বৃহস্পতিবার, ৩১ মার্চ, ২০২২

সুন্দর নির্জন

সুন্দর নির্জন ! 

দিনান্ত বেলার এই ছায়া ঢাকা মায়াময়ী রূপ, 
এই অপরূপ নির্জনতা – শূণ্যতার ‌মাঝে 
অস্তিত্বের লীলাভূমি আদীম পৃথিবী। 
আছে আর নাই মিলে বিপুল বিভ্রম। 
নামবে আঁধার অচিরাৎ, এ-সৃষ্টি যাবে চলে 
দৃষ্টির আড়ালে। নিশান্তে আবার আলোকপ্লাবনে 
পুণর্জন্ম এ সৃষ্টিসত্তার। আমার প্রাণের মুক্তি 
সমাসন্ন অস্তাচল পারে রবেনা কি‌ সত্য হয়ে, 
ওই শূণ্যে, চিরস্তব্ধ নিখিলের অসীম প্রাঙ্গণে।। 

দুলাল বন্দ্যোপাধ্যায় 
০১/০৪/২০২২ 
বাঁকুড়া। 

বুধবার, ৩০ মার্চ, ২০২২

চৈত্রমাস

"যখন রব না আমি তোমাদের মাঝে 
তখন স্মরিতে যদি হয় মন, 
তবে তুমি এসো হেথা যেথা এই 
চৈত্রের শালবন।" 
                          – রবীন্দ্রনাথ। 

আদীম-অরণ্য নিবিড় ঝাড়খণ্ডের আরণ্যক প্রকৃতি, 
তার সারল্য, সৌন্দর্য, উদ্দাম-উচ্ছল বণ্যপ্রাণ 
আজ প্রায় অবলুপ্তির সীমান্ত প্রান্তে। 

শেষের সেদিন 

অনাদি কালের শালতরু মূলে 
বসে আছে আদি শৈশব, 
তার চারিধারে ধূ ধূ প্রান্তরে 
নাই সুখ, নাই বৈভব। 
আশা নাই বুকে, ভাষা নাই মুখে 
চোখে মরীচিকা মায়া, 
ভরা চৈত্রের খরা প্রহরের 
ভরসা বৃক্ষছায়া। 
বন গেছে ক্ষয়ে লাঞ্ছনা সয়ে 
নিয়ে গেছে ফুল ও ফল। 
তপ্ত ধরায় মরুপিপাসায় 
ছায়াটুকু সম্বল। 
কত দিন আর এ ছায়া মিলাতে – 
হাসে সভ্যতা নাগিনী, 
বিষ নিঃশ্বাসে পুড়ে যাবে শেষে 
শ্যাম ছায়াময়ী ধরণী।। 

দুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়, 
৩০/০৩/২০২২ 
পুরুলিয়া।

___________________________________________



বৃহস্পতিবার, ২৪ মার্চ, ২০২২

রক্তনেশা

"হিংসা যেদিন যাইবে দুনিয়া ছাড়ি 
সব তরবারী হইবে সেদিন কাষ্ঠের তরবারী।" 
                                'গাথাঞ্জলি'– কালিদাস রায়। 

রক্তের নেশা শুধুমাত্র পশুদের আছে – 
তাই যদি হোত ভালো হতো না কি ? 
পশ্বাচার জেনে নিয়ে, কিম্বা নিয়ে পাঠ, 
পশুদের ডাক্তার এঁকে দিত বিভাজন রেখা। 
নররূপী শ্বাপদের শোণিত পিপাসা – 
মিটাতে কতনা যুদ্ধ, অস্ত্রশস্ত্র, মন্ত্র-তন্ত্র-ছল, 
বিজ্ঞানের বিপন্ন সাধনা, বিবেক-বিচারশূণ্য 
বুদ্ধি ও মননের একান্ত প্রয়াস, স্থির লক্ষ্যে
অবিচল – রক্ত চাই, চাই রক্ত আরো ! 
সে কোন্ সুদূর অতীত – পাথরের অস্ত্র হাতে 
হনন-সঙ্কল্প হোল শুরু। তারপর, আদি নর 
'বলি'র মন্ত্র নিল শিখে। এলো কাপালিক। 
নরবলি দাও ; পুণ্য নয় শুধু, শূণ্য থেকে
পূর্ণ হবে কর্মে, ধর্মে – অপ্রতিরোধ্য মহাশক্তি। 
কুরুক্ষেত্র – ধর্মক্ষেত্র – প্রতি যুগে, যুগান্তরে। 
নর-নারী-শিশু-বৃদ্ধ – যুদ্ধের‌ যুপকাষ্ঠে বলি– 
"এতো‌ রক্ত !" বৃদ্ধা ধাত্রী‌‌ ধরিত্রী জননী –
শ্যামল স্নেহাঞ্চলে‌ শোণিত ‌লাঞ্ছনা ! 
সভ্যতার আদি এবং অন্তিম পরিণাম ; 
রক্তপান মানুষের সত্য পরিচয় ? নাকি , 
রক্তদানে হবে তার প্রায়শ্চিত্য  শেষ ? 
অহিংসাব্রত পালন করবে নর সহস্রাব্দ কাল ?

দুলাল বন্দ্যোপাধ্যায় 
২৭/০৩/ '২২ 
পুরুলিয়া ।









বুধবার, ২৩ মার্চ, ২০২২

মানুষ কি ভালোবাসে আলো ?

 তবে তাই হোক্, থাক্ অন্ধকার
_______________________________

'কেটে যাবে নিশীথ অন্ধকার' – বলে ছিলে তুমি। 
কেটেছে তা, এসেছে ঊষার আলো ; কিন্তু কো-ই– 
ডাকে না তো পাখী, বাজে না তো রাখালিয়া বাঁশী, 
নদী ঘাটে কোথা মাঝি ? কোথা তরী তার ? 
কোথায় বা খেয়া পারাপার ? পথ নাই, নাই তো পথিক। 
সুরে বা বেসুরে গান, নিরর্থক কলতান, অপাঙ্গে চাহনি, 
 না-দেখার ভান করে দেখে নেওয়া তাকে 
ভালোবাসি যাকে – নাই...কিছু নাই ! 
                              ফুলের সুবাস ছিল চাওয়া ,
পরিবর্তে তার পুতিগন্ধ হাওয়া, মাংসপোড়া গন্ধ 
ভেসে আসে। কোথা সুর, কোথা গান, শুধু হাহাকার! 
প্রাণভরা পৃথিবীতে প্রভাতী মরণ ! বন্ধ কর দ্বার। 
দৃষ্টিহীনের কাছে আলো নয় অন্ধকারই ভালো – 
চিতানেভা অন্ধকার ! শান্তিময়ী, মৃত্যুরূপা কালো ! 

দুলাল বন্দ্যোপাধ্যায় 
২৩/০৩/২০২২
কলকাতা। 
______________________________________________




ঋষি অরবিন্দের বাণী এবং বর্তমান

১। The Life Divine, p 112. 
ঋষি অরবিন্দলিখছেনঃ 
"...all our human endeavour is foredoomed to turn in a futile circle and can only in a success that is a specious failure." 
আমাদের (শুধুমাত্র) পার্থিব উন্নতি-সঙ্কল্পের প্রয়াস নিয়ত অবক্ষয়ের বৃত্তে ঘুরতে থাকে এবং অবশেষে বিপুল ব্যর্থতায় পর্যবশিত হয়। 
২। এপ্রিল, ১৯৪৭ (সময়কালটি লক্ষ্য করুন) দিলীপ কুমার রায়কে লেখা পত্রে লিখছেনঃ 
I myself foresaw that this worst would come, the darkness of night before the dawn ; therefore I am not discouraged. 
এই দ্বিতীয় বাণীটি বর্তমান স্বদেশ ও বিদেশের ঘটনাপ্রবাহ পর্যালোচনায় নিরর্থক বলে মনে হয়। 

নিরীহ নর-নারী-শিশুদের পুড়িয়ে মারার মধ্যে, তা সে বীরভূমেই হোক বা ইউক্রেনে – সভ্যতার সাফল্যই বা কোথায় , কোথায় বা ঊষার আলোর প্রত্যাশা ? 

