সুখ-৩
"যস্মিন্ সর্বাধিক ভূতানি আত্মৈবাভূৎ বিজানতঃ।
তত্র কো মোহঃ কঃ শোক একত্বম্ অনুপশ্যতঃ।।"
(ঈশা উপনিষদ-- মন্ত্র ৭)
বিশ্বময় ভূতবর্গের (প্রাণ ও আপ্রাণ) সঙ্গে যখন একত্বের অনুভূতি হয়, আমার আমি যখন জগৎ সংসারের সমস্ত দেশে কাল ও পাত্রে একাত্ম হয়ে যায়, তখন কোথায় বা শোক, কোথায় বা মোহ ? পৃথকবোধ থেকেই তো ঘৃণা আসে, একাত্মবোধে কোথায় বা ঘৃণা, কোথায় বা সর্বগ্রাসী মোহ ? এই জ্ঞান লাভ করলে শোক দুঃখ মোহ ভয় কিছুই থাকে না।
সুখ ও দুঃখ বিষয়ে আমাদের ঈশা উপনিষদে এত সুন্দর সুন্দর বাণী আছে যা আমাদের সমস্ত দৈহিক ও আত্মিক দুঃখ থেকে মুহূর্তে মুক্তি দান করে, নিরন্তর মৃত্যুভীতি থেকে মুক্ত করে এক প্রশান্ত আনন্দের অনুভূতি জাগায়। বস্তুত আমাদের সকল দুঃখের কারণ হোল এই নিরন্তর মৃত্যুভয়। জীবন যেমন ভাবেই কাটুক না কেন দীর্ঘায়ু লাভের বাসনা, মৃত্যুঞ্জয়ী হবার কামনা, রোগ থেকে রক্ষা পাবার ইচ্ছা যে কত দুর্নিবার, কত উৎকট, অপ্রকৃতিস্থ হতে পারে তার বিভীষিকাময় দৃশ্য আমরা দেখেছি বিগত 'করোনা' বিশ্বমারির সময়কালে। ইতিহাস জুড়ে এমন ঘটনার অন্ত নেই এবং এখনও তা চলেছে। অসংখ্য যুদ্ধের কথা ছেড়ে দিলেও মন্বন্তরে, দুর্ভিক্ষে, ভূমিকম্পে, প্লাবনে, অতি ঝরায়, খরায়, প্লেন-রেল-পথ দুর্ঘটনায় নিরন্তর মৃত্যুমিছিল চলে এসেছে, চলেছে পৃথিবীর সমস্ত দেশে। বর্তমান সময়কালে, এইটি আশা করা গিয়েছিল যে বিজ্ঞান, বিশেষকরে চিকিৎসাবিজ্ঞানের, যানবাহনের এবং আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ব্যবস্থার বৈপ্লবিক উন্নতির ফলে মানুষের এই মৃত্যুভীতির সামান্য হলেও উপসম হবে। হয়নি, বরং বেড়েছে। বিশ্বব্যাপী অনেক বিপর্যয়ের পূর্বাভাস এখন মানুষের আয়ত্বে এবং সে-সব বিপর্যয় প্রশমিত করবার বৈজ্ঞানিক কৌশলও মানুষের জানা ; কিন্তু সেই জ্ঞানে-বিজ্ঞানে-ঋদ্ধ মানবগোষ্ঠী যদি সমষ্টিগতভাবে মানুষের মঙ্গল বিধানের জন্য সাধনার পরিবর্তে সাম্প্রদায়িক, সামাজিক, ধর্মীয় গোষ্ঠীতন্ত্রে বিভাজিত হয়ে যায়, যদি উগ্র রাষ্ট্রতন্ত্রের মন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে সম্প্রসারণবাদী, সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের অশ্বমেধের ঘোড়াকে লাগামহীন তাড়িয়ে দুর্বলতর দেশের উপর শাসন, শোষণ ও রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের উল্লাসে উন্মত্ত হয়ে ওঠে তবে জাগতিক মানবতার সুখের দিন যে কোনদিনও সম্ভাবিত হবে না, বরং স্বর্গীয় সৌন্দর্য এবং অফুরান ঐশ্বর্যে-ভরা এই প্রাণময়ী ধরিত্রী যে নরকে পরিণত হবে - এ-তো দিনের শেষে রাত্রি আসার মতই সত্য। বর্তমান পৃথিবীর দিকে দৃষ্টিপাত করলেই সভ্যতাবিরোধী এই বর্বর-যুগের (মধ্যযুগের ইউরোপ ৮০০ খ্রিঃ থেকে কনস্টান্টিনোপোলের ধংস ১৪৫৩ খ্রিঃ) অন্ধকার আজও ছেয়ে রয়েছে। আমেরিকার, ইস্রায়েলের সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ দেশগুলির সুদীর্ঘকালের দ্বন্দ্ব এতকাল তুষের আগুনের মতো কখনো ধিকি ধিকি, কখনো বা প্যালেস্তাইনের গাজা অঞ্চলে গণচিতার মত স্থানে স্থানে জ্বলছিল, এখন তা দাবানলেল মত ছড়িয়ে পড়েছে ইরান থেকে লেবাননের বেরুট পর্যন্ত। শান্তিকামী বিশ্বব্যবস্থা সম্পূর্ণরূপে বিধ্বস্ত। অগ্নিমুখী "নাগিনীরা দিকে দিকে ফেলিতেছে বিষাক্ত নিঃশ্বাস।"
