রামায়ণে অবিচার -- ১
উত্তরাকান্ড
_______________
চতুর্দশ বৎসর অতিবাহিত হবার পর, রাবণ বধ ও সীতা উদ্ধার করে রাম সস্ত্রীক, সভ্রাতা ও
নর-বানর- রক্ষবর্গসহ অযোধ্যায় ফিরে এলেন এবং সুখে রাজ্যপাট ভোগ করতে লাগলেন।
"বানর ভল্লুক ও রাক্ষসবন্ধুদেরকে বিদায় দিয়ে রাম ভ্রাতৃগণের সঙ্গে সুখে কালযাপন করতে লাগলেন।
••••••• (একদিন) অনন্তর রাম অশোকবনে গেলেন (অযোধ্যার এই অশোকবন অযোধ্যারাজের প্রমোদকানন। এ স্বর্গোদ্যান তুল্য রমণীয় বনের সুদীর্ঘ, মহাকাব্যিক বর্ণনা আছে।)।
অশোকবনিকাং স্ফীতাং প্রবিশ্য রঘুনন্দনঃ।
আসনে চ শুভাকারে পুষ্পপ্রকরভূষিতে।।
কুশাস্তরণসংস্তীর্ণে রামঃ সন্নিষসাদ হ।
সীতামাদায় হস্তেন মধু মৈরেয়কং শুচি।।
পায়য়ামাস কাকুৎস্থঃ শচীমিব পুরন্দর।
মাংসাশি চ সুমৃষ্টানি ফলানি বিবিধানি চ ।।
রামস্যাভ্যবহারার্থং কিন্নরাস্তূর্ণমাহরণ্।।
সেই সমৃদ্ধ অশোকবনে প্রবেশ করে রাম পুষ্পাকীর্ণ কুশাস্তরণ- সমন্বিত সুন্দর আসনে উপবিষ্ট হলেন এবং পুরন্দর যেমন শচীর পরিচর্যা করেন সেই রূপ সীতার হাত ধরে পবিত্র মৈরেয় মদ্য পান করালেন। রামের ভোজনের জন্য কিন্নরগণ সত্বর বিবিধ সুসংস্কৃত মাংস ও ফল নিয়ে এল।
সেই সময়ে কিন্নরী অপ্সরা এবং রূপবতী নারীগণ পানোন্মত্তা হয়ে নৃত্য গীতে রামের মনোরঞ্জন করতে লাগল। বশিষ্ঠ যেমন অরুন্ধতীর সঙ্গে সেইরূপ রাম সীতার সঙ্গে উপবিষ্ট হয়ে অতিশয় শোভান্বিত হলেন।
এই মধুর-রসামৃতসিক্ত বিলাসকালে রাম যখন সীতাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, সন্তান সম্ভবা তুমি, এযে পরম ভাগ্য, কী চাই তোমার বল, আমি তোমার ইচ্ছা পূরণ করতে চাই। স্মিতাননা সীতা বললেন, জাহ্নবী তীরে যে সমস্ত উগ্রতেজা, ফলমূলাহারী ঋষিগণ থাকেন তাঁদের সেই পূত তপোবনে আমি এক রাত্রি বাস করতে মনস্থ করেছি।
রাম সম্মত হলেন। (এই সম্মতির সঙ্গে সঙ্গেই সীতার দুর্ভাগ্যের নিষ্ঠুর নিয়তি তাঁর অগোচরেই ক্রূর হাসি হেসে উঠেছিল)। রাম তাঁর সুহৃদ গণের সঙ্গে মধ্যক্ষায় গমন করলেন। বিজয়, মধুদত্ত, ভদ্র, দন্তবক্র, সুমাগধ, যারা রামচন্দ্রের বয়স্য এবং বিদূষক তারা হাস্যরসাত্মক কথা বলে রামচন্দ্রের মনোরঞ্জন করবার চেষ্টা করছেন। হঠাৎই রাম তাদের প্রশ্ন করে বসলেন, সীতা, ভ্রাতা, মাতা কৈকেয়ী সম্মন্ধে জনপদের নরনারীর কি ধারণা, কি বা আলোচনা করে তারা। ভদ্র বলেছিল, সকলে রাজা রামচন্দ্রের প্রশংসাই করে। তবুও রাম জানতে তাদের অভয় দান করে বললেন, রাজপরিবার সম্পর্কে শুভাশুভ যাই শোনা যায় তা যেন তারা অসংকোচে ব্যক্ত করে।
তখন ভদ্রের উক্তি ---
কীদৃশং হৃদয়ে তস্য সীতাসম্ভোগজং সুখম।
অঙ্কমারোপ্য তু পুরা রাবণেন বলাদ্ধৃতাম্ ।।
লঙ্কামপি পুরা নীতামশোকবনিকাং গতআম্।
রক্ষসাং বশমাপন্নাং কথং রামো ন কুৎসতি।।
অস্মাকমপি দারেষু সহনীয়ং ভবিষ্যতি।
যথা হি কুরুতে রাজা প্রজাস্তমনুবর্ততে।।
--সীতা সম্ভোগে রাম পরম এবং প্রবল সুখে আছে। রাবণ যাকে কোলে নিয়ে লঙ্কায় গিয়েছিল, অশোকবনে রেখেছিল, যে সীতা রাক্ষসের বশে ছিল তাকে (সেই স্ত্রীকে) রাম কেন ঘৃণা করেন না ? এমন যদি আমাদের পত্নীদের ক্ষেত্রে হয় তবে তা আমাদেরকেও সহ্য করে থাকতে হবে। কারণ রাজা যা করেন প্রজারা তাই তো অনুসরণ করবেন। ...... এইরকম সব কথা পুরবাসীরা আলোচনা করে।
রামচন্দ্র ভদ্রের কথায় মানসিক ভাবে কাতর হয়ে পড়লেন এবং অপরাপর সভাসদ ও আমাত্যদের কাছেও জানতে চাইলেন সে জনাপবাদ সত্য কি না। ভদ্রের কথাই প্রতিধ্বনি করলেন সকলেই। রাম রাজসভা ভঙ্গ করে, সভাসদদের বিদায় দিয়ে লক্ষ্মণ ভরত শত্রুঘ্নকে ডেকে পাঠালেন। তাদের কাছে রাজপরিবারের এই কলঙ্কজনক ঘোর জনাপবাদের কথা জানালেন এবং বললেন, অকীর্তি রটিত হলে তার নরকবাস। সীতার কথা দূরে থাক, অপবাদের ভয়ে আমি নিজের জীবন, এমনকি তোমাদেরকেও ত্যাগ করতে পারি। আমি শোক সাগরে পতিত হয়েছি, নিদারুণ দুঃখ ভোগ করছি। লক্ষ্মণ, তুমি কাল প্রভাতেই সুমন্ত্রকে ডাক দাও, রথ সজ্জিত কর এবং সীতাকে অন্য দেশে বিসর্জন দিয়ে এস। গঙ্গার অপর পারে, তমসা নদীর তীরে মহর্ষি বাল্মীকির আশ্রম আছে, সেখানে কোন নির্জন স্থানে বৈদেহীকে রেখে আসবে।
('নির্জন স্থান' শব্দযুগল গভীর তাৎপর্যপূর্ণ।)
রামায়ণের উত্তরাকান্ডে এই যে সীতাবিসর্জন অধ্যায় (৪৬ থেকে৫২ সর্গ), মহাকবি যে সুগভীর 'ভাবে', যে ছন্দ -অলঙ্কার সমৃদ্ধ ভাষায়, যে শোকাতুর হৃদয়ের স্বতোৎসারিত করুণ 'রসে' রচনা করেছেন তার তুলনা তিনিই। বিশ্ব সাহিত্যের মহাপ্রাঙ্গনে আর দ্বিতীয়টি নাই।
পরদিন প্রভাতে সীতাকে নিয়ে রথারোহনে লক্ষ্মণ যাত্রা করলেন। (চির দুঃখিনী সীতা দেবীর, তাঁর অজান্তেই, তাঁর মর্মান্তিক যাত্রার এই বর্ণনা দীর্ঘ)। তারা বহু পথ অতিক্রম করে গোমতী নদীর তীরে এক আশ্রম দেখতে পেলেন। সেখানে রাত্রিবাস করলেন।
পরদিন নিষাদগণ দ্বারা সুসজ্জিত নৌকায় গঙ্গা নদী পার হলেন। সেখানে মহাযশা বাল্মীকি মুনির আশ্রমের পাদদেশে সীতাকে রেখে শোকাতুর লক্ষ্মণ সেই হৃদয়বিদারক কথাগুলি উচ্চারণ করলেন, দেবী, জনাপবাদের ভয়ে, কীর্তিহীনতার আশঙ্কায় রাম আমাকে এই কঠোর, মর্মান্তিক আদেশ দিয়েছেন। আমি এইস্থলে, মহর্ষি বাল্মীকির আশ্রম সন্নিকটে আপনাকে (বিসর্জন দিয়ে) রেখে যেতে ...! লক্ষ্মণের সমস্ত কথাগুলি শোনার আগেই সীতা দেবী সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলেছিলেন।
পুনরায় সচেতন হলে সীতা লক্ষ্মণকে যে কথা বলেছিলেন সবিস্তারে তার আলোচনার অবকাশ এখানে নাই, তবে এই প্রথম স্নেহের দেবরটিকে বলতে বাধ্য হলেন, লক্ষ্মণ, দেখে যাও আমার ঋতুকাল অতিক্রান্ত হয়েছে।
তিনি তাঁর গর্ভলক্ষণ জানিয়ে দিয়েছিলেন। তিনি আপন গর্ভস্থ সন্তানের অপরিচিতির নিদারুণ পরিণতি নিয়েও এমনিই আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিলেন যে নারীত্বের সমস্ত লজ্জা, সমস্ত সঙ্কোচ অনাবৃত করতেও দ্বিধা করলেন না।
___________________________________________
এই টা জানা ছিল না ,দারুন জ্ঞানের প্রকাশ!
উত্তরমুছুন