সোমবার, ২৫ জুলাই, ২০২২

ভাঙনের তীরে (খণ্ডচিত্র)

নদীতীরে বসে আছেন বৃদ্ধ মহারাজ, যেন মূর্তি পাষাণের। 
 দীঘল শ্বেত পাথরের সিঁড়ি ভাঙছে, ডুবছে স্রোতে। 
ওই যে,  নাই সম্পূর্ণটাই ! স্নানঘর, শিবমন্দিরের চূড়া, 
মহিষীর কুসুম কানন, জলসাঘর, -- কোথায় যে হয়ে গেল হারা ! 
করাল জলতরঙ্গ, ঢেওয়ের পর ঢেও আছড়ায় 
অবিরত পাড়ে --- 
 সহস্রফনা বাসুকির ভীষণ ছোবল ! 
প্রাসাদের দিকে ছুটে যায় ঘুর্ণীবাত্যা-ক্ষুব্ধ জলোচ্ছ্বাস! 
অকস্মাৎ চিহ্নহীন হয়ে গেল রাজার প্রাসাদ, 
সাথে তার-- সঞ্চিত ঐশ্বর্য যত, সম্ভ্রম, গৌরব, দম্ভ, 
মান-অভিমান নিঃশেষে বিলীন। 
"ক্ষান্ত হও, স্পর্শ তুমি করো না আমায়," রাজার হুকুম। 
'খল খল' অট্টহাসি কালতরঙ্গের, ডুবে গেল রাজার 👑 মুকুট ! 

কীর্তিনাশা নদীতীরে সুসজ্জিত যাত্রার আসর ---  
রাজা মহারাজাদের সান্ধ্য অভিনয়। 
মহাকাল তরঙ্গের স্রোত দুর্নিবার, 
বৈভবের আবর্জনা মুহূর্তে বিলয়। 
ক্ষীণকণ্ঠ 'বিবেকের' গান ভাসে দূরে -- 
নির্মম নিয়তি হাসে রাত্রি অন্ধকারে।। 

দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় 
১৯/০৮/২০২২ 
কলকাতা।









মঙ্গলবার, ১৯ জুলাই, ২০২২

সাতে শূণ্য সত্তর

আজ আমার জন্মদিন 


অজয়ের পার হতে নিরুদ্দেশ পথের যাত্রী এ জীবন। 
লক্ষ্যহীন, অসংযত, ক্ষুব্ধ, লুব্ধ, শৃঙ্খলাবিহীন। 
চাইতে পারিনি কিছু চাইবার মতো মূল্যবান। 
দুর্মূল্য ছিল সে পথের তুচ্ছতম পাথেয় টুকুও। 
হাল ভাঙা নৌকার মতন ছিল দিক দিশাহারা। 
একূলে, ওকুলে, যতবার প্রয়াস ছিল কাছি বাঁধবার, 
ততবারই এসেছে আঘাত ;  আবার দুরন্ত স্রোতে, 
উদভ্রান্ত আবেগে, নিয়তির অনিবার্য টানে শুধু ভাসা, 
নিয়ে আশা মৃত্যুঞ্জয়ী, হয়তোবা আছে বাসা--- 
শান্তিময়, শান্ত-স্নিগ্ধ নীড় অন্য কোথা, ওই দূরে, 
আঁধারে আচ্ছন্ন তীরে, পরপারে। অদৃশ্য দেবতা, 
সুখ-চরে বেঁধে দিল জীবনের তরী অকস্মাৎ। 

হিসাবের খাতা নিয়ে বসে আছি জীবনের পড়ন্ত 
বেলায়। না-চাওয়ার শূণ্য পাত্র পাওয়ার রত্ন দিয়ে ভরা। 
চাওয়ার কী ছিল এত কিছু পেয়েছি যা অফুরান ? 
    নয়ন-শ্রবণ-কণ্ঠ, সংরক্ত আবেগ-মাখা হৃদয় উচ্ছ্বাস। 
  চেতনার ঊষালগ্নে, আচ্ছন্ন প্রহরে জননীর বক্ষ- 
 বিগলিত গোমুখ নিসৃত অমৃতের ধারা -- মৃতসঞ্জীবনী, 
পিতার বাৎসল্য সুধা, আত্মজন, স্বজন, সখা, 
দূরাগত অচেনা প্রাণের স্নেহ, প্রেম, প্রীতি, ভালোবাসা। 
 সঙ্গসুধা তার, জীবন সঙ্গিনী 'সাবিত্রীর'। সন্তানসন্ততি, 
তাদের মালঞ্চে-আসা বিহঙ্গ শাবক, ভ্রমরা- ভ্রমর -- 
সে সকল বিস্ময়-বিহ্বল দৃষ্টি, কলকণ্ঠ গীতি , 
সমাচ্ছন্ন করে আছে সুদীর্ঘকালের এই পাঁজর পিঞ্জর। 

তবু অপূর্ণতা ; নিজেরই সে অবিবেকী কর্মের কুফল -- 
মানীর হরেছি মান, দুর্বলেরে করেছি ভর্ৎসনা অবিচারে, 
হেনেছি নির্মম তীর সুকোমল বুকে, কৃপণের ভিক্ষা দিয়ে 
ফিরায়েছি জীবনের মূল্যে প্রাণ যারা দিয়েছে আমার। 
ঋণ রয়ে গেছে দেখি পাহাড় প্রমান। মাতৃঋণ, পিতৃঋণ, 
ধাত্রী-ধরিত্রী ঋণ, আচার্য চরণে ঋণ --জ্ঞানদীপ জ্বেলে 
যাঁরা অন্ধকারে দিয়েছেন আলো। আজ আর সাধ্য নাই 
সে ঋণ মিটাই । শূণ্য কেটে সাতে ফেরা হবে না আবার। 