দুলাল বন্দ্যোপাধ্যায় 
২৩/০৩/'২২ 
কলকাতা। 

রবিবার, ২০ মার্চ, ২০২২

চণ্ডীদাসের আধুনিক কবিতা

 দ্বিজ চন্ডীদাসের আধুনিক কবিতা 

না, "আধুনিক কবিতা" এই শিরোনাম দিয়ে আমি আজ সাহিত্য সমালোচনা করতে যাবো না। 'আধুনিক'  শব্দটির বয়স 'বর্তমান' নয়। আদি কবি বাল্মীকিও যেমন তাঁর সময়কালে আধুনিক ছিলেন, তেমনই আজ  যাঁরা ‌পত্র পত্রিকায় লিখছেন তাঁরাও তাঁদের কালে আধুনিক। 
রামায়ণ, মহাভারত, কাদম্বরী, ঋতুসংহার, কুমারসম্ভব, গীতগোবিন্দম্, গাথাসপ্তশতীর কবিদের কথা তো বাদই  দিলাম, বৈষ্ণব কবিরগণও আধুনিকতার (নিরাবরণ দৈহিকতা ও 'নিলাজ' কামনা যদি মানদ্ণ্ড হয়) যে  উদাহরণ রেখে গিয়েছেন তেমন কিছু লিখতে গেলে আজকের অত্যাধুনিক কবিরও হাত কেঁপে উঠবে। 

আজ থেকে পাঁচ শতাধিক বছর আগে অনাবিল বাংলাভাষার আদি কবি চণ্ডীদাসের পদাবলী পাঠ  করুন। 

'মাথুর' পদে রাই বিরহিণী বলছেন , 
 
"কালি বলি কালা গেল মধুপুরে 
     সে কালের কত বাকি। 
যৌবন সায়রে সরিতেছে ভাঁটা 
     তাহারে কেমনে রাখি।। 
জোয়ারের পানী নারীর যৌবন 
     গেলে না ফিরিবে আর। 
জীবন থাকিলে বঁধুরে পাইব 
      যৌবন মিলন ভার।।" 

পাঁচ শতাধিক বছর আগে এমন সংরক্ত আবেগের রক্তমাংসের কামনা এবং পার্থিব (জোয়ার ভাটার) উপমা সমকালের সামাজিক পরিবেশে কতখানি অনুকূল বা প্রতিকূল ছিল সেটির সম্পূৰ্ণ ছবি ইতিহাসের ধূসর পাতা থেকে উদ্ধার করা না গেলেও কবির অন্তর প্রকৃতির অনাবিল, জৈবিক ক্ষুৎপিপাসা সমন্বিত মানবিকতাকে অস্বীকার করার কোন উপায় থাকে না।  

      সই  কেবা শুনাইল শ্যাম নাম। 
কানের ভিতর দিয়া মরমে পশিল গো 
           আকুল করিল মন প্রাণ।। 
**********************************
নাম পরতাপে যার ঐছন করিল গো 
           অঙ্গের পরশে কিবা হয়।। 

                                   দুই
                               ________
মানবাত্মার জাগতিক যে রূপ – তার যে পার্থিব আশা-‌ আকাঙ্ক্ষা, দেহজ কামনা-বাসনা, প্রিয় বিরহে   মনোবেদনা, মিলনে পরমানন্দ – এসকল হৃদয়াবেগের মধ্যেই জীবনের ইহজাগতিক ও পারমার্থিক চরিতার্থতা। রূপমুগ্ধতার সঙ্গে সংরক্ত স-অঙ্গ সম্মিলন-য়ের এই যে  সুতীব্র কামজ কামনা, এমনতর উদাহরণ সংস্কৃত  সাহিত্য, কোমলকান্ত, তরলিত সংস্কৃত, শৃঙ্গরসাত্মক পদাবলীর আকরগ্রন্থ গীতগোবিন্দম্ ব্যতিরেকে এই প্রথম 'আধুনিক বাঙলা সাহিত্যে' পরিদৃশ্যমান। 

রূপ লাগি আঁখি ঝুরে গুণে মন ভোর। 
প্রতি অঙ্গ তরে কাঁদে প্রতি অঙ্গ মোর।। 

"চণ্ডীদাসের পদাবলী পড়িতে পড়িতে বিস্মিত হইয়া  
জিজ্ঞাসা করিতে হয়, এই ভাষা পাঁচশো বৎসর পূর্বেকার লেখা না এখনকার লেখা ? এভাষা যদি  প্রাচীন  হয়, তাহা হইলে নবীন ভাষা কোথায়? রচনার  সর্বশ্রেষ্ঠ গুণ প্রসাদ গুণ, চণ্ডীদাসের রচনায় এই গুণ  সর্বত্র বিরাজমান। এমন সহজ সরল সুন্দর সরস ভাষা  দেখিতে পাওয়া যায় না। চণ্ডীদাসের কথা যেন প্রাণ  হইতে নিঃসারিত হইয়া প্রাণ স্পর্শ করে।" 

পদকর্তা চণ্ডীদাস পূর্বরাগ, অনুরাগ, রূপানুরাগ, মান, মাথুর, অভিসার, মিলন–য়ের অসংখ্য (বহু পদই বিভিন্ন পদকর্তার নামে প্রচারিত হয়েছে) পদে নরনারীর হৃদয়াবেগের যে বাস্তবানুগ ভাষা-প্রতিমা নির্মাণ  করেছেন তা তাঁর পূর্বতন শিল্পী কবি জয়দেব, কবি  বিদ্যাপতির মতো অলঙ্কার সর্বস্বতার ঔজ্জ্বল্যে  রাজসভার রাজকীয় রুচিবোধকে তৃপ্ত করার জন্য নয়, সে যেন আবহমানকালের বাঙলাদেশের পল্লীপ্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ পল্লীবালার বহিরঙ্গ ও অন্তরঙ্গ  সংরাগ দিয়ে গড়া।  

তোমরা আমারে ডাকিয়া সুধাও না (প্রাচীন বানানরীতি) 
         প্রাণ আনচান বাসি। 
কেবা নাহি         করে প্রেম 
       আমি হইলাম দাসী। 
গোকুল নগরে     কেবা কিনা করে 
          তাহে কি নিষেধ বাধা। 
সতী কুলবতী       সে সব যুবতী 
           কানু কলঙ্কিনী রাধা। 

আহাঃ, যেন আমার ঝাড়খণ্ডের প্রত্যন্ত এক গ্রামের 
মনসাতলায় গ্রাম্য কুলবধূদের দ্বিপ্রাহরিক জটলা বসেছে। 

আরো শুনুন 'মাটির কাছাকাছি' কবির কথা , 

পাপ পরাণে কত সহিবেক জ্বালা। 
শিশুকালে মরি গেলে হইত যে ভালা।। 
এ জ্বালা জঞ্জাল সই‌ তবে সে পরিহরি। 
ছেদন করিয়া দেও পিরীতের ডরি।। 
তেমতি নহিলে যার এমতি ব্যাভার। 
কলঙ্ক কলসী লইয়া ভাসিব পাথার।। 

সমাজের সমস্ত নিয়মের নিগড়, বাধা-বন্ধন, বর্ণাভিমান,  
ধর্মাভিমান, কুল-শীল-জাতি-মান – সবার উর্দ্ধে কবি  চণ্ডীদাস স্থান দিয়েছিলেন 
প্রেম ও মানবিকতাকে। 

পিরীতি নগরে বসতি করিব 
            পিরীতে বাঁধিব ঘর। 
পিরীতি দেখিয়া পড়শী করিব 
             তা বিনু সকলি পর।। 
.............................................
পিরীতি সরসে       সিনান করিব 
          পিরীতি অঞ্জন লব। 
পিরীতি ধরম.        পিরীতি করম 
             পিরীতে পরাণ দিব। 

আর যা চিরদিনের, ধ্রুবতারার মতো জ্যোতির্ময়, 
শাশ্বত মানবপ্রেমের বাণী তা তো এই মহাপ্রেমিকেরই 
স্বর্ণলেখনীনিঃসৃত ,

"শুনহ মানুষ ভাই। 
সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপর নাই।।" 
 
এখনকার আধুনিক সময়কালের এমন একজন আধুনিক কবির জন্মদিন পালন করা যাবে কি যিনি  সংকীর্ণ গণ্ডীবদ্ধ রাজনীতি, সমাজপরিবেশ, স্বার্থসর্বস্বতা, উচ্চমন্যতা এবং অবচেতনিক মর্ষকামিতা-  নিরপেক্ষ উদার মনুষত্ববোধের একটি কবিতা লিখছেন? তেমন যদি একটি কবিতা পেয়ে থাকেন, 
আমাকে উপহারস্বরূপ পাঠিয়ে দিবেন। আমি ওই  কবিতাটিকে আধুনিক কবিতার সর্বশ্রেষ্ঠ উদাহরণ  হিসাবে উদ্ধার করে রাখব।  

ঋণ স্বীকার, 
বৈষ্ণব পদাবলী, 
'বাঙলার গীতিকাব্য' -- নগেন্দ্রনাথ বসু । 

দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় 
২০/০৩/২০২২
কলকাতা।













শুক্রবার, ১৮ মার্চ, ২০২২

রবীন্দ্রনাথ ও বসন্ত

বিশ্বকবি বিশ্বকে কি দিয়ে গিয়েছেন তার মূল্য নিরূপিত  হয়নি, তা জানাও হয়নি, জানান দেওয়াও যায়নি। সেটি  সকল মহামানবদের ক্ষেত্রেই সংঘটিত হয়েছে। আর  বাঙালীদের বেলা যা ঘটেছে তা হোল আমাদের জন্য  তিনি দুর্বহ – "বড়ো বেশী ভারী।" এই শেষ বাক্যটি  বলেছেন কবি, সাহিত্যিক ও সাহিত্য সমালোচক  বুদ্ধদেব বসু।  
ভূমিকাটি অপ্রাসঙ্গিক। আজ, শুধু শান্তিনিকেতন বা  রবীন্দ্রনাথ নামাঙ্কিত যত প্রতিষ্ঠান আছে, সর্বত্র বসন্ত  উৎসব পালিত হচ্ছে । বাংলার প্রতিটি অঙ্গন আজ  রঙের ও সঙ্গীতের বন্যায় পরিপ্লাবিত। শুধুমাত্র  গীতবিতানে , প্রকৃতি' পর্যায়ের বিপুল সংখ্যক গানগুলির  মধ্যে বসন্তের গান আছে পাঁচানব্বইটি।  তারপর গীতিনাট্য, কাব্যনাট্যে এবং মিশ্ররচনা মিলে  এখনো পর্যন্ত  (অনেকেই অবগত নন, রবীন্দ্রনাথের  পান্ডুলিপিগুলির এক চতুর্থাংশ এখনও অ-সংগৃহীত 
ও অপ্রকাশিত) প্রাপ্ত শ'দেড়েক। আর সচরাচর গীত  হয়  সাকুল্যে পনেরো থেকে কুড়িটি গান। 
আরো একটি কথা প্রণিধানযোগ্য, সেটি হোল 
গানগুলির সুর। এই সুরের মাধুর্য্য এমনই যে বাণীর  ব্যঞ্জনা বোধের বাইরে থেকে যায়। শব্দগুলির নিহিতার্থ 
অন্তরে অননুভুত রয়ে যায়। রবীন্দ্রসঙ্গীতের "সুর ও  বাণী" যদি যুগপৎ হৃদয়ঙ্গম হয় তবে বিমূর্ত 'আনন্দের'   মূর্ত রূপটি 'দৃষ্টির সম্মুখে আসিয়া দাঁড়াইবে।' ‌
_______________________________________

                আনন্দ 

খরা-ঝরা-মরা, নগ্ন-রুগ্ন-ভগ্ন দেশে 
বিছায়ে দিয়েছ কবি স্বর্গের কুসুম। 
পারিজাত মন্দারের গেঁথেছ মালিকা। 
তোমার সে গীতিকুঞ্জে গন্ধর্ব অপ্সরা, 
নৃত্যগীতে আনন্দের যে হিল্লোল তোলে–
 দেবরাজ সভামঞ্চে করে নিবেদন, 
সে আনন্দরাশি নিয়ে এলে এ বঙ্গের 
অঙ্গনে অঙ্গনে। নৃত্যপরা মেনকা ‌উর্বশী, 
অঙ্গে অঙ্গে যৌবনের বিভঙ্গদোলায় 
 সুন্দরের করে আবাহন। সেই নৃত্যগীতে 
অর্চনা করেছ কবি , বঙ্গভারতীর । 
আমরা পেয়েছি যে তা অনায়াসে – 
বেদনার বিষকুম্ভ পান করে' নিজে, 
সৃষ্টির অমৃত সবই দিয়ে গেলে শেষে।। 

দুলাল বন্দ্যোপাধ্যায় 
১৮/০৩/২০২২ 
কলকাতা ।

 

                          (ক্রমশঃ)

বৃহস্পতিবার, ১৭ মার্চ, ২০২২

শুভেচ্ছা

"In darkness' core she dug out wells of light, 
On the undiscovered depths imposed a form,
Lent a vibrant cry to the unuttered vasts , 
And through great shoreless, voiceless, starless breaths–
Bore earthward fragments of revealing thought
Hewn from the silence of the Ineffable. " 
                  'Savitri'. – Aurobindo. 

আজ সকালবেলায় একটি গদ্যছন্দে কবিতা লিখে ফেসবুকে পোষ্ট করে দিলাম। দু'এক জনের সাথে হোয়াস্-অ্যাপেও share করেছি। বিকেল বেলা ওই লেখাটিই, পরিমার্জিত রূপে আমার blog-য়ে দেবার ইচ্ছে হোল – আমার blog-য়ের পাঠকবৃন্দও পড়ুন ।
 মহামারী, হিংসা-জিঘাংসা-সম্ভূত আত্মহনন, সভ্যতার নামে কসাইদের অস্ত্রের আস্ফালন  ("নিতি নব ছোরা গড়িয়া কসাই বলে জ্ঞান বিজ্ঞান "–নজরুল) – তবুও নিত্যনৈমিত্তিক কর্মপ্রবাহ, কর্মপ্রয়াসের মধ্য দিয়ে জীবনের অবিনশ্বরতা । এর মূলে রয়েছে জীবনদায়িনী নারীর ভালোবাসা – প্রেম । 
"Eternal Famine holds us above"– Goethe.

প্রেমালোকিত প্রভাতী শুভেচ্ছা 
___________________________

সকালে উঠেছে সূর্য কুয়াশায় ম্লান।
বৈতালিক ঝগড়া সেরে চড়াইয়ের ঝাঁক, 
উড়ে গেল যে যেখানে – রুজির সন্ধান । 
চপলচরণা যত চঞ্চলা চপলা, বিমলা 
ও-বাড়ি, এ-বাড়ি দৌড় – মুঠিযন্ত্র কানে। 
আধখানা রুটি মুখে উড়ে যায় কোথা 
আমারই সে প্রতিবেশী খোঁড়া বুড়ো কাক – 
ধাওয়া করে বেচারাকে গোটাদশ অ-মিত্র স্বজাতি। 

টিভি খুলি – ওদেশে সেদেশে 
বিনা মেঘে কত বজ্রপাত – মরণের দূত নামে 
সঙ্গে নিয়ে চিতাগ্নির লেলিহান শিখা ; 
পুড়ে যায় সভ্যতার ব্যর্থ অহংকার। 
নবজাতকের শ্বাসে মড়াপোড়া গন্ধ আসে ভেসে ! 
আর এখানে, এ-দেশে – "সুন্দরী মম জননী বঙ্গভূমি ", 
অঞ্চল তার‌ রক্তে ছোপানো ঢাকা-দেওয়া দুটো লাশে । 

এমন সময়ে দেখি, ফোনের আয়নাতে 
ভেসে ওঠে ফোটা ফুল, আবেগ শিশিরে ভেজা, 
নীচে লেখা , 'বন্ধু, আছ তো ভালো' – প্রভাতী সম্ভাষণ। 
এখন সকাল হোল সত্যিই – এতোটা বেলাতে। 
মনে হোল থাকি বেঁচে আরো দুটো দিন, দেখি – 
মরণের পরপারে, মনে হয়, আছে বাকি, 
অ-মরার প্রেরণা কিছুবা ; এই ধর, তোমার পাঠানো, 
প্রেমের আতর-মাখা ফুলের ছবিতে ।। 

দুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়
১৭/০৩/ ২০২২ 
কোলকাতা।



বুধবার, ১৬ মার্চ, ২০২২

নগরের অদূরে

 দীর্ঘ পঞ্চান্ন-ষাট বছর ধরে, আমার ভালোবাসার বিষয়, আমার প্রেম, আমার আবেগের আশ্রয় সাহিত্য। 'নগরের অদূরে' – এমন ধারা গল্প বাঙলা সাহিত্যে বিরল। গল্পটি আমার গল্পসঙ্কলন 'অজয়ের এপার ওপার'  গ্রন্থে সঙ্কলিত।  বৃহত্তর পাঠক সম্প্রদায়ের কাছে পৌঁছে দেবার বাসনায় আমার blog-য়ে প্রকাশ করেছি।  

 শ্রদ্ধেয় পাঠক, পড়ুন, পড়ান, মতামত জানাবেন। 

দুলাল বন্দ্যোপাধ্যায় 

১২/৪/২০২২ 































চাই না এ আলো

চাই না এ আলো 

অজয় নদের স্রোতে ক্ষয়ে যাওয়া কূল 
সেখানে নির্জনে এক দেবতা দেউল। 
কালের চরণঘায়ে ভাঙা সে মন্দিরে
নীরব নিস্তব্ধ সন্ধ্যা নেমে আসে ধীরে। 
অন্ধকারে ভেঙ্গে যায় আলোকের খাঁচা, 
বাদুড়েরা জেগে ওঠে, চোখ খোলে পেঁচা। 
বৃদ্ধ শৃগাল, মহাশাক্ত,  নিশার ব্রাহ্মণ-- 
শিবলিঙ্গে শিবাম্বু ঢেলে শ্মশান চারণ। 
আধনাঙ্গা ভিখারীটা চুপি চুপি গিয়ে
ঢুকে পড়ে মন্দিরের নিশ্চিন্ত আশ্রয়ে। 
সেখানে একটি ঘর একান্তই তার, 
আঁধারের বন্ধু নিয়ে পেতেছে সংসার। 
সূর্যটা তার কাছে জ্যান্ত অভিশাপ, 
নগ্ন হয়ে যায় তার বুভুক্ষার পাপ। 
যত বেলা বাড়ে তত উদরের জ্বালা, 
চোখে পড়ে গৃহস্থের অন্নভরা থালা। 
সর্বগ্রাসী লালসার মূর্তি হয়ে ফেরে 
"দাও মা, দাও মা ভিক্ষা," দুয়ারে দুয়ারে। 
যখন এই দিন ডুবে রাতের কালোয় 
তখনই মুক্তি তার নির্লজ্জ 'আলোয়'। 
সত্যের উলঙ্গ রূপ তমসার কোলে, 
আঁতুর শিশুর মতো অকুন্ঠিত দোলে। 

দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
২৪শে জানুয়ারী, ২০২৩ 










বৃহস্পতিবার, ১০ মার্চ, ২০২২

মুক্তি পারের খেয়া

"জেগে ওঠে বিদ্রোহিনী  
  তীক্ষ্ণ চোখের আড়ে জানায় ঘৃণা  
      চারিদিকের ভীরুর ভিড়কে ,  
         কৃষ কুটিল কাপুরুষতাকে ।"  
                     " বাঁশিওয়ালা" –  রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ।  

সাহিত্যরস সমৃদ্ধ একটি লেখার মধ্যে ভাষার বিন্যাস , 
ছন্দ-তাল-লয় , সুর ও ব্যঞ্জনা যতই থাক্ , যা থাকে না 
বা কম থাকে সেটি হোল 'সত্য'। এ 'সত্য' সনাতন  দর্শনের সত্য নয়। এ হোল বাস্তবতা। এই ধরনের  একটি  'সত্য', নিরেট বাস্তব ঘটনার সংঘটন 
গল্প হবে কিনা জানিনা, তবে তোমাদের মনে দাগ 
কাটবে, নিশ্চিতই। কথাগুলি বলছিলাম বন্ধু 
নিখিলেশ সেনগুপ্তকে, তার ঘরে বৈকালিক চায়ের  আড্ডায় বসে'। 

  আমার ছেলে, এক কর্পোরেট সংস্থার চাকুরে। তারই  
সমমানের চাকরিতে অধিষ্ঠিত, উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত ,  সাহিত্যপ্রেমী এক বন্ধুকে একদিন নিয়ে এসেছে তার  সাহিত্যিক বাবার, মানে আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করিয়ে  দেবার জন্যই। অবশ্য ইচ্ছা ও আগ্রহটি ছিল ছেলের  বন্ধুটির , সুরঞ্জনের । সুপুরুষ, সপ্রতিভ, বুদ্ধিদীপ্ত  মুখশ্রী,  সুরঞ্জন প্রাথমিক কিছু এলোমেলো আলাপ- সংলাপের পর, আমার লেখাগুলির আলোচনা প্রসঙ্গে  বলল ,  
– আপনার ভাষা বেশ আকর্ষণীয়, শেষ পর্যন্ত টেনে  
রাখে, কিন্তু সমাপ্তিতে এসে মনে হয়, সত্যিই কী এমন  
হয় বা হতে পারে ?  
– হতে পারে নয় বাবা, হয়, হয়ে চলেছে নিত্য নিয়ত।   বলি তাহলে তোমাকে একটি ঘটনার কথা ।  

....কলকাতার সঙ্গে ব্যাঙ্গালোর শহরের নাম এখন এক  নিঃশ্বাসে উচ্চারিত হয়। এই দুই শহরের যোগাযোগ  রক্ষাকারী ট্রেনগুলি বাঙালী যাত্রী নিয়ে ঠাসা হয়ে 
যায় , ঠাসা হয়ে আসে । টিকিট পাওয়া দায়। সেবার ,  এই তো , গত বছরের মে মাস। আমি কোলকাতায় যাচ্ছি যশবন্তপুর - হাওড়া এক্সপ্রেস ট্রেনটিতে। আর- এ-সি কোটায় টিকিট পেয়েছিলাম স্লিপার ক্লাসে –কোন্ সে ভাগ্যফলে । তাই হাসিমুখে নয় , মুখভার করেই বের হলাম ঘর থেকে। তবে ট্রেনে উঠে জানতে  পারি , টিকিট 'কনফার্মড' । "আহা কী আনন্দ !" "আনন্দধারা বহিছে ভূবনে।" হে পান্থসখা মহাশকট, এবার যত পারো লোক ভরো। সাইড-লোয়ার বার্থ।‌প্রায় মধ্যিখানে। জুত করে বসলাম। আগামী দিন দেড়েক এই আসনটির উপর আমার সার্বভৌম অধিকার। বসে থাকো, শুয়ে পড় – কারো কিচ্ছুটি বলার নেই ।  

দীর্ঘ পথের যাত্রীদের ট্রেন ধরা , ট্রেনে ওঠা ,  বাক্সপ্যাঁটরা গুছ-গাছ করে রাখা, সঙ্গে-আসা আত্মীয়  
বন্ধুদের বিদায় সম্ভাষণের চিরপরিচিত কোলাহল-  কলকাকলি স্তব্ধ হোল একসময়। এবার সহস্রপদ  মহাযানের যাত্রা হোল শুরু। জানালার বাইরে আমার  
দৃষ্টি। দৃষ্টি পাথুরে পাহাড়ের উপর নয়। পাথরের  
পাহাড়গুলির উপর। সে কোন্ অনাদি অতীতে  ধরিত্রীগর্ভসঞ্জাত এই বহুবর্ণিল পাহাড়গুলির কী অপূর্ব  রূপ ! পাথরেরও এতো সুরম্য সৌন্দর্য ! মনে হোল , এ  কী শুধুই বিশ্বস্রষ্টার  অহৈতুকী সৃজনেচ্ছা ! আহা !  

ধুর ! এই বাঁচা-মরার যুযুধান সংসারে 'আ-পোড়া' লঙ্কা কি  কোথাও নাই ? সামান্য পল-অনুপলের জন্যও কবি-  কবি ভাব আসার উপায় নাই ! অনুনয়ের কাতর সুর ,  ধমক্-চমকের রূঢ় ,কর্কশ স্বর কানে আসছে। চোখ  ফেরাতেই হোল। দেখি, এক তরুণী, নজরকাড়া রূপ  কিন্তু বিস্রস্ত বেশবাস, করজোড়ে টিটি সাহেবের সামনে  দাঁড়িয়ে, প্রার্থনার ভঙ্গীমায় শুদ্ধ ইংরেজিতে কথা বলে চলেছেন ,  
– স্যার, সিট যদি না পাই আমি নীচে বসে বা দাঁড়িয়েই  যাবো স্যার। যেতে আমাকে হবেই। স্যার প্লিজ, স্যার...।  
ভাবজগৎ ছেড়ে বাস্তবে ফিরে বিষয়টি বুঝলাম। এই  তরুণী আজকেই টিকিট কেটেছেন, একশ' তিন  'ওয়েটিং' জেনেও কেটেছেন এবং ট্রেনে উঠে পড়েছেন।  টিটি সাহেব কিছু বোধ্য , কিছু দুর্বোধ্য শব্দরাজি  প্রয়োগ  করেই চললেন আর তরুণীটির কাতরতা ধীরে  ধীরে মন্দীভূত হোতে হোতে এবার চোখের জল হয়ে গলে গলে গড়াতে  আরম্ভ করলো । দেখে মনে হচ্ছে মেয়েটি  সম্ভ্রান্ত  পরিবারের , সচ্ছলতা ও বিত্তবৈভবের মাঝেই  বাস  করেন । পরণের পোশাকে মহার্ঘতার 
ছাপ ,  ঝলমলে ওড়নায় দাক্ষিনাত্যের শিল্পকলার সুষমা,  সুডোল, সুন্দর কিন্তু নিরাভরণ হাত। সিঁথিতে  ক্ষীণ  সিঁদুরের রেখা । 
কম্পার্টমেন্টের সমস্ত মুখ নীরব । সকলেই হাত-পা-   কোমর নাড়িয়ে নিজেদের বসার আসনগুলি যতোটা   সম্ভব ভরিয়ে নেবার চেষ্টা করে চলেছে। বেদখল  হওয়ার ভয়েই হয়তো ! আমি মেয়েটির অসহায়   অশ্রুমোচন সইতে না পেরে মুখ খুলে ফেললাম, 

–দেখুন স্যার, ইনি যদি আপাতত আমার সিটে বসেন    তাতে আমার আপত্তি নেই ; কিন্তু খালি বার্থ দেখে   আপনি এনার ব্যবস্থা করে দেবেন ।  

টিটি স্যারের সটান উত্তর , 
– বার্থ খালি পাওয়া যাবেই না, আপনি যদি আপনার  সিটে বসাতে চান। আমি বাধা দেবো না । 
(মনে মনে, 'অভাগা যদ্যপি চায় সাগর শুকায়ে যায়) । 
অগত্যা মেয়েটিকে বললাম , 
– মামণি , বোস । 


                    দুই   

দিন ফুরিয়ে যায় দেখায়-শোনায় , কলরবে-কোলাহলে ;  
 কিন্তু দীর্ঘ পথের ট্রেনযাত্রা যেন মনে হয় অফুরাণ।   ট্রেন চলার ছন্দিত শব্দ আর সম্মুখের 'লোয়ার সিটের'  দুই মহা পৃথুল যাত্রীর ঘোর নাসিকা-গর্জণ রাত্রির    নিবিড়তাকে যেন আরও ঘন , ঘনতর করে তুলেছে।  
সামনে হেলান-দিয়ে বসে-থাকা তরুণীর চোখ বন্ধ  
কিন্তু  বাইরে থেকে মাঝে মাঝেই আসা আলোর ঝলকে   স্পষ্টভাবেই দেখা যাচ্ছে , দুই গাল বেয়ে দুটি শীর্ণ  অশ্রুস্রোত – বিরামহীন বয়েই চলেছে ! 
– কে এই মেয়ে ? কেন একা ? কোথায় বা যাবে ? 
কান্নাই বা কেন ? 
প্রশ্নগুলি মনের মধ্যে গুমরে গুমরে উঠছে।‌ বলতেও  
পারছি না । আবার না জিজ্ঞাসা করে থাকাও অসম্ভব  হয়ে উঠেছে । হঠাৎই কোন একটি স্টেশনে দাঁড়ালো 
ট্রেন। চেয়ে দেখি আমাদের কামরার সোজাসুজি কফি  ষ্টল । নেমে পড়লাম । নিলাম দুটো । ফিরে এসে 
 কোন ভূমিকা না করেই মেয়েটিকে বললাম ,  
 – মামণি , নাও , কফি খাও । 
 চোখ খুলে , কোনও কথা না বলে হাত বাড়িয়ে কফির   কাপটি ধরল সে । তারপর ওড়নাটা গুছিয়ে , সোজা   হয়ে বসে' অতি মৃদুকণ্ঠে বলল , 
 – জল আছে কাকু ? 
 – হ্যাঁ মা , এই যে । 

কোন এক বিদেশী কাহিনীতে পড়েছিলাম, তৃষ্ণার্ত‌, 
মরীচিকার ভ্রান্তিমোহে উদভ্রান্ত এক পথিক অকস্মাৎ 
এসে পড়েছে এক মরুদ্যানে।‌ সেখানে বিশ্রামরত এক  যাযাবর তার হাতে তুলে দিল পাত্রভরা জল । তারপর   কাহিনীকার ঐ যাযাবরের মহত্বের কথাই বলেছেন  সাতকাহন । কিন্তু সেই তৃষ্ণার্ত‌ পথিকের জলপানের  
ছবিটি যেন 'সাহিত্যে উপেক্ষিতই' রয়ে গেল । 
আমি আজ সেই মরুপিপাসার বিমূর্ত ছবির মূর্তি দেখছি  চোখের সামনেই। জলের বোতলটির আর ওই  উব্জ্বলন্ত কফির কাপের শেষ বিন্দুটি পর্যন্ত যে ভাবে  
মুখে ঢেলে নিল সে , মনে হোল এই সর্বগ্রাসী তৃষ্ণা  একদিনের নয় ! তরুছায়াহীন দুস্তর মরুপথ পেরিয়ে  আসার মহাপিপাসা !  

হঠাৎই চমক ভাঙার মতো উদ্ব্যস্ত হয়ে , মুখে ক্ষমাপ্রার্থীর বিশুষ্ক হাসির রেখা ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা  করে', 
– আপনার খুবিই কষ্ট হচ্ছে কাকু, শুতে পারছেন না ।  
আমি উঠে যাই ? 
– হ্যাঁ মা , কষ্ঠ আমার হচ্ছে ; কিন্তু তা শুতে না পাওয়ার  জন্য নয় , তোমার কষ্টের কারণটি না জানার জন্য । আর উঠে যাবে কোথায় ? আপাতত যাবার জায়গা তো  তোমার নেই । 
আবারও অস্থিরতা । 
– ক'টা বাজে কাকু ? 
পকেট থেকে মোবাইল ফোন বের করে বললাম , 
– দুটো বাজতে দশ । 
মেয়েটি তার ব্যাগটি হাতড়ে বেশ বড় অ্যান্ড্রয়েড ফোন বার করল। ফোনটি অফ ছিল। কিছুক্ষণ তার উপর উদ্বিগ্ন আঙুলের নানান ছক কেটে কানের কাছে রাখল 
সেটি। ফোনই করল ঠিক ।
– হ্যাঁ , তোর ওখানেই উঠছি। তোর কাছে অনেক ফোন আসবে । সক্কলকে বলে দিবি তুই কিছুই জানিস না । 
আমার ফোন সুইচ অফ্ থাকবে। রাখছি । 

আমার তীব্র কৌতুহলভরা চোখের দিকে তাকিয়ে রইলো কয়েকটি মুহূর্ত, তারপর একটুকরো রহস্যাবৃত , দুর্বোধ্য দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে উঠল , 
– কাকু, আমি ঐশ্বর্য আর উল্লাসের মরুঝড় থেকে আমার সন্তানকে বাঁচাতে চাইছি কাকু ।
– তোমার সন্তান ? কোথায় সে ? কি হয়েছে তার ? 
– আজ তার মৃত্যু...! 
কথা আঠকে গেল ...ডুকরে কেঁদে উঠল ...দুটি হাতের 
তালুতে মুখ গুঁজে কান্না থামানোর মরিয়া চেষ্টায় কেঁপে কেঁপে উঠছে সে । 
আমি আর থাকতে না পেরে তার মাথায় হাত রেখে 
বললাম , 
– শান্ত হও মা .....কি বলছো এসব .....'মৃত্যু, সন্তানের..... বাঁচাতে চাই' ! 
– আজ ...তা..তাকে...আবার, আবার, আবার খুন করা হোত ...হোতে দি' নি....দেব না কিছুতেই । 

আমি বাকস্তব্ধ । মেয়েটিও নির্বাক। দুরন্ত গতিময় রাত্রির রেলগাড়ির ঝনঝঙ্কৃত ধ্বনি , ঘুমন্ত সহযাত্রীদের উৎকট নাসিকা-গর্জণ , অন্য এক বার্থ থেকে-আসা কোন একটি শিশুর স-বিরাম কিন্তু বিলম্বিত লয়ের ক্রন্দন – এ সমস্তকে ঢাকা দিয়ে একটি রহস্যঘেরা মৌনতা, সৃজন প্রলয়ের সন্ধিক্ষণের নীরবতার মতো , একজন ষাটোর্ধ্ব বৃদ্ধ আর প্রায় অষ্টবিংশতি বয়সের তরুণীর মাঝখানে ! 

মুহূর্ত কয়েক, আমি মরিয়া চেষ্টায় বলে উঠলাম ,
– মা , তুমি বল , আমি থাকতে পারছি না। 

তরুণীটি বুকে হাত রেখে, অনেকখানি শ্বাস নিয়ে , জানালার আলো-অন্ধকারে চোখ রেখে, ছাড়া ছাড়া 
উচ্চারণে যা বলেছিল, তার সংক্ষিপ্তসারঃ– 

এই তরুণী এবং এর স্বামীর ('হাজব্যাণ্ড' শব্দটিই ব্যবহার করেছিল) একই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা – যাদবপুর। 
তাদের স্কুলও নামে এক ছিল – লা মার্টিনা । ছেলেটি 
কম্পুটার সায়েন্সে এম এস-সি, গোল্ড মেডেলিস্ট ।
 মেয়েটিও এম-এ , ইংরেজি সাহিত্যে । প্রথম বিভাগে  দ্বিতীয়। অনেকই মেয়েবন্ধু ছিল ছেলের ; কিন্তু বহুদিনের পরিচয়ের সুবাদে দুই বাড়ির মতামতেই 
বিয়ে। হাজব্যান্ডের সঙ্গে ব্যাঙ্গালোর , হোয়াইট ফিল্ড ।  বিখ্যাত শান্তিনিকেতন মল আর শ্যারেটন হোটেলের  মাঝখানে ইডেন অ্যাপার্টমেন্টের নাইন্থ ফ্লোরে ফ্ল্যাট ।  হাজব্যান্ডের 'কোটি প্যাকেজের' চাকরি । বৌয়ের চাকরির  চেষ্টাই হয়নি । শাশুড়ী মায়ের বাধা । তাঁর একমাত্র ছেলের শরীরের দিকে নজর রাখতে হবে ।  ছেলেরও ইচ্ছা তাই। 

– নূতন নূতন রেসিপি বানাও। জানো না ? শিখে নাও। 
লাখ টাকার ফোন , শুধু কি বন্ধু আর বাপের বাড়ির  সঙ্গে 'মিনিংলেশ চ্যাট' করার জন্য ? 
পরিপাটি ডিনার , ককটেইল পেগ, জৈবিক ক্ষুৎপিপাসা 
মিটানোর সকল রকমের উপকরণ সাজিয়ে দিয়ে  হাজব্যান্ডকে আনন্দে রাখতে হবে ,সন্তুষ্ট রাখতে হবে । 
– অভাব তো কিছু রাখিনি । Please don't make my  home miserable. Try to be an agile home  maker. 
এর মধ্যে দু-দুবার প্যারাডাইস নার্সিং হোম। শাশুড়ির  ভয়ঙ্কর আদেশ , 'ঘ্যান ঘ্যানে' অবাঞ্ছিতদের এনে  আমার  ছেলের 'কেরিয়ার' নষ্ট করবে না । সে স্টেট্স্  বা  ইউ-কে  - তে সেটেল্ড করবে । করতেই হবে । তার  কাকা , মামারা সকলেই 'অ্যাবর্ডে' রয়েছে .....মনে  রেখো ।'
বাপের বাড়ির , নিজের মা বাবারও সেই একই মতামত,   'শ্বশুর বাড়ির স্ট্যাটাসের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার  চেষ্টা কর ।'  

– কাকু , ( ছোট কোন স্টেশনে ট্রেনটি বাধ্য হয়েই  হয়তো  দাঁড়িয়েছে , এক টুকরো আলো এসে পড়েছে  তার মুখের উপরে । কৃষ্ণপক্ষের ত্রয়োদশীর ডুবুডুবু  চাঁদের মতো মুখ আর ঝরা পাপড়ির মতো দুটো চোখ  তুলে এই প্রথম একটু স্পষ্ট করে কথা বলল মেয়েটি।)  গতকাল সন্ধ্যায় কেরালার কুমারাপুরম লেক রিসর্ট  থেকে ফিরেছি। সেখানে আমার হাজব্যান্ড আর ওর  দুই  বন্ধু – একজনের বৌ আর একজনের গার্লফ্রেন্ড  ছিল সঙ্গে –  
তাদের যে কী উন্মত্ত তান্ডব , আপনাকে তা বলতে  পারব  না। আমি শরীরে , মনে ধর্ষিত- বিধ্বস্ত । রাতে  ফিরেও তার নেশা যায় নি । আমি আর না বলে থাকতে  পারলাম না আমার সন্তান সম্ভাবনার কথা ।  

হঠাৎই বিছানায় উঠে বসল সে , উৎকট দৃষ্টিতে  কিছুক্ষণ  তাকিয়ে রইল আমার দিকে , পা দিয়ে  মারলো  বুকে.... আমি পড়ে গেলাম খাটের নীচে একটা    'বিনে'র উপর । ভয় ..বিস্ময় ! আমি কী করব ! এ রূপ  তার কখনও দেখিনি । সে ল্যাপটপ নিয়ে বসে পড়ল,  পর পর সিগারেট । ছাই, আধখাওয়া সিগারেট ঘরের  মধ্যে, আমার গায়ে ছুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলছে, আমি কোন  রকমে উঠে ব্যালকনিতে গিয়ে দাঁড়ালাম। সেখানেই  দাঁড়িয়ে কাটল সারাটা রাত।  
সকালবেলা, যেমন অফিসের জন্য তৈরি হয় ঠিক  তেমনই । আমার সামনে এসে , আমার মুখটা ধরে  সজোরে নাড়িয়ে, থুতনিতে ঝটকা দিয়ে মুখে থুথু  ছিটিয়ে বলে , 
-–  এক্ষুণি সেই নার্সিং হোম , appointment done . 
Get ready , get aborted . Driver 'll pick you up   after your purification... get up... get lost  ...you  ... bitch !  
(স্বগতোক্তির মতোঃ  – 'আর কী বাকী রইল আমার !)'

নার্সিং হোমে গেলাম। শাশুড়ীমাকে ফোন করলাম ।  আরো অশ্রাব্য কিছু কথা শুনলাম । বাড়িতে বাবা মাকে  জানালাম । 'জামাই যা বলছে তাই কর' – সংক্ষিপ্ত   নির্দেশ । আমার ছোট বেলাকার বান্ধবী , (আমাদের  বাড়ির নীচের তলায় ভাড়া থাকত , অনেক আগে বিয়ে  হয়েছে তার , দুটো ছেলে মেয়ে , বর স্কুলমাষ্টার , থাকে   ক্যানিংয়ে , সে'ই উপযাচক হয়ে আমার সঙ্গে  যোগাযোগ  রেখেছে ।) মরিয়ার মতো ফোন করে  ফেললাম তাকে । 

– যে অবস্থায় রয়েছিস বেরিয়ে আয়, চলে আয়  আমাদের কাছে ।  
আবার ফোন, এবার তার বর ,  
– দিদি চলে আসেন। আপনার ভালোর জন্য শুধু নয় ,  আপনার সন্তানকে বাঁচান, তাকে মরতে দিবেন না। 
দিদি, আপনে দাদার ঘরে আসছেন, কোন ভয় নাই। 

বেরিয়ে পড়লাম কাকু , সোনার দোকানে সোনার চুড়ি 
 আর শাঁখা-পলায় যতটুকু সোনা ছিল , বিক্রি করে  
বেরিয়েছি । কোথায় ক্যানিং,  নামই শুধু শুনেছি ,  হাওড়া থেকে যাবোই বা কিভাবে, কিছুই জানিনা কাকু,  জানিনা। আবার ডুকরে ডুকরে কাঁদতে লাগল সে ।  

– বড় অন্ধকারাচ্ছন্ন ভবিষ্যৎ, দ্বন্দ্বময় জীবনের পথ  বেছে নিলে যে, মা ! আইন-আদালত, পুলিশ -- সহানুভূতির স্পর্শ যে কোথাও নেই মা ! 

রাত্রির গাঢ় অস্পষ্টতা কেটে গিয়েছে অনেকখানি ।  স্বল্পস্ফুট ঊষার কিরণ জানালা বেয়ে মেয়েটির মুখে  এসে পড়েছে। কী অপরূপ মুখশ্রীমায়া! সম্ভাবনাময়,  
অনাগত ; কিন্তু বিকাশোন্মুখ কুসুমকলিকার সুগভীর  
গর্ভাশয়ে সুনিশ্চিত অথচ সুসুপ্ত ফলটির আগমনী  সংবাদের আশ্বাসে ফুল যেমন ফোটার জন্য আকুল হয়ে  ওঠে, তেমনই এই নারী যেন তার আজন্মকালের  অবরুদ্ধ মাতৃত্বকে প্রকাশের জন্য উন্মুখ। বালিকা  বেলার পুতুল খেলার 'বাৎসল্যকে' প্রাণময়, রক্তমাংসের  পুতুলটির মতো কোলে নিতে চাইছে এমন কী আপন  অস্তিত্বের বিনিময়েও ! 

--- এ আমার স্বভাবজ কবিত্ব নয় বাবা, বললাম ছেলের বন্ধুকে, সম্মুখে উপবিষ্ট সেই তরুণীকে দেখে তখন আমার মনে হচ্ছিল, আত্মপ্রলয়ের চিতাভস্ম আপন সর্বাঙ্গে  ধারণ করেও যেন সৃষ্টির "সত্য ও সুন্দর"–কে অকাল মরণের রাহুগ্রাস থেকে রক্ষা করার ব্রত গ্রহন করেছে অনাদি কালের অবিনশ্বর মাতৃত্ব। 

কান্না চেপে, ওড়নায় চোখ মুছে, জানালার বাইরে স্থির  দৃষ্টি রেখে অতি মৃদু কণ্ঠস্বরে বলে উঠল , 

– অন্ধকার, কাকু , অন্ধকার ! তবু এই অন্ধকারের বুক  চিরে আমি এবার আমাকে মুক্তি দেব, আমার সন্তানকে  বাঁচাবো, আমি মা হব , মা হয়ে বাঁচব ...নইলে মা হতে  গিয়ে মরবো । 


সুরঞ্জনকে কেমন অস্থির মনে হোল। আমারও 
সেদিনের আবেগ, নিজের অসহায়ত্বের গ্লানি ফিরে  এলো যেন আবার। কথা হারিয়ে যাচ্ছে । চুপ করে 
রইলাম কিছুক্ষণ । আমার ছেলে একরকম অসন্তুষ্ট  হয়েই কী একটা বলতে গেল। হঠাৎই সুরঞ্জন  অস্বাভাবিক জোরে বলেন উঠল , 

– তারপর ? 
তারপর আর কি ! অন্ধ, বৃদ্ধ, বনবাসী বাল্মীকি – তাও লাঞ্ছিতা,  অন্তঃসত্বা সীতা দেবীকে আশ্রয় দিয়েছিলেন ; কিন্তু  আমি অপারগ !‌ তাকে বললাম , 

– মা , আমি তোমাকে নিয়ে যাব , শিয়ালদা স্টেশনে  ক্যানিং লোকালে তুলে দিয়ে আসব। আর আমার  কাছে  কিছু অতিরিক্ত টাকা আছে, সেটুকু নিলে  আমার  মনের কষ্ট একটু কমবে । 

– আমার সঙ্গে শিয়ালদা স্টেশন পর্যন্ত যাবেন , ঠিক  আছে কিন্তু টাকা লাগবে না কাকু। অনেকগুলি টাকা  আমার কাছে আছে । 

কি আর করি । হাওড়া স্টেশন থেকে ট্যাক্সিই নিলাম।   তাকে ক্যানিং লোকালে তুলেও দিলাম । এক টুকরো কাগজে আমার নাম, ব্যাঙ্গালোরের (যেহেতু এখানেই বেশী থাকা হয়) ঠিকানা , ফোন নম্বর লিখে  তার হাতে দিয়ে বললাম ,  
– বিশ্বস্রষ্টার কাছে প্রার্থনা করি , তোমার ইচ্ছাটি পূর্ণ  হোক্ । যেদিন আমার দাদুভাই বা দিদিভাই আসবে সেই  দেবদূতের আগমনের শুভ সংবাদটি দিতে ভুলে যেয়ো  না , মা। 

আমায় প্রণাম করে বিদায় নিল সে। না বলল নাম, না  দিল কারো ঠিকানা। সেই দিন থেকে আমি মাস গুণে  চলেছি। এতো দিনে তো ...! 

সুরঞ্জন উঠে দাঁড়ালো। কাকু, আমি যাই । 
ছেলে বলে, সে কী ? যাবি কোথায় ? কেন ? 

বৌমা এলেন । 
– সুরঞ্জনদা , ডিনার রেডি । 
সে সবার মুখের উপর চোখ রেখে, মাথা নাড়িয়ে  বেরিয়ে গেল, হতচকিত আমরা নিথর বসেই থাকলাম  নীরবে । 
ছেলে আমার গল্পটি বলার সময়েই বিরক্ত বোধ  করেছিল। মুখে বলেনি কিছু। রাত্রে খাবার টেবিলে  বেশ  ভারি গলায় মন্তব্য করল , 

– সব জায়গাতে তোমার সাহিত্যে চলে না,  বাবা । এই  তো এখনও এক বছর হয়নি , সুরঞ্জনের ওয়াইফ্ তার  কোন পূর্বপরিচিত বয়ফ্রেন্ডের সঙ্গে বিদেশে পালিয়ে  গেছে । কোন খোঁজ পাওয়া যায়নি । কেসও চলছে । 

(টেবিল ছেড়ে ওঠার সময়),
– বেচারার কেরিয়ারটাই বরবাদ হয়ে গেল । 

                       সমাপ্ত 

দুলাল বন্দ্যোপাধ্যায় 
১৮/০৩/২০২২ 
কলকাতা।
















                                         




 
  



                                          
                              


                               


                   




সোমবার, ৭ মার্চ, ২০২২

কামনা

 

আমার এই গল্পটি অনেকগুলি পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। 
                                দুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়।















রবিবার, ৬ মার্চ, ২০২২

প্রাণ

বৃহদারণ্যক উপনিষদ্ বলছেন , 
"তস্মাতে কাকি ন রম্যতে।।" 

মাত্র চারটি শব্দ কিন্তু গভীর অর্থবাহী । রবীন্দ্রনাথ এই মন্ত্রটির অন্তর্নিহিত ভাবটি একটি অনন্যসাধারণ কবিতায় প্রকাশ করেছেন । 

"যেভাবে পরম এক আনন্দে উৎসুক , 
আপনারে দুই করি লভিছেন সুখ – 
দুইয়ের মিলন , তাতে বিচিত্র বেদনা 
নিত্য বর্ণ-গন্ধ-গীত করিছে রচনা ।" 
                                                 ("স্মরণ ") 

                       প্রাণ
               ____________

সেদিন ছিল না দুঃখ এমন তো নয় । 
ছিল হিংসা , ছিল দ্বেষ , স্বজাতি বিদ্বেষ , 
মহা মহা যুদ্ধে শেষ মহা জনপদ । 
মহামারি দাবানল , বিধ্বংসী প্লাবন , 
প্রলয়-ঝটিকা ঝঞ্ঝা , যক্ষ-রক্ষ ত্রাস ! 
শ্মশান শয্যায় কত নগর নগরী , 
জীবন্ত সভ্যতা যত ঘুমন্ত সমাধী । 
প্রাণ তবু আছে বেঁচে চিরজ্যেতির্ময় । 

অরুণ, বরুণ আছে , আছে বসুন্ধরা – 
পতিতপাবনী গঙ্গা , পবনের সুধা , 
অনন্ত আলোকধারা অসীমের প্রেম – 
প্রাণের অমৃতকুম্ভে নিত্য পড়ে ঝরে । 
ধরাভরা মাতৃস্নেহ সর্ববিঘ্ননাশা , 
দ্যুলোকের আশীর্ব্বাদ পিতৃ ভালোবাসা । 

দুলাল বন্দ্যোপাধ্যায় 
০৬/০৩/২০২২ 
কোলকাতা । 


শূন্যতা

মনে কর কিছু নাই – না রয়েছে ঘর,না জগৎ-সংসার ।‌ 
নিখিল জগৎ জুড়ে বিপুল শূন্যতা । 
ছায়া ছায়া যা কিছু বা আছে চতুর্দিকে , 
কাল তো রইবেনা আর – ধনীর ঐশ্বর্য বা দীনের 
দীনতা । 
বার বার বলি তবু ওই যে পিপাসা ,
ঘরে ঘরে যাই , 'জল দাও' , চাই , 

শুক্রবার, ৪ মার্চ, ২০২২

ধর্মক্ষেত্র কুরুক্ষেত্র

John Mccrae – (1872 - 1918) -
A Canadian soldier , physician and a poet , served in the Boer War and 1st. World War. His poem : 

In Fanders Field  

"In Fanders Field the puppies blow 
Between crosses row on row , 
That mark our place ; in the sky , 
The larks , still bravely singing , fly 
Scarce heard amid the gun below . 
..................................................... 
....................................................."

