শনিবার, ৩০ আগস্ট, ২০২৫

শ্রীমদ্ভগবত গীতায় অর্জুন--৯


শ্রীমদ্ভগবত গীতায় অর্জুন--৯ 


দশম অধ্যায়ের ২০তম ভাষণে শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, হে নিদ্রাজয়ী অর্জুন (গুড়াকেশ), এই চরাচরপরিব্যপ্ত মহাবিশ্বের সমস্ত ভূতকুলের অন্তরস্থিত আত্মা আমি, আমিই সৃষ্টি স্থিতি লয়, দ্বাদশ অদিতিপুত্রের মধ্যে  আদিত্য। আমি বিষ্ণু, পবনদের মধ্যে মরীচি এবং নক্ষত্রদের মধ্যে চন্দ্রমা। আমি চতুর্বেদের সামবেদ, দেবতাদের মধ্যে ইন্দ্র, ইন্দ্রিয়গুলির মধ্যে মন এবং 'ভূতানাম্ চেতনা'। আমি একাদশ রুদ্রের সর্বশ্রেষ্ঠ শঙ্কর, দক্ষ-যক্ষদের মধ্যে কুবের, অষ্টবসুর আমি অগ্নি, পর্বতের সুমেরু, পুরোধাদের মধ্যমণি আমি বৃহস্পতি, যোদ্ধৃকুলে কার্তিকেয়, সরোবরের মধ্যে সাগর। আমি ভৃগু, আমি অক্ষর ও ওঁ-কার। আমি স্থাবরে হিমালয়, অস্থাবরে জপযজ্ঞ , সাধন আরাধনা সকলই। আমি বৃক্ষদের মধ্যে অশ্বত্থ, দেবর্ষিদের মধ্যে নারদ, আমি গন্ধর্বদের মধ্যে  চিত্ররথ, তপোসিদ্ধ মুনি দের মধ্যে কপিল।
____________________________________________

                            ব্যাখ্যা
এই কপিল বা কপিলমুনি কে, যিনি ঈশ্বরপ্রমান পুরুষ ? যার কথা এখানে স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ উল্লেখ করছেন। সমকালের আর্যাবর্তে দেবল, শোনক, ব্যাস, গৌতমাদি  মহা মহা সব ঋষি মুনিগণ থাকতে কৃষ্ণ কেন‌ বলছেন -- আমি "সিদ্ধানাং কপিলো মুনি।" এই কপিল সম্মন্ধে আমরা যতটুকু জানতে পেরেছি তারই সামান্যটুকু আলোচনা করি।
ভারতবর্ষে বেদসংহিতা, ব্রাহ্মণ, বেদান্ত (উপনিষদ) ও পুরাণ কথিত ধর্মমত ও ধর্মাচরণের সাথে সাথে নিরীশ্বরবাদী, বেদান্তের 'পরমাত্মা' ধারণার বিপরীতমুখী 'তান্ত্রিকতা বা তন্ত্রবাদ বা প্রকৃতি-পুরুষবাদ' আর্যাবর্তের গণ্ডির বাইরে ন-আর্য জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রবলভাবে প্রভাব বিস্তার করেছিল। তান্ত্রিক ধ্যান-ধারণার প্রধানতম ক্ষেত্র 'বাংলাদেশ' তথা অখণ্ড ভারতবর্ষের পূর্বদেশ। সাংখ্যের বা সাংখ্য মতবাদের সাথে তন্ত্রের গভীর মিল রয়েছে। কেননা, যে-মাতৃপ্রধান চেতনার মধ্যে তন্ত্রের উৎস খুঁজে পাওয়া যায় (প্রকৃতি ও পুরুষের মিলনই সৃষ্টির কারণস্বরূপ) তার মধ্যেই সাংখ্যের উৎপত্তিও আবিস্কার করা অসম্ভব নয়। গৌড়পাদের 'সাংখ্য-কারিকার' ভাষ্যে বলা হয়েছে, 

"যথা স্ত্রীপুরুষসংযোগাৎ সুতোৎপত্তিস্তথা প্রদান পুরুষসংযোগাৎ সর্গস্যোৎপত্তি।।" 

যেমন স্ত্রীপুরুষের মিলনে সন্তানের উৎপত্তি হয় সেইরূপ 'প্রধানপুরুষের' সংযোগে সৃষ্টির উৎপত্তি।
আর এই সাংখ্য মতবাদের প্রবক্তা 'কপিল মুনি'। মহামোহপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী মহাশয় (বৌদ্ধধর্ম গ্রন্থে) লিখছেন,
"সাংখ্যমত 'কপিলের মত', চিরকালের প্রবাদ। কপিলের বাড়ি পূর্বাঞ্চলে, অর্থাৎ 'বঙ্গবগধচের'দের দেশে। গঙ্গাসাগর যাইতে 'কপিলের আশ্রম আছে, কবতক্ষের ধারে কপিলমুনির গ্রাম। কপিলবাস্তুও কপিল মুনির বাস্তু। কারণ অশ্বঘোষ বলিতেছেন, 'গোতমঃ কপিল নাম মুণিধর্মভূতাং বরং।।' বাস্তবিকও কপিলকে কেহ ঋষি বলে না। তাঁহার নাম করিতে গেলেই বলে আদিবিদ্বান। বাল্মীকি যেমন আদিকবি তিনিও তেমনি আদিবিদ্বান। শ্বেতাশ্বতর উপনিষদে কপিলকে 'পরমর্ষি' বলা হইয়াছে, কিন্তু ভাব ভাষা ও মত দেখিলে এ-খানিকে অল্পদিনের পুস্তক বলিয়াই মনে হয়। সাংখ্য ও যোগের যে সমস্ত পুস্তক পাওয়া যায়‌ সেগুলিকে অর্বাচীন বলে মনে হয়। কিন্তু অশ্বঘোষের লেখা ও কৌটিল্যের উক্তি দেখিয়া সাংখ্য যে খুব প্রাচীন তাহা বেশ অনুভূত হয়। ...... উপরের লেখা হইতে তিনটি কথা বুঝা যায়‌ যে ,সাংখ্য মত সকলের চাইতে পুরাণ, উহা মানুষের করা এবং পূর্বদেশের মানুষের করা। উহা বৈদিক আর্যদের মত নহে, বঙ্গবগধ ও চেরজাতির কোন আদিবিদ্বানের মত। 


বেদ পরবর্তী বা বেদের সময়কালেই, অর্থাৎ খ্রিঃপূঃ প্রায় দেড় হাজার বছর আগে ('ব্রাহ্মণ' গ্রন্থগুলির রচনা পর্যায়ের সময়কালের সামান্য পরে ; যেমন 'শতপথ ব্রাহ্মণের' রচনাকাল আনুঃ খ্রিষ্টপূর্ব দশম শতাব্দী)। তাই মহাভারত পুরাণ কাহিনী সংঘটনের কালে শ্রীকৃষ্ণ যখন বলছেন "মুনিগণের মধ্যে আমি কপিল" তখন দুইটি সিদ্ধান্তে উপনিত হওয়া যায়‌ ---- এক, কপিল মুনি তাঁদের পূর্ববর্তী ও প্রাচীন এবং কপিলের 'সাংখ্যযোগ' (পুরুষপ্রধান) দর্শনের 'প্রকৃতি-পুরুষবাদ'-এর তিনি সমর্থক। তবে তিনি (শ্রীকৃষ্ণ) ন-আর্য সম্প্রদায়ের কঠোর বাস্তববাদী 'প্রকৃতিপ্রাধান্যকে' লঘু করে 'পুরুষপ্রধান' সৃষ্টিতত্ত্বের প্রতিষ্ঠা করবার প্রয়াস পেয়েছেন। সেই পুরুষপ্রাধান্য 'আমি'-তে এবং ধীরে ধীরে ক্রমোত্তরণের পথে সেই 'আমি' সৃষ্টিপরিব্যাপ্ত মহাচৈতন্যস্বরূপ 'আমিত্বে' রূপান্তরিত হয়েছে --- যা ,উপনিষদ-সিদ্ধ পরমব্রহ্ম বা পরমাত্মা।
_______________________________________________

তিনি আরো বলছেন, অশ্বদের মধ্যে তিনি উচ্চৈশ্রবা, হস্তিদের মধ্যে ঐরাবত, মানুষের মধ্যে রাজা, অস্ত্রসমুহের মধ্যে বজ্র, ধেনুদের মধ্যে কামধেনু। তিনিই সন্তান উৎপাদনের হেতু কন্দর্প (কামদেব) এবং সর্পরাজ বাসুকি। তিনিই শেষনাগ, জলচরদের আশ্রয় দেবতা বরুণ, পরম পিতা 'অর্যমা' (আদিত্যমাতা অদিতির তৃতীয় পুত্র) এবং শাসনকর্তাদের মধ্যে যমরাজ। দৈত্যকুলে তিনি প্রহ্লাদ, তিনিই কাল (সময়ের গণনার চরম বিষয়), পশুদের  মধ্যে পশুরাজ সিংহ। তিনিই ধনুর্ধারীদের মধ্যে রামচন্দ্র, তিনি পবিত্র বায়ু, মৎস্য রাজ্যের তিনি মকর এবং নদীগুলির মধ্যে তিনি জাহ্নবী।
সমগ্র সৃষ্টিজুড়ে যা কিছু মহতো-মহীয়ান, গরীয়ান-গরিষ্ঠ,  শ্রেয়ান-শ্রেষ্ঠ -- ভগবান শ্রীকৃষ্ণ সেই রূপই পরিগ্রহ করে আছেন। শুধু তাই নয়, এই জগতসংসারের যা কিছু সৃষ্টি তাদের আদি ও অন্ত তিনিই। বিদ্যার মধ্যে তিনি অধ্যাত্মবিদ্যা, বিবাদাত্মক তত্ববিদ্যার 'বাদ' বা শেষ সিদ্ধান্তও তিনি। তিনি অক্ষরের আদি 'অ'-কার, সমাসের মধ্যে তিনি 'দ্বন্দ্ব', কালের তিনি মহাকাল, তিনি বিরাট 'বিশ্বরূপ' এবং সকল ভূতজগতের ধারণকারী ও পোষণকারী। তিনি বিনাশকারী 'মৃত্যু', ও পুনর্জন্মের কারণ। তিনি সমস্ত নারীদের গুণসমুহের সংহত রূপ 'কীর্তি' সহ গুণাবলি--- শ্রী, বাণী, স্মৃতি, মেধা, ধৃতি ও‌ ক্ষমা। সৎরূপে তিনি সাম, ছন্দের‌ মধ্যে গায়ত্রী, মাসের মধ্যে  অগ্রহায়ণ, "ঋতুনাম্ কুসুমাকরঃ " (বসন্ত ঋতু)।
শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, জীবাত্মার মধ্যে যা কিছু 'গুণ অপগুণ' তিনি তাও। প্রতারণা বা ছলনাপূর্ণ 'জুয়াখেলা', বিজয়ী পুরুষদের বা বিজয়ীর অহংকার। তিনিই আবার প্রতিজ্ঞাত পুরুষদের 'নিশ্চিত প্রতিজ্ঞা', সাত্ত্বিক পুরুষদের ''সাত্ত্বিকী' ভাব। দেখ সখা (অত্যন্ত বিস্ময়করভাবে বলছেন),  আমি যেমন বৃষ্ঞী বংশের (যাদবদের অন্তর্গত একটি স্বতন্ত্র গোষ্ঠী) বসুদেবসূত বাসুদেব, তেমনি পাণ্ডবদের মধ্যে ধনঞ্জয় (তোমার সত্ত্বার মধ্যেও)। আমিই মুনিশ্রেষ্ঠ ব্যাসদেব এবং কবিশ্রেষ্ঠ শুক্রাচার্য। দমনকারীর 'দণ্ড' শক্তি, জয়েচ্ছুদের 'জিগীষা', গুহ্যভাবের 'মহামৌন', জ্ঞানীদের 'জ্ঞান' এই 'আমি' --(তোমার সম্মুখে বর্তমান)। এই 'আমিই' তাই সমস্ত ভূতজগত, সকল ভাবজগতের অস্তিত্ব। দেখ অর্জুন, আমার যে অপার 'বিভূতি'র কথা তুমি জানতে চাইছো তা অসীম, অপার, অন্তহীন। এতক্ষণ যতটুকু তোমায় জানালাম তা অত্যাতি সংক্ষিপ্ত (এষঃ তুদ্দেশতঃ প্রোক্তঃ)। এই জগতচরাচরে যা কিছু প্রবল শক্তিশালী ঐশ্বর্যসমন্বিত--- সবকিছুই আমারই তেজাংসম্ভূত (মম তেজহংশসম্ভবম্)।
_______________________________________________

                             ব্যাখ্যা
শ্রীকৃষ্ণের এই বাণীর সঙ্গে 'শ্রীভাগবতম্'-এর একাদশ স্কন্ধের  ৪১তম শ্লোকটির কী অপূর্ব মিল ! --- 

"খং বায়ুম অগ্নিং সলিলং মহীং চ
জ্যোতিংষি সত্ত্বানি দিশো দ্রুমাদিন্।
সরিৎ সমুদ্রাংশ্চ হরেঃ শরীরং
যৎ কিঞ্চ ভূতং প্রণমেৎ অনন্যঃ ।।" 

আকাশ, বাতাস, অগ্নি, জল ---- এমনকি সমগ্র ধরিত্রী, পশু প্রাণী, দিক সকল, বৃক্ষ, নদী, সমুদ্র ---- যা কিছু দৃশ্যমান ও দৃষ্টির বাইরে সমস্তই যে শ্রীহরিরই শরীর --- তাঁকে প্রণাম করি।
সেই একই কথা, প্রকৃতির দৃশ্যজগৎ --- ধরা থেকে অ-ধরা বিপুল এই ব্রহ্মাণ্ড --- সমস্ত কিছুই আমি, আমার মধ্যেই সমস্ত কিছু। কিন্তু এখানেই আমার 'পূর্ণতা' বা 'পূর্ণ 'আমির' শেষ নয়। আমার বিভূতি-বৈভবঋদ্ধ সত্ত্বার এই বহুত্বের এবং অন্তহীনতার ধারণায় তোমার কিসের প্রয়োজন ? আমার 'আমিরূপের' মাত্র একাংশ দ্বারা আমি 'মায়ার বিভূতিতে আবরিত করে' বিশ্বব্রহ্মাণ্ড  ধারণ করে আছি।

"অথবা বহুনৈতেন কিং জ্ঞাতেন তবার্জুন।
বিষ্টভ্য অহমিদম কৃৎস্নমেকাংশেন স্থিতো জগৎ।।" 

''আমি'রূপের একাং'' দ্বারা সমস্ত জগৎকে ধারণ করে আছেন যিনি সেই অনন্তসত্তার মূর্ত বিগ্রহ রূপে শ্রীকৃষ্ণ। তিনি বার বার 'বিভূতি'র কথা বলছেন এবং বলেছেন। টিকাকারেরা "যৎ যৎ বিভূতিমৎ সত্ত্বম"-কে মায়ার দ্বারা আচ্ছন্ন বস্তু বলছেন। কোন কোন টিকাকার এই 'মায়া'-কে 'যোগমায়া'ও বলেছেন।
'বিভূতি', 'মায়া' বা 'যোগমায়া' শব্দগুলির প্রকৃত অর্থ বা ব্যঞ্জনা বেশ জটীল। বেদকেই যদি আদিমতম সাহিত্য (যদিও প্রাথমিকভাবে 'শ্রুতি'রূপে) ধরি তার প্রথম প্রকাশিত ঋগ্বেদেই 'মায়ার' উল্লেখ আমরা পাই" ঋগ্বেদে  মায়ার কথা আছে ; কিন্তু  বৈদান্তিক অর্থে 'মায়াবাদ' (শঙ্করাচার্য বর্ণিত) নেই --- বড়জোর ঋগ্বেদের অর্বাচীন অংশে (স্মরণে রাখতে হবে যে দশসহস্রাধিক মন্ত্রসমন্বিত ঋগ্বেদ সৃষ্টি হয়েছিল প্রায়  দুই হাজার বছর ধরে) মায়াবাদের আভাস দেখা দিয়েছে। মায়াবাদের পরিবর্তে ঋগ্বেদে দেখা যায়‌ দেবতাদের প্রজ্ঞা বা কৌশলের নাম হোল মায়া।" সেই সঙ্গে মায়া অর্থে যাদুশক্তির আভাসও আছে। কিন্তু বেদান্তে এসে (বেদের পর 'ব্রাহ্মণ', 'ব্রাহ্মণ'এর পর 'আরণ্যক ও বেদান্ত') বৈদিক ঐতিহ্যের ধারক বৈদান্তিকেরাই ঋগ্বেদের প্রাক-অধ্যাত্মবাদী, প্রাক-ভাববাদী চেতনার ধংসস্তুপের উপর ভাববাদের  প্রাসাদ গড়ে তুলেছিলেন এবং সেই ভাববাদের প্রধানতম ভিত্তি বলতে 'মায়াবাদ'ই।
('লোকায়ত দর্শন'--- দে.প্র.চট্টোপাধ্যায়, স়ংক্ষিপ্তাকারে)
ঋগ্বেদের একটি মন্ত্রে বলা হয়েছে,‌ 

"ধর্মণা মিত্রা বরুণা বিপশ্চিতা ব্রতা
                       রক্ষতে অসুরস্য মায়য়া।
ঋতেন বিশ্বং ভূবনং বি রাজথঃ
                       সূর্য মা ধত্থো দিবি চিত্রং রথম্।।"
                                              (ঋগ্বেদঃ ৫.৬৩.৭) 

হে প্রাজ্ঞ মিত্রা বরুণগণ, তোমরা ধর্মদ্বারা ও অসুরের মায়া দ্বারা যজ্ঞসমূহ রক্ষা কর, ঋতদ্বারা এই বিশ্বভূবনকে দীপ্যমান কর, সূর্যকে তাহার বিচিত্র রথসহ ধারণ করিয়া থাক।
'মায়া' ন-আর্য সম্প্রদায়ের আয়ত্বাধীন --- এমন ধারণা বেদ হতে পুরাণ পর্যন্ত সর্বত্র লক্ষণীয়। সমুদ্রমন্থনের সময় মায়াবী অসুর রাহু কেতুর 'কীর্তি' থেকে আরম্ভ করে রামায়ণ, মহাভারতসহ সমস্ত পুরাণকাহিনীতে শত সহস্র আসুরী মায়ার উদাহরণ আছে। সেই 'মায়া' যা প্রাগার্য যুগ থেকে আসা ব্যক্তিক কৌশল বা ঐন্দ্রজালিক কোন শক্তির বিষয় বোঝাতো তাই বেদ পরবর্তী কালে এসে অধ্যাত্মিক তত্ত্বের এক বিশেষ উপাদানরূপে প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল, যখন উপনিষদীয় ঋষিগণ 'ব্রহ্মবাদ' ব্যাখ্যা করলেন। মায়া থেকে 'মায়াবাদের' প্রধানতম প্রবক্তা শঙ্করাচার্য। 'সর্বমিদং খলু ব্রহ্ম' থেকে 'ব্রহ্ম সত্য জগন্মিথ্যা'। ইন্দ্রিয় অনুভূত জগৎ, দৃশ্য্যজগৎ মায়া, যা সত্যরূপ ব্রহ্মকে আবরিত করে আছে। 

(ভাগবৎ পুরাণে 'যোগমায়া'র কথা সবিস্তারে বর্ণিত আছে।)

যাই হোক্, 'দশম অধ্যায়ের' শেষ শ্লোকে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তাঁর অসীম, অন্তহীন ঐশ্বর্যমণ্ডিত সত্ত্বার সামান্য একটুখানি ঝলক দিয়েছেন 'এই বলে যে "আমার বিভূতির (দৈব মায়া) একাংশ দ্বারা সম্পূর্ণ এই জগৎ ধারণ করে স্থিত আছি। 'বহু' বা বিচিত্র বিরাটকে "কিম জ্ঞাতেন তবার্জুন ?" অর্থাৎ মানুষের সীমিত চেতনায় নিখিল ভূবন সত্ত্বাকে জানা যায় না। সেই 'বিরাটের' আশ্রয় নেওয়া যায়‌।।
_____________________________________________
পরবর্তী দশম পর্বে আমরা 'একাদশ অধ্যায়' নিয়ে আলোচনা করব।
                     (ক্রমশঃ)
দুলাল চন্দ্র বন্দোপাধ্যায়
৩০শে আগষ্ট, ২০২৫
ব্যাঙ্গালোর।





বৃহস্পতিবার, ২১ আগস্ট, ২০২৫

শ্রীমদ্ভগবত গীতায় অর্জুন--৮


শ্রীমদ্ভগবত গীতায় অর্জুন -৮

ধীরে ধীরে আমরা শ্রীমদ্ভগবদ্ গীতার দশম অধ্যায়ে প্রবেশ করলাম। আজ এই বছরের পবিত্র জন্মাষ্টমী তিথিও সমাপন হোল। পরমপুরুষ শ্রীকৃষ্ণ ভগবান আজিও এই ভারতবর্ষে এবং পৃথিবীর অন্যান্য বহু দেশের মানবসমাজে ভক্তি ও প্রেমভাবনার বিগ্রহরূপে পূজিত। এই ভক্তি ও প্রেমের দ্বারা ঈশ্বর আরাধনার যে পথ তার দিশা প্রথম দেখিয়েছেন পার্থসারথি সুদর্শনধারী শ্রীকৃষ্ণ স্বয়ং ; তাঁরই শ্রীমুখনিঃসৃত বাণীর সংহিতা শ্রী গীতায়।  ক্ষণপূর্বে আলোচিত নবম অধ্যায়ের শেষ মহাবচনে উচ্চারণ করলেন, --- "মন্মনা, মদ্ভক্তা, মদ্ যাজী' ও মৎপরায়ণ" হয়ে, আমাকেই ভজনা কর। যতক্ষণ সাধারণ মানুষের পক্ষে দুরাচরণীয় পরমেশ্বর সাধনার কথা তিনি বলেছেন ততক্ষণ অর্জুন থেকেছেন নিরুত্তর, নির্বাক। তাই কি এই ভক্তিমার্গের দিগদর্শন ? 

সে যাই হোক্, গীতায় উল্লেখিত এই ভক্তির পথ ও ভক্তিপথের দিশা নির্ধারিত হবার পর থেকেই ভারতবর্ষে  ভক্তি আন্দোলনের সূচনা হয়েছে এবং শ্রীমদ্ভগবদ্ গীতাই এই আন্দোলনের উৎস। অবশ্য দেশের ও বিদেশের অনেক মহান বেদ-পুরাণবিদ গবেষক ও সাধকের মতে ভক্তি আন্দোলনের বীজ উপ্ত হয়েছিল উপনিষদ ও আরণ্যক যুগেই --- শ্রীগীতার (খ্রিষ্টপূর্ব পঞ্চম থেকে খ্রিষ্টপূর্ব দ্বিতীয় শতাব্দীর) আবির্ভাবের পূর্বযুগেই --- প্রাচীনতর কঠ ও শ্বেতাশ্বতর উপনিষদে 'পরমাত্মন' আরাধনায় 'ভক্তি ও প্রেমের' আভাসিত উল্লেখ আছে।

নবম অধ্যায়ে শ্রীকৃষ্ণ "প্রেম ভক্তির" পথের কথা যখন ‌ বলছেন তখন অর্জুনের সাথে সাথে আবহমানকালের ঈশ্বরভক্তকুলের মনে হতেই পারে যে এ পথ হয়তো কিঞ্চিৎ হলেও‌ সুগম ; কিন্তু কতখানি সে পথ 'সুগম' তাই আমরা আলোচনা করবার চেষ্টা করি দশম অধ্যায় ও পরবর্তী সাতটি অধ্যায়ের 'কৃষ্ণার্জুন' সংবাদে। দ্বিতীয় অধ্যায়ের 'সাংখ্যযোগে', তৃতীয় অধ্যায়ের 'কর্মযোগে' যে কঠিন ও কঠোর যোগব্রতের উপদেশ শ্রীকৃষ্ণ দিয়েছিলেন। সেই 'যোগব্রত'- সম্মন্ধে বলতে গিয়ে তিনি চতুর্থ অধ্যায়ের প্রথম শ্লোকটিতে বলেছেন, দেখ অর্জুন, এই যোগসাধনার পরম্পরা বহুকাল থেকে লুপ্ত হয়ে আছে। আদিকালে আমি এবম্প্রকার যোগের কথা সূর্যকে বলেছিলাম, সূর্যের কাছ থেকে সূর্যপুত্র বিবস্বান, পরে মনু মহারাজ হয়ে রাজা ইক্ষ্বাকু এবং ইক্ষ্বাকু থেকে রাজর্ষিগণ জেনেছিলেন। এখন 'তোমার এবং আমারও' বহু জন্ম অতীত হয়ে যাবার পর আবারও আমি চাই এই যোগ সাধনার পুনঃপ্রবর্তণ, পুনরাচরণ। 

(মাঝখানের জন্ম জন্মান্তর কাল ধরে তবে কোন্ সে ঈশ্বর আরাধনার পন্থা‌ মানুষের অনুসরণীয় ছিল? না কি সেই সময়কালটি লোকায়তিক ও নিরীশ্বরবাদীদের  প্রচারিত ধর্মধারণা ও জীবনাচরণের আদর্শ অনুসৃত হোত ? এমত অত্যন্ত নিগূঢ়, অব্যাখ্যাত কিছু ঐতিহাসিক প্রশ্ন উত্থিত হয়েছে মহান ধর্মতাত্ত্বিক গবেষক 'দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়ের 'লোকায়ত দর্শনে'। উপসংহারে আলোচ্য

এই নবম অধ্যায় থেকে ভক্তিযোগ। এখানে ভগবান প্রেমবিগ্রহ এবং সখা অর্জুনের সঙ্গে পরম সুহৃদ-সম্মন্ধে বাঁধা। তাই দশম অধ্যায়ের প্রথম শ্লোকটিতেই তিনি বলছেন, দেখ মহাবাহু অর্জুন, তুমি আমার প্রিয় সখা, 'প্রীয়মানায়' (সংস্কৃত ভাষায় 'ঈ'-কারও প্রচলিত), তোমার হিতাকাঙ্ক্ষী, তাই তোমার মঙ্গলের জন্যই বলছি --- 'প্রীয়মানায় বক্ষামি হিতকাম্যয়া।" 

বলছেন, 'আমি সৃষ্টির আদি', সৃষ্টির প্রয়োজনে আমার অবতারত্ব বা লীলাবিলাস অপরাপর দেবতাগণ, মহর্ষিবৃন্দ--- তাঁদেরও অধিগম্য নয়। কেননা আমিই যে আদি কারণ। (যে আত্মা জীবাত্মারূপে আবির্ভূত হয়েছেন, তাঁর মহিমা কল্পনাতীত। তিনিই সর্বশ্রেষ্ঠ মহিমময় দেবতা, তিনি কালাতিকাল বিরাজমান ; তিনিই একমাত্র দেবতা যিনি অতীতেও ছিলেন, বর্তমানেও আছেন, ভবিস্যতেও থাকবেন। --- স্বামী বিবেকানন্দ।  তিনি আদি সত্ত্বা। "সর্বস্য জগতো বীজভূতম্"-- --শঙ্করাচার্য।) 

অতএব, হে প্রিয়সখা, তত্ত্বজ্ঞানের দ্বারা এই অনাদি, জন্মরহিত, সর্বলোকে পরমেশ্বররূপে আমাকে যাঁরা জানেন, তাঁরা এও জানেন যে বুদ্ধি -জ্ঞান- ক্ষমা-সত্যোপলব্ধি, নির্মোহতা, সংযম, সুখ দুঃখ, উৎপত্তি-প্রলয়, ভয়-অভয় ভাব, এবং --- ---

অহিংসা সমতা তুষ্টিস্তপো দানং যশোহযশঃ।
ভবন্তি ভাবা ভূতানাং মত্ত এব পৃথগ্বিধাঃ।। 

--- অহিংসা, সমতা প্রভৃতি নানা প্রকারের (পৃথগ্বিধা) যে ভাবগুলি মানুষের প্রকৃতিতে প্রকাশ পায় তা সবই আমা থেকেই উৎসারিত হয়। ব্রহ্মজ্ঞানী মহা মহা ঋষি, সনক ইত্যাদি পুরুষগণ, স্বায়ম্ভ ইত্যাদি চতুর্দশ মনু (মানবগণ) আমার ভাব নিয়ে (ঈশ্বর ও মানব, জীবাত্মা ও পরমাত্মা এক ও অদ্বিতীয়) এবং আমার সঙ্কল্পেই (ইচ্ছার বশে) পৃথিবীতে জন্ম নিয়েছেন ; তারপরে তাঁদের পরবর্তী বংশ পরম্পরা সম্ভাবিত হয়েছে। আমার পরমৈশ্বর্যরূপ বিভূতি (অব্যক্ত দৈবশক্তি) এবং যোগশক্তির পরম তত্ত্ব যিনি  জেনেছেন, এই জ্ঞানে যিনি স্থিত হয়েছেন, যিনি এই সারসত্য উপলব্ধি করেছেন যে আমিই সৃষ্টির কারণ, আমাতেই এই জগৎসংসার স্থিত ও আমাতেই আবর্তিত, সেই বুদ্ধিমান ভক্ত আমারই ভজনা করেন ; সেই ভক্ত মন প্রাণ আমাতেই সমর্পণ করে, আমার প্রতি ভক্তি প্রদর্শন করেন, সংসারে আমার গুণকীর্তন করেন, (মাম কথয়ন্ত) আমাতেই রমন (আত্মসন্তোষ ও আনন্দ লাভ) করেন।
এমন যিনি বা যাঁরা আমার ভক্ত, আমার উপাসনায় রত সে সকল প্রেমিক ভক্তদের আমি তত্ত্বজ্ঞান প্রদান করি, আমি স্বয়ং অনুকম্পায়ী হয়ে তাদের অন্তরে স্থিত হই, তাদের অজ্ঞানতা প্রসূত অন্ধকারকে, জ্যোতির্ময় তত্ত্বজ্ঞানরূপ দীপ প্রজ্বলিত করে' দূরিভূত করে থাকি। 

তেষাং এব অনুকম্পার্থম অহম অজ্ঞানজম  তমঃ।
নাশয়ামি আত্মভাবস্থঃ জ্ঞান দীপেন ভাস্বতা।। 

এখানেই মানুষের সর্বশ্রেষ্ঠ ও পরম আনন্দময় ব্রহ্মস্থিতির ইঙ্গিত। এই যে শ্রীকৃষ্ণ বার বার 'আমি, আমি' বলছেন, এটি একটি অতি 'গূহায়িত' (গূহ্য) আত্মদর্শনের 'ভাব' যা সাধকের অনুভূতির মধ্যেই, হৃদয়ানুরাগের মধ্যেই অনুভূত হয়। শ্রীমদ্ভগবত গীতার  এই বাণীগুলি কোন ভাষায়, কোন শব্দে প্রকাশ করা যায়‌ না। এখানে কৃষ্ণ অর্জুনের সখা, অর্জুনের সারথি ঠিকই ; কিন্তু রূপকার্থে। তিনি যুগ যুগান্তরের, জীবনসংগ্রামরত মানবসংসারের প্রতিভূস্বরূপ অর্জুনকে বলছেন যে-কৃষ্ণ, তিনি মানববিগ্রহরূপী স্রষ্টা--- বিশ্বব্রহ্মাণ্ডব্যপ্ত মহাচৈতন্য। তিনি অনাদি, অজ, অব্যয়, 'অবাঙমনোসগোচর'। আবার এই আমি জগৎচরাচরের প্রকৃতিতে, জীবে, অজীবে, জলে স্থলে, আকাশে বাতাসে, বৌমে-মহাবৌমে, সূর্য চন্দ্রাদি জ্যোতিরর্মণ্ডলে ওতপ্রোত, এই ভূতজগতও বিপরীতক্রমে এই 'আমি' বা স্রষ্টার 'আমিত্বের' মধ্যেই বিরাজমান। এই 'জ্ঞান' অধিগত হলে পরেই জীবাত্মা 'পরমাত্মায়' লীন হয় এবং আনন্দময় ব্রহ্মস্থিতি লাভ করে। যোগসাধনার পথে এই একত্ববোধের 'জ্ঞান' সুকঠিন সাধনসাপেক্ষ ; এবং তাই প্রেম ভক্তি ও নিষ্কামনায় আত্মসমর্পণ। মানবাত্মা তখন মুক্ত, সুখ দুঃখের অতীত। সর্ব সত্যের সত্য, সর্ব রহস্যের রহস্য  পরমাত্মার বাস যেখানে (অখণ্ড একত্বের মধ্যে) সেই স্বর্গধাম-প্রাপ্তিই জীবনের পরম এবং শেষ চরিতার্থতা --- যে কথা জীবনপারের দেবতা যম নচিকেতাকে বলছেন,  --- 

যং দুর্দশং গূঢ়মনুপ্রবিষ্ঠম্।
     গুহাহিতং গহ্বরেষ্ঠং পুরাণম।।
অধ্যাত্মযোগাধিগমেন দেবং।
       মত্বা ধিরো হর্ষশোকৌ জহাতি।। 

শান্তচেতা ধীর (বোধবিশিষ্ঠ) মানব যখন প্রায় অদৃশ্য, দুর্জ্ঞেয়, অনুভূতির গহনে অবস্থিত, হৃদয়ের গভীর দেশে অধিষ্ঠিত, শাশ্বত সনাতন ও স্বপ্রকাশ সত্ত্বাকে ধ্যানের মধ্য‌ দিয়ে অনুভব করে, তখন সে সুখ দুঃখের পারে আশ্রয় লাভ করে। ----- (কঠোপনিষদ, দ্বাদশ মন্ত্র।) 

এই 'হৃদয়ের গভীর দেশে' শব্দগুচ্ছের মধ্যেই নিহিত আছে 'স্বপ্রকাশ সত্ত্বার' প্রতি ভালোবাসার সম্পর্ক, প্রেমের সম্পর্ক, ভক্তির সম্পর্ক এবং সেই স্বপ্রকাশ সত্ত্বা যে আমি, আমারই অন্তরে নিত্য জাগ্রত আমার  জীবন-সারথি --- পরম চৈতন্যসত্তার অংশ। শ্রীকৃষ্ণ এখানে অর্জুনের, (আমাদেরও) জীবন-রথের সারথি। যোগ সাধনায় তাঁকে যেমন অনুভবে লাভ করা যায়, তেমনি আত্মসমর্পিত প্রেম ভক্তির দ্বারাও তাঁকে আপন করে পাওয়া যায়। শ্রীকৃষ্ণের শ্রীমুখনিঃসৃত 'আমি'-র তাৎপর্য্য এখানেই।
ভগবান বাসুদেবের এমত অমৃতনিঃস্যন্দি বাণীসমূহ বিস্ময়-বিমুগ্ধ চিত্তে শ্রবণ করবার পর, এবার অর্জুন নিজেকে সখার কাছে সমর্পণই করলেন। তাঁর মনে হোল ইনি তো শুধু বন্ধু নন, ইনি প্রভু আমার, প্রিয় আমার -- জীবন-মরণের 'নিয়তি' এবং পরম ভক্তিভরে উচ্চারণ  করলেন, (গীতার সর্বশ্রেষ্ঠ মন্ত্রগুলির একটি), 

"পরং ব্রহ্ম পরং ধাম পবিত্রং পরমং ভবান।
পুরুষং শাশ্বতং দিব্যমাদিদেবম্ অজম বিভুম।।
আহুস্তাম্ ঋষয়ঃ সর্বে দেবার্ষির্নারদস্তথা।
অসিতো দেবলো ব্যাসঃ স্বয়ং চৈব ব্রবীষি মে।।" 

হে ভগবান, হে কেশব, এইবার আপনার মহিমময়, সত্যরূপ অন্তরে মূর্ত হয়ে উঠছে। আপনি স্বরূপে ব্রহ্ম, পরম আশ্রয়, পরম পবিত্র, শাশ্বত কালের দিব্যপুরুষ, দেবতা, ঋষিগণেরও‌ আদি, জন্মমৃত্যুরহিত, সর্বব্যপ্ত সত্ত্বা। একথা দেবল ঋষি, নারদ ঋষি, মহর্ষি ব্যাসদেবও বলেছেন এবং (কী সৌভাগ্য আমার) আপনি স্বয়ং সে পরিচয় আমার কাছে ব্যক্ত করছেন --- "স্বয়ং চৈব ব্রবীষি মে।"  হে কেশব, যা যা এতক্ষণ বলেছেন, বলছেন সবই সত্য মানি, আপনার লীলাময় স্বরূপ আমার মত মানুষ তো দূর, দেবতা দানবগণও জানতে পারেন না--- বিদুঃ ন দেবাঃ ন দানবাঃ।  আপনি এই ভূতজগতের সৃষ্টিকর্তা, দেবতাদেরও দেবতা। হে জগতপতি পুরুষোত্তম, আপনি নিজেই নিজেকে জানেন --- "স্বয়মেব আত্মনা আত্মানাম্ বেত্থ।" হে ভগবন, আপনিই সেই পরমাত্মন পুরুষ যিনি বলতে পারেন আপনার সেই বিভূতির কথা যার দ্বারা এই বিশ্বলোক পরিব্যপ্ত হয়ে আছে, স্থিত হয়ে আছে। 

_______________________________________________
এখন অর্জুন শ্রীকৃষ্ণ কথিত 'আমি'কে উপলব্ধি করছেন। "যা কিছু আমরা জানি সবই আগে তাঁকে জেনে তাঁরই  ভেতর দিয়ে --- তবে জানতে হয়। তিনিই প্রকৃত 'আমি' -- সেই 'আমি'ই আমাদের এই 'আমি'র স্বরূপ ; আমরা সেই 'আমি'র ভেতর দিয়ে ছাড়া কিছুই জানতে পারি না। তিনি সাক্ষিস্বরূপ ---- সকল জ্ঞানের তিনি অনন্ত সাক্ষিস্বরূপ।
                   (----- 'বাণী ও রচনা'-- স্বামী বিবেকানন্দ।)
______________________________________________


হে যোগেশ্বর, আমাকে বলুন কি ভাবে আপনার এই বিভূতির কথা আমি জানব, কি ভাবে নিরন্তর আপনার চিন্তা করে আপনাকে জানব, কি ভাবেই'বা আপনি (কোন্ কোন্ রূপে) আমার চিন্তা করবার যোগ্য হতে পারেন ? হে অমৃতপুরুষ, হে জনার্দন, আপনি আপনার পরমৈশ্বর্যরূপ বিভূতি ও যোগশক্তির কথা আবার বলুন, বার বার বলুন। শুনতে শুনতে আমার পিপাসা যেন আরও তীব্রতর হয়ে উঠছে, ---- 

বিস্তরেণ আত্মনঃ যোগম্ বিভূতিঞ্চ জনার্দন,
ভূয়ঃ কথয় তৃপ্তির্হি শৃন্বতো নাস্তি মে অমৃতম।। 

এই সুধাময় কথা এত শুনেও তৃপ্তি মেটেনি আমার। --- "ভূয় কথয়" --- আবার বলুন।
(হে জনার্দন, আপনার কমলানন-নিঃসৃত অমৃতময়ী বাণী ধ্বনিত হোক্, রণিত হোক আমার অন্তরে নিরন্তর !
"কী দেখিব, কী জানিব,
না জানি সে কী আনন্দ ----
নূতন আলোক আপন মনোমাঝে।।")
                          ----------- রবীন্দ্রনাথ। 
মুগ্ধচিত্ত, ভক্তিভাববিহ্বল কুরুকুল-অলঙ্কার অর্জুনের প্রতি করুণার্দ্র হয়ে পরম করুণায় ভগবান বাসুদেব তখন আবারো কৃতসঙ্কল্পিত হলেন, আশ্বস্থ করলেন শ্রদ্ধালু সুহৃদকে এই বলে' যে, 

"হন্ত  তে  কথয়িষ্যামি দিব্যা হ্যান্তবিভূতয়ঃ।
প্রাধ্যান্যতঃ কুরুশ্রেষ্ঠ নাস্ত্যন্তো বিস্তরস্য মে।।" 

হে কুরুশ্রেষ্ঠ গাণ্ডীবধন্বা অর্জুন, আমার বিভূতি সম্মন্ধে (অনন্তবিস্তারী আমার এই 'আমিত্ব' বিষয়ে) বিশেষভাবেই (প্রাধান্যতঃ) কিছু অবশ্যই বলবো ---
(এরপর আবারো ১০ম অধ্যায়েরই ২০তম শ্লোক থেকে কৃষ্ণকথা, ভগবান বাসুদেবের আত্মবিভূতির 'কথকথা' -- পরবর্তী পর্বে।)
                            










রবিবার, ১৭ আগস্ট, ২০২৫

জন্মাষ্টমী -- কানুর বিড়ম্বনা।



জন্মাষ্টমী -- কানুর বিড়ম্বনা।

মা আসেনি, একেলা তুই আসতে গেলি কেন ?
জানিস না তোর মাসিরা সব ছুঁতমার্গী হেন !
উলঙ্গ গা, দাঁড়ায় না পা, কটিতটের বসন
তাও খুলেছে দিতে হামা বাঁধেনি কেও তেমন।
কোলে নিয়ে এলোও যদি রাখলে আঙিনায়, 
কলস কলস আনলে জল ঢাললে মাথাটায়।‌
কাঁদলি কত -- নয়ন ধারা জলের ধারে ঢাকা।
ধুয়ে গেছে রসকলি, চোখের কাজল-আঁকা।
কি সকরুণ মলিন দেখায় প্রসুন-ওষ্ঠাধর,
শীতল বারি বিগলিত ননীর কলেবর।
কাতর 'মা-ডাক' যায়না শোনা গান বাজনের স্বরে,
'কে আছো গো, যাওনা ছুটে যশোমতীর ঘরে।'

জাহ্নবী যাঁর চরণ হতে নামেন ধরাতলে,
নাওয়াও তারে, ধোওয়াও তারে ঘটের গঙ্গাজলে ?

দুলাল চন্দ্র বন্দোপাধ্যায়
২রা ভাদ্র, ১৪৩২
ব্যাঙ্গালোর।

শনিবার, ১৬ আগস্ট, ২০২৫

শ্রীমদ্ভগবত গীতায় অর্জুন- ৭



শ্রীমদ্ভগবত গীতায় অর্জুন- ৭

শ্রীমদ্ভগবত 'গীতায় অর্জুন-৬ -তে' আমরা নবম অধ্যায়ের প্রথম শ্লোকটির উল্লেখ করেছি। আমাদের উদ্দেশ্য নয় যে গীতার একটি নবতম ভাষ্য রচনা করা ; কেননা, আগেও বলেছি, আবারও বলব যে প্রায় তিন হাজার বছর বা তারও অধিক কাল ধরে অসংখ্য ঈশ্বরপ্রমাণ সাধক ও জ্ঞানতাপস যে মহাগ্রন্থের ভাষ্য ও টিকা রচনা করেছেন তাদের বোধের এবং পাণ্ডিত্যের কণামাত্র লাভ করা জন্ম জন্মান্তরের সাধনা। সে সাধনা আমার নাই। শ্রীমদ্ভগবত গীতা নিয়ে আমার আলোচনার প্রয়াসও ধৃষ্টতার নামান্তর। তবু আলোচনা করে চলেছি এই কারণেই যে   অর্জুনের বর্তমানে মনের যে দ্বিধা-দ্বন্দ্ব, কিংকর্তব্যবিমূঢ়তা তার সঙ্গে আমাদের মত অসহায় মর্ত্য-মানবের অন্তরের মিল খুঁজে পাই। অরিন্দম পার্থ সখা ও সারথিরূপে যাঁকে চিনতেন সেই কৃষ্ণ এখন বিশ্বসংসার-পরিব্যপ্ত অব্যক্ত পরমাত্মা, সম্পূর্ণ অপরিচিত অচিন্ত্য এক দৈববিগ্রহ ! 


ময়া ততমিদং সর্বং জগদব্যক্ত মূর্তিনা।
মৎস্থানি সর্বভূতানি ন চাহং তেষু অবস্থিতঃ।। (৯।৪) 

কৃষ্ণ বলছেন, এই জগৎ --- দ্যুলোক, ভূলোক, ঊর্দ্ধ্বলোক, অধঃলোক এবং ভূতগণ (বস্তুবিশ্ব) আমার মধ্যেই অবস্থান করে রয়েছে কিন্তু আমি এ সবের মধ্যে নেই।।  তুমি দোষ-রহিত পুরুষ, তোমাকেই আমার (ভগবানের) এই গুহ্য জ্ঞানের কথা জানাব ; আর সেই অতি গোপন জ্ঞানরহস্য জানলে এই দুঃখপূর্ণ সংসার প্রপঞ্চ থেকে মুক্তি লাভ হবে, --- বলে' ভগবান শ্রীকৃষ্ণ সখা অর্জুনকে রাজগূহ্যযোগ-সাধনার তত্ত্ব বিশদে বলতে আরম্ভ করলেন।
এই পরমজ্ঞান-রহিত মানুষ জন্মমৃত্যুর চক্রে কাল কালান্তর ধরে ঘূর্ণায়মান ও দুঃখের নরকে নিমজ্জিত। দেখ অর্জুন, অব্যক্তরূপে আমি (এই পরম চৈতন্যে)সমস্ত জগতে ব্যপ্ত। সমস্ত জীব (সর্বভূতানি) আমার মধ্যেই অবস্থান করে, কিন্তু 'আমি' না জগতে, না জীবে -- কোথাও অবস্থিত নই। যদিও সৃষ্টির কারণ ও কার্য আমি, সমস্ত জীবের ধারক আমি, আমি সর্বব্যপ্ত ; তবুও আমার আত্মা ভূতজগতের মধ্যে স্থিত নয় -- ন চ ভূতস্থঃ মম আত্মা। যেমন আকাশ থেকে উৎপন্ন সর্বগা (সর্বত্রগামী) বাতাস নিত্য আকাশেই স্থিত আছে তেমনই সমস্ত জগৎ আমাতেই স্থিত আছে। কল্পের অন্তে সমস্ত ভূতজগত (এই যে জীব-অজীব-সমন্বিত মহাবিশ্ব) আমারই সৃষ্ট প্রকৃতিকে প্রাপ্ত হয় আর লয় হয় এবং (তারপর আবারও) কল্পের আদিতে তাদের আমি পুনরায়  সৃষ্টি করে থাকি --- বিসৃজ্যামি।  এই ভূতজগত আমারই প্রকৃতির অধীন, প্রকৃতির বশে চেতনাহীন হয়ে আবার আমারই দ্বারা পুনঃ পুনঃ সৃষ্ট হয়, সৃষ্ট হয় তাদেরই বিগত জন্মের কর্মানুসারে, এবং অন্তকালে বিনষ্টও হয় আমারই ইচ্ছায়। হে অর্জুন, এই যে আমি 'বিসৃজামি' বা 'সৃষ্টি করি' কথাটি তোমাকে বলছি, তাতে মনে হতে পারে এই কর্ম আমার দ্বারা কৃত --- তা কিন্তু নয়। এবং এও নয় যে ভূত জগতের (জীবকুলের) কৃত কর্মে আমার প্রেরণা আছে। ('আমি' এখানে অক্ষরব্রহ্ম, 'পরম চৈতন্য'।   কর্ম সাধিত হয় 'প্রকৃতিম অবষ্টভ্য' --প্রকৃতিরই  স্বভাবের বশে, প্রকৃতিরই  'ত্রিগুণময়ী মায়াকে' অবলম্বন বা অঙ্গীকার করে। সেখানে আমার কোন কর্তৃত্বভাব নেই। তবে ত্রিগুণময়ী (সত্ত্ব,  রজঃ ও তম-গুণসম্পন্ন) 'মায়া' আমার বশীভূত এবং একইসঙ্গে এই মায়ার দ্বারা আমি আবরিত। 

"ময়াধ্যক্ষেণ প্রকৃতিঃ সূয়তে সচরাচরম।
হেতুনানেন কৌন্তেয় জগদ্বিপরিবর্ততে ।। ৯।১০।। 

শ্রীগীতায় স্ফুরিত এই মহাবাণীর তাতপর্য্য অতিশয় গভীর, যুগপৎ জটীল। 'ময়া অধ্যক্ষেণ ' --- 'স্রষ্টার মায়াবিগ্রহ' পরমাত্মা বা পরমচৈতন্যরূপ শ্রীকৃষ্ণ এখানে বলছেন যে আমার অধ্যক্ষতায় অর্থাৎ আমার নিয়ন্ত্রণে প্রকৃতি (ত্রিগুণাত্মিকা মায়া) এই চরাচর ব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টি করেন এবং আমারই 'নির্লিপ্ত' ইচ্ছাশক্তির প্রভাবে বা প্রকৃতির নিয়মেই এই জগৎ পুনঃ পুনঃ সৃষ্ট হয় এবং ধংস হয়। ('বিপরিবর্ততে' -- গমনাগমনরূপ চক্রে আবর্তিত হয়ে চলেছে)। মহেশ্বর (মহা+ঈশ্বর =মহাদব বা শিব নহেন), পরমেশ্বররূপে আমার যে পরম ভাব, তাকে মূঢ়তাচ্ছন্ন মানুষ, স্বীকার করে না যখন আমি মনুষ্য অবতারে আবির্ভূত হই। এই নির্বোধ, মূঢ় মানুষেরা রাক্ষসী ও আসুরী অজ্ঞতায় মোহাচ্ছন্ন স্বভাবকে ধারণ‌ করে। বৃথা আশায়, বৃথা কর্মে, নিষ্ফলা জ্ঞানে তারা তমসাবৃত। কিন্তু সুরপ্রকৃতির মহাত্মাগণ 'শুদ্ধস্বভাবকে' আশ্রয় করে, ভূতজগতের সৃষ্টির কারণ 'আমাকেই' জেনে এবং অবিনাশী ও অক্ষরস্বরূপ আমাতেই আশ্রয় করে আছেন, আমাকেই নিরন্তর ভজনা করেন এবং তাঁরা আমাকে লাভ করেন ও জন্মমৃত্যুর দুঃখময় আবর্তন থেকে মুক্তি পান। (বিষয়টি আমরা ষোড়শ অধ্যায়ে বিশদে আলোচনা করবার চেষ্টা করব)। আমার ভক্ত যাঁরা তাঁরা একনিষ্ঠভাবে আমার নাম কীর্তন করেন, গুনকীর্তন করেন, প্রণত হন, ধ্যানস্থ হয়ে অনন্যা ভক্তির সঙ্গে আমার উপাসনা করেন। কিছু তেমন ভক্তও আছেন  যাঁরা এই প্রকার জ্ঞানযোগে উপাসনা করেন যে এই মহাসৃষ্টিতে যা কিছু আছে (জীব অজীব ও নির্জীব শূন্য) সবই  বাসুদেব কৃষ্ণ -- একত্বভাবে। আবার অন্য সকলে পৃথকভাবে, অথবা 'বহু'ভাবেও উপাসনা করেন। কেননা আমিই--- এই বাসুদেব ----অগ্নি -যজ্ঞ-ঘৃত-মন্ত্র-পিণ্ডান্ন-ঔষধি-বনস্পতি। আমিই পিতামাতা-ধাতা-পিতামহ। আমি বেদত্রয়ী (ঋক্ সাম যজুঃ-- স্মরণীয় অথর্ব সংহিতা আদিতে বেদ পদবাচ্য ছিল না)।  আমিই জগতের গতি ; আমিই ভর্তা-প্রভু-সাক্ষী ও শরণ (আশ্রয়)। ভূতজগত সূক্ষ্মরূপে লয়প্রাপ্ত হলে, 'নিধানে' আমাতেই (অবিনাশী এবং বীজরূপ পরম সত্ত্বা) যুক্ত হয়। কেননা আমিই--- 

গতর্ভর্তা প্রভুঃ সাক্ষী নিবাসঃ শরণং সুহৃদ।
প্রভবঃ প্রলয়ঃ স্থানং বিধানং বীজমব্যয়ম।। ৯।।১৮ 

আমি আবার সূর্যরূপে তাপ, বর্ষার আকর্ষণী শক্তি ও বর্ষণ। আমিই অমৃত, আমিই মৃত্যু। আমিই সৎ এবং অসৎ। (এখানে সৎ ও অসৎ অর্থে আলো ও অন্ধকার--- উপসংহারে আলোচ্য) 

সকাম উপাসনা (যাগ যজ্ঞ) যাঁরা করেন সে সকল বৈদিক পবিত্র সোমপায়ীগণ আমার আরাধনা করে, নিজ নিজ পুন্যফলে ইন্দ্রলোক প্রাপ্ত হন, স্বর্গে দেবতাদের মতই  দেববাঞ্ছিত ভোগ উপভোগ করেন। তারা আপন আপন পুন্যের প্রভাবে স্বর্গসুখ ভোগ করতে থাকেন, আবার পুন্যবল ক্ষীণ হলে (সঞ্চিত পুন্যফল শেষ হয়ে এলে) আবার তাঁরা, এই জন্মমৃত্যুর ধাম মর্ত্যলোকে ফিরে আসেন। আর যাঁরা নিষ্কামনায় উপাসনা করেন, অনন্যভাবে আমাকেই নিরন্তর স্মরণে রেখে, আমাতেই সুস্থিত থেকে, সেই সমস্ত 'আমাতে যুক্তি' ভক্তপুরুষদের জন্য আমি স্বয়ং 'যোগক্ষেম' বহন করে থাকি --- 

"তেষাং নিত্যাভিযুক্তানাং যোগক্ষেমং বহাম্যহং।"
(এখানে ক্ষেম শব্দের অর্থ লব্ধ পুন্যবলের সংরক্ষণ)। 

দেখ অর্জুন, কাম্যফলের আশায় যাঁরা অন্যান্য দেবতাদেরও শ্রদ্ধার সঙ্গে আরাধনা ('যজন্তে' কিন্তু পূজা নয়) করেন, তাঁরাও আমারই সাধনা করেন ; কিন্তু যদি তাদের সেই দেবারাধনা বিধিবিধানহীন হয় এবং অজ্ঞানতা প্রসূত হয়, তাত্ত্বিকভাবে 'অধিযজ্ঞ'রূপ আমাকে না-জেনে হয়, তবে তারা পুন্যলোক থেকে চ্যুত হয়ে আবারো পুনর্জন্ম লাভ করেন। বিভিন্ন দেবতার আরাধনার ফল বিভিন্ন। কেও পিতৃলোক, কেও ভূতলোক প্রাপ্ত হন ; কিন্তু আমাকে যারা ভজনা করেন (মদযাজিনঃ) তারা আমাকেই লাভ করেন। আমাতেই মিলন হলে, জীবাত্মা যখন 'পরমাত্মায়' লীন হয়ে যান তখন জন্মমৃত্যুর শৃঙ্খল থেকে তার মুক্তি লাভ।
এতক্ষণ, অর্থাৎ অষ্টম অধ্যায় পর্যন্ত আমরা অর্জুনের সাথেই যোগেশ্বর শ্রীকৃষ্ণের শ্রীমুখনিঃসৃত বাণীসমূহে  কখনো দুঃসাধ্য, কখনো বা অসাধ্য, মাঝে মাঝে সাধ্যায়ত্ব যোগসাধনার বর্ণনা ও যোগমার্গের দ্বারা ফললাভের কথা শুনেছি। যোগ-সাধনমার্গের অন্তিম প্রাপ্তি জন্মমৃত্যুর আবর্তণ থেকে মুক্ত হয়ে ব্রহ্মসত্যকে উপলব্ধি করা। 'শ্বেতাশ্বতর' উপনিষদ যেমন বলেছেন ---- 

"যদাত্মতত্ত্বেন তু ব্রহ্মতত্বম্
    দীপোপমেনেহ যুক্ত প্রপশ্যেৎ
অজং ধ্রুবং সর্বতত্ত্বৈঃ বিশুদ্ধম্।
    জ্ঞাত্বা দেবং মুচ্যতে সর্বপাপৈ।।" 

সাধক যখন যোগযুক্ত হন, যোগারূঢ় অবস্থায় তাঁর শরীর হতেই আলোর মত স্বয়ংজ্যোতিঃ প্রকাশিত হয়। সেটি নিজেরই আত্মার সত্যোপলব্ধির জ্যোতিঃ। এবং সেই প্রকাশ পরম জ্যোতিরই বিকিরণ। (সূর্যালোক যেমন চন্দ্রে প্রতিবিম্বিত) সেই দিব্য আলোকে তখন তিনি আপনার মধ্যেই 'ব্রহ্মসত্যকে' উপলব্ধি করেন এবং সেই অবস্থাতেই তিনি জন্মমৃত্যুরহিত, পরিবর্তনহীন, প্রকৃতির কার্যকারণের ঊর্দ্ধে পরম দেবতাকে জেনে (ব্রহ্মানন্দ লাভ করে) সমস্ত পাপ বা আপনার হীনতা দীনতা ক্ষুদ্রতা থেকে মুক্ত হয়ে যান।
মহাবাহো, অমিতশক্তি, দেবরাজ ইন্দ্রতনয় কি ভাবে সেই সুকঠিন যোগমার্গ অনুসরণ করবেন তা তো পরবর্তী পর্যায়ে জানা যাবে কিন্তু আমাদের মত ইন্দ্রিয়াসক্ত, বিক্ষুব্ধচিত্ত, মরজগতের মানুষ নিরাশ হতে বাধ্য। "এ জীবন তোর এমনি গেল মন।" ভগবান শ্রীকৃষ্ণ কথিত চরিতার্থতা, মোক্ষ-মুক্তি-স্বর্গ তো 'নিশিতা দুরত্যয়া',  মোহ-মায়া, কামনা-বাসনা, দুঃখ-শোকের এই সংসার নামক নিত্য-কুরুক্ষেত্রের নরককুণ্ডু থেকে আমাদের আর নিস্তার নাই।
___________________________________________


বৈষ্ণব মতের উৎস 


(আর্তস্বরে ডেকে উঠি, 'হা কৃষ্ণ!' বলতে চাই, অন্য কোন সহজ পথ বল, হে ঠাকুর। তখন, ঠিক তখনই কুরুক্ষেত্রের সেই পার্থসারথি, সুদর্শনধারী, পাঞ্চজন্য শঙ্খনিনাদী শ্রীকৃষ্ণের পরিবর্তে হৃদয়াসনে দেখি, দেবকী গর্ভজাত বসুদেবসূত, বৃন্দাবনের শ্রীনন্দনন্দন ---- প্রেমের ঠাকুর, বংশীধারী ত্রিভঙ্গমুরারী, শ্রীরাধাবল্লভ শ্যামরায়। হ্যাঁ, এখন তাঁর শ্রীচরণে আত্মসমর্পন করে বলা যায়‌ --
"এই কর হরি দীন দয়াময়,
তুমি  আমি যেন দুটি নাহি হয়।
জলের বিম্ব জলে কর লয় ---
চিন্ময় শ্যামসুন্দর।")
___________________________________________


