বৃহস্পতিবার, ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২২

অভিন্ন জননী-- অন্য গাথা

(চন্দননগরের রাণীর ঘাটে এই দৃশ্যটি দেখেছি। ওই গঙ্গাতীরের ভ্রমনবিলাসী সকলেই তাঁদের জানেন কিন্তু 'চেনেন' না। দেবী পক্ষের পুন্য তিথিতে সেই মায়েদের চরণে প্রণাম নিবেদন করে, এই গাথাটি তাঁদেরই উদ্দেশে উৎসর্গিত।) 


অভিন্ন জননী-- অন্য গাথা


ভূবন মোহিনী জগজ্জননী সমাগতা ধরণীতে, 
নব আনন্দে জাগ্রত প্রাণ মুখরিত সংগীতে। 
নভোনীলিমায় শঙ্খস্বর, বাতাসে বাঁশরী সুর, 
স্বর্গে মর্ত্যে মঙ্গলগান , স্তবগাথা সুমধুর। 
নৃত্য ছন্দে বহিছে তটিনী, চলৌর্মি সরসীতে, 
বন উপবন মালঞ্চ বিতান মুখর কাকলি গীতে। 
হরিৎ শস্যে, শ্যাম তৃণদলে নবযৌবনা ভূমি 
প্রভাত সূর্য সপ্রেম সোহাগে আলগোছে যায় চুমি'। 
নব আবরণ, নব আভরণ, কন্ঠে কুসুম মালিকা, 
কাশফুলে ঢাকা ভরানদী তীরে দাঁড়ায়ে শরৎবালিকা। 

সেদিন এমন বিমল সকালে নদী পাড়ে গিয়ে দেখি 
 ঘাটের দু পাশে বৃদ্ধার দল বসে আছে মুখোমুখি। 
সমুখে তাদের এবড়ো-থেবড়ো, ছোট-বড় বাটি মেলা'  
কোনটিতে বেশি, কোনটিতে কম খুচরো পয়সা ফেলা। 
নিরাভরণ শীর্ণ শরীরে জীর্ণ বসন জড়ানো, 
কারো বা রয়েছে জটপাকা চুল, মাথাটি কারো বা মুড়ানো। 
ঘোলাটে চোখের উদাস চাহনি মাঝে মাঝে ডাকে, "বাবা রে" ! 
জানে উত্তর পাবে না সে ডাক, ডাকে ডাকবারই বেঘোরে। 

নিষিদ্ধ পাড়ার অশুদ্ধ জীবনে রোজ রজনীতে বিষ খেয়ে, 
মা হওয়ার সাধ মিটেছে যাদের, 'মা' হতে পারেনি মা হয়ে। 
ফুল ফুটাবার, ফল ফলাবার  উর্বর ঋতু হারিয়ে, 
স্বামী সন্তান গৃহাঙ্গনের মায়া মরীচিকা পেরিয়ে, 
 বাঁচার লালসে রূপ-যৌবন তিলে তিলে ক্ষয়ে ক্ষয়ে, 
 ভিখারিনী আজ বসে আছে ঘাটে 'সৎ-ছেলেদের' মুখ চেয়ে। 
হে মা দুর্গা, আসবার কালে এই ঘাটে বেঁধে তরণী, 
হারা-সংসার 'মেনকা মা'দের দিয়ে যেও শেষ পারাণী।। 
                                         

('সৎ-ছেলে' =সপত্নী-সন্তান -- সমাসবদ্ধ পদটি প্রণিধানযোগ্য)

দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় 
১২ই আশ্বিন, ১৪২৯ 
(২৯শে সেপ্টেম্বর, ২০২২) 
দেবী পক্ষের চতুর্থী সন্ধ্যা

















শনিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২২

ডাক

দূরে কোথাও যাবার 
চির সখা মোহন সুরে ডাক দিয়েছে আবার। 
ভালোই হোল দেখব নূতন দেশ --- 
না-জানা ভাষা, না-চেনা মানুষ, না-দেখা বাস বেশ। 
সবার সাথে হবে জানাজানি, 
নূতন ছন্দে শুনব নূতন বাণী, 
মিলিয়ে নেব আমার সুরে তাদের সুরের গান, 
মিলিয়ে নেব আমার প্রাণে বিশ্ব জোড়া প্রাণ। 
তাদের মাঝেই পেয়ে যাব ডাক দিয়েছে যে, 
সবার মাঝে প্রেমের মালা পরিয়ে দিবে সে। 
মুছে যাবে বিভাজনের রেখা, 
 ভুলে যাব সুজন কুজন দেখা, 
ভালোবাসা ছড়িয়ে যাব পথের ধারে ধারে 
আলোর সোহাগ যেমন ঝরে রাতের অন্ধকারে। 