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরপরই ১৯২৫ এবং ১৯২৬ সালে রবীন্দ্রনাথ দু'দুবার ইটালি যাত্রা করেছিলেন। ২০শ শতকের গোড়ার দিক থেকেই ইংল্যান্ডে তো বটেই, ১৯২১ সাল থেকে ফ্রান্স, সুইজারল্যান্ড (তখন রোমা রোলাঁর সঙ্গে বন্ধুত্ব নিবিড়) ইটালি প্রভৃতি দেশে তাঁর যাতায়াত ছিল নিয়মিত। ইটালিতে মুসোলিনির সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎকার নিয়ে সমগ্র ইউরোপজুড়ে নানা বিরূপ সমালোচনা হয়েছিল সেই সময়, কেননা সেই সময় ইটালিতে মুসোলিনির নেতৃত্বে ন্যাশনাল ফ্যাসিস্ট পার্টি (Partito Nationale Fascista বা PNF) ক্ষমতাসীন ছিল যাদের 'আদর্শ' ছিল সমাজতন্ত্র বিরোধী চরম জাতিয়তাবাদ। এই ক্ষমতাসীন দল ছিল সমস্ত বিরুদ্ধ কণ্ঠস্বরের প্রতি নির্মম ঘাতকস্বরূপ ; ঠিক যেমন জার্মানিতে ন্যাশনাল সোশ্যালিস্ট ওয়ার্কার্স পার্টি, (Nationalsozialistsche Deutsche Arbeiterpartie বা সংক্ষেপে Nazi party, নাৎসি বাহিনী নামেই ইতিহাসে প্রসিদ্ধ)। যাই হোক্ জার্মানির বিষয়ে বারান্তরে আলোচনা করা যাবে।
এখন আমরা ফিরে যাই ওই রবীন্দ্রনাথ ও মুসোলিনি প্রসঙ্গে। সরল ও নিষ্কলুষ মনের আবেগপ্রবণ কবি প্রথম সাক্ষাতে মুসোলিনির মত একজন কুটীল ও ধুরন্ধর একনায়ককে ঠিক চিনতে পারেন নি। মুসোলিনির আতিথেয়তা তাঁকে মুগ্ধ করেছিল এবং তিনি মুসোলিনি ও সমকালের ইতালির প্রসংশাও করছিলেন। সেই সংবাদ তখন বিশ্বের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছিল এবং কবির উদার মানবতাবাদী অন্তরসত্ত্বা বিরুদ্ধ সমালোচনার আঘাতে জর্জরিত হয়ে উঠেছিল। তাঁর সেই দুঃসহ দুঃখের দিনে, তাঁর হয়ে লেখনী-অস্ত্র ধারণ করেছিলেন অভিন্নহৃদয় বন্ধু রোমা রোলাঁ। এই ঘটনা ও ঘটনার পরম্পরা ঐতিহাসিক তাৎপর্যবাহী। সে বিষয়ে সবিস্তারে যাওয়ার অবকাশ এই ক্ষুদ্র প্রবন্ধটিতে সম্ভব না হলেও আমরা সেই সময়ে একনায়কতন্ত্র, নিষ্ঠুর রাষ্ট্রতন্ত্র ও চরম জাতিয়তাবাদের বিরোধিতায় তিনি কি মত পোষণ করতেন এবং কতখানি ধিক্কার জানিয়েছিলেন তার উদাহরণ রয়েছে তাঁর একখানি ঐতিহাসিক পত্রে যেটি তিনি লিখেছিলেন ৫ই আগষ্ট, ১৯২৬ সালে, 'ম্যানচেস্টার গার্ডিয়ান'( Manchester Guardian)-এর ঠিকানায়। দীর্ঘ এই চিঠির অতি সামান্য কিছু অংশ,
