শনিবার, ২৮ মার্চ, ২০২৬

শান্তি--৩

শান্তি-৩
বেদ হতে বেদান্তদর্শন -- শত সহস্র বছরের সাধনায় আহৃত ও লব্ধ জ্ঞান --- তার মধ্যে কোথাও মানুষ (শুধু কি মানুষ ? সমস্ত ভূতজগৎ)-কে বাদ দিয়ে ব্রহ্ম বা পরমাত্মা বা 'মহান পুরুষ'-অস্তিত্ব স্বীকার করা হয় নি।  প্রকৃতিকে মায়া বলে বিচ্ছিন্ন করে পুরুষ এবং পুরুষকে অজ্ঞেয় বলে প্রকৃতিকে জগৎ সৃষ্টির কারণরূপে সিদ্ধ করা হয়নি। এমনকি আদি যে নাস্তিক্যবাদী বা নিরীশ্বরবাদী কপিলের সাংখ্যদর্শন, সেখানেও প্রকৃতি ও পুরুষের মহাসংগমের (এই ঘোর জটিল সৃষ্টিতত্ত্বের অবতারণা অন্যত্র করবার বাসনা রইল) স্বীকৃতি আছে যেখানে একদিকে যেমন দৃশ্যমান বিশ্বজগতের উপর, অন্যদিকে অদৃশ্য চৈতন্যজগতের উপর সমান মহিমা অর্পিত হয়েছে। অদৃশ্য যে চৈতন্য এই বিশাল বিপুল অনন্ত সৃষ্টির উৎস এবং সৃষ্টিকে ধারণ করে আছে তার কণিকারূপ মূর্ত মূর্তি মানুষ। মানুষই জ্ঞানের সাধনার পথ ধরে ব্রহ্ম হয়ে উঠতে পারে, বলতে পারে 'অহম্ ব্রহ্মাস্মি', বলতে পারে 'অয়ম আত্মা ব্রহ্ম', বলতে পারে 'প্রজ্ঞানম্ ব্রহ্ম' এবং 'তৎ তম্ অসি'।
"এই ত্রাণকারী আত্মজ্ঞান প্রাচীন ভারতীয় ঋষিদের পবিত্র ও সংযত হৃদয়ে প্রতিভাত হয়েছিল। তাঁরা মানবের প্রতি ভালোবাসা ও করুণাপরবশ হয়ে জ্ঞানের অধিকার, সম্ভাবনা ও শক্তির ঐতিহ্যের মতো, জ্ঞান-গঙ্গার নিরবচ্ছিন্ন প্রবাহের মতো -- বংশপরম্পরায় রক্ষা করার ব্যবস্থা করে গিয়েছেন।"
          ----- স্বামী রঙ্গনাথানন্দ মহারাজ।

উপনিষদের বাণীগুলি মানব প্রাণের শান্তির, শক্তির, নির্ভয়তার চিরন্তন প্রেরণা। নিয়ত মৃত্যুভয়, রোগ-শোক-জরা ও একাকিত্বের ভয় থেকে মুক্তি দিয়ে মানুষকে প্রকৃত সত্যের অন্বেষণে নিরত করে।" এই কারণেই ভারতীয় সনাতন (বৈদান্তিক) ধর্মকে চিরন্তন দর্শন বা Aldous Huxley-র ভাষায় 'দর্শনের অনন্ত প্রবাহ' বলা হয়। ঈশা উপনিষদের সুন্দর শান্তিপাঠেই আমরা আশ্বাস পাই যে, মানবের অনুসন্ধান ব্যর্থ যাবে না ; ঋষিগণ শুদ্ধ দৃষ্টিতে যা উপলব্ধি করেছিলেন, আমাদের দৃষ্টি শুদ্ধ হলে আমরাও তা (পরম অবিনাশী সত্যকে) উপলব্ধি করতে পারব।"
                                     --- তদেব।
কি সেই সত্য, যা মানবজগৎ যুগ যুগান্তর ধরে অনুসন্ধান করে চলেছে ? মিথ্যা মায়ার ছায়া ঘুচিয়ে একটি 'সত্যের আশ্রয়' যা তাকে ভয় থেকে --- বিনাশের ভয় থেকে মুক্ত করে 'চিরন্তন জীবনের' (বংশপরম্পরায় বহমান প্রাণকে না হারানোর) ভরসার আশীর্বাদ বহন করে আনবে। এমন এক সত্যের উপলব্ধি এসেছে, বৈদান্তিক জ্ঞানের ভিতর দিয়ে। কঠোপনিষদের একটি মহামন্ত্রেই আমরা সেই সত্যের আলোকিত জগতে পোঁছাতে পারি, --

"নিত্যোহনিত্যানাং চেতনশ্চেতনানাম্
একো বহুনাং যো বিদধাতি কামান।
তমাত্মস্থং যেহনুপশ্যন্তি ধীরাঃ
তেষাং শান্তিঃ শাশ্বতী নেতরেষাম্।।"

এই মন্ত্রটি বার বার, একাগ্রতাসহকারে পাঠ করলে এক প্রদীপ্ত সত্যের আলোকে, শান্তির সান্ত্বনায় আমাদের অন্তর প্রসন্নতায়, জ্যোৎস্নাময়ী শারদাকাশের মত, অপরিম্লান পূর্ণতায় উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে। মন্ত্রটি বলছেন,
সকল অনিত্য বস্তুর মধ্যে 'তিনি'ই নিত্য। সচেতন প্রাণের তিনি চৈতন্যস্বরূপ। তিনি 'এক', তবু বহু সকাম জীবের মধ্যে বাস করেন, জীবের কামনার ও কর্মের ফল প্রদান করেন। যেসব 'ধীঃ'যুক্ত জীব (প্রজ্ঞাবান মানুষ) নিজ আত্মায় তাঁর অস্তিত্ব উপলব্ধি করেন, তাঁরাই শাশ্বত শান্তি লাভ করেন -- আর কেউ নয়।
লক্ষ্যণীয় এখানে 'নিজ আত্মায়', সেই 'নিত্য' এবং 'চৈতন্যস্বরূপ' --- এই মহাসৃষ্টির চৈতন্যসত্ত্বাকে অনুভব করতে পারলেই শাশ্বত শান্তির, ভ্রান্তিহীন সত্যের আশ্রয় লাভ করা সম্ভব হবে। তখন মৃত্যুর মধ্যে মৃত্যুহীনকে, বিকৃতির মধ্যে অবিকারীকে, বহুর মধ্যে 'এক'কে আত্মস্থ করতে পারলেই ভয় থাকবে না। 'বহুর মধ্যে এক',  একই চৈতন্যের প্রকাশ ওই দূরাতিদূর আলোকপথের সীমান্তহারা প্রান্তসীমায়  জ্যোতিষ্ক-মণ্ডলের একটি নক্ষত্রের মধ্যে দিয়ে যেমন প্রতিভাসিত, ব্রহ্মাণ্ডের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ধূলিকণাসদৃশ এই পৃথিবীর প্রাণকণিকা--- আমার মধ্যেও তাইই প্রকাশিত-- এই বোধ অর্জিত হয় যে সাধনার দ্বারা তা প্রেম, বিশ্বজয়ী প্রেম যা শুধু জীবের, বিশেষ করে  পূর্ণচৈতন্যের অধিকারী মানুষের অন্তরে বিরাজ করে। এই প্রেমে দৃষ্টি দিয়ে সে যখন জগৎসংসারকে দেখে তখন কোথাও তার শত্রু নেই, নেই তার বিনাশের ভয়।
"চেতনার অনন্ত বিস্তারের ফলেই এরূপ ভয়হীনতা আসে। যখন সৎরূপের (সৃষ্টির উৎস পরম সত্ত্বা) সঙ্গে আমাদের একত্ববোধ হবে, একমাত্র তখনই মৃত্যুর অস্তিত্ব বিলুপ্ত হবে। যখন জ্ঞানস্বরূপের (প্রজ্ঞা-ব্রহ্মের) সঙ্গে আমাদের একত্ববোধ হবে, একমাত্র তখনই অজ্ঞানের অস্তিত্ব লোপ পাবে। যখন আনন্দস্বরূপের ("আনন্দাদ্ধ্যেব খল্বিমানি ভূতানি জায়ন্তে..") সঙ্গে আমাদের একত্ববোধ হবে, তখনই দুঃখের অস্তিত্ব লোপ পাবে। বেদান্ত মতে মানবাত্মা অনন্ত অস্তিত্বস্বরূপ, অনন্ত জ্ঞানস্বরূপ এবং অনন্ত আনন্দস্বরূপ।"
                    ---- স্বামী রঙ্গনাথানন্দ মহারাজ।

মানবাত্মার সঙ্গে পরমাত্মার, অর্থাৎ মহাসৃষ্টির আকারবিশিষ্ট ভৌতিক অস্তিত্বের বিপরীত রূপহীন বিমূর্ত চৈতন্যময় সত্ত্বার একাত্মতা অনুভব করবার যে জ্ঞানমার্গীয় ধর্মধারণা তাই সমস্ত ধর্মমতের, (একেশ্বরবাদী আব্রাহামিক, বহুদেবতাবাদী  প্যাগানিজম ও বেদবাদী আর্যধর্মাবলম্বীদের) মূল আদর্শ। তবুও এই মূল ধর্মাদর্শ থেকে, শুধুমাত্র ধর্মীয় স্মৃতিশাস্ত্রের ভিন্নতার জন্য পরস্পর পরস্পরের বিরুদ্ধে রক্তক্ষয়ী আত্মহননে লিপ্ত হয়, কেন 'বিশ্বনিয়ন্তার' শুভ ও মঙ্গলময় ইচ্ছার বিরুদ্ধাচরণ করে' পরোক্ষে বিশ্বধংসের তান্ডবে, আপন আত্মার ঐশ্বর্য বিস্মৃত হয়ে, মানুষ তার পশুপ্রবৃত্তিগুলিকেই জাগিয়ে প্রথিবীটাকে নরকে পরিণত করেই চলেছে বার বার ? এর কারণ অসংখ্য ; কিন্তু মূল কারণ ঐ 'পশুপ্রবৃত্তি' ! সম্রাটের সাম্রাজ্য বিস্তারের উদগ্র আকাঙ্ক্ষা থেকে 'বাবু কর্তৃক উপেনের দুইবিঘা জমি দখল' ; গ্রাম্য পরিবারের ক্ষুদ্র সম্পত্তির লালসাসম্ভূত ভ্রাতৃহনন থেকে বিশ্বযুদ্ধের গণহত্যা এবং  নিত্যদিনের যত খুন, লুণ্ঠন, শোষণ, পেষণ, বলাৎকার, ধর্ষণ --- সবই ওই পশুপ্রবৃত্তিসঞ্জাত। আরও ভয়ঙ্কর ও পৈশাচিক হয়ে ওঠে যখন এই নরকসৃষ্টির প্রয়াসগুলিকে ধর্মীয় সংস্কারের 'কর্তব্য'রূপে গণ্য করা হয়। বর্ণাশ্রমী 'ব্রাহ্মণদের' অমানবিক কুসংস্কার স্বীকার করে রামচন্দ্রের শম্বুক (শূদ্র তপস্বী) হত্যার মতই বর্তমানের দলিতনিধন -- একই রকমের 'ধর্মে'র বিকৃত ব্যভিচার। শ্রীমদ্ভগবদগীতায় ধর্মাবতারের মূর্ত প্রতীক শ্রীকৃষ্ণ নিজেই অর্জুনকে যুদ্ধে প্রবৃত্ত করেছিলেন এই বলে যে যুদ্ধ ক্ষত্রিয়ের 'ধর্ম'-- এষঃ ধর্মঃ সনাতন। আবার মহাভারতের স্ত্রীপর্বে, শান্তিপর্বে কুরুক্ষেত্রের মহাশ্মশানে স্বামী-সন্তান-হারা নারীদের হাহাকারের মাঝে তিনি ছিলেন কখনো নীরব, কখনো'বা নিরুত্তর। বিশ্বজনীন মানব সভ্যতায়, সামাজিক উপপ্লব, সে যত বড় বা ছোটই হোক্ -- তা সে রাবণের সীতা অপহরণ, দ্রৌপদীর লাঞ্ছনা বা ট্রয়ের যুবরাজ প্যারিস কর্তৃক স্পার্টার রাণী হেলেনকে অপহরণ থেকে আরম্ভ করে মানব সভ্যতার মহাকাব্যের ইতিহাস জুড়ে এমন লক্ষকোটি অপরাধের কলঙ্কিত অধ্যায় পার হয়ে আজ যখন কোন নিভৃত গৃহাভ্যন্তরে, কোন সেবা-শুশ্রূষাদায়িনী, প্রাণধাত্রী অবলা অসহায় নারী ধর্ষণ ও নৃশংস নিধনের শিকার হন তখন মানুষ নামক জাতিটির পশুপ্রবৃত্তির উপর আর কোন সন্দেহ থাকে না। বন্য সর্পশ্বাপদদের যা প্রাকৃতিক ও স্বভাবজ প্রবৃত্তি, মানুষের মধ্যে তার প্রকাশ যদি ঘটে, এই ধরিত্রীর মানবসমাজে কোনদিনও, কোথাও ধ্বনিত হবে না শান্তির 'মহাওঙ্কারধ্বনি'।

কিন্তু চেতনাহীন পাশবিকতার পাশাপাশি চৈতন্যময় মহামানবতার ---  নৃশংসতার বিরুদ্ধে প্রেমের, হিংস্রতার পরিবর্তে অহিংসার, নিপীড়নের বিপরীতে সেবার সাধনা কি হয়নি, হয়না ? হয়, হয়ে আসছে এবং হবেও। মনুষত্বের সাধনায় আত্মোৎসর্গীকৃত মহামানবগণ ---সুদূর প্রাচীনকাল থেকে, পৃথিবীর কোণায় কোণায় ছড়িয়ে-থাকা বিভিন্ন, বৈচিত্র্যময় জাতির মধ্যে জন্ম গ্রহণ করেছেন। শুধু ভারতবর্ষের মানবতীর্থেই যে যুগে যুগে অসংখ্য ঋষি, মুনি, মণীষী, মহাকবিগণ ---  বাল্মীকি, ব্যাসদেব, বুদ্ধ, জৈনমুনি, মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্য, শ্রীরামকৃষ্ণ প্রভৃতি দেবতা নয় --- মানব চেতনার বিগ্রহদের আবির্ভাব ঘটেছিল এমনও নয় --- গ্রীস থেকে চীন, রোম থেকে শ্যামদেশ ---- জরাথুষ্ট্র, মুশা, ইশা, মুহম্মদ, কনফুসিয়াস -- তাঁরাও এই ধরিত্রীর বুকেই বিচরণ করে গিয়েছেন ; "তাঁরা বলে গেল ক্ষমা কর সবে, বলে গেল ভালবাসো, / অন্তর হতে বিদ্বেষবিষ নাশো" ; কিন্তু তাঁদের বাণীর দোহাই দিয়েই বিদ্বেষের নরমেধযজ্ঞের অগ্নিশিখা লক্ লক্ জ্বলে উঠেছে দেশে দেশে, কালে বিরামহীন নিরবচ্ছিন্নতায়।
"তোমার বাণীর আড়াল টানি তোমায় ঢাকি ..."।
পরিশেষে এ-কথাই বলার যে যতদিন না মানুষ -- ক্ষমতাবান এবং ক্ষমতালোভী মানুষ -- তার দুঃখের সাধনার মধ্য দিয়ে আত্মোপলব্ধির ঐশ্বর্যে আপনার অন্তরের ঈশ্বরকে লাভ করবে ততদিন আত্মা-আত্মীয়-আত্মহননের নরকবাস থেকে তার মুক্তি নেই, ততদিন শান্তির ঠাঁই থাকুক শ্মশানে আর  শান্তির মন্ত্র ধ্বনিত হোক্ মানবতার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার শ্রাদ্ধবাসরে।
"বায়ুরনিলমমৃতম্ অথেদং ভস্মান্তং শরীরম্।
ওঁ ক্রতো স্মর কৃতং স্মর ক্রতো স্মর কৃতং স্মর।" 
                                (ঈশা উপনিষদ, মন্ত্র ১৭)
অন্তিম মুহূর্ত, আমার জীবনের শক্তিতরঙ্গ (ধীরে ধীরে) অমৃত সাগরে বিলীন হতে চলেছে (ঐ বিশ্বপ্রাণের সঙ্গে আমার প্রাণবায়ু মিলিত হবে!) !
ওঁ! এখনিই এই নশ্বর দেহ ভস্মে পরিণত হবে !
ওঁ ! তাই হোক্, এই শরীর ভস্মীভূতই হয়ে যাক্ তবে !
"অথ ইদং শরীরং ভস্মান্তং ভূয়াৎ। ওঁ শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তিঃ।।
হে আমার চিত্ত, (আসন্ন মৃত্যুর এই মহালগ্নে) স্মরণ কর ; তোমার সৎকর্মগুলি স্মরণ কর ; তোমার অসৎ কর্মগুলিও স্মরণ কর ! 

"ধর্ম, ঈশ্বর বা পরকালের ধারণা কোথা থেকে এল ? মানুষ ঈশ্বর ঈশ্বর করে বেড়ায় কেন ?
.................................................................
............. ......... ......................... ............. এখানে সেখানে, মন্দিরে গির্জায়, স্বর্গে মর্তে, নানা স্থানে এবং নানা উপায়ে অন্বেষণ করবার পর অবশেষে আমরা যেখান থেকে আরম্ভ করেছিলাম অর্থাৎ আমাদের আত্মাতেই বৃত্তপথে ঘুরে আসি এবং দেখতে পাই--- যার জন্য সমগ্র জগতে অন্বেষণ করেছিলাম, যার জন্য আমরা মন্দির, গির্জা প্রভৃতিতে কাতর হয়ে প্রার্থনা এবং অশ্রুবিসর্জন করেছিলাম, যাঁকে আমরা সুদূর আকাশে মেঘরাশি দিয়ে ঢাকা --- অব্যক্ত রহস্যময় বলে মনে করেছিলাম, তিনি আমাদের নিকট থেকেও নিকটতর, প্রাণের প্রাণ; তিনিই আমার দেহ, তিনিই আমার আত্মা। তুমিই আমি--- আমিই তুমি। এই তোমার স্বরূপ --- একে প্রকাশ কর। তোমাকে পবিত্র হতে হবে না ---- তুমি পবিত্রস্বরূপই আছ। তোমাকে পূর্ণ হতে হবে না, তুমি পূর্ণস্বরূপই আছ। প্রকৃতিই পর্দার ন্যায় আড়ালে সত্যকে ঢেকে রেখেছে। তুমি যে কোন সৎ-চিন্তা, সৎ-কার্য কর, তা জেনো, শুধু সেই তমসার আবরণকে ধীরে ধীরে ছিন্ন করছে, আর সেই প্রকৃতির আড়ালে শুদ্ধস্বরূপ অনন্ত ঈশ্বর প্রকাশিত হচ্ছেন।"

অনাদিকালের ঈশ্বর-অন্বেষণের যে সাধনা তার মূল, লক্ষ্য ও পথ, ঋদ্ধি ও সিদ্ধি এবং অন্তিম অনুভব এই কথাগুলির মধ্যে দিয়ে প্রকাশিত হয়েছে ; প্রকাশ করেছেন স্বামী বিবেকানন্দ যিনি সর্বধর্মের মূলিভূত একত্বের, মানবতাবাদের জীবন্ত বিগ্রহ শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংস দেবের ভাববসন্তান -- ঠিক তেমনি যেমন ছিলেন ব্যাসদেবের পুত্র শুকদেব। আত্মজিজ্ঞাসা, আত্মজ্ঞান, আত্মোপলব্ধি এবং সকলের ভিতর আত্মদর্শন --- এই সাধনার ধর্মক্ষেত্রেই জ্যোতির্ময় মূর্তি ধারণ করে দন্ডায়মান আছেন মানুষের ঈশ্বর --আত্মবিস্মৃত আত্মহননের কুরুক্ষেত্রে নয়।

 
            " .... ‌নক্ষত্রের অক্ষৌহিণী হতে
অরণ্যের পতঙ্গ অবধি, মিলাইছে এক স্রোতে
সঙ্গীতের‌ তরঙ্গিণী বৈকুণ্ঠের শান্তিসিন্ধুপারে।"
‌‌                    'ভাষা ও ছন্দ', -- রবীন্দ্রনাথ।

বিশ্বের সকল দেশে, সকল সমাজে, সকল ঘরে, প্রতিটি মানুষের অন্তরে 'শান্তি' বিরাজ করুক।

                           (সমাপ্ত)

শ্রী দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
২৫/০৩/২০২৬
কলকাতা।
____________________________________




বুধবার, ২৫ মার্চ, ২০২৬

শান্তি-২

শান্তি -২

"উদ্ভ্রান্ত সেই আদিম যুগে
স্রষ্টা যখন নিজের প্রতি অসন্তোষে
নূতন সৃষ্টিকে বার বার করছিলেন বিধ্বস্ত..."

ঋগ্বেদের রচনাকাল স্মরণে রাখলে স্বীকার করে নিতেই হবে যে সেই সুদূর অতীতের বাধাবন্ধনহীন প্রকৃতির দৌরাত্ম্যের দিনরাত্রিগুলিতে মানুষের বাঁচার উপায় কি ছিল ঘন ঘন রুষ্ট হওয়া জল, স্থল, আকাশকে তুষ্ট করা ছাড়া ? নিরন্ধ্র অন্ধকারে আচ্ছন্ন, হিংস্র শ্বাপদসঙ্কুল অরণ্যানী, সেখানে কখনো প্রলয়ঙ্করী ঝঞ্ঝা, কখনো সর্বদাহী সর্বগ্রাসী দাবানল ! উর্ধাকাশে ঘোর ঘনঘটা, বিরামবিহীন ধারাবর্ষণ, মহাপ্লাবন, অগ্নুৎপাত, ভূকম্পন, তুষারপাত ! জীবনে, জগতে মৃত্যুভীষণা নিশীথিনীর অন্ধকারে একমাত্র আশা রাত্রিশেষের ঊষা আর 'প্রথম দিনের সূর্য'। এবার ঋগ্বেদের উপাস্যদের নাম নিলেই এই সত্য উদ্ভাসিত হয়ে উঠবে যে আধিদৈবিক 'শক্তি' সমূহ তখন দেবতা হয়ে উঠেছিলেন। অগ্নি, বরুণ, বিষ্ণু, রুদ্র, সাবিত্রী (সূর্য), বায়ু, ঊষা, পৃথিবী, সরস্বতী (বাগ্দেবী), অশ্বিনীকুমারদ্বয় (চিকিৎসার দেবতা)। ঋগ্বেদের মন্ত্র রচয়িতাগণ (মন্ত্রদ্রষ্টা ঋষি) জগতকে ত্রিস্থানিক বিভাজন করে সেই সেই স্থানের অধিকারী দেবতাদের উপাসনা করবার জন্য ঋকগুলি উচ্চারণ করতেন। 'ভূলোক' অর্থাৎ পৃথিবী স্থানের অধিকারী দেবতা অগ্নি, ধরিত্রী, সোম। ভূবর্লোক বা অন্তরীক্ষ (আকাশ ও পৃথিবীর মধ্যস্থিত স্থান) এবং স্বলোক বা দ্যুলোকের অধিকারী দেবতা বিষ্ণু, রুদ্র মিত্র প্রভৃতি। এইভাবে ঋগ্বেদে মোট ৩৩ প্রকারের দেবতার উল্লেখ আছে।
এই সমস্ত দেবতাদের উদ্দেশে প্রার্থনা, বিভিন্ন প্রকার যজ্ঞের আয়োজন ও অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তাঁদের আবাহন, ঘৃতাহুতি সহ সুভক্ষ্য পশু ও সুরা (সোমরস) উৎসর্গ করা হোত নিত্য নিয়মিত যজ্ঞানুষ্ঠানে। যজ্ঞের প্রকারভেদ ছিল। অগ্নিহোত্র (প্রতিদিনের যজ্ঞানুষ্ঠান) থেকে রাজা মহারাজাদের, স্বরাট-সম্রাটদের রাজসূয়, অশ্বমেধ প্রভৃতি বৎসরব্যাপী --এমনকি দ্বাদশ বৎসরব্যাপী যজ্ঞের আয়োজনও করা হোত। উদ্দেশ্য  পূর্বোক্ত দেবতাদের সন্তুষ্ট করে পার্থিব চতুবর্গ (ধর্ম, অর্থ, কাম, মোক্ষ) লাভ করা। যজুর্বেদসংহিতাসহ ব্রাহ্মণসংহিতা, স্মৃতিশাস্ত্র প্রভৃতি শত শত গ্রন্থরাজী রচিত হয়েছে এ-সকল হোম, যজ্ঞ, যাগ, হবন ইত্যাদি বহুবিধ নামের বৈদিক ধর্মাচরণের ক্রিয়া ও অনুষ্ঠানের উপর। ভারতবর্ষের ব্রাহ্মণ্যবাদী ধর্মীয় সংস্কারে এই প্রকার ক্রিয়াচার হাজার হাজার বছর ধরে চলে এসেছে এবং এখনও সে সব ক্রিয়াকল্প অব্যাহতও আছে। আর বৈদিককালের সেই তেত্রিশজন দেবতা এখন বংশবিস্তার করে তেত্রিশ কোটিতে কোথাও রূপান্তরিত, কোথাও বিবর্তিত হয়ে বিরাজ করছেন। বৈদিক দেবতা ও দেবীগণ (ইন্দ্র, বরুণ, কিংবা ঊষা সরস্বতী), যাঁদের অস্তিত্ব বিমূর্ত ছিল এখন তাঁরাও মূর্তিমন্ত হয়ে আমাদের কাছে পূজা চাইছেন বা পূজিত হচ্ছেন। "মানুষই দেবতা গড়ে / তাহার কৃপার 'পরে / করে দেব মহিমা বিস্তার।"

