের মহাচৈতন্য এক। তিনি ব্রহ্ম, তুমিও ব্রহ্মস্বরূপ।‌ তত্বমসি। 

আরুণি উদ্দালক এখানে একাধারে পিতা ও আচার্য। ভারতীয় আর্য-ধর্মের এই পরম্পরায় পিতৃত্বের যে ভূমিকা তাই মানবজীবনের দিশা নির্ধারণ করে দেয়। পিতা যখনি পুত্রকে 'তুমি ব্রহ্ম' --- এ বলে সম্বোধন করছেন তখনই পুত্রের অন্তরে আত্ম-অন্বেষণের, আত্মানুসন্ধানের ব্যগ্রতা এবং আত্মানুভূতির জাগরণ ঘঠল। এবার স্ব-আত্মার সঙ্গে পরমাত্মার যোগ সাধনের ব্যাকুলতা। 

পরমাত্মা, "অখণ্ডমণ্ডলাকারম্ ব্যপ্তম যেন চরাচরম তদপদম দর্শিতং যেন তস্মৈ শ্রীগুরবে নমঃ।"

অখণ্ডমণ্ডলাকার, চরাচর পরিব্যপ্ত যিনি (পরমব্রহ্ম) তাঁর শ্রীচরণ যাঁর দ্বারা দেখার দৃষ্টি লাভ করলাম, সেই গুরুদেবকে আমার প্রণাম নিবেদন করি। 

এবার আমরা অন্য তিনটি মহাবাক্যের আলোচনা যদি করি তবে দেখব সবগুলি উচ্চারণেই সেই একই  উদ্দিষ্টের দিকে তারাও ইঙ্গিত করেছেন। (বৈদিক মন্ত্রগুলিকে 'আপনি' বলেই সম্বোধন করা হয়)।
পিতা ও আচার্যের দ্বারা যখনি এই আত্মানুভূতি ও পরমাত্মার বোধি জাগরুক হোল তখনই শিষ্যের কাছে তার জীবন-সাধনার পথ উন্মুক্ত হয়ে যায়। সাধনায় সিদ্ধি লাভের পথে তিনি উপলব্ধি করেন, "অয়ম্ আত্মা ব্রহ্ম"--- এই আত্মাই ব্রহ্ম বা আমার মধ্যে জাগ্রত যে 'অণিয়ান ' সত্তা তা মহিয়ান পরমাত্মার (ব্রহ্মের) সঙ্গে সম্পর্কিত।
                                             (মাণ্ডুক্য উপনিষদ) 

ঐতরেয় উপনিষদের 'প্রজ্ঞানম্ ব্রহ্ম' বা 'ব্রহ্ম হলেন শুদ্ধ চৈতন্য' --- সেই একই মহতোপলব্ধি। যিনি জৈবিকতা-ক্লিন্ন বা লোভ-মোহ-কাম-ক্রোধ-মাদক-মাৎসর্য্য দ্বারা পীড়িত নন, যিনি জিতেন্দ্রিয়, অনৃশংস, অহিংস -- তিনিই শুদ্ধ চৈতন্য, তিনিই পরম চৈতন্যময় সত্তাকে লাভ করেন ও তাঁর সঙ্গে একীভূত হয়ে যান।
পরম ব্রহ্মের সঙ্গে এই একীভূত অবস্থাই মানব জীবনের পরিপূর্ণতা। তখন সাধক ঘোষণা করতেই পারেন --- "অহং ব্রহ্মাস্মি।" 

                                  (বৃহদারণ্যক উপনিষদ) 

এই মহাবাক্যে মীমাংসিত হয়েছে মানবের দেবত্বলাভ এবং ব্রহ্মাণ্ডব্যপ্ত ব্রহ্মের সঙ্গে আধ্যাত্মিক একত্ববোধে ।

এই হোল ভারতীয় ধর্মধারণায় ঈশ্বরসাধনার লক্ষ্য। ধর্মমত, সাধনপথ ভিন্ন ভিন্ন হতে পারে কিন্তু অভিসার সেই পথে যে পথের শেষে মানবজীবনের পূর্ণতা।
ভারতের ধর্মাচরণে তাই বহুপ্রকার সাধনমার্গ। জ্ঞানমার্গ, ভক্তিমার্গ, কর্মমার্গ। সাধনপন্থাকে 'যোগ' নামেও অবিহিত করা হয়ে থাকে। তখন জ্ঞানযোগ, কর্মযোগ, ভক্তিযোগ এবং রাজযোগের কথা আসে। যে পথেই, যে মতেই সাধনা করা হোক না কেন অভিলষিত লক্ষ্য ও পরম উদ্দিষ্ট সেই পূর্ণতাপ্রাপ্তি। 


এই 'উপনিষদের এই চারটি মহাবাক্য নিয়ে আমরা এতক্ষণ যে আলোচনায় প্রবৃত্ত হয়েছি তা জ্ঞানযোগ বা জ্ঞানমার্গের সাধনার কথা। বৃহত্তর মানবসমাজের মানুষ, যাঁরা জীবনরক্ষার জীবনসংগ্রামে নিত্য ব্যতিব্যস্ত তাদের পক্ষে 'জ্ঞানযোগ' সাধনা দুশ্চর। 'কর্মযোগ' ও 'ভক্তিযোগ' সাধনের দ্বারাই তাঁরা পরমসত্তার সঙ্গে, পরম 'প্রেয়'র সঙ্গে একাত্মতা লাভ করেন। শ্রীমৎ ভাগবতে অষ্টাদশ অধ্যায়ে শ্রীকৃষ্ণ (যাঁকে পরমপ্রজ্ঞা, পরমাত্মা ও পরম চৈতন্যময় সত্তারূপেই ভারতের সনাতন ধর্ম স্বীকার করেছেন) অর্জুনকে বিশ্বরূপ দেখানোর পর, বলছেনঃ 

সর্ব কর্মাণ্যপি সদা কুর্বাণো মদ্ব্যপাশ্রয়ঃ।
মৎ প্রাসাদাৎ অবাপ্নোতি শাশ্বতং পদমব্যয়ম্ ।। 

যাঁরা মৎপরায়ণ  (আমাকেই আশ্রয়ে করেন), নিষ্কাম কর্মব্রতী, জগতের মঙ্গলের নিমিত্ত কর্ম করতেই থাকেন, আমার কৃপাতে তিনি সনাতন, অবিনাশী পরম পদ (ঈশ্বরের শ্রীচরণ) লাভ করেন।
এই বাণীর মধ্য‌ দিয়েই কর্মযোগ ও ভক্তিযোগের সাধনপথের ইঙ্গিত দিয়েছেন পূর্ণচৈতন্যস্বরূপ আমাদের চির আরাধ্য শ্রীকৃষ্ণ।

তাই আমাদের উপনিষদীয় বোধির বুদ্ধস্বরূপ সেই ঋষিকবি রবীন্দ্রনাথের কথাতেই বলি, 

"আমার একলা ঘরের আড়াল ভেঙে 

            বিশাল ভবে 

     প্রাণের রথে বাহির হতে 

           পারবো কবে |" 

                                                                  সমাপ্ত 

____________________________________________















কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Recently published

অমূল্য

He ( Tagore) who sees all things in his own self and his own self in all things, he does not remain unrevealed.                     ...