বৃহস্পতিবার, ১০ মার্চ, ২০২২

মুক্তি পারের খেয়া

"জেগে ওঠে বিদ্রোহিনী  
  তীক্ষ্ণ চোখের আড়ে জানায় ঘৃণা  
      চারিদিকের ভীরুর ভিড়কে ,  
         কৃষ কুটিল কাপুরুষতাকে ।"  
                     " বাঁশিওয়ালা" –  রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ।  

সাহিত্যরস সমৃদ্ধ একটি লেখার মধ্যে ভাষার বিন্যাস , 
ছন্দ-তাল-লয় , সুর ও ব্যঞ্জনা যতই থাক্ , যা থাকে না 
বা কম থাকে সেটি হোল 'সত্য'। এ 'সত্য' সনাতন  দর্শনের সত্য নয়। এ হোল বাস্তবতা। এই ধরনের  একটি  'সত্য', নিরেট বাস্তব ঘটনার সংঘটন 
গল্প হবে কিনা জানিনা, তবে তোমাদের মনে দাগ 
কাটবে, নিশ্চিতই। কথাগুলি বলছিলাম বন্ধু 
নিখিলেশ সেনগুপ্তকে, তার ঘরে বৈকালিক চায়ের  আড্ডায় বসে'। 

  আমার ছেলে, এক কর্পোরেট সংস্থার চাকুরে। তারই  
সমমানের চাকরিতে অধিষ্ঠিত, উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত ,  সাহিত্যপ্রেমী এক বন্ধুকে একদিন নিয়ে এসেছে তার  সাহিত্যিক বাবার, মানে আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করিয়ে  দেবার জন্যই। অবশ্য ইচ্ছা ও আগ্রহটি ছিল ছেলের  বন্ধুটির , সুরঞ্জনের । সুপুরুষ, সপ্রতিভ, বুদ্ধিদীপ্ত  মুখশ্রী,  সুরঞ্জন প্রাথমিক কিছু এলোমেলো আলাপ- সংলাপের পর, আমার লেখাগুলির আলোচনা প্রসঙ্গে  বলল ,  
– আপনার ভাষা বেশ আকর্ষণীয়, শেষ পর্যন্ত টেনে  
রাখে, কিন্তু সমাপ্তিতে এসে মনে হয়, সত্যিই কী এমন  
হয় বা হতে পারে ?  
– হতে পারে নয় বাবা, হয়, হয়ে চলেছে নিত্য নিয়ত।   বলি তাহলে তোমাকে একটি ঘটনার কথা ।  

....কলকাতার সঙ্গে ব্যাঙ্গালোর শহরের নাম এখন এক  নিঃশ্বাসে উচ্চারিত হয়। এই দুই শহরের যোগাযোগ  রক্ষাকারী ট্রেনগুলি বাঙালী যাত্রী নিয়ে ঠাসা হয়ে 
যায় , ঠাসা হয়ে আসে । টিকিট পাওয়া দায়। সেবার ,  এই তো , গত বছরের মে মাস। আমি কোলকাতায় যাচ্ছি যশবন্তপুর - হাওড়া এক্সপ্রেস ট্রেনটিতে। আর- এ-সি কোটায় টিকিট পেয়েছিলাম স্লিপার ক্লাসে –কোন্ সে ভাগ্যফলে । তাই হাসিমুখে নয় , মুখভার করেই বের হলাম ঘর থেকে। তবে ট্রেনে উঠে জানতে  পারি , টিকিট 'কনফার্মড' । "আহা কী আনন্দ !" "আনন্দধারা বহিছে ভূবনে।" হে পান্থসখা মহাশকট, এবার যত পারো লোক ভরো। সাইড-লোয়ার বার্থ।‌প্রায় মধ্যিখানে। জুত করে বসলাম। আগামী দিন দেড়েক এই আসনটির উপর আমার সার্বভৌম অধিকার। বসে থাকো, শুয়ে পড় – কারো কিচ্ছুটি বলার নেই ।  

দীর্ঘ পথের যাত্রীদের ট্রেন ধরা , ট্রেনে ওঠা ,  বাক্সপ্যাঁটরা গুছ-গাছ করে রাখা, সঙ্গে-আসা আত্মীয়  
বন্ধুদের বিদায় সম্ভাষণের চিরপরিচিত কোলাহল-  কলকাকলি স্তব্ধ হোল একসময়। এবার সহস্রপদ  মহাযানের যাত্রা হোল শুরু। জানালার বাইরে আমার  
দৃষ্টি। দৃষ্টি পাথুরে পাহাড়ের উপর নয়। পাথরের  
পাহাড়গুলির উপর। সে কোন্ অনাদি অতীতে  ধরিত্রীগর্ভসঞ্জাত এই বহুবর্ণিল পাহাড়গুলির কী অপূর্ব  রূপ ! পাথরেরও এতো সুরম্য সৌন্দর্য ! মনে হোল , এ  কী শুধুই বিশ্বস্রষ্টার  অহৈতুকী সৃজনেচ্ছা ! আহা !  

ধুর ! এই বাঁচা-মরার যুযুধান সংসারে 'আ-পোড়া' লঙ্কা কি  কোথাও নাই ? সামান্য পল-অনুপলের জন্যও কবি-  কবি ভাব আসার উপায় নাই ! অনুনয়ের কাতর সুর ,  ধমক্-চমকের রূঢ় ,কর্কশ স্বর কানে আসছে। চোখ  ফেরাতেই হোল। দেখি, এক তরুণী, নজরকাড়া রূপ  কিন্তু বিস্রস্ত বেশবাস, করজোড়ে টিটি সাহেবের সামনে  দাঁড়িয়ে, প্রার্থনার ভঙ্গীমায় শুদ্ধ ইংরেজিতে কথা বলে চলেছেন ,  
– স্যার, সিট যদি না পাই আমি নীচে বসে বা দাঁড়িয়েই  যাবো স্যার। যেতে আমাকে হবেই। স্যার প্লিজ, স্যার...।  
ভাবজগৎ ছেড়ে বাস্তবে ফিরে বিষয়টি বুঝলাম। এই  তরুণী আজকেই টিকিট কেটেছেন, একশ' তিন  'ওয়েটিং' জেনেও কেটেছেন এবং ট্রেনে উঠে পড়েছেন।  টিটি সাহেব কিছু বোধ্য , কিছু দুর্বোধ্য শব্দরাজি  প্রয়োগ  করেই চললেন আর তরুণীটির কাতরতা ধীরে  ধীরে মন্দীভূত হোতে হোতে এবার চোখের জল হয়ে গলে গলে গড়াতে  আরম্ভ করলো । দেখে মনে হচ্ছে মেয়েটি  সম্ভ্রান্ত  পরিবারের , সচ্ছলতা ও বিত্তবৈভবের মাঝেই  বাস  করেন । পরণের পোশাকে মহার্ঘতার 
ছাপ ,  ঝলমলে ওড়নায় দাক্ষিনাত্যের শিল্পকলার সুষমা,  সুডোল, সুন্দর কিন্তু নিরাভরণ হাত। সিঁথিতে  ক্ষীণ  সিঁদুরের রেখা । 
কম্পার্টমেন্টের সমস্ত মুখ নীরব । সকলেই হাত-পা-   কোমর নাড়িয়ে নিজেদের বসার আসনগুলি যতোটা   সম্ভব ভরিয়ে নেবার চেষ্টা করে চলেছে। বেদখল  হওয়ার ভয়েই হয়তো ! আমি মেয়েটির অসহায়   অশ্রুমোচন সইতে না পেরে মুখ খুলে ফেললাম, 

–দেখুন স্যার, ইনি যদি আপাতত আমার সিটে বসেন    তাতে আমার আপত্তি নেই ; কিন্তু খালি বার্থ দেখে   আপনি এনার ব্যবস্থা করে দেবেন ।  

টিটি স্যারের সটান উত্তর , 
– বার্থ খালি পাওয়া যাবেই না, আপনি যদি আপনার  সিটে বসাতে চান। আমি বাধা দেবো না । 
(মনে মনে, 'অভাগা যদ্যপি চায় সাগর শুকায়ে যায়) । 
অগত্যা মেয়েটিকে বললাম , 
– মামণি , বোস । 


                    দুই   

দিন ফুরিয়ে যায় দেখায়-শোনায় , কলরবে-কোলাহলে ;  
 কিন্তু দীর্ঘ পথের ট্রেনযাত্রা যেন মনে হয় অফুরাণ।   ট্রেন চলার ছন্দিত শব্দ আর সম্মুখের 'লোয়ার সিটের'  দুই মহা পৃথুল যাত্রীর ঘোর নাসিকা-গর্জণ রাত্রির    নিবিড়তাকে যেন আরও ঘন , ঘনতর করে তুলেছে।  
সামনে হেলান-দিয়ে বসে-থাকা তরুণীর চোখ বন্ধ  
কিন্তু  বাইরে থেকে মাঝে মাঝেই আসা আলোর ঝলকে   স্পষ্টভাবেই দেখা যাচ্ছে , দুই গাল বেয়ে দুটি শীর্ণ  অশ্রুস্রোত – বিরামহীন বয়েই চলেছে ! 
– কে এই মেয়ে ? কেন একা ? কোথায় বা যাবে ? 
কান্নাই বা কেন ? 
প্রশ্নগুলি মনের মধ্যে গুমরে গুমরে উঠছে।‌ বলতেও  
পারছি না । আবার না জিজ্ঞাসা করে থাকাও অসম্ভব  হয়ে উঠেছে । হঠাৎই কোন একটি স্টেশনে দাঁড়ালো 
ট্রেন। চেয়ে দেখি আমাদের কামরার সোজাসুজি কফি  ষ্টল । নেমে পড়লাম । নিলাম দুটো । ফিরে এসে 
 কোন ভূমিকা না করেই মেয়েটিকে বললাম ,  
 – মামণি , নাও , কফি খাও । 
 চোখ খুলে , কোনও কথা না বলে হাত বাড়িয়ে কফির   কাপটি ধরল সে । তারপর ওড়নাটা গুছিয়ে , সোজা   হয়ে বসে' অতি মৃদুকণ্ঠে বলল , 
 – জল আছে কাকু ? 
 – হ্যাঁ মা , এই যে । 

কোন এক বিদেশী কাহিনীতে পড়েছিলাম, তৃষ্ণার্ত‌, 
মরীচিকার ভ্রান্তিমোহে উদভ্রান্ত এক পথিক অকস্মাৎ 
এসে পড়েছে এক মরুদ্যানে।‌ সেখানে বিশ্রামরত এক  যাযাবর তার হাতে তুলে দিল পাত্রভরা জল । তারপর   কাহিনীকার ঐ যাযাবরের মহত্বের কথাই বলেছেন  সাতকাহন । কিন্তু সেই তৃষ্ণার্ত‌ পথিকের জলপানের  
ছবিটি যেন 'সাহিত্যে উপেক্ষিতই' রয়ে গেল । 
আমি আজ সেই মরুপিপাসার বিমূর্ত ছবির মূর্তি দেখছি  চোখের সামনেই। জলের বোতলটির আর ওই  উব্জ্বলন্ত কফির কাপের শেষ বিন্দুটি পর্যন্ত যে ভাবে  
মুখে ঢেলে নিল সে , মনে হোল এই সর্বগ্রাসী তৃষ্ণা  একদিনের নয় ! তরুছায়াহীন দুস্তর মরুপথ পেরিয়ে  আসার মহাপিপাসা !  

হঠাৎই চমক ভাঙার মতো উদ্ব্যস্ত হয়ে , মুখে ক্ষমাপ্রার্থীর বিশুষ্ক হাসির রেখা ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা  করে', 
– আপনার খুবিই কষ্ট হচ্ছে কাকু, শুতে পারছেন না ।  
আমি উঠে যাই ? 
– হ্যাঁ মা , কষ্ঠ আমার হচ্ছে ; কিন্তু তা শুতে না পাওয়ার  জন্য নয় , তোমার কষ্টের কারণটি না জানার জন্য । আর উঠে যাবে কোথায় ? আপাতত যাবার জায়গা তো  তোমার নেই । 
আবারও অস্থিরতা । 
– ক'টা বাজে কাকু ? 
পকেট থেকে মোবাইল ফোন বের করে বললাম , 
– দুটো বাজতে দশ । 
মেয়েটি তার ব্যাগটি হাতড়ে বেশ বড় অ্যান্ড্রয়েড ফোন বার করল। ফোনটি অফ ছিল। কিছুক্ষণ তার উপর উদ্বিগ্ন আঙুলের নানান ছক কেটে কানের কাছে রাখল 
সেটি। ফোনই করল ঠিক ।
– হ্যাঁ , তোর ওখানেই উঠছি। তোর কাছে অনেক ফোন আসবে । সক্কলকে বলে দিবি তুই কিছুই জানিস না । 
আমার ফোন সুইচ অফ্ থাকবে। রাখছি । 

