শুক্রবার, ২৭ জুন, ২০২৫

শ্রীমদ্ভগবত গীতায় অর্জুন--২

শ্রীমদ্ভগবত গীতায় অর্জুন-২ 


বর্ণসঙ্করতার পরিণতি সনাতন জাতিধর্ম এবং কুলধর্মের সর্বনাশ। যারা নিজেরাই নিজেদের কুলঘাতী তারা তো সমগ্র স্বজাতির ও স্বগোষ্ঠীর নরকবাস নিশ্চিত করে।
হে জনার্দন, আমরা (বেদবিধি প্রনেতাদের কাছে) শুনেছি কুলধর্মভ্রষ্ট মানুষ অনন্তকাল নরকে বাস করে।
ঋকবেদের কাল থেকে (আনুমানিক ১৫০০ থেকে ১২০০ খ্রীষ্টপূর্বাব্দ, কিন্তু অনেক ঐতিহাসিকের মতে ৫০০০ খ্রীষ্টপূর্বাব্দেরও আগে ঋকবেদের সুক্তগুলির বাচনিক অস্তিত্ব ছিল) আর্যগণ পার্থিব কামনাকে ত্যাগ করেননি। ব্যক্তিক কামনা নয়, সমষ্ঠির কামনাই ঋকবেদের মন্ত্রগুলিতে প্রকাশ পেয়েছে। "আমাদের ধন বর্ধিত হোক্, আমাদের পশু বর্ধিত হোক্, আমাদের শত্রুর বিনাশ হোক্, আমাদের বীর পুত্র উৎপন্ন হোক্। একটি কামনা ঘুরে ফিরে বার বার ---- প্রায় ধূয়ার মত --- ঋকবেদের দ্বিতীয় মণ্ডলে, অর্থাৎ প্রাচীনতম অংশটিতে, ব্যক্ত হয়েছে, "বৃহদ্বদেম বিদথে সুবীরাঃ।" আমরা বীর পুত্রের জন্য  সভায় বিশেষ করিয়া বলিতেছি।" দ্বিতীয় মণ্ডলে বাইশবার, নবম মণ্ডলে একবার, অর্থাৎ প্রাচীন থেকে অর্বাচীনকালের ঋকেও এই প্রার্থনা উচ্চারিত হয়েছে।"
      

                                                             ---- লোকায়ত দর্শন, দেবী প্রসাদ চট্টোপাধ্যায়) 


(এস্থলে স্মরণীয় যে প্রায় দুই হাজার বছর ধরে এই বেদ  মহাসংহিতার মন্ত্রগুলি রচিত এবং 'শ্রুতি'র মাধ্যমে সংরক্ষিত। পরে কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস সেগুলিকে সুবিন্যস্ত করে, সঙ্কলিত করে , প্রথমে তিনটি---ঋক, সাম, যজুঃ ও পরে একটি অথর্ব --- এই চারটি বেদ সংহিতার সৃষ্টি করেন।) 

আবারও আসি আলোচনায়।‌
অর্জুনের বক্তব্যগুলি অত্যন্ত যুক্তিপ্রযুক্ত।‌ মানুষের জাগতিক অস্তিত্ব রক্ষার প্রয়োজনেই ছিল পুত্রকামনা। আধিভৌতিক আধিদৈবিক বিপর্যয়কে পরাস্ত ও পরাভূত করবার জন্য প্রয়োজন কেবল পুত্র নয় বীরপুত্র। এমতাবস্থায় এক রক্তক্ষয়ী মহারণের আয়োজন করে তরুণ যুবকদের, সক্ষম পুরুষদের সংহার করলে একটি জাতিগোষ্ঠীর (ক্ষত্রিয়দের) যে মহাবিনষ্টি সাধিত হবে তা নরকবাসেরই সামিল। 

দ্বিতীয় অধ্যায়ে 

এরপর বিষাদগ্রস্ত, অশ্রুপূর্ণ লোচন, বিষন্ন অর্জুনকে ঐরূপ মোহাচ্ছন্ন হওয়ার কারণে সখা শ্রীকৃষ্ণ কিঞ্চিৎ ভর্ৎসনাই করলেন। বললেন, এরূপ জ্ঞানহীনতা ও  হৃদয়দৌর্বল্য "অনার্যজুষ্টম্, অস্বর্গ্যম্, অকীর্তিকরম।" তোমার এবম্প্রকার আচরণ শ্রেষ্ঠ পুরুষোচিত নয়, স্বর্গ ও কীর্তি লাভেরও অনুকূল নয়। (এই 'অস্বর্গ্যম' শব্দটির, অনেক পুজ্যপাদ পুরাণবিদ অর্থ করেছেন যা ভবিষ্যতের জন্য  মঙ্গলদায়ক নয়। কিন্তু রামায়ণ, মহাভারতের মত পুরাণ শাস্ত্রগুলিতে পুন্যকর্মের সঙ্কল্প ও অনুষ্ঠান দ্বারা স্বর্গলাভের বাসনা চরিতার্থ হয় --- এ কথা অসংখ্যবার বলা হয়েছে)। কৃষ্ণ আবারো বলছেন, (এবার তিরস্কার বেশ তীব্র), "ক্লৈবং মাস্মগমঃ পার্থ।" নপুংশকের মত ভাব তোমার ক্ষেত্রে উপযুক্ত নয়। হৃদয়ের দুর্বলতা পরিত্যাগ কর উঠে দাঁড়াও, যুদ্ধের জন্যে প্রস্তুত হও।
কিন্তু বিষাদবিহ্বল অর্জুন তখনও বলছেন, 


কথং ভীষ্মমহং সংখ্যে দ্রোণঞ্চ মধুসূদন।
ইষুভিঃ প্রতি যোৎস্যামি পূজার্হাবরিসূদন।। 

পিতামহ ভীষ্ম, গুরু দ্রোণাচার্যের প্রতি বাণ নিক্ষেপ করব কি করে ? হে মধুসূদন, হে অরিসূদন (শত্রুসংহারক), ওঁরা যে আমার পূজনীয়। মহানুভব এসকল গুরুজনদের প্রাণসংহার না করে ভিক্ষান্ন খেয়ে জীবনধারণ করা কল্যাণকর। আমি কি পূজার্হদের হত্যা করে তাঁদের রক্তসিক্ত 'অর্থ ও কাম' ভোগ করব ? 

"ভুঞ্জীয় ভোগান্ রুধিরপ্রদিগ্ধান" 

দ্বিতীয় অধ্যায়ে অর্জুন কথিত এই পঞ্চম বক্তব্যটি আমাদের অন্তরাত্মকে শিহরিত করে। মানসচক্ষে প্রতিবিম্বিত হয় প্রবৃদ্ধ দুই মহান ব্যক্তিত্বের রক্তলাঞ্ছিত মৃতদেহ যাঁরা কৌরব ও পাণ্ডব পরিবারের আজন্ম হিতাকাঙ্ক্ষী। বিচিত্রবীর্যের মৃত্যুর পর ভীষ্মের পরামর্শে  সত্যবতীর উদ্যোগে ব্যাসদেবের আগমন ঘটে এবং তাঁর ঔরসে বিচিত্রবীর্যের বিধবা পত্নীদের (অম্বিকা, অম্বালিকা) গর্ভে ধৃতরাষ্ট্রের, পাণ্ডুর (ও দাসী গর্ভে বিদুরের)  জন্ম সম্ভব হয়েছিল এবং কুরু মহাজনপদের রাজবংশ নির্বংশ হয়ে যায়‌ নি। মহামতি ভীষ্ম নিজে সংসার না করে কুরু রাজবংশের সংসার রক্ষার জন্য দীর্ঘ দীর্ঘ কাল ধরে যে নিষ্কামনায় আত্মত্যাগ করে গিয়েছেন সেই কাহিনী মহাভারতের আদ্যোপান্ত, সারাটি মহাভারত জুড়ে --- শান্তনু, বিচিত্রবীর্য এবং ধৃতরাষ্ট্র-পাণ্ডু --- তিন পুরুষের সময়কালের বিঘ্ন-বিপদের ত্রাণকর্তা তিনি।‌ কত কত রাজ্যজয়ের মাধ্যমে কুরুরাজভাণ্ডার ধনে-সম্পদে পূর্ণ করেছেন তিনি। এহেন সর্বত্যাগী পিতামহের রুধিররঞ্জিত যে রাজত্বলাভ তাতে সুখ কোথায় ? কোথায়‌ চরিতার্থতা ?  
অপরদিকে অস্ত্রগুরু দ্রোণাচার্য। যাঁর অস্ত্রশিক্ষায় কুরুবংশের রাজকুমারেরা দুর্বিজয়, যাঁর স্নেহার্দ্র পক্ষপাতের আনুকুল্য এই ফাল্গুনী আজ গাণ্ডীবধন্বা, তাঁকে হত্যা !
না মধুসূদন, (এই চিত্তবৈকল্য নিয়ে) তাঁদের উদ্দেশে তাঁদের বক্ষবিদারী শরক্ষেপন আমার দ্বারা অসম্ভব। তা ছাড়াও উচিত্য অনৌচিত্য বোধেও আমি দ্বিধাগ্রস্ত। আবার দ্বিধাগ্রস্ত এই কারণেও যে জয়ী কি আমরা হবই,  নাকি প্রতিপক্ষ জয়ী হবে ! জয়লাভ আমাদের হয়ও যদি তবে এই কৌরব বংশ ও তাদের মিত্রপক্ষকে বধ করেই তো সেই জয় আসবে। না না, তাঁদের হত্যা করে আমরা জীবিত থাকতে চাই না। 

যানেব হত্যা ন জিজীবিষাম।
স্তেহবস্থিতাঃ প্রমুখে ধার্তারাষ্ট্রাঃ।। 

হে সখা, হে প্রাণসখা, আমি শোকবিহ্বল, আমি মানসিক দ্বন্দ্বে কাতর, কর্তব্য অকর্তব্য বিষয়ে আমি মোহিতচিত্ত --- ধর্মসংমূঢ়চেতাঃ।  হে দিগদিশারী,  (হে বন্ধু, হে প্রিয়,) দিশাহারা আমি তোমাকে প্রশ্ন করছি, আমার পক্ষে যা নিশ্চিত করা উচিত, যা শ্রেয়স্কর তাই আমাকে বল, আমাকে শিক্ষা দাও। 

"যচ্ছ্রেয় স্যান্নিশ্চিতং ব্রূহি তন্মে।
শিষ্যস্তেহহং শাধি মাং তাং প্রপন্নম্।।" 

