গীতায় অর্জুন-৬
শ্রীমদ্ভগবদ্ গীতায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণের শ্রীমুখনিঃসৃত বাণীসমূহের আলোচনার দুটি দিক আছে। একটি বিচারের, অন্যটি ভক্তির। কিন্তু বিচার করে অগ্রসর হতে গেলে এমন এক 'বিরাটের' সম্মুখে এসে দাঁড়াতে হয় যে প্রশ্ন আর থাকেনা। থাকলেও তা অকিঞ্চিৎকর মনে হবে। তখন প্রশ্নকর্তার বিস্ময় জাগে। এই 'বিস্ময়' বা আশ্চর্যান্বিত ভাব থেকেই আসে বিশ্বাস। এই বিশ্বাসেই মানবীয় চেতনা আত্মোৎসর্গের পথ অবলম্বন করে। পরম (যা মানুষের অধিগত নয়) শক্তির কাছে আত্মনিবেদন করে বলে, "দেখা দাও, দেখা দাও।" শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব যেমন বলেন, "দেখা দিবি নে মা !" রবীন্দ্রনাথ বলেন, "নাই বা ডাকো রইব তোমার দ্বারে।" ভগবৎপ্রাণ ভক্তদের একই আর্ত কামনা, "কি করিলে বল পাইব তোমাকে, রাখিব আঁখিতে আঁখিতে।"
এখানে, এই অষ্টম অধ্যায়ে, অর্জুন যেন সখা কৃষ্ণ নয়, পরম পুরুষের সন্নিধানে এসে দাঁড়িয়েছেন। নিজের অজ্ঞতা, দীনতায় ক্লিষ্ট হয়ে জানতে চাইছেন,
কিং তদ্ব্রহ্ম কি মধ্যাত্মং কিম্ কর্ম পুরুষোত্তম।
অধিভূতং চ কিম্ প্রোক্তমধিদৈবং কিমুচ্যতে।।
হে পুরুষোত্তম, আপনি যে যে কথাগুলি বলে গেলেন -- 'ব্রহ্ম', 'অধ্যাত্ম', 'কর্ম', 'অধিভূত' 'অধিযজ্ঞ' 'প্রয়াণকালে ('ব্রহ্ম) কি ভাবে জ্ঞেয' এবং 'অধিদৈব'--- সেগুলির অর্থ তো আমি জানি না। 'অধিযজ্ঞ' কে ? 'অধিযজ্ঞ'-যুক্ত চিত্তবিশিষ্ঠ পুরুষগণ অন্তিমকালে আপনাকে পায় ; কিন্তু কি সাধনায় ? 'জ্ঞানের বিষয় -রূপে' আপনার সত্তা প্রকাশিত হয় কি ভাবে ?
অর্জুনের এই সাতটি প্রশ্ন মানব-চেতনার অনাদি কালের জিজ্ঞাসা। শ্রীকৃষ্ণ উত্তরে বলছেন, 'ব্রহ্ম' পরম অক্ষর --- অবিনাশী, ক্ষয়হীন, লয়হীন পরমাত্মা। তাঁর নিজের স্বরূপের প্রতিবিম্বিত রূপ জীবাত্মা। এই জীবাত্মাই 'অধ্যাত্ম'। আর জীবের জড় অবস্থা অর্থাৎ 'দেহ'ভাব উৎপন্ন করে তার 'কর্ম'। জীবাত্মা দেহের মধ্যেই বিরাজ করে দেহকে কর্মে প্রবৃত্ত করে। কর্মের বহিঃপ্রকাশ ঘটে যখন দেহী শাস্ত্রবিধি অনুযায়ী, 'স্মৃতি' অনুসরণ করে যজ্ঞ করে, দান করে। কর্মযোগে দানের জন্য যে ত্যাগ করা ---তাই হোল 'কর্মসজ্ঞিতঃ'। 'অধিভূত' হয় জাগতিক সমস্ত পদার্থ যা উৎপত্তি ও বিনাশের অধীন। 'অধিদৈব' হলেন 'পুরুষ' ; সেই পুরুষ যিনি হিরণ্যগর্ভ, প্রজাপতি 'ব্রহ্মা'। আর দেহধারী জীবাত্মাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ, হে অর্জুন, এই আমি বাসুদেব --- বিষ্ণুরূপে ''অধিযজ্ঞ'। এবং যে জীবাত্মা পুরুষ মৃত্যুকালে আমার শরণ নেয়, আমাকেই স্মরণ করে সে আমাকে, (আমার স্বরূপকে) লাভ করে। অতএব,
"তস্মাৎ সর্বেষু কালেষু মামনুস্মর যুদ্ধ চ।
ময়ি অর্পিতমনোবুদ্ধিঃ মামেব এষ্যসি অসংশয়ম্।।"
অন্তিমে আমাকে লাভ করা বা আমার শরণে আশ্রয় নেওয়াই যখন জীবের উদ্দেশ্যে তখন আমাকে স্মরণ কর, এবং যুদ্ধ কর -- "মামুনুস্মর যুদ্ধ চ।"
কী সাংঘাতিক ! আহা রে, বেচারা অর্জুন !
এমন ধারা কঠোর আদেশ (stringent command) তো প্রথমেই দিলে পারতেন। "ক্লৈবং মাস্মগমঃ পার্থ (২।৩) বলেই তো ছেড়ে দিলেই পারতেন। আমি নিশ্চিয়ই সখার কথামতই এতসব যোগ-যাগের বিষয় শোনার জন্য কালক্ষেপ করতাম না। তারপর আবার বললেন, "ধর্ম্যাদ্ধি যুদ্ধাৎ শ্রেয়ঃ অন্যৎ ক্ষত্রিয়স্য ন বিদ্যতে" (২।৩১), কারণ এটি ধর্মযুদ্ধ (২।৩৩), এই যুদ্ধ পরিত্যাগ করলে তোমার সামর্থ্যের নিন্দা হবে, তুমি ক্ষত্রিয়। অতএব "যুদ্ধায় কৃতনিশ্চয়ঃ।" এই যুদ্ধে জয়ী হয়ে পৃথিবী ভোগ কর (২।৩৭)। তার পর থেকেই "নিষ্কাম কর্মযোগ"-য়ের নিগূঢ় সাধন-পন্থার অবতারণা, সাংখ্য বা জ্ঞানযোগের বিষয়-বর্ণন এবং একই সাথে জ্ঞানকর্মসন্ন্যাসযোগ, কর্মসন্ন্যাসযোগ, আত্মসংযমযোগ, গভীর ও গম্ভীর মায়াতত্ত্ব ! আর এখন এনাকে স্মরণ করে যুদ্ধে প্রবৃত্ত হতে হবে !
এখানেই শেষ নয় ; শুধু তাকে স্মরণ করলেই হবে না, কৃষ্ণ আবারও বলছেন, তাঁর মধ্য দিয়ে পরম দিব্যপুরুষকে অনুভব করতে হবে। কে, কি সে দিব্য পুরুষ ?
