রবিবার, ৮ ডিসেম্বর, ২০২৪

বাঙলা ও বাঙালীর চিরন্তন দুর্গতি

বাঙলা ও বাঙালীর চিরন্তন দুর্গতি,---পর্ব ১ 

 ‌        (পরিমার্জিত সংস্করণ)


শিল্পবিশ্বের অবিস্মরণীয় ভাস্কর অগুস্ত রঁদা (Auguste Rodin, 1840--1917) চেয়েছিলেন --- 'ধর্ম নয়, রাষ্ট্র নয়, মানুষ --- ব্যক্তি মানুষ, তার মন, তার দুঃখ, তার আনন্দ, তার অন্তরের আলো আঁধারের অপার বিশ্বকে তিনি ধরে রাখবেন তাঁর সৃষ্টিতে।' ধরে রেখেছেনও। তাঁর‌ সৃষ্ট The Thinker, The Kiss, The Gates of Hell, Monument to Balzak, Adam -- এসকল ভাস্কর্যগুলি যাঁরা দেখেছেন তাঁরা জানেন কী আকাশ-উদার দৃষ্টিভঙ্গিতে তিনি জগৎ এবং এই জগতের একমাত্র চিন্তাশীল মানব নামক প্রাণীটিকে দেখেছেন।'
তেমন আকাশের মত উদার, সাগরের মত দৃষ্টিতে বাঙলার শিল্পী, সাহিত্যিক, দার্শনিকরাও তো 'জীবন, জগৎ, দেশ ও কাল'-কে ধরেছিলেন, ধরেছেন। ভুলে যাব কি জয়দেব-চণ্ডীদাসের আমল থেকে রবীন্দ্রনাথ- নজরুলের সময়কাল পর্যন্ত কবিদেরকে, ভুলে যাব কি মহাশিল্পী ধীমান ও ভিত্তিপাল থেকে থেকে আরম্ভ‌ করে রামকিঙ্কর বেইজ, মীরা মুখোপাধ্যায় ও শেলিম শেখের মত মহান শিল্পীদের।‌ সুর-সঙ্গীতের জগতে চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন ও থাকবেন আলাউদ্দিন খাঁ, বড়ে গোলাম আলি, আলি আকবর খাঁ, পণ্ডিত রবিশঙ্কর, শিশিরকণা ধরচৌধুরী ; গোপেশ্বর বন্দোপাধ্যায় থেকে শুরু করে ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায় ও দিলীপ রায়। এ সকলি তো গুটিকয় উদাহরণ মাত্র। আরো কত যে ছিলেন, কত যে রয়েছেন। ছিলেন লালন ফকির, হাসান রাজা, ছিলেন আব্বাসউদ্দিন, ভবা পাগলা।
রবীন্দ্রসঙ্গীত ও নজরুল গীতি --- এই দুই সঙ্গীতধারা গঙ্গা-পদ্মার যুগ্মধারার মতো একই উৎসমুখ --- আবহমান কালের বঙ্গের হৃদয়গঙ্গোত্রী হতে উৎসারিত হয়ে, এপার ওপার দুপারের আনন্দবেদনার ঊর্মিমালা-মুখরিত কলকলোচ্ছ্বাস সৃজন করেছে, বহন করে চলেছে নিরন্তর, চলবেও অনন্তকাল ধরে। আমি রবীন্দ্র-নজরুল ভক্ত ঝাড়খণ্ডী, তাই নিরপেক্ষ বিচারে বলি, বাঙলা দেশে নজরুলের উপর যে গভীর ও শ্রদ্ধালু গবেষণা হয়েছে, হচ্ছে আজও এবং রবীন্দ্রনাথের ও নজরুলের গান যে আন্তরিক আবেগে গীত হয় তেমনটি আমি এপার বাঙলায় কম দেখি। বাঙলাদেশে এই দুই ধারার শিল্পসম্পদ এখনো তেমন দৃষ্টিকটুভাবে বানিজ্য্যকরণ প্রবনতার মধ্যে আসেনি। দু'দেশের পূর্বতন ও বর্তমানের অনেক মহান শিল্পীদের ক্ষেত্রে এমন সাধারণ বিচার খাটে না --- সে কথাও স্বীকার করি। যদিও বর্তমানে ধর্মীয় সংকীর্ণতামুক্ত সংগীত ও শিল্পচর্চা বাঙলা দেশে যথেষ্টই কুণ্ঠিত। 