গেলাম দূরে দূরে 
নাম না জানা অচেনাদের পুরে। 
কোথাও প্রীতি কোথাও তিরস্কার, 
কোথাও নিন্দা, কোথাও পুরস্কার, 
তবু শুধুই মানুষ দেখি আমি 
প্রেমের ডাকে চরণ যায় থামি' 
অভিমানের অশ্রুধারা শুকায় ভালোবাসায়, 
অন্তবিহীন চলা আমার বন্ধু পাবার আশায়। 
হাজার হৃদয় ছুঁয়ে যদি তারেই পাই যারে 
জীবন ভরে খুঁজে ফিরি মানব পারাবারে। 
পথের সাথী পরাণসখা, জীবন মরণ জুড়ে 
আছে জানি, কিন্তু আমি কোথায় পাব তারে ? 
 কোথায় পাব তারে, ওগো আমার অন্তর্যামী ? 
সুদূর পারে পেলাম যারে, সে যে আমার আমি। 

দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
৪ঠা ডিসেম্বর, ২০২২ 
ব্যাঙ্গালোর।
     ্









 











রবিবার, ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২২

জীবন

ঋষি অরবিন্দের দিব্য জীবন (Life Divine) পাঠান্তে। 


জীবনের মূল্য দেওয়া হোল না আমার। 
মরণ যন্ত্রনা জননীর, পিতৃস্নেহ অতল, অপার, 
জ্যোতির্ময় আলোর অমৃত ধারা, সুধারস ধরিত্রীর, 
আকাশ, বাতাস, মাটি, সূর্য-চন্দ্র-তারাদের দানে, 
অনন্ত 'কালের' ধ্যানে একটি প্রাণের কণা আসে। 
চৈতন্যের দীপ্তি চোখে তার, অঙ্গে তার অমর্ত্য আভাস, 
হৃদয়ের সহস্রদল পূর্ণ তার প্রেমের সৌরভে। 

এতো যে সম্পদ, বৈভব বিত্ত, ঐশ্বর্যের মূর্ত প্রতিমা, 
ব্যর্থতার অভিশাপ বয়ে বয়ে পরিক্লান্ত রাত্রি অন্ধকারে। 
শুনি নাই বিশ্বের আহ্বান, দেখি নাই নিখিলের লীলা, 
গাঁথি নাই মালা, চেতনার দীপ জ্বেলে প্রেমের আরতি -- 
অনারব্ধ রয়ে গেল জীবনে আমার। ফিরে যেতে চাই 
জন্মকালের সেই অজ্ঞাত প্রত্যুষে। আবার আরম্ভ হোক্ 
 একটি আলোর দিন --- আমার আমিকে নিব চিনে। 
তমসার পরপারে, খুঁজে নিব জ্যোতির্ময় দ্যুলোক ভূলোক। 
সীমা পাবে অসীমের অমৃত আশিষ, মুক্তির আনন্দ সেই দিনে। 

দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় 
১৮/০৯/২০২২ 
কলকাতা।
  








রবিবার, ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২২

সাম্য মৈত্রী ভালোবাসা

সূর্য যদি একটু আসে কাছে, 
চাঁদটি যদি উধাও হয়ে যায়, 
পৃথিবী কি রইবে যেমন আছে 
মুহূর্তেকে দেখবে সবই নাই। 
সাগর যদি ডাঙার মাটি খায়, 
পাহাড় যদি হুড়মুড়িয়ে ভাঙে, 
বন বনানী হঠাৎ মরে যায়, 
সভ্যতাটা ডুববে অথৈ গাঙে। 
অকস্মাৎই এমনি যদি হয় 
তুমি একা রইলে বেঁচে হেথা, 
সমস্ত প্রাণ মরণ গাঁড়ায় লয়। 
কি থাকবে -- আনন্দ না ব্যথা ? 

স্রষ্টা যেদিন গড়লো ভূবন খানি 
বিরাট বিপুল আদি-অন্ত হারা, 
 বলে সেদিন বসুন্ধরা রাণী, 
"আমি হব সৃষ্টি মাঝে সেরা।" 
এই ধরণী তাই এত সুন্দর, 
বিচিত্র সব অলঙ্কারের সাজ, 
যা কিছু তার 'ভীষণ' মনোহর, 
বিধাতার সব নিজের হাতের কাজ। 

সালঙ্কারা বসুন্ধরা সে তো সবার মা। 
তোমার আমার জন্ম তাঁরই কোলে, 
তবে কেন বৃথাই নিঠুর হানা ? 
ধংস কর সৃষ্টি করার ছলে ? 
আদি মাতা জীবধাত্রী ধরা -- 
যা কিছু তার সবই তোমার আমার। 
সবার জন্য তার ঈশ্বর্য ভরা, 
তবে কেন কুরুক্ষেত্র, জীবন সংহার ? 

