রবিবার, ২৯ ডিসেম্বর, ২০২৪

O Liberty, let the bird fly.

O Liberty, let the bird live

I fly above the sky, over the mounds and hills,
The oceans, rivers, cities, meadows and fields.
None but the dark or sombre clouds or mists,
Tempests, showers or hails hinder my sail.
But I fear not, neither furl my wings ever ;
Nor l throttle my voice of beauty and joyous life.
But I fear you, the man bereft of mercy,
With fiery fierce gun in hand aiming at me
Lurking nowhere, to strip of my liberty,
To call upon Hell to my being, my existence !

O humanity, what benignity you've bestowed,
Brought upon the frail? but what did Prometheus  
To save Life and Civilization that you boast of,
And by that eternal damnation suffers nature
Is fire, in thousand form --  hatred, animosity,
Malice, hostality, detestation -- such and so on
Are flameless but more Infernal than the fire
That burns the corpse in the crematorium pyre.

Dulal Chandra Bandyopadhyay
16-08-2024
(Republished 29/12/2024)
Bangalore.
_______________________________________________





শনিবার, ২৮ ডিসেম্বর, ২০২৪

O Liberty, let the bird live

O Liberty, let the bird live

I fly above the sky, over the mounds and hills,
The oceans, rivers, cities, meadows and fields.
None but the dark or sombre clouds or mists,
Tempests, showers or hails hinder my sail.
But I fear not, neither furl my wings ever ;
Nor l throttle my voice of beauty and joyous life.
But I fear you, the man, bereft of mercy,

With fiery fierce gun in hand aiming at me
Lurking nowhere, to strip of my liberty,
To call upon Hell to my being, my existence !

O humanity, what benignity you've bestowed,
Brought upon the frail? but what did Prometheus  
To save Life and Civilization that you boast of,
And by that eternal damnation suffers nature
Is fire, in thousand form --  hatred, animosity,
Malice, hostality, detestation -- such and so on
Are flameless but more Infernal than the fire
That burns the corpse in the crematorium pyre.

Dulal Chandra Bandyopadhyay
16-08-2024
Bangalore.
_______________________________________________





বুধবার, ২৫ ডিসেম্বর, ২০২৪

Birth Day writes down the night of the Last Supper.

The Birth Day writes down the night of the 

Last Supper. 


Oh ! My running is now slowing down ;
For yonder I see a lightless world.
A waveless sea of gloom invisible,
And irresistible for me to plunge In.
The worrisome path of life, burdened with
Illusions, my soul finds redemption at last.
Sufferings I love more than the joyous Heaven.
Ask not why, as you know, my sweet heart,
For the whole humanity knows for sure
That the God Himself seeks assuagement
When His loving creature man holds out
His hands for a cup of blood nor of His'
But of his brother for the Last Supper.

Dulal Chandra Bandyopadhyay
December 25, 2o24
Kolkata.

সোমবার, ২৩ ডিসেম্বর, ২০২৪

বাঙলা ও বাঙালীর দুর্গতি --- পর্ব তিন।

বাঙলা ও বাঙালীর দুর্গতি --- পর্ব তিন, 

মানুষের ধর্ম ও আমরা বাঙলী। 


দ্বিতীয় পর্বে আলোচনা করেছি, বাঙালী কি 'সনাতনী' ?

সেই সূত্র ধরেই তৃতীয় পর্বের আরম্ভ এবং এই প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথের ভাবনা কি ছিল, সেটিও খোঁজার চেষ্টা করব আমরা। অবশ্য সমসাময়িক কালের রবিকরসমুজ্বল আরো কিছু বিদগ্ধ ব্যক্তিত্বের চিন্তার কথাও‌ অবধারিতভাবে এসেই যাবে।
বাংলা (অখণ্ড বাঙলা) শুধুমাত্র মুষ্টিমেয় কুলগর্বে উন্নাসিক কুলীন ব্রাহ্মণ, কায়স্থ, বৈশ্য সম্প্রদায়ের ভদ্রাসন ছিল এমন তো নয়। বর্তমানে 'বাঙালী' নামে  সামগ্রিকভাবে যে জনগোষ্ঠীকে আমরা চিনি সকলেই এক নরগোষ্ঠির লোক যে নয় তার সাক্ষী আছে বাঙালীর ইতিহাস। বিচিত্র ও বিভিন্ন নরগোষ্ঠীর লোক নিয়েই বৃহত্তর বাঙালী-জনের গঠন, যে জনসমষ্টি বহুদিন পর্যন্ত  আলাদা আলাদা কোমে বিভক্ত ছিল এবং শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে তারা কৌম জীবনেই অভ্যস্ত ছিল। নির্দিষ্ট একটি কোম এক একটি বিশেষ স্থান দখল করে স্ব-স্বতন্ত্রপরায়ণ স্ব-সম্পূর্ণ জীবন যাপন করত। অন্য কোমের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল অত্যন্ত ক্ষীণ বা ছিলই না একেবারে। বিধি নিষেধও ছিল কঠোর। যার ফলে বিচিত্র সব কোমের মধ্যে বৃহত্তর, ঐক্যবদ্ধ জনচেতনা গড়ে ওঠেনি  কখনোই। অতীত বাঙলার সেই বিচ্ছিন্ন, বহুধা বিভক্ত কৌমচেতনা আজও বিদ্যমান। আজও বঙ্গ জনসমাজ শতধা বিভাজিত। যে বাঙালী জাতিসত্তার কল্পমূর্তি অঙ্কন করে আমরা গর্ব বোধ করি তা আসলে তথাকথিত উচ্চবর্ণের বর্ণাভিমানের রক্ষণশীলপন্থী বিপ্লবসঞ্জাত কল্পনাবিলাস। 


বঙ্গ জনসমাজের এই যে বিষম কৌম বিভাজন তাইই বাঙালীকে কখনো সম্পূর্ণরূপে সুসংগঠিত হতে দেয় নি। দ্বাদশ শতাব্দীতে তুর্কীদের সর্বধংসী আক্রমণের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ছিল না। কেননা উন্নাসিক ব্রাহ্মণ্যগর্বী সমাজের বাইরে যে বিশাল অব্রাহ্মণ জনগোষ্ঠী ছিল তাদের সঙ্গে ঐ উচ্চবর্ণের রাজা ও রাজন্যবর্গের কোনরূপ একাত্মতা ছিল না। আজও তা নেই। সেদিনও এই সামাজিকভাবে অবহেলিত, অস্পৃশ্য, উচ্চবর্ণের পঙক্তি-ভোজনে ব্রাত্য প্রান্তিক মানুষদের কাছে ইসলামধর্মকে বরণ করতে দ্বিধা জাগেনি এবং ইসলাম পরবর্তী খ্রীষ্টান পাদ্রীদের উপদেশ গ্রহণ করতেও সঙ্কোচ হয় নি। বরং নিজের দেশের উচ্চবর্ণের উপেক্ষার, ঘৃণার আঘাত থেকে বাঁচার ও পরবর্তী প্রজন্মকে বাচাঁনোর জন্য তারা 'একগোষ্ঠী'-মানসিকতা-বিশিষ্ঠ ইসলামধর্মের শরণাপন্ন হয়েছিল। পরে 'ইসলাম' যখন 'রাজার-ধর্ম' হোল  তখন ধর্মান্তরিতদের 'ঐহিক ও পারলৌকিক' সুখের পর্যাপ্ত প্রতিশ্রুতি। তাই উমাপতি ধরের ন্যায় কবিকেও যবন প্রশস্তি লিখতে হয়েছিল। দ্বাদশ শতাব্দীতে সেন বংশ ধ্বংসকারী 'যবনবীরদের' বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার ক্ষমতা বঙ্গজনপদে না থাকার কারণ ছিল ঐ পূর্ব-উল্লেখিত জাতি বা বর্ণগত বিভাজন। উচ্চ বর্ণাভিমানীরা তখন কবি জয়দেবের দশাবতার স্তোত্রের বাহানা দিয়ে ভেবেছিলেন বা ভাবিয়েছিলেন যে ঘোড়সওয়ার তুর্কী আক্রমণকারীরা ঈশ্বরের কল্কি  অবতার।
উমাপতি ধর ছাড়াও তুর্কীবিজয়ের অব্যবহিত পরেকার লেখা রামাই পণ্ডিতের শূন্য পুরাণে বাঙালী 'হিন্দু'র মনোভাবের সামান্য পরিচয় পাওয়া যায়। 


"ধর্ম হৈলা যবনরূপী    শিরে পরে কাল টুপী
           হাতে ধরে ত্রিচক কামান
ব্রহ্ম হৈলা  মহম্মদ     বিষ্ণু হৈলা পেগম্বর
           মহেশ হৈলা বাবা আদম
দেখিয়া চণ্ডিকা দেবী    তেঁহ হৈলা হায়া বিবি।" 


এইরূপে ভয়ঙ্কর এক বিপর্যয় বাঙলার ভাগ্যাকাশে উল্কাপিণ্ডের আকস্মিকতায় নেমে এল। তুর্কীদের  আক্রমণে বাঙলার পুরাতন ধর্মধারণা, সংস্কার, যুগ যুগ আচরিত রীতি নীতি যখন বিধ্বস্ত তখন বিহ্বল বিক্ষিপ্ত  জনচিত্তকে দূরদৃষ্টিহীন সংকীর্ণবুদ্ধি ভাগ্যনির্ভর ধর্মোপদেষ্টারা স্তোকবাক্য দিলেন যে 'এ যে বিধাতার অমোঘ বিধান।'
ইংরেজদের আগমনকালেও সেই একই সমাজ-সংকট এবং ধর্মসংকট। এমন সব আধিভৌতিক, আধিদৈবিক (প্লাবন, অনাবৃষ্টি, মন্বন্তর) এবং  আধ্যাত্মিক (ধর্মান্তরণ) মহাবিপন্নতা, (যা সুদূর অতীতে নয়, দ্বাদশ শতাব্দী থেকে বিংশ শতাব্দী) প্রায় হাজার বছর ধরে ভোগ করার পর একটি স্খলিত, বহুধা বিভক্ত জাতির কাছ থেকে ঐক্যবদ্ধ একটি জাতিসত্তা আশা করা যায় কি ? 

"কাজেই মধ্য-পর্বের সুদীর্ঘ শতাব্দীর পর শতাব্দী জুড়িয়া বাঙালীর ভাগ্য বা দৈব নির্ভরতা ঘুচিল না, আত্মশক্তিতে বিশ্বাস ও ফিরিয়া আসিল না।"
উদ্ধৃত অংশটি বাঙালীর ইতিহাস রচয়িতা ও গবেষক নীহার রঞ্জন রায় মহাশয়ের। 


বঙ্গাব্দ ১৩৫৬ সাল নাগাদ এই পুস্তক যখন প্রকাশিত হয় তখনও এই বঙ্গভূমি অতীতের পর্যায়ক্রমিক বিড়ম্বনা থেকে মুক্তি পায়নি। লেখককে তখনও (ভূমিকায়) লিখতে হয়েছিল, "আজ গ্রন্থরচনা যখন শেষ হইল, রাষ্ট্রবিধাতার ইচ্ছা ও কূটকৌশলে দেশ তখন দ্বিখণ্ডিত এবং ভারতবর্ষের সঙ্গে তাহার অনাদিকালের নাড়ীর সম্মন্ধ বিচ্ছিন্ন। দুই হাজার বছরের ইতিহাসে বাঙলাদেশ কখনও এত গভীর এত ব্যাপক দুর্ঘটনার সম্মুখীন হয় নাই। ....... দুর্ভিক্ষ, রাষ্ট্রবিপ্লব,দেশচ্ছেদ, প্রান্তীয় দ্বেষ ও হিংসা, চারিত্রদৈন্য, আর্থিক দুর্গতি প্রভৃতি সকল শত্রু মিলিয়া আজ বাঙলা দেশকে এবং মূঢ় আশাহত বাঙালী জাতিকে চরম দুর্গতির মধ্যে আনিয়া ফেলিয়াছে।"
বাঙলা ও বাঙালীর ইতিহাস রচনা করে সমাপ্তির প্রান্তে দাঁড়িয়ে ঐতিহাসিকের বিষাদময় আর্তনাদ। বাঙলার  ১৯৪০-'৫০-য়ের এমন ঘনঘোর সঙ্কটের নিরাশার নিরালোক কী এড়ানো যেতো না ?
ঊনবিংশ শতক জুড়ে মুক্ত উদার মানসিকতার মানবিক আলো জ্বালানোর প্রয়াস হয়নি কি ?
হয়েছিল। বাঙলার নবজাগরণ মিথ্যা ছিল না। রাজা রামমোহন রায় (১৭৭২-১৮৩৩), ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগর (১৮২০-১৮৯১) থেকে শুরু করে ১৯৪১সালে বাঙলার শেষ রবি ভাগীরথীর কূলে অস্তমিত হওয়া পর্যন্ত যে কালখণ্ড তা ছিল এই বঙ্গভূমির নবচেতনার যজ্ঞাগ্নিশিখা প্রজ্বলনের যুগ, ক্রান্তিকাল (transition period). এই সময়কালে সমাজ সংস্কার, শিক্ষা-সংস্কৃতির বিস্তার, ইয়োরোপীয় জ্ঞানবিজ্ঞানের প্রচার ও অনুশীলন,  ধর্মধারণায় মানবতাবাদের সংযোজন, নারীশিক্ষার‌, নারী স্বাধীনতার প্রবর্তনা, কৃষিনির্ভরতার বাইরে শ্রমবাজার সৃষ্টি ও শ্রমবিপননের উদ্যোগ, জলপথ-স্থলপথ, রেলপথের মাধ্যমে যোগাযোগ ব্যবস্থার ক্রমোন্নন -- সমগ্র ভারতবর্ষের সঙ্গে বঙ্গদেশেও নবযুগের সূচনা যে করেছিল সেকথা অস্বীকার করবে কে ?
তা'হলে চল্লিশ-পঞ্চাশের দশকের ঐরূপ বিভীষিকাময় সামাজিক ও সাম্রদায়িক উপপ্লবের সৃষ্টি হোলই বা কেন ?  
১৯৪৬ - '৪৭ কবিতায় জীবনান্দ দাশ লিখছেন,
"বাঙলার লক্ষ গ্রাম নিরাশার আলোহীনতায় ডুবে
নিস্তব্দ নিস্তেল।
সূর্য অস্তে চলে গেলে কেমন সুকেশী অন্ধকার
খোঁপা বেঁধে নিতে আসে --- কিন্তু কার হাতে  ?
আলুলায়িত হয়ে চেয়ে থাকে -- কিন্তু কার তরে ?
হাত নেই --- কোথাও মানুষ নেই  ;
বাঙলার লক্ষ গ্রামরাত্রি একদিন
আলপনার, পটের ছবির মতো সুহাস্যা
পটলচেরা চোখের মানুষী হতে পেরেছিল প্রায়  ;
নিভে গেছে সব। ...........
সৃষ্টির মনের কথা মনে হয় দ্বেষ।" 


কিন্তু কেন ? এই প্রশ্নের মীমাংসা হয় নি, হয় না, হবেও না। অনাদ্যন্ত কাল থেকে বিশ্বসংসারে দুইটি বিশেষ  শিল্পকর্ম সমান্তরাল ভাবে ক্রিয়াশীল। একটি সৃজন, অন্যটি বিনাশ। বিজ্ঞানীরা বলেন একটি মহাসঙ্কোচ (আধুনিক বিজ্ঞানীদেরকে ভাষায় black hole বা কৃষ্ণ গহ্বর) তার চরমতম অবস্থায় মহাবিস্ফোরণের মধ্য দিয়ে বিনাশ পায়। এই বিনষ্টি শূন্যে লীন হয়ে যাওয়ার বিনাশ নয়। সে বিস্ফোরণ থেকে অনন্ত অসংখ্য জ্যোতির্কণা বা নক্ষত্রের জন্ম, নক্ষত্রের দেহাংশ ছিন্ন হয়ে গ্রহ, উপগ্রহ উল্কাপিন্ড, ধূমকেতুরা নাচতে থাকেন, তাঁদের স্রষ্টাকেই পরিক্রমণ করেন। একই সাথে ধংস আর সৃষ্টির দেবতা নটরাজের তাণ্ডবনৃত্যে উতরোল, উন্মত্ত এই অসীম, অপরিমেয় ব্রহ্মাণ্ড। 

ঋষিকবি রবীন্দ্রনাথ তাঁর একটি অতুলনীয় সঙ্গীতে  স্রষ্টার এই সৃজনরঙ্গের ছন্দটি ধরেছেন,
"তব নৃত্যের প্রাণ বেদনায়  বিবশ বিশ্ব জাগে চেতনায়
যুগে যুগে কালে কালে সুরে সুরে তালে তালে,
সুখে দুখে হয় তরঙ্গময় তোমার পরমানন্দ হে ..।"

স্রষ্টার নৃত্যলীলার সুরে তালে ছন্দে বিবশ (অচেতন) বিশ্বে সঞ্চারিত হোল চেতনা। বিষয়টি আমাদের প্রাসঙ্গিক আলোচনার আলোকবর্ষ দূরের ; তবুও এই কথাটি বলার যে বিশ্বলোকের উৎসস্রোতের তরঙ্গছন্দে জাগ্রত সেই 'চেতনার' আশীর্বাদ নিয়ে আবির্ভূত হয়েছে মানুষ। কিন্তু কোন্ জ্ঞানবৃক্ষের ফল খেয়ে তার সত্তার এমন আত্মবিস্মরণ, এবং একই সাথে আলোক পিপাসা আর তমসাভিসার ! কেন সৃষ্টি ও ধংসসাধনের যুগল প্রবনতা ?
এক দিকে মানবের অবিশ্বাস্য, অপরূপ সব সৃষ্টি ; আর অপরদিকে রক্তপিপাসায় আত্মহনন, ভ্রাতৃহনন। নারীঘাতী, শিশুঘাতী, কৃষ্টি-সংস্কৃতি-ধংসকারী, কুৎসিৎ বীভৎসা। কেন এহেন বৈপরিত্য ?
এই বৈপরীত্যের কারণ অনুসন্ধান করেছেন, করে চলেছেন কত না মহামানব, হাজার হাজার বছর ধরে আজ পর্যন্ত। কিন্তু জীবধর্ম ও জীবনধর্মের মূলের যে সূক্ষ্মতম ভিন্নতা আছে সেটি আমাদের উপলব্ধির অগোচরেই রয়ে গেল আজও। জীব ধর্মের যে দুটি প্রবনতায় মনুষত্ববোধ মোহগ্রস্ত তাদের একটি লালসা এবং অন্যটি  নৃশংসতা। এই প্রবনতা দুটি মানুষের জীবনধর্মের পরিপন্থী। সকল মানবের একত্বের ধারণার বিপরীতে দাঁড়িয়ে রয়েছে লুব্ধতা। লোভ সঞ্জাত করে মোহ এবং মোহভঙ্গে শোক।
বাঙালী জাতির একাত্মতাবোধের অভাবের জন্যই বাঙালী-জাতিসত্তা গড়ে ওঠেনি। ভবিষ্যতে গড়ে উঠবে এমন আশা করাও বৃথা। 

এবার বাঙলা ছাড়িয়ে সমগ্র বিশ্বের মানবতাহীন মানবসভ্যতার দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে কি বলা যায় ---- দীর্ঘ দীর্ঘ কাল অতিবাহিত হলে পর এমন এক যুগ আসবে এই পৃথিবীর বক্ষের উপর যখন সব ভুল সব ভ্রান্তি মূঢ়তা ইতরতা ও হিংস্রতা ধুয়ে মুছে যাবে, সব মানুষের বোধবুদ্ধি আলোকোজ্জ্বল, হৃদয় পবিত্র‌ এবং নিষ্কলুষ হবে ?
এমন এক আশাবাদে বিশ্বাস রেখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ  ১৯১৬-'১৭ সালের সময়কালে, যখন প্রথম বিশ্বযুদ্ধের নারকীয় অমানবিকতার দৃষ্টান্ত তাঁর গোচরে আসেনি।
তখন তিনি Personality শীর্ষক একটি বক্তৃতায় বলেছিলেন,
"The spiritual world which is being built of men's life and that of God, will pass its infancy of helpless falls and bruises, and one day will stand firm in its vigour of youth, glad in its own beauty and freedom of movement." 