দুই বাংলার রবীন্দ্র সঙ্গীত ও নজরুলগীতির এত বিপুল সংখ্যক মধুকণ্ঠ শিল্পী ছিলেন এবং এখনো আছেন যাঁদের নামের তালিকা এতই দীর্ঘ যে সকলের নামের উল্লেখ একটি সংক্ষিপ্ত নিবন্ধের পক্ষে দুর্বহ। অবশ্য এই নিবন্ধটির উদ্দেশ্যও তা নয়। 

আলোচনার প্রারম্ভেই বাঙলার শিল্পকলা বিষয়ে দু'কথা বলা এই কারণেই যে বাঙলা, এপার ওপার মিলিয়ে বাঙলার যে জাতিসত্তা ---- তার একটি অখণ্ড রূপ আছে, এবং একটি মানস-বিগ্রহ আছে। বাঙলার সে রূপের দেখা পাই ভৌগলিক সমতা বা সমরূপতার সৌন্দর্যে ; আর মানস-বিগ্রহের হৃদয়াবেগের অভিব্যক্তি অনুভব করি অবিভাজ্য শিল্প-চেতনায় --- সঙ্গীতে, সাহিত্যে, শিল্পকলায়, ঐতিহ্যে, কৃষ্টিতে ও সংস্কৃতির প্রকাশভঙ্গিমায়। এই যুক্তিতে মিল ও মিলন তো স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু পরিস্থিতি তাহলে অস্বাভাবিক হয়েছিল, হয়েছে, হচ্ছেই বা কেন ? এই প্রশ্নের উত্তর সহজ নয়, জটীল। তাও আবার শব্দ প্রয়োগে সামান্য অসতর্ক হলে যাচিত বিড়ম্বনায় জড়িয়ে পড়ার প্রবল সম্ভাবনাও আছে।
সে কথা মনে রেখেই বলি, পরিস্থিতির অস্বাভাবিকতার মূল কারণ ধর্ম। বঙ্গভূমির যে ভৌগলিক বিভাজন ঘটেছে তার কারণ ধর্ম, আর একই জাতি সত্তার বিভাজনের কারণও ধর্ম বা ধর্মধারণার ভিন্নতা। এই ধর্মধারণার ভিন্নতা হেতু ধর্মাচরণের মত পথ ও আচরিত সংস্কার আলাদা আলাদা --- মসজিদ ও মন্দির, ভগবান ও আল্লাহ। এই আপাত ভিন্নতার গভীরে, ধর্মীয় দর্শনের অন্তঃস্তলে কোন ভিন্নতা নাই। শুধু মহান ইসলাম বা মহান  হিন্দুধর্ম নয় পৃথিবীর সকল ধর্মের শেষ গন্তব্য সেই নিখিল পরিব্যপ্ত সর্বময় মহাসত্তা, জগৎস্রষ্টা। তাঁকে যে সম্বোধনেই ডাকি না কেন --- তিনিই পূজার্হ, তিনিই প্রার্থিত, তিনিই অভীষ্ট, তিনিই প্রারম্ভ, তিনিই অন্তিম এবং শেষ গতি।

ধর্ম নিয়ে আলোচনা বা বিশ্বের শ্রেষ্ঠ দুটি ধর্মদর্শনের ব্যাখ্যা করবার উদ্দেশ্যও এই প্রবন্ধটির নয়। উদ্দেশ্য বাঙালী জাতির অহেতুক অন্তর্দ্বন্দ্ব বিষয়ে দু'কথা বলা। ১৯৩৫ সালে রবীন্দ্রনাথ গবেষক চিন্তাবিদ ও প্রাবন্ধিক আবদুল ওদুদকে একটি চিঠিতে একটি মর্মান্তিক প্রশ্ন করেছিলেন, "আমরা দুইটি সম্প্রদায় কি সর্বনাশের শেষদিন পর্যন্ত পরস্পর বিদ্বেষ করেই যাব ?"


                      দুই 


প্রথম বিশ্বযুদ্ধের (১৯১৭ থেকে ১৯১৯) ভয়াবহতা লক্ষ্য করে বিশ্বের সারস্বত সমাজের বহু মানুষ রবীন্দ্রনাথ, রোমা রঁলা, আইনষ্টাইন, হারম্যান হেসে, স্টিফেন জিউইগ, সিগমুন্ড ফ্রয়েড, জরজেস ধূমেল প্রভৃতি. ... যুদ্ধের বিরুদ্ধে প্রচার করে গিয়েছেন অনলসভাবে। আন্তর্জাতিক সমিতি গঠন করেছিলেন, পরস্পর পত্রালাপ ও বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রনায়কদের কাছে দরবার করে যুদ্ধের অমানবিক নিষ্ঠুরতার দিকটি উন্মোচিত করে মরণ ও মারণলিপ্সা থেকে মানুষকে বাচাঁনোর চেষ্টা করেছিলেন, যুদ্ধ নামক নেশা (warphobia) থেকে যুদ্ধবাজ দেশগুলিকে বিরত থাকার কাতর আবেদন করেওছিলেন ("The Project of Declaration of Independence of The Spirit") ; কিন্তু তাঁদের সমস্ত প্রয়াস ব্যর্থ করে দ্বিতীয় মহাসমরের  (১৯৪৯-১৯৪৫) অনিবার্যতাকে স্বীকার করে নিতে হয়েছিল মানব সভ্যতাকে। 'সভ্যতার সঙ্কট' লিখতে হয়েছিল রবীন্দ্রনাথকে। 

"আজ আমার বয়স আশি বৎসর পূর্ণ হোল,..." জীবনের শেষ জন্মদিনে কবি লিখছেন, (শাশ্বত সত্যের সাধক, সত্যদ্রষ্টা ঋষিকবির অন্তর্দৃষ্টিতে ধরা পড়েছিল কি ১৯৪৬--'৪৭-য়ের তাঁর সোনার বাঙলার আসন্ন নারকীয় আত্মহননের দৃশ্য, কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধারম্ভের প্রাককালেই কৃষ্ণ যেমন অর্জুনকে দেখিয়েছিলেন যুদ্ধের অন্তিম পরিণাম ?)
"সভ্যশাসনের চালনায় ভারতবর্ষের সকলের চেয়ে যে দুর্গতি আজ মাথা তুলে উঠেছে সে কেবল অন্ন বস্ত্র শিক্ষা এবং আরোগ্যের শোকাবহ অভাব মাত্র নয় ; সে হচ্ছে ভারতবাসীর মধ্যে নৃশংস আত্মবিচ্ছেদ, যার কোন তুলনা দেখতে পাইনি ভারতবর্ষের বাইরে মুসলমান স্বয়ত্বশাসন-চালিত দেশে। কিন্তু এই দুর্গতির রূপ ক্রমশই প্রকট হয়ে উঠেছে, সে যদি ভারতের ঊর্দ্ধ্বস্তরে কোন এক গোপনকেন্দ্রে প্রশ্রয়ের দ্বারা প্রোষিত না হোত তাহলে কখনোই ভারত-ইতিহাসের এতবড়ো অসভ্য, কুৎসিত পরিণাম ঘটতে পারতো না।"