"I have said over and over again that the aggressive spirit of nationalism and imperialism, religiously cultivated by most of the nations of the West, is a menace to the whole world. The demonstration that it produces in European politics is sure to have disastrous effects, especially upon the peoples of the East who are helpless to exploit the western methods of exploitation. It would be most foolish, if it were not almost criminal, to express my admiration for a political ideal which openly declares its loyalty to brute force as the motive power of civilization. The barbarism is not altogether incompatible with material prosperity may be taken for granted, but the cost is terribly great ; indeed it is fatal. The work of unscrupulous force as the vehicle of nationalism keeps ignited the fire of international jealousy, and makes for universal incendiarism, for a fearful orgy of devastation. The mischief of the infection of this mortal aberration is great because today the races of humanity have come close together, and any process of destruction set going does work on an enormously vast scale. Knowing all this, could it be believed that I should have played my fiddle while an unholy fire was being fed with human sacrifice ?"
'Aggressive spirit of nationalism religiously cultivated by most of the nations of the West' পাশ্চাত্যের বহু রাষ্ট্রের ধর্মান্ধতাপুষ্ট চরম আগ্রাসনবাদী সাম্রাজ্যবাদ ও জাতিয়তাবাদের উগ্রসুরা 'is menance to the whole world'-- সমগ্র বিশ্বের কাছে এক ভয়াবহ সর্বনাশ। এর পর এই চিঠির শব্দে শব্দে, পঙক্তিতে পঙক্তিতে তিনি যুদ্ধোন্মাদ ইউরোপের যে ধর্মীয়, রাজনৈতিক ও অমানবিক রাষ্ট্রচরিত্রের বহিরাবরণ উন্মোচন করেছেন, সভ্যতাগর্বী পাশ্চাত্যের হিংস্রতার নগ্নরূপ অনাবৃত করে দিয়েছেন তা শুধু তাঁর সময়কালের জন্যই প্রাসঙ্গিক ছিল এমন নয়, আজও যাঁরা প্রভাতী সংবাদ শোনবার জন্যে সংবাদপত্রের পাতা খোলেন বা সংবাদ মাধ্যমের পর্দায় চোখ রাখেন তাঁরাও সেই একই পরিবর্তনহীন দৃশ্যের সম্মুখীন হন প্রতিটি দিন -- দূর অতীতের ১৯২৬ সাল থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত, একটি সম্পূর্ণ শতাব্দী অতিক্রান্ত হবার পরও। শতাব্দীপূর্বে আমাদের দূরদর্শী ঋষিকবি নিষ্ঠুর রাষ্ট্রযন্ত্রের, উন্মত্ত জাত্যাভিমানের নারকীয় পরিণাম অনুধাবন করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তাই এমন অকুতোভয়, বীরত্বব্যঞ্জক, ক্ষমতালোলুপতার বিরুদ্ধে ভর্ৎসনার ভাষা ; যেন নিষ্কোষিত তলোয়ার, যা নিয়ে সমরাস্ত্রের-দম্ভে অন্ধ, উদ্ধতমস্তক ইউরোপীয় আগ্রাসনের বিরুদ্ধে একজন অপরাজেয় সৈনিকের রূপ ধারণ করেছিলেন এবং লিখেছিলেন "Knowing all this, could it be believed that I should have played my fiddle while an unholy fire was being fed with human sacrifice ?"
না, রবীন্দ্রনাথের এই সব্যসাচীর রূপ আত্মবিস্মৃত বাঙালি জাতির অন্তরে আজ আর জাগ্রত আছে কিনা সন্দেহ জাগে যখন দেখি 'তাঁর দেশ, তাঁর 'মা ভৈঃ' মন্ত্রে দীক্ষিত সমাজ' আত্মসংবিদহারা, সাম্প্রদায়িকতার মাদকাসক্ত এবং একতাছিন্ন আত্মহননে লিপ্ত। যাঁরা জানেন রবীন্দ্রনাথ আনন্দবাদী ছিলেন, ললিত লতার পেলবতায় প্রেমের গান লিখে গিয়েছেন, বর্ষা-শরৎ-বসন্তে নৃত্য করবার ছন্দোময় সুর সৃষ্টি করে গিয়েছেন তাঁরা যোদ্ধৃবেশের রবীন্দ্রনাথকে হয় চিনতে পারেন নি, নয় তো হীনমন্যতাবোধে উপেক্ষা করে গিয়েছেন ; না হয়, দুই চোখ দুই হাতে ঢেকে সেই আগুন ঝরানো লেখা 'সভ্যতার সংকট' ও 'মানহারা মানবতার' নবোদ্বোধনের রচনাসমূহ এবং বিভিন্ন বক্তৃতার তীব্র তীক্ষ্ণ দীপ্র উচ্চারণের বাণীর দলিলগুলি বিস্মৃতির অন্ধঘরে তালাবন্ধ করে রেখে দিয়েছেন।
এতক্ষণ রবীন্দ্রনাথের ইতিহাসপ্রসিদ্ধ একটি চিঠির কিয়দংশ উদ্ধার করেছি আমাদের মূল বক্তব্য থেকে সরে আসার জন্য নয় ; বরং মানুষের প্রকৃত সুখ কি এবং কোথায় তার হদিশ পাওয়ার জন্য। এ প্রসঙ্গে তাঁর একটি স্বল্পশ্রুত সঙ্গীত সম্পূর্ণ উদ্ধার করি,
"বাধা দিলে বাধবে লড়াই
মরতে হবে।
পথ জুড়ে কি করবি বড়াই,
সরতে হবে।
লুট-করা ধন ক'রে জড়ো
কে হতে চাস সবার বড়ো,
এক নিমেষে পথের ধূলায়
পড়তে হবে।
নাড়া দিতে গিয়ে তোমায়
নড়তে হবে।।
নিচে বসে আছিস কে রে,
কাঁদিস কেন।
লজ্জাডোরে আপনাকে
বাঁধিস কেন।
ধনী যে তুই দুঃখধনে
সেই কথাটি রাখিস মনে,
ধুলার 'পরে স্বর্গ তোমায়
গড়তে হবে।
বিনা অস্ত্র, বিনা সহায়
লড়তে হবে।।"
বীরের সুখ এখানেই। "ধনী যে তুই দুঃখধনে।" দুঃখের ভিতরে সুখ, শোকের অন্তরে আত্মোপলব্ধির আনন্দ, দারিদ্র্যের গ্লানির অন্তরে অপরাজেয় প্রাণের ঐশ্বর্যের ভাবনা তিনি আমাদের দিয়ে গিয়েছেন এই বিশ্বাসেই যে, পরাধীন, শোষণে-ত্রাশনে নিষ্প্রাণ ভারতের 'সুখের' সম্ভাবনার উৎস নিহিত আছে দুঃখী মানুষের একাত্মবোধের মধ্যে। তিনি জানতেন 'ঐক্যবদ্ধ' হওয়ার তাগিদ আসে ব্যক্তিক স্বার্থপরতার তাড়নায় যা ক্ষণভঙ্গুর, কিন্তু একাত্মতার প্রেরণা আসে মানবপ্রেমের ধর্মে। সকলের সুখের মধ্যে, সমাজের, দেশের, এমনকি, বিশ্বসংসারের সুখের ভিতর সুখের সন্ধান করাই নিরন্তর দুঃখ থেকে চিরন্তন মুক্তি ; অন্যথায় 'সুখ' হিংসায় উন্মত্ত, হৃদয়হীন, রুক্ষ, মরুময় পৃথিবীতে চির-অপসৃয়মান মরীচিকা।
"ধূলার পরে স্বর্গ তোমায়
গড়তে হবে।।"
দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
০৭/০৩/ ২০২৬
কলকাতা।
_____________________________________
খুবই ভাল
উত্তরমুছুন