তারপর তো দু' দুটো বিশ্বযুদ্ধ ! এবং আজও পৃথিবীর বুকজুড়ে নররক্তস্রোত অব্যাহত। আর বাঙলা ? এক কিম্ভুত ধর্মমোহে বাঙালী জাতিসত্ত্বা আজও 'হিন্দু' নামধারী একটি গোষ্ঠী এবং 'মুসলিম' পরিচয়ের অপর একটি সম্প্রদায়, বহুদিন একত্ববোধের তপস্যা করেও ছলনাশ্রয়ী রাষ্ট্র ব্যবস্থার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রশ্রয়ে আবার দুটি  যুযুধান পক্ষে বিভক্ত।
১৩১১ বঙ্গাব্দে এই সাম্প্রদায়িক বিভেদের আসন্ন অমঙ্গলের ইঙ্গিত পেয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ।  বিশ্বৈকানুভূতির বার্তা দিয়েছিলেন 'স্বদেশী সমাজ' রচনায়। 

"ইহাই নিশ্চয় জানা চাই, প্রত্যেক জাতিই বিশ্বমানবের অঙ্গ। বিশ্বমানবকে দান করিবার, সহায়তা করিবার সামগ্রী কী উদ্ভাবন করিতেছে, ইহারই সদুত্তর দিয়া প্রত্যেক জাতি প্রতিষ্ঠা লাভ করে। যখন হইতে সেই উদ্ভাবনের প্রাণশক্তি কোন জাতি হারায়, তখন হইতেই সেই বিরাট মানবকলেবরে পক্ষাঘাতগ্রস্ত অঙ্গের ন্যায় সে ভারস্বরূপ বিরাজ করে।"

আজ বাঙালীর জাতিসত্ত্বা একাধিক হিংসাশ্রয়ী  বিবদমান গোষ্ঠীতে ঘণ্ডে খণ্ডে বিচ্ছিন্ন। আধুনিকতার, আধুনিক সভ্যতার, উদার নিখিলভূবন-পরিব্যপ্ত মানবীয় ধর্মবোধের পরিবর্তে আজ বঙ্গবাসী হয় হিন্দু, নয় অ-হিন্দু। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকেই প্রশ্ন করি, তুমি কি 'সনাতনী' ? একই শব্দ প্রতিধ্বনিত হয়।
পাই না উত্তর।।

     (প্রবন্ধটি অসম্পূর্ণ রেখে দিয়েই প্রকাশ করা হোল। এটি এতখানিই গবেষণার দাবি রাখে যে সম্পূর্ণটি পুস্তকাকারে প্রকাশের বাসনা রইল।)
ঋণ স্বীকার
নীহার রঞ্জন রায় (বাঙালীর ইতিহাস),
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর,
জীবনান্দ দাশ,
আবু সৈয়দ আইয়ুব (পান্থ জনের সখা) এবং
অপরাপর গবেষকবৃন্দ।
দুলাল চন্দ্র বন্দোপাধ্যায়
৭ই পৌষ, ১৩৩১বঙ্গাব্দ।
২২শে ডিসেম্বর, ২০২৪। 

পরিমার্জিত 

২৪/৫/২০২৬ 

কলকাতা।

______________________________________________










শনিবার, ১৪ ডিসেম্বর, ২০২৪

বাঙলা ও বাঙালীর চিরন্তন দুর্গতি। ---- পর্ব দুই। বাঙালী কি সনাতনী ?


বাঙলা ও বাঙালীর চিরন্তন দুর্গতি ---পর্ব দুই। 

বাঙালী কি 'সনাতনী' ? 

(পরিমার্জিত সংস্করণ)

বঙ্গবধূ, পোড়ামাটির ফলক, চন্দ্রকেতুগড়। 
সৌঃ বাঙালীর ইতিহাস/ নীহার রঞ্জন রায়।

সমগ্র হিন্দুধর্মকে সনাতন বলা যায় কি ?
এই প্রশ্নের উত্তরে প্রথমে আমরা দেখি সনাতন শব্দের আভিধানিক অর্থ। সনাতন শব্দের অর্থ যা চিরন্তন, শাশ্বত, নিত্য, চিরস্থায়ী, অক্ষয় বা অপরিবর্তণীয়। এই শব্দার্থের নিরিখে বিচার করলে দেখা যাবে হিন্দুধর্ম শাশ্বতও নয়, অপরিবর্তনীয়ও নয়। কাজেই সামগ্রিকভাবে হিন্দুধর্মকে সনাতন ধর্ম বলার মধ্যে অনেকখানি ভ্রান্তি আছে।
বাবরি মসজিদ ধ্বংসের (৬ ডিসেম্বর, ১৯৯২) পরে পরেই তৎকালীন দেশ পত্রিকার একটি বিশেষ সংখ্যায় সুপণ্ডিত অমলেশ ত্রিপাঠী মহাশয় লিখেছিলেন, 

"সমগ্র হিন্দুধর্মকে সনাতন বলা অনৈতিহাসিক।‌ তা দীর্ঘদিনের, চিরকালের নয়। অনার্য, প্রাগার্য্য, আর্য, বাহ্লিক, গ্রীক, মধ্য এশিয়ার যাযাবরদের নানা জাতিগোষ্ঠি, নানা ভাষাভাষী, নানা প্রগতিশীল এবং অনগ্রসর সংস্কৃতির যে মিলনের ছবি রবীন্দ্রনাথ দেখেছেন, তা গভীর ঐতিহাসিক দৃষ্টির পরিচায়ক।"
ঐতিহাসিক সমাজবিবর্তনের ফলেই গড়ে উঠেছে জাতিভেদ, জন্মান্তরবাদ, কর্মতত্ব ---- বৃক্ষ, যক্ষ, নাগ থেকে বিষ্ণু, শিব, শক্তি। এসেছে গৌতম বুদ্ধের ধর্মধারণার নিরীশ্বরবাদী তত্ত্ব। প্রচলিত হয়েছে নানা দেবতার পূজা, তন্ত্রমন্ত্র ? উপনয়ন, বিবাহ, শ্রাদ্ধের মত মন্ত্রপুত, আচারসর্বস্ব অনুষ্ঠান। পরবর্তীকালে সেই বিধি বিধান নিয়ন্ত্রিত অনুষ্ঠানগুলি লোকাচারে কৌলিক ও সামাজিক হয়ে দাঁড়ালো। ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলি যেমন যাগযজ্ঞ, পূজা, উপাসনা, ব্রত, পার্বণ, বিধিবিধান পালন। অনার্য বা মূল দ্রাবিড়ীয় ধর্মধারণার সঙ্গে মিলন ও মিশ্রণের (assimilation) ফলে বিভিন্ন দেব দেবীর বিগ্রহ --- মূর্তি, প্রতিমার সৃষ্টি হোল। সে সকল বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা, রক্ষা, ধর্মালোচন পূজার্চনার জন্য গড়ে উঠল মন্দির, আশ্রম, আখড়া। ইসলামের মসজিদ, খ্রীষ্টানদের গীর্জা এবং বৌদ্ধ-জৈনদের স্তুপ, প্যাগোডা, মঠের কাহিনী অন্যরকম ; অন্য সময় সে কাহিনী বিস্তারে আলোচনা করা যাবে। 


এবার ধর্ম নিয়ে দু'কথা বলে আমরা হিন্দুধর্মে ফিরে যাব। বুৎপত্তিগতভাবে ধর্ম হোল তাই যা ধারণ করে। কাকে ধারণ করে, ব্যক্তি মানুষকে না মনুষ্য সমাজকে ? শুধুমাত্র তাদেরকে, যারা ধর্ম শব্দটির প্রথম আমদানি করেছে, অর্থাৎ ভারতবর্ষের প্রাচীন আর্যদের, নাকি সমগ্র বিশ্বচরাচরকে ? প্রাচীন আর্যদের শ্রুতি বলে, ধর্ম হোল 'ঋত', শাশ্বত সত্য, (পরমাত্মা বা ব্রহ্ম) যা বিশ্বকে --- ভূতরূপ ব্রহ্মাণ্ডকে নিয়ন্ত্রণ করে অর্থাৎ যা বিশ্ববিধান, যা চিরসত্য। যাকে লাভ করতে হলে তপস্যা ও ধ্যানের পথ অবলম্বন করতে হবে এবং যাকে লাভ করলে অন্তরাত্মা একাধারে  চিদানন্দ ভোগ করবে ও মোক্ষ লাভ করবে। জীবাত্মার তাইই শেষ উদ্দিষ্ট ও পরম গতি। প্রথমত তার উপলব্ধির মধ্যে এই সত্য প্রতিভাত হবে যে প্রাণের উৎসে আছে সৃষ্টির আনন্দ এবং শেষ সঙ্গমেও আছে আনন্দ। 


"আনন্দাদ্ধেব খল্বিমানি ভূতানি জায়ন্তে
আনন্দেন জাতানি জীবন্তি
আনন্দং প্রয়ন্তাভিসংবিশন্তি।।"
                   -----তৈত্তিরীয় উপনিষদ। 

এই আনন্দই জীব চৈতন্যের উ্যৎস, আনন্দেই তার স্থিতি এবং আনন্দেই তার বিলয়।
ধর্মের এই সংজ্ঞা (defininition) কি খ্রীষ্টান, মুসলিম বা ইহুদীদের মত বড় বড় ধর্মপ্রতিষ্ঠানগুলি মানবেন? হিন্দুরাই(?) মানবেন কি ? বেদবাদী মীমাংসকরা তো বেদে নির্দেশিত ক্রিয়াকর্ম মানে, ঈশ্বরে বিশ্বাস করে না। এদিকে গীতা-প্রবক্তা স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন ধর্ম লোকহিতে, ধর্ম বেদে নেই। 
এবারে পাশ্চাত্য পণ্ডিত দার্শনিকদের কাছে ধর্মের সংজ্ঞা তো বিচিত্র, বিভিন্ন। স্পিনোজা ঈশ্বরে ব্যক্তিত্ব-আরোপন মানেন না কিন্তু ঈশ্বরে নিবেদিতপ্রাণ। এইভাবে কান্ট বললেন ধর্ম হোল 'লক্ষ্যস্থল' (জীবনের চরিতার্থতার চুড়ান্ত স্থান) ; কিছু নীতি (principles) এবং নৈতিকতাবোধ (morality), যেগুলি মানুষকে ঐ লক্ষ্যস্থলে পৌঁছে দিতে সাহায্য করে। এইরপর ফ্রয়েড, রুডলফ অটো, ব্রাডন, আঁদ্রে মনরো, সার্ত্রে, কার্ল মার্কস প্রভৃতি দার্শনিকরা ধর্মের নানাবিধ ব্যাখ্যা দিয়েছেন।  সকলেই শেষ সিদ্ধান্তে নীতিবাদী। তারই মধ্যে ফ্রয়েড মহাশয়, মার্কস মহোদয় এবং ব্রাডন স্যারের সিদ্ধান্ত একটু আলাদা আলাদা।
"ধর্ম হচ্ছে একটা কাল্পনিক আশ্বাস, একটা যৌথ বিকার, মরীচিকার ছলনা।"---সিগমুন্ড ফ্রয়েড।
"ধর্ম হোল বিচ্ছিন্ন মানুষের (alienated) জাতিসত্তার  কল্পনা, আফিং জাতীয় নেশার বস্তু।" ----কার্ল মার্কস।
(আফিংয়ের সঙ্গে, এই লেখকের  মতে, গাঁজা বা hashis যোগ করলে ভালো হোত কেননা এই পোড়া দেশে আমার মতো বাউলবাবা ও আমার বন্ধুর মতো ভষ্মমাখা সাধুবাবারা তাহলে বেজাই খুশী হোতাম)। 

"ধর্ম হচ্ছে মানুষের শঙ্কিত মৃত্যুচেতনার প্রতিক্রিয়া।"
                               ---এস জি এফ ব্রাডন। 


মহান অস্তিত্ববাদী গ্রীক দার্শনিক, পিথাগোরাসের গুরু থেলিস আমাদের উপনিষদের ঋষিদের মতই বলেছেন,
"ধর্ম হোল মানুষের নিজেকে অতিক্রম করে পরমের  (ultimate) অভিমুখে যাত্রার আকুতি।"  

এগুলি তো হোল ধর্ম নামক একটি বিমূর্ত আদর্শের দিক। কিন্তু ধর্ম বলতে আমরা ঐ বিমূর্ত আদর্শকে পালন করি না। পালন করি, লালন করি কিছু অনুষ্ঠান, কিছু  প্রচলিত সংস্কার, কিছু অভ্যস্ত রীতি। হিন্দুদের যাগযজ্ঞ পূজা উপাসনা ব্রত পার্বণ, জন্ম বিবাহ শ্রাদ্ধের সময়ে কিছু কৌলিক ও সামাজিক সংস্কার। তেত্রিশ কোটি না হলেও অন্তত গোটা তেত্রিশটি বা গোটা পঞ্চাশেক দেব দেবীর ভিন্ন ভিন্ন মন্ত্র-তন্ত্র উচ্চারণ করা, দেব দেবীদের পছন্দ মাফিক (individual choice) নৈবেদ্য নির্মাল্য জোগাড় করাও ধর্মাচরণের মধ্যে পড়ে। সমস্ত অনুষ্ঠান, সামাজিক কৌলিক এবং কখনো কখনো ব্যক্তিক যেগুলি ভারতের অ-মুসলমান, অ-খ্রীষ্টানরা পালন করেন -- সমস্তই ধর্ম। সমবেতভাবে দুর্গাপূজার অঞ্জলি দেওয়া যেমন ধর্ম তেমনি একজন পৈতেধারীর (স্বঘোষিত ব্রাহ্মণ) একান্তে গায়ত্রীমন্ত্র জপ করাও ধর্ম। (মুসলমান, খ্রীষ্টান, বৌদ্ধ বা আদিবাসী সম্প্রদায়ের ধর্মাচরণ ভিন্ন প্রসঙ্গ)। 

বাঙলার লোকায়ত ধর্মের সঙ্গে মৌলিক আর্য-ধর্মের, (যে পুরাতন ধর্মধারণা ও ধর্মাচরণ বেদ-বিহিত, ব্রাহ্মণ-উপনিষদ গ্রন্থ এবং সাংখ্য-মীমাংসা-স্মৃতিশাস্ত্র  অনুমোদিত) কোন সাদৃশ্য নাই। মনসা মঙ্গল, চণ্ডীমঙ্গল, অন্নদা মঙ্গলের দেবতারা আর যাই হোন আর্যদের দেবদেবী নন। 

পৌরাণিক কাল থেকে আরেকটি ধর্মধারণার চিন্তা প্রাধাণ্য লাভ করে এবং শ্রেষ্ঠতম ধর্ম বলে বিবেচিত হয়। সেটি সর্বমানবের ধর্ম---মনুষ্যধর্ম বা মানবধর্ম। এই ধর্ম সম্পূর্ণ অ-প্রাতিষ্ঠানিক, অসাম্প্রদায়িক এবং অনুষ্ঠান বর্জিত। মহাভারতে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধারম্ভের প্রাককালে জয়াকাঙ্ক্ষী দুর্যোধন মাতা গান্ধারীর নিকট আশীর্বাদ প্রার্থনা করলে দেবী গান্ধারী বলেছিলেন, "যতো ধর্মস্ততোজয়ঃ।" ব্যাসদেব তাঁর ঔরসপুত্র ধৃতরাষ্ট্রকে যুদ্ধ থেকে নিবৃত্ত করার বিফল চেষ্টায় হতাশ হয়ে শেষে ঐ একই কথা বলেছিলেন। এ কোন গ্রন্থনির্ধারিত ধর্ম নয়। কোন religion নয়। গীতায় শ্রীকৃষ্ণের বাণীর প্রতিধ্বনি করে বঙ্কিমচন্দ্রও বলেছেন, ধর্ম লোকহিতায়--লোকের হিতসাধনই ধর্ম। এই ধর্ম কোন শাস্ত্রীয় ধর্ম নয়। মানুষের, সমাজের হিতসাধন ধর্ম না হোক্, অহিতসাধন যে অধর্ম তা কোন ধর্মধারণাই অস্বীকার করতে পারে না। 

 মিথ্যাচার, হিংসা, বিদ্বেষ, স্বার্থপরতা, শঠতা --- এই সব অপগুণগুলি নৈতিকতার পরিপন্থী এবং অবশ্যই 'অধর্ম'। একই প্রকারে হনন, লুণ্ঠন, নারী নির্যাতন, শিশুনিধন, ধর্ষণ -- এগুলিকেও তো মানবিক বিবেক, মানব সমাজের বিচার অনুমোদন করে না। তা হলে এই সিদ্ধান্তে উপনিত হওয়া যায় যে ধর্ম হোল তাই যা বিশ্ব-মানবজাতির মঙ্গল বিধান করবার জন্যে আচরণীয় সংস্কার। যে সংস্কার বা সংস্কারগুলি আচরণীয় তা হোল কর্ম। এই কর্মের নিরিখে ধর্মের বিচার হোক্ সমাজবিবেক তথা বিশ্ববিবেকের আদালতে।‌ সেই বিচার নরবলি, নারীঘাতী শিশুঘাতী, কৃষ্টি-সংস্কৃতি-ধংসকারী যুদ্ধ, দাঙ্গার মত বীভৎসাকে অনুমোদন করবে না। পরিবর্তে প্রেম, অহিংসা মৈত্রী করুণার মত মানবোচিত সদ্গুণের পক্ষেই রায় দান করবে --  (deliverance of supreme Verdict)। এটিকেই 'মানব সভ্যতার ধর্ম' রূপে গ্রহণ ও লালন করার মধ্যে দ্বন্দ্ব থাকবার কথা নয়।

                                দুই 

বাঙলার জাতিতত্ত্ব ও মিশ্রিত জাতিসত্তা।


"বাঙালী জাতির যুগে যুগে আগত সুদীর্ঘ জাতিপ্রবাহের ইতিহাস আলোচনায় একটি সুস্পষ্ট তথ্য‌ ধরা পড়ে। সেটি এই : নরত্ত্বের দিক হইতে বাঙলার জনসমষ্টি মোটামুটি দীর্ঘমুণ্ড, দীর্ঘ ও মধ্যোন্নতনাস মিশর-এশীয় বা মেলানিড, বিশেষভাবে গোলমুণ্ড, উন্নতনাস আলপাইন বা পূর্ব-ব্রাকিড, এই তিন জনের সমন্বয়ে গঠিত। নিগ্রবটু রক্তের স্বল্প প্রভাবও উপস্থিত, কিন্তু তাহারা সমাজের খুব নিম্নস্তরে এবং সংকীর্ণ স্থান- গণ্ডির মধ্যেই আবদ্ধ। মঙ্গোলীয় রক্তের কিছুটা প্রভাব আছে, কিন্তু তাহাও উত্তর ও পূর্বদিকে সংকীর্ণ স্থানগণ্ডির সীমা অতিক্রম করে নাই। আদি-নর্ডিক বা খাঁটি 'ইণ্ডিড্' রক্ত প্রভাবও অস্বীকার্য, কিন্তু সে ধারা অত্যন্ত শীর্ণ ও ক্ষীণ। মোটামুটিভাবে ইহাই বাঙলা ভাষাভাষী জনসৌধের চেহারা এবং এই জনসৌধের উপরই বাঙালীর ইতিহাস গড়িয়া উঠিয়াছে। এই বিচিত্র সংকর-জন লইয়াই বাঙলার ও বাঙালীর ইতিহাসের সূত্রপাত।"

       - 'বাঙলার ইতিহাস'-- নীহার রঞ্জন রায়। 


গবেষক নীহার রঞ্জন রায় আরো একটি সাহসী ও সত্যকথা লিখেছেন যে, বস্তুত বাঙালী ব্রাহ্মণ- বৈদ্য-কায়স্থ জনতত্ত্বের দিক হইতে একই (বর্ণসংকর)গোষ্ঠীর লোক বলিলে কিছু অবৈজ্ঞানিক কথা বলা হয় না।
বাংলায় সেন রাজাদের আগে প্রায় তিন'শ বছর পাল রাজবংশ রাজত্ব করে। পাল রাজারা ছিলেন বৌদ্ধধর্মের পৃষ্টপোষক। বেদবাদী, ব্রাহ্মণ্যবাদী উত্তর ভারতের উন্নাসিক উচ্চবর্ণের লোকেরা বৌদ্ধ ধর্মকে 'সনাতন' আখ্যা দিতে চায়না। কারণ বৌদ্ধধর্ম বর্ণবিভেদ স্বীকার করে না। কাজেই সেন রাজত্বের আগে বঙ্গদেশে 'সনাতনী' ধারণার অস্তিত্বই ছিল না। এবং সেই জন্যই সেন বংশের (দক্ষিণ ভারতীয় দ্বিজরাজ ওষধিনাথ বংশের উত্তরাধিকারী) দ্বিতীয় রাজা বল্লাল সেন উত্তর ভারতের 'উপাধ্যায়' গোষ্ঠীর কিছু লোককে এনে ব্রাহ্মণ্য সংস্কারের  প্রচলন করেন এবং পরবর্তী সময়ে কৌলিণ্য প্রথা প্রচলিত হয়। 


"আচারো বিনয়ো বিদ্যা প্রতিষ্ঠা তীর্থদর্শনম। 

নিষ্ঠা বৃত্তি তপো দানম্ নবধা কুললক্ষণম্।।" 


এই গুণভিত্তিক কৌলিণ্য প্রথা পরে বংশভিত্তিক হয়ে যায় এবং কিছু অমানবিক, নিষ্ঠুর সামাজিক সংস্কারের জন্ম দেয়। তারি ফলস্বরূপ বাল্য বিবাহ, বহুবিবাহ,‌ সহমরণ, অনুমরণ এবং অন্তর্জলী যাত্রার মত নারকীয় ও বীভৎস সামাজিক অবশ্যকৃত্যগুলির প্রবর্তন হয়েছিল। কাজেই এমনতর একটি ব্রাহ্মণ সমাজকে সনাতনী হিন্দু সমাজ বললে 'সনাতন' শব্দটির কোন গরিমা থাকে কি ? 

আবার বর্তমানে সনাতনপন্থী 'হিন্দু' -- এরূপ একটি সাম্প্রদায়িক ধারণার উদ্ভব ঘটেছে এবং সেটির প্রচার চলেছে আগ্রাসী তৎপরতায়। প্রথমত হিন্দু শব্দটি বৈদিক বা সংস্কৃত শব্দ নয়। যদিও পণ্ডিতদের মতে এটি সিন্ধু শব্দের অপভ্রংশ। শব্দটি, গ্যাভিন ফ্লাডের মতে ফার্সী উচ্চারণ ( অর্থ -- বৃহৎ জলের আধার, অর্থাৎ সিন্ধু নদের পারে যারা থাকে)। এবারে 'হিন্দু' বলতে আমরা যদি ধরেও‌ নি 'প্রাচীন, পরিশুদ্ধ, অবিমিশ্র আর্য জাতি', তবে তারা এখন কোথায় ? সুদূর অতীতের, প্রায় পাঁচ থেকে দশ হাজার বছর পুর্বেকার একটি জাতিগোষ্ঠি যারা মধ্য এশিয়া থেকে দলে উপদলে বিভক্ত হয়ে ছড়িয়ে পড়েছিল ইউরোপে, এশিয়াখণ্ডের বিভিন্ন স্থানে --- যুগ যুগান্ত পরে কি আমরা দাবি করতে পারি  আমাদের রক্তের সেই সুপ্রাচীন অবিমিশ্র পরিশুদ্ধতা ? আমাদের পুরাণ কাহিনীগুলির উদাহরণ দিয়ে দেখানো যায় কতকাল আগে থেকে আমরা আর্য ও ন-আর্যর  মিলিত, মিশ্রিত রক্ত বহন করে চলেছি। তারপর তো এই ভারতের মহামানবের সাগরতীরে 'শক্ হুনদল, পাঠান মোগল এক দেহে হোল লীন'। আবার দু'শ বছরের ইংরেজ আধিপত্য (সর্বক্ষেত্রেই) এখনো অর্বাচীন, অমলিন।‌ আর বাঙলা ? সে তো ছিল 'ডাচ-ফরাসী-মগের মুলুক'।
তাহলে সনাতনী হিন্দু কাদের বলব ? নিরামিষাশী  বৈষ্ণবদের নাকি  আমিষাশী শাক্তদের ? (খাদ্যাখাদ্য নিয়ে বেশী কথা এখানে নয়, সে কথা রামায়ণের রামচরিত  আলোচনায় সবিস্তারে বিবৃত করেছি।)
তাই বেদ, ব্রাহ্মণ (বেদেরই অংশ), পুরাণ মন্থন করে এই মীমাংসকরা, নির্দিষ্ট করে‌ ধর্মধ্বজীরা বলতে পারবেন না, ভারতবর্ষে সনাতন কারা। বাংলায় তো, আমার মতে, সনাতনী সুদুর্লভ। 


                      (ক্রমশঃ)
(পরবর্তী পর্ব তিন। সে পর্বে রবীন্দ্র দর্শনে 'মানুষের ধর্ম ' ও বঙ্গবাসী।)
দুলাল চন্দ্র বন্দোপাধ্যায়
২৩/০৫/ ২০২৬
কলকাতা ।
_____________________________________

  





রবিবার, ৮ ডিসেম্বর, ২০২৪

বাঙলা ও বাঙালীর চিরন্তন দুর্গতি

বাঙলা ও বাঙালীর চিরন্তন দুর্গতি,---পর্ব ১ 

 ‌        (পরিমার্জিত সংস্করণ)


শিল্পবিশ্বের অবিস্মরণীয় ভাস্কর অগুস্ত রঁদা (Auguste Rodin, 1840--1917) চেয়েছিলেন --- 'ধর্ম নয়, রাষ্ট্র নয়, মানুষ --- ব্যক্তি মানুষ, তার মন, তার দুঃখ, তার আনন্দ, তার অন্তরের আলো আঁধারের অপার বিশ্বকে তিনি ধরে রাখবেন তাঁর সৃষ্টিতে।' ধরে রেখেছেনও। তাঁর‌ সৃষ্ট The Thinker, The Kiss, The Gates of Hell, Monument to Balzak, Adam -- এসকল ভাস্কর্যগুলি যাঁরা দেখেছেন তাঁরা জানেন কী আকাশ-উদার দৃষ্টিভঙ্গিতে তিনি জগৎ এবং এই জগতের একমাত্র চিন্তাশীল মানব নামক প্রাণীটিকে দেখেছেন।'
তেমন আকাশের মত উদার, সাগরের মত দৃষ্টিতে বাঙলার শিল্পী, সাহিত্যিক, দার্শনিকরাও তো 'জীবন, জগৎ, দেশ ও কাল'-কে ধরেছিলেন, ধরেছেন। ভুলে যাব কি জয়দেব-চণ্ডীদাসের আমল থেকে রবীন্দ্রনাথ- নজরুলের সময়কাল পর্যন্ত কবিদেরকে, ভুলে যাব কি মহাশিল্পী ধীমান ও ভিত্তিপাল থেকে থেকে আরম্ভ‌ করে রামকিঙ্কর বেইজ, মীরা মুখোপাধ্যায় ও শেলিম শেখের মত মহান শিল্পীদের।‌ সুর-সঙ্গীতের জগতে চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন ও থাকবেন আলাউদ্দিন খাঁ, বড়ে গোলাম আলি, আলি আকবর খাঁ, পণ্ডিত রবিশঙ্কর, শিশিরকণা ধরচৌধুরী ; গোপেশ্বর বন্দোপাধ্যায় থেকে শুরু করে ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায় ও দিলীপ রায়। এ সকলি তো গুটিকয় উদাহরণ মাত্র। আরো কত যে ছিলেন, কত যে রয়েছেন। ছিলেন লালন ফকির, হাসান রাজা, ছিলেন আব্বাসউদ্দিন, ভবা পাগলা।
রবীন্দ্রসঙ্গীত ও নজরুল গীতি --- এই দুই সঙ্গীতধারা গঙ্গা-পদ্মার যুগ্মধারার মতো একই উৎসমুখ --- আবহমান কালের বঙ্গের হৃদয়গঙ্গোত্রী হতে উৎসারিত হয়ে, এপার ওপার দুপারের আনন্দবেদনার ঊর্মিমালা-মুখরিত কলকলোচ্ছ্বাস সৃজন করেছে, বহন করে চলেছে নিরন্তর, চলবেও অনন্তকাল ধরে। আমি রবীন্দ্র-নজরুল ভক্ত ঝাড়খণ্ডী, তাই নিরপেক্ষ বিচারে বলি, বাঙলা দেশে নজরুলের উপর যে গভীর ও শ্রদ্ধালু গবেষণা হয়েছে, হচ্ছে আজও এবং রবীন্দ্রনাথের ও নজরুলের গান যে আন্তরিক আবেগে গীত হয় তেমনটি আমি এপার বাঙলায় কম দেখি। বাঙলাদেশে এই দুই ধারার শিল্পসম্পদ এখনো তেমন দৃষ্টিকটুভাবে বানিজ্য্যকরণ প্রবনতার মধ্যে আসেনি। দু'দেশের পূর্বতন ও বর্তমানের অনেক মহান শিল্পীদের ক্ষেত্রে এমন সাধারণ বিচার খাটে না --- সে কথাও স্বীকার করি। যদিও বর্তমানে ধর্মীয় সংকীর্ণতামুক্ত সংগীত ও শিল্পচর্চা বাঙলা দেশে যথেষ্টই কুণ্ঠিত। 

দুই বাংলার রবীন্দ্র সঙ্গীত ও নজরুলগীতির এত বিপুল সংখ্যক মধুকণ্ঠ শিল্পী ছিলেন এবং এখনো আছেন যাঁদের নামের তালিকা এতই দীর্ঘ যে সকলের নামের উল্লেখ একটি সংক্ষিপ্ত নিবন্ধের পক্ষে দুর্বহ। অবশ্য এই নিবন্ধটির উদ্দেশ্যও তা নয়। 

আলোচনার প্রারম্ভেই বাঙলার শিল্পকলা বিষয়ে দু'কথা বলা এই কারণেই যে বাঙলা, এপার ওপার মিলিয়ে বাঙলার যে জাতিসত্তা ---- তার একটি অখণ্ড রূপ আছে, এবং একটি মানস-বিগ্রহ আছে। বাঙলার সে রূপের দেখা পাই ভৌগলিক সমতা বা সমরূপতার সৌন্দর্যে ; আর মানস-বিগ্রহের হৃদয়াবেগের অভিব্যক্তি অনুভব করি অবিভাজ্য শিল্প-চেতনায় --- সঙ্গীতে, সাহিত্যে, শিল্পকলায়, ঐতিহ্যে, কৃষ্টিতে ও সংস্কৃতির প্রকাশভঙ্গিমায়। এই যুক্তিতে মিল ও মিলন তো স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু পরিস্থিতি তাহলে অস্বাভাবিক হয়েছিল, হয়েছে, হচ্ছেই বা কেন ? এই প্রশ্নের উত্তর সহজ নয়, জটীল। তাও আবার শব্দ প্রয়োগে সামান্য অসতর্ক হলে যাচিত বিড়ম্বনায় জড়িয়ে পড়ার প্রবল সম্ভাবনাও আছে।
সে কথা মনে রেখেই বলি, পরিস্থিতির অস্বাভাবিকতার মূল কারণ ধর্ম। বঙ্গভূমির যে ভৌগলিক বিভাজন ঘটেছে তার কারণ ধর্ম, আর একই জাতি সত্তার বিভাজনের কারণও ধর্ম বা ধর্মধারণার ভিন্নতা। এই ধর্মধারণার ভিন্নতা হেতু ধর্মাচরণের মত পথ ও আচরিত সংস্কার আলাদা আলাদা --- মসজিদ ও মন্দির, ভগবান ও আল্লাহ। এই আপাত ভিন্নতার গভীরে, ধর্মীয় দর্শনের অন্তঃস্তলে কোন ভিন্নতা নাই। শুধু মহান ইসলাম বা মহান  হিন্দুধর্ম নয় পৃথিবীর সকল ধর্মের শেষ গন্তব্য সেই নিখিল পরিব্যপ্ত সর্বময় মহাসত্তা, জগৎস্রষ্টা। তাঁকে যে সম্বোধনেই ডাকি না কেন --- তিনিই পূজার্হ, তিনিই প্রার্থিত, তিনিই অভীষ্ট, তিনিই প্রারম্ভ, তিনিই অন্তিম এবং শেষ গতি।

ধর্ম নিয়ে আলোচনা বা বিশ্বের শ্রেষ্ঠ দুটি ধর্মদর্শনের ব্যাখ্যা করবার উদ্দেশ্যও এই প্রবন্ধটির নয়। উদ্দেশ্য বাঙালী জাতির অহেতুক অন্তর্দ্বন্দ্ব বিষয়ে দু'কথা বলা। ১৯৩৫ সালে রবীন্দ্রনাথ গবেষক চিন্তাবিদ ও প্রাবন্ধিক আবদুল ওদুদকে একটি চিঠিতে একটি মর্মান্তিক প্রশ্ন করেছিলেন, "আমরা দুইটি সম্প্রদায় কি সর্বনাশের শেষদিন পর্যন্ত পরস্পর বিদ্বেষ করেই যাব ?"


