সোমবার, ২৭ মে, ২০২৪

মেঘ

বহুদিন পরে জ্বলন্ত আকাশ ডেকেছে শ্যামল মেঘে, 
বহুদিন পরে আর্দ্র বাতাস বইছে সুসহ বেগে। 
কতদিন পরে বিদ্যুৎ শিখা প্রেম কটাক্ষ হানে, 
ভীষণ সে বান, রণহুঙ্কার শিহরণ জাগে প্রাণে। 
জীর্ণ যা কিছু পুড়ে যাবে, উড়ে যাবে তার ছাই, 
যাবার যা চলে যাক্ তা, 'ছিল' হয়ে যাক্ 'নাই'। 
শুকনো পাতার মর্ম বিলাপ হয়ে যাবে দূরস্মৃতি, 
নবজলধারে নবপল্লবে সাজবে কাননবীথি। 
নবঘনশ্যাম মেঘের সৃজন রুদ্র অনল দহনে, 
জীবনের সাথে মরণ দোসর মরণ ফিরে জীবনে। 
দুরন্ত ঝড়, মারণ প্লাবন, তমসাগহন নিশা, 
কোথা যাবে যত অসহায় প্রাণ ভেবে না পায় দিশা। 
তীরে তরী নিয়ে কেউ তবু আসে জ্বালায়ে প্রেমের বাতি, 
মানুষের রূপে ভগবান সে যে --- আর্ত জীবন সাথী। 
ত্রাসের রজনী ফুরায় ঊষায়, জাগে প্রাণময়ী আশা, 
কৃষ্ণ মেঘের আবরণ ছেঁড়া আলোকিত পূর্বাশা। 
এমনি করেই শেষ আর শুরু সৃষ্টি লয়ের খেলা, 
নিত্য প্রভাতে রবির উদয়, অস্ত সন্ধ্যা বেলা। 
রবিকরস্নাত সুনীল আকাশ, পূবালী বাতাস  জেগেছে, 
কেতকী ঝোঁপের লুকানো ফুলের গন্ধ নিয়ে সে এসেছে। 
তাই মনে ভাবি, বেদনার দাহ থাকেনা নিত্য জীবনে, 
ক্ষয় ক্ষতি ক্ষত মেনে নিলে কবি আনন্দ আছে ভূবনে। 

দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
২৪/০৫/২০২৪
কলকাতা।











বুধবার, ২২ মে, ২০২৪

অসার ভূবনে ভবন বিলাস

মনের মত ঘর গড়েছি। জীবনের সকল সঞ্চয় ---
অর্থ স্বার্থ স্বপ্ন কল্পনাগুলি গাঁথা আছে প্রতি ইঁটে।
ভিতে আছে ভালোবাসা-রসে-মাখা সুরকি সিমেন্ট।
শতেক কুঠুরি তার, বিলাসী আসবাব। জ্বলে, ঝোলে
ঝাড়বাতি মাথার উপর, মখমল-কোমল কার্পেট
পদতলে-- সূর্যাস্তের রঙে রাঙা। জলসাঘরে সুর তোলে
সারেঙ্গী সেতার, দেওয়ালে দেওয়ালে আঁকা নর্তকীর
নৃত্যের তরঙ্গিত দেহের ভঙ্গিমা। আরাম কেদারা জুড়ে
বসে আছি একা। সখা ও স্বজন ছিল যারা নাই আজ ;
একে একে বিদায় নিয়েছে তারা, যেমন বিদায় নেয়
উৎসবের রাত্রিশেষে আহুত বা অনাহুত অভ্যাগত জন।
জনহীন কক্ষে আমি, নির্জন মনোভূমি, শূন্যতার অন্ধকার 
আলোভরা ঘরে।
'না, না', অন্তরাত্মা কেঁদে ওঠে শঙ্কিত বিলাপে।
'এসো, এসো', কে আছো কোথায়, দাও ডাক সোহাগের,
কও কথা মরমের, শরমের, সান্ত্বনার ; না হয় ভর্ৎসনার।
তবু কিছু বল, মানুষের কণ্ঠস্বর জীবনের শাশ্বত সঙ্গীত।

দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
২৩/৫/২০২৪
কলকাতা।
_____________________________________________

বুধবার, ৮ মে, ২০২৪

কে তুমি, পাই নি উত্তর


কে তুমি, পাই নি উত্তর

"মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ", __ 
এ মন্ত্র জপেছ দিনে রাতে, সত্য বলে জেনেছ অন্তরে ; 
তবু সে বিশ্বাসে হেনেছে আঘাত বারে বারে সে মানুষ, 
যাকে তুমি গড়েছো নিত্য নব নব রূপে হৃদয়ের প্রেম দিয়ে, 

দিয়ে ভালবাসা। কী আবেগী প্রীতির ছোঁয়ায় 
মানুষ গড়েছো কবি নূতন নূতন। তোমার বিপুল সৃষ্টির 
পাতায় পাতায়, চির অমরতা নিয়ে চেয়ে আছে তারা, 

অনন্তের আলোকের জ্যোতিঃকণা--কালজয়ী, অমলিন। 

চাঁড়ালের কন্যা ওই প্রকৃতির প্রাকৃত ললনা, প্রকৃতি
পূর্ণবারি মাটির কলস কাঁকালে রয়েছে তার, আছে প্রতিক্ষায় ; 
আসে যে সুদূরের প্রান্ত হতে, পার হয়ে মরুদেশ 
তৃষ্ণার্ত আনন্দ তার --- "জল দাও, জল দাও", 
কাতর প্রার্থনা নিয়ে। 
কী প্রেমার্দ্র জলদান, কী তৃষ্ণার্ত জলপান-- 

 মানবীর, মানবের, অভেদ আত্মার। 

 "যেই মানব আমি, সেই  মানব  তুমি''। 

দীনতা হীনতা নাই, নাই আত্মগ্লানি 

 নাই ছোট বড় এই বিশ্বনীড়ে। 

মানুষ তো প্রতিবিম্ব চরাচর পরিব্যপ্ত মহাচেতনার। 

হে ঋষি কবি, সুর ও বাণীর মাল্যে ছন্দোবদ্ধ-গীতি-গ্রন্থে 
গেঁথেছো যে মিলন-মালিকা তুমি, মূল্য তার বুঝি নাই। 
কবন্ধ দর্পিতা ভরে' পরি নাই সেই মালা আত্মবিস্মরণে। 
তবুও করছো ক্ষমা, আসো সখা বছরে বছরে এ দারুণ
তপ্ত দিনে, পঁচিশে বৈশাখে --- অমৃতের স্বর্ণঘট কৃতাঞ্জলিপুটে। 
ফিরে যাও আমাদের বিভেদ-বিদ্বেষ-ক্লিন্ন জীবনের 
গরল করে' পান বাইশে শ্রাবণে। ওগো নীলকন্ঠ কবি, 
জাগ্রত জীবন-দেবতা তুমি, নও ছবি, নও শুধু ছবি। 

তবু তমি এসো কবি, 'ভগ্ন হৃদয়ে' বসো, যাও দেখে --- 

 তোমার সে উষার আকাশ--- নীল শতদল আজ ঢাকা 

আত্মহননের চিতাবহ্নিধূমে। তোমার সে স্নেহময়ী ধরা 

সুভদ্রার মত মৃত অভিমন্যু-কোলে বসে আছে একা। 

(পরিমার্জিতরূপে পুনঃপ্রকাশিত) 

দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় 
২৫শে বৈশাখ, ১৪৩১ 
কলকাতা। 

বৃহস্পতিবার, ২ মে, ২০২৪

দারুণ অগ্নিবানে

(পরিত্যক্ত প্রাসাদের ভগ্নস্তুপ। ভাঙা প্রাচীর কোণায় একটি আশ্বত্থ শিকড় ছড়িয়ে, দীর্ঘ শাখা আকাশে তুলে দাঁড়িয়ে রয়েছে। নাম না জানা একটি 🐦 পাখী, হোক্ না বুলবুল, ডেকেই চলেছে অ-বিরাম। মনে হোল, পাখীটি যেন ধরিত্রীর প্রতিরূপ)।

দারুণ অগ্নিবানে 

এই যে তৃষ্ণা ধরিত্রীর, সকাতর একান্ত কামনা --- 
এখনো রয়েছে যারা ঊর্ধবাহু লতা তরু বনস্পতি, 
চাতক প্রার্থনা নিয়ে মানব দানব পশু পাখি, 
'এসো,শ্যামল সুন্দর' এসো তৃষাহরা, তাপহরা মেঘ। 
এসো জলভারে, এসো জলধারে, বিদ্যুৎ-দীপ্ত 

 শিখায়, এসো বজ্রগর্জন-হুংকারে। 
                                         দগ্ধ ধরিত্রীর এ প্রার্থনা 
প্রকৃতির দাক্ষিণ্যদানে পূর্ণ হবে অচিরাৎ তাও জানি। 
কিন্তু মানি, প্রার্থনার চেয়ে অনুতাপ ছিল ভালো বহুগুণে। 
ধংস করেছি বনভূমি, নদ নদী জলাশয়, টিলা ও পাহাড়, 
শিলা ভেঙে তক্ষণে গড়েছি অজস্র তক্ষশীলা, জলহীন 
পাষাণের তপ্ত মরুভূমি। মায়াহীন অনাদরে মাতা ধরিত্রীর 
গর্ভ খুঁড়ে শোষণ করেছি নিত্য অস্থি মজ্জা রক্ত রস। 
ক্ষমা নাই, ক্ষমা নাই --- রুদ্রতেজে চিতাবহ্নি জ্বলে ; 
তবু দেখি পুরাতন জীর্ণ এক প্রাসাদের কোণে 
মৃত্যুঞ্জয়ী অশ্বত্থের একাঙ্গ শাখায় সতৃষ্ণ একাকী বুলবুল 
ক্ষীণকণ্ঠে গায়, 'দাও ফিরে সে অরণ্য, এসো মেঘ, দাও  ফল ও ফুল।' 

দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
১৯শে বৈশাখ, ১৪৩১,
সোনামুখী , বাঁকুড়া।

Recently published

অমূল্য

He ( Tagore) who sees all things in his own self and his own self in all things, he does not remain unrevealed.                     ...