দুটি নিদারুণ ও মর্মান্তিক সত্যের বাক্যবন্ধ ---
'অতি নৃশংস আত্মবিচ্ছেদ' এবং "ভারতশাসন-যন্ত্রের ঊর্দ্ধ্বস্তরে কোন এক গোপন কেন্দ্রে-- বাঙলার, বাঙালীর দেহ ও আত্মা ব্যবচ্ছেদের ষড়যন্ত্র !" সেই নির্মম রাষ্ট্রীয় ষড়যন্ত্রের বিষময় পরিণতি হাতে হাতে। উন্মাদ উন্মত্ত সাম্প্রদায়িক তাণ্ডবে লণ্ডভণ্ড হয়ে গেল যুগ যুগ সাধিত মানবতার পাদপিঠ। বঙ্গজননীর শ্যামলাঞ্চলে রক্তের লাঞ্ছনা। শুধু মানচিত্রে নয়, চিত্তপটেও আঁকা হয়ে রয়ে গেল বিভেদের, বিচ্ছিন্নতার, বিদ্বেষের চিরকলঙ্কের রেখা।

স্বাধীনতা এল বাঙলার দেহ দ্বিখণ্ডিত করে, শোণিতসিক্ত, শব-আকীর্ণ বাঙলার মেঠোপথ ধরে। লক্ষ লক্ষ ভ্রষ্টনীড়, নষ্টমূল, হৃতগৌরব, দিশাহীন মানুষের ক্লান্ত মিছিল এসে পৌঁছাল শিয়ালদায়, কুপার্স, ধুবুলিয়ায়, রানাঘাটে। গড়ে উঠল ক্যাম্প --- জীবন্ত নরক।
এখানেই যদি বাঙলার বাঙালীর দুর্গতির অবসান হোত ! না, তা যে হবার নয়। কেননা বাঙলার দুর্দৈবের ইতিহাস যে চলমান। সেই দূর অতীতে তার আরম্ভ। লক্ষ্মণ সেনের রাজত্বের সময়কাল থেকেই যদি ধরি --- তুর্কীদের সর্বধংসী আক্রমণ, ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর হাতে সিরাজদ্দৌলার পতন, ছিয়াত্তরের মন্বন্তর, বর্গী আক্রমণ --- আরো কতই না। তারপর এই তো অদূর অতীতে, দাঙ্গা, দুর্ভিক্ষ, দেশভাগ, ওপারের ক্রমান্বয়ে রাষ্ট্রীয় শাসন-তান্ত্রিক  আলোড়ন। রক্তক্ষয়ী ভাষা আন্দোলনের পর থেকে রাষ্ট্ৰীয় মুক্তি সংগ্রামের সূচনা। গত শতকের সত্তরের দশকে বাঙলার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসও রক্তস্নাত। তখনো ওপার থেকে এপারে এসেছিলন কয়েক লক্ষ শরণার্থী। তাঁদের হৃদয়বিদারী দুর্ভোগের দৃশ্য আমাদের চোখে দেখা। তবে মুক্তিযুদ্ধের সৈনিকদের মধ্যে সম্প্রদায়গত বিভাজন ছিল না। তাই সেই মুক্তিসংগ্রামে মুসলমান এবং অমুসলমানের একটি ঐতিহাসিক মিলন সুদীর্ঘ কালের ইপ্সিত অসাম্প্রদায়িক সমাজচেতনার জন্ম দিয়েছিল। ধন-মান-প্রাণের ক্ষত-ক্ষতি-ক্ষয়ের মূল্যেও ওপার বাঙলায় সৃষ্টি হয়েছিল একটি উদার, ধর্ম-সম্প্রদায়-নিরপেক্ষ নূতন রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রচেতনা। এপার বাঙলার জনমানসেও তার প্রভাব পড়েছিল। প্রভাব পড়েছিল সাহিত্যে শিল্পে -- সংস্কৃতির সমস্ত শাখায়, ভাব ও ভাবনার আদান প্রদানের মধ্য দিয়ে জেগে ওঠেছিল ভৌগলিক গণ্ডীবদ্ধতাহীন নবতর বঙ্গ জাতিসত্তার মানসমূর্তি। স্বস্তি পেয়েছিলাম আমরা যারা গত শতাব্দীর পঞ্চাশ-ষাটের অনটন, সত্তরের সংগ্রাম, প্রতিবেশী দুই রাষ্ট্রের শাসনতান্ত্রিক অস্থিরতা দেখে দেখে ক্লান্ত। কিন্তু 'অভাগা যদ্যপি চায় সাগর শুকায়ে যায়'। চিরদিনের ভাগ্যবিড়ম্বিত এই ভূখন্ডের, এই জাতির ললাট লিখন দুর্মোচনীয়। সুস্থ, সুন্দর, সুস্থিত ওপার বাংলায় আবারও অস্থিরতা, রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক উপপ্লবের ঘোর ঘনঘটা। এখন কিছুটা মেঘছেড়া রোদ্দুর এলেও যে কোন দিন আবারো ধর্মান্ধ দ্বন্দ্বের অন্ধকার নেমে আসতে পারে। 


রাষ্ট্রের শাসনতান্ত্রিক অস্থিরতা একটি ইতিহাস-সিদ্ধ প্রক্রিয়া। সেই ইতিবৃত্তই মানব সভ্যতার ক্রমবিবর্তনের সত্যরূপ --- একথা ঐতিহাসিকেরা অস্বীকার করেন না। সেই বিবর্তন কখনো কখনো মানব সমাজের মঙ্গলের জন্যে আলোকিত পথের দিশা নির্ধারণ করে (The way to enlightenment) এবং সেই পথ ধরেই আমরা রাজতন্ত্র - অভিজাততন্ত্র- একনায়কতন্ত্রের পর্যায়ক্রমিক ব্যবস্থা পেরিয়ে এবং  ইউটোপিয়ান সর্বহারার একনায়কতন্ত্রের দুষ্প্রয়োগের বাস্তব অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে গণতন্ত্র বা সমাজতান্ত্রিক গণতন্ত্রের পথ অবলম্বন করেছি যে পথে সমস্ত মানুষকে নিয়ে, ধর্ম-বর্ণ-জাতি-সম্প্রদায় নিরপেক্ষ রাষ্ট্র গঠনের প্রতিশ্রুতি আছে। এই রাষ্ট্রভাবনা ভারতবর্ষে আছে এবং যে সময়ে ভারতের প্রতিবেশী দেশগুলিতে 'ধর্ম'বিশ্বাসকে কেন্দ্রস্থলে রেখে রাষ্ট্রযন্ত্র চালানোর ব্যবস্থা কায়েম হয়েছে তখনো ভারতরাষ্ট্র 'গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র' (Democratic Republic) রূপেই আপন সার্বভৌম সত্তা প্রতিষ্ঠিত করেছে। এই রাষ্ট্রব্যবস্থায় জনগণ সরাসরি, প্রত্যক্ষে বা পরোক্ষে অংশগ্রহন করেছে এবং করে চলেছে। এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় ধর্ম বা সাম্প্রদায়িকতা যখনি মাথা তুলবার চেষ্টা করেছে তখনই দেশের জণসাধারণ যুগপৎ সংবিধান ও সংবিধান-সংরক্ষক বিচার ব্যবস্থা তেমন প্রচেষ্টাকে দৃঢ়তার সঙ্গে নস্যাৎ করে দিয়েছে। তাই ভারত রাষ্ট্রের একটি অঙ্গরাজ্য হিসাবে এপার বাঙলা বা পশ্চিম বাঙলার সমাজিক পরিবেশে এখনো সাম্প্রদায়িক অস্থিরতার সৃষ্টি হয়নি। কিন্তু বহির্বঙ্গ হতে ভেসে আসা একটি অপরিচিত রণহুংকার আসন্ন একটি সর্বনাশা ঝড়ের ইঙ্গিত পশ্চিম বাংলার আকাশে প্রতিয়মান হয়ে উঠেছে ।

 যেহেতু ওপার বাংলার সঙ্গে এপার বাঙলার ওতপ্রোত সম্পর্ক তাই বর্তমান বাঙলা দেশের সম্প্রদায়গত সঙ্কট গভীর দুশ্চিন্তার। তবু বিবেকের বাণী বেশিদিন রুদ্ধ হয়ে রইবেনা, এমন আশাকে প্রাণপণে রক্ষা করতেই হবে। এদেশ আউল, বাউল, ফকির, পীর- দরবেশ-মুর্শেদ আর সর্বধর্ম সমন্বয়ী সহজিয়া বৈষ্ণব, সুফী সাধকদের দেশ। এদেশ রবীন্দ্র নজরুল আর সংখ্যাতীত মানবতাবাদী মণীষী, সাহিত্যসাধক, কবিদের দেশ। একদিন মানবীয় চৈতন্যের আলোয় আলোকিত বঙ্গবিবেক এই ধ্রুবতা উপলব্ধি করবেই,
"সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপর নাই।"
যে সর্বদ্রষ্টা ঋষিকবির অন্তর্দৃষ্টিতে-ধরা অন্তিম বাণী নিয়ে কথকথা আরম্ভ করেছিলুম তার অমৃতময় উচ্চারণ স্মরণ করে আমিও বলি, ----

"আজ পারের দিকে যাত্রা করেছি ---- পিছনের ঘাটে কী দেখে এলুম, ইতিহাসের কী অকিঞ্চিৎকর,  উচ্ছিষ্ট সভ্যতাভিমানের পরিকীর্ণ ভগ্নস্তূপ ! কিন্তু মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ, সে বিশ্বাস শেষ পর্যন্ত রক্ষা করব।"  

মৃত্যুপথযাত্রী মানুষ আর ওষুধটুকুও খেতে চায় না, অসাড় হাত সামান্য তুলে বলতে চায়, "না না।" ঠোঁট দুটো ফাঁক করে জল চায় এক গণ্ডূষ। মানবতাহীন মানব সভ্যতার আজ তেমনই পরিণাম। হাজার হাজার বছরের চর্চিত, লালিত দর্শন, বিজ্ঞান, সাহিত্য, শিল্প ; প্রেম, সুকুমার প্রবৃত্তি, প্রাণদায়ী বৃত্তি ; মৈত্রী, করুণা, সৌভ্রাতৃত্ব --- সমস্ত মৃতসঞ্জীবনী ঔষধি আজ ব্যর্থ হয়েছে, বিফল হয়েছে। ইস্রায়েল, The promised Land for the Zews, দাবি করে সমস্ত মধ্যপ্রাচ্য, (stretching from The Nile to the Euphrates, and including parts of Egypt, Soudi Arabia and Iraq.) ইহুদিদের জন্য ঈশ্বর (Jehovah) নির্ধারণ করে গিয়েছেন। অপরদিকে ইসলাম ধর্মধারণায় সমগ্র বিশ্ব বা মহাবিশ্ব মহান আল্লাহর সৃষ্টি। 

আশ্চর্যের বিষয় এই যে ইহুদি ধর্ম, খ্রিস্টান ধর্ম এবং ইসলাম -- এই তিনটি ধর্মধারণারই মূল উৎস একেশ্বরবাদী আব্রাহামিক ধর্মচেতনা --অর্থাৎ নবীশ্রেষ্ঠ ইব্রাহিম বা আব্রাহাম- এর বংশধারা ও ঐতিহ্যের সঙ্গে সংযুক্ত ; কিন্তু তবুও এই তিন ধর্মের অনুসারীদের মধ্যে পরস্পর শোণিত-সিক্ত আত্মঘাতী সংগ্রাম ও স্বজাতিহনন হাজার হাজার বছর ধরে মানব সভ্যতার স্বর্গারোহনের পথ বন্ধ করে দিয়ে প্রায়শই মানবজাতির অধোগতি পথ প্রশস্ত করে দিয়েছে। এই প্রসঙ্গে আমার সদ্য প্রকাশিত 'বিন্দুতে সিন্ধু দর্শন'' গ্রন্থে' 'ধর্মসংকটের বলি মানবতা' প্রবন্ধে সবিস্তারে আলোচনা করা হয়েছে। 

                           (ক্রমশঃ) 

দ্বিতীয় পর্ব একদিন পর প্রকাশিত হবে।

দুলাল চন্দ্র বন্দোপাধ্যায় 
০৮/১২/২০২৪
কলকাতা। 
_________________________________________



কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Recently published

অমূল্য

He ( Tagore) who sees all things in his own self and his own self in all things, he does not remain unrevealed.                     ...