সুগভীর প্রজ্ঞার একটি ঐতিহাসিক গ্রন্থ
দুই
গ্রন্থটির শেষ, অষ্টম সর্গের শেষাংটি আবেগময়তায় অত্যন্ত হৃদয়দ্রাবী।
Here endth what I write
Who love the Master for his love of us
A little knowing little I have told
Touching the Teacher and the Ways of Peace.
Fifty five years thereafter showed he those
In many lands and many tongues gave
Our Asia Light, that still is beautiful
Conquering the World with spirit of strong grace
All which is written in holy books. ......
যে ভালোবাসা দিয়ে বেসেছেন তিনি ভালো,
সে ভালোবাসার সামান্য জেনেছি আমি।
পরশ পেয়েছি সে মহাগুরুর স্বর্গীয় করুণার,
দিয়েছেন তিনি সান্ত্বনা আর শান্তি-পথের দিশা।
তেমনিভাবেই প্রাচী ধরিত্রীর কত বিভিন্ন দেশে,
কত বিচিত্র ভাষায় জ্বেলেছেন তিনি জ্ঞানের দীপ্ত শিখা,
জয় করে' সারা বিশ্বভূবন অপরাজেয় সাধনার মহিমায়।
লেখনীতে লেখা, তুলিকায় আঁকা সেই দিব্য জীবনকাহিনী
আজও সত্য, আজও সুন্দর নরদেবতার বাণী।
(ভাবানুবাদ মৎকৃত।)
তারপর, পুস্তকসমাপ্তির ঠিক উপসংহারে, পরম শ্রদ্ধালু লেখক অখিল নিরঞ্জন তথাগত বুদ্ধের উদ্দেশে যে স্তবগাথা গেয়েছেন তার তুলনা শুধুমাত্র আছে শ্রীমদ্ভগবদ্গীতায় --- যেখানে অর্জুন সারথী কৃষ্ণকে বলছেন,
"নষ্টোমহো স্মৃতির্লব্ধা তৎপ্রসাদাৎ ময়াচ্যুত।
স্থিতোহস্মি গতসন্দেহঃ করিষ্যে বচনং তব।।"
অষ্টাদশ অধ্যায় ।।৭৩।।
"...... Ah ! Lover ! Brother ! Guide ! Lamp of Law !
I take my refuge in thy mame and Thee
I take my refuge in thy 0rder ! OM !"
হে আমার প্রিয়তম, ভাই, বন্ধু, জীবন পথের সাথী,
হে আমার মুক্তিপথের আলো, আমার শেষের আশ্রয়,
"তোমারেই করিয়াছি জীবনের ধ্রুবতারা", ওঁ ।।
গ্রন্থশেষের এই স্তবগাথাটি দশটি অসামান্য পংক্তিতে রচিত। (আমার পাঠকদের কাছে এই প্রার্থনা রইল যাঁরা এই অপূর্ব কাব্যটি পান নি, পড়ার সুযোগ যাদের আসেনি তাঁরা অবশ্য অবশ্যই পাঠ করবেন)।
কিষাগৌতমীর উপাখ্যান
উপাখ্যানটি সকলের জানা। বুদ্ধদেব কি ভাবে মৃতসন্তান, শোকদগ্ধা মাতা কিসাগৌতমীকে জীবনের পরম সত্যের সন্ধান দিয়েছিলেন। তাকে বলা হয়েছিল, মৃত্যু যে ঘরে জীবনাবসান ঘটাতে পারেনি, সেই ঘর থেকে একমুঠো সর্ষে আহরণ করতে, স্পর্শে যার মৃত সন্তান পুনর্জীবন লাভ করবে। -- তাই নিয়েই এই কাহিনী। মৃতবৎসা কিষাগৌতমীর আর্তনাদ,
I went, my Lord, clasping to my breast0
The babe, grown colder, asking at each hut ---
Here in the jungle, and towards the town ---
'I pray you, give me mastered, of your grace,
A tola black ; and each who had it gave,
For all the poor and piteous to the poor ;
But when I asked, in my friend's household here
Hath any peradventure ever died
Husband or wife, or child, or slave ? they said:
'O Sister, what is this you ask ? the dead
There are very many, and the living few.'
লেখকের বর্ণনায় ভাষার যে পেলবতা, ঘটনার যে শোকাতুর, মর্মস্পর্শী ছবি ফুটে উঠেছে, তাতে মনে হয় তিনি যেন এই সজল শ্যামল দেশের কোমলহৃদয় এক কবি। আমাদের মন পড়ে কবি করুণা নিধান বন্দোপাধ্যায়য়ের 'জীবন ভিক্ষা' কবিতাটি,
"দেউলে দেউলে কাঁদিয়া ফিরি গো দুলালে আগলি বক্ষে
উষ্ণ-বিয়োগ-উৎস-সরিত দরদবিগলিত চক্ষে।
শত চুম্বনে মেলে না নয়ন চুরি গেছে মোর আঁচলের ধন,
অভাগী বিহগী আজিকে আহত মরণ শ্যেনের পক্ষে।
...........................................….......................
জানি প্রভু তব পাণির পরশে ননীর পুতুল জাগিবে হরষে
কোন পাষাণের বিষবাণে তার নয়নের মণি ভিন্ন ?"
....................................................................
অচঞ্চল বুদ্ধ যেন মূর্ত বিগ্রহ করুণার। কিষাদেবীকে বললেন, "
"থাকে যদি কোথা অশোক নিলয় ভিখ মাগি আন সর্ষপচয়---
পরশে তাহার দুলিয়া উঠিবে পরাণ-মৃণাল-ভগ্ন !"
শোকার্ত মা কোথাও পেলেন না তেমন এক ঘর যেখানে মৃত্যুর চরণচিহ্ন আঁকা হয়ে যায়নি কখনো।
অবশেষে কিষাদেবী ত্রিতাপহারী ভগবান বুদ্ধের শ্রীচরণে আশ্রয় নিলেন, বললেন,
"জীয়াতে চাহিনা তনয়ে আমার ভবনে ভবনে উঠে হাহাকার,
হরো' জগতের বিরহ-আঁধার দাও গো অমৃত দীক্ষা।"
এই সুললিত কাব্যে বৌদ্ধ ধর্ম ও বৌদ্ধ দর্শনের সহজ সরল, মানবীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে বর্ণনা ও সম্যক ব্যাখ্যাও আছে। যেমন ত্রি-তাপ দুঃখ, শীল, সমাধি, প্রজ্ঞা, অষ্ট- নীতি এবং সর্বজনীন তিন সত্য। এই তিনটি সত্য বৌদ্ধদর্শনের চুড়ান্ত পরম প্রতিপাদ্য বিষয়। যা বৌদ্ধধর্মের নিরীশ্বরবাদের প্রধান ও অন্তিম সিদ্ধান্ত।
প্রথম সত্য অসারত্ব (সংঘঠিত বা ঘটমান ঘটনাগুলির কোন অস্তিত্ব নেই)।
দ্বিতীয় সত্য অনস্তিত্ব (অস্তিত্ব থাকলেও তা সাময়িক)।
তৃতীয় সত্য মধ্যপথ ( ঘটনাগুলির বিচার করতে হবে স্থায়িত্ব ও অস্থায়িত্বর মধ্যবর্তী ধারণায়)।
এইভাবে বুদ্ধের ধর্মমতের ও ধর্মদর্শনের নীতি, সত্য, বিচার, মত ও পথের বিবরণ যা ত্রিপিটক পুস্তকে লিপিবদ্ধ আছে, সেইসব সমস্ত বিবরণ ছাড়াও দুই সহস্রাব্দের অধিক কালে ধরে অসংখ্য পুঁথিতে যা কিছু লিপিবদ্ধ হয়েছে সে সবেরই একটি অতি সংক্ষিপ্ত সংস্করণ আর্নল্ড সাহেবের এই Light of Asia বা 'প্রাচী ধরিত্রীর আলো' গ্রন্থটি।
প্রভাব
রাজকুমার সিদ্ধার্থের জন্ম থেকে তাঁর সাধনা ও আত্মোপলব্ধির বা বুদ্ধত্ব লাভের সময়কাল বাদ দিলে থাকে তাঁর ধর্মপ্রচারের কয়েকটি বছর। ঊনপঞ্চাশ বছর অব্যাহত ছিল এই মহাতীর্থঙ্করের ধর্মপ্রচার যাত্রা সেই সময়কালে তিনি ভারতীয় (অখণ্ড) উপমহাদেশের উত্তর ও উত্তরপূর্বের সুবিস্তীর্ণ অঞ্চলের বহু জনপদে পরিভ্রমণ করেন এবং ধর্মপ্রচারে আত্মসমর্পণ করেন। সারনাথ থেকে যাত্রা আরম্ভ করে গয়া, শ্রাবস্তী, বৈশালী, বিদিশা, কৌশাম্বী, উজ্জয়িনী প্রভৃতি রাজ্যের বিস্তৃত অঞ্চলে বিচরণ করেন, রাজপুরীর উপকণ্ঠে অবস্থান করেন। রাজা ও সম্রাটগণও তাঁর মানব-চৈতন্য-উন্মেষকারী দার্শনিকতায়, অহিংসা মন্ত্রে মুগ্ধ হয়ে তাঁর দীক্ষালাভ করেন। সম্রাট অশোক, বিম্বিসার, অজাতশত্রু, প্রসেনজিৎ ছাড়াও অসংখ্য রাজা ও রাজন্যবর্গ বৌদ্ধ ধর্মের পৃষ্টপোষকতা করেছিলেন এবং বৌদ্ধধর্ম প্রচার, বৌদ্ধমঠ, চৈত্য, বৌদ্ধবিহার, বৌদ্ধস্তুপ নির্মাণে সাহায্য করেছিলেন। বুদ্ধের জীবনকালে এবং তাঁর মহাগতি প্রাপ্তির পরও প্রায় এক হাজার বছর ধরে চলেছিল বৌদ্ধ ধর্ম সংস্থাপনের এরূপ মহাযজ্ঞ। বৌদ্ধ ধর্ম ছড়িয়ে পড়ে এশিয়া মহাদেশের সর্বত্র। চিন, তিব্বত, জাপান এবং শ্রীলঙ্কাসহ সুদূর দক্ষিণ ও দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার দ্বীপময় ধরিত্রীর প্রান্তে প্রান্তে। যুদ্ধজয়ের পরিবর্তে ধর্মবিজয়ের পথ অবলম্বন করে সম্রাট অশোক ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন।
আনুমানিক খ্রীষ্টপূর্ব ৪৮৩ অব্দে, আশি বৎসর বয়সে, কুশীনগরে এই মহাতীর্থঙ্কর মহাপরিনির্বাণ লাভ করেন।
বৌদ্ধধর্ম সংক্রান্ত পুঁথি --- ত্রিপিটক, পালি ত্রিপিটক, প্রজ্ঞাপারমিতা --- অজস্রবার লিপিবদ্ধ ও প্রচারিত হয়েছে এই সময়কালের মধ্য।
Light of Asia বা 'প্রাচী ধরিত্রীর আলো' কাব্যগ্রন্থটির স্বতন্ত্র প্রভাব।
এশিয়া মহাদেশের প্রায় সর্বত্র বৌদ্ধ ধর্ম প্রচারিত ও প্রসারিত হলেও ইউরোপ ভূখন্ডে তার তেমন প্রভাব ছিল না। কিন্তু ১৮৮৯ খ্রীষ্টাব্দে স্যার এডুইন আর্নল্ডের এই 'Light of Asia' কাব্যটি প্রকাশিত হবার সঙ্গে সঙ্গে ইউরোপ ও আমেরিকার সারস্বত সমাজের গৌতম বুদ্ধের বিষয়ে ঔৎসুক্য অকস্মাৎ চরম আকার ধারণ করে এবং মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে গ্রন্থটির ন্যূন্যাধিক আশিটি সংস্করণ প্রকাশিত হয়। শুধু পশ্চিমের দেশগুলিতেই নয়, সারা বিশ্বের ঐতিহাসিক, গবেষক, চিন্তাবিদ, নোবেল পুরস্কারজয়ী সাহিত্যসাধক, বিজ্ঞানী, দেশনায়কদের ভাবনার জগতেও আলোড়ন সৃষ্টি হয়। তাঁদের মধ্যে ছিলেন রবীন্দ্রনাথ, আইনষ্টাইন, কিপলিং, ইয়েটস ; ছিলেন চার্চিল, মহাত্মা গাঁধী, জওহরলাল নেহরু, ভি আর আম্মেদকর।
অস্কার ওয়াইল্ড (Oscar Wilde)-য়ের বিখ্যাত উপন্যাস দি পিকচার অব ডোরিয়ান গ্রে, (The Picture of
Dorain gray). উপন্যাসের চলচিত্রায়নে দখানো হয়েছে প্রধান চরিত্র বিধস্ত-জীবন, কারারুদ্ধ ডোরিয়ানকে তার বন্ধু Light Of Asia বইটি উপহার দিয়ে তাকে সুন্দর জীবনে ফিরে আসতে সাহায্য করেছিল।
১৯৫৫ সালে উইনস্টন চার্চিল ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জহরলাল নেহেরুকে লিখছেন,
"I hope You will think of the phrase , 'The Light Of Asia'. It seems to me that you might be able to do what no other human being could in giving India the lead, at least in the realm of thought, throughout Asia, with the freedom and dignity of the individual as the ideal rather than communist party drill book."
এই ঐতিহাসিক চিঠির প্রাসঙ্গিকতা ও তাৎপর্য্য গভীর। একজন ইতিহাসের ছাত্র হিসাবে আমার মনে হয়েছে ব্যক্তি স্বাধীনতা এবং ব্যক্তির আত্মসম্ভ্রম রক্ষা করবার জন্যে তথাগত বুদ্ধের জাতি-ধর্ম-বর্ণ-সম্প্রদায় ও শ্রেণী-নিরপেক্ষ দর্শন ও আদর্শের যে মূল ভাবনা তার অনুসরণের মধ্যে দিয়েই সমগ্র এশিয়ার মুক্তি ও সামাজিক উন্নতি সম্ভব। জহরলাল নেহেরুর পক্ষেই সেই চিন্তার দীপশিখা প্রজ্বলন করা সম্ভব ( যে হেতু Light Of Asia -- এই শব্দবন্ধটি, phrase, তিনি জানেন ; সাম্যবাদী মতবাদে (Communist drill book) যা নেই।
এখানে মনে করা যেতেই পারে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে সমগ্র পৃথিবীর রাষ্ট্রগুলি, উত্তর ও দক্ষিণ গোলার্ধের ছোট বড় সমস্ত দেশ দুই ক্ষমতাকেন্দ্রে (Power Bloc) ভাগ হয়ে গিয়েছিল --- সোভিয়েট ইউনিয়ন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র (The USSR & The USA). গঠিত হয়েছিল যথাক্রমে NATO ( North Atlantic Treaty Organisation) আর WARSW pact অনুযায়ী সোভিয়েত ইউনিয়ন ও তার অন্য সাতটি দেশের বন্ধুত্বের চুক্তি)। জওহরলাল নেহেরু এবং ভারতের আরও কয়েকটি বন্ধুরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপ্রধান, যাঁরা কোন ক্ষমতার ভরকেন্দ্রেই থাকতে চাইলেন না, তাঁরা গড়ে তুললেন ওই জোট নিরপেক্ষ একটি অহিংসপন্থী আন্দোলন, বা Non Aligned Movement. এই আন্দোলনের অগ্রদূত ছিলেন জওহরলাল নেহেরু, ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট সুকর্ন, যুগোশ্লাভিয়ার প্রেসিডেন্ট জে বি টিটো, মিশরের প্রেসিডেন্ট জি এ নাসের এবং ঘানার প্রেসিডেন্ট কুয়ামি কুরমা।
কিন্তু তবুও জওহরলাল নেহরু যেহেতু সমাজতান্ত্রিক চিন্তাধারায় বিশ্বাসী ছিলেন এবং প্রায় প্রতিবেশী দেশ সোভিয়েত ইউনিয়নের দিকে তাঁর স্বাভাবিক ঝোঁক (inclination) ছিল ---- সে বিষয়ে অবহিত হয়েই চার্চিল সাহেব তাঁকে বুঝিয়ে দিতে চেয়েছিলেন জনগণতান্ত্রিক আদর্শ ভারতের ঐতিহাসিক ধারনাতেই বিদ্যমান ; কমিউনিষ্ট চিন্তাধারাতে নয়।
যাই হোক্, এ-সব ইতিহাসের তথ্য ও তত্ত্ব আমাদের আলোচনার বিষয়বস্তু হয়ে উঠেছে এইটি অনুধাবন করবার জন্য যে ওই স্যার এডুইন আর্নল্ডের লেখা কাব্য 'The Light Of Asia' বা 'প্রাচী ধরিত্রীর আলো'-র প্রভাব কী গভীর ও পরিব্যপ্ত ছিল ঊনবিংশ শতকের শেষভাগ থেকে বিংশ শতকের মধ্যভাগ পর্যন্ত এবং যা আজিও প্রাসঙ্গিক। গ্রন্থটির ক্রমবর্ধিষ্ণু লোকপ্রিয়তা তাই প্রমাণ করে।
(ক্রমশঃ)
____________________________________________