আলোচনাটিকে বর্তমান যুগের সীমানা পর্যন্ত আনা হোল এইটিই প্রমাণ করবার জন্য যে আমাদের ভারতীয় 'সনাতন' ধর্মধারণা একেশ্বরবাদী নয়। কিন্তু তবুও এই কথাটি বিচার্য যে মূল ভারতীয় ধর্মধারণায় বলা হয়েছে সমস্ত দেবতা এক পরমেশ্বরের ভিন্ন ভিন্ন রূপ বা জগৎচরাচরের স্রষ্টা ও নিয়ন্তা এক পরমশক্তি। ঋগ্বেদের প্রথম রচনায় যে বহুদেবতার উপাসনা হোত,  তা কালের গতি ও জ্ঞানের প্রগতির সঙ্গে সঙ্গে 'এক ব্রহ্ম, দ্বিতীয় নাস্তি'-তে পর্যবসিত হয়ে এসেছিল। (স্মরণীয়, আমরা আগেই বলেছি যে ঋগ্বেদ প্রকটিত হয়েছিলেন প্রায় দুই হাজার বছর ধরে, প্রথম মণ্ডল এবং দশম মণ্ডলের মধ্যে ব্যবধান দু'হাজার বছর)। 

আমাদের রবীন্দ্রনাথ বেদ-উপনিষদ, কালিদাস রচিত অভিজ্ঞান শকুন্তলম্, রঘুবংশ প্রভৃতি ও অপরাপর সংস্কৃত সাহিত্য এবং রামায়ণ-মহাভারতের বিস্তর ও বিক্ষিপ্ত অংশ অনুবাদ করে গিয়েছেন। সে-সকল অনুবাদ রঙে, রূপে, রসে কোথাও কোথাও মূল রচনাকেও ছাড়িয়ে তাঁর নিজস্ব ভাবের ঋদ্ধতায় মহিমান্বিত হয়ে উঠেছে। তাদের মধ্যে ঋগ্বেদের দশম মণ্ডলের ১২১ সূক্তের দশটি ঋকের মধ্যে ছ'টির অনুবাদও আছে। সেই ঋক্-ষটক্-এর একটি উদ্ধার করেছি ওই 'এক ব্রহ্ম' চিন্তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণতার মীমাংসা করার জন্যইঃ

"যা আত্মজা বলদা যস্য বিশ্ব উপাসতে প্রশিষং যস্য দেবাঃ।
যস্য ছায়ামৃতং যস্য মৃত্যুঃ কস্মৈ দেবায় হবিষা বিধেম।।"
রবীন্দ্রনাথ এই মহামন্ত্রের দুটি অনুবাদ করেছেন। প্রথমটি---
"আত্মদা বলদা যিনি ; সর্ব বিশ্ব, সকল দেবতা
বহিছে শাসন যাঁর ; মৃত্যু ও অমৃত যাঁর ছায়া ;
           আর কোন দেবতারে দিব মোরা হবি ?"
(১৮৯৪সালের ফাল্গুনে তত্ত্ববোধিনী পত্রিকায় প্রকাশিত)।

দ্বিতীয়টি আরো পনের বছর পর ---
"আপনারে দেন যিনি,
     সদা যিনি দিয়েছেন বল,
বিশ্ব যাঁর পূজা করে,
   পূজে যাঁরে দেবতা সকল,
অমৃত যাঁহার ছায়া,
    যাঁর ছায়া মহান্ মরণ,
সেই কোন্ দেবতারে
    হবি মোরা করি সমর্পণ !"
          (১৯০৯ সালের ২২শে অগ্রহায়ণ)।

অনুদিত ছয়টি মন্ত্রেই এই প্রশ্ন যে দেবতাদের দেবতা, বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের স্রষ্টা, নিয়ন্ত্রক ও সমস্ত ভূতজগতের 'আত্মা' ও বল-প্রদায়ক এক অবিভাজ্য মহাশক্তি ছাড়া আর কোন্ দ্বিতীয় সত্ত্বা আছে যাকে 'হবি' উৎসর্গ করা যায় ? এই 'আত্মদা' শব্দার্থের যুগে যুগে, অসংখ্য পণ্ডিত, গবেষক বিভিন্ন ধরণের তাৎপর্য ব্যাখ্যা করেছেন। কিন্তু আমাদের ঋষিকবি যখন বলেন 'আপনারে দেন যিনি' তখন যেন শব্দটির প্রকৃত অর্থ আমাদের বোধগম্য হয়ে ওঠে।  যিনি 'আত্ম',-- সহজার্থে অহং বা আপন সত্ত্বা, বা আপন চৈতন্যসত্ত্বা জগৎসংসারের সবার মধ্যে বিতরণ করেন।
আরো একটি মন্ত্রে আদিপ্রজ্ঞা ঋগ্বেদ বলছেন,
"যং ক্রন্দসী অবসা তস্তভানে অভ্যৈক্ষেতাং মনসা রেজমানে।
যত্রাধি সূর উদিতো বিভাতি কস্মৈ দেবায় হবিষা বিধেম।।"
"মহাশক্তি-প্রতিষ্ঠিত দীপ্যমান দ্যুলোক ভূলোক
যাঁরে করে নিরীক্ষণ ; সূর্য যাঁহে লভিছে প্রকাশ ;
                আর কোন্ দেবতারে দিব মোরা হবি ?"

এখানেই নির্ধারিত হয়ে গেছে আমাদের প্রাচীন ভারতীয় ধর্মধারণার প্রকৃত রূপ। এক অনন্ত অসীম অনির্বচনীয় সত্ত্বা, আমাদের অজ্ঞাত, বোধাতীত মহাশক্তিকে আমরা জানবার চেষ্টা করে গিয়েছি যুগ যুগান্তর, অনাদি অতীত থেকে বর্তমান--- বিগত, আগত, অনাগত কালের তিনিই ভারতীয় ধর্মচিন্তার আধার ও আধেয়।  এই ধর্মবোধ কোন প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের অনুসরণ বা অনুশীলন নয়। এটিকেই শাশ্বতকালের, সনাতন ধর্ম‌-অন্বেষুদের সাধনার লক্ষ্য ও পথ। (এখানে 'সনাতন' শব্দটি বর্তমানের উগ্র সাম্প্রদায়িক হিন্দুত্ববাদীরা যে অর্থে ব্যবহার করেন তা সম্পূর্ণ ভিন্ন --  বিকৃত, সংকীর্ণ, স্বার্থপরতাসর্বস্ব)। ভারতবর্ষের বেদ ও উপনিষদের কোনখানে 'ঈশ্বর' (পাশ্চাত্যের God অর্থে) শব্দটি নেই ; প্রাচীন শাস্ত্রগ্রন্থ- সমুদ্রের কচিৎ কোথাও তার দেখা গেলেও তা ব্যবহৃত হয়েছে ঐশ্বর্যবান অর্থে। 'ঈশ্বর' (ভগবান) এসেছেন শঙ্করাচার্যের বৈদিক ও উপনিষদীয় ভাষ্য থেকে। কিন্তু এখানেও 'ঈশ্বর' কোন সম্প্রদায়গত আরাধ্য দেবতা নন। তিনি 'একমেবাদ্বিতীয়ম্' পরমাত্মা, পরম চৈতন্য যাঁর দ্বারা এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সৃষ্টি স্থিতি এবং বিলয় সম্ভাবিত হয়। ভারতবর্ষের ধর্মদর্শনের শঙ্করাচার্যই ব্যাসদেব, তৎপুত্র শুকদেবের উত্তরসূরী, শ্রেষ্ঠ ধর্ম- ব্যখ্যাতা।

(ভগবান শঙ্করাচার্য (৭৮৮-- ৮২০ খ্রিঃ) পরম বেদজ্ঞ, ও দার্শনিক। তিনি প্রধান দশ'টি উপন্যাসের ভাষ্য রচনা করেছেন। ঈশা, কেন, কঠ, প্রশ্ন, মুণ্ডক, মাণ্ডুক্য, তৈত্তিরীয়, ঐতরেয়, ছান্দ্যোগ্য এবং বৃহদারণ্যক)।
ঈশা উপনিষদের প্রথম মন্ত্রের বলা হয়েছে,
"ঈশাবাস্যমিদং সর্বং যৎ কিঞ্চ জগতাং জগৎ।"
তিনি এই অদ্বৈতবেদান্তের প্রবক্তা, অদ্বৈতবাদ এবং ভক্তিবাদের প্রতিষ্ঠাতা। বেদান্ত সৃষ্টিতত্ত্বের অনুসন্ধানে নিরন্তর সাধনা কর-চলা পথের নির্দেশ দেন। কখনও এই মহাসৃষ্টির স্রষ্টাকে পুরুষরূপে স্বীকার করেছেন ---

শৃন্বন্তু বিশ্বে অমৃতস্য পুত্রাঃ।
আ যে দিব্যানি ধামানি তস্থুঃ
বেদাহমেতং পুরুষং মহান্তং
আদিত্যবর্ণ তমসঃ প্ররস্তাত।।
                     ----- শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ।

হে বিশ্বের অমৃতের পুত্রগণ, শোন, তোমরা তাঁর সন্তান (এই 'পুত্র' উচ্চারণে নর বা নারী আলাদা করা হয় নি) যিনি দিব্যধামে, সমস্ত 'তমসা' -- অন্ধকারের পারে, বাস করেন, যিনি আদিত্য বর্ণের (সূর্যসন্নিভ), যিনি 'পরম এবং এক' -- পরাহমেকং।
এই মন্ত্রের ভিন্ন ব্যাখ্যাও আছে। হে দিব্যধামবাসী অমৃতের পুত্রগণ, তোমরা শোন, মহাতমশার পরপারে আদিত্যের মত জ্যোতির্ময় মহান যে পুরুষ (স্রষ্টা) তাঁকে আমি জেনেছি -- বেদাহমেতং।
'তমসা' এখানে 'জ্ঞানান্ধকার' ; 'আদিত্যবর্ণ' এখানে 'জ্যোতিস্যাং জ্যোতিঃ' আলোর আলো- বা প্রজ্ঞা। উপনিষদ বলছেন 'প্রজ্ঞানম্ ব্রহ্ম'।

এই যদি প্রাচীন ভারতীয় ধর্মধারণা হয় তবে তার মধ্যে তো বিভেদের, বাদ বিসম্বাদের, জাতি বা বর্ণবৈষম্যের কোন কলঙ্ক, কোন অমানবিক নৃশংসতার অবকাশ নেই। প্রজ্ঞার আলোকিত পথে যদি এই বিশ্বচরাচরের স্রষ্টা 'আলোর আলো'-র সঙ্গে আমাদের চেতনার আলো একাত্মতা অনুভব করতে পারে তবে আলাদা করে 'ভগবান বা ঈশ্বরের' শরণাপন্ন হবার প্রয়োজন কোথায় ? উপনিষদ কোন ঈশ্বর নয়, সৃষ্টিতত্ত্ব নিয়ে যে গভীর আলোচনা করেছেন তা মানবকেও স্রষ্টার সঙ্গে একাত্ম করে দিয়েছে।
ঈশা উপনিষদ এবং অন্যান্য যজুর্বেদীয় উপনিষদের শান্তিপাঠ আরম্ভ হয়েছে এমন এক মন্ত্র দিয়ে যা মানবপ্রাণের বিশ্বৈকানুভবের চূড়ান্ত প্রকাশ। এই ব্রহ্মাণ্ডের শান্তিময় স্বরূপ কি ?
"ওঁ পূর্ণমদঃ পূর্ণমিদং পূর্ণাৎ পূর্ণমুদচ্যতে।
পূর্ণস্য পূর্ণমাদায় পূর্ণমেবাবশিষ্যতে।।
ওঁ শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তিঃ... " 
যা এখানে নেই, অর্থাৎ দৃশ্য নয় (অদৃশ্য মহান সত্ত্বা) তিনি পূর্ণ, যা এখানে দৃশ্যমান তাও পূর্ণ, পূর্ণ থেকে (অদৃশ্য মহাসত্ত্বা) থেকে পূর্ণ এই দৃশ্য জগৎ সৃষ্ট হয়েছে,  পূর্ণ জগৎব্যপ্ত মহাসত্ত্বা (যিনি ব্রহ্ম) অপরিবর্তিত (অক্ষর) থাকেন। ওই পূর্ণ থেকে এই পূর্ণ অদৃশ্য বা বিনষ্ট হলেও পূ্র্ণ অক্ষয় থাকে।
"হে পূর্ণ, তব চরণের কাছে
যাহা কিছু সব আছে আছে আছে।
নাই নাই ভয়, সে শুধু আমারই
নিশিদিন কাঁদি তাই।।"

ঈশ্বরে বিশ্বাসী মানুষ 'আস্তিক' এবং ঈশ্বরে অবিশ্বাসী মানুষ 'নাস্তিক' -- দুই জনই কিন্তু স্বীকার করেছেন ঈশ্বরের অস্তিত্বে, প্রতক্ষে বা পরোক্ষে। যিনি বলছেন 'God is not Great', যিনি বলছেন 'God is Dead' -- তাঁরা কি বলছেন না 'ঈশ্বরের মহান হওয়া' উচিত ছিল, বা 'ঈশ্বরের বেঁচে থাকার' প্রয়োজন ছিল ? এসকল কথা নিরর্থক কেননা ঈশ্বর বা God থাকুন বা না থাকুন এই 'সৃষ্টি' তো আছে। আছে এই প্রাণময়ী, শ্যামলাঞ্চলা পৃথিবী, ওই সূর্য-চন্দ্র-গ্রহ-নক্ষত্র নীহারিকার আলোকোদ্ভাসিত নভোমণ্ডল। আছে আলো, আছে কাল। আছে জন্ম, আছে মৃত্যু -- সৃজন প্রলয়ের নিরন্তর বহমান ধারা।
"মহাবিশ্বে মহাকাশে মহাকাল মাঝে
আমি মানব একাকী ভ্রমি বিস্ময়ে, ভ্রমি বিস্ময়ে।।
তুমি আছ, বিশ্বনাথ, অসীম রহস্যমাঝে
নীরবে একাকী আপন মহানিলয়ে।।"

প্রশ্ন করি, খুঁজি  স্রষ্টাকে এবং দ্রষ্টাকে ? সেই বিস্ময়কর সত্ত্বাকেই মানুষ ঈশ্বরের মহাসিংহাসনে প্রতিষ্ঠা করে ভিন্ন ভিন্ন নামে আরাধনা করেছে। ঈশ্বর, আল্লাহ, God, অহুরা মাজদা -- এমনই শত সহস্র ভাষায়, শত সহস্র নামে। এই বিস্ময়বোধ, এই অন্বেষণ মানুষের ধর্মধারণার আদি সুর, আদি জ্ঞান ও বিজ্ঞানের উৎস।
"My religiosity consists in a humble admiration of the infinitely superior spirit that reveals itself in the little that we, with our weak and transitory understanding, can comprehend of reality. Mortality is of the highest importance -- but for us, not for God."
                        --- Albert Einstein.
এই পর্যন্ত, এমনটিই হোত যদি, তবে কোন দ্বন্দ্ব নেই ; কিন্তু যখন 'আমার ঈশ্বরকে' শ্রেষ্ঠ আসন দান করবার নির্বোধ অহংকারে 'ওদের God-কে' আমরা আক্রমণ করি তখনই ঈশ্বরও নিহত হন এবং সাথে সাথে আমরাও। তখন ধর্ম আর মানুষের সমাজকে, মানুষের প্রাণকে ধারণ করতে পারে না। মানবতা বা মানুষের চেতনা অন্ধ হিংসা ও প্রতিহিংসায় উন্মাদ হয়ে যায়।
       পরবর্তী পর্বে
              (ক্রমশঃ)
দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
২২/৩/২০২৬
কলকাতা।
__________________________________










বৃহস্পতিবার, ১৯ মার্চ, ২০২৬

শান্তি-১

                         শান্তি ১

'শান্তি' শব্দের প্রকৃত অর্থ কি, কেও কি বলতে পারবে ? পারবে একজনই যে বলতে পারে না, এমনকি, ইঙ্গিতে-ভঙ্গিতে, প্রকাশে-অভিব্যক্তিতেও জানান দিতে পারে না। সে কে ? সে হোল এক, একা, একটি প্রাণহীন শবদেহ, যাকে, দাহ করবার জন্যই হোক্ বা মাটি দেওয়ার জন্যই হোক্ শ্মশানে কিংবা গোরস্থানে আনা হয়েছে। জীবন থাকা কালে 'শান্তি'র কোন অস্তিত্ব নেই। এইখানে প্রশ্ন উঠতে পারে, এই আগের বাক্যে 'এক একা একটি' বিশেষণগুচ্ছ প্রয়োগ করা হোল কেন ওই শবদেহটির ক্ষেত্রে ? আরো তো সহযাত্রীরা ছিল তার সঙ্গে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায়। হ্যাঁ, ছিল ; কিন্তু যারা ছিল তাদের সাথে আর কি যোগ আছে ঐ মড়াটির ? তবে সে তো নিঃসঙ্গই, এমনকি তার আজীবনের সঙ্গী -- দেহ-কাঠামো, কর্মেন্দ্রিয়-জ্ঞানেন্দ্রিয়গুলি আর তার সঙ্গে নেই। চিন্তা-ভাবনা, স্মরণ-মননশূণ্য, নিশ্চেষ্ট, নির্বিকার, অন্তরের এবং বাইরের আঘাত-অভিঘাত- নিরপেক্ষ এই 'অবস্থাটিই' শান্তির শান্ত বিমূর্ত মূর্তি। সমস্ত জীবজগতের কথা বাদই দিলাম, পূর্ণচৈতন্যের মানব নামক জীবটির কাছে 'শান্তি' শব্দটি যে এক নির্মম বিদ্রুপের মত ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত হতে থাকে -- মাতৃগর্ভ থেকে ভূমিষ্ঠ হওয়ার জন্মক্ষণ থেকে শ্মশানে নিয়ে যাওয়ার আগে শেষ নিঃশ্বাসটি ফেলে যাওয়া পর্যন্ত -- এই তো নিয়তি।
তাই হলে জীবন কি এক সত্যিই ট্রাজেডি ? হ্যাঁ এবং না। ('না' এর কথা পরে।) গভীরভাবে বিচার করলে দেখা যাবে, মানবসমাজের, মানবসংসারের অশান্তির যত কারণ আছে তার মধ্যে বেশিরভাগই মানুষের স্বকৃত ও স্ব-আরোপিত। সমস্ত রকমের প্রাকৃতিক বিপর্যয় সহ্য করে, প্রতিরোধ করে, জয় করে, নব নব সৃজনের দুর্মর প্রচেষ্টায় বেঁচে থাকার যে জীবনসংগ্রাম তার পরিণাম পরাভবের নয় ; কিন্তু দেশে দেশে, কালে কালে যে সকল যুদ্ধ, জাতিদাঙ্গা, আক্রমণ, আগ্রাসন, লুণ্ঠন সংঘটিত হয়েছে তার জন্য যে নরকের অশান্তি, সে সবই ভোগ করতে হয়েছে, হয়ে আসছে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে যাঁরা অশান্তি চায় নি, চায় না। মানব সমাজে মানুষে মানুষে বিভেদ, ঘৃণা ও নৃশংসতা -- তার অনেকখানিই দায় বর্তায় ধর্মধারণার উপর, ধর্মমতগুলির পারস্পরিক দ্বন্দ্ব ও সংঘাতের উপর, ঈশ্বর নামক একটি বিধান-স্রষ্টা ও তাঁর নির্মিত স্বর্গ ও নরক সৃষ্টির কাল্পনিক বিশ্বাসের উপর। রাজ্য- সাম্রাজ্যলোভী রাজা, সম্রাটদের আক্রমণ, আগ্রাসন, লুণ্ঠন, শিশুনারী নির্বিশেষে হত্যা ও ধর্ষণ হয়, হয়েছে ও হবে। ইউরোপের মধ্যযুগে ভ্যাণ্ডাল, হুন, ফ্রাঙ্ক, অষ্ট্রোগোথ, ভিসিগোথ, ল্যাম্বার্ডদের অমানবিক ধ্বংসলীলায় (অ্যাটিলা দ্য হুনকে বলা হোত 'ঈশ্বরের কশাঘাৎ', Scourge of God) যত রক্তবন্যা বয়েছিল ইউরোপের মাটিতে, তার চাইতে কম শোণিতাক্ত হয় নি বিশ্বের মানবসমাজ ধর্ম নামক খড়্গের আঘাতে। অ্যাংলো আমেরিকান লেখক Christopher Hitchens, (1949-2011) তাঁর একটি বিতর্কিত বইতে (God is not Great, How Religion poisons Everything) লিখছেন যে যে-কোন "Organized Religion is violent, irrational, intolerant, allied to racism, tribalism, and bigotry, invested in ignorance and hostile to free inquiry, contemptuous of women and coercive towards children".

বইটির নামের মধ্যে একটি বিষম বিতর্কের অবতারণা করা হয়েছে। আব্রাহামিক ধর্মগুলির মধ্যে ইসলাম ধর্মের একটি মহান উচ্চারণ 'ঈশ্বর মহান' বা 'God is Great'. এখানেই দ্বন্দ্ব। হিচেন তাঁর গ্রন্থের নাম রেখেছেন 'God is not Great.' তাই যাঁরা আব্রাহামীয় একেশ্বরবাদী যেমন ইহুদি, খ্রিস্টান এবং ইসলাম ধর্মের মধ্যে পড়েন না, তাঁদের পক্ষে এই দ্বান্দ্বিক আলোচনায় লিপ্ত হওয়ার পরিসর অত্যন্ত সংকীর্ণ। কিন্তু তিনি শুধু ইসলাম নয় বাকি অন্যান্য বহু ধর্মধারণা নিয়েই তাঁর এই গবেষণামূলক গ্রন্থটি প্রণয়ন করেছেন। তিনি  (বিশেষ করে ঐ প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মগুলির বিষয়ে) ধর্মীয় মতবাদ সৃজন, সে মতবাদের প্রচার ও অন্য ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে তার দ্বন্দ্বের যে ঐতিহাসিক পরম্পরা সে-সবের বিশদে আলোচনা ও ব্যাখ্যা করে দেখিয়েছেন কত অসংখ্য রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ সংঘটিত হয়েছে ধর্মবিশ্বাসকে কেন্দ্র করে। মধ্যযুগের ক্রুসেড, ইনকুইজিশন ছাড়াও উনবিংশ শতাব্দীতে বেলফাস্ট (আয়ারল্যান্ড) দ্বন্দ্ব, বেইরুট বা লেবাননের গৃহযুদ্ধ, ভারতের সাম্প্রদায়িক জাতিদাঙ্গার উদাহরণ দিয়ে লেখক প্রশ্ন করেছেন এ সকল হিংস্রতা, হত্যা, বাস্তুচ্যুত হওয়া কি মঙ্গলময় ঈশ্বর অনুমোদিত ? এমনকি যে ধর্মমত 'অহিংসার' মন্ত্রে দীক্ষিত, সেই বৌদ্ধধর্মে বিশ্বাসী মায়ানমার নিষ্ঠুর রাষ্ট্রবাদের ত্রাসনে ইসলাম ধর্মে বিশ্বাসী রোহিঙ্গাদের উপর নামিয়ে এনেছে এমন নারকীয় নিষ্পেষণ যার জন্য তারা দেশহারা, আশ্রয়হারা হয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে, অমানবোচিত জীবন যাপন করতে বাধ্য হয়েছে। লাঞ্ছনা, ঘৃণা ও নির্বাসনের শিকার হয়েছে।
ধর্মে ধর্মে এমন সব সংঘাত ও সংঘর্ষের কথা, ঈশ্বরের অস্তিত্ব, সর্বশক্তিমানের (God the Great) সর্বময় ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের ধারণাকে প্রশ্ন করেছেন, সন্দেহ প্রকাশ করেছেন, এমনকি অস্বীকারও করেছেন আমার বর্তমান আলোচিত একমাত্র লেখক খ্রিষ্টোফার হিচেনস্ -- তা কিন্তু নয়। আরও বহু বিদ্বান ও চিন্তাবিদ আছেন যাঁরা ধর্মীয় ধারণা ও ঈশ্বরবাদী বিশ্বাসকে বাস্তববাদী (materialistic) বিতর্কের দৃষ্টিভঙ্গিতে বিচার করেছেন। তাঁদের মধ্যে আছেন Richard Dawkins, Danial Dennett, Marlin Amis, George Orwell, Noam Chomsky প্রভৃতি। এনারা প্রায় সকলেই মানবিক চেতনার উন্মেষ ও ক্রমোন্নয়নের পক্ষেই মত প্রকাশ করেছেন, যার দ্বারা মানবতার, মানবজাতির প্রকৃত মঙ্গল সম্ভাবিত হতে পারে এবং এই পৃথিবী নামক আশ্রয়টি ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে সকলের জন্য একটি শান্তিপূর্ণ আশ্রয় হয়ে উঠতে পারে।

যে ধর্মধারণাগুলি এক এবং অদ্বিতীয় কোন ঈশ্বরকে অবলম্বন করেছে, বিশ্বাস করেছে, যাঁর কাছে আত্মসমর্পণ করেছে জাগতিক ও পরাজাগতিক শান্তিলাভের কামনায়, তাহলে সেই ঈশ্বরের বিশ্বজনীন কল্যাণ ও মঙ্গল বিধানের ক্ষমতা কি তবে প্রশ্নাতীত নয় ? আবার প্রশ্নটির অন্য দিক থেকেও ওঠা বিতর্কও স্বাভাবিক যে যখন আমরা বলছি 'ঈশ্বর মহান' বা 'ঈশ্বর মহান নয়' তখন তো আমরা স্বীকার করেই নিচ্ছি যে 'ঈশ্বর' নামধারী কোনো এক অদৃশ্য সর্বশক্তিমান নিয়ন্ত্রকের অস্তিত্ব আছে। এবং যাঁরা ধর্মপ্রবক্তা বা ঈশ্বরের অবতার বা জীবনপথের প্রদর্শক বা জীবনদ্বন্দ্বের মুক্তিদাতা (Supreme Leaders or Liberators) তাঁরা সেই অদৃশ্য 'সর্বশক্তিমান নিয়ন্ত্রকের' বাণী বহন করে এনেছেন দুঃখময় জগতের যন্ত্রনাক্ষুব্ধ মানুষের ঐহিক ও পারত্রিক জীবনকে শান্তিময় ও মঙ্গলময় করে তোলার জন্যই। "তবে কেন পঙ্গু সৃষ্টি, খণ্ডিত এ অস্তিত্বের ব্যথা !"
'অস্তিত্বের ব্যথা' বিশেষতঃ ধর্মকে কেন্দ্র করেই হয়ে আসছে -- এ কথা তো সত্য। ঈশ্বর আছেন, তিনি স্বর্গ নামক এক কল্পিত সুখ-শান্তিময় স্থানে বাস করেন, তিনি ধর্ম সৃষ্টি করেছেন ; ধর্মের রীতি নীতি, বিধি বিধান, সাধন-আরাধনা, সংস্কার পালনের মধ্য দিয়ে তাঁর কাছে যাওয়া যায়। এই ধরাধামে তাঁর প্রতিনিধি বা ধর্মগুরুরা আছেন যাঁদের সাহায্য ব্যতিরেকে, আশীর্বাদ ছাড়া, করুণা ব্যতিত ঈশ্বরের সঙ্গে যোগাযোগ করা যায় না, স্বর্গলাভেরও সম্ভাবনা থাকে না। পাপ নিয়েই মানুষ জন্মগ্রহন করে এবং নরকে তার স্থান নির্ধারিত , সেখানে purgatory বা শুদ্ধিলোক যদিও আছে কিন্তু সেই শুদ্ধিলোকের দীর্ঘ দহনযন্ত্রনা ভোগ করতেই হবে। তার পরেও অনন্ত নরকবাসের বিভীষিকাময় ভীতি এই বিশ্বাসের শিকড় একদিকে যেমন সুদূর অতীতের অধোলোকে নিমজ্জিত তেমনি তার শাখা প্রশাখা বিস্তার করে আছে সমগ্র পৃথিবীর সমস্ত জনপদে -- রাজার প্রাসাদ হতে ভিখারীর ভগ্ন কুটীরের জীর্ণ চালাঘরে। মধ্যযুগের পাপমুক্তির জন্য গীর্জা কর্তৃক নির্ধারিত, ধর্মযাজকদের কাছ থেকে মুক্তিপত্র (Letter of Indulgence) কেনার প্রচলন ছিল, যা ধর্মভীরু, নিরীহ, সন্ত্রস্ত মানুষেরা কপর্দকশূন্য অবস্থায় থাকলেও, সামন্তপ্রভুদের কাছে শ্রমদানের প্রতিজ্ঞার মাধ্যমে, কিনতে বাধ্য হোত যাতে মৃত্যুর পর তাদের শুদ্ধিকরণের ভয়াবহ অন্ধলোকে যেতে না হয়। আবার শুদ্ধিলোকে বা purgatory-র অগ্নিকুণ্ডের জ্বালা সহ্য করে' (purifying suffering or satispassion) উত্তীর্ণ হতে না পারলে শেষবিচারের দিন (সৃষ্টির অন্তিমকাল) পর্যন্ত মহানরকে অবস্থান। এই শেষ বিচারেরধারণা সমস্ত মানবীয় চিন্তাকে নিয়ন্ত্রণ করে। 'শেষবিচার' হোল In Abrahamic religions (Judaism, Christianity, Islam, and Zoroastrianism) Judgement Day or The Last Judgement is a core theological concept which is a future event where God or Jesus Christ returns to judge all humanity ---- both living and resurrected dead ---- based on their faith, words, and actions leading to eternal reward or punishment.

কিন্তু তবুও বিচারের ভার তুলে নিয়েছিলেন ধর্মযাজক ও ধর্মগুরুরা। অবিশ্বাসী ও অখ্রিষ্টানদের উপর, বিশেষ করে ক্যাথলিকদের নির্মমতা কী বীভৎস ছিল তার অসংখ্য উদাহরণ আছে। মধ্যযুগে ১০৬৪ সাল থেকে ১৫২৬ সাল পর্যন্ত ক্যাথলিক ধর্মযাজকেরা অখ্রিষ্টানদের নির্মূল করার জন্য নির্বাসন, জোরপূর্বক ধর্মান্তরিতকরণ এবং গনহত্যার মত এমন সব নির্বিবেক, নির্বিচার, নিষ্ঠুর পন্থা অবলম্বন করেছিল যে সমগ্র পশ্চিম ইউরোপ একজাতি, এক ধর্মের ভূখণ্ডে রূপান্তরির হয়ে গিয়েছিল। এবং সেই সময়েই অখ্রিষ্টানদের কয়েকটি বিশাল বিশাল গোষ্ঠী ভবঘুরে বা Gipsy-তে পরিনত হয়ে যায়, যাঁরা মূলত উত্তর ভারত থেকে স্থানান্তরিত হয়ে, বলকান অঞ্চল দিয়ে ইউরোপে প্রবেশ করেছিল। এই অভিবাসিত যাযাবর জাতি ত্রয়োদশ শতাব্দীতে মধ্য ও পূর্ব ইউরোপের ভিন্ন ভিন্ন ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় প্রান্তিকভাবে বসতি স্থাপন করেছিল। মধ্যযুগের ইউরোপ তাদের মিশরীয় মনে করত বলেই তাদের Gypsy বলা হোত। আব্রাহামিক কোন ধর্ম, কোন ভগবান তাদের রক্ষা করতে পারে নি। (ইতিহাসের ঘোর কলঙ্কের বিষয় এই যে সেই সব ভবঘুরে জনগোষ্ঠীর বিভিন্ন, বিচিত্র সংস্কার, সংস্কৃতি, নৃত্য-সঙ্গীতের মত শৈল্পিক সৌন্দর্য, দৈহিক এবং মানসিক ঐশ্বর্য থাকা সত্ত্বেও এই বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়কালে এসেও কিছু উন্মাদ, নৃশংস একনায়কতন্ত্রী রাষ্ট্রতন্ত্রের হাতে চিরবিনাশের অন্ধকারে হারিয়ে গেল তারা ! (অতি সামান্যই অবশিষ্ট রয়েছে এখনো, এখানে ওখানে)। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়েরও আগে থেকে (১৯৩৩-১৯৪৫) ৬০/৭০ লক্ষ ইহুদিদের সঙ্গে নাৎসি বাহিনী প্রায় ৫০০,০০০ রোমানি ভবঘুরেদের হত্যা করেছিল -- "The cruelest Holocaust along with the Nazi Genocide of the Jews in the history of Europe!"
তাহলে তখন 'ঈশ্বর' নামের ব্রহ্মাণ্ডের 'সর্বশক্তিমান মুক্তিদাতা' কেউ ছিলেন না বা থাকলেও তিনি অসহায় মানববিশ্বের কল্যাণময় প্রাণশক্তি হতেই পারেন না। এমন ই চিন্তার ঝলক আমরা পাই Friedrich Nietzsche-য়ের লেখা থেকেঃ
"God is Dead. God remains Dead. And we killed him." ----'The grey science'. (প্রবন্ধের অন্যত্র এ বিষয়ে আলোচনা করা হবে।)

এতক্ষণ ইউরোপীয় ভূখণ্ডের ইতিহাসের কতিপয় ধর্মীয় দ্বন্দ্ব সংঘাতের কথা বলেছি, অন্ধ ধর্মবিশ্বাসের নরমেধ যজ্ঞকুণ্ডে মানবপ্রাণের আহুতিদানের কয়েকটি উদাহরণ তুলে ধরেছি। এবার তাই যদি ভিন্ন ভিন্ন দেশের প্রসঙ্গে আলোচনায় যাই তবে দেখব খ্রিস্টান ও ইসলাম‌ সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের সঙ্গে সমান্তরালভাবে সশস্ত্র ধর্ম-বিজয়াভিযানের শোণিত-তরঙ্গ, ঢেউয়ের পর ঢেউ, আছড়ে পড়েছিল এশিয়া, আফ্রিকা, উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার সর্বত্র। এ সমস্ত স্থানে প্রথমদিকে এসেছিল ক্যাথলিক ধর্মযাজক ও ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদ। পরবর্তী সময়ে ইসলাম ধর্মের ধর্মগুরু ও নবাব-সুলতানেরা। বিশ্বের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ তাদের নিয়ন্ত্রণে এসেছিল শান্তির শ্বেতপতাকাবাহী অহিংস ধর্মপ্রচারকদের দ্বারা নয়, এসেছিল রক্তমাখা অস্ত্রহাতে, রক্তক্ষয়ী হনন, লুণ্ঠন, ধর্ষণ ও নিপীড়নের মধ্যে দিয়ে। ইতিহাসের এই হাজার হাজার বছরের যুদ্ধ, বিপ্লব, উপপ্লবের আলোচনা এখানে অপ্রাসঙ্গিক কিন্তু প্রাসঙ্গিক যা তা হোল 'ধর্ম' ও 'ধার্মিক' সম্প্রদায়ই যদি 'শান্তির' পথ অবলম্বন না করে তবে ধর্ম ও ধার্মিকতার বিমূর্ত মূর্তি 'ঈশ্বরের' অস্তিত্বে কি বিশ্বাস রাখা যায় ? এই অবিশ্বাস থেকেই নাস্তিক্যবাদের জন্ম। এই মতবাদটিই ইউরোপীয় নাস্তিক বা নিরীশ্বরবাদীদের চিন্তাকে ঋদ্ধ করেছে।
এবার আসি প্রতীচ্য ছেড়ে প্রাচীন প্রাচ্য ভূমিখণ্ডে --- প্রধানভাবে এবং প্রাসঙ্গিক কারণেই এই ভারতবর্ষে,  কেননা এখানে 'ঈশ্বর' বা 'ভগবান' বিষয়ে যত আলোচনা হয়েছে, মানবসভ্যতার ঊষালগ্ন থেকে, ততখানি আর কোন দেশের কোন সভ্যতায় হয় নি। 'ঋক্শ্রুতি' বা ঋক্বেদ, বা 'ঋকবেদ সংহিতা' আজ থেকে প্রায় পাঁচ হাজার বছর, মতান্তরে দশ হাজার বছরও হতে পারে, আগে রচিত হতে আরম্ভ করে এবং গবেষকদের মতে দশ মণ্ডলের এই মহাগ্রন্থ সম্পূর্ণ রূপে প্রকটিত হয়েছে দুই হাজার বছর কাল ধরে। ঋক্ বেদ বিশ্বমানবসভ্যতার আদিমতম সাহিত্য, মানুষের মনন ও দর্শনের প্রথম অভিব্যক্তি। বাক্, বাক্যগঠন ও ভাষার ব্যাকরণগত ও ছন্দায়িত (ত্রিষ্টুপ, গায়ত্রী, জগতী প্রভৃতি ছন্দে ঋক্ মন্ত্রগুলির আবৃত্তকরণ হয়) চলনের প্রথম উচ্চারিত উদাহরণ। শুধু তাই নয় ঋগ্বেদ, যা পরবর্তী সামবেদ, যজুর্বেদ এবং আরো পরবর্তীতে, যুগ পর্বের ব্যবধানে সংকলিত অথর্ববেদের, ব্রাহ্মণগ্রন্থগুলির, আরণ্যক ও উপনিষদসমূহের উৎসস্বরূপ। (যোগবাশিষ্ঠ রামায়ণ, মদ্ভাগবৎগীতা, রামায়ণ, মহাভারতাদি পুরাণ গ্রন্থাবলীর আলোচনা প্রসঙ্গান্তরে করার অবকাশ থাকবে)।

আমাদের বা এই ভারতবর্ষের মত উপমহাদেশের ধর্মধারণা ও ঈশ্বরবিশ্বাস নিয়ে আলোচনা আরম্ভ করতে হলেই বেদসংহিতার প্রসঙ্গ অবধারিত। তাই বেদের সময়কাল থেকে আমাদের শান্তি ও সান্ত্বনার একমাত্র আশ্রয় 'ঈশ্বর'-য়ের মূর্ত এবং বিমূর্ত রূপের আলোচনা করতেই হবে --
                  (পরবর্তী পর্বে)।
                   --ক্রমশঃ--
দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
১৯/০২/২০২৬
কলকাতা।


রবিবার, ৮ মার্চ, ২০২৬

সুখ ৩

  সুখ-৩

 
"যস্মিন্ সর্বাধিক ভূতানি আত্মৈবাভূৎ বিজানতঃ।
তত্র কো মোহঃ কঃ শোক একত্বম্ অনুপশ্যতঃ।।"
                    (ঈশা উপনিষদ-- মন্ত্র ৭)

বিশ্বময় ভূতবর্গের (প্রাণ ও আপ্রাণ) সঙ্গে যখন একত্বের অনুভূতি হয়, আমার আমি যখন জগৎ সংসারের সমস্ত দেশে কাল ও পাত্রে একাত্ম হয়ে যায়, তখন কোথায় বা শোক, কোথায় বা মোহ ? পৃথকবোধ থেকেই তো ঘৃণা আসে, একাত্মবোধে কোথায় বা ঘৃণা, কোথায় বা সর্বগ্রাসী মোহ ? এই জ্ঞান লাভ করলে শোক দুঃখ মোহ ভয় কিছুই থাকে না।

সুখ ও দুঃখ বিষয়ে আমাদের ঈশা উপনিষদে এত সুন্দর সুন্দর বাণী আছে যা আমাদের সমস্ত দৈহিক ও আত্মিক দুঃখ থেকে মুহূর্তে মুক্তি দান করে, নিরন্তর মৃত্যুভীতি থেকে মুক্ত করে এক প্রশান্ত আনন্দের অনুভূতি জাগায়। বস্তুত আমাদের সকল দুঃখের কারণ হোল এই নিরন্তর মৃত্যুভয়। জীবন যেমন ভাবেই কাটুক না কেন দীর্ঘায়ু লাভের বাসনা, মৃত্যুঞ্জয়ী হবার কামনা, রোগ থেকে রক্ষা পাবার ইচ্ছা যে কত দুর্নিবার, কত উৎকট, অপ্রকৃতিস্থ হতে পারে তার বিভীষিকাময় দৃশ্য আমরা দেখেছি বিগত 'করোনা' বিশ্বমারির সময়কালে। ইতিহাস জুড়ে এমন ঘটনার অন্ত নেই এবং এখনও তা চলেছে। অসংখ্য যুদ্ধের কথা ছেড়ে দিলেও মন্বন্তরে, দুর্ভিক্ষে, ভূমিকম্পে, প্লাবনে, অতি ঝরায়, খরায়, প্লেন-রেল-পথ দুর্ঘটনায় নিরন্তর মৃত্যুমিছিল চলে এসেছে, চলেছে পৃথিবীর সমস্ত দেশে। বর্তমান সময়কালে, এইটি আশা করা গিয়েছিল যে বিজ্ঞান, বিশেষকরে চিকিৎসাবিজ্ঞানের, যানবাহনের এবং আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ব্যবস্থার বৈপ্লবিক উন্নতির ফলে মানুষের এই মৃত্যুভীতির সামান্য হলেও উপসম হবে। হয়নি, বরং বেড়েছে। বিশ্বব্যাপী অনেক বিপর্যয়ের পূর্বাভাস এখন মানুষের আয়ত্বে এবং সে-সব বিপর্যয় প্রশমিত করবার বৈজ্ঞানিক কৌশলও মানুষের জানা ; কিন্তু সেই জ্ঞানে-বিজ্ঞানে-ঋদ্ধ মানবগোষ্ঠী যদি সমষ্টিগতভাবে মানুষের মঙ্গল বিধানের জন্য সাধনার পরিবর্তে সাম্প্রদায়িক, সামাজিক, ধর্মীয় গোষ্ঠীতন্ত্রে বিভাজিত হয়ে যায়, যদি উগ্র রাষ্ট্রতন্ত্রের মন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে সম্প্রসারণবাদী, সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের অশ্বমেধের ঘোড়াকে লাগামহীন তাড়িয়ে দুর্বলতর দেশের উপর শাসন, শোষণ ও রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের উল্লাসে উন্মত্ত হয়ে ওঠে তবে জাগতিক মানবতার সুখের দিন যে কোনদিনও সম্ভাবিত হবে না, বরং স্বর্গীয় সৌন্দর্য এবং অফুরান ঐশ্বর্যে-ভরা এই প্রাণময়ী ধরিত্রী যে নরকে পরিণত হবে - এ-তো দিনের শেষে রাত্রি আসার মতই সত্য। বর্তমান পৃথিবীর দিকে দৃষ্টিপাত করলেই সভ্যতাবিরোধী এই বর্বর-যুগের (মধ্যযুগের ইউরোপ ৮০০ খ্রিঃ থেকে কনস্টান্টিনোপোলের ধংস ১৪৫৩ খ্রিঃ) অন্ধকার আজও ছেয়ে রয়েছে। আমেরিকার, ইস্রায়েলের সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ দেশগুলির সুদীর্ঘকালের দ্বন্দ্ব এতকাল তুষের আগুনের মতো কখনো ধিকি ধিকি, কখনো বা প্যালেস্তাইনের গাজা অঞ্চলে গণচিতার মত স্থানে স্থানে জ্বলছিল, এখন তা দাবানলেল মত ছড়িয়ে পড়েছে ইরান থেকে লেবাননের বেরুট পর্যন্ত। শান্তিকামী বিশ্বব্যবস্থা সম্পূর্ণরূপে বিধ্বস্ত। অগ্নিমুখী  "নাগিনীরা দিকে দিকে ফেলিতেছে বিষাক্ত নিঃশ্বাস।"

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরপরই ১৯২৫ এবং ১৯২৬ সালে রবীন্দ্রনাথ দু'দুবার ইটালি যাত্রা করেছিলেন। ২০শ শতকের গোড়ার দিক থেকেই ইংল্যান্ডে তো বটেই,  ১৯২১ সাল থেকে ফ্রান্স, সুইজারল্যান্ড (তখন রোমা রোলাঁর সঙ্গে বন্ধুত্ব নিবিড়) ইটালি প্রভৃতি দেশে তাঁর যাতায়াত ছিল নিয়মিত। ইটালিতে মুসোলিনির সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎকার নিয়ে সমগ্র ইউরোপজুড়ে নানা বিরূপ সমালোচনা হয়েছিল সেই সময়, কেননা সেই সময় ইটালিতে মুসোলিনির নেতৃত্বে ন্যাশনাল ফ্যাসিস্ট পার্টি (Partito Nationale Fascista বা PNF) ক্ষমতাসীন ছিল যাদের 'আদর্শ' ছিল সমাজতন্ত্র বিরোধী চরম জাতিয়তাবাদ। এই ক্ষমতাসীন দল ছিল সমস্ত বিরুদ্ধ কণ্ঠস্বরের প্রতি নির্মম ঘাতকস্বরূপ ; ঠিক যেমন জার্মানিতে ন্যাশনাল সোশ্যালিস্ট ওয়ার্কার্স পার্টি,  (Nationalsozialistsche Deutsche Arbeiterpartie বা সংক্ষেপে Nazi party, নাৎসি বাহিনী নামেই ইতিহাসে প্রসিদ্ধ)। যাই হোক্ জার্মানির বিষয়ে বারান্তরে আলোচনা করা যাবে।

 এখন আমরা ফিরে যাই ওই রবীন্দ্রনাথ ও মুসোলিনি প্রসঙ্গে। সরল ও নিষ্কলুষ মনের আবেগপ্রবণ কবি প্রথম সাক্ষাতে মুসোলিনির মত একজন কুটীল ও ধুরন্ধর একনায়ককে ঠিক চিনতে পারেন নি। মুসোলিনির আতিথেয়তা তাঁকে মুগ্ধ করেছিল এবং তিনি মুসোলিনি ও সমকালের ইতালির প্রসংশাও করছিলেন। সেই সংবাদ তখন  বিশ্বের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছিল এবং কবির উদার মানবতাবাদী অন্তরসত্ত্বা বিরুদ্ধ সমালোচনার আঘাতে জর্জরিত হয়ে উঠেছিল। তাঁর সেই দুঃসহ দুঃখের দিনে, তাঁর হয়ে লেখনী-অস্ত্র ধারণ করেছিলেন অভিন্নহৃদয় বন্ধু রোমা রোলাঁ। এই ঘটনা ও ঘটনার পরম্পরা ঐতিহাসিক তাৎপর্যবাহী। সে বিষয়ে সবিস্তারে যাওয়ার অবকাশ এই ক্ষুদ্র প্রবন্ধটিতে সম্ভব না হলেও আমরা সেই সময়ে একনায়কতন্ত্র, নিষ্ঠুর রাষ্ট্রতন্ত্র ও চরম জাতিয়তাবাদের বিরোধিতায় তিনি কি মত পোষণ করতেন এবং কতখানি ধিক্কার জানিয়েছিলেন তার উদাহরণ রয়েছে তাঁর একখানি ঐতিহাসিক পত্রে যেটি তিনি লিখেছিলেন ৫ই আগষ্ট, ১৯২৬ সালে, 'ম্যানচেস্টার গার্ডিয়ান'( Manchester Guardian)-এর ঠিকানায়। দীর্ঘ এই চিঠির অতি সামান্য কিছু অংশ, 

"I have said over and over again that the aggressive spirit of nationalism and imperialism, religiously cultivated by most of the nations of the West, is a menace to the whole world. The demonstration that it produces in European politics is sure to have disastrous effects, especially upon the peoples of the East who are helpless to exploit the western methods of exploitation. It would be most foolish, if it were not almost criminal, to express my admiration for a political ideal which openly declares its loyalty to brute force as the motive power of civilization. The barbarism is not altogether incompatible with material prosperity may be taken for granted, but the cost is terribly great ; indeed it is fatal. The work of unscrupulous force as the vehicle of nationalism keeps ignited the fire of international jealousy, and makes for universal incendiarism, for a fearful orgy of devastation. The mischief of the infection of this mortal aberration is great because today the races of humanity have come close together, and any process of destruction set going does work on an enormously vast scale. Knowing all this, could it be believed that I should have played my fiddle while an unholy fire was being fed with human sacrifice ?"
'Aggressive spirit of nationalism religiously cultivated by most of the nations of the West'  পাশ্চাত্যের বহু রাষ্ট্রের ধর্মান্ধতাপুষ্ট চরম আগ্রাসনবাদী সাম্রাজ্যবাদ ও জাতিয়তাবাদের উগ্রসুরা 'is menance to the whole world'-- সমগ্র বিশ্বের কাছে এক ভয়াবহ সর্বনাশ। এর পর এই চিঠির শব্দে শব্দে, পঙক্তিতে পঙক্তিতে তিনি যুদ্ধোন্মাদ ইউরোপের যে ধর্মীয়, রাজনৈতিক ও অমানবিক রাষ্ট্রচরিত্রের বহিরাবরণ উন্মোচন করেছেন, সভ্যতাগর্বী পাশ্চাত্যের হিংস্রতার নগ্নরূপ অনাবৃত করে দিয়েছেন তা শুধু তাঁর সময়কালের জন্যই প্রাসঙ্গিক ছিল এমন নয়, আজও যাঁরা প্রভাতী সংবাদ শোনবার জন্যে সংবাদপত্রের পাতা খোলেন বা সংবাদ মাধ্যমের পর্দায় চোখ রাখেন তাঁরাও সেই একই  পরিবর্তনহীন দৃশ্যের সম্মুখীন হন প্রতিটি দিন -- দূর অতীতের ১৯২৬ সাল থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত, একটি সম্পূর্ণ শতাব্দী অতিক্রান্ত হবার পরও। শতাব্দীপূর্বে আমাদের দূরদর্শী ঋষিকবি নিষ্ঠুর রাষ্ট্রযন্ত্রের, উন্মত্ত জাত্যাভিমানের নারকীয় পরিণাম অনুধাবন করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তাই এমন অকুতোভয়, বীরত্বব্যঞ্জক, ক্ষমতালোলুপতার বিরুদ্ধে ভর্ৎসনার ভাষা ; যেন নিষ্কোষিত তলোয়ার, যা নিয়ে সমরাস্ত্রের-দম্ভে অন্ধ, উদ্ধতমস্তক ইউরোপীয় আগ্রাসনের বিরুদ্ধে একজন অপরাজেয় সৈনিকের রূপ ধারণ করেছিলেন এবং লিখেছিলেন "Knowing all this, could it be believed that I should have played my fiddle while an unholy fire was being fed with human sacrifice ?" 

না, রবীন্দ্রনাথের এই সব্যসাচীর রূপ আত্মবিস্মৃত বাঙালি জাতির অন্তরে আজ আর জাগ্রত আছে কিনা সন্দেহ জাগে যখন দেখি 'তাঁর দেশ, তাঁর 'মা ভৈঃ' মন্ত্রে দীক্ষিত সমাজ' আত্মসংবিদহারা, সাম্প্রদায়িকতার মাদকাসক্ত এবং একতাছিন্ন আত্মহননে লিপ্ত। যাঁরা জানেন রবীন্দ্রনাথ আনন্দবাদী ছিলেন, ললিত লতার পেলবতায় প্রেমের গান লিখে গিয়েছেন, বর্ষা-শরৎ-বসন্তে নৃত্য করবার ছন্দোময় সুর সৃষ্টি করে গিয়েছেন তাঁরা যোদ্ধৃবেশের রবীন্দ্রনাথকে হয় চিনতে পারেন নি, নয় তো হীনমন্যতাবোধে উপেক্ষা করে গিয়েছেন ; না হয়, দুই চোখ দুই হাতে ঢেকে সেই আগুন ঝরানো লেখা 'সভ্যতার সংকট' ও 'মানহারা মানবতার' নবোদ্বোধনের রচনাসমূহ এবং বিভিন্ন বক্তৃতার তীব্র তীক্ষ্ণ দীপ্র উচ্চারণের বাণীর দলিলগুলি বিস্মৃতির অন্ধঘরে তালাবন্ধ করে রেখে দিয়েছেন।
এতক্ষণ রবীন্দ্রনাথের ইতিহাসপ্রসিদ্ধ একটি চিঠির কিয়দংশ উদ্ধার করেছি আমাদের মূল বক্তব্য থেকে সরে আসার জন্য নয় ; বরং মানুষের প্রকৃত সুখ কি এবং কোথায় তার হদিশ পাওয়ার জন্য। এ প্রসঙ্গে তাঁর একটি স্বল্পশ্রুত সঙ্গীত সম্পূর্ণ উদ্ধার করি, 

"বাধা দিলে বাধবে লড়াই
মরতে হবে।
পথ জুড়ে কি করবি বড়াই,
সরতে হবে।
লুট-করা ধন ক'রে জড়ো
কে হতে চাস সবার বড়ো,
এক নিমেষে পথের ধূলায়
পড়তে হবে।
নাড়া দিতে গিয়ে তোমায়
নড়তে হবে।।
নিচে বসে আছিস কে রে,
কাঁদিস কেন।
লজ্জাডোরে আপনাকে
বাঁধিস কেন।
ধনী যে তুই দুঃখধনে
সেই কথাটি রাখিস মনে,
ধুলার 'পরে স্বর্গ তোমায়
গড়তে হবে।
বিনা অস্ত্র, বিনা সহায়
লড়তে হবে।।" 

বীরের সুখ এখানেই। "ধনী যে তুই দুঃখধনে।" দুঃখের ভিতরে সুখ, শোকের অন্তরে আত্মোপলব্ধির আনন্দ, দারিদ্র্যের গ্লানির অন্তরে অপরাজেয় প্রাণের ঐশ্বর্যের ভাবনা তিনি আমাদের দিয়ে গিয়েছেন এই বিশ্বাসেই যে, পরাধীন, শোষণে-ত্রাশনে নিষ্প্রাণ ভারতের 'সুখের' সম্ভাবনার উৎস নিহিত আছে দুঃখী মানুষের একাত্মবোধের মধ্যে। তিনি জানতেন 'ঐক্যবদ্ধ' হওয়ার তাগিদ আসে ব্যক্তিক স্বার্থপরতার তাড়নায় যা ক্ষণভঙ্গুর, কিন্তু একাত্মতার প্রেরণা আসে মানবপ্রেমের ধর্মে। সকলের সুখের মধ্যে, সমাজের, দেশের, এমনকি, বিশ্বসংসারের সুখের ভিতর সুখের সন্ধান করাই নিরন্তর দুঃখ থেকে চিরন্তন মুক্তি ; অন্যথায় 'সুখ' হিংসায় উন্মত্ত, হৃদয়হীন, রুক্ষ, মরুময় পৃথিবীতে চির-অপসৃয়মান মরীচিকা। 

"ধূলার পরে স্বর্গ তোমায়
গড়তে হবে।।"

দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
০৭/০৩/ ২০২৬
কলকাতা।
_____________________________________










শনিবার, ৭ মার্চ, ২০২৬

সুখ ২

   সুখ-২

অধুনা ঝাড়খণ্ডের অজয় নদের পাড়েই আমাদের গ্রাম ভাগ্যপুর। এই অঞ্চলটি বৃহত্তর বাঙলারই একটি অংশ। বাঙলা ভাষা, বাঙলা সংস্কার-সংস্কৃতি, অশন-বসন, উৎসব-অনুষ্ঠান সবই  বর্তমানের পশ্চিম বর্ধমানের মত ; কিন্তু যেহেতু 'অজয় নদ অন্তরায়' তাই বছরের চার পাঁচ মাস -- পারাপার শুধু ডিঙিনৌকা। আমাদের গ্রামে স্কুল পাঠশালা যা ছিল তা ওই ঈশ্বর চন্দ্রের 'বর্ণপরিচয় প্রথম ভাগ', 'দ্বিতীয় ভাগ' আর সংখ্যা গণনার 'ধারাপাত'। তাই ছোটনাগপুরের এই নির্জলা প্রান্তরে, পাহাড় টিলার ঢালে, সীমিত জমিতে অত্যল্প ধান চাষের মতই পড়াশোনার চাষও ছিল এইটুকু। তবে বামুন পাড়ার কিছু কিছু বাবা-মা চাইতেন তাঁদের ছেলে সন্তানেরা লেখাপড়াটা এমন শিখুক যাতে চাকরি-বাকরি করতে পারে এবং আখেরে তাঁদের দুঃখ ঘোচাতে পারে। দুঃখ বামুনদেরই বেশি কেননা, জমি-জিরেত তাঁদের যথেষ্ট থাকলেও তাঁরা, তাঁদের ছেলেরা তো আর হাল-কোদাল ধরত না। এমনই এক বামুন ঘর, অঘোর চক্রবর্ত্তী তাঁর ছয় ছেলে আর তিন মেয়ে নিয়ে সংসার চালাতে গিয়ে নাজেহাল। পৌরহিত্য, ঝাড়ফুঁক, হস্তরেখা বিচার এমনকি ভিক্ষা পর্যন্ত করেও বড় ছেলে নিরঞ্জনকে বীরভূমের দুবরাজপুরের এক ছাত্রাবাসে রেখে পড়িয়েছিলেন। নিরু মেধাবী ছিল এবং হেতমপুর রাজকলেজ থেকে বি-এ, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম-এ পাশ করে কৃষ্ণনগর কলেজে অধ্যাপকের চাকরি পেয়ে গেল। প্রথম প্রথম দু' তিন বছর দেশের বাড়িতে যাওয়া-আসা, টাকা-পয়সা দেওয়া নিয়মিত ছিল। অঘোর ঠাকুর আর তাঁর স্ত্রী কাত্যায়নী দেবীর বুকে সন্তান-গর্বের জোয়ার। নিরুর জন্য পাত্রীর পিতাদের নিত্য আগমন কিন্তু অঘোর ঠাকুরের 'বরপণ' চাহিদার ঘায়ে আহত ও আশাহত হয়ে তাঁরা আর দ্বিতীয়বার সৌভাগ্যপুরমুখো হতেন না।

