রবিবার, ২৭ এপ্রিল, ২০২৫



উপনিষদে কি আছে সেটি প্রাচীন ও অর্বাচীন মিলে প্রায় শ' দুয়েক উপনিষদ পড়েও বলা দুঃসাধ্য। তবে ভগবান শঙ্করাচার্য থেকে আরম্ভ করে বহু ব্রহ্মবিদ টিকাকার  উপনিষদীয় মন্ত্রগুলির সাধারণ ও গূঢ় ব্যাখ্যা করে গিয়েছেন। মহান সাধক ও উপাসকমণ্ডলী সে সকল ব্যাখ্যার স্বাদ পেয়েছেন। তাঁদেরই একজন্য পূজ্যপাদ স্বামী রঙ্গনাথানন্দ মহারাজ, যাঁর 'উপনিষদের সন্দেশ' গ্রন্থটি নিয়েই আমরা আলোচনা আরম্ভ‌ করেছি এবং করে চলেছি।‌ কিন্তু 'গ্রন্থটির আলোচনা' শব্দদ্বয়ের মধ্যে অতিরঞ্জনের এবং প্রচ্ছন্নভাবে হলেও ধৃষ্টতার ইঙ্গিত দৃশ্যমানভাবেই প্রকট। তার জন্য আমি অবনতচিত্তে, গ্রন্থকারের শ্রীচরণ স্মরণ করি ; আর পাঠকবৃন্দের কাছে করজোড়ে ক্ষমা প্রার্থনা করি। সম্পূর্ণ গ্রন্থটির আলোচনা    পঙ্গুর গিরিলঙ্ঘন বা পিপীলিকার সাগর-সন্তরণের মতই  কল্পনাতীত। তবুও এমত ধৃষ্ট প্রয়াস এই কারণেই যে সুধী পাঠকদের মূল গ্রন্থটির উপর আবারও ঔৎসুক্য বর্ধিত হবে। 

(পূজ্যপাদ স্বামী রঙ্গনাথানন্দ মহারাজের 'উপনিষদ সন্দেশ' গ্রন্থটির সাথে পুজ্যপাদ স্বামী লোকেশ্বরানন্দ মহারাজের 'উপনিষদ ব্যাখ্যা' গ্রন্থটিরও ভাবসম্পদ এই আলোচনায় গৃহীত হয়েছে।) 

যাই হোক্ আমরা পঞ্চম পর্বের শেষে‌ উপনিষদের মহাবাক্য চতুষ্টয় নিয়ে আলোচনা করবার কথা বলেছি। এই মহাবাক্য চতুষ্টয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে, হয়ে চলেছে হাজার হাজার বছর ধরে। শুধু এ দেশে নয়, বিদেশেও ---- সমস্ত বিশ্বজুড়েই। "শেষ নাহি যে শেষ কথা কে বলবে।" তবু আমাদের মত সামান্য সাধারণ মানুষের কাছে এই মহাবাক্যগুলি কিরূপ অভিব্যঞ্জনা প্রকাশ করে তাই নিয়ে কিছু আলোচনা। 

প্রথম বাক্য ---- অয়ম্ আত্মা ব্রহ্ম।
                                    (মাণ্ডুক্য উপনিষদ) 

এটি মহাবাক্য কেন ? এমন একটি পাঁচ শব্দের, বারটি অক্ষরের (অ+য়+ম্ আ+ত+ম+আ ব+র+হ+ম+অ) বাক্যে কি এমন বিরাটত্ব নিহিত আছে ?  আছে। প্রথম শব্দ অয়ম্', দ্বিতীয় শব্দ আত্মা --- বিশেষণ ও বিশেষ্য নিয়ে‌ গঠিত' শব্দ যুগলের অর্থ 'এই আত্মা এবং 'অয়ম্ আত্মা ব্রহ্ম ' বাক্যটির অর্থ দাঁড়ালো -- এই আত্মাই ব্রহ্ম। 

দ্বিতীয় বাক্য -- প্রজ্ঞানম্ ব্রহ্ম।
                              (ঐতরেয়-উপনিষদ) 

এটি আবার আরো সংক্ষিপ্ত। মাত্র দুটি শব্দের বাক্য।‌একটি বিশেষ্য (কর্তা) প্রজ্ঞানম্, অন্যটিও বিশেষ্য ব্রহ্ম। অকর্মক ক্রিয়াটি 'হয়' এখানে উহ্য। প্রজ্ঞাই ব্রহ্ম। প্রজ্ঞা অর্থে প্রকৃষ্ট জ্ঞান। যে জ্ঞান একমাত্র মানুষরূপী জীবেরই অধিগত। চৈতন্যসত্তা। অতএব 'প্রজ্ঞানম্ ব্রহ্ম' উচ্চারণে ঐতরেয় উপনিষদ বলছেন 'ব্রহ্ম হলেন শুদ্ধ চৈতন্য।' 

তৃতীয় বাক্য-- 'তৎ ত্বম্ অসি'
                             (ছান্দোগ্য উপনিষদ) 

এখানে আবারো একটি সংক্ষিপ্ত বাক্য। 'তৎ' তিনি, ত্বম্ তুমি। অর্থাৎ তিনিই 'তুমি' বা তুমিই 'তিনি'।
মানুষের মধ্যে (তার সৎ স্বরূপের মধ্যে) তিনি অর্থাৎ ব্রহ্ম বিরাজমান। ব্রহ্মের সঙ্গে মানবের একত্ববোধের এই যে ঘোষণা উপনিষদ করেছেন তা সুগভীর তাৎপর্য্যবাহী। 

চতুর্থ বাক্য -- অয়ং ব্রহ্মাস্মি।
                        (বৃহদারণ্যক উপনিষদ) 

এই বাক্যটির উদ্ঘোষণা তিনিই করতে পারেন যিনি ব্রহ্মবিদ্। সাধন সাধ্য সাধক যেখানে একাকার। এমত অবস্থা অবর্ণনীয়, অব্যাখ্যনীয়। তবুও উপনিষদ এই 'অবাঙ্মমনোসোগোচর' যিনি তাঁর কথা যা বলেছেন, আমরা তার অতি অতি সামান্যটুকুই প্রতিধ্বনি করছি মাত্র।

এই মহাবাক্য চতুষ্টয়ের টিকা, ভাষ্য, ব্যাখ্যা হয়েছে, হয়ে চলেছে হাজার হাজার বছর ধরে। সমস্ত আলোচনাগুলি উদ্ধার, সংকলন, অধ্যয়ন এবং তাদের মধ্যে নিহিত অধ্যাত্মদর্শনের মূল প্রতিপাদ্য উপস্থিত করা ভগবান বেদব্যাসের মত ঈশ্বরিক প্রতিভার পক্ষেই সম্ভব। (স্মরণীয়, অসংহত, বিক্ষিপ্ত শ্রুতিমন্ত্রগুলিকে  কৃষ্ণদ্বৈপায়ন ব্যাসদেবই সংহত করে, প্রথম তিনটি বেদসংহিতায় সন্নিবিষ্ট করেন এবং ঋকবেদ সংহিতা, সামবেদ সংহিতা ও যজুর্বেদ সংহিতা সংকলন করেন। অথর্ববেদ পরবর্তী কালে সংকলিত হয় এবং বেদ সংহিতার মর্যাদায় উন্নিত হয়)।
কেননা এই মহাবাক্যগুলির টিকাকার ও ভাষ্যকারগণ নানাভাবে, আপন আপন বোধ অনুযায়ী ভাষ্য রচনা করেছেন। এই মহাবাক্যগুলি একক ভাবে উদ্ধার করা হলেও এর এক একটি ওই প্রাসঙ্গিক উপনিষদের অমৃতকথার মন্থনসঞ্জাত শেষ মীমাংসিত সিদ্ধান্তবাণী। তাই বাক্যগুলির অর্থ (গূঢ়ার্থ) সম্যক অনুধাবন করতে হলে উপনিষদসমুহের পূর্বাপর আলোচনা আবশ্যিক।
সমস্ত ভাষ্যগুলির মর্মার্থ কিছুটা অনুধাবন করা যায় যখন পরম পূজার্হ স্বামী রঙ্গনাথানন্দ মহারাজ সকল উপনিষদের সংক্ষিপ্তসার সম্মন্ধে বলেন, 

এই সাহিত্য (উপনিষদগুলি একাধারে দর্শন ও সাহিত্যরসের মানস সরোবর)পর্যালোচনা করলে আমরা পাই চিন্তায় চিন্তায় মাধুর্যপূর্ণ দ্বন্দ্ব ----আর তাই থেকে উদ্ভূত হচ্ছে নূতন নূতন চিন্তা যা আরো যুক্তিপূর্ণ ও গভীরতর অনুভূতির অনুমোদনযোগ্য এবং বিনা অশ্রুপাতেই বর্জিত হচ্ছে পূরাতন চিন্তাগুলি। ... এইভাবে পথ করে নিয়ে 'চিন্তা 'এগিয়ে চলেছে মানবের ও যে-বিশ্বে-সে রয়েছে তার রহস্য উদ্ঘাটনের উদ্দেশ্যে ; আমরা দেখতে পাব চিন্তার প্রসারকার্য কিভাবে চলেছে, আর আমাদের যথেষ্ট সূক্ষ্মানুভূতি থাকলে চিন্তার স্রোতের টানে ভাসতে ভাসতে "সত্য-সুন্দর-আনন্দ সমুদ্রে পৌঁছানোর পথে অগ্রগতির অভিজ্ঞতা হবে এবং অনুভব করব বহুর পেছনে যে 'এক' তাতে একীভূত হয়েছি।" 

যেমন মুণ্ডক উপনিষদ বলছেন,
যথা নদ্যঃ স্যন্দমানাঃ সমুদ্রে
অন্তং গচ্ছন্তি নামরূপ বিহায়।
তথা বিদ্বান্ নামরূপাৎ বিমুক্তঃ
পরাৎপরং পুরুষমুপৈতি দিব্যম্।। 

'প্রবহমান নদীসমুহ যেমন পৃথক পৃথক নাম ও রূপ ত্যাগ করে সাগরের সঙ্গে এক হয়ে যায়, তেমনই জ্ঞান (আপাতদ্বন্দ্বময় হলেও) এবং জ্ঞানী (আপাত ভিন্ন মতের হলেও) নাম রূপ থেকে মু্ক্ত হয়ে, পরম বা অব্যাকৃত প্রকৃতিরও পারে, চরম অবস্থায় স্বয়ংজ্যোতিঃ পরমাত্মাকে প্রাপ্ত হয়।'
চারটি উপনিষদের চারটি মহাবাক্যের অন্তর্গত মিল বিস্ময়কর। মনে হতেই পারে সত্যের এই চার প্রকার অভিব্যক্তি তো 'অন্তিমে সব একাঙ্গী'। 

এই আত্মাই ব্রহ্ম, প্রজ্ঞানই ব্রহ্ম, তৎ ত্বম্ অসি, এবং অহম ব্রহ্মাস্মি ----- এই বাক্যগুলির অর্থ, ব্যঞ্জনা, দ্যোতনা তো একই। শুধু মাত্র 'তৎ ত্বম্ অসি' বাক্যটির ব্যঞ্জনা সামান্য ভিন্ন। বাক্যটির লক্ষ্য সামান্য ভিন্ন। 

তবে আমরা ছান্দোগ্য উপনিষদের এই 'তত্বমসি' বাক্যটিকে  আশ্রয় করে যদি অগ্রসর হতে পারি তবে অন্য তিনটি মহাবাক্যের কিছুটা হলেও অর্থদ্যুতির ঝলক পাব। 

('ঝলক্' শব্দটি সজ্ঞানেই ব্যবহার করেছি এই কারণেই যে ঝলকের সঙ্গে আমাদের পরিচয় আছে। বৃন্দাবনে, প্রহরে প্রহরে নবসাজে সজ্জিত গোবিন্দের ঝলক দর্শন হয়। আবার যাঁরা বড় বড় সব দেব মন্দিরে গিয়েছেন তারা জানেন ভৌরবেলা থেকে পুন্যার্থীদের সারিতে দাঁড়িয়ে, আঁকা বাঁকা গোলকধাঁধা পথ পেরিয়ে যখন আমরা অভীপ্সিত দেবমূর্তির সম্মুখে আসি তখন মূর্তির উপর চোখ পড়তে না-পড়তে প্রবল ধাক্কায় বহির্গমন। সেটিও ঝলক দর্শন)। 

তাই 'আপন আত্মাই ব্রহ্ম, পরম জ্ঞানই ব্রহ্ম কিংবা আমিই ব্রহ্ম' ----- বলতে পারা সহজ কিন্তু আপন আত্মনের উপলব্ধি, জ্ঞান সাধনার অত্যুচ্চ চুড়ায় অবস্থান করবার পর বিশ্বচরাচরের সৃষ্টির মূল কারণ অনুসন্ধান করা এবং সেইখানে এই 'সূর্য-চন্দ্র-গ্রহ-নক্ষত্র-নীহারিকা'-র জ্যোতির্উৎসের (জ্যোতিঃ উৎসের) গোমুখে নিজেকে স্রষ্টার আসনে প্রতিষ্ঠিত করে বলা -- "ব্রহ্মাস্মি, আমিই ব্রহ্ম"--- সহজ কি ? 'এ সাধনা তো এক জনমের নহে।' তবু এই অনন্তের সাধনা থেকে সরে এসে মানুষ ঐহিক জীবনের অশাশ্বত সুখ-দুঃখ, লাভ অলাভের মধ্যেই গণ্ডিবদ্ধ হয়ে থাকতে চায় নি। গণ্ডিবদ্ধতা ছিন্ন করে, জৈবিক জীবনের দাসত্ব, ইন্দ্রিয়গুলির শৃঙ্খল-মুক্ত হয়ে মহত্তর,মহত্তম চৈতন্যলোকের (ব্রহ্মলোক) সন্ধানে সে নিরন্তর সাধনরত। যদিও পথ 'ক্ষুরস্য ধারা নিশিতা দুরত্যয়া'। আমাদের উপনিষদ সেই পথের সন্ধান করেছেন, সন্ধান পেয়েছেন, সন্ধান দিয়েছেন  ; এবং সঙ্গে সঙ্গে সেই দুস্তর পথের পাথেয়ও হাতের মুঠিতে ধরিয়ে দিয়েছেন।
দুস্তর সে পথের 'পাথেয় বাণী' নিত্যকার ধ্যানের মন্ত্র এই ছান্দোগ্য উপনিষদে উদ্ঘোষিত 'তত্বমসি' মহাবাক্যটির আলোচনা সামান্য হলেও সহজবোধ্য এই কারণেই যে ব্রহ্মর্ষি আরুণি পুত্র শ্বেতকেতুকে 'আদেশ' দান করছেন। সঙ্গে সঙ্গে মন্ত্রদ্রষ্টা ঋষি (আরুণি) মন্ত্রটির ব্যাখ্যাও করছেন। 

তাই এখন আমরা ছান্দোগ্য উপনিষদের সন্নিকটে যাব। আলোচ্য মন্ত্রটি ছান্দোগ্য উপনিষদে বিধৃত আছে। ছান্দোগ্য উপনিষদটির অতি সংক্ষিপ্ত একটি পরিচয় দিলে সুধী পাঠকদের (অবশ্যই তাঁদের অধিগত) স্মৃতি জাগরুক হবে। সামবেদের ছান্দোগ্য ব্রাহ্মণের মোট দশটি অধ্যায়ের শেষ আটটি অধ্যায় নিয়ে ছান্দোগ্য উপনিষদ। সামবেদ হোল ছন্দস্। এই ছন্দস্ যিনি গান করেন তিনি ছন্দগ্। সামবেদ অনুসারী যাঁরা তাঁরা ছান্দক  ; আর ছান্দকদের ধর্মমত ও অনুষ্ঠান নিয়ে ছান্দোগ্য উপনিষদ। 

আমাদের উপনিষদ শাস্ত্র আক্ষরিক অর্থেই 'আদরবতী'। স্নেহময়ী মাতা, স্নেহময় পিতা যেমন করে হাত ধরে সন্তানকে পথ দেখিয়ে জীবন পথে এগিয়ে নিয়ে যান, এই শাস্ত্রও তেমনটি। আমাদের হাত ধরে সত্যোপলব্ধির লক্ষ্যপথে আমাদের চালিত করেন‌ উপনিষদ। এই ছান্দোগ্য উপনিষদে আমরা তেমনই দেখব। এই উপনিষদের দশ দশটি অধ্যায়ের প্রত্যেকটিতে অমৃতক্ষরা বাণী আছে। কিন্তু সমস্তটির আলোচনার বিশালতার কথা চিন্তা করে আমরা আমাদের উদ্দিষ্ট মহাবাক্যটির কাছে আসি,---- 


"স  য এষ অণিমা ঐতদাত্ম্যমিদং সর্বং তৎ সত্যং স আত্মা  তত্বমসি  শ্বেতকেতো ইতি।"
                                         (অষ্টম খণ্ড, মন্ত্র সাত) 

পিতা অরুণি পুত্র শ্বেতকেতুকে বলছেনঃ
এই যে সূক্ষ্মতম বস্তু ('প্রাণ'), ইনি -ই সমস্ত জগতের অন্তরাত্মা (এককভাবে), আবার ইনিই আত্মা (এক এক ভাবে)। ইনিই সত্য, ইনি সৎ। সমস্ত জগতের ইনি আত্মা, তাই জগৎ আত্মবান, আবার এক এক ভাবে তোমার আমার আত্মা ইনিই, তাই আমরা আত্মবান। তুমিই সেই,  শ্বেতকেতু।
এই 'সূক্ষ্মতম বস্তু' প্রাণ, যিনি চৈতন্যস্বরূপ তিনি সৎরূপে, সত্যরূপে, শাশ্বতরূপে, একদিকে যেমন বিশ্বচরাচরে বিরাজমান, তেমনই  তিনি কণারূপে (চৈতন্যকণা) তোমার অন্তরেও বিরাজমান।
অতএব চরাচরপরিব্যপ্ত বিশ্বচৈতন্যের সঙ্গে তোমার যোগ অচ্ছেদ্য। তুমিই সেই মহাচৈতন্য, সৎ, সত্যরূপ, শাশ্বত ও সনাতন।
স্বয়ং অরুনের সন্তান উদ্দালক আরুণি পুত্র শ্বেতকেতুকে বার বার বলছেন, তুমিই সেই  ; কিন্তু শ্বেতকেতুর বোধগম্য হচ্ছে না কিছুতেই। শ্বেতকেতুও বার বার পিতাকে অনুরোধ করেই চলেছেন,
"ভূয় এব মা ভগবান্ বিজ্ঞাপয়ত্বিতি তথা সোম্য ইতি উবাচ।"
                                       (দ্বাদশ খণ্ড, মন্ত্র দুই ও তিন) 

পিতা উদ্দালকের ধৈর্য অসীম। তিনিও পুত্রের সংশয়ের নিরসনের প্রয়াসে ক্লান্তিহীন। সূক্ষ্মতম যে আত্মা অদৃশ্য, তার থেকে জগৎ ! এবং তাইই একটি ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র প্রাণ, চৈতন্যকণা ! তাই আবার নিখিল বিশ্বে পরিব্যপ্ত পরমাত্মা, ব্রহ্ম! সেই পরমাত্মার সত্তা আমার মধ্যে !
এই প্রজ্ঞা তো সহজবোধ্য নয়। কিন্তু সন্তানকে তো আত্মজ্ঞানে দীক্ষা দিতেই হবে।
এখানেই, উদ্দালক আরুণি যখন দেখছেন পুত্র কোন মতেই নিঃসংশয় হতে পারছে না তখন তিনি বুঝলেন সাধন ব্যতিরেকে এই উপলব্ধি সম্ভব নয়। তিনি পুত্রকে আদেশ দিলেন, "যাও, ঐ বটগাছের একটি ফল নিয়ে এসো।"
শ্বেতকেতু বটগাছের ফল নিয়ে এলেন। পিতা তাঁকে সেটি ভাঙতে বললেন। শ্বেতকেতু তা ভাঙলেন। পিতা জিজ্ঞাসা করলেন, "কি দেখতে পাও ?" শ্বেতকেতু বললেন, "অণ্ব্য ইব ইমাঃ ধানাঃ।" অণুর মত সব বীজ। পিতা পুত্রকে আবার বল্লেন, "একটি বীজকেও ভাঙ এবং কি আছে দেখ।" পুত্র জানালেন আর তো কিছু দেখা যায় না।
মহর্ষি উদ্দালক আরুণি তখন উচ্চারণ করলেন,
"সোম্য এতম্ বৈ অনিমানম্ যম্ ন নিভালয়স এতস্য বৈ অণিম্নঃ এস মহান্যগ্রোধঃ এবম্ তিষ্টতি।
সোম্য শ্রদ্ধৎস্ব।।"

উদ্দালক পুত্রকে তখন বললেন, হে সোম্য, বীজের মধ্যে যে সূক্ষ্মতম অংশটিকে তুমি দেখতে পাচ্ছ না, একটি বিশাল বটগাছের সম্ভাবনা অদৃশ্যভাবে তার মধ্যেই রয়েছে। শ্রদ্ধাবান হও, বিশ্বাস কর, এই বীজের মধ্যে দৃশ্যাতীত প্রাণকণিকারূপ চৈতন্য আর অনন্ত এই জগতের মহাচৈতন্য এক। তিনি ব্রহ্ম, তুমিও ব্রহ্মস্বরূপ।‌ তত্বমসি। 

আরুণি উদ্দালক এখানে একাধারে পিতা ও আচার্য। ভারতীয় আর্য-ধর্মের এই পরম্পরায় পিতৃত্বের যে ভূমিকা তাই মানবজীবনের দিশা নির্ধারণ করে দেয়। পিতা যখনি পুত্রকে 'তুমি ব্রহ্ম' --- এ বলে সম্বোধন করছেন তখনই পুত্রের অন্তরে আত্ম-অন্বেষণের, আত্মানুসন্ধানের ব্যগ্রতা এবং আত্মানুভূতির জাগরণ ঘঠল। এবার স্ব-আত্মার সঙ্গে পরমাত্মার যোগ সাধনের ব্যাকুলতা। 

পরমাত্মা, "অখণ্ডমণ্ডলাকারম্ ব্যপ্তম যেন চরাচরম তদপদম দর্শিতং যেন তস্মৈ শ্রীগুরবে নমঃ।"

অখণ্ডমণ্ডলাকার, চরাচর পরিব্যপ্ত যিনি (পরমব্রহ্ম) তাঁর শ্রীচরণ যাঁর দ্বারা দেখার দৃষ্টি লাভ করলাম, সেই গুরুদেবকে আমার প্রণাম নিবেদন করি। 