আমাদের মত, অর্জুনেরও কী পরমাত্মার সাধনপন্থা এমনই সুদুর্গম হয়ে উঠছিল ! তাই কি অন্তর্যামী বাসুদেব এবার করুনাময় রূপ ধারণ করলেন ? সখা অর্জুনকে, সঙ্গে সঙ্গে জগৎসংসারের সকল অসহায় ভক্তকুলের উদ্দেশে, সান্ত্বনার সুরে বলে উঠলেন,---- না না, এত কঠোর কঠিন সাধনপন্থা অবলম্বন করবার প্রয়োজন নেই, 'সুগম' ভক্তিমার্গ বরণ কর, --- 

পত্রং পুষ্পং ফলম্ তোয়ম্ তো মে ভক্ত্যা প্রযচ্ছতি।
তদহং অহম্ ভক্ত্যুপহৃতমশ্নামি প্রযতাত্মনঃ।। ৯।।২৬‌‌‌

শোন অর্জুন, ফুল, তুলসী (পত্র) জল --- এই প্রকার অতি সামান্য নেবেদ্য-নির্মাল্য কোন মদগতপ্রাণ ভক্ত যদি  আমাকে প্রেমপূর্বক অর্পণ করে তবে সেই প্রেমিক ভক্তের অর্ঘ্য আমি (সগুণরূপে আবির্ভূত হয়ে) গ্রহণ করি, প্রীত ও পরিতুষ্ট হয়ে ভক্ষণ করি---- অশ্নামি।  কিন্তু হে সখা, অর্পণের সাথে সমর্পণও করতে হবে যে ! আত্মসমর্পণ ! ভগবান নারায়ণ যেন সত্যকার মানবরূপী জীবনবল্লভ হয়ে উঠলেন। অর্জুনের সঙ্গে মর্ত্যলোকের দিশাহারা ভক্তবৃন্দও  এতক্ষণে স্বস্তি লাভ করেছেন। ‌তবে তাকে বরণ করবার, তাঁর করুণা, তাঁর কৃপা আস্বাদন করবার সহজ পথও আছে ! কায়-মন-বাক্যে বলতে হবে,
"আমার  জগতের সব তোমারেই দেব
দিয়ে তোমায় নেব----ভাবনা ।" --রবীন্দ্রনাথ।
এইবার সেই শ্রীমদ্ভগবত গীতার মহাবাক্যগুলির অন্যতম একটি --- শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, 

"যৎ করোষি যদশ্নাসি যজ্জুহোষি দদাসি যৎ।
যৎ তপস্যসি কৌন্তেয় 'তৎ কুরুষ্ব মদর্পণম্।।" ৯।।২৭ 

প্রারব্ধ-আরব্ধ-অনারব্ধ, পূর্ণ-অপূর্ণ কর্ম এবং কর্মের ফলাকঙ্ক্ষা এমন কি দান-পান-ভোজন, যজ্ঞাদি সঙ্কল্প, সাধনা তপস্যা --- সমস্তই, সমস্তটাই আমাকে অর্পণ কর --- কুরুষ্ব মদর্পণম।
এই 'শূন্য করে' দেবার মধ্যেই আছে আমিত্বের বিনাশ। তখন নিঃস্ব, নিষ্কাম, নির্ভার, নিরহংকার আত্মসত্ত্বার  সঙ্গে পরমাত্মার মিলন। 

"যেন সময় এসেছে আজ ‌ ফুরালো মোর যা ছিল কাজ ---
বাতাস আসে হে মহারাজ  তোমার গন্ধ মেখে।।"

তখন ভারহীন প্রাণে পরমেশ্বরকেই পাওয়া হোল। সর্বত্যাগী সন্ন্যাসী হয়ে, কর্মবন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে আমাকে প্রাপ্ত হও। "বিমুক্তঃ কর্মবন্ধনৈঃ মাম উপৈষ্যসি।।"  শুধুই ভক্তি, অনন্যা ভক্তি। আমার কাছে প্রিয় বা অপ্রিয় কেও নয়, কিছু নয়, কেননা বিশ্বচরাচরের সকল প্রাণে, সকল বস্তুতেই তো আমি। তবুও কিন্তু অহংত্যাগী ভক্ত আমার সঙ্গে একাত্ম। ভক্তির দ্বারা ভজনা করলে আমার মধ্যেই ভক্তের বাস, আমিও ভক্তের মধ্যেই বাস করি।
"যে ভজন্তি তু মাং ভক্ত্যা  ময়ি তেষু চাপাম্যহম।।"
ভক্ত ও ভগবান একাকার। 


শ্রীকৃষ্ণ মানব জগতের প্রতি করুণার্দ্র হয়ে বলছেন, পাপাত্মা, দুরাচারী মানুষও যদি যথানিশ্চয় হয়ে ভক্তিপূর্বক আমার ভজনা করে, সেও অচিরেই ধর্মাত্মায় পরিণত হয়, (আমার ভক্ত) নষ্ট হয়ে যায়‌ না। অধিকন্তু, স্ত্রীজাতি, বৈশ্য , শূদ্র এবং কলুষজন্মা মানব মানবীও পরম গতি (দেব লোক) লাভ করে যদি একান্ত ভক্তি সহকারে মৎপরায়ণ হয়। যাঁরা ব্রাহ্মণ (ব্রহ্মকে জেনেছেন যাঁরা), রাজর্ষি তাঁরা এই সত্য উপলব্ধি করেছেন যে এই পার্থিব শরীর ক্ষণভঙ্গুর, অনিত্য ; তাই বিষয়সুখ পরিত্যাগ করে আমাকেই ভজনা করেন। অতএব হে  অর্জুন, 

"মন্মনা ভবো মদ্ভক্তো মদযাজী মাং নমস্কুরু ।
মামেবৈষ্যসি যুক্ত্বা এবমাত্মানং ম পরায়ণঃ।। " ৯।।৩৪

হে সখা, তুমি সমস্ত পরস্পর বিরোধী চিন্তা দূর‌ করে আমাতেই শ্রদ্ধা-ভক্তি-প্রেম-সমন্বিত মন সমর্পণ কর, আমার ভক্ত হও, আমারই অর্চণা কর, আমায় প্রণাম নিবেদন করে, পরিপূর্ণভাবে আমার শরণাগত হয়ে স্ব-আত্মাকে 'পরমাত্মন আমাতে' যুক্ত করলে 'পরেই আমাকে, চরাচরপরিব্যপ্ত 'আমিরূপ বিশ্বচৈতন্য'-- আমাকে লাভ করবে। 

শ্রীমদ্ভগবত গীতার এই নবম অধ্যায় 'রাজবিদ্যারাজগুহ্যযোগ' নামাঙ্কিত। বিগত সাতটি অধ্যায়ে (প্রথম অধ্যায় অর্জুনবিষাদযোগ) পরমাত্মারূপী ভগবৎ আরাধনার যে সমস্ত মত, পথ, উপায় ও উদ্দেশ্যের কথা বলা হয়েছে সে সবই (সাংখ্যযোগ, কর্মযোগ, জ্ঞানযোগ, কর্মসন্ন্যাসযোগ, অভ্যাসযোগ, জ্ঞানবিজ্ঞানযোগ ও  অক্ষরব্রহ্মযোগ) গভীর তাত্ত্বিককতাপূর্ণ, 'বেদ ও ব্রাহ্মণ' সংহিতার সাধনক্রিয়ায় বর্ণিত এবং 'স্মৃতি' সংহিতা-নির্ধারিত, আচরণীয় ক্রিয়াকল্পের জটীল ও দুরূহ বিধি-বিধানের বিষয়ীভূত যা স্বয়ং 'যোগেশ্বর'সখা পুরুষাগ্রগন্য তৃতীয় পাণ্ডব অর্জুনের অধিগম্য।  এখন এই নবম অধ্যায়ে এসে--- আত্মানুভূতি হতে শতসহস্র যোজন দূরে, কাম-কামনা-তাড়িত, মায়া মোহে আচ্ছন্ন জীব --- আমরা প্রথম এই সান্ত্বনার বাণী (তাঁরই অযাচিত করুণায়) পেয়েছি যে একটি সরল 'পথও' আছে। ভক্তির পথ।

কিন্তু ভক্তির পথ, পরমেশ্বর আরাধনার এই পথই পরবর্তীকালে 'ভক্তি আন্দোলনের' উৎস এবং তা শত ধারায় প্রবাহিত হয়ে ভারতবর্ষের পূর্ব হতে পশ্চিমে, উত্তর হতে দক্ষিণে আবেগময় কলকলোচ্ছ্বাসে ছড়িয়ে পড়েছিল। দক্ষিণের মহাসাধক রামানুজ, পূর্বদেশের শ্রীগৌরাঙ্গ মহাপ্রভুর প্রেমভক্তি সাধনপন্থার জোয়ারে আজিও লক্ষকোটি মানবের মনোভূমি অভিসিক্ত। ভক্তি আন্দোলন আজ দেশ ছাড়িয়ে বিশ্বময় মানবচিত্তকে আলোড়িত করেছে। 


যাই হোক্, এই আলোচনা ধারাবাহিকভাবে চলমান রইবে। আজ ভাদ্রমাসের কৃষ্ণপক্ষ। নিখিল জগতের শোক-দুঃখহারী শ্রীমাধবের পবিত্র আবির্ভাব তিথি। পালিত হচ্ছে দেশজুড়ে--- বিশ্বজুড়েও। আজ মহাচৈতন্যর কণারূপ বালগোপালকে স্মরণ করি। 

                "করারবিন্দেন পদারবিন্দ।
                 মুখারবিন্দে বিনিবেশন্তম্।।
                 বটস্য পত্রস্যপুটে শয়ানম্।
                  বালমুকুন্দম্ মনসা  স্মরামি।।"

                        জন্মাষ্টমী
           কমলদলের মত ছোট দুটি করে
           কমলফুলের মত পা'দুখানি ধরে,
           কমলনিন্দিত মুখে রাখে বার বার,
          দেখে হাসে নন্দরাণী আনন্দ অপার।
          ছিল যত গোপবালা বলে যশোদাকে,
          "কি নিঠুরা মা গো তুমি ? নাও তুলে বুকে।"
           পদ্মাসনে নন্দরাণী গোপাল নিল তুলে --
            শরতের পূর্ণচাঁদ খণ্ড-মেঘ কোলে।

            ব্রজাঙ্গনা নৃত্য করে যমুনা পুলিনে
           কে যেন বাজায় বাঁশী নিখিল অঙ্গনে।।

                                            ভাবানুবাদ--
                              দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়

_____________________________________
                               (ক্রমশঃ)
পরবর্তী অষ্টম পর্ব একাদশ অধ্যায় থেকে।
_________________________________________







শুক্রবার, ১৫ আগস্ট, ২০২৫

Independence day-2025

Independence day, 2025 

(A lecture delivered at the community podium in the Pruska Silvana Housing Complex in Bangalore.)

I am blessed having been born in this exquisitely  beautiful land where the mountains proclaim their unbeatable vigour and the seas show their immeasurable depth. Where the immortal Rishis harang the celestial OM. Where the Gange cha Yabunechaiba Godavari Saraswati Narmada Sindhu Kaberi stream the sacred water to enliven the pilgrims throughout the world through the ages.
We, the Indians, have been living at our own free will since 1947, for 78 or nearly 79 years without being suppressed, oppressed and exploited by any foreign power or invaders and above all, which is hilarious to think that we have enjoyed and are enjoying a full flagged Democracy from  up to the bottom. What a heavenly our country is with natural, social, political and religious diversities !  Within these seven decades we have won, by our scientific knowledge, the earth -- lithosphere, hydrosphere, atmosphere and even piercing into the neighbouring planets and satellites. Our researches in every scientific sphere including medicine and medical science have reached the zenith of prosperity. We have eradicated as well as can combat possible fright of some dreadful epidemic and pestilence. Yes, we are fearlessly dwelling in this blessed Bharata.
Yet, yes yet, there is a serious question that rises above all the wealth and fortune whether we have set our souls free from some heinous iniquities like dogmatism, communalism, sectarianism and communal hatred ? The world, in this hour, is severely suffering from an infernal  disharmony mingled with global suspicion which has mounted to warfare between countries causing death and destruction leaving thousands of people along with the innocent and the frail in utter helplessness. What, then, should be or ought to be our ideals and ideologies to herald to the universal humanity ? Should we only preach 'Om Shanti, Om Shanti ?' An embodiment of India's Vedanta Philosophy Swami Vivekananda, once said, "Mind my countrymen, no one is ready to listen to You until and unless you are having an imposing might and invincible authority and power of oneness." Sarvapally Radha krishnan, the great philosopher, explained our aeon-old Hinduism saying that in our holy scripts the wisdom reaches the last phase and has sown the seeds of universal civilization.
Now two questions are to be asked. One, is there an unbreakable unity in India irrespective of cast, creed, community and the rich and the deprived ? And Two, do we, the Indians bear and carry forward the high legacy of our cultural heritage that our grand ancestors left for their predecessors ?
Today is an auspicious day to introspect and to recall the bygone ages when our indomitable heroes would dominate half of the globe with Himalayan hearts and Oceanic wisdom.

Dulal Chandra Bandyopadhyay.
15th August, 2025.
Bangalore.
_______________________________________________

মঙ্গলবার, ৫ আগস্ট, ২০২৫

গীতায় অর্জুন-৬

গীতায় অর্জুন-৬ 


শ্রীমদ্ভগবদ্ গীতায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণের শ্রীমুখনিঃসৃত বাণীসমূহের আলোচনার দুটি দিক আছে। একটি বিচারের, অন্যটি ভক্তির। কিন্তু বিচার করে অগ্রসর হতে গেলে এমন এক 'বিরাটের' সম্মুখে এসে দাঁড়াতে হয় যে প্রশ্ন আর থাকেনা। থাকলেও তা অকিঞ্চিৎকর মনে হবে। তখন প্রশ্নকর্তার বিস্ময় জাগে। এই 'বিস্ময়' বা আশ্চর্যান্বিত ভাব থেকেই আসে বিশ্বাস। এই বিশ্বাসেই মানবীয় চেতনা আত্মোৎসর্গের পথ অবলম্বন করে। পরম (যা মানুষের‌ অধিগত নয়) শক্তির কাছে আত্মনিবেদন করে বলে, "দেখা দাও, দেখা দাও।" শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব যেমন বলেন, "দেখা দিবি নে মা !" রবীন্দ্রনাথ বলেন, "নাই বা ডাকো রইব তোমার দ্বারে।" ভগবৎপ্রাণ ভক্তদের একই আর্ত কামনা, "কি করিলে বল পাইব তোমাকে, রাখিব আঁখিতে আঁখিতে।"

এখানে, এই অষ্টম অধ্যায়ে, অর্জুন যেন সখা কৃষ্ণ নয়, পরম পুরুষের সন্নিধানে এসে দাঁড়িয়েছেন। নিজের অজ্ঞতা, দীনতায় ক্লিষ্ট হয়ে জানতে চাইছেন, 

কিং তদ্ব্রহ্ম কি মধ্যাত্মং কিম্ কর্ম পুরুষোত্তম।
অধিভূতং চ কিম্ প্রোক্তমধিদৈবং কিমুচ্যতে।। 

হে পুরুষোত্তম, আপনি যে যে কথাগুলি বলে গেলেন -- 'ব্রহ্ম', 'অধ্যাত্ম', 'কর্ম', 'অধিভূত' 'অধিযজ্ঞ' 'প্রয়াণকালে ('ব্রহ্ম) কি ভাবে জ্ঞেয' এবং 'অধিদৈব'--- সেগুলির অর্থ তো আমি জানি না। 'অধিযজ্ঞ' কে ? 'অধিযজ্ঞ'-যুক্ত চিত্তবিশিষ্ঠ পুরুষগণ  অন্তিমকালে আপনাকে পায় ; কিন্তু কি সাধনায় ? 'জ্ঞানের বিষয় -রূপে' আপনার সত্তা প্রকাশিত হয় কি ভাবে ?
অর্জুনের এই সাতটি প্রশ্ন মানব-চেতনার অনাদি কালের জিজ্ঞাসা। শ্রীকৃষ্ণ উত্তরে বলছেন, 'ব্রহ্ম' পরম অক্ষর --- অবিনাশী, ক্ষয়হীন, লয়হীন পরমাত্মা। তাঁর নিজের স্বরূপের প্রতিবিম্বিত রূপ জীবাত্মা। এই জীবাত্মাই 'অধ্যাত্ম'। আর জীবের জড় অবস্থা অর্থাৎ 'দেহ'ভাব উৎপন্ন করে তার 'কর্ম'। জীবাত্মা দেহের মধ্যেই বিরাজ করে দেহকে কর্মে প্রবৃত্ত করে। কর্মের বহিঃপ্রকাশ ঘটে যখন দেহী শাস্ত্রবিধি অনুযায়ী, 'স্মৃতি' অনুসরণ করে যজ্ঞ করে, দান করে। কর্মযোগে দানের জন্য যে ত্যাগ করা ---তাই হোল 'কর্মসজ্ঞিতঃ'। 'অধিভূত' হয় জাগতিক সমস্ত পদার্থ যা উৎপত্তি ও বিনাশের অধীন। 'অধিদৈব' হলেন 'পুরুষ' ; সেই পুরুষ যিনি হিরণ্যগর্ভ, প্রজাপতি 'ব্রহ্মা'। আর দেহধারী জীবাত্মাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ, হে অর্জুন,  এই আমি বাসুদেব --- বিষ্ণুরূপে ''অধিযজ্ঞ'। এবং যে জীবাত্মা পুরুষ মৃত্যুকালে আমার শরণ নেয়, আমাকেই স্মরণ করে সে আমাকে, (আমার স্বরূপকে) লাভ করে। অতএব, 

"তস্মাৎ সর্বেষু কালেষু মামনুস্মর যুদ্ধ চ।
ময়ি অর্পিতমনোবুদ্ধিঃ মামেব এষ্যসি অসংশয়ম্।।"
অন্তিমে আমাকে লাভ করা বা আমার শরণে আশ্রয় নেওয়াই যখন জীবের উদ্দেশ্যে তখন আমাকে স্মরণ কর, এবং যুদ্ধ কর -- "মামুনুস্মর যুদ্ধ চ।"

কী সাংঘাতিক ! আহা রে, বেচারা অর্জুন !
এমন ধারা কঠোর আদেশ (stringent command) তো প্রথমেই দিলে পারতেন। "ক্লৈবং মাস্মগমঃ পার্থ (২।৩) বলেই তো ছেড়ে দিলেই পারতেন। আমি নিশ্চিয়ই সখার কথামতই এতসব যোগ-যাগের বিষয় শোনার জন্য কালক্ষেপ করতাম না। তারপর আবার বললেন, "ধর্ম্যাদ্ধি যুদ্ধাৎ শ্রেয়ঃ অন্যৎ ক্ষত্রিয়স্য ন বিদ্যতে" (২।৩১), কারণ এটি ধর্মযুদ্ধ (২।৩৩), এই যুদ্ধ পরিত্যাগ করলে তোমার সামর্থ্যের নিন্দা হবে, তুমি ক্ষত্রিয়। অতএব "যুদ্ধায় কৃতনিশ্চয়ঃ।" এই যুদ্ধে জয়ী হয়ে পৃথিবী ভোগ কর (২।৩৭)। তার পর থেকেই "নিষ্কাম কর্মযোগ"-য়ের  নিগূঢ় সাধন-পন্থার অবতারণা, সাংখ্য বা জ্ঞানযোগের বিষয়-বর্ণন এবং একই সাথে জ্ঞানকর্মসন্ন্যাসযোগ, কর্মসন্ন্যাসযোগ, আত্মসংযমযোগ, গভীর ও গম্ভীর মায়াতত্ত্ব ! আর এখন এনাকে স্মরণ করে যুদ্ধে প্রবৃত্ত হতে হবে !

এখানেই শেষ নয় ; শুধু তাকে স্মরণ করলেই হবে না, কৃষ্ণ আবারও বলছেন, তাঁর মধ্য দিয়ে পরম দিব্যপুরুষকে অনুভব করতে হবে। কে, কি সে দিব্য পুরুষ ?
"কবিং পুরাণমনুশাসিতারম অণোঃ আণীয়াংসম অনুস্মরেদ্ যং।
সর্বস্য ধাতারমচিন্ত্যরূপম্ আদিত্যবর্ণম্ তমসঃ পরস্তাত।।" (গীতা-৮।৯)
এই মন্ত্রে পুরাণ-উপনিষদোক্ত পরমব্রহ্মের (এখানে পরমেশ্বর শব্দ ব্যবহৃত) স্বরূপের বর্ণনা পাই। 'যে পুরুষ কবি, আদিরও আদি (পুরাণম্), সৃষ্টির, বা
ভূতজগতের নিয়ন্ত্রক, ধারক, সূক্ষ্ম হতেও সূক্ষ্ম, চিন্তাতীত যাঁর সত্ত্বা, সকল অন্ধকারের (অবিদ্যাজনিত, অজ্ঞানতা প্রসূত মোহাচ্ছন্নতা) পরপারে সূর্যসন্বিভ প্রকাশরূপী সচ্চিদানন্দঘন সেই পরমাত্মাই স্মর্তব্য। বেদবিদগণ সেই 'পরমপদম'কে অক্ষরব্রহ্ম বলেন, কামনাবিহীন নিরাসক্ত মহাত্মাগণ তাঁকে ধারনায় লাভ করে' তাঁরই মধ্যে (সচ্চিদানন্দঘনরূপের মধ্যে) প্রবেশ করেন (বিশন্তি), এবং শাশ্বতী শান্তি লাভ করেন ---
            "তমাত্মস্থং যেহনু পশ্যন্তি ধীরাঃ।
             তেষাং শান্তি শাশ্বতী নেতরষাম্।।"
                                        ----কঠোপনিষদ।
কঠোপনিষদের এই মন্ত্রটির অন্তর্নিহিত ভাব ধরা পড়েছে ঐ উপরোক্ত গীতার শ্লোকটিতে (৮।৯)।
___________________________________
প্রাচীন ভারতের দর্শনচিন্তা বর্তমানের বৈজ্ঞানিক যুক্তিনির্ভর দার্শনিক গবেষকদেরকেও বিস্মিত করে। উপনিষদ ও পুরাণ কাহিনীগুলির সৃষ্টির সময়কালেও 'আত্মা, পরমাত্মা, ব্রহ্ম' এবং পারলৌকিক স্বর্গের ধারণাকে, অস্তিত্বকে নস্যাৎ করে 'বৈশেষিক' ও 'ন্যায়', 'কপিলের সাংখ্য', 'বৌদ্ধ' 'চার্বাক' এবং এ সবের ফলিত রূপ 'লোকায়ত' দর্শন প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল। ঐ সকল দর্শনে আত্মাকেও জড়েরই সমগোত্রীয়রূপে  তুলনা করা হয়েছে। "সাংখ্য দর্শনই প্রথম আত্মা সম্মন্ধে সীমিত জড় দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সরে এসে তার আধ্যাত্মিক লক্ষণ, স্বতন্ত্র ভাবের কথা ঘোষণা করেছে।" আবার অনেক পুজ্যপাদ বেদ-বেদান্ত-উপনিষদের বিদ্বানদের মতে 'কপিলের সাংখ্য ' আদীতে 'নিরীশ্বরবাদীই' ছিল। ('কপিলের সাংখ্য দর্শনের' সঙ্গে গীতার 'সাংখ্যযোগের' মিল ও অমিল দুটিই আছে) বিদেশের পণ্ডিতগণও এই বিষয়টির উপর গবেষণা করেছেন এবং বক্তব্য রেখেছেন। বেদ পরবর্তী বা বেদের কর্মকাণ্ড বিষয়ক ব্রাহ্মণ গ্রন্থগুলির ক্রিয়াকাণ্ড প্রসঙ্গে পুরুষ শব্দটির প্রয়োগ বিশ্লেষণ করে তাঁরা বলছেন,-----
"This clearly shows that Purusa originally denoted the human being with its peculiar bodily structure and not any inner or spiritual entity in dwelling therein. ( In the first and second group of our Upanisadic Texts, this is almost the exclusive sense in which the term is used."
          ------(S.K. Belvalkar and R.D. Ranade). 


অতএব এর থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়‌ যে আদীতে পুরুষ বলতে দেহবিশিষ্ট মানুষই বুঝিয়েছে---- দেহাতিরিক্ত বা দেহাভ্যন্তরের কোন আধ্যাত্মিক সত্ত্বা নয়।
         ('লোকায়ত দর্শন',ডি. পি. চট্টোপাধ্যায়, থেকে।)

শ্রীমদ্ভগবদ্ গীতার অষ্টম অধ্যায়ে কৃষ্ণার্জুন সংবাদ আলোচনার মাঝখানে আমরা কিছুটা শাখাপথ নিয়েছিলাম এই কারণেই যে শ্রীকৃষ্ণ যে ব্রহ্মসাধন পন্থার কথা অর্জুনকে বলছেন, (বিশেষত দ্বিতীয় অধ্যায় সাংখ্যযোগ, থেকেই যার আরম্ভ‌), সে পন্থার রেখাচিত্র অঙ্কিত আছে বেদ-ব্রাহ্মণ-উপনিষদে, বা ব্রহ্মবাদ তত্ত্বে। আবার সাংখ্য দর্শনের পুরুষ-প্রকৃতি তত্ত্বেও। বেদান্ত দর্শনের সঙ্গে সঙ্গে সাংখ্য দর্শনের প্রভাবও সমকালের জনমানসে যে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল তার ইঙ্গিতগুলি আমরা পাই অর্জুনের প্রশ্নগুলিতে এবং শ্রীকৃষ্ণের উপদেশবাণীগুলিতে ব্যক্ত হয় আদি সাংখ্যের নিরীশ্বরবাদী মতবাদের বিপরীতমুখী যুক্তির অবতারণায়। কৃষ্ণের কিছু বক্তব্যে সাংখ্যের 'পুরুষ-প্রকৃতি' তত্ত্বের (আত্মা, পরমাত্মা, ব্রহ্ম যেখানে অস্বীকৃত) সরাসরি বিরোধিতা লক্ষণীয়ভাবে প্রকট। 

প্রকৃতেঃ ক্রিয়মাণানি গুণৈঃ সর্বশঃ।
অহঙ্কারবিমূঢ়াত্মা কর্তাহমিতি মন্যতে।।  (৩।২৭) 

সমস্ত কর্ম সাধিত হয় প্রকৃতির গুণেই, কিন্তু 'অহংকার'-সর্বস্ব' মূঢ়তামুগ্ধ পুরুষ মনে করে 'আমি কর্তা'।
কিন্তু তত্ত্ববিদ্ পুরুষ জানেন 'সকল গুণ' গুণসমূহের মধ্যেই সম্পাদিত বা নিষ্পন্ন হয়। এখানে ভর্ৎসনা সহকারে এই কথা বলা হয়েছে যে, "যে পুরুষ দেহাত্মবাদী বা দেহকেই আত্মা বলে জানে, সে অহংকারপ্রমত্ত হয়ে নিজেকেই কর্মের কর্তারূপে ভাবতে থাকে, জানেনা যে সব কর্মই সম্পাদিত হয় প্রকৃতির পরিচালনায়। আর প্রকৃতি পরিচালিত হয় পরমপুরুষের বা ভগবানের নির্দেশে। এর পরেই কৃষ্ণ বলবেন, "অধ্যাত্মচেতনার দ্বারা ধ্যান-অভিনিবিষ্ট হয়ে আশারহিত, মমতারহিত, সন্তাপরহিত হয়ে, সকল কর্ম আমাকে, আমার মধ্যে (ময়ি) সমর্পণ করে যুদ্ধ কর। নিরাশীর্নির্মমো ভূত্বা যুদ্ধস্ব বিগতজ্বরঃ।" কর্মের বন্ধন ছিন্ন করবার, মুক্তি (মোক্ষ) লাভ করবার এই একমাত্র উপায়। 

এখন সাংখ্য দর্শনের বিষয়ে আরো কয়েকটি কথা আলোচনা করা যাক্। সাংখ্য দর্শনে‌ প্রকৃতিই প্রধান। পুরুষ নেহাতই অপ্রধান বা উদাসীন। এইজন্যই, প্রাচীনদের পরিভাষায় সাংখ্যে প্রকৃতিই হোল প্রধান-কারণবাদ। প্রধান-কারণবাদ বলতে প্রাচীনেরা জড়বাদ বা বস্তুবাদ বুঝতেন ---আধুনিক পরিভাষায় materialism. স্বভাবতই  আধুনিক বিদ্বানকুল প্রকৃতি বলতে primordial matter বোঝেন। সেটা নিশ্চিয়ই ভুল নয় ; কিন্তু ওইটুকু বললে এই প্রকৃতিরই আরো একটি মৌলিক বৈশিষ্ঠের কথা অস্পষ্ট থেকে যাবে ; কেননা প্রকৃতি বলতে সাংখ্যে শুধুমাত্র primordial matter-ই বোঝায় না, female principal-ও বোঝায়। এদিক থেকে সাংখ্য-দর্শন শুধুমাত্র জড়বাদ বা বস্তুবাদ নয় নারীপ্রাধান্যমূলক চিন্তারও পরিচায়ক। কিন্তু কৃষ্ণ বলছেন প্রকৃতির দ্বারা কর্ম প্রবর্তিত হলেও 'পুরুষ'ই সৃষ্টি স্থিতি ও লয়ের কারণ এবং কারণস্বরূপ হয়েও তিনি উদাসীন, নির্গুণ, নিষ্ক্রিয়।
সাংখ্য দর্শনের প্রকৃতিবাদ ও বৈদান্তিক ব্রহ্মবাদের এক অদ্ভুত সংমিশ্রণ এখানে পরিলক্ষিত হয়।
____________________________________________
এবার শ্রীকৃষ্ণ বলে গেলেন কি ভাবে সেই (তাঁরই মধ্যে বিলীন) দিব্য, পরম পুরুষ অধিগত হন। কি সে সাধনা, কি ভাবে সেই সাধনা, কি ভাবেই বা সেই "আদিত্যবর্ণম্ তমসঃ পরস্তাত"-এর ধ্যান, কেমনভাবেই সেই সনাতন, অব্যক্ত, 'অক্ষরব্রহ্ম'-এর আরাধনা। এ প্রসঙ্গে এসেছে কৃষ্ণমার্গ ও শুক্লমার্গের--- (যথাক্রমে দেবযান ও পিতৃযান) ব্রহ্মোপলব্ধির দ্বিবিধ মার্গের কথা। এসেছে ব্রহ্মচর্য আচরণ (ব্রহ্মচর্যম চরন্তি), ধ্যানযোগের বিধি বিধান অনুসরণ করে ওঁ-কার উচ্চারণ- পূর্বক ভগবৎস্বরূপ সত্ত্বা'-র স্মরণ ও মননের মাধ্যমে পরমেশ্বরকে লাভ করা এবং তাঁকে লাভ করে জীবন- মরণের চির ঘূর্ণায়মান দুষ্ছেদ্য বৃত্ত ছিন্ন করবার দুরূহ সাধনপন্থার কথাও। সেই পরমাত্মা, পরমেশ্বরকে লাভ করাই জীবের একমাত্র এবং পরমতম  উদ্দেশ্য হওয়া উচিত এই কারণেই যে এই নশ্বর জগতে সমস্ত ভূত (বস্তু- অবস্তু, জীব-জীবন, ভাব-অভাব) নষ্ট হলেও  "সচ্চিদানন্দঘন পূর্ণব্রহ্ম পরমাত্মা ন বিনশ্যতি।"
যোগসাধনার বিবিধ বিধি বিধান, ক্রিয়া কল্প ছাড়াও
তাঁকে লাভ করবার আরো একটি সহজ উপায়ের কথা ভগবানস্বরূপ শ্রীকৃষ্ণ এখানে মিলিয়ে দিয়েছেন--- বুদ্ধিমান ঈশ্বরানুরাগী যে পথটি অনুসরণ করেন। 

"পুরুষঃ স পরঃ পার্থ ভক্ত্যা লভ্যস্তনস্তয়া।
যস্যান্তঃস্থানি ভূত আনি যেন সর্বমিদং ততম।" ৮।২২। 

হে পার্থ, ভূতজগৎ যে পরমাত্মার অন্তর্গত, যে সৎ-চিৎ-আনন্দময় পরমাত্মার দ্বারা এই সম্পূর্ণ নিখিল ভূবন পরিপূর্ণ হয়ে আছে সেই সনাতন অব্যক্ত পরম পুরুষকে প্রাপ্ত হওয়া যায় অনন্যা ভক্তির দ্বারা।
আরো একটি আপাত সরল কিন্তু অতি কঠিন সাধনক্রিয়ার উপায় (অষ্টম অধ্যায়ের অন্তিমে) তিনি ব্যক্ত করেছেন ,---
"বেদেষু যজ্ঞেষু তপঃসু চৈব দানেষু যৎ পুন্যফলং প্রদিষ্টম।
তত্যেতি তৎ সর্বমিদং বিদিত্বা যোগী পরং স্থানমুপৈতি চ অদ্যম।। "(৮।২৮)।‌ 

'পরমেশ্বর' বা 'পরমাত্মার' সঙ্গে 'একাত্ম' হবার জন্য শ্রীকৃষ্ণ অব্যবহিত পূর্বে যে দুটি পন্থার, কৃষ্ণমার্গ ও শুক্লমার্গের কথা বলেছেন, এখন বলছেন 'যোগী পুরুষ' ওই উভয় মার্গের কোনটিতেই মোহিত না হয়ে, সম্পূর্ণ নিষ্কাম সাধনার দ্বারা, আমার প্রতি আত্মসমর্পণ করে যোগসাধনা করেন, যিনি (যে যোগী) বেদপাঠ, যজ্ঞ, তপশ্চর্যা, দানের মাধ্যমে পুন্যফল প্রাপ্তিকে অস্বীকার করে আমাতেই যোগযুক্ত থাকেন তিনিই চিরন্তন, চির সনাতন আমার 'পরম পদম' লাভ করতে সক্ষম হন।

"তোমার এই করিয়াছি জীবনের ধ্রুবতারা" --- পরিপূর্ণভাবে সেই পরমব্রহ্মে আত্মসমর্পণ।
অর্জুন ধীরে ধীরে সেই পথেই অগ্রসর হচ্ছেন। অষ্টম অধ্যাস্থান অক্ষরব্রহ্মযোগ' সাধনার নিহিতার্থ এই যে একমেবাদ্বিতীয়ম্ পরমব্রহ্মরূপী শ্রীকৃষ্ণ এই 'সত্য' উদ্গীত করেছেন যেমনটি আমরা পাই ভাগবত পুরাণে, ------ যস্মিন্নিদং  যতশ্চেদম্,

         যেনেদং য ইদং স্বয়ং ;
         যোহস্মাৎ পরস্মাৎ চ পরঃ
           যং প্রপদ্যে স্বয়ংভূবম্।।
                                      (ভাগবত পুরাণ)

সেই স্বয়ম্ভূ-সত্ত্বা আমার আশ্রয় যাতে এই জগৎসংসার বিধৃত রয়েছে (ওতপ্রোত), যাঁর থেকে জগৎসংসারের  (ভূতজগতের) উদ্ভব হয়েছে এবং যিনি এরও (ইদম)পারে, ওরও পারে (পরস্মাৎ চ পরঃ)। ব্যক্ত ও অব্যক্ত বিশ্বপ্রকৃতির পরপারে।
"সেই আদি, পরম স্থান (পরম পদম) কি ভাবে লাভ করা যায়‌ সেই অতি গোপন (গুহ্য), 'জ্ঞান-বিজ্ঞান'- তোমাকে জানাব '' --- শ্রীকৃষ্ণের এই বাণী দ্বারাই শ্রীমদ্ভগবতের নবম অধ্যায় আরম্ভ।


                           (ক্রমশঃ)












Recently published

অমূল্য

He ( Tagore) who sees all things in his own self and his own self in all things, he does not remain unrevealed.                     ...