This blog contains short stories, poems written by me in Bengali and English and also a few translations in English of some great works of the legendary Rabindranath Tagore.
সোমবার, ৩১ জানুয়ারি, ২০২২
চম্পু বা চম্পূ
রবিবার, ৩০ জানুয়ারি, ২০২২
কোথায় অন্ধকার ?
The January 26 , India observes Republic Day.
শুক্রবার, ২৮ জানুয়ারি, ২০২২
২৬শে জানুয়ারী , মুক্তির দিন !
বুধবার, ২৬ জানুয়ারি, ২০২২
সীতা
________________
সোমবার, ২৪ জানুয়ারি, ২০২২
পরিণাম !
শূন্য হাতে শূন্যে লীন ?
—-------------------------
মাতৃ জঠরের গন্ধ উবে গেছে কবে।
মাথার উপরে আলো ছিলো , দেখি নাই।
পা’য়ে নিয়ে পাঁক , মরুতৃষা বুকে
এসেছি পশ্চিম সাগর কূলে, একা,
আসন্ন সন্ধ্যায়, নিয়তি নির্দেশ –
বিস্ময় বিপন্ন দৃষ্টি , অবশ চরণ ।
ওই যায় ডুবে দিনান্তের শেষ রশ্মিরেখা,
অন্ধকার রাহু, ঢেউয়ের নিয়েছে রূপ !
অস্তিত্ব-বিনাশী ‘না ’ যেন সর্বগ্রাসী ‘হাঁ’ !
পা-ধোওয়া হলো না আমার, আলো দেখা –
এ-জন্মের মতো হয়ে গেল সারা ।
লবনাক্ত সিন্ধুজল ! প্রাণান্ত পিপাসা !
কি চেয়েছি সারাটি জীবন ? পেয়েছিই বা কী ?
চাওয়া ও পাওয়ার মাঝে এত গরমিল ?
না চাওয়ার ছিল যা’, পেয়েছি তাই সবই ,
পাওয়ার যা এলো হাতে ,ভুল ছিল তাতে !
ভুলের ফসল বয়ে’ কেটে গেল কাল ।
সঞ্চয় জীবনে শুধু শবের জঞ্জাল ।
“জীবনকে দিবিটা কি ?”, শুধায় ‘প্রাণেশ’ ,
নির্ভার ‘মরণ’ মাত্র আছে অবশেষ ।।
দুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়
২২-০১-২০২২
ব্যাঙ্গালোর ।
_______________________________
The call of Destiny
The inspiration has been prompted by reading Shakespeare where the great Bard, with the power of his ever-lasting creation, has shaken up our sensations and torn at our emotional roots of belief in life, by wielding Macbeth's celebrated outburst, (on life).
“Tomorrow, tomorrow, and tomorrow,
Creeps in this petty pace from day to day,
To the last syllable of recorded time;
And all our yesterdays have lighted fools
The way to dusty death.”
But, we, the ‘souls’, who believe in oriental philosophy , possess an unbroken confidence that there is One, the Almighty, in Whom we are, by Whom we are guided, but , at our journey’s end, what 'The Dark’ we face, is due to our own greed for what is earthly and evanescent.
I, too, believe in Him, and pray for the human conscience to be enlightened by Him.
Dulal chandra Bandyopadhyay,
24-o1-2022
An encounter with nothingness
—----------------------------------------
"The smell of the womb I’ve forgotten.
Forgets everyone though – no exception.
As the river remembers not its source.
Started running , with head, bent down,
Hands, stretched out to grasp whatever,
With inordinate desire, as if the wanting
is unending.
Burdened with things futile, I’ve plodded so long
A journey, stumbling on in blind ignorance.
Now, standing on the shore I see
The sea of the dark before me,
The Sun, that for so long, waited for,
To bless me with his resplendence, is set.
My feet trudge no more, eyes view nothing,
Heart urges Someone to guide , but in vain.
As during the blessed life of the blessed days,
The Heaven’s Light I’ve ignored, now destined–
I’m to plunge into this undeniable nothingness.
Oh! Is there no one to bring me back once more,
Where did I come from, where I stayed and lived?
For, I feel how dearly I Love my life, how dearly !"
Faintly he cried ,and, with this, in that abysmal dusk,
The lone traveller’s voice abruptly got choked.
And the dark waves came furiously surging,
And engulfed the whole leaving nothing and Nothing.
_______________________________________________
The whole--all of something.
The dark--the absence of light.
Dulal Chandra Bandyopadhyay
24-01-2022
Bangalore.
______________________________________
বৃহস্পতিবার, ২০ জানুয়ারি, ২০২২
দিন ফুরালো ঘরে এলি !
সারা দিনটা কোথায় ছিলি ?
সদ্য ঘটে -যাওয়া একটি বাস্তব ঘটনা অবলম্বনে ।
-------------------------------------------------------------
(গ্রাম থেকে শহর। স্বদেশ থেকে বিদেশ। শিক্ষা ও জীবিকার সন্ধানে সন্তানদের পরিযায়ী জীবন। সন্তান-সান্নিধ্য বঞ্চিত মায়ের আশ্রয় হয় মেয়ের ঘর ,নয় বিষাদঘন একাকীত্ব। বিবর্তিত কালের দাবী – অনুপেক্ষণীয়। কবিতাটি সর্বজনীন মাতৃত্বের আর্তি।)
“সারা দিনটা কোথায় ছিলি ?
সন্ধ্যা বেলায় ঘরে এলি ।
সত্যি কথা না বললে ঢুকবি না তুই ঘরে ।
বনের ধারে , নদীর ঘাটে ,
আঁখের ক্ষেতে , সিমের মাঠে ,
গিয়েছিলে মাছ ধরতে মতিঝিলের পাড়ে ।
কোন গাছে কোন পাখির ছানা,
কোন পাখিটার হলুদ ডানা ,
ঠিক ঠিক সব আছে জানা, পড়ার বেলা নাই ।
গাঁয়ের ছেলে করে' জড়ো,
ঘোষ বাগানের পেয়ারা পাড়ো ,
চৌকিদারের ধমক খেয়ে কান ধরেছো তাই।
সব খবরই জানা আছে ,
বলে গেছে আমার কাছে
দুলে পাড়ার দুখীর ব্যাটা রাখাল কালো সোনা ।
আসুক বাবা, বলবো তাঁকে ,
শহরে নিয়ে রাখতে তোকে ,
এখানে আর যাবে না তোর দারুন দুষ্টপনা ।”
“ও দিম্মা , ঘুমাচ্ছিলে ?
মনে মনে কী বকছিলে ? “
নাতনী হাসে খিলখিলিয়ে দঁড়িয়ে মুখের কাছে ।
চম্কে উঠে দিম্মা বলে ,
"না গো দিদি, ওই আসলে
ভাবতেছিলাম মামাটি তোর আসবে কবে ঘরে !
কথা আমার শুনে না সে ,
কোথায় আছে ,কোন বিদেশে ,
আসবে যেদিন হয়তো সেদিন যাবো এ -ঘর ছেড়ে ।”
দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
—---------------------------------------------------------------
মঙ্গলবার, ১৮ জানুয়ারি, ২০২২
শাঁওলী --স্বরের প্রতিমা
শনিবার, ১৫ জানুয়ারি, ২০২২
ফুলেশ্বরী নন্দিনী, দ্বাদশ বার্ষিক সংখ্যা – ২০২২
ফুলেশ্বরী নন্দিনী , দ্বাদশ বার্ষিক সংখ্যা , বইটির পূর্ণাঙ্গ আলোচনা ।
______________________________________________
প্রথম পর্ব , প্রবন্ধ
আরম্ভ করি প্রচ্ছদ দিয়ে | ফুলেশ্বরী নন্দিনী (দ্বাদশ বার্ষিক সংখ্যা) এবং ডাংগুলি (দ্বিতীয় বর্ষ) বই দুটি হাতে আসার অনেক আগে তাদের ছবি ভেসে এসেছে বর্তমান বিজ্ঞানের মহাদান –মুঠিদর্পণে | আমার প্রথম অনুভূতি আমি ব্যক্ত করেছি প্রেরকের কাছে এক টুকরো কবিতায় :
ফুলেশ্বরী নন্দিনী ও ডাংগুলির প্রচ্ছদ
—-------------------------------------------
এ দুটি চক্ষু নিয়ত নিত্য
যা কিছুই দেখে সকলি সত্য,
কল্পনা ছোখে অ-সত্য কিছুবা
দেখার জন্য মরি।
সেই পিপাসার জল দিল যারা,
রঙ তুলি নিয়ে সুখে থাক তারা ,
দিনের বেলায় হাতে ডাংগুলি,
রাত্রে ফুলেশ্বরী।
এবার ‘নন্দিনীমাতা’, পরম শ্রদ্ধেয়া সুলতানা রিজিয়ার শুভেচ্ছাবার্তা। তাঁর সম্পর্কে বিশেষ কিছু বলা , বিশেষ করে তাঁদের কাছে যাঁরা ‘ফুলেশ্বরী নন্দিনীর সঙ্গে প্রায় এক যুগ অধিককাল জড়িয়ে রয়েছেন, আমার পক্ষে অতিকথন হবে। তাই বর্তমান প্রকাশিত পত্রিকা তাঁকে কতখানি আনন্দ দিয়েছে সেটি তাঁর লেখনীতেই পড়ে নেওয়া যায় :
“নন্দিনীর যথার্থ মর্মবাণী লালনে ফুলেশ্বরী নন্দিনী সত্যই অদ্বিতীয়।”
সভাপতি ,সর্বজনশ্রদ্ধেয় শ্রী সুহাস বসু মহাশয় সম্মন্ধেও সেই একই কথা :
“অনেক স্বনামধন্য লেখকদের সঙ্গে নবীন লেখকদিগকেও আমরা স্থান দিয়ে থাকি । কে বলতে পারে কখন কোন কুঁড়ি বিকশিত হবে ।”
এবার আসি প্রবন্ধ প্রসঙ্গে, আমার প্রণম্য শ্রী গৌরমোহন রায় মহাশয়ের লেখা “পরশুরামের কবিতা “ নামক লেখায় । গবেষণাই যাঁর সাহিত্য কীর্তির পরিচায়ক তাঁর (সেই ড: রায়ের ) লেখা প্রবন্ধের উপর কোনো আলোচনায় যাবার আগে আমার সীমাবদ্ধতার কথা স্বীকার করে নিলাম।
রাজশেখর বসু হলেন পরশুরাম (১৮৮০- ১৯৬০)। তার বিজ্ঞান গবেষণা ও সাহিত্য সাধনার যুগপৎ আলোচনা, তাঁর অনুদিত বাল্মীকি রচিত রামায়ণ, কৃষ্ণদ্বৈপায়ন ব্যাসকৃত মহাভারতের বঙ্গানুবাদের মতোই সুবৃহৎ পুস্তকেও স্থানস্বল্পতা অবশ্যম্ভাবি। মনস্বী প্রাবন্ধিক সেই বিপুল ক্ষেত্রটিকে সযত্নে পরিহার করেছেন একটি সাময়িক পত্রিকার ধারণ ক্ষমতার সীমাবদ্ধতার কথা ভেবে এবং শুধুমাত্র কবি ‘পরশুরামের
কাব্যকলার’ প্রতি দ্রোণশিষ্য পার্থসুলভ দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখে । প্রথমে রাজশেখর বসুর কবিতাগুলির নাম ,
১। অটোগ্রাফ, এই নামে পাঁচটি কবিতা । নাবিক, ’কবিতা’কে, হবুচন্দ্র গবুচন্দ্র, কালিপদ দলিকসেফালিক, প্রার্থনা ,কৈলাসশিখর মধ্যে যত ধাতু,
সতী, ঘাস, সরস্বতী, ঙ্গ, জল, সূর্যগ্রহণ, দুলালের গল্প,
শেলীর the question হইতে অনুকৃত, ছবি - মণিকে, শেক্সপিয়রের নাটক পড়িয়া, দীপঙ্কর, বনফুল,
চন্দ্রসূর্য বন্দনা -- এবং আরো কয়েকটি ।
প্রাবন্ধিক ‘বনফুল’ কবিতাটির উল্লেখ করেছেন, বলেছেন, “ ডাক্তার বলাইচাঁদ কিভাবে সাহিত্যিক বনফুলকে অতিক্রম করে গেল সে কথাই ছন্দোবদ্ধ রীতিতে প্রকাশ করেছেন ।”
এবং তিনি সমাপ্ত করেছেন এই বলে ,
“কবিতাগুলি পাঠ করে আমার মনে হচ্ছে – এগুলির উদ্দিষ্ট কিশোর সমাজ । ব্যতিক্ৰম শেষ দুটি কবিতা । গবেষক এবং সৎ , আগ্রহী পাঠকের কাছে কবিতাগুলির যথেষ্ট মূল্য
আছে ।”
প্রণম্য সাহিত্য সাধক বাংলা ভাষার ও সাহিত্যের যুগসন্ধিকালের, (রবীন্দ্রযুগ এবং আধুনিক যুগের) একজন বৈচিত্রময় প্রতিভার পুনরাবিষ্কার করে’ বাংলার সাহিত্য পরিমন্ডলে পুনঃপ্রতিষ্টিত করবার যে প্রয়াস করেছেন তা তুলনারহিত ।
সংযোজন
-----------------
গবেষণা-ঋদ্ধ মননে লেখকের ধরা পড়েছে ঠিকই যে মিলনসাগরের কবিতাগুলির অধিকাংশ কিশোরদের জন্য । ব্যতিক্রমধর্মী শেষ দুটি কবিতা, তাও উল্লেখ করেছেন। তবে আরও কয়েকটি কবিতার ভাব ও রস ভেবে দেখার মতো। যেমন দার্শনিক চিন্তার প্রকাশ,
১) "অনন্তের কোলে রহিগো আমরা
অনন্ত হইতে এসেছি চলে।
অনন্তে আবার ফিরে যাব মোরা
বারেক হেরিয়া সুনীল জলে।।
........................................
........................................"
কবিতাটি লেখা ২২/৬/'৪২. ।
২)বয়স্য সুলভ সরসতা ও বৈচিত্র্যময়তা -
দীর্ঘ দিনের বন্ধু, আর্ট প্রেসের সর্বাধিকারী, 'সচিত্র ভারতের' সম্পাদক নরেন্দ্র নাথ মুখোপাধ্যায়কে
লেখা একটি কবিতা,
পঞ্চাশ বৎসর পরে নরেন বাবুকে,
Be bold with me,
The best is yet to be.
বুড়ো হও দুজনে থাকি কাছে কাছে
উত্তম ফল এখনো বাকী আছে।
...............................................
................................................
সুখং বা যদি দুখং, প্রিয়ং যদি বা অপ্রিয়ং
প্রাপ্তং প্রাপ্তমুপাশিত হৃদয়ে মা পরাজিত।।
তিনটি ভাষা ব্যবহার করে একটি রসায়ন, রসায়ন গবেষক পরশুরামের কাব্যপত্র !
কবিতাটি লেখা ১৮/১/'৫৫ ।
এবার দেখুন, pure romanticism , 'শেলীর The question হইতে অনুকৃত'
"....................................
.....................................
রচিনু যতনে কুসুমের হার
বসি নদীতীরে বিটপি তলে,
ফুলহার লয়ে ফিরিনু আবার
পরাতে সে মালা কাহার গলে।।"
সর্ব কালের সর্বশ্রেষ্ঠ কবিপ্রতিভার অন্যতম একটি উজ্জ্বল নক্ষত্র শেলীর "প্রশ্নটি" কবিতার শেষ স্তব্কটি এই প্রসঙ্গে উধৃত করি :
The Questions
By Percy Bbysshe Shelly
"Methought that of these visionary💐flowers
I made a nosegay, bound in such a way
That the same hues ,which in their natural bowers
Were mingled or opposed, the like array
Kept these imprisoned children of the Hours
Within my hand, -- and then, elate and gay,
I hastened to the spot whence I had come,
That might there present it ! -- Oh ! to whom ?"
ভাবুন, কোন নৈসর্গিক আবেগ (প্রেম, platonic love ?) "রামগড়ুড়ের ছানা" রসায়ন বিজ্ঞনীটিকে , বুদ্ধদেবের সম্মুখে সুজাতার মতো পরমান্ন এনে দিয়েছিল । এখানেই সাহিত্যের বিজয় গৌরব ।
বিচিত্র ভাব ও ভাবনার রসায়নে পরশুরাম বাঙলা সাহিত্যর রসুইখানায় যে রসের ভিয়েন চড়িয়ে গিয়েছেন তার তুলনা তিনি নিজেই – একমেবাদ্বিতীয়ম।
(এবার পরবর্তী প্রবন্ধ প্রসঙ্গে)
______________________________________________
ফুলেশ্বরী নন্দিনী , দ্বাদশ বার্ষিক সংখ্যা, এটি একটি
পত্রিকাই নয়, - সাহিত্য সংকলন । এই বইটির প্রতিটি
রচনা মনোগ্রাহী। ক্রমান্বয়ে আলোচনা করার ইচ্ছা রইল ।
পত্রিকার দ্বিতীয় প্রবন্ধ "বিদূষী স্বর্ণকুমারী দেবী।"
–---–--------------------------------------------------–-----
লেখিকার সুচনাটি সংক্ষিপ্ত কিন্তু লক্ষ্যভেদী। বর্তমান বাংলার (নারী) লেখকসম্প্রদায় ঊনবিংশ শতকের সমুন্নত ও বিপ্লবাত্মক মানসিকতাসম্পন্ন নারীরত্নগুলিকে স্মরণ করেছেন এবং বলছেন , "আমরা নুতন করে খুঁজে নিতে চাইছি আমাদের হারিয়ে যাওয়া উত্তরাধিকার।"
বলিষ্ঠ এবং সত্য উচ্চারণ । গার্গী, মৈত্রেয়ী ,লোপামুদ্রা, সতী ,সাবিত্রী ,সীতা ,অরুন্ধুতী ---"বহু বীরবালা বীরেন্দ্র প্রসূতি , আমরা তাঁদেরই সন্ততি"---একথাও বলেননি। বলেননি যে , অষ্টাদশ শতকের দ্বিতীয় ভাগ থেকে ঊনবিংশ শতকের প্রথম দশক --- এই সময়কালে ইংরেজি ভাষা ও ইংরেজিয়ানার (পাশ্চাত্য সংস্কৃতি - শব্দবন্ধটি ইচ্ছাকৃতভাবেই পরিহার করেছি) ক্রম বিস্তারের ফলে সমকালের পশ্চিম দেশের নারীশিক্ষা ,নারীমুক্তি আন্দোলনের প্রভাব ঐতিহাসিক ভাবেই আমাদের অনুপ্রাণিত করেছে।
তিনি দৃষ্টি নিবদ্ধ করেছেন ঠাকুরবাড়িতে এবং নবজাগ্রত নারীত্বের জাগরণের উৎসেরও সন্ধান করেছেন
সেখানে। তাঁর লক্ষ্যভেদ সার্থক । ঠিকই তো, বাংলার নবজাগরণের যে আন্দোলন তার অগ্রদূত রাজা রামমোহন রায় ,ঈশ্বরচন্দ্র থেকে আরম্ভ করে শত সহস্র ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান কিন্তু সামাজিক ভাবে সেই নব উন্মেষিত চেতনা গ্রহণ করা ও ধারণ করার কেন্দ্রগুলির মধ্যে অন্যতম ছিল জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবার। এখানেই স্বর্ণকুমারী মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ও সারদা দেবীর একাদশ সন্তান রূপে জন্ম নিয়েছিলেন।
এরপর প্রাবন্ধিক স্বাভাবিক চলনছন্দেই স্বর্ণকুমারী দেবীর জীবন ,জীবনী, সৃষ্টি ও কীর্তির কাহিনী সংক্ষিপ্ত আকারে বর্ণনা করেছেন এবং সমাপ্তির আগে লিখেছেনঃ
"স্বর্ণকুমারীর জীবনে সাফল্য বিপুল, কৃতিত্ব বিরাট , কেননা তার মূলে ছিল সকল মানুষের প্রতি তাঁর অগাধ ভালোবাসা , সুস্থ জীবন দর্শনের প্রতি ঐকান্তিক অনুরাগ। এখানেই তাঁর মহত্ব।" প্রাবন্ধিক যাঁরা ,তাঁরা তাঁদের লেখায় কিছু ইঙ্গিত দিয়ে রাখেন যা অনুধাবনীয় । রচনার চতুর্থ অনুচ্ছেদে তিনি লিখেছেন ,মাত্র এগার বৎসর বয়সে স্বর্ণকুমারীর বিয়ে হয় (১৮৬৭খ্রীষ্টাব্দে ) ,১৮৬৮খ্রীষ্টাব্দে জন্ম হয় তাঁর প্রথমা কন্যা হিরণ্ময়ী দেবীর।
আমার কথা এখানেই :
তারপর সুদীর্ঘ সংসারজীবন, সন্তান-সন্ততি, রোগ, শোক ,বিপর্যয়। এ-সমস্ত কিছুকে অতিক্রম করে'
সামাজিক, মানবিক ধর্ম প্রতিপালন করেও সৃষ্টিশীলতা ও উন্নততম জীবনবোধ অক্ষুণ্ণ রাখার মধ্যে যে অপরাজেয় নারীত্ব স্বর্ণকুমারী দেবীর মধ্যে সেদিন বর্ণে,সৌরভে ,মাধুর্যে পূর্ণ বিকাশ লাভ করেছিল -- তাইই তো সনাতন বাংলার
এবং বর্তমান নারীসমাজের উত্তরাধিকার।
তাঁর সৃজনশীল সাহিত্য সৃষ্টির ফসল সহজ ,সরল ,যুগধর্মে ক্রান্তিকারী এবং গোলাজাত করার মতো সুপ্রচুর ।
উপন্যাস : দীপনির্বাণ ,মিবার রাজ ,ছিন্নমূল ,মালতী ,হুগলীর ইমামবাড়ি ,বিদ্রোহ, সাব্বিরের দিন রাত ,মিলন রাতি ,বিচিত্রা ,স্বপ্ন বাণী ,ফুলের মালা ,কাহাকে ,স্নেহলতা । উপন্যাসগুলি লিখেছেন ১৮৭৬ সাল থেকে ১৯১২ সাল অবধি । তা ছাড়া ছোট গল্প , যেমন নব কাহিনী ,গল্প স্বল্প । প্রবন্ধ : পৃথিবী , নাটক: বসন্ত,উৎসব ,বিবাহ উৎসব । কাব্য : কবিতা ও গান। শিশুদের জন্য : সচিত্র বর্ণবোধ ,আদর্শনীতি।
বাংলার প্রথম নারী সাহিত্য- প্রতিভা , যিনি "জগত্তারিণী স্বর্ণ পদক" লাভ করেন।
তাঁর সর্বগুণান্বিত ব্যক্তিসত্বার উপর দীর্ঘ আলোচনার অবকাশ রয়ে গেল । তাঁর জীবন সাধনার মর্মবাণী আমরা শুনে নি ঋষি শ্রী অরবিন্দের উপলব্দিতে –
"Each has his or her own periods of fulfillment and difficulty, his or her distinct course and times and the seasons of the Sadhana,"
( Sri Aurobindo to Dilip Roy )
লেখকের প্রতি আমার সস্নেহ শুভেচ্ছা রইলো।
দুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়
১৭-০১-২০২২
ব্যাঙ্গালোর ।
-----------+----------------------+-----------------+----------
১৯--০১--২০২২
প্রবন্ধ বিষয়ে দু 'কথা
আজকের আলোচনা 'ফুলেশ্বরী নন্দিনীর' ( দ্বাদশ বার্ষিক সংখ্যা ) তৃতীয় প্রবন্ধ "কবি কামিনী রায়ের জীবন একটি কবিতা ---অকৃত্রিম।"
সূচি অনুযায়ী তেমনই হওয়ার কথা। কিন্তু এই প্রবন্ধটির রচয়িতা আমি ,অর্থাৎ দুলাল বন্দ্যোপাধ্যায় নিজে, তাই
এ কাজের দায় আমি দিতে চাই পাঠকদের , যাঁরা লেখকদের সত্যিকারের বিচারক । বিচার তাঁরা করবেন আর আমি, লেখক , করজোড়ে সেই বিচারক মণ্ডলীর সম্মুখে দাঁড়িয়ে থাকবো -- এই স্বপ্নে বিভোর থাকে বলেই তো লেখকের আবেগ উদ্বেল হয়ে ওঠে ,যা চোখে আনে জল, কলমে ঝরায় কালি । মস্তিস্ক থেকে সাহিত্য সাধকদের লেখা আসে না , আসে দলিত ,মথিত, দুখের কাটাঁয় দীর্ণ হৃদয় থেকে । সাহিত্য আলোচনা বা সমালোচনা যিনিই করুন তাঁর প্রথম কাজই হলো লেখকের হৃদয় অনুভব করা। স্রষ্টা যখন সৃষ্টি কর্মে মগ্ন থাকেন , সেই সময়কালের তাঁর যে ভাব সেটি বাস্তবে রূপ লাভ করে' পাঠকের বুকে গিয়ে বাসা বাঁধে । তখন সে পাঠকের সম্পদ । লেখক আমি, তাই পাঠক যে অনুভবে সেটি গ্রহণ করেছেন তিনিই বলতে পারবেন সেই লেখাটির প্রসাদ গুণ কতখানি ।
আজ বরং প্রবন্ধ প্রসঙ্গে দু'কথা বলি ।
উপন্যাস, ছোটগল্প , অমিত্রাক্ষর ছন্দ , sonnet বা চতুর্দশপদী কবিতার মতো প্রবন্ধও বাংলার সাহিত্য ক্ষেত্রে নবাগত । রাজা রামমোহন রায় ও ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগরের দু 'একটি প্রস্তাব,প্রস্তাবনা বা দলিল গোছের কিছু বাংলা গদ্য বাদ দিলে প্রকৃত অর্থে বাংলায় প্রবন্ধ সৃষ্টি সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিম চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের হাতে। তারপর সেই সদ্য উন্মীলিত অঙ্কুরটিকে মহীরুহের বিশালতায় ও বিচিত্র পল্লব -পুষ্প-প্রাচুর্যে লালন ও পালন করে গেলেন সাহিত্যের সব্যসাচী রবীন্দ্রনাথ। এটি শেষ কথা নয় । এই বলে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অব্যবহিত পূর্বে ,তাঁর সমকালে এবং পরবর্তী কালের কয়েকজন দিকপাল প্ৰবন্ধকারের নাম নিতেই
হয় ।যেমনঃ
প্যারীচাঁদ মিত্র ,ভূদেব মুখোপাধ্যায় ,সঞ্জীব চন্দ্র চট্টোপাধ্যায় দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর ,হরপ্রসাদ শাস্ত্রী ,শিবনাথ শাস্ত্রী, অক্ষয় কুমার মৈত্রয় , হরপ্রসাদ শাস্ত্রী ,প্রমথ চৌধুরী ,ধুর্জুটি প্রাসাদ ,বেগম রোকেয়া ,আকরাম খাঁ ,কাজী মোতাহার হোসেন, অন্নদাশঙ্কর রায় এবং আরো আরো ।
আর রবীন্দ্রনাথ ? তাঁর প্রবন্ধ ? সাকুল্যে তাও হাজারের কাছাকাছি ।এখনো পর্যন্ত সঙ্কলিত আট শত !
প্রবন্ধ, সন্দর্ভ ,রচনা যাইই নাম দেওয়া হোক না কেন সাহিত্যের এই আঙ্গিকটির আদি জন্মভূমি ওই পাশ্চাত্য দেশ। ষোড়শ শতকে ফরাসি সাহিত্যিক মাইকেল মোতেন , Essais নামে একটি গ্রন্থ রচনা করেন ( আনুমানিক ১৫৮০), যার অর্থ 'প্রয়াস ' তাঁর শৈলী অবলম্বনে ফ্রান্সিস বেকন (Francis Bacon) তাঁর "Essays" নামক বিখ্যাত গ্রন্থ প্রণয়ন
করেছেন । সেইই প্রবন্ধ রচনার আদি। তারপর তো প্রবন্ধ সাহিত্যে মহা মহা রথী ,সারথীর আবির্ভাব। সেসব প্রাতঃস্মরণীয়দের মধ্যে আছেন ---------
Aldous Hurley, Jonathan Swift, Graham Green, George Orwell, Bertrand Russel, David Hume, Charles Lamb ,Mark Twain, Virginia Woolf , Geoff Dyer, Christopher Hitchens, Nora Epson....(only a few among the greatest) .
আসলে আমি বলতে চাইছি সাহিত্যের এই বিশেষ শাখা ও তার আঙ্গিক একাধারে ঐতিহাসিক এবং ব্যাপকতায়,বৈচিত্রে ও গভীরতায় ঐতিহ্য ও ঐশ্বর্যমণ্ডিত। প্রবন্ধ নির্দিষ্ট বিষয় ভিত্তিক কিন্তু তার মধ্যে একদেশদর্শিতার কোনো ঠাইঁ নেই । বিষয়টির সমস্ত দিক নিয়ে তার আলোচনা । অবশ্য এ বিষয়ে পন্ডিতদের মতের মিল কোনো দিনও হয় নি ,হবেও না। বিশ্ববিশ্রুত সমালোচক হাডসন মন্তব্য করেছেন ,--"The essay, then, may be regarded roughly as composition on any topic, the chief negative features of which are comparative brevity and the comparative want of exhaustiveness."
ওই , একই কথা , "শেষ হয়ে হইল না শেষ "। ঠিক এই কথাই আমি বলেছি সুখ্যাত প্রাবন্ধিক , শ্রদ্ধেয় ডঃ গৌরমোহন রায় মহাশয়ের রচনা "পরশুরামের কবিতা" প্রসঙ্গে। শ্রীমতী তপতী ঘোষের লেখা "বিদূষী স্বর্ণকুমারী দেবী" রচনাটির ক্ষেত্রেও সেই একই কথা। রচনা দাবী করে সংক্ষিপ্ততা , আর উৎসাহবর্ধক ইঙ্গিত যা পাঠকের চিন্তা ও ঔৎসুক্য বাড়িয়ে তোলে । এই দুটি গুণই পূর্বে আলোচিত প্রবন্ধ দুটিতে
রয়েছে । 'ডঃ রায় যদি আরো কিছুটা লিখতেন' -- এই যে আফসোস , এটি প্রবন্ধের একটি বিশেষ গুণ। শ্রীমতী ঘোষের বেলায় ওই একই Want of exhaustiveness.
তা হোলে স্বামী বিবেকানন্দের "বর্তমান ভারত ", রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের "সভ্যতার সঙ্কট", শরৎ চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের "নারীর মূল্য"-----এগুলিকে কী বলা হবে ? হ্যাঁ , এ-গুলিও মহৎ.
'রচনা' । এগুলিও inexhaustible এবং তাই ওই সমস্ত বিষয় নিয়ে আজও রচিত হয়ে চলেছে অন্তহীন রচনা।
আর 'রচনার ভাষা ' বিষয়টি প্রবন্ধের চরিত্রের উপর নির্ভর করে । নির্ভর করে লেখকের সৃজন প্রতিভা ও বৈদগ্ধ্যের তারতম্যের উপরে । এ ক্ষেত্রে আলোচনা ,সমালোচনা অকিঞ্চিৎকর।
"This was once a house of trade,--a centre of busy interests. The throng of merchants was here --the quick pulse of gain -- and here , some forms of business are still kept up, though the soul be long since fled."
"Essays of Elia,"
Charles Lamb.
"ভারতবর্ষীয় ও পাশ্চাত্য অলঙ্কারিকেরা কাব্যকে নানা শ্রেণীতে বিভক্ত করিয়াছেন । তাহার মধ্যে অনেকগুলি বিভাগ অনর্থক বলিয়া বোধয় । ...... খণ্ডকাব্যের মধ্যে আমরা অনেক প্রকার কাব্যের স্থান করিয়াছি ।তন্মধ্যে একপ্রকার কাব্য প্রাধান্য লাভ করিয়া ইউরোপে গীতিকাব্য (Lyric)) নামে খ্যাত হইয়াছে ।"
"গীতিকাব্য"
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
"আর্ট হচ্ছে রসাত্মক রূপ বা রূপাত্মক রস । যেখানে রূপ নেই সেখানে আর্ট নেই । যেখানে রস নেই সেখানে তো নেইই । কূল আর জল দুই নিয়েই নদী । রূপ আর রস দুই নিয়ে আর্ট। দর্শন ,বিজ্ঞান ,ইতিহাস প্রভৃতিতে এমন কোনো বাঁধ নেই যা সত্যকে ধরে রাখে । আলোকে ধরে রাখতে পারে এমন কোনো নিৰ্দিষ্ট রূপ নেই । দর্শন ,বিজ্ঞানের ভাষা রূপহীন অলঙ্কার হীন ।পক্ষান্তরে সাহিত্যের ভাষা রূপবান ,সালঙ্কার । ভাষা যে ক্ষেত্রে রূপহীন ,ভাবও সে ক্ষেত্রে রূপহীন , কারণ ভাব ও ভাষা অভিন্ন ।"
অন্নদা শঙ্কর রায়
প্রবন্ধ সমগ্র ,নবম খন্ড ।
এই উদাহরণ তিনটি সমুদ্রের তরঙ্গ লহরীর দূরশ্রুত মৃদু ধ্বনি মাত্র । উদ্ধার করে' সন্নিবিষ্ট করেছি এই জন্যই যে যদি , নব প্রজন্মের সাহিত্য সাধক যাঁরা, তাঁরা আরও একবার প্রবন্ধ সাহিত্যের মহাসমুদ্র দেখার জন্য উদগ্রীব হয়ে ওঠেন তবে বাংলা সাহিত্যের আবারো একবার নবজাগরণ অচিরাৎ, অবশ্যম্ভাবী -- সন্দেহ নাই । নূতনের পদধ্বনি শোনার জন্য "কান পেতে রই ।"চোখ মেলে থাকি সাময়ীক পত্রিকার পাতায় (Little Magazine ) নূতন সৃষ্টি দেখার জন্যে ।
দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
১৯- ০১ -২০২২
ব্যাঙ্গালোর ।
ফুলেশ্বরী নন্দিনীর বা কোনো আগ্রহী পাঠক , লেখক , সমালোচক যদি
প্রশ্ন রাখেন কিংবা জানতে চান তবে আনন্দের সঙ্গে তা গ্রহণ করবো ,
উত্তর দেবারও চেষ্টা করবো ।
বিনয়ের সঙ্গে ,
দুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়
১৯-০১-২০২২
ব্যাঙ্গালোর ।
__________________________________________________________________________________
দ্বিতীয় পর্ব , একটি সাক্ষাৎকার এবং কবিতা ,
____________________________________
ফুলেশ্বরী নন্দিনী ,দ্বাদশ বার্ষিক সংখ্যা , পত্রিকা বা
বই যাই বলা যায় , তারই আলোচনা করে চলেছি ধারাবাহিক ভাবে । আজ সুচিপত্র অনুযায়ী "ভ্রমণকাহিনীকার গৌরীশঙ্কর ভট্টাচার্যের সাথে সাক্ষাৎকার।"
'ভ্রমনকাহিনী '-- সাহিত্য ভূমিখণ্ডের একটি পরিব্যাপ্ত স্থান আপন অধিকারে দখল করেছে । সেখানে শুধু ভূপ্রকৃতির ভৌগলিক বর্ণনা থাকে না , থাকে সেখানের মানব প্রকৃতি , তার ইতিহাস, ঐতিহ্য ,সংস্কৃতি ।
যেমন সুবোধ কুমার চক্রবর্তী মহাশয়ের 'রম্যানি বীক্ষ্য ' (চব্বিশটি পর্বে বিভক্ত ) একটি অত্যাশ্চর্য, ধ্রুপদী ( classic) ভ্রমন সাহিত্য । আছে প্রবোধ কুমার সান্যালের ' দেবতাত্মা হিমালয় ', শঙ্কু মহারাজের
'বিগলিত করুণা জাহ্নবী যমুনা ' হিমালয় , পাঁচ খন্ড -- এগুলি শিলিগুড়ি শহরের বহুতলের কোনো ছাত থেকে ওই হিমালয়েরই কোনো একটি "প্রাতঃসূর্যকিরণসম্পাতে" দিব্যোজ্বল ,তুষারমন্ডিত শীর্ষ মুকুট দেখার মতোই -- বিশ্বসাহিত্যের সূচিপত্রে ভ্রমন সাহিত্যের বিশালতা এতই অকল্পনীয় বিপুল, এবং বিচিত্র।
আরো , যেমনঃ
অন্নদাশঙ্কর রায়ের 'পথে প্রবাসে ', তারেক অনুর 'পৃথিবীর পথে পথে ', সৈয়দ মুজতবা আলীর 'পৃথিবীর পথে ' , Into the Heart of the Himalayas, by Jono Lineen, India The Journey, A Travel book on India, World Travel, by Anthony Bourdain, Travels Round The World, Great Journeys In History ,.. সিন্ধুর বিন্দু মাত্র। এমন শতেকখানি বই পড়ার পরে মনে হবে ,
................" বসি শুধু গৃহকোণে
লুব্ধচিত্তে করিতেছি সদা অধ্যয়ন
দেশ দেশান্তরে কারা করেছে ভ্রমন
কৌতূহলবশে ; আমি তাহাদের সনে
করিতেছি তোমারে বেষ্টন মনে মনে
কল্পনার জালে ।"
রবীন্দ্রনাথ, "সোনার তরী"।
বিশ্ব পথিকের এমনই ভ্রমন পিপাসা !
শ্রদ্ধেয় "গৌরীশঙ্কর ভট্টাচার্য মহাশয়ের সাথে একান্ত আলাপচারিতায়" যেহেতু ভ্ৰমণ কাহিনী আলোচনার অবকাশ অপ্রতুল তাই এ প্রসঙ্গ এখন এখানে থাক্ । আজ বরং, পত্রিকায় প্রকাশিত কবিতাগুলি নিয়েই বসা যাক্ ।
কবিতাগুলি চারটি পর্যায়ে সন্নিবিষ্ট । প্রথম পর্যায়ে পনেরটি, তার মধ্যে আজ দশটি পড়া হোক এবং আস্বাদন করি তাদের রূপ-রস-গন্ধ , দেখা যাক্ তাদের 'ভাবের ' হাবভাব। কবিতাগুলির বার্তা অনুধাবন করবার চেষ্টা করাই পাঠকের প্রথম এবং প্রধান কাজ ,তারপর কবিতা সম্পর্কে তাঁর নিজস্ব বক্তব্য তিনি বলতেই পারেন। সে অনুশাসন আমাকে মানতেই হবে ।
মানবোও ।
কবিতা এক --'নিজস্বী' ।
কবি লিখছেন : 'মারাত্মক কথাগুলো বিশ্লেষণ করছি গভীর আবেগে ';
শেষ করছেন একই বাক্য দিয়ে : 'মারাত্মক কথাগুলো ............গভীর আবেগে !'
'জ্যোৎস্নার রং', 'অলীক অনুভূতি ', 'আগাছার গলিপথে দু'চোখে হেঁটে চলি ', 'শূন্যতায় বসে থাকি একা একা ', ... স্বজন সঙ্গীবিহীন নিসঙ্গতার বিষাদ রয়েছে কবিতাটিতে ।
কবিতা দুই --'কৈশোরের বর্ণময় দিনগুলি ' ।
'বার বার ফিরে যাই কৈশোরের বর্ণময় দিনে' , শেষ করেছেন 'স্মৃতির কোটরে তার অস্তিত্ব পুষে রেখেছি কোন মতে ' ...। সেই , 'বিস্ময়ভরা অপার সমুদ্রে' ফিরে যেতে চান কবি ।
জীবনের দিনান্ত বেলার সূর্যাস্তের সোনালী আলো পড়েছে যেন সুদূর পূর্ব দিগন্তের প্রান্ত রেখায় । মনে হয় কবি বলছেন : স্মৃতি , তুমি বেদনার ।
কবিতা তিন -- 'বয়স যখন আটষট্টি',
'ভাটিতে সাঁতার কাটি' , নদীর রূপকল্পে জীবন পরিক্রমা।
'পুরুষ আমাকে নিয়ে যাচ্ছে সমাপ্তির আশ্রয়ে।'
যেখানে শুরু সেখানেই হারিয়ে যেতে"....।
উৎস ও সঙ্গম দ্বিধান্বিত । কিন্তু ফিরিবার পথ নাহি । জার্মান দার্শনিক শেকলে-র অসহায়তাবোধ ?
'পুরুষ', শব্দটি (?) রাখে।
কবিতা চার -- দিশা ,
তিনটি যতি চিহ্ন , তাও সপ্তদশ পংক্তিতে , অনুক্ত কথার ইঙ্গিৎবাহী' ---'
আর শেষের প্রশ্ন চিহ্নটি শূন্যতায় রয়েছে ভেসে । বর্তমান জীবনের দিশাহীনতার ইঙ্গিত ?
পঞ্চম কবিতা --'আমার পূজা',
শান্ত রসের কবিতা। সুখ-দুঃখ নিরপেক্ষ , আনন্দের কাছে আত্মসমর্পণ । ঠিক পয়ার ছন্দের মিল
নয় , অনির্দিষ্ট মিল । আধুনিক কবিতায় 'গরমিল' বলা ঠিক হবে না ।
ষষ্ঠ কবিতা --'বিশ্রাম',
দ্বিতীয় স্তবকের শেষ বাক্য ,
'শীঘ্রই তুলতে হবে যে রে
পান্না রঙের পটল আঁখি '
অবশ্যম্ভাবী পরিণামের ইঙ্গিত? আবার , মাতাল (?) সূর্যের সঙ্গে পৌষের মাঝ মাঠে জব্বর সংগ্রাম , তারাদের নৈশীক হাটে পূর্বসূরিরা সে কৌতুক দেখবেন । Symbolism ? হতেও পারে !
সপ্তম কবিতা -- পুনঃ +নবীকরণ = (পুনর্নবীকরণ )
'বেতো আরশোলা ', 'মুছে যাওয়া ছবি 'পুনঃ+ অঙ্কন , (শব্দ দুটির সন্ধি ?) , যাই হোক , মনের মধ্যে জটীল চিন্তার জন্ম দেয় । কবিতাটির রচয়িতা কি Franz Kafka (the German speaking Bohemian writer) দ্বারা প্রভাবিত ? তাঁর অসাধারণ ছোট গল্পটি, "The metamorphosis", কি তিনি পড়েছেন ? যদি জানতে পারি বা তিনি যদি জানান ,তবে কিছু বলবার আছে ।
অষ্টম কবিতা ---'সামগ্রিক'
একটি পূর্ণচ্ছেদ যতি চিহ্নে কবিতাটি শেষ ,
শূন্যের দৃশ্যে সমুদ্র অঙ্কন :
'শত স্রোতে দেখতে পাবে
শুরু -শেষ ,সামগ্রিক।'
বিপরীত রূপকল্পে খুঁজতে হবে কবিতাটির অর্থ ।
নবম কবিতা--- 'ওড়া',
একটি যতি চিহ্ন , পূর্ণচ্ছেদ , আর একটি ... অসম্পূর্ণতার চিহ্ন ।
অনুক্ত কিছু বলবার প্রয়াস , মনে হয় আফগানিস্থানের অমানবিক কিছু ঘটনার খবর কবির মনটিকে আলোড়িত করেছে ।
দশম কবিতা -- 'এখন গান্ধার দেশ ',
এখানেও , ওই আফগানিস্তানের বর্তমান মানবিকতাহীন ও উদারতাবোধশূন্য উপপ্লবের সরাসরি উপস্থাপনা ।
ফুলেশ্বরী নন্দিনীর ( দ্বাদশ বার্ষিক সংখ্যা ) সমস্ত কবিতার নাম উল্লেখ করার পর প্রয়াস থাকবে আধুনিক কবিতা ও আলোচিত কবিতাগুলির আঙ্গিক গঠন ও অন্তর্লীন ভাব নিয়ে সাধ্যমত কিছু বলার ।
দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
২১-০১-২০২২
ব্যাঙ্গালোর ।
___________________________________________________________________________________
২৩- ০১-২০২২
আজ প্রথম পর্যায়ের শেষ পাঁচটি কবিতা নিয়ে আলোচনা । আবার এ কথা স্বীকার করে নেওয়া সঙ্গত
যে , যে কবিতাগুলি নিয়ে আমি আলোচনা করছি সেগুলির ভাষায় ও ব্যঞ্জনায় , তাদের ভাব এবং রূপ যতখানি আমার কাছে ধরা পড়েছে , সেই সীমাবদ্ধতার মধ্যেই আমার মন্তব্য ও মতামত । বত্যয় বা ভ্রান্তি হয় যদি তবে , কবি তাঁর বক্তব্য রাখতেই পারেন । সেখানে উভয় তরফের ,লেখক আর পাঠকের, মাঝখানে, একটি অদৃশ্য বাক-সেতু গড়ে ওঠে ।
যায় হোক , এবার আসি কবিতায় ,
কবিতা এগারো , 'সোনার খাঁচা',
কবিতাটি একান্নবর্তী , সুস্থির ,সুস্থায়ী , বংশপরম্পরায় বহমান , পুরাতন শহর বা গ্রামের গৃহস্থ পরিবারের ছবি আঁকে । 'যতদিন বাঁচা ততদিন খাঁচা ' প্রবাদ বাক্যের ব্যঞ্জনায় 'সোনার খাঁচা' নামকরণটিও সার্থক ।
একটি যতিচিহ্নে (শেষে) কবিতাটি লেখা । যতিচিহ্নবিহীন লেখার চল সম্ভবতঃ কবি বিষ্ণু দে'র সময়কাল থেকে শুরু । দীর্ঘ বাক্যের অভ্যন্তরে
অন্তর -ছন্দের লয় ধরে রাখার দায় পাঠকের ।
কবিতা বারো , 'চিতা ',
বিশ্বমারির বীভৎস চিত্র চিত্রায়িত । ছন্দোবদ্ধতায় ভাষা প্রাঞ্জল , শেষে বিষাদবিধুর । পাঠকের মনে যন্ত্রণার অনুভূতি জাগাতে সক্ষম। 'আমি তো পারি না রক্ত ' -- অসম্পূর্ণ বাক্যটি কি বলতে চায় ?
কবিতা, তেরো , ' খুঁজে নেবে,'
'হারায় না সব কিছু , কিছু থেকে যায় '। 'ধানের বীজ', 'অলঙ্কার ' 'নিঃসঙ্গ নৌকা 'র মতো 'স্বপ্নের গরিমাকে' নিয়ে মানুষ তার আসল ঠিকানা খঁজে পাবে । শাশ্বত আশা নিয়ে বেঁচে থাকার প্রত্যয়ে কবিতাটি সুখপাঠ্য।
কবিতা--চোদ্দ , ' আমি মাটিতে ঘুমায় নি বলে '
উড়ে যাওয়া কাগজের লেখা পড়া যায় নি , নিথর সমুদ্র , ঢেউ ছিল না , পাতা ঝরা বৃদ্ধ গাছ , একটা নীরব অনুষ্ঠান -- (মানুষ ছিল না , না কি সঞ্চালক? ) , "মাটির কাছাকাছি" নামের (সম্ভবত )গ্রন্থটি পড়া হয় নি মাটিতে ঘুমানো হয়নি , তাই । আকাশে ওড়া চিলটি ঠিক চেনা যায় নি কী ?
কবিতাটিতে symbolism and abstraction–
( something which exists only as an idea) এমনভাবে জড়িয়ে আছে যে সাধারণ পাঠকের মনে বিপরীত চুম্বকীয় তরঙ্গের সৃষ্টি করতে বাধ্য ।
কবিতা -- পনের , 'স্টকহোম সিনড্রোম '
STOCKHOLM --capital of Sweden.
Syndrome = meaning no. 2 , A set of opinions or behavior that is typical of a particular
group of people.
Stockholm Syndrome means , a psychological condition that occurs when a victim of abuse identifies and attaches, or bonds, positively with their abuser. This syndrome was originally observed when hostages who were kidnapped not only bonded with their kidnappers but also fell in love with them.
এর সঙ্গে 'মদ আর মাধ্যাকর্ষণের' যোগ ঠিক কি , সাধারণ বাংলা "কাব্যি-পাঠকের" কাছে হঠাৎ দুর্বোধ্য ঠেকবেই, এ আমি হলপ করে বলতে পারি । "ল্যাটিউড, মন্ত্রপূত কমা , সেকুলার চরণামৃত , সেমিকোলন শরবৎ , ভাইটাল স্ট্যাট " .. সহ , সমাসব্দ্ধ পদগুলির প্রয়োগে মূল ভাবটিকে ধরতে, পাঠকের যথেষ্ট পরিমানে মস্তিষ্কের কসরৎ করার প্রয়োজন আছে বৈকি !
কবিতা-- ষোলো , 'অধরা মাধবী ', (মাধুরী ?)
আপেল ক্ষেতের রূপকল্পে পাঠকেরা ,বয়সের তারতম্য অনুযায়ী , মনে মনে 'ডোকো' ভরিয়ে তৃপ্ত
হবেন , আপেল রসে সম্পৃক্ত , চেরি ,ব্ল্যাকবেরি ,
খুঁজবেন । তা না পেলে , আপেলের চাইতে আরো কড়া রসের কিছু (ফল) না পেলে , মুখে আপেল বনের মহিমা কীর্তন করলেও সংগোপনে দীর্ঘশ্বাস ফেলবেন ওই না পাওয়া 'টসটসে ' রসালো ফলের জন্যই । ভোগবাদের চিত্রটি বেশ রগরগে । অপর দিকে অনাস্বাদিত প্রেমের' অধরা মাধুরী' তাদের কাছে নিশীর ডাক , যারা তারই জন্যে "ঘর করিলুঁ বাহির ,বাহির করিলুঁ ঘর ।" অবশ্য 'শক্তি- সম্বল -হীন অলি গলির নেশাড়ুদের ' ছবিও
ভাসে । কবিতাটি আধুনিক অবশ্যই ।
এই ছয়টি কবিতা নিয়েই আজ আলোচনার আসর ভাঙি । আগামী কাল দ্বিতীয় পর্যায়ের কবিতাগুলির সাথে পরিচয় করা যাবে । আর সবার শেষে সার্বিক পর্যালোচনা ।
আরও একটি কথা । 'সনেট ' নিয়ে যাঁরা জানতে চান তাঁরা "ফ্রান্সিসকো পেত্রার্কা , নবজাগরণের রাজকবি ", (Francesco Petrarch-1304--1374,The Renaissance Bard) লেখাটি একটি বার চোখ বুলিয়ে নিতে পারেন । Link টাও দেওয়া হোল ।
---_________________________________________________________________________________
২৫-০১-২০২২
______________
আজ দ্বিতীয় পর্যায়ের কবিতা গুলি নিয়ে আলোচনা । আরম্ভের আগে এই কথাটি বার বার বলতে চাই যে কবিতা যিনি লেখেন , অর্থাৎ কবি , তাঁর রচনাকালের সময়কালটি , বিশ্বসৃষ্টির আদিমতম অবস্থার মতোই উথালি-পাথালি। যাঁরা এখন সেই সৃষ্টিতে বিচরণ করছেন বা সৃষ্ট বিষয়টিকে ভোগ করছেন তাঁরা কি ভাবে অনুভব করবেন বিশ্বজননীর প্রসব যন্ত্রণা ? তবু এই সৃষ্টি নিয়ে ভোক্তারা কিছু না কিছু বলতেই থাকেন , নইলে সমাগত সন্তানটি ,এখানে কবির কবিতা , অভিমানী হয় ,উপেক্ষিত মনে করে নিজেকে । যাই হোক , আজ ,
কবিতা সতের -- 'বেঁচে থাকার সহজ পাঠ' ,
আলোহার ঘর ,সময়ের গোঙানি । তবে কী সঙ্গীবিহীন বিনিদ্র রজনীতে 'দেখো' সম্বোধনে নিজের সঙ্গে আলাপন ? অবশ্য গীতিকবিতার এটিই ধর্ম । বাকী অংশ জোত্স্নারাতের প্রকৃতি ,ঘরে বাইরে । একা,গল্পকথাদের স্মৃতিচারণায় কবির রাট কাটে -- সুখী রাত । এমন রাত (ব্রহ্ম্যের নাভীমূলে )
'অমর রহে' । সুন্দর কবিতা , নান্দনিক ।
কবিতা আঠারো --'ফিরে এসো '
'আফসোস' বলবো না , সত্যই অনুতাপের । জীবিকার জন্য জীবনপাত করে চলেছে 'যৌবন', আধুনিক যন্ত্রগণকের পর্দায় জ্বলে জ্বলে ওঠে তার ভাগ্যফলের উত্থান পতন । নিবিষ্ট মনে , অবনত মস্তকে তাই দেখে চলেছে বেচারা , লজ্জাজড়িমাকুন্ঠিত প্রেম উপেক্ষার অভিমান নিয়ে 'ফিরে যায়, হায়'! আবার যদি দেখা হয় তবে , আমার জগৎ ভরবে আলোয় । দরশে তো বটেই , পরশেও আমার প্রেমের এতোদিনের সাধনা , অতৃপ্ত কামনা "শেষ করে দাও", বলবো সেদিন । কবি জয়দেবের গীতগোবিন্দের 'মান' --
"স্মরগরলখন্ডনম "......, না থাক । জানিনা আধুনিক কবিবর কি ভাবে গ্রহণ করবেন !
তবে কবিতাটি রসালো ।
কবিতা ঊনিশ -- 'মাপজোখ ',
'মজে-যাওয়া ইচ্ছেনদী ' , নদীর রূপকল্পে বহমান ইচ্ছাগুলির তরঙ্গ হারিয়ে পল্বলে পরিণত হওয়ার দীর্ঘশ্বাস । "অহল্যার প্রতি" কবিতায় রবীন্দ্রনাথ লিখছেন ,
"হাসে পরিচিত হাসি নিখিল সংসার ।
তুমি চেয়ে নির্নিমেষ ; হৃদয় তোমার
কোন দূর কালক্ষেত্রে চলে গেছে একা
আপনার ধুলিলিপ্ত পদচিহ্নরেখা
পদে পদে চিনে চিনে !"
অহল্যার মুক্তি ঘটেছিল ।
"নবীন-শৈশব-স্নাত সম্পূর্ণ যৌবন " ফিরে পেয়েছিল সে । কিন্তু আধুনিক অহল্যাদের উচ্চরোল নারীমুক্তির আস্ফালনের অন্তরালে নারীত্বের নিষ্পেষণ চলে 'অলৌকিক জারিজুরিতে'! নারীত্ব এখনও সামাজিক রূঢ়তার পাষাণতলে মৌন ,মূক ,"পরখের ছল" সহ্য করে পড়ে থাকে --অর্ধমৃত ,অর্ধজাগরণে!
কবিতার কাঠামোটির দিকে আরো একটু মগ্ন দৃষ্টির প্রয়োজন ছিল । ভাবটিও ছিন্নমূল হয়েছে ,কিন্তু সাহসী ।
কবিতা কুড়ি --'শহরের সব গলিতে',
'শহরের গলিপথ'গুলির ছবি চমৎকার , প্রাণবন্ত । জুলেখা ,স্বপ্নদ্রষ্টা ইউসুফ -য়ের প্রেমের না-বলা বাণী
শুধু 'জানলার মরুপথে ' মরীচিকা তৃষ্ণা নিয়ে "ঝুরে" (নজরুলের শব্দকুসুম-- আহা! কবিতায় ও সঙ্গীতে প্রেম-বিরহের শব্দ প্রয়োগে বিস্ময় জাগানো কবি ) না কি ঝরে যায় ?
"চেয়ে চেয়ে দেখি ফোটে যবে ফুল ,
ফুল বলে না তো সে আমার ভুল ,
মেঘ হেরি' ঝুরে' চাতকিনী ,
------------------------------------
মেঘ করে না তো প্রতিবাদ।"
---কাজী নজরুল ইসলাম।
কবিতাটি "ময়মনসিংহ গীতিকা, জসীমউদ্দীনের নকশিকাঁথার মাঠ " মনে আনে ; কিন্তু অবশ্যই আধুনিক পরিবেশে মানানসই ,আধুনিক গঠনে । ভালো কবিতা ।
কবিতা একুশ ----'ওঠা -নামা ',
'বারান্দার কার্ণিশে দাঁড়িয়ে সে হাঁটে ',। 'দাঁড়িয়ে হাঁটা' , অবশ্যই মনের চলাচল , আর পৃথিবী ভেঙে পাতাল প্রবেশ। বহির্মুখীনতা আছে ; কিন্তু নিরুপায়, আবারো প্রাত্যহিকতার অন্ধ (পাতাল) প্রকোষ্ঠে ঢুকে যেতে হয়।
" বনের পাখি বলে,'না ,
আমি শিকলে ধরা নাহি দিব ।'
খাঁচার পাখি বলে , 'হায় ,
আমি কেমনে বনে বাহিরিব'।"
--------রবীন্দ্রনাথ।
সংসারের নিত্য নৈমিত্যিকতার খাঁচায় আবদ্ধ জীবনের শ্রান্তি কবি ও কবিতায় এক হয়ে জড়িয়ে রয়েছে ।
পাঁচটি বাক্য । একান্ত ব্যক্তিক অনুভবের কবিতা । সম্ভাবনাময় ।
কবিতা বাইশ --'নীলাম্বরী শরৎ ,
ক্বচিৎবর্ষণ , আকাশে শুভ্রমেঘখণ্ডের সঞ্চরণ , নদীর পাড়ে কানা ফুল , কাশ ফুলের দোলা । শরৎ এসেছে বাংলায় । সোনা রোদের অপরাহ্ন ,তারাভরা রাত, সকালে শিশিরসিক্ত শেফালী,তার সুবাসিত
বুকে ,শরতের সমস্ত- রূপ -রস সৌরভ নিয়ে , আকাশগাঙে ভাসা, মেঘের ভেলায় আসা কার প্রতীক্ষায় দিন গোনে ? আর কবি ?
নিসর্গ প্রকৃতির চিত্রায়ণ সুন্দর , কবিতাটিও সুখপাঠ্য।
কবিতা তেইশ -- 'খিদে অথবা প্রেমিকা বিষয়ক' ,
'খিদে' এখানে আক্ষরিক অর্থে না ধরে' , আলঙ্কারিক অর্থে বেশ মানিয়ে যায় । আঠাশ বছরের সময়- কালের বুভুক্ষা তো ! তার রূপটি তা হোলে বেশ ফুটে ওঠে ওই শেষ পংক্তিটিতে ,
'জীবন কোনো অশ্লীল শব্দ নয় '
নয়ই তো , এখানেই তো বাংলা কবিতার সাবালত্ব। এই ধারার সূচনা হয়েছে সেই কবে , সাহিত্যিক বুদ্ধদেব বসুর সময়কাল থেকেই। তবে প্রদীপ জ্বালানোর আগে সলতে পাকানোর কাজটি অবশ্য করে গিয়েছেন স্বয়ং
কবিগুরু। আর বিদেশে ? ১৮৫৭ সালে প্রকাশিত Charles Baudelaire, তাঁর Flowers of Evil কাব্যে,
"Don Juun in Hell", কবিতায় বলছেন,
"Women, their open dresses exposing pendant breasts,
Writhed under a dark sky and, like a herd of
sacrificial victims,
Let trail behind long drawn-out moan."
ভীষণ বুভুক্ষার ভয়ঙ্কর পরিণাম । বাংলা কবিতায় একটি দুঃসাহসিক প্রয়াস ।
কবিতার দ্বিতীয় অংশ , ।।২।।
এই অংশের প্রেমের তীব্র কামনা যদি ধরিত্রীর দিকে ধাবিত হয় ,তবে কবির শব্দ প্রয়োগ লক্ষ্যভেদী ।
হায়াৎ বা হায়াত , অর্থ = মেহেদী / জীবন,আয়ু ।
এর কবিতায় প্রযুক্ত অর্থটি যদি কবি আমাদের কাছে ব্যক্ত করেন তবে, কৃতজ্ঞ থাকবো অবশ্যই ।
আজ এখানেই বিরাম । আবার আগামীকাল কবিদের আসরে বসা যাবে ।
শুভরাত্রি ।
দুলাল বন্দোপাধ্যায়
২৫/০১/ '২০২২।
ব্যাঙ্গালোর ।
___________________________________________________________________________________
২৭--০১--২০২২
আজ কবিতা চব্বিশ থেকে আরম্ভ । ওই একই কথার পুনরাবৃত্তি । ভোগ আর ভোক্তা , দান আর দান-গ্রহীতার মধ্যে যে পার্থক্য , কবিতা আর কবিতাটির পাঠকের মধ্যেও তেমনই। ভোগের মধ্যে প্ৰদত্তার , দানের আর দত্তার , কবিতা ও কবিতা রচয়িতার যে ভালোবাসার সম্মন্ধ, ভোক্তা যিনি , তিনি তো তার বাইরে । তাই পাঠক হিসেবে আমার অনুভবে যতটুকু আসে তাই লিখি ।
কবিতা চব্বিশ --'দু'ফোঁটা চোখের জল ',
অশ্রুবিন্দু , দুঃখের বা সুখের , তা যেন প্রকৃতির দান । তা নিসর্গপ্রকৃতি হোক বা অন্তর -প্রকৃতি । মেঘ জানে দুফোঁটা বৃষ্টি সৃষ্টির সাধনের বেদনা , আর অন্তর জানে দু'ফোঁটা চোখের জলের অন্তরালে কি আনন্দ বেদনার আবেগ রয়েছে ঢাকা । তাই থাক্ তা সংগোপনে , সংযমের বাঁধনে বাঁধা ।
খুবই ভালো কবিতা , হৃদয়-নিঙড়ানো ।
কবিতা পঁচিশ --'দ্বন্দ্ব ',
কবিতাটিতে গৃহপরিত্যক্ত /পরিত্যক্তা জীবনের ছবি ভেসে ভেসে উঠছে । 'অলস জীবনে মনের গতির দায় নেওয়ার মধ্যে ছিন্নসূত্র সম্পর্কের নিরাবলম্বন , দায়হীন, ভাসমান ,ছন্দবিহীন প্রাণ ধারণের ছবি।
মিলন বিরহের দ্বান্দ্বিক , সরব বিক্ষোভের পর এখন Catharsis . "তুমি -আর আমি আছি ।"
ভালো লেখা , আবেগ প্রকাশের উপযুক্ত ছন্দ প্রয়োগ।
কবিতা ছাব্বিশ --'আরণ্যক ডুয়ার্সে শীত নামল',
হিমেল কুয়াশার অস্পষ্ট চাদরে মোড়া অরণ্য প্রকৃতি । তার আরণ্যক ,শীতাতুর জীবন ছন্দের রূপটি সুন্দর ও সুচিন্তিত শব্দের বাঁধনে বাঁধা একটি সুখপাঠ্য কবিতা। কবির নান্দনিক দৃষ্টি প্রশংসার দাবী রাখে।
কবিতা সাতাশ --' অনুচ্চারিত ',
"ভণিতাবিহীন অর্গলবিহীন" এবং যতিবিহীন কবিতাটিতে শব্দ ব্যবহারের মুনশিয়ানা যোগ্যতার দাবী
রাখে । এই Monologue - টির কর্তা ,Subject ,যদি হয় প্রেম , তবে অষ্টম পংক্তির মরদেহ শব্দটিতে 'এ-কার' (মরদেহে ) প্রয়োজন ছিল । সে যাক , কবিতাটি আধুনিক কবিতা । ভাবের মধ্যে তরল আবেগের প্রশ্রয় নেই ।
'কবিতা আঠাশ --'ছক ',
শিল্প' আছে আততায়ীর হত্যা কর্মটিতেও। হ্যাঁ , আছে । তা Macbeth নাটকে বেশ বোঝা যায় । কিন্তু কালিদাশের শকুন্তলা ভগ্নপ্রায় সিঁড়ি বেয়ে ফ্লিপ কভারের নিখাদ আড়ালে লুকিয়ে যাওয়ার ব্যাপারটি বেশ 'Brain storming'. বাকিটা এলোমেলো ভাবনার (আধুনিক মধ্যবিত্ত জীবনের ক্ষেত্রে সাযুজ্যপূর্ণ) ফসল । দ্বন্দ্বময় জীবনছন্দের কবিতা। বেশ ভালো ।
কবিতা ঊনত্রিশ --'মানচিত্র',
এই বাংলাদেশ'টি ঠিক কোন বাংলাদেশ, সেটির মানচিত্র জানলে বলে দেওয়া যেতো কবিতাটির অন্তর্নিহিত ভাব । তবে বাংলাদেশের এপার ওপার যে পারেই সনাতনরা থাক , আত্মপরিচয়ের স্বীকৃতির অভাব (Identity crisis) তাদের তাড়া করে' বেড়ায় । কবিতাটির বাক্যবিন্যাস সহজ ও সরল ।
ভালো কবিতা ।
কবিতা তিরিশ --'বসন্ত বিলাপ' ,
কবিতাটির আটটি কাপলেট ( যমক ) জুড়ে আটটি ভাবনার অভিব্যক্তি । পাঠক বোঝা- নাবোঝার দোলায় দুলতে থাকে । পলাশ গলিতে আর বসন্ত আসে না ; কিন্তু সেখানে 'ঐনিতম ' সাক্ষী থাকবে , না সাক্ষী রাখবে ? এই দ্বন্দ্বে কবিতাটি শেষ হয় । কবিতাটির বাঁধন আঁটোসাঁটো ।
কবিতা একত্রিশ ---'যন্ত্রনা ',
'অবিশ্বাসের' সর্বব্যাপী পরিবেশের ছবি উজ্বল রূপে শব্দ ও বাক্যের তুলিতে চিত্রায়িত । একান্ত ও শান্ত জীবনের অবকাশ শূন্যে বিলীন । কবির কাছ থেকে আরো ভালো কবিতা পাওয়ার সম্ভাবনা আছে ।
কবিতা বত্রিশ ,-- 'তোমার খোঁজে মন ',
একটি ঐকান্তিক ভাবে প্রেমের কাব্যকণা । অন্তরে বাহিরে 'তুমি শুধু তুমি '। কিন্তু শেষ হয় নিরাশায় । প্রেমিক বা প্রেমিকা সেই চিরকাঙ্ক্ষিত প্রেমের আশ্রয়ে চির অনাহুত । উপেক্ষিত ভালোবাসার করুণ কল্পমূর্তি বিষাদের রেশ রেখে যায় । রসঘন কবিতা ।
আজ এ পর্যন্ত । পরে আবার তৃতীয় পর্যায়ের কবিতাগুলির আলোচনা । তবে 'ফুলেশ্বরী নন্দিনীর' সদস্য ,পাঠক , পৃষ্টপোষক -- তাঁদের অনাগ্রহ আমাকে নিরুৎসাহিত করেছে অনেকখানি । ভালো না যদি লাগে তবে তা আমারই অক্ষমতা --একথা মেনে নিয়ে এ কাজটি থেকে অব্যাহতি চেয়ে বিদায় নেবো ।
যথাযোগ্য স্থানে নমস্কার এবং ভালোবাসা --,
দুলাল বন্দোপাধ্যায় ,
২৯-০১-২০২২
ব্যাঙ্গালোর ।
______________________________________________
০১ - ০২-২০২২
আজ তৃতীয় পর্যায়ের কবিতাগুলি নিয়ে আলোচনা । তৃতীয় পর্যায়ে কবিতা আছে নয়টি । আবারো বলি লেখক ও পাঠকের অনুভবের দুরত্যয় দূরত্ব স্বীকার করে নিয়েই এ আলোচনা । নির্দিষ্ট লক্ষ্যে আলোচকের কলম নাও পৌঁছাতে পারে । সে ক্ষেত্রে রচয়িতার অধিকার আছে জানান দেওয়ার ।
কবিতা তেত্রিশ -- জীবন যাপন ( কবিতাটি শেষে আলোচিত হয়েছে) ।
কবিতা চৌত্রিশ --নির্মাণ ,
কবিতাটির আরম্ভ খুবই সুন্দর -- সহজ ,সরল , দুর্বোধ্য শব্দের আড়ম্বর নেই । জীবনধারণ জীবনপালনের দুর্বহ দায় বহন করতে গিয়ে আপন সত্তাই যেন শতধা হয়ে যায় । রাত্রির একান্ত অবকাশে আবার পুনর্গঠন । কিন্তু নিঃঝুম রাতে হাতুড়ির 'ঠুক ঠুক' । একটু হোলেও মূল ভাবটিকে বিপন্ন করেছে ।
কবিতা পঁয়ত্রিশ -- আলোকিত ,
একটি সুন্দর ও সম্পূর্ণ গীতি কবিতা । একটি নির্দিষ্ট 'ভাব', রাতের বেলার কলি যেন সকাল বেলায় ফুল হয়ে ফুটেছে । কবিতা নির্মাণ থেকে চিত্ত বিচ্যুত হয়ে যায় নি । কবির ভবিষ্যৎ ফুলের মতোই বিকশিত হবে, আমার বিশ্বাস , তবে তা গভীর পাঠ ও অনুশীলন সাপেক্ষ ।
কবিতা ছত্রিশ -- বেলা অবেলার গল্প ,
স্বপ্নের অপমৃত্যু । বেশ দক্ষতার সঙ্গে উপস্থাপিত । ফুটি, ফুটি কৈশোরের সাধ , স্বপ্ন ,আবেগ , 'ডুব দিল হেঁসেলের নোন জলে' । ভারি সুন্দর , হৃদয়-মথিত হতাশার ছবি । আরো ভালো কবিতার অপেক্ষায় রইলাম ।
কবিতা সাঁইত্রিশ -- সমুদ্দরের ওপারে ,
বর্তমান ঝাড়খন্ড প্রদেশে আমার বাড়ী , আর মানভূম থেকে সিংভূম --এই অঞ্চলে আমার জীবনের ষাটটি বছর কেটেছে । পশ্চিম বাঁকুড়া , পুরুলিয়া, পশ্চিম বর্ধমানের প্রত্যন্ত অঞ্চলে যে ভাষা প্রচলিত , 'দুমকাইয়া বাংলা বা দাদরি' , সেই কথ্য ভাষায় কিছু লেখা যথেষ্ট অনুশীলনের অপেক্ষা রাখে ।
কবিতাটির ভাবটি বেশ ভালো ।
কবিতা আটত্রিশ -- আলো আঁধারের খেলা ,
স্বপ্নসুন্দর প্রেম , মিলন , প্রশ্ন ছিল ,তবু বালুচরে ঘর বাঁধা । আবার বিরহ এবং 'দুজনে দোহার (দোঁহার ) হবার প্রত্যাশা । যথোপযুক্ত শব্দ প্রয়োগের মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন কবি । ভবিষ্যতের জন্য শুভেচ্ছা রইল।
কবিতা ঊনচল্লিশ -- ভালোবাসার জ্বর হয়েছে ,
'বোদলেয়ার ও আধুনিক কবিতা' (বুদ্ধদেব বসু) , আধুনিকতা ও রবীন্দ্রনাথ (আবু সৈয়দ আইয়ুব) -- যাঁরা পড়েছেন তাঁরা জানেন , আধুনিক কবিদের শব্দচয়নের দক্ষতা । ফরাসি কবি মালার্মে ,ইংরেজ কবি ইয়েটস তো শব্দকে হাতুড়ির মতো ব্যবহার করে কবিতা গড়েছেন । ( তাঁদের সকল কবিতা একরকম নয় , শেষে পর্যালোচনায় তা নিয়ে লিখবো ।) এই কবিতার প্রথম স্তবক আশা জাগিয়েছিল যে বুভুক্ষার রূপটি , কিশোর কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের মতোই , বুঝে নিতে পারবো । কিন্তু "সৃষ্টির আদিগন্ত, গহনবেলা, আগুনের মশালে ছাই হয়ে যায় দুঃখী হৃদয়ের বিষাদ ,কুয়াশা মাখা ভোর , তখন নবীন সূর্যের আলো, তারপর তো ভালোবাসার জ্বর"-- এই সব শব্দ ও বাক্যাংশ বেশ দুষ্পাচ্য । তবে কবি শুধু আধুনিক নন , অত্যাধুনিক ---মানতে হবে ।
কবিতা চল্লিশ ---তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ ,
কবিতাটি চারটি স্তবকে ,পনের পংক্তিতে লেখা একটি গদ্য কবিতা । সকালের বহুরঙা আকাশ থেকে দুপুর, গোধূলি , নদী , কোনো এক কান্না --'বাউলের' , খসে পড়া রাত , গৃহহীনা হরিমাসী , তার বা কারো শ্মশান যাত্রা , আগমনীর সুর ,শরৎ ফুল(কাশ?) ---এতোসব চিত্রকল্পের কোলাজ ।
গদ্য কবিতা তো , বাক্যগুলির ব্যাকরণগত সুসংহতি থাকলে 'কুরুক্ষেত্রটির' ছবি সাধারণ পাঠকের মনেও আঁকা হয়ে যেতো ।
প্রথম কবিতাটি ছাড়া হয়ে গিয়েছিল , ওটি দিয়ে শেষ করি :
কবিতা তেতত্রিশ -- জীবন যাপন ,
Analog or analogue,
1. Relating to electronic information,
2.A person or thing that is like or comparable to another.
এখন কথা হলো , 'এঁকে যায় ' মানে 'সে' হোল শেষ বাক্যের কর্তা / subject .তা কি প্রেম ? সে আবার সেলফোন বিহীন । এবার মুশকিল , ধ্রুপদের দেরাজে নামা বিষ পানে নীলাভ রাতটিকে 'প্রেম'- য়ের বা প্রেমিক ধ্রুপদের সঙ্গে মেলানো যায় কি ভাবে, তাই ভাবছি । শুধু 'যাপন' , জীবনকে পাওয়া যাচ্ছে কই ?
আধুনিক কবিতা । গাঢ় ভাব, কড়া রস , চড়ায় বাঁধা ছন্দ , মিশ্র ভাষার শব্দ --- এসব নিয়েই আধুনিক কবিদের কাব্যকলা । মানতে হবে , নইলে মান হারাতে হবে । তবে ,বয়সের অধিকার নিয়ে বলি -- ঘুমে , জগরণে , একান্ত নিমগ্নতায় গড়া, কুম্ভকারের প্রতিমাটি যদি মৃন্ময়ী থেকে চিন্ময়ীতে জীবন্ত না হয়ে ওঠে, তবে শিল্পীর সাধনার মূল্য কোথায় ?