আলোময়, প্রেমময় বিশ্বচরাচরে, 
এসো থাকি তুমি আমি এক মাতৃক্রোড়ে। 

দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
১২/০৯/২০২২ 
কলকাতা। 



















বৃহস্পতিবার, ১ সেপ্টেম্বর, ২০২২

মা ও সন্তান

                      মা ও সন্তান 



ত্রিবেনীর ঘাট থেকে বেশি দূরে নয়। একটি বাগান  বাড়ির শেষ প্রান্তে, নির্জন শান্ত পরিবেশে, ঠিক গঙ্গার  পাড়েই বৃদ্ধাশ্রম। বন্ধুর সঙ্গে গিয়েছিলাম তার দূর  সম্পর্কীয় এক মাসীমার সঙ্গে দেখা করতে। দেখা  হয়েছিল, কথা হয়েছিল। সে সবই তাঁদের আত্মীয়  স্বজনদের ভালোমন্দ খবরাখবর। মাসীমার নিজের  সন্তান একজন প্রখ্যাত গবেষক। তাঁর সুদীর্ঘকালের প্রবাস জীবন। মা ও সন্তানের বিরহের দীর্ঘ, দুর্লঙ্ঘ্য অন্তরাল। ছেলের প্রসঙ্গ উঠতেই মাসীমা নীরব হয়ে গিয়েছিলেন। কিছুক্ষণ পর প্রসঙ্গান্তরে গিয়ে আমার বন্ধুটিকে বললেন, 

"তোমার মা'কে নিয়ে একদিন এসোনা বাবা, দেখতে  ইচ্ছে হচ্ছে খুব। শুধু আত্মীয় নয়, আমার ছেলের ভিক্ষা মা সে। তার সাথে আমিও সই পাতিয়ে ছিলাম। কত আনন্দের দিন ছিল সে সব।" 

কথাগুলি বলে একটি প্রলম্বিত দীর্ঘশ্বাস ফেললেন মাসীমা। দু'চোখ বেয়ে দুটি শীর্ণ জলের ধারা ভাঙা দুই গাল বেয়ে নেমে আসছে, মুখে ম্লান হাসি। 

আপন সন্তানটির জন্য তাঁর অন্তরের অব্যক্ত কথাগুলি এই কবিতাটিতেঃ  

                         সন্তান 

জীবনের জীবন, নাড়ীছেঁড়া ধন স্নেহের পুত্তলিকা, 
কেমনে তোমায় পেয়েছি, পেলেছি জ্বালায়ে দুঃখের শিখা।
শুধুই বাঁচার অশনই কি ছিল বুকের মমতা রসে ? 
অতল অপার স্নেহ পারাবার ঢেলেছি যে নিঃশেষে। 
গান গেয়ে সুর দিয়েছি কণ্ঠে, হাসি হেসে মুখে হাসি। 
চরণছন্দে দিয়েছি যে চলা নয়নে দৃশ্য রাশি। 
যা কিছু তোমার ভাবো আপনার সকলই আমারই দেওয়া --- 
দেহ প্রাণ মন, নিখিল ভূবন আমারই রক্তে পাওয়া। 
  বিশীর্ণ দেহে কিছু নাই আজ স্মৃতি নিয়ে বেঁচে আছি ; 
মনে হয় তোরে রাখি বুকে ধরে থাকি তোর কাছাকাছি।

সেদিনের কথা শুধু মনে পড়ে, দেখি সে শ্রীমুখ মায়া, 
লালাঝরা ঠোঁটে হাসি ক্রন্দন, দেয়ালার আলো ছায়া। 
আবরণহীন ননীর পুতুল, উলঙ্গ প্রেমের কায়ারূপ, 
অমর্ত্য সুবাস অঙ্গে অঙ্গে দেহমন্দিরে পূজাধূপ। 
ওই মুখ নিয়ে গোপাল আমার, একবার ডাক্ "মা"-বলে, 
আরো একবার এ ঊষর বুক নবযৌবনে যাক্ চলে। 
যত দূর থাকো যেখানেই থাকো আমাকে করেছ 'মা,' 
সৃজনের সুখ পেয়েছি জীবনে, স্মরণে রেখেছি তা। 

খেয়াঘাটে মাঝি       ডাকে শেষ ডাক, 
           সাঁঝের আঁধার ঘনালো, 
হৃদয়ের-চাওয়া,       পাওয়া ও না-পাওয়া 
         একসাথে সবই ফুরালো। 

এখনো রেখেছি আলোহারা চোখে দু-ফোঁটা অশ্রুবারি -- 
আমার খোকার সকল বালাই যেন ধুয়ে যেতে পারি। 

দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
০৮/০৯/২০২২ 
কলকাতা। 

পরিমার্জিত সংস্করণ 
০৫/১২/২০২৩ 
_______________________________________________




 







Recently published

অমূল্য

He ( Tagore) who sees all things in his own self and his own self in all things, he does not remain unrevealed.                     ...