রবিবার, ১৫ জুন, ২০২৫

জীবনে পরম লগন


জীবনে পরম লগন

সর্বপ্রথম এই অপরূপ রবীন্দ্রসঙ্গীতটি উদ্ধার করি,

জীবনে পরম লগন          করো না হেলা
               করো না হেলা, হে গরবিনি।
বৃথাই কাটিবে বেলা      সাঙ্গ হবে যে খেলা
  সুধা -র হাটে ফুরাবে বিকিকিনি, হে গরবিনি।।

মনের মানুষ লুকিয়ে আসে,  দাঁড়ায় পাশে, হায়
হেসে চলে যায়‌  জোয়ার জলে ভাসিয়ে ভেলা ----
দুর্লভ ধনে দুঃখের পণে   লও গো জিনি
                                    হে গরবিনি।।
ফাগুন যখন যাবে গো নিয়ে ফুলের ডালা,
কি দিয়ে তখন গাঁথবে তোমার বরণমালা,
                                        হে বিরহিনী।
বাজবে বাঁশী দূরের হাওয়ায়  কাটবে প্রহর ------
বাজবে বুকে বিদায় পথে চরণ ফেলা  দিন যামিনী।।

এটি গীতবিতানে প্রেম পর্যায়ের ১৯৮ সংখ্যক গান। গানটির রচনাকাল ১৯৩৮ সাল। ১৯৪৯ সালে এই গানটি শ্যামা নিত্যনাট্যে অন্তর্ভুক্ত হয়। 'শ্যামা' নৃত্যনাট্যের গান হিসাবে এর পরিচিতি যথেষ্ট বৃদ্ধি পেয়েছিল ; আর গানটির জনপ্রিয়তা তুঙ্গে উঠেছিল যখন ১৯৪৮ সালে দৃষ্টিদান ছবিতে গাইলেন সমকালের অন্যতম সুরঋদ্ধ কণ্ঠশিল্পী সুপ্রীতি ঘোষ।
আবার 'শ্যামা' নৃত্যনাট্যটি কবির 'পরিশোধ' কবিতার পরিবর্তিত রূপ। 'পরিশোধ' প্রকাশিত হয়েছিল ১৯০৮ সালে।
পুরসুন্দরী, নৃত্যগীতসটিয়সী, রাজসভাবিলাসিনী শ্যামাকে কিশোর প্রেমিক উত্তীয় ভালোবাসে। কিন্তু শ্যামার সখীরা জানত উত্তীয়র সে ভালোবাসা এক অসম প্রেম। তাদের গানেই সে কথার অভিব্যক্তি আছে, 


.সখীরা ---- ".....অলক্ষ্য-অলকাপুরী-নিবাসিনী,
               তাহার মূর্তি রচিলে বেদনায় হৃদয়মাঝারে।।"
উত্তীয় শ্যামার সভায় (ঘরে) বার বার আসে, বার বার ফিরে যায়,
সখীরা ----". .....ফিরে যাও, কেন ফিরে ফিরে যাও
                  বহিয়া বিফল বাসনা...।"
উত্তীয় সে কথা জানে। তবু
উত্তীয়-------"মায়াবন বিহারিণী হরিণী
                    গহন-স্বপন-সঞ্চারিণী,
          কেন তারে ধরিবারে করি পন   অকারণ ...."
সখীরা আশ্বস্থ করে,
            "হতাশ হয়ো না হয়ো না সখা ....."
উত্তীয় তার গানটির শেষের অন্তরাগুলি গাইতে থাকে,
            "... চমকিবে ফাগুনের পবনে,
                  পশিবে আকাশবাণী শ্রবণে,  
                   চিত্ত আকুল হবে অনুক্ষণ.....।।" 
সখীরা আবার তাকে আশ্বাস দেয়,
          .......হে প্রেমিক তাপস, নিঃশেষে  আত্মআহুতি
                    ফলিবে চরম ফলে "
এই এখানেই, সেই বহুকণ্ঠে গীত, বহুশ্রুত গানটি ; উত্তীয় প্রস্থান করবার পর এক সখী গাইছে,
                          "জীবনে পরম লগন 
             করো না হেলা, করো না হেলা,
                                            হে গরবিনী. ..."

                   দুই
প্রশ্ন উঠতে পারে সকাল বেলায় এই "জীবনে পরম লগন" গানটি নিয়ে পঞ্চায়েত ডেকে আলোচনায় বসা কেন ? কারণ আছে, এবং কারণেই বেশ গুরুতর কেননা গতকাল সন্ধ্যাবেলায় আমার এক অশিতিপর বন্ধু হঠাৎই জিজ্ঞাসা করলেন, এই গানটির যে আবেদন সেটি যদি বাস্তবে, কোন 'যৌবনমদমত্ত কোন তরুণ দেখতে পায় কোন সমগোত্রীয় তরুণী সাগরিকা ----- যে "সাগরজলে সিনান করি' সজল এলোচুলে" বসে রয়েছে সাগরতীরের উপলখণ্ডে, যার শিথিল বেশবাস, নিরাভরণ দেহ আর নিরাবরণ বক্ষের চূড়ায় চূড়ায় চুম্বনলেখা এঁকে দিয়েছে ঊষার স্বর্ণকিরণ সোহাগ ---- তাকে যদি নিবেদন করে, যদি বলে, "আজ পরম লগ্ন এসেছে আমাদের জীবনে, একে হেলায় হারিয়ে ফেলো না।" আমি আজ "পূজার ফুল তুলিতে চাহি তোমার ফুলবনে", তবে কি তা সমাজের  স্মৃতিশাস্ত্রের পণ্ডিতগণ মেনে নেবেন ? 

ঠিক এমনি করে তিনি বলেন নি, আমি সামান্য অলঙ্কারে ভূষিত করে শব্দগুলি সাজালাম আর কি। (যাঁর লেখা এই সকল কাব্য ও কাব্যগীতি তিনি তো চিরকালের 'কাঁচা কার্তিক')। কিন্তু আমাদের বয়েস হয়েছে তো !
স্মৃতিশাস্ত্রকার মহর্ষি মনু থেকে আমাদের রঘুনন্দন ভট্টাচার্য (খ্রীষ্টীয় ষোড়শ শতক) পর্যন্ত নিরাবরণ যৌবনচিত এমন আচরণ মেনে নিতে পারবেন না। তাই ঐ গানটির প্রথম পংক্তির যে 'অর্থ' তার রসে মজে গেলে শ্রোতার বা পাঠকের পদস্খলন হতেই পারে। আমাদের দেখতে হবে গানটির প্রায়োগিক পরিবেশের দিকটি বিচার করে। একটু আগে থেকেই আরম্ভ করি।
রবীন্দ্রনাথের 'কথা ও কাহিনী'  কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয় ১৯০৮ সালে। এই কাব্যের 'কথা' ভাগের একটি কবিতা 'পরিশোধ'। এটি 'মহাবস্ত্বাবদান' বৌদ্ধ জাতককথার একটি কাহিনী, যেটি কবির কল্পনার তুলিতে নবরূপ লাভ করেছে এই কবিতায়। আবার এই কবিতাটির বিষয়বস্তুকে অবলম্বন করে সুদীর্ঘ ৩১বছর পরই, ১৯৩৯ সালে জন্ম দিলেন 'শ্যামা' নৃত্যনাট্যের। তখন কবির বয়স ৭৮। আর এই গানটি রচিত হয়েছিল ১৯৩৮ সালে এবং বৎসরান্তেই সেটির শ্যামা নাটকে অন্তর্ভুক্তি।
এই নৃত্যনাট্যের যে নায়িকা, সে শ্যামা। নগরবধূ, বা রাজনর্তকী। রূপযৌবনসম্পন্না সুন্দরী। রাজানুগ্রহে সে ধনরত্নে, সম্ভ্রমে ও সম্মানে, বিলাস ব্যসনের ঐশ্বর্যে রাজরাণীর সমগোত্রীয়া। তার অপার সুখ, অসীম ভোগবিলাস। গৌতম বুদ্ধের সময়কালে, আগে ও পরে ভারতবর্ষের বিভিন্ন রাজার রাজধানীগুলিতে ও নগর নগরীতে যেমন এমনই সব পুরসুন্দরীদের অবস্থান ছিল। বৌদ্ধ জাতক কথায় আমরা এমন অনেক নগর নগরীর কথা ও  রূপপোজিবীনীদের কাহিনী পাই। তাঁদেরই কয়েকজন নবরূপে যেন পুনর্জন্ম লাভ করেছে রবীন্দ্রনাথের 'কথা ও কাহিনী' কাব্যগ্রন্থে এবং গীতিনাট্য ও নৃত্যনাট্যগুলিতে। 'অভিসার' (বোধিসত্তাবদান) কবিতার বাসবদত্তাও তেমনই একজন মথুরাপুরীর নগরবধূ,
"নগরের নটী চলে অভিসারে যৌবনমদে মত্তা--
           অঙ্গে আঁচল সুনীল বরণ
          রুনু রুনু রবে বাজে আভরণ
  সন্ন্যাসী গায়ে পড়িতে চরণ থামিল বাসবদত্তা।" 


আবার আম্রপালীর কথাও আসে। পরে তিনি পতিতপাবন বুদ্ধের চরণে নিজেকে সমর্পন করে ভিক্ষুণীব্রত অবলম্বন করেছিলেন। ভিক্ষুণীদের কথা যখন উঠলই তখন 'নগরলক্ষ্মী' (কল্পদ্রুমাবদান) কবিতার সুপ্রিয়া, 'পূজারিনী' (অবদানশতক) কবিতার শ্রীমতীও অবিস্মরণীয়া। তাঁরাও পুনর্জন্ম লাভ করেছেন রবীন্দ্রনাথের নবনির্মিতির ভাব ও নান্দনিক সৌন্দর্য  নিয়ে। 'বুদ্ধ জাতককথার' কথামালায় এমন অনেক কাহিনী ও চরিত্র আছে যেগুলিকে রবীন্দ্রনাথ নবনির্মান করেছেন এবং যাদের প্রভাব কবির অন্যান্য সৃষ্টিকেও, বিশেষ করে নাটকগুলিকে, প্রত্যক্ষে বা পরোক্ষে প্রভাবিত করেছে। 


এখন আসি আবারও ওই গানটির প্রসঙ্গেই। পুরনরমনমুগ্ধা, রাজানুগৃহীতা ছলাকলাময়ী শ্যামা সরলমতী প্রেমিক উত্তীয়ের নিঃস্বার্থ প্রেম নিয়ে খেলা করে। শ্যামার সখীরা তা জানে। তাই জনৈক সখীর কণ্ঠে এই গানটি এমনই নৃত্যনাট্যের বিষয়ানুযায়ী তাৎপর্য্যবাহী হয়ে উঠেছে। শ্যামা তখনও বজ্রসেনের দেখা পায়নি। তাই সেই সময়কালে শ্যামার আচরণ, উত্তীয়র প্রেমকে স্বীকার করার, মূল্য দেওয়ার যে অনীহা তার প্রতি ললিতকঠিন ভর্ৎসনা প্রকাশ পেয়েছে এই গানটিতে।
জীবনের মধুমাসে (মধুর যৌবনে) উপেক্ষিত প্রেম (উত্তীয়) যদি বিদায় নিয়ে আত্মনির্বাসনে যায়‌ তবে সেই বিগতযৌবন বিরহদিনে শূন্যবুকে বাজবে শুধু বিরহীর  বিদায়বেলার সুর, 

"বাজবে বাঁশী দূরের হাওয়ায় কাটবে প্রহর ---
বাজবে বুকে বিদায় পথে চরণ ফেলা  দিনযামিনী।।" 

এই প্রেম-প্রণয়-দ্বন্দ্ব-বিচ্ছেদ-সমন্বিত কাহিনীটিকে কবি একটি নৃত্যনাট্যের রূপ দিয়ে, তাতে যে অনাস্বাদিতপূর্ব কাব্যরসের সঞ্চার করেছেন তা সম্পূৰ্ণরূপে রাবীন্দ্রিক। 

"বিদায় পথে চরণ ফেলা" -- এমন সংগুপ্ত-অলঙ্কার-ভূষিত শব্দগুচ্ছ মহাকবির লেখনী হতেই নিঃসৃত হতে পারে।
তাই আমার আলোচনার (tube-এ) একটি বিষয় রবীন্দ্রসঙ্গীত বিশ্বসাহিত্যের শ্রেষ্ঠতম গীতিকবিতা।

('রবীন্দ্রসৃষ্টিতে বৌদ্ধ ধর্ম ও দর্শনের প্রভাব' --- এই বিষয়টি একটি স্বতন্ত্র প্রবন্ধে আলোচিত হবে)।

দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
৩১শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩২
ব্যাঙ্গালোর।
___________________________________________

                     

       
                                 

                                     

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Recently published

অমূল্য

He ( Tagore) who sees all things in his own self and his own self in all things, he does not remain unrevealed.                     ...