এবার আমরা অন্য তিনটি মহাবাক্যের আলোচনা যদি করি তবে দেখব সবগুলি উচ্চারণেই সেই একই  উদ্দিষ্টের দিকে তারাও ইঙ্গিত করেছেন। (বৈদিক মন্ত্রগুলিকে 'আপনি' বলেই সম্বোধন করা হয়)।
পিতা ও আচার্যের দ্বারা যখনি এই আত্মানুভূতি ও পরমাত্মার বোধি জাগরুক হোল তখনই শিষ্যের কাছে তার জীবন-সাধনার পথ উন্মুক্ত হয়ে যায়। সাধনায় সিদ্ধি লাভের পথে তিনি উপলব্ধি করেন, "অয়ম্ আত্মা ব্রহ্ম"--- এই আত্মাই ব্রহ্ম বা আমার মধ্যে জাগ্রত যে 'অণিয়ান ' সত্তা তা মহিয়ান পরমাত্মার (ব্রহ্মের) সঙ্গে সম্পর্কিত।
                                             (মাণ্ডুক্য উপনিষদ) 

ঐতরেয় উপনিষদের 'প্রজ্ঞানম্ ব্রহ্ম' বা 'ব্রহ্ম হলেন শুদ্ধ চৈতন্য' --- সেই একই মহতোপলব্ধি। যিনি জৈবিকতা-ক্লিন্ন বা লোভ-মোহ-কাম-ক্রোধ-মাদক-মাৎসর্য্য দ্বারা পীড়িত নন, যিনি জিতেন্দ্রিয়, অনৃশংস, অহিংস -- তিনিই শুদ্ধ চৈতন্য, তিনিই পরম চৈতন্যময় সত্তাকে লাভ করেন ও তাঁর সঙ্গে একীভূত হয়ে যান।
পরম ব্রহ্মের সঙ্গে এই একীভূত অবস্থাই মানব জীবনের পরিপূর্ণতা। তখন সাধক ঘোষণা করতেই পারেন --- "অহং ব্রহ্মাস্মি।" 

                                  (বৃহদারণ্যক উপনিষদ) 

এই মহাবাক্যে মীমাংসিত হয়েছে মানবের দেবত্বলাভ এবং ব্রহ্মাণ্ডব্যপ্ত ব্রহ্মের সঙ্গে আধ্যাত্মিক একত্ববোধে ।

এই হোল ভারতীয় ধর্মধারণায় ঈশ্বরসাধনার লক্ষ্য। ধর্মমত, সাধনপথ ভিন্ন ভিন্ন হতে পারে কিন্তু অভিসার সেই পথে যে পথের শেষে মানবজীবনের পূর্ণতা।
ভারতের ধর্মাচরণে তাই বহুপ্রকার সাধনমার্গ। জ্ঞানমার্গ, ভক্তিমার্গ, কর্মমার্গ। সাধনপন্থাকে 'যোগ' নামেও অবিহিত করা হয়ে থাকে। তখন জ্ঞানযোগ, কর্মযোগ, ভক্তিযোগ এবং রাজযোগের কথা আসে। যে পথেই, যে মতেই সাধনা করা হোক না কেন অভিলষিত লক্ষ্য ও পরম উদ্দিষ্ট সেই পূর্ণতাপ্রাপ্তি। 


এই 'উপনিষদের এই চারটি মহাবাক্য নিয়ে আমরা এতক্ষণ যে আলোচনায় প্রবৃত্ত হয়েছি তা জ্ঞানযোগ বা জ্ঞানমার্গের সাধনার কথা। বৃহত্তর মানবসমাজের মানুষ, যাঁরা জীবনরক্ষার জীবনসংগ্রামে নিত্য ব্যতিব্যস্ত তাদের পক্ষে 'জ্ঞানযোগ' সাধনা দুশ্চর। 'কর্মযোগ' ও 'ভক্তিযোগ' সাধনের দ্বারাই তাঁরা পরমসত্তার সঙ্গে, পরম 'প্রেয়'র সঙ্গে একাত্মতা লাভ করেন। শ্রীমৎ ভাগবতে অষ্টাদশ অধ্যায়ে শ্রীকৃষ্ণ (যাঁকে পরমপ্রজ্ঞা, পরমাত্মা ও পরম চৈতন্যময় সত্তারূপেই ভারতের সনাতন ধর্ম স্বীকার করেছেন) অর্জুনকে বিশ্বরূপ দেখানোর পর, বলছেনঃ 

সর্ব কর্মাণ্যপি সদা কুর্বাণো মদ্ব্যপাশ্রয়ঃ।
মৎ প্রাসাদাৎ অবাপ্নোতি শাশ্বতং পদমব্যয়ম্ ।। 

যাঁরা মৎপরায়ণ  (আমাকেই আশ্রয়ে করেন), নিষ্কাম কর্মব্রতী, জগতের মঙ্গলের নিমিত্ত কর্ম করতেই থাকেন, আমার কৃপাতে তিনি সনাতন, অবিনাশী পরম পদ (ঈশ্বরের শ্রীচরণ) লাভ করেন।
এই বাণীর মধ্য‌ দিয়েই কর্মযোগ ও ভক্তিযোগের সাধনপথের ইঙ্গিত দিয়েছেন পূর্ণচৈতন্যস্বরূপ আমাদের চির আরাধ্য শ্রীকৃষ্ণ।

তাই আমাদের উপনিষদীয় বোধির বুদ্ধস্বরূপ সেই ঋষিকবি রবীন্দ্রনাথের কথাতেই বলি, 

"আমার একলা ঘরের আড়াল ভেঙে 

            বিশাল ভবে 

     প্রাণের রথে বাহির হতে 

           পারবো কবে |" 

                                                                  সমাপ্ত 

____________________________________________















বৃহস্পতিবার, ২৪ এপ্রিল, ২০২৫

O Olympus, get your gate open

O Olympus, get your gate open 

We 're at your gate Olympus, get it open.
Throat chocked, tongue shrivelled
Stand unmoved as stonny pillers,
A team of lads and lasses with their mothers Bewildered. With tearless fear they beheld
Their fathers're shot at, fallen down trembling
With blood dilapidated. Dark, Dark, Dark !
They too fell as if they're lopped of saplings,
And fell into a swoon.
                   Soon the great war was over.
The warriors disappeared. A volly of gunfire,
A bizarre sound of laughter echoed long --
Through the woods and mounds !
The sun set blood-red, the moon lurked
frightened, the silence of serenity descended.

O listen my brethren, do not run afar,
Here, here is the Olympus, we yearn for,
More tranquil, deserted, lifeless and gloom,
A soothing dark veil in the valley tintless,
And quieter than the doom.

Dulal Chandra Bandyopadhyay
April 24, 2024
Bangalore.

___________________________________________










বুধবার, ২৩ এপ্রিল, ২০২৫

হে নরক, ঢাকো ঢাকো চোখ

হে নরক, ঢাকো ঢাকো চোখ

কোন শব্দ রয়েছে কি মানুষী ভাষায়,
যা দিয়ে বর্ণিত হবে এই বীভৎসতা !
অবোধ নির্বোধ শিশু নির্বাক নিথর,
অসহায় নারী নিস্পন্দ পাথর !
শুধু থেমে থেমে বন্দুকের শব্দ !
প্রতিধ্বনি পাহাড়ে পাহাড়ে কাঁপে ;
আর রক্তস্নাত দেহ পড়ে একে একে !
পিতা, পতি, সন্তান তারাও মানুষেরই।
তারা কি ছিল কি কেও ধর্মের বিদ্রোহী ?
অস্ত্র হাতে চেয়েছিল সম্পদ লুণ্ঠন ?

বিমুগ্ধ চাহনি দিয়ে পূজারীর মত
বরণ করতে চেয়ে স্রষ্টার অপরূপ রূপ
গিয়েছিল ভূস্বর্গের নন্দন কাননে।
উপহার তার এমনই ভীষণ মৃত্যু, যার
নারকীয় ছবি দেখে নরক নিজেই
দুই চোখ ঢেকে ছিল অক্ষম লজ্জায় !

দুলাল চন্দ্র বন্দোপাধ্যায়
২৩শে এপ্রিল, ২০২৫
ব্যাঙ্গালোর।
__________________________________________

বুধবার, ১৬ এপ্রিল, ২০২৫

স্বামী রঙ্গনাথানন্দ ও বর্তমান ভারতবর্ষে তাঁর মতাদর্শের অপরিহার্যতা- ৫

পাঁচ 

কামনা ও ভোগস্পৃহা মানুষের সমস্ত দুঃখের মূল। একথা আমাদের ধর্মশাস্ত্রগুলিতে কতবার কত ভাবে যে লেখা হয়েছে তার ইয়ত্তা নাই। কিন্তু কামনা ও ভোগাসক্তি ত্যাগ করা কি যায় ? আর তা যদি সামাজিক এবং পরিবারভুক্ত মানুষ -- বাস্তবে ত্যাগ করে তবে মানুষের সমাজ বা পরিবার নামক প্রতিষ্ঠানগুলিই অচল, অনুৎপাদক হয়ে যাবে। যাবেই। আর এই যে গীতায় (১৩/৯) শ্রীকৃষ্ণ বলে দিলেন,--- 

"অসক্তিরনভিষ্বঙ্গঃ পুত্রদার গৃহাদিষু।
নিত্যঞ্চ সমচিত্তম্ ইষ্টানিষ্টোপপত্তিষু।।" 

পুত্র, স্ত্রী, গৃহ, ধন সম্পদ ইত্যাদিতে কোন আসক্তি থাকবেনা, 'অনভিষ্বঙ্গ' হবে, অর্থাৎ কোন মায়া মমতা থাকবে না, আর প্রিয় বা অপ্রিয় যাহা-ই আসুক সর্বদাই সমভাবে গ্রহণ করতে হবে। এরকম কামনাবিবর্জিত হয়ে কি আর সংসার করা যায় ? কাম ও কামনা প্রজনের চালিকাশক্তি। আর প্রজনন বা উৎপাদনের প্রতি আসক্তির তীব্রতা থেকেই মানব সভ্যতার ক্রমোন্নয়ন। শরীর থাকলে ইন্দ্রিয়গুলির ক্রিয়াও থাকবে। ইন্দ্রিয়ানুভূতিও থাকবে। না যদি থাকে তবে শবদেহবৎ একটি অহল্যা-মূর্তি থাকাও যা, না-থাকাও তা। আর মনুষ্যসুলভ  ইন্দ্রিয়ানুভূতির, বরং বলা যায়, সংরক্ত ইন্দ্রিয়ালুতার মহাকবি আমাদের কালিদাস তো 'রঘুবংশ'-এ বলেইছেন, "শরীরম্ আদ্যং খলু ধর্মসাধনম্।" শরীর না থাকলে  এবং শরীরের মধ্যে ভোগবাসনার অদম্য ইচ্ছার আন্তর-প্রেরণায় অনুপ্রাণিত না হলে জীবনের রথ সচল থাকবে কেমন করে ? 


'শরীরই হোল উচ্চতর, উচ্চতম জীবনবোধ লাভ করার সাধনমন্দির।'
"দেহের ভাঁড়ে ছলকে পড়ে খে-জুর গাছের রস।" -- -- --বাউল। ('খ' এখানে আকাশ।) 

এইটিই সারকথা।
আমাদের জীবন্ত দেব-দেবী জনক-জননীর মনোবাসনায় প্রাপ্ত, তাদের সেবায় স্নেহে বর্ধিত এই পার্থিব দেহ, এই অনন্ত আবেগানুভূতি-ঋদ্ধ জীবনে জৈবিক প্রবনতাগুলির অপরিহার্যতা স্বীকার করেও যা থাকে তা হোল ইন্দ্রিয়াতীত চৈতন্যের অনুসন্ধান। জৈবিক জীবনের চাহিদাগুলো পূরণ করেও 'শাশ্বত-নিত্য-সত্য' জীবনের জন্য সাধনা আমাদের ধর্মশাস্ত্রগুলিও স্বীকার করে।
অতিন্দ্রীয় এবং ইন্দ্রিয়াতীত জ্ঞানের মূর্ত মূর্তি পরম নিরঞ্জন গৌতম বুদ্ধ বুদ্ধত্ব লাভের পর বারাণসীর কাছে সারনাথে তাঁর‌ শিষ্যদের প্রথম উপদেশ দিয়েছিলেন, মানবজীবনে দ্বৈতসত্তা ও মধ্যপন্থার কথা উল্লেখ করে।
"একটি হোল যা ইন্দ্রিয়সুখের মাধ্যমে কাম-লালসার সঙ্গে যুক্ত ও সম্পর্কিত এবং নীচ, অজ্ঞ, অমার্জিত, ইতর এবং মূল্যহীন ; অপরটি আত্মপীড়নের সঙ্গে সম্পর্কিত -- কষ্টদায়ক, নিকৃষ্ট ও মূল্যহীন।"
এই দুই চরম মূল্যহীন পথ অনুসরণ না করে তিনি একটি মধ্যপথের দিশা দেখিয়েছেন। যে পথের অনুসরণের মধ্য‌ দিয়ে আসে ইন্দ্রিয়াতীত অনুভূতি এবং প্রজ্ঞা, যা এগিয়ে দেয় শান্ত পরিবেশ, বিবেকপূর্ণ-বোধি ও শান্তির অভিমুখে। 

এমন মধ্যপন্থার কথা আছে গীতাতেও। 

নাত্যশ্নতস্তু যোগহস্তি ন চৈকান্তম্ অনশ্নতঃ।
ন চাতিস্বপ্নশীলস্য জাগ্রত ও নৈবচার্জুন।।

যুক্তাহারবিহারস্য যুক্তচেষ্টস্য কর্মসু।
যুক্তস্বপ্নাববোধস্য যোগো ভবতি দুঃখহা ।। 
                                                 (ষষ্ঠ অধ্যায়)। 


অতিভোজী, অনাহারী, অতি নিদ্রালু এবং অনিদ্রা অভ্যাসকারীরদের যোগ হয় না। বরং পরিমিত আহার-বিহারশীল, পরিমিত কায়কর্মশীল এবং নিদ্রা-জাগরণে যাঁদের পরিমিতি বোধ আছে তাদের সাধনা (যোগ) সংসার-দুঃখ নাশক হয়।

এখানেই ঋষিকল্প স্বামী রঙ্গনাথানন্দ মহারাজের উপনিষদ ব্যাখ্যার বিশেষত্ব। তিনি বেদান্ত শ্রুতির এমন এক সুন্দর, সহজতর ভাষ্য রচনা করেছেন যা সাধারণ মানুষেরও বোধগম্যতার মধ্যে ধরা পড়ে। সাধারণ মানুষেরও অধিকার আছে আপন স্বাধীন চিন্তার মাধ্যমে স্রষ্টাকে জানা, সৃষ্টিকে জানা। উপনিষদ আমাদের সেই শিক্ষাই দিয়েছেন। কঠোর তপশ্চর্যা, কৃচ্ছসাধনা বা যোগসাধনায় যাঁরা সত্যকে উপলব্ধি করেছেন, আর যাঁরা সুশৃঙ্খল জীবনাচরণের মধ্যে দিয়ে সত্যের অনুসরণ করেছেন -- দুই দলই একই তীর্থের যাত্রী। স্বামী রঙ্গনাথানন্দ মহারাজ এ-প্রসঙ্গে যা বলেছেন তার অন্তর্নিহিত ভাব এই রকমঃ --- 

শরীর, ইন্দ্রিয়াতীত ও মনস্ বা মন সঠিক নিয়ম শৃঙ্খলায় চালিত হলে বুদ্ধি শুদ্ধ ও মুক্ত হয়।‌ তখন সে উপলব্ধি করতে সমর্থ হয় আত্মার সৎরূপের (সত্যরূপ) বিরাটত্বকে ----- যে আত্মা নিজেকে অনুভূতিতে মানবাত্মারূপে‌ ধরা দেন।  মানুষ নিজেই এই মানবাত্মার সাধনায় ব্রতী হতে পারেন। ধর্মগ্রন্থ বা ধর্মগুরুদের দ্বারা আরোপিত বিধিনিষেধ পালনের দ্বারা নিজের আপন অন্তরাত্মার সঙ্গে যোগ সাধিত হয় না। 


স্বামী বিবেকানন্দ (মানবতাবাদের পরাকাষ্ঠা) বলছেন, "কোন বিধিনিষেধের দ্বারা মুক্তিলাভ হয় না। তুমি সদা মুক্ত আছো। যদি তুমি পূর্ব হতেই মুক্ত না হতে তবে কিছুই তোমায় মুক্তি দিতে পারে না। আত্মা স্বপ্রকাশ। কার্য-কারণ আত্মাকে স্পর্শ করতে পারে না --- এই দেহশূন্য ভাব বা বিদেহ অবস্থার নামই মুক্তি।" 

এই প্রসঙ্গে তাঁর কালজয়ী বক্তব্যের কিছুটা অংশ উদ্ধার করি, ----
এখানে সেখানে, মন্দিরে গীর্জায় ,স্বর্গে মর্ত্যে, নানাস্থানে এবং নানা উপায়ে অন্বেষণ করবার পর অবশেষে আমরা যেখান থেকে আলোচনা আরম্ভ করেছিলাম (আত্মা স্বপ্রকাশ), সেই আত্মাতেই যদি বৃত্তপথে ঘুরে‌ আসি, তবে দেখতে পাই  যার জন্যে আমরা সমগ্র জগতে অন্বেষণ করেছিলাম, যার জন্য আমরা মন্দিরে গীর্জায় --- সকল ধর্মস্থানগুলিতে  কাতর হয়ে প্রার্থনা ও অশ্রু বিসর্জন করেছিলাম, যাকে আমরা সুদূর আকাশে মেঘরাশির দ্বারা আবৃত ---- অব্যক্ত রহস্যময় বলে মনে করেছিলাম, তিনি আমাদের নিকট হতেও নিকটতর, প্রাণের প্রাণ ; তিনিই আমার দেহ, তিনিই আমার আত্মা। 'তুমিই  আমি, আমিই তুমি।' 


"আমার মধ্যে তোমার প্রকাশ তাই এত মধুর।‌"
                                                  --- রবীন্দ্রনাথ 


এই ধর্মদর্শন একান্তভাবেই বৈদান্তিক ; অর্থাৎ ঋকবেদ, সাম, যজুঃ -র পরবর্তী কালের (অথর্ব বেদ প্রথমে মূল শ্রুতিসংহিতার অন্তর্গত ছিল না)  যখন ঋষিগণ বুঝতে পেরেছিলেন কলস কলস ঘৃত অগ্নিতে আহুতি দেওয়ার  নিরর্থকতা। যাই হোক্, আর্য জাতির ধর্মাচরণের এই ক্রমবিবর্তনের ইতিহাস সুদীর্ঘ। শতাব্দী নয়, সহস্রাব্দের ব্যবধান ছিল ঋকবেদ থেকে উপনিষদ, শ্রীমৎ ভাগবত এবং রামায়ণ-মহাভারতাদি পুরাণ রচনার সময়কালে পোঁছাতে। 

এই হাজার হাজার বছর পরে (ঋক্ পরবর্তী) আর্য জাতির ধর্মাচরণের রীতি বহুধাবিভক্ত হয়েছে। বৌদ্ধ ও বৌদ্ধধর্মাবলম্বীগণ, মহাবীর জৈন ও জৈনধর্মাবলম্বীগণ বিভিন্ন শাখায় ভাগ হয়ে গিয়েছেন। বেদবাদীগণের মধ্যে ব্রাহ্মণ্যবাদী স্মার্ত এবং বেদান্তবাদী মীমাংসক সম্প্রদায়ের সৃষ্টি হয়েছে। এই উভয় সাম্রদায়ের মাঝখানের মতবাদীরা ছিলেন আবার সাংখ্যিক। আর্যধর্মের এত বিভাজন ছাড়িয়েও এক বিপুল জনগোষ্ঠী ছিল যারা (তারাই সংখ্যাগরিষ্ঠ) লোকায়তিক। ('লোকায়ত দর্শন' একটি স্বতন্ত্র বিষয়)। 

এই সব জ্ঞাতব্য বিষয়গুলির ইঙ্গিত দিয়ে আমরা আবার ফিরে আসি 'উপনিষদের সন্দেশ' আলোচনায়। ঈশ্বর- সাধনা, উপনিষদ যাকে 'ব্রহ্ম' সাধনারূপেই বর্ণনা করেছেন, তা কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম নয়। সে ধর্ম গুরুমুখ বিতরিত এবং গুরুকুল নিয়ন্ত্রিত। অবশ্য এই সমস্ত গুরুগৃহগুলি যেমন বশিষ্ঠ, গৌতম, যাজ্ঞবল্ক্য, অত্রি প্রভৃতি--- বংশানুক্রমে বা শিষ্যাণুক্রমেই চলমান ছিল। কিন্তুু আর্য ধর্মধারণা বহির্দেশীয় ইহুদী, খ্রীষ্টান, ইসলাম এবং ভারতবর্ষীয় জৈন, বৌদ্ধ ধর্মের মত একক, প্রশ্নাতীত বা ঈশ্বরকল্প কোন প্রবর্তকের দ্বারা প্রচারিত নয় ; নিয়ন্ত্রিতও নয় সেই সমস্ত ধর্মধারণার প্রাতিষ্ঠানিক 'স্মার্তগণের' মত। 

বৈদান্তিক বা উপনিষদীয় ধর্ম একাধারে ব্যক্তিক ও সর্বজনীন। যার ফলে আর্য ছাড়া ন-আর্য জনগোষ্ঠীর আচরিত সংস্কার ও রীতি নীতির মধ্যেও বৈদান্তিক ধর্মবোধের, ধর্মাচরণের প্রভাব ক্রিয়াশীল।
আমাদের বৈদিক সভ্যতার প্রথম আধ্যাত্মিকতার ইতিহাস যদি ঋকবেদ হয়, তবে ঋকবেদের সুক্ত গুলির দ্বারা প্রার্থিত বিষয়গুলি ছিল প্রাণরক্ষার প্রয়োজনে। একটি সুক্তে বলা হচ্ছে,

ব্রহ্মণস্পতে সুষমস্য বিশ্বহা রায়ঃ শ্যাম রথ্যো বয়স্বতঃ।
বীরেষু বীরাঁ উপ পৃঙধি নস্তং যদিশানো ব্রহ্ম তা বেষি মে হবম্।। 

হে ব্রহ্মণস্পতি, বিশ্বব্যাপি সুনিশ্চিত (ভিন্নার্থে সুনিয়ন্ত্রিত) ধনের আমরা যেন অধিপতি হই  ; আমাদের বীরদেরকে তুমি  বীর পুত্র উৎপাদন করতে সাহায্য কর। তুমি সকলের শ্রেষ্ঠ এবং আমাদের অন্নযুক্ত ('নৈবেদ্য) স্তুতির অভিলাষী। 
অথবা
অম্বে রায়ো দিবে দিবে সং চরন্তু পুরস্পৃহঃ।
অম্বে বারাস ঈরতাম্।।

ওহো অগ্নি, আমাদের অতি কাম্য ধনসমুহ আমাদের নিকট আনয়ন করুক। অন্নসমুহ (খাদ্যদ্রব্য ) আমাদিগকে কর্মের প্রেরণা দিক।

মন্ত্রগুলি (সাম) অতি অনুশীলীত কণ্ঠে প্রার্থণা- সঙ্গীতরূপে গীত হোত। এই সকল গান ছিল কামনার গান। অন্নের কামনা, ধনের কামনা, পশুর কামনা, সন্তানের কামনা, নিরাপত্তার কামনা। মোক্ষলাভের কামনা নয়, আধ্যাত্মিক উৎকর্ষের কথা নয়। সরলভাবে নেহাতই পার্থিব কামনা প্রকাশ করা হয়েছে।
ধন, জন, জীবন লাভের এই প্রার্থনা তো বিশ্বের সমস্ত আদিম সভ্যতার প্রাথমিক চাহিদা। হাজার হাজার বছর অতিবাহিত হবার পর, এই প্রাথমিক চাহিদাগুলিই রূপান্তরিত হয়ে যে আধ্যাত্মিক কামনা জীবন ও জগৎ সৃষ্টির কারণ অনুসন্ধানে ব্যাপৃত হোল উপনিষদসমুহ তারই বাঙ্ময় অভিব্যক্তি। এবং সেই 'অভিব্যক্তি' যা মানব সভ্যতার সমগ্র শাখার জ্ঞান বিজ্ঞানের ক্রমবিকাশের আদিতম উচ্চারণ। তাইই উদ্ভাসিত হয়েছে, উদ্ঘোষিত হয়েছে, হয়ে আছে আমাদের উপনিষদগুলিতে। 

"অসতো মা সৎগময়
তমসো মা জ্যোতির্গময়
মৃত্যোর্মা অমৃতংগময়ো।।" 

 এমন আর্ত উচ্চারণ বহুযুগের জীবনসাধনার অন্তিম প্রার্থণা |

এরপর চারটি মহাবাক্য নিয়ে আলোচনা I 
                                     


সোমবার, ১৪ এপ্রিল, ২০২৫

শুভ নববর্ষ নাকি অশুভ অকাল

শুভ নববর্ষ নাকি অশুভ অকাল 

'শুভ নববর্ষ' বলা কিম্বা লেখা নূতন খাতায় ---
ক্ষান্তি দাও, ভুলে যাও। ঐ শব্দ দুটো দেখে বা শুনে
হাহাকার করে ওঠে আশা-ভাঙা বুক, লজ্জায় মুখ
খোঁজে অন্ধকার। বাঙলার লক্ষ গ্রামে, শত জনপদে
স্তব্ধ আজ সব‌ কথকথা -- শ্রীরাম পাঁচালী, কৃষ্ণলীলা,
আজানের গান, শুক সারী দ্বন্দ্বকথা ভৈরবীর তানে,
সান্ধ্য সংকীর্তন পালা, মৃত্যুঞ্জয়ী বেহুলার নূপুরের ধ্বনি
ইমনে বেহাগে। পরিবর্তে তার মানব-জন্তুর হুহুঙ্কার
আসে ভেসে, সাথে তার শোকের দমিত স্বর বঙ্গজননীর।
চেনা মুখ অচেনা চাহনি-- হয় হাতে ত্রিফলা ত্রিশূল,
নয় তীক্ষ্ণ তরোয়াল। কার রক্ত কোন্‌ প্রয়োজনে
জানে না সে। ঐ দেখ, মাঝপথে শ্মশানের চিতা ---
কার ভালবাসা পোড়ে কোন্ পাপে, কার অভিশাপে
জানে না সে। দোহাই তোমার, দেখো নাকো চেয়ে
ঝলসানো খড়ের কুটীর -- মাটির‌ দাওয়াটি জুড়ে
লাল রঙ ছোপ ছোপ দেওয়ালে, মাটিতে। শুনো নাকো,
ওই লাল রঙ নয়, তাজা রক্ত কিশোরের ; সবে মাত্র
শিথিল হয়েছে যার দেহ -- ছট্পট্ তঞ্ছট -- শীতল এখন।

বাঙলার নূতন বছর, হালখাতা ;  সুদল কদলি পাতা,
আমের পল্লব-ঢাকা সুমঙ্গল ঘট -- আল্পনা-চিত্রালি
দুয়ারে দুয়ারে, ভাঁড়ে ভাঁড়ে মিষ্টান্নের মধু-আমন্ত্রণ
ছিল তো সেদিনও, হয়তো বা রয়েছে এখনো।
কিন্তু 'নিমন্ত্রণ' ? বিষ মাখা বাক্যবাণে বিচ্ছিন্ন সমাজ।
যাক্ চলে বছরের প্রথম সকাল বারুদের গন্ধ মেখে---
ছাই-ওড়া, রক্ত-ধোওয়া রুদ্র বৈশাখের নৃত্য হোক্‌ আজ।

দুলাল চন্দ্র বন্দোপাধ্যায়
১লা বৈশাখ, ১৪৩২
ব্যাঙ্গালোর।
_______________________________________________










রবিবার, ১৩ এপ্রিল, ২০২৫

"এরে ভিখারি সাজায়ে"

এরে ভিখারি সাজায়ে  


বহিরাবরণ অলঙ্করণের অন্তরালে আন্তরমূর্তির বাঁশ-খড়ের কাঠামোটি যখন নিরাবরণ হয়ে যায় তখন দেবতা যিনি, যিনি এতদিন মুগ্ধচিত্ত ভক্তদের ভক্তির আসনে অধিষ্ঠিত দিলেন, তাঁর আপন করুণ পরিণতি দেখে করুণা জাগে কি না জানিনা (জানবার উপায় বা অধিকার কোনটিই নেই), তবে 'যশোলাভের' অক্ষম আকাঙ্ক্ষা যদি সারস্বত মন্দিরের দীনাতিদীন, জীর্ণ কোন সোপান-সম্মার্জনীর অন্তরে জেগে থাকে তবে সেই লজ্জাহীন ভিখারিত্বের উলঙ্গ চিত্তটি তার নিজের কাছেই বড়ো করুণার ! আপনার অন্তরসত্তার এমন ভিক্ষুকদশা আবিষ্কার করে‌ সে কবির মাথা নত হয়ে আসে মহতের চরণপ্রান্তে যিনি দৈবসৃষ্ট কবি, যিনি বীণাপানির আশীর্বাদধন্য স্রষ্টা, যিনি বাণীর সাধনায় সিদ্ধি লাভ করেছেন। 'বাণীই' মানবের আত্মচৈতন্য জাগরণের প্রেরণা। বাণীই প্রকাশিত বিশ্বের 'শোভনতমা' বিদ্যা। 

"সর্বেষাং হি শোভমানানাং শোভনতমা বিদ্যা।
তথা বহু শোভমানা ইতি বিশেষনম্ উপপন্নং ভবতি।" 

(ইন্দ্রের সত্যের প্রতি ভক্তি দেখে ...'কেন' উপনিষদের একটি উপাখ্যান ) অধ্যাত্মজ্ঞান স্বয়ং, দেবী উমারূপে উপস্থিত হলেন তাঁকে আশীর্বাদ করতে।
এখানে উমাকে বহুশোভমানা, স্বর্গীয় উজ্জ্বলারূপে বর্ণনা করা হয়েছে।
ভগবান শঙ্করাচার্য তাঁর টিকায় লিখছেন, "বিদ্যা বা আধ্যাত্মিক জ্ঞান -ই সমস্ত উজ্জ্বল বস্তুর মধ্যে উজ্জ্বলতম।" 

 জ্ঞানভিখারীই মানবসংসারের শ্রেষ্ঠতম ভিক্ষুক। আর বাক্ বা বাণীই পরম ঐশ্বর্য জ্ঞানের বাহক।

তাই অনুজ কবি মহাকবির নিকট নিয়ত ভিক্ষা করেন বাণী। কবিগুরু বাল্মীকির কাছে প্রার্থনা আর এক মহাকবির, 

"গাঁথিব নূতন মালা, তুলি সযতনে 

তব কাব্যোদ্যানে ফুল ; ইচ্ছা সাজাইতে 

বিবিধ ভূষনে ভাষা ; কিন্তু কোথা পাব 

(দীন আমি) রত্নরাজী, তুমি নাহি দিলে 

রত্নাকর --- কৃপা প্রভু কর আকিঞ্চনে।" 

              ('মেঘনাদ বধ') মাইকেল মধুসূদন দত্ত। 


আমাদের শ্রীমদ্ভাগবৎ গীতা এও বলছেনঃ

ধৃত্বা যয়া ধরায়তে মনঃপ্রাণেন্দ্রিয়ক্রিয়াঃ।
যোগেনাব্যভিচারিণ্যা ধৃতিঃ সা পার্থ সাত্ত্বিকী।। 

যে আকাঙ্ক্ষা মন, প্রাণ ও ইন্দ্রিয়গুলির ক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করে, সমভাবে তাদের তেজকে অন্তর্নিহিত ঈশ্বরাত্মার দিকে ফিরিয়ে দেয়, সেই আকাঙ্ক্ষাই , হে পার্থ,  'সাত্ত্বিকী আকাঙ্ক্ষা' -- তাই জেনো। 


কিন্তু এই 'ভিখারি' শব্দটির উচ্চারণে যে কল্পমূর্তি আমাদের মানসচক্ষে উপস্থিত হয় তা বড়ই বেদনার। এই দীর্ঘ জীবনকালে তেমন মর্মভাঙা দৃশ্য দেখেওছি অগনন। জীবনের বিস্মৃত পথের ছায়াচ্ছন্ন বিচ্ছিন্ন প্রান্ত থেকে মূর্ত রূপ ধরে দাঁড়ালো কত যে 'ভিখারি' দেব-দেবী--- যাঁদের,-- 


"একটি শুধু পয়সাদিয়ে বকেছিলাম কত,
আজকে তাহা বিঁধছে বুকে কুশাঙ্কুরের মত।
কথা সে তো কয়নি কিছু, 
ছিল করে মুখটি নীচু,
জনম ভরে রয়ে গেল নিজের দেওয়া ক্ষত।" 

                      ------- কুমুদরঞ্জন মল্লিক। 


ওই কড়ি-কপর্দকশূন্য, নিরন্ন ভিক্ষাজীবী ব্যতিরেকেও আমার মত জন্মভিখারিও তো আছে। 'দাও, দাও' -- 

"আয়ুর্দ্দেহি যশো দেহি ভাগ্যং ভগবতী দেহিমে।
পুত্রান দেহি ধনং দেহি সর্বান কামাংশ্চ দেহি মে।।" 