তাই আজ, শ্রাবণের সজল প্রভাতে, আলোতে ছায়াতে, 
সুখে দুঃখে, আনন্দে বিষাদে, হে ধরিত্রী, তোমার 
 মাটিতে, রাখি মাথা। অভিশাপ অথবা আশীর্বাদ, 
যাই পাই, হোক তাই জীবনের শ্রেষ্ঠ পুরস্কার ! 
 মহাজীবনের যে ইঙ্গিত দিয়েছিলে তুমি, অনায়ত্ব 
রয়ে গেল, মা গো। সমাসন্ন দিনে যতটুকু ভালোবাসা 
বুকে আছে বাকী, এ বিশ্বসংসার দিয়েছে আমায় -- 
সবটুকু দিয়ে যাব, শূণ্য যেন পূর্ণ হয় অসীম ক্ষমায়।। 

দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
২০/০৭/ ২০২২ 
শিলিগুড়ি।












বুধবার, ১৩ জুলাই, ২০২২

গুরু পূর্ণিমা

(আমি নাস্তিক নই, কিন্তু একথা তো সত্য যে কাল্পনিক দেবতাদের পূজার অছিলায়, ছলনায় বা বৈভব প্রদর্শনের আত্মম্ভরিতায় যে আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয় সেখানে আর যাঁরাই থাকুন ঈশ্বর থাকেন না। এবং একই সময়ে অসমর্থ পিতামাতা, দারিদ্র্য লাঞ্ছিত আত্মীয় স্বজন অনাদৃত এবং উপেক্ষিতই থাকেন। এ আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা শুধু নয়, ব্যক্তি জীবনের পাপ। 
আজকের এই ছন্দোবদ্ধ বাক্যগুলি বিগত জীবন কালের অনর্থক কর্মকাণ্ডের অনুশোচনার মন্থনসঞ্জাত ফসল।) 

"তোমার পূজার ছলে তোমায় ভুলে থাকি"।
                                                    ---রবীন্দ্রনাথ 

গুরু পূর্ণিমা 

"পিতা হি দেবতা লোকে জননী পরম গুরুঃ।"

"জীবনাচরণে আজো যা রয়েছে 
 ‌      সুন্দর, মধুময়। 
সবই জনক জননীর দান 
      সদা যেন সাথে রয়।"

এ মহামন্ত্র শুনেছি তো বারবার, 
তবুও দু-চোখে নেমেছে অন্ধকার। 

উপেক্ষার ছলে, জীবন্ত দেবতা 
 দিয়েছি বিসর্জন, 
আজ খুঁজে মরি, হাহাকার করি--- 
পাষাণে ভজন পূজন। 
দেবতা দেউল ঘুরে ঘুরে দেখি, 
তীর্থে তীর্থে ভ্রমি, 
সিঁদুরের দাগ যেখানেই দেখি 
মাথা ঠুকে ঠুকে নমি'। 
হে প্রিয়জন, হে সখা-স্বজন, 
পিতা মাতা যার আছে, 
যত টুকু পার নিবেদন কর 
রাখ বক্ষের কাছে। 
 যেদিন তাঁদের চরণ চিহ্ন 
পড়বে না আর ঘরে , 
শালগ্রাম শিলা মাথায় ভেঙেও 
অনুতাপে যাবে মরে। 
আদেশ নয় এ, উপদেশও নয় -- 
জীবন মথিত সত্য, 
দেবতা দানব সকলি মিথ্যা 
'গোমুখ ধারাই' নিত্য। 

দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় 
১৩/০৭/২০২২ 
শিলিগুড়ি

মঙ্গলবার, ৫ জুলাই, ২০২২

বাউল

(জয়দেব কেন্দুলির আখড়াতে এক বাউলের জীবনাচরণ খুব কাছ থেকে দেখেছি) 


রইল অনেক বাকি। 
নিজেই নিজের জীবনটাকে দিয়ে গেলাম ফাঁকি। 
জন্ম হোল আকাশতলে, শ্যামল মাটির কোলে, 
কাটলো জীবন সুখের দুখের দোদুল দোলায় দুলে, 
মন্দ ভালোর কান্না হাসির দিন ফুরালো সাঁঝে, 
এখন এলো রাত্রি নেমে দূরের বাঁশী বাজে। 
যতন করে দুহাত ভরে করেছি যা জড়ো, 
সর্বনাশা প্রলয়ঝড়ে কাঁপছে থর থর। 

মুক্ত উদার ওই যে আকাশ তারার প্রদীপ জ্বলে, 
বিপুল বিরাট বসুন্ধরা শোভন ফুলে ফলে, 
অথৈ জলের সাগর নীরে মুক্তা মাণিক ভরা, 
পাহাড় হতে সহস্রধার নদী কলস্বরা। 
 অন্তবিহীন জীব-জীবনের জীবন-মরণ খেলায়, 
আমিও আছি যুগে যুগে নিত্য প্রাণের মেলায়। 
 জোয়ার ভাটার নদীর কূলে কাদা মাটির ঘর 
শ্রাবণ প্লাবন ধেয়ে আসে -- নিত্য ভাঙন-ডর। 
যা আছে আজ, যেমন আছে তাকেই ধরি বুকে--- 
জীবন তরী যাক না বয়ে ক্ষণকালের সুখে। 

''কিসের দুঃখ, কিসের বা শোক, কেন এত আশা ? 
বাউল হয়ে বেড়াও ঘুরে, বিলাও ভালোবাসা।'' 

দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
০৮/০৭/২০২২
শিলিগুড়ি। 
____________________________________________











Recently published

অমূল্য

He ( Tagore) who sees all things in his own self and his own self in all things, he does not remain unrevealed.                     ...