বৃহস্পতিবার, ২৩ অক্টোবর, ২০২৫

মুণ্ডক উপনিষদের একটি মন্ত্র

মুণ্ডক উপনিষদের একটি মন্ত্র

"যঃ সর্বজ্ঞঃ সর্ববিদ্ যস্যৈষ মহিমা ভুবি
দিব্যে ব্রহ্মপুরে হ্যেষ ব্যোম্ন্যাত্মা প্রতিষ্ঠিতঃ।
মনোময়ঃ প্রাণশরীরনেতা প্রতিষ্ঠিতোহন্নে

 হৃদয়ং  সন্নিধায় তদ্বিজ্ঞানেন পরিপশ্যন্তি 

ধীরা আনন্দরূপংম্  অমৃতং যদ্বিভাতি ---" 


যিনি সব জানছেন, সব দেখছেন, এই বিশ্ব তাঁর মহিমা। তার মহিমা শুধু বাহ্যপ্রকৃতিতে নয়, শুধু দেশ কালে ব্যাপ্ত প্রকৃতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, তাঁর মহিমা মানুষের অন্তরেও, মানুষের সত্তার গভীরেও বিকশিত। তিনিই আত্মা। সেই আত্মা, মানবের অন্তরে যিনি মানবাত্মা যা ব্রহ্মের জ্যোতির্ময় পুরী, সেখানেই বাস করেন। তিনি মন ও চিন্তারূপে অভিব্যক্ত হন, মানবের মন ও প্রাণের যে শক্তি তিনি তার মধ্যে বা মাধ্যমে, হৃদয়ে অবস্থিত থেকে, মানমানবের জড়দেহে কর্মের উদ্যোগ নিয়ে আসেন। বিবেকবান প্রজ্ঞাবান লোকেরা তাঁকেই ভিতরে বাইরে সর্বত্র উপলব্ধি করেন। তিনিই আনন্দস্বরূপ, অমৃতস্বরূপ, যার মহিমা দৃশ্যমান বিশ্বে উপচে পড়ছে।
সৃষ্টি এবং স্রষ্টার মধ্যে একটি অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক আছে। সেইটি যিনি উপলব্ধি করেন তিনিই ধার্মিক, তিনিই সাধক, তিনিই কবি। একথা ঠিক যে, ধর্মের মূলে দুটি বিভাগ আছে। একটি দর্শন বিভাগ, অন্যটি আচরণ বিভাগ। দর্শন বিভাগটিকে 'শ্রুতি'  এবং 'আচরণীয়' ভাগটিকে 'স্মৃতি' বলাই যুক্তিযুক্ত।
শ্রুতি বিভাগটি সমস্ত  ধর্মের ক্ষেত্রে প্রায় একই। ঈশ্বর এক, অদ্বিতীয়। তিনি এই সৃষ্টির স্রষ্টা, পালনকর্তা, রক্ষাকর্তা এবং সংহারকর্তাও। বিশ্বে যত বড় বড় ধর্ম বা 'ঈশ্বরসংক্রান্ত' বা 'সৃষ্টি ও স্রষ্টা- কেন্দ্রিক'  মতবাদের জন্ম হয়েছে, যেমন পারসিক, ইহুদী, খ্রীষ্টান, ইসলাম--- এই সকল ধর্মমতগুলির যাঁরা জন্মদাতা বা প্রবর্তক যেমন জরাথুষ্ট্র, মোসেস, যীশু খ্রীষ্ট, হজরত মোহম্মদ --- এঁরাই পরবর্তীতে 'ঈশ্বরপ্রমাণ' হয়ে গিয়েছেন। তাঁরা বলেছেন তাঁরা ঈশ্বরের দূত বা ঈশ্বরের সন্তান বা ঈশ্বর-প্রেরিত পুরুষ --- পয়গম্বর বা অবতার বা ঈশ্বরের সন্তান। রবীন্দ্রনাথ এই সমস্ত 'ঈশ্বরপ্রমাণ' মানুষদেরকে স্বর্গের দূতরূপেই সম্বোধন করেছেন। 

"ভগবান তুমি যুগে যুগে দূত পাঠায়েছ বারে বারে
দয়াহীন সংসারে।
তারা বলে গেল ক্ষমা করো সবে, বলে গেল ভালবাস,
অন্তর হতে বিদ্বেষবিষ নাশো ...." 

এনাদের বাদ দিয়েও জৈনমুনি মহাবীর বর্ধমান, শাক্যমুনি তথাগত গৌতম বুদ্ধ, প্রেমাবতার মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্যদেব, সর্বধর্মসমন্বয়ী শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব --- তাঁরাও তো এই মাটির পৃথিবীতেই বিচরণ করে গিয়েছেন। তাঁরা কেউই এই বস্তুজগৎ ও প্রাণময় জগৎ-প্রপঞ্চকে অস্বীকার করে' আপন আপন মোক্ষলাভের আকাঙ্ক্ষায় সংসার-বিবিক্ত, মানবতা-নিরপেক্ষ জীবনাচরণ অবলম্বন করেন নি। গৃহত্যাগ করেছেন, সন্ন্যাস নিয়েছেন, কঠোর কঠিন সাধনায় মগ্ন থেকেছেন জীবনের উর্বর সময়কালে। সর্বস্ব ত্যাগ, অপার তিতিক্ষার মধ্য‌ দিয়ে, দু্ঃখময় সংসার থেকে মুমুক্ষুত্ব অস্বীকার করে সে সকল মহামানব মানুষকে মনুষত্ববোধে উদ্বোধিত করবার সাধনায়, মানুষের সঙ্গে থেকেই জীবনপাত করে গিয়েছেন। তাঁরা সকলেই 'একটিই' এবং বিশেষরূপে একটিই অমৃত বাণী, সাধনালব্ধ সত্য উচ্চারণ করেছেন, "হে মানব, দেখ, তুমিই ঈশ্বর, তোমার মধ্যেই স্রষ্টার ও তাঁর সৃষ্টির ঐশ্বর্য রয়েছে। উপলব্ধি কর।

_______________________________________


ছান্দোগ্য উপনিষদ থেকে উদাহরণ

ছান্দোগ্য উপনিষদে ব্রহ্মজ্ঞানী মহর্ষি আরুণি উদ্দালক পুত্র শ্বেতকেতুকে বার বার যেমন বলছেন,
"তৎ তম্ অসি"--তুমিই সেই শ্বেতকেতো।

উপনিষদ সমূহের চারটি মহাবাক্যের মধ্যে এটি অন্যতম। গুরু বা পিতা ব্রহ্মবিদ্ মহর্ষি আরুণি, যিনি নিজেই বলতে পারেন 'অহম ব্রহমাস্মি' (বৃহদারণ্যক উপনিষদের অপর একটি মহাবাক্য) তিনি সন্তান ও শিষ্য শ্বেতকেতুকে বলেছেন "তত্ত্বমসি"-- তিনি (সেই ব্রহ্ম) হও তুমি। 'আমি ব্রহ্ম' -- সাধনার পথে এই সিদ্ধি লাভ করবার পরে ব্রহ্মজ্ঞ ঋষি যখন বলেন, 'তুমিও সেই' তখন যে আত্মোন্মোচন ঘটে তাই জীবনের সর্বোত্তম চরিতার্থতা। বৈদান্তিক ঋষিগণের এমত মহাবাণী আমরা যখন শুনি তখন, বিকারগ্রস্ত, অজ্ঞানতাবশতঃ আত্মবিস্মৃতির মেঘ কেটে যায়, অন্তরাকাশে চিরজ্যোতির্ময় আত্মা, পরমাত্মার প্রতিবিম্ব উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে। বেদান্ত এইভাবেই আমাদের অন্তরে, বিবেকে, সম্বিতে সত্যের অমোঘ বাণী উচ্চারণ করে বলেছেন, 'তুমিই ব্রহ্ম, তুমি নিত্য, তুমি জ্যোতির্ময় আত্মা। ব্রহ্মজ্ঞান কোন বাইরের বস্তু নয়, তুমি স্বরূপতঃ যা তাই -- অজর অমর নিত্য শুদ্ধ পরমাত্মার প্রতিরূপ।'  

মহর্ষি আরুণি দেখালেন অশ্বত্থ বৃক্ষের একটি ফল, ফলের মধ্যে বীজ, বীজ ভাঙলে আর তো কিছু নাই। তাহলে এই 'নাই'-এর ভিতরে কি এমন আছে যে ঐ অতি ক্ষুদ্র একটি অশ্বত্থ ফলের বীজ থেকে এক বিপুল মহীরুহর জন্ম হোল ? এখানেই চৈতন্যরূপ পরমাত্মার অবস্থিতির সত্য অসন্দিগ্ধ রূপে প্রতিষ্ঠিত, যা সর্বত্র, সর্বভূতে বিরাজমান। "তোমার মধ্যেও সেই চৈতন্যময় পরমাত্মা, তুমি নিজেই সেই, শ্বেতকেতো।" তোমার মধ্যেই সেই বীজনিহিত আছে। অদৃশ্য, অজ্ঞেয় চৈতন্যসত্ত্বা যা কায়া লাভ করে 'মহীরুহ' হয়েছে, মহীরুহ হয়। 'মহী' শব্দের অর্থ পৃথিবী, রূহ শব্দের অর্থ জন্ম হওয়া। (দুইটি শব্দ সমাসবদ্ধ (বহুব্রীহি) হওয়ার ফলে পরবর্তী শব্দ 'উ'-কার।) মহীতে অর্থাৎ মাটির পৃথিবীতে যদি ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বীজের মধ্যে লুপ্ত-সুপ্ত, অচিন্ত্য চৈতন্যকণা বিপুল বনস্পতির জন্ম দিতে পারে তবে অনাদ্যন্ত এই মহাবিশ্বের জন্মও দিয়েছেন সেই অব্যক্ত, অনির্বচনীয় 'মহাচৈতন্য' ; যাঁকে বেদান্ত বলছেন 'ব্রহ্ম', বলছেন 'পরমাত্মা'।
___________________________________


ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের বাণীতেও মাণ্ডুক্য উপনিষদের ঐ মহামন্ত্রের প্রতিধ্বনি শুনতে পাই আমরা। নরেন ঠাকুরকে জিজ্ঞাসা করলেন, "আপনি কি ভগবান দেখেছেন ?" ঠাকুরের তাৎক্ষণিক উত্তর, "দেখেছি তো ; এই  যেমন তোকে দেখছি।" নরেন স্তম্ভিত, কত সহজেই, কত অনায়াসে পুঁথিগত-বিদ্যাহীন দক্ষিণেশ্বরের 'পাগল' ঠাকুর প্রাচীন ভারতভূমির তপোবনের মহর্ষিদের তপস্যালব্ধ মহাসত্যকে জীবন্তরূপে প্রতিষ্ঠিত করলেন, যেমন অবলীলায় তিনি বলতে পেরেছিলেন, মা ভবতারিণী যে প্রাণময়ী, "কথা কয় যে!"  ঠাকুরের সঙ্গে মা ভবতারিণীর "কথাবার্তা" আর তো কেউ শুনতে পেতেন না। এটিই সাধনা। সারা জীবনের নিষ্কাম সাধনায়, অনন্যা ভক্তির অশ্রুজলে, কাম-কামনা-বিবিক্ত পরাচিন্তার ধ্যানে নিমগ্ন থেকে পাষাণ প্রতিমায় তিনি ব্রহ্মময়ীকে প্রাণময়ী জননীরূপে লাভ করেছেন। তাঁর কাছে তখন 'আসল নকল একাকার।' ('নিমাইসন্ন্যাস'পালা দেখে নটী বিনোদিনীকেও ঠাকুর এ-কথা বলেছিলেন।)

মানুষের মধ্যেই স্রষ্টার ও সৃষ্টির সমস্ত গুণ যে বিদ্যমান তা উপলব্ধি করেন 'বিবেকবান ও প্রজ্ঞাবান' যাঁরা ; কিন্তু তাঁদের স্তরের বাইরে যারা আছে, আমাদের মত জৈবিক জীবনের ক্ষু্ৎপিপাসা নিয়েই নিরন্তর সংগ্রামরত, তাদের আত্মোপলব্ধি উপায় কি ? তাদের উপায় তাই করা যা তাদের জীবনধারণের সহায়ক। এবং তাই মানুষ করে। বিশ্বপরিব্যপ্ত মানবসংসারে নিত্যদিনের যে কর্মধারা তা ওই জীবনধারণের জন্যেই। কিন্তু এখানেই একটি সূক্ষ্ম ব্যতিক্রম আছে। বেঁচে থাকার জন্য যে যে কাজ মানুষ করে -- কৃষিকাজ, পশুপালন, আবাস ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী নির্মাণ (ঘরামী, কুম্ভকার, কর্মকারদের কাজ) ছাড়াও এমন অনেক সৃজনশীল কাজ মানুষ করে, যা শুধুমাত্র জৈবিক জীবনের প্রয়োজনে নয়, আত্মিক সত্তার আনন্দ লাভের তাগিদে। এই 'তাগিদ' প্রাণরক্ষার কর্মপ্রবনতার চাইতেও তীব্রতর এবং তাই বা তার জন্যেই প্রকৃতির দেওয়া পৃথিবীটাকে মানুষ নিজের মত করে গড়ে নিয়েছে, গড়ে নিচ্ছে। সঙ্গে সঙ্গে দেহাতিরিক্ত যে মননজগৎ, আবেগময় হৃদয়পুর সেখানেও তার অহেতুক লীলাবিলাস -- অরূপের সাধনা। শিল্প সাহিত্য স্থাপত্য ভাস্কর্যের সৃজনপ্রয়াস। 

এইখানেই মানুষ আর ঈশ্বরের একত্বের ভাব। তবে এই 'একত্ববোধ' সাধনসাপেক্ষ। এই সাধনার পথ যিনি দেখান, জ্ঞানরূপ পাথেয় যিনি দান করেন তিনিই ঈশ্বরের দূত, তিনিই অবতার বা 'ঈশ্বরপ্রমাণ' মানুষ। তিনি সাধারণ মানুষের মধ্যে অজ্ঞান-তিমিরে আচ্ছন্ন চৈতন্যসত্তাটিকে জাগিয়ে তোলেন। কিন্তু তাই কি মানবসমাজে হয়েছে বা হয় ? হয় নি এবং হয় না।
এমন 'পত্রপাঠ' অস্বীকার 'নির্বিচারের' সমার্থক মনে হলেও এই 'অ-স্বীকৃতি' সত্য। কেননা মানুষের অন্তরের ভিতরকার সুপ্ত দেবত্বকে জাগ্রত করবার শিক্ষা থেকে আমরা আলোকবর্ষ দূরে রয়েছি। যে শিক্ষা শুধুমাত্র জৈবিক জীবনধারণের 'উপায়গুলির' সন্ধান দেয়, জীবনাচরণের, জীবনানুসন্ধানের অনুসন্ধিৎসায় প্রাণিত করে না, তেমন শিক্ষাব্যবস্থা রূঢ় বাস্তবতার পক্ষেই সওয়াল করে, দৃশ্যমান জগতের কথা বলে। কিন্তু কঠোর বাস্তবতা নিরপেক্ষ, দৃষ্ট-জগতের অতীত এমন কিছু স্বপ্ন-কল্পনা, আবেগ-অনুভূতি আছে যেগুলি না থাকলে মানুষ ও মনুষ্যেতর প্রাণীর মধ্যে পার্থক্য থাকে না। স্বপ্ন ও কল্পনাই মানুষের সৃজনশীলতার উৎস যা সভ্যতার পথে মানুষকে উত্তরোত্তর ক্রমোত্তরণের সীমান্তপারে পোঁছে দিয়েছে এবং অন্তরের আবেগ ও হৃদয়ের অনুভূতি মানুষের সেই অদৃশ্য চিত্তধর্ম যা মানুষকে বিশ্বমানবতার সঙ্গে যুক্ত করেছে, জৈবিক দেহাতিকা বোধের গন্ডীবদ্ধতা থেকে মুক্ত করেছে। বাস্তবানুগ শিক্ষায় আজ মানুষ জল-স্থল-আকাশ-বিজয়ী, কিন্তু অদৃশ্য চিত্তধর্মের শিক্ষায় আমরা আত্মজয়ী হতে পারিনি। যে আত্মজয়ের দ্বারা মানুষ তার সমস্ত হীনতা, দীনতা, সংকীর্ণতার নাগপাশ ছিন্ন করে বলতে পারবে, 

শৃন্বন্তু বিশ্বে অমৃতস্য পুত্রাঃ।
আ যে দিব্যানি ধামানি তস্থু ।।
পরাহমেকং পুরুষং মহান্তং।
আদিত্যবর্ণং তমস পরস্তাৎ।।

হে বিশ্বের অমৃতের পুত্রগণ, তোমরা শোন ; সমস্ত তমসার (অন্ধকারের) পরপারে আদিত্য বর্ণের যে জ্যোতির্ময় মহান পুরুষ বিরাজমান, তোমরা তাঁরই সন্তান। 
জগৎসংসারের সকল মানুষ 'অমৃতস্য পুত্রাঃ' --- তপোবন-ভারতের ঋষিমুখ-নিঃসৃত এমন শিক্ষার দ্বারা যদি এই বোধ জাগ্রত হয় তবে তো বর্তমান (সভ্যতাকে যিনি সংকটাপন্ন দেখে গিয়েছেন) ভারতের ঋষিকবিকে এমন ভর্ৎসনার বাণী উচ্চারণ করতে হোত না,                           
                                  "ক্ষুব্ধ যারা, লুব্ধ যারা
মাংসগন্ধে মুগ্ধ যারা, একান্ত আত্মার দৃষ্টিহারা,
শ্মশানের প্রান্তচর, আবর্জনা-কুণ্ড তব ঘেরি
বীভৎস চীৎকারে তারা রাত্রিদিন করে ফেরাফেরি,
নির্লজ্জ হিংসায় করে হানাহানি।"

আমাদের 'উপনিষদগুলি' এমন শিক্ষা দান করেন যা মানুষকে পশুত্বের প্রবৃত্তি থেকে মুক্তি দেয়, তার অন্তরের দেবত্বকে জাগ্রত করে। 'মাণ্ডুক্য' উপনিষদ এতদূর পর্যন্ত বলেছেন যে মানুষ তার মনুষত্বের সাধনায় স্বয়ং ঈশ্বরের 'ঐশ্বর্য' লাভ করতে পারে। সে বলতে পারে,
"অয়ম্ আত্মা ব্রহ্ম।" (অপর একটি মহাবাক্য)।
'আমার এই আত্মাই ব্রহ্ম' -- এই কথাটি বলবার জন্য সাধনা চাই। নিজেকে জানা চাই। এই নিজেকে জানা বড়ই দুরূহ।
ছান্দ্যোগ্য উপনিষদও এমন কথা বলছেন। বলেছেন, 

"ওঁ, অথ যদিদম্ অস্মিন ব্রহ্মপুরে যদিদম্ দহরম্ পুণ্ডরিকম্ বেস্ম দহরোহস্মিন্ অন্তরাকাশঃ যৎ অন্তঃ তৎ অন্বেষ্টব্যম্ তৎ বাব বিজিজ্ঞাসিতব্যম্ ইতি।।"
                                            --- খণ্ড ১/১।

ওঁ, এই যে 'ব্রহ্মনগর' (প্রাণময় দেহ), এর অভ্যন্তরে পদ্মের মতো রাজপুরীর মত গৃহ আছে। এই গৃহ হৃদয়। তাঁর ভিতরে এক ক্ষুদ্র আকাশ আছে। সেই আকাশের ভিতরে কি আছে তাঁকে খুঁজতে হবে ; এবং তাঁকেই জানবার চেষ্টা করতে হবে।

আলোচনার প্রারম্ভে 'মুণ্ডক' উপনিষদের ওই যে "দিব্য ব্রহ্মপুরের চিন্তা" পরমব্রহ্মের দৈব করুণায় আমাদের অজ্ঞান-তিমিরান্ধ চিত্তে অকস্মাৎ উদ্ভাসিত হয়েছিল, এতক্ষণে সেই অমর্ত্য চিন্তার কণাতিকণার হৃদয়ঙ্গম হয়েছে বোধ হয় -- আমার এবং সঙ্গে সঙ্গে ঈশ্বরানুরক্তপ্রাণ সুধী পাঠকবৃন্দেরও। 

ওঁ আসতো মা সদ্গময় 

তমসো মা জ্যোতির্গময় 

মৃত্যোর্মা অমৃতংগময়।।

 ওঁ শান্তি শান্তি শান্তি হি।।
_____________________________________                               
দুলাল চন্দ্র বন্দোপাধ্যায়
২০ মে ২০২৫
কলকাতা।



বুধবার, ২২ অক্টোবর, ২০২৫

শ্রীমদ্ভগবদগীতায় অর্জুন-১৫

শ্রীমদ্ভগবদগীতায় অর্জুন- পর্ব ১৫

'অথো পঞ্চদশোধ্যায়' 

এই অধ্যায়ে পরমাত্মন বাসুদেব তার অনাদি অনন্ত রূপের মহিমা বর্ণনা করছেন। তার সৃষ্ট ব্রহ্মাণ্ডের তুলনা করছেন উর্ধমূল অধোশাখা অশ্বথবৃক্ষের সঙ্গে। 

"ঊর্ধ্বমূলমধঃশাখমশ্বত্থং প্রাহুরব্যয়ম্।
ছন্দাংসি যহ্য পর্ণানি যস্তং বেদ সঃ বেদবিৎ।।"

ঊর্ধে মূলরূপে বিরাজ করছেন আদিপুরুষ পরমেশ্বর। তিনিই নিম্নে বহুশাখা-বিশিষ্ট সংসাররূপে বিরাজমান। সেই মহা অশ্বত্থবৃক্ষের পত্রগুলি বেদ, এই কারণেই যে এই সংসাররূপ বৃক্ষকে শোভন নির্মল রাখার জন্য, রক্ষা করবার জন্য মন্ত্র ও কর্মকান্ড বর্ণিত আছে বেদ নামক মহাগ্রন্থের পত্রাবলীত।
এই উর্ধমূল, অধোঃশাখ মহবৃক্ষটির সঙ্গে সৃষ্টিতত্বের, জগতসংসারের তুলনা করেছেন শ্রীকৃষ্ণ। বৃক্ষটির মূল অবিনাশী, অনির্বচনীয় পরমাত্মা। মুখ্য‌ শাখা সৃষ্টির কর্তা ব্রহ্মা। ব্রহ্মা হতে গুণত্রয়যুক্ত দেব মানব দানবাদি যোনিগুলির উৎপত্তি। যেগুলিতে কর্মানুসারে বন্ধন ও পূর্বকৃত কর্মের ফলভোগ করে জীবজগত।

 (এই শ্লোকটিতে দেহাত্মবাদী লোকায়ত তন্ত্রসাধনার ইঙ্গিত দুর্লক্ষ্য নয়)। সংসারবৃক্ষের যে রূপ বর্ণিত হোল, ইন্দ্রিয়ানুভূতিতে যে রূপে এই সংসারকে পাওয়া যায় তত্বজ্ঞান হবার পর, অর্থাৎ বিশ্বসংসারের মূলটিকে জানলে, ওই ঊর্দ্ধজগতের অনন্ত মহাচৈতন্যস্বরূপ উৎসটিকে জানলে, প্রকৃতির ত্রিগুণের মায়ায় আবদ্ধ সংসারবন্ধন হতে মুক্তি লাভ করা যায়‌। এই সংসার নামক বৃক্ষের না আছে আদি, না আছে অন্ত (অনাদ্যন্ত পরমব্রহ্মের ইচ্ছায় কবে যে প্রকৃতি-পাশবদ্ধ এই 'সংসার'-মায়ার‌ বন্ধন ছিন্ন করে বিগত ও বর্তমান পুরুষেরা (মানবপ্রাণ) মুক্তি লাভ করেন। ভাগবৎ প্রাপ্ত পুরুষেদের লক্ষণগুলি সম্মন্ধেও ভগবান বাসুদেব বলেছেন। বলেছেন যে যাঁদের মান ও মোহ বিনষ্ট হয়েছে, যাঁরা আসক্তিকে জয় করেছেন, পরমাত্মার ধ্যানে যাঁদের নিত্য নিরন্তর স্থিতি (অধ্যাত্মনিত্যা), যাঁরা নষ্টকাম এবং দুঃখ-সুখের দ্বন্দ্ব থেকে মুক্ত -- সেইসকল জ্ঞানী পুরুষগণ অবিনাশী পূ্র্ণ সত্ত্বার পদপ্রাপ্ত হন -- "গচ্ছন্তি অমূঢ়া (জ্ঞানবান) পদব্যয়ং তৎ।" 'পদম্ অব্যয়ম'-- পরমেশ্বরের অক্ষয় অব্যয় চির আনন্দের পদ বা পরমাশ্রয়টি কিরূপ ? ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, 

"ন তদ্ভাসয়তে সূর্যো ন শশাঙ্কো ন পাবকঃ।
যৎ গত্বা ন নিবর্তন্তে তদ্ধাম পরং মম।।"

সেই আপনাতে আপনি প্রকাশময় মহাচৈতন্যস্বরূপ ব্রহ্ম সূর্য, চন্দ্ৰ, অগ্নির দ্বারা প্রকাশিত নহেন ; সেই স্বয়ং-জ্যোতিষ্মান ব্রহ্মলোক প্রাপ্ত হন যাঁরা তাঁরা আর দুঃখ- শোকে আচ্ছন্ন সংসারবন্ধনে ফিরে আসেন না।
_________________________________________


                      ব্যাখ্যা

এই স্বর্গীয় পরমধামের (প্রায় একইরূপ, একই প্রকার) অনবদ্য বর্ণনা ভগবান বাসুদেবের শ্রীমুখে ধ্বননিময় হয়েছে আমাদের ছেড়ে আসা অষ্টম অধ্যায়ের ২১ তম শ্লোকে।
অব্যক্তোহক্ষর ইত্যুক্তস্তমাহুঃ পরমাং গতিম্।
যং প্রাপ্য ন নিবর্তন্তে তদ্ধাম পরমং মম।। (৮/২১)
আমাদের বেদসংহিতা ও বেদান্তগলি বার বার ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য দৃশ্যমান ভূতজগতের আদিতে ও অন্তিমে প্রবেশ করে উপলব্দি করবার চেষ্টা করেছেন জগৎ সৃষ্টির রহস্য। মর্ত্যলোক ছাড়িয়ে, সূর্য-চন্দ্র-গ্রহ-নক্ষত্র-নীহারিকারও পারে, দৃষ্টির অগোচরে থাকা মহাবিশ্বের গভীরে প্রবেশ করতে চেয়েছেন। অনন্ত বিশ্বসংসারের অনন্ত বিস্ময়ের জাল ছিন্ন করবার জন্য অনন্ত প্রশ্নও রেখে গিয়েছেন মানবীয় প্রজ্ঞার কাছে। 'জ্যোতির জ্যোতিঃ' - অনুসন্ধানে সাধনার উচ্চতম শৃঙ্গে ধ্যানমগ্ন হয়ে ছিলেন আমাদের মুনিঋষিগণ। পূর্বশ্রুত (১৩/১৭) মহা বাণীতে আমরা উক্ত শব্দগুচ্ছ শুনেছি এবং উপলব্দি করেছি 'তিনি 'তৎ',  তিনিই ব্রহ্ম।'

"জ্যোতিষামপি তজ্জ্যোতিস্তমসঃ পরমুচ্যতে।"
এই 'তৎ', এই ব্রহ্মই জ্যোতি সমুহেরও জ্যোতি। 

ঋগ্ বেদের 'ঋক-ষটক', ছয়টি মহামন্ত্র অনুবাদ করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। ষষ্ট মন্ত্রটিতে আজ থেকে পাঁচ (মতান্তরে দশও হতে পারে) হাজার বছর আগে মন্ত্রদ্রষ্টা ঋষিগণের কণ্ঠে উচ্চারিত হয়েছিল এই মহাবাক্য

"যৎ ক্রন্দসী অবসা তস্তভানে অভ্যৈক্ষেতাং মনসা রেজমানে।‌
যত্রাধি সূর উদিতো বিভাতি কস্মৈ দেবায় হবিষা বিধেম।।"

"মহাশক্তি-প্রতিষ্ঠিত দীপ্যমান দ্যুলোক ভূলোক।
যারে করে নিরীক্ষণ ; সূর্য যাঁহে লভিছে প্রকাশ ;
               আর কোন্ দেবতারে দিব মোরা হবি ?"

"সূর্য যাঁহে লভিছে প্রকাশ" -- এই বাক্যাংশের ব্যঞ্জনায় মন্ত্রদ্রষ্টা ঋষিগণ পেয়ে গিয়েছিলেন স্বপ্রকাশ পরম চৈতন্যরূপী ব্রহ্মের ভাবনা এবং 'জ্যোতির জ্যোতি' ব্রহ্মের ধ্যানে তাঁরা‌ অনুভব করেছিলেন সেই পরম জ্যোতির কণা ভূতজগত এবং জীবাত্মাও। তাই তাঁরা সর্বভূতে ব্রহ্মের দর্শন লাভ করে, আপনাকে পরাজ্যোতিঃ স্রষ্টার সঙ্গে  'এক' হয়ে গিয়ে বলতে পেরেছিলেন, 'অহম ব্রহ্মাস্মি'।
____________________________________

'সুখ-দুঃখ-মোহ- শোকে'র ঊর্ধে এই দেহস্থিত জীবাত্মা আমারই অংশ। "মামৈবংশ জীবলোকে জীবভূত সনাতন।" পরমাত্মা যেমন অবিনাশী, তেমনই জীবের আত্মারও বিনাশ হয় না। বায়ু যেমন গন্ধের স্থান থেকে গন্ধকে গ্রহন করে অন্যস্থানে নিয়ে যায়, তেমনি দেহের বিনাশ হলে সেই দেহের অভ্যন্তরে থাকা মন সহ ইন্দ্রিয়গুলির কামনা-বাসনারূপ অদৃশ্য 'আর্তি'কে পরবর্তী দেহে (ঐ আত্মা যে দেহে আশ্রয় লাভ করবে) নিয়ে যায় -- "সংযাতি বায়ুর্গন্ধানিবাশয়াৎ"।
দেখ পার্থ, জীবের যে আত্মা, যাকে আমি আমারই অংশ বলেছি, সেই আত্মাই দেহস্থিত ইন্দ্রিয়গুলির মাধ্যমে, মনকে আশ্রয় করে বিষয়সমূহ (জাগতিক ভোগের সামগ্রী) নির্বিকারভাবে সেবন করে -- "বিষয়ান্ উপসেবতে"। কিন্তু এই সকল অবস্থাতে অচঞ্চলভাবে স্থিত আত্মাকে অজ্ঞানীরা জানতে পারে না। "বিমূঢ়া নানুপশ্যন্তি পশ্যন্তি জ্ঞানচক্ষুষা"। যোগীগণ নিত্য সাধনপথে থেকে আপন-হৃদয়ে-অবস্থিত আত্মাকে অনুভব করেন। অন্তঃকরণ শুদ্ধ,পবিত্র না হলে ( লোভ-মোহ- কাম-ক্রোধ-মুক্ত না হলে) 'আপনার মাঝে আপন যে জন' তাঁকে জানা যায় না।

শ্রীকৃষ্ণ আবারও বলছেন, শোন অর্জুন, যে 'জ্যোতির জ্যোতি'-বিষয়ে তোমাকে বললাম, যে জ্যোতির তেজরশ্মিতে এই জগৎ ভাসমান, সূর্যে নক্ষত্রে স্থিত থেকে যে তেজশক্তি অখিল জগৎকে প্রকাশিত করছে, যে তেজশক্তি চন্দ্রমায় স্থিত আছে, অগ্নিতে স্থিত আছে তা আমারই তেজশক্তি বলে জানবে।  ওই অক্ষয় তেজশক্তি নিয়ে আমি এই জীবাত্মার আলয়ে (পৃথিবীতে) আসি, (ভূতদের) জীবজগতকে ধারণ করি, রসস্বরূপ বা অমৃতময় 'চন্দ্ৰ' হয়ে বৃক্ষ, লতা, ঔষধী, বনস্পতিদের পোষণ করি। অগ্নিরূপে (বৈশ্বানরো ভূত্বা) জীবশরীরে ভুক্ত অন্ন (সমস্ত খাদ্য) পরিপাক করে থাকি। আমিই সকল প্রাণীর হৃদয়ে অন্তর্যামীরূপে বিরাজ করি, আমার প্রণোদনায় স্মৃতি, জ্ঞান মানুষদের বোধ‌ ও অনুভবের মধ্যে আসে, আবার বুদ্ধির মধ্যে সংশয়, বিপর্যয় প্রভৃতি দোষগুলির বিচারের দ্বারা পরিশুদ্ধ হয়, ''অপোহনম ভবতি''। সমস্ত বেদের দ্বারা যা বেদ্য (জানবার যোগ্য) ও বেদবেত্তা আমিই। আবার সমস্ত বেদান্তের কর্তাও আমি। সমগ্ৰ ভূতজগৎকে 'পৃথিবী' হয়ে আমিই ধারণ করি, 'চন্দ্ৰ' হয়ে আমিই  পোষণ করি। (বৈদান্তিক দর্শনে চন্দ্ৰ বা 'চন্দ্ৰলোক' পরমব্রহ্ম বা স্রষ্টার অমৃতধারা বর্ষণ করে ; যার দ্বারা জীবজগত প্রাণবান ও রসসিক্ত হয়। পরবর্তী সময়ে আলোচিত হবে)।

দেখ সখা, এই সংসারে সমস্ত ভূতজগতে, (এখানে মানুষদেরকেই প্রাধান্য দিয়ে বলা হয়েছে) দৈহিক, ত্রিগুণসমন্বিত অস্তিত্ব নাশবান বা 'ক্ষরঃ' ; কিন্তু প্রাণীদের অন্তরে গুহ্য যে জীবাত্মা তা অবিনাশী বা 'অক্ষরঃ'। (৭/৪--৫, এবং ১৩/১ শ্লোকেও এই তত্বের বিষয়েই বলা হয়েছে)। এই প্রকার দুটি প্রাকৃত পুরুষ হতে ভিন্ন হলেন পরমেশ্বর পরমাত্মা যিনি জগৎকে ধারণ করেন, জীবাত্মাকে পোষণ করেন। এই যে পুরুষ (শ্রীকৃষ্ণ বলছেন 'আমি') তিনি নাশবান জড়জগতের অতীত এবং মায়াবিষ্ট জীবাত্মা হতে উত্তম। "যস্মাৎ ক্ষরম্ অতীত...... অতঃ অস্মি লোকে চ বেদে চ প্রথিতঃ পুরষোত্তম"।
আর তুমি জেনে রেখো, হে অর্জুন, এমনই পুরুষোত্তমরূপে আমাকে যিনি জানেন তিনি, সেই জ্ঞানী ভক্ত সর্বজ্ঞ পুরুষ এবং তিনি পরমেশ্বররূপে আমারই ভজনা করেন।
"যো মামেবমসংমূঢ়ো জানাতি পুরুষোত্তমম্।
স সর্ববিৎ ভবতি মাম সর্বভাবেন ভারত।।" 
________________________________

                        ব্যাখ্যা
বিনাশশীল জড়জগৎবিবিক্ত, ত্রিগুণাতীত, 'স্রষ্টা' কিন্তু আপন সৃষ্টির প্রতি নিরাসক্ত, জীব ও জড়জগতের পালক ও পোষক, অনন্ত, অনাদি মহাচৈতন্যস্বরূপ এই 'অক্ষর' পুরুষ অবতারশ্রেষ্ঠ দেবকীনন্দন শ্রীকৃষ্ণ সারথীরূপে এখন অর্জুনের সম্মুখে অবতীর্ণ এবং তিনি   'পুরুষোত্তমযোগ'-য়ের সাধনফল সম্মন্ধে যে বাণী পরিশেষে উচ্চারণ করলেন তাইই পঞ্চদশ অধ্যায়ের সারসংক্ষেপ। তিনি বলেছেন, 

"ইতি গুহ্যতমম শাস্ত্রমিদমুক্তম ময়ানঘ।
এতদ্বুদ্ধ্বা বুদ্ধিমান্ স্যাৎ কৃতকৃত্যশ্চ ভারত।।"

তাঁকে পরমেশ্বর, পরমপুরুষ (তত্ত্বতঃ) জেনে ভক্ত যদি তাঁর সাধনায় আত্মসমর্পণ করেন তবেই ভক্ত কৃতকৃতার্থ, তাঁর জীবন ধন্য। "তত্ত্বতঃ" শব্দটি গভীর তাৎপর্য বহন করে। 'ভাগবত পুরাণ' বলছেন,
"সমস্ত তত্ত্ববিদগণ তাকেই 'তত্ত্বঃ' বলে থাকেন, যা অদ্বিতীয়, যা একক জ্ঞান। এই অদ্বয় জ্ঞানের স্বরূপকে ব্রহ্ম, পরমাত্মা বলা হয়ে থাকে। জগতের সমস্ত শ্রদ্ধাশীল মুনিগণ বেদ সমুহের শেষভাগ, যা বেদান্ত নামে পরিচিত তাঁরা তা শ্রবণের দ্বারা পরম আনন্দরূপ জ্ঞান প্রাপ্ত হন। সেই পরমব্রহ্মরূপ, আনন্দরূপ জ্ঞান লাভ করে মুনিগণ ও ঋষিগণ বৈরাগ্যযুক্ত প্রেম দ্বারা, অব্যভিচারিণী ভক্তির দ্বারা তাঁদের পবিত্র ও বিশুদ্ধ হৃদয়ে পরম শুদ্ধ পরমাত্মাকে প্রত্যক্ষ করেন।"
                   --- ভাগবত পুরাণ, ২য় অধ্যায়। 

'পুরুষোত্তম' যোগে যে 'পরম পুরুষের' কথা বলা হয়েছে, তিনি কে, তাঁর ধারণা কেমন করে হবে ? এই প্রশ্নটি অত্যন্ত গূঢ়, 'উত্তর'ও মৌন হয়ে থাকে। আকারহীন, বিকারহীন, গুণাতীত, অচিন্ত্য, 'অবাঙমনোসগোচর' সেই জগদ্ধারক, জগৎ-পালক, বিশ্বব্যপ্ত পরমব্রহ্মরূপ মহাচৈতন্যকে ধারণা করাই বা যাবে কেমন করে ? ধ্যানের মাধ্যমে জ্ঞানের পথে তাঁর উপলব্ধি যার হবে তিনিও (সেই যোগী) তো "অহম ব্রহমাস্মি" হয়ে যাবেন। সমুদ্রের বিকার যে ঢেও, সে স্তিমিত হলে নিবাত নিস্তরঙ্গ অনন্ত গভীরে লীন হয়ে যায়।
এই অনির্বচনীয় পুরুষসত্ত্বার কথা বলেছেন কঠোপনিষদ, 

"মহতঃ পরম্ অব্যক্তম্ অব্যক্তাৎ পুরুষঃ পর।
পুরুষাৎ ন পরং কিঞ্চিৎ সা কাষ্ঠা সা পরা গতিঃ।।"  'কঠ' ১/৩/১১। 

অব্যক্ত (সৃষ্টির আদি ও অন্ত যা অব্যক্ত) সত্ত্বা মহান আত্মা অপেক্ষা উচ্চতর ; 'পুরুষ' অব্যক্ত সত্ত্বা অপেক্ষাও উচ্চতর। 'পুরুষ' অপেক্ষা উচ্চতর কিছু নাই। এখানেই সকল গতির পরিসমাপ্তি, ইহাই শেষ গন্তব্য।

সুধী পাঠককুলের স্মরণে আছে দ্বিতীয় অধ্যায়ের (সাংখ্যযোগ) সেই অমোঘ শ্রীকৃষ্ণবাণীঃ 

"অব্যক্তাদীনি ভূতানি ব্যক্তমধ্যানি ভারত।
অব্যক্তনিধনান্যেব তত্র কা পরিদেবনা।।"
                                          --শ্রীগীতা- ২/২৮

'অব্যক্ত' থেকে ভূতজগতের সৃষ্টি, কিছুসময়ের স্থিতি ; আবার অব্যক্তেই নিধন। তাই 'ব্যক্ত' অবস্থাটির অবশ্যম্ভাবী নিধনের জন্য কিসের শোক, কেনই বা বিলাপ। এখানেও সেই অব্যক্ত থেকে ক্ষয়-লয়, জন্ম-মৃত্যুর নিয়ত ঘূর্ণায়মান চক্রে আবর্তিত অশাশ্বত জগৎপ্রকৃতির সৃষ্টি হোল কেন ? এটি সীমার মধ্যে আবদ্ধ মানব-জ্ঞানের 'অতিপ্রশ্ন'। কেন না এই সৃষ্টি তাঁর আপন আনন্দের বিলাসকুঞ্জ। আর তিনি নিরাকার, রসস্বরূপ, নির্বিকল্প আনন্দস্বরূপ। একমাত্র তাঁকে লাভ করা, সেই ভূমানন্দে আশ্রয় লাভ করাই জীবাত্মার সাধনা। সেই সাধনাই নানা পথে, নানা মতে মানুষ করে চলেছে। তাঁর সঙ্গে জীবাত্মার মিলন হলে তো আর প্রশ্ন থাকে না। তিনি যে সুধারসসসিন্ধু।

"রসো বৈ সঃ।
রসং হ্যেবায়ঃ লব্ধানন্দী ভবতি।।
কো হ্যেবান্যাৎ কঃ প্রাণাৎ।
যদেষ আকাশ আনন্দো না স্যাৎ।।"
                ‌--- তৈত্তিরীয় উপনিষদ ২/৭ ।
                     (ক্রমশঃ)
পরবর্তী ষোড়শ পর্ব (ষোড়শ অধ্যায়) অচিরেই প্রকাশিত হবে।
ওঁ শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তিঃ হি।

দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
২২ অক্টোবর, ২০২৫
ব্যাঙ্গালোর।
___________________________________

শুক্রবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২৫

শ্রীমদ্ভগবত গীতায় অর্জুন-পর্ব-১৪

শ্রীমদ্ভগবত গীতায় অর্জুন-পর্ব ১৪

শ্রীমদ্ভগবত গীতায় অর্জুন-পর্ব ১৩ (ত্রয়োদশ অধ্যায়), আলোচনায় ভগবান বাসুদেবের উপদেশবাণীর মধ্যে পেয়েছি 'ক্ষেত্রক্ষেত্রজ্ঞ' তত্ত্বের মহাজ্ঞান। যেখানে তিনি তার সৃষ্ট ভূবনমণ্ডলের দ্বৈত সত্ত্বার রূপ দেখিয়েছেন। গভীর, দুর্বোধ্য, দুর্জ্ঞেয় এই তত্ত্ব অতি সাধারণ বুদ্ধিতে যদি বুঝতে চাই এবং প্রকাশ করতে চাই তবে এইটুকু বলা যেতে পারে যে এই বিশ্বসংসার দুটি রূপে আমাদের কাছে প্রতিভাত হয়। একটি জড়জগৎ, অন্যটি চেতনজগৎ। জড়জগৎ প্রকৃতি। প্রকৃতি নিত্য বিকারগ্রস্ত, পরিবর্তনশীল, জন্ম-জরা-ক্ষয় ও লয়ের অধীন। তবু সেটিই ক্ষেত্র। ক্ষেত্র কর্ষিত হয়, ক্ষেত্রে 'বীজ' উপ্ত হয় এবং নূতন প্রাণ সঞ্চারিত ও সৃষ্ট  হয়, (ভূমি হতে শস্য, মাতৃগর্ভ হতে প্রাণী)। এইসব সঞ্চার, এসকল সৃষ্টির স্থিতি আছে, ক্ষয় আছে এবং কালশেষে পরিণাম বা লয় আছে। এই যে জড়জগতের চলমানতা তার উৎস কোথায় ? শক্তি কি ? জড়জগতে এই যে কার্যগুলি হয়ে চলেছে তার কারণই বা কি ?
এইসকল গূঢ় ও জটীল প্রশ্নের উত্তর দিয়ে গিয়েছেন আমাদের প্রাচীন ভারতের ঋষিগণ। তাঁরা বলেছেন, বিশ্বসৃষ্টির উৎস চৈতন্য, সৃষ্টির শাশ্বত চলমানতার শক্তি পূর্ণচৈতন্য ব্রহ্ম এবং কার্য্য ও কারণের হেতু কাল। আর এই সৃষ্টি, সৃষ্টির শাশ্বত চলমানতা ('সংসার'য়ের অর্থ হোল যা সঞ্চরমান বা গতিশীল), সৃষ্টি-র হেতু এক এবং অদ্বিতীয় অনাদি, অনন্ত, মহাচৈতন্যস্বরূপ পরমব্রহ্ম। তাঁর আকার নেই, তাই বিকার নেই। তিনি জ্ঞেয় নন, তিনি ধ্যেয়। তিনি অব্যক্ত, অচিন্ত্য। তিনি একাধারে তাঁর সৃষ্টির সঙ্গে সম্পৃক্ত এবং সৃষ্টিবিবিক্ত। তিনি জগতসংসারের সুখ-দুঃখ-শোক, জীবন-মরণের পারে আনন্দময় চিৎসত্ত্বা। আমাদের সকল প্রয়াসের গতি তাঁরই দিকে নিরন্তর ধাবিত -- জ্ঞানত বা অজ্ঞানত। ভূত জগতের সকল ক্ষণস্থায়ী 'চিৎকণা' (জীবাত্মা) জন্মমৃত্যুর চক্রে আবর্তিত হতে হতে, তাকেঁ স্মরণে রেখে, তার সঙ্গেই মিলিত হতে চায়। যাঁরা  এই সাধনপথে আছেন তাঁরাই তাকে, সেই পরমানন্দময় উৎসকে লাভ করেন। অশেষ প্রকারের সাধন পথের মধ্যে ভক্তিপথই একমাত্র পথ যে পথের লক্ষ্য পরমাত্মার সাথে জীবাত্মার মহামিলন।

"ধায় যেন মোর সকল ভালোবাসা
প্রভু, তোমার পানে, তোমার পানে, তোমার পানে।
যায় যেন মোর সকল গভীর আশা
প্রভু, তোমার কানে তোমার কানে তোমার কানে।।" 
                                          ----- রবীন্দ্রনাথ

অপরদিকে যিনি, যে ভক্ত 'অব্যভিচারিণী' ভক্তির মধ্যে দিয়ে তাঁর এই আনন্দময় উৎসের অভিমুখে যাত্রা করবেন, অপার করুণায় সচ্চিদানন্দঘন পরমেশ্বরও এগিয়ে আসবেন তাঁর কাছে। ভক্তবল্লভ তো চান তাঁর সৃষ্টির সঙ্গে মিলিত হতে, একাকার হয়ে যেতে। অনন্তের দূত ডাক দিয়ে যান ভক্তকে, ভক্তের হৃদয়ে ঈশ্বরের চরণধ্বনি ধ্বনিত হয়, 

''কতকালের সকাল সাঁঝে  তোমার চরণধ্বনি বাজে
গোপনে দূত হৃদয় মাঝে গেছে আমায় ডেকে।।
আমার মিলন লাগি তুমি আসছে কবে থেকে।।"
                                                         --- ঐ


এরপর মিলন। 'তুমি' (পরমাত্মা) 'আমি' (জীবাত্মা) একাকার।
চতুর্দশ পর্ব (চতুর্দশ অধ্যায়, 'গুণত্রয়বিভাগযোগো')  আলোচনা প্রারম্ভেই এতখানি ভূমিকার প্রয়োজন হোল এই কারণেই যে এই অধ্যায়ে ভগবান বাসুদেব জ্ঞানমার্গের শেষ সীমা অতিক্রম করে তার ভক্তকে বুঝাতে চাইছেন জীবাত্মা পরমাত্মারই অংশ। এই 'অংশ'বিশেষ কি ভাবে 'পূর্ণ'কে প্রাপ্ত হবে ?
শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, হে অর্জুন, এবার আমি সমস্ত জ্ঞানের সার যার দ্বারা মহাবিদ্বান জ্ঞানসাধকগণ (মুনয়ঃ) পরম সিদ্ধি লাভ করে শোক-দুঃখ-সমাচ্ছন্ন সংসারবন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে যান, সেই উত্তম জ্ঞানের (জ্ঞানানাং জ্ঞানুত্তমম্) কথাই বলছি। এই জ্ঞান প্রাপ্ত হলে, সাধক আমার স্বরূপ হৃদয়ঙ্গম করেন। তাঁরা তখন পুনর্জন্মরহিত হন (আদিতে  জন্মলাভ করেন না) এবং প্রলয়কালে বা অন্তিমে ব্যাকুলতা প্রদর্শনও করেন না, জন্মমৃত্যুর শৃঙ্খল থেকে মুক্ত হয়ে যান। দেখ পার্থ,

"মমযোনির্মহদ্ব্ব্রহ্ম তস্মিন গর্ভং দধাম্মহম্।
সম্ভবঃ সর্বভূতানাং মতো ভবতি ভারত।।"

আমার যে 'ব্রহ্মরূপ'য়ের প্রকৃতিরূপ অভিব্যক্তি (ত্রিগুণময়ী মায়া) তাইই 'যোনির্মহদ্ব্রহ্ম'-- যোনিরূপ মহৎ ব্রহ্ম, সৃষ্টির গর্ভাধানের স্থান, যেখানে চেতনরূপ বীজ সংস্থাপিত করি। এইভাবে  জড় ও চেতনের সংযোগে ভূতগণের (জীব জগতের) উৎপত্তি সম্ভাবিত হয়েছে।।
____________________________________________
         ‌‌‌                ব্যাখ্যা

শ্রীগীতার এই বাণীর (১৪/৩) তাৎপর্য্য নিগূঢ় ও দ্বান্দ্বিক। ব্রহ্ম এবং তাঁর অভিব্যক্তি ভিন্ন ভিন্ন। 'প্রকৃতি' এখানে 'মহাযোনি' অর্থাৎ 'গর্ভধারণকারিণী', (১৪/৪ শ্লোকে শ্রীকৃষ্ণ সে কথা বলবেনও) নারী। আর ব্রহ্ম স্বয়ং 'বীজস্থাপনকারী' পুরুষ। এখানে ব্রহ্মের দ্বৈত সত্ত্বা প্রকটিত যা, (পাঠকগণের স্মরণ করুন, প্রাথমিক কয়েকটি অধ্যায়ে ব্যাখ্যা করা হয়েছে) সাংখ্য দর্শনের 'প্রকৃতি পুরুষ' তত্ত্বের দ্বারা প্রতিপাদিত। সাংখ্য-কারিকার ভাষ্যে বলা হয়েছে,
"যথা স্ত্রীপুরুষসংযোগাৎ সুতোৎপত্তিস্তথা প্রধান-পুরুষ- সংযোগাৎ সর্গস্যোৎপত্তি।।
....... প্রকৃতি বলতে সাংখ্যে শুধুমাত্র primordial matter-ই বোঝায় না, female principle-ও বোঝায়। এদিক থেকে সাংখ্যদর্শন শুধুমাত্র জড়বাদ বা বস্তুবাদ নয়।, নারীপ্রধান্যমূলক চিন্তার ও পরিচায়ক।" 

                                                          'লোকায়ত দর্শন'-- দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়

জড়বাদী লোকায়ত দর্শনের নারী-পুরুষ-তত্বের  প্রতিধ্বনি শ্রীকৃষ্ণের কথায় স্পষ্টিকৃত। 'ব্রহ্মযোনি' হলেন 'প্রকৃতি' (বস্তুবাদে নারীর প্রতিকল্প), স্বয়ং ব্রহ্ম হলেন বীজপ্রদ 'পুরুষ'। এখানেই, এই কারণেই ভারতীয় দর্শনে 'দ্বৈতবাদ'ও প্রতিষ্ঠা পেয়েছে।  অপরদিকে 'অদ্বৈতবাদী'বেদান্ত দর্শন ঘোষণা করছে,
''যতো বা ইমানি ভূতানি জায়ন্তে। যেন জাতানি জীবন্তি। যৎ প্রয়ন্ত্যভিসংবিশন্তি তৎ বিজিজ্ঞাসস্ব। তৎ ব্রহ্মেতি।।"

সমস্ত ভূতজগত, পদার্থ উৎপন্ন হয়েছে যাঁর থেকে, যাঁর  আশ্রয়ে তারা আছে ও বেঁচে আছে এবং বিনাশকালে তারা যার মধ্যে বিলীন হয় তিনিই ব্রহ্ম। তাঁকেই জানতে ইচ্ছা কর।
    তৈত্তিরীয় উপনিষদ, (পুত্রশিষ্য ভৃগুর প্রতি আচার্যপিতা বরুণ)।

সুধী পাঠক লক্ষ্য করে থাকবেন, শুধু 'সর্বোপনিষদ'-য়ের নয়, দ্বৈতবাদ, অদ্বৈতবাদ, সাংখ্য, পূর্বমীমাংসার সমস্তরকমের 'দ্বন্দ্বমূলক' তত্ত্বের সন্নিবেশ ঘটেছে শ্রীমদ্ভগবত গীতায়। এবং শেষে 'ভক্ত ও ভগবান' এই দুই অভেদাত্মার মিলনে বৈষ্ণবীয় 'অচিন্ত্যভেদাভেদ' তত্ত্বের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে।
___________________________________________


শ্রীগীতার এই চতুর্দশ অধ্যায়ে বেদান্তের ঐ 'একোমেবাদ্বিতীয়ম্' ব্রহ্ম, অব্যক্ত চৈতন্য যাঁর থেকে সৃষ্টির জন্ম এবং যাঁর মধ্যে সৃষ্টির বিলয় -- তত্ত্বটির অভ্যন্তরেই প্রশ্ন উত্থিত হয়েছে। প্রকৃতি ও 'পুরুষ' (ব্রহ্ম) কি তবে ভিন্ন ভিন্ন সত্ত্বা ? সত্ত্ব, রজঃ, তমঃ-- এই ত্রিগুণাত্মিকা প্রকৃতি কি নির্গুণ, সাক্ষীচৈতন্যের বীজ ধারণ করে ? প্রশ্নগুলি স্পষ্ট হয়েছে নিম্নোক্ত ১৪/৫ শ্লোকটিতে,

"সত্ত্বাম্ রজস্তম ইতি গুণাঃ প্রকৃতিসম্ভবাঃ।
নিবধ্নতি মহাবাহো দেহে দেহিনম্ অব্যয়ম্।।"

হে অর্জুন, প্রকৃতিজাত গুণত্রয় অবিনাশী পরমাত্মারূপ চৈতন্যসত্ত্বাকে দেহীর শরীরে বন্ধন করে এবং তাই জীবাত্মা।
(এই শ্লোকটিই জীবাত্মার সঙ্গে পরমাত্মার বিরহ-মিলনের চিরন্তননিরন্তর লীলাবিলাস (মাথুররাস)-সম্ভূত মধুর রসের সঞ্চার করেছে ; মহান ভাগবৎ পুরাণ যার আধার।)

প্রকৃতির এই তিনটি গুণ জীবাত্মা পায় বলেই সত্ত্বগুণের প্রভাবে সুখে আসক্ত হয়, রজোগুণের প্রভাবে কর্মে আসক্ত হয়, তমোগুণের আকর্ষণে জ্ঞানালোক রহিত প্রমাদ ও ভ্রান্তির অন্ধকারে আচ্ছন্ন হয়। রজোগুণ ও তমোগুণকে যদি সংহত করা যায়‌ তবে সত্ত্বগুণ বর্ধিত হয়, রজোগুণ যদি সত্ত্বগুণকে আচ্ছন্ন করে তবে তমোগুণের বৃদ্ধি হয়, আবার তমোগুণ সত্ত্বগুণকে অভিভূত করলে রজোগুণ প্রবল হয়ে ওঠে। যদি প্রকৃতি-সঞ্জাত দেহীর অন্তঃকরণে এবং ইন্দ্রিয়গুলিতে চৈতন্য ও জ্ঞান সঞ্চারিত হয়ে তবে বুঝতে হবে সেই দেহীর (জীবাত্মার) সত্ত্বগুণ বর্ধিত হয়েছে। (স্মর্তব্য --ভগবান শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব 'কল্পতরু' রূপ ধারণ করে শিষ্যদের বলেছিলেন, "চৈতন্য হোক্")।
শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, হে ভরতর্ষভ, রজোগুণ লোভ ও প্রবৃত্তি-বর্ধক, কর্মে স্বার্থপরতার কামনা সৃষ্টি করে, বিষয়ভোগের লালসার জন্ম দেয় এবং লালসার অপূর্ণতাহেতু মনের চঞ্চলতা ও অশান্তির দ্বারা জীব নিগ্রহ ভোগ করে। এই ভাবে শ্রীকৃষ্ণ বলে গেলেন সত্ত্বগুণান্বিত জীব মৃত্যুর পর নির্মল স্বর্গ লাভ করেন, রজোগুণসমন্বিত জীবাত্মা মৃত্যুর পর 'কর্মসঙ্গিষু' বা কর্মবীর মানুষদের মধ্যে পুনর্জন্ম লাভ করে, তমোগুণে আচ্ছন্ন মানুষ অধঃপতিত জীবযোনি প্রাপ্ত হয় -- 'মূঢ়যোনিষু জায়তে'। তিনি পর পর শ্লোকে সাত্ত্বিক, রাজসিক এবং তামসিক প্রবনতাসমূহের সুষ্পষ্ট পরিণতির কথাও বলেছেন। ১৪/১৮ শ্লোকে বলছেন, 

ঊর্দ্ধ্বং গচ্ছন্তি সত্ত্বস্থা মধ্যে তিষ্ঠন্তি রাজসাঃ।
জঘন্যগুণবৃত্তিস্থা অধো গচ্ছন্তি তামসাঃ।।

সত্ত্বগুণে স্থিত থাকেন যারা‌ তাঁরা স্বর্গ বা উচ্চলোক প্রাপ্ত হন, রজোগুণে স্থিত মানুষ 'মধ্য' বা মানবলোকে বার বার গমনাগমন করেন, তমোগুণসম্পন্ন মানুষ অধঃলোক প্রাপ্ত হন -- পশু বা কীটযোনি সম্ভূত হয়ে নরকের জীবন যাপন করেন।
কিন্তু এই তিনটি গুণের দ্বারা কর্তা, অর্থাৎ পরমাত্মা-অনুসন্ধানী পুরুষ (সাধক) প্রভাবিত হন না। মায়া থেকে জাত গুণত্রয় দেহের ইন্দ্রিয়গুলির সঙ্গে সম্পর্কিত। অন্তরস্থিত 'চেতন' দেহজ বা দেহস্থিত ইন্দ্রিয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত গুণগুলির দ্রষ্টা মাত্র। এই চেতন আবার শুধুমাত্র একটি ব্যক্তির নয়, সমষ্টির চেতনসত্ত্বার সঙ্গে তিনি অবিভাজ্য। তিনি ব্যপ্ত এবং ব্যক্তির ও সমষ্টির কর্মপ্রবনতার সাক্ষীস্বরূপ। জ্ঞানী পুরুষ (সাধক) প্রকৃতির মায়াসঞ্জাত ত্রিগুণের দ্বারা আক্রান্ত স্থূলশরীরের মোহ পরিত্যাগ করে জন্ম-জরা-মৃত্যু অতিক্রমণ করে পরমানন্দময় পরমাত্মাকে প্রাপ্ত হন।
(প্রকৃতিসঞ্জাত গুণত্রয়কে স্থূলশরীরের উৎপত্তির কারণ বলা হয়ে থাকে। মানবের স্থূলশরীর পঞ্চ জ্ঞানেন্দ্রিয়, পঞ্চ কর্মেন্দ্রিয়,  পঞ্চভূত, মন-বুদ্ধি-অহংকার -- এই প্রকার ২৩ তত্ত্বের পিণ্ডরূপ)।

এতক্ষণ পর, চতুর্দশ অধ্যায়ের ২০-তম শ্লোকের পরে আবার অর্জুনের একটি প্রশ্ন। পুরুষ, প্রকৃতি, প্রকৃতিজাত গুণত্রয় (সত্ত্ব রজঃ তমঃ) এবং এই সকল গুণের দেহীদের উপর প্রভাব, সেই প্রভাব থেকে মুক্ত হয়ে গুণাতীত, চিদানন্দময় পরমাত্মার সঙ্গে মিলনের যে পন্থা ভগবান বাসুদেব বলে গেলেন তা অতীব জটীল ; দুরূহ এবং দুর্বোধ্যও বটে। স্বাভাবিক ভাবেই মর্ত্যমানবের প্রতিনিধি অর্জুনও ঈশ্বরসন্নিধানে বিমূঢ় ও বিহ্বল। সখা শ্রীকৃষ্ণের রহস্যাবৃত বাক্য শ্রবণ করে রথী পার্থ প্রশ্ন করছেন,
কৈঃ লিঙ্গৈঃ ত্রীন্ গুণানেতান অতীতো ভবতি প্রভো।
কিমাচারঃ কথম্এতাংস্ত্রীন্ গুণানবিবর্ততে।।

হে সখা, এই যে তিনটি গুণের সম্মন্ধে আপনি দীর্ঘ আলোচনা করলেন, এবার আমাকে বলুন এই সত্ত্ব রজঃ ও তমঃ গুণের প্রভাবশূন্য (ত্রিগুণাতীত) পুরুষের‌ লক্ষণ কি ? আচারই বা তাঁর  কেমন ? প্রকৃতির মায়াসঞ্জাত এই ত্রিগুণের প্রভাব ছিন্ন করবার উপায়ই বা কি ?
___________________________________________________

                        ব্যাখ্যা

এ তো চিরন্তন মানবাত্মার প্রশ্ন। 'ব্রহ্মযোনি'-তে ভ্রূণরূপে দীর্ঘকাল অবস্থান করে, তারপর জীবযোনি প্রাপ্ত হয়ে, মর্ত্য পৃথিবীর সমস্ত 'গুণ' আন্তর-সংস্কারে (inner instinct) বহন করে, প্রকৃতির মধ্যেই জন্মলাভ করে, প্রকৃতির মধ্যেই লালিত হয়ে প্রকৃতির গুণত্রয় হতে মুক্ত হওয়া কি করে সম্ভব ? প্রাচীন সাংখ্য মতে 'প্রকৃতি ও পুরুষ' দুইটি ভিন্ন সত্ত্বা বলা হয়েছে ঠিকই ; কিন্তু তা নিরীশ্বরবাদী চিন্তায়, বাস্তবের 'নারী ও পুরুষ' ধারণাকে বিচারের মূলে স্থাপিত করে। পরবর্তী কালে 'চরক সংহিতায়' সাংখ্যদর্শনের প্রতিধ্বনি পাওয়া যায়। চরকের মতে, " প্রকৃতিরই অব্যক্ত অংশটির নাম পুরুষ। প্রকৃতির যা বিকার (ওই ত্রিগুণ) বা পরিণামের দিক তার নাম ক্ষেত্র এবং যেটা অব্যক্ত দিক তার নাম ক্ষেত্রজ্ঞ :
"অব্যক্তমস্য ক্ষেত্রস্য ক্ষেত্রজ্ঞমৃষয়ো বিদুঃ।।"
অব্যক্ত ও চেতন একই। এই চেতন বা অব্যক্ত প্রকৃতি থেকে বুদ্ধি, বুদ্ধি থেকে অহংকার, অহংকার থেকে পঞ্চভূত এবং পঞ্চেন্দ্রিয়ের উৎপত্তি ; আর সেই  উৎপত্তিকেই আমরা 'সৃষ্টি' আখ্যা দিয়ে  থাকি।"
    ----- 'লোকায়ত দর্শন' -- দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়

শ্রীমদ্ভগবত গীতায় শ্রীকৃষ্ণ বেদ, বেদপরবর্তী ব্রাহ্মণ, উপনিষদ, যোগবাশিষ্ঠ, পুরাণ এবং সমসাময়িক কালের জড়বাদী, নিরীশ্বরবাদী, অদ্বৈতবাদী, দ্বৈতবাদী-- সমস্ত আধ্যাত্নিক দর্শনের আশ্রমগুলির (Schools of thoughts) একত্ব স্থাপনা করে অব্যক্ত অচিন্ত্য চৈতন্যসত্ত্বার মহাকাশে মহাসম্মীলন ঘটিয়েছেন। জয়তু দেবকীনন্দন !
_________________________________________________
অর্জুনের প্রশ্নের উত্তরে বাসুদেবের শাশ্বত বাণী, হে ভরতর্ষভ পার্থ, সত্ত্ব গুণের কার্যরূপ প্রকাশ চৈতন্যসত্ত্বারই অভিব্যক্তি। সেই প্রকাশ রজোগুণের প্রবৃত্তি, তমোগুণের প্রবৃত্তির প্রবল্যকেও দ্বেষ করেন না। সে চৈতন্যসত্ত্বা নির্বিকার ও উদাসীন। অব্যবহিত পূর্ব শ্লোকে (১৪/২১) "গুণাননেতানতীতো" 'এই তিন গুণের অতীত' শব্দগুচ্ছের অর্থ হোল, যে পুরুষ (এখানে ভক্ত) চিদানন্দময় চৈতন্যরূপী পরমাত্মাতেই জ্ঞানযোগে ও ধ্যানযোগে নিত্য স্থিত থাকেন, ত্রিগুণময়ী মায়ার সংসারবন্ধন স্বীকার করেও একমাত্র পরমগতি ঈশ্বরের কামনা করেন তিনিই গুণাতীত। তিনি সাক্ষীস্বরূপ ('উদাসীনবৎ')।
"সমদুঃখসুখঃ স্বস্থঃ সমলোষ্টাশ্মকাঞ্চনঃ।
তুল্যপ্রিয়াপ্রিয়ো ধীরঃ তুল্যনিন্দাত্মসংস্তুতিঃ।।"

সুখ দুঃখ, প্রিয় অপ্রিয়, স্তুতি নিন্দায় তাঁর সমভাব, সোনা-মাটি-পাথর-- তাঁর চোখে সমান। (টাকা মাটি, মাটি টাকা-- শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব) এবং তিনি অচঞ্চলভাবে ধৈর্যধারণ করতে পারেন।
আর জেনো, মানে অপমানে, শত্রু মিত্রে সমভাবাপন্ন এবং কর্মারম্ভে ও কর্মসাধনে কর্ত্তৃত্বাভিমান মুক্ত পুরুষই গুণাতীত হতে পারেন। ব্রহ্মচৈতন্যও তো এমনই। তিনি সৃষ্টি করেছেন, তিনি চালনা করছেন, তিনিই আবার ধংসও করছেন ; কিন্তু তিনি জড়িয়ে নেই। তাই তিনি গুণাতীত।
______________________-______________________

অতিরিক্ত উদাহরণ 

মহাভারতের 'শান্তিপর্বে' এমনই এক বাণী আমরা পাই,
"সুখং বা যদি বা দুঃখং প্রিয়ং বা যদি বাহপ্রিয়ং
প্রাপ্তং প্রাপ্তমুপাসীত হৃদয়েনাপরাজিতঃ।
প্রিয়েনাতিভৃশং হৃষ্যেদপ্রিয়ে ন চ সংজ্বরেৎ
নমুহ্যেৎ অর্থকৃচ্ছ্রেষু ন চ ধর্ম্মংপরিত্যজেৎ।।"

"সুখ বা হোক্, দুঃখ বা হোক্
প্রিয় বা অপ্রিয়,
অপরাজিত চিত্তে সব
বরণ করিয়া নিও।
অতি হৃষ্ট হইবে না প্রিয় সমাগমে
অপ্রিয়ে‌ হবে না ম্লান ব্যথিয়া মরমে।
করিবে না হা-হুতাশ হলে অঘটন,
ধর্ম ত্যজিবেনা কভু থাকিতে জীবন।।" (২)

'নবরত্নমালা', সত্যেন্দ্রনাথ ও রবীন্দ্রনাথের অনুবাদ। উদ্ধার--  জগদীশ ভট্টাচার্য রচিত 'রবীন্দ্রসান্নিধ্যে'।
______________________________________________ 


অর্জুনের উচ্চারণে (১৪/২১) একত্রে তিনটি প্রশ্ন ছিল। 'সত্ত্ব রজঃ তমঃ' -- এই তিন গুণের অতীত যে পুরুষ তিনি কি কি লক্ষণযুক্ত ? তিনি কি প্রকার আচরণ করেন ? এবং মানুষ কি উপায়ে এই তিনটি গুণকে অতিক্রম করতে পার ? প্রথম ও দ্বিতীয় প্রশ্নের সম্মিলিত উত্তর দেবার পর এবার তৃতীর প্রশ্নের উত্তরে ভগবান যা বলছেন তা  ভক্তিযোগ।।
মাঞ্চ যোহব্যভিচারেণ ভক্তিযোগেন সেবতে।
স গুণান সমতীত্য এতান ব্রহ্মভূয়ায় কল্পতে।।

হে পরমসখা অর্জুন, যে পুরুষ (একমাত্র চিদানন্দময় পরমাত্মাকেই কামনা করেন যে ভক্ত) 'অব্যভিচারিণী' ভক্তিরূপ যোগের দ্বারা 'আমাকে' নিরন্তর ভজনা করেন, তিনি প্রকৃতিরূপ মায়াসঞ্জাত ত্রিগুণের পাশবদ্ধতা ছাড়ায়ে সচ্চিদানন্দঘন পরমব্রহ্মের ভাব প্রাপ্ত হতে পারেন -- "ব্রহ্মভূয়ায় অল্পতে"। তখন অব্যক্ত, অব্যয়, অবিনাশী পরমাত্মারূপ চৈতন্যসত্ত্বার অমৃত, মানবধর্মঅক্ষয় আনন্দের অখন্ড 'একরস' এই যে 'আমি' -- আমার ভক্তের জন্ম-মৃত্যুহীন 'আশ্রয়' হয়ে থাকি।

"ব্রহ্মণো হি প্রতিষ্ঠা অহম অমৃতস্য অব্যয়স্য চ।
শাশ্বতস্য ধর্মস্য সুখস্য ঐকান্তিকস্য চ।।"
____________________________________________

                        ব্যাখ্যা

এতক্ষণে মহাভারতের মহানায়ক অর্জুনের সঙ্গে সঙ্গে জগতসংসারের ভক্তবৃন্দও যেন পতিতপাবন ভগবান বাসুদেবের করুণাসিঞ্চিত সান্ত্বনাবাণী লাভ করলেন। এই চতুর্দশ অধ্যায়ের 'গুণত্রয়বিভাগযোগ'-য়ে শুধুমাত্র 'সত্ত্ব রজঃ তমঃ' গুণের সূক্ষ্ম বিভাজন-ধারণার কথাই আসেনি, এসেছিল ব্রহ্মরূপী নির্বিকার সত্ত্বার কথা, এসেছিল 'প্রকৃতি-পুরুষ' তত্ত্ব, এসেছিল প্রকৃতির বা প্রকৃতিরূপ মায়ার কথাও। ভক্তহৃদয় দ্বিধায়-দ্বন্দ্বে, রহস্যে-ধন্ধে বিকল, বিহ্বল। বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের এই অনন্ত ঐশ্বর্যের (ঈশ্বরের রূপ ও গুণ) ছিন্ন করি (তাঁর মায়াই না হয় হোল) কেমন করে ? মানুষরূপী 'আমি' তো তাঁরই সৃষ্ট ! মুক্তি চাইবোই বা কোন্ লজ্জায় ?
তাই এখন আর কোন সংশয় সঙ্কোচ রইল না। 'অহম ব্রহ্মাস্মি' হতে চাই না।‌ তোমার সৃষ্টির মহা সিংহাসনে‌ তুমি বিরাজ কর প্রভু

"তুমি আছ মোরে চাহি
আমি চাহি তোমা পানে।"
          ‌                       ----রবীন্দ্রনাথ

"ত্বয়া হৃষিকেশ হৃদিস্থিতেন যথা নিযুক্তোহস্মি তথা করোমি।"
                    (ক্রমশঃ)
পরবর্তীকালের ১৫দশ পর্ব (পঞ্চদশ অধ্যায়)

__________________________________________









শুক্রবার, ১০ অক্টোবর, ২০২৫

শ্রীমদ্ভগবদগীতায় অর্জুন --পর্ব ১৩

শ্রীমদ্ভগবত গীতায় অর্জুন-১৩ 


শ্রীগীতার এই ত্রয়োদশ অধ্যায়টি "ক্ষেত্রক্ষেত্রজ্ঞবিভাগযোগ"। অধ্যায়টি জটীল ও এই যোগ জানায় পরমাত্মা সত্যই যেন  'সাধনদুর্লভ' ("ওহে, সাধনদুর্লভ"-- রবীন্দ্রনাথ)। এখানে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ আবারো জ্ঞানমার্গীয় সাধনতত্ত্বের কথাই বলেছেন। বলছেন, 

"ইদং শরীরং কৌন্তেয় ক্ষেত্রম্ ইতি অভিধীয়তে।
এতদ্ যো বেত্তি তং প্রাহুঃ ক্ষেত্রজ্ঞ ইতি তদ্বিদঃ।।" 


হে অর্জুন, দেখ এই শরীর এক ক্ষেত্রবিশেষ, এবং এই ধারণা যাঁর আছে তিনি ক্ষেত্রজ্ঞ। এবার সকল ক্ষেত্রের (ভূতদেহের) ক্ষেত্রজ্ঞ আমি, এবং ক্ষেত্রক্ষেত্রজ্ঞের যে তত্ত্বজ্ঞান (সবিকার ক্ষেত্র ও বিকারহীন পুরুষ) তাও আমি। 

 "ক্ষেত্রক্ষেত্রজ্ঞয়োর্জ্ঞানং যত্তজ্ (যৎ, তৎ) জ্ঞানং মতং মম।।" দৃশ্যজগৎ হোল প্রকৃতি (জীবদেহ ও সমস্ত ভূতজগত)। প্রকৃতি সবিকার ; কেননা তারা নিয়ত পরিবর্তনের অধীন, ক্ষণভঙ্গুর, নাশবান। জন্ম ও মৃত্যুর অধীন। কিন্তু আত্মা অর্থাৎ প্রকৃতির অন্তরে যে চেতন সত্ত্বা --- তিনি বিকারহীন, অবিনাশী, নিত্য, শুদ্ধ। অতএব হে অর্জুন, 'ক্ষেত্র'-এর কারণ ও ক্ষেত্রের উপর ক্ষেত্রজ্ঞের (সাক্ষীচৈতন্যের) প্রভাব --- এই সুগভীর জ্ঞান ঋষিগণ জানেন এবং বেদ ও ব্রহ্মসূত্র তার প্রমান দিয়েছেন। 

ঋষিভিঃ বহুদা গীতম ছন্দোভিঃ বিবিধৈঃ পৃথক্।
ব্রহ্মসূত্রপদৈশ্চৈব হেতুমদ্ভিঃ বিনিশ্চিতৈঃ।। 

ঋষিগণ বহুপ্রকারে এই জ্ঞানের ব্যাখ্যা করেছেন, এবং বেদসমুহের মন্ত্র দ্বারা ও ব্রহ্মসূত্রের পদগুলির দ্বারা সুনিশ্চতরূপে ক্ষেত্রক্ষেত্রজ্ঞের বিষয় কথিত হয়েছে।
হে অর্জুন, এই যে দৃশ্যজগৎ বা পঞ্চভূত যেমন আকাশ, বায়ু, অগ্নি, জল, পৃথিবীর সূক্ষ্মভাব বা সত্ত্ব রজঃ তম (অদৃশ্য মায়া) তিনটি গুণ, দশেন্দ্রিয় (জ্ঞানেন্দ্রিয় ও কর্মেন্দ্রিয়)--এই সমস্তটির মিলিত রূপ হোল ক্ষেত্র। আর এই যে ক্ষেত্র সে সবিকার। বিকারগুলি কি ? মননক্রিয়া সঞ্জাত ইচ্ছা, রাগ, দ্বেষ, সুখ-দুঃখ, দেহ ও দেহের যে চেতনবোধ (চৈতন্য নয়) এবং 'ধৃতি' (পরে আলোচ্য) --- এসকলই 'ক্ষেত্রের' এই 'ক্ষেত্রজ' (দেহগত) বিকার থেকে মুক্ত হবার উপায় হোল আত্ম অনুধাবন করে মান ও রাগ অনুরাগ, দম্ভ বর্জন করতে হবে। অহিংসা, ক্ষমা, মন ও বাক্যের সরলতা, আচার্যসেবা, অন্তর ও বাহিরের শুদ্ধিকরণ, স্থৈর্য ইত্যাদি গুণাবলির অনুশীলন করতে‌ হবে এবং মন ও ইন্দ্রিয়গুলির প্রবল আক্রমণ থেকে 'শুদ্ধ আত্মাকে' রক্ষা করবার জন্যে প্রয়োজনে দেহসুখের প্রতি উদাসীন হতে হবে। 

"আমার এই দেহখানি তুলে ধর,
তোমার ওই দেবলয়ের প্রদীপ কর।" (রবীন্দ্রনাথ)। 


ইহলোকে ভোগের প্রতি আসক্তি, পরলোকে স্বর্গসুখ প্রাপ্তির কামনা ত্যাগ করতে হবে। অহংকারশূণ্য এবং জন্ম-জরা-ব্যাধি-মৃত্যু জনিত যে দুঃখ, সে দুঃখের কথা বার বার 'অনুদর্শন' করা, স্মরণ-মনন করা ত্যাগ করতে হবে। স্ত্রী পুত্র গৃহ ও বিত্তের প্রতি আসক্তি, ('অনভিষ্বঙ্গ') মমত্বহীন, ইষ্ট ও অনিষ্টে, প্রিয় ও অপ্রিয়ে সমভাবাপ্ন হতে হবে। জ্ঞানসাধনায় নির্মল এবং একনিষ্ঠ (অব্যভিচারিণী) ভক্তি থাকতে হবে। নির্জন ও পবিত্র স্থানে বাস করা ও বিষয়াসক্ত মানুষদের সংসর্গ ত্যাগ করে মনকে একমাত্র পরমেশ্বর অভিমুখে নিবিষ্ট রাখতে হবে।
___________________________________________
                           ব্যাখ্যা 

এই 'অব্যভিচারিণী' শব্দটি বিষ্ণুভক্ত বৈদান্তিক ও  বৈষ্ণবদের কাছে পরম উপাদেয়। ব্যভিচার শব্দের অর্থ বি+অভি-আচার= ব্যভিচার। মনুষ্য জীবনে, বা মানুষের সমাজে বৈবাহিক সম্মন্ধের জটীল ও নানা সংস্কার বন্ধনে আবদ্ধ বিধি বিধান আছে। আছে ঐতিহাসিক কাল থেকেই। বহুগামিতা, পুনর্বিবাহ, স্বামীর মৃত্যুর পর বংশ রক্ষার্থে সন্তান উৎপাদনের 'ক্ষেত্র' হিসাবে ব্যবহৃত হওয়া, কুমারীকালে সন্তানের জন্ম দেওয়া নারীদের সামাজিক দৃষ্টিতে  নিন্দনীয় ছিল না। পুরুষদের তো একাধিক বিবাহ বা নারীসঙ্গ স্বাভাবিক ছিল। পুরাণ কাহিনীগুলিতে সে সকল ঘটনার অজস্র উদাহরণ আছে। রামায়ণ ও মহাভারতের মুখ্য নারী চরিত্র অহল্যা, দ্রৌপদী, কুন্তী,  তারা ও মন্দোদরী (পঞ্চকন্যা), তাঁরা দ্বিভোগ্যা বা বহুভোগ্যা হয়েও প্রাতঃস্মরণীয়া। (পঞ্চকন্যা নাম স্মরণে মহাপাতক নাশয়েৎ)। এই দুই মহাপুরাণে সীতাদেবী ও সাবিত্রী (অপরাপর পুরাণে ও উপনিষদে আরো কিছু নারী চরিত্র আছেন, যেমন শিবের প্রথমা স্ত্রী সতী দাক্ষায়ণী, যাজ্ঞবল্ক্যের স্ত্রী মৈত্রেয়ী ও কাত্যায়নী, বশিষ্ঠের স্ত্রী অরুন্ধতী প্রভৃতি) ---- এনারা পতিগতপ্রাণা ও সতীত্বের ও পবিত্রতার পরাকাষ্ঠা। এগুলি উচ্চবর্ণীয় সমাজের ছবি। যেখানে প্রথম পংক্তির কুন্তী প্রভৃতি পঞ্চকন্যা, বিচিত্রবীর্যের বিধবা পত্নীগণ (অম্বিকা, অম্বালিকা ; অম্বার বিষয় ভিন্ন) যেমন ছিলেন তেমনই দ্বিতীয় পংক্তিভূক্ত ছিলেন ঐ সতী, পার্বতী, সীতা, অরুন্ধতী, সাবিত্রীগণ। এই দ্বিতীয় পংক্তিভূক্ত গরিয়সী নারীদের নারীত্বের আদর্শকে উচ্চকোটিতে স্থান দেওয়া হয়েছিল এবং হয়ও। এনাদের এক একজনের জীবন সাধনার ইতিবৃত্তে এক একটি মহাকাব্য রচিত হতে পারে। হয়েওছে। রামায়ণ মহাকাব্যটির বহির্দেশে শ্রীরামচন্দ্রের পুরুষোত্তম ব্যক্তিত্ব প্রতিভাত হলেও বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ এই আদি মহাগ্রন্থের অন্তর্প্রকৃতিটি  শ্রীরাম-অন্তপ্রাণা, সতীত্বের পরাকাষ্ঠা সীতাদেবীর অশ্রুজলে পরিসিক্ত। 

আজীবন সতীত্বরক্ষার সংগ্রামে বিধ্বস্ত সীতামাতা ধরিত্রীর কোলে আশ্রয় প্রার্থনা করছেন। নারীত্বের অবমাননা সত্ত্বেও সতীত্বের বিজয়গৌরব উদ্ঘোষিত করে   মৃত্যুপূর্ব বাণী উচ্চারণ করলেন, 

মনসা কর্মণা বাচা যথা রামং সমর্চয়ে।
তথা মে মাধবী দেবী বিবরং দাতুমর্হতি।।
                                  ------ বাল্মীকি রামায়ণ। 

অপর একজন মহাসতী, সাবিত্রীর পতিপ্রাণতার মহাভারতীয় উপাখ্যান অবলম্বন করে রচিত হয়েছে ইংরেজি ভাষার শ্রেষ্ঠতম মহাকাব্য শ্রী অরবিন্দের সাবিত্রী (Savitri)। স্বামীর প্রাণ পুনরুদ্ধারের জন্য মর্ত্যলোক থেকে অমর্ত্যলোক পর্যন্ত মৃত্যুর দেবতাকে অনুসরণ করেছিলে তিনি। সফলও হয়েছিলেন  পাতিব্রত্যের সেই মহাসাধনায়। প্রেম ও পবিত্রতার এই সাধনাকে অমর্ত্যজীবন (Life Divine)-লাভের  সাধনার সঙ্গে তুলনা করেছেন কবি।

"From darkness' heart she dug out wells of light,
On the undiscovered depths imposed a form,
Lent a vibrant cry to the unuttered vasts,
And through great shoreless, voiceless, starless breadths
Bore earthward fragment of revealing thought
Been from the silence of the ineffable."
                        --- 'Savitri' -- Arobindo.

 আবারো মহাভারতের নল-দময়ন্তী উপাখ্যান, মঙ্গলকাব্যে বেহুলা-লখীন্দর উপাখ্যান প্রভৃতি কাহিনীর মধ্যেও 'পতির্হি দেবতা লোকে' -- এই একান্ত প্রেমের গৌরবগাথা উদ্ঘোষিত। একান্তশরণী নারীর আদর্শই 'অব্যভিচারিণী' প্রেম। অন্যদিকে অনেকান্তশরণী নারীত্বের কাম ও কামনার 'সাধনা' ব্যাভিচারিণী। 'সাধনা' শব্দটি এই জন্যেই উল্লেখ করা হোল যে ভারতীয় সমাজদর্শনে বৈদান্তিক ব্রহ্ম সাধনার সমান্তরালভাবে লোকায়তিক তন্ত্রসাধনার জটীল,গূহ্য ও বহু শাখায়িত একটি ধারা সুপ্রাচীনকাল থেকেই বহমান ছিল এবং আছে, যে ধর্মাচারের সৃষ্টিতত্ত্বে বলা হয়েছে, 

"মহাকাশে যাহা স্পন্দন নরনারীর (লক্ষণীয়, এখানে বিবাহ-সম্মন্ধে-বদ্ধ স্বামী-স্ত্রী বা দম্পতির কথা বলা হয়নি) মধ্যে তাহা কাম ও মদনের লীলা। ... কাম ও মদনজন্য যেমন নূতন জীবের নাম ও রূপের বিকাশ হয় তেমনি পুরুষ এবং প্রকৃতির মধ্যে কাম ও মদনের স্পন্দন জন্য বিশ্বব্যাপী নাম ও রূপের বিকাশ হইয়াছে। ... তন্ত্রবিশেষে বিশ্বসৃষ্টির জন্য শিব-শক্তির এবং জীবসৃষ্টির জন্য নরনারীর মিলনের একতা পদে পদে খুলিয়া ব্যাখ্যা করিয়া দেওয়া আছে।"
            ---- পাঁচকড়ি বন্দোপাধ্যায় রচনাবলী। 

শ্রীমদ্ভগবত গীতায় শ্রীকৃষ্ণের বাণীগুলি গভীরভাবে অনুধাবন করলে দেখা যাবে সেগুলির মধ্যে দিয়ে শুদ্ধ, পবিত্র, ব্যভিচারমুক্ত যেরূপ প্রেম একনিষ্ঠ ও পতিগতপ্রাণা নারীর সাধনসম্পদ, সেইরূপ 'অব্যভিচারিণী', অনন্যা ভক্তি ও প্রেমের দ্বারাই সচ্চিদানন্দ ঈশ্বরকে লাভ করা যেতে পারে।
________________________________________


এরপর শ্রীকৃষ্ণ আবারো জ্ঞানমার্গের কথাই বলেছেন। অধ্যাত্মজ্ঞান লাভের পথে সকল তত্ত্বের পরম তত্ত্ব পরমাত্মাকে সর্বত্র, সকল ভূতে দর্শন করাই প্রকৃত সাধনা। আর এর বিপরীত সাধনা (সমকালের নিরীশ্বরবাদী, তন্ত্রবাদী ও ঐহিক পরমার্থবাদী সাধনমার্গ) 'অজ্ঞানম্'। তাই এবার (শ্লোক ১৩//১২ থেকে) আবারও উপনিষদীয় 'ব্রহ্মতত্বম্'। হে অর্জুন, যা জ্ঞাত হবার যোগ্য', যা জ্ঞাত হলে পরমানন্দ প্রাপ্ত হওয়া যায় তাই তোমাকে বলছি, অনুধাবন কর, 

"জ্ঞেয়ং যৎ তৎ প্রবক্ষ্যামি যৎ জ্ঞাত্বা অমৃতমশ্নুতে।
অনাদিমৎ পরং ব্রহ্ম ন সৎ ন অসদুচ্যতে।।" 

সেই 'ইদম্ বা অদম্' ব্রহ্মকে জানতে হবে যা 'অনির্বচনীয়', যা সৎ ও ন য়, অসৎও নয়। যাঁর সকল দিকেই মুখমণ্ডল---- চক্ষু, কর্ণ এবং সংবৃতি। আকাশ যেমন অসীম, দ্যুলোক ভূলোক ব্যাপ্ত করে আছে, ব্রহ্ম ও তেমনই সর্বব্যপ্ত ,'ব্যাপ্তং যেন চরাচরম্'। তিনি ইন্দ্রিয় বিবর্জিত হয়েও 'ইন্দ্রিয়সমূহের প্রকাশক।' তিনি নিরাসক্ত, গুণাতীত (সত্তঃ রজঃ তম গুণ এর ঊর্দ্ধে) হয়েও জগৎসংসারকে ধারণ করে আছেন এবং গুণগুলির ভোক্তা। (এখানে ভোক্তা অর্থে ভোগকারী নন, সমস্ত গুণ ও প্রবনতা যাঁর মধ্যে মিলায়ে যায়।
___________________________________________

                                 ব্যাখ্যা
ব্রহ্ম একাধারে জগতের স্পন্দন, বা 'বিকার' অর্থাৎ সৃজন, বিবর্তন ও লয় এবং 'নির্বিকার' --- অনাদি অনন্ত অবিচল।
"তরঙ্গ মিলায়ে যায় তরঙ্গ ওঠে,
কুসুম ঝরিয়া পড়ে কুসুম ফোটে।
নাহি ক্ষয় নাহি শেষ   নাহি নাহি দৈন্যলেশ
সেই পূর্ণতার পায়ে মন স্থান মাগে।।"
                                     ----- রবীন্দ্রনাথ।
_________________________________________

চরাচরপরিব্যপ্ত সকল ভূতের অন্তরে তিনি, বাইরেও তিনি। "বহিরন্তশ্চ ভূতানাম্ অচরং চর়মেব চ।" অবিক্ষুব্ধ পূর্ণ তিনি, সর্বত্রস্পন্দিত সঞ্চরমানও তিনি। তিন 'ভূতভর্ত্তৃ', গ্রসিষ্ণু এবং প্রভবিষ্ণু (দেহ ও আকার ধারণকারী, সংহারকারী এবং সৃজনকারী)। তিনি 

"জ্যোতিষামপি তজ্জ্যোতিস্তমসঃ পরমুচ্যতে।
জ্ঞানং জ্ঞেয়ং জ্ঞানগম্যং হৃদি সর্বস্য  বিষ্ঠিতম।।"
(ত্রয়োদশ অধ্যায়ের ১৭তম এই মন্ত্রটির অনন্ত ব্যাখ্যা আছে)। 

তিনি 'জ্যোতিষাম্ জ্যোতিঃ'। তিনি সেই তেজশক্তি যাঁর দ্বারা 'সূর্য-চন্দ্র-নক্ষত্র-নীহারিকা'ও জ্যোতির্ময়। তিনি 'মায়ার' বা বিনাশশীল এই যে জাগতিক অস্তিত্বেরও ঊর্দ্ধে। তিনি সাধকের বোধের মধ্যে ও তত্ত্বজ্ঞান দ্বারা উপলব্ধ। তিনি সকলের হৃদয়ে আছেন সত্য ; কিন্তু সেই একনিষ্ঠ জ্ঞানসাধকই তাঁকে হৃদয়ে ধারণ করতে পারেন যিনি 'জ্ঞান ও জ্ঞেয়' বিষয়ের স্পষ্টরূপে বুঝতে পারেন। 'ক্ষেত্র' ও 'ক্ষেত্রজ্ঞ' --- অর্থাৎ বস্তুবিশ্ব ও বস্তুবিশ্বের ধারণা  জ্ঞানসাধনার দ্বারা প্রাপ্ত হলেই ভক্ত আমাকে পায় -- "মদ্ভক্তঃ এতৎ বিজ্ঞায় মদ্ভাবায় উপপদ্যতে।" এই দৃশ্যজগৎ হোল প্রকৃতি এবং প্রকৃতি হোল মায়া (কেননা প্রকৃতি সত্ত রজঃ ও তম গুণের দ্বারা আচ্ছন্ন, অশাশ্বত ও বিকারসম্পন্ন। এমনকি জীবের রাগদ্বেষাদি যে মনোবিকার তাও মায়ামুগ্ধ প্রকৃতি থেকেই উদ্ভূত। অতএব  বিকারশীল প্রকৃতির ঊর্দ্ধে অবিকারী 'পুরুষ'কে জানলে, সাধক জীবাত্মার সুখ দুঃখের হেতু যে প্রকৃতি -- তা জানতে পারেন এবং দুঃখ সুখের পারে আনন্দলোকে যেতে পারেন। প্রকৃতি কার্য কারণের উৎস। প্রকৃতি হলেন মায়া। প্রকৃতির তিনটি গুণের মধ্যে, যে যে জীবাত্মা যে যে গুণের দ্বারা মায়াবদ্ধ হয়, কর্মানুসারে তারা পর পর জন্মে তেমন তেমন উত্তম বা অধম যোনিতে গমন করে ও পুনর্জন্ম লাভ করে। "গুণসঙ্গোহস্য সদসদ্ যোনিজন্মসু।।"

পরমপুরুষ বা পরমাত্মাও মায়ার অধীন ; কিন্তু, 

উপদ্রষ্টানুমন্তা চ ভর্তা ভোক্তা  মহেশ্বরঃ।
পরমাত্মেতি চাপ্যুক্তো দেহহস্মিন্ পুরুষঃ পরঃ।।

এই পরমপুরুষ প্রতিটি জীবদেহে স্থিত আছেন। জীবদেহ ত্রিগুণময়ী মায়ার বশীভূত। সেখানেই দেহস্থিত পরমাত্মা সাক্ষীস্বরূপ। তিনি জীবের সৎ-অসৎ চিন্তনের সম্মতিদাতা --- 'অনুমন্তা', তিনি ভূতজগতের ধারণকারী -- 'ভর্তা', জীবের অন্তরাত্মারূপে তিনি 'ভোক্তা' এবং সকল দেবতাদেরও প্রভু --- 'মহেশ্বরঃ'। এই ভাবে, ইন্দ্রিয়বিকারের দ্বারা প্রভাবিত না হয়ে, সগুণ প্রকৃতির পারে গুণাতীত 'নির্বিকার' পরমাত্মাকে যে মানুষ 'তত্ত্বতঃ' জানেন (যঃ বেত্তি), সে মানুষ মায়াময় জগতে থেকেও মায়ার 'গুণ' দ্বারা প্রলুব্ধ হন না, এবং জন্মমৃত্যুর নিরানন্দ চক্র হতে মুক্ত হয়ে চিদানন্দঘন পরমপুরুষের আশ্রয় লাভ করেন। 

এইভাবে, এই ত্রয়োদশ অধ্যায়ের ১৩/২৪, ১৩/২৫, ১৩/২৬ শ্লোকত্রয়ীর উচ্চারণের মধ্যে দিয়ে, জগন্নাথ শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন ধ্যানযোগ ও কর্মযোগ দ্বারা ভগবৎপ্রাপ্তি ঘটে, জ্ঞানসাধক পুরুষদের উপদেশানুসারে উপাসনার দ্বারা মোক্ষলাভ হয় ও সৃষ্টির (স্থাবর জঙ্গম) রহস্য উন্মোচন করা যায় --- এমনি সব গূঢ় তত্ত্বের ব্যাখ্যাও দিয়েছেন। এবং বলেছেন বস্তু ও জ্ঞানের সংযোগই হোল এই ইন্দ্রিয়ভোগ্য জগৎ। এই 'ইন্দ্রিয়ভোগ্য জগৎ' নাশবান ও ক্ষণভঙ্গুর। কিন্তু এই বিনাশশীল জড়জগতের মধ্যে যে সাধক পরমেশ্বরের পরম সত্ত্বাকে স্থিত অবস্থায় দেখে,  যে সাধক সেই শাশ্বত, অক্ষরপুরুষ পরমাত্মার সঙ্গে নিজেকেও যুক্ত করতে সক্ষম হয়, সেও নিজের ক্ষণস্থায়ী শরীরের নাশ হলেও মনে করেন আত্মার নাশ হয় না। জীবাত্মা পরমাত্মার মধ্যেই লীন হয়ে যায়। তিনি এও জানেন আত্মা স্বভাবতঃই নির্লিপ্ত, অকর্তা। কর্ম প্রকৃতির দ্বারা কৃত হয়। আকাশ যেমন সর্বব্যপ্ত, সূক্ষ্ম এবং স্পর্শানুভূতির অতীত, নির্লিপ্ত, আত্মাও তেমনি সূক্ষ্ম হয়েও সর্বব্যাপী, যুগপৎ ভূতজগতের বিকাল হতে মুক্ত। সূর্য যেমন বিশ্বব্রহ্মাণ্ডকে প্রকাশিত করে, আত্মার জ্যোতি তেমনি 'ক্ষেত্র'কে, গুণত্রয়যুক্ত শরীরকে প্রকাশিত করে। যে মহাত্মাগণ জ্ঞানচক্ষুর দ্বারা (জড়, বিকারী, ক্ষণস্থায়ী,নাশবান) ক্ষেত্র ও (নিত্য, চেতন, অবিকারী, অবিনাশী) ক্ষেত্রজ্ঞের ভেদ জানেন তিনি ব্রহ্মবিদ্, তিনি দুঃখময় মৃত্যুসাগর পারে সচ্চিদানন্দঘন পরমাত্মার সঙ্গে একাত্ম ও একীভূত হয়ে যান। তখন, 


"অন্তঃ বহিশ্চ তৎ সর্বং ব্যাপ্য নারায়ণঃ স্থিতঃ।।"
                             -------মহানারায়ণ উপনিষদ।
                     ও৺ শান্তি শান্তি শান্তিহি।

               (ক্রমশঃ)

(এরপর চতুর্দশ পর্ব, ভক্তিমার্গের শ্রেষ্ঠত্ব)। 


দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
অক্টোবর ১০, ২০২৫
ব্যাঙ্গালোর।

_______________________________________

 








Recently published

অমূল্য

He ( Tagore) who sees all things in his own self and his own self in all things, he does not remain unrevealed.                     ...