শুক্রবার, ১০ অক্টোবর, ২০২৫

শ্রীমদ্ভগবদগীতায় অর্জুন --পর্ব ১৩

শ্রীমদ্ভগবত গীতায় অর্জুন-১৩ 


শ্রীগীতার এই ত্রয়োদশ অধ্যায়টি "ক্ষেত্রক্ষেত্রজ্ঞবিভাগযোগ"। অধ্যায়টি জটীল ও এই যোগ জানায় পরমাত্মা সত্যই যেন  'সাধনদুর্লভ' ("ওহে, সাধনদুর্লভ"-- রবীন্দ্রনাথ)। এখানে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ আবারো জ্ঞানমার্গীয় সাধনতত্ত্বের কথাই বলেছেন। বলছেন, 

"ইদং শরীরং কৌন্তেয় ক্ষেত্রম্ ইতি অভিধীয়তে।
এতদ্ যো বেত্তি তং প্রাহুঃ ক্ষেত্রজ্ঞ ইতি তদ্বিদঃ।।" 


হে অর্জুন, দেখ এই শরীর এক ক্ষেত্রবিশেষ, এবং এই ধারণা যাঁর আছে তিনি ক্ষেত্রজ্ঞ। এবার সকল ক্ষেত্রের (ভূতদেহের) ক্ষেত্রজ্ঞ আমি, এবং ক্ষেত্রক্ষেত্রজ্ঞের যে তত্ত্বজ্ঞান (সবিকার ক্ষেত্র ও বিকারহীন পুরুষ) তাও আমি। 

 "ক্ষেত্রক্ষেত্রজ্ঞয়োর্জ্ঞানং যত্তজ্ (যৎ, তৎ) জ্ঞানং মতং মম।।" দৃশ্যজগৎ হোল প্রকৃতি (জীবদেহ ও সমস্ত ভূতজগত)। প্রকৃতি সবিকার ; কেননা তারা নিয়ত পরিবর্তনের অধীন, ক্ষণভঙ্গুর, নাশবান। জন্ম ও মৃত্যুর অধীন। কিন্তু আত্মা অর্থাৎ প্রকৃতির অন্তরে যে চেতন সত্ত্বা --- তিনি বিকারহীন, অবিনাশী, নিত্য, শুদ্ধ। অতএব হে অর্জুন, 'ক্ষেত্র'-এর কারণ ও ক্ষেত্রের উপর ক্ষেত্রজ্ঞের (সাক্ষীচৈতন্যের) প্রভাব --- এই সুগভীর জ্ঞান ঋষিগণ জানেন এবং বেদ ও ব্রহ্মসূত্র তার প্রমান দিয়েছেন। 

ঋষিভিঃ বহুদা গীতম ছন্দোভিঃ বিবিধৈঃ পৃথক্।
ব্রহ্মসূত্রপদৈশ্চৈব হেতুমদ্ভিঃ বিনিশ্চিতৈঃ।। 

ঋষিগণ বহুপ্রকারে এই জ্ঞানের ব্যাখ্যা করেছেন, এবং বেদসমুহের মন্ত্র দ্বারা ও ব্রহ্মসূত্রের পদগুলির দ্বারা সুনিশ্চতরূপে ক্ষেত্রক্ষেত্রজ্ঞের বিষয় কথিত হয়েছে।
হে অর্জুন, এই যে দৃশ্যজগৎ বা পঞ্চভূত যেমন আকাশ, বায়ু, অগ্নি, জল, পৃথিবীর সূক্ষ্মভাব বা সত্ত্ব রজঃ তম (অদৃশ্য মায়া) তিনটি গুণ, দশেন্দ্রিয় (জ্ঞানেন্দ্রিয় ও কর্মেন্দ্রিয়)--এই সমস্তটির মিলিত রূপ হোল ক্ষেত্র। আর এই যে ক্ষেত্র সে সবিকার। বিকারগুলি কি ? মননক্রিয়া সঞ্জাত ইচ্ছা, রাগ, দ্বেষ, সুখ-দুঃখ, দেহ ও দেহের যে চেতনবোধ (চৈতন্য নয়) এবং 'ধৃতি' (পরে আলোচ্য) --- এসকলই 'ক্ষেত্রের' এই 'ক্ষেত্রজ' (দেহগত) বিকার থেকে মুক্ত হবার উপায় হোল আত্ম অনুধাবন করে মান ও রাগ অনুরাগ, দম্ভ বর্জন করতে হবে। অহিংসা, ক্ষমা, মন ও বাক্যের সরলতা, আচার্যসেবা, অন্তর ও বাহিরের শুদ্ধিকরণ, স্থৈর্য ইত্যাদি গুণাবলির অনুশীলন করতে‌ হবে এবং মন ও ইন্দ্রিয়গুলির প্রবল আক্রমণ থেকে 'শুদ্ধ আত্মাকে' রক্ষা করবার জন্যে প্রয়োজনে দেহসুখের প্রতি উদাসীন হতে হবে। 

"আমার এই দেহখানি তুলে ধর,
তোমার ওই দেবলয়ের প্রদীপ কর।" (রবীন্দ্রনাথ)। 


ইহলোকে ভোগের প্রতি আসক্তি, পরলোকে স্বর্গসুখ প্রাপ্তির কামনা ত্যাগ করতে হবে। অহংকারশূণ্য এবং জন্ম-জরা-ব্যাধি-মৃত্যু জনিত যে দুঃখ, সে দুঃখের কথা বার বার 'অনুদর্শন' করা, স্মরণ-মনন করা ত্যাগ করতে হবে। স্ত্রী পুত্র গৃহ ও বিত্তের প্রতি আসক্তি, ('অনভিষ্বঙ্গ') মমত্বহীন, ইষ্ট ও অনিষ্টে, প্রিয় ও অপ্রিয়ে সমভাবাপ্ন হতে হবে। জ্ঞানসাধনায় নির্মল এবং একনিষ্ঠ (অব্যভিচারিণী) ভক্তি থাকতে হবে। নির্জন ও পবিত্র স্থানে বাস করা ও বিষয়াসক্ত মানুষদের সংসর্গ ত্যাগ করে মনকে একমাত্র পরমেশ্বর অভিমুখে নিবিষ্ট রাখতে হবে।
___________________________________________
                           ব্যাখ্যা 

এই 'অব্যভিচারিণী' শব্দটি বিষ্ণুভক্ত বৈদান্তিক ও  বৈষ্ণবদের কাছে পরম উপাদেয়। ব্যভিচার শব্দের অর্থ বি+অভি-আচার= ব্যভিচার। মনুষ্য জীবনে, বা মানুষের সমাজে বৈবাহিক সম্মন্ধের জটীল ও নানা সংস্কার বন্ধনে আবদ্ধ বিধি বিধান আছে। আছে ঐতিহাসিক কাল থেকেই। বহুগামিতা, পুনর্বিবাহ, স্বামীর মৃত্যুর পর বংশ রক্ষার্থে সন্তান উৎপাদনের 'ক্ষেত্র' হিসাবে ব্যবহৃত হওয়া, কুমারীকালে সন্তানের জন্ম দেওয়া নারীদের সামাজিক দৃষ্টিতে  নিন্দনীয় ছিল না। পুরুষদের তো একাধিক বিবাহ বা নারীসঙ্গ স্বাভাবিক ছিল। পুরাণ কাহিনীগুলিতে সে সকল ঘটনার অজস্র উদাহরণ আছে। রামায়ণ ও মহাভারতের মুখ্য নারী চরিত্র অহল্যা, দ্রৌপদী, কুন্তী,  তারা ও মন্দোদরী (পঞ্চকন্যা), তাঁরা দ্বিভোগ্যা বা বহুভোগ্যা হয়েও প্রাতঃস্মরণীয়া। (পঞ্চকন্যা নাম স্মরণে মহাপাতক নাশয়েৎ)। এই দুই মহাপুরাণে সীতাদেবী ও সাবিত্রী (অপরাপর পুরাণে ও উপনিষদে আরো কিছু নারী চরিত্র আছেন, যেমন শিবের প্রথমা স্ত্রী সতী দাক্ষায়ণী, যাজ্ঞবল্ক্যের স্ত্রী মৈত্রেয়ী ও কাত্যায়নী, বশিষ্ঠের স্ত্রী অরুন্ধতী প্রভৃতি) ---- এনারা পতিগতপ্রাণা ও সতীত্বের ও পবিত্রতার পরাকাষ্ঠা। এগুলি উচ্চবর্ণীয় সমাজের ছবি। যেখানে প্রথম পংক্তির কুন্তী প্রভৃতি পঞ্চকন্যা, বিচিত্রবীর্যের বিধবা পত্নীগণ (অম্বিকা, অম্বালিকা ; অম্বার বিষয় ভিন্ন) যেমন ছিলেন তেমনই দ্বিতীয় পংক্তিভূক্ত ছিলেন ঐ সতী, পার্বতী, সীতা, অরুন্ধতী, সাবিত্রীগণ। এই দ্বিতীয় পংক্তিভূক্ত গরিয়সী নারীদের নারীত্বের আদর্শকে উচ্চকোটিতে স্থান দেওয়া হয়েছিল এবং হয়ও। এনাদের এক একজনের জীবন সাধনার ইতিবৃত্তে এক একটি মহাকাব্য রচিত হতে পারে। হয়েওছে। রামায়ণ মহাকাব্যটির বহির্দেশে শ্রীরামচন্দ্রের পুরুষোত্তম ব্যক্তিত্ব প্রতিভাত হলেও বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ এই আদি মহাগ্রন্থের অন্তর্প্রকৃতিটি  শ্রীরাম-অন্তপ্রাণা, সতীত্বের পরাকাষ্ঠা সীতাদেবীর অশ্রুজলে পরিসিক্ত। 

আজীবন সতীত্বরক্ষার সংগ্রামে বিধ্বস্ত সীতামাতা ধরিত্রীর কোলে আশ্রয় প্রার্থনা করছেন। নারীত্বের অবমাননা সত্ত্বেও সতীত্বের বিজয়গৌরব উদ্ঘোষিত করে   মৃত্যুপূর্ব বাণী উচ্চারণ করলেন, 

মনসা কর্মণা বাচা যথা রামং সমর্চয়ে।
তথা মে মাধবী দেবী বিবরং দাতুমর্হতি।।
                                  ------ বাল্মীকি রামায়ণ। 

অপর একজন মহাসতী, সাবিত্রীর পতিপ্রাণতার মহাভারতীয় উপাখ্যান অবলম্বন করে রচিত হয়েছে ইংরেজি ভাষার শ্রেষ্ঠতম মহাকাব্য শ্রী অরবিন্দের সাবিত্রী (Savitri)। স্বামীর প্রাণ পুনরুদ্ধারের জন্য মর্ত্যলোক থেকে অমর্ত্যলোক পর্যন্ত মৃত্যুর দেবতাকে অনুসরণ করেছিলে তিনি। সফলও হয়েছিলেন  পাতিব্রত্যের সেই মহাসাধনায়। প্রেম ও পবিত্রতার এই সাধনাকে অমর্ত্যজীবন (Life Divine)-লাভের  সাধনার সঙ্গে তুলনা করেছেন কবি।

"From darkness' heart she dug out wells of light,
On the undiscovered depths imposed a form,
Lent a vibrant cry to the unuttered vasts,
And through great shoreless, voiceless, starless breadths
Bore earthward fragment of revealing thought
Been from the silence of the ineffable."
                        --- 'Savitri' -- Arobindo.

 আবারো মহাভারতের নল-দময়ন্তী উপাখ্যান, মঙ্গলকাব্যে বেহুলা-লখীন্দর উপাখ্যান প্রভৃতি কাহিনীর মধ্যেও 'পতির্হি দেবতা লোকে' -- এই একান্ত প্রেমের গৌরবগাথা উদ্ঘোষিত। একান্তশরণী নারীর আদর্শই 'অব্যভিচারিণী' প্রেম। অন্যদিকে অনেকান্তশরণী নারীত্বের কাম ও কামনার 'সাধনা' ব্যাভিচারিণী। 'সাধনা' শব্দটি এই জন্যেই উল্লেখ করা হোল যে ভারতীয় সমাজদর্শনে বৈদান্তিক ব্রহ্ম সাধনার সমান্তরালভাবে লোকায়তিক তন্ত্রসাধনার জটীল,গূহ্য ও বহু শাখায়িত একটি ধারা সুপ্রাচীনকাল থেকেই বহমান ছিল এবং আছে, যে ধর্মাচারের সৃষ্টিতত্ত্বে বলা হয়েছে, 

"মহাকাশে যাহা স্পন্দন নরনারীর (লক্ষণীয়, এখানে বিবাহ-সম্মন্ধে-বদ্ধ স্বামী-স্ত্রী বা দম্পতির কথা বলা হয়নি) মধ্যে তাহা কাম ও মদনের লীলা। ... কাম ও মদনজন্য যেমন নূতন জীবের নাম ও রূপের বিকাশ হয় তেমনি পুরুষ এবং প্রকৃতির মধ্যে কাম ও মদনের স্পন্দন জন্য বিশ্বব্যাপী নাম ও রূপের বিকাশ হইয়াছে। ... তন্ত্রবিশেষে বিশ্বসৃষ্টির জন্য শিব-শক্তির এবং জীবসৃষ্টির জন্য নরনারীর মিলনের একতা পদে পদে খুলিয়া ব্যাখ্যা করিয়া দেওয়া আছে।"
            ---- পাঁচকড়ি বন্দোপাধ্যায় রচনাবলী। 

শ্রীমদ্ভগবত গীতায় শ্রীকৃষ্ণের বাণীগুলি গভীরভাবে অনুধাবন করলে দেখা যাবে সেগুলির মধ্যে দিয়ে শুদ্ধ, পবিত্র, ব্যভিচারমুক্ত যেরূপ প্রেম একনিষ্ঠ ও পতিগতপ্রাণা নারীর সাধনসম্পদ, সেইরূপ 'অব্যভিচারিণী', অনন্যা ভক্তি ও প্রেমের দ্বারাই সচ্চিদানন্দ ঈশ্বরকে লাভ করা যেতে পারে।
________________________________________


এরপর শ্রীকৃষ্ণ আবারো জ্ঞানমার্গের কথাই বলেছেন। অধ্যাত্মজ্ঞান লাভের পথে সকল তত্ত্বের পরম তত্ত্ব পরমাত্মাকে সর্বত্র, সকল ভূতে দর্শন করাই প্রকৃত সাধনা। আর এর বিপরীত সাধনা (সমকালের নিরীশ্বরবাদী, তন্ত্রবাদী ও ঐহিক পরমার্থবাদী সাধনমার্গ) 'অজ্ঞানম্'। তাই এবার (শ্লোক ১৩//১২ থেকে) আবারও উপনিষদীয় 'ব্রহ্মতত্বম্'। হে অর্জুন, যা জ্ঞাত হবার যোগ্য', যা জ্ঞাত হলে পরমানন্দ প্রাপ্ত হওয়া যায় তাই তোমাকে বলছি, অনুধাবন কর, 

"জ্ঞেয়ং যৎ তৎ প্রবক্ষ্যামি যৎ জ্ঞাত্বা অমৃতমশ্নুতে।
অনাদিমৎ পরং ব্রহ্ম ন সৎ ন অসদুচ্যতে।।" 

সেই 'ইদম্ বা অদম্' ব্রহ্মকে জানতে হবে যা 'অনির্বচনীয়', যা সৎ ও ন য়, অসৎও নয়। যাঁর সকল দিকেই মুখমণ্ডল---- চক্ষু, কর্ণ এবং সংবৃতি। আকাশ যেমন অসীম, দ্যুলোক ভূলোক ব্যাপ্ত করে আছে, ব্রহ্ম ও তেমনই সর্বব্যপ্ত ,'ব্যাপ্তং যেন চরাচরম্'। তিনি ইন্দ্রিয় বিবর্জিত হয়েও 'ইন্দ্রিয়সমূহের প্রকাশক।' তিনি নিরাসক্ত, গুণাতীত (সত্তঃ রজঃ তম গুণ এর ঊর্দ্ধে) হয়েও জগৎসংসারকে ধারণ করে আছেন এবং গুণগুলির ভোক্তা। (এখানে ভোক্তা অর্থে ভোগকারী নন, সমস্ত গুণ ও প্রবনতা যাঁর মধ্যে মিলায়ে যায়।
___________________________________________

                                 ব্যাখ্যা
ব্রহ্ম একাধারে জগতের স্পন্দন, বা 'বিকার' অর্থাৎ সৃজন, বিবর্তন ও লয় এবং 'নির্বিকার' --- অনাদি অনন্ত অবিচল।
"তরঙ্গ মিলায়ে যায় তরঙ্গ ওঠে,
কুসুম ঝরিয়া পড়ে কুসুম ফোটে।
নাহি ক্ষয় নাহি শেষ   নাহি নাহি দৈন্যলেশ
সেই পূর্ণতার পায়ে মন স্থান মাগে।।"
                                     ----- রবীন্দ্রনাথ।
_________________________________________

চরাচরপরিব্যপ্ত সকল ভূতের অন্তরে তিনি, বাইরেও তিনি। "বহিরন্তশ্চ ভূতানাম্ অচরং চর়মেব চ।" অবিক্ষুব্ধ পূর্ণ তিনি, সর্বত্রস্পন্দিত সঞ্চরমানও তিনি। তিন 'ভূতভর্ত্তৃ', গ্রসিষ্ণু এবং প্রভবিষ্ণু (দেহ ও আকার ধারণকারী, সংহারকারী এবং সৃজনকারী)। তিনি 

"জ্যোতিষামপি তজ্জ্যোতিস্তমসঃ পরমুচ্যতে।
জ্ঞানং জ্ঞেয়ং জ্ঞানগম্যং হৃদি সর্বস্য  বিষ্ঠিতম।।"
(ত্রয়োদশ অধ্যায়ের ১৭তম এই মন্ত্রটির অনন্ত ব্যাখ্যা আছে)। 

তিনি 'জ্যোতিষাম্ জ্যোতিঃ'। তিনি সেই তেজশক্তি যাঁর দ্বারা 'সূর্য-চন্দ্র-নক্ষত্র-নীহারিকা'ও জ্যোতির্ময়। তিনি 'মায়ার' বা বিনাশশীল এই যে জাগতিক অস্তিত্বেরও ঊর্দ্ধে। তিনি সাধকের বোধের মধ্যে ও তত্ত্বজ্ঞান দ্বারা উপলব্ধ। তিনি সকলের হৃদয়ে আছেন সত্য ; কিন্তু সেই একনিষ্ঠ জ্ঞানসাধকই তাঁকে হৃদয়ে ধারণ করতে পারেন যিনি 'জ্ঞান ও জ্ঞেয়' বিষয়ের স্পষ্টরূপে বুঝতে পারেন। 'ক্ষেত্র' ও 'ক্ষেত্রজ্ঞ' --- অর্থাৎ বস্তুবিশ্ব ও বস্তুবিশ্বের ধারণা  জ্ঞানসাধনার দ্বারা প্রাপ্ত হলেই ভক্ত আমাকে পায় -- "মদ্ভক্তঃ এতৎ বিজ্ঞায় মদ্ভাবায় উপপদ্যতে।" এই দৃশ্যজগৎ হোল প্রকৃতি এবং প্রকৃতি হোল মায়া (কেননা প্রকৃতি সত্ত রজঃ ও তম গুণের দ্বারা আচ্ছন্ন, অশাশ্বত ও বিকারসম্পন্ন। এমনকি জীবের রাগদ্বেষাদি যে মনোবিকার তাও মায়ামুগ্ধ প্রকৃতি থেকেই উদ্ভূত। অতএব  বিকারশীল প্রকৃতির ঊর্দ্ধে অবিকারী 'পুরুষ'কে জানলে, সাধক জীবাত্মার সুখ দুঃখের হেতু যে প্রকৃতি -- তা জানতে পারেন এবং দুঃখ সুখের পারে আনন্দলোকে যেতে পারেন। প্রকৃতি কার্য কারণের উৎস। প্রকৃতি হলেন মায়া। প্রকৃতির তিনটি গুণের মধ্যে, যে যে জীবাত্মা যে যে গুণের দ্বারা মায়াবদ্ধ হয়, কর্মানুসারে তারা পর পর জন্মে তেমন তেমন উত্তম বা অধম যোনিতে গমন করে ও পুনর্জন্ম লাভ করে। "গুণসঙ্গোহস্য সদসদ্ যোনিজন্মসু।।"

পরমপুরুষ বা পরমাত্মাও মায়ার অধীন ; কিন্তু, 

উপদ্রষ্টানুমন্তা চ ভর্তা ভোক্তা  মহেশ্বরঃ।
পরমাত্মেতি চাপ্যুক্তো দেহহস্মিন্ পুরুষঃ পরঃ।।

এই পরমপুরুষ প্রতিটি জীবদেহে স্থিত আছেন। জীবদেহ ত্রিগুণময়ী মায়ার বশীভূত। সেখানেই দেহস্থিত পরমাত্মা সাক্ষীস্বরূপ। তিনি জীবের সৎ-অসৎ চিন্তনের সম্মতিদাতা --- 'অনুমন্তা', তিনি ভূতজগতের ধারণকারী -- 'ভর্তা', জীবের অন্তরাত্মারূপে তিনি 'ভোক্তা' এবং সকল দেবতাদেরও প্রভু --- 'মহেশ্বরঃ'। এই ভাবে, ইন্দ্রিয়বিকারের দ্বারা প্রভাবিত না হয়ে, সগুণ প্রকৃতির পারে গুণাতীত 'নির্বিকার' পরমাত্মাকে যে মানুষ 'তত্ত্বতঃ' জানেন (যঃ বেত্তি), সে মানুষ মায়াময় জগতে থেকেও মায়ার 'গুণ' দ্বারা প্রলুব্ধ হন না, এবং জন্মমৃত্যুর নিরানন্দ চক্র হতে মুক্ত হয়ে চিদানন্দঘন পরমপুরুষের আশ্রয় লাভ করেন। 

এইভাবে, এই ত্রয়োদশ অধ্যায়ের ১৩/২৪, ১৩/২৫, ১৩/২৬ শ্লোকত্রয়ীর উচ্চারণের মধ্যে দিয়ে, জগন্নাথ শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন ধ্যানযোগ ও কর্মযোগ দ্বারা ভগবৎপ্রাপ্তি ঘটে, জ্ঞানসাধক পুরুষদের উপদেশানুসারে উপাসনার দ্বারা মোক্ষলাভ হয় ও সৃষ্টির (স্থাবর জঙ্গম) রহস্য উন্মোচন করা যায় --- এমনি সব গূঢ় তত্ত্বের ব্যাখ্যাও দিয়েছেন। এবং বলেছেন বস্তু ও জ্ঞানের সংযোগই হোল এই ইন্দ্রিয়ভোগ্য জগৎ। এই 'ইন্দ্রিয়ভোগ্য জগৎ' নাশবান ও ক্ষণভঙ্গুর। কিন্তু এই বিনাশশীল জড়জগতের মধ্যে যে সাধক পরমেশ্বরের পরম সত্ত্বাকে স্থিত অবস্থায় দেখে,  যে সাধক সেই শাশ্বত, অক্ষরপুরুষ পরমাত্মার সঙ্গে নিজেকেও যুক্ত করতে সক্ষম হয়, সেও নিজের ক্ষণস্থায়ী শরীরের নাশ হলেও মনে করেন আত্মার নাশ হয় না। জীবাত্মা পরমাত্মার মধ্যেই লীন হয়ে যায়। তিনি এও জানেন আত্মা স্বভাবতঃই নির্লিপ্ত, অকর্তা। কর্ম প্রকৃতির দ্বারা কৃত হয়। আকাশ যেমন সর্বব্যপ্ত, সূক্ষ্ম এবং স্পর্শানুভূতির অতীত, নির্লিপ্ত, আত্মাও তেমনি সূক্ষ্ম হয়েও সর্বব্যাপী, যুগপৎ ভূতজগতের বিকাল হতে মুক্ত। সূর্য যেমন বিশ্বব্রহ্মাণ্ডকে প্রকাশিত করে, আত্মার জ্যোতি তেমনি 'ক্ষেত্র'কে, গুণত্রয়যুক্ত শরীরকে প্রকাশিত করে। যে মহাত্মাগণ জ্ঞানচক্ষুর দ্বারা (জড়, বিকারী, ক্ষণস্থায়ী,নাশবান) ক্ষেত্র ও (নিত্য, চেতন, অবিকারী, অবিনাশী) ক্ষেত্রজ্ঞের ভেদ জানেন তিনি ব্রহ্মবিদ্, তিনি দুঃখময় মৃত্যুসাগর পারে সচ্চিদানন্দঘন পরমাত্মার সঙ্গে একাত্ম ও একীভূত হয়ে যান। তখন, 


"অন্তঃ বহিশ্চ তৎ সর্বং ব্যাপ্য নারায়ণঃ স্থিতঃ।।"
                             -------মহানারায়ণ উপনিষদ।
                     ও৺ শান্তি শান্তি শান্তিহি।

               (ক্রমশঃ)

(এরপর চতুর্দশ পর্ব, ভক্তিমার্গের শ্রেষ্ঠত্ব)। 


দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
অক্টোবর ১০, ২০২৫
ব্যাঙ্গালোর।

_______________________________________

 








কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Recently published

অমূল্য

He ( Tagore) who sees all things in his own self and his own self in all things, he does not remain unrevealed.                     ...