এরপর চতুর্থ পর্যায়ের কবিতাগুলি ।
দুলাল বন্দ্যোপাধ্যায় ,
০২--০২--২০২২
ব্যাঙ্গালোর।
___________________________________________________________________________________
আজ চতুর্থ পর্যায়ের কবিতাগুলি নিয়ে আলোচনা ।
কবিতা একচল্লিশ ---- দুর্গা ,
কবিতাটি একটি সরলমনা বালিকার গ্রাম থেকে পতিতাপল্লীতে আসা , বঞ্চনা ,ভোগ্য বস্তুতে রূপান্তরিত হওয়ার দুর্ভাগ্য বহন করা ---সরলরৈখিক পরিণতি । দুর্গা পূজায় পতিতাপল্লীর মাটি প্রয়োজন হোলেও পতিতা 'দুর্গারা' অপবিত্র কেন তবে ? এই শেষ প্রশ্নটিই কবিতাটির প্রাণ । ভালো লেখা ।
কবিতা বিয়াল্লিশ --দেখবি যদি গ্রাম চল শহরের মেয়ে ,
প্রায় এক শতাব্দী আগে এই বাংলায় যিনি এসেছেন এবং এখনও কলম হাতে লিখছেন , তাঁর লেখাটির আলোচনা করবার আগে তাঁর 'চরণে রাখি মাথা' । ওনার সমস্ত সত্তা জুড়ে তো গ্রাম , সুজলা -সুফলা , শ্যামশস্য-আনমিত দিগন্ত প্রসারিত মাঠ, উদার আকাশ, উন্মুক্ত প্রান্তর । এই স্মৃতিমেদুর অন্তরের ছবি মূর্ত রূপ ধারণ করেছে কবিতাটিতে । অলমিতি ।
কবিতা তেতাল্লিশ -- বৈষম্য ,
অভাব ও প্রাচুর্যের , দান ও বঞ্চনার , আনুকূল্য ও প্রতিকূলতার চিত্রগুলি সুন্দরভাবে আঁকা হয়েছে ।
রূঢ় বাস্তবতাই কবিতাটির রূপ ,রস এবং ভাব । বেশ ভালো ।
কবিতা চুয়াল্লিশ --প্রেম ,
হৃদয়-ভাসানো প্রেম-প্লাবনের বর্ণনা আকর্ষণীয় । মাঝের বাক্যগুলি 'মাত্রা' হারানো , পাড় -ডোবানো হলেও হাল ও পাল নিয়ে তরী ঠিক তীরে ভিড়েছে । বিরহে প্রেম অবনত হয় , ভেঙে পড়ে ,অনু পরমাণুর কাছে ভিক্ষা চায় । এখানে কর্তা আছে , 'কর্ম' ? কবি বলতেই পারেন , "আধুনিক কবিতার রহস্য" । আরো একটু বেশি মনোযোগের দরকার ছিল ।
কবিতা পঁয়তাল্লিশ -- আগমনী ,
এই কবিতাটি সম্ভবত কবির প্রথম প্রচেষ্টা । বয়সের অধিকারে তাঁকে বলি, আগমনীর আবেগ কবিতাটিতে পূর্ণ মাত্রায় আছে কিন্তু আরো পড়াশুনা ও অনুশীলনের মধ্য দিয়ে যেতে হবে ।
এখানেই আজ থামি । সবার শেষে কবিতা নিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ পর্যালোচনা থাকবে ।
১১-০২-২০২২,
ব্যাঙ্গালোর
---------------------------------------------------------------------------------------
১৫-০২-২০২২
কবিতা ছিচ্চলিশ -- রুদ্রাশিষ ,
রুদ্রের কাছে প্রার্থনার উপযুক্ত শব্দ এবং ছন্দ ব্যবহার করা হয়েছে । কিন্তু 'তব' , 'মম' , 'মোর' -- এই শব্দগুলি পরিহার করলেই আধুনিক কবির 'জীবনের স্পন্দন' -টি কবিতাটিতে স্পন্দিত হোত । কবি সম্ভবত এখনো ছাত্র , অতএব সম্ভাবনা ষোল আনা ।
কবিতা সাচ্চলিশ --'সবকিছুই হারিয়ে যায়',
কবিতাটি ছোট । কিছু সাধারণ জিনিস , ঘটনা -- হাতে পাই , ঘটে যায় ,তারপর হারিয়ে যায় । কবির উপলব্ধি সত্য এবং কবিতাটি সুলিখিত ।
কবিতা আটচল্লিশ --'মন' ,
মন নামক অদৃশ্য সত্তার উপস্থাপনা, বাক্য গঠন বেশ ভালো । 'পরাগমাখা' শব্দটি 'পরাগভরা' হলে সদর্থক হোত । কবির মনটিও স্বচ্ছ ।
কবিতা ঊনপঞ্চাশ -- স্বপ্ন ,
স্বপ্ন যেমন ছাড়া ছাড়া আসে , ঘুমে বা জাগরণে মনের আকাশে ভাসে , ঠিক তেমনি ভাবে কবিতাটিও লেখা হয়েছে । তবে মিল খুঁজতে গিয়ে মনন ও শব্দ প্রয়োগের সামঞ্জস্য বজায় থাকেনি । সেদিকে দৃষ্টি দিতে হবে ।
কবিতা পঞ্চাশ -- 'শুধু তোমার জন্য' ,
কবিতাটির তিনটি স্তবকের মধ্যে প্রথমটি সুগঠিত । দ্বিতীয়টিতে 'বিবমিষা সময়' , 'আপনজালা বিতান' --
ঠিক বোঝা গেলো না। কবি যা বলতে চেয়েছেন আর শব্দগুলির যা অর্থ তার মধ্যে দুস্তর দূরত্ব রয়ে
গেছে । তাড়াতাড়ি লেখার জন্য হয় নি তো ?
কবিতা একান্ন -- 'তুমি আছো বলেই',
কবিতাটি প্রেমের কবিতার আবেগে এমন একজন সামাজিক বা রাষ্ট্রীয় ব্যক্তিত্বকে উদ্দেশ করা হয়েছে যিনি 'গণদেবতা' । "এ দুর্যোগেও বেঁচে যায় মানুষগুলো" -- এই বাক্যটি সে কথাই বলে। লেখাটি বেশ ভালো হয়েছে । কবি প্রশংসার্হ ।
শেষে 'অবসর' নামে একটি মুক্ত গদ্য আছে । সদ্য কর্মজীবন থেকে অবসর নেওয়া মনের উপলব্ধি যেমন হয় সেটি সুন্দরভাবেই বর্ণিত হয়েছে ।
যাই হোক , আজ কবিতাগুলির শেষ পর্যায়ের আলোচনাও শেষ হোল ।
আমি আবার বলছি , এই কাজে যারপরনাই নিরুৎসাহিত বোধ করছি এই কারণেই যে , আগ্রহী পাঠকের সংখ্যা নিতান্তই সামান্য --জনা দুই-তিন হবে। এরপর ছোট গল্পের আলোচনা আরম্ভ হবে । এই আলোচনা বা সমালোচনা বিষয়টি যথেষ্ট গবেষণা ও সময়সাপেক্ষ । সংশ্লিষ্ট লেখক ও পাঠক যাঁরা , তাঁরা যদি পড়ার সময় না পেয়ে থাকেন ,তবে সে কথা জানিয়ে দিন । সময়টি আমি ভিন্ন কাজে ব্যবহার করার কথা চিন্তা করব । জীবনের গোধূলি লগ্নে আছি , সময়ও তো সীমিত ।
সকলকে বাসন্তী অভিবাদন জানিয়ে --
দুলাল বন্দ্যোপাধ্যায় ,
১৫-০২-২০২২,
ব্যাঙ্গালোর ।
_____________________________________________
'ফুলেশ্বরী নন্দিনী , দ্বাদশ বার্ষিক সংখ্যা' - য় প্রকাশিত প্রবন্ধ ও কবিতা গুলির আলোচনা শেষ হয়েছে ।
আজ ছোট গল্প নিয়ে কথা বলা আরম্ভ করি ।
বিজ্ঞানের বিস্ময়কর উন্নতি ব্যক্তিক জীবন থেকে সমাজজীবন , গোষ্ঠী সংস্কার থেকে সর্বজনীন মানব জাতির মননের বিবর্তন , বিগত অর্ধ শতাব্দী কালে এমনি ত্বরান্বিত করেছে যে সাহিত্য ,শিল্প , সংস্কৃতির কাঠামোগত ও বিষয়গত পরিবর্তন অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠেছে । বৃহদাকার উপন্যাস বা কাব্যের সমাদর গিয়েছে কমে । জীবন বিলম্বিত লয়ে , মন্দাক্রান্তা ছন্দে চলেনা , চলে দীপক রাগের তারানার তালে পা মিলিয়ে । এবং তা স্বাভাবিক , যুগের দাবী । আবরণ ,আভরণ-সুসজ্জিতা , দ্বিধায় জড়িত, অলক্তরাগ-রঞ্জিত চরণ বিক্ষেপে বাসরগামিনী পুত্রবধূকে পরদিনই যদি 'আমাজন' অফিসের একবিংশ তলায় হাজিরা দিতে হয় তবে , ঊনবিংশ শতকের মানসিকতা সম্পন্ন শ্বশুর মহাশয় বাসন্তিবাস পরা , অবগুণ্ঠিতা , কুণ্ঠিতা নবাগতার কম্পিত হাতের চায়ের পেয়ালা পাবেন কেমন করে ? তাঁকে বিমর্ষ মুখে , বারান্দায় বসে দেখতেই হবে স্বল্পবসনা পুত্রবধূর ঝটিতি চলন ,তড়িৎ-গমন । অতএব নান্যঃ পন্থা । ছোট গল্প , আরো ছোট গল্প না হলে ছোট ছোট সাহিত্য পত্রিকা অচল । আরো অনেক বিষয় আছে , যেগুলি এই আলোচনায় অপ্রাসঙ্গিক ।
এবার আসি আমাদের আলোচিত সাহিত্য পত্রিকার প্রথম ছোট গল্প 'পাখিমন' প্রসঙ্গে ।
বিচ্ছিরি এক রোগ এসেছে , ঘর হতে এখন আঙিনা বিদেশ । শমীর জীবনও হুইলচেয়ারে স্থানু । গল্পটিতে মানুষ চরিত্রগুলির চাইতে মুক্ত পাখিদের জীবনছন্দের চিত্রায়ণ অনেক বেশি উজ্জ্বল । নিসর্গ চিত্রও । সকালের সূর্যোদয় , বিকালের সূর্যাস্ত , শালিখ পাখিদের সামাজিক জীবন --এ সবই বেশ দক্ষতার সঙ্গে বর্ণনা করা হয়েছে । ভাই, ভাইবৌ , ভাইঝি -- এই ছোট সংসারেও দ্বন্দ্ব । তাই একাকীত্বের বলয়ের মধ্যে আবদ্ধ নায়ক বাঁচার খোরাক খোঁজে নিজেরই ভিতর ।
গল্পটিতে চরিত্রগুলির ভাবরূপ যথেষ্ট দক্ষতায় চিত্রনায়িত হয়েছে । ভাষাটিও আধুনিক । পরবর্তী গল্পের জন্য প্রতীক্ষায় রইলাম ।
দ্বিতীয় গল্প 'জোয়ার ভাটা' ,
ওহো ! দুঃসাহসি প্রয়াস !
সুবিনয় বোস , তানিয়া । পিতা পুত্রী । তানিয়ার মা অরুন্ধতী। সুবিনয় বোস, ছেড়ে আসা, ঝেড়ে ফেলা একদা রমনীর ( বন্ধুপত্নী, পরে স্ত্রী) গর্ভজাত মেয়ের সঙ্গে কামার্ত লালসা উপভোগের প্রাকমুহূর্তে
সন্দেহবিদ্ধ । পরে সত্য প্রকাশ এবং অনুতাপ ।'এত বড় অন্যায়, এত বড় পাপের কোন ক্ষমা হয় না' !
আজ থেকে প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে গ্রীক নাট্যকার সফোক্লিস তাঁর "অউদিপাউস টিরেনাস" নাটকে এমনই একটি সমাজ-সংসার-সংস্কার বিধ্বংসী ঘটনার অবতারণা করে গিয়েছেন যা আজও
অতি আধুনিক লেখকদের কলমও স্তব্ধ করে দিতে পারে ।
তবে 'জোয়ার ভাটা' গল্পটিতে যে অনুতাপদগ্ধ অন্তর্দাহ অভিপ্রেত , সেইটি যেন কিছুটা ম্লান ।
এখানেই আমাদের নাট্যকার রবীন্দ্রনাথ, কবি রবীন্দ্রনাথ একান্ত প্রাসঙ্গিক । এসব আলোচনা পরবর্তী কালে, শেষ পর্যায়ে, যদি ফুলেশ্বরী নন্দিনীর সদস্যগণ পড়েন এবং শুনতে চান ।
এই লেখকের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাময় ।
আজ এখানেই থামি ।
-
Recently published
অমূল্য
He ( Tagore) who sees all things in his own self and his own self in all things, he does not remain unrevealed. ...
-
বৈশাখী পূর্ণিমা (পরিবর্ধিত ও পরিমার্জিত) বিষণ্ণ সায়াহ্ন বেলা, ক্ষীণ জলধারা অজয়ের। পাড়ে আছি বসে। রৌদ্র-দহন-দগ্ধ পাথরের টিলা, আধ-ডোবা পানস...
-
শ্রীমদ্ভগবত গীতায় অর্জুন-১৩ শ্রীগীতার এই ত্রয়োদশ অধ্যায়টি " ক্ষেত্রক্ষেত্রজ্ঞবিভাগযোগ"। অধ্যায়টি জটীল ও এই যোগ জানায় পরমাত্ম...
-
শ্রীমদ্ভগবত, অর্জুন --পর্ব ১২ ভক্তিযোগ একাদশ অধ্যায় আমাদের সেখানেই শেষ হোল যেখানে শ্রীকৃষ্ণ ভগবান প্রাপ্তির সর্বশে...