রাময়ণে অবিচার ---চার
দ্বাদশ বৎসর পর শত্রুঘ্ন মধুপুরী থেকে অযোধ্যায় এলেন, অগ্রজ মহারাজ রামচন্দ্র এবং রাজপরিবার ও অযোধ্যাবাসীর সঙ্গে মিলিত হলেন। সপ্তরাত্রি এখানে বাস করে আবার স্বস্থাপিত রাজ্য মধুপুরী ফিরে গেলেন। রাজা রামচন্দ্র অপরাপর ভ্রাতৃগণের সঙ্গে সুখে রাজ্যপালন করতে লাগলেন।
এখানে মহাকবি দেখাতে চেয়েছেন যে মধ্যিখানের এই বার বছর বাল্মীকি আশ্রমে নির্বাসিতা ও উপেক্ষিতা সীতা দেবীর স্নেহাঞ্চলে, আর তপোঋদ্ধ মহাপ্রাণ বাল্মীকির আশ্রয়ে বাল্য থেকে কৈশোরে পদার্পণ করেছে রাজা রামের দুই সন্তান কুশ এবং লব।
এরপর রামরাজত্বে বহুবিধ ঘটনা সংঘটিত হতে লাগল। মহাকবি সে সবের বর্ণনা করেছেন। অগস্ত্য, সুদেব, সুদেবপুত্র শ্বেত, দন্ডকারণ্যের ইতিবৃত্ত, বৃত্র বধের নানা কাহিনী, পুরুরবার জন্ম কাহিনী, বিবিধ আখ্যান বর্ণনা করে মহাকবি বিপুল-ধরিত্রী ভারতবর্ষের সংস্কার, সংস্কৃতি, পুরাণ, দর্শন ও লোককথা উপস্থাপিত করেছেন। যুগ (বার বৎসর) অতিবাহিত হোল। যুগান্তর এল। রাম তাঁর রাজসভার ব্রাহ্মণ সদস্য -- বশিষ্ঠ বামদের, জাবালি কশ্যপদের আহ্বান করলেন, এবং অশ্বমেধ যজ্ঞ করবার অভিলাষ জানালেন। সকলের সম্মতিক্রমে নৈমিষক্ষেত্রে, গোমতী নদীর তীরে বৃহৎ যজ্ঞশালা নির্মিত হোল।
'রামচন্দ্রের অশ্বমেধ' যজ্ঞ বলে কথা। দেবতা দানব নর বানর সকলেই আমন্ত্রিত, নিমন্ত্রিত। তাছাড়াও বরাহূত রবাহূতরাও আছেন। সমস্ত দ্বিজকুল -- সস্ত্রীক মুনি, ঋষি, দেশের সকল রাজ পরিবার --- 'সবারে করি আহ্বান।' সে এক মহামচ্ছব।
রাম আদেশ দিলেন, পর্যাপ্ত তিল তন্ডুল মুদ্গ চনক কুলিত্থ মাষ ঘৃত তৈল গন্ধদ্রব্য বহন করে নিয়ে যাও যজ্ঞস্থানে। বহু কোটি সুবর্ণ রজত নিয়ে ভরত সর্বাগ্রে যাত্রা করলেন। দোকানী, নট-নর্তক-নর্তকী, পাচক, সহস্র যৌবনবতী নারী, ভৃত্য, কোষাধ্যক্ষ তারাও যাবে। আর যাবে রাম ভরত লক্ষ্মণ শত্রুঘ্নের মাতৃদেবীগণ। কিন্তু যজ্ঞারম্ভের পূর্বে যিনি যজমান তাঁকে তো সপত্নীক দীক্ষা নিতে হবে, সঙ্কল্প করতে হবে। স্ত্রীহীন রাজা কি ভাবে যজ্ঞ করতে পারেন ?
বিধানদাতা ব্রাহ্মণ, পুরোহিত তাঁরা তো রাজার বশংবদ ; তাহলে সমস্যা হবে কেন ? স্মৃতি শ্রুতি পালটে দাও।
কাঞ্চনীং মম পত্নীং চ দীক্ষায়াং জ্ঞাংশ্চ কর্মণি। অগ্রতো ভরতো কৃত্বা গচ্ছত্বগ্রে মহাযশা।।
দীক্ষার প্রয়োজনে আমার পত্নীর কাঞ্চনী প্রতিমা এবং কর্মজ্ঞ ব্রাহ্মণগণকে সম্মুখে রেখে মহাযশা ভরত অগ্রে গমন করুন।
(পুরুষোত্তম রাম সহধর্মিণীর স্বর্ণ প্রতিমাও স্পর্শ করবেন না। মনে রাখতে হবে বিশ্বের সর্বত্র রাজ্যের, সাম্রাজ্যের, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী মহানায়কদের নীতি-নিয়ম, বিচার-বিধান পরিবর্তন করার আস্পর্ধা কাল কালান্তর পেরিয়ে আজও পরিলক্ষিত হয়, হয়ে চলেছে।)
যাই হোক্ মহা সমারোহে রাজা রামচন্দ্রের অশ্বমেধ মহাযজ্ঞ বৎসরাধিক কাল পরে সমাপ্ত হোল। তেমন যজ্ঞ 'ন ভূতো ন ভবিষ্যতি'। মহাকবি লিখেছেন, নৃপশ্রেষ্ঠ রামের যজ্ঞ অতুলনীয়, ইন্দ্র চন্দ্র যম বরুণের যজ্ঞেও এমন আড়ম্বর, এমন বৈভব দেখা যায় নি।
মহর্ষি বাল্মীকিও তাঁর শিষ্যবর্গ সহকারে, কুশ ও লবকেও সঙ্গে নিয়ে এই মহোৎসবে এসেছিলেন। তিনি কুশ ও লবকেও আদেশ দিয়েছিলেন, বৎস, তোমরা এই সমস্ত জনপদমধ্যে, রাজপথে, আগত রাজাদের, মুনি-ঋষিদের ঋত্বিকদের, এবং রাজা রামচন্দ্রের ভবন প্রাঙ্গণেও তোমরা রামায়ণ কাব্য গাও। যদি তোমাদের গান শুনবার জন্য রাম তোমাদের আহ্বান করেন, আদেশ করেন তবে সে আদেশ অবশ্যই পালন করবে। এই সুমধুর সঙ্গীত বীণাযন্ত্র সহযোগে, মূর্ছনা সহকারে কাব্যের আদি থেকে গাইবে। যদি রামচন্দ্র জিজ্ঞাসা করেন, তোমরা কার সন্তান ? তোমরা উত্তর দিও , আমরা বাল্মীকির শিষ্য। মহর্ষি তাদের আরও একটি সঙ্কেতপুর্ণ কথা বলে দিলেন, রাম ধর্মত সকলের পিতা, তাঁকে অসম্মান করো না। অর্থাৎ তিনি বলেই দিলেন, রামকে তোমরা পিতা রূপেই জেনো, তাঁকে তেমন ভাবেই সম্মান ও শ্রদ্ধা প্রদর্শন করবে।
মহর্ষির উদ্দেশ্য অচিরেই বাস্তবায়িত হোল। একদিন যখন প্রভাতকালে কুশ লব দুই কিশোর স্নানস্নিগ্ধ হয়ে, মহর্ষি নির্দেশিত হোমাদি অনুষ্ঠান ও নিত্যকার সাধনা সমাপনান্তে নানাস্থানে রামায়ণ গান গেয়ে চলেছে তখন তাদের সেই 'বীণাধ্বনিসহকৃত দ্রুত -মধ্য-বিলম্বিত' লয়ে গীত অপূর্ব সঙ্গীত শুনে পুরবাসীজন কৌতুহল প্রকাশ করতে লাগলেন। এমন অনিন্দসুন্দর বালকেরা কে? রাজানুচরগণ রামচন্দ্রের নিকট সেই সংবাদ জানাল। রাজা রামচন্দ্রও কৌতূহল পরবশ হয়ে তাদের ডেকে পাঠালেন। তারা রাজসভায় এল। রাজাদেশে গান আরম্ভ করল। সমবেত ঋষি, রাজা, শাস্ত্রজ্ঞ পণ্ডিতগণ সেই অলৌকিক মধুর গান আবিষ্ট হয়ে শুনতে লাগলেন।
দৃষ্টা মুনিগণাঃ সর্বে পার্থিবাশ্চ মহৌযশঃ।
পিবন্ত ইব চক্ষুর্ভিঃ পশ্যন্তি স্ম মুহুর্মুহুঃ।।
ঊচুঃ পরস্পরং চেদং সর্ব এব সমাহিতাঃ।
উভৌ রামস্য সদৃশৌ বিম্বাৎ বিম্বম্ ইবোধৃতৌ।।
জটিলৌ যদি না স্যাতাং নং বল্কলধরৌ যদি।
বিশেষং নাধিগচ্ছামো গয়তো রাঘবস্য চ।।
রাজা রামচন্দ্রের সঙ্গে দুই কিশোরের সাদৃশ্য দেখেও রাজসভায় সমবেত মহাজনগণ বিমুগ্ধ, বিমোহিত। তাঁরা বালকদ্বয়ের রূপ চক্ষুর দ্বারা পান করতে লাগলেন।
(আহা! কী সুন্দর, কী অনবদ্য এই কবিত্ব)
তাঁরা একে অপরকে বলছেন, দেখ, দেখ, দুর্বাদলশ্যাম নবনীততনু এই কিশোরযুগল যেন রামেরই প্রতিবিম্ব।এরা যদি জটাবল্কল ধারী তাপস বালক না হোত তবে রামের সঙ্গে এই মধুকন্ঠী গায়কদের প্রভেদ আমরা বুঝতেই পারতাম না।
তাদের গান শুনে রামচন্দ্রও বিগলিতহৃদয়। তিনি আদেশ দিলেন, এদের অষ্টাদশ সহস্র স্বর্ণমূদ্রা এবং আরও যা তারা চায় উপহার স্বরূপ প্রদান কর। কুশ ও লব সবিনয়ে সমস্ত উপহার অস্বীকার করে বলে, আমরা ফল মূল আহার করি, আমরা বনবাসী। অর্থে সম্পদে আমাদের প্রয়োজন নেই। সভাস্থ সকলেই বিস্ময়ে হতবাক।
রাজা দশরথের পুত্র, বাল্য কৈশোরে রাজকীয় ঐশ্বর্যে প্রতিপালিত, বর্তমানে মহারাজ রঘুকুলপতি রামচন্দ্রের সঙ্গে তাঁরই সন্তান, ঋষির বনাশ্রমে লালিত বালকদ্বয়ের চিত্তবৃত্তির প্রভেদ কী অসাধারণভাবে প্রদর্শিত !
রামচন্দ্র নিদারুণ কৌতুহলাক্রান্ত। তাঁর কৌতুহল নিরসনের জন্য কিশোরযুগল রামায়ণ গান, তার রচয়িতা ও তাদের গুরু ভগবান পূজ্যপাদ মহর্ষি বাল্মীকির পরিচয় এবং রামায়ণ মহাকাব্যের বিস্তারিত বিবরণ ব্যাখ্যা করল। এও জানাল যে তাদের মাতৃদেবী ও গুরুদেব ভগবান বাল্মীকির সঙ্গেই তারা এখানে এসেছে।
রামচন্দ্র সমস্ত অবগত হওয়ার পর তাঁর প্রত্যয় জন্মাল যে বালকদুটি সীতার সন্তান। তিনি মহর্ষি বাল্মীকির নিকট দূত পাঠালেন এবং বলে দিলেন,
তোমরা ভগবান বাল্মীকির কাছে যাও এবং তাঁকে জানাও যে সীতা যদি শুদ্ধচারিণী, পাপহীনা হন তবে তিনি মহামুনির আজ্ঞা লাভ করে আত্মশুদ্ধির পরীক্ষা দিন। এই মহাযজ্ঞপরিষদে আমার ও সমবেত সকলের সমক্ষে শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে অংশ গ্রহণ করে আপন পবিত্রতা প্রমাণ করুন। এক্ষেত্রে সীতা ও মহর্ষির মনোগত ইচ্ছা কি আমাকে জানাতে বলুন।
(ভগবান বাল্মীকি শুদ্ধ সিদ্ধ মহাপ্রাণ। তিনি মান অভিমান অপমান, কামনা বাসনা, ক্রোধ ঈর্ষা -- এসবের ঊর্ধ্বে। তিনি জানালেন, তাই হবে। পতি নারীর দেবতা। রামের ইচ্ছাই সীতা শিরোধার্য করুন। এখানেই মহাকবি ও মহাকাব্যের মহিমা। কেননা তিনি যদি সীতার প্রতি রামের এই অনুজ্ঞার মধ্যে রাজা রামচন্দ্রের পুরুষত্বের রাজকীয় অহমিকার অনুসন্ধান করতেন এবং তা ব্যক্ত করতেন তবে পরোক্ষভাবে রামচন্দ্র ও রামরাজ্যবাসীদের সীতার সতীত্বের উপর সন্দেহকেই প্রশ্রয় দেওয়া হোত।)
পরদিন প্রভাতকালে রাম যজ্ঞশালায় গিয়ে উপস্থিত ও উপবিষ্ট হলেন। তাঁর রাজ্যসভায় নক্ষত্রমন্ডলীর মত মুনি ঋষি ধর্মবেত্তা শাস্ত্রজ্ঞ পণ্ডিতগণ সমুপস্থিত। আছেন বশিষ্ঠ জাবালি বিশ্বামিত্র কাশ্যপ পুলস্ত, দুর্বাসা, মার্কন্ডেয়, ভরদ্বাজ, গৌতম, নারদ। আছেন অতুল বিক্রম, মহাবল সব রাক্ষস, বানর, দেশ দেশান্তর হতে আগত কত রাজা মহারাজা। আছেন বহু সহস্র ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শূদ্র -- সীতাদেবীর পরীক্ষা দেখবার জন্য সকলে উৎসুক উদগ্রীব, উৎসুক্য-পীড়িত।
সমবেত বিপুল জনতা পাষাণবৎ নিশ্চল নীরব। তখন ভগবান বাল্মীকি, তাঁর কন্যাসমা চির দুঃখিনী সীতাকে নিয়ে সভাস্থলে ধীর পদক্ষেপে উপনীত হলেন।
এই অংশটি আদি কবির দেবভাষায় আরো একবার শুনুন,
তমৃষিং পৃষ্ঠতঃ সীতা অন্বগচ্ছদবাংমুখী।
কৃতাঞ্জলির্বাষ্পাকলা কৃত্বা রামং মনোগতম।।
তাং দৃষ্ট্বা শ্রুতিমায়ান্তীং ব্রহ্মাণংনুগামিনীম্।
বাল্মীকেঃ পৃষ্ঠতঃ সীতাং সাধুবাদো মহানভূত।।
ততো হলহলাশব্দঃ সর্বেষামেবমাবভৌ।
দুঃখজন্মবিশালেন শোকেনাকুলিতাত্মনাম্।।
অধোবদনী সীতাদেবী, কৃতাঞ্জলীবদ্ধ হস্তকমল, অশ্রুসিক্ত নয়নে রামচন্দ্রের ধ্যান করতে করতে মহর্ষির পশ্চাতে পশ্চাতে সভায় প্রবেশ করছেন। তপোঋদ্ধ, জ্ঞান ও প্রজ্ঞার জ্যোতির্ময় মূর্তি মহর্ষি বাল্মীকি ও তাঁর অনুবর্তিণী সীতা দেবীকে দেখে মনে হচ্ছে যেন স্রষ্ঠা ব্রহ্মার অনুগামিনী বেদপ্রকাশিনী বিদ্যা স্বয়ং।
( মহাকবি বাল্মীকির মূল রামায়ণেই শুধু নয়, পরবর্তী কালে, যুগ যুগান্তর ধরে যত রামায়ণ রচিত হয়েছে সর্বত্র পতিব্রতা বিষাদপাণ্ডুর সীতার চরিত্রমহিমার এমনি রূপ আমরা প্রত্যক্ষ করি। পবিত্রতম ও সুন্দরতম উপমায় সীতাচরিত্র অলঙ্কৃত। সুধী পাঠকগণের স্মরণে আছে আমাদের বাঙলার মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের অঙ্কিত সীতাসতী। পবিত্রতা এবং পাতিব্রত্যের মূর্ত প্রতিমা।
"একাকিনী শোকাকুলা, অশোক কাননে,
কাঁদেন রাঘব-বাঞ্ছা আঁধার কুটিরে
নীরবে ! দুরন্ত চেড়ী, সতীরে ছাড়িয়া,
ফেরে দূরে মত্ত সবে উন্মত্ত কৌতুকে ---
হীনপ্রাণা হরিণীরে রাখিয়া বাঘিনী
নির্ভয় হৃদয়ে যথা ফেরে দূর বনে !
মলিন-বদনা দেবী, হায় রে যেমতি
খনির তিমির-গর্ভে ( না পারে পশিতে
সৌরকররাশি যথা) সূর্যকান্ত মণি।
কিংম্বা বিম্বাধরা রমা অম্বুরাশি- তলে।
••••••••••••••••••••••••••••••••••••••••••••
•••••••••••••••••••••••••••••••••••••••••••••
একাকিনী বসি দেবী, প্রভা আভাময়ী
তমোময় ধামে যেন। ••••••••••••••••••
(সেখানে বিভীষণ পত্নী সরমা এলেন)
কৌটা খুলি, রক্ষোবধূ দিলা ফোঁটা
সীমন্তে ; সিন্দুর বিন্দু সোভিল ললাটে,
গোধূলি- ললাটে, আহা, তারা-রত্ন যথা।
ক্ষম লক্ষ্মী, ছুঁইনু ও দেব- আকাঙ্ক্ষিত
তনু ; কিন্তু চির-দাসী দাসী ও চরণে।
••••••••••••••••••••••••••••••••••••••••••
সুবর্ণ দেউটি
তুলুসীর মূলে যেন জ্বলিল, উজলি
দশ দিশ।
•••••••••••••••••••••••••••••••••••••••••
যথা গোমুখীর মুখ হইতে সুস্বনে
ঝরে পূত বারিধারা, কহিলা জানকী,
মধুরভাষিণী সতী," ••••••••••••••••••)
আমরা ফিরে আসি মূল কথায়।
কুশ লব রয়েছে। সীতাকে নিয়ে সভাস্থলে সমাগত হলেন ভগবান বাল্মীকি। বললেন, এই সেই পতিব্রতা ধর্মচারিণী সীতা, যাঁকে অপবাদের ভয়ে আমার আশ্রমের অনতিদূরে পরিত্যাগ করা হয়েছিল। রাম, তুমি লোকাপবাদের ভয়ে ভীত, এখন বল কী ইচ্ছা তোমার ? সীতা তোমার কিভাবে প্রত্যয় উৎপাদন করবেন ? জানকীর এই পুত্রদ্বয় তোমারই। প্রচেতার দশম পুত্র এই আমি কখনও মিথ্যার আশ্রয় গ্রহণ করিনি। সহস্র সহস্র বৎসর তপস্যা করে যে মহাধর্ম, যে পরমার্থ আমি লাভ করেছি তার সমস্ত সুফলের শপথ করে বলছি, মা মৈথিলী নিষ্কলঙ্কা। আমি পঞ্চ জ্ঞানেন্দ্রিয় এবং মন দিয়ে জেনে ছিলাম সীতা শুদ্ধচারিণী, পতিগতপ্রাণা। লোকাপবাদে তোমার চিত্ত কলুষিত হয়েছিল। এই কলুষযুক্ত মননে প্রিয়তমা স্ত্রীকে শুদ্ধা জেনেও তুমি ত্যাগ করেছ।
রাম মহর্ষির সত্য বাক্য শ্রবণ করলেন, স্বীকার করলেন, বরবর্ণিনী সীতার প্রতি দৃষ্টিপাত করলেন এবং বললেন এই 'যমজ কুশ লব আমারই পুত্র'। কিন্তু জনকাত্মজার 'শপথ ও অন্য পরীক্ষা যা আবশ্যক' -- এই রাজাদেশ বহাল রাখলেন।
সতীত্ব এবং পাতিব্রত্যের পরীক্ষা ! আবারও! কী বা বলবেন জানকী দেবী ? এখানে আমরা অতীতে আরও একবার ফিরে যাই,
রাবণ পরাজিত, নিহত। সীতা উদ্ধারের শুভ মুহূর্ত। হনুমান এসে রামের নিকট নিবেদন করলেন, আমাদের উদ্যোগ ও সংগ্রাম সফল। এই বিজয় সংবাদ শুনে মা সীতা আকুল নয়নে আমাকে বলছেন সত্ত্বর তিনি তাঁর ভর্তাকে দেখতে চান। রাম সম্মত হলেন কিন্তু সীতার উদ্বেগ ও আকুলতার মর্ম উপলব্ধি করেও আদেশ দিলেন তাঁকে শিরঃস্নান করিয়ে অঙ্গরাগে, বসনে ভূষনে অলঙ্কৃত করে শিবিকায় নিয়ে আসবেন বিভীষণ। তারপর আবার আদেশ দিলেন,
বিসৃজ্য শিবিকাং তস্মাৎ পদভ্যামেবাপসর্পতু।
সমীপে মম বৈদেহীং পশ্যন্ত্বেতে বনৌকসঃ।।
শিবিকা ছেড়ে পদব্রজে আসতে বলা হোক বৈদেহীকে। বনবাসী বানর ভল্লুকেরাও আমার সমীপে তাঁকে দেখুক।
বিভীষণ কিছু চিন্তান্বিত হলেন। রামের এই রূঢ় আদেশে লক্ষ্মণ সুগ্রীব হনুমানও অন্তরে বেদনা অনুভব করলেন। কিন্তু রামাদেশ ! বিজয়ী রাজার আদেশ। সীতাদেবীর এতদিনের আর্ত কামনায়, এত দিনের একান্ত সাধনায় যেন বজ্রপাত হোল। তবু অসহায়া নারী তাই করতে বাধ্য হোলেন যা তাঁর স্বামী চাইছেন।
অসহ লজ্জায় নিজের মধ্যেই লীন হয়ে, জীবন্ত শঙ্খ যেমন ভয়ে নিজের দেহবর্মের ভিতরে গুটিয়ে যায় তেমনি ভাবে কুন্ঠিতা জনকনন্দিনী রামের সম্মুখে আসছেন, তবুও বিস্ময়বিমুগ্ধ দুই চোখ দিয়ে স্নেহে ও আনন্দে পতিমুখ নিরীক্ষণ করছেন। 'পদ্মপলাশাক্ষী, কৃষ্ণকুঞ্চিতকেশা হৃদয়প্রিয়া জানকী' !
কিন্তু লোকাপবাদের ভয়ে রাম দ্বিধান্বিত। কী বলছেন তিনি,
তোমার মঙ্গল কামনা করি। যে যুদ্ধশ্রম দ্বারা, সুহৃদগণের বাহুবল দ্বারা তোমাকে মুক্ত করেছি তা তোমার জন্য করা হয়নি !
(পাঠক, মুহূর্তকাল চোখের পাতা বন্ধ করুন, শ্বাস প্রশ্বাস সংহরণ করুন। ধ্যানমগ্ন চিত্তে চতুর্দশ বৎসর যাবৎ প্রতীক্ষাদীর্ণা, রাম-অন্ত-প্রাণ বৈদেহীর চিত্তদাহের অগ্নিশিখার জ্বালা অনুভব করুন।)
আবারো বলছেন,
রক্ষতা তু ময়া বৃত্তমপবাদং চ সর্বতঃ।
প্রখ্যাতস্যাত্মবংশস্য ন্যঙ্গং চ পরিমার্জিত।।
প্রাপ্তচরিত্রসন্দেহা মম প্রতিমুখে স্থিতা।
রাবণাঙ্কপরিক্লিষ্টাং দৃষ্টাং দুষ্টেন চক্ষুষা।।
--- আত্মচরিত্র রক্ষার্থে, অপবাদ খন্ডনের নিমিত্তে, আমাদের সুবিখ্যাত বংশের গ্লানি দূরিভূত করবার প্রয়াসে তোমাকে উদ্ধার করেছি। দীপশিখা যেমন নেত্ররোগক্লিষ্ট মানুষের কাছে অসহ্য, আমার সম্মুখে তুমিও তেমনি কষ্টকর।
এখানেই থেমে থাকলেন না রাজা রামচন্দ্র। তিনি বলছেন,
রাবণ তোমাকে কুদৃষ্টিতে দেখেছে, রাবণের দ্বারা তুমি নিপীড়িতা হয়েছ, সেই ক্লিন্না তোমাকে গ্রহণ করলে আমার মহৎ বংশের উপর কলঙ্ক আরোপিত হবে। এখন তোমার প্রতি আমি আসক্তিহীন। আমার উদ্দেশ্য সফল, তোমাকে রাবণের কবল থেকে উদ্ধার করেছি। তুমি এখন যেখানে ইচ্ছা যেতে পার, যাকে তোমার মন চায় --- ভরত লক্ষ্মণ শত্রুঘ্ন সুগ্রীব বা বিভীষণ তাকে গ্রহণ করতে পার।
তুমি নিশ্চিত অপরিশুদ্ধা।
ন হি ত্বাং রাবণো দৃষ্ট্বা দিব্যরূপাং মনোরমাম।
মর্ষয়ত্যচিরং সীতে স্বগৃহে পর্যবস্থিতাম্।।
দিব্যরূপা, সুন্দরী সীতাকে স্বগৃহে পেয়ে রাবণ অধিক কাল ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করেন নি।
রাক্ষস বানর ভল্লুক, সেনা সেনাপতি, লক্ষ্মণ হনুমান বিভীষণ, ছোট বড় - - সমবেত সকলের মাঝে রামের মুখে এমন গর্হিত, এমন কদর্য ভাষা !
সীতার কাছে অকল্পনীয়। সহ্য করতে পারলেন না তিনি। তিনিও জনকরাজনন্দিনী। রাজকুলে জন্ম তাঁর, রাজকুলবধূ। তাঁর শ্রীমুখ থেকে নিঃসৃত বাণীর দীপশিখা,
কিং মামসদৃশং বাক্যমীদৃশং শ্রোত্রদারুনম্।
রুক্ষং শ্রাবয়সে বীর প্রাকৃতঃপ্রাকৃতমিব।।
------- এ কী কথা বলছ তুমি ! নীচ ব্যক্তি নীচ নারীকে যেমন বলে, হে বীর, তুমি আমাকে সেই রকম কর্কশ, অনুচিত ও কটু বাক্য শোনাচ্ছ কেন ?
---- কী ছিল তখন আমার অধীনে ? আমার হৃদয়, যা ছিল তুমিময়। কিন্তু পরায়ত্ত ছিল দেহ। তোমার আমার দীর্ঘকাল সংসর্গ হয়েছে, পরস্পর আমরা অনুরক্ত হয়েই দুই দেহ, দুই মন, দুই হৃদয় এক হয়ে থেকেছি। তাও যদি তুমি আমাকে বুঝতে না পার তবে আমার পক্ষে তা মরণ সমান। রাজর্ষি জনকের নামে আমার পরিচয়, আমি বসুন্ধরার কন্যা। তুমি সর্বজ্ঞাতা, কিন্তু আমার মহৎ চরিত্রের প্রতি কোন সম্মান প্রদর্শন করলে না। বাল্য কালে তুমি আমাকে বরণ করেছিলে, আমার পাণিগ্রহণ করেছিলে। আমার এতদিনের ভক্তি, আমার চরিত্র সব নস্যাৎ করে দিলে !
তারপর সীতা অশ্রুভারবিগলিত কণ্ঠে লক্ষ্মণকে বললেন,
চিতা প্রস্তুত কর, প্রীতিহীন স্বামীর দ্বারা অমি পরিত্যক্তা, আমি অগ্নিতে প্রবেশ করে প্রাণ বিসর্জন দিতে চাই।
সেদিন লঙ্কায় সীতার অগ্নিপরীক্ষা ! অগ্নি স্বয়ং এবং অন্যান্য দেবতাদের আগমন, রামকে ভর্ৎসনা, তাঁর স্বরূপ সন্ধানের উপদেশ -- বিরাট সে আখ্যানভাগ। কিন্তু বর্তমানে আমরা আবার ফিরে আসি অযোধ্যায়।
আজ আবার রাজা রামচন্দ্রের অশ্বমেধ যজ্ঞসভায় জনপদবাসী, রাজন্যবর্গ, কৌতুহলী অতিথি অভ্যাগতদের মাঝখানে সতীত্বের পরীক্ষা ! স্বয়ং মহর্ষি বাল্মীকির স্নেহে, শিক্ষায় পালিত, জ্ঞানে মানে ঋদ্ধ দুই সন্তান, রাম এই মাত্র যাদের পিতৃত্ব স্বীকার করেছেন, তাদের উপস্থিতিতে তাদের মাতৃদেবীর চরিত্র-শুদ্ধতার প্রমাণ ? রামের নিষ্ঠুর বিচারের আবারো আলোচনা, তাঁর চিত্তের মালিন্যকে আবারো ধিক্কার দিবেন কি জনকনন্দিনী ? তাঁর সন্তানদের ওই বিস্ময়বিস্ফারিত বিহ্বল দৃষ্টির সম্মুখে ! না, না।
কী আর প্রোয়োজন ধরাতলে ? তাঁর চেয়ে ----পতিগতপ্রাণা, তপঃঋদ্ধা, কাষায়বস্ত্র অবগুণ্ঠিতা, পবিত্রতায় বেদমাতা সমতুল্যা সীতাদেবীর কণ্ঠ হতে নিঃসৃত হোল শেষ বিদায় বাণী,--------
মনসা কর্মণা বাচা যথা রামং সমর্চয়ে।
তথা মে মাধবী দেবী বিবরং দাতুমর্হতি।।
যথৈতৎ সত্যমুক্তং মে বেদ্মি রামাহ পরং চ।
তথা মে মাধবী দেবী বিবরং দাতুমর্হতি।।
রঘুপতি রাঘব ভিন্ন অন্য কোন পুরুষকে মনে মনেও যদি না চিন্তা করে থাকি তবে হে মাধবী (হে ধরিত্রী দেবী), তুমি বিদীর্ণ হও। যদি মননে কর্মে বাক্যে একমাত্র রামকেই আরাধ্য দেবতা জ্ঞান করে থাকি, যদি পতিরূপে আমার জীবনে রামই পরম সত্য হয়ে থাকে তবে হে মাধবী, বিদীর্ণ হও।
বিবরং দাতুমর্হতি'--- এই মর্মবিদারী প্রার্থনা পরপর তিন বার ! (নারীর শেষের অবলম্বন তার জননী।) মা বসুধা, এই অবমাননা, এই লাঞ্ছনা আর সহ্য করতে পারছি না মা। দ্বিধা হও, চিরকালের মত তোমার গর্ভে আমায় ঠাঁই দাও মা গো ! ______________________________________________________
মূল বাল্মীকি রামায়ণে সীতা চরিত্রই প্রধান এবং এমন একটি বিষাদবিধুর (tragic) চরিত্র যা বিশ্ব সাহিত্যের কোথাও পরিদৃষ্ট হয় না।
ঋণ স্বীকার ---
মূল বাল্মীকি রামায়ণ,
বাল্মীকি রামায়ণ, সারানুবাদ --- রাজশেখর বসু।
ভাব গ্রহণ ---
উত্তর রামচরিত ---ভবভূতি
রঘুবংশ,--- কালিদাস
মেঘনাদবধ কাব্য--- মাইকেল মধুসূদন দত্ত।
এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক গ্রন্থরাজি।
(গবেষণামূলক এই লেখাটি পাঠ করার পর মতামত জানালে আনন্দ লাভ করব।)
দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
৯ই বৈশাখ, ১৪৩১
কলকাতা।
_____________________________________________