শুক্রবার, ২৮ মার্চ, ২০২৫

স্বামী রঙ্গনাথানন্দ ও বর্তমান ভারতবর্ষে তাঁর ধর্মাদর্শের অপরিহার্যতা-- ৩

তিন 

ভারতবর্ষের অধ্যাত্ম চিন্তা, বেদ-বেদান্ত-উপনিষদ ও গীতার বাণী বহুকাল ‌পূর্বেই পাশ্চাত্য মণীষীদের কাছে পোঁছেছিল এবং পশ্চিম দুনিয়ায় প্রাচীন ভারতের সে বাণী সাগরপারের মনন জগতে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। ইসলাম আসার প্রায় পাঁচ'শ বছর আগে খ্রীষ্টান (Christianity) ধর্মধারণার সঙ্গে  ভারতবর্ষের পরিচয় ঘটে। সেন্ট থমাস দ্য এপোষ্টেল (St. Thomas the Apostle), যীশু খ্রীষ্টের সাক্ষাৎ শিষ্য, 52খ্রীষ্টাব্দে অর্থাৎ খ্রীষ্টীয় প্রথম শতাব্দীতেই ভারতের দক্ষিণ-পশ্চিমের কেরল রাজ্যে এসেছিলেন। তখন থেকেই খ্রীষ্টান ধর্মের সঙ্গে আমাদের পরিচয় এবং প্রায় সমসাময়িককালেই ইহুদী | অষ্টম শতাব্দীতে পারসিক জরথুষ্ট্রীয় সম্প্রদায়ও ভারতে পদার্পণ করেন। স্বামী বিবেকানন্দ তাঁর চিকাগো ভাষণে সে কথাই  জগতবাসীর কাছে উদাত্ত-গম্ভীর কণ্ঠে ঘোষণা করেনঃ 

"I am proud to belong to a religion which has taught the world both tolerance and Universal acceptance. we believe not only in universal toleration, but we accept all religions as true. I am proud to belong to a nation which has sheltered the persecuted and the refugees of all religions and nations of the earth."

'আমি এমন এক ধর্মীয় ঘরানা থেকে এসেছি যে ধর্ম জগতকে শিখিয়েছে সুমহান সহনশীলতা ও বিশ্বকে বরণ করবার, ঠাইঁ দেবার উদার মানসিকতা।' 

ভারতের সনাতন ধর্মবোধ-সঞ্জাত এই বাণীর উৎস আমাদের উপনিষদ। মহাউপনিষদের শ্লোকটি এই রকমঃ 

অয়ং নিজ পরোবেতি গণনা লঘুচেতসাম্।
উদার চরিতানাম্ তু বসুধৈব কুটুম্বকম্।।

সেই কোন বিস্মৃত অতীতকাল থেকেই ভারতবর্ষে বিশ্বের প্রধান ধর্মধারণার দূতেরা (Apostle) এসেছেন, তাঁদের ধর্মমত প্রচার করেছেন। সে সকল ধর্মমতগুলির মধ্যে ইহুদী, খ্রীষ্টান ও জরাথুষ্ট্রিয়ান প্রাচীনতর। তাদের সঙ্গে ভারতীয় ধর্মধারণার প্রবলতর দ্বন্দ্ব বা সংঘাত সংঘটিত হয়েছিল এমন উদাহরণ এ দেশের ইতিহাসে পাওয়া যায় না। 

কিন্তু যে ধর্মধারণা সপ্তম শতাব্দীর পর থেকে প্রায় অর্ধেক পৃথিবীতে আপন প্রতিষ্ঠা সুনিশ্চিত করেছে তা হোল ইসলাম। ইসলাম ধর্মের প্রবর্তক হজরত মহম্মদ ৫৭০ খ্রীষ্টাব্দে মক্কায় জন্মগ্রহন করেন। মহম্মদের প্রবর্তিত ও প্রচারিত ইসলাম ধর্ম অল্পকালের মধ্যেই সুবিস্তীর্ণ ভূখন্ডে ছড়িয়ে পড়েছিল। 

স্বামী রঙ্গনাথানন্দ তাঁর 'উপনিষদের সন্দেশ' গ্রন্থে  সবিস্তারে আলোচনা করেছেন। ভারতীয় সভ্যতার আর্য তথা হিন্দু সম্প্রদায়ের কাছে বেদ-ব্রাহ্মণ-বেদান্ত-উপনিষদ যেমন শ্রুতি এবং বেদানুবর্তী অনুশাসন সম্মন্ধীয় সংস্কার ও ক্রিয়াকর্ম‌ সম্মন্ধীয় গ্রন্থ যেমন স্মৃতি, ঠিক তেমনি ইসলাম ধর্মেও 'শ্রুতি ও স্মৃতি'-র বিষয়টি আছে। স্বামী রঙ্গনাথানন্দজী ইসলাম ধর্মের শ্রুতি কোরানের কিছু রুকু (সুক্ত বা বাণী) উদ্ধার করেছেন, এবং সিদ্ধান্ত করেছেন যে সে সকল কোরানের আয়াতগুলি বিরল আধ্যাত্মিক ঐশ্বর্যও মাধুর্যমণ্ডিত।
'কোরান বা কোরআন' -এর ৬২ নং রুকু উদ্ধার করে দেখিয়েছেন যে মহানবী হজরত মহম্মদ অপরাপর ধর্মধারণার উপরও শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। 

"যারা (কোরআনে) বিশ্বাস করে,
যারা ইহুদী,
এবং যারা খ্রীষ্টান
এবং পাবেয়ী -----
এদের যে কেহ
আল্লাহ্ এবং শেষ দিবসে বিশ্বাস করে
ও সৎকাজ করে,
তাদের জন্য তাদের প্রতিপালকের কাছে পুরস্কার আছে,
এবং তাদের কোন ভয় নেই,
তারা দুঃখিত হবে না।" 

এইভাবে গ্রন্থকার কোরআনের অনেকানেক স্তবক বা বাক্যসমষ্ঠি উদ্ধৃত করে দেখিয়েছেন যে ইসলামের 'শ্রুতি' বা ধর্মগ্রন্থের বাণীর মধ্যে যে গভীর আধ্যাত্মিক তত্ব আছে তা উপনিষদীয় ভাব ও দর্শনেরও অনুবর্তী বা পৃথিবীর অন্যান্য ধর্মীয় দর্শনের সঙ্গে মূলগতভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ। "কোরআনের এই সমস্ত আধ্যাত্মিক বাণী, তার শিক্ষা, যা মানুষকে আধ্যাত্মিক অনুভূতির পথ দেখিয়ে দেয় তা সর্বকালীন ও সর্বজনীন।" 

কিন্তু ধর্ম যখনি শাসকের বা শাসকদের ধর্ম হয়ে উঠেছে, যখনি ধর্মের সঙ্গে রাজার ক্ষমতা, রাষ্ট্রশক্তি, ও নিষ্ঠুর পুরহিততান্ত্রিক বিধিবিধান যুক্ত হয়েছে তখনই ধর্ম তার কল্যাণকামী, বিশ্বমানবতার রূপ পরিহার করে আগ্রাসী ও রক্তক্ষয়ী পরিণামের দিকে অগ্রসর হয়েছে। মহান ইসলামের ক্ষেত্রেও তার ব্যত্যয় ঘটেনি।
"প্রত্যক্ষ রাজনীতির সঙ্গে অতিমাত্রায় জড়িত থাকার জন্য ইসলাম ব্যহত হয়েছে, যেমন হয়েছিল খ্রীষ্টধর্ম কষ্ট্যানটাইনের পরে।" 

খ্রীষ্টান ধর্মের মতই ইসলামের প্রায় জন্মলগ্ন থেকেই ভারতবর্ষে ইসলাম ধর্মের প্রচারকগণের আগমন ঘটে। প্রথম পর্যায়ে, প্রায় চার'শ বছর ধরে যে সমস্ত ঐস্লামিক  দূতগণ দেশে দেশে ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে গিয়েছিলেন তাতে মধ্যপ্রাচ্যের ভূখন্ডটিকে কেন্দ্রভূমিতে রেখে প্রাচ্যদেশের ভাব, চিন্তা, সংস্কৃতিসহ ব্যবসায়িক বিষয়েরও আদান প্রদান ও আমদানি রপ্তানির পথ খুলে দিয়েছিলেন।
আরব থেকে ভারতে এসেছিলন সুলেমান (৮৫১খ্রীঃ), আল মাসুদি (৯৫৭ খ্রীঃ), পারস্য  থেকে এসেছিলেন আল বিরুনি (১০২৪ খ্রীঃ)। এইরূপে বিভিন্ন দেশের, বিভিন্ন জাতির, ভিন্ন ভিন্ন ধর্মের সঙ্গে ভাব বিনিময় ও আদান প্রদানের ফলে ইসলাম ধর্মবোধও বরণীয় ও গ্রহনীয় হয়ে ওঠে। "এই সময়েই আবার আরব জাতীয় মানস নূতন নূতন ভাব আহরণের ও তাদের প্রতি সাদর আতিথেয়তা দেখাতে উৎসুক হয়ে গ্রীকো-রোমান, ইরাণী ও ভারতীয় সংস্কৃতির ভাবধারা থেকে ইচ্ছামত গ্রহন করায় ইসলাম তার তেজ ও গৌরবের শিখরে উঠেছিল।" 

কিন্তু ত্রয়োদশ শতক থেকে ইসলামের শাসন-সাম্রাজ্য (যা পশ্চিমের স্পেন থেকে পূর্বে চীন পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল) এবং ভাব-সাম্রাজ্যে ঐতিহাসিক পরিবর্তন দেখা দিল। 'ক্রুশেড' (সে এক ভয়ঙ্কর ও বিপুল ইতিবৃত্তান্ত, (মৎপ্রণীত 'বিন্দুতে সিন্ধু দর্শন' গ্রন্থের, প্রথম‌ খণ্ডে প্রাপ্তব্য) শেষ হতে না হতে মোঙ্গল আক্রমণ আরবীয় ইসলামের আধিপত্য প্রায় বিধ্বস্ত করে দিয়েছিল। এই সময় কয়েক শতাব্দী ধরে ইসলামের পবিত্র 'শ্রুতি' অনেকটাই বিস্মরণে চলে যায়। বিজিতরা স্মৃতি অংশ (জীবনাচরণের সংস্কারগুলি) অনুসরণ করতে থাকেন। অপরদিকে বিজয়ী মোঙ্গলরাও ইসলাম গ্রহন করেন ঠিকই কিন্তু ইসলাম ধর্মের সুউচ্চ দার্শনিক ভাব গ্রহনে তাদের তেমন ধৈর্য না থাকার কারণে ধর্মের সঙ্গে শাসকদের আগ্রাসী শক্তির মিলন সংঘটিত হয়েছিল। 

ভারতে ইসলাম বিস্তার লাভ করতে আরম্ভ হোল মুসলমান শাসনের মধ্য দিয়ে। এই শাসনতন্ত্রের সঙ্গে ইসলামের ক্রমবিকাশের ফলে ভারতের এক বিপুল জনগোষ্ঠী ইসলাম ধর্মের অন্তর্ভুক্ত হয়ে। ভারতীয়দের ইসলাম গ্রহন করবার মূল কারণ তিনটি। এক -- 'হিন্দু' ধর্মের অবিভাবকত্ব যাদের হাতে ছিল সেইসব উচ্চবর্ণের ---- ব্রাহ্মণ, বৈদ্য, ক্ষত্রিয় সম্প্রদায়গুলির 'নীচু' সম্প্রদায়ের প্রতি অবিচার, অত্যাচার, ঘৃণা।
দুই --- ইসলাম রাজার ধর্ম, ইসলাম বর্ণবিদ্বেষহীন ভ্রাতৃত্ববোধের পৃষ্টপোষক।
তিন----- ইসলাম তার জন্মমুহূর্ত থেকেই ধর্মান্তরিতকরণের উপর শাসন ত্রাশন এবং উপঢৌকনের ব্যবস্থা কায়েম রেখেছে যার পূর্ণ প্রয়োগ হয়েছে অধিকৃত রাজ্যগুলিতে, এমনকি দেশগুলিতেও।
কিন্তু এই যে ধর্মান্তরিত মুসলমান সম্প্রদায় সৃষ্টি হোল তাদের কাছে ইসলামধর্মের আদি ও অকৃত্রিম শ্রুতির দার্শনিক মতবাদ সম্পূর্ণ পোঁছায়নি, আর পোঁছালেও ভাষার (আরবি) প্রতিবন্ধকতা ছিল দুস্তর।
তাই একদিকে উচ্চবর্ণীয় ব্রাহ্মণ্যবাদী হিন্দুদের উদারতাহীন আচারসর্বস্ব ছুুঁৎমার্গ, আর অপরদিকে ধর্মান্তরিত মুসলমানদের প্রতিহিংসা--- দুইয়ের মাঝখানে জাতিবিদ্বেষজনিত  ফাটল‌ --- ক্রমশ প্রশস্ত হতে হতে দুর্লঙ্ঘ্য বিভাজনের গিরিসঙ্কটে পর্যবশিত হয়ে গেল, হয়ে চলেছে আজও। 

তবুও ভূয়োদর্শী স্বামী রঙ্গনাথানন্দজী বলছেন, 

"প্রগতিশীল ইসলামের মন ও‌ বুদ্ধি এখন সংগ্রাম চালাচ্ছে, ভারতীয় চিন্তায় যাকে যুগের ধর্ম নাম দেওয়া হয় সেরূপ, নূতন ঐস্লামিক যুগধর্ম প্রবর্তনের জন্য এই নূতন ইসলাম এখনই কয়েকটি আরবদেশের লক্ষ লক্ষ মানুষের মনে ও প্রাণে সাড়া জাগিয়েছে। দু-রকম ইসলামের দ্বন্দ্ব এখন নিছক প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি আর প্রগতিশীল শক্তির, অনমনীয় অতীত-দর্শী আর নমনীয় ভবিষ্যৎ-দর্শীর দ্বন্দ্বরূপে প্রকাশ পাচ্ছে। প্রথমটি, ইসলামকে সুচারুরূপে বিন্যস্ত একটি পরিপূর্ণ 'স্মৃতি'  মনে করে,----যা স্বতন্ত্র থাকতে চায়, আর অপরটি ইসলামকে 'শ্রুতি'র অনুসরণের মধ্য‌ দিয়ে নবযুগের বৈজ্ঞানিক ও মানসিক চিন্তার আলোকে দেখছে ও চেষ্টা করছে নূতন ঐশ্লামিক স্মৃতি রচনা করতে --- যা ইসলামের চিরন্তন তত্ত্ব ও বর্তমান প্রগতিশীল ভাব, উভয়ের সঙ্গে একতাবদ্ধ হবে।" 

আমরা খ্রীষ্টানধর্ম ও ইসলামধর্মের কঠোর ও কঠিন বিধি বিধানবদ্ধ রূপ দেখেছি এবং তাইই 'পেগান'দের লিখিত ইতিহাসের প্রতিপাদ্য বিষয় ; কিন্তু এই দুই ধর্মেরই আরো একটি শাখা মূল শাখার সমান্তরাল ভাবে বেড়ে চলেছে। সেটি মরমীয়া সাধনা। মরমীয়া সাধনায় সাধকের কল্পনায় ঈশ্বরকে প্রত্যক্ষত অনুভবের মধ্যে মূল ধর্মাদর্শের 'শ্রুতি' ও 'স্মৃতি' - র জটীলতা থাকেনা। তাই খ্রীষ্টীয় মরমীয়া সাধনার (Mysticism) শাখাটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ঠিক যেমন গুরুত্বপূর্ণ "ইসলাম-পূর্ব  ইরানের আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের সংস্পর্শজাত ইসলামের সুফি আন্দোলন"  (এ-প্রসঙ্গে সবিস্তারে আলোচনার অবকাশ আছে, যা পর্বান্তরে লেখা হবে।)

পূজ্যপাদ স্বামী রঙ্গনাথানন্দ এই ভাবে বিশ্বের প্রধান ও কিছু অপ্রধান ধর্মের মূল ধারণা বিতরণ করার পর উপনিষদের অতলান্ত প্রজ্ঞার আলোকবলয়ে প্রবেশ করেছেন। পরবর্তী পর্ব থেকে আমরা সেই জ্ঞানালোকের জ্যোতির্ময় শিখা থেকে আমাদের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র হৃদয়প্রদীপের সলতে জ্বালিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করব।

(পেগান ধর্ম, Paganism-- বলতে বোঝায় খ্রীষ্টীয় দৃষ্টিভঙ্গীতে ইব্রাহিমীয় ধর্মমত বহির্ভূত কিছু আত্মিক ও সামাজিক বিশ্বাস যা পৌত্তলিকতার সঙ্গে যুক্ত)
                            


বুধবার, ২৬ মার্চ, ২০২৫

Burial, A rare piece of poetry


I would like to present a rare piece of poetry to my beloved readers which is written by Conrad Ferdinand Mayer, a Swiss poet (1825- 1898), about the poet, playwright and philosopher Friedrich Shiller (1759-1805). The very age was an age of the European Renaissance which held high humanitarian values rather than indulging in Catholic dogmatism and bigotry.

                     Burial
"Two dim and paltry torches that the raging  storm
And rain at any moment threaten to put out
A saving pall.
A vulger Coffin made of pine with no wreath, not even the poorest,
And no train ---
As if a crime were swiftly carried to the grave !
The bearers hastened onward, one unknown alone,
'Round whom a mantle waved of wide and nobel fold,
Followed this coffin. 'T was the  spirit of mankind."
                            -----  Conrad Ferdinand Mayer
This poem was so significant at that period which was encountering the conflict between the supremacy of religion and that of humanitarianism. Friedrich Shiller was not only one of the  all-time-greatest literary laureates but also a lyricist. Some of his lyrics were translated into music compositions by none other than Beethoven. Friedrich Shiller, like other Divine Souls, suffered humiliation imposed by the then religious conservatives of his own country and passed away unsung. The tragedy of his life and death has been depicted in this poem.

Dulal chandra Bandyopadhyay
26/03/2025
Bangalore.
____________________________________________

সোমবার, ২৪ মার্চ, ২০২৫

স্বামী রঙ্গনাথানন্দ ও বর্তমান ভারতবর্ষে তাঁর ভাবাদর্শের অপরিহার্যতা- ২

                           দুই 


স্বামী রঙ্গনাথানন্দ তার 'উপনিষদের সন্দেশ' গ্রন্থটির‌ ভূমিকায় ভারতীয়দের সনাতন ধর্ম, যা হিন্দুধর্ম (Hinduism) নামেই বিশ্বসমাজে সুপরিচিতি, তার ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে প্রাচ্যদেশ ও পাশ্চাত্যদেশের ইতিহাসবিদ ও ধর্মতাত্ত্বিক পণ্ডিতগণের গবেষণাপ্রসূত মতামতগুলিও উদ্ধৃত করেছেন। সঙ্গে সঙ্গে সংস্কৃতি ও কলা জগতের সাধকদের অধ্যাত্মচেতনার সাথে ধর্মধারণার একত্বের মীমাংসা উপস্থাপিত করেছেন। 

সাহিত্য ও সংস্কৃতি জগতের জোতিষ্ক রোমা রোঁলা, আমাদের রবীন্দ্রনাথের পর পরই যিনি সাহিত্য নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হন ১৯১৫ খ্রীষ্টাব্দে (প্রথম যুদ্ধের আরম্ভকালে, ১৯১৪ খ্রীষ্টাব্দে নোবেল পুরস্কার প্রদান স্থগিত ছিল), তিনি শ্রীরামকৃষ্ণ ও বিবেকানন্দের জীবনী (The Life of Ramkrishna Paramhansa and Life of Vivekananda and The Universal Gospel) রচনা করেন। শ্রীরামকৃষ্ণের জীবনী রচনাটিতে তিনি লিখছেন, 

 "(---- After attaining supreme consciousness) the rest of his life had been spent in the serine fullness of his cosmic Joy, whose revelation Beethoven and Shiller have sung for the West. But  he has realised it more fully than our tragic heroes. Joy appeared to Beethoven only as a gleam of the blue through the chaos of conflicting clouds, while the Paramhansa --- the Indian Swan --- rested his great white wings on the sapphire lake of eternity beyond the vail of tumultuous days." 

পরম চৈতন্য লাভ বা ব্রহ্মত্ব লাভের পর বাকী জীবন তিনি (শ্রীরামকৃষ্ণ) প্রশান্তিময় স্বর্গীয় আনন্দে অতিবাহিত করেন। এই প্রকার স্বর্গীয় আনন্দের প্রতিভাস বিটোভেন ও শ্রিলার তাঁদের সংগীত মূর্ছনায় অভিব্যক্ত করে দিয়েছিলেন পাশ্চাত্যদেশের মর্মমূলে। কিন্তু ভারতের পরমহংসদেব সেই চিদানন্দ পরিপূর্ণভাবে উপলব্ধি করেছিলেন। তেমন আনন্দোপলব্ধি বিটোভেনের হৃদয়ে সমাগত হয়েছিল ঠিকই কিন্তু পূর্ণরূপে নয়, এসেছিল ঝড়ে কম্পমান মেঘখণ্ডের ফাটল‌ দিয়ে, যেমন নীল আকাশের শীর্ণ আলোকরেখা আসে, তেমনি ভাবে  --- যখন পরমহংসদেব, ভারতের  রাজহংস, তাঁর শ্বেতশুভ্র পাখার উড়ান থামিয়ে, দ্বন্দ্ব- তাড়িত ক্ষণজীবনের মোহাবরণ ছিন্ন করে, নীলকান্তমণির মত স্বচ্ছ গভীর, আদি-অন্তহীন ব্রহ্মানন্দময় আকাশ-সরোবরে বিশ্রামরত। (ভাবানুবাদ মৎকৃত) 

রোমা রোঁলার এই অননুকরণীয় বর্ণনা পাশ্চাত্যদেশের ঋষিপ্রতীম বুধ-সম্প্রদায়ের নিকট সহজে বোধগম্য হলেও আমাদের মত সাধারণ মানুষের পক্ষে দুর্বোধ্য মনে হয়। এখানে বিটোভেন (Ludwig van Beethoven, 1770-1827), ও Schiller (Friedrich Shriller 1759- 1805), এই দুই বিশ্ববন্দিত সুরকার ও গীতিকার তথা সাহিত্যিক ও দার্শনিকের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু তাদের সাধনার সঙ্গে শ্রীরামকৃষ্ণের সাধনার তুলনা এলো কেন ? না, পরমহংসদেবের সাধন ও সিদ্ধির অমৃতস্বাদী ঐশ্বর্যের (ঈশ্বরপ্রদত্ত অমর্ত্য সম্পদ) কণামাত্র প্রসাদ পাশ্চাত্যবাসীকে  বিতরণ করবার জন্য তিনি এই উপমার মাধ্যম গ্রহণ করেছেন। জীবনীকার বলতে চেয়েছেন মহান জার্মান দার্শনিক, কবি, নাট্যকার ও গীতীকার, শীলার রচিত গীত (lyrics) এবং বিশ্ববিশ্রুত সঙ্গীতকার বিটোভেন-সৃষ্ট সঙ্গীতের ভাব ও মূর্ছনায় মানুষের ত্রিতাপ- দুঃখে-জর্জরিত জীবাত্মা যে সামান্য পরমার্থের, পরমাত্মার সন্ধান পান, পরমহংসদেবের সাধনার পথে তা পরিপূর্ণভাবে লভ্য। এর অর্থ এই যে মানুষের মনুষত্বের সাধনার পথ বিভিন্ন, কিন্তু তার উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য একই ---  অখণ্ড চৈতন্যে সমাহিত হওয়া। তা হলেই এই যে জাগতিক দ্বন্দ্ব, সংঘাত ; দ্বেষ, বিদ্বেষ, হিংসা, যুদ্ধ --- সে‌ সবের অকিঞ্চিৎকরতা, তুচ্ছতা, নিরর্থকতা মানুষের কাছে প্রতিপন্ন হবে, প্রতীয়মান হবে অমর্ত্য আনন্দে‌র আলো। আপন ‌ চৈতন্যের আলোয় মানুষই জ্যোতির্ময় হয়ে উঠবে, আপনার অন্তরস্থিত দেবতাকে লাভ করে মানুষ‌ দেবতায় রূপান্তরিত হবে ; সকল মানুষের মধ্যে, সকল জীবের মধ্যে আপনার দেবতার প্রতিরূপ অবলোকন করবে। "সমস্ত জীবে শিব জ্ঞান"হবে ;   সত্য হয়ে উঠবে , "জীবে প্রেম করে যেই জন / সেই জন সেবিছে ঈশ্বর।" 


শ্রীরামকৃষ্ণের সাধনপন্থায় ঈশ্বরলাভ বা ঈশ্বরত্বলাভ এবং স্বামী বিবেকানন্দের কর্মমার্গের মধ্য দিয়ে ঈশ্বরলাভ বা ঐশ্বরিক শক্তিলাভের কথাই বার বার বলেছেন স্বামী রঙ্গনাথানন্দজী।
সাধনপন্থা বহুধা। সকল ‌পথই একই লক্ষ্যে পৌঁছায়।   সঙ্গীত, সাহিত্য, শিল্পকলার সৃজনে যে একনিষ্ঠতা, তন্ময়তা, তাও তো সাধনা। বাল্মীকি, ব্যাস, হোমার, দান্তে, সেক্সপিয়ের, রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য ; লিওর্নাদো দ্য ভিঞ্চি, মাইকেল এঞ্জেলো, রাফায়েল, পিকাশো, রামকিঙ্কর প্রভৃতি শিল্পী ভাস্করদের চিত্র ও ভাস্কর্যের সৃজনও সাধনা (কোটিতে গুটি মাত্র উদাহরণ)। সন্তানপ্রসূতা জননী যেমন অপার বেদনার মধ্য দিয়ে সন্তানসৃষ্টির পরমানন্দ লাভ করেন, শিল্প-সাহিত্য-ভাস্কর্য- সঙ্গীতস্রষ্টাগণও অনুরূপভাবেই তাঁদের কর্মযোগ- সাধনপথের "অসীম বেদন, অসীম রোদনের" অন্তিমে তেমনই সৃষ্টির 'আনন্দকে' বরণ করেন। 


সঙ্গীতস্রষ্টা বিটোভেনের সিম্ফনির (অপেরা) কথা উঠলেই তাঁর‌ সিম্ফোনি ৫ ও সিম্ফোনি ৯ -এর সুর- ব্যঞ্জনায় অতিন্দ্রীয় জগতের ভাব অনুভূত হয়, যে ভাব মানুষকে অনন্তের সন্ধান দেয় ; হীনতা দীনতা আত্মসর্বস্বতা ও আত্মপরতার গণ্ডি থেকে মুক্ত করে মানব চেতনাকে বিশ্বচেতনার নিখিল ভূবনে আমন্ত্রণ জানায়। 

এই সুরের সাধনপথের ইঙ্গিত আমরা বুঝতে পারি, উপলব্ধি করতে পারি কেননা আমাদের মহাকবি, (যিনি আবার ঐ সুমহান সাহিত্যিক ও দার্শনিক রোমা রোঁলার অভিন্নহৃদয় বন্ধু) তিনি তাঁর সুর ও বাণীর অচ্ছেদ্য বন্ধনের কথা বলার পরও দিনের শেষে সুরের সাধন-ধর্মের আবেদনের শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকার করে বলছেনঃ 

"আমার সুরগুলি পায় চরণ, আমি পাইনে তোমারে..." 

বলছেনঃ
"তোমার সুর শুনায়ে যে ঘুম ভাঙাও, সে ঘুম আমার রমনীয়..." 

সুরের সাধনাও যে পরমাত্মার সাধনার পথ --- সেটি যে মানুষের সত্তাকে অতিমানবীয় সত্তার আলো দেখাতে পারে, সেকথা প্রতিপন্ন করার জন্যেই রোঁলা বিটোভেনের সিম্ফনির, বিশেষ করে পঞ্চম ও নবম সিম্ফনির উল্লেখ ‌করেছেন। বহুবিধ বিদ্যার বিশারদ (polymath) এই প্রাতঃস্মরণীয় পণ্ডিত রোঁলা ছিলেন একজন সমকালের বিশ্বশ্রেষ্ঠ সঙ্গীততত্ত্ববিদও (musicologist) এবং তাঁর নোবেল পুরস্কার বিজয়ী গ্রন্থ 'Jean Christophe' -র প্রধান চরিত্র Jean Christophe Krafft -এর জীবন সংগ্রাম সুরসাধক Ludwig Van Beethoven-এর‌ জীবন সংগ্রাম ও জীবন সাধনারই কল্পচিত্র। 


এবার স্বামী বিবেকানন্দ প্রসঙ্গে রোমা রোঁলার ভাষ্যঃ 

'Life of Vivekananda and the Universal Gospels' গ্রন্থটির মুখবন্ধে রোমা রোঁলা লিখছেন -----
"Battle and Life for him (Swamiji) were synonyms. And his days were numbered. Sixteen years passed between Ramkrishna's death and that of his great disciple. ...... years of conflagration. He was less than forty years of age when the athlete lay stretched upon the pyre. ..... But the flame of the pyre is still alight today. From his ashes like those of the Phoenix of old has sprung the conscience of India ----the magic bird ---- faith in her unity and in the great message,  brooded over from Vedic times by the dreaming spirit of his race ---- the Message for which it must render account to the rest of the mankind."

সংগ্রাম ও জীবন তাঁর কাছে ছিল সমার্থক। কটা দিনই বা তিনি বেঁচে ছিলেন। তাঁর দেবতা শ্রীরামকৃষ্ণের মহাপ্রয়াণ ও তাঁর পরলোক গমনের মাঝখানের সময়ের মাত্র আঠারোটি বছর। জীবন চল্লিশ বছরের  হয়নি তখনো যখন তার সুঠাম সুন্দর মল্লবীর-সদৃশ দেহ চিতামঞ্চে শায়িত হোল --- নিথর। কিন্তু সেই চিতাগ্নি শিখা আজও বহ্নিমান।
তার চিতার সেই ভষ্মরাশি থেকে, রূপকথার বিহঙ্গের মত ভারতভূমির সুদূর অতীতে-সাধিত চৈতন্যসত্তা জাগ্রত হয়েছে। এই সেই ভারতভূমি --- মায়ারূপী বিহঙ্গম ----যিনি বিশ্বাস রাখেন বিশ্বৈকানুভূতির উপর, যিনি বিশ্বাস রাখেন বেদ-বেদান্ত উচ্চারিত মহা বাণীর উপর---- এবং সেই বৈদিক সময়কাল থেকে যিনি বিশ্বাস রেখে চলেছেন এক মহান জাতির অতিলৌকিক আত্মশক্তির উপর। এই যে বাণী, ভারতাত্মার বাণী প্রচারিত করবার দায় তাঁর। (বিবেকানন্দের চিতাভস্ম থেকে উত্থিত শাশ্বত , সনাতন ভারতাত্মা, যাকে পাখীরূপে কল্পনা করা হয়েছে।
'blooded over' শব্দটিতে 'গভীর মনোনিবেশ সহকারে অতীতের স্মৃতি-রোমন্থন বোঝায়'।) 

                                                                                                                       (ভাবানুবাদ মৎকৃত) 

পুজ্যপাদ স্বামী রঙ্গনাথানন্দজীর উপনিষদের সন্দেশ  (The Message of the Upanishads) গ্রন্থটি নিয়ে আলোচনা প্রসঙ্গে রোমা রোঁলার রচিত দুটি জীবনী গ্রন্থের বিষয়বস্তুর অবতারণা করা হোল কেন ?

উত্তরে অনেক কথা বলার আছে যেগুলি আমাদের এই আলোচনাতে, যেটি প্রবন্ধ বা কথকথারূপে লিপিবদ্ধ হয়ে চলেছে তার পর্বে পর্বে স্বাভাবিকভাবেই এসে পড়বে, কেননা গ্রন্থকার উপনিষদগুলির, বিশেষত কঠ, কেন, বৃহদারণ্যক --- এই সকল প্রাচীনতম উপনিষদের অভ্যন্তরে প্রবেশ করবার আগে এই মানবজগতসংসারের  অপরাপর ধর্মধারণা ও পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মণীষীদের চিন্তার উপর ভারতবর্ষের বৈদান্তিক ধর্মবোধের প্রভাব বিষয়ে একটি উচ্চকোটির গবেষণামূলক বক্তব্য রেখেছেন গ্রন্থটির ভূমিকায়। কিন্তু যেহেতু ভূমিকা বা মুখবন্ধ তাই তাঁর‌ বক্তব্য ইঙ্গিতে বা সূত্র আকারে লিপিবদ্ধ। আমরা সেই সূত্রগুলির ভাষ্য ও ব্যাখ্যা রচনা করছি মাত্র।
                             ‌ ‌  ‌         





শুক্রবার, ২১ মার্চ, ২০২৫

স্বামী রঙ্গনাথানন্দ ও বর্তমান ভারতবর্ষে তাঁর ধর্মধারণার অপরিহার্যতা 


                  এক 


পরম পূজনীয় স্বামী রঙ্গনাথানন্দ (১৯০৮ - ২০০৫), রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের বহু প্রকার দায়িত্ব পালন করার পর, অবশেষে ঐ মিশনের ত্রয়োদশ অধ্যক্ষরূপে তার কর্মজীবন সমাপ্ত করেন। এই কর্মসাধনের সঙ্গে সঙ্গে তার সাহিত্য সৃজনের সাধনাও ছিল অপ্রতিহত। ভারতীয়দের শাশ্বতী জীবনাচরণের বাহ্যিকতার অভ্যন্তরে অন্তঃসলিলা ফল্গুধারার মত অতি পবিত্র আধ্যাত্মিক জীবনবোধও সমান ছন্দে অনুশীলীত হয়ে চলেছে সুদূর অতীতের সেই তপোবন-সভ্যতার ব্রাহ্মমুহূর্তের সময়কাল থেকেই। জীবনবোধের এরূপ অনুশীলনের দলিল আমাদের শ্রুতি বা বেদ, ব্রাহ্মণ, উপনিষদ ; শ্রীমৎ ভাগবত, রামায়ণ, মহাভারত সহ বিভিন্ন পুরাণগুলি --- যে সকল সাধারণের নিকট দুরূহ, দুর্গম ও কখনো কখনো দুর্বোধ্য, সে সব মহাগ্রন্থরাজি যিনি প্রাঞ্জল ভাষায়, অনুশীলনীয় ও আচরণীয় পন্থায় আমাদের নিকটে উপস্থিত করেছেন, তিনি স্বামী বিবেকানন্দ, স্বামী ব্রহ্মানন্দ আদির মহান উত্তরাধিকারী ও উত্তরসূরী স্বামী রঙ্গনাথানন্দ। তিনি তাঁর জীবদ্দশায়, প্রাচ্যদেশের এই জীবনসাধনার ঐশ্বর্যসমন্বিত বাণী বাগ্মিতা ও লেখনীর মাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়েছেন বিশ্বময়। তার গ্রন্থসমূহের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি,  যেমন--- 

Eternal value for changing society, Messages of Upanishads, A pilgrim looks at the World,  Practical Vedanta and the science of values, Essence of Indian culture, Swami vivekananda and Human Excellence science and religion, Introduction to the study of Gita, Messages of the Brihadaranyak Upanishad, The approach to truth in Vedanta, The Indian Vision of God as Mother. 

 
এমন কুড়িটি স্বল্প-বৃহৎ গ্রন্থের মধ্যে তিনি শুধুমাত্র ভারতীয় ধর্মধারণার ব্যাখ্যা করেছেন এমন নয়, সে সকল পুস্তকের পাতায় পাতায় আছে বিশ্বের সমস্ত ধর্মধারণার তুলনামুলক আলোচনা (discussions on Comparative Religion).
উপনিষদের  সন্দেশ (The messages of the Upanishads) গ্রন্থ হতে একটি বিশেষ অংশ উদ্ধার করছি এই কারণেই যে তারই মধ্যে আমরা আমাদের আলোচনার বিষয়টিও ওতপ্রোতভাবে দেখতে পাব। 

"ভারত আজ ইতিহাসের একটি সৃজনশীল যুগের দোরগোড়ায় এসে উপস্থিত হয়েছে  ---- বৈদান্তিক ভাব ও রামকৃষ্ণ -বিবেকানন্দের তেজের অভূতপূর্ব নূতন অভিব্যক্তিতে নবজাগরণের সূচনা। শ্রীরামকৃষ্ণের প্রশস্তিতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের জন্মশতবার্ষিকী  অনুষ্ঠানে ১৯৩৭ খ্রীষ্টাব্দে তার অপূর্ব এই কবিতাটি পাঠ করেছিলেন ঃ 

  ''বহু সাধকের বহু সাধনার ধারা
  ধেয়ানে তোমার মিলিত হয়েছে তারা ;
তোমার জীবনে অসীমের লীলাপথে 
        নূতন তীর্থ রূপ নিল এ জগতে ;
দেশবিদেশের প্রণাম আনিল টানি,
       সেথায় আমার প্রণতি দিলাম আনি ----''

যাঁর সম্মন্ধে  কবি কাজী নজরুল ইসলাম গেয়েছেন ঃ
'মন্দিরে মসজিদে গীর্জায়
পূজিলে ব্রহ্মে সম শ্রদ্ধায়  ;
তব নাম মাখা প্রেম নিকেতনে
ভরিয়াছে তাই ত্রিসংসারে -----'

এবং স্বামী বিবেকানন্দ সম্মন্ধে ঋষিকবি রবীন্দ্রনাথের সেই অমোঘ উক্তিঃ

'আধুনিক কালে ভারতবর্ষে বিবেকানন্দই মহৎ বাণী প্রচার করেছেন, যেটি কোন আচারগত নয়। তিনি দেশের সকলকে ডেকে বলেছিলেন, তোমাদের সকলকলের মধ্যেই ব্রহ্মের শক্তি ; দরিদ্রের মধ্যে দেবতা তোমাদের সেবা চান। এই কথাটি যুবকদের চিত্তকে সমগ্রভাবে জাগিয়েছে। তাই এই বাণীর ফল --- দেশের সেবা বিচিত্রভাবে বিচিত্রত্যাগে ফলেছে। তাঁর বাণী মানুষকে যখনই সম্মান দিয়েছে, তখনই মানুষকে শক্তি দিয়েছে।' 


বিবেকানন্দ সম্মন্ধে কাজি নজরুল ইসলাম গাইলেনঃ 

 ''নব ভারতে আনিলে তুমি নব বেদ,
মুছে দিলে জাতি ধর্মের ভেদ  ;
জীবে ঈশ্বরে অভেদ আত্মা জানাইলে উচ্চারি----''
রোমা রোঁলা শ্রীরামকৃষ্ণ ও স্বামী বিবেকানন্দকে পিটার সেরাফিকাস্ ও জোভ দি থাণ্ডারার আখ্যা দেন, যাঁদের মঙ্গলময় প্রভাব এখনও সব ধর্মের আধ্যাত্মিক অনুসন্ধিৎসুরা অনুভব করছেন।" 


স্বামী রঙ্গনাথানন্দজী তার বিপুল রচনাসম্ভারে নিজের উপর দেবত্ব আরোপ করে নিজস্ব কোন মত প্রকাশ করেন নি, কোন নূতন পথের পথরেখাও অঙ্কন করেন নি। তিনি আমাদের এই সুপ্রাচীন ভারতভূমির চিরায়ত অধ্যাত্মচিন্তনের আলোচনার সঙ্গে সঙ্গে পৃথিবীর মূল ধর্মাদর্শের শ্রুতি ও স্মৃতি-র গভীরে ডুব দিয়েছেন, বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ধর্মবীরদের, সাধকদের বাণীগুলি চয়ন ও সঞ্চয়ন করেছেন ; বেদ, উপনিষদ, পুরাণ কাহিনীর সারমর্ম এবং একই সাথে কোরাণ, বাইবেল, আবেস্তা প্রভৃতি ধর্মগ্রন্থের অন্তর্নিহিত ভাব ও ভাবনার মূলে প্রবেশ করে শ্রীরামকৃষ্ণের 'যত মত তত পথ' -- এই বাণীর সত্যকেই প্রতিষ্ঠা করেছেন। 


প্রতিটি ধর্মের শ্রুতি অংশে সর্বজনীন ধর্মবোধের কোন বিরোধ নেই ; বিরোধ স্মৃতি অংশে। এখানে শ্রুতি ও স্মৃতি-র বিষয়টি প্রাঞ্জল  হওয়া বাঞ্ছনীয়।
'শ্রুতি' শব্দটির বহু প্রকার ব্যাখ্যা আছে। তবে সাধারণভাবে শ্রুতি বলতে আমরা বুঝি বেদ। প্রাচীন ভারতীয় অধ্যাত্মচিন্তনের ধারা লিখিত আকারে থাকেনি। তা শ্রবণের মধ্য দিয়ে গুরু পরম্পরায় প্রচারিত ও প্রচলিত ছিল। সেই যে গুরু বা ঋষিদের মুখনিঃসৃত বাণী (messages) তাই শ্রুতি। এমনকি পরবর্তী সময়ে সেই বাণীগুলি যখন লিখিত আকারেও প্রকাশিত হোল তখনোও তা শ্রুতি নামেই অবিধেয় ও সম্বোধিত হোত এবং হয়েই চলেছে আজও। ভারতীয় বৈদান্তিকগণ মনে করেন শ্রুতি অপৌরষেয় ; অর্থাৎ দৈব-প্রেরিত, মানুষের দ্বারা রচিত বা সৃষ্ট নয়। 

অপরদিকে 'স্মৃতি', যা বেদেরই শাখা কিন্তু তা ধর্মাচরণের, বা আরও সহজ সরল ভাবে বলতে গেলে,  তা বেদোক্ত ধর্ম পালনের রীতি নীতি ও সংস্কার বোঝায়। যেমন স্মার্ত মনুর স্মৃতিশাস্ত্র (মনুস্মৃতি)। স্মার্ত রঘুনন্দন ভট্টাচার্য, স্মার্ত রাঘবানন্দ প্রভৃতির স্মৃতিগ্রন্থ। এই সকল স্মৃতিগ্রন্থে লিখিত বিধানগুলির আচরণ যদি পূর্বকালের মতই থাকে তবে তা সমাজের ক্রমবিবর্তনের পথে যে ক্রমোন্নতি সেই প্রবনতাকে রুদ্ধ করে রাখে।
অপরদিকে 'শ্রুতি' বা ঋষিমুখনিঃসৃত বা যুগশ্রেষ্ঠ পুরুষ (যাদের অবতার বা ঈশ্বরপুত্র বা ঈশ্বরের দূত বলা হয়ে থাকে) - দের উচ্চারিত বাণী প্রশ্নাতীত সত্য রূপে গ্রহনীয়।‌

স্বামী রঙ্গনাথানন্দজী এখানে শুধুমাত্র ভারতীয় সভ্যতার বেদোক্ত বাণী (শ্রুতি), এবং বেদোক্ত ধর্মাচরণের রীতি নীতি (স্মৃতি)-র কথাই বলেন নি, তিনি সমস্ত ধর্মের, যেমন পারসিক, ইহুদী, খ্রীষ্টান, ইসলাম -- ধর্মের স্মৃতি অংশটিকে যুগোপযুগী করার কথা বলেছেন।
তিনি খ্রীষ্ট ধর্মের আলোচনা করতে গিয়ে বলছেন, "পাশ্চাত্যে খ্রীষ্টধর্মকে এখন অভূতপূর্ব বিক্ষোভ ও প্রশ্ন বাণের সম্মুখীন হতে হচ্ছে।" তিনি বলতে চাইছেন মধ্যযুগে মূল (গোঁড়া ক্যাথলিক) খ্রীষ্টান ধর্মের স্মার্তগণ যে সকল আচরণবিধি পালন করতেন, বা পালন করতে‌ বাধ্য করাতেন এবং অ-খ্রীষ্টান সম্প্রদায়কে স্বধর্মে নিয়ে আসার জন্য যে সকল পন্থা অবলম্বন করতেন সেগুলির অধিকাংশই ছিল নিষ্ঠুর ও অমানবিক। 

কিন্তু ঈশার যে মূল বাণী (sermons), সেগুলির মধ্যে তো কোথাও নৃশংসতা ও অমানবিকতার লেশমাত্র নেই।
শুধু খ্রীষ্টান ধর্ম নয়, পারসিক, ইহুদী, ইসলাম--- এমনকি আমাদের 'হিন্দু' ধর্মের আলোচনা প্রসঙ্গেও তিনি এই কথা বলেছেন। আর একথা তো সত্য যে ব্রাহ্মণ্যবাদী হিন্দুত্বের স্বঘোষিত ধর্মগুরু এবং একশ্রেণীর রক্ষণশীল পুরোহিত সম্প্রদায় 'হিন্দু'ধর্মের নামে যে সমস্ত আচার- সংস্কারসর্বস্ব, বিবেকবর্জিত নিষ্ঠুর বিধিবিধান পালন করতে সমাজকে বাধ্য করেছিল তার পরিণামেই তো আমাদের দেশের অব্রাহ্মণ, দলিত, ব্রাত্য ও প্রান্তিক শ্রেণীর মানুষ দলে দলে ইসলামে ধর্মান্তরিত হয়েছে, খ্রীষ্টানধর্ম ও বৌদ্ধ ধর্মে আশ্রয় নিয়েছে। (বর্তমানেও আবার সেই উচ্চবর্ণীয় ব্রাহ্মণ্যবাদীদের পুনরভ্যুত্থানের ইঙ্গিত দৃশ্যমানভাবে প্রকট)।
জাতিবাদ ও সাম্প্রদায়িকতাকে হিন্দুর বৈদান্তিক ধর্মবোধ কখনো স্বীকার করে নি। এই সিদ্ধান্তে উপনিত হতে গিয়ে তিনি স্বামী বিবেকানন্দের সে ১৮৯৩ খ্রীষ্টাব্দে শিকাগো ধর্মসভায় প্রদত্ত ভাষণের কিয়দংশ উদ্ধার করেছেন, --- "একই আলোক ভিন্ন ভিন্ন রঙের কাচের মধ্যে দিয়ে আসছে। সকলের উপযোগী হবে বলে সামান্য বিভিন্নতা প্রয়োজন। কিন্তু সব কিছুর অন্তঃস্তলে সেই এক সত্যই বিরাজমান। শ্রীকৃষ্ণাবতারে ভগবান বলছেনঃ  

'সূত্র যেমন মণিগণের মধ্যে, আমিও সেরূপ সকল ধর্মের মধ্যে অনুস্যূত। যা কিছু অতিশয় পবিত্র ও প্রভাবশালী, মানব জাতির উন্নতিকারক ও পাবনকারী, জানবে সেখানে আমি আছি।'


যদি কখনও একটি সর্বজনীন ধর্মের উদ্ভব হয় তা কখনো কোন দেশে বা কালে সীমাবদ্ধ হবে না ; যে অসীম ভগবানের বিষয় ঐ ধর্ম প্রচার করবে, ঐ ধর্মকে তারই মত অসীম হতে হবে ; সেই ধর্মের সূর্য --- কৃষ্ণভক্ত, খ্রীষ্টভক্ত, সাধু অসাধু---- সলের উপর সমানভাবে নিজ কিরণ বর্ষণ করবে ; সেই ধর্ম ব্রাহ্মণ্যবাদী বা বৌদ্ধ, খ্রীষ্টান বা মুসলমান হবে না, বরং সব ধর্মের সমষ্টিরূপ হবে, অথচ উন্নতির সীমাহীন অবকাশ থাকবে ; নিজ উদারতায় সেই ধর্ম অসংখ্য হাতে সকল নরনারীকে আলিঙ্গন করবে,‌ স্থান দেবে প্রতিটি মানবকে ---পশুতুল্য হীন বর্বর থেকে সেই সব শ্রেষ্ঠ মানব পর্যন্ত --- যাঁরা হৃদয়বত্তায় ও জ্ঞানে প্রায়ই সকল মানব জাতির শীর্ষস্থানে অবস্থান করে' সমাজের মনে বিস্ময় ও  তাঁর মানব প্রকৃতি সম্মন্ধে সংশয় উৎপাদন করেন। সেই ধর্মের নীতিতে পীড়ন বা বিদ্বেষের কোন স্থান থাকবে না ; এতে প্রত্যেক নরনারীর দেবস্বভাব স্বীকৃতি পাবে ; এই ধর্মের সমস্ত শক্তি মনুষ্য জাতিকে দেবস্বভাব উপলব্ধি করতে সহায়তা করবে এবং সেই কাজেই সর্বদা নিযুক্ত থাকবে।"

                 





শনিবার, ১ মার্চ, ২০২৫

শ্রীরামকৃষ্ণের পুন্য জন্মতিথি

শ্রীরামকৃষ্ণের পুন্য জন্মতিথি 


ধরিত্রীর চতু্ঃসীমা থেকে নিশিডাক,‌ '"আয় আয়, 

ওই দেখা যায় স্বর্গের দুয়ার। এসো ছুটে ছুটে, 

নয় নিবে লুটে ওরা-তারা স্বর্গের সম্পদ, সুধা অমরার। 

যোগ-ক্ষেম-মোক্ষ লক্ষ্যে রেখে, দাও ডুব ওই তীর্থনীরে-- 

শ্রীহরিচরণ-নিঃসৃতা, চন্দ্রচূড়জটাজাল-সমুদ্ভুতা জাহ্নবীর।" 

অগণন নরনারী, ধনী-মানী, সুখী-দুখী, ক্লিন্ন-ক্লিষ্ট, 

কিংবা সংসারের নিত্যদ্বন্দ্বে দীর্ণপ্রাণ চলে ঊর্ধশ্বাস। 

আরো একবার অমৃতকুম্ভের সন্ধান-- (নয় দেবতার, 

নয় দানবের) গণদেবতার সমুদ্রমন্থন। ওঠে সুধার 

 কলস, ওঠে হলাহল। মহাকোলাহল মাঝে, 

কার ভাগ্যে জুটেছে যে কতটুকু জানে না সে নিজে। 

তীর্থযাত্রা শেষে ফিরে নাই যারা, যারা হোল হারা, 

তারা কি গিয়েছে স্বর্গে চিরতরে ? সত্যই কী সেই প্রাণকণা, 

চেয়েছিল ছেড়ে যেতে এই মর্ত্যবাস অমরার আশে ? 

প্রশ্নাতুর বসে আছি কামারপুকুরে এক কুটিরের ছায়ে। 

অকস্মাৎ একি ! জ্যোতির্ময় নরশিশু সেই গদাধর। 

সুবোধ অবোধ মুখ, বালকৃষ্ণ যেন যশোময়ী কোলে। 

চিরন্তন নারীত্বের মৃত্যুহীন অ-মৃতের বাণী মাতৃশ্লোক, 

লেখা দেখি সন্ধ্যাকাশে আলোক লেখায়, "চৈতন্য হউক।" 

দুলাল চন্দ্র বন্দোপাধ্যায়
১৬ই ফাল্গুন, ১৪৩১
শিলিগুড়ি।



Recently published

অমূল্য

He ( Tagore) who sees all things in his own self and his own self in all things, he does not remain unrevealed.                     ...