বৃহস্পতিবার, ২৮ অক্টোবর, ২০২১

তৈত্তিরীয় উপনিষদ্-য়ের একটি বাণী ও সূর্যোদয়।

অসংখ্য মৃত্যুর খবর নিত্য নিয়ত।
কালে ও অকালে। বিগত রাত্রির ‌অন্ধকারে পরিচিত দুটি স্নেহের প্রতিমা লীন হয়ে গিয়েছে । বিষাদের বেদনা বুকে নিয়ে অপেক্ষা করেছি সূর্যালোকের।

          _____শান্তি মন্ত্র_____
__________________________

        
 মৃত্যু-শীতল রাত্রির অবসানে
এসেছে প্রভাত উষ্ণ আলোকস্নানে,
পুষ্পসুবাসে, বিহঙ্গ কলতানে,
ধরিত্রী ক্রোড়ে জীবনের জয়গান।

অন্তরে শুনি অসীম কালের বাণী
'এজগৎ-জোড়া প্রাণের আসনখানিঃ।'
.........................................
"আনন্দাদ্ধেব খল্বিমানি
ভূতানি জায়ন্তে ।
আনন্দেন জাতানি জীবন্তি
আনন্দ প্রয়ন্ত্যাভিসং বিশন্তীতি।।"
...................................................

শাশ্বত সত্য, যদিও একথা জানি
চির-দুঃসহ কৃতান্ত আহ্বান।।

দুলাল বন্দ্যোপাধ্যায় 
২৭/১০/২০২১
ব্যাঙ্গালোর।
 বিশেষ কথা – 'ধাত্রী ধরিত্রী'--এই  কবিতাটি এখনও শেষ হয়নি। গত রাত্রের দুটি মৃত্যু সংবাদ মনটিকে বিচলিত করে দিয়েছে।তাই উপনিষদ্-দের এই মন্ত্র বার উচ্চারণ করেছি। উপলব্ধি করার চেষ্টা করেছি।আপনাদেরও পাঠালাম।

দুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়
২৭/১০/'২১.

সোমবার, ২৫ অক্টোবর, ২০২১

ধাত্রী ধরিত্রী

কালহারা সে সুদূর অতীত হবে–
বসুধার মুখে আলো পড়েছিল যবে,
প্রাণের প্রদীপ জ্বালালো বসুন্ধরা--
বিশ্বভূবনে বন্ধ্যা পাষাণে ঝরঝর জলধারা,
প্রাণের অমৃত-ভরা।

কত যুগ, কত যুগান্তর অবসান।
স্ফটিক পাথরে মৃত্যু গরল নিত্য করিয়া পান,
শাশ্বত প্রাণের মহিমা উঠেছে জ্বলে
আকাশে বাতাসে মরুময় দেশে ভূধরে জলে স্থলে।
যুগসন্ধির রহস্যময় সাঁঝে
অপাপবিদ্ধ নরনারী এলো বিধাতার দেওয়া কাজে ;
দেহমন্দিরে তার
আনন্দময় প্রাণের মূর্তি বিমূর্ত চেতনার।

তারপর?  ইতিহাস কথা কয়।
যুগে যুগে এলো শত সভ্যতা, কত সভ্যতা লয়--
লয় শুধু নয়, প্রকৃতির শাপে সঞ্চিত 'অবলুণ্ঠন',
দম্ভের গড়া কীর্তিস্তম্ভে লজ্জার অমাগুণ্ঠন।
পাশবিক-ভাব পশুরাও ছিল, এখনও কিছুবা আছে,
পাখীরাও আছে, গান গেয়ে বাঁচে, প্রকৃতির তালে নাচে।
তারা পৃথিবীর ভালোবাসা বোঝে, জ্ঞানের গরিমা-হারা--
শুধু মানুষের লালসা-আগুনে🔥দগ্ধ বসুন্ধরা।
যুগে যুগে যারা আগুন জ্বেলেছে নিজেও জ্বলেছে চিতায়
দ্যুলোকের বাণী ধ্বনিত নিয়ত -  শোনেনি অহমিকায়।

    " শৃণ্বন্তু বিশ্বে অমৃতস্য পুত্রাঃ
     আ যে দিব্যানি ধামানি তস্তু
     পরাহমেকম্ পুরুষম্ মহান্তং
      আদিত্যবর্ণং তমসোপরস্তাৎ।।"

ওই তমসার পরপারে দেখ-- স্রষ্টা জ্যোতির্ময় ,
আত্মা তোমার তাঁহার সৃষ্টি, অক্ষয়, অব্যয়।
ধর্ম-বর্ণ-জাতি বিভাজনে কেন এ আত্মনাশ?
মনুষ্যত্বের মহাপরাভবে পিশাচের উল্লাস !

মহাকবি বলে, "হে অতীত তুমি কথা কও,কথা কও।"
আমি বলি, "ওগো গতকাল, তুমি বিস্মৃত হয়ে রও।"
ভালো যত আছে,তার চেয়ে কালো দেখি সহস্রগুণে,
ধরণীর কোল শোণিত-সিক্ত হিংসা মারণ-বাণে ।
বিদ্যুৎ ঝলে ঝঞ্ঝার মেঘে, তারেও অভয় মানি,
ধরিত্রীর বুকে হাহাকার আনে অস্ত্রের ঝলকানি।
সাগরের কূলে, মরুপ্রান্তরে শ্যামল সজল ধরায়
মৃত নরনারী, শিশুদের দেহ শোণিত-পঙ্কে লুটায়।

মনে করে দেখ কুরুক্ষেত্র,  যুদ্ধের অবসানে--
অস্তসূর্য স্থির অপলক মৃত্যুর প্রাঙ্গনে।
কুরু-পাণ্ডব আরো যত শব আঠারো অক্ষোহিনী,
রথ-মহারথী,কুশলী সারথী,অশ্ব-হস্তী-বাহিনী -
সব যবে শেষ, শুধু অবশেষ মূর্ত শোকের হাহাকার,
ছোটে সুভদ্রা পাগলিনী মাতা,হাতড়ায় মৃতদেহ কার !
হঠাৎ যেখানে দাঁড়ালেন এসে--বাহ্য চেতনা-হারা
অভিমন্যুর মৃতদেহ কোলে বসে আছে উত্তরা !
শূণ্যদৃষ্টি, শূণ্যে নিথর  গর্ভে রয়েছে প্রাণ ,
মরণের পায়ে জীবনকে সঁপে' নারীত্ব বলিদান ।
________________________________________
সুভদ্রা বিলাপঃ
"মুখ়ং তে দৃশ্যতে বৎস গুন্ঠিতং রণরেণুনা ।"

  রণাঙ্গনের ধূলায় মলিন কী মূর্তি যন্ত্রণার !
(হে কৃষ্ণ), কার পাপে এই নরকের গতি আমার প্রাণের কণার?)
_____________________________________________
এমনই নিযুত পুত্রহনন, ভ্রাতৃহনন শেষে
আজিও মানুষ মরণোন্মাদ  আত্মসর্বনাশে।
ঝটিকা, প্লাবন, দাবানল যত প্রকৃতির তাণ্ডবে
ভেঙেছে আলয়, আবার গড়েছি নব নব অনুভবে।
যে বিশ্বমারি মড়কের বলি শতেক লক্ষ প্রাণ–
মানুষের জ্ঞানে, জীবন-সাধনে তারও হবে অবসান।

কিন্তু যে পাখী, বুকে বিঁধে তীর আফগানী গুলবাগে,
থামালো গজল,পড়ল মাটিতে, সোমেতে ফেরার আগে।
যে‌ অবোধ শিশু–প্রাণহীন যীশু মধ্যসাগর তীরে,
কোথা তার গৃহ,পিতামাতা স্নেহ দেখা হয় নাই ফিরে।
কার পাপে ,কোন্ অভিশাপেএই নির্মম পরিণাম !
ফরিস্তা চুকাবে জীবন-মূল্যে অমানবিকতার দাম !

আঁধি, ব্যাধি,–দুর্দৈবের ভীতি সমস্ত জয় করে'
স্বকৃত পাপের তরবারী নিয়ে মানুষ মরে ও মারে।
ধর্মের নামে অধর্ম সৃজন–তার নির্মম অজুহাতে
দেশে দেশে যত ঘাতকের দল রক্ত-সিনানে মাতে।
মুনাফার ঘোরে উল্লাসে নাচে অস্ত্রের কারবারি,
পৃথিবীতে সুখস্বপ্নের ইতি, ভিনগ্রহে দিবে পাড়ি।
নেশাখোর আশা,হয়েছে দুরাশা,অন্তিম আসে ঘনায়ে,
অবলুন্ঠিতা কুন্ঠিতা ধরা দিয়েছে সেকথা জানায়ে।

সভ্যতা, তুমি আত্মঘাতী ! এখন এবার থামো !
প্রাণ প্রসবিনী, ধরিত্রী জননী, বল তারে নমঃ নমঃ,
ক্ষমা করো মা গো সর্বংসহা, এ বিশ্ব‌ সংসারে,
তুমিই রয়েছো প্রাণদীপ জ্বেলে লোকে ও লোকান্তরে।
জীবশ্রেষ্ঠ এ মানবকুল, তার জন্মদাত্রী তুমি,
তোমার বিপুল স্নেহভরা কোল সবার জন্মভূমি।
যুগে যুগে এলো শান্তির দূত অমৃত মন্ত্র নিয়ে, 
বরণ করেছে অকাল মরণ আমাদের পাপ ধুয়ে।
রক্তপিপাসু যে অসুর জাগে মানুষের অন্তরে–
মানবতা-হীন ধর্মপালন কপালিক উপচারে ।

নরবলি-দান হবে না বন্ধ ? হবে না কি প্রেমদান?–
নবপ্রভাতের নূতন আলোক, নবরাগ, নবতান –
একটি পৃথিবী, এক মহানীড়, একসুরে গান গাই –
"সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপর নাই ।"

দুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়
৩১/১০/২০২১
ব্যাঙ্গালোর।

জ্ঞাতব্যঃ
কিছু কিছু ভাব, ভাবনা, শব্দ, শ্লোক ও বাক্য–
বিশ্বসাহিত্যের মহান স্রষ্টাদের শাশ্বত সৃষ্টি থেকে নেওয়া হয়েছে। শেষ বাক্যটি মানবপ্রেমের মূর্ত বিগ্রহ দ্বিজ চণ্ডীদাসের একটি অমৃতক্ষরা পদের শেষ উচ্চারণ।
-----------------------------------------------------------------------









                    


                     



                  
        

বৃহস্পতিবার, ১৪ অক্টোবর, ২০২১

নবমী নিশি ও বঙ্গের রমণীকুল

শুম্ভ-নিশুম্ভ-দম্ভনাশিনী, মহিষাসুরমর্দিনী মহাচণ্ডী কিভাবে গিরিরাজ-মেনকা-কন্যা উমা হয়ে সনাতন বাঙলার চিরন্তন মাতৃত্বের স্নেহের সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হোল সেকথা পুরাণকারগণ অনেক লিখেছেন, লিখছেন এবং লিখবেন। আমি বরং আমাদের মেয়ে-উমার পতিগৃহবাসে মা মেনকার নিত্যদিনের উৎকণ্ঠা,বৎসরান্তে মেয়ের জন্য পথ চেয়ে থাকা, মেয়ের আগমনে স্বল্পকালের সান্ত্বনা আর তার পতিগৃহ পুণর্যাত্রায় বাঙলার 'মা মেনকাদের' মনের মর্মবিদারী বিষাদের রূপটি দেখে নি "আগমনী ও বিজয়ার" পালাকীর্তনে।
শাক্ত পদাবলীর সকল কবি, পদকর্তাদের অপূর্ব সব "আগমনী ও বিজয়া" বিষয়ক সঙ্গীত স্রস্টা ও শিল্পী যেমন  রামপ্রসাদ, নিধুবাবু(রামনিধি গুপ্ত)দাশরথী রায়, নীলকন্ঠ ঠাকুর, কমলাকান্ত,এন্টনি ফিরিঙ্গী, ভবানী চরণ দাস প্রভৃতি, তাঁদের সৃষ্টির গভীর আবেগের অতলান্ত সমুদ্রে ডুব দিলে আজ, এই নবমী সন্ধ্যায় আমার (কবি)সত্ত্বার অকাল বিসর্জন হয়ে যাবে। তাই আলোচনাটি আগামীকাল সকালে আগিয়ে নিয়ে যাব।
_________________________________________________                     আজ বিজয়া দশমী
এই ফাঁকে আমার সকল প্রণম্য ও প্রেমের মানুষদের প্রতি শুভকামনা জানিয়ে আবার ধারাবাহিকটি আরম্ভ করবো।

                         
                          শুভবিজয়ার শুভকামনা

"বিদায় করেছ যারে নয়ন জলে
এখন ফিরাবে তারে কিসের ছলে (গো)?"
                                  (রবীন্দ্রনাথ)

রয়েছে এখনো যারা এই বুক জুড়ে
শান্তি সমৃদ্ধি থাক্ সবাকার ঘরে,
পূর্ণ হোক্ হৃদয়ের সকল বাসনা,
সত্য হোক্ জীবনের সকল সাধনা,
বাঁধা থাক্ আত্মপর প্রেমের মালায়,
'মানবতা' ধর্ম থাক্ পূজার থালায়।

দুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়
১৫/১০/'২১ 
______________________________________________
       __ধারাবাহিক আলোচনাটির পুনরারম্ভ__
______________________________________________
গতকাল আলোচনার শেষের দিকে একটি শব্দবন্ধ ছিল 'আবেগের অতলান্ত সমুদ্র'।
এইটিই আবহমান বাংলার হৃদয়ানুভূতির সত্য পরিচয়।এই হৃদয়ানুভব কোনো নির্দিষ্ট ধর্মধারণাকে আশ্রয় করে নয়, নয় কোন দেবতার জন্য আকুলতা। শ্রীকৃষ্ণ বৈষ্ণব- পদাবলীতে যশোদা-দুলাল গোপাল, রাধিকারমন শ্যামরায়,গোপিবল্লভ বংশীধারী। মহিষাসুরমর্দিনী মহাচণ্ডী গিরিরাজ-মেনকা তনয়া উমা,চণ্ডমুণ্ড-বিনাসিনী চামুণ্ডা রামপ্রসাদের শ্যামা(মেয়ে হয়ে বেড়া বাঁধে বাপের সঙ্গে)।
আজ এখন উমা,পর্বতরাজ-কন্যা পার্বতীর পতিগৃহ থেকে পিতৃগৃহে আগমন এবং পতিগৃহে প্রত্যাবর্তন --এই লোকায়ত কাহিনীর বঙ্গহৃদয়-রঙ্গমঞ্চে জীবন্ত উপস্থাপনা । 'আগমনী বিজয়া'-র প্রাতঃস্মরণীয় পদকর্তা(তাঁদের কয়েকজনের নাম আরম্ভেই স্মরণ করেছি)ছাড়াও আরো অসংখ্য অনামী
কবি (কবিগান ও তরজা গানের তাৎক্ষণিক পদ রচনা করতেন তাঁরা), বাউল,ঝুমরগায়ক,কথকথা-বলা, পাঁচালী-পাঠক , বর্ষার প্রকোপ সামান্য কম হতেই বেরিয়ে পড়ত গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে।
পিতৃপক্ষের অবসান, মহালয়ার তর্পণ শেষ হতেই , গৃহস্থের গৃহপ্রাঙ্গনে তাঁদের আবির্ভাব।পশ্চিম বর্ধমানের আসানসোল হয়ে পুরুলিয়া যাবার পথে দামোদর নদের ডিসেড়গড় ঘাট পার হতে হয়।এই ঘাটের কয়েক-পা উজানে সত্যপীরের মাজার। হিন্দু ধর্মের সত্যনারায়ণ মুসলমানদের পীর -- মিলিত তীর্থক্ষেত্র। এখানে যাঁরা
সাধন ভজন করেন তাঁরা সকলেই ফকির। মুরশেদরাও
আছেন। এঁরা হলেন সুফি, উদার মানবতাবাদী চিন্তা-চেতনার মানুষ। এঁরা ভিক্ষাজীবী - গান গেয়ে গ্রামে গ্রামে ঘুরে', ঘরে ঘরে ভিক্ষা করে' এনাদের দি কাটত। কিন্তু এই সম্প্রদায়ের মূল উদ্দেশ্য ছিল সর্বধর্মসমন্বয়ের বার্তা প্রচার করা।যেমন তাঁরা মহান নবীর মহিমা কীর্তন করতেন তেমনি হিন্দু সম্প্রদায়ের আরাধ্য দেব দেবীদের গুণকীর্তনও করতেন।হাতে মন্দীরা বা খঞ্জনী।
দুর্গা পূজার আগে গাইতেন আগমনী আর নবমী থেকে বিজয়ার গান। আগমনী বিজয়ার বহু মর্মস্পর্শী সঙ্গীত  আমাদের শোনা, বিষয়বস্তুও জানা, কিন্তু আজ থেকে অর্ধশতাধিক বছর আগের আমাদের ঝাড়খণ্ডী(বৃহত্তর বাঙলা) অঞ্চলের,দারিদ্র-লাঞ্ছিত সেই আধভাঙা মাটির ঘরের আঙিনায় সেই ফকিরী, মুর্শেদী গান , আজও আমার বুকে "কী-হারানোর" বেদনা বয়ে আনে । সেই সব গানের সুর জাগে মনে, কিছু কিছু ভাঙা কলিও স্মৃতির আকাশে ভাসে।
যেমন :
                 ___আগমনী___

ফর্সা  পাঁকে ঘর লেপিস্ না মা,
তুর গৌরী আসছে না ....

যেই না এতোটা গাওয়া হয়েছে,অমনি মা, জেঠি,খুড়ি, ঠাকুমারা সব রে রে করে আসতেন। বয়স্কারা চিৎকার করে উঠতেন,
--চুপ কর মুখপোড়া, বাইরে যা, বাইরে যা, কিছুই দিব নাই, যা।
গায়কের কী হাসি,--না গো মা,ইট লয় ।
--আসল গানটি শুন এখন, তবে ,মনে শান্তি পাবে। 
এই বলে, খঞ্জনীতে ঝঙ্কার তুলতো আর গাইতো,

গৌরী রাণী গো,
ঘর লেপা হোল সারা,খই মুড়ি  হাঁড়িতে ভরা
নাড়ু পিঠা, তুই এলেই,মা, হবে।
বলে দে চাঁদ 🌙, চাঁদবদনী 
(আমার) আসবে কবে, গো।
প্রতিপদে না হয় দেখা,
দ্বিতীয়ায় তুমি মেঘে ঢাকা,
তৃতীয়াতে কাস্তা পারা রবে।
চতুর্থীতে মন ভরে না,
পঞ্চমীতে তর সয়না--
জেগে জেগে রাত ফুরায় না,
ষষ্ঠী কখন হবে গো, ষষ্ঠী কখন হবে।

ছোট ছোট ছেলে মেয়েদের একটি ছোট ভীড় তখন উঠান জুড়ে।মা,ঠাকুরমাদের চোখভরা জল। তাদেরই মধ্যে কেউ একজন কুলো কিংবা পাঁশুলি --পাঁচ সেরের ডালা --ভর্তি খই, মুড়ি-মুড়কি,লাড্ডু, পিঠে  ফকিরদের ঝোলায় ঢেলে দিত। ছেলে মেয়েরাও হাত বাড়িয়ে দিত, পেতোও কিছু কিছু।
জীবনের প্রভাত-বেলার এসব হৃদয়াবেগের রক্ত-রেখায় আঁকা স্মৃতি চিহ্নগুলি কি ভোলা যায় ?

                (আগামী কাল আবার)

যাদের ঘরের মেয়ে সত্যি সত্যি আছে শ্বশুর ঘরে, আসবে --এই আশায় পথ চেয়ে আছে যে পরিবার, তারা তো সেই ফকিরদের ভাবে দেবতার দূত,  বয়ে এনেছে কন্যা আগমনের মঙ্গল সংবাদ।আর সে উৎকণ্ঠা নেই যাদের তারাও মেনকার মেয়ে উমাকেই দেখে আপন ঘরের কন্যা-রূপে।
কেন ছিল এমন উদ্বেগের প্রতীক্ষা? তাঁর সামাজিক কারণগুলি ছিল মর্মবিদারী।কৌলিন্য প্রথার "বল্লালীবালাই"।
--সেই অনুসৃত সংস্কারের ফলস্বরূপ বহুবিবাহ,সতীন-কলহ বহুপত্নীকদের মৃত্যুতে একসাথে বহু অপরিনত-বয়সের অবোধ নারীর শুধু কপাল পুড়তো তাই নয়, সঙ্গে সঙ্গে তাদের জীবন্ত দেহগুলিও মৃত স্বামীর চিতা-শয্যায়, 'জ্বলন্ত প্রেমের লেলিহান  অগ্নিশিখায়' ঝলসে ঝলসে "সাবিত্রী সমতুলেষু"হয়ে যেতো। ঢাক-ঢোল, কাড়া-নাকাড়া,সিঙা-ঝাঁঝরের অম্বরভেদী নিনাদের সঙ্গে সমতালে উচ্চনাদী , পৈশাচিক মন্ত্রের কর্ণবিদারী মহারবে ঢেকে যেত অবলা নারীর নরক যন্ত্রণার মরণ-কান্না। নারীমেধ যজ্ঞের সেই বিজয়-উৎসব থিতিয়ে যাবার বহুদিন পর ,"অনুমরণে বা সহমরণে" যাওয়া কণ্যাটির বাপের বাড়িতে পৌঁছাতো সেই খবর। বাপ গর্ব করে ঘোষণা করতো "মেয়ে সতী হয়েছে", (এর কারণও ছিল--তিন, চারটি মেয়ের বিয়ে এখনো বাকি, এদের সঙ্গে আবার ওই হতভাগী?  সর্বনাশ!  ভালোই হয়েছে, গলগ্রহ ওখানেই মরেছে।)
আর (মেনকা রূপিনী) মা তখন অন্ধকার অন্দরমহলে বুক ঠুকতো ... মাথা কুটত ...চুল ছিঁড়ত !

যাই হোক, আমি আবার ফিরে আসি ওই 'আগমনী বিজয়ার' পালাগানের আসরে।কেননা এতক্ষণে আমার
সংবেদনশীল পাঠগণ আভাস পেয়ে গিয়েছেন মা মেনকাদের উৎকণ্ঠিত প্রতীক্ষার হেতু, কেনই বা 'নবমী নিশিকে  সম্বোধন করে বলতেন,
"বার মাস তিতি, সতী, নিত্য অশ্রুজলে
পেয়েছি উমায় আমি,.........।"

সোনার বাংলার এই নারী-নিধন-কাণ্ডের উপাখ্যান 'স্বর্ণাক্ষরে' লেখা আছে শত শত গ্রন্থে, মণীষীদের গবেষণা পত্রে, কবিতায় (সহমরণ--সত্যেন্দ্র নাথ দত্ত), প্রবন্ধে (নারীর মূল্য--শরৎ চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়)।প্রাতঃ- স্মরণীয় রাজা রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, দানবীর, শিক্ষা-সম্প্রচারক কালী প্রসন্ন সিংহ এবং সমকালের বিদেশী শাসক এই নারীঘাতী প্রথার‌ অসম-সাহসিকতায় বিরুদ্ধাচরণ না করলে আরও কতদিন যে মহাশ্মশান ত্রিবেণীর ঘাটে (প্রতি বৎসর সহস্র সতী-দহনের 'পুন্যে পবিত্র' তীর্থক্ষেত্র), বাংলার আরও শত নদীর চড়ায়, প্রকাশ্যে এমন বালিকাবধূ পোড়ানোর 'পবিত্ৰ দায়' সংঘঠিত হোত,  কে জানে ! বন্ধ হয়েছে একথা বলিনা,('প্রকাশ্যে' শব্দটির ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ) তবে এদেশে এখন বৃহত্তর রমনীকুল 'কৌলিন্য-কলঙ্কের অভিশাপ' থেকে মুক্ত হয়েছে --একথা সত্য। কিন্তু অপ্রকাশ্যে, গোপনে, গৃহাভ্যন্তরে নারী নির্যাতনের অভিযোগ মাঝে মাঝেই ঘোলা জলের উপরে-উঠে -আসা, মড়ক-লাগা মাছের মতো তঞ্ছট করতে করতে সংবাদের শিরোনাম হয়ে যায় ।
 কন্যাসন্তানের বিবাহ-পরবর্তী পর্বে গর্ভধারিণী মায়ের বুকে উৎকণ্ঠার যন্ত্রনাটি দেশের সমাজজীবন থেকে সম্পূর্ণ অবলুপ্ত হবে কি কোনো দিনও ? জানি না,
কেও জানে না ।

"হোক ", এই প্রার্থনা করে ফিরে আসি প্রসঙ্গে :
তা, সেই ফকির বাবারা  মহালয়ার পর থেকে রোজই আসে,রোজ দিন নূতন নূতন গান বাঁধে, নূতন নূতন গান গেয়ে শোনায়। এমনি চলে অষ্টমী পর্যন্ত, নবমী থেকে বিজয়ার গান। বিজয়ার একটি এমনি গান আজও ভুলতে পারিনি,
 
                 সকাল বেলা যায়ে(গিয়ে)দেখি মা
                 নদীর ঘাটে নাইকো বাঁধা না'(নাও=নৌকা)।
                 উমারাণী গেইছে উজানে।

                 আসে নদী যার জটা  বেয়ে,
                 ছিল কি উমার পথ চেয়ে,
                 দয়া তার নাই পরাণে,গো ।

                কাঁদিস না গো মা মেনকা,
                ঘুরলে বছর পাবি দেখা,
                জামাই তাকে রাখবেন সম্মানে।
                ওমা মেনকা,
                 কত জল আছে তুর নয়ানে ,গো 
                 কত জল আছে তুর নয়ানে ।

সেদিন আর আজ। দীর্ঘ পথ, ততোধিক দীর্ঘ সময় পেরিয়ে এসেছি আমি,আমরা,আমাদের বাঙলা। দেশভাগ-পরবর্তী
খণ্ডিত বাংলা। পঞ্চাশের মহা-অনটন, মাইলো-ভক্ষণ, ষাটের চিনা আক্রমণ, রেশন বিপর্যয়। সত্তরের বাঙলা দেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ ,আবার উদ্বাস্তু-স্রোত।এইভাবে আন্তর্জাতিক,
জাতীয় ও সামাজিক উপপ্লবের মধ্য দিয়ে কণ্টকাকীর্ণ পথ পেরিয়ে এসেছে ---বেরিয়ে এসেছে আজকের ভৌগোলিক পশ্চিম বাংলা। কিন্তু 'বাঙালীর প্রাণ, বাঙালীর ভাষা, বাঙালীর পণ, বাঙালীর আশা' খণ্ডিত হয়নি, ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বের কোণায় কোণায়। উত্তর গোলার্ধের কানাডা থেকে দক্ষিণ গোলার্ধের অষ্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যাণ্ড, পশ্চিমের আয়ারল্যান্ড থেকে পূর্ব দেশের মায়ানমার, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দ্বীপ-উপদ্বীপে  "অজস্র সহস্রবিধ চরিতার্থতায়" বিভূষিত বাঙালী যখন সে-সকল দেশে দুর্গা পূজার আয়োজন করে, সমবেত হয় বাঙলার সনাতন ঐতিহ্য,কৃষ্টি, সংস্কৃতি নিয়ে,কথা বলে, গান গায় আপনার মাতৃভাষায়,তখন এই বিশ্বব্যাপ্ত বাঙালিত্বের জন্য গর্বে বুক ভরে ওঠে। সঙ্গে সঙ্গে স্মৃতি-কাতর হয়ে পড়ি সেই সব ভীক্ষান্ন-সম্বল, মানবপ্রেমের বিগ্রহগুলির অন্তর্ধানে।
'কাল'বৈশাখীর ঝড়ে ভেঙে-পড়া বনস্পতির শাখা উড়ে যায়,পড়ে গিয়ে নদীর জলে,ভেসে যায় নিরুদ্দেশ, অদৃশ্য হয়ে যায় নদীর বাঁকে। ঠিক তেমনি বৃহত্তর বঙ্গসমাজের ফুল-ফোটানো, ফল-ধরাণো ডাল-পালার মতোই ছিল যারা
তারা হারা হয়ে গিয়েছে আজ। কিন্তু তাদের নিষ্পাপ হৃদয়- কুসুমের সৌরভ, নিষ্কলঙ্ক প্রেমধর্ম-সাধনের অমৃত-ফলের
রস,প্রত্যক্ষে বা পরোক্ষে, আবহমান বাংলার জনমানসটিকে
সুরভিত , রসসিঞ্চিত করে রেখেছে এই নিরস,বস্তুসর্বস্ব অত্যাধুনিক পৃথিবীতে।
অমানবিকতার ছবি আজও যখন দেখি, নারীত্বের অমর্যাদা, অসম্মান আজও যখন চোখে পড়ে, আজও যখন ধর্মোন্মাদদের তাণ্ডব চলে গঙ্গা-পদ্মা, মেঘনার ঘাটে ঘাটে, ধানসিঁড়ি নদীটির তীরে,  তখন আবার সেই ফকিরদের 
প্রেমময় মূর্তিগুলি মনের আকাশে ভেসে ওঠে, তাদের গানের সুর বুকের ভিতরে ঐ "কী হারানোর" বেদনা জাগায়।
তারা নাই কিন্তু তাদের গানের সুর রয়ে গেছে বাংলার আকাশে,বাতাসে,নদ-নদীর তরঙ্গে তরঙ্গে। বাংলায় গান থাকবে যতদিন ততদিন 'নাহি ভয়' । 

বাংলা সাহিত্যের আদি প্রকাশ কাব্যে, কবিতায়। এখনও সে  ধারা অব্যাহত, অপ্রতিরোধ্য অপ্রতিহত। তাই কাব্য করেই এই আলোচনাটির সমাপ্তি :

আগমনী বিজয়ার পালা হোল শেষ,
এখনো রয়েছে অবশেষ,
কোজাগরী লক্ষ্মী পূজা, জগদ্ধাত্রী, কালী আরাধনা,
নয় দূর ভারতীরও পুষ্পার্ঘ্য রচনা।
স্বর্গ হতে অবতীর্ণ চিন্ময়ী সকলে , মৃন্ময়ী রূপ ধরে'
এ বাঙলার ঘরে ঘরে
পূজা পান ভক্তি ও ভীতির উপচারে।

কিন্তু হায়! রক্ত দিয়ে যারা গড়ে মানব সন্তান,
বক্ষরসের ধারে রক্ষা করে প্রাণ,
তাদেরই বলি দিয়ে কতদিন আর,
ঈশ্বরের আশীর্বাদ পাবে এ সংসার ?

দুলাল বন্দোপাধ্যায়
২০/১০/'২১
ব্যাঙ্গালোর ।







                                

আসন্ন বিদায়।

আসন্ন বিদায়।

এল যে মলিন উষা
 বিষাদ-বেদন মেশা
ঢাকা‌ কুয়াশায়,
সানাইয়ে করুণ সুর
স্তব্ধ   'হৃদয়পুর'
মূক বেদনায় ।
মাটির পুতুল গড়ে
দিয়ে প্রাণ‌ তার পরে'
করেছি  সাধনা,
বিদায়ের কালে তার
কেন এত অশ্রু ধার?
কিসের কামনা ?
দুর্বোধ্য সংসার মাঝে
এমন কিছু বা আছে 
নাই তার সীমা,
অসীম আকাশ তলে,
অনন্ত এ দেশে কালে--
সৃষ্টির অপার মহিমা!

দুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়
১৪/১০/'২১
ব্যাঙ্গালোর।

বুধবার, ১৩ অক্টোবর, ২০২১

মহাঅষ্টমী

সপ্তমীর সুর সপ্তমে ছিল আজ অষ্টমী তিথি
শ্রীরাগের তান শান্তছন্দে স্তোস্ত্র ও স্তবগীতি ।
ভূলোকে দ্যুলোকে স্থলে-জলে দেখি আলোর ঝর্ণাধারা।
কাশফুলবন কমলকানন রূপসী স্বয়ম্বরা ।
দুর্গোৎব উৎসব শুধু --একথা সত্য নয়--
এর সাথে আছে বঙ্গজনের আত্মার পরিচয়।
ভালোবাসা তার কুটীর ছাড়ায়, ছড়ায় বিশ্বঘরে,
"বসুধৈব কুটুম্বকম"-- এ-মন্ত্র জপ করে ।
_______________________________________


মঙ্গলবার, ১২ অক্টোবর, ২০২১

পদ্মপাতায় টলটল জলকণা ভেসে আছে ভরা সায়রে, কখন হঠাৎ একাকার হবে অকূল অসীম পাথারে ।কলিকার মায়া কাটাতে পারেনি তাই, পাতাটিও আছে ভেসে,কলি কবে হবে ফোটা কমলিনী- -তারও বাঁচা সেই আশে ।এমনই ভাবেই প্রাণের কণিকা সংসার পারাবারে,আশায় আশায় ক্ষণকাল থাকে,আশা বুকে বেঁধে মরে ।কবি বলে তাই,আশা কুহকিনী,কায়াহীনা মায়াবিনী,নিত্য রয়েছে প্রাণের গভীরে চিনেও তারে না চিনি। দুলাল বন্দ্যোপাধ্যায় ১২/১০/'২১ ব্যাঙ্গালোর।

সীমান্তে সপ্তসেনার 'বলিদান'

আজ সপ্তমী !
সীমান্তে সপ্তসেনার 'বলিদান'

             শোক-সন্তপ্ত
       দুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়

সীমান্ত রেখায় রক্ত লেখায় 
লেখা ভাইয়েদের নাম,
মা'র কাছে গিয়ে কোন্ বর চেয়ে
পুরাবে মনস্কাম?
মৃণ্ময়ী মা'র পূজা করি আর
 চিন্ময়ী মাকে ডাকি,
রক্তস্রাবী জননী বিলাপে
বধির,--কর্ণ ঢাকি।

১২/১০/'২১
ব্যাঙ্গালোর

মহালয়া

আজ মহালয়ার "শারদপ্রাতে" মঙ্গলশঙ্খের ধ্বনি,পিতৃপক্ষের অবসান।পরলোকগত পিতা-পিতামহ-প্রপিতামহদের আত্মার চিরশান্তি কামনা করে ,পতিতোদ্ধারিণী গঙ্গার ঘাটে ঘাটে পিতৃতর্পণ।
আমাদের মরণোত্তর সংস্কার সবই
পিতা-কেন্দ্রিক। "পিতা নোহসি পিতা নোবধি।" এই বিধিবিধান বেদপরবর্তী উপনিষদ্ ও ব্রাহ্মণ যুগেরও বহু পরবর্তীকালের।
মাণ্ডুক্য উপনিষদ্-য়ের তর্পণ-মন্ত্র
কিন্তু ‌বিশ্বজনীন:
"ময়া দত্তেন তোয়েন তৃপ্যন্তু‌ ভূবনত্রয়ম্।"
অতৃপ্তির আগুণে দগ্ধ (মৃত) বিশ্বভূবনের সকল আত্মা পরিতৃপ্ত
হোক আমার প্রদত্ত জলের দ্বারা।

আত্মার শান্তিকামনার এই  সৎকার ক্রিয়ার মধ্যে (বৈদিক ক্রিয়া) নর ও নারী-র পৃথক উল্লেখ নেই।কিন্তু  ব্রাহ্মণ্যতন্ত্রে পিতার গুরুত্ব অধিকতর। যেমন :
"পুত্রার্থে ক্রিয়তে ভার্যা পুত্রপিণ্ড প্রয়োজনম্।"
ভার্যার প্রয়োজন শুধু পুত্রহস্তের পিণ্ড প্রাপ্তি। নারীত্বের প্রতি কী অমানবিক প্রবঞ্চনা! মরণের পরেও!
তাই যে ব্রাহ্মণ পুরোহিতগণ আজ পিতৃ-তর্পণ-মন্ত্র পাঠ করছেন বা করাচ্ছেন তাঁরা অবশ্যই ইহলোক পরিত্যক্তা পরমারাধ্যা মাতা-প্রমাতাদের উদ্দেশেও যেন কোষাকুষির ডগায় দু'ফোঁটা গঙ্গাজলে, দু'ফোঁটা চোখের জল মিশিয়ে  দিয়ে উচ্চারণ করেন:
"তৃপ্যন্তু‌ মাতা প্রাণ প্রদায়িনীম্।"
............................................

সূর্যমুখীর গোপন কথা

এমন রঙের সূর্যমুখী দেখিনি তো আগে!
.…..............................
সূর্যমুখীর গোপন কথা

সৃষ্টি ঊষার প্রথম ক্ষণেই কণ্যা
বসুধা রাণী,
স্রষ্টা পিতার পেয়েছিল বর
শুনেছিল মহাবাণী,
"সূর্য্য সোহাগী হয়ে থাকো মাগো
চিরায়ুষ্মতী হও,
'প্রাণের' আশীষ দিলাম তোমায়
প্রাণের কথাটি কও।"
সেই থেকে ধরা সূর্য্যের মুখ
দেখে রোজ প্রত্যুষে,
তার শরমের আভাটুকু নিয়ে
সূর্যমুখীরা হাসে।
এসকল অতি গোপনীয় কথা
প্রেমের লীলাও বটে,
সকলে জানে না, জানে শুধু কবি--
ফুলেরা গোপনে রটে।

দুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়.

   ব্যাঙ্গালোর ।
০১/১০/'২১

রবিবার, ১০ অক্টোবর, ২০২১

স্মরণ-বীথি

               স্মরণ-বীথি
                  দুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়

"কেউ ভোলে না কেউ ভোলে অতীত দিনের স্মৃতি,
কেউ দুঃখ লয়ে কাঁদে কেউ ভুলিতে গায় গীতি"
              --- -কাজী নজরুল ইসলাম।


সেদিনও শরৎ ছিল যে ভূবন ছেয়ে,
বউ কথা কও উঠেছিল গান গেয়ে,
কাশফুলবন দুলেছিল মৃদু বাতাসে,
মেঘ বলাকারা উড়েছিল নীল আকাশে,
আলোর সোহাগে বনবীথি ছিল উতরোল,
ভরা দিঘী-জলে ফুটেছিল শত শতদল।
ঝরা শিউলীর গন্ধ-বিভোর ভোরে -
আগমনী গান স্নিগ্ধ মাটির সুরে।

কিন্তু সেদিন বুঝি নাই তার ভাষা,
কোন্ সে নিয়তি কোন্ সে কুহকি আশা--
ভ্রূকুটি-ভঙ্গে ডাক দিল যেন স্বপনে  
হেথা নয়- হোথা নয়, নেই কিছু আর পিছনে।
এসেছি যেখানে সেখানে খুঁজেছি সুখ--
সুখে সুখী ভেবে সুখের হাসিতে ঢেকে রাখি সব দুখ।
বাহির অঙ্গে রাজকীয় বেশ অন্তর উপবাসী--
ব্যথার অশ্রু লুকানোর ছলে মুখে বিগলিত হাসি।

জীবনের দিন ক্ষয়ে ক্ষয়ে আজ গোধূলি ,
মনে পড়ে সেই বিমল শরৎ ,শারদ-সুষমা সকলি।
মনে পড়ে সেই ভাঙা-ঘর,ঘর-ভাঙা ভরা জোছনা,
মনে পড়ে সেই দুগ্গাদিদির ছেঁড়া পিরাণের বেদনা।
ভুলতে পারিনি দুলু কুমারের দুর্গা গড়ার যাদু,
ছবি হয়ে ভাসে হৃদয় আকাশে আধ-নাঙা ঢাকী দাদু।
জমিদার ঘরে রেডিওতে বাজে‌ "মহিষাসুর-বিমর্দিনী",
ফেরিওয়ালার ঘন ঘন ডাক্, "আলতা সিঁদুর চিরুনী",

"লাগাস্-নে' মাটি নতুন জামায়",  বারবার বলে মা,
পরি আর খুলি, খুলি আর পরি নতুন-গন্ধী জামা।
ছুটে ছুটে যাই চণ্ডীতলায়, ছুটে ছুটে আসি ঘরে,
'হলো কি মায়ের নারকেল নাড়ু'? দেখে যাই বারে বারে।

কেন যে কেবলি সে-ছবি সকলি প্রতিমার মতো জাগে -
সুখের আগুনে দুখ-দীপ জ্বলে -- অনুতাপে,অনুরাগে ।
এ-কী বিস্ময়! অতৃপ্ত হৃদয়, নিজের সঙ্গে যুঝে' -
অভিমানি যেন অবোধ বালক, সুখ ফেলে দুখ খোঁজে।

শারদোৎসব
মহাষষ্ঠী
১১/১০/২০২১
ব্যাঙ্গালোর ।
______________________________________________

বুধবার, ৬ অক্টোবর, ২০২১

মহালয়ায় পিতৃ-তর্পণ-মন্ত্র

আজ মহালয়ার "শারদপ্রাতে" মঙ্গলশঙ্খের ধ্বনি,পিতৃপক্ষের অবসান।পরলোকগত পিতা-পিতামহ-প্রপিতামহদের আত্মার চিরশান্তি কামনা করে ,পতিতোদ্ধারিণী গঙ্গার ঘাটে ঘাটে পিতৃতর্পণ।
আমাদের মরণোত্তর সংস্কার সবই
পিতা-কেন্দ্রিক। "পিতা নোহসি পিতা নোবধি।" এই বিধিবিধান বেদপরবর্তী উপনিষদ্ ও ব্রাহ্মণ যুগেরও বহু পরবর্তীকালের।
মাণ্ডুক্য উপনিষদ্-য়ের তর্পণ-মন্ত্র
কিন্তু ‌বিশ্বজনীন:
"ময়া দত্তেন তোয়েন তৃপ্যন্তু‌ ভূবনত্রয়ম্।"
অতৃপ্তির আগুণে দগ্ধ (মৃত) বিশ্বভূবনের সকল আত্মা পরিতৃপ্ত
হোক আমার প্রদত্ত জলের দ্বারা।

আত্মার শান্তিকামনার এই  সৎকার ক্রিয়ার মধ্যে (বৈদিক ক্রিয়া) নর ও নারী-র পৃথক উল্লেখ নেই।কিন্তু  ব্রাহ্মণ্যতন্ত্রে পিতার গুরুত্ব অধিকতর। যেমন :
"পুত্রার্থে ক্রিয়তে ভার্যা পুত্রপিণ্ড প্রয়োজনম্।"
ভার্যার প্রয়োজন শুধু পুত্রহস্তের পিণ্ড প্রাপ্তি। নারীত্বের প্রতি কী অমানবিক প্রবঞ্চনা! মরণের পরেও!
তাই যে ব্রাহ্মণ পুরোহিতগণ আজ পিতৃ-তর্পণ-মন্ত্র পাঠ করছেন বা করাচ্ছেন তাঁরা অবশ্যই ইহলোক পরিত্যক্তা পরমারাধ্যা মাতা-প্রমাতাদের উদ্দেশেও যেন কোষাকুষির ডগায় দু'ফোঁটা গঙ্গাজলে, দু'ফোঁটা চোখের জল মিশিয়ে  দিয়ে উচ্চারণ করেন:
"তৃপ্যন্তু‌ মাতা প্রাণ প্রদায়িনীম্।"
............................................

'সুপ্রভাত-' য়ের প্রত্যাভিবাদন

দুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়

আজকের প্রভাতটির সঙ্গে 'সু' বিশেষণ খুব মানানসই । অন্য হোতা, অন্য কোনখানে  কেমন সে প্রকৃতি ,কেমন সে পরিবেশ জানি না , তবে আমাদের এই কলকাতা নামক  বিপুল , প্রাচীন জনপদটি আজ আলোকোজ্বল ।
মেঘেরা আছে আকাশে , কিন্তু তারা যেন পূজা-শেষ , ফিরতি-পথের তীর্থযাত্রীদের মতো দলে দলে ভাগ হয়ে , ধীর লয়ে , মন্দাক্রান্তা ছন্দে , উড়ে চলেছে তাদের বসতভিটার ঠিকানায় –
ওই আকাশমুখী 'হিম -আলয়ের'
চূড়ায় চূড়ায় । যাবার পথে করুণার শীতল ছায়া , সঞ্চিত-পুণ্যের আশীর্ব্বাদ, ছড়িয়ে দিয়ে চলেছে 
মারী ,বন্যায় যন্ত্রণা-কাতর এই নগরী-বাসবদত্তার দীর্ণ দেহপটে ।

আজ, এই নিসর্গের আশিষ-ধন্য শরৎ-প্রভাতে আমার প্রার্থণা –

"আরো আলো ,আরো আলো
এই নয়নে প্রভু  ঢালো।
সুরে সুরে বাঁশী  পুরে
মোরে আরো আরো আরো দাও তান।"
            –  –   রবীন্দ্রনাথ ।


দুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়
৩১/৮/'২১
কলকাতা ।

Recently published

অমূল্য

He ( Tagore) who sees all things in his own self and his own self in all things, he does not remain unrevealed.                     ...