রবিবার, ২৮ এপ্রিল, ২০২৪

অপ্রকাশিত পাণ্ডুলিপি

অপ্রকাশিত পাণ্ডুলিপি

এখন রোজ রাতে দিন গুনি, লিখে রাখি
প্রতিটি দিনের স্বরলিপি --- আনন্দের বিষাদের,
মিলনের বিরহের, এমনকি রক্তদানের, রক্ত পানের।
যে সঙ্গীত বেজে ওঠে পথে ঘাটে, মাঠে ময়দানে,
নৈতিকতার সভামঞ্চে, ধর্ম-ধরার উন্মত্ত মিছিলে,
নৈমিত্তিক কুরুক্ষেত্রে আত্মহননের উন্মাদ তান্ডবে,
প্রকৃতি নিধনের খান্ডব দহনে --- সব লিখে রাখি।
লিখে রাখি দুর্বলের দুর্বিসহ ব্যথার বিলাপ,
লিখে রাখি সুজনের স্বার্থহীন সেবার প্রয়াস।
লাভ ক্ষতি, জয় পরাজয় যতি চিহ্নে রাখি পাশাপাশি।
জানি এই পাণ্ডুলিপি প্রকাশ পাবে না কোন দিনও।
চৈত্রের ঝরাপাতা বৈশাখের ঘূর্ণিঝড়ে যায় উড়ে,
আর কি ঠিকানা তার খোঁজ রাখে কেউ ?
বিস্মরণের দেব মহাকাল রয়েছেন জেগে, তাই বাঁচি।
আমার আখরগুলি স্বর্ণাক্ষর নয়, তারা কঠিন মাটিতে
আঁকা রক্তাক্ষর রেখা --- যাবে ধুয়ে বর্ষার নবজলধারে।
ব্যাকুল মনের কথা, সুচেতনা, কাকে বলি ? তাই,
অপ্রকাশ পাণ্ডুলিপি অভিমানে প্রকাশের প্রত্যাশা হারায়।

দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
১৫ই বৈশাখ, ১৪৩১
সোনামুখী।







সোমবার, ২২ এপ্রিল, ২০২৪

রামায়ণে অবিচার---চার

রাময়ণে অবিচার ---চার 

দ্বাদশ বৎসর পর শত্রুঘ্ন মধুপুরী থেকে অযোধ্যায় এলেন, অগ্রজ মহারাজ রামচন্দ্র এবং রাজপরিবার ও অযোধ্যাবাসীর সঙ্গে মিলিত হলেন। সপ্তরাত্রি এখানে বাস করে আবার স্বস্থাপিত রাজ্য মধুপুরী ফিরে গেলেন। রাজা রামচন্দ্র অপরাপর ভ্রাতৃগণের সঙ্গে সুখে রাজ্যপালন করতে লাগলেন। 


এখানে মহাকবি দেখাতে চেয়েছেন যে মধ্যিখানের এই বার বছর বাল্মীকি আশ্রমে নির্বাসিতা ও উপেক্ষিতা সীতা দেবীর স্নেহাঞ্চলে, আর তপোঋদ্ধ মহাপ্রাণ বাল্মীকির আশ্রয়ে বাল্য থেকে কৈশোরে পদার্পণ করেছে রাজা রামের দুই সন্তান কুশ এবং লব। 


এরপর রামরাজত্বে বহুবিধ ঘটনা সংঘটিত হতে লাগল। মহাকবি সে সবের বর্ণনা করেছেন। অগস্ত্য, সুদেব, সুদেবপুত্র শ্বেত, দন্ডকারণ্যের ইতিবৃত্ত, বৃত্র বধের নানা কাহিনী, পুরুরবার জন্ম কাহিনী, বিবিধ আখ্যান বর্ণনা করে মহাকবি বিপুল-ধরিত্রী ভারতবর্ষের সংস্কার, সংস্কৃতি, পুরাণ, দর্শন ও লোককথা উপস্থাপিত করেছেন। যুগ (বার বৎসর) অতিবাহিত হোল। যুগান্তর এল। রাম তাঁর রাজসভার ব্রাহ্মণ সদস্য -- বশিষ্ঠ বামদের, জাবালি কশ্যপদের আহ্বান করলেন, এবং অশ্বমেধ যজ্ঞ করবার অভিলাষ জানালেন। সকলের সম্মতিক্রমে নৈমিষক্ষেত্রে, গোমতী নদীর তীরে বৃহৎ যজ্ঞশালা নির্মিত হোল।
'রামচন্দ্রের অশ্বমেধ' যজ্ঞ বলে কথা। দেবতা দানব নর বানর সকলেই আমন্ত্রিত, নিমন্ত্রিত। তাছাড়াও বরাহূত রবাহূতরাও আছেন। সমস্ত দ্বিজকুল -- সস্ত্রীক মুনি, ঋষি, দেশের সকল রাজ পরিবার --- 'সবারে করি আহ্বান।' সে এক মহামচ্ছব। 

রাম আদেশ দিলেন, পর্যাপ্ত তিল তন্ডুল মুদ্গ চনক কুলিত্থ মাষ ঘৃত তৈল গন্ধদ্রব্য বহন করে নিয়ে যাও যজ্ঞস্থানে। বহু কোটি সুবর্ণ রজত নিয়ে ভরত সর্বাগ্রে যাত্রা করলেন। দোকানী, নট-নর্তক-নর্তকী, পাচক, সহস্র যৌবনবতী নারী, ভৃত্য, কোষাধ্যক্ষ তারাও যাবে। আর যাবে রাম ভরত লক্ষ্মণ শত্রুঘ্নের মাতৃদেবীগণ। কিন্তু যজ্ঞারম্ভের পূর্বে যিনি যজমান তাঁকে তো সপত্নীক দীক্ষা নিতে হবে, সঙ্কল্প করতে হবে। স্ত্রীহীন রাজা কি ভাবে যজ্ঞ করতে পারেন ? 

বিধানদাতা ব্রাহ্মণ, পুরোহিত তাঁরা তো রাজার বশংবদ ; তাহলে সমস্যা হবে কেন ? স্মৃতি শ্রুতি পালটে দাও।

কাঞ্চনীং মম পত্নীং চ দীক্ষায়াং জ্ঞাংশ্চ কর্মণি। অগ্রতো ভরতো কৃত্বা গচ্ছত্বগ্রে মহাযশা।। 

দীক্ষার প্রয়োজনে আমার পত্নীর কাঞ্চনী প্রতিমা এবং কর্মজ্ঞ ব্রাহ্মণগণকে সম্মুখে রেখে মহাযশা ভরত অগ্রে গমন করুন। 

(পুরুষোত্তম রাম সহধর্মিণীর স্বর্ণ প্রতিমাও স্পর্শ করবেন না। মনে রাখতে হবে বিশ্বের সর্বত্র রাজ্যের, সাম্রাজ্যের, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী মহানায়কদের নীতি-নিয়ম, বিচার-বিধান পরিবর্তন করার আস্পর্ধা কাল কালান্তর পেরিয়ে আজও পরিলক্ষিত হয়, হয়ে চলেছে।)
যাই হোক্ মহা সমারোহে রাজা রামচন্দ্রের অশ্বমেধ মহাযজ্ঞ বৎসরাধিক কাল পরে সমাপ্ত হোল। তেমন যজ্ঞ 'ন ভূতো ন ভবিষ্যতি'। মহাকবি লিখেছেন, নৃপশ্রেষ্ঠ রামের যজ্ঞ অতুলনীয়, ইন্দ্র চন্দ্র যম বরুণের যজ্ঞেও এমন আড়ম্বর, এমন বৈভব দেখা যায় নি। 

মহর্ষি বাল্মীকিও তাঁর শিষ্যবর্গ সহকারে, কুশ ও লবকেও সঙ্গে নিয়ে এই মহোৎসবে এসেছিলেন। তিনি কুশ ও লবকেও আদেশ দিয়েছিলেন, বৎস, তোমরা এই সমস্ত জনপদমধ্যে, রাজপথে, আগত রাজাদের, মুনি-ঋষিদের ঋত্বিকদের, এবং রাজা রামচন্দ্রের ভবন প্রাঙ্গণেও তোমরা রামায়ণ কাব্য গাও। যদি তোমাদের গান শুনবার জন্য রাম তোমাদের আহ্বান করেন, আদেশ করেন তবে সে আদেশ অবশ্যই পালন করবে। এই সুমধুর সঙ্গীত বীণাযন্ত্র সহযোগে, মূর্ছনা সহকারে কাব্যের আদি থেকে গাইবে। যদি রামচন্দ্র জিজ্ঞাসা করেন, তোমরা কার সন্তান ? তোমরা উত্তর দিও , আমরা বাল্মীকির শিষ্য। মহর্ষি তাদের আরও একটি সঙ্কেতপুর্ণ কথা বলে দিলেন, রাম ধর্মত সকলের পিতা, তাঁকে অসম্মান করো না।  অর্থাৎ তিনি বলেই দিলেন, রামকে তোমরা পিতা রূপেই জেনো, তাঁকে তেমন ভাবেই সম্মান ও শ্রদ্ধা প্রদর্শন করবে। 

 
মহর্ষির উদ্দেশ্য অচিরেই বাস্তবায়িত হোল। একদিন যখন প্রভাতকালে কুশ লব দুই কিশোর স্নানস্নিগ্ধ হয়ে, মহর্ষি নির্দেশিত হোমাদি অনুষ্ঠান ও নিত্যকার সাধনা সমাপনান্তে নানাস্থানে রামায়ণ গান গেয়ে চলেছে তখন তাদের সেই 'বীণাধ্বনিসহকৃত দ্রুত -মধ্য-বিলম্বিত' লয়ে গীত অপূর্ব সঙ্গীত শুনে পুরবাসীজন কৌতুহল প্রকাশ করতে লাগলেন। এমন অনিন্দসুন্দর বালকেরা কে?  রাজানুচরগণ রামচন্দ্রের নিকট সেই সংবাদ জানাল। রাজা রামচন্দ্রও কৌতূহল পরবশ হয়ে তাদের ডেকে পাঠালেন। তারা রাজসভায় এল। রাজাদেশে গান আরম্ভ করল। সমবেত ঋষি, রাজা, শাস্ত্রজ্ঞ পণ্ডিতগণ সেই অলৌকিক মধুর গান আবিষ্ট হয়ে শুনতে লাগলেন।

দৃষ্টা মুনিগণাঃ সর্বে পার্থিবাশ্চ মহৌযশঃ।
পিবন্ত ইব চক্ষুর্ভিঃ পশ্যন্তি স্ম মুহুর্মুহুঃ।।
ঊচুঃ পরস্পরং চেদং সর্ব এব সমাহিতাঃ।
উভৌ রামস্য সদৃশৌ বিম্বাৎ বিম্বম্ ইবোধৃতৌ।।
জটিলৌ যদি না স্যাতাং নং বল্কলধরৌ যদি।
বিশেষং নাধিগচ্ছামো গয়তো রাঘবস্য চ।। 


রাজা রামচন্দ্রের সঙ্গে দুই কিশোরের সাদৃশ্য দেখেও রাজসভায় সমবেত মহাজনগণ বিমুগ্ধ, বিমোহিত। তাঁরা বালকদ্বয়ের রূপ চক্ষুর দ্বারা পান করতে লাগলেন।
(আহা! কী সুন্দর, কী অনবদ্য এই কবিত্ব)
তাঁরা একে অপরকে বলছেন, দেখ, দেখ, দুর্বাদলশ্যাম নবনীততনু এই কিশোরযুগল যেন রামেরই প্রতিবিম্ব।এরা যদি জটাবল্কল ধারী তাপস বালক না হোত তবে রামের সঙ্গে এই মধুকন্ঠী গায়কদের প্রভেদ আমরা বুঝতেই পারতাম না।
তাদের গান শুনে রামচন্দ্রও বিগলিতহৃদয়। তিনি আদেশ দিলেন, এদের অষ্টাদশ সহস্র স্বর্ণমূদ্রা এবং আরও যা তারা চায় উপহার স্বরূপ প্রদান কর। কুশ ও লব সবিনয়ে সমস্ত উপহার অস্বীকার করে বলে, আমরা ফল মূল আহার করি, আমরা বনবাসী। অর্থে সম্পদে আমাদের প্রয়োজন নেই। সভাস্থ সকলেই বিস্ময়ে হতবাক। 

রাজা দশরথের পুত্র, বাল্য কৈশোরে রাজকীয় ঐশ্বর্যে প্রতিপালিত, বর্তমানে মহারাজ রঘুকুলপতি রামচন্দ্রের সঙ্গে তাঁরই সন্তান, ঋষির বনাশ্রমে লালিত বালকদ্বয়ের চিত্তবৃত্তির প্রভেদ কী অসাধারণভাবে প্রদর্শিত ! 

রামচন্দ্র নিদারুণ কৌতুহলাক্রান্ত। তাঁর কৌতুহল নিরসনের জন্য কিশোরযুগল রামায়ণ গান, তার রচয়িতা ও তাদের গুরু ভগবান পূজ্যপাদ মহর্ষি বাল্মীকির পরিচয় এবং রামায়ণ মহাকাব্যের বিস্তারিত বিবরণ ব্যাখ্যা করল। এও জানাল যে তাদের মাতৃদেবী ও গুরুদেব ভগবান বাল্মীকির সঙ্গেই তারা এখানে এসেছে।
রামচন্দ্র সমস্ত অবগত হওয়ার পর তাঁর প্রত্যয় জন্মাল যে বালকদুটি সীতার সন্তান। তিনি মহর্ষি বাল্মীকির নিকট দূত পাঠালেন এবং বলে দিলেন, 


তোমরা ভগবান বাল্মীকির কাছে যাও এবং তাঁকে জানাও যে সীতা যদি শুদ্ধচারিণী, পাপহীনা হন তবে তিনি মহামুনির আজ্ঞা লাভ করে আত্মশুদ্ধির পরীক্ষা দিন। এই মহাযজ্ঞপরিষদে আমার ও সমবেত সকলের সমক্ষে শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে অংশ গ্রহণ করে আপন পবিত্রতা প্রমাণ করুন। এক্ষেত্রে সীতা ও মহর্ষির মনোগত ইচ্ছা কি আমাকে জানাতে বলুন।

(ভগবান বাল্মীকি শুদ্ধ সিদ্ধ মহাপ্রাণ। তিনি মান অভিমান অপমান, কামনা বাসনা, ক্রোধ ঈর্ষা -- এসবের ঊর্ধ্বে। তিনি জানালেন, তাই হবে। পতি নারীর দেবতা। রামের ইচ্ছাই সীতা শিরোধার্য করুন। এখানেই মহাকবি ও মহাকাব্যের মহিমা। কেননা তিনি যদি সীতার প্রতি রামের এই অনুজ্ঞার মধ্যে রাজা রামচন্দ্রের পুরুষত্বের রাজকীয় অহমিকার অনুসন্ধান করতেন এবং তা ব্যক্ত করতেন তবে পরোক্ষভাবে রামচন্দ্র ও রামরাজ্যবাসীদের সীতার সতীত্বের উপর সন্দেহকেই প্রশ্রয় দেওয়া হোত।)

পরদিন প্রভাতকালে রাম যজ্ঞশালায় গিয়ে উপস্থিত ও উপবিষ্ট হলেন। তাঁর রাজ্যসভায় নক্ষত্রমন্ডলীর মত মুনি ঋষি ধর্মবেত্তা শাস্ত্রজ্ঞ পণ্ডিতগণ সমুপস্থিত। আছেন বশিষ্ঠ জাবালি বিশ্বামিত্র কাশ্যপ পুলস্ত, দুর্বাসা, মার্কন্ডেয়, ভরদ্বাজ, গৌতম, নারদ। আছেন অতুল বিক্রম, মহাবল সব রাক্ষস, বানর, দেশ দেশান্তর হতে আগত কত রাজা মহারাজা। আছেন বহু সহস্র ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শূদ্র -- সীতাদেবীর পরীক্ষা দেখবার জন্য সকলে উৎসুক উদগ্রীব, উৎসুক্য-পীড়িত। 
সমবেত বিপুল জনতা পাষাণবৎ নিশ্চল নীরব। তখন ভগবান বাল্মীকি, তাঁর কন্যাসমা চির দুঃখিনী সীতাকে নিয়ে সভাস্থলে ধীর পদক্ষেপে উপনীত হলেন।
এই অংশটি  আদি কবির দেবভাষায় আরো একবার শুনুন, 

তমৃষিং পৃষ্ঠতঃ সীতা অন্বগচ্ছদবাংমুখী।
কৃতাঞ্জলির্বাষ্পাকলা কৃত্বা রামং মনোগতম।।
তাং দৃষ্ট্বা শ্রুতিমায়ান্তীং ব্রহ্মাণংনুগামিনীম্।
বাল্মীকেঃ পৃষ্ঠতঃ সীতাং সাধুবাদো মহানভূত।।
ততো হলহলাশব্দঃ সর্বেষামেবমাবভৌ।
দুঃখজন্মবিশালেন শোকেনাকুলিতাত্মনাম্।।

অধোবদনী সীতাদেবী, কৃতাঞ্জলীবদ্ধ হস্তকমল, অশ্রুসিক্ত নয়নে রামচন্দ্রের ধ্যান করতে করতে মহর্ষির পশ্চাতে পশ্চাতে সভায় প্রবেশ করছেন। তপোঋদ্ধ, জ্ঞান  ও  প্রজ্ঞার জ্যোতির্ময় মূর্তি মহর্ষি বাল্মীকি ও তাঁর অনুবর্তিণী সীতা দেবীকে দেখে মনে হচ্ছে যেন স্রষ্ঠা ব্রহ্মার অনুগামিনী বেদপ্রকাশিনী বিদ্যা স্বয়ং। 

( মহাকবি বাল্মীকির মূল রামায়ণেই শুধু নয়, পরবর্তী কালে, যুগ যুগান্তর ধরে যত রামায়ণ রচিত হয়েছে সর্বত্র পতিব্রতা বিষাদপাণ্ডুর সীতার চরিত্রমহিমার এমনি রূপ আমরা প্রত্যক্ষ করি। পবিত্রতম ও সুন্দরতম উপমায় সীতাচরিত্র অলঙ্কৃত। সুধী পাঠকগণের স্মরণে আছে আমাদের বাঙলার মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের অঙ্কিত সীতাসতী। পবিত্রতা এবং পাতিব্রত্যের মূর্ত প্রতিমা। 


"একাকিনী শোকাকুলা, অশোক কাননে,
কাঁদেন রাঘব-বাঞ্ছা আঁধার কুটিরে
নীরবে ! দুরন্ত চেড়ী, সতীরে ছাড়িয়া,
ফেরে দূরে মত্ত সবে উন্মত্ত কৌতুকে ---
হীনপ্রাণা হরিণীরে রাখিয়া বাঘিনী
নির্ভয় হৃদয়ে যথা ফেরে দূর বনে !
মলিন-বদনা দেবী, হায় রে যেমতি
খনির তিমির-গর্ভে ( না পারে পশিতে
সৌরকররাশি যথা) সূর্যকান্ত মণি।
কিংম্বা বিম্বাধরা রমা অম্বুরাশি- তলে।
••••••••••••••••••••••••••••••••••••••••••••
•••••••••••••••••••••••••••••••••••••••••••••
একাকিনী বসি দেবী, প্রভা আভাময়ী
তমোময় ধামে যেন। ••••••••••••••••••
(সেখানে বিভীষণ পত্নী সরমা এলেন)
কৌটা খুলি, রক্ষোবধূ দিলা ফোঁটা
সীমন্তে ; সিন্দুর বিন্দু সোভিল ললাটে,
গোধূলি- ললাটে, আহা, তারা-রত্ন যথা।
ক্ষম লক্ষ্মী, ছুঁইনু ও দেব- আকাঙ্ক্ষিত
তনু ; কিন্তু চির-দাসী দাসী ও চরণে।
••••••••••••••••••••••••••••••••••••••••••
                                 সুবর্ণ দেউটি
তুলুসীর মূলে যেন জ্বলিল, উজলি
দশ দিশ।
•••••••••••••••••••••••••••••••••••••••••
  যথা গোমুখীর মুখ হইতে সুস্বনে
ঝরে পূত বারিধারা, কহিলা জানকী,
মধুরভাষিণী সতী," ••••••••••••••••••) 


আমরা ফিরে আসি মূল কথায়।
কুশ লব রয়েছে। সীতাকে নিয়ে সভাস্থলে সমাগত হলেন ভগবান বাল্মীকি। বললেন, এই সেই পতিব্রতা ধর্মচারিণী সীতা, যাঁকে অপবাদের ভয়ে আমার আশ্রমের অনতিদূরে পরিত্যাগ করা হয়েছিল। রাম, তুমি লোকাপবাদের ভয়ে ভীত, এখন বল কী ইচ্ছা তোমার ? সীতা তোমার কিভাবে প্রত্যয় উৎপাদন করবেন ? জানকীর এই পুত্রদ্বয় তোমারই। প্রচেতার দশম পুত্র এই আমি কখনও মিথ্যার আশ্রয় গ্রহণ করিনি। সহস্র সহস্র বৎসর তপস্যা করে যে মহাধর্ম, যে পরমার্থ আমি লাভ করেছি তার সমস্ত সুফলের শপথ করে বলছি, মা মৈথিলী নিষ্কলঙ্কা। আমি পঞ্চ জ্ঞানেন্দ্রিয় এবং মন দিয়ে জেনে ছিলাম সীতা শুদ্ধচারিণী, পতিগতপ্রাণা। লোকাপবাদে তোমার চিত্ত কলুষিত হয়েছিল। এই কলুষযুক্ত মননে প্রিয়তমা স্ত্রীকে শুদ্ধা জেনেও তুমি ত্যাগ করেছ। 


রাম মহর্ষির সত্য বাক্য শ্রবণ করলেন, স্বীকার করলেন, বরবর্ণিনী সীতার প্রতি দৃষ্টিপাত করলেন এবং বললেন এই 'যমজ কুশ লব আমারই পুত্র'। কিন্তু জনকাত্মজার 'শপথ ও অন্য পরীক্ষা যা আবশ্যক' -- এই রাজাদেশ বহাল রাখলেন।
সতীত্ব এবং পাতিব্রত্যের পরীক্ষা ! আবারও! কী বা বলবেন জানকী দেবী  ? এখানে আমরা অতীতে আরও একবার ফিরে যাই, 

রাবণ পরাজিত, নিহত। সীতা উদ্ধারের শুভ মুহূর্ত। হনুমান এসে রামের নিকট নিবেদন করলেন, আমাদের উদ্যোগ ও সংগ্রাম সফল। এই বিজয় সংবাদ শুনে মা সীতা আকুল নয়নে আমাকে বলছেন সত্ত্বর তিনি তাঁর ভর্তাকে দেখতে চান। রাম সম্মত হলেন কিন্তু সীতার উদ্বেগ ও আকুলতার মর্ম উপলব্ধি করেও আদেশ দিলেন তাঁকে শিরঃস্নান করিয়ে অঙ্গরাগে, বসনে ভূষনে অলঙ্কৃত করে শিবিকায় নিয়ে আসবেন বিভীষণ। তারপর আবার আদেশ দিলেন, 

বিসৃজ্য শিবিকাং তস্মাৎ পদভ্যামেবাপসর্পতু।
সমীপে মম বৈদেহীং পশ্যন্ত্বেতে বনৌকসঃ।।

শিবিকা ছেড়ে পদব্রজে আসতে বলা হোক বৈদেহীকে। বনবাসী বানর ভল্লুকেরাও আমার সমীপে তাঁকে দেখুক।
বিভীষণ কিছু চিন্তান্বিত হলেন।  রামের এই রূঢ় আদেশে লক্ষ্মণ সুগ্রীব হনুমানও অন্তরে বেদনা অনুভব করলেন। কিন্তু রামাদেশ ! বিজয়ী রাজার আদেশ। সীতাদেবীর এতদিনের আর্ত কামনায়, এত দিনের একান্ত সাধনায় যেন বজ্রপাত হোল। তবু অসহায়া নারী তাই করতে বাধ্য হোলেন যা তাঁর স্বামী চাইছেন।

অসহ লজ্জায় নিজের মধ্যেই লীন হয়ে, জীবন্ত শঙ্খ যেমন ভয়ে নিজের দেহবর্মের ভিতরে গুটিয়ে যায় তেমনি ভাবে কুন্ঠিতা জনকনন্দিনী রামের সম্মুখে আসছেন, তবুও বিস্ময়বিমুগ্ধ দুই চোখ দিয়ে স্নেহে ও আনন্দে পতিমুখ নিরীক্ষণ করছেন। 'পদ্মপলাশাক্ষী, কৃষ্ণকুঞ্চিতকেশা হৃদয়প্রিয়া জানকী' !

কিন্তু লোকাপবাদের ভয়ে রাম দ্বিধান্বিত। কী বলছেন তিনি,
তোমার মঙ্গল কামনা করি। যে যুদ্ধশ্রম দ্বারা, সুহৃদগণের বাহুবল দ্বারা তোমাকে মুক্ত করেছি তা তোমার জন্য করা হয়নি !

(পাঠক, মুহূর্তকাল চোখের পাতা বন্ধ করুন, শ্বাস প্রশ্বাস সংহরণ করুন। ধ্যানমগ্ন  চিত্তে চতুর্দশ বৎসর যাবৎ প্রতীক্ষাদীর্ণা, রাম-অন্ত-প্রাণ বৈদেহীর চিত্তদাহের অগ্নিশিখার জ্বালা অনুভব করুন।)

আবারো বলছেন, 

রক্ষতা তু ময়া বৃত্তমপবাদং চ সর্বতঃ।
প্রখ্যাতস্যাত্মবংশস্য ন্যঙ্গং চ পরিমার্জিত।।
প্রাপ্তচরিত্রসন্দেহা মম প্রতিমুখে স্থিতা।
রাবণাঙ্কপরিক্লিষ্টাং দৃষ্টাং দুষ্টেন চক্ষুষা।।

--- আত্মচরিত্র রক্ষার্থে, অপবাদ খন্ডনের নিমিত্তে, আমাদের সুবিখ্যাত বংশের গ্লানি দূরিভূত করবার প্রয়াসে তোমাকে উদ্ধার করেছি। দীপশিখা যেমন নেত্ররোগক্লিষ্ট মানুষের কাছে অসহ্য, আমার সম্মুখে তুমিও তেমনি কষ্টকর।

এখানেই থেমে থাকলেন না রাজা রামচন্দ্র। তিনি বলছেন, 

রাবণ তোমাকে কুদৃষ্টিতে দেখেছে, রাবণের দ্বারা তুমি নিপীড়িতা হয়েছ, সেই ক্লিন্না তোমাকে গ্রহণ করলে আমার মহৎ বংশের উপর কলঙ্ক আরোপিত হবে। এখন তোমার প্রতি আমি আসক্তিহীন। আমার উদ্দেশ্য সফল, তোমাকে রাবণের কবল থেকে উদ্ধার করেছি। তুমি এখন যেখানে ইচ্ছা যেতে পার, যাকে তোমার মন চায় --- ভরত লক্ষ্মণ শত্রুঘ্ন সুগ্রীব বা বিভীষণ তাকে গ্রহণ করতে পার।
তুমি নিশ্চিত অপরিশুদ্ধা।

ন হি ত্বাং রাবণো দৃষ্ট্বা দিব্যরূপাং মনোরমাম।
মর্ষয়ত্যচিরং সীতে স্বগৃহে পর্যবস্থিতাম্।।
দিব্যরূপা, সুন্দরী সীতাকে স্বগৃহে পেয়ে রাবণ অধিক কাল ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করেন নি।

রাক্ষস বানর ভল্লুক, সেনা সেনাপতি, লক্ষ্মণ হনুমান বিভীষণ, ছোট বড় - - সমবেত সকলের মাঝে রামের মুখে এমন গর্হিত, এমন কদর্য ভাষা !
সীতার কাছে অকল্পনীয়। সহ্য করতে পারলেন না তিনি। তিনিও জনকরাজনন্দিনী। রাজকুলে জন্ম তাঁর, রাজকুলবধূ। তাঁর শ্রীমুখ থেকে নিঃসৃত বাণীর দীপশিখা,

কিং মামসদৃশং বাক্যমীদৃশং শ্রোত্রদারুনম্।
রুক্ষং শ্রাবয়সে বীর প্রাকৃতঃপ্রাকৃতমিব।। 

------- এ কী কথা বলছ তুমি ! নীচ ব্যক্তি নীচ নারীকে যেমন বলে, হে বীর, তুমি আমাকে সেই রকম কর্কশ, অনুচিত ও কটু বাক্য শোনাচ্ছ কেন ?
---- কী ছিল তখন আমার অধীনে ? আমার হৃদয়, যা ছিল তুমিময়। কিন্তু পরায়ত্ত ছিল দেহ। তোমার আমার দীর্ঘকাল সংসর্গ হয়েছে, পরস্পর আমরা অনুরক্ত হয়েই দুই দেহ, দুই মন, দুই হৃদয় এক হয়ে থেকেছি। তাও যদি তুমি আমাকে বুঝতে না পার তবে আমার পক্ষে তা মরণ সমান। রাজর্ষি জনকের নামে আমার পরিচয়, আমি বসুন্ধরার কন্যা। তুমি সর্বজ্ঞাতা, কিন্তু আমার মহৎ চরিত্রের প্রতি কোন সম্মান প্রদর্শন করলে না। বাল্য কালে তুমি আমাকে বরণ করেছিলে, আমার পাণিগ্রহণ করেছিলে। আমার এতদিনের ভক্তি, আমার চরিত্র সব নস্যাৎ করে দিলে !

তারপর সীতা অশ্রুভারবিগলিত কণ্ঠে লক্ষ্মণকে বললেন,  
চিতা প্রস্তুত কর, প্রীতিহীন স্বামীর দ্বারা অমি পরিত্যক্তা, আমি অগ্নিতে প্রবেশ করে প্রাণ বিসর্জন দিতে চাই।
সেদিন লঙ্কায় সীতার অগ্নিপরীক্ষা ! অগ্নি স্বয়ং এবং অন্যান্য দেবতাদের আগমন, রামকে ভর্ৎসনা, তাঁর স্বরূপ সন্ধানের উপদেশ -- বিরাট সে আখ্যানভাগ। কিন্তু বর্তমানে আমরা আবার ফিরে আসি অযোধ্যায়। 


আজ আবার রাজা রামচন্দ্রের অশ্বমেধ যজ্ঞসভায় জনপদবাসী, রাজন্যবর্গ, কৌতুহলী অতিথি অভ্যাগতদের মাঝখানে সতীত্বের পরীক্ষা ! স্বয়ং মহর্ষি বাল্মীকির স্নেহে, শিক্ষায় পালিত, জ্ঞানে মানে ঋদ্ধ দুই সন্তান, রাম এই মাত্র যাদের পিতৃত্ব স্বীকার করেছেন, তাদের উপস্থিতিতে তাদের মাতৃদেবীর চরিত্র-শুদ্ধতার প্রমাণ ? রামের নিষ্ঠুর বিচারের আবারো আলোচনা, তাঁর চিত্তের মালিন্যকে আবারো ধিক্কার দিবেন কি জনকনন্দিনী ? তাঁর সন্তানদের ওই বিস্ময়বিস্ফারিত বিহ্বল দৃষ্টির সম্মুখে ! না, না।
কী আর প্রোয়োজন ধরাতলে ? তাঁর চেয়ে ----পতিগতপ্রাণা, তপঃঋদ্ধা, কাষায়বস্ত্র অবগুণ্ঠিতা, পবিত্রতায় বেদমাতা সমতুল্যা সীতাদেবীর কণ্ঠ হতে নিঃসৃত হোল শেষ বিদায় বাণী,--------

মনসা কর্মণা বাচা যথা রামং সমর্চয়ে।
তথা মে মাধবী দেবী বিবরং দাতুমর্হতি।।
যথৈতৎ সত্যমুক্তং মে বেদ্মি রামাহ পরং চ।
তথা মে মাধবী দেবী বিবরং দাতুমর্হতি।। 


রঘুপতি রাঘব ভিন্ন অন্য কোন পুরুষকে মনে মনেও যদি না চিন্তা করে থাকি তবে হে মাধবী (হে ধরিত্রী দেবী), তুমি বিদীর্ণ হও। যদি মননে কর্মে বাক্যে একমাত্র রামকেই আরাধ্য দেবতা জ্ঞান করে থাকি, যদি পতিরূপে আমার জীবনে রামই পরম সত্য হয়ে থাকে তবে হে মাধবী, বিদীর্ণ হও।
বিবরং দাতুমর্হতি'--- এই মর্মবিদারী প্রার্থনা পরপর তিন বার ! (নারীর শেষের অবলম্বন তার জননী।) মা বসুধা, এই অবমাননা, এই লাঞ্ছনা আর সহ্য করতে পারছি না মা। দ্বিধা হও, চিরকালের মত তোমার গর্ভে আমায় ঠাঁই দাও মা গো ! ______________________________________________________

মূল বাল্মীকি রামায়ণে সীতা চরিত্রই  প্রধান এবং এমন একটি বিষাদবিধুর  (tragic) চরিত্র যা বিশ্ব সাহিত্যের কোথাও পরিদৃষ্ট হয় না। 

ঋণ স্বীকার ---
মূল বাল্মীকি রামায়ণ, 

বাল্মীকি রামায়ণ, সারানুবাদ --- রাজশেখর বসু।

ভাব গ্রহণ ---

উত্তর রামচরিত ---ভবভূতি

রঘুবংশ,--- কালিদাস
মেঘনাদবধ কাব্য--- মাইকেল মধুসূদন দত্ত।
এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক গ্রন্থরাজি।
(গবেষণামূলক এই লেখাটি পাঠ করার পর মতামত জানালে আনন্দ লাভ করব।)

দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
৯ই বৈশাখ, ১৪৩১
কলকাতা।

_____________________________________________
















সোমবার, ১৫ এপ্রিল, ২০২৪

রামায়ণে অবিচার --- তিন

রামায়ণে অবিচার --- পর্ব তিন

রামায়ণে অবিচার প্রসঙ্গে পর্ব দুই'তে রাজা রামচন্দ্রের 

'শম্বুক বধ' বর্ণনা ও আলোচনা করেছি। আজ আলোচনা করব সেই ঘটনার পরবর্তী পর্যায়। 


সীতা বিসর্জনের পর বহু কাল রাজা রামচন্দ্রের রাজ্যশাসন অব্যাহত আছে। গো-ব্রাহ্মণ হিতায়, ধর্ম রক্ষার দায়িত্ব পালন করে রামচন্দ্র তখন দিগ্বিদিকে প্রসংসিত। বাল্মীকি রামায়ণ, ৬০ -- ৬৪ সর্গে আমরা পাই, একদিন, কোন এক অপগতশীত, কবোষ্ণ প্রভাতে রামচন্দ্র তাঁর রাজসভায় এসে সিংহাসনে সমাসীন হলে সুমন্ত্র নিবেদন করলেন, মহর্ষি চ্যবনের সঙ্গে কয়েকজন যমুনাতীরবাসী তপস্বী রাজার দর্শনপ্রার্থী হয়েছেন। 


ভূগুপুত্র মহর্ষি চ্যবনের কথায় রামচন্দ্র জানতে পারলেন যে যমুনাতীরের মধু নামের এক মহাসুরের প্রতিষ্ঠিত রাজ্যে, মধুবনে, অসুর মধুর পুত্র পাপাত্মা লবনাসুর দ্বারা ওই জনপদের সকল জীব, বিশেষত তাপসগণ উৎপীড়িত, নিহত এবং ভক্ষিত হয়ে চলেছে।
রামচন্দ্র কণিষ্ট ভ্রাতা শত্রুঘ্নের উপর লবণাসুর নিধনের ভার অর্পণ করলেন এবং বললেন, তুমি মধুর পুত্র পাপাত্মা লবনাসুরকে বধ করে ওই স্থানে, যমুনাতীরে, মধুর রাজ্যে নগর ও জনপদ স্থাপন কর, রাজ্য স্থাপনা কর। আমি সেই রাজ্যে তোমাকে অধিষ্ঠিত করব। 


এইবার শত্রুঘ্ন তাঁর সৈন্য বাহিনীকে অগ্রসর হতে আদেশ দিয়ে একমাস পরে মধুর রাজ্য অধিকার করবার জন্য যাত্রা করলেন। এই অভিযাত্রায় দুই রাত্রি পথে কাটিয়ে, তৃতীয় দিবসে মহর্ষি বাল্মীকির আশ্রমে উপস্থিত হলেন। মহর্ষি বাল্মীকি তাঁর আশ্রমে শত্রুঘ্নকে স্বাগত জানালেন। সেই আশ্রমের নাতিদূরে কিছু পূরাতন যজ্ঞোপকরণ দেখে শত্রুঘ্ন কৌতুহল প্রকাশ করেন।
মহর্ষি মহান রঘুবংশের পূর্বতন এক রাজা সৌদাসের কাহিনী সবিস্তারে বর্ণনা করলেন এবং পরিশেষে বললেন, শত্রুঘ্ন, এই আশ্রমের নিকটে যে যজ্ঞস্থান দেখছ তা রঘুবংশেরই রাজা সৌদাসের যজ্ঞস্থান ছিল। 


"শত্রুঘ্ন যে রাত্রিতে বাল্মীকির পর্ণশালায় ছিলেন, সেই রাত্রির মধ্যভাগে সীতা দুই পুত্র প্রসব করলেন। দেবতুল্য কান্তিমান বালকদ্বয়কে দেখে বাল্মীকি অতিশয় প্রীত হলেন, এবং কুশগুচ্ছ দিয়ে ভূতরক্ষোবিনাশিনী  রক্ষা (রাখি বা তাগা) রচনা করে বৃদ্ধাদের বললেন, যে অগ্রজ তার গাত্র এই মন্ত্র পূত কুশগুচ্ছের অগ্রভাগ দিয়ে মার্জনা কর, তার নাম 'কুশ' হবে। যে  পরে জাত তার গাত্র কুশগুচ্ছের অধোভাগ (লব) দিয়ে মার্জনা কর, তার নাম 'লব' হবে। এই দুই জমজ পুত্র আমার প্রদত্ত নামেই খ্যাতি লাভ করবে। (বাল্মীকির বর্ণনা অনুযায়ী 'কুশ' অগ্রজ এবং 'লব' অনুজ।) 


লক্ষণীয়, আধুনিক (উনবিংশ শতাব্দী থেকে বর্তমান কালের) বিশ্বসাহিত্যের বিশ্ববরেণ্য উপন্যাসিকগণও তাঁদের সুবৃহৎ সব উপন্যাসে এমন নিখুঁত পারম্পর্য, অজস্র ঘটনার এমত যৌক্তিক গ্রন্থন সম্ভব করতে পারেন নি।
যাই হোক্, এখানে সীতা দেবীর সঙ্গে শত্রুঘ্নের দেখা হওয়ার কোন উল্লেখ নেই। তীলক প্রভৃতি টীকাকারেরা মন্তব্য করেছেন রামচন্দ্রের অনুজ্ঞা না থাকায় শত্রুঘ্ন সীতা দেবীর সঙ্গে দেখা করতে চান নি। কিন্তু মহর্ষি সেই যমজ সন্তানের জন্ম হওয়ার কথা, তাদের নামকরণ, গোত্র নির্দিষ্টকরণ -- সমস্ত কথাই তাদের খুল্লতাত শত্রুঘ্নকে জানিয়ে দিলেন। এবং শত্রুঘ্নও সহর্ষে বললেন, "কী সৌভাগ্য!"
মধ্যরাত্রি। বাল্মীকি আশ্রমে অযোধ্যারাজ রামচন্দ্রের ঔরসজাত, সীতা দেবীর গর্ভজ যমজসন্তান ভূমিষ্ঠ হোল। এই পবিত্র ঘটনাটিকে সংশয়াতীতরূপে প্রমাণযোগ্য করার জন্য মহাকবি কী বিস্ময়কর ঘটনা- শত্রুঘ্নের উপস্থিতি -- সংস্থাপন করেছেন।
আজ যখন অযোধ্যারাজ্যের 'উত্তরাধিকার' জন্ম নিচ্ছেন তখন, সীতা নির্বাসনের এক বৎসর অতিক্রান্ত না হতেই কনিষ্ঠ রামানুজ শত্রুঘ্ন রাজাদেশে রাজকার্য সম্পাদন করার নিমিত্তে, যুদ্ধযাত্রার পথে সেই বাল্মীকি আশ্রমেই রাত্রিবাস করছেন যেখানে তাঁদের বংশধরদের অভ্যুদয় সংঘটিত হোল।
আমাদের স্মরণে আছে লক্ষ্মণ যেদিন সীতা দেবীকে নির্বাসনে দিয়ে গেলেন সেদিনও সীতা দেবী তাঁর নারীসুলভ সমস্ত ব্রীড়া বিসর্জন দিয়ে রামানুজ লক্ষ্মণকে তাঁর গর্ভস্ফীত নিম্নোদর দেখিয়ে বলেছিলেন, দেখ, দেখ লক্ষ্মণ, আমি সন্তানসম্ভবা। এই অবস্থায় তোমরা আমাকে কোথায় রেখে যাচ্ছ ? 


বিস্মিত, বিমূঢ় সীতা দেবী আরো কিছু মর্মবিদারী বাক্য অশ্রুবাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে উচ্চারণ করলেন,
পূর্বে বনবাসকালে আমি রামের সঙ্গে ছিলাম, এখন একাকিনী কি করে এই আশ্রমে থাকব ? মুনিরা যখন প্রশ্ন করবেন --- কোন্ অসৎ কর্মের জন্য রাঘব তোমাকে ত্যাগ করেছেন , তখন আমি কি উত্তর দেব ? আমার গর্ভে রাজবংশের সন্তান আছে, নতুবা আজই জাহ্নবীর জলে প্রাণ বিসর্জন দিয়ে এই আরোপিত কলঙ্কের যন্ত্রণা থেকে মুক্তি লাভ করতাম।  
পরিশেষে, জীবনে এই প্রথম তাঁর শ্রীমুখ থেকে নিঃসৃত হয়েছিল তাঁর আরাধ্য জীবন স্বামীর উদ্দেশ্য ভর্ৎসনার বাণী,
লক্ষ্মণ, তুমি সেই ধর্মনিষ্ঠ নৃপতির চরণবন্দনা ক'রে আমার এই কথা জানিও, ---- "আমি শুদ্ধচরিত্রা, তোমার (রাজা রামচন্দ্রের) প্রতি একান্ত ভক্তিমতী ও হিতকারিণী তা তুমি জান। তুমি (রামচন্দ্র) অপবাদভীরু তাই আমাকে ত্যাগ করেছ। তুমি আমার পরম গতি, তোমার অপবাদ যেন না হয় তা আমার অবশ্য করণীয়।"

এখানে ধর্মনিষ্ঠ নৃপতি সম্বোধন করে সীতা দেবী বুঝিয়ে দিলেন রাম এতখানিই দুর্বল 'পুরুষোত্তম' রাজা যিনি আপন অসহায় অন্তঃসত্ত্বা সহধর্মিণীকে, শুধুমাত্র জনসমক্ষে, সন্দেহক্লিন্ন প্রজাবর্গের কাছে নিজেকে নিষ্কলঙ্ক, নিষ্কলুষ ও আত্মশ্লাঘী প্রমাণ করবার জন্য রাবণ বধের পর লঙ্কায় অগ্নিপরীক্ষায় পরিশুদ্ধা সীতা দেবীকে এমন গ্লানিময় অবস্থায় নিক্ষেপ করতে পারেন। তিনি তো সীতারও 'পতি', স্ত্রীকে রক্ষা করবার দায় আপন রাজস্কন্ধে বহন করে, রাজ্যশাসনের ভার অপর ভ্রাতাদের উপর ন্যস্ত করে, তাঁর আসন্ন সন্তানের রক্ষার পবিত্র প্রয়োজনে রাজ সিংহাসন পরিত্যাগ করতেই তো পারতেন।
তিনিই তো প্রথম জানতে পেরেছিলেন সীতা দেবী তাঁর সন্তান ধারণ করেছেন। 

তাঁকে বিসর্জনের আগে, অযোধ্যার অশোক কাননে তিনিই সীতা দেবীকে বলেছিলেন,
বৈদেহী, তোমার অপত্যলাভ হবে তার লক্ষণ দেখতে পাচ্ছি, এখন তুমি কি ইচ্ছা কর, আমাকে বল।
তাহলে রাম সত্যটা জানতেন এবং সহধর্মিণীর সঙ্গে সহবাস স্বীকার করেই তাঁর (সীতা দেবীর)'সাধ 'পূর্ণ করতে চাইছেন।
এখানে আমরা মহাকবির কথা কিছু বলি -----
কী অতিমানবীয় প্রতিভা, কী অতুলনীয় সৃষ্টিচেতনা। সীতা দেবীর সন্তান সম্ভাবনা থেকে তাঁর যমজ সন্তানের শুভ প্রসবকাল --- প্রতিটি সুনির্দিষ্ট সময়ে মহাকবি অযোধ্যার রাজপরিবারের সদস্যদের, বিশেষ করে রামচন্দ্র, লক্ষ্মণ ও শত্রুঘ্নকে সাক্ষী রেখেছেন।
কিন্তু লক্ষ্মণ অযোধ্যায় প্রত্যাবর্তন করে সীতার বিদায়কালের কথাগুলি রামকে বলেছিলেন কিনা তা মহাকবি উল্লেখ করেন নি।

এইভাবে ঘটনা পরম্পরা সংঘটিত হতে লাগল। শত্রুঘ্ন লবনাসুরকে বধ করেন, সেখানে শূরসেনারা উপনিবেশ গড়ে তুলল। ক্ষত্রবীর শত্রুঘ্নের যত্নে, পৃষ্টপোষকতায় দ্বাদশ বৎসরের মধ্যে যমুনাতীরে এক অর্ধচন্দ্রাকৃতি শোভমান ও সমৃদ্ধ বহুপ্রজাসমন্বিত নগর স্থাপিত হোল। (এই মধুপুরীই মথুরা এবং তার পরিধির মধ্যেই শূরসেন)। অনন্তর দ্বাদশ বৎসর অতিবাহিত হবার পর শত্রুঘ্ন একশত রথ ও তাঁর অনুচরদের নিয়ে রামচন্দ্রের সঙ্গে দেখা করার জন্য অযোধ্যা যাত্রা করলেন।  বিভিন্ন স্থানে বিশ্রাম করার পর তিনি আবারও মহর্ষি বাল্মীকির আশ্রমে উপস্থিত হলেন। 


পান ভোজনের পর বিশ্রাম কালে তাঁদের কানে ভেসে এল রামচরিত গান। দেবভাষায় ছন্দোবদ্ধ, উদারা-মুদারা- তারায় উচ্চারিত, বীণাধ্বনিসহযোগে, সমতালে, মধুর কণ্ঠে গীত সেই গান শুনতে শুনতে যেন সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়লেন শত্রুঘ্ন। তাঁর দুই চোখ বেয়ে অশ্রুধারা নিঃসৃত হতে লাগল। তাঁর সঙ্গে যাঁরা ছিলেন তাঁরাও স্মৃতিমেদুর ও বিষাদগ্রস্ত হয়ে পড়লেন। তাঁরা জানতে চাইলেন এই স্বপ্নবৎ সঙ্গীত কার রচনা, কাদের কণ্ঠেই বা ধ্বনিত হচ্ছে। শত্রুঘ্ন উত্তর দিলেন, আশ্রমে বহু কিছু আশ্চর্য ব্যাপার ঘটে। কৌতুহল প্রদর্শন করা অনুচিত হবে।
শত্রুঘ্ন নিজে কিন্তু বিনিদ্র রজনী যাপন করে শুধু সেই গানের কথাই ভাবতে লাগলেন। পরদিন প্রত্যুষেই তিনি মহর্ষির নিকট বিদায় নিয়ে অযোধ্যার উদ্দেশ্য যাত্রা করলেন। সুদীর্ঘকাল পর তিনি অযোধ্যায় অগ্রজদের সঙ্গে মিলিত হলেন। 


আবারো এমন একটি ঘটনা , মহাকবি নাটকীয় ভাবে ঘটালেন যার মধ্য দিয়ে রামায়ণ কাহিনীর পারম্পর্য অক্ষুন্ন রয়ে গেল। 


এরপর উপাখ্যান চলমান। গতি তার মন্থর কিন্তু আকর্ষণ তীব্র থেকে তীব্রতর। 'শম্বুকের শিরশ্ছেদ' কিছু পূর্বেই আলোচনা করেছি।
তা হলে এই সত্যটি  প্রতিপন্ন হোল যে সীতা দেবীকে বিসর্জনের সংকল্পটি ছিল সম্পূর্ণ ত্যাগ এবং কতখানি নির্মম, নিষ্ঠুর ছিল এই সম্পর্ক ছিন্ন করার বিধান, (রাজার শাস্তি বিধান)তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ এই কঠোর নীরবতা। সুদীর্ঘ বারটা বছর সন্তান সম্ভবা স্ত্রীকে নির্বাসনে দিয়ে স্বয়ং রাজা বা অযোধ্যার রাজপরিবারের কোন সদস্য, রাজার শাসনেই হয়তোবা, বাল্মীকি আশ্রমে সীতা দেবীর অবস্থা, অবস্থিতি ও পরিণাম বিষয়ে 'অমানবিক'ভাবে উদাসীন। এই রাজকীয় উপেক্ষা  একটি অবলা নারীর প্রতি কী প্রাণঘাতী অবিচার ! 


                         ক্রমশঃ
      (চতুর্থ পর্বে সমাপ্য। বিশ্ব সাহিত্যের নির্মমতম বিয়োগান্তক মহাপরিণাম নিয়ে আলোচনা করার চেষ্টা করব। সুধী পাঠকগণের জন্য শুভ নববর্ষ।)
______________________________________________




রবিবার, ১৪ এপ্রিল, ২০২৪

শুভঃ বৈশাখ


 

 


শুভ বৈশাখ -- ১৪৩১

আজ এক নূতন ভোর, নব সূর্যোদয়। 
পুরাতন খন্ড কাল অতীতের সাগরে বিলীন -- 
বিপুল বিস্মৃতি। অতলে রইবে ডুবে স্মৃতির কণিকা, 
নীলা পান্না চুণি ; তাই দিয়ে সুখের রত্নহার গড়ার  প্রয়াস ব্যর্থ হবে জানি, তবু মানি সে সবের মূল্য  অনিঃশেষ। চৈত্রের সংক্রান্তি সন্ধ্যায় শেষ স্বর্ণচাঁপা 
ঝরে গেল একান্ত নীরবে, সেও তো গিয়েছে রেখে 
বিষাদের মধুগন্ধ তার, নূতন বছর ভরে' সে আমার 
প্রেরণার সঞ্চিত ভাণ্ডার। ঝরেছে যা, গিয়েছে যা চলে 
দিয়ে গেছে সে দিনের, সে কালের ছোঁওয়া ---- 
সুখের বা দুঃখের পরশ, গর্ভযন্ত্রণার অন্তে  নবজাতকের কান্না-হাসির মত জীবন স্পন্দন। 
বিগত আগত কিংবা অনাগত কালের মিলন 
এই শুভ বৈশাখের নব অভ্যুদয়, নবোদিত সবিতার 
বিমল কিরণে বাজে আনন্দের গান নব প্রত্যাশার। 

শুভ বৈশাখ, ১৪৩১
কলকাতা।
(রামায়ণে অবিচার -- পর্ব ৩,  কয়েক দিন পর প্রকাশিত হবে)।







শনিবার, ৬ এপ্রিল, ২০২৪

রামায়ণে অবিচার (দুই)

রামায়ণে অবিচার (দুই) 


পরমারাধ্যা, মাতৃসমা বৈদেহীকে বিসর্জন দেওয়ার কর্মটি তাঁকে দিয়েই কেন করালেন রাম ! জানতেন কি তিনি যে যত কঠোর, যত অসাধ্য কাজই হোক না কেন লক্ষ্মণ রামচন্দ্রের অবাধ্য হতে পারবেন না। লক্ষ্মণের প্রতি এই বিশ্বাসের বশে এমন নির্দয় ভাবে এমন মর্মবিদারী আদেশ দেওয়া কি চিরশরণাগত, চির অনুগত ভক্তের প্রতি ভক্তবৎসল রামচন্দ্রের শেষ 'উপহার' !

যাই হোক্, ওদিকে আশ্রমবাসী মুনি কুমারদের দ্বারা শোকাকুলা, সঙ্গীহীনা, সীতাদেবীর সংবাদ যখন ত্রিকালজ্ঞ মহর্ষি বাল্মীকির কর্ণগোচর হোল তখন তিনি স্বয়ং সীতার নিকট গিয়ে উপস্থিত হলেন। তিনি অতি সুমধুর কণ্ঠে দশরথের পুত্রবধূ, জনকনন্দিনী, শ্রীরামভার্যা সীতা দেবীকে বললেন, মা, তুমি কেন এখানে  এসেছ আমি তপোবলে তা জেনেছি। হে পতিব্রতা, অপাপবিদ্ধা, তুমি আমার আশ্রমে স্বাগত। আশ্রমের অদূরে তাপসীগণ থাকেন, তাঁরা তোমাকে কন্যার ন্যায় প্রতিপালন করবেন।
দূর থেকে লক্ষ্মণ সে দৃশ্য দেখে সামান্য হলেও দুশ্চিন্তামুক্ত হলেন। ভারাক্রান্ত হৃদয়ে সারথি সুমন্ত্রকে বলেছিলেন, রাম সীতার এই বিচ্ছেদ যদিও মনে হয় দৈবাধীন, তবুও বলি, অন্যায়বাদী পৌরজনের কথা শুনে রাম এই যে যশোনাশক কর্ম করলেন তাতে তাঁর কোন্ মহদ্ধর্ম সাধিত ও সম্পাদিত হবে ?
যাই হোক্, শোকসন্তপ্তচিত্ত লক্ষ্মণ প্রত্যাবর্তনের পথ ধরে কৌশিনী নদীর তীরে এক রাত্রি যাপন করে অযোধ্যায় ফিরে এলেন। রাজা রামচন্দ্রের বিরহকাতরতা দেখে লক্ষ্মণ তাঁকে এই বলে প্রবোধ দেওয়ার চেষ্টা করেন,

-------- সর্বে ক্ষয়ন্তা নিচয়াঃ পতনাত্মাঃ সমুচ্ছ্রয়াঃ।
সংযোগা বিপ্রয়োগান্তা মরণান্তং তু জীবিতম্।।

দেখুন, সঞ্চয় ক্ষয়ে, উন্নতি পতনে, মিলন বিচ্ছেদে, জীবন মরণে বিলয় হয়। এই সত্য স্বীকার করতেই হবে। আবার এখন আপনি যদি মৈথিলীর জন্য শোক বিহ্বল হয়ে পড়েন তবে যে অপবাদের ভয়ে ( কলঙ্কিত স্ত্রীর প্রতি অত্যাসক্ত রাম) আপনি তাঁকে ত্যাগ করলেন, সেই অপবাদ লোকমুখে প্রচারিত হবে।
অতএব রামচন্দ্রের নীরবে অনুতাপ ভোগ করা ছাড়া আর কোন উপায় আর রইল না।
রামচন্দ্র বিষ্ণুর অবতার -- এই লোকায়ত পুরাণপ্রবাদ অবলম্বন করেই মহাকবি বাল্মীকি রাম চরিত্র অঙ্কন করেছেন এবং তিনি এস্থলে একটি অতীত কাহিনীর উল্লেখ করেছেন।
মহর্ষি বশিষ্ঠের আশ্রমে একদা রাজা দশরথ এবং মুনি দুর্বাসার কথোপকথন হয়। তাঁর বংশের গতি ও পরিণতি কী হবে এই প্রশ্নের উত্তরে দুর্বাসা রাজা দশরথকে বলেন যে, দেবতাদের দ্বারা নির্যাতিত ও নিপীড়িত হয়ে দৈত্যগণ যখন দৈত্যগুরু ভৃগুর পত্নীর নিকট আশ্রয় লাভ করেন তখন বিষ্ণু অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়ে ওঠেন এবং আপন চক্রে ভৃগুপত্নীর শিরশ্ছেদ করেন। নিহত পত্নীর শোকে ভৃগুমুনি মুহ্যমান হয়ে পড়েন। বিষ্ণুকে অভিশাপ দেন এই বলে যে,  

তোমাকে মানবজন্ম নিতে হবে এবং বহুবর্ষব্যাপী পত্নীর বিচ্ছেদযন্ত্রনা ভোগ করতে হবে।

সেই অভিশাপের ফলেই রাম রূপে বিষ্ণু মর্ত্যে অবতীর্ণ হয়েছেন এবং ওই পূর্বজন্মের অভিশাপ বহন করতে তিনি বাধ্য। নিয়তি নির্ধারিত জীবন তাঁরও।
এখানে মহাকবি একটি গূঢ় দার্শনিক মতবাদ প্রতিষ্ঠা করেছেন। দেবতাদেরও তিনি চারিত্রিক কলুষমুক্ত, সর্বগুণসমন্বিত সত্ত্বা বলে স্বীকার করেন নি। তাঁদের অন্তরপ্রকৃতিতে মানবোচিত দোষ গুণের অস্তিত্ব ছিল এবং তা নিষ্ঠুর ভাবেই ছিল। নইলে দেবশ্রেষ্ঠ বিষ্ণু কিভাবে একজন দয়াময়ী, সহানুভূতিসম্পন্না নারীর মুন্ডচ্ছেদ করতে পারেন ?
রামের রাজ্যে স্বয়ং রাজা রামচন্দ্রের দ্বারাই আরো এমনি এক 'অমানবিক' দেবস্বভাবের মতোই নির্মম হননক্রিয়া অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এক বৃদ্ধ গ্রামবাসী ব্রাহ্মণের একমাত্র পুত্রের মৃত্যু হয়। ব্রাহ্মণের বক্তব্য ছিল "রাজার দোষেই ওই বালকের অকাল মৃত্যু ঘটেছে।" রাজা রামচন্দ্র বশিষ্ঠাদি ঋষির একতরফা বিচার শুনলেন।
"মহারাজ, তোমার রাজ্যে কোন দুর্বুদ্ধি শূদ্র তপস্যা করছে, সেই পাপেই এই বালক মরেছে।" 


রাম রথারোহনে তাঁর সাম্রাজ্যের সর্বত্র অনুসন্ধান করে অবশেষে দক্ষিণ দিকে গিয়ে দেখলেন শৈবাল পর্বতের উত্তরে এক সুবিশাল সরোবরের তীরে অধোমুখে লম্বমান হয়ে এক তপস্বী তপস্যা করছেন। রাম তাঁর পরিচয় জিজ্ঞাসা করে জানতে পারলেন যে তিনি একজন শূদ্র, নাম শম্বুক। তিনি জানালেন তিনি দেবত্বলাভ এবং দেবলোক জয় করার জন্য এমত কঠোর তপস্যায় ব্রতী হয়েছেন।
তাঁর কথা শোনা মাত্র রাম খড়্গাঘাতে তাঁর দেহ হতে মস্তক ছিন্ন করে দিলেন।
এই নৃশংস, "পাপাচার" করার পর স্বর্গ হতে পুষ্প বৃষ্টি হতে লাগল। দেবগণ বললেন, রাম, তুমি আমাদের প্রিয় কার্য সাধন করেছ। তোমার জন্যই শূদ্র স্বর্গাধিকারী হোল না এবং দেবতাদের বরে, এই শূদ্রের নিধনের সঙ্গে সঙ্গেই সেই ব্রাহ্মণের সন্তান জীবন লাভ করেছিল।

(মনে রাখতে হবে আজ থেকে আড়াই হাজার বছর আগে এই ভারতবর্ষের সমাজ জীবনে যে  হৃদয়হীন ব্রাহ্মণ্যবাদ প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল, আর তার  প্রভাব যে রামচন্দ্রের মত রাজাকেও প্রভাবিত করেছিল মহাকবি কী অপূর্ব সূক্ষ্ম ঔপন্যাসিক বুননে তার বর্ণনা উপস্থাপিত করেছেন। তাই রামায়ণ একটি আদিমতম বিরাট সাহিত্যসৃষ্টি রূপে বিবেচিত হোক্, দুই তিন হাজার বছর পরে আধুনিক মানবতাবাদী চিন্তনে তার প্রভাব না পড়ুক, এমনটি কামনা করি।)

আজ এ পর্যন্তই। আবার পরের পর্বে। একটি বিয়োগান্তক মহাপরিণাম ! অপেক্ষা করুন।
______________________________________________


মঙ্গলবার, ২ এপ্রিল, ২০২৪

রামায়ণে অবিচার -- ১


রামায়ণে অবিচার -- ১

উত্তরাকান্ড
_______________ 


চতুর্দশ বৎসর অতিবাহিত হবার পর, রাবণ বধ ও সীতা উদ্ধার করে রাম সস্ত্রীক, সভ্রাতা ও 

নর-বানর- রক্ষবর্গসহ অযোধ্যায় ফিরে এলেন এবং সুখে রাজ্যপাট ভোগ করতে লাগলেন। 


"বানর ভল্লুক ও রাক্ষসবন্ধুদেরকে বিদায় দিয়ে রাম ভ্রাতৃগণের সঙ্গে সুখে কালযাপন করতে লাগলেন।
••••••• (একদিন) অনন্তর রাম অশোকবনে গেলেন (অযোধ্যার এই অশোকবন অযোধ্যারাজের প্রমোদকানন। এ স্বর্গোদ্যান তুল্য রমণীয় বনের সুদীর্ঘ,  মহাকাব্যিক বর্ণনা আছে।)। 


অশোকবনিকাং স্ফীতাং প্রবিশ্য রঘুনন্দনঃ।
আসনে চ শুভাকারে পুষ্পপ্রকরভূষিতে।।
কুশাস্তরণসংস্তীর্ণে রামঃ সন্নিষসাদ হ।
সীতামাদায় হস্তেন মধু মৈরেয়কং শুচি।।
পায়য়ামাস কাকুৎস্থঃ শচীমিব পুরন্দর।
মাংসাশি চ সুমৃষ্টানি ফলানি বিবিধানি চ ।।
রামস্যাভ্যবহারার্থং কিন্নরাস্তূর্ণমাহরণ্।। 


সেই সমৃদ্ধ অশোকবনে প্রবেশ করে রাম পুষ্পাকীর্ণ কুশাস্তরণ- সমন্বিত সুন্দর আসনে উপবিষ্ট হলেন এবং পুরন্দর যেমন শচীর পরিচর্যা করেন সেই রূপ সীতার হাত ধরে পবিত্র মৈরেয় মদ্য পান করালেন। রামের ভোজনের জন্য কিন্নরগণ সত্বর বিবিধ সুসংস্কৃত মাংস ও ফল নিয়ে এল।
সেই সময়ে কিন্নরী অপ্সরা এবং রূপবতী নারীগণ পানোন্মত্তা হয়ে নৃত্য গীতে রামের মনোরঞ্জন করতে লাগল। বশিষ্ঠ যেমন অরুন্ধতীর সঙ্গে সেইরূপ রাম সীতার সঙ্গে উপবিষ্ট হয়ে অতিশয় শোভান্বিত হলেন।
এই মধুর-রসামৃতসিক্ত বিলাসকালে রাম যখন সীতাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, সন্তান সম্ভবা তুমি, এযে পরম ভাগ্য, কী চাই তোমার বল, আমি তোমার ইচ্ছা পূরণ করতে চাই। স্মিতাননা সীতা বললেন, জাহ্নবী তীরে যে সমস্ত উগ্রতেজা, ফলমূলাহারী ঋষিগণ থাকেন তাঁদের সেই পূত তপোবনে আমি এক রাত্রি বাস করতে মনস্থ করেছি।
রাম সম্মত হলেন। (এই সম্মতির সঙ্গে সঙ্গেই সীতার দুর্ভাগ্যের নিষ্ঠুর নিয়তি তাঁর অগোচরেই ক্রূর হাসি হেসে উঠেছিল)। রাম তাঁর সুহৃদ গণের সঙ্গে মধ্যক্ষায় গমন করলেন। বিজয়, মধুদত্ত, ভদ্র, দন্তবক্র, সুমাগধ, যারা রামচন্দ্রের বয়স্য এবং বিদূষক তারা হাস্যরসাত্মক কথা বলে রামচন্দ্রের মনোরঞ্জন করবার চেষ্টা করছেন। হঠাৎই রাম তাদের প্রশ্ন করে বসলেন, সীতা, ভ্রাতা, মাতা কৈকেয়ী সম্মন্ধে জনপদের নরনারীর কি ধারণা, কি বা আলোচনা করে তারা। ভদ্র বলেছিল, সকলে রাজা রামচন্দ্রের প্রশংসাই করে। তবুও রাম জানতে তাদের অভয় দান করে বললেন, রাজপরিবার সম্পর্কে শুভাশুভ যাই শোনা যায় তা যেন তারা অসংকোচে ব্যক্ত করে।
তখন ভদ্রের উক্তি --- 

কীদৃশং হৃদয়ে তস্য সীতাসম্ভোগজং সুখম।
অঙ্কমারোপ্য তু পুরা রাবণেন বলাদ্ধৃতাম্ ।।
লঙ্কামপি পুরা নীতামশোকবনিকাং গতআম্।
রক্ষসাং বশমাপন্নাং কথং রামো ন কুৎস‌তি।।
অস্মাকমপি দারেষু সহনীয়ং ভবিষ্যতি।
যথা হি কুরুতে রাজা প্রজাস্তমনুবর্ততে।। 


--সীতা সম্ভোগে রাম পরম এবং প্রবল সুখে আছে। রাবণ যাকে কোলে নিয়ে লঙ্কায় গিয়েছিল, অশোকবনে রেখেছিল, যে সীতা রাক্ষসের বশে ছিল তাকে (সেই স্ত্রীকে) রাম কেন ঘৃণা করেন না ? এমন যদি আমাদের পত্নীদের ক্ষেত্রে হয় তবে তা আমাদেরকেও সহ্য করে থাকতে হবে। কারণ রাজা যা করেন প্রজারা তাই তো অনুসরণ করবেন। ...... এইরকম সব কথা পুরবাসীরা আলোচনা করে।
রামচন্দ্র ভদ্রের কথায় মানসিক ভাবে কাতর হয়ে পড়লেন এবং অপরাপর সভাসদ ও আমাত্যদের কাছেও জানতে চাইলেন সে জনাপবাদ সত্য কি না। ভদ্রের কথাই প্রতিধ্বনি করলেন সকলেই। রাম রাজসভা ভঙ্গ করে, সভাসদদের বিদায় দিয়ে লক্ষ্মণ ভরত শত্রুঘ্নকে ডেকে পাঠালেন। তাদের কাছে রাজপরিবারের এই কলঙ্কজনক ঘোর জনাপবাদের কথা জানালেন এবং বললেন, অকীর্তি রটিত হলে তার নরকবাস। সীতার কথা দূরে থাক, অপবাদের ভয়ে আমি নিজের জীবন, এমনকি তোমাদেরকেও ত্যাগ করতে পারি। আমি শোক সাগরে পতিত হয়েছি, নিদারুণ দুঃখ ভোগ করছি। লক্ষ্মণ, তুমি কাল প্রভাতেই সুমন্ত্রকে ডাক দাও, রথ সজ্জিত কর এবং সীতাকে অন্য দেশে বিসর্জন দিয়ে এস। গঙ্গার অপর পারে, তমসা নদীর তীরে মহর্ষি বাল্মীকির আশ্রম আছে, সেখানে কোন নির্জন স্থানে বৈদেহীকে রেখে আসবে। 

('নির্জন স্থান' শব্দযুগল গভীর তাৎপর্যপূর্ণ।)

রামায়ণের উত্তরাকান্ডে এই যে সীতাবিসর্জন অধ্যায় (৪৬ থেকে৫২ সর্গ), মহাকবি যে সুগভীর 'ভাবে', যে ছন্দ -অলঙ্কার সমৃদ্ধ ভাষায়, যে শোকাতুর হৃদয়ের স্বতোৎসারিত করুণ 'রসে' রচনা করেছেন তার তুলনা তিনিই। বিশ্ব সাহিত্যের মহাপ্রাঙ্গনে আর দ্বিতীয়টি নাই।
পরদিন প্রভাতে সীতাকে নিয়ে রথারোহনে লক্ষ্মণ যাত্রা করলেন। (চির দুঃখিনী সীতা দেবীর, তাঁর অজান্তেই, তাঁর মর্মান্তিক যাত্রার এই বর্ণনা দীর্ঘ)। তারা বহু পথ অতিক্রম করে গোমতী নদীর তীরে এক আশ্রম দেখতে পেলেন। সেখানে রাত্রিবাস করলেন।
পরদিন নিষাদগণ দ্বারা সুসজ্জিত নৌকায় গঙ্গা নদী পার হলেন। সেখানে মহাযশা বাল্মীকি মুনির আশ্রমের পাদদেশে সীতাকে রেখে শোকাতুর লক্ষ্মণ সেই হৃদয়বিদারক কথাগুলি উচ্চারণ করলেন, দেবী, জনাপবাদের ভয়ে, কীর্তিহীনতার আশঙ্কায় রাম আমাকে এই কঠোর, মর্মান্তিক আদেশ দিয়েছেন। আমি এইস্থলে, মহর্ষি বাল্মীকির আশ্রম সন্নিকটে আপনাকে (বিসর্জন দিয়ে) রেখে যেতে ...!  লক্ষ্মণের সমস্ত কথাগুলি শোনার আগেই সীতা দেবী সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলেছিলেন।
পুনরায় সচেতন হলে সীতা লক্ষ্মণকে যে কথা বলেছিলেন সবিস্তারে তার আলোচনার অবকাশ এখানে নাই, তবে এই প্রথম স্নেহের দেবরটিকে বলতে বাধ্য হলেন, লক্ষ্মণ, দেখে যাও আমার ঋতুকাল অতিক্রান্ত হয়েছে।
তিনি তাঁর গর্ভলক্ষণ জানিয়ে দিয়েছিলেন। তিনি আপন গর্ভস্থ সন্তানের অপরিচিতির নিদারুণ পরিণতি নিয়েও এমনিই আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিলেন যে নারীত্বের সমস্ত লজ্জা, সমস্ত সঙ্কোচ অনাবৃত করতেও দ্বিধা করলেন না। 



___________________________________________






Recently published

অমূল্য

He ( Tagore) who sees all things in his own self and his own self in all things, he does not remain unrevealed.                     ...