সুগভীর প্রজ্ঞার একটি ঐতিহাসিক গ্রন্থ --- তিন
রবীন্দ্র সৃষ্টিতে শাক্যমুনি তথাগত
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টি জুড়ে, বিশেষ করে বিশ শতকের প্রথম দশকের পর থেকে তাঁর রচিত কাব্যে, সঙ্গীতে, প্রবন্ধে এবং অভিভাষণে প্রত্যক্ষে বা প্রচ্ছন্নভাবে বৌদ্ধ দর্শনের প্রভাব লক্ষণীয়ভাবে প্রতীয়মান। এই বিষয়টি এতই বৃহৎ, এতই অতলান্ত যে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র একটি প্রবন্ধে তার সম্যক পরিচয় দেওয়া দুরূহ এবং আমার মতো একজন স্বল্পজ্ঞাত রবীন্দ্র ভক্তের কাছে প্রায় তা 'নুনের পুতুলের সাগরের তল মাপতে যাওয়ার দুস্পর্ধার' সামিল। তবুও 'কথাবলা মুখ আর পথচলা পা' যেমন থামতে চায় না, তেমনি হাতে কলম আর সামনে সাদা পাতা দেখলে আর মন মানতে চায়না। 'মনে হয় লিখি যা-তা, পুরানো খাতার পাতা ভরে দি' বৃথা শব্দজালে।'
রবীন্দ্রনাথ গৌতম বুদ্ধের জীবনী, বৌদ্ধ ধর্ম ও দর্শন এবং বৌদ্ধসাহিত্যের প্রতি কী গভীর অনুরাগ পোষণ করতেন তার নিদর্শন ছড়িয়ে আছে তাঁর সৃষ্টিসৌধের অঙ্গে অঙ্গে।
১৯২৪ সালে, জাপান ভ্রমনের সময়কালে ত্রিপিটকের একটি বাণী "অক্কোধেন জিনে কোধং" (অক্রোধ দিয়ে ক্রোধ জয় করা যায়), সিল্কের কাপড়ের উপর লিখে সেখানকার দর্শনের অধ্যাপক তাকাসুকুকে উপহার দিয়ে ছিলেন।
১৮ই মে ১৯৩৫ সালে কোলকাতার মহাবোধি সোসাইটি হলে বৈশাখী পূর্ণিমা উজ্জাপনের সময় 'বুদ্ধদেব' শিরোনামে কবি একটি দীর্ঘ অভিভাষণ পাঠ করেন। পরে সেই অভিভাষণটি প্রবাসী পত্রিকায় (১৩৪২) প্রকাশিত হয়। কবি লিখছেন,
"আমি যাঁকে অন্তরের মধ্যে শ্রেষ্ঠ মানব বলে উপলব্ধি করি আজ বৈশাখী পূর্ণিমায় তাঁর জন্মোৎসবে তাঁকে প্রণাম নিবেদন করতে এসেছি।"
এই বাণীর তাৎপর্য্য গভীর। রবীন্দ্রনাথ বুদ্ধদেবকে ঈশ্বর রূপে বা পূজার্হ দেবতারূপে দেখেননি, দেখেছেন শ্রেষ্ঠ মানব রূপে।
পরিশেষ কাব্য গ্রন্থে জটীল বাক্যগ্রন্থনে 'প্রার্থনা' কবিতায় কবি লিখছেন,
".....আত্মজাতি মাংসলুব্ধ মানুষের প্রাণনিকেতন
উন্মিলিছে নখে দন্তে হিংস্র বিভীসিকা ; চিত্ত মম
নিস্কৃতি সন্ধানে ফিরে পিঞ্জরিত বিহঙ্গম সম,
মুহূর্তে মুহূর্তে বাজে শৃঙ্খল-বন্ধন-অপমান
সংসারের। হেনকালে জ্বলে ওঠে বজ্রাগ্নি সমান
চিত্তে তাঁর দিব্যমূর্তি, সেই বীর রাজার কুমার
বাসনারে বলি দিয়া বিসর্জিয়া সর্ব আপনার
বর্তমান কাল হতে নিষ্ক্রমিলা নিত্য কাল মাঝে
অনন্ত তপস্যা বহি' মানুষের উদ্ধারের কাজে
অহমিকা বন্দিশালা হতে। --- ভগবান বুদ্ধ তুমি,
নির্দয় এ লোকালয়, এ ক্ষেত্রই তব জন্মভূমি।"
(প্রার্থনা /পরিশেষ কাব্যগ্রন্থ )
রবীন্দ্র সৃষ্টির দেউলে দেউলে উৎকীর্ণ আছে এমন সব
কত না বুদ্ধবন্দনার ভাষামূর্তি, কত শ্রদ্ধার্ঘ্যের শব্দকুসুম, ঠিক যেমন আছে বুদ্ধমন্দিরের, স্তুপের, মঠের, চৈত্যের, অজন্তা ইলোরার গূহামন্দিরের দেওয়ালে দেওয়ালে তপোসিদ্ধ, তপোমগ্ন ভগবান বুদ্ধ ও মহাভিক্ষু-ভিক্ষুণীদের তপোস্নিগ্ধ প্রতিমাগুলি।
বিশ্বপথিক কবি যখন প্রাচী ধরিত্রীর দ্বীপময় ভূখন্ডে গিয়েছিলেন, দেখেছিলেন কম্বোজের (কম্বোডিয়া) অঙ্কোরভাট মন্দির। ইতিহাস বলে বিশ্বের সর্ববৃহৎ ওই মন্দির গঠিত হয়েছিল দ্বাদশ শতাব্দীতে, খেমের সাম্রাজ্যের রাজা সূর্য বর্মনের সময়কালে। দেবতা বিষ্ণুর নামে উৎসর্গিত এই মন্দির ধীরে ধীরে, বৌদ্ধধর্মের উচ্ছলিত, উচ্ছ্বসিত ধারা যা অধুনা উত্তরপ্রদেশ, বিহার, বৃহত্তর বাংলা (আসাম, মণিপুর, ত্রিপুরা, সমগ্র বঙ্গভূমি) প্লাবিত করে' যখন দক্ষিণপূর্ব দ্বীপময় ভূমিখণ্ডে প্রবেশ করেছিল, সেই প্রথম সহস্রাব্দের শেষভাগে শ্যামদেশ, কম্বোজ, (বর্তমান ভিয়েৎনাম, কম্বোডিয়া, লাউস, বালি, সুমাত্রা, বোর্ণিও, থাইল্যান্ডসহ দ্বীপপুঞ্জ) প্রভৃতি দেশে ততকালীন সম্রাট ও রাজাদের পৃষ্টপোষকতায় হিন্দু দেবমন্দির গুলি বৌদ্ধ মন্দিরে রূপান্তরিত হয়ে যায়। সেখানে ভগবান বুদ্ধের মূর্তি ছাড়াও বজ্রযানী বৌদ্ধ ভিক্ষু, ভিক্ষুণীদের আরাধ্য কিছু দেব দেবীর বিগ্রহ উৎকীর্ণ বা সংস্থাপিত করা হয়। এ সকল মন্দিরের মধ্যে সর্ববৃহৎ, বিস্ময়কর মন্দির কম্বোডিয়ার সিয়াম রিপে অবস্থিত অঙ্কোরভাট মন্দির যেটি দ্বাদশ শতাব্দীতে রাজা সূর্যবর্মন দ্বারা প্রতিষ্ঠিত এবং চতুর্দশ শতাব্দীতে বুদ্ধ মন্দিরে রূপান্তরিত।
এই যে 'বজ্রযানী বৌদ্ধ ভিক্ষু'
অন্য একটি বৃহৎ মন্দির বরভূধর বা বরোবুদুর, যেটি আনুমানিক নবম শতাব্দীর সময়কালে নির্মিত। এই মন্দির প্রথমাবধি মহাযান বুদ্ধ মন্দির, যেখানে সাকুল্যে ৫০৪টি বুদ্ধ মূর্তি এবং ২৬৭২টি খোদাইকরা প্যানেল রয়েছে। ঐতিহাসিকেরা বলেন বঙ্গদেশের স্থপতিরাই ওই আশ্চর্য স্থাপত্যের মন্দিরগুলি নির্মাণ করেছেন।
"স্থপতি মোদের স্থাপনা করেছে বরভূধরের ভিত্তি,
শ্যাম কম্বোজে ওঙ্কারধাম মোদেরি প্রাচীন সৃষ্টি।"
---------সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত
যাই হোক্, আমরা কিছুটা প্রসঙ্গান্তরে চলে এসেছি শুধু এইটুকু বলবার জন্য যে রবীন্দ্রনাথ তাঁর ভ্রাম্যমান জীবনপথে যেখানেই দেখেছেন তাঁর অন্তরদেউলে স্থিরস্থিত মানব-ভগবানের মূর্তি সেখানেই তিনি মুখর হয়েছেন তাঁর (বুদ্ধের) স্তবগাথায়,
"ত্রিশরণ মহামন্ত্র যবে
বজ্রমন্দ্ররবে
আকাশে ধ্বনিতেছিল পশ্চিমে পূরবে
মরুপারে শৈলতটে, সমুদ্রের কূলে উপকূলে
দেশে দেশে চিত্তদ্বার দিল যবে খুলে
আনন্দমুখর উদ্বোধন. ...
.................................................................
পাষাণের মৌনতটে যে বাণী রয়েছে চিরস্থির
কোলাহল ভেদ করি শত শতাব্দীর
আকাশে উঠিছে অবিরাম
অমেয় প্রেমের মন্ত্র বুদ্ধের শরণ লইলাম।"
----- 'সিয়াম'--- রবীন্দ্রনাথ।
জৈনমুনি মহাবীর (৫৯৯ খ্রী: পূ:) এবং শাক্ত্যমুনি সিদ্ধার্থ (৬২৩খ্রী: পূ:) আবির্ভাবের কাল থেকে প্রায় তিন হাজার বছর ধরে শুধু ভারতবর্ষে নয়, সমগ্র এশিয়া মহাদেশ জুড়ে এক মহান ধর্মান্দোলন সংঘটিত হয়ে চলেছে এবং এই ঐতিহাসিক আন্দোলন বহুমাত্রিক ও বহুমুখী --- যার অভিব্যক্তি ও প্রকাশ জীবনাচরণের, জীবনছন্দের বাইরে শিল্প সংস্কৃতির মধ্য দিয়েও বিকাশলাভ করেছে। শত সহস্র মন্দির, মঠ, স্তুপ প্যাগোডা এমনকি গিরিবর্ত্ম ও গিরিগূহাতেও ভগবান বুদ্ধের (কোথাও কোথাও মহাবীর বর্ধমানেরও) মূর্তি ক্ষোদিত হয়েছে , নির্মিত হয়েছে, অঙ্কিত হয়েছে বিস্ময়কর তক্ষণ ও শিল্প দক্ষতায়। (অজন্তা, ইলোরার গূহামন্দিরের, বামিংহাম গিরিপথের দৃষ্টান্ত স্মরণে আসে।)
শুধু কি তাই, ভারতবর্ষের, যুগপৎ বহির্বিশ্বেরও এমন হিন্দু (অ-হিন্দুও নাত্যল্প) ঘর কমই আছে যেখানে একটি, ছোট বা বড়, শাক্যসিংহের ধ্যানমগ্ন মূর্তি পাওয়া যাবে না।
আমাদের কবি যিনি বিশ্বেরও কবি, তাঁর চৈতন্যমুকুরে ধরা পড়েছিল অখিল নিরঞ্জন বুদ্ধের এই জগৎব্যপ্ত মহামানবীয় রূপ। তিনি সাক্ষী ছিলেন প্রথম বিশ্বযুদ্ধের, তিনি দেখেছিলেন ইউরোপের তথাকথিত উন্নত জাতিগুলির সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের অমানবিক হিংস্রতা, তিনি দেখেছিলেন জালিয়ানাবাগের নিষ্ঠুর নরহত্যা, তিনি দেখেছিলেন স্বদেশের স্বজাতির বিভেদের, সাম্প্রদায়িক বৈষম্যের রূপ !
"....... দেখি ধিক্কারে ভরিয়া ওঠে মন,
আত্মজাতি মাংসলুব্ধ মানুষের প্রাণনিকেতন
উন্মীলিছে নখে দন্তে হিংস্র বিভীসিকা।"
এবং তাই আন্তরিক আশ্রয় প্রার্থনা করেছিলেন নরশ্রেষ্ঠ
নরদেবতার কাছে,
"ভরসা হারালো যারা, যাহাদের ভেঙেছে বিশ্বাস,
তোমারি করুণাবিত্তে ভরুক তাদের সর্বনাশ, --
আপনারে ভুলে তারা ভুলুক দুর্গতি।"
এতক্ষণ রবীন্দ্র মানসে বুদ্ধদেব এবং বৌদ্ধ ধর্মের, বৌদ্ধ দর্শনের অভিঘাত নিয়ে কিছু বলা হোল, কিন্তু যা বলা বাকী রইল তা হোল বুদ্ধভাবনার তাঁর সৃষ্টিসমুহের কথকথা। এই কথকথা আরম্ভ করলে কথক বলতে পারবেন না, 'অদ্য শেষ রজনী'। তাঁর রচনার 'নৈবেদ্য কাব্যগ্রন্থ'-পরবর্তী সময়ের ( এই বিচারও প্রশ্নের উর্ধৈ নয়) সমস্ত লেখায় প্রত্যক্ষে বা পরোক্ষে অমিতাভ নিরঞ্জনের মানবতাবাদী দর্শনের উপস্থিতি লক্ষণীয়ভাবে সুপ্রকাশ।
প্রত্যক্ষরূপে পাই কথা ও কাহিনী কাব্যর একাধিক কবিতায়,--
অভিসার, (বোধিসত্তাবদান কল্পলতা)।
পূজারিণী, (অবদান শতক)।
নগরলক্ষ্মী, (কল্পদ্রুমাবদান)।
সামান্য ক্ষতি, (দিব্যাবদানমালা)।
পরিশোধ, (মহাবস্ত্বাবদান)।
শ্রেষ্ঠভিক্ষা, (অবদানশতক)।
রবীন্দ্রনাথ গ্রন্থশেষে লিখছেন,
"এই গ্রন্থে যে সকল বৌদ্ধকথা বর্ণিত হইয়াছে তাহার রাজেন্দ্রলাল মিত্র সংকলিত নেপালী বোদ্ধ সাহিত্য সম্মন্ধীয় ইংরেজি গ্রন্থ হইতে গৃহীত। মূলের সহিত কিছু কিছু প্রভেদ লক্ষিত হইবে।"
কবির এই সমাপ্তি বাক্যটি অনুধাবনীয়।
এবং তেমনধারাই সৃজনকর্ম তাঁর। বৌদ্ধ কাহিনীর চরিত্রগুলি, এমনকি বুদ্ধদেব স্বয়ং রবীন্দ্রনাথের লিখনলেখায় নবরূপ, নবতর চরিত্র-সুষমা লাভ করেছে। পরিশোধ কাহিনী-কবিতার বজ্রসেন, শ্যামা ও উত্তীয়---
এই ত্রিকোন প্রেমের পরিসমাপ্তি একটি অসামান্য রাবীন্দ্রিক ছোট গল্পের অনবদ্য উদাহরণ।
".....পরক্ষণে
ভূতলে রাখিয়া জানু যুবার চরণে
প্রণমিল ---- তারপরে নামি নদীতীরে
আঁধার বনের পথে চলি গেল ধীরে .."
শ্যামার এই অন্তিম যাত্রা, এই বিষাদময় বিচ্ছেদ দুর্বিসহ। শ্যামা, বজ্রসেন ও উত্তরীয় ---- মাঝখানে মানবীয় প্রেম কামনা করেছিল ক্ষমা।
এই ভাবেই তিনি যখন গীতিনাট্য ও নৃত্যনাট্য রচনা করেছেন তখনো আমরা লক্ষ্য করেছি রবীন্দ্রনাথ বৌদ্ধদর্শন-সঞ্জাত মানবীয় প্রেম, মানবীয় আবেগ ও মননকে সঞ্চারিত করেছেন প্রকাশে, অভিব্যক্তিতে, উপস্থাপনায় ও রসসঞ্চারে। এই রসাবেসের দৃষ্টান্ত আছে মালিনী, রাজা, অচলায়তন, গুরু, অরূপরতন, নটীর পূজা এবং সবিশেষভাবে চণ্ডালিকায়।
একইভাবে বিশ্বের সমস্ত মনীষী---- সাহিত্যসাধক, সমাজ সংস্কারক, রাষ্ট্রনায়ক, বিভিন্ন বিষয়ের পণ্ডিত, গবেষক --- যারাই স্যার এডুইন আর্নল্ডের The Light of Asia বা প্রাচী ধরিত্রীর আলো পাঠ করেছেন তাঁদের কর্মে, ধর্মে, সৃজনে, মননে মানব-ধর্মের মূর্ত রূপ ভগবান তথাগত গৌতমবুদ্ধের জীবনবোধের অনির্বাণ আলোকরশ্মি প্রতিফলিত হয়েছে, প্রতিবিম্বিত হয়েছে।
ঋণ স্বীকার:
The Light of Asia -- Sir Edwin Arnold,
রবীন্দ্র রচনাবলী,
সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত,
The Light of Asia: The Poem that Defined
The Buddha --- Joyram Ramesh.
('রবীন্দ্রনাথের শ্রেষ্ঠ মানব' -- এই বিষয়টি নিয়ে একটি দীর্ঘ প্রবন্ধ অনতিবিলম্বে প্রকাশিত হবে।)
_____________________________________________
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন