গীতায় অর্জুন- ৫
শ্রী মদ্ভগবদ্ গীতায় 'অর্জুন-৪' --- আলোচনা আমরা শেষ করেছি আমাদের বাংলার মহাকবি রবীন্দ্রনাথের একটি সঙ্গীত উদ্ধার করে। আমাদের গ্রামদেশের কথকথার আসরের এমনটিই নিয়ম ছিল যে কথা আরম্ভের সূচনায় এবং কথাশেষে বলা হোত, "করুণাময়ের করুণা আমাদের সকলের উপর বর্ষিত হোক্।" এখানে এই সুখশ্রাব্য রবীন্দ্রনাথের প্রার্থনা সঙ্গীতটি।
এবার আবার ফিরে আসি গীতার ভাবনায়। আসলে যিনি কিছু বলতে চান, বলতে চান জীবনের নিত্যদিনের জৈবিক কামনার প্রয়োজনীয়তার বাইরে মহত্তর আকাঙ্ক্ষার কিছু কথা, প্রশ্ন করতে চান, "এই জীবন লইয়া কি করিব'', জানতে চান অন্তিম বিনাশ বা মৃত্যু সমাসন্ন জেনেও 'কর্মযোগ' সাধনায় কি লাভ --- তাঁর কাছে তাঁর নিজের জীবন ও জগৎ নিরর্থক মনে হয়। এই আশাহত, লক্ষ্যশূন্য, অর্থহীনতায়-ভরা জীবন দুটি পথের একটি পথ বেছে নেয় সে ---- হয় ভোগবাদ, নয় আত্মহনন। ভোগবাদ মানবতার সমস্ত গুণ হরণ করে নেয়। ভোগবিলাসের জন্য অর্থ চাই, ধন চাই। অফুরান সম্পদের সঞ্চয় চাই। এই সম্পদ আহরণের জন্যই শোষণ, ত্রাসন, লুণ্ঠন। অপরের বিত্ত, অশন-বসন, গ্রাসাচ্ছাদন হরণ থেকে আরম্ভ করে তাকে হত্যা এবং বিতাড়ন করাও চলতে থাকে নির্মম অমানবিকতায়। এই ভোগসর্বস্বতার রূপ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীগত দ্বন্দ্ব থেকে আরম্ভ করে বিশ্বযুদ্ধের আকার ধারণ করে। করেছেও --- মানব সভ্যতায় তেমন নরমেধ যজ্ঞ সংঘটিত হয়েছে সহস্রবার, হয়ে চলেছে আজও। হবেও বা এই নর-সভ্যতার শেষ ধংসকাল পর্যন্ত।
আর ভোগের সুযোগ থেকে বঞ্চিত যারা তারা আশাহারা, ভাষাহারা। ভোগীদের ভোগের সামগ্রী। শিক্ষাদীক্ষা বা জ্ঞানার্জনের পথ তাদের জন্য রুদ্ধ। এমনকি আত্মসম্বিৎহীন এবং জীবনের মূল্য সম্মন্ধেও উদাসীন। ঐশ্বর্যগর্বী, ভোগবাদী, বিলাসী এই বর্তমান সভ্যতার মধুচক্রের বা মৌচাকের তারা শ্রমিক মৌমাছি, সেটি নির্মাণ করবার কাজেই তারা বাঁচে ও মরে।
মানব সমাজের এই দুই প্রকার জনগোষ্ঠীর কাছেই 'ধর্ম' আশ্রয়। প্রথম গোষ্ঠী ধর্মের আশ্রয় অবলম্বন করে সুখ-সম্ভোগ অব্যাহত রাখার আর্ত কামনায় ; আর দ্বিতীয় জনগোষ্ঠী ধর্মের আশ্রয় গ্রহন করে জীবনের নিরন্তর দুঃখ থেকে সান্ত্বনা লাভের আশায়। সমাজের এই দুটি শ্রেণীর অভাব বা দারিদ্র্য কিন্তু একই--- শান্তির। এখানেই প্রয়োজন আধ্যাত্মিক সচেতনতার। সমাজে যাঁরা সুযোগপ্রাপ্ত এবং জ্ঞান সাধনায় ব্রতী, তাঁদের উপর এ দায়িত্ব বর্তায় যে তাঁরা সমাজসংসারের সকলকে, ধনবান-ধনহীন নির্বিশেষে আধ্যাত্মিক সচেতনতার দীক্ষা দান করবেন। প্রেয় এবং শ্রেয় -- এই দুই মানবীয় বিপরীতমুখী কামনার প্রকৃত পরিণাম সম্মন্ধে মানুষকে সচেতন করাই সমাজের পথপ্রদর্শকদের ঐশ্বরীক 'সেবা'পরায়নতা। প্রেয়ভাব (ক্ষণস্থায়ী সুখ সম্ভোগের তৃষ্ণা) অবক্ষয়ী ; কিন্তু শ্রেয়ভাব (সুখে -দুঃখে আনন্দ সন্ধান) অক্ষয় শান্তিলাভের উপায়। "প্রেয়ের সন্ধান হোল সম্পদ, শক্তি আর সুখের সন্ধান ; কিন্তু শ্রেয়ের সন্ধান অন্য ; এ হোল আধ্যাত্মিকতার সন্ধান ; এ হোল সেই তেজের সন্ধান যা সব সম্পদ, শক্তি ও সুখকে পরিপাক করবে। আধ্যাত্মিক পরিপাক (সকলের মধ্যে ভোগের, ত্যাগের দ্বারা ভোগ) ছাড়া সম্পদ শক্তি ও সুখ মানবাত্মার ক্ষয় সাধন করে, মানবকে খর্ব ও তুচ্ছ করে দেয়।" যতই কেননা সে মানব শক্তিধর (giant) হোক না কেন।
------ স্বামী রঙ্গনাথানন্দ।
Shakespeare তাঁর Measure for Measure কাব্যে (নাটকে) এই কথাগুলি সুন্দর ভাবে বলেছেন, (ইসাবেলার মুখ দিয়ে বলিয়েছেন এঞ্জেলোকে),
Angelo: Your brother dies tomorrow ; be content.
Isabella: So you must be the first that gives the sentence.
And he that suffers ! O, it is excellent to have a giant's strength ; but it is tyrannous to use it like a giant.
শক্তিকেও জ্ঞানের শাসনে ব্যবহার করতে হবে। সেই 'জ্ঞান'য়ের চুড়ান্ত পর্যায়ে আছেন পরমাত্মা। তিনি দ্যুলোক ভূলোক সর্বত্র ব্যপ্ত।
"আছ অনল অনিলে চির নভোনীলে ভূধরে সাগরে গহনে
আছ বিটপী লতায়, জলদের গায় শশী-তারকায় তপনে।"
এই 'জ্ঞানসহ ভক্তিযোগে' তাঁর শরণাগত হয়ে কর্মযোগ সাধনা করলে কর্মযোগীর চতুর্বর্গ (পুরুষার্থ) প্রাপ্তি এবং জগতের মঙ্গল সম্ভাবিত হবে।
শ্রীমদ্ভগবত গীতার সপ্তম অধ্যায়ে আমরা প্রবেশ করেছি। এই অধ্যায়ে শ্রীকৃষ্ণ বলছেন মানুষের আসুরিক শক্তির কোন পরিণামপূর্তি নেই। আধ্যাত্মিক শক্তির দ্বারাই সে পরমগতি বা পূর্ণ জীবন বা জীবনযুদ্ধে চরিতার্থতা লাভ করে। সেই পূর্ণতা, সেই পরম গতি, সেই চরিতার্থতা --- চতুর্বর্গ (ধর্ম অর্থ কাম মোক্ষ) আমিই। এই সপ্তম অধ্যায় থেকেই ভগবান নিজ শ্রীমুখে ভক্তিমার্গের কথা বলছেন।
বলছেন 'ময্যাসক্তমনাঃ' --- সম্পূৰ্ণরূপে আমাতেই আসক্ত হয়ে থাক তবে সমগ্রতার মধ্যে, এই বিশ্বচরাচরের সমস্ত রূপ ও গুণের মধ্যে, বিভূতি-বল- ঐশ্বর্যের মধ্যে, সকল প্রাণের মধ্যে আমাকেই পাবে--- এই বিজ্ঞান (বিশেষ জ্ঞান)-যুক্ত তত্ত্ব জ্ঞান আমি তোমাকে বলব (বক্ষামি) যা জানবার পর আর কিছু প্রশ্ন থাকবে না।
___________________________________________
লক্ষণীয়, অর্জুন কিন্তু এখনো পর্যন্ত শ্রীকৃষ্ণের উপদেশবাণীগুলিকে অসন্দিগ্ধ চিত্তে গ্রহণ করতে পারছেন না। কেননা যুদ্ধ, হত্যা, ধংস ; প্রাণের ক্ষয়, প্রতিষ্ঠার লয় --- এমন এক সর্বনাশের কাল যখন আসন্ন, তখন পরমার্থ, পরমাত্মন চিন্তার অবকাশ কোথায় ? এমন প্রশ্নই তো অর্জুন করেছিলেন ষষ্ঠ অধ্যায়ে (৩৮তম শ্লোকে) 'কচ্চিৎ ন উভয়বিভ্রষ্টঃ ছিন্নাভ্রমিব নশ্যতি।'' পরমাত্মা 'ব্রহ্মণঃ' প্রাপ্তি আর সাংসারিক ভোগ-সুখ -- এই উভয়বিধ চরিতার্থতাই ভ্রষ্ট হবে না কি যদি তোমার কথাই পালন করি।
_______________________________________________
যাই হোক্, আমরা পুনর্বার শ্রীকৃষ্ণের উপদেশবাণী শ্রবণ করি : দেখ অর্জুন, সহস্র সহস্র মানুষের মধ্যে কেও কেও (কশ্চিত) আমার প্রতি অনুরক্ত হয়ে, তত্ত্বের জ্ঞানে আমাকে যথার্থরূপে জানে। সেই তাত্ত্বিক হয়তো জানে, 'প্রকৃতিরষ্ঠধা' ---- ভূমি, জল, অগ্নি, বায়ু, আকাশ, মন, বুদ্ধি আর অহংকার---- আমারই স্ব-ভাব। এই অষ্ট প্রকারের জড় প্রকৃতি ছাড়াও আমার যে 'জীবভূতাম' চেতন প্রকৃতি, তাই 'পরাম্' বা পরম চৈতন্যসত্ত্বা, যার দ্বারা এই জগৎ ধারণ করা হয় -- 'যয়েদং ধার্যতে জগৎ।' আমার এই দুই প্রকার প্রকৃতি হতে সকল ভূতসত্ত্বার সৃষ্টি। এই সৃষ্টির আবার প্রলয় রূপও আমি।
এখানে শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, এই যে দৃশ্য জগৎ তার সৃষ্টি এবং বিলয়ের হেতু আমিই। 'আমি' ছাড়া আর কিছুর আলাদা অস্তিত্ব নেই। এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে যা দেখছ, অনুভব করছ সকল, সমস্ত 'ভাব ও অভাব' --- দৃশ্যমান বস্তুসমূহ এবং অদৃশ্য শক্তি --- আমাতে মণিখণ্ডের মত গ্রথিত।
"ময়ি সর্বমিদং প্রোতং সূত্রে মণিগণা ইব।"
(শুধুমাত্র যোগমার্গের সাধকেরাই যে গীতার শব্দের, বাক্যের অর্থে মগ্ন হন তাই নয়, সাহিত্যরসের রসবেত্তারাও এমন সংগীতময় ধ্বনি ও ব্যঞ্জনায় মুগ্ধ হয়ে যান)।
সে কথা আবার বলছেনও --- হে পার্থ, তুমি জেনো জলে আমি রসস্বরূপ, চন্দ্রে সূর্যে আলোর প্রকাশ, বেদে 'ওঁকার', আকাশে শব্দ, পুরুষে পৌরুষ। আমিই রূপ-রস গন্ধ-স্পর্শ। আমি অগ্নিতে তেজ, সকল জীবিতের জীবন, সকল তপস্বীদের তপস্যা। এই ভূত জগতের (সৃষ্টির) কারণ, আদি বীজরূপ আমি। মানব চেতনার বোধ, বুদ্ধি, কামনা-অনুরাগ-বিবর্জিত পুরুষের বল, নীতিশাস্ত্র-সম্মত কর্মের প্রেরণাও আমি। বিশ্বচরাচরের বিরাজমান পরমাত্মা, পরমাত্মা থেকে সত্ত্ব-তম-রজোগুণ সমন্বিত সকল বস্তু ও অবস্তুর "সৃষ্টি আমা হতেই"। কিন্তু এই সকল গুণত্রয়-বিশিষ্ট সবিকার ভূতের (ভৌতিক পদার্থ) মধ্যে আমি নেই, আমাতেও তারা নেই। "ন তু অহম তেষু তে ময়ি।"
কি বিপদ, ভাবুন একবার ! চিন্তা করুন অর্জুনের মনের অবস্থা ! স্বয়ং যিনি দাঁড়িয়ে রয়েছেন তাঁর সম্মুখে, তাঁরই রথের সারথি (যোগীগণ ভাবছেন চিরচলমানতার মধ্যে অচল, অচঞ্চল, নির্বিকার চৈতন্যসত্তা), তিনি কিনা বাঙ্ময় মূর্তি হয়ে বলছেন, "সৃষ্টির হেতু তিনি, তার থেকে ত্রিগুণযুক্ত ভাব দ্বারা, ভিন্নার্থে বিকার দ্বারা এই সৃষ্টজগত মোহিত হয়ে আছে --- এবং সেই তিন গুণের (সত্ত্ব, রজঃ, তম) অতীত, নির্গুণ বা গুণাতীত, নির্বিকার, ভাব-অভাব- নিরপেক্ষ, জড়-জগতের মধ্যে সম্পৃক্ত অথচ জগতাতীত-- এমন সত্ত্বা তো মানবীয় বোধবুদ্ধির জ্ঞানে ধরা যায় না। তবে ? অর্জুন ভাবছেন, কে এই পুরুষ ? কৃষ্ণ যেন ধীরে ধীরে সামনে থেকেও দূরে, দূর থেকেও সুদূরে ক্রমশ অপসৃয়মান হতে হতে পরিদৃশ্যমান এই কুরুক্ষেত্র ছাড়িয়ে, পরিচিত এই দেশকাল ছাড়িয়ে, নিখিল ভূবনের পরপার হতে আগত আলোর জ্যোতির্ময় শিখা। "পরাহমেকং পুরুষ মহান্তং আদিত্যবর্ণং তমস পরস্তাৎ।"
যোগীরা ধ্যানের মধ্যে এই ত্রিগুণময়ী মায়াজাল, মোহান্ধকার ছিন্ন করতে পারেন। শ্রীকৃষ্ণ তাইই বলছেন। এই দৃশ্য জগত সত্ত্বার বিকৃতি। আর এই বিকৃতিপ্রাপ্ত, প্রকৃতিরূপ জগতের পারে জগতাতীত যে আলোময় 'পরম অব্যয়ম' চৈতন্যস্বরূপ আমাকে জানতে না পারার কারণ মায়া। "দৈবী হি এষা গুণময়ী মম মায়া দুরত্যয়া।" মায়ার অন্ধকার ছিন্ন করা সুকঠিন যদি আমাকে, অর্থাৎ সৃষ্টির চৈতন্যস্বরূপকে নিরন্তর ভজনা না কর।
"ন মাং দুষ্কৃতিনো মূঢ়াঃ প্রপদ্যন্তে নরাধমাঃ।
মায়য়াপহৃতজ্ঞানা আসুরং ভাবমাশ্রিতা।।"
দেখ অর্জুন, মায়া দ্বারা অপহৃতজ্ঞান, আসুরী ভাবাশ্রিত দুষ্কৃতি, মূঢ়, নরাধম যারা তারা তো ভজনা করে না। ভগবৎ আরাধনার প্রবৃত্তি নাই যাদের তারা আসুরীস্বভাব। এই দৃশ্যমান জগতের মায়া যে মোহের আবরণ সৃষ্টি করে তাকে ছিন্ন করতে হলে আসুরীস্বভাব ত্যাগ করতে হবে।
এরপর শ্রীকৃষ্ণ, ভিন্ন ভিন্ন শ্রেণীর ভক্তের কথা বলেছেন। বলেছেন তারা কেও অর্থার্থী (বিত্তকামী), কেও আর্ত, কেও জিজ্ঞাসু, কেও বা আবার কামনা-বাসনাহীন। এদের মধ্যে জ্ঞানী ভক্ত আমার প্রিয়। তবে নিষ্কাম জ্ঞানী, আমাতেই-স্থিত এমন ভক্ত বড়ই বিরল। বহু বহু জন্মের পর, অন্তিমে পরম তত্বজ্ঞানী এই বিশ্বাস করে যে সর্ব ব্যপ্ত সত্ত্বা বাসুদেব এবং এই ভাব নিয়ে তাকে যে ভজনা করে তেমন মহাত্মা সুদুর্লভ --- ''সঃ মহাত্মা সুদুর্লভঃ।" তাঁকে ছাড়া, ভোগের (সামগ্রী) কামনায়, যারা অন্য অন্য দেবতার ভজনা করে, এবং যদি শ্রদ্ধার সঙ্গে ভজনা করে তবে তাঁকেও শ্রদ্ধায় অচঞ্চল হবার জন্য সুমতি প্রদান করেন। অন্যান্য দেবতাদের শ্রদ্ধার দ্বারা ('শ্রদ্ধয়া') পূজা করলে আমা কর্তৃক সেই পূজক ও ইষ্টফল লাভ করে।
(এখানে ঋকবেদোক্ত বিবিধ বাসনা-কামনা পূর্ণ করবার জন্য স্বতন্ত্র স্বতন্ত্র দেবতার আরাধনার প্রসঙ্গ উল্লেখিত। উপসংহারে আলোচিত হবে।)
আমার অব্যক্ত, সচ্চিদানন্দঘন পরমাত্মার রূপ সকলে অনুভব করতে পারে না এইজন্যই যে আমি যোগমায়া দ্বারা আবৃত। হে অর্জুন, ভগবান শ্রীকৃষ্ণ আবার বলছেন, যা হয়েছে, যা হচ্ছে এবং যা হবে সবই আমি জানি কিন্তু ভক্তিরহিত পুরুষ আমাকে জানে না।
____________________________________________
('মায়া বা যোগমায়া' বিষয়টি অত্যন্ত জটীল ও ভারতীয় পুরাণ সাহিত্যে, বিশেষ করে মাকেণ্ডেয় পুরাণ, অগ্নি পুরাণ, শ্রী মদ্ভগবদ্ পুরাণে এবং গীতায় ব্যাপকতররূপে আলোচিত হয়েছে। কৃষ্ণ ও তাঁর একই দিনে জন্ম হয়েছিল। তিনিই নন্দজায়া যশোদার কোলে কন্যারূপে জন্ম নেন ; আর কৃষ্ণ জন্ম নিয়েছিলেন বসুদেবপত্নী দেবকীর কোলে, কংসের কারাগারে । পরে তাঁদের আঁতুরঘর পরিবর্তনের নাটকীয় কাহিনী। উপরোক্ত পুরাণগুলির বর্ণনায় কৃষ্ণের হ্লাদিনী শক্তিরূপে কৃষ্ণের প্রাণ রক্ষা করবেন বলেই যোগমায়ার জন্ম। বিষ্ণুর কৃষ্ণ অবতার লীলায় এই যোগমায়া সকল সময়ে, সকল অবস্থায় অদৃশ্যভাবে অবস্থান করেছেন। জিজ্ঞাসু্ ও ভক্ত পাঠকগণ অবশ্যই কৃষ্ণলীলা বিষয়ক অমৃতনিস্যন্দী গন্থগুলি পাঠ করেছেন বা করবেন।)
______________________________________________
রাগ, দ্বন্দ্ব, সুখ, দুঃখ সব আসে ইচ্ছা বা তীব্র মনস্কামনা থেকে ; ফলতঃ মানুষ অসার সৌভাগ্যের স্বপ্নে সম্মোহিত হয়। জীবনের পরম প্রাপ্তির জন্যেই 'দ্বন্দ্বমোহনির্মুক্ত' হয়ে, দৃঢ়ব্রতী হয়ে, আমাকে (ভগবানকে) ভজনা করলে পাপমুক্ত হয়। এমন অধ্যাত্ম জীবন, প্রকৃত কর্মজীবন এবং ব্রহ্মকে জানবার জন্যও ভগবৎ-শরণই একমাত্র পন্থা।
জরামরণমোক্ষায় মামাশ্রিত যতন্তি যে।
তে ব্রহ্ম তদ্বিদু কৃৎস্নমধ্যাত্মং কর্ম চালিনম।।
আবার যে পুরুষ অধিদৈব, অধিভূত, অধিযজ্ঞের --- প্রকৃতির ভৌতিক বিকার, দৈবিক বিকার এবং মানবাত্মার যে বিভিন্নতা, সে সবের মূলে যে 'আমি', (সূচনায় ও অন্তিমকালে এক পরমব্রহ্ম, 'অন্তিমে সব একাঙ্গী') সেই পুরুষ আমাকেই (মরণ পারেও) প্রাপ্ত হন। জলেতে মিলায় জল।
এইভাবে সপ্তম অধ্যায়ের 'জ্ঞানবিজ্ঞানযোগ' বিষয়ক উপদেশবাণীর ঘোর জটীলতার শেষ পর্যায়ে অর্জুন যেমন স্বস্তি পেলেন এই ভেবে যে সখা বাসুদেবের শরণ নিলে জীবনের উদ্দেশ্যে সাধনের পথ তিনিই দেখাবেন, তেমনি যিনি মহোপনিষদ গীতার পাঠক তিনিও এই ভরসা পাবেন, যোগী না হতে পারলেও, ভক্তির পথ তো আছে। আর যদি এই বিশ্বচরাচরের আদিতেও তিনি, অন্তেও তিনি, প্রকৃতির সকল বস্তুতে, সকল প্রাণেই তিনি তবে আমিও তো তিনিই। আমার মত কিংকর্তব্যবিমূঢ় গীতাপাঠক তখনই আত্মনিবেদন করবে, বলবে,
"আমিও তোমারি গো তোমারি সকলি তো,
জানিয়ে জানেনা এ মোহহত চিত।
আমারি বলে কেন ভ্রান্তি হোল হেন--
ভাঙো এ অহমিকা মিথ্যা গৌরব।।"
--------- কান্তকবি।
কিন্তু অর্জুন যে মহারথী। তিনিও তো প্রলয়ঙ্করী শক্তির আধার। সেই শক্তির প্রয়োগের ক্ষেত্র এই কুরুক্ষেত্রে এসব কি 'কথা ! একই সঙ্গে যোগের দুরূহ সাধনা এবং সমরাঙ্গনে সংহার ! তার উপর আবার অধ্যাত্ম, অধিদৈব, অধিভূত--য়ের মত দুর্বোধ্য শব্দজাল ! "হে সখা, আমি বিভ্রান্ত, বোঝাও আমাকে", বলে' অষ্টম অধ্যায়ে, শ্রীকৃষ্ণকে সাতটি প্রশ্ন করলেন অর্জুন।
আমরা পরের পর্বে জীবনের কুরুক্ষেত্র- সমরাঙ্গণে দুই পুরুষশ্রেষ্ঠ, কৃষ্ণার্জুনের আলাপন যেন কৃপাসিন্ধুর কৃপায় শ্রবণ করতে পারি।
যুদ্ধোন্মত্ত ধরাধামে শান্তির সঙ্খস্বর ধ্বনিত হোক্।
(ক্রমশঃ)
দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
১২ই শ্রাবণ,১৪৩২
২৯/৭/২০২৫,
ব্যাঙ্গালোর।