"কবিং পুরাণমনুশাসিতারম অণোঃ আণীয়াংসম অনুস্মরেদ্ যং।
সর্বস্য ধাতারমচিন্ত্যরূপম্ আদিত্যবর্ণম্ তমসঃ পরস্তাত।।" (গীতা-৮।৯)
এই মন্ত্রে পুরাণ-উপনিষদোক্ত পরমব্রহ্মের (এখানে পরমেশ্বর শব্দ ব্যবহৃত) স্বরূপের বর্ণনা পাই। 'যে পুরুষ কবি, আদিরও আদি (পুরাণম্), সৃষ্টির, বা
ভূতজগতের নিয়ন্ত্রক, ধারক, সূক্ষ্ম হতেও সূক্ষ্ম, চিন্তাতীত যাঁর সত্ত্বা, সকল অন্ধকারের (অবিদ্যাজনিত, অজ্ঞানতা প্রসূত মোহাচ্ছন্নতা) পরপারে সূর্যসন্বিভ প্রকাশরূপী সচ্চিদানন্দঘন সেই পরমাত্মাই স্মর্তব্য। বেদবিদগণ সেই 'পরমপদম'কে অক্ষরব্রহ্ম বলেন, কামনাবিহীন নিরাসক্ত মহাত্মাগণ তাঁকে ধারনায় লাভ করে' তাঁরই মধ্যে (সচ্চিদানন্দঘনরূপের মধ্যে) প্রবেশ করেন (বিশন্তি), এবং শাশ্বতী শান্তি লাভ করেন ---
"তমাত্মস্থং যেহনু পশ্যন্তি ধীরাঃ।
তেষাং শান্তি শাশ্বতী নেতরষাম্।।"
----কঠোপনিষদ।
কঠোপনিষদের এই মন্ত্রটির অন্তর্নিহিত ভাব ধরা পড়েছে ঐ উপরোক্ত গীতার শ্লোকটিতে (৮।৯)।
___________________________________
প্রাচীন ভারতের দর্শনচিন্তা বর্তমানের বৈজ্ঞানিক যুক্তিনির্ভর দার্শনিক গবেষকদেরকেও বিস্মিত করে। উপনিষদ ও পুরাণ কাহিনীগুলির সৃষ্টির সময়কালেও 'আত্মা, পরমাত্মা, ব্রহ্ম' এবং পারলৌকিক স্বর্গের ধারণাকে, অস্তিত্বকে নস্যাৎ করে 'বৈশেষিক' ও 'ন্যায়', 'কপিলের সাংখ্য', 'বৌদ্ধ' 'চার্বাক' এবং এ সবের ফলিত রূপ 'লোকায়ত' দর্শন প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল। ঐ সকল দর্শনে আত্মাকেও জড়েরই সমগোত্রীয়রূপে তুলনা করা হয়েছে। "সাংখ্য দর্শনই প্রথম আত্মা সম্মন্ধে সীমিত জড় দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সরে এসে তার আধ্যাত্মিক লক্ষণ, স্বতন্ত্র ভাবের কথা ঘোষণা করেছে।" আবার অনেক পুজ্যপাদ বেদ-বেদান্ত-উপনিষদের বিদ্বানদের মতে 'কপিলের সাংখ্য ' আদীতে 'নিরীশ্বরবাদীই' ছিল। ('কপিলের সাংখ্য দর্শনের' সঙ্গে গীতার 'সাংখ্যযোগের' মিল ও অমিল দুটিই আছে) বিদেশের পণ্ডিতগণও এই বিষয়টির উপর গবেষণা করেছেন এবং বক্তব্য রেখেছেন। বেদ পরবর্তী বা বেদের কর্মকাণ্ড বিষয়ক ব্রাহ্মণ গ্রন্থগুলির ক্রিয়াকাণ্ড প্রসঙ্গে পুরুষ শব্দটির প্রয়োগ বিশ্লেষণ করে তাঁরা বলছেন,-----
"This clearly shows that Purusa originally denoted the human being with its peculiar bodily structure and not any inner or spiritual entity in dwelling therein. ( In the first and second group of our Upanisadic Texts, this is almost the exclusive sense in which the term is used."
------(S.K. Belvalkar and R.D. Ranade).
অতএব এর থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে আদীতে পুরুষ বলতে দেহবিশিষ্ট মানুষই বুঝিয়েছে---- দেহাতিরিক্ত বা দেহাভ্যন্তরের কোন আধ্যাত্মিক সত্ত্বা নয়।
('লোকায়ত দর্শন',ডি. পি. চট্টোপাধ্যায়, থেকে।)
শ্রীমদ্ভগবদ্ গীতার অষ্টম অধ্যায়ে কৃষ্ণার্জুন সংবাদ আলোচনার মাঝখানে আমরা কিছুটা শাখাপথ নিয়েছিলাম এই কারণেই যে শ্রীকৃষ্ণ যে ব্রহ্মসাধন পন্থার কথা অর্জুনকে বলছেন, (বিশেষত দ্বিতীয় অধ্যায় সাংখ্যযোগ, থেকেই যার আরম্ভ), সে পন্থার রেখাচিত্র অঙ্কিত আছে বেদ-ব্রাহ্মণ-উপনিষদে, বা ব্রহ্মবাদ তত্ত্বে। আবার সাংখ্য দর্শনের পুরুষ-প্রকৃতি তত্ত্বেও। বেদান্ত দর্শনের সঙ্গে সঙ্গে সাংখ্য দর্শনের প্রভাবও সমকালের জনমানসে যে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল তার ইঙ্গিতগুলি আমরা পাই অর্জুনের প্রশ্নগুলিতে এবং শ্রীকৃষ্ণের উপদেশবাণীগুলিতে ব্যক্ত হয় আদি সাংখ্যের নিরীশ্বরবাদী মতবাদের বিপরীতমুখী যুক্তির অবতারণায়। কৃষ্ণের কিছু বক্তব্যে সাংখ্যের 'পুরুষ-প্রকৃতি' তত্ত্বের (আত্মা, পরমাত্মা, ব্রহ্ম যেখানে অস্বীকৃত) সরাসরি বিরোধিতা লক্ষণীয়ভাবে প্রকট।
প্রকৃতেঃ ক্রিয়মাণানি গুণৈঃ সর্বশঃ।
অহঙ্কারবিমূঢ়াত্মা কর্তাহমিতি মন্যতে।। (৩।২৭)
সমস্ত কর্ম সাধিত হয় প্রকৃতির গুণেই, কিন্তু 'অহংকার'-সর্বস্ব' মূঢ়তামুগ্ধ পুরুষ মনে করে 'আমি কর্তা'।
কিন্তু তত্ত্ববিদ্ পুরুষ জানেন 'সকল গুণ' গুণসমূহের মধ্যেই সম্পাদিত বা নিষ্পন্ন হয়। এখানে ভর্ৎসনা সহকারে এই কথা বলা হয়েছে যে, "যে পুরুষ দেহাত্মবাদী বা দেহকেই আত্মা বলে জানে, সে অহংকারপ্রমত্ত হয়ে নিজেকেই কর্মের কর্তারূপে ভাবতে থাকে, জানেনা যে সব কর্মই সম্পাদিত হয় প্রকৃতির পরিচালনায়। আর প্রকৃতি পরিচালিত হয় পরমপুরুষের বা ভগবানের নির্দেশে। এর পরেই কৃষ্ণ বলবেন, "অধ্যাত্মচেতনার দ্বারা ধ্যান-অভিনিবিষ্ট হয়ে আশারহিত, মমতারহিত, সন্তাপরহিত হয়ে, সকল কর্ম আমাকে, আমার মধ্যে (ময়ি) সমর্পণ করে যুদ্ধ কর। নিরাশীর্নির্মমো ভূত্বা যুদ্ধস্ব বিগতজ্বরঃ।" কর্মের বন্ধন ছিন্ন করবার, মুক্তি (মোক্ষ) লাভ করবার এই একমাত্র উপায়।
এখন সাংখ্য দর্শনের বিষয়ে আরো কয়েকটি কথা আলোচনা করা যাক্। সাংখ্য দর্শনে প্রকৃতিই প্রধান। পুরুষ নেহাতই অপ্রধান বা উদাসীন। এইজন্যই, প্রাচীনদের পরিভাষায় সাংখ্যে প্রকৃতিই হোল প্রধান-কারণবাদ। প্রধান-কারণবাদ বলতে প্রাচীনেরা জড়বাদ বা বস্তুবাদ বুঝতেন ---আধুনিক পরিভাষায় materialism. স্বভাবতই আধুনিক বিদ্বানকুল প্রকৃতি বলতে primordial matter বোঝেন। সেটা নিশ্চিয়ই ভুল নয় ; কিন্তু ওইটুকু বললে এই প্রকৃতিরই আরো একটি মৌলিক বৈশিষ্ঠের কথা অস্পষ্ট থেকে যাবে ; কেননা প্রকৃতি বলতে সাংখ্যে শুধুমাত্র primordial matter-ই বোঝায় না, female principal-ও বোঝায়। এদিক থেকে সাংখ্য-দর্শন শুধুমাত্র জড়বাদ বা বস্তুবাদ নয় নারীপ্রাধান্যমূলক চিন্তারও পরিচায়ক। কিন্তু কৃষ্ণ বলছেন প্রকৃতির দ্বারা কর্ম প্রবর্তিত হলেও 'পুরুষ'ই সৃষ্টি স্থিতি ও লয়ের কারণ এবং কারণস্বরূপ হয়েও তিনি উদাসীন, নির্গুণ, নিষ্ক্রিয়।
সাংখ্য দর্শনের প্রকৃতিবাদ ও বৈদান্তিক ব্রহ্মবাদের এক অদ্ভুত সংমিশ্রণ এখানে পরিলক্ষিত হয়।
____________________________________________
এবার শ্রীকৃষ্ণ বলে গেলেন কি ভাবে সেই (তাঁরই মধ্যে বিলীন) দিব্য, পরম পুরুষ অধিগত হন। কি সে সাধনা, কি ভাবে সেই সাধনা, কি ভাবেই বা সেই "আদিত্যবর্ণম্ তমসঃ পরস্তাত"-এর ধ্যান, কেমনভাবেই সেই সনাতন, অব্যক্ত, 'অক্ষরব্রহ্ম'-এর আরাধনা। এ প্রসঙ্গে এসেছে কৃষ্ণমার্গ ও শুক্লমার্গের--- (যথাক্রমে দেবযান ও পিতৃযান) ব্রহ্মোপলব্ধির দ্বিবিধ মার্গের কথা। এসেছে ব্রহ্মচর্য আচরণ (ব্রহ্মচর্যম চরন্তি), ধ্যানযোগের বিধি বিধান অনুসরণ করে ওঁ-কার উচ্চারণ- পূর্বক ভগবৎস্বরূপ সত্ত্বা'-র স্মরণ ও মননের মাধ্যমে পরমেশ্বরকে লাভ করা এবং তাঁকে লাভ করে জীবন- মরণের চির ঘূর্ণায়মান দুষ্ছেদ্য বৃত্ত ছিন্ন করবার দুরূহ সাধনপন্থার কথাও। সেই পরমাত্মা, পরমেশ্বরকে লাভ করাই জীবের একমাত্র এবং পরমতম উদ্দেশ্য হওয়া উচিত এই কারণেই যে এই নশ্বর জগতে সমস্ত ভূত (বস্তু- অবস্তু, জীব-জীবন, ভাব-অভাব) নষ্ট হলেও "সচ্চিদানন্দঘন পূর্ণব্রহ্ম পরমাত্মা ন বিনশ্যতি।"
যোগসাধনার বিবিধ বিধি বিধান, ক্রিয়া কল্প ছাড়াও
তাঁকে লাভ করবার আরো একটি সহজ উপায়ের কথা ভগবানস্বরূপ শ্রীকৃষ্ণ এখানে মিলিয়ে দিয়েছেন--- বুদ্ধিমান ঈশ্বরানুরাগী যে পথটি অনুসরণ করেন।
"পুরুষঃ স পরঃ পার্থ ভক্ত্যা লভ্যস্তনস্তয়া।
যস্যান্তঃস্থানি ভূত আনি যেন সর্বমিদং ততম।" ৮।২২।
হে পার্থ, ভূতজগৎ যে পরমাত্মার অন্তর্গত, যে সৎ-চিৎ-আনন্দময় পরমাত্মার দ্বারা এই সম্পূর্ণ নিখিল ভূবন পরিপূর্ণ হয়ে আছে সেই সনাতন অব্যক্ত পরম পুরুষকে প্রাপ্ত হওয়া যায় অনন্যা ভক্তির দ্বারা।
আরো একটি আপাত সরল কিন্তু অতি কঠিন সাধনক্রিয়ার উপায় (অষ্টম অধ্যায়ের অন্তিমে) তিনি ব্যক্ত করেছেন ,---
"বেদেষু যজ্ঞেষু তপঃসু চৈব দানেষু যৎ পুন্যফলং প্রদিষ্টম।
তত্যেতি তৎ সর্বমিদং বিদিত্বা যোগী পরং স্থানমুপৈতি চ অদ্যম।। "(৮।২৮)।
'পরমেশ্বর' বা 'পরমাত্মার' সঙ্গে 'একাত্ম' হবার জন্য শ্রীকৃষ্ণ অব্যবহিত পূর্বে যে দুটি পন্থার, কৃষ্ণমার্গ ও শুক্লমার্গের কথা বলেছেন, এখন বলছেন 'যোগী পুরুষ' ওই উভয় মার্গের কোনটিতেই মোহিত না হয়ে, সম্পূর্ণ নিষ্কাম সাধনার দ্বারা, আমার প্রতি আত্মসমর্পণ করে যোগসাধনা করেন, যিনি (যে যোগী) বেদপাঠ, যজ্ঞ, তপশ্চর্যা, দানের মাধ্যমে পুন্যফল প্রাপ্তিকে অস্বীকার করে আমাতেই যোগযুক্ত থাকেন তিনিই চিরন্তন, চির সনাতন আমার 'পরম পদম' লাভ করতে সক্ষম হন।
"তোমার এই করিয়াছি জীবনের ধ্রুবতারা" --- পরিপূর্ণভাবে সেই পরমব্রহ্মে আত্মসমর্পণ।
অর্জুন ধীরে ধীরে সেই পথেই অগ্রসর হচ্ছেন। অষ্টম অধ্যাস্থান অক্ষরব্রহ্মযোগ' সাধনার নিহিতার্থ এই যে একমেবাদ্বিতীয়ম্ পরমব্রহ্মরূপী শ্রীকৃষ্ণ এই 'সত্য' উদ্গীত করেছেন যেমনটি আমরা পাই ভাগবত পুরাণে, ------ যস্মিন্নিদং যতশ্চেদম্,
যেনেদং য ইদং স্বয়ং ;
যোহস্মাৎ পরস্মাৎ চ পরঃ
যং প্রপদ্যে স্বয়ংভূবম্।।
(ভাগবত পুরাণ)
সেই স্বয়ম্ভূ-সত্ত্বা আমার আশ্রয় যাতে এই জগৎসংসার বিধৃত রয়েছে (ওতপ্রোত), যাঁর থেকে জগৎসংসারের (ভূতজগতের) উদ্ভব হয়েছে এবং যিনি এরও (ইদম)পারে, ওরও পারে (পরস্মাৎ চ পরঃ)। ব্যক্ত ও অব্যক্ত বিশ্বপ্রকৃতির পরপারে।
"সেই আদি, পরম স্থান (পরম পদম) কি ভাবে লাভ করা যায় সেই অতি গোপন (গুহ্য), 'জ্ঞান-বিজ্ঞান'- তোমাকে জানাব '' --- শ্রীকৃষ্ণের এই বাণী দ্বারাই শ্রীমদ্ভগবতের নবম অধ্যায় আরম্ভ।
(ক্রমশঃ)
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন