শ্রীমদ্ভগবত গীতায় অর্জুন-৩
এরপর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ আত্মার নিত্যত্ব, অবিনশ্বরতা এবং অবিকারত্ব বিষয়ে অর্জুনকে উপদেশ দিয়েছেন। বস্তুত শ্রীগীতার দ্বিতীয় অধ্যায় জুড়ে অনাদি অনন্ত, অক্ষয় অব্যয়, জন্মহীন মৃত্যুহীন, দেহ-বিবিক্ত অথচ দেহধারী, অব্যক্ত অথচ সৃষ্টিপরিব্যাপ্ত এক এবং অবিভাজ্য যে আত্মার কথা ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বলেছেন তা এতই গূঢ় যে সেই আত্মজ্ঞানের, আত্মা সম্মন্ধীয় জ্ঞানের অধিকারী যাঁরা, যাঁরা আত্মসমাহিত সাধক তাঁরা তখন এই সত্য উপলব্ধি করেন যে দেহ জন্ম মৃত্যুর অধীনে কিন্তু আত্মা 'অজ' ও 'অ-মর' ; এবং এই শাশ্বত সত্য জেনে তাঁরা শরীরের নিধন হলে শোকাকুল হন না। তারা জানেন, মানুষ যেরূপ জীর্ণ পুরাতন বস্ত্র পরিত্যাগ করে নূতন বস্ত্র পরিধান করে, সেইরূপ মৃত্যু হলে দেহী (যার দেহ আছে) জীবাত্মা পুরাতন শরীর ত্যাগ করে নূতন শরীরে প্রবেশ করে। মৃত দেহ চিতাগ্নি দ্বারা ভস্মীভূত হয় বা মৃত্তিকার মধ্যে বিলীন হয় ; কিন্তু আত্মা অস্ত্র দ্বারা ছিন্ন হন না, অগ্নিতে দগ্ধ হন না, জলে আর্দ্র বা ক্লেদাক্ত হন না।
অচ্ছেদ্যোহয়ম্ অদাহ্যোহয়ম্ অক্লেদ্যোহশোষ্য এব চ।
নিত্যঃ সর্বগতঃ স্থানুঃ অচলঃ অয়ম সনাতনঃ।।
অতএব হে পার্থ, তুমি যখন জান (অর্জুন এখন জানছেন) এই অদৃশ্য অস্পর্শ অবিজ্ঞাত অচিন্ত্য অবিকার্য্য আত্মার মৃত্যু হয় না, তখন এই সনাতন সত্য জেনেও তুমি অযথা শোক করতে পার না। দেখ, যার জন্ম হয়েছে তার মরণ নিশ্চিত, আর মৃতের জন্যও (পুনর্জন্ম) নিশ্চিত। জন্ম মৃত্যুর এই অপরিহার্যতা জেনে তোমার শোক করা অনুচিত।
ভূত অর্থাৎ অতীত (জন্মের পূর্বকাল) প্রাণীসকল জানে না। তা ব্যক্ত নয় এবং মৃত্যুর পরবর্তী কাল --- তাও অব্যক্ত। মধ্যখানের এই যে আমাদের শরীরী অস্তিত্ব (ব্যক্ত অবস্থা)- এই ক্ষণিক অস্তিত্বের জন্য কