দুই
তাঁর কাব্যগ্রন্থগুলির বিশদে আলোচনা করবার প্রয়াস রয়েছে অপর একটি গ্রন্থে ('বিন্দুতে সিন্ধু দর্শন--দ্বিতীয় খণ্ড)। বর্তমানে তাঁর বনলতা সেন কাব্যগ্রন্থটির বহুপঠিত এবং বহুচর্চিত কবিতা 'বনলতা সেন ' সম্মন্ধে আলোচনা করবার চেষ্টা করব।
কবিতাটির প্রথম প্রকাশ বুদ্ধদেব বসুর কবিতা পত্রিকায়, ১৯৩৫ খ্রীষ্টাব্দের ডিসেম্বরে। পরে 'বনলতা সেন' কবির তৃতীয় কাব্যগ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। আবারো সেটি 'মহাপৃথিবী' কাব্যগ্রন্থে স্থান লাভ করে।
কবিতাটির প্রথম পংক্তি পাঠককে ঝাঁকুনি দেয়।
'হাজার বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে' --- সিংহল সমুদ্র, অন্ধকারে ঢাকা মালয় সাগর, বিম্বিসার অশোকের ধূসর জগৎ। এসেছে বিধর্ভ নগর, নিশার তিমিরাচ্ছন্ন বিদিশা নগরী--- কবির এহেন অতীতচারী কল্পনার অভিযাত্রার সঙ্গী হবে যে পাঠক তারও তো মনে ক্লান্তিভার আসবেই নেমে। হাজার বছর ধরে দূরে, দূরান্তে পদচারণায় ক্লান্তি-শিথিল জীবনের পরমতম আশ্রয়-- একটি নিশ্চিন্ত আশ্রয় প্রেম। কোথায় সে, কি রূপ তার ?
উত্তর --- নাটোরের বনলতা সেন। অন্ধকারে ঢাকা বিদিশা নগরীর রাত্রির মত তার কেশরাশি, শ্রাবস্তী নগরীর কারুকলার সৌন্দর্য দিয়ে গড়া তার মুখশ্রীমায়া। অকূল সমুদ্রের দিকভ্রষ্ট অভিযাত্রীর অকস্মাৎ দেখা সবুজ দারুচিনি দ্বীপ খুঁজে পায়, তেমনি সেই আশাময়ী ভাষাময়ী প্রেমময়ীর আবির্ভাব, আশ্রয়দানের অর্ঘ্য (নীড়) সাজিয়ে চিরপরিচয়ের নির্ভার নির্ভরতায় আমন্ত্রণ জানিয়ে বলে, ''এতদিন কোথায় ছিলেন ?"
তারপর শ্রান্তিহরা, শান্তিময়ী 'অনন্ত' বিশ্রাম। অশ্রুত শব্দের শিশির-পতনের নৈশব্দমাখা সন্ধ্যায়, যখন রৌদ্রের আভাটুকুও মিলিয়ে যায় আকাশবিহারী চিলের ডানায়, কূলায়ে ফিরে পাখী, নদী তার ক্লান্তি ঢালে সাগরসঙ্গমে, সমস্ত রঙ একাকার হয়ে যায় সান্ধ্য অন্ধকারে, অস্তগত দিনের গল্পের পাণ্ডুলিপি লেখে ঝিলমিল জোনাকীর আলো --- সেই দিনশেষের, (জীবন শেষের!) একান্ত, একমাত্র অবলম্বন বনলতা সেন। সেই কি চিরন্তন নারীত্বের কল্পমূর্তি --- "the Eternal feminine" ?
কবিতাটিতে কবি এক অত্যাশ্চার্য প্রেমের কল্পচিত্র অঙ্কন করেছেন। কবির মানসী, নাটোরের 'বনলতা সেন', নাটোরের রাজপুরীর রাজকন্যা নয় ; যদি হোত তবে আমরা বাঙলা সংস্করণের পেত্রার্কার লরা, বা দান্তের বিয়াত্রিস, বা লিওর্নাদো 'দ্য ভিঞ্চির মোনালিসাকে পেতাম। দেহসুষমার গঠনে মানবী রূপের চিহ্নগুলি সংরক্ত আবেগের কলমের তুলি দিয়ে আঁকা হোত। কিন্তু এ কী! কোন্ সে সুদূর অতীতের, বিস্মৃতির ছায়াময়ী অস্পষ্টতায় হারিয়ে যাওয়া 'বিদিশা'র তমসাময়ী রাত্রি এসেছে সে নারীর চুলের উপমা হয়ে, মুখের আদলের উপমায় এসেছে 'শ্রাবস্তীর' কারুকার্যময়তা। আবার তার সঙ্গে কবির অন্তিম দেখা দিনান্ত বেলার 'অন্ধকারে'।
অবচেতন মনের অন্তঃস্তল থেকে কোন্ সে বিষাদমগ্নতা হতে উঠে এসেছে মিলনহীন প্রেমের কামনা। সফেন জীবনসমুদ্র পাড়ি দিয়ে দু' দণ্ড শান্তির প্রত্যাশা ! কবি বলছেন, 'দিয়েছিল' ; কিন্তু জীবনের 'সব লেন দেন' ফুরায় যখন, যখন থাকে শুধু অন্ধকার ?
পাঠককে এমনই এক বিশ্বাস অবিশ্বাসের আলো ছায়ায় অমোঘ আকর্ষণে টেনে আনতে পারেন যে শিল্পী তাকে তো বলতেই হবে পরাবাস্তবতার স্রষ্টা।
"Surrealist artists have drawn inspiration from mysticism, ancient cultures and indigenous art and knowledge as a way of imagining alternative realities."
ইংরেজি সাহিত্যের কবি এবং অধ্যাপক জীবনান্দ দাশের এই কবিতার সঙ্গে (Edgar Allen Poe) এডগার এলান পো-র 'To Helen' কবিতাটির মিল বিস্ময়কর। কয়েকটি লাইন উদ্ধার করি,
"Helen, thy beauty is to me
Like those Nicean barks of yore,
That gently, over a perfumed sea,
The weary way-worn wanderer bore
To his own native shore.''
Nicean barks, perfumed sea, way-worn wanderer, to his native shore -- এ সকল সমাসবদ্ধ শব্দগুলি যেন এই মাত্র জীবনান্দের 'বনলতা সেন' কবিতায় পড়ে এসেছি --- মনে হোল। তারপর ঐ,
"Thy hyacinth hair, thy classic face,
And naiad airs have brought me home
To the beauty of fair Greece,
And the grandeur of old Rome."
"চুল তার কবেকার বিদিশার নিশা,
মুখ তার শ্রাবস্তীর কারুকার্য ;"
"Thy hyacinth hair, thy classic face."
What a parallel !The person, the object -- those are, as if, depicted similar to one another.
এ তো গেল 'বনলতা সেন' কবিতাটির কথা।
এর পরও আসে তাঁর রূপসী বাঙলা', যে কাব্যগ্রন্থটি তাঁর মৃত্যুর পর প্রকাশিত হয়। জন্মভূমির সমস্তকে, (তার ইতিহাস-ভূগোল, তার অতীত, তার বর্তমান, তার পুরাণ (mythology), তার শিল্পকলা, সাহিত্য, লোকাচার, লোকসংস্কৃতি, লোকসঙ্গীত) চির অমলিন, চির অক্ষয় করে গিয়েছেন এই মরমীয়া কবি -- হাস্যরসের উচ্ছ্বাসে নয়, বেদনার অশ্রুজলধারায় অভিসিঞ্চিত করে।
দান্তের পোর্টেট দেখে কার্লাইল বলে ছিলেন,
"I think it is the mournfulest (old english) face that ever was painted from reality, an altogether tragic, heart-affecting face."
আমরাও কবি জীবনান্দে হাস্যোজ্জ্বল মুখ কখনো দেখিনি ; দেখেছি সদাবিষন্ন, ছায়াচ্ছন্ন এক বেদনাতুর মুখাবয়ব।
(কিন্তু বন্ধুমহলে তাঁর হাস্যরসাত্মক মন্তব্যগুলি বহুচর্চিত।
সে কাহিনী বারান্তরে।)
ঋণ স্বীকার
বুদ্ধদেব বসু
ভূমেন্দ্র গুহ
সুজিত সরকার ও
সমকালিক দেশ পত্রিকা।
দুলাল চন্দ্র বন্দোপাধ্যায়
১৫ -১১ - ২০২৪
কলকাতা।
সমাপ্ত
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন