বুধবার, ৩০ জুলাই, ২০২৫

গীতায় অর্জুন-৫


গীতায় অর্জুন- ৫ 


শ্রী মদ্ভগবদ্ গীতায় 'অর্জুন-৪' --- আলোচনা আমরা শেষ করেছি আমাদের বাংলার মহাকবি রবীন্দ্রনাথের একটি সঙ্গীত উদ্ধার করে। আমাদের গ্রামদেশের কথকথার আসরের এমনটিই নিয়ম ছিল যে কথা আরম্ভের সূচনায় এবং কথাশেষে বলা হোত, "করুণাময়ের করুণা আমাদের সকলের উপর ‌বর্ষিত হোক্।" এখানে এই সুখশ্রাব্য রবীন্দ্রনাথের প্রার্থনা সঙ্গীতটি।
এবার আবার ফিরে আসি গীতার ভাবনায়। আসলে যিনি কিছু বলতে চান, বলতে চান জীবনের নিত্যদিনের জৈবিক কামনার প্রয়োজনীয়তার বাইরে মহত্তর আকাঙ্ক্ষার কিছু কথা, প্রশ্ন করতে চান, "এই জীবন লইয়া কি করিব'', জানতে চান অন্তিম বিনাশ বা মৃত্যু সমাসন্ন জেনেও 'কর্মযোগ' সাধনায় কি লাভ --- তাঁর কাছে তাঁর নিজের জীবন ও জগৎ নিরর্থক মনে হয়। এই আশাহত, লক্ষ্যশূন্য, অর্থহীনতায়-ভরা জীবন দুটি পথের একটি পথ বেছে নেয় সে  ---- হয় ভোগবাদ, নয় আত্মহনন। ভোগবাদ মানবতার সমস্ত গুণ হরণ করে নেয়। ভোগবিলাসের জন্য অর্থ চাই, ধন চাই। অফুরান সম্পদের সঞ্চয় চাই। এই সম্পদ আহরণের জন্যই শোষণ, ত্রাসন, লুণ্ঠন। অপরের বিত্ত, অশন-বসন, গ্রাসাচ্ছাদন হরণ থেকে আরম্ভ করে তাকে হত্যা এবং বিতাড়ন করাও চলতে থাকে নির্মম অমানবিকতায়। এই ভোগসর্বস্বতার রূপ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীগত দ্বন্দ্ব থেকে আরম্ভ করে বিশ্বযুদ্ধের আকার ধারণ করে। করেছেও --- মানব সভ্যতায় তেমন নরমেধ যজ্ঞ সংঘটিত হয়েছে সহস্রবার, হয়ে চলেছে আজও। হবেও বা এই নর-সভ্যতার শেষ ধংসকাল পর্যন্ত।
আর ভোগের সুযোগ থেকে বঞ্চিত যারা তারা আশাহারা, ভাষাহারা। ভোগীদের ভোগের সামগ্রী। শিক্ষাদীক্ষা বা জ্ঞানার্জনের পথ তাদের জন্য রুদ্ধ। এমনকি আত্মসম্বিৎহীন এবং জীবনের মূল্য সম্মন্ধেও উদাসীন।  ঐশ্বর্যগর্বী, ভোগবাদী, বিলাসী এই বর্তমান সভ্যতার  মধুচক্রের বা মৌচাকের তারা শ্রমিক মৌমাছি, সেটি নির্মাণ করবার কাজেই তারা বাঁচে ও মরে।
মানব সমাজের এই দুই প্রকার জনগোষ্ঠীর কাছেই 'ধর্ম' আশ্রয়। প্রথম গোষ্ঠী ধর্মের আশ্রয় অবলম্বন করে সুখ-সম্ভোগ অব্যাহত রাখার আর্ত কামনায় ; আর দ্বিতীয় জনগোষ্ঠী ধর্মের আশ্রয় গ্রহন করে জীবনের নিরন্তর দুঃখ থেকে সান্ত্বনা লাভের আশায়। সমাজের এই দুটি শ্রেণীর অভাব বা দারিদ্র্য কিন্তু একই--- শান্তির। এখানেই প্রয়োজন আধ্যাত্মিক সচেতনতার। সমাজে যাঁরা সুযোগপ্রাপ্ত এবং জ্ঞান সাধনায় ব্রতী, তাঁদের উপর এ দায়িত্ব বর্তায় যে তাঁরা সমাজসংসারের সকলকে, ধনবান-ধনহীন নির্বিশেষে আধ্যাত্মিক সচেতনতার দীক্ষা দান করবেন। প্রেয় এবং শ্রেয় -- এই দুই মানবীয়  বিপরীতমুখী কামনার প্রকৃত পরিণাম সম্মন্ধে মানুষকে সচেতন করাই সমাজের পথপ্রদর্শকদের ঐশ্বরীক  'সেবা'পরায়নতা। প্রেয়ভাব (ক্ষণস্থায়ী সুখ সম্ভোগের তৃষ্ণা) অবক্ষয়ী ; কিন্তু শ্রেয়ভাব (সুখে -দুঃখে আনন্দ সন্ধান) অক্ষয় শান্তিলাভের উপায়। "প্রেয়ের সন্ধান হোল সম্পদ, শক্তি আর সুখের সন্ধান  ; কিন্তু শ্রেয়ের সন্ধান অন্য ; এ হোল আধ্যাত্মিকতার সন্ধান ; এ হোল সেই তেজের সন্ধান যা সব সম্পদ, শক্তি ও সুখকে পরিপাক করবে। আধ্যাত্মিক পরিপাক (সকলের মধ্যে ভোগের, ত্যাগের দ্বারা ভোগ) ছাড়া সম্পদ শক্তি ও সুখ মানবাত্মার ক্ষয় সাধন করে, মানবকে খর্ব ও তুচ্ছ করে দেয়।" যতই কেননা সে মানব শক্তিধর (giant) হোক না কেন।
                                                                                      ------ স্বামী রঙ্গনাথানন্দ।


Shakespeare তাঁর Measure for Measure কাব্যে (নাটকে) এই কথাগুলি সুন্দর ভাবে বলেছেন, (ইসাবেলার মুখ দিয়ে  বলিয়েছেন এঞ্জেলোকে),
Angelo: Your brother dies tomorrow ; be content.
Isabella: So you must be the first that gives the sentence.
And he that suffers ! O, it is excellent to have a giant's strength ; but it is tyrannous to use it like a giant. 

শক্তিকেও জ্ঞানের শাসনে ব্যবহার করতে হবে। সেই 'জ্ঞান'য়ের চুড়ান্ত পর্যায়ে আছেন পরমাত্মা। তিনি দ্যুলোক ভূলোক সর্বত্র ব্যপ্ত। 


"আছ অনল অনিলে চির নভোনীলে ভূধরে সাগরে গহনে
আছ বিটপী লতায়, জলদের গায় শশী-তারকায় তপনে।" 

এই 'জ্ঞানসহ ভক্তিযোগে' তাঁর শরণাগত হয়ে কর্মযোগ সাধনা করলে কর্মযোগীর চতুর্বর্গ (পুরুষার্থ) প্রাপ্তি এবং জগতের মঙ্গল সম্ভাবিত হবে। 


শ্রীমদ্ভগবত গীতার সপ্তম অধ্যায়ে আমরা প্রবেশ করেছি। এই অধ্যায়ে শ্রীকৃষ্ণ বলছেন মানুষের আসুরিক শক্তির কোন পরিণামপূর্তি নেই। আধ্যাত্মিক শক্তির দ্বারাই সে পরমগতি বা পূর্ণ জীবন বা জীবনযুদ্ধে চরিতার্থতা লাভ করে। সেই পূর্ণতা, সেই পরম গতি, সেই চরিতার্থতা --- চতুর্বর্গ (ধর্ম অর্থ কাম মোক্ষ) আমিই। এই সপ্তম অধ্যায় থেকেই ভগবান নিজ শ্রীমুখে ভক্তিমার্গের কথা বলছেন।
বলছেন 'ময্যাসক্তমনাঃ' --- সম্পূৰ্ণরূপে আমাতেই আসক্ত হয়ে থাক তবে সমগ্রতার মধ্যে, এই বিশ্বচরাচরের সমস্ত রূপ ও গুণের মধ্যে, বিভূতি-বল- ঐশ্বর্যের মধ্যে, সকল প্রাণের মধ্যে আমাকেই পাবে--- এই বিজ্ঞান (বিশেষ জ্ঞান)-যুক্ত তত্ত্ব জ্ঞান আমি তোমাকে বলব (বক্ষামি) যা জানবার পর আর কিছু প্রশ্ন থাকবে না।
___________________________________________
লক্ষণীয়, অর্জুন কিন্তু এখনো পর্যন্ত শ্রীকৃষ্ণের উপদেশবাণীগুলিকে অসন্দিগ্ধ চিত্তে গ্রহণ করতে পারছেন না। কেননা যুদ্ধ, হত্যা, ধংস ; প্রাণের ক্ষয়, প্রতিষ্ঠার লয় --- এমন এক সর্বনাশের কাল যখন আসন্ন, তখন পরমার্থ, পরমাত্মন চিন্তার অবকাশ কোথায়‌ ? এমন প্রশ্নই তো অর্জুন করেছিলেন ষষ্ঠ অধ্যায়ে (৩৮তম শ্লোকে) 'কচ্চিৎ ন উভয়বিভ্রষ্টঃ ছিন্নাভ্রমিব নশ্যতি।'' পরমাত্মা 'ব্রহ্মণঃ' প্রাপ্তি আর সাংসারিক ভোগ-সুখ -- এই উভয়বিধ চরিতার্থতাই ভ্রষ্ট হবে না কি যদি তোমার কথাই পালন করি।
_______________________________________________


যাই হোক্, আমরা পুনর্বার শ্রীকৃষ্ণের উপদেশবাণী শ্রবণ করি : দেখ অর্জুন, সহস্র সহস্র মানুষের মধ্যে কেও কেও  (কশ্চিত) আমার প্রতি অনুরক্ত হয়ে, তত্ত্বের জ্ঞানে আমাকে যথার্থরূপে জানে। সেই তাত্ত্বিক হয়তো জানে, 'প্রকৃতিরষ্ঠধা' ---- ভূমি, জল, অগ্নি, বায়ু, আকাশ, মন, বুদ্ধি আর অহংকার---- আমারই স্ব-ভাব। এই অষ্ট প্রকারের জড় প্রকৃতি ছাড়াও আমার যে 'জীবভূতাম' চেতন প্রকৃতি, তাই 'পরাম্' বা পরম চৈতন্যসত্ত্বা, যার দ্বারা এই জগৎ ধারণ করা হয় -- 'যয়েদং ধার্যতে জগৎ।' আমার এই দুই প্রকার প্রকৃতি হতে সকল ভূতসত্ত্বার সৃষ্টি। এই সৃষ্টির আবার প্রলয় রূপও আমি।
এখানে শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, এই যে দৃশ্য জগৎ তার সৃষ্টি এবং বিলয়ের হেতু আমিই।  'আমি' ছাড়া আর কিছুর আলাদা অস্তিত্ব নেই। এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে যা দেখছ, অনুভব করছ সকল, সমস্ত 'ভাব ও অভাব' --- দৃশ্যমান বস্তুসমূহ এবং অদৃশ্য শক্তি --- আমাতে মণিখণ্ডের মত গ্রথিত।
"ময়ি সর্বমিদং প্রোতং সূত্রে মণিগণা ইব।"
(শুধুমাত্র যোগমার্গের সাধকেরাই যে গীতার শব্দের, বাক্যের অর্থে মগ্ন হন তাই নয়, সাহিত্যরসের রসবেত্তারাও এমন সংগীতময় ধ্বনি ও ব্যঞ্জনায় মুগ্ধ হয়ে যান)।
সে কথা আবার বলছেনও --- হে পার্থ, তুমি জেনো জলে আমি রসস্বরূপ, চন্দ্রে সূর্যে আলোর প্রকাশ, বেদে 'ওঁকার', আকাশে শব্দ, পুরুষে পৌরুষ। আমিই রূপ-রস গন্ধ-স্পর্শ। আমি অগ্নিতে তেজ, সকল জীবিতের‌ জীবন, সকল তপস্বীদের তপস্যা। এই ভূত জগতের (সৃষ্টির) কারণ, আদি বীজরূপ আমি। মানব চেতনার বোধ, বুদ্ধি, কামনা-অনুরাগ-বিবর্জিত পুরুষের বল, নীতিশাস্ত্র-সম্মত কর্মের প্রেরণাও আমি। বিশ্বচরাচরের বিরাজমান পরমাত্মা, পরমাত্মা থেকে সত্ত্ব-তম-রজোগুণ সমন্বিত  সকল বস্তু ও অবস্তুর "সৃষ্টি আমা হতেই"। কিন্তু এই সকল গুণত্রয়-বিশিষ্ট সবিকার ভূতের (ভৌতিক পদার্থ) মধ্যে আমি নেই, আমাতেও তারা নেই। "ন তু অহম তেষু তে ময়ি।" 


কি বিপদ, ভাবুন একবার ! চিন্তা করুন অর্জুনের মনের অবস্থা ! স্বয়ং যিনি দাঁড়িয়ে রয়েছেন তাঁর সম্মুখে, তাঁরই রথের সারথি (যোগীগণ ভাবছেন চিরচলমানতার মধ্যে অচল, অচঞ্চল, নির্বিকার চৈতন্যসত্তা), তিনি কিনা বাঙ্ময় মূর্তি হয়ে বলছেন, "সৃষ্টির হেতু তিনি, তার থেকে ত্রিগুণযুক্ত ভাব দ্বারা, ভিন্নার্থে বিকার দ্বারা এই সৃষ্টজগত মোহিত হয়ে আছে --- এবং সেই তিন গুণের (সত্ত্ব, রজঃ, তম) অতীত, নির্গুণ বা গুণাতীত, নির্বিকার, ভাব-অভাব- নিরপেক্ষ, জড়-জগতের মধ্যে সম্পৃক্ত অথচ জগতাতীত-- এমন সত্ত্বা তো মানবীয় বোধবুদ্ধির জ্ঞানে ধরা যায় না। তবে ? অর্জুন ভাবছেন, কে এই পুরুষ ? কৃষ্ণ যেন ধীরে ধীরে সামনে থেকেও দূরে, দূর থেকেও সুদূরে ক্রমশ অপসৃয়মান হতে হতে পরিদৃশ্যমান এই কুরুক্ষেত্র ছাড়িয়ে, পরিচিত এই দেশকাল ছাড়িয়ে, নিখিল ভূবনের পরপার হতে আগত আলোর জ্যোতির্ময় শিখা। "পরাহমেকং পুরুষ মহান্তং আদিত্যবর্ণং তমস পরস্তাৎ।" 

যোগীরা ধ্যানের মধ্যে এই ত্রিগুণময়ী মায়াজাল, মোহান্ধকার ছিন্ন করতে পারেন। শ্রীকৃষ্ণ তাইই বলছেন। এই দৃশ্য জগত সত্ত্বার বিকৃতি। আর এই বিকৃতিপ্রাপ্ত, প্রকৃতিরূপ জগতের পারে জগতাতীত যে আলোময় 'পরম অব্যয়ম' চৈতন্যস্বরূপ আমাকে জানতে না পারার কারণ মায়া। "দৈবী হি এষা গুণময়ী মম মায়া দুরত্যয়া।" মায়ার অন্ধকার ছিন্ন করা সুকঠিন যদি  আমাকে, অর্থাৎ সৃষ্টির চৈতন্যস্বরূপকে নিরন্তর ভজনা না কর।


"ন মাং দুষ্কৃতিনো মূঢ়াঃ প্রপদ্যন্তে নরাধমাঃ।
মায়য়াপহৃতজ্ঞানা আসুরং ভাবমাশ্রিতা।।" 

দেখ অর্জুন, মায়া দ্বারা অপহৃতজ্ঞান, আসুরী ভাবাশ্রিত দুষ্কৃতি, মূঢ়, নরাধম যারা তারা তো ভজনা করে না। ভগবৎ আরাধনার প্রবৃত্তি নাই যাদের তারা আসুরীস্বভাব। এই দৃশ্যমান জগতের মায়া যে মোহের আবরণ সৃষ্টি করে তাকে ছিন্ন করতে হলে আসুরীস্বভাব ত্যাগ করতে হবে। 

এরপর শ্রীকৃষ্ণ, ভিন্ন ভিন্ন শ্রেণীর ভক্তের কথা বলেছেন। বলেছেন তারা কেও অর্থার্থী (বিত্তকামী), কেও আর্ত, কেও জিজ্ঞাসু, কেও বা আবার কামনা-বাসনাহীন। এদের মধ্যে জ্ঞানী ভক্ত আমার প্রিয়। তবে নিষ্কাম জ্ঞানী, আমাতেই-স্থিত এমন ভক্ত বড়ই বিরল। বহু বহু জন্মের পর, অন্তিমে পরম তত্বজ্ঞানী এই বিশ্বাস করে যে সর্ব ব্যপ্ত সত্ত্বা বাসুদেব এবং এই ভাব নিয়ে তাকে যে ভজনা করে তেমন মহাত্মা সুদুর্লভ --- ''সঃ মহাত্মা সুদুর্লভঃ।" তাঁকে ছাড়া, ভোগের (সামগ্রী) কামনায়, যারা অন্য অন্য দেবতার ভজনা করে, এবং যদি শ্রদ্ধার সঙ্গে ভজনা করে  তবে তাঁকেও শ্রদ্ধায় অচঞ্চল হবার জন্য সুমতি প্রদান করেন। অন্যান্য দেবতাদের শ্রদ্ধার দ্বারা ('শ্রদ্ধয়া') পূজা করলে আমা কর্তৃক সেই পূজক ও ইষ্টফল লাভ করে। 

(এখানে ঋকবেদোক্ত বিবিধ বাসনা-কামনা পূর্ণ করবার জন্য স্বতন্ত্র স্বতন্ত্র দেবতার আরাধনার প্রসঙ্গ উল্লেখিত। উপসংহারে আলোচিত হবে।) 

আমার অব্যক্ত, সচ্চিদানন্দঘন পরমাত্মার রূপ সকলে অনুভব করতে পারে না এইজন্যই যে আমি যোগমায়া দ্বারা আবৃত। হে অর্জুন, ভগবান শ্রীকৃষ্ণ আবার বলছেন, যা হয়েছে, যা হচ্ছে এবং যা হবে সবই আমি জানি কিন্তু ভক্তিরহিত পুরুষ আমাকে জানে  না।

____________________________________________


('মায়া বা যোগমায়া' বিষয়টি অত্যন্ত জটীল ও ভারতীয় পুরাণ সাহিত্যে, বিশেষ করে মাকেণ্ডেয় পুরাণ, অগ্নি পুরাণ, শ্রী মদ্ভগবদ্ পুরাণে এবং গীতায় ব্যাপকতররূপে আলোচিত হয়েছে। কৃষ্ণ ও তাঁর একই দিনে জন্ম হয়েছিল। তিনিই নন্দজায়া যশোদার কোলে কন্যারূপে জন্ম নেন ; আর কৃষ্ণ জন্ম নিয়েছিলেন বসুদেবপত্নী দেবকীর কোলে, কংসের কারাগারে । পরে তাঁদের আঁতুরঘর পরিবর্তনের নাটকীয় কাহিনী। উপরোক্ত পুরাণগুলির বর্ণনায় কৃষ্ণের হ্লাদিনী শক্তিরূপে কৃষ্ণের প্রাণ রক্ষা করবেন বলেই যোগমায়ার জন্ম। বিষ্ণুর কৃষ্ণ অবতার লীলায় এই যোগমায়া সকল সময়ে, সকল অবস্থায় অদৃশ্যভাবে অবস্থান করেছেন। জিজ্ঞাসু্ ও ভক্ত পাঠকগণ অবশ্যই কৃষ্ণলীলা বিষয়ক অমৃতনিস্যন্দী গন্থগুলি পাঠ করেছেন বা করবেন।)
______________________________________________


রাগ, দ্বন্দ্ব, সুখ, দুঃখ সব আসে ইচ্ছা বা তীব্র মনস্কামনা থেকে ; ফলতঃ মানুষ অসার সৌভাগ্যের স্বপ্নে সম্মোহিত হয়। জীবনের পরম প্রাপ্তির জন্যেই 'দ্বন্দ্বমোহনির্মুক্ত' হয়ে, দৃঢ়ব্রতী হয়ে, আমাকে (ভগবানকে) ভজনা করলে পাপমুক্ত হয়। এমন অধ্যাত্ম জীবন, প্রকৃত কর্মজীবন এবং  ব্রহ্মকে জানবার জন্যও ভগবৎ-শরণই একমাত্র পন্থা।
জরামরণমোক্ষায় মামাশ্রিত যতন্তি যে।
তে ব্রহ্ম তদ্বিদু কৃৎস্নমধ্যাত্মং কর্ম চালিনম।। 

আবার যে পুরুষ অধিদৈব, অধিভূত, অধিযজ্ঞের --- প্রকৃতির ভৌতিক বিকার, দৈবিক বিকার এবং মানবাত্মার যে বিভিন্নতা, সে সবের মূলে যে 'আমি', (সূচনায় ও অন্তিমকালে এক পরমব্রহ্ম, 'অন্তিমে সব একাঙ্গী') সেই পুরুষ আমাকেই (মরণ পারেও) প্রাপ্ত হন। জলেতে মিলায় জল। 


এইভাবে সপ্তম অধ্যায়ের 'জ্ঞানবিজ্ঞানযোগ' বিষয়ক উপদেশবাণীর ঘোর জটীলতার শেষ পর্যায়ে অর্জুন যেমন স্বস্তি পেলেন এই ভেবে যে সখা বাসুদেবের শরণ নিলে জীবনের উদ্দেশ্যে সাধনের পথ তিনিই দেখাবেন,  তেমনি যিনি মহোপনিষদ গীতার পাঠক তিনিও এই ভরসা পাবেন, যোগী না হতে পারলেও, ভক্তির পথ তো আছে। আর যদি এই বিশ্বচরাচরের আদিতেও তিনি, অন্তেও তিনি, প্রকৃতির সকল বস্তুতে, সকল প্রাণেই তিনি তবে আমিও তো তিনিই। আমার মত কিংকর্তব্যবিমূঢ় গীতাপাঠক তখনই আত্মনিবেদন করবে, বলবে,
"আমিও তোমারি গো তোমারি সকলি তো,
জানিয়ে জানেনা এ মোহহত চিত।
আমারি বলে কেন ভ্রান্তি হোল হেন--
ভাঙো এ অহমিকা মিথ্যা গৌরব।।"
                               --------- কান্তকবি।
কিন্তু অর্জুন যে মহারথী। তিনিও তো প্রলয়ঙ্করী শক্তির আধার। সেই শক্তির প্রয়োগের ক্ষেত্র এই কুরুক্ষেত্রে এসব কি 'কথা ! একই সঙ্গে যোগের দুরূহ সাধনা এবং সমরাঙ্গনে সংহার ! তার উপর আবার অধ্যাত্ম, অধিদৈব, অধিভূত--য়ের মত দুর্বোধ্য শব্দজাল ! "হে সখা, আমি বিভ্রান্ত, বোঝাও আমাকে", বলে' অষ্টম অধ্যায়ে, শ্রীকৃষ্ণকে সাতটি প্রশ্ন করলেন অর্জুন। 


আমরা পরের পর্বে জীবনের কুরুক্ষেত্র- সমরাঙ্গণে দুই পুরুষশ্রেষ্ঠ, কৃষ্ণার্জুনের আলাপন যেন কৃপাসিন্ধুর কৃপায় শ্রবণ করতে পারি।
যুদ্ধোন্মত্ত ধরাধামে শান্তির সঙ্খস্বর ধ্বনিত হোক্।
                             (ক্রমশঃ)

দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
১২ই শ্রাবণ,১৪৩২
২৯/৭/২০২৫,
ব্যাঙ্গালোর।


রবিবার, ২০ জুলাই, ২০২৫

গীতায় অর্জুন-৪



গীতায় অর্জুন-৪ 


আমরা শ্রীমদ্ভগবত গীতার পঞ্চম অধ্যায়ে এসে উপস্থিত হয়েছি। বিগত অধ্যায়ের শেষে অর্জুন তার কিংকর্তব্যবিমূঢ়তার কথা জানিয়ে শ্রীকৃষ্ণকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন মানুষের নিষ্কাম কর্মযোগ ও কর্মবন্ধন ছিন্ন করার সাধনার মধ্যে কোনটি অধিকতর শ্রেয়ষ্কর। এখানে আবারো ওই "ওঠো, জাগো, যুদ্ধ কর" -- তত্ত্বের আপাত  প্রয়োজনীয়তার নিরিখে 'নিষ্কাম কর্মযোগের' কথাই বলেছেন। বলেছেন 'নিষ্কাম কর্মযোগ'ই শ্রেষ্ঠ কিন্তু একই সঙ্গে বলছেন, যে পুরুষ অন্যকে দ্বেষ করেনা, আকাঙ্ক্ষা করে না, নিত্য সন্ন্যাসী, নির্দ্বন্দ্ব --- সে সংসার-বন্ধন থেকে আনন্দপূর্বক মুক্ত হয়ে যায়। এরপর পঞ্চম অধ্যায়ের 'শ্রীভগবানুবাচ' দ্বিতীয় শ্লোক থেকে নিষ্কাম কর্মযোগের, ও নিষ্কাম কর্মযোগীর প্রশংসা, সাংখ্যযোগের গূঢ় তত্ত্বের আলোচনার, ( সাংখ্যযোগ ও জ্ঞানযোগ অবিভাজ্যও বলা হয়েছে) বেদবাণী অনর্গল স্ফুরিত হয়েছে সমগ্র পঞ্চম অধ্যায় জুড়ে। কেমন হবে প্রকৃত সাংখ্যযোগীর লক্ষণগুলি। ভগবান বলছেনঃ 


"নৈব কিঞ্চিৎ করোমীতি যুক্তো মন্যেত তত্ত্ববিৎ।
পশ্যন্ শৃন্বন্ স্পৃশন্ জিঘ্রন্নশ্নন্ গচ্ছন্ স্বপন্ শ্বসন্।।
প্রলপন্ বিসৃজন্ গৃহ্ণন্ন ন্মিষন্নিমিষন্নপি।
ইন্দ্রয়াণীন্দ্রিয়ার্থেষু বর্তন্ত ইতি ধারয়ন।‌" 

ভাবুন একবার, কী ভয়ঙ্কর এই যোগসাধনা ! যিনি সাংখ্যযোগী হবেন তিনি দর্শন, শ্রবণ, স্পৃশন্ (স্পর্শ করা), আঘ্রাণ, ভোজন, গমন, শয়ন, শ্বাসগ্রহণ, কথন,  ত্যাগ, গ্রহণ, চক্ষুরুন্মীলন এবং নীমিলন --- ইন্দ্রিয় আচরিত ও প্রবর্তিত সমস্ত কিছুই করবেন ; কিন্তু এইরকম ধারণা করবেন যে তিনি কিছুই করছেন না। দেহজ, দেহস্থ ইন্দ্রিয়গুলি যার যা স্বভাবজাত স্ফুরণ তাই ঘটছে, আমি কিছুই  করছি না। 'সবই তার কাজ, তিনিই করাচ্ছেন' --- এমন নির্লিপ্ততার সঙ্গে যিনি কর্ম করেন জলের উপর পদ্মপত্রের মত তিনি পাপ দ্বারা লিপ্ত হন না --- "লিপ্যতে ন স পাপেন পদ্মপত্রমিব অম্ভসা"। 

এই ভাবে পঞ্চম অধ্যায়ের ২৯তম শ্লোক পর্যন্ত শ্রীকৃষ্ণ কর্ম ও সন্ন্যাসযোগের গভীর থেকে গভীরতর, গভীরতম সাধন-ধ্যান-নিধিধ্যাসনের পন্থার বর্ণনা করেছেন, উদাহরণ দিয়েছেন এবং অনুরূপ তপশ্চর্যার মধ্য দিয়ে কি ভাবে পরমাত্মা পরমেশ্বরকে লাভ করা যায়, পরম শান্তি প্রাপ্ত হওয়া যায় তার উপদেশ প্রদান করেছেন -- এবং তিনিই যে সেই 'সর্বলোকমহেশ্বরম' সে কথাও স্বমুখে ব্যক্ত করেছেন। ইন্দ্রিয়গুলির আকর্ষণকারী, বাইরের বিষয়ভোগগুলি ত্যাগ করে, চক্ষুর দৃষ্টিকে ভ্রুযুগলের মধ্যিখানে ন্যস্ত করে শ্বাস-প্রশ্বাসের দ্বারা বিচরণকারী প্রাণ-বায়ুকে 'সমে' স্থাপনা করে, মন-বুদ্ধি-ইন্দ্রিয়-বিক্ষোভ সংহত করে 'পরমাত্মার নিরন্তর স্মরণে মগ্ন ' সদামুক্ত মুনি (মননযোগী) তাঁকে লাভ করেন। 

ভোক্তারং যজ্ঞতপসাং 'সর্বলোকমহেশ্বম'।
সুহৃদং সর্বভূতানাং জ্ঞাতা মাং শান্তিমৃচ্ছতি।। 


ষষ্ঠ অধ্যায়েও এই পঞ্চম অধ্যায়েরই বিস্তৃততর উপদেশ রয়েছে। আবারো ওই নিষ্কাম কর্মযোগ, যোগমার্গের নিয়ম, আত্মজ্ঞান, আত্ম উদ্ধারের আকুতি ও প্রেরণা, মনের চঞ্চলতা দূরিকরণ, মননিগ্রহ এবং পুরুষ যোগভ্রষ্ট হলে তার কি গতি হয় --- এ সমস্ত উপদেশামৃত বর্তমান অধ্যায়েও বর্ষিত হয়েছে। শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, তাঁর উপদেশমত ঐরূপ যোগ সাধনায় যিনি স্থিত হন তিনি সর্বত্র, সর্বসময়, সকল স্থানে, সকল ভূতে (সকল প্রাণের মধ্যে), আমাকেই দেখে, আমার মধ্যে সমস্তকে দেখে এবং  সমস্ত কর্মে থেকেও আমাতেই থাকে ( সচ্চিদানন্দঘনরূপ জগতাত্মায় লীন হয়ে চিরশান্তি লাভ করে)। সুখ দুঃখ তাঁর কাছে একাকার, সকল প্রাণ তাঁর কাছে আত্মবৎ।
এতক্ষণ যোগ, যোগমার্গের নিয়ম, যোগমগ্নতা ও যোগীর লক্ষণ ও পরমপ্রাপ্তির পথনির্দেশ তন্ময়ভাবে শ্রবণ করবার পর ষষ্ঠ অধ্যায়ের ৩৩ ও ৩৪-তম শ্লোকে আবারও অর্জুন জানতে চাইছেন: "আপনার কথিত এই মহাভাবে আমি মনোযোগ দেব কি করে ? এই যে ধ্যানযোগে আপনি সমত্বভাবের কথা বলছেন তা আমার মনের মধ্যে দীর্ঘকাল স্থায়ী হবে না। 

চঞ্চলং হি মনঃ কৃষ্ণ প্রমাথি বলবে দৃঢ়ম।
তস্যাহং নিগ্রহং মন্যে বায়োরিব সুদুষ্করম্।।" 

মনের মধ্যে নিত্য আলোড়ন সৃষ্টি হয়, সে প্রবল শক্তিশালী, দার্ঢ্যভাবসম্পন্ন। বায়ুকে যেমন বশ করা যায়‌ না, ঠিক তেমনি মনকেও স্ববশে রাখা "সুদুষ্কর্মম্ মন্যে।"
অর্জুনের এই কথাগুলি সর্বশক্তিমান, সর্বময়, পরমাত্মার পূর্ণ অবতার- (যদা যদাংহি ধর্মস্য গ্লানির্ভবতি ভারত..." স্মর্তব্য), -রূপে যিনি এস্থলে বিরাজমান, সেই ভগবান শ্রীকৃষ্ণের উপদেশবাণীগুলির জ্যোতিঃ বিচ্ছুরণে বেশ নিষ্প্রভ হয়ে গিয়েছে  ; কিন্তু অর্জুনের কথাগুলিও কঠোর বাস্তবতার পরিচায়ক। গীতার আলোচনায়, শ্রীকৃষ্ণের উপদেশবাণী নিয়ে বার বার সাংখ্যযোগ, সাংখ্যদর্শনের কথা আসে যে 'সাংখ্য' আদিতে 'নিরীশ্বরবাদীই' ছিল। এমনকি কিছু কিছু পণ্ডিতদের মতে আদিতে সাংখ্য শুধুমাত্র 'নিরীশ্বরবাদীই' ছিল না, বস্তুবাদী বা জড়বাদীও ছিল। অর্থাৎ 'অচেতন প্রধানের' পক্ষে জগৎকারণ বা জগৎ সৃষ্টির কারণ হওয়া সম্ভব ছিল। এস্থলে অর্জুন শ্রীকৃষ্ণকে যে কথাগুলি বলেছেন (বায়ুকে যেমন বশ করা যায় না..... ইত্যাদি) সেগুলির মধ্যে বস্তুবিশ্বের মহাশক্তির যুক্তিই প্রাধান্য পেয়েছে, এবং শ্রীকৃষ্ণ যে বাণীসমূহ উচ্চারণ করেছেন, করছেন ও করবেন সেগুলির সঙ্গে সরাসরি বেদবাদী (ব্রহ্মবাদীও আখ্যা দেওয়া যায়‌) এবং বেদবিরোধী আদি সাংখ্যেয় দ্বন্দ্ব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। 

"বৈদিক পুরোহিতের কাছে স্বর্গই ছিল পরম পুরুষার্থ। কিন্তু এর বিরুদ্ধে সাংখ্য প্রবল প্রতিবাদ ঘোষণা করতে থাকে এবং প্রমাণ করতে চায়  স্বর্গের কথা অমূলক  এবং বৈদিক যাগযজ্ঞ অনর্থক।" 

                    ------ পুরাণবিদ্ পুলিনবিহারী চক্রবর্তী 


এখানে একটি শাস্ত্রীয় বিরোধের কথা বলে রাখা ভালো যে শ্রীমদ্ভগবত গীতায় যে সাংখ্য যোগের বর্ণনা ও ব্যাখ্যা আমরা পাই তা কপিল প্রবর্তিত আদি সাংখ্য দর্শনের নিরীশ্বরবাদের সাথে মেলে না। কপিল ছিলেন ঈশ্বরে 'অবিশ্বাসী', অর্থাৎ নাস্তিক, বস্তু তথা জড়বাদী যা সমকালের লোকায়ত দর্শনের অস্তিত্বের আত্মঘোষণা।
"... মহাভারত, ভাগবত ও পুরাণ, এই সকল গ্রন্থে কপিল সম্মন্ধে যেরূপ ইতিহাস প্রকটিত আছে তাহা দেখিলে কপিল ঈশ্বরনাস্তিক ছিলেন বলা দূরে থাকুক, তিনি সম্পূর্ণ আস্তিক, ঈশ্বরের প্রধান ভক্ত বা অবতার না বলিয়া থাকা যায়‌ না। কিন্তু তাহার গ্রন্থ দেখিলে অনুভব হয়, তিনি ঈশ্বরনাস্তিকদের অগ্রগন্য।" 

           'সাংখ্যদর্শনম' -- পণ্ডিত কালিবর বেদান্তবাগীশ। 

'সাংখ্য'-য়ে যে প্রকৃতিই বা অচেতন জড়-জগতই প্রধান তা নয়--- এমনটি বলেন আধুনিক বিদ্বানকুল। তাঁরা তাই সাংখ্যদর্শনকে বস্তুবাদী না বলে দ্বৈতবাদী বলতে চান এই কারণ দেখিয়েই যে কপিল প্রকৃতি ছাড়াও পুরুষকে স্বীকার করেছেন। এবং পুরুষকে স্বীকার করেছেন বলেই তিনিও, সাংখ্যকার কপিল চেতনকেও স্বীকার করছেন। আর চেতনকে স্বীকার করা মানেই পরম চৈতন্যময় ব্রহ্মকে স্বীকার করা। কিন্তু আদি সাংখ্যদর্শনের বিষয়টি 'এবম্প্রকার নহে' --- এরকম নয়। কপিল দর্শনে 'প্রকৃতি বা বস্তুবিশ্ব' এক, অভিন্ন এবং স্বয়ংনিয়ন্ত্রিত স্বতন্ত্র সত্ত্বা। সেখানে প্রজননগত কারণে প্রাকৃতিক নারী পুরুষ আলাদা আলাদা আছে বলেই পুরুষ নামক চেতন সত্ত্বাকে স্থাপনা করেছেন ব্রহ্মবাদীরা। 

(যাই হোক্, আমরা অর্জুনের‌ প্রশ্নগুলির গভীরতার প্রতি শ্রদ্ধাশীল পাঠকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করবার প্রয়াসেই এমন জটীল এক দার্শনিক তত্ত্বের অবতারণা করেছি।)
আবারও ফিরে আসি শ্রীকৃষ্ণ ও অর্জুনের কথপোকথনের প্রসঙ্গে। ৩৫ তম এবং ৩৬ তম শ্লোকে (ষষ্ঠ অধ্যায়) শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে মনের চঞ্চলতা নিরসনের উপায় সম্মন্ধে উপদেশ দান করে জানালেন যে  'অভ্যাসেন' আর 'বৈরাগ্যেন' ---- বার বার অভ্যাসের দ্বারা, বৈরাগ্যের দ্বারা চিত্তবিক্ষোভকে প্রশমিত করে, ধ্যানতন্ময়তার মাধ্যমে 'মন' নামক পরিবর্তনশীল 'বিকার'কে বশীভূত করা যায়‌। মন আত্ম নিয়ন্ত্রণে নেই এমন পুরুষ যোগ প্রাপ্ত হতে পারে না। স্ব- অধীনে থাকা, যত্নশীল পুরুষ, সাধনার বলে সহজেই মনকে বশীভূত করতে সক্ষম বলে আমি মনে করি।

 
(এখানে একটি গূঢ়ার্থ বিষয় আমাদের স্মরণে রেখে দিতে হবে যে এই যে 'অভ্যাস ও বৈরাগ্যের' কথা শ্রীকৃষ্ণ  বলছেন সে কি এই ভয়ঙ্কর যুদ্ধারম্ভের প্রাক্ কালে অর্জুনের মত একজন যোদ্ধার পক্ষে গ্রহণ করা, আত্মস্থ করা এবং তা জীবনাচরণে পালন করে যুদ্ধ করা সম্ভব ? তৃতীয় পাণ্ডব পার্থর সঙ্গে তো কৃষ্ণের কতকালের সখ্য ; আগে তো কৃ্ষ্ণ এমন ধর্মোপদেশ কখনো সখার প্রতি উচ্চারণ করেন নি। এটি একটি গভীর আধ্যাত্মিক জ্ঞান ও আত্মান্বেষণের পাঠ। আমরা প্রবন্ধের শেষের দিকে তা আলোচনা করব।) 

এখানে অর্জুন আরো সংশয়ান্বিত। পর পর তিনটি শ্লোকবাক্যে (৩৭, ৩৮, ৩৯তম) তার সংশয় আর্ত মানুষের মত অভিব্যক্ত হয়েছে। বলছেন শ্রদ্ধা আছে অথচ মনঃসংযোগ ছিন্ন হবার কারণে যদি কোন পুরুষের যোগসিদ্ধি লাভ না হয়।, যদি তার 'সংসিদ্ধিম' বা পরমাত্মার সঙ্গে একাত্মতা না ঘটে, যদি তেমন পরম সিদ্ধি লাভ না করে তবে তার কি গতি হবে ? সে কি পরমাত্মাকে (ব্রহ্ম বা ঈশ্বর) পাবে না ? জীবনে চরিতার্থতা লাভের পথে বিমূঢ়, আশ্রয়হারা হয়ে শারদাকাশের ছিন্ন বিচ্ছিন্ন মেঘের ন্যায় দিকভ্রষ্ট হয়ে দুকূলই হারাবে ? না হবে ভগবৎ (ব্রহ্মণঃ) প্রাপ্তি, না পাবে সংসারের ভোগ-সুখ ! (সেই ব্রহ্মতত্ত্ব অভিমুখে ধীরে ধীরে অভিগমন !) হে মহাবাহো, আমি অঙ্কিত সংশয়ক্লিষ্ট ! 

কচ্চিন্নোভয়বিভ্রষ্টঃ ছিন্নাভ্রম ইব নশ্যতি।
অপ্রতিষ্ঠো মহাবাহো বিমূঢ়ো ব্রহ্মণঃ পথি।।
এতন্মে সংশয়ং কৃষ্ণ ছেত্তুমর্হস্যশেষতঃ।
তদন্যঃ সংশয়সাস্য ছেত্তা ন  হি উপপদ্যদে।।' 

অর্জুন বলছেন, এই যে আমার চিত্ত-আচ্ছন্নকারী সংশয়, আপনি ছাড়া আর কেও নেই যিনি তা ছেদন করতে পারেন।
‌অসীম নীলিমায় ভাসমান, লক্ষহীন, দিকভ্রষ্ট মেঘখণ্ডের সাথে দেবরাজ ইন্দ্রের 'বর'পুত্র, কুন্তীনন্দন এখানে যেন মর্ত্য-মানবের প্রতিভূ --- যম সন্নিধানে নচিকেতার মত  আত্মোৎসর্গ করে বলছেন,--- "আপনি ছাড়া আর কে আছে আমার মূঢ়তা দূরিভূত করতে পারে ?"
‌"কচ্চিন্নোভয়বিভ্রষ্টঃ ছিন্নাভ্রমিব" --- কী অপরূপ এই উপমা-অনুপ্রাস ঝংকৃত শব্দালঙ্কার, বাক্যালঙ্কার ! গীতার গীতধ্বনিময় বাণীগুলিই সমস্ত মন-প্রাণ-চিত্তকে মোহিত করে রাখে। তাই রসশাস্ত্রের পণ্ডিতেরা বলেন শ্রীমদ্ভগবত গীতা যেন ভগবান শ্রীকৃষ্ণের আবক্ষবিলম্বিত কণ্ঠহারের মধ্যস্থিত কৌস্তুভ মণি।
‌অর্জুনে সংশয় নিরসনের প্রয়াসে এবার সর্বজ্ঞাতা জনার্দন বলছেন এবং যেন 'অধিকারীরূপে' বলছেন, (তিনি ত্রিলোকাধিকারী অপরা শক্তির মূর্ত বিগ্রহ) শুভকর্মে, ভগবানের নিমিত্তে কর্মের সঙ্কল্পীদের দুর্গতি হয় না। যদি তাঁরা কখনো যোগভ্রষ্ট হন তবু তাঁরা স্বর্গ (উত্তম লোক) লাভ করেন, সেখানে কিছুদিন পরম শান্তিতে বাস করেন, তারপর আবার শুদ্ধাচারী ঐশ্বর্যবানদের ঘরে জন্মলাভ করেন। অথবা তাঁরা, যোগভ্রষ্ট অথচ  বৈরাগ্যবান পুরুষগণ, স্বর্গপ্রাপ্ত না হলেও এই সংসারেই দুর্লভ যোগীকুলে জন্মগ্রহন করেন। সঙ্গে নিয়ে আসেন পূর্ব পূর্ব জন্মের সাধিত সংস্কার এবং আবারো ভগবান প্রাপ্তির আরাধনা করেন। তখন বিগত জন্মের ঐ সকল সংস্কার তাদেরকে 'সমত্ববুদ্ধিযোগে' সিদ্ধি লাভ করতে সাহায্য করে। জন্ম জন্ম ধরে অতি যত্ন সহকারে এমত যোগ অভ্যাসের দ্বারাই পরম গতি প্রাপ্ত  হওয়া যায়। তপস্বীদের, জ্ঞানমার্গীদের চাইতে যোগীগণ শ্রেষ্ঠতর এবং তাদের চাইতেও ধ্যানযোগীরা আরও ঋদ্ধিবান --তাঁরা শ্রেষ্ঠতম। তাঁদের সঙ্গে আমার একাত্মতা। 

                                     ------(কর্মফলানুসারী জন্মান্তরবাদ, বৌদ্ধদর্শন। পরে আলোচিত )।

"যোগিনামপি সর্বেষাং মদ্গতেন অন্তরাত্মনা।
শ্রদ্ধাবান ভজতে তো মাং স মে যুক্ততমো মতঃ।। 


ষষ্ঠ অধ্যায় 'আত্মসংযমযোগ'। এখান থেকেই অধিকতর যুক্তিপূর্ণভাবে শ্রীকৃষ্ণ 'আমিত্বকে' (স্রষ্টাএবং দ্রষ্টা) অনাবৃত করেছেন এবং  উপনিষদোক্ত 'অহম ব্রহ্মাস্মি'-র  গুহ্য পথের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করেছেন। বলেছেন "শ্রদ্ধাবান হও, আমাকে ভজনা কর।" 

অবশ্য পঞ্চম অধ্যায়ের ২৬তম শ্লোকেও বলেছেন, কামবিযুক্ত (এখানে কামনা অর্থে), ক্রোধরহিত, সংযতচিত্ত প্রজ্ঞাবান পুরুষেরাই পরমাত্মার সাক্ষাতে সক্ষম হন এবং অনুভব করেন সকল জগৎ ও জগদাতীত সংসারের সর্বত্র শান্ত, পরমব্রহ্ম স্থিত আছেন "অভিতো ব্রহ্মনির্বাণং বর্ততে।" 

('ব্রহ্মনির্বাণম্ শান্তম্ পরমেশ্বরম্' --- এই শব্দগুচ্ছে পাঁচটি ভিন্ন ভিন্ন শব্দ। শ্রীমদ্ভগবত গীতার গূঢ়তম অর্থ নিহিত আছে এই শব্দগুলির অভ্যন্তরে। ভগবান শঙ্করাচার্যের ভাষ্যে তার অমৃতময় আলোকাভাস  প্রতিভাসিত--- তাঁর দৈবকৃপা অযাচিত বর্ষিত হলে একদিন আমরা সামান্য ধারণা করবার প্রয়াস পাব)।

ষষ্ঠ অধ্যায়ের পর থেকে অর্জুনসারথি শ্রীকৃষ্ণকে নিখিল ভূবনের সারথিরূপে তাঁরাই দেখতে পাবেন, পেয়েছেন,  রথারূঢ় অর্জুনের মত যাঁরা তাঁরই করুণায় তেমন দৈবদৃষ্টি লাভ করেছেন। 

"অহম ব্রহ্মাস্মি" --- বৃহদারণ্যক উপনিষদের এই মহাবাক্যের আলোচনা শুধুমাত্র শব্দদ্বারা, বাক্য দ্বারা প্রকাশ করা বা ব্যাখ্যা করা যায়‌ না। ঋষিগণ, মুনিগন যুগ যুগ ধরে এই মহামন্ত্রের সাধনা করেছেন। আমরা এই রচনার শেষ অংশে উপনিষদে বিধৃত, অমর্ত্য-বীণার সুরে নিত্য-ঝংকৃত মহাবাক্য চতুষ্টয়, 'উপনিষদগুলি' যেমন উচ্চারণ করেছেন তেমনই উদ্ধার করবার চেষ্টা করব। পরমেশ্বরের আশীর্বাদ ও করুণা জগৎসংসারে বর্ষিত হোক্। 

আমাদের মহাকবির বাণীর অর্ঘ্য দিয়ে প্রার্থনা করি --- 

"শ্রাবণের     ধারার মত পড়ুক ঝরে,পড়ুক ঝরে
তোমারি       সুরটি আমার মুখের 'পরে, বুকের 'পরে।
পূরবের       আলোর সাথে পড়ুক প্রাতে দুই নয়ানে--
নিশীথের      অন্ধকারে  গভীর ধারে পড়ুক প্রাণে ।

নিশিদিন    এই জীবনের সুখের  'পরে, দুখের  'পরে
শ্রাবণের     ধারার মতো পড়ুক ঝরে, পড়ুক ঝরে।।
যে শাখায়    ফুল ফোটে না, ফল ধরে না একেবারে,
তোমার    ওই বাদল বায়ে  দিক জাগায়ে সেই শাখারে।
যা কিছু     জীর্ণ আমার, দীর্ণ আমার, জীবনহারা ---
তাহারি    স্তরে স্তরে পড়ুক ঝরে সুরের ধারা। 
নিশিদিন   এই জীবনের তৃষার পরে, ভুখের 'পরে
শ্রাবণের   ধারার মতো পড়ুক ঝরে, পড়ুক ঝরে।।" 

                                    --------- রবীন্দ্রনাথ।  

ওঁ শান্তি, শান্তি, শান্তিহি ইতি।।

পরবর্তী পর্ব সপ্তম অধ্যায় থেকে।
                     (ক্রমশঃ)
দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
২০/৭/২০২৫
ব্যাঙ্গালোর।

____________________________________________











মঙ্গলবার, ১৫ জুলাই, ২০২৫

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ও 'বিলাসী'

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ও 'বিলাসী'। 

বাংলার হৃদয়ে শরৎসাহিত্যের স্থান কোথায় তার সন্ধান দেবার আগে একটি আমার ব্যক্তিজীবনের ঘটনা বলি। 
সাল ১৯৬৭। সে বছর দশম শ্রেণী (ক্লাস টেন) পরীক্ষা দিয়েছি। এগার বা ইলেভেন ক্লাসে উঠব। তখন ইলেভেন ছিল হায়ার সেকেন্ডারি। আমার স্কুল ছিল আমাদের গ্রাম থেকে ন'মাইল  দূরে। মাঝে গোটা তিনেক সাঁওতাল পল্লী পেরিয়ে এক মহুলবন, তারপর অজয় নদ। 'নদী' নামটিরই চল মুখে মুখে। নদী পেরিয়ে আরও মাইল তিনেক দূরে চিত্তরঞ্জন রেলইঞ্জিন কারখানার রেল‌ কলোনির স্কুল। নদীর পাড়েই একটি মাঝিগাঁ --- যারা, বিশেষ করে বর্ষাকালে নৌকা বায়। নদী পারাপারের একমাত্র বাহন ছিল এই নৌকা। আমাদের গ্রাম যেহেতু ছিল দক্ষিণ বিহার আর পশ্চিম বাঙলার সীমানারেখার  উপর, আদিবাসীদের বস্তির একপ্রান্তে, তাই কোন এক অজ্ঞাত কারণেই, শুধু আমাদের গ্রামটিই নয়, আশেপাশের বিশ পঁচিশখানা গ্রামাঞ্চল ছিল বিদ্যা- বিদ্যালয়শূন্য। গ্রামে একটি পাঠশালা ছিল, ধনবান চাষীদের বদান্যতায়, পৃষ্টপোষকতায় সে পাঠশালাটিতে‌ পড়ুয়াদের যত না নাম ছিল তার চাইতে বেশী সুনাম ছিল বহির্গ্রামের এক বৃদ্ধ মাষ্টার মশাইয়ের। নাম ছিল তাঁর দীননাথ চক্রবর্তী।‌ তিনি ছিলেন একাধারে  পুরোহিত-কথক-পাঠক ও পাঠশালার পণ্ডিত। একের ভিতর চার। তাঁরই একান্ত আগ্রহে আমাদের কয়েকজনের ওই নদীপারের শহরের স্কুলে ভর্তি হওয়া। 
এই দীনু মাষ্টারের নাম ও পরিচয় দেবার জন্যই এতখানি ভূমিকা। যিনি ছিলেন গল্প বলার যাদুকর। গ্রীষ্মকালের দুপুর বেলায়, বর্ষায়, শীতের সন্ধ্যায় তাঁর কাছারি ঘরের (অব্যবহৃত কাছারি ঘরটিই ছিল তাঁর আস্তানা) বারান্দায় থৈ থৈ করত গ্রামের লোক। তিনি শুধু পুরাণ কাহিনী --- রামায়ণ, মহাভারত, ভাগবৎ পুরাণ --- এ সকল পুরাতন গ্রন্থের গল্পই শুনাতেন না, কখনো কখনো  বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্রের বই, যেগুলি তাঁর সংগ্রহে ছিল, সেগুলি থেকেও পাঠ করে শোনাতেন। আমি যখন ক্লাস নাইনে পড়ি তখন একদিন আমার এক কাকা, যিনি প্রায় প্রতিদিনই ঐ মাষ্টারের গল্পের আসরে যেতেন, বললেন, --- চল্ আমার সঙ্গে। আজ দিনুমাষ্টার শরৎবাবুর গল্প পড়বেন। 

আমার আজও মনে আছে আমি কাঁদতে কাঁদতে ঘরে ফিরেছিলাম। "কেন কাঁদছিস" --- মা জিজ্ঞাসা করেছিল। বলতে পারিনি। মা কাকাকে ডেকে জিজ্ঞাসা করল, বুড়ো কাঁদে কেন ? কাকা উত্তর দিয়েছিল, কি জানি, মাষ্টারের  গল্প শুনতে শুনতেই কান্না আরম্ভ করেছিল। আমি বলেছিলাম, ঘরে চলে আসতে। তাও শুনল না --- ওকে আর নিয়ে যাবই না। সেটা অবশ্য হয় নি। যেমন সে দিনের গল্পটি শুনে কেঁদেছি, তেমনি কাঁদতে কাঁদতেই  কাকাকে বলেছি, 'আমি যাব'। 
সেদিন কোন্ সে গল্প পড়েছিলেন মাষ্টারমশাই ? গল্পটি ছিল 'বিলাসী'। এই গল্পটির মধ্য‌ দিয়েই আমার 'শরৎচন্দ্রের' সঙ্গে পরিচয়। তাই আজও, প্রৌঢ়ত্বের সীমা পেরিয়েও, জরাতুর জড়তার সংবেদনহীন পাথুরে বুকেও জেগে আছে 'বিলাসীরা'। আমি যেন ছিলাম 'মৃত্যুঞ্জয়', যদিও সে একই স্কুলে থার্ড ক্লাসে পড়ত। বয়সে বড় ছিল আমার চাইতে। "মৃত্যুঞ্জয়ের বাপ মা ভাই বোন কেওই ছিল না। ছিল শুধু গ্রামের এক প্রান্তে একটা প্রকাণ্ড আম কাঁঠালের বাগান।" ঐ বাগান জমা দিয়েই নিজের ভরণ পোষণই চলত এমন নয়, সহপাঠী বন্ধুদের মিষ্টি খাওয়ানো, অভাবীদের অভাব মেটানো --- সে সবও চলত ওই বাগানের উপার্জনে। "বাগানের মধ্যখানে একটা পোড়ো বাড়ি, আর ছিল এক জ্ঞাতি খুড়া। "খুড়া প্রচার করিত,--- ঐ বাগানের অর্ধেকটা তার নিজের অংশ, নালিস করিয়া দখল করার অপেক্ষা মাত্র। অবশ্য দখল তিনি একদিন পাইয়াছিলেন বটে কিন্তু সে জেলা আদালতে নালিশ করিয়া নয় ---- উপরের আদালতের হুকুমে।" 
 এই বাক্যটির অভিঘাত এমনই ছিল যে ঐ চোদ্দ পনের বছরের বুকটাতেও যেন কেমন এক ভয়, আমাদের বনপাড়ার সাপুড়ে তৈমুর চাচার পোষা নাগিনীটার মতন ফোনা তুলে দুলতে লাগলো। গল্পের এক একটি বাক্য শেষ হয় আর কত কি যে মনে হতে থাকে! তারপর সেই অসুখে মৃতপ্রায় মৃত্যুঞ্জয়ের সেবায় নিযুক্ত ক্ষীণপ্রাণ বিলাসী দেখা দিল, তখন থেকে বিলাসীর দিকেই মনটা ঝুঁকে রইল। "দিনের পরে দিন, রাত্রির পর রাত্রি তাহার কত সেবা, কত শুশ্রূষা, কত ধৈর্য, কত রাত জাগা"--- মৃত্যুঞ্জয়কে 'যম'এর মুখ থেকে এ যাত্রা ফিরিয়ে এনেছে। তখন মনটা কিছুটা শান্ত হোল ; কিন্তু মনে হতে লাগল এমন কথা লেখাই বা কেন --- "মৃত্যুঞ্জয় তো যে কোন মুহূর্তে মরিতেই পারিত, তখন সমস্ত রাত্রি এই বনের মধ্যে মেয়েটি একাকী কি করিত !" মরেনি তো। 
এখানে আরো একটি সদ্যমৃত স্বামীর সঙ্গে তার একান্ত অসহায় স্ত্রীর করুণ কাহিনীও আছে। আমার সেদিকে তেমন আগ্রহ ছিল না, কেবলই তারপর কি, তারপরে কি --- এমনই আকুল উদ্বেগ ! একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছি যে ভালই হোল মৃত্যুঞ্জয় আর বিলাসীর বিয়ে হয়ে গেল ; কিন্তু কয়েক মুহূর্ত যেতে না যেতেই একি ! গ্রামের লোকেরা সকলে মিলে, ন্যাড়াও ছিল তাদের সাথে, মৃত্যুঞ্জয়ের ঘরে চড়াও হোল। বিলাসী রুটি গড়ছিল ; সমস্ত কিছু নষ্টভ্রষ্ট করে, মৃত্যুঞ্জয়কে ঘরের ভিতরে আটকে রেখে, বিলাসীকে মারতে মারতে, টেনে হিঁচড়ে গ্রামের বাইরে নিয়ে যাওয়া ! ন্যাড়া কেন তাদের মেরে তাড়ালো না! আমি যদি...! সে ভাবনা আমার শেষ হতে না হতেই ভেসে এল মাষ্টারমশাইয়ের কণ্ঠ হতে বিলাসীর আর্তনাদ, 
"বাবুরা, আমাকে একটিবার ছেড়ে দাও, আমি রুটিগুলা ঘরে দিয়ে আসি। বাইরে শিয়াল কুকুরে খেয়ে যাবে --- রোগা মানুষ সমস্ত রাত খেতে পাবে না।" 
আমার মনে আছে আমি ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠেছিলাম। সবাই ঘাড় বেঁকিয়ে একবার আমাকে দেখে নিল, আবার মাষ্টারমশাইয়ের দিকে মুখ। কাকা বড় বড় চোখ করে আমাকে হাত দিয়ে ইঙ্গিত করল, বাড়ি চলে যা। আমি একচুলও নড়তে পারিনি। গল্প এগিয়ে চলে। মৃত্যুঞ্জয় সাপুড়ে হয়ে গেল, বিলাসী তার বৌ। বেশ হয়েছে, বেশ। এবার গ্রামের লোকেরা তার করবে কি ? গল্পটা মাষ্টার এখানেই তো শেষে করতে পারতেন। আবার পড়তে আরম্ভ করলেন। এবার মৃত্যুঞ্জয় আর ন্যাড়ার সাপধরা। মনে মনে আমি তখন ন্যাড়া হয়ে গিয়েছিলাম ; কিন্তু হঠাৎ এ কি ! দুটো গোখরো খরিষ ছিল এক গর্তে ! বাসা বেঁধেছিল ; সে কথা বিলাসী তো বলেছিল। ওরা শুনলো না ! একটা সাপ ধরে মৃত্যুঞ্জয় ন্যাড়ার হাতে যেমনি দিয়েছে অমনি গর্তের ভিতর থেকে অন্য সাপটা ফনা তুলে বেরিয়ে ছোবল মারল মৃত্যুঞ্জয়ের হাতে। ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরিয়ে এল। নেড়ার মন্ত্র, বিলাসীর দেওয়া শেকড়-বাকড়, মাদুলি কবজ কিছুই বাচাঁতে পারলাম না তাকে। মৃত্যুঞ্জয় মরেই গেল ! 
"বিলাসী তাহার স্বামীর মাথাটা কোলে করিয়া বসিয়াছিল। সে যেন‌ একেবারে পাথর হইয়া গেল।" 

এই অসহনীয় ছবিটি কল্পনায় ধরে রাখতে পারছিলাম না। এরপর এই গ্রামদেশের সমস্ত মানুষেরা মিলে মৃত্যুঞ্জয়-হারা ঐ অসহায়, নিরন্ন বিলাসীর উপর আর কতই যে অত্যাচার করবে সেকথা ভাবতে ভাবতে যখন দুশ্চিন্তার কষ্ট অসহ্য হয়ে উঠছিল ন্যাড়া তখন একদিন তাদের পাড়ায় গিয়ে শুনলো, বিলাসী আত্মহত্যা করেছে। 
হ্যাঁ, আমি কেঁদে কেঁদেই ঘরে ফিরেছিলাম। 


                     দুই
চোখের জলের সঙ্গে কি সাহিত্যের গাঢ় সম্পর্ক আছে ? আর তার সঙ্গে তীব্র আকর্ষণ ? সেই যে সেদিনের চোখের জলে শরৎচন্দ্র আমার জীবনে এলেন আজও, এই সত্তরোর্ধ্ব বয়সেও, তাঁর সঙ্গে আমার আত্মীয়তার ছেদ পড়েনি। কত এদেশের, কত বিদেশের বইই-না পড়লাম ; কিন্তু ওই যে সাহিতিকের সঙ্গে পাঠকের চিরকালীন সম্পর্ক, আত্মীয়তা --- তার যেন একটা দূরত্ব থেকেই গিয়েছিল, থেকে গিয়েছিল ভালো-মন্দের বিচার। কিন্তু কেন যে শরৎবাবুর সাথে এমন আত্মীয়তা বা আত্মিকতা অচ্ছেদ্য হয়ে রয়ে গেল, তার জন্যে তাঁরই লেখা থেকে কয়েকটি আখর উদ্ধার করি, ---- আর  একজন প্রখ্যাত সাহিত্য সাধক, যাযাবর সাহিত্যিক কেদারনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় (জন্ম ১৮৬৩) তখন বিহারের পূর্ণিয়ায়। তাঁর সাথে সমকালের প্রায় সকল প্রথিতযশা, জনপ্রিয় বাঙালী লেখকদের, এমনকি রবীন্দ্রনাথেরও, নিয়মিত চিঠি পত্রের আদান প্রদান হোত। শরৎচন্দ্রের সঙ্গে তো হোতই এবং বড়ই হার্দিক ছিল সে সম্পর্ক। শরৎচন্দ্র তখন হাওড়ার বাজে শিবপুরে। তিনি কেদারনাথবাবুকে লিখছেন, 

                                   "বাজে শিবপুর। হাওড়া 
                                                 ১১-১০-'২৪ 
প্রিয়বরেষু, 
আজ সকালে আপনার চিঠি পেলাম। নানা কাজে ভুলে থাকি, প্রতিদিন অনেক চিঠিই তো পাই, কিন্তু কালে-ভদ্রে লেখা আপনার কয়েক ছত্র আমাকে যে আনন্দ দেয় তা সত্যেই দুর্লভ। প্রীতির মধ্যে দিয়ে আসবার সময়ে সে যেন অনেকখানি তা সঙ্গে করে আনে। কেদারবাবু, মানুষের সত্যকার ভালোবাসা আমি টের পাই --- এখানে আমার বড় বেশী ভুলচুক হয় না।" " 
শরৎচন্দ্রের স্বর্ণলেখনী (তিনি কলম-সৌখিনও ছিলেন) নিঃসৃত এই সত্যবাণীর দীপ্তিতে দ্যুতিময় হয়ে আছে তার সমগ্র রচনাসম্ভার "কেদারবাবু, মানুষের সত্যকার ভালোবাসা আমি টের পাই..."।  

'বিলাসী' গল্পটির রচনা ও আবির্ভাবের লগ্নটি ঐতিহাসিক। এই সময়টিও ওই '২৪ সাল  ; কিন্তু সেটি বঙ্গাব্দ।  শরৎচন্দ্র বাজে শিবপুরে থাকার সময়েই তাঁর সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের পরিচয় হয়। বন্ধু চারু বন্দোপাধ্যায় শরৎচন্দ্রকে নিয়ে গিয়েছিলেন জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির বিচিত্রার আসরে। সেখানেই প্রথম শরৎ-রবির সম্পর্কের 'অদেখা ও অপরিচয়ের' মেঘমুক্তি। এই বিচিত্রার আসরেই রবীন্দ্রনাথের অনুরোধে শরৎচন্দ্র তার 'বিলাসী' গল্পটি পাঠ করেন, ১৩২৪ সালের ১৪ই চৈত্র। 

"বিলাসী" গল্পটিতে কি আছে 'ভালোবাসা' ছাড়া ? রূপযৌবনসম্পন্না, উচ্চকুলসম্ভবা কোন নারীরত্ন তো ছিল না বিলাসী। আর তা হলে কি সে ঐ একা, নিঃসম্বল, শয্যাশায়ী, মৃতপ্রায় মৃত্যুঞ্জয়ের সেবা করতে যেত অমন আত্মসমর্পিত ভালোবাসা নিয়ে ? সেও তো এক বলহীনা, ক্ষীণপ্রাণ, জীর্ণদেহী, গ্রামসমাজের অন্তেবাসী অচ্ছুৎ, বেজাত এক সাপুড়ের মেয়ে। "ঠিক যেন ফুলদানিতে জল দিয়া ভিজাইয়া রাখা বাসী ফুলের মালার  মত --- এতটুকু নাড়া চাড়া করিতে গেলেই ঝরিয়া পড়িবে।" 
তবে কিসের আকর্ষণে মরণাপন্ন মৃত্যুঞ্জয়কে বাচাঁনোর জন্য দিনের পরে দিন, রাত্রির পর রাত্রি জেগে, অনাহারে অনিদ্রায় নিজেকে নিঃশেষে বিলিয়ে দিয়েছিল বিলাসী ? এ হেন নিষ্কামনার ব্রত পালন করবার শক্তির উৎস কি ছিল ? উৎস ছিল ভালোবাসা--- অহৈতুকী ভালোবাসা। যাঁরা শরৎসাহিত্যের গভীরে প্রবেশ করেছেন তাঁরা সকলে, কিছু কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া, শরৎচন্দ্রের দরদী মনের কথা, সহমর্মিতার কথা বলেছেন সাতকাহন করে। তাঁদের অগাধ পাণ্ডিত্য, সীমাহীন অধ্যয়ন ; লিখেছেনও সাহিত্যতত্ত্বের নিখুঁত বিচারে। কিন্তু আমার মনে হয়েছে  মানুষকে, নারী পুরুষ নির্বিশেষে, বড়ই ভালোবাসতেন শরৎচন্দ্র --- এইটিই প্রেম-প্রণয়সিক্ত, দরদভরা শরৎসাহিত্যের মর্মকথা-অনুভবের সুলুক।
 "ভালোবাসার মত এত বড় শক্তি, এত বড় শিক্ষক সংসারে আর বুঝি নাই। ইহা পারে না এত বড় কাজও বুঝি আর কিছু নাই।" 
                                                      --- শ্রীকান্ত। 
"মেয়েরা পুরুষের হৃদয় এক নিমিষেই চিনে নিতে পারে, এটি বিধাতার দেওয়া শক্তি. ..।" 
                                           ---- নারীর মন। 

মৃত্যুঞ্জয় সুস্থ হয়ে উঠল। বিলাসীর সঙ্গে ঘর বাঁধল সে। স্বাভাবিক ভাবেই তার 'জাত গেল, ধর্ম গেল।' সমাজের ঘৃণা, দুর্নামের বিষের চাইতে সাপুড়ে 'জাতের' সাপের বিষ নিয়ে খেলার পেশা --'বরং ভালো' বলে বরণ করে নিল মৃত্যুঞ্জয়। এও তো ভালোবাসার জন্যই স্বজন, স্বজাতি, 'স্বধর্ম' অকাতরে বিসর্জন দেওয়া, শুধুমাত্র এবং একমাত্র ভালোবাসার মূল্য চুকাতে হবে বলেই। "বিবাহ ব্যাপারটা যাহাদের শুধু নিছক contract, তা সে যতই কেননা বৈদিক মন্ত্র দিয়া document করা হোক্, সে দেশের লোকের সাধ্য নাই মৃত্যুঞ্জয়ের অন্ন-পাপের কারণ বোঝে। বিলাসীকে যাহারা পরিহাস করিয়াছিল তাহারা সকলেই সাধু গৃহস্থ এবং সাধ্বী গৃহিনী --- অক্ষয় সতীলোক তাহারা সবাই পাইবেন, তাও আমি জানি ; কিন্তু সেই সাপুড়ে মেয়েটি যখন একটি পীড়িত শয্যাগত লোককে তিলে তিলে জয় করিতেছিল তাহার তখনকার সে গৌরবের কণামাত্রও হয়তো আজিও ইহাদের কেহ চোখে দেখে নাই।" 
প্রেম দিয়ে, ভালোবাসা দিয়ে, পরম বেদনায়, চরম আত্মত্যাগের মধ্য‌ দিয়ে কারো হৃদয় জয় করবার  'গৌরবের' কথা শরৎচন্দ্র তো এই প্রথমবার এবং  একবার বললেন, পরে আর বলবেন না --- এমন তো নয়। কতবার যে বলেই গিয়েছেন‌ তার হিসাব করলে আরো একটি গবেষণা গ্রন্থ রচিত হবে। ভেসে ভেসে উঠবে কত নারীর মুখায়বয়ব (রাজলক্ষ্মী, অভয়া, কমললতা, কিরণময়ী, সাবিত্রী, বিরাজ, বিজয়া, রমা, ষোড়শী, অনুপমা, রাধারাণী, ললিতা ....না, থাক্। অযথা কলেবর বৃদ্ধি পাবে লেখার), কত হৃদয়দহনানলসম্ভুত চিতাগ্নিশিখা কিংবা প্রীতিস্নিগ্ধ  প্রদীপালোকদীপ্তি। 

আমরা ফিরে আসি 'বিলাসী'র কাছে। গল্পটি শেষ হোল ; কিন্তু রেখে গেল প্রভাত-রবিকরে পল্লবপ্রান্তে ক্ষণ-উদ্বায়ী শিশিরবিন্দুর অমোঘ সত্যবাণীর কিরণবিচ্ছুরণ। সে সবের মধ্যে একটি মর্মান্তিক নাটকীয় বিদ্রুপ (dramatic irony) : 
"অবশ্য (মৃত্যুঞ্জয়ের) বাগানের দখল একদিন তিনি পাইয়াছিলেন বটে, কিন্তু সে জেলা আদালতে নালিশ করিয়া নয় ---- উপরের আদালতের হুকুমে।" 
ঠিক এমনি এক আইরনি, এমনই পেলব অথচ ক্ষুরের ধারের মত তীক্ষ্ণ একটি অতুলনীয় রবীন্দ্রবাক্য : 
 "অবশেষে যাত্রাকালে ফটিক আনন্দের ঔদার্যবশত তাহার ছিপ ঘুড়ি লাটাই সমস্ত মাখনকে পুত্রপৌত্রাদিক্রমে ভোগদখল করিবার পুরা অধিকার দিয়া গেল।" 
                                       'ছুটি' --রবীন্দ্রনাথ। 

"শুনিয়াছি নাকি বিলাত প্রভৃতি ম্লেচ্ছদেশে পুরুষদের মধ্যে একটি কুসংস্কার আছে, স্ত্রীলোক দুর্বল এবং নিরুপায় বলিয়া তাহার গায়ে হাত তুলিতে নাই ! এ আবার একটা কি কথা ! সনাতন হিন্দু এ কুসংস্কার মানে না। আমরা বলি, যাহার গায়ে জোর নাই, তাহারই গায়ে হাত তুলিতে পারা যায়‌।" 
কি নির্মম নিদারুণ এই সত্য ! ছোটগল্পের ক্ষুদ্র পরিসরে হাজার বছরের হিন্দু সমাজ-মনস্কতার, বর্ণবিভাজিত, নারীবিদ্বেষী পুরুষের পরুষ-কঠোর মানসিকতা বিবেকদাহী চিতাগ্নির মত গনগন করে উঠেছে। উদাহরণও আছে তার। মূল গল্পটির একটি শাখা-আখ্যানভাগে এক সদ্যমৃতের স্ত্রীর উক্তি : 

 "....তিনি  স্বেচ্ছায় যখন সহমরণে যাইতেছেন তখন সরকারের কি ? তার আর তিলার্ধ বাঁচিবার সাধ নাই, এ কি তাহারা বুঝিবেন না ?" গল্পকার যদিও এইটি প্রতিপন্ন করেছেন যে ওই কথাগুলি শোকার্তার অন্তরের কথা ছিল না ; কিন্তু তবুও বৈধব্যের নিরাশ্রয়তার অন্ধকার, এই পোড়া দেশে, এমনই নিরন্ধ্র ছিল যে চিতাগ্নিশিখার দহনালোকও কাম্য ছিল, শান্তির আশ্রয় ছিল স্বামীহারাদের কাছে। 
পরিশেষে বলি, মৃত্যুঞ্জয় আর বিলাসী --- অপঘাতে মরে গেল একজন, আত্মহত্যা করল‌ আরেকজন। সমাজের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র 'ঘৃণ্য', 'কলঙ্কিত' পাত্র-পাত্রীদুটির একজন জাত হারিয়ে, 'অন্ন-পাপে' "না পেলে একফোঁটা আগুন, না হোল (তার নামে) একটা ভুজ্জি উচ্ছুগ্যু।" আরেকজনের‌ গতিও হয়েছিল হয়তো অমনিই। কোন এক নদীপাড়ের কবরখানায়, কয়েক কোদাল মাটির তলায় তাদের অচ্ছুৎ দেহগুলি লুপ্ত হয়ে গিয়েছে সেই কবে ! এমনি ধারা "অনন্ত বিস্মৃতিরাশি প্রত্যহ যেতেছে ভাসি" ;  কিন্তু তাদের সেই প্রেম ! 

এখন ভাবি, আত্মহত্যা করবার প্রাকমুহর্তে কেমন ছিল মনের অবস্থা বিলাসীর ! তেমনই ছিল কি, যেমন ছিল মহাকবি, জীবননাট্যের মহাশিল্পীর জুলিয়েটের মত ! 
"What's here? a cup closed in my true love's hand ?
Poison, I see, hath been his timeless end ---
O Churl, drunk all, and left no friendly drop 
To help me after ! I will kiss thy lips ! 
Haply some poison yet doth hang on them, 
To make me die with a restorative." 
                         ------ Shakespeare 
              (Romeo and Juliet, act-5, scene-3) 

মৃত্যুঞ্জয় হয়ত নিতান্তই একটা তুচ্ছ মানুষ ছিল, কিন্তু তাহার হৃদয় জয় করিয়া দখল করেছিল বিলাসী যে শক্তির দ্বারা, আর ঐ কুসংস্কারাচ্ছন্ন, সংকীর্ণ মানসপ্রবৃত্তির-বশীভূত পল্লীগ্রামের ছেলে, পাড়াগাঁয়ের তেলেজলেই মানুষ ধনঞ্জয়কে এত বড় দুঃসাহসিক কাজে প্রবৃত্ত করিয়েছিল যে শক্তি  --- উভয়ই যে অপরাজেয়, দুর্দমনীয় প্রেমেরই শক্তি। বাংলা সাহিত্যে অমর, অবিস্মরণীয় করে রেখে  গেলেন শরৎচন্দ্র তার স্বর্ণ লেখনীর মন্ত্রলিপিতে।

             সমাপ্তিপূর্বের দু'কথা 
শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের রচনা সম্ভার নাতিবৃহৎ, নাতিস্বল্প। তার প্রকাশিত উপন্যাসের সংখ্যা ৩১টি, গল্প ছোট বড় মিলিয়ে ২২টি। প্রথম প্রকাশিত উপন্যাস বড়দিদি ১৯১৩ সালে এবং শেষ প্রকাশ শেষের পরিচয় ১৯৩৯ সালে। নাটক ৩টি, প্রবন্ধের সংখ্যা ১২। ১৯৩৮ সালে তার মৃত্যুর পর কিছু কিছু লেখা প্রকাশিত হয়েছিল যাদের মধ্যে 'শেষের পরিচয়' উপন্যাসটি আছে। 
১৯১৩ সালে ‌ 'বড়দিদি' উপন্যাস প্রকাশের মধ্যে দিয়ে যখন সাহিত্যিক হিসেবে তাঁর আত্মপ্রকাশ ঘটে তখন, বিশ শতকের প্রথম ও দ্বিতীয় দশক, বাংলা সাহিত্য-সাধনার রত্নযুগ। তখন রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যসৃষ্টির হীরকজ্যোতি বহুশাখায় বিকীর্ণ, দেশের সীমানা ছাড়িয়ে ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বের সারস্বত সমাজের কোণায় কোণায়। সাহিত্যে নোবেল এসেছে। গীতাঞ্জলির অনুবাদ হয়ে চলেছে ভারতের এবং বিদেশের বহু বহু ভাষাতেও। ওদিকে বাংলা সাহিত্যের নবতম যে শাখা 'ছোটগল্প', সেটিও তার অতিমানবীয় প্রতিভার স্পর্শে ঝলমল করে উঠেছে। অষ্টাদশ শতকে শেষ দশক থেকে যখন তিনি ছোটগল্প রচনার হাত দিলেন, তখন থেকেই তার সমসাময়িককালের, পরবর্তীকালের কেদারনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় (১৮৬৩) থেকে তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের (১৮৯৮) পর্যন্ত সাহিত্যসাধনার বিশেষ করে ছোটগল্প রচনার, মর্মমূলে ছিলেন রবীন্দ্রনাথ --- প্রত্যক্ষে এবং পরোক্ষে ; যদিও ভাবের বৈচিত্র, বিষয়ের ভিন্নতা, আঙ্গিকের বৈপরিত্য ছিল। সর্বোপরি চরিত্রগুলিকে, নরনারীর সম্পর্কটিকে নিরাবরণ করবার প্রবনতাও দেখা গিয়েছিল কোন কোন লেখকের রচনায়। এ প্রসঙ্গে আমরা সাহিত্যিক জগদীশ গুপ্তের লেখনশৈলীর ও সাহিত্যাদর্শের উদাহরণ দিতে পারি। জগদীশ গুপ্তের (১৮৮৬-১৯৫৭) গল্পে প্রেমের স্নিগ্ধ মধুর রূপ নেই। তাঁর গল্পের যারা কুশী-লব তারাও প্রধানত নীচু তলারই মানুষ ---নিম্নবিত্ত, স্বল্পবিত্ত বা দরিদ্র। কিন্তু শরৎচন্দ্র বা বিভূতিভূষণের গল্প উপন্যাসের নীচু তলার মানুষের সঙ্গে তাদের মিল নেই। দেহগত যৌনচেতনার রূপ প্রাধান্য পেয়েছে তার অধিকাংশ রচনায়। যৌবনচিত ভাববিহ্বলতা বা রোমান্টিকস্বপ্নে তাঁর বিরুদ্ধ ভাবটি প্রকট। তিনি তাঁর রচনায় সজ্ঞানেই পরিহার করেছেন 'শরৎচন্দ্রীয় আবেগ ও কল্লোলী ভাবালুতা। 
বাঙলা সাহিত্যের আধুনিক সমালোচক যাঁরা, তাঁরা এ দাবী করে থাকেন যে সাহিত্যিক জগদীশ গুপ্তের হাত ধরেই বাঙলা ছোটগল্পে আধুনিকতার বাস্তবানুগ প্রয়োগ সম্ভাবিত হয়েছে। যাই হোক্ আধুনিকতার সংজ্ঞা কালে কালে বিবর্তিত হয়, পরিবর্তিত হয়। তবে, যুগে যুগে সাহিত্যসৃষ্টির শ্রেষ্ঠতম বিচার হয় পাঠকের দরবারে। সেখানে, বিষয়, ভাব, ভাষা ও রসের আবেদনে কালজয়ী সাহিত্যস্রষ্ঠাদের অন্যতম একটি নাম শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়--- অপরাজেয় কথাশিল্পী। 

(রচনাটি সম্পূৰ্ণরূপেই শরৎচন্দ্র-কেন্দ্রিক। বাংলা সাহিত্যের বৃহৎ বিপুল 'ছোটগল্পের সংসারে' উঁকি দেওয়া হয়নি। শুধু প্রাসঙ্গিকভাবে যতটুকু -- তাই নিয়েই  আলোচনা।) 

দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় 
১৪ই জুলাই, ২০২৫ 
ব্যাঙ্গালোর। 
               (এখানে পুনঃপ্রকাশিত)
___________________________________

সোমবার, ১৪ জুলাই, ২০২৫

রত্নজোড়া

রত্নজোড়া 


পান্না চুণি রত্নদুটি প্রাণের মূল্যে কেনা,
জোড়ায় বেঁধে হার পরেছি জীবনভরে দেনা।
শোধ দেবোনা, রইব ঋণী ভগবানের ঘরে,
পূজা দিয়ে সুদ মেটাবো অনন্তকাল ধরে।
কান্তিময়ী থাকে যেন রত্নময়ী মালা।
কৃত্তিকা আর ‌বর্তিকা যে আঁধার ঘরের আলা।

     ১৪ই জুলাই' ২০২৫
তিতি তিন্নির জন্মদিনে
                       ------ ঠাম্মা দাদুভাই।
___________________________________________



বৃহস্পতিবার, ৩ জুলাই, ২০২৫

শ্রীমদ্ভগবত গীতায় অর্জুন-৩

শ্রীমদ্ভগবত গীতায় অর্জুন-৩ 


এরপর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ আত্মার নিত্যত্ব, অবিনশ্বরতা এবং অবিকারত্ব বিষয়ে অর্জুনকে উপদেশ দিয়েছেন। বস্তুত শ্রীগীতার দ্বিতীয় অধ্যায় জুড়ে অনাদি অনন্ত,  অক্ষয় অব্যয়, জন্মহীন মৃত্যুহীন, দেহ-বিবিক্ত অথচ দেহধারী, অব্যক্ত অথচ সৃষ্টিপরিব্যাপ্ত এক এবং অবিভাজ্য যে আত্মার কথা ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে  বলেছেন তা এতই গূঢ় যে সেই আত্মজ্ঞানের, আত্মা সম্মন্ধীয় জ্ঞানের অধিকারী যাঁরা‌, যাঁরা আত্মসমাহিত সাধক তাঁরা তখন এই সত্য উপলব্ধি করেন যে দেহ জন্ম মৃত্যুর অধীনে কিন্তু আত্মা 'অজ' ও 'অ-মর' ; এবং এই শাশ্বত সত্য জেনে তাঁরা শরীরের নিধন হলে শোকাকুল হন না। তারা জানেন, মানুষ যেরূপ জীর্ণ পুরাতন বস্ত্র পরিত্যাগ করে নূতন বস্ত্র পরিধান করে, সেইরূপ মৃত্যু হলে দেহী (যার দেহ আছে) জীবাত্মা পুরাতন শরীর ত্যাগ করে নূতন শরীরে প্রবেশ করে। মৃত দেহ চিতাগ্নি দ্বারা ভস্মীভূত হয় বা মৃত্তিকার মধ্যে বিলীন হয় ; কিন্তু আত্মা অস্ত্র দ্বারা ছিন্ন হন না, অগ্নিতে দগ্ধ হন  না, জলে আর্দ্র  বা ক্লেদাক্ত হন না।
অচ্ছেদ্যোহয়ম্ অদাহ্যোহয়ম্ অক্লেদ্যোহশোষ্য এব চ।
নিত্যঃ সর্বগতঃ স্থানুঃ অচলঃ অয়ম সনাতনঃ।। 


অতএব হে পার্থ, তুমি যখন জান (অর্জুন এখন জানছেন) এই অদৃশ্য অস্পর্শ অবিজ্ঞাত অচিন্ত্য  অবিকার্য্য আত্মার মৃত্যু হয় না, তখন এই সনাতন সত্য জেনেও তুমি অযথা শোক করতে পার না। দেখ, যার জন্ম হয়েছে তার মরণ নিশ্চিত, আর মৃতের জন্যও (পুনর্জন্ম) নিশ্চিত। জন্ম মৃত্যুর এই অপরিহার্যতা জেনে তোমার শোক করা অনুচিত।
ভূত অর্থাৎ অতীত (জন্মের পূর্বকাল) প্রাণীসকল জানে না। তা ব্যক্ত নয় এবং মৃত্যুর পরবর্তী কাল --- তাও অব্যক্ত। মধ্যখানের এই যে আমাদের শরীরী ‌অস্তিত্ব (ব্যক্ত অবস্থা)- এই ক্ষণিক অস্তিত্বের জন্য কিসের বিষাদময়তা "তত্র কা পরিদেবনা) !
শ্রীমদ্ভগবত গীতায় প্রায় প্রায় সাড়ে সাত শত শ্লোকের মধ্যে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ মুখ নিঃসৃত শ্লোক ছয়শত কুড়িটি, 'অর্জুনোবাচ' সাতান্নটি, সঞ্জয়োক্ত সাতষট্টি এবং মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র কর্তৃক উচ্চারিত শ্লোক মাত্র একটি। প্রথম বাণীটিই অন্ধ ধৃতরাষ্ট্রের, 

ধর্মক্ষেত্রে কুরুক্ষেত্রে সমবেতা যুযু্ৎসবাঃ।
মামকা পাণ্ডবাশ্চৈব কিমকুর্বত সঞ্জয়।।" 

লক্ষণীয়, ধৃতরাষ্ট্র একটিই প্রশ্ন করেছেন সঞ্জয়কে এবং তারপরই তিনি শ্রোতা, সঞ্জয় বক্তা। অর্জুন সারথি শ্রীকৃষ্ণকে কি কি বললেন, তাঁর মানসিক, দৈহিক অবস্থা, কৃষ্ণের প্রতিক্রিয়া, কৃষ্ণের সমস্ত বক্তব্যের হুবুহু অসম্পাদিত (unedited) বর্ণনা  শুনে গিয়েছেন ধৃতরাষ্ট্র কিন্তু উক্তি, এমন কি স্বগতোক্তিও করেন নি একটি বারের জন্যও। গীতায় রাজা ধৃতরাষ্ট্রের এই পাষাণ-মৌনতার কোন ব্যখ্যা গীতায় নেই। তবে কি তিনি জেনেই গিয়েছিলেন পরিণাম, 

                   "...... এখন তো আর
বিচারের কাল নাই নাই প্রতিকার,
নাই পথ ---- ঘটেছে যা ছিল ঘটিবার,
ফলিবে যা ফলিবার আছে।"
                  --- গান্ধারীর আবেদন (রবীন্দ্রনাথ) 

আমাদের মনে রাখতে হবে গীতার শেষ কথা এই নিয়তি, যার মূর্ত বিগ্রহ শ্রীকৃষ্ণ। নইলে ঐ প্রথম অধ্যায়ে এবং দ্বিতীয় অধ্যায়ের ৬তম শ্লোকটিতে আপন ইচ্ছা দৃঢ়তার সঙ্গে প্রকাশ করবার পর অর্জুন যেন শ্রীকৃষ্ণেরই ইচ্ছার দাস হয়ে গিয়েছিলেন। বললেন, আমি ধর্মসংমূঢ়চেতাঃ, কি করতে হবে বল। "তোমার ইচ্ছা হউক পূর্ণ আমার জীবনমাঝে" (শ্লোক-সপ্তম)। অষ্টম শ্লোকে শোকে মুহ্যমান অর্জুন তো যুদ্ধ অপেক্ষা বৈরাগ্যই শ্রেয়তর মনে করেছিলেন। 

এরপর থেকে আবার (প্রথম অধ্যায়ের অনুবর্তন) ঐ যোগশাস্ত্র সম্মন্ধীয় সাঙ্খ্যযোগের তত্ত্ব বর্ণনা করেছেন শ্রীকৃষ্ণ। এই দ্বিতীয় অধ্যায়ের চুয়ান্নতম ও পঞ্চান্নতম শ্লোকে অর্জুন শ্রীকৃষ্ণকে 'স্থিরপ্রজ্ঞ' পুরুষের বিষয়ে চারটি প্রশ্ন করেছেন। তৃতীয় অধ্যায়ে আবার অর্জুনের দুটি জিজ্ঞাসা (শ্লোক প্রথম ও দ্বিতীয় -- এই শ্লোকগুলি আমরা প্রবন্ধের শেষ অংশে আলোচনা করব)। এই অধ্যায়েই আবার অর্জুন ছত্রিশতম শ্লোকে জানতে চাইছেন, হে বার্ষ্ণেয়, তুমি বল, মানুষ কার দ্বারা নিয়োজিত হয়ে অর্থাৎ কার প্রেরণায় অনিচ্ছা সত্তেও পাপ কাজে প্রবৃত্ত হয় ?
অর্জুনের এই প্রশ্নের উত্তরে শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন অনিচ্ছা সত্ত্বেও মানুষ পাপকর্মে যে লিপ্ত হয় তার জন্য দায়ী তার নিজেরই অন্তরের রজোগুণ --- কাম, ক্রোধ, অতৃপ্ত ভোগাকাঙ্ক্ষা। এই অধ্যায়ের ৩৭তম শ্লোক থেকে ৪১তম শ্লোকে মানুষের ইন্দ্রিয়পরতাই যে মানুষের বুদ্ধি ও বিবেককে ধূম্রাচ্ছন্ন করে, তাকে পাপকাজে প্রবৃত্ত করে, সে কথাই নানাভাবে উদাহরণ সহযোগে অর্জুনে কাছে ব্যাখ্যা করেছেন। 

(এস্থলে আমার দীনতা স্বীকার করে নেওয়া, ক্ষমা প্রার্থনা করবার অবকাশ আছে। আমি ভগবান শ্রীকৃষ্ণের উপদেশবাণীগুলির গভীরে আলোচনা করিনি, করার মতো বিদ্যা, জ্ঞান, সাধনোচিত পুন্যবল এবং দার্শনিক অধিকার --- কিছুই আমার নেই। ঈশ্বরবাণীর প্রসঙ্গানুক্রমে তৃতীয় পাণ্ডব যখন যে প্রশ্ন করেছেন শুধু সেই প্রশ্নগুলিই পুনরাবৃত্তি করেছি।) 

'কর্মযোগ' নামক তৃতীয় অধ্যায়ের পর চতুর্থ অধ্যায় থেকে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ আরও গভীর দার্শনিক তত্ত্বে প্রবেশ করেছেন। এবার তিনি 'অহম বা আমি' শব্দ ব্যবহার করে যোগশাস্ত্র সম্মন্ধীয় জ্ঞানের বর্ণনা ও ব্যাখ্যা দিয়েছেন। এবম্প্রকার যোগের কথা তিনি সূর্যকে জানিয়েছিলেন, সূর্য তার পুত্র মনুকে জানিয়েছেন, মনু রাজা ইক্ষ্বাকুকে বলেছেন। পরে রাজা ইক্ষ্বাকুর কাছ থেকে রাজর্ষিগণ জেনেছিলেন বটে, কিন্তু সেই যোগসাধনার পরম্পরা এক সময় লুপ্ত হয়ে গিয়েছিল। এবার তুমি, (অর্জুনকে উদ্দেশ করে শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন) যেহেতু আমার ভক্ত ও সখা তাই আবার এই যোগের কথা তোমাকে জানালাম।
এইখানে, চতুর্থ অধ্যায়ের ৪র্থ শ্লোকে, মহারথী অর্জুন শ্রীকৃষ্ণকে একটি মোক্ষম প্রশ্ন করে বসলেন যাতে সারথি কৃষ্ণ তাঁর দৈবসত্ত্বার অবগুণ্ঠন খুলতে বাধ্য হলেন। 

অপরং ভবতো জন্ম পরং জন্ম বিবস্বতঃ।
কথমেতদ্বিজানীয়াং ত্বমাদৌ প্রোক্তবানিতি।। 

আপনার জন্ম তো এখন হয়েছে, বিবস্বান সূর্যদেব তো কত পুরাতন। তাহলে এই যোগের কথা আপনি কল্পাদিতে বলেছিলেন -- এ আমি কি প্রকারে জানব ? 

('আদৌ' -- আদি কালে বা কল্পের আদিতে, মহাকালের জন্মের সূচনালগ্নে। ঋকবেদের একটি মন্ত্রের প্রতিধ্বনি এই শ্লোকে প্রচ্ছন্ন আছে। পরে আলোচিত হবে)।

শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনের এমন প্রশ্নের উত্তরে যা বললেন সেই বাণীগুলিই শ্রীমদ্ভগবত গীতার সার। তিনি বলছেন, দেখ অর্জুন, তুমি ও আমি কত অনন্ত জন্ম পেরিয়ে এসেছি।  সে সকল গত-হয়ে-যাওয়া জন্মের কথা তোমার স্মরণে থাকার কথা নয় ; কিন্তু 'আমি' তা সবই জানি --এই আমি অবিনশ্বর, অবিনাশী। জন্মমৃত্যুরহিত, সর্বজীবে, সর্ববস্তুতে ঈশ্বররূপে চিরবিরাজমান এবং স্বীয় প্রকৃতিকে (জীবোচিত প্রবনতাকে) যোগমায়া বা আত্মমায়ার দ্বারা বশীভূত করে আমি আবির্ভূত হই। এরপর সেই বহু আলোচিত, বহুচর্চিত ভগবানের আবির্ভাব প্রসঙ্গ। অবতারবাদের ঘোষণা, 

যদা যদা হি ধর্মস্য গ্লানির্ভবতি  ভারত।
অভ্যুত্থানমধর্মস্য তদাত্মানং সৃজাম্যহম।। 

হে ভারত (অর্জুন), যখন যখন ধর্ম গ্লানিময় হয়, অধর্মের অভ্যুত্থান হয়, তখনই আমি নিজ রূপের বা নিজেকে সৃষ্টি করি -- 'সৃজাম্যহম'।
কেন ?
না, সাধু যাঁরা, জগতের হিতাকাঙ্ক্ষী যাঁরা তাদের রক্ষা করবার নিমিত্তে এবং পাপীদের, অধর্মাচারীদের বিনাশের জন্যই আমার এরূপ দিব্য আবির্ভাব।
(এখানে আর সখারূপে নয়, এক 'দিব্যম' অর্থাৎ অলৌকিক যুগপৎ অতিলৌকিক, সর্বশক্তিমান, অজ, অবিনাশী পরমাত্মারূপে স্বয়ং পরমেশ্বর নিখিল ধরাধামের দ্বন্দ্বক্ষুব্ধ মানুষের প্রতিনিধি স্থানীয় অর্জুনকে বলছেন।) এবং আমার এই দিব্যরূপ, জন্ম ও কর্ম 'তত্ত্বতঃ' যে জানে সে জন্মচক্রের নিরন্তর ঘূর্ণাবর্তের মধ্যে আর নিপতিত হয়ে না ---- 'আমাকেই'' প্রাপ্ত হয়। তবে সেই -ই আমাকে লাভ করে যে, (শ্রীভগবানের নিজের শ্রীমুখনিঃসৃত গীতধ্বনিময় সেই বাণীই শ্রবণ করি)
বিতরাগভয়ক্রোধাঃ মন্ময়া মাম উপাশ্রিতাঃ।
বহবঃ জ্ঞানতপসা পূতাঃ মদ্ভাবমাগতাঃ।।  

হে অর্জুন, অনুরাগ, ভয়, ক্রোধ--- এ সকল ইন্দ্রিয়বিকার থেকে মুক্ত হয়ে বহু বহু জ্ঞানতাপস, তপস্যার মধ্যে দিয়ে পবিত্রচিত্ত হয়ে আমার স্বরূপকে প্রাপ্ত হয়েছেন।
তৃতীয় অধ্যায়ের এই শ্লোক থেকে সমস্ত (শেষ ৪২তম) শ্লোকে ভগবান অত্যন্ত জটীল এবং অত্যুচ্চ জ্ঞান সাধনার, 'জ্ঞানকর্মসন্ন্যাসযোগের' মহামন্ত্রসমূহ উচ্চারণ করেছেন। বহুপ্রকার যজ্ঞের বিধান আছে, যেমন ব্রহ্মযজ্ঞ, দেবযজ্ঞ, জ্ঞানযজ্ঞ, ইন্দ্রিয়সংযমরূপ যজ্ঞ, বিষয়হবনরূপ যজ্ঞ, দ্রব্যযজ্ঞ, যোগযজ্ঞ, স্বাধ্যায়রূপ যজ্ঞ প্রভৃতি। জ্ঞানমার্গের সাধনার পথে এসকল 'যজ্ঞ' শুধু যজ্ঞক্রিয়ারূপ কর্মানুষ্ঠান নয়, সে সকল বিমূর্ত ধ্যান ও ভাবরূপ যজ্ঞ, মননের ক্ষেত্রেই যা সাধারণের কাছে দুরূহ দুর্গম দুর্বোধ্য। ব্রহ্মযজ্ঞে যেমন ভগবান বলছেন,
"ব্রহ্মার্পণং ব্রহ্ম হবির্ব্রহ্মাগ্নো ব্রহ্মণাহুতম্।" ---

  ব্রহ্মরূপ হবি ব্রহ্মরূপ অগ্নিতে ব্রহ্মণারূপ কর্তার দ্বারা হোম (ঘৃতাহুতি)করা হয়। ব্রহ্মবিদ ঋষি, দেবর্ষি, রাজর্ষিগণ ছাড়া এই অতলস্পর্শী ভাবব্যঞ্জক বাণীর অর্থোদ্ধার করা দুঃসাধ্য নয়, অসাধ্য। এই ভাবে সুগভীর জ্ঞানযোগ ও কামনা-বাসনা-শূন্য কর্মযোগের দীক্ষায় দীক্ষিত করে এই অধ্যায়ের শেষ বাণীতে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে আবারো আদেশ দিচ্ছেন,

অতএব, হে ভরতবংশীয় বীর, 'সমত্ববুদ্ধিযোগে' স্থিত হও, অজ্ঞান-সম্ভুত সংশয় জ্ঞানরূপ অসি দ্বারা ছেদন কর, ওঠো, যুদ্ধের জন্যে প্রস্তুত হও। এই মন্ত্রে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ শুধুমাত্র যে অর্জুনকে আসন্ন অনারব্ধ কর্মে প্রবৃত্ত ও উদ্বুদ্ধ করতে চাইলেন তাই নয়, নিখিল মানবচেতনার প্রতি এ যেন বিশ্ববিধাতার আদেশ। ঠিক যেমনটি আমরা পাই কঠ উপনিষদে, যেখানে যম নচিকেতাকে বলছেন,
"উত্তিষ্ঠিত জাগ্রত প্রাপ্য বরান্ নিবোধত।
ক্ষুরস্য ধারা নিশিতা দুরত্যয়া।
দুর্গম পথস্তৎ কবয়ো বদন্তি।।" 

এই আহ্বানের মধ্যে দিয়ে উদ্ঘোষিত হয়েছে যুদ্ধযাত্রার তূর্যনিনাদ, ডাক দেওয়া হয়েছে মানবজীবনের মহত্তম অভিযানের, সাধনলব্দ অভিজ্ঞতার উচ্চতম শৃঙ্গে আরোহন করে জীবনযুদ্ধে জয়ী হওয়ার জন্যে ধ্বনিত হয়েছে মহামন্ত্র --- মাভৈঃ। 

এইবার আবারও, পঞ্চম অধ্যায়ে, রথীন্দ্র অর্জুন এক সাধনমার্গের তাত্ত্বিক প্রশ্ন করলেন,
সন্ন্যাসং কর্মনাং কৃষ্ণ পুনঃ যোগং চ শংসসি।
"যচ্ছ্রেয় এতয়োরেকং তন্মে ব্রূহি শুনিশ্চিতম্ ।। 

হে কৃষ্ণ, (এখন কৃষ্ণ যেন তার গুরু) আপনি কর্মের প্রতি সন্ন্যাস ভাব থাকার কথা বলছেন এবং একই সঙ্গে নিষ্কাম কর্মযোগের প্রশংসা করছেন। এই দুইয়ের মধ্যে যেটি নিশ্চয়রূপে কল্যাণকর সেইটি আমাকে  বলুন-- ''তৎ মে ব্রূহি সুনিশ্চিতম।'' 

অর্জুন দ্বিধাগ্রস্ত, সংশয়ক্লিষ্ট ; কেননা এই কিছুক্ষণ আগেই শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন, 'সমত্ববুদ্ধিযোগে' সকল কর্ম যিনি ঈশ্বরে উৎসর্গিত করে 'দিয়েছেন', আর জ্ঞানযোগে যার সংশয় দূর হয়েছে (সংছিন্ন) এমন পরমাত্মাপরায়ণ পুরুষকে কর্মসকল আবদ্ধ করে না। এ তো কর্মবন্ধন ছিন্ন করবার সাধনা, কর্ম থেকে সন্ন্যাস নেওয়ার সাধনা। যার চাইবার কিছু নেই, পাবারও কিছু নেই, যে 'দুঃখেষু নিরুদ্বিগ্নমনা, সুখেষু বিগতস্পৃহ', যার কর্মফলের আকাঙ্ক্ষা নেই, যিনি 'পরমাত্মায়' আত্মসমর্পণ করেছেন নিঃসংশয়চিত্তে --- সংসারে কর্মবন্ধনছিন্ন সেই সন্ন্যাসীকে কেন বলা --- 'ওঠো, যুদ্ধের জন্যে প্রস্তুত হও।'

আসলে বেদান্ত বা উপনিষদের যুগ হতে পৌরাণিক যুগের মাঝখানের সময়কালেই মূল 'আর্য' জীবনদর্শনের সাথে ন-আর্য জনগোষ্ঠীর জীবনদর্শনে দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়, যা 'বুদ্ধদেবের আবির্ভাব ও তাঁর ধর্মবিপ্লবের সময়কালে সুস্পষ্ট রূপ ধারণ করে। তাই transition - (অন্তর্বর্তীকালীন অবস্থান্তর দশা)-এর কালে বেদ ও বেদান্তবাদীগণ (বিশেষ করে ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয় জনগোষ্ঠী) ওই ন-আর্য সম্প্রদায়ের ইহলোক সংক্রান্ত  বস্তুবাদী জীবনদর্শনের বিপরীতে ব্রহ্ম বা পরমাত্মা কেন্দ্রিক জীবনাচরণের আদর্শ প্রতিষ্ঠা করার জটীল আস্তিক্যবাদী দর্শনের বহুবিধ যুক্তির অবতারণা করেছেন। অপর দিকে অনার্য জনগোষ্ঠীর ইহলোক সংক্রান্ত জীবনদর্শনই হোল লোকাৎয়ত দর্শন। "যারা আত্মা মানে না, পরলোক মানে না, ধর্ম (বৈদিক ও বৈদান্তিক) মানে না, মোক্ষ মানে না, তাদেরই বলে লোকায়তিক। তারা মনে করে জল-মাটি-আগুন-হাওয়া দিয়ে গড়া এই মূর্ত পৃথিবীটাই একমাত্র সত্য, আত্মা বলতে দেহ ছাড়া আর কিছুই বোঝায় না। কথায় বলা হয়েছে বটে, আমি আর দেহ আলাদা কিছু ; কিন্তু এ হোল নেহাতই কথার কথা। ... এই মানে অনুসারে লোকায়ত হোল দেহাত্মবাদ বা বস্তুবাদ।‌"
               (লোকায়ত দর্শন-- দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়।) 

শ্রীকৃষ্ণে উত্তরের মধ্যে তাত্ত্বিক বৈপরিত্য লক্ষ্যে করে অর্জুন যে প্রশ্নগুলি করছেন বা করবেন সেগুলি সমকালের লোকায়ত দর্শনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। যুদ্ধ যদি করতেই হয় লোকায়ত দর্শনেই তো তার সমর্থন আছে।
" অধ্যাপক রাধাকৃষ্ণণ বলছেন, মহাকাব্যের যুগে ---- অর্থাৎ তাঁর হিসাবে খ্রিষ্টপূর্ব ৬০০ থেকে ২০০-র মধ্যে --- ভারতের সমাজ-ব্যবস্থায় নানারকম তোলপাড় শুরু হয়েছিল এবং পরিণাম হিসাবে চিন্তাক্ষেত্রে লোকায়ত-মতের‌ আবির্ভাব হয়। এই যুগটিতে (যাকে আমরা transition-যুগ বলেছি) অনেক শতাব্দীর পুরাতন বিশ্বাস ভেঙে পড়েছিল।"
                                                    (ঐ)
                                           
এই প্রশ্নের উত্তরে শ্রীকৃষ্ণ আরও গভীরতরভাবে সাংখ্যযোগ ও নিষ্কাম কর্মযোগের উপদেশ দিয়েছেন। পরের পর্বে পঞ্চম অধ্যায় ও পরবর্তী।
                         (ক্রমশঃ)
_________________________________________








Recently published

অমূল্য

He ( Tagore) who sees all things in his own self and his own self in all things, he does not remain unrevealed.                     ...