                      দুই 


প্রথম বিশ্বযুদ্ধের (১৯১৭ থেকে ১৯১৯) ভয়াবহতা লক্ষ্য করে বিশ্বের সারস্বত সমাজের বহু মানুষ রবীন্দ্রনাথ, রোমা রঁলা, আইনষ্টাইন, হারম্যান হেসে, স্টিফেন জিউইগ, সিগমুন্ড ফ্রয়েড, জরজেস ধূমেল প্রভৃতি. ... যুদ্ধের বিরুদ্ধে প্রচার করে গিয়েছেন অনলসভাবে। আন্তর্জাতিক সমিতি গঠন করেছিলেন, পরস্পর পত্রালাপ ও বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রনায়কদের কাছে দরবার করে যুদ্ধের অমানবিক নিষ্ঠুরতার দিকটি উন্মোচিত করে মরণ ও মারণলিপ্সা থেকে মানুষকে বাচাঁনোর চেষ্টা করেছিলেন, যুদ্ধ নামক নেশা (warphobia) থেকে যুদ্ধবাজ দেশগুলিকে বিরত থাকার কাতর আবেদন করেওছিলেন ("The Project of Declaration of Independence of The Spirit") ; কিন্তু তাঁদের সমস্ত প্রয়াস ব্যর্থ করে দ্বিতীয় মহাসমরের  (১৯৪৯-১৯৪৫) অনিবার্যতাকে স্বীকার করে নিতে হয়েছিল মানব সভ্যতাকে। 'সভ্যতার সঙ্কট' লিখতে হয়েছিল রবীন্দ্রনাথকে। 

"আজ আমার বয়স আশি বৎসর পূর্ণ হোল,..." জীবনের শেষ জন্মদিনে কবি লিখছেন, (শাশ্বত সত্যের সাধক, সত্যদ্রষ্টা ঋষিকবির অন্তর্দৃষ্টিতে ধরা পড়েছিল কি ১৯৪৬--'৪৭-য়ের তাঁর সোনার বাঙলার আসন্ন নারকীয় আত্মহননের দৃশ্য, কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধারম্ভের প্রাককালেই কৃষ্ণ যেমন অর্জুনকে দেখিয়েছিলেন যুদ্ধের অন্তিম পরিণাম ?)
"সভ্যশাসনের চালনায় ভারতবর্ষের সকলের চেয়ে যে দুর্গতি আজ মাথা তুলে উঠেছে সে কেবল অন্ন বস্ত্র শিক্ষা এবং আরোগ্যের শোকাবহ অভাব মাত্র নয় ; সে হচ্ছে ভারতবাসীর মধ্যে নৃশংস আত্মবিচ্ছেদ, যার কোন তুলনা দেখতে পাইনি ভারতবর্ষের বাইরে মুসলমান স্বয়ত্বশাসন-চালিত দেশে। কিন্তু এই দুর্গতির রূপ ক্রমশই প্রকট হয়ে উঠেছে, সে যদি ভারতের ঊর্দ্ধ্বস্তরে কোন এক গোপনকেন্দ্রে প্রশ্রয়ের দ্বারা প্রোষিত না হোত তাহলে কখনোই ভারত-ইতিহাসের এতবড়ো অসভ্য, কুৎসিত পরিণাম ঘটতে পারতো না।"

দুটি নিদারুণ ও মর্মান্তিক সত্যের বাক্যবন্ধ ---
'অতি নৃশংস আত্মবিচ্ছেদ' এবং "ভারতশাসন-যন্ত্রের ঊর্দ্ধ্বস্তরে কোন এক গোপন কেন্দ্রে-- বাঙলার, বাঙালীর দেহ ও আত্মা ব্যবচ্ছেদের ষড়যন্ত্র !" সেই নির্মম রাষ্ট্রীয় ষড়যন্ত্রের বিষময় পরিণতি হাতে হাতে। উন্মাদ উন্মত্ত সাম্প্রদায়িক তাণ্ডবে লণ্ডভণ্ড হয়ে গেল যুগ যুগ সাধিত মানবতার পাদপিঠ। বঙ্গজননীর শ্যামলাঞ্চলে রক্তের লাঞ্ছনা। শুধু মানচিত্রে নয়, চিত্তপটেও আঁকা হয়ে রয়ে গেল বিভেদের, বিচ্ছিন্নতার, বিদ্বেষের চিরকলঙ্কের রেখা।

স্বাধীনতা এল বাঙলার দেহ দ্বিখণ্ডিত করে, শোণিতসিক্ত, শব-আকীর্ণ বাঙলার মেঠোপথ ধরে। লক্ষ লক্ষ ভ্রষ্টনীড়, নষ্টমূল, হৃতগৌরব, দিশাহীন মানুষের ক্লান্ত মিছিল এসে পৌঁছাল শিয়ালদায়, কুপার্স, ধুবুলিয়ায়, রানাঘাটে। গড়ে উঠল ক্যাম্প --- জীবন্ত নরক।
এখানেই যদি বাঙলার বাঙালীর দুর্গতির অবসান হোত ! না, তা যে হবার নয়। কেননা বাঙলার দুর্দৈবের ইতিহাস যে চলমান। সেই দূর অতীতে তার আরম্ভ। লক্ষ্মণ সেনের রাজত্বের সময়কাল থেকেই যদি ধরি --- তুর্কীদের সর্বধংসী আক্রমণ, ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর হাতে সিরাজদ্দৌলার পতন, ছিয়াত্তরের মন্বন্তর, বর্গী আক্রমণ --- আরো কতই না। তারপর এই তো অদূর অতীতে, দাঙ্গা, দুর্ভিক্ষ, দেশভাগ, ওপারের ক্রমান্বয়ে রাষ্ট্রীয় শাসন-তান্ত্রিক  আলোড়ন। রক্তক্ষয়ী ভাষা আন্দোলনের পর থেকে রাষ্ট্ৰীয় মুক্তি সংগ্রামের সূচনা। গত শতকের সত্তরের দশকে বাঙলার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসও রক্তস্নাত। তখনো ওপার থেকে এপারে এসেছিলন কয়েক লক্ষ শরণার্থী। তাঁদের হৃদয়বিদারী দুর্ভোগের দৃশ্য আমাদের চোখে দেখা। তবে মুক্তিযুদ্ধের সৈনিকদের মধ্যে সম্প্রদায়গত বিভাজন ছিল না। তাই সেই মুক্তিসংগ্রামে মুসলমান এবং অমুসলমানের একটি ঐতিহাসিক মিলন সুদীর্ঘ কালের ইপ্সিত অসাম্প্রদায়িক সমাজচেতনার জন্ম দিয়েছিল। ধন-মান-প্রাণের ক্ষত-ক্ষতি-ক্ষয়ের মূল্যেও ওপার বাঙলায় সৃষ্টি হয়েছিল একটি উদার, ধর্ম-সম্প্রদায়-নিরপেক্ষ নূতন রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রচেতনা। এপার বাঙলার জনমানসেও তার প্রভাব পড়েছিল। প্রভাব পড়েছিল সাহিত্যে শিল্পে -- সংস্কৃতির সমস্ত শাখায়, ভাব ও ভাবনার আদান প্রদানের মধ্য দিয়ে জেগে ওঠেছিল ভৌগলিক গণ্ডীবদ্ধতাহীন নবতর বঙ্গ জাতিসত্তার মানসমূর্তি। স্বস্তি পেয়েছিলাম আমরা যারা গত শতাব্দীর পঞ্চাশ-ষাটের অনটন, সত্তরের সংগ্রাম, প্রতিবেশী দুই রাষ্ট্রের শাসনতান্ত্রিক অস্থিরতা দেখে দেখে ক্লান্ত। কিন্তু 'অভাগা যদ্যপি চায় সাগর শুকায়ে যায়'। চিরদিনের ভাগ্যবিড়ম্বিত এই ভূখন্ডের, এই জাতির ললাট লিখন দুর্মোচনীয়। সুস্থ, সুন্দর, সুস্থিত ওপার বাংলায় আবারও অস্থিরতা, রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক উপপ্লবের ঘোর ঘনঘটা। এখন কিছুটা মেঘছেড়া রোদ্দুর এলেও যে কোন দিন আবারো ধর্মান্ধ দ্বন্দ্বের অন্ধকার নেমে আসতে পারে। 


রাষ্ট্রের শাসনতান্ত্রিক অস্থিরতা একটি ইতিহাস-সিদ্ধ প্রক্রিয়া। সেই ইতিবৃত্তই মানব সভ্যতার ক্রমবিবর্তনের সত্যরূপ --- একথা ঐতিহাসিকেরা অস্বীকার করেন না। সেই বিবর্তন কখনো কখনো মানব সমাজের মঙ্গলের জন্যে আলোকিত পথের দিশা নির্ধারণ করে (The way to enlightenment) এবং সেই পথ ধরেই আমরা রাজতন্ত্র - অভিজাততন্ত্র- একনায়কতন্ত্রের পর্যায়ক্রমিক ব্যবস্থা পেরিয়ে এবং  ইউটোপিয়ান সর্বহারার একনায়কতন্ত্রের দুষ্প্রয়োগের বাস্তব অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে গণতন্ত্র বা সমাজতান্ত্রিক গণতন্ত্রের পথ অবলম্বন করেছি যে পথে সমস্ত মানুষকে নিয়ে, ধর্ম-বর্ণ-জাতি-সম্প্রদায় নিরপেক্ষ রাষ্ট্র গঠনের প্রতিশ্রুতি আছে। এই রাষ্ট্রভাবনা ভারতবর্ষে আছে এবং যে সময়ে ভারতের প্রতিবেশী দেশগুলিতে 'ধর্ম'বিশ্বাসকে কেন্দ্রস্থলে রেখে রাষ্ট্রযন্ত্র চালানোর ব্যবস্থা কায়েম হয়েছে তখনো ভারতরাষ্ট্র 'গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র' (Democratic Republic) রূপেই আপন সার্বভৌম সত্তা প্রতিষ্ঠিত করেছে। এই রাষ্ট্রব্যবস্থায় জনগণ সরাসরি, প্রত্যক্ষে বা পরোক্ষে অংশগ্রহন করেছে এবং করে চলেছে। এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় ধর্ম বা সাম্প্রদায়িকতা যখনি মাথা তুলবার চেষ্টা করেছে তখনই দেশের জণসাধারণ যুগপৎ সংবিধান ও সংবিধান-সংরক্ষক বিচার ব্যবস্থা তেমন প্রচেষ্টাকে দৃঢ়তার সঙ্গে নস্যাৎ করে দিয়েছে। তাই ভারত রাষ্ট্রের একটি অঙ্গরাজ্য হিসাবে এপার বাঙলা বা পশ্চিম বাঙলার সমাজিক পরিবেশে এখনো সাম্প্রদায়িক অস্থিরতার সৃষ্টি হয়নি। কিন্তু বহির্বঙ্গ হতে ভেসে আসা একটি অপরিচিত রণহুংকার আসন্ন একটি সর্বনাশা ঝড়ের ইঙ্গিত পশ্চিম বাংলার আকাশে প্রতিয়মান হয়ে উঠেছে ।

 যেহেতু ওপার বাংলার সঙ্গে এপার বাঙলার ওতপ্রোত সম্পর্ক তাই বর্তমান বাঙলা দেশের সম্প্রদায়গত সঙ্কট গভীর দুশ্চিন্তার। তবু বিবেকের বাণী বেশিদিন রুদ্ধ হয়ে রইবেনা, এমন আশাকে প্রাণপণে রক্ষা করতেই হবে। এদেশ আউল, বাউল, ফকির, পীর- দরবেশ-মুর্শেদ আর সর্বধর্ম সমন্বয়ী সহজিয়া বৈষ্ণব, সুফী সাধকদের দেশ। এদেশ রবীন্দ্র নজরুল আর সংখ্যাতীত মানবতাবাদী মণীষী, সাহিত্যসাধক, কবিদের দেশ। একদিন মানবীয় চৈতন্যের আলোয় আলোকিত বঙ্গবিবেক এই ধ্রুবতা উপলব্ধি করবেই,
"সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপর নাই।"
যে সর্বদ্রষ্টা ঋষিকবির অন্তর্দৃষ্টিতে-ধরা অন্তিম বাণী নিয়ে কথকথা আরম্ভ করেছিলুম তার অমৃতময় উচ্চারণ স্মরণ করে আমিও বলি, ----

"আজ পারের দিকে যাত্রা করেছি ---- পিছনের ঘাটে কী দেখে এলুম, ইতিহাসের কী অকিঞ্চিৎকর,  উচ্ছিষ্ট সভ্যতাভিমানের পরিকীর্ণ ভগ্নস্তূপ ! কিন্তু মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ, সে বিশ্বাস শেষ পর্যন্ত রক্ষা করব।"  

মৃত্যুপথযাত্রী মানুষ আর ওষুধটুকুও খেতে চায় না, অসাড় হাত সামান্য তুলে বলতে চায়, "না না।" ঠোঁট দুটো ফাঁক করে জল চায় এক গণ্ডূষ। মানবতাহীন মানব সভ্যতার আজ তেমনই পরিণাম। হাজার হাজার বছরের চর্চিত, লালিত দর্শন, বিজ্ঞান, সাহিত্য, শিল্প ; প্রেম, সুকুমার প্রবৃত্তি, প্রাণদায়ী বৃত্তি ; মৈত্রী, করুণা, সৌভ্রাতৃত্ব --- সমস্ত মৃতসঞ্জীবনী ঔষধি আজ ব্যর্থ হয়েছে, বিফল হয়েছে। ইস্রায়েল, The promised Land for the Zews, দাবি করে সমস্ত মধ্যপ্রাচ্য, (stretching from The Nile to the Euphrates, and including parts of Egypt, Soudi Arabia and Iraq.) ইহুদিদের জন্য ঈশ্বর (Jehovah) নির্ধারণ করে গিয়েছেন। অপরদিকে ইসলাম ধর্মধারণায় সমগ্র বিশ্ব বা মহাবিশ্ব মহান আল্লাহর সৃষ্টি। 

আশ্চর্যের বিষয় এই যে ইহুদি ধর্ম, খ্রিস্টান ধর্ম এবং ইসলাম -- এই তিনটি ধর্মধারণারই মূল উৎস একেশ্বরবাদী আব্রাহামিক ধর্মচেতনা --অর্থাৎ নবীশ্রেষ্ঠ ইব্রাহিম বা আব্রাহাম- এর বংশধারা ও ঐতিহ্যের সঙ্গে সংযুক্ত ; কিন্তু তবুও এই তিন ধর্মের অনুসারীদের মধ্যে পরস্পর শোণিত-সিক্ত আত্মঘাতী সংগ্রাম ও স্বজাতিহনন হাজার হাজার বছর ধরে মানব সভ্যতার স্বর্গারোহনের পথ বন্ধ করে দিয়ে প্রায়শই মানবজাতির অধোগতি পথ প্রশস্ত করে দিয়েছে। এই প্রসঙ্গে আমার সদ্য প্রকাশিত 'বিন্দুতে সিন্ধু দর্শন'' গ্রন্থে' 'ধর্মসংকটের বলি মানবতা' প্রবন্ধে সবিস্তারে আলোচনা করা হয়েছে। 

                           (ক্রমশঃ) 

দ্বিতীয় পর্ব একদিন পর প্রকাশিত হবে।

দুলাল চন্দ্র বন্দোপাধ্যায় 
০৮/১২/২০২৪
কলকাতা। 
_________________________________________



সোমবার, ২ ডিসেম্বর, ২০২৪

সুগভীর প্রজ্ঞার একটি ঐতিহাসিক গ্রন্থ ---তিন


সুগভীর প্রজ্ঞার একটি ঐতিহাসিক গ্রন্থ --- তিন

রবীন্দ্র সৃষ্টিতে শাক্যমুনি তথাগত
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টি জুড়ে, বিশেষ করে বিশ শতকের প্রথম দশকের পর থেকে তাঁর রচিত কাব্যে, সঙ্গীতে, প্রবন্ধে এবং অভিভাষণে প্রত্যক্ষে বা প্রচ্ছন্নভাবে বৌদ্ধ দর্শনের প্রভাব লক্ষণীয়ভাবে প্রতীয়মান। এই বিষয়টি এতই বৃহৎ, এতই অতলান্ত যে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র একটি প্রবন্ধে তার সম্যক পরিচয় দেওয়া দুরূহ এবং আমার মতো একজন স্বল্পজ্ঞাত রবীন্দ্র ভক্তের কাছে প্রায় তা 'নুনের পুতুলের সাগরের তল মাপতে যাওয়ার দুস্পর্ধার' সামিল। তবুও 'কথাবলা মুখ আর পথচলা পা' যেমন থামতে চায় না, তেমনি হাতে কলম আর সামনে সাদা পাতা দেখলে আর মন মানতে চায়না। 'মনে হয় লিখি যা-তা, পুরানো খাতার পাতা ভরে দি' বৃথা শব্দজালে।'

রবীন্দ্রনাথ গৌতম বুদ্ধের জীবনী, বৌদ্ধ ধর্ম ও দর্শন এবং বৌদ্ধসাহিত্যের প্রতি কী গভীর অনুরাগ পোষণ করতেন তার নিদর্শন ছড়িয়ে আছে তাঁর সৃষ্টিসৌধের অঙ্গে অঙ্গে।
১৯২৪ সালে, জাপান ভ্রমনের সময়কালে ত্রিপিটকের একটি বাণী "অক্কোধেন জিনে কোধং" (অক্রোধ দিয়ে ক্রোধ জয় করা যায়), সিল্কের কাপড়ের উপর লিখে সেখানকার দর্শনের অধ্যাপক তাকাসুকুকে উপহার দিয়ে ছিলেন।
১৮ই মে ১৯৩৫ সালে কোলকাতার মহাবোধি সোসাইটি হলে বৈশাখী পূর্ণিমা উজ্জাপনের সময় 'বুদ্ধদেব' শিরোনামে কবি একটি দীর্ঘ অভিভাষণ পাঠ করেন। পরে সেই অভিভাষণটি প্রবাসী পত্রিকায় (১৩৪২) প্রকাশিত হয়। কবি লিখছেন,
"আমি যাঁকে  অন্তরের মধ্যে শ্রেষ্ঠ মানব বলে উপলব্ধি করি আজ বৈশাখী পূর্ণিমায় তাঁর জন্মোৎসবে তাঁকে প্রণাম নিবেদন করতে এসেছি।"
এই বাণীর তাৎপর্য্য গভীর। রবীন্দ্রনাথ বুদ্ধদেবকে ঈশ্বর রূপে বা পূজার্হ দেবতারূপে দেখেননি, দেখেছেন শ্রেষ্ঠ মানব রূপে।
পরিশেষ কাব্য গ্রন্থে জটীল বাক্যগ্রন্থনে 'প্রার্থনা' কবিতায় কবি লিখছেন, 

".....আত্মজাতি মাংসলুব্ধ মানুষের প্রাণনিকেতন
উন্মিলিছে নখে দন্তে হিংস্র বিভীসিকা ; চিত্ত মম
নিস্কৃতি সন্ধানে ফিরে পিঞ্জরিত বিহঙ্গম সম,
মুহূর্তে মুহূর্তে বাজে শৃঙ্খল-বন্ধন-অপমান
সংসারের। হেনকালে জ্বলে ওঠে বজ্রাগ্নি সমান
চিত্তে তাঁর  দিব্যমূর্তি, সেই বীর রাজার কুমার
বাসনারে বলি দিয়া বিসর্জিয়া সর্ব আপনার
বর্তমান কাল হতে নিষ্ক্রমিলা নিত্য কাল মাঝে
অনন্ত তপস্যা বহি' মানুষের উদ্ধারের কাজে
অহমিকা বন্দিশালা হতে। --- ভগবান বুদ্ধ তুমি,
নির্দয় এ লোকালয়, এ ক্ষেত্রই তব জন্মভূমি।"
                           (প্রার্থনা /পরিশেষ কাব্যগ্রন্থ ) 


রবীন্দ্র সৃষ্টির দেউলে দেউলে উৎকীর্ণ আছে এমন সব
কত না বুদ্ধবন্দনার ভাষামূর্তি, কত শ্রদ্ধার্ঘ্যের শব্দকুসুম, ঠিক যেমন আছে বুদ্ধমন্দিরের, স্তুপের, মঠের, চৈত্যের, অজন্তা ইলোরার গূহামন্দিরের দেওয়ালে দেওয়ালে তপোসিদ্ধ, তপোমগ্ন ভগবান বুদ্ধ ও মহাভিক্ষু-ভিক্ষুণীদের তপোস্নিগ্ধ প্রতিমাগুলি।
বিশ্বপথিক কবি যখন প্রাচী ধরিত্রীর দ্বীপময় ভূখন্ডে গিয়েছিলেন, দেখেছিলেন কম্বোজের (কম্বোডিয়া) অঙ্কোরভাট মন্দির‌। ইতিহাস বলে বিশ্বের সর্ববৃহৎ ওই মন্দির গঠিত হয়েছিল দ্বাদশ শতাব্দীতে, খেমের সাম্রাজ্যের রাজা সূর্য বর্মনের সময়কালে। দেবতা বিষ্ণুর নামে উৎসর্গিত এই মন্দির ধীরে ধীরে, বৌদ্ধধর্মের উচ্ছলিত, উচ্ছ্বসিত ধারা যা অধুনা উত্তরপ্রদেশ, বিহার,  বৃহত্তর বাংলা (আসাম, মণিপুর, ত্রিপুরা, সমগ্র বঙ্গভূমি) প্লাবিত করে' যখন দক্ষিণপূর্ব দ্বীপময় ভূমিখণ্ডে প্রবেশ করেছিল, সেই প্রথম সহস্রাব্দের শেষভাগে শ্যামদেশ, কম্বোজ, (বর্তমান ভিয়েৎনাম, কম্বোডিয়া, লাউস, বালি, সুমাত্রা, বোর্ণিও, থাইল্যান্ডসহ দ্বীপপুঞ্জ) প্রভৃতি দেশে ততকালীন সম্রাট ও রাজাদের পৃষ্টপোষকতায় হিন্দু দেবমন্দির গুলি বৌদ্ধ মন্দিরে রূপান্তরিত হয়ে যায়। সেখানে ভগবান বুদ্ধের মূর্তি ছাড়াও বজ্রযানী বৌদ্ধ ভিক্ষু, ভিক্ষুণীদের আরাধ্য কিছু দেব দেবীর বিগ্রহ উৎকীর্ণ বা সংস্থাপিত করা হয়। এ সকল মন্দিরের মধ্যে সর্ববৃহৎ, বিস্ময়কর মন্দির কম্বোডিয়ার সিয়াম রিপে অবস্থিত অঙ্কোরভাট মন্দির যেটি দ্বাদশ শতাব্দীতে রাজা সূর্যবর্মন দ্বারা প্রতিষ্ঠিত এবং চতুর্দশ শতাব্দীতে বুদ্ধ মন্দিরে রূপান্তরিত। 