 
বিশ্বের বড় বড় ট্রাজেডিগুলোর অবিবেকী, অদূরদর্শী কিছু কিছু কারণ থাকে, যেমন রামায়ণের সোনার হরিণ, মহাভারতের পাশাখেলা, ইলিয়াডে গ্রীকরাণী হেলেন অপহরণ, 'ওথেলো'-তে রুমাল --- এই রকম  আর-কি, --- সংসারের অকস্মাৎ বিপর্যয়ের বেলাতেও তেমনি কিছু কিছু হেতু থাকেই থাকে যেগুলি আমাদের দৃষ্টি এড়িয়ে যায়। অঘোর বাবুর সংসারে, তাঁর ওই পণাপণির একগুঁয়েমি তেমনই এক হেতু হয়ে উঠেছিল কি ? কেননা হঠাৎই কিছুদিন নিরু নিরুত্তর থাকার পর, তার লেখা একটি চিঠি এসে হাজির। চিঠি দীর্ঘ ; কিন্তু মূল বক্তব্যটি অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত, শ্মশানে শবদাহের পর একঢেলা পিণ্ডির মতন। ছেলে তারই  সহকর্মী জনৈকা 'লেখা সরকার' নাম্নী এক 'বাঙাল' নমঃশূদ্র মেয়েকে বাধ্য হয়ে বিয়ে করেছে, বাবা যদি অনুমতি দেন তবে তাঁর বৌমাকে নিয়ে নিরঞ্জন ঘরে আসবে।
মধ্যাহ্নভোজনের থালা পড়ে রইল। অঘোর ঠাকুর বার কয়েক কপালে করাঘাত করে ঘন ঘন বিড়ি টানতে লাগলেন। কাত্যায়নী দেবী তো শয্যাশায়িনী হয়ে পড়লেন। অপরাপর ছেলে মেয়েরা ঘরের দাওয়ায় এ-কোনে, সে-কোনে বসে পড়ল। যাই হোক্, সে দিনটা সেই ভাবেই কেটে গেল। পরের দিনগুলি একটু একটু পিছোতে পিছোতে অঘোর ঠাকুরের সংসার আবার অভাব অনটন ও মানহীন অগৌরবের অবস্থায় ফিরে গেল। গ্রামময় কানাকানি, জানাজানি হওয়াতে অঘোর ঠাকুরের 'ইনকাম'ও বেশ কমে গেল। সঙ্গে এসে জুটল নিন্দা, ভর্ৎসনা, বিদ্রুপ আর উপেক্ষা। কাত্যায়নী দেবী মরমে মরে গিয়ে একদিন স্বামীর পায়ের কাছে বসে, অস্থিসার পায়ে তেল মালিশ করতে করতে বললেন,
" এখন তো কতই এমন হয়, তুমি নিরুকে ক্ষমা করে দাও। একটা চিঠি লিখে বৌমাকে নিয়ে আসতে বল। ছেলেকে না দেখার কষ্ট আমি সহ্য করতে পারছি না। সংসারেরও সাহায্য হবে ; ওরা দুজনেই তো রোজগার করে।"
অঘোর ঠাকুরের দুটো চোখ রাগে রক্তজবার মত লাল হয়ে গেল, অঘোর সন্নাসীর মতোই দুর্বোধ্য এক হুংকার ছেড়ে, লাল গামছা কাঁধে ফেলে বাইরে বেরিয়ে গেলেন।  মু'আঁধারি সন্ধ্যায় ঘরে ফিরলেন, হ্যারিকেনের আলোয় একটা চিঠিও লিখলেন। কিন্তু সেই চিঠিতে নিরুর উপর অনন্ত দোষারোপের পর, 'পুনশ্চ' বাক্যে লিখে দিলেন, "মৃত্যুর আগে আমি যেন তোমার মুখ না দেখি।"

চিঠি পোস্ট করবার পর ঘরে ফিরে স্ত্রীর ও সন্তানদের মূক, বিষাদবিপন্ন মুখগুলি দেখে অঘোর ঠাকুরের সংবিদ ফিরে এল। ভাবলেন, এতখানি নিষ্ঠুরতা ঠিক হোল না। কিন্তু তখন আর কিছুই করার ছিল না, অনুতপ্ত হওয়া ছাড়া। ধনুক থেকে ব্রহ্মবাণ বেরিয়ে গিয়েছে। ওদিকে নিরঞ্জন সেই চিঠি পেয়ে এমনই ভেঙে পড়েছিল যে তিনদিন আর কলেজেই গেল না। লেখা বার বার জানতে চাইছে, হয়েছেটা কি ? অবশেষে নিরঞ্জন বালিশের তলা থেকে চিঠি বার করে লেখার হাতে দিয়ে বলল, "আমি বাবার ত্যাজ্যপুত্র হয়ে গেলাম।" লেখা বার বার বোঝানোর চেষ্টা করে গেল, "বাবার এই অভিযান সঙ্গত, কিন্তু চল, আমরা যাই, তাঁদের পায়ে অপরাধ স্বীকার করি, তাঁরা অবশ্যই ক্ষমা করে দেবেন।" নিরঞ্জন কোন উত্তর দিল না। জ্যেষ্ঠপুত্রসুলভ অভিমানের সঙ্গে অবিমৃষ্যকারিতাজনিত সন্তাপে বিবশ হয়ে গেল নিরঞ্জন।

অঘোর ঠাকুরের সাংসারিক সমস্ত সুখ, সুখের আশা, সুখের আশ্রয় এবং নিরঞ্জনের নব বিবাহিত জীবনের আবেগ-সংরক্ত সুখের এখানেই সমাপ্তিরেখা টেনে দেওয়া যেত ; কিন্তু জীবনের গতি বিচিত্র, অনিশ্চয়তার বাঁক পদে পদে। নিরঞ্জনের মেজ ভাই, ভরাযৌবন বোধনের ছিল সংসারের প্রতি গভীর টান এবং গ্রামের চাষাভূষো, বাউরী বাগতি, ডোম চুয়াড়, সাঁওতাল শবরদের সঙ্গে ওঠাবসা এবং তাড়ি-মাড়ি মহুয়ার দিকেও অল্পবিস্তর ঝোঁক। কীর্তনীয়া, বাউলদের আখড়ায় আখড়ায় ঘুরে, দু'এক বার গাঁজার কলকেতে দম মেরে বুঝে গিয়েছিল ''সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই"। তাই দাদার বিয়েটাকে সে নিজের বিশ্বাসের জয় বলেই মনে করেছিল। বৌদিকে দেখার জন্যও মনটা ছোঁক্ ছোঁক্ করছিল। বয়সের ধর্ম আর কি ! 

এখন বেহাল সংসারের হাল ধরল সেই। বামুনের কাজকর্ম সম্পূর্ণ ছেড়ে লেগে পড়ল চাষের কাজে। আবার মনে মনে ভাবল, ফেরাতে হবে দাদাকে নইলে মা'টা মরে যাবে অকালে। পূজা পার্বণের কাজ না পেয়ে বাপটাও মুষড়ে পড়েছে। তাই ঘরের কাউকে কিছু না জানিয়েই একদিন তার বর্ণপরিচয় দ্বিতীয় ভাগের বিদ্যা সম্বল করে চিঠি লিখল দাদাকে। বিশেষ অর্থ-অনর্থ না বুঝেই লিখে দিল, "তোমাকে অদ্য না এলে মায়ের 'দুরাবস্থা' ঘটিয়াছে।"
একটি সপ্তাহ কেটেছে সবে, হঠাৎই এমনই এক চৈত্র মাসের বিকালবেলায় সৌভাগ্যপুরের পাড়ায় পাড়ায়, ঘরে ঘরে গুঞ্জন অঘোর ঠাকুরের বড় ছেলে তার 'বেজাত' বউ নিয়ে গাঁয়ে ফিরেছে। বামুন পাড়া ছাড়া বাকি সমস্ত পাড়ার বউ-বিটি থেকে বুড়া-বুড়ি দল বেঁধে এসে হাজির অঘোর ঠাকুরের উঠানে। বউ দেখে তো সবার চোখ চড়কগাছ। কী সুন্দর, কী সুন্দর ! আর ব্যবহারটি দেখলে ? মুখের কথাগুলি ? আহা, কী মিষ্টি, কী মিষ্টি ! 

ব্যাস্, খবর রটে গেল চৈত্রের দমকা হাওয়ার ঢেওয়ে ঢেওয়ে। পরদিন বামুন পাড়ার গিন্নিবান্নি, নবোঢ়া-অনুঢ়ারাও, বুড়োদের বাধার বাঁধ ভেঙে কাত্যায়নীর সংসারে। হ্যাঁ, নূতন বউ এখন কাত্যায়নী দেবীর কোলের কাছটিতেই এসে আশ্রয় নিয়েছে বা উল্টো করে বললে, বৌমাকে পাওয়ার পর থেকে শাশুড়িমা তাকে আর কাছ ছাড়া করেন নি। ফেরার পথে সকলেই একবাক্যে স্বীকার করে গেল, 'সত্যি বউটি রূপে লক্ষ্মী, গুণে সরস্বতী।' কেউ কেউ আবার কাত্যায়নী ঠাকরাণের কাছে আবদার করেও গেল, 'ভোজনটি ফাঁকি দিও না।' আর এইটিই চাইছিল বোধন। দাদাকে গিয়ে বলল, "দাদা, বৌভাতের ব্যবস্থা করতে হবে তো।''
সৌভাগ্যপুর গ্রামে এমন আবেগের মিষ্টান্ন-রসে সিক্ত, সার্বজনীন বৌভাতের ভোজ আগে কেও কখনো দেখেছিল কিনা তাই নিয়ে আলোচনা চলেছিল দিনের পর দিন মাঠের আলে, পুকুরঘাটে, কু্ঁয়োর পাড়ে। কিন্তু আসল আসরটি দেখা গেল তালবাগানের তাড়ির ঝুপড়িতে। গ্রামের বামুন-অবামুন, গোত্র-অপগোত্রের সব যুবকেরা গোল হয়ে বসা, মধ্যমণি বোধন, মধ্যিখানে তাড়ির ভাঁড় নয়, তাড়ির হাঁড়ি। আলোচনার বিষয় লেখা বৌদি। সেই শেষ চৈত্রের পলাশ- রাঙা পড়ন্ত বিকালের, তাড়িখেকো গ্রাম্যযুবকদের প্রগলভ শব্দগুলো নাই বা শোনালাম ; তবে সলজ্জ হাসির মধ্যে বোধনের যে বিজয়ীর গর্ব, তাড়ির ঢোকে ঢোকে ছলকে ছলকে উঠছিল -- তার সেই 'সুখানুভূতি'র প্রকাশ আমি আজও মনে রেখেছি। 

একজন প্রায়-অশিক্ষিত, অ-মার্জিত, মেঠো মানুষ তার অপার, নিষ্কলুষ সত্যের আলোকদীপ্ত ভালোবাসার স্পর্শ দিয়ে নিশ্চিত অনুতাপের দুঃখ থেকে তার পরিবারটিকে বাঁচিয়ে দিয়েছিল, জাতি-বর্ণ-হীন মানবপ্রেমের আমন্ত্রণে স্ববর্ণ-অসবর্ণের বাঁধ ভেঙে দিয়েছিল, অন্তঃসারশূন্য, অসাড়, সংস্কারাচ্ছন্ন পল্লীসমাজে একটি অসবর্ণ বিবাহ অনুষ্ঠানকে উচ্চনীচের ভেদাভেদহীন মিলনোৎসবে পরিণত করে দিয়েছিল ; তাও আবার এই 'প্রগতিশীল' সময়কাল থেকে অর্ধশতাব্দী আগের এক বিদ্যা-বিদ্যালয়শূন্য পাণ্ডববর্জিত দেশে -- সে ঘটনা আজও আমার সুখের স্মৃতি হয়ে বেঁচে আছে।
জনান্তিকে বলে রাখি বোধনের তাড়ির আড্ডার বন্ধু ছিলাম 'আমিও'।
                 (ক্রমশঃ)

দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
০৪/০৩/২০২৬
কলকাতা।
__________________________________









Recently published

অমূল্য

He ( Tagore) who sees all things in his own self and his own self in all things, he does not remain unrevealed.                     ...