আমার তীব্র কৌতুহলভরা চোখের দিকে তাকিয়ে রইলো কয়েকটি মুহূর্ত, তারপর একটুকরো রহস্যাবৃত , দুর্বোধ্য দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে উঠল , 
– কাকু, আমি ঐশ্বর্য আর উল্লাসের মরুঝড় থেকে আমার সন্তানকে বাঁচাতে চাইছি কাকু ।
– তোমার সন্তান ? কোথায় সে ? কি হয়েছে তার ? 
– আজ তার মৃত্যু...! 
কথা আঠকে গেল ...ডুকরে কেঁদে উঠল ...দুটি হাতের 
তালুতে মুখ গুঁজে কান্না থামানোর মরিয়া চেষ্টায় কেঁপে কেঁপে উঠছে সে । 
আমি আর থাকতে না পেরে তার মাথায় হাত রেখে 
বললাম , 
– শান্ত হও মা .....কি বলছো এসব .....'মৃত্যু, সন্তানের..... বাঁচাতে চাই' ! 
– আজ ...তা..তাকে...আবার, আবার, আবার খুন করা হোত ...হোতে দি' নি....দেব না কিছুতেই । 

আমি বাকস্তব্ধ । মেয়েটিও নির্বাক। দুরন্ত গতিময় রাত্রির রেলগাড়ির ঝনঝঙ্কৃত ধ্বনি , ঘুমন্ত সহযাত্রীদের উৎকট নাসিকা-গর্জণ , অন্য এক বার্থ থেকে-আসা কোন একটি শিশুর স-বিরাম কিন্তু বিলম্বিত লয়ের ক্রন্দন – এ সমস্তকে ঢাকা দিয়ে একটি রহস্যঘেরা মৌনতা, সৃজন প্রলয়ের সন্ধিক্ষণের নীরবতার মতো , একজন ষাটোর্ধ্ব বৃদ্ধ আর প্রায় অষ্টবিংশতি বয়সের তরুণীর মাঝখানে ! 

মুহূর্ত কয়েক, আমি মরিয়া চেষ্টায় বলে উঠলাম ,
– মা , তুমি বল , আমি থাকতে পারছি না। 

তরুণীটি বুকে হাত রেখে, অনেকখানি শ্বাস নিয়ে , জানালার আলো-অন্ধকারে চোখ রেখে, ছাড়া ছাড়া 
উচ্চারণে যা বলেছিল, তার সংক্ষিপ্তসারঃ– 

এই তরুণী এবং এর স্বামীর ('হাজব্যাণ্ড' শব্দটিই ব্যবহার করেছিল) একই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা – যাদবপুর। 
তাদের স্কুলও নামে এক ছিল – লা মার্টিনা । ছেলেটি 
কম্পুটার সায়েন্সে এম এস-সি, গোল্ড মেডেলিস্ট ।
 মেয়েটিও এম-এ , ইংরেজি সাহিত্যে । প্রথম বিভাগে  দ্বিতীয়। অনেকই মেয়েবন্ধু ছিল ছেলের ; কিন্তু বহুদিনের পরিচয়ের সুবাদে দুই বাড়ির মতামতেই 
বিয়ে। হাজব্যান্ডের সঙ্গে ব্যাঙ্গালোর , হোয়াইট ফিল্ড ।  বিখ্যাত শান্তিনিকেতন মল আর শ্যারেটন হোটেলের  মাঝখানে ইডেন অ্যাপার্টমেন্টের নাইন্থ ফ্লোরে ফ্ল্যাট ।  হাজব্যান্ডের 'কোটি প্যাকেজের' চাকরি । বৌয়ের চাকরির  চেষ্টাই হয়নি । শাশুড়ী মায়ের বাধা । তাঁর একমাত্র ছেলের শরীরের দিকে নজর রাখতে হবে ।  ছেলেরও ইচ্ছা তাই। 

– নূতন নূতন রেসিপি বানাও। জানো না ? শিখে নাও। 
লাখ টাকার ফোন , শুধু কি বন্ধু আর বাপের বাড়ির  সঙ্গে 'মিনিংলেশ চ্যাট' করার জন্য ? 
পরিপাটি ডিনার , ককটেইল পেগ, জৈবিক ক্ষুৎপিপাসা 
মিটানোর সকল রকমের উপকরণ সাজিয়ে দিয়ে  হাজব্যান্ডকে আনন্দে রাখতে হবে ,সন্তুষ্ট রাখতে হবে । 
– অভাব তো কিছু রাখিনি । Please don't make my  home miserable. Try to be an agile home  maker. 
এর মধ্যে দু-দুবার প্যারাডাইস নার্সিং হোম। শাশুড়ির  ভয়ঙ্কর আদেশ , 'ঘ্যান ঘ্যানে' অবাঞ্ছিতদের এনে  আমার  ছেলের 'কেরিয়ার' নষ্ট করবে না । সে স্টেট্স্  বা  ইউ-কে  - তে সেটেল্ড করবে । করতেই হবে । তার  কাকা , মামারা সকলেই 'অ্যাবর্ডে' রয়েছে .....মনে  রেখো ।'
বাপের বাড়ির , নিজের মা বাবারও সেই একই মতামত,   'শ্বশুর বাড়ির স্ট্যাটাসের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার  চেষ্টা কর ।'  

– কাকু , ( ছোট কোন স্টেশনে ট্রেনটি বাধ্য হয়েই  হয়তো  দাঁড়িয়েছে , এক টুকরো আলো এসে পড়েছে  তার মুখের উপরে । কৃষ্ণপক্ষের ত্রয়োদশীর ডুবুডুবু  চাঁদের মতো মুখ আর ঝরা পাপড়ির মতো দুটো চোখ  তুলে এই প্রথম একটু স্পষ্ট করে কথা বলল মেয়েটি।)  গতকাল সন্ধ্যায় কেরালার কুমারাপুরম লেক রিসর্ট  থেকে ফিরেছি। সেখানে আমার হাজব্যান্ড আর ওর  দুই  বন্ধু – একজনের বৌ আর একজনের গার্লফ্রেন্ড  ছিল সঙ্গে –  
তাদের যে কী উন্মত্ত তান্ডব , আপনাকে তা বলতে  পারব  না। আমি শরীরে , মনে ধর্ষিত- বিধ্বস্ত । রাতে  ফিরেও তার নেশা যায় নি । আমি আর না বলে থাকতে  পারলাম না আমার সন্তান সম্ভাবনার কথা ।  

হঠাৎই বিছানায় উঠে বসল সে , উৎকট দৃষ্টিতে  কিছুক্ষণ  তাকিয়ে রইল আমার দিকে , পা দিয়ে  মারলো  বুকে.... আমি পড়ে গেলাম খাটের নীচে একটা    'বিনে'র উপর । ভয় ..বিস্ময় ! আমি কী করব ! এ রূপ  তার কখনও দেখিনি । সে ল্যাপটপ নিয়ে বসে পড়ল,  পর পর সিগারেট । ছাই, আধখাওয়া সিগারেট ঘরের  মধ্যে, আমার গায়ে ছুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলছে, আমি কোন  রকমে উঠে ব্যালকনিতে গিয়ে দাঁড়ালাম। সেখানেই  দাঁড়িয়ে কাটল সারাটা রাত।  
সকালবেলা, যেমন অফিসের জন্য তৈরি হয় ঠিক  তেমনই । আমার সামনে এসে , আমার মুখটা ধরে  সজোরে নাড়িয়ে, থুতনিতে ঝটকা দিয়ে মুখে থুথু  ছিটিয়ে বলে , 
-–  এক্ষুণি সেই নার্সিং হোম , appointment done . 
Get ready , get aborted . Driver 'll pick you up   after your purification... get up... get lost  ...you  ... bitch !  
(স্বগতোক্তির মতোঃ  – 'আর কী বাকী রইল আমার !)'

নার্সিং হোমে গেলাম। শাশুড়ীমাকে ফোন করলাম ।  আরো অশ্রাব্য কিছু কথা শুনলাম । বাড়িতে বাবা মাকে  জানালাম । 'জামাই যা বলছে তাই কর' – সংক্ষিপ্ত   নির্দেশ । আমার ছোট বেলাকার বান্ধবী , (আমাদের  বাড়ির নীচের তলায় ভাড়া থাকত , অনেক আগে বিয়ে  হয়েছে তার , দুটো ছেলে মেয়ে , বর স্কুলমাষ্টার , থাকে   ক্যানিংয়ে , সে'ই উপযাচক হয়ে আমার সঙ্গে  যোগাযোগ  রেখেছে ।) মরিয়ার মতো ফোন করে  ফেললাম তাকে । 

– যে অবস্থায় রয়েছিস বেরিয়ে আয়, চলে আয়  আমাদের কাছে ।  
আবার ফোন, এবার তার বর ,  
– দিদি চলে আসেন। আপনার ভালোর জন্য শুধু নয় ,  আপনার সন্তানকে বাঁচান, তাকে মরতে দিবেন না। 
দিদি, আপনে দাদার ঘরে আসছেন, কোন ভয় নাই। 

বেরিয়ে পড়লাম কাকু , সোনার দোকানে সোনার চুড়ি 
 আর শাঁখা-পলায় যতটুকু সোনা ছিল , বিক্রি করে  
বেরিয়েছি । কোথায় ক্যানিং,  নামই শুধু শুনেছি ,  হাওড়া থেকে যাবোই বা কিভাবে, কিছুই জানিনা কাকু,  জানিনা। আবার ডুকরে ডুকরে কাঁদতে লাগল সে ।  

– বড় অন্ধকারাচ্ছন্ন ভবিষ্যৎ, দ্বন্দ্বময় জীবনের পথ  বেছে নিলে যে, মা ! আইন-আদালত, পুলিশ -- সহানুভূতির স্পর্শ যে কোথাও নেই মা ! 

রাত্রির গাঢ় অস্পষ্টতা কেটে গিয়েছে অনেকখানি ।  স্বল্পস্ফুট ঊষার কিরণ জানালা বেয়ে মেয়েটির মুখে  এসে পড়েছে। কী অপরূপ মুখশ্রীমায়া! সম্ভাবনাময়,  
অনাগত ; কিন্তু বিকাশোন্মুখ কুসুমকলিকার সুগভীর  
গর্ভাশয়ে সুনিশ্চিত অথচ সুসুপ্ত ফলটির আগমনী  সংবাদের আশ্বাসে ফুল যেমন ফোটার জন্য আকুল হয়ে  ওঠে, তেমনই এই নারী যেন তার আজন্মকালের  অবরুদ্ধ মাতৃত্বকে প্রকাশের জন্য উন্মুখ। বালিকা  বেলার পুতুল খেলার 'বাৎসল্যকে' প্রাণময়, রক্তমাংসের  পুতুলটির মতো কোলে নিতে চাইছে এমন কী আপন  অস্তিত্বের বিনিময়েও ! 

--- এ আমার স্বভাবজ কবিত্ব নয় বাবা, বললাম ছেলের বন্ধুকে, সম্মুখে উপবিষ্ট সেই তরুণীকে দেখে তখন আমার মনে হচ্ছিল, আত্মপ্রলয়ের চিতাভস্ম আপন সর্বাঙ্গে  ধারণ করেও যেন সৃষ্টির "সত্য ও সুন্দর"–কে অকাল মরণের রাহুগ্রাস থেকে রক্ষা করার ব্রত গ্রহন করেছে অনাদি কালের অবিনশ্বর মাতৃত্ব। 

কান্না চেপে, ওড়নায় চোখ মুছে, জানালার বাইরে স্থির  দৃষ্টি রেখে অতি মৃদু কণ্ঠস্বরে বলে উঠল , 

– অন্ধকার, কাকু , অন্ধকার ! তবু এই অন্ধকারের বুক  চিরে আমি এবার আমাকে মুক্তি দেব, আমার সন্তানকে  বাঁচাবো, আমি মা হব , মা হয়ে বাঁচব ...নইলে মা হতে  গিয়ে মরবো । 


সুরঞ্জনকে কেমন অস্থির মনে হোল। আমারও 
সেদিনের আবেগ, নিজের অসহায়ত্বের গ্লানি ফিরে  এলো যেন আবার। কথা হারিয়ে যাচ্ছে । চুপ করে 
রইলাম কিছুক্ষণ । আমার ছেলে একরকম অসন্তুষ্ট  হয়েই কী একটা বলতে গেল। হঠাৎই সুরঞ্জন  অস্বাভাবিক জোরে বলেন উঠল , 

– তারপর ? 
তারপর আর কি ! অন্ধ, বৃদ্ধ, বনবাসী বাল্মীকি – তাও লাঞ্ছিতা,  অন্তঃসত্বা সীতা দেবীকে আশ্রয় দিয়েছিলেন ; কিন্তু  আমি অপারগ !‌ তাকে বললাম , 

– মা , আমি তোমাকে নিয়ে যাব , শিয়ালদা স্টেশনে  ক্যানিং লোকালে তুলে দিয়ে আসব। আর আমার  কাছে  কিছু অতিরিক্ত টাকা আছে, সেটুকু নিলে  আমার  মনের কষ্ট একটু কমবে । 

– আমার সঙ্গে শিয়ালদা স্টেশন পর্যন্ত যাবেন , ঠিক  আছে কিন্তু টাকা লাগবে না কাকু। অনেকগুলি টাকা  আমার কাছে আছে । 

কি আর করি । হাওড়া স্টেশন থেকে ট্যাক্সিই নিলাম।   তাকে ক্যানিং লোকালে তুলেও দিলাম । এক টুকরো কাগজে আমার নাম, ব্যাঙ্গালোরের (যেহেতু এখানেই বেশী থাকা হয়) ঠিকানা , ফোন নম্বর লিখে  তার হাতে দিয়ে বললাম ,  
– বিশ্বস্রষ্টার কাছে প্রার্থনা করি , তোমার ইচ্ছাটি পূর্ণ  হোক্ । যেদিন আমার দাদুভাই বা দিদিভাই আসবে সেই  দেবদূতের আগমনের শুভ সংবাদটি দিতে ভুলে যেয়ো  না , মা। 

আমায় প্রণাম করে বিদায় নিল সে। না বলল নাম, না  দিল কারো ঠিকানা। সেই দিন থেকে আমি মাস গুণে  চলেছি। এতো দিনে তো ...! 

সুরঞ্জন উঠে দাঁড়ালো। কাকু, আমি যাই । 
ছেলে বলে, সে কী ? যাবি কোথায় ? কেন ? 

বৌমা এলেন । 
– সুরঞ্জনদা , ডিনার রেডি । 
সে সবার মুখের উপর চোখ রেখে, মাথা নাড়িয়ে  বেরিয়ে গেল, হতচকিত আমরা নিথর বসেই থাকলাম  নীরবে । 
ছেলে আমার গল্পটি বলার সময়েই বিরক্ত বোধ  করেছিল। মুখে বলেনি কিছু। রাত্রে খাবার টেবিলে  বেশ  ভারি গলায় মন্তব্য করল , 

– সব জায়গাতে তোমার সাহিত্যে চলে না,  বাবা । এই  তো এখনও এক বছর হয়নি , সুরঞ্জনের ওয়াইফ্ তার  কোন পূর্বপরিচিত বয়ফ্রেন্ডের সঙ্গে বিদেশে পালিয়ে  গেছে । কোন খোঁজ পাওয়া যায়নি । কেসও চলছে । 

(টেবিল ছেড়ে ওঠার সময়),
– বেচারার কেরিয়ারটাই বরবাদ হয়ে গেল । 

                       সমাপ্ত 

দুলাল বন্দ্যোপাধ্যায় 
১৮/০৩/২০২২ 
কলকাতা।
















                                         




 
  



                                          
                              


                               


                   




কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Recently published

অমূল্য

He ( Tagore) who sees all things in his own self and his own self in all things, he does not remain unrevealed.                     ...