মা ও সন্তান
ত্রিবেনীর ঘাট থেকে বেশি দূরে নয়। একটি বাগান বাড়ির শেষ প্রান্তে, নির্জন শান্ত পরিবেশে, ঠিক গঙ্গার পাড়েই বৃদ্ধাশ্রম। বন্ধুর সঙ্গে গিয়েছিলাম তার দূর সম্পর্কীয় এক মাসীমার সঙ্গে দেখা করতে। দেখা হয়েছিল, কথা হয়েছিল। সে সবই তাঁদের আত্মীয় স্বজনদের ভালোমন্দ খবরাখবর। মাসীমার নিজের সন্তান একজন প্রখ্যাত গবেষক। তাঁর সুদীর্ঘকালের প্রবাস জীবন। মা ও সন্তানের বিরহের দীর্ঘ, দুর্লঙ্ঘ্য অন্তরাল। ছেলের প্রসঙ্গ উঠতেই মাসীমা নীরব হয়ে গিয়েছিলেন। কিছুক্ষণ পর প্রসঙ্গান্তরে গিয়ে আমার বন্ধুটিকে বললেন,
"তোমার মা'কে নিয়ে একদিন এসোনা বাবা, দেখতে ইচ্ছে হচ্ছে খুব। শুধু আত্মীয় নয়, আমার ছেলের ভিক্ষা মা সে। তার সাথে আমিও সই পাতিয়ে ছিলাম। কত আনন্দের দিন ছিল সে সব।"
কথাগুলি বলে একটি প্রলম্বিত দীর্ঘশ্বাস ফেললেন মাসীমা। দু'চোখ বেয়ে দুটি শীর্ণ জলের ধারা ভাঙা দুই গাল বেয়ে নেমে আসছে, মুখে ম্লান হাসি।
আপন সন্তানটির জন্য তাঁর অন্তরের অব্যক্ত কথাগুলি এই কবিতাটিতেঃ
সন্তান
কেমনে তোমায় পেয়েছি, পেলেছি জ্বালায়ে দুঃখের শিখা।
শুধুই বাঁচার অশনই কি ছিল বুকের মমতা রসে ?
অতল অপার স্নেহ পারাবার ঢেলেছি যে নিঃশেষে।
গান গেয়ে সুর দিয়েছি কণ্ঠে, হাসি হেসে মুখে হাসি।
চরণছন্দে দিয়েছি যে চলা নয়নে দৃশ্য রাশি।
যা কিছু তোমার ভাবো আপনার সকলই আমারই দেওয়া ---
দেহ প্রাণ মন, নিখিল ভূবন আমারই রক্তে পাওয়া।
বিশীর্ণ দেহে কিছু নাই আজ স্মৃতি নিয়ে বেঁচে আছি ;
মনে হয় তোরে রাখি বুকে ধরে থাকি তোর কাছাকাছি।
সেদিনের কথা শুধু মনে পড়ে, দেখি সে শ্রীমুখ মায়া,
লালাঝরা ঠোঁটে হাসি ক্রন্দন, দেয়ালার আলো ছায়া।
আবরণহীন ননীর পুতুল, উলঙ্গ প্রেমের কায়ারূপ,
অমর্ত্য সুবাস অঙ্গে অঙ্গে দেহমন্দিরে পূজাধূপ।
ওই মুখ নিয়ে গোপাল আমার, একবার ডাক্ "মা"-বলে,
আরো একবার এ ঊষর বুক নবযৌবনে যাক্ চলে।
যত দূর থাকো যেখানেই থাকো আমাকে করেছ 'মা,'
সৃজনের সুখ পেয়েছি জীবনে, স্মরণে রেখেছি তা।
খেয়াঘাটে মাঝি ডাকে শেষ ডাক,
সাঁঝের আঁধার ঘনালো,
হৃদয়ের-চাওয়া, পাওয়া ও না-পাওয়া
একসাথে সবই ফুরালো।
এখনো রেখেছি আলোহারা চোখে দু-ফোঁটা অশ্রুবারি --
আমার খোকার সকল বালাই যেন ধুয়ে যেতে পারি।
দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
০৮/০৯/২০২২
কলকাতা।
পরিমার্জিত সংস্করণ
০৫/১২/২০২৩
_______________________________________________
ভাষা নেই আমার।
উত্তরমুছুন