সেই কবে, চেতনোন্মেষের প্রথম প্রভাত থেকেই, দু'হাত প্রসারিত করে আছি। শুধু চেয়েছি, শুধুই চেয়েছি। কিন্তু পেয়েছি যা, জীবনভর জীবনের রস ও রসদ পেয়েছি যত, চাওয়ার বহর বেড়েছে ততই। অতৃপ্তি বেড়েছে অপরিমেয়। এই অপরিতৃপ্তির মোহ এমনই যে তার থেকে মুক্তি নিলে, মনে হয়, রইল কি, কি রইবে বাঁচবার অবলম্বন ? সাধক যাঁরা, পরমের ধনে ধনি যাঁরা, পার্থিব চাওয়া-পাওয়ার আকাঙ্ক্ষার বন্ধন ছিন্ন করে পরমার্থের ধ্যানে মগ্ন যাঁরা তেমন কোন পূজার্হ মানুষের সংস্পর্শে আসার সৌভাগ্য আমার হয়নি। যাদের সঙ্গ পেয়েছি, জীবনপথের সহযাত্রী ছিলেন যাঁরা (তাঁদের অনেকেই আজ পঞ্চভূতে লীন), এখনো রয়েছেন যাঁরা সবার মাঝে নিজেকে যখন দেখি তখন আমার সত্তার 'ভিখারি' রূপটি প্রকট হয়ে ওঠে। মনে ভাবি, এঁদের কাওকেই কিছুই তো হোল না দেওয়া, শুধু নিতে চেয়েছি ঝুলি ভরে, পাত্র ভরে। যাঁরা নেই তাঁদের ছায়া ছায়া মূর্তিগুলি, যারা আছেন তাঁরা স্বকায়ে এসে দাঁড়িয়ে রয়েছেন আমাকে ঘিরে ; বিদ্রুপের অট্টহাস্যে ভরে উঠেছে চরাচর। 

রবীন্দ্রনাথের একটি গানে কায়া ধারণ করেছে যেন এই চির-ভিখারির সংসার-ভর্ৎসিত রূপ ---
"এরে ভিখারি সাজায়ে কি রঙ্গ তুমি করিলে।
হাসিতে আকাশ ভরিলে।।
পথে পথে ফেরে দ্বারে দ্বারে যায়   ঝুলি  ভরে রাখে যাহা কিছু পায় ----
কতবার তুমি পথে এসে হায়   ভিক্ষার ধন হরিলে।।
ভেবেছিল চির কাঙাল সে এই ভূবনে   কাঙাল মরণে জীবনে।
ওগো মহারাজা, বড়ো ভয়ে ভয়ে  দিন শেষে এল তোমারি আলয়ে ---
আধেক আসনে তারে ডেকে লয়ে  নিজ মালা দিয়ে বরিলে।।" 


"গানটির শেষ দুই পংক্তি (আভোগ) আমারও মনের কথা" --- এমন বলার ক্ষীণমাত্র আস্পর্ধা থেকে বিধাতা যেন আমাকে চির-বঞ্চিত রাখেন। জীবন দেবতার কাছে, জগৎসংসারের মানবদেবতার কাছে এই আলয় তাঁর জন্য, এই জনমভিখারির স্বীকৃতি তার জন্য, এই বরণের মালা তাঁর‌ জন্যে যিনি ত্রিলোক (ভূঃ, ভূবঃ, স্বঃ) ভূলোক, দ্যুলোক, স্বলোক--জুড়ে পরিব্রজ্যা করেছেন। ঝুলি ভরে চেয়েছেন 'আনন্দ' -- সুখে, দুঃখে, শোকে ; মিলনে, বিরহে খুঁজেছেন জীবনের রস এবং সে রসে ভোগ করতে চেয়েছেন সৃষ্টির আনন্দকে। কারণ তিনি যে স্রষ্টার মতই ত্যাগের দ্বারা ভোগ করেন (তেন ত্যক্তেন ভুঞ্জিথা), আর নিশ্চিত জানেন, 

"রসো বৈ সঃ
রসং হ্যেবায়ং লব্ধানন্দী ভবতি
কো হ্যেবান্যাৎ কঃ প্রাণ্যাৎ
যদেশ আকাশ আনন্দো ন স্যাৎ ---" 

তিনি আনন্দস্বরূপ ; এই মানবপ্রাণ সেই আনন্দ লাভ করতে চায়। কেই বা (মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী জেনে) জীবনধারণ করত, কেই বা শ্বাসক্রিয়ার জন্য নিরন্তর প্রয়াসী হোত, যদি না 'আকাশ-আনন্দ' --- সীমাহীন, অনন্ত আনন্দ এখানে থাকত ? 

সেই আনন্দাভিপ্সু 'ভিখারি'র জন্য তো তাঁর 'ব্রহ্ম' আছেন, যিনি পূর্ণ, মহারাজ। ভিক্ষা করতে করতে তো তিনি তার রাজার আলয়ে এসে উপস্থিত হলেন। 

"যং লব্ধা চাপরং লাভং মন্যতে নাধিকং ততঃ ।
যস্মিন্ স্থিতো নঃ দুঃখেন গুরুনাপি বি চাল্যতে।।"

যে পাওয়া অন্য কোন পাওয়া থেকে অধিক নয়। কিন্তু  সেখানে স্থিত হলে সুখই বা কি দুঃখই বা কি ! কি বা তার অভাব ! 'ভিক্ষাবৃত্তির' চির অবসান। 


আমার জীবনদেবতার এই পরম প্রাপ্তির জন্যেই পরিব্রজ্যা ছিল। সে ছিল তাঁর তপস্যা। কিন্তু আমাদের 'ভিক্ষুকদশা' একটি নিখাদ আত্মপ্রচারের উদ্দেশ্যে আত্মপ্রবঞ্চনা। তাই স্বঘোষিত 'কবিদের' উলঙ্গ এই রূপটি' উপস্থাপিত করবার জন্যই  কবি নীরেন্দ্র নাথ চক্রবর্তী মহাশয় এমন একটি কবিতা তাঁর পাঠকদের উপহার দিয়ে গিয়েছেন। 

কবি যদি 

"কবি যদি লোভী হয় 

তাহলে সে কবি নয়, 

তা হলে সে পথের কাঙাল। 

ভিক্ষাবৃত্তির কথা যখন উঠলই তখন আমার একটি জীবনাভিজ্ঞতার কথাবলি,  

চিত্তরঞ্জনে থাকার সময়ে জয়দেব কেন্দুলির অজয়ের ঘাটে মাঝে মাঝেই যেতাম। যেতাম মেলার সময় ছাড়া অন্য সময়েও, আমার এক বাউল দাদার  সঙ্গে। ('পেশায়' নয়, 'নেশায়' বাউল‌ ছিলেন তিনি)। তা একবার চৈত্রমাসের সংক্রান্তির দিন তিনি বললেন,
--- চল হে ক্ষেপা, কাল জয়দেবে যাই। আমাদের সুধীর বাবার আশ্রমে কাল ছোটখাট এক মচ্ছব আছে।
গেলাম। পোঁছেছি এই সকাল দশটা নাগাদ। চৈতন্য পুরের ঘাটে নেমে, বিশীর্ণ জলধারার শুষ্ক অজয়ের বালিরাশির তপ্ত চড়া পেরিয়ে যখন ওপারের বাউলদের আখড়ায় পোঁছালাম তখন রোদে আধমরা। নদীর একেবারে পাড়ের কয়েকটি আখড়া পেরিয়ে তমালতলা --- সুধীর বাবার আশ্রম। এও আখড়াই, তবে বেশ বড়পারা। আমার বাউল দাদার হাঁকডাক শুনে এক সাদাচুলের অতি বৃদ্ধা রমণী --- একা উঁঁকি দিলেন।  একখানি লালপেড়ে সাদা শাড়ী, মড়াপোড়ানো কাঠের মত তাঁর‌ অস্থিচর্মসার দেহটিকে জড়িয়ে আছে। তিনি সেই কাপড়েরই একটুকরো আঁচল কোনক্রমে মাথায় তুলবার চেষ্টা করতে করতে, কিছুটা ঝুঁকে, তালপাতার ছাওনি দেওয়া কুঁড়ে ঘরটার ফুট-তিনেকের দুয়ার থেকে বরিয়ে এলেন। উপরের গোটা তিনেক হবে হয়তো, জর্দাপোড়া, আধকালো দাঁত-শুদ্ধো এক হৃদয়-খোলা হাসি।
কণ্ঠভাঙা স্বর, কিন্তু যেন ছেলে ফিরেছে ঘরে এমনি সেই বলার ভঙ্গিটি,
---- কখন থেকে পায়ের 'শবদ যে পাছি।' ভাবছি কেষ্টক্ষেপা আজ আসবেই। আর এটি আবার কে ? সুবল ?
---- না, না, আমি....
---- ওই হল রে ক্ষেপা।
আমি চুপ করে গেলাম, বিস্ময় মাখানো দুটি চোখ ওই রমণীর মুখের উপর। 

চোখ নামাতেই দেখি আমার দাদাটি উবুড় হয়ে তাঁর দু' পায়ের ধূলা হাতে নিয়ে মাথায় মাখছে।
---- ওঠ রে ক্ষেপা, জিরো (জিরিয়ে নে)। তারপরে বাতাসা জল খাবি।
দেখাদেখি আমিও প্রণাম করতে গেলাম। না, কিছুতেই প্রণাম নেবেন না। কেবল আমার মাথায় হাত রাখলেন। 

সময় অনেক বয়ে গেল। আমরা নদীতে স্নান করে এলাম। বাউল'মা মুড়ির সঙ্গে পাকা কাঁঠালের কোয়া দিলেন এক এক বাটি। পাকা আম, বেল -- তাও এল।
ভরপেট খেয়ে তমালগাছের ছায়ায়, বিকট আকারের দড়ির খাটিয়ায় বসে আছি একা। দাদা আর বাউল'মা মিলে, কলসি আর বালতি নিয়ে জল আনতে গেল নদীতে। ভাবছি কোথায়‌ মচ্ছব, কোথায়‌ বা সুধীরবাবা ; আর এই বাউল'মা-ই বা কে ? এমন জীর্ণ, রুগ্ন দেহ ; তবু কী অপার প্রসন্নতা, কী প্রাণ-জুড়ানো কথা, কী স্নেহের আপ্যায়ন ! ইনি যেন সেই তপোবন-ভারতের কবি কৃত্তিবাস বর্ণিত অত্রিমুনিপত্নী, 

"তপস্যা করিয়া মূর্তি ধরেন তপস্যা।
জ্ঞান হয় গায়ত্রী কি সবার নমস্যা।।" 

দারিদ্র্যের তপস্যার মধ্যে দিয়ে মূর্তিমতী 'সেবা'-র প্রতিমায় উত্তোরণ ! কেন যে আমার প্রণাম নিলেন না ?
একথা ভাবতে ভাবতে ওই দড়ির খাটিয়ায় ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। হঠাৎই কয়েকজনের কলকণ্ঠে ঘুম ভেঙে গেল। দেখি পাঁচ জন মূর্তিমান কিম্ভুত ! চিত্র বিচিত্র আলখাল্লা পরা, কাঁচাপাকা দাড়ির ঝোঁড়ে ঢাকা মুখ, কাঁধে লম্বা লম্বা গেরুয়া রঙের ঝোলা, এক হাতে একতারা, অন্য হাতে খঞ্জনী। কারো আবার পেটের কাছে ঝুলছে ছোট ডুগি। 

সে দিনের মাধুকরী সেরে ফিরে এল সবে।
গোবরলেপা উঠোনটায় তাদের গাত্রাবরণ সহ সমস্ত অস্থাবর সম্পত্তি সম্পদ নামিয়ে নামিয়ে রাখছে আর বলছে,
---- দেখ্ ক্ষেপিমা, কী সব এনেছি।
----- এতো রোদে রোদে ঘুরেছো বাবারা, জিরোও, আমি সরবত করে রেখেছি। সেই এক -ই কথা 'জিরোও'।
(আহা! জীবনের সকল দুঃখ-ক্লান্তিহরা মাতৃকণ্ঠনিঃসৃত বাণী, 'বাবারা জিরোও')।
সবার শেষে এলেন সুধীর বাবা। ওই একই বেশবাস, কিন্তু বুক জুড়ে মালার বোঝা আর সাদা চুলের একটি বিপুল চূড়া মাথার মাঝখানটিতে বাঁধা। শরীর তাঁরও মেদহীন হাড়ের মেড়। থলি ছিল আরেক কম বয়সী বাউলের কাঁধে। নির্দন্ত মুখের হাসিতে সমস্ত আখড়াটি ভাসিয়ে দিয়ে বলে উঠলেন,
-- ও ক্ষেপি, তুর ঘরে আজ গোবিন্দের মেলা যে গো, সেবা দিয়েছিস্ তো ?

দেখতে দেখতে উৎসবের পরিবেশ। দুটো উনুন জ্বলছে। ওদিকে কেও সংগৃহীত আনাজপাতি কাটছে, কেও মসলা পিসছে, কেও কেও আবারো জল আনছে নদী থেকে।
সূর্যদেব অস্ত যাবার আগেই সাঙ্গ হোল সেবা। সকলের ভোজন শেষে সুধীর বাবা আর বাউল'মা বসলেন। এক থালাতেই খাওয়া আর খাওয়ানো। সে এক অপূর্ব দৃশ্য। মা ভাত মেখে মেখে বাবার মুখে একগাল দেন, একগাল নিজে খান।
তারপর তামাক। কত যে গল্প, কথা, কথকথা এবং বাউল গান। আমার দাদাটি কিছুক্ষণ পরে পরেই আমার কাছে,
---- কি, কেমন দেখছ সব ?
আমি রুদ্ধবাক, হাসি দিয়ে জানিয়ে দিচ্ছি, 'বেশ'।
ধীরে ধীরে কলতান মন্দীভূত হয়ে এল। খাটিয়া নিয়ে এদিক ওদিক ঘুমাতে গেল সবাই। আমি যেখানে ছিলাম সেখানেই। কিছু পরে, বেশ রাত হয়েছে তখন, দাদা দুটো তেলচিটে বালিশ নিয়ে আমার খাটেই এসে বসলেন। বিড়ি ধরালেন। একটা প্রলম্বিত দীর্ঘশ্বাস। তারপর বললেন,
---- এখানে, এমনি করেই যদি কয়েকটা দিনের জীবন কাটাতে পারতাম।
আমি এবার মুখ খুললাম। জিজ্ঞাসা করলাম,
--- কেন, কি আছে এখানে।
দাদা বললেন,
--- প্রেম। 

আমি যে সে উত্তরে সন্তুষ্ট হতে পেরেছিলাম তেমনটি নয়। তবে পরে বুঝেছিলাম দাদা এমন এক প্রেমের কাঙাল ছিলেন যা হয়তো আমাদের বোধগম্যতার বাইরে। আর এও বুঝেছিলাম অন্তরসত্তায় আমিও তো ভিখারিই।‌‌ হয়তো বা আমার 'ভিক্ষার ধন' ---- অভীপ্সিত ও অভিলষিত দ্রব্যাদির আকার প্রকার, গুনমান ভিন্ন। 

 ভিক্ষুকত্ব মানব অস্তিত্বের আদীম প্রবনতা। জীবন যাপনের জন্যে প্রয়োজনীয় বস্তুর প্রার্থনার মধ্য দিয়েই প্রকাশিত হয়েছে, অভিব্যক্ত হয়েছিল মানুষের প্রথম ধর্মবোধ, ধর্মাচরণ এবং তারই ক্রমোত্তরণের, ক্রমবিবর্তনের রূপ জ্ঞানমার্গীয় আধ্যাত্মিকতা। 

আমাদের ঋকবেদের মন্ত্রগুলিতে কোন কোনটিতে যেমন সুগভীর প্রজ্ঞার, অপরূপ কবিত্বের দ্যোতনা আছে, তেমনই বেশিরভাগ মন্ত্রে আছে জীবনে বেঁচে থাকার জন্য নিত্যদিনের ভোগ্যদ্রব্যের জন্য প্রার্থনা। আদিমতম এই 'শ্রুতি'র ষষ্ঠ মণ্ডলের (৬. ৩৯. ৫) একটি মন্ত্র উদ্ধার করে আমরা দেখব আজ থেকে প্রায় দশ হাজার বছর আগে কেমন ছিল আমাদের আদি পিতাদের যাচনা --- 

"নৃ গৃণানো গৃণতে প্রত্ন রাজন্নিষঃ বসু দেয়ায় পুর্বীঃ। 

অপ ওষধীরবিষা বনানি গা অর্বতো নৃনৃচসে রিরিহি ।।" 

হে পুরাতন রাজা (ইন্দ্র), তুমি স্তবে স্তুত হয়ে তোমার দেয় যে ধনসমূহ এবং অন্নসমূহ শীঘ্র আমাদিগকে দাও। বৃষ্টি দাও, ওষধীসমূহ দাও, নির্বিষ বৃক্ষগুলি, গরুগুলি, অশ্বগুলি এবং মনুষ্যগুলি আমাদিগকে দাও। 

আমরা চাই বলেই পাই ; আর পাই, তাই বাঁচি --- বেঁচে আছি জন্মের পর জন্মের মধ্য দিয়ে অন্তহীন প্রাণের বিকাশতীর্থে যাত্রা করেছি পরিপূর্ণ চৈতন্যসত্তার সন্ধানে। 

দুলাল চন্দ্র বন্দোপাধ্যায়
১৩-০৪-২০২৫
ব্যাঙ্গালোর।
______________________________________________

বৃহস্পতিবার, ৩ এপ্রিল, ২০২৫

স্বামী রঙ্গনাথানন্দ ও বর্তমান ভারতবর্ষে তাঁর মতাদর্শের অপরিহার্যতা - ৪

                                           চার 


প্রথমে উপনিষদ সম্মন্ধে আমাদের ধারণা স্বচ্ছ হওয়া প্রয়োজন। আর্য জাতি, তাঁরা বহিরাগত না কি এই ভারতভূমিই তাঁদের ধাত্রী ও ধরিত্রী --- ইতিহাসের এযাবৎকালের গবেষণায় এখনো তা পূর্ণরূপে নির্নায়িত হয়নি। তবে মানব সভ্যতার ক্রমবিবর্তনের এক পর্বে, আসমুদ্রহিমাচল এই ভারত যে তাঁদের শাসনে এবং অনুশাসনে নিয়ন্ত্রিত ও শৃঙ্খলিত ছিল এ-সত্য সুপ্রতিষ্ঠিত। এ-সত্যের প্রমাণরূপে সাক্ষ্য দেন বেদ, ব্রাহ্মণ, উপনিষদ, পুরাণ গ্রন্থগুলি এবং বৈদিক, সংস্কৃত ও পালি ভাষায় রচিত প্রাচীন মহান অজস্র সাহিত্যসম্ভার। এই সাহিত্য --- লোক পরম্পরায় 'শ্রুতি' আকারে 'শ্রুত' বা 'পুঁথি' আকারে লিপিবদ্ধ। বৃহত্তর ভারতবর্ষে বা ভারতীয় উপমহাদেশে, যে মহাদেশ উত্তরে হিমালয় থেকে দক্ষিণে ভারত মহাসাগর, পশ্চিমে সিন্ধু নদের উপত্যকা হতে পূর্বে  ব্রহ্মপুত্র নদ পর্যন্ত বিস্তৃত। এ-হেন মহাদেশের সর্বত্রজুড়ে যে ঐতিহাসিক বা প্রাগৈতিহাসিক কোন যুগে কখনো একটি নির্দিষ্ট সভ্যতা গড়ে উঠেছিল --- এমন কল্পনা করা ঘোর অযুক্তিক। তবে এই 'ভারত' নামের এই বিপুল ভূমিখণ্ডে আর্য 'জাতি' বা জনগোষ্ঠী ধীরে ধীরে পশ্চিম থেকে পূর্বে এবং পরবর্তী কালে ক্রমান্বয়ে দক্ষিণের উপদ্বীপ (Decan Peninsula)-পেরিয়ে আরো দক্ষিণে ও দক্ষিণপূর্বের দ্বীপময় ভারতেও ছড়িয়ে পড়ে, আধিপত্য বিস্তার করে। কিন্তু আর্যজাতি কোন একটি নির্দিষ্ট ধর্মধারণা প্রবর্তনার  (-- যেমনটি ঘটেছে আব্রাহামীয় ধর্মগুলির যথা জরাথুষ্ট্রিয়ান, ইহুদী, খ্রীষ্টান ও স্বতন্ত্রভাবে ইসলাম ধর্মের ক্ষেত্রে ) চেষ্টা করেনি। অধিগৃহীত দেশে বা বিজিত জাতিগোষ্ঠির উপর শাসনক্ষমতার সঙ্গে ধর্মের অনুশাসন আরোপন করবার জন্য অস্ত্রের প্রয়োগ করেনি (পৌরাণিক কালের পূর্ববর্তী সময়ে) বরং ন-আর্য জাতির লোকায়ত ধর্মের আদর্শ ও সংস্কারগুলিরও আর্যায়ন ঘটিয়েছিল।
(এই 'লোকায়ত ধর্মধারণা' বিষয়টি আবার এমনই জটীল এবং ব্যপ্ত যে তার জন্য আরও একটি স্বতন্ত্র আলোচনা প্রয়োজন)। 

আপাতত আমাদের আলোচনার বিষয় স্বামী রঙ্গনাথানন্দজীর 'উপনিষদের সন্দেশ' গ্রন্থ। 'আর্য জাতির ক্রমবিকাশ, ক্রমবিস্তার এবং ন-আর্য জাতির আর্যায়ন ও লোকায়ত ধর্মধারণার' প্রসঙ্গটির উপস্থাপনা এই কারণেই যে বেদ, বেদাঙ্গ ও ব্রাহ্মণ গ্রন্থগুলির পরবর্তী অধ্যায়ে যখন বেদান্ত বা উপনিষদের যুগে এসে 'আর্য সভ্যতা' স্থিতিলাভ করল তখন আর্যত্ব ও অনার্যত্বের মধ্যে এক মহাসম্মিলন (great assimilation) সংঘটিত হয়েছে ; বিশেষ করে ধর্মতাত্ত্বিক ও দার্শনিকতার পরিমণ্ডলে। এই বৌদ্ধিক পরিমণ্ডলের তখন দুটি ভাগ স্পষ্টরূপে প্রতীয়মান ছিল ---- আস্তিক্যবাদ ও নাস্তিক্যবাদ। প্রথম ভাগের অন্তর্ভুক্ত এই উপনিষদ বা ঔপনিষদিক ধ্যানধারণা এবং দ্বিতীয় ভাগের মধ্যে পড়ে বৌদ্ধিক ক্ষেত্রে লোকায়তিক ধ্যানধারণা -- যার চরম বিকাশ, প্রকাশ বা অভিব্যক্তি গৌতম বুদ্ধ ও বর্ধমান জৈনমুনি মহাবীর-প্রচারিত ধর্মধারণায় | 

এইভাবে ভারতীয় আর্য-ধর্মের বিভিন্ন প্রকার বিবর্তনের কালে ভিন্ন ভিন্ন মতবাদ গড়ে উঠেছে ঠিকই কিন্তু তা সত্ত্বেও সমস্ত রকমের মতবাদ, ন-আর্যদের গোষ্ঠীকেন্দ্রিক স্বতন্ত্র স্বতন্ত্র মতবাদ, লোকায়তিক মতবাদ --- সকলের অন্তিম মীমাংসা যেন এই উপনিষদের মধ্যেই প্রাপ্তব্য। সনাতন ভারতাত্মার জ্ঞানালোকের জ্যোতির্ময় বিগ্রহ এই উপনিষদগুলি, প্রধানত প্রথম পর্বের বা প্রাচীনতর  উপনিষদগুলি, যেমন ঈশা, কেন, কঠ, প্রশ্ন, ঐতরেয়, তৈত্তিরীয়, ছান্দোগ্য, বৃহদারণ্যক, মুণ্ডক ও মাণ্ডুক্য ---- যেগুলির ভাষ্য রচনা করেছেন শঙ্করাচার্য, নবম শতাব্দীর প্রথম দিকে। 

ভাবতে গেলে বিস্ময়ে অভিভূত হতে হয় খ্রীষ্টপূর্ব হাজার হাজার বছর আগে কি এমন জীবনবোধের আকাঙ্ক্ষা ভারতের তপোবনের মানুষদের (ঋষি, মুনি, ঋষিকা, মুনীপত্নী নামে যাঁরা সম্বোধিত হতেন) প্রাণিত করেছিল যার জন্য জৈবিক প্রবনতাগুলিকে লালন করার পরেও আত্মিক এবং পরমাত্মিক জীবনবোধের সাধনায় তাঁরা নিমগ্ন হতে পেরেছিলেন ? এবং সাধনার সেই সূক্ষ্ম ও সুকঠিন পথের, সাধনার সেই পরম প্রাপ্তির বিবরণ এবং বর্ণনা দিতে গিয়ে কেমন করেই বা আবিষ্কার করে‌ গেলেন এক সুন্দর মধুর, যুগপৎ জঠীল ও গভীর ব্যঞ্জনাধর্মী ভাষার ! (বৈদিক না হলেও আমরা সংস্কৃত রূপে যা পেয়েছি। বৈদিক অর্থাৎ যে ভাষায় 'বেদ' স্ফুরিত হয়েছে, আর 'সংস্কৃত' অর্থাৎ যে ভাষায় পরবর্তী কালে বেদ, ব্রাহ্মণ, পুরাণ ও সাহিত্য রচিত হয়েছে, এই দুটি ভাষা কিন্তু এক নয়। বেদের ক্ষেত্রে 'স্ফুরিত' শব্দটির প্রয়োগ করা হোল এই কারণে যে ঋষিদের মুখনিঃসৃত বাণী যা লিখিত ছিল না। শ্রুত ও শিষ্যপরম্পরায় বাহিত। তাই বেদ শ্রুতি নামেও আখ্যাত। যদিও সারস্বত সমাজে এ বিষয়ে ঘোর দ্বন্দ্ব আজও বিদ্যমান)। 

যাই হোক্, আমরা উপনিষদে বিধৃত জীবনবোধের আলোচনার ফিরে আসি। স্বামী রঙ্গনাথানন্দ উপনিষদগুলির আরম্ভকালেই যে কথা বলছেন তা তাঁর আজন্ম অধ্যাত্মসাধনা ও সুগভীর শ্রদ্ধা-সমন্বিত মণীষার পরিচয়বাহী। তিনি লিখছেন, ---- 

"উপনিষদের বাণীগুলি মহান সঙ্গীতের মতো, যার সুরমূর্ছণা শত শত বছর ধরে সংবেদনশীল মানুষের হৃদয়কে আবিষ্ট করে রাখার শক্তি ধারণ করে। শ্রদ্ধার সঙ্গে, অনুসন্ধিৎসু মন নিয়ে, নারী পুরুষ নির্বিশেষে, যিনিই উপনিষদগুলি অনুশীলন করবেন, তিনিই উপলব্ধি করবেন,স্পষ্ট ,গভীর কাব্যময় ও উদাত্ত ভাষায় উচ্চারিত বাণীগুলির অতলস্পর্শী, মহিমময় মনোহারিত্ব। অধ্যাত্মসাধক উপনিষদ পাঠ করলে অনুভব করবেন, তিনি অনুশীলন করছেন এমন একটি বিষয় নিয়ে, যা তাঁর  নিজের জীবন ও ভবিতব্যের অতি ঘনিষ্ট, এমন এক সত্তা নিয়ে, যা আপন অন্তরে, আবার বহির্বিশ্বে সমান বিদ্যমান।"
এর পরই তিনি ঈশোপনিষদের সেই মহা মন্ত্রটির ( যে মন্ত্রটি আমরা যজুর্বেদীয় উপনিষদের শান্তি পাঠেও উচ্চারণ করে থাকি) উল্লেখ করেছেন, 


ওঁ পূর্ণমদঃ পূর্ণমিদং পূর্ণাৎ পূর্ণমুদচ্যতে
পূর্ণস্য পূর্ণমাদায় পূর্ণমেবাবশিষ্যতে।
ওঁ শান্তিঃ ওঁ শান্তিঃ ওঁ শান্তিঃ----।। 


স্বামী রঙ্গনাথানন্দ তাঁর ব্যপ্ত ও গভীর প্রজ্ঞার আলোতে এই মধুর, আপাত সরল অথচ গূঢ় ব্যঞ্জনাধর্মী মন্ত্রটির ব্যাখ্যা করেছেন। ঈশ্বরপ্রতিম আচার্য শঙ্করের ভাষ্যের অবতারণা করেছেন। পাশ্চাত্য মণীষীদের, যেমন William James, Fred Hoyle, Pierre Teihard de Chardin, Julian Huxley-র মতামতের সঙ্গে এই মন্ত্রের অন্তর্নিহিত ভাবের সামঞ্জস্য খুঁজেছেন। কিন্তু আমাদের মত সাধারণের বোধগম্যতায় যতটুক ধরে তার‌ জন্যও করুণাপরবশ হয়ে সচেষ্ট থেকেছেন।

মন্ত্রটির শব্দার্থ এই রকমঃ
'অদঃ' শব্দের অর্থ ঐ, দূরের বস্তু। 'ইদম' অর্থে এই, চোখের সামনে যা দেখা যায়, স্পর্শ করা যায়। 'পূর্ণ' এখানে ব্রহ্ম, চৈতন্যসত্তা। 


'পূর্ণস্য পূর্ণমাদায় পূর্ণমেবাবশিষ্যতে।। মহাচৈতন্যের (ব্রহ্মের) পূর্ণতা থেকে বিশ্বের 'পূর্ণতা', পূর্ণ থেকে পূর্ণ নিলে পূর্ণই অবশিষ্ঠ থাকে।
আরাধ্য শঙ্করাচার্য, স্বামী বিবেকানন্দ এবং বর্তমান ব্যাখ্যাতা স্বামী রঙ্গনাথানন্দ -- সাধনালব্ধ প্রজ্ঞায়‌‌ এই সাধকগণ উপনিষদের মহামন্ত্রের গভীরে প্রবেশ করেছেন এবং বলতে চেয়েছেন সৃষ্টির চৈতন্যসত্তা একটি অক্ষয় অব্যয় অদৃশ্য অস্তিত্ব। আপনাতে আপনি পূর্ণ। সেই 'পূর্ণ' থেকে আগত এই দৃশ্যমান জগতও পূর্ণ। আমরা এই জগতের (ইদম্) ক্ষয়, ক্ষতি, লয়--- যা লোকচক্ষুতে দেখি তা সত্য নয়। পূর্ণ হতে‌ কিছু নিলে বা পূর্ণে কিছু অর্পণ করলে পূর্ণের কোন বিকার ঘটে না। জীবাত্মা মোহের বশবর্তী হয়ে ধন, জন, মান, অহংকার ----- যা কিছু আগলে রাখতে চায় সে সবের ক্ষতি বা ক্ষয় মানতে পারে না। মায়া মোহে আচ্ছন্ন প্রাণ হাহাকার করে ওঠে। কিন্তু উপনিষদ বলছেন, এই অজ্ঞানতাপ্রসূত শোক বৃথা। 

আমাদের ঋষিকবি রবীন্দ্রনাথ বলছেনঃ
"হে পূর্ণ  তব চরণের কাছে
যাহা কিছু সব আছে আছে আছে।
নাই নাই ভয়, সে শুধু আমারই
নিশি দিন কাঁদি তাই।।" 

কিন্তু আমাদের মত ইন্দ্রিয়সর্বস্ব মানুষদের তবে কি 'ভয়ে'র দ্বারা ("হারাই হারাই সদা মনে হয়....") নিত্য নিগৃহীত হওয়া ছাড়া গত্যন্তর নেই। ইন্দ্রিয়ানুভূতির যে জগৎ তার কি কোন যথার্থতা নেই ? উপনিষদ বলছেন আছে। তাও আছে। তবে সেই ইন্দ্রিয়ালুতা যেন চৈতন্যরূপ চিদাকাশটিকে আচ্ছন্ন করে না ফেলে। ইন্দ্রিয়-ভোগ-স্পৃহার সঙ্গে যদি বিবেক ও হৃদয়বত্তার যোগ থাকে তবে পরম সত্তার করুনা লাভ করা যায়। স্নেহ, প্রেম, দয়া এবং সেবা মানব ধর্মের শ্রেষ্ঠ অভিব্যক্তি।‌তার দ্বারা পরমের (ultimate) সঙ্গে মিলন অবশ্যম্ভাবী।‌
এ-স্থলে ভগবান শঙ্করাচার্য তাঁর একটি অপূর্ব স্তোত্রে মানুষের উদ্দেশ্যে বলছেন,---- 

মূঢ় জহীহি ধনাগমতৃষ্ণা, কুরু সদবুদ্ধিং মনসি বিতৃষ্ণাম।
জল্লভসে নিজ কর্মোপাত্তং বিত্তং তেন বিনোদয় চিত্তম।।

হে মূর্খ, অত্যাধিক আকাঙ্ক্ষা ত্যাগ কর, তোমার মনকে শুভচিন্তায় ও সত্যে বাঁধ। অনাসক্তি অনুশীলন কর। তবেই মনে ও প্রাণে আনন্দ লাভ করবে, (বিনোদয় চিত্তম্ )‌

একথা মায়াবাদী, ব্রহ্মবিদ শঙ্করাচার্য বলতেই পারেন, আমাদের ইন্দ্রিয়প্রাবল্যকে ভর্ৎসনা করতেই পারেন কিন্তু জলের মধ্যে থেকে মাছ যেমন জলের প্রতি আসক্তি অস্বীকার করতে পারে না, আমরাও তেমনই এই জগৎ প্রপঞ্চের মধ্যে থেকে ভোগাসক্তি স্বীকার করতে বাধ্য।
তবে উপায় ?
                 

Recently published

অমূল্য

He ( Tagore) who sees all things in his own self and his own self in all things, he does not remain unrevealed.                     ...