এই যে 'বজ্রযানী বৌদ্ধ ভিক্ষু'  

অন্য একটি বৃহৎ মন্দির বরভূধর বা বরোবুদুর, যেটি আনুমানিক নবম শতাব্দীর সময়কালে নির্মিত। এই মন্দির প্রথমাবধি মহাযান বুদ্ধ মন্দির, যেখানে সাকুল্যে ৫০৪টি বুদ্ধ মূর্তি এবং ২৬৭২টি খোদাইকরা প্যানেল রয়েছে। ঐতিহাসিকেরা বলেন বঙ্গদেশের স্থপতিরাই ওই আশ্চর্য স্থাপত্যের  মন্দিরগুলি  নির্মাণ করেছেন।
"স্থপতি মোদের স্থাপনা করেছে বরভূধরের ভিত্তি,
শ্যাম কম্বোজে ওঙ্কারধাম মোদেরি প্রাচীন সৃষ্টি।"
                                     ---------সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত 

যাই হোক্, আমরা কিছুটা প্রসঙ্গান্তরে চলে এসেছি শুধু এইটুকু বলবার জন্য যে রবীন্দ্রনাথ তাঁর ভ্রাম্যমান জীবনপথে যেখানেই দেখেছেন তাঁর‌ অন্তরদেউলে স্থিরস্থিত মানব-ভগবানের মূর্তি সেখানেই তিনি মুখর হয়েছেন তাঁর (বুদ্ধের) স্তবগাথায়,
"ত্রিশরণ মহামন্ত্র যবে
বজ্রমন্দ্ররবে
আকাশে ধ্বনিতেছিল পশ্চিমে পূরবে
মরুপারে শৈলতটে, সমুদ্রের কূলে উপকূলে
দেশে দেশে চিত্তদ্বার দিল যবে খুলে
আনন্দমুখর উদ্বোধন. ...
.................................................................
পাষাণের মৌনতটে যে বাণী রয়েছে চিরস্থির
কোলাহল ভেদ করি শত শতাব্দীর
আকাশে উঠিছে অবিরাম 
অমেয় প্রেমের মন্ত্র বুদ্ধের শরণ লইলাম।"
                               ----- 'সিয়াম'--- রবীন্দ্রনাথ।‌‌

জৈনমুনি মহাবীর (৫৯৯ খ্রী: পূ:) এবং শাক্ত্যমুনি সিদ্ধার্থ (৬২৩খ্রী: পূ:) আবির্ভাবের কাল থেকে প্রায় তিন হাজার বছর ধরে শুধু ভারতবর্ষে নয়, সমগ্র এশিয়া মহাদেশ জুড়ে এক মহান ধর্মান্দোলন সংঘটিত হয়ে চলেছে এবং এই ঐতিহাসিক আন্দোলন বহুমাত্রিক ও বহুমুখী --- যার অভিব্যক্তি ও প্রকাশ জীবনাচরণের, জীবনছন্দের বাইরে শিল্প সংস্কৃতির মধ্য দিয়েও বিকাশলাভ করেছে। শত সহস্র মন্দির, মঠ, স্তুপ প্যাগোডা এমনকি গিরিবর্ত্ম ও গিরিগূহাতেও ভগবান বুদ্ধের (কোথাও কোথাও মহাবীর বর্ধমানেরও) মূর্তি ক্ষোদিত হয়েছে , নির্মিত হয়েছে, অঙ্কিত হয়েছে বিস্ময়কর তক্ষণ ও শিল্প দক্ষতায়। (অজন্তা, ইলোরার গূহামন্দিরের, বামিংহাম গিরিপথের দৃষ্টান্ত স্মরণে আসে।)
শুধু কি তাই, ভারতবর্ষের, যুগপৎ বহির্বিশ্বেরও এমন হিন্দু (অ-হিন্দুও নাত্যল্প) ঘর কমই আছে যেখানে একটি, ছোট বা বড়, শাক্যসিংহের ধ্যানমগ্ন মূর্তি পাওয়া যাবে না।
আমাদের কবি যিনি বিশ্বেরও কবি, তাঁর চৈতন্যমুকুরে ধরা পড়েছিল অখিল নিরঞ্জন বুদ্ধের এই জগৎব্যপ্ত মহামানবীয় রূপ। তিনি সাক্ষী ছিলেন প্রথম বিশ্বযুদ্ধের, তিনি দেখেছিলেন ইউরোপের তথাকথিত উন্নত জাতিগুলির সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের অমানবিক হিংস্রতা, তিনি দেখেছিলেন জালিয়ানাবাগের নিষ্ঠুর নরহত্যা, তিনি দেখেছিলেন স্বদেশের স্বজাতির বিভেদের,  সাম্প্রদায়িক বৈষম্যের রূপ !
"....... দেখি ধিক্কারে ভরিয়া ওঠে মন,
আত্মজাতি মাংসলুব্ধ মানুষের প্রাণনিকেতন
উন্মীলিছে নখে দন্তে হিংস্র বিভীসিকা।"
এবং তাই আন্তরিক আশ্রয় প্রার্থনা করেছিলেন নরশ্রেষ্ঠ
নরদেবতার কাছে,
"ভরসা হারালো যারা, যাহাদের ভেঙেছে বিশ্বাস,
তোমারি করুণাবিত্তে ভরুক তাদের সর্বনাশ, --
আপনারে ভুলে তারা ভুলুক দুর্গতি।" 

এতক্ষণ রবীন্দ্র মানসে বুদ্ধদেব এবং বৌদ্ধ ধর্মের, বৌদ্ধ দর্শনের অভিঘাত নিয়ে কিছু বলা হোল, কিন্তু যা বলা বাকী রইল তা হোল বুদ্ধভাবনার তাঁর সৃষ্টিসমুহের কথকথা। এই কথকথা আরম্ভ করলে কথক বলতে পারবেন না, 'অদ্য শেষ রজনী'। তাঁর রচনার 'নৈবেদ্য কাব্যগ্রন্থ'-পরবর্তী সময়ের ( এই বিচারও প্রশ্নের উর্ধৈ নয়) সমস্ত লেখায় প্রত্যক্ষে বা পরোক্ষে অমিতাভ নিরঞ্জনের মানবতাবাদী দর্শনের উপস্থিতি লক্ষণীয়ভাবে সুপ্রকাশ।
প্রত্যক্ষরূপে পাই কথা ও কাহিনী কাব্যর একাধিক কবিতায়,--
অভিসার, (বোধিসত্তাবদান কল্পলতা)।
পূজারিণী, (অবদান শতক)।
নগরলক্ষ্মী, (কল্পদ্রুমাবদান)।
সামান্য ক্ষতি, (দিব্যাবদানমালা)।
পরিশোধ, (মহাবস্ত্বাবদান)।
শ্রেষ্ঠভিক্ষা, (অবদানশতক)।
রবীন্দ্রনাথ গ্রন্থশেষে লিখছেন,
"এই গ্রন্থে যে সকল বৌদ্ধকথা বর্ণিত হইয়াছে তাহার রাজেন্দ্রলাল মিত্র সংকলিত নেপালী বোদ্ধ সাহিত্য সম্মন্ধীয় ইংরেজি গ্রন্থ হইতে গৃহীত। মূলের সহিত কিছু কিছু প্রভেদ লক্ষিত হইবে।" 


কবির এই সমাপ্তি বাক্যটি অনুধাবনীয়।
এবং তেমনধারাই সৃজনকর্ম তাঁর। বৌদ্ধ কাহিনীর চরিত্রগুলি, এমনকি বুদ্ধদেব স্বয়ং রবীন্দ্রনাথের লিখনলেখায় নবরূপ, নবতর চরিত্র-সুষমা লাভ করেছে। পরিশোধ কাহিনী-কবিতার বজ্রসেন, শ্যামা ও উত্তীয়---
এই ত্রিকোন প্রেমের পরিসমাপ্তি একটি অসামান্য রাবীন্দ্রিক ছোট গল্পের অনবদ্য উদাহরণ।
".....পরক্ষণে
ভূতলে রাখিয়া জানু যুবার চরণে
প্রণমিল ---- তারপরে নামি নদীতীরে
আঁধার বনের পথে চলি গেল ধীরে .."
শ্যামার এই অন্তিম যাত্রা, এই বিষাদময় বিচ্ছেদ দুর্বিসহ। শ্যামা, বজ্রসেন ও উত্তরীয় ---- মাঝখানে মানবীয় প্রেম কামনা করেছিল ক্ষমা। 


এই ভাবেই তিনি যখন গীতিনাট্য ও নৃত্যনাট্য রচনা করেছেন তখনো আমরা লক্ষ্য করেছি রবীন্দ্রনাথ বৌদ্ধদর্শন-সঞ্জাত মানবীয় প্রেম, মানবীয় আবেগ ও মননকে সঞ্চারিত করেছেন প্রকাশে, অভিব্যক্তিতে, উপস্থাপনায় ও রসসঞ্চারে। এই রসাবেসের দৃষ্টান্ত আছে মালিনী, রাজা, অচলায়তন, গুরু, অরূপরতন, নটীর পূজা এবং সবিশেষভাবে চণ্ডালিকায়।
একইভাবে বিশ্বের সমস্ত মনীষী---- সাহিত্যসাধক,  সমাজ সংস্কারক, রাষ্ট্রনায়ক, বিভিন্ন বিষয়ের পণ্ডিত, গবেষক --- যারাই স্যার এডুইন আর্নল্ডের The Light of Asia বা প্রাচী ধরিত্রীর আলো পাঠ করেছেন তাঁদের কর্মে, ধর্মে, সৃজনে, মননে মানব-ধর্মের মূর্ত রূপ ভগবান তথাগত গৌতমবুদ্ধের জীবনবোধের অনির্বাণ আলোকরশ্মি প্রতিফলিত হয়েছে, প্রতিবিম্বিত হয়েছে। 


ঋণ স্বীকার:
The Light of Asia -- Sir Edwin Arnold,
রবীন্দ্র রচনাবলী,
সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত,
The Light of Asia: The Poem that Defined
The Buddha --- Joyram Ramesh.
('রবীন্দ্রনাথের শ্রেষ্ঠ মানব' -- এই বিষয়টি নিয়ে একটি দীর্ঘ প্রবন্ধ অনতিবিলম্বে প্রকাশিত হবে।)
_____________________________________________








Recently published

অমূল্য

He ( Tagore) who sees all things in his own self and his own self in all things, he does not remain unrevealed.                     ...