এই কবিতাটির অনুসরণে একটি কবিতা – 
শুধু ভাষা নয় , ভাবটিও ভারতীয় দর্শনের অনুসারী । 

– দুলাল বন্দ্যোপাধ্যায় 
______________________________________________

ধর্মক্ষেত্র কুরুক্ষেত্র 

কবরের পর কবরে রয়েছে পোঁতা 
পবিত্ৰ ক্রসের চিহ্ন , 
মাটি চাপা আছে হাজরো তরুণ 
বারুদে ছিন্ন ভিন্ন । 
এই প্রান্তর আমার ঠিকানা 
উদার আকাশ তলে , 
কত পাখী সেথা মুক্ত পাখায় 
গান গেয়ে উড়ে চলে । 
ছোট ছোট কান বন্দুক-তান 
হয়তো শুনেনি তারা , 
নির্ভয়ে তাই পাখা মেলে ধায় – 
আনন্দে আপন-হারা । 

এখন আমরা মরণের কোলে ; 
কিন্তু দুদিন আগে , 
প্রভাত কিরণে স্নান হোত সারা  
গীতালি সন্ধ্যারাগে ।
ভালোবাসা ছিল , বাসতামও ভালো , 
পাখী ফুল , ছিল আলো । 
ঘৃনা ছিল , ছিল বিজিগীষা 
 এখন শুধুই 'কালো' । 
মরণের পরে থাকে না কিছুই , 
থাকে না আপন পর , 
থাকে না প্রেয়সী , প্রেমের পিপাসা 
সত্য বা সুন্দর ! 

দুলাল বন্দ্যোপাধ্যায় 
০৪/ ০৩/ ২০২২ 
ব্যাঙ্গালোর । 

______________________________________________














বুধবার, ২ মার্চ, ২০২২

পৃথিবী কি হয়ে যাবে ডাকিনীর মাঠ ?

বিদগ্ধ ‌ও প্রজ্ঞাঋদ্ধ পাঠকবৃন্দ , তাঁরা জানেন 
'আত্মাহুতির' নামান্তর যুদ্ধের 'শেষ পরিণাম' ! মহাকবি 
বাল্মীকি , ব্যাসদেব , হোমার , ভার্জিল আর মহাকবি ও 
নাট্যকার সেক্সপিয়ার – সকলেই তাঁদের অবিনশ্বর 
সৃষ্টিগুলির শেষ পর্বে / অধ্যায়ে অননুকরণীয় ( তাঁদের পক্ষেই যা সম্ভব) ভাষায় মানুষের হিংসা-সম্ভূত আত্মহননের "শান্তিময়ী" সমাপ্তির চিত্র অঙ্কন 
করে গিয়েছেন । 

বর্তমান কবিতাটিতে তারই নবতর অনুরণন ।

সভ্যতা – তুমি আত্মঘাতী ! 

বসন্তের অপরাহ্ন ,  বিবর্ণ ধূসর ! 
তরুশূণ্য , তৃণশূণ্য বিষণ্ণ প্রান্তরে 
ধূলিঘুর্ণী – উল্কাগতি প্রেতাত্মার মত 
ছোটে দিশাহীন ,  ডাকিনীর মাঠে । 
  হাজার হাজার অতৃপ্ত আত্মার আজ 
অন্তিম সৎকার – উদ্দেশ্য আমার । 
পুরোহিত প্রতিনিধি , আমিই যাজ্ঞিক , 
আমি গণৎকার । 
দৃষ্টি মেলে চেয়ে দেখি দগ্ধ , কৃষ্ণরেখা – 
আছে লেখা সভ্যতার শেষ পরিণাম । 

নদীতীরে, ভূধরে প্রান্তরে , গ্রামে গ্রামান্তরে 
শহরে বন্দরে , প্রকাশ্যে গোপনে , 
অনুক্ষণ প্রতিক্ষণে নিরন্তর নরমেধ । 
স্তরিভূত রক্তের পোড়ামাটি রঙে 
লেপা হয়ে পড়ে আছে গৃহহীন প্রাঙ্গনের 
নিষ্প্রাণ পৃথিবী । 
অবাধ্য নরের , সু-বধ্য নারীর বিদেহী ক্রন্দন 
শন্ শন্‌ বয়ে যায় অদৃশ্য হুতাশে ! 
কান পেতে শুনি , স্পর্শ করি , গণি – 
উচ্চাবচ ঢিপি , টিলা !  দিনান্তের ছায়া
ঢেকে আছে  যুগ যুগান্তের হরপ্পা , 
মহেঞ্জোদারো , মায়া , মেসোপটেমিয়া । 
'ফারাও' কবর হতে ইউফ্রেতিস , তাইগ্রিস ; 
বামিয়ান হয়ে হোথা কুরুক্ষেত্র ভূমি , 
নালন্দা রাজগীর – 'জীবন্ত' সে ইতিবৃত্ত 
নির্বাক শান্তির ! 

গণনায় আরো আসে উঠে – 
মর্তে বসে স্বর্গের অভিলাষ যাবে টুটে ! 
অনু পরমাণুদের নিয়ে যত খেলা , 
মানুষের দেবতারে নিত্য অবহেলা , 
প্রেমহীন দানবের 'আত্ম'-হারা বিজয় উল্লাস , 
আকস্মাৎ স্তব্ধ হবে , হবে ইতিহাস ! 
'সভ্যতার' চিতা আপনার ভস্মে ঢাকা শ্মশান শয্যায় 
পাবে ঠাঁই ! 
বসন্ত বাতাস বইবে কী আর , শেষ বাণী নিয়ে তার ,
'নাই নাই নাই' ! ? 

দুলাল বন্দ্যোপাধ্যায় 
০২/০৩/২০২২ 
ব্যাঙ্গালোর । 

_____________________________________________











মঙ্গলবার, ১ মার্চ, ২০২২

Hopelessness

Gone are the hopes , gone all beliefs in man . 
He looks as naked as the caveman when 
When  at war or the caveman was slightly better, 
For having no alternative , being an almost alien ,
He too was struggling for his survival . 
He had to live on prey , ferocity and 
wilderness . 
Many a thousand years  passed by . 
Many a civilization came up and perished . 
Many a war 

ছোট প্রাণ, ছোট ছোট কথা ।

গাঁওয়ালি আলাপ 
__________________


চল , বসি চায়ের দোকানে । 
ভালো মন্দ কথা বলি দুটো – 
হৃদয়ে হৃদয়ে মেশা , একান্ত নির্ভার , 
বাতাসে ভাসানো খড়কুটো । 

বুড়া বাবা কাশে সারারাত , 
বুড়ি মা'টা রোজ মরমর । 
ভাই গুলো ? মোটামুটি আছে , 
ভাগ্নীটা কাজে কম্মে দড় । 

বিয়েরও বয়স হোল তার , 
পাত্তর কোথা পাই ভাই – 
পণের টাকাও পাওয়া ভার । 
ভাবনায় রাতে ঘুম নাই । 

চাষে শুধু দেনা , লাভ নাই । 
ফসলের দাম পাই কই ? 
আনতে নুন পান্তা ফুরায় – 
কেবলি ঋণের বোঝা বই । 

তোমার খবর কিছু বল – 
বৌদি কী রয়েছেন ভালো ? 
সব জমি চাষ দেওয়া হোল ? 
গাছে আম আছে, না ফুরালো ? 

২ 

গাঁয়ে ওরা কত কী যে বলে – 
জাত ধর্ম রাজনীতি কথা ।
হিংসা জাগায় ছলে-বলে 
নানা ধন্ধ, চাপা অস্থিরতা । 

পাড়ায় পাড়ায় রেষারেষি 
অনর্থক রক্ত ঝরে কত ।
শত ছেলে হোল পরবাসী , 
ঘরহারা বিবাগীর মতো ।

আজান কীর্তন সবই হয় – 
মানুষে মানুষে প্রেম নাই । 
ঘরে ঘরে বাদ বিসম্বাদ , 
মনোদুখ কারে বা জানাই ! 

কটা দিন বাঁচব বলনা ? 
অকালেই মরণের খেলা ! 
কেন এত নিজেকে ছলনা – 
বিদ্বেষ আগুণে নিত্য জ্বলা ! 

যেখানে যা হোক্, তা হোক্ , 
তুমি আমি বসি কিছুক্ষণ , 
ধার হোক্ , খাও চা দু'ঢোক্ 
শোধ দেব , এলেই আঘন ।।

দুলাল বন্দ্যোপাধ্যায় , 
০১/০৩/ ২০২২ 
ব্যাঙ্গালোর ।











Recently published

অমূল্য

He ( Tagore) who sees all things in his own self and his own self in all things, he does not remain unrevealed.                     ...