লক্ষ্যহীন, অসংযত, ক্ষুব্ধ, লুব্ধ, শৃঙ্খলাবিহীন।
চাইতে পারিনি কিছু চাইবার মতো মূল্যবান।
দুর্মূল্য ছিল সে পথের তুচ্ছতম পাথেয় টুকুও।
হাল ভাঙা নৌকার মতন ছিল দিক দিশাহারা।
একূলে, ওকুলে, যতবার প্রয়াস ছিল কাছি বাঁধবার,
ততবারই এসেছে আঘাত ; আবার দুরন্ত স্রোতে,
উদভ্রান্ত আবেগে, নিয়তির অনিবার্য টানে শুধু ভাসা,
নিয়ে আশা মৃত্যুঞ্জয়ী, হয়তোবা আছে বাসা---
শান্তিময়, শান্ত-স্নিগ্ধ নীড় অন্য কোথা, ওই দূরে,
আঁধারে আচ্ছন্ন তীরে, পরপারে। অদৃশ্য দেবতা,
সুখ-চরে বেঁধে দিল জীবনের তরী অকস্মাৎ।
হিসাবের খাতা নিয়ে বসে আছি জীবনের পড়ন্ত
বেলায়। না-চাওয়ার শূণ্য পাত্র পাওয়ার রত্ন দিয়ে ভরা।
চাওয়ার কী ছিল এত কিছু পেয়েছি যা অফুরান ?
নয়ন-শ্রবণ-কণ্ঠ, সংরক্ত আবেগ-মাখা হৃদয় উচ্ছ্বাস।
চেতনার ঊষালগ্নে, আচ্ছন্ন প্রহরে জননীর বক্ষ-
বিগলিত গোমুখ নিসৃত অমৃতের ধারা -- মৃতসঞ্জীবনী,
পিতার বাৎসল্য সুধা, আত্মজন, স্বজন, সখা,
দূরাগত অচেনা প্রাণের স্নেহ, প্রেম, প্রীতি, ভালোবাসা।
সঙ্গসুধা তার, জীবন সঙ্গিনী 'সাবিত্রীর'। সন্তানসন্ততি,
তাদের মালঞ্চে-আসা বিহঙ্গ শাবক, ভ্রমরা- ভ্রমর --
সে সকল বিস্ময়-বিহ্বল দৃষ্টি, কলকণ্ঠ গীতি ,
সমাচ্ছন্ন করে আছে সুদীর্ঘকালের এই পাঁজর পিঞ্জর।
তবু অপূর্ণতা ; নিজেরই সে অবিবেকী কর্মের কুফল --
মানীর হরেছি মান, দুর্বলেরে করেছি ভর্ৎসনা অবিচারে,
হেনেছি নির্মম তীর সুকোমল বুকে, কৃপণের ভিক্ষা দিয়ে
ফিরায়েছি জীবনের মূল্যে প্রাণ যারা দিয়েছে আমার।
ঋণ রয়ে গেছে দেখি পাহাড় প্রমান। মাতৃঋণ, পিতৃঋণ,
ধাত্রী-ধরিত্রী ঋণ, আচার্য চরণে ঋণ --জ্ঞানদীপ জ্বেলে
যাঁরা অন্ধকারে দিয়েছেন আলো। আজ আর সাধ্য নাই
সে ঋণ মিটাই । শূণ্য কেটে সাতে ফেরা হবে না আবার।
তাই আজ, শ্রাবণের সজল প্রভাতে, আলোতে ছায়াতে,
সুখে দুঃখে, আনন্দে বিষাদে, হে ধরিত্রী, তোমার
মাটিতে, রাখি মাথা। অভিশাপ অথবা আশীর্বাদ,
যাই পাই, হোক তাই জীবনের শ্রেষ্ঠ পুরস্কার !
মহাজীবনের যে ইঙ্গিত দিয়েছিলে তুমি, অনায়ত্ব
রয়ে গেল, মা গো। সমাসন্ন দিনে যতটুকু ভালোবাসা
বুকে আছে বাকী, এ বিশ্বসংসার দিয়েছে আমায় --
সবটুকু দিয়ে যাব, শূণ্য যেন পূর্ণ হয় অসীম ক্ষমায়।।
দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
২০/০৭/ ২০২২
শিলিগুড়ি।