কেননা, আমার মনে হচ্ছে এই পৃথিবীতে আমি যদি ধন-অন্ন-সমৃদ্ধ, শত্রুহীন, দেবতাদের আশীর্বাদধন্য (একমাত্র দেবতাদেরই আধিপত্যসমন্বিত) রাজ্য লাভও করি তবু আমার ইন্দ্রিয়গুলির উচ্ছ্বাস-বিনাশী  (উচ্ছোষনম=উৎ +শোষণম্=সম্পূর্ণ শোষণকারী) শোককে প্রশমন করতে পারে এমন কোন উপায় দেখছি না।
হে পরন্তপ, হে রাজন --- এই ভাবে ধৃতরাষ্ট্রকে সম্বোধন করে সঞ্জয় বললেন,  যুদ্ধে (সম্ভাব্য মারণান্তিক পরিণামের কথা ভেবে), ''হে গোবিন্দ, আমি যুদ্ধ করব না'' -- এই কথা বলে নিদ্রাজয়ী ধনঞ্জয় নির্বাক, নিশ্চুপ হয়ে রইলেন।
হে রাজন, (ধৃতরাষ্ট্রের প্রতি সঞ্জয়), অর্জুনের এই শোকাকুলতা লক্ষ্য করে অন্তর্যামী হৃষিকেশ উভয়পক্ষের সৈন্যবাহিনীর‌ মাঝখানে, তিরস্কার-মিশ্রিত কণ্ঠস্বরে  (প্রহসন্নিব) বলতে লাগলেন, 'হে অর্জুন, তুমি শোক করবার অযোগ্য বিষয়ে শোক প্রকাশ করছ, এবং সর্বজ্ঞাতা প্রাজ্ঞজনোচিত বড় বড উক্তি করছ, কিন্তু জান কি, যারা বিগত হয়েছে এবং যারা এখন জীবিত অবস্থায় আছে সত্যিকারের পণ্ডিতগণ তাদের জন্যে শোক করেন না।'
এবার, শ্রীমদ্ভগবতের এই দ্বিতীয় অধ্যায়ের ১১তম শ্লোক থেকে আরম্ভ হোল শোকার্ত, মায়ামোহে আচ্ছন্ন, যুদ্ধে অনীহ, হৃদয়াবেগে দুর্বল রথী অর্জুনের প্রতি সারথি শ্রীকৃষ্ণের উপদেশবাণী। দ্বিতীয় অধ্যায় সাংখ্যযোগ।

যুদ্ধ কুলনাশী, আত্মীয়-বন্ধু বিনাশের কারণ এবং যুযুধান তরুণদের মৃত্যুর পরিণতিতে বংশনাশ, অনাথা নারীদের অন্যভোগ্যা হবার সম্ভাবনা এবং পরিণামে বর্ণসঙ্করতার ফলে পূর্বপুরুষগণের নরকপ্রাপ্তি--- মহারথী পার্থ যখন এই যুক্তিগুলি সখা শ্রীকৃষ্ণের কাছে উত্থাপন করে অস্ত্রধারণ করতে অস্বীকার করলেন তখন শ্রীকৃষ্ণ তাকে ভর্ৎসনাই করলেন না, সম্পূর্ণ এক ভিন্ন পথ অবলম্বন করে তাঁকে বোঝাতে চাইলেন 'হত বা নিহত হওয়ার' ঘটনাটি ঘটে দেহের সঙ্গে, আত্মার সঙ্গে নয়। কাজেই স্বজনদের সম্ভাব্য মৃত্যুজনিত শোক অনুচিত। 

ন ত্বেবাহং জাতু নাসং ন ত্বং নেমে জনাধিপাঃ।
ন চৈব ন ভবিষ্যামঃ সর্বে বয়মতঃ পরম।। 

দেখ পার্থ, এমন নয় যে অতীতের কোন কালে আমি ছিলাম না, তুমি ছিলে না, তোমার প্রতিস্পর্ধী এই রাজারা ছিলেন না ; আবার এমনো নয় যে পরে,  ভবিষ্যতে আমরা থাকবো না। দেখ, জীবাত্মার যে দেহরূপ তার মধ্যে যেমন 'কৌমারম্ যৌবনম্ জরা' আসে (প্রকৃতির ধর্মেই আসে), তেমনই অন্য দেহরূপেও (দেহান্তর প্রাপ্ত হলে) একই রূপান্তর ঘটে। 


এখানে শ্রীকৃষ্ণ জন্মান্তরবাদের কথা বলছেন। তিনি বলতে চাইছেন আত্মা ও স্থূল শরীর ভিন্ন। শরীরের অবস্থান্তর ঘটে। জন্ম হয়, বাল্য ও কৈশোর, যৌবন, বার্ধক্য প্রাপ্তি এবং অবশ্যম্ভাবী মৃত্যু। অর্থাৎ জীবদেহ বিকার প্রাপ্ত হয়। জ্ঞানহীনতাহেতু শরীরের এই বিকার আত্মাতে প্রতিভাসিত হয় যেহেতু শরীর এবং আত্মাকে একাকার ভাবে দেখি। কিন্তু আত্মা অবিকার ও অমর। তত্ত্বজ্ঞানী ধীরপুরুষ তাই এ বিষয়ে (দেহান্ত প্রাপ্তিতে) মোহাচ্ছন্ন হন না।
                                  (ক্রমশঃ)








বৃহস্পতিবার, ১৯ জুন, ২০২৫

শ্রীমদ্ভাগবত গীতায় অর্জুন -১


শ্রীমদ্ভাগবত গীতায় অর্জুন-১

শ্রীমদ্ভগবত গীতা বিশ্বের শ্রেষ্ঠতম দার্শনিক মহাগ্রন্থ। শ্রীগীতা ধর্মগ্রন্থ --- এ কথাও ঠিক, কিন্তু এই সংহিতা যে মানবধর্মের উদ্ঘোষণা করেছেন তা কোন প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মধারণা নয়। নয় কোন সম্প্রদায় বিশেষের ধর্মীয় মতামত বা শ্রুতি। ভগবান শ্রীকৃষ্ণের শ্রীমুখনিঃসৃত, মহাকবি বেদব্যাস কর্তৃক সংকলিত, আঠারোটি অধ্যায়ে বিদ্ধৃত মহাবাণী সমূহের মর্মকথা সমগ্র মানবজাতির জন্য। জীবাত্মার নিয়ত ও নিরন্তর সাধনা পরমাত্মার সঙ্গে তার মিলন হোক্, আর পরমাত্মা যিনি, স্রষ্টা যিনি তিনি ইচ্ছা করেন মানবাত্মার সঙ্গে লীলাবিলাসে তিনিও একাত্ম হবেন। "তুমি আছ মোরে চাহি, আমি চাহি তোমা পানে।" কিন্তু কি ভাবে মানব সত্তার এমন পূর্ণতা লাভ সম্ভব সেই ক্রমোত্তরণের পন্থাই দেখিয়ে দিয়েছেন জীবনরথের সারথি শ্রীকৃষ্ণ সখা অর্জুনকে।
এই মহাভারতীয় কাহিনী সকলের জানা। শুধু ভারতবর্ষের নয়, বিশ্বের সুধীসমাজ জানেন কখন কোথায় এই ভাগবতী বাণী উদ্ঘোষিত হয়েছিল। সে বিবরণ অতি সংক্ষিপ্ত আকারেই আছে শ্রীগীতার প্রথম অধ্যায়ে। আর এই প্রথম অধ্যায়টিই বিশেষভাবে আজ আমাদের আলোচ্য। 

প্রথম অধ্যায়ে কি আছে ?
কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস বিরচিত মহাকাব্য বা ইতিহাস এইভাবে আরম্ভ হয়েছে যে, অন্ধ ধৃতরাষ্ট্র সঞ্জয়ের কাছে জানতে চাইলেন, 

"ধর্মক্ষেত্রে কুরুক্ষেত্রে সমবেতা যুযু্ৎসবাঃ।
মামকা পাণ্ডবাশ্চৈব কিমকুর্বত সঞ্জয়।।" 

হে সঞ্জয়, তুমি বল, ধর্মক্ষেত্র কুরুক্ষেত্রে আমার ছেলেরা (আমার পক্ষের যোদ্ধারা) এবং পাণ্ডুর ছেলেরা (পাণ্ডব পক্ষের যোদ্ধারা) সমবেত হয়ে কি করল। এরপর সঞ্জয়  আনুপূর্বিক ও যুদ্ধান্তিক পর্যন্ত সমস্ত ঘটনার পুঙ্খানুপঙ্খ  বর্ণনা ধৃতরাষ্ট্রকে দিয়ে যেতে লাগলেন।

কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধারম্ভের বিনষ্টিকাল আসন্ন। রণাঙ্গণে কুরুপক্ষ ও পাণ্ডবপক্ষের বিপুল সৈনবাহিনীর সমাবেশ ও বিন্যাস। রণাঙ্গণের একপ্রান্তে দুর্যোধনসহ সমস্ত কৌরবসৈন্য এবং দ্রোণ, কৃপাচার্য আদি সেনাপতিবৃন্দ। সর্বপ্রথম দেখা গেল দুর্যোধন দ্রোণাচার্যের নিকট যাচ্ছেন। পাণ্ডবসেনাদের দেখবার জন্য গুরু দ্রোণাচার্যের অনুমতি প্রার্থনা করছেন। এবার পাণ্ডব সৈন্যবাহিনীতে যাঁরা যাঁরা রয়েছেন সে সমস্ত মহেষ্বাস--- ভীম অর্জুনসহ পঞ্চপাণ্ডব, বিরাট দ্রুপদ প্রভৃতির নাম জেনে নিলেন দুর্যোধন গুরু দ্রোণাচার্যের কাছ থেকে এবং একই ভাবে গুরু দ্রোণাচার্যের কাছ থেকে জানলেন ও তাকে জানালেন স্বীয় সৈনবাহিনীর প্রধান প্রধান রথী মহারথীদের নাম। দুর্যোধন নিজের সেনাদের প্রশংসা করতে লাগলেন এবং সে দিনের সেনাপতি ভীষ্মকে রক্ষা করবার জন্য দ্রোণাচার্যকে ও অপরাপর বীরদেরকে অনুপ্রাণিত করলেন। এমন সময় দুর্যোধনকে প্রসন্ন করবার উদ্দেশে সিংহনাদ সহকারে কুরুবৃদ্ধ পিতামহ ভীষ্ম শঙ্খ বাজালেন। উভয়পক্ষের সমরাহ্বান ঘোষিত হোল। বিভীষণ শঙ্খরব, রণবাদ্য ধ্বনিত হোল। (পাণ্ডু নন্দন পাঞ্চপাণ্ডবের সাথে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের পাঞ্চজন্যও উদ্ঘোষণা করেছিল এই মহাযুদ্ধের, এটি স্মরণে রাখতে হবে)।

এবার (সঞ্জয় ধৃতরাষ্ট্রকে জানাচ্ছেন) দুর্যোধনের সৈন্যবাহিনী প্রস্তুত দেখে রথী অর্জুন সারথি শ্রীকৃষ্ণকে প্রাণিত করছেন এই বলে,
"সেনয়োরুভয়োর্মধ্যে রথং স্থাপয় মেহচ্যুত ।।"
হে অচ্যুত, উভয় সেনার মধ্যভাগে আমার রথ স্থাপনা কর। 


(প্রথম অধ্যায়ে এই প্রথম আরম্ভ হোল কৃষ্ণার্জুনের কথপোকথন ; আর এটিই আমাদের আলোচনার বিষয় । শ্রীমৎ ভাগবতের গূঢ়, গুহ্য যোগ সাধনার বা বেদ ও উপনিষদের ভিতর নিহিত, ভগবানের মুখপদ্ম নিঃসৃত গভীর, আদি-অন্তহীন ব্রহ্মতত্ব বিষয়ে আলোচনা যুগ যুগান্তর ধরে ব্রহ্মবিদ ঋষি, সাধক-মহাত্মা, বিদ্বান ও পণ্ডিত এবং দেশের ও বিশ্বের মহান গবেষকবৃন্দ করেছেন, করে চলেছেন। তারা গীতারূপ অমৃত পান করেছেন ও করেন। কেননা গীতা ''সুধীর্ভোক্তা"। কিন্তু সাধারণ্যে, সামাজিক বা পারিবারিক ধর্মাচরণের অনুষ্ঠানে, শ্রাদ্ধ শান্তি উপনয়ন ইত্যাদি সংস্কার পালনের সময়কালে গীতার বাণী যখন উচ্চারিত হয় তখন আমাদের মনে যেসব ভাব ও ভাবনার উদয় হয় তাইই প্রকাশ করবার অভিলাষে কিছু কথা বলা। আর সেই কথাগুলি, একান্তভাবেই কৌন্তেয় তৃতীয় পাণ্ডবের প্রশ্নসমূহে অভিব্যক্ত হয়েছে।)
তারপর উভয় সেনার মধ্যভাগে রথ স্থাপিত করে শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে কৌরবসৈন্যবাহিনী দেখবার অনুমতি দিলেন। 

তত্রাপশ্যৎ স্থিতান পার্থঃ পিতৃনথ পিতামহান্।
আচার্যান মাতুলান ভ্রাতৃন পুত্রান্ পৌত্রান সখীংস্তদা।।
শ্বশুরান্ সুহৃশ্চৈব সেনয়োরুভয়রপি।
তান সমীক্ষ স কৌন্তেয়ঃ সর্বান্ বন্ধুনবস্থিতান্।
কৃপয়া পরয়াবিষ্টো বিষীদন্নিমব্রবীৎ।।‌ 

প্রতিপক্ষ সেনাবাহিনীর সমাবেশস্থলে এমত আত্মীয় স্বজন বন্ধু পরিজনদের দেখে বিমর্ষ বিষাদগ্রস্ত অর্জুন শ্রীকৃষ্ণকে বলছেন, এই (যুযু্ৎসবাঃ) যুযু্ৎসুগনকে দেখে সীদন্তি মম গাত্রাণি মুখং চ পরিশুষ্যতি --- আমার সকল অঙ্গ অসাড় হয়ে আসছে, মুখ শুকিয়ে যাচ্ছে, শরীর অজানা ভয়ে কম্পিত, রোমাঞ্চিত। (দেখ দেখ, সখা) গাণ্ডীব ধনুও শিথিল হস্ত ধরে রাখতে পারছে না, দেহত্বক যেন জ্বলে যাচ্ছে, মনের মধ্যে মহাভ্রম জেগে উঠেছে, স্থির থাকতে করছি না আমি।
হে কেশব, এই বিপরীত লক্ষণগুলি দেখছি আর মনে হচ্ছে যুদ্ধে স্বজনদের হত্যা করে কী কল্যাণ হবে ! না না,‌
"ন কাঙ্ক্ষে বিজয়ং কৃষ্ণ ন চ রাজ্যং সুখানি চ"।‌
রাজ্যলাভ ভোগ সুখ এমন কি জীবনের কি প্রয়োজন !  যাদের ভোগ, সুখ ও শান্তির জন্য আমরা প্রার্থনা করি, তারাই (দেখছি) ধনসম্পদ ও জীবনের মায়া ত্যাগ করে যুদ্ধক্ষেত্রেও অবস্থান করছে। না সখা, এই সমস্ত আপনজন ---- আচার্য, পিতা-পিতৃব্য-পিতামহ, মাতুল-শ্বশুর-শালা নাতিদের বধ করতে পারবো না। হে মাধব, এই আত্মজনদের হত্যা করে আমি পৃথিবী কি, ত্রিলোক জয়েরও ইচ্ছা করি না। এই ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রগণ আততায়ী, তা আমি জানি কিন্তু তবুও তাদের বধ করে তো আমরা পাপকেই আশ্রয় করব। স্বজনদের হত্যা করে কি করে আমরা সুখি হব ? যদিও লোভের দ্বারা ভ্রষ্টচিত্ত (বিবেকহীন) দুর্যোধনসহ কৌরবেরা কুলবিনাশী কাজ করেছে, মিত্রদ্রোহের মত অপরাধেও পাপ দেখেনি, কিন্তু হে জনার্দন, তুমিই বল আমরা, যারা জানি কুলক্ষয়জনিত পাপের কথা, এমত জ্ঞানসম্পন্ন হয়েও সেই পাপ আমরাও করব ! কুলের ক্ষয় হলে যে আমাদের 'আর্যস্মৃতি' অনুযায়ী, কুলধর্ম নষ্ট হয়ে যাবে এবং সমস্ত কুলকে (ভরতকুল)পাপ অভিভূত করবে।  পাপের প্রভাবে কুলস্ত্রীগণ দোষযুক্ত হবেন। হে বৃষ্মিনন্দন, তুমি জানো,
"স্ত্রীষু দুষ্টাসু জায়তে বর্ণসঙ্কর"--স্ত্রীগণ দুষ্ট (পরভোগ্যা) হলে বর্ণসঙ্কর উৎপন্ন হওয়া অবশ্যম্ভাবী এবং বর্ণসাঙ্কর্য্য সংঘটনের ফল নরকপ্রাপ্তি। তখন গতপ্রাণ পিতা পিতামহ, মাতা মাতামহ আদি পূর্বপুরুষগণ পিণ্ড ও জল (শ্রাদ্ধক্রিয়া বিহিত তর্পন) থেকেও বঞ্চিত হবেন। জাতিধর্ম কুলধর্ম কিছুই থাকবে না। হে জনার্দন, কুলধর্ম নাশে প্রয়াত পূর্বতনদের যে অনন্ত নরকপ্রাপ্তি ঘটবে। এ যে মহা পরিতাপের বিষয় ! আমরা রাজ্যলোভে, (জাগতিক) সুখের লালসায় ঘোর পাপের কর্ম, আপন আত্মজনকেই বধ করতে চলেছি। (এখন মনে হচ্ছে) প্রতিকার-করবার -ইচ্ছারহিত , নিরস্ত্র এই আমাকে শস্ত্রধারী ধার্তরাষ্ট্রগণ যদি রণভূমিতে হত্যাও করে তাও আমার কাছে কল্যাণকর। 

এই কথাগুলি উচ্চারণ করে---
এবমুক্ত্বার্জুন সংখ্যে রথোপস্থ উপাবিশৎ। 
বিসৃজ্য সশরং চাপং শোকসংবিগ্নমানস।।
(স্বজনদের সম্ভাব্য মৃত্যুজনিত) শোকে নিমগ্ন হয়ে অর্জুন ধনুর্বাণ ত্যাগ করে রথের পেছনে বসে পড়লেন।‌


সঞ্জয় এভাবে কুরুক্ষেত্র রণভূমিতে ঘটিত ও ঘটমান জীবন্ত ছবি ধৃতরাষ্ট্রের নিকট উপস্থাপিত করলেন।
শ্রীমদ্ভাগবতের প্রথম অধ্যায় 'অর্জুনবিষাদযোগ'। অর্জুন এখানে মানবতাবাদের পরাকাষ্ঠা। তিনি তাঁর প্রতিটি বক্তব্যের মধ্যে তুলে ধরেছেন যুদ্ধের ভয়ঙ্কর পরিণামের কথা। যেখানে তিনি বলছেন যুদ্ধে অবশ্যম্ভাবীরূপে পুরুষদের মৃত্যু ঘটবে। অনাথিনী নারীরা অন্য বর্ণের পুরুষের অধিগত হবে। ফলে কুলধর্ম নষ্ট হবে। পরিণামে বর্ণসাঙ্কর্য্য। বংশ, গোত্রের উৎস হারিয়ে গেলে প্রয়াত পিতৃপুরষগণের শ্রাদ্ধ তর্পণাদি হবে কি ?
অর্জুনের অনুযোগমিশ্রিত যুক্তিগুলির মধ্যে দিয়ে সমকালের বর্ণবিভাজিত সমাজচিত্রটি গাঢ়রঙে ফুটে উঠেছে। ব্রাহ্মণ ক্ষত্রিয় বৈশ্য ও শূদ্র-- এই চতুরবর্ণে বিশ্লিষ্ট সমাজে ক্ষত্রিয়েরা ছিলেন রাজার বা শাসকের আসনে। সেই কালে উত্তর ও উত্তরপূর্ব ভারতে যতগুলি মহাজনপদ ছিল তাদের মধ্যে মগধ, অঙ্গ, কাশী, কোশল, চেদি, কুরু, পাঞ্চাল, মৎস্য, সুরসেন, গান্ধার--এই জনপদগুলির নাম মহাভারতে (কয়েকটি পূর্ববর্তী মহাকাব্য রামায়ণেও) উল্লেখিত। মহাভারত পাঠকেরা তা জানেন এবং ঐ সমস্ত জনপদের‌ সঙ্গে 'কুরু' জনপদের কি সম্পর্ক ছিল, কৌরববংশের কয়েকজন রাজকুমারের কখন কিভাবে কি প্রকার সম্মন্ধ-বন্ধন ঘটেছিল মহাভারত পাঠকগণ তাও জানেন।
সে সকল রাজ্যের বেশীরভাগ রাজাই কুরুক্ষেত্রে কৌরব পাণ্ডব মহাযুদ্ধে দুই শিবিরেই জড়িয়ে পড়েছিলেন। 

"দেখিতে দেখিতে হল উপনীত
ভারতের যত ক্ষত্রশোণিত
ত্রাসিত ধরণী করিল ধ্বনিত
                প্রবলয়বন্যাগানে।" 

আর্য জনগোষ্ঠী ও সেই সময়কালের ন-আর্য জনগোষ্ঠীর মধ্যে যে বর্ণ বিভাজন তাতে ন-আর্য বা অনার্য জনগোষ্ঠী শূদ্রশ্রেনীর অন্তর্ভুক্ত ছিল। 'ক্ষত্রিয়' শ্রেণীভুক্ত যারা তারা রাজা, রাজন্যবর্গ ; অর্থাৎ শাসক। ব্রাহ্মণ ও শূদ্র জনগোষ্ঠী, কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া, এই মহাযুদ্ধে জড়িয়ে পড়েনি। ক্ষত্রিয় জনগোষ্ঠী যেহেতু আর্যসংস্কার, অর্থাৎ বেদের কর্মকাণ্ডের 'স্মৃতি'- অংশ জীবনাচরণের পালন করে চলত তাই প্রয়াত ('স্বর্গগত' শব্দটির ব্যবহার ছিল) পিতৃপুরুষদের আত্মার স্বর্গকামনায় অন্তেষ্টিক্রিয়া--- যেমন সৎকার, শ্রাদ্ধ ও শান্তি, সপিণ্ডকরণ, বাৎসরিক শ্রাদ্ধ, তর্পন প্রভৃতি পারলৌকিক ক্রিয়াকল্প ও অনুষ্ঠান তাদের অবশ্যকর্তব্য ছিল। বংশ পরম্পরায় এই অনুষ্ঠানগুলি লোকাচারের মধ্যে নয়, 'স্মৃতি'শাস্ত্রের বিধান অনুযায়ীই করা হোত এই কারণেই যে আর্যজাতি বিশ্বাস করে যে পারলৌকিক ক্রিয়ার অনুষ্ঠানে মৃত্যুর পর মানুষের আত্মার পরলোকগমন সুচারুভাবে সম্পন্ন হয়, তার স্বর্গলাভের পথ সুগম হয়। ((হিন্দু বা আর্য-ধর্মে পালিত ও অনুসৃত এই শ্রাদ্ধানুষ্ঠান বিষয়টি অতি জটীল। বেদ, ব্রাহ্মণগ্রন্থ ও উপনিষদের অনেকানেক মন্ত্র এই অন্তিম সংস্কারের জন্য একত্র গ্রন্থিত একটি 'আচরণীয়'  সংহিতা। হিন্দু সংস্কারে গীতার শ্লোকগুলি দুঃখ-শোকহরা মহামন্ত্র))। 


বিষাদগ্রস্ত অর্জুন সখা শ্রীকৃষ্ণকে সেই কথাই বলেছেন। তিনি বলছেন এই মহাসমরে পাণ্ডব পক্ষের, কৌরব পক্ষের এবং উভয় পক্ষের যে সকল পক্ষাবলম্বনকারী ক্ষত্র রাজা, রাজপুরুষ ও রাজপুত্র অংশগ্রহন করেছেন তারা যদি মৃত্যুবরণ করে‌ন তবে আমাদের এক বিপুল জনগোষ্ঠীর বংশধারা লুপ্ত হয়ে যাবে। এই যুদ্ধ হবে এমন যে আত্মজনের সঙ্গে আত্মজনের আত্মঘাতী মারণযজ্ঞ। এবং তা নিশ্চিত। তখন স্বামীহারা শত সহস্র ক্ষত্রনারী -- বধূ, কন্যা--- অসবর্ণভোগ্যা হবেই এবং ভারতে এক বর্ণসঙ্কর জাতির সৃষ্টি হবে। 


দোষৈঃ এতৈঃ কুলঘ্নানাং বর্ণসঙ্করকারকৈঃ।
উৎসাদ্যন্তে  জাতিধর্মাঃ কুলধর্মাঃ চ শাশ্বতা।।
‌‌‌‌‌                (ক্রমশঃ)


রবিবার, ১৫ জুন, ২০২৫

জীবনে পরম লগন


জীবনে পরম লগন

সর্বপ্রথম এই অপরূপ রবীন্দ্রসঙ্গীতটি উদ্ধার করি,

জীবনে পরম লগন          করো না হেলা
               করো না হেলা, হে গরবিনি।
বৃথাই কাটিবে বেলা      সাঙ্গ হবে যে খেলা
  সুধা -র হাটে ফুরাবে বিকিকিনি, হে গরবিনি।।

মনের মানুষ লুকিয়ে আসে,  দাঁড়ায় পাশে, হায়
হেসে চলে যায়‌  জোয়ার জলে ভাসিয়ে ভেলা ----
দুর্লভ ধনে দুঃখের পণে   লও গো জিনি
                                    হে গরবিনি।।
ফাগুন যখন যাবে গো নিয়ে ফুলের ডালা,
কি দিয়ে তখন গাঁথবে তোমার বরণমালা,
                                        হে বিরহিনী।
বাজবে বাঁশী দূরের হাওয়ায়  কাটবে প্রহর ------
বাজবে বুকে বিদায় পথে চরণ ফেলা  দিন যামিনী।।

এটি গীতবিতানে প্রেম পর্যায়ের ১৯৮ সংখ্যক গান। গানটির রচনাকাল ১৯৩৮ সাল। ১৯৪৯ সালে এই গানটি শ্যামা নিত্যনাট্যে অন্তর্ভুক্ত হয়। 'শ্যামা' নৃত্যনাট্যের গান হিসাবে এর পরিচিতি যথেষ্ট বৃদ্ধি পেয়েছিল ; আর গানটির জনপ্রিয়তা তুঙ্গে উঠেছিল যখন ১৯৪৮ সালে দৃষ্টিদান ছবিতে গাইলেন সমকালের অন্যতম সুরঋদ্ধ কণ্ঠশিল্পী সুপ্রীতি ঘোষ।
আবার 'শ্যামা' নৃত্যনাট্যটি কবির 'পরিশোধ' কবিতার পরিবর্তিত রূপ। 'পরিশোধ' প্রকাশিত হয়েছিল ১৯০৮ সালে।
পুরসুন্দরী, নৃত্যগীতসটিয়সী, রাজসভাবিলাসিনী শ্যামাকে কিশোর প্রেমিক উত্তীয় ভালোবাসে। কিন্তু শ্যামার সখীরা জানত উত্তীয়র সে ভালোবাসা এক অসম প্রেম। তাদের গানেই সে কথার অভিব্যক্তি আছে, 


.সখীরা ---- ".....অলক্ষ্য-অলকাপুরী-নিবাসিনী,
               তাহার মূর্তি রচিলে বেদনায় হৃদয়মাঝারে।।"
উত্তীয় শ্যামার সভায় (ঘরে) বার বার আসে, বার বার ফিরে যায়,
সখীরা ----". .....ফিরে যাও, কেন ফিরে ফিরে যাও
                  বহিয়া বিফল বাসনা...।"
উত্তীয় সে কথা জানে। তবু
উত্তীয়-------"মায়াবন বিহারিণী হরিণী
                    গহন-স্বপন-সঞ্চারিণী,
          কেন তারে ধরিবারে করি পন   অকারণ ...."
সখীরা আশ্বস্থ করে,
            "হতাশ হয়ো না হয়ো না সখা ....."
উত্তীয় তার গানটির শেষের অন্তরাগুলি গাইতে থাকে,
            "... চমকিবে ফাগুনের পবনে,
                  পশিবে আকাশবাণী শ্রবণে,  
                   চিত্ত আকুল হবে অনুক্ষণ.....।।" 
সখীরা আবার তাকে আশ্বাস দেয়,
          .......হে প্রেমিক তাপস, নিঃশেষে  আত্মআহুতি
                    ফলিবে চরম ফলে "
এই এখানেই, সেই বহুকণ্ঠে গীত, বহুশ্রুত গানটি ; উত্তীয় প্রস্থান করবার পর এক সখী গাইছে,
                          "জীবনে পরম লগন 
             করো না হেলা, করো না হেলা,
                                            হে গরবিনী. ..."

                   দুই
প্রশ্ন উঠতে পারে সকাল বেলায় এই "জীবনে পরম লগন" গানটি নিয়ে পঞ্চায়েত ডেকে আলোচনায় বসা কেন ? কারণ আছে, এবং কারণেই বেশ গুরুতর কেননা গতকাল সন্ধ্যাবেলায় আমার এক অশিতিপর বন্ধু হঠাৎই জিজ্ঞাসা করলেন, এই গানটির যে আবেদন সেটি যদি বাস্তবে, কোন 'যৌবনমদমত্ত কোন তরুণ দেখতে পায় কোন সমগোত্রীয় তরুণী সাগরিকা ----- যে "সাগরজলে সিনান করি' সজল এলোচুলে" বসে রয়েছে সাগরতীরের উপলখণ্ডে, যার শিথিল বেশবাস, নিরাভরণ দেহ আর নিরাবরণ বক্ষের চূড়ায় চূড়ায় চুম্বনলেখা এঁকে দিয়েছে ঊষার স্বর্ণকিরণ সোহাগ ---- তাকে যদি নিবেদন করে, যদি বলে, "আজ পরম লগ্ন এসেছে আমাদের জীবনে, একে হেলায় হারিয়ে ফেলো না।" আমি আজ "পূজার ফুল তুলিতে চাহি তোমার ফুলবনে", তবে কি তা সমাজের  স্মৃতিশাস্ত্রের পণ্ডিতগণ মেনে নেবেন ? 

ঠিক এমনি করে তিনি বলেন নি, আমি সামান্য অলঙ্কারে ভূষিত করে শব্দগুলি সাজালাম আর কি। (যাঁর লেখা এই সকল কাব্য ও কাব্যগীতি তিনি তো চিরকালের 'কাঁচা কার্তিক')। কিন্তু আমাদের বয়েস হয়েছে তো !
স্মৃতিশাস্ত্রকার মহর্ষি মনু থেকে আমাদের রঘুনন্দন ভট্টাচার্য (খ্রীষ্টীয় ষোড়শ শতক) পর্যন্ত নিরাবরণ যৌবনচিত এমন আচরণ মেনে নিতে পারবেন না। তাই ঐ গানটির প্রথম পংক্তির যে 'অর্থ' তার রসে মজে গেলে শ্রোতার বা পাঠকের পদস্খলন হতেই পারে। আমাদের দেখতে হবে গানটির প্রায়োগিক পরিবেশের দিকটি বিচার করে। একটু আগে থেকেই আরম্ভ করি।
রবীন্দ্রনাথের 'কথা ও কাহিনী'  কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয় ১৯০৮ সালে। এই কাব্যের 'কথা' ভাগের একটি কবিতা 'পরিশোধ'। এটি 'মহাবস্ত্বাবদান' বৌদ্ধ জাতককথার একটি কাহিনী, যেটি কবির কল্পনার তুলিতে নবরূপ লাভ করেছে এই কবিতায়। আবার এই কবিতাটির বিষয়বস্তুকে অবলম্বন করে সুদীর্ঘ ৩১বছর পরই, ১৯৩৯ সালে জন্ম দিলেন 'শ্যামা' নৃত্যনাট্যের। তখন কবির বয়স ৭৮। আর এই গানটি রচিত হয়েছিল ১৯৩৮ সালে এবং বৎসরান্তেই সেটির শ্যামা নাটকে অন্তর্ভুক্তি।
এই নৃত্যনাট্যের যে নায়িকা, সে শ্যামা। নগরবধূ, বা রাজনর্তকী। রূপযৌবনসম্পন্না সুন্দরী। রাজানুগ্রহে সে ধনরত্নে, সম্ভ্রমে ও সম্মানে, বিলাস ব্যসনের ঐশ্বর্যে রাজরাণীর সমগোত্রীয়া। তার অপার সুখ, অসীম ভোগবিলাস। গৌতম বুদ্ধের সময়কালে, আগে ও পরে ভারতবর্ষের বিভিন্ন রাজার রাজধানীগুলিতে ও নগর নগরীতে যেমন এমনই সব পুরসুন্দরীদের অবস্থান ছিল। বৌদ্ধ জাতক কথায় আমরা এমন অনেক নগর নগরীর কথা ও  রূপপোজিবীনীদের কাহিনী পাই। তাঁদেরই কয়েকজন নবরূপে যেন পুনর্জন্ম লাভ করেছে রবীন্দ্রনাথের 'কথা ও কাহিনী' কাব্যগ্রন্থে এবং গীতিনাট্য ও নৃত্যনাট্যগুলিতে। 'অভিসার' (বোধিসত্তাবদান) কবিতার বাসবদত্তাও তেমনই একজন মথুরাপুরীর নগরবধূ,
"নগরের নটী চলে অভিসারে যৌবনমদে মত্তা--
           অঙ্গে আঁচল সুনীল বরণ
          রুনু রুনু রবে বাজে আভরণ
  সন্ন্যাসী গায়ে পড়িতে চরণ থামিল বাসবদত্তা।" 


আবার আম্রপালীর কথাও আসে। পরে তিনি পতিতপাবন বুদ্ধের চরণে নিজেকে সমর্পন করে ভিক্ষুণীব্রত অবলম্বন করেছিলেন। ভিক্ষুণীদের কথা যখন উঠলই তখন 'নগরলক্ষ্মী' (কল্পদ্রুমাবদান) কবিতার সুপ্রিয়া, 'পূজারিনী' (অবদানশতক) কবিতার শ্রীমতীও অবিস্মরণীয়া। তাঁরাও পুনর্জন্ম লাভ করেছেন রবীন্দ্রনাথের নবনির্মিতির ভাব ও নান্দনিক সৌন্দর্য  নিয়ে। 'বুদ্ধ জাতককথার' কথামালায় এমন অনেক কাহিনী ও চরিত্র আছে যেগুলিকে রবীন্দ্রনাথ নবনির্মান করেছেন এবং যাদের প্রভাব কবির অন্যান্য সৃষ্টিকেও, বিশেষ করে নাটকগুলিকে, প্রত্যক্ষে বা পরোক্ষে প্রভাবিত করেছে। 


এখন আসি আবারও ওই গানটির প্রসঙ্গেই। পুরনরমনমুগ্ধা, রাজানুগৃহীতা ছলাকলাময়ী শ্যামা সরলমতী প্রেমিক উত্তীয়ের নিঃস্বার্থ প্রেম নিয়ে খেলা করে। শ্যামার সখীরা তা জানে। তাই জনৈক সখীর কণ্ঠে এই গানটি এমনই নৃত্যনাট্যের বিষয়ানুযায়ী তাৎপর্য্যবাহী হয়ে উঠেছে। শ্যামা তখনও বজ্রসেনের দেখা পায়নি। তাই সেই সময়কালে শ্যামার আচরণ, উত্তীয়র প্রেমকে স্বীকার করার, মূল্য দেওয়ার যে অনীহা তার প্রতি ললিতকঠিন ভর্ৎসনা প্রকাশ পেয়েছে এই গানটিতে।
জীবনের মধুমাসে (মধুর যৌবনে) উপেক্ষিত প্রেম (উত্তীয়) যদি বিদায় নিয়ে আত্মনির্বাসনে যায়‌ তবে সেই বিগতযৌবন বিরহদিনে শূন্যবুকে বাজবে শুধু বিরহীর  বিদায়বেলার সুর, 

"বাজবে বাঁশী দূরের হাওয়ায় কাটবে প্রহর ---
বাজবে বুকে বিদায় পথে চরণ ফেলা  দিনযামিনী।।" 

এই প্রেম-প্রণয়-দ্বন্দ্ব-বিচ্ছেদ-সমন্বিত কাহিনীটিকে কবি একটি নৃত্যনাট্যের রূপ দিয়ে, তাতে যে অনাস্বাদিতপূর্ব কাব্যরসের সঞ্চার করেছেন তা সম্পূৰ্ণরূপে রাবীন্দ্রিক। 

"বিদায় পথে চরণ ফেলা" -- এমন সংগুপ্ত-অলঙ্কার-ভূষিত শব্দগুচ্ছ মহাকবির লেখনী হতেই নিঃসৃত হতে পারে।
তাই আমার আলোচনার (tube-এ) একটি বিষয় রবীন্দ্রসঙ্গীত বিশ্বসাহিত্যের শ্রেষ্ঠতম গীতিকবিতা।

('রবীন্দ্রসৃষ্টিতে বৌদ্ধ ধর্ম ও দর্শনের প্রভাব' --- এই বিষয়টি একটি স্বতন্ত্র প্রবন্ধে আলোচিত হবে)।

দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
৩১শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩২
ব্যাঙ্গালোর।
___________________________________________

                     

       
                                 

                                     

বুধবার, ১১ জুন, ২০২৫

আত্মানুসন্ধান -- পর্ব ২

 আত্মানুসন্ধান 


পুরোহিত মহাশয়ের কক্ষটিতে ঢুকে কেমন যেন একটি অন্যরকম অনুভূতি জাগল। খুশী নয়, অখুশী নয় ; উত্তেজনা ঔৎসুক্য ; আকর্ষণ বিকর্ষণ --- এমন কোন মনোভাব ? না, তাও নয়। মনে হোল কোন পুরাতন মন্দিরের গর্ভগৃহ। একটি মাঝারি আকারের প্রদীপ জ্বলছে। প্রদীপের আলো গিয়ে পড়েছে একটি ঠাকুরের সিংহাসনের উপর। সিংহাসনে দাড়ানো অবস্থায় রাধাকৃষ্ণের যুগলের মূর্তি। বংশীবাদনরত ত্রিভঙ্গ কৃষ্ণের বাম অঙ্গে হেলান দিয়ে শ্রীরাধা। যুগ্মভাবে দু'জনের গলায় একটিই বেলফুলের মালা ঝোলানো। এখনো অমলিন সেই ফুলগুলির মৃদুগন্ধে, ধূনোর ধোঁওয়ায় সেই ঘরটির বাতাস মন্দিরের বাতাসের মতই পবিত্র। মন ভক্তি-আপ্লুত ও প্রশান্তিময় হয়ে উঠল। প্রণাম করলাম নতজানু হয়ে।
উঠে দাঁড়াতেই ঠাকুরমশাই আবারও বললেন, এসো।
এবার ঠিক পাশের ঘরটিতে। ওই ঠাকুরঘরের বামদিকের খোলা দরজা দিয়েই ঢোকা যায়‌। এটিই শেষ। এরপর আর কুঠুরি নেই। বেশ খোলামেলা কক্ষ। দরজা ছাড়া দুটি জানালাও আছে বড় বড়। কোন আসবাবপত্র নেই। দরজা জানালার অংশগুলি বাদ দিয়ে দুখানা লম্বা দেওয়ালের মাঝে থেকে কড়িকাঠ পর্যন্ত কাঠের পাটাতন, পর পর আলমারির মত সাজানো, আর প্রতিটি পাটাতনে বই --- বৃহদাকার থেকে শীর্ণদেহী --- অগুন্তি বই পরিপাটি করে সাজানো। মলাট দিয়ে মোড়া, আর তাদের শিরদাঁড়ায় মোটা মোটা হরপে নাম ; যেমন ঋকবেদ, সামবেদ, ছান্দোগ্য উপনিষদ---- এবং শ্রীমদ্ভগবত  গীতা, শ্রীচণ্ডী, কত সব পুরাণ, রামায়ণ মহাভারত। রয়েছে শ্রীশ্রীচৈতন্যচরিতামৃত, শ্রীচৈতন্যভাগবৎ -- এমন সব গ্রন্থ।‌ সংস্কৃত ভাষায়ও কিছু কিছু নাম। একটি পড়তে না পারলেও লেখাটি আন্দাজ করে বুঝলাম, গীতগোবিন্দম্। আমি মুগ্ধ দৃষ্টি মেলে বইয়ের তাকগুলো দেখেই চলেছি। ঠাকুরমশাই হয়তো চাইছিলেন যে আমি তাঁর বইয়ের সংগ্রহশালাটি দেখি। তাই বেশ কিছুক্ষণ পরে তিনি বললেন, বোস।
তিনিও বসলেন, মেঝেতেই। কক্ষটির মেঝের অর্ধেকখানি জুড়ে রয়েছে কম্বল পাতা এবং ডান দিকের কোণায়, জানালার নীচে সামান্য উঁচুপায়া কাঠের পিঁড়ি,  যার উপর বই রেখে পড়তে বা লিখতে সুবিধা হয়। যে কম্বল দুটি পাতা আছে সেগুলি বর্তমান কালে আমাদের পরিচিত কম্বল নয়।‌ মেষপালকদের কাছ থেকে কেনা, ধূসর রঙের, চার পাশের পাড় কালো। সমস্তটাই ভেড়ার অকৃত্রিম লোম দিয়ে তৈরী। আমাদের ছোটবেলায় আমরা ওই মেষপালকদের দেখেছিলাম। শীতের সময়কালে, ধান কাটা সারা হলে, বিরাট বিরাট সব ভেড়ার পাল নিয়ে তারা আসত। মেষপালকদের একজন আগে, একজন পালের পিছনে হাঁটত। ভেড়াগুলো, একে অপরের গায়ে গায়ে সেঁটে দৌড়াত, যেন ধূসর ধূলার প্রবাহ (এমন দৃশ্য দেখেই হয়তো গড্ডালিকা প্রবাহ প্রবাদটির সৃষ্টি হয়েছে)। 


যাই হোক সামান্য প্রসঙ্গান্তরে চলে গিয়েছিলাম। আবার ফিরে আসি ঠাকুরমশাইয়ের কাছে। তিনি তাঁর পাঠের আসনে নয়, কিন্তু তার কাছাকাছি, দেওয়াল ঘেঁসে, দেওয়ালে পিঠের ভর রেখে বসেছেন। আমিও বসলাম মুখোমুখি। তিনি মাথা ঝুঁকিয়ে কি যেন ভাবলেন। তারপর মাথা তুলে অত্যন্ত কোমল স্নেহার্দ্র কণ্ঠে বললেন,
বাবা, আমি খুবই খুশী হয়েছি, এই প্রথম কেও একজন আমার কাছে মন্ত্রের অর্থ জানতে চাইলো। কত শত ঘরে শ্রাদ্ধ, শান্তি, উপনয়ন, অন্নপ্রাশন করেছি, এখনো করি ; কিন্তু এই প্রথম তুমি এসেছো মন্ত্রের অর্থ জানবার কামনা নিয়ে। তুমি যে মন্ত্রটির মানে জানতে চাইছো সেটি, শ্রীমদ্ভাগবত গীতার দ্বিতীয় (সাংখ্যযোগ) অধ্যায়ের ২৮তম মন্ত্র। তৃতীয় পাণ্ডব অর্জুন, কুরুক্ষেত্রের রণাঙ্গণে, যুদ্ধারম্ভের প্রাককালে, দেখলেন তাঁকে তাঁদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করতে হবে যাঁরা স্বজন এবং গুরুজন, তখন তিনি বিষাদগ্রস্ত হয়ে পড়লেন। তিনি সখা এবং তাঁর রথের সারথি কৃষ্ণকে তাঁর ঐ যুদ্ধের প্রতি অনীহার কথা বার বার বলতে লাগলেন। যুক্তিপ্রযুক্ত কথা ছিল‌ সেগুলি। তিনি বলেছিলেন, সম্মুখে পরিদৃশ্যমান আপনজন, পিতৃতুল্য পিতৃব্য, পিতামহ, ভ্রাতা, বন্ধু --- এদের সংহার করার মতো মহাপাপ আমি করতে পারবো না। রাজ্যলাভ তো তুচ্ছ, ত্রিলোক জয়ের গৌরবের অধিকারী হলেও আমি এমন কুলবিনাশী যুদ্ধ করতে চাই না। 

এবম্ উক্তা অর্জুনঃ সংখ্যে রথোপস্থ উপাবিশৎ।
বিসৃজ্য সশরং চাপং শোকসংবিগ্নমানস।।
কৃষ্ণকে তাঁর মনের কথা জানিয়ে, শোকাকুল অর্জুন, ধনুর্বাণ ত্যাগ করে রথের পেছনে বসে পড়লেন। 

এটি শ্রীগীতার প্রথম অধ্যায়ের, অর্জুনবিষাদযোগের শেষ কথা। অর্জুনের এই (আত্মীয় স্বজনদের সম্ভাব্য মৃত্যুজনিত) শোক যে নিরর্থক সেইটি প্রতিপন্ন করবার জন্যই ঐ "অবক্তাদীনি ভূতানি..." মহাবাণী উচ্চারণ করেছিলেন শ্রীকৃষ্ণ। 

দেখ বাবা, গীতা বৈদিক ধর্মধারণার শেষ কথা, সার কথা। বৈদিক ধর্ম, যা সনাতন ধর্ম নামেও অবিহিত তা একটি সহস্রমূল, আকাশব্যপ্ত শাখা-প্রশাখা সমন্বিত বটবৃক্ষ। এই ধর্মরূপ মহাতরু পাঁচ হাজার বা বহু গবেষকদের মতে নূন্যধিক দশ হাজার বছর ধরে বিবর্তিত ও বর্ধিত হয়েছে, হয়ে চলেছে আজও। এই ধর্মের প্রধান দুটি শাখা। একটি কর্মকাণ্ড এবং অপরটি জ্ঞানকাণ্ড। বেদের বা শ্রুতির সংহিতা ও ব্রাহ্মণভাগ কর্মকাণ্ডের বিধি বিধান নিয়ে কথা বলেন আর আরণ্যক ও উপনিষদ ভাগ জ্ঞানকাণ্ড যা জ্ঞানমার্গের কথা বলেন। বৈদিক এই জ্ঞানকাণ্ডের অসীম অভিব্যক্তি ঘটেছে শ্রীমদ্ভগবত গীতায়। গীতাপাঠের মঙ্গলাচরণে বলা হয়েছে, 

সর্বোপনিষদো গাবো দোগ্ধা গোপাল নন্দন।
পার্থ বৎস সুধীর্ভোক্তা দুগ্ধং গীতামৃতং মহৎ।। 

সকল উপনিষদ, এখানে প্রথম ও প্রধান বারটি উপনিষদ, যেমন ঈশ, ঐতরেয়, কৌষীতকী, ছান্দোগ্য ইত্যাদি গৌমাতাস্বরূপ, দোহন করছেন গোপালনন্দন শ্রীকৃষ্ণ, গো-বৎস হলেন পার্থ, সুধীজন সেই দুগ্ধ পান করেন এবং ঐ দুগ্ধ গীতারূপ অমৃত। সমগ্র গীতা গ্রন্থটি তো জ্ঞানের ক্ষীরসমুদ্র, তার প্রতিটি বাণী অমৃতময়। কিন্তু সেই অমৃত পান করবার অধিকারী হতে হয়। আমি সে অধিকার অর্জন করতে পারিনি বাবা। আমি পৌরোহিত্য করি পেটের দায়ে। তবে তুমি যখন জানতে চেয়েছো, তখন যতটুকু বুঝতে পেরেছি ততটুকুই বলি।
এরপর ঠাকুরমশাই যা বললেন তার মর্মার্থ সত্যেই অতি গভীর। ভূত অর্থাৎ যা অতীতে ছিল তা অব্যক্ত, অপ্রকাশিত ছিল। অদৃশ্য, অস্পর্শ, অবিজ্ঞাত ছিল। আমাদের জন্মের পূর্বকালটি আমরা জানিনা। আবার আমাদের শরীরের নিধনপরবর্তী কালও আমাদের  অজানা। আমাদের এই দেহ-মন-প্রাণ সমন্বিত যে অস্তিত্ব তার আগের অবস্থা অব্যক্ত এবং পরের অবস্থা-- তাও অব্যক্ত। অথচ দুটি অবস্থাই, যা ছিল এবং যা হবে, অনস্বীকার্য। দুটি অপ্রকাশিত অবস্থাই সত্য। একটি সম্ভাবিত ছিল যা ঘটেছে, আর একটি অবশ্যম্ভাবী যা ঘটবেই। অতএব মধ্যবর্তী সময়কালে, শরীরী অবস্থায় প্রাণীর যে অস্তিত্ব তা তো অনিত্য। এই অনিত্য, ক্ষণস্থায়ী আমাদের যে দেহীরূপ, তার জন্যে শোক করা বৃথা।
এরপর ঠাকুরমশাই বললেন,
দেখ, আমি যা বললাম তা ঐ শ্লোকটির সাধারণ অর্থ মাত্র। এই 'অব্যক্ত' বিষয়টি বোঝানো যায়‌ না। জ্ঞানী, বিদ্বান ও সাধক যাঁরা তাঁরাই এই অব্যক্ত, অপ্রকাশিত, অদৃশ্য, অস্পর্শিত অবস্থাটি উপলব্ধি করেন।
এরপর তিনি উঠে দাঁড়ালেন এবং তাক থেকে একটি বই পেড়ে, ধুলো ঝেড়ে আমার হাতে দিয়ে বললেন,
--- বইটি পড়, অনেক প্রশ্নের উত্তর পেয়ে যাবে।‌ 


এর মধ্যে দশ দশটি বছর পেরিয়ে গিয়েছে। বছর পাঁচেক আগে গ্রামও ছেড়েছি। তবে যতদিন গ্রামে ছিলাম পুরোহিত মহাশয়ের আমি ছাত্র হয়ে গিয়েছিলাম। প্রতিদিন সন্ধ্যায় তাঁর বাড়িতে গিয়েছি, যে বই দিয়েছেন, যে পড়া দিয়েছেন তা পড়েছি ধ্যানস্থ হয়ে। বুঝতে পারিনি, তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন বার বার, দীর্ঘ সময় ধরে। সংস্কৃত ভাষাও শিখেছি যৎসামান্য এবং দুটি ব্যাকরণ বই আমাকে সম্পূর্ণ দান করে বলে দিয়েছিলেন,
--- এগুলি রোজ পড়বে।
গ্রাম ছেড়ে শহরে আসছিলাম যে দিন, সে দিন সারাটি পথ একটি ভাবনাই মনের মধ্যে জেগেছিল যা একাধারে আনন্দ ও বেদনার। 'আনন্দ' অজানা জগত আবিস্কারের, আর 'বেদনা' সেই জগত ছেড়ে আসার। অতীত ভারতবর্ষের জ্ঞানসাধনার যে জগত, তার ব্যাপ্তি, তার গভীরতার যে সামান্য পরিচয়, ঠাকুরমশাইয়ের সান্নিধ্যে আমি লাভ করেছিলাম সেটি আমার জীবনের নূতনতর বোধের জগৎ, অযাচিত পরমধন প্রাপ্তির আনন্দ। আর বেদনাবোধ এই কারণেই যে সেই জ্ঞানতাপসের অপূর্ব ব্যাখ্যা আর শুনতে পাবো না।

তাঁর কাছ থেকে চলে আসার কয়েকদিন আগে তিনি বলেছিলেন,
বেদ, বেদাঙ্গ, বেদান্ত বা উপনিষদ এবং পুরাণ ও স্মৃতিশাস্ত্রের কথা আমি যৎকিঞ্চিৎ জানি, সে সকল কিছু তোমাকে বলেছি। এবার তুমি মহাগ্রন্থ শ্রীগীতা পাঠ কর। ভগবান বেদব্যাস সঙ্কলিত, স্বয়ং পরমেশ্বর মুখনিঃসৃত ঐ মহাবাণীগুলির অর্থ প্রকাশিত হবে। তবে আমার গুরুদেব ঐ তোমার প্রথম জিজ্ঞাসার মন্ত্রটির বিষয়ে যা বলেছিলেন সেটি তোমাকেও জানিয়ে দিতে চাই। তাঁর মত ছিল এই যে, আমাদের ব্যক্ত জীবনের ঐশ্বর্য তো কম কিছু নয়। শ্রীকৃষ্ণ সেই দিকটির অভিমুখেই ইঙ্গিত করেছেন। বিষাদগ্রস্ত হয়ে, কর্মহীন, জীবনধর্মবিমুখ হলে তো 'পুরুষাকার'ই বিনষ্ট, কালপ্রাপ্ত হয়। জীবনের মূল্য তখনই নিরূপিত যখন কর্মসাধনের মধ্যে দিয়ে জীবন চরিতার্থতা লাভ করে। আমাদের প্রতিটি জীবন কুরুক্ষেত্রের সমরপ্রাঙ্গন। গীতার বাণী শুধুমাত্র অর্জুনের উদ্দেশেই উদ্ঘোষিত হয় নি ; এ বাণী সকল মানবের জন্যই উচ্চারিত। 

যে দিন তিনি বললেন, "গীতার বাণী সকল মানবের জন্যই উচ্চারিত",--- সেই দিন থেকে আমার মনে হোল আমার ভাবনার অন্ধকার ঘরে তিনি প্রদীপশিখা জ্বালিয়ে দিয়েছেন। এতদিন নিজেকে বিবিক্ত করে মহাভারতের কুরুক্ষেত্রে নিজেকে স্থাপনা করেছিলাম। যুদ্ধারম্ভের প্রাককালে সমরাঙ্গনের একপ্রান্তে কল্পনার দৃষ্টিতে দেখছিলাম বক্তা শ্রীকৃষ্ণ ও শ্রোতা অর্জুনকে। এখন মনে হোল সেই ধর্মক্ষেত্র কুরুক্ষেত্রের মহারণ, মহাদ্বন্দ্ব তো আমার অন্তরেই নিয়ত ঘটে চলেছে। আমার অন্তরই তো সেই কুরুক্ষেত্র যেখানে হিংসা দ্বেষ ক্রুরতা ছলনা কপটতা  পরশ্রীকাতরতা লালসা কায়া ধারণ করে ছায়াশত্রুদের সঙ্গে নিরন্তর যুদ্ধ করেই চলেছে। পার্থিব সম্পদ কামনার‌ অগ্নিকুণ্ড নিজের অন্তরেই জ্বালিয়ে রেখেছি অহোরাত্র। সেই অগ্নিকুণ্ডে ছাই হয়ে যায়‌ স্নেহ প্রেম দয়া মায়া। কপট পাশায় পরাজিত পাণ্ডবদের বনবাসে পাঠিয়ে দুর্যোধন পিতা ধৃতরাষ্ট্রকে বলেছিলেন,
সুখ চাহি নাই মহারাজ ---
"জয় ! জয় চেয়েছিনু, জয়ী আমি আজ।
ক্ষুদ্র সুখে ভরে নাকো ক্ষত্রিয়ের ক্ষুধা
কুরুপতি ! দীপ্তজ্বালা অগ্নিঢালা সুধা
জয়রস, ঈর্ষাসিন্ধু মন্থনসঞ্জাত ,
সদ্য করিয়াছি পান --- সুখী নহি তাত
অদ্য আমি জয়ী।.।.." 

ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র আকারে হলেও এই প্রকার ঈর্ষাসিন্ধু নিত্য  আমাদের চিত্তদেশে ছোটবড় ঢেও তুলে বিরাজ করছে। এবং তাই থেকে জন্ম নিচ্ছে অতৃপ্তি। আর এই অতৃপ্তিই সকল দ্বন্দ্বের উৎসভূমি ---- কুরুক্ষেত্র।
আমাদের মানস কুরুক্ষেত্র প্রাঙ্গনে বেজে উঠুক পাঞ্চজন্য, কম্বুকণ্ঠে ধ্বনিত হোক্ চৈতন্যজগতের মহাগীত, অজ্ঞানতিমিরান্ধ মানবসত্তার ক্ষণকালের অস্তিত্ব জ্ঞানালোকে দ্যুতিময় হয়ে উঠুক। ভগবানের শ্রীমুখনিঃসৃত গীতধ্বনিময় মহামন্ত্রসমূহ শ্রবণ করার পর 'নষ্টমোহ' কুন্তীনন্দন আত্মসমর্পণ করলেন। হে জীবনবল্লভ,  আমার মানসলোকে আমৃত্যু জ্যোতির্ময় হয়ে বিরাজ করুন কৃষ্ণার্জুনের যুগলমূর্তি ---- যুক্তকর, নতজানু, আনতমস্তক জগতসংসারের চিরসারথির উদ্দেশে‌ রথী ভারত (পার্থ) নিবেদন করছেন,  

"নষ্টমোহঃ স্মৃতির্লব্ধা তৎপ্রসাদাৎ ময়াচ্যুত।
স্থিতোহস্মি গতসন্দেহঃ করিষ্যে বচনং তব।।" 

হে অচ্যুত, (অবিনাশী) আপনার কৃপায় আমার মোহান্ধকার দূরিভূত হয়েছে, আমার স্মৃতি জাগ্রত হয়েছে (আমার আরব্ধ ও প্রারব্ধ কি তা জেনেছি) সংশয়মুক্ত হয়ে স্থিত হয়েছি। (এখন থেকে) আপনার আজ্ঞাই পালন করব --- করিষ্যে বচনং তব।
বিশ্বমানবসংসারে তাঁর কৃপা বর্ষিত হোক্ --- এই প্রার্থনা।‌

(আকাশসন্নিভ ধর্মধারণা 'বৈদিক ও বৈদান্তিক ধর্ম' বিষয়ে একটি সংক্ষিপ্ত ও সরল আলোচন পরবর্তী লেখায়, বেশ কয়েকটি পর্বে, প্রকাশিত হবে)।

দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
১১/৬/২০২৫
কলকাতা
_____________________________________________












রবিবার, ১ জুন, ২০২৫

আত্মানুসন্ধান-- পর্ব ১

আত্মানুসন্ধান 


"বিন্দু মিলতে‌ চায় সিন্ধুর সঙ্গে ; খণ্ড তার সমগ্রতা খুঁজে  পায় অখণ্ডের মধ্যে ; আর মানুষ তার চরিতার্থতা লাভ করে ঈশ্বরে।"
উক্ত কথাগুলি রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের ত্রয়োদশ অধ্যক্ষ,‌ বহু অধ্যাত্ম ও দর্শনগ্রন্থ-প্রনেতা পুজ্যপাদ স্বামী লোকেশ্বরানন্দ মহারাজের। উক্ত সিদ্ধান্তটি তিনি বেদ, ব্রাহ্মণ, বেদান্ত, শ্রীমদ্ভাগবত গীতা এবং শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব, স্বামী বিবেকানন্দ ও বিশ্বের সারস্বত সমাজের অনেকানেক জ্ঞানতাপসদের সত্যদর্শন উদ্ধার করে প্রতিপন্ন করেছেন। (এ-সমস্ত ব্রহ্মজীজ্ঞাসু সাধক, মহাকাব্য, মহাগ্রন্থ প্রনেতা, কবি-শিল্পী-সাহিত্যিকদের সৃষ্টির সঙ্গে আমার পরিচয় আরম্ভ হয়েছে অনেক পরে ;  আমার পিতা মাতার মৃত্যুর পর)। আমরা উক্ত বিষয়টির, স্বামী রঙ্গনাথানন্দ মহারাজের সিদ্ধান্তটির উপর গভীর দার্শনিক আলোচনা বা ব্যাখ্যার সাহায্য নেবার চেষ্টা করব ততটুকুই যতটুকু আমাদের অতি সাধারণ বুদ্ধিতে ধরে। 

আমার জন্মভূমি বর্তমান পশ্চিম বাঙলার পশ্চিম প্রান্তসীমার শেষে অজয় নদের উত্তর পাড়ের একটি ছোট গ্রামে। যে নদের দক্ষিণ পাড়ে গড়ে উঠেছে চিত্তরঞ্জন রেলইঞ্জিন কারখানা। এই কারখানা গড়ে ওঠার আগে এবং তারপরেও এই অঞ্চলটি ছিল বনাঞ্চল। শুধু বন জঙ্গল নয়, উচ্চাবচ ভূমি, পাহাড়-টিলা, বিপুলাকৃতি পাথরের চাঙাড়, ছোট বড় ঝোরা --- সমস্তকিছু মিলিয়ে ছোটনাগপুরের মালভূমির আদিম প্রকৃতির অনেকখানিই  বিরাজ করত এই অঞ্চলটিতে। দূরে দূরে স্বল্পবসতির গ্রাম। তাও আম জাম মহুল, কেন্দু ভেলা পিয়াল, শাল শিমুল পলাশ বনের আড়ালে আড়ালে। আবার দিগন্তজোড়া তৃণহীন, নিষ্পাদপ প্রান্তর --- তাও ছিল নদীর পাড় বরাবর। আমার জন্মকালের আমার জন্মভূমির প্রকৃতি-পরিচয় এই জন্যই দেওয়া যে তাহলে শৈশব-কৈশোর কালের আমার মনের স্বপ্ন-কল্পনার সীমাহীন উড়ানের কথা-কাহিনীগুলি অবিশ্বাস্য ঠেকবে না।

ভোর বেলায় ঘুম ভেঙেই যেত, কেননা তখন রাত্রি এসেই পড়ত সন্ধ্যার ছায়া নামতে নামতেই। গরুর পাল ফিরতি পথে ধূলোর মেঘে ঢেকে দিত পুরো গ্রামটাই, শাঁখ বেজে উঠত রাধাশ্যামের ভাঙা মন্দিরের উঠোন থেকে আরম্ভ করে গ্রামের সমস্ত ঘরের তুলসীতলায়। মাঠ ঘাট থেকে হাঁক ডাক দিয়ে চাষী, নদী পেরিয়ে ঊর্দ্ধশ্বাসে হাটুড়েরা, কাজের লোকেরা, তাসপার্টি, তাসাপার্টি, খোল-করতাল-ওয়ালা বৈষ্ণব ভিখারী, আউল-বাউল, মোছলমান পাড়ার ঝোলা-কাঁধে ফকির, চামর-হাতে দরবেশ, গামছা-মাথায় বামুন ----- যে যেখানে 'পেটের দায়ে' বেরিয়েছিল সব্বাই আপন আপন ঘরে ঢুকতেই চারিদিক শুনসান। তখন ঘরের ভিতরে তেলচিটে চটের আসনে বসে, হ্যারিকেনের বা 'লম্ফ'-এর আলোয় বর্ণপরিচয় প্রথমভাগ, দ্বিতীয় ভাগ এবং একটি কোনা-ফাটা শ্লেট, এক টুকরো খড়ি পেনশিল নিয়ে কিছুক্ষণ বসে বসে, ঢুলে ঢুলে পড়া। তারপর আধোঘুমে, আধো জাগরণে খাওয়া (মা এক হাতে তন্দ্রাশিথিল ঘাড়টি ধরে অন্য হাতে ভাতের ঢেলা মুখের ভিতরে গুঁজে গুঁজে দিতেন) এবং ঘুমিয়ে যাওয়া। আবার ভোর। আবার ঘরের চৌহদ্দির মধ্যেই ঘোরাফেরা, বড় জোর সামনের আমবাগান আর ঘরের পিছনের ছোট পুকুরের পাড়। বালককালের কতগুলো বছর যে এই গন্ডীর মধ্যেই আবদ্ধ ছিলাম জানি না। হঠাৎ কখন বয়েস বেড়েছে, বড় হয়েছি, চারণভূমির সীমানাও বড় হতে হতে বাগানের শেষে মাঠ, মাঠ পেরিয়ে বন, বন পেরিয়ে নদী, নদী পেরিয়ে ভিন গ্রাম, ভিন শহর, ভিন দেশ এবং দেশান্তর। 

যখন কৈশোরকাল তখন যা দেখেছি তাতেই ঘোর লেগেছে। সূর্য ওঠা, সূর্য ডোবা, মাঠ ঘাট ডাঙা ডহর। ঝড় বৃষ্টি আকাশ বাতাস। নদ নদী ঝোরা, ঝাড় জঙ্গল, পাহাড়-টিলা। জল থৈ থৈ পুকুরগুলো, রায়দীঘি তো বটেই, এমনকি ডোবা-ডাঁড়ি। ছোট ছোট গাঁড়া গর্তের ভিতরে মনে হোত মায়ের-কাছে-শোনা গল্পের পাতালপুরী আছে। সে সকল দেখা স্বাভাবিক আর সড়গড় হতেই আরেক বিরাট বিস্ময়। সময় ছিল শরৎকাল। শান্ত-ঢেও অজয় নদীতে  ছিপে মাছধরার উপযুক্ত পরিবেশ। মাছ ধরবার সরঞ্জাম নিয়ে, পাড়ার খোঁড়াদাদুর সঙ্গে চলেছি। একেবারে রোদ-ঝলমলে দিন। বনের দিকে নয়, বাগানবাড়ির ডাঙা পেরিয়ে যাচ্ছিলাম। উপরের প্রায় নির্মেঘ আকাশ থেকে আলোর স্রোত নেমে আসছে  হড়পা বানের মত। কেন যে হঠাৎই দাঁড়িয়ে পড়েছিলাম ! ওই রোদ, ওই আকাশ, ওই আলোজ্বলা অসীম মাঠ কী যে ভালো লাগছিল !
কি রে, দাঁড়ালি কেন ? কি দেখছিস ? -- খোঁড়াদাদুর তাড়া খেয়ে  প্রথমে চমকে উঠেছিলাম। কিন্তু, এখনও স্পষ্ট মনে আছে, দাদুকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম,  

--- আচ্ছা দাদু, ঐ দূরে যেখানে এই ডাঙাটা শেষ হয়ে গেল, যেখানে আকাশটা নেমে এসেছে, সেখানে তুমি কখনো গিয়েছ ? ওইখান থেকেই তো সূর্য ওঠে, ওখানে গিয়েই ডুবে যায়‌। আমি দেখেছি।
দাদু বলেছিল, ওটি দিগন্ত। চারিপাশে ঘুরে ঘুরে দেখ্ ঐ রকমই দেখতে পাবি। কেও যেন গোল করে দাগ দিয়ে সীমা টেনে দিয়েছে। ওই হোল দিগন্তরেখা। ওটি তো একটি সত্যিকারের রেখাটানা জায়গা নয়, যত তুই তার দিকে এগিয়ে যাবি ওই রেখা ততই সরে সরে যাবে। আর আকাশটাও নীচে নেমে আসেনি। এখানে মাথার উপরে যেমনটি দেখছিস, দিগন্তের সীমা পেরিয়েও তেমনই দেখবি।
আমি আবার জিজ্ঞাসা করেছিলাম, কতটা উঁচুতে উঠলে আকাশটাকে ছুতে পারব ?
কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর দাদু বলেছিল, আজ সন্ধ্যা বেলায় তোর বাবার কাছে  যাব। 


না, এরপর আমার শহরে যাওয়া, ইস্কুলে ভর্তি হওয়া, স্কুল থেকে কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, চাকরি-বাকরি -- এ সবের কথা বলার আর প্রয়োজন নেই। তা হলে আত্মজীবনী গোছের কিছু একটা হবে যেখানে সূক্ষ্ম মিথ্যার আড়ালে ঢেকে যাবে জীবনের সত্যরূপ। জীবনের কি সে সত্যরূপ ? না, তা জানতে পারিনি। খুঁজেছি, ভেবেছি, প্রশ্ন করেছি  ; কিন্তু পাইনি। দৃষ্টিতে পাইনি, উপলব্ধিতে পাইনি ; তবে কখনো ক্বচিৎ মনে হয়েছে (অনুভব বলাই সঠিক) কাম্যের অতিরিক্ত কিছু যেন সারাটি দেহমন জুড়ে, ঘনঘোর শ্রাবণের ঘুটঘুটে অন্ধকার রাত্রের বিদ্যুৎ ঝলকের মত, কি যেন জ্বলে ওঠে আঘাত করে‌ই হারিয়ে গেল।
আমি বামুনঘরে জন্মেছি। (আহা, মানুষের বিশ্বজাগতিক সংসারে এই বামুন অ-বামুন যদি না থাকত তবে সে কী আনন্দময় মিলনোৎব দিকে দিকে !) কাজেই ঘরে দেখেছি বছরভর নানা ব্রত পার্বণ, পূজা উপাসনা তন্ত্রমন্ত্র। আমার উপনয়নেও সে কী নিয়ম, বিধি-বিধানের ঘটা। তারপর নিজের সংসার  ; সেখানেও, এই এতটা কাল পর্যন্ত কত আচার, কত সংস্কারই না পালন করে এসেছি, গ্রহণ বর্জন মেনে নিয়েছি। যা করছি বা করিনি তা যেন কোন এক অজানা-অচেনা, অদৃশ্য-অমীমাংসিত 'শর্তের' বাধ্যবাধকতায়।

ভাগ্যই বলি বা সুযোগই বলি, অনেক দিন বেঁচেও আছি। এই বেশীদিন বাচাঁর ফলে হয়েছে কি, ব্যক্তিজীবনের দ্বন্দ্ব, পারিবারিক জীবনের সুখ দুঃখ, মিলন সংঘাত যেমন ভোগ করে এসেছি তেমনই সমাজজীবন এবং (আধুনিক বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তির অবিশ্বাস্য উন্নতির ফলে) সারা পৃথিবীর চলমান জীবনের সঙ্গে প্রত্যক্ষরূপে বা পরোক্ষভাবে জড়িয়েও রয়েছি। কিন্তু রয়েছি একটি নশ্বর দেহের মধ্যেই। এখানে, এই চিন্তা মাথায় আসতেই মনে হোল দেহ-বিবিক্ত বা দেহাতিরিক্ত একটি সত্তা আমার আছে যা একই সাথে হরিমন্দিরে বসে ভাগবৎ পুরাণের কৃষ্ণকথা শুনে প্রেমাশ্রু বিসর্জন করছে ; আবার   অজানা কোন দেশে, অচেনা কোন অসহায় নর নারী বা শিশুর নৃশংস মৃত্যুর খবর পেয়ে হাহাকার করে উঠছে। দরদবিগলিত শোকাশ্রু ঝরে পড়ছে। অদেখা রাধাবল্লভের সঙ্গে প্রেমেও যেমন, আর অচেনা দুর্ভাগা কোন মানবের যন্ত্রণার সঙ্গেও তেমনই সে একাত্ম।
আমার কোনটি এই পৃথিবীব্যাপী আত্মা, বা আরও বাস্তব ও সহজতর শব্দে বলা যায় 'মানবাত্মার' সঙ্গে সহমর্মিতা রাখে, সহধর্মিতা পোষণ করে, সমত্ব বা একত্ব বোধ করে ? ইদানিং নিরন্তর এই প্রশ্ন আমার মনের মধ্যে জাগে। শরীর ছাড়া আমার আর কি আছে ? উত্তর পাই --- শরীর ছাড়া আছে মন, বোধ, বুদ্ধি। আছে ইন্দ্রিয়গুলির, জ্ঞানেন্দ্রিয়গুলির কর্মশীলতা বা আবেদন।
কিন্তু এ-সবের তো ক্ষয় লয় আছে। শরীরটার সাথে সাথে সবই শেষ। বাবার শ্রাদ্ধের অনুষ্ঠানে আমাদের কুলপুরোহিত গীতা পাঠ করেছিলেন। সকলের সাথে আমিও বসে আছি, শুনছি। পুরোহিত মশাই একটি শ্লোক বার বার, জোরে জোরে উচ্চারণ করছিলেন, আর বোঝানোর খুব চেষ্টা করছিলেন। না শুনে উপায় নাই, এমনি অবস্থা। অতএব মন দিয়েই শুনতে লাগলাম। 

"অবক্তাদীনি ভূতানি ব্যক্তমধ্যানি ভারত।
অব্যক্তনিধনান্যেব  তত্র কা পরিদেবনা।।" 

প্রথমত বুঝতে পারিনি। কিন্তু যেই অনুষ্ঠান শেষ হয়ে এল, আমন্ত্রিত-নিমন্ত্রিত, আত্মীয় স্বজন একে একে বিদায় নিলেন। গৃহপরিবেশে একটি শান্ত বিষাদময়  বিষন্নতা নেমে এল। গুছিয়ে নেবার, ধোওয়ার-মোছার, রাখার-ফেলার যা যা ছিল তাও সারা হোল অপূর্ণতার অতৃপ্তি সত্ত্বেও। এবার ক্লান্তি। শোকের, দুঃখের, উদ্বেগের, উৎকণ্ঠার শেষে এ যেন নিরানন্দের অবসন্নতা। কিন্তু ঘুম ছিল না চোখে। গত-হওয়া সমস্ত কাজ, মানা, না-মানা  সংস্কার সবই যেন সন্ধ্যার ছায়ার মত মিলিয়ে গিয়েছে  ; শুধু পুরোহিত মশাইয়ের ঐ কথাগুলি যেন আরো তীক্ষ্ণ হয়ে, স্পষ্টতর হয়ে মনে পড়তে লাগল সারা রাত।
ভোরের ক্ষীণ আলো দেখা দিতেই উঠে পড়লাম। উঠান পেরিয়ে, সামনের আমবাগানটা পেরিয়ে, ছোট একটা টিলার উপর গিয়ে দাঁড়ালাম। পূর্বদিগন্ত ধীরে ধীরে লাল, তারপর গৈরিক। গেরুয়া বসনপরা আকাশ-সংসারের মহাসন্ন্যাসী। সূর্যদেবের এমন আবির্ভাব এই প্রথম দেখলাম যেন। জীবনের তিনটি দশক পেরিয়ে এসেছি সূর্যোদয়ের এমন রূপ কখনও, কোনদিনও চোখে পড়েনি। ভৌর থেকে সকাল, আকাশের গায়ে আলোর এত যে খেলা, এত যে রঙের, রূপের পরিবর্তন -- দেখতে দেখতে তন্ময়তার এমন ঘোর জেগেছিল যে, ভুলেই গিয়েছিলাম বিগত দিনগুলির দুঃখের, কষ্টের, শোক-বিষাদের যন্ত্রণা। হঠাৎই মনে হোল গতকাল অপরাহ্ন বেলার পুরোহিত মহাশয়ের সেই মন্ত্রটির কথা  কিছুটা যেন বুঝতে পারছি। সত্যেই তো, আজ সকালে তো গত রাত্রির অন্ধকার আর নাই। সে তো ফিরবেও না আর কোন দিনও। 'অব্যক্তাদীনি ভূতানি।'

আবার যাই তাঁর কাছে। যে মন্ত্রগুলি তিনি শ্রাদ্ধের অনুষ্ঠানে উচ্চারণ করেছিলেন, আবার সেগুলি শুনে আসি। ভালো করে জেনে আসি কী কথাই না বলা আছে সে সকল মন্ত্রে। পুকুরে স্নান সেরেই ঘরে ফিরলাম, পুরোহিত মহাশয়ের জন্য আরো কিছু ফলমূল, ঘি, গোবিন্দভোগ চাল নিয়ে গেলাম তাঁর বাড়িতে, এ গ্রামেরই   শেষ মাথায়। 

পুরুতমশাই হরগোবিন্দ ভট্টাচার্য (হারু ঠাকুর বলেই এ তল্লাটে তাঁর পরিচিত) অতি পণ্ডিত মানুষ। পৌরোহিত্য, তিনি বলেন, তাঁর জাতকর্ম, পেশা নয় ; এবং তা সত্যও। দান-দক্ষিণার প্রতি তিনি চিরকালই উদাসীন। আমাকে তাঁর আঙিনায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বিস্মিতই হলেন।
--- এসো, এসো বাবা, কেনই বা আজ বেরোলে ? কয়েক দিন ধরে কত মনের কষ্ট, শরীরের পরিশ্রমই না গিয়েছে। দুটো দিন শান্ত হয়ে বিশ্রাম নাও।
---- না না ঠাকুরমশাই, শরীরের শ্রান্তি তেমন নেই। মনে হোল আপনাকে প্রণাম করে আসি, তাই। আর আপনি গতকাল যে মন্ত্রটি বলেছিলেন, সেটি আরও একবার শোনার বড়ই ইচ্ছা জাগল ঠাকুরমশাই। ভাবলাম আপনার কাছে জেনে আসি, বুঝে আসি।
হরঠাকুরের চোখ মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। আমাকে বললেন, এসো।
তাকে অনুসরণ করে প্রবেশ করলাম লম্বা বারান্দার কোঠা বাড়ির শেষপ্রান্তে একটি কক্ষে।
                                 (ক্রমশ)
লেখাটি ধারাবাহিকভাবে কয়েকটি পর্বে প্রকাশিত হবে।









Recently published

অমূল্য

He ( Tagore) who sees all things in his own self and his own self in all things, he does not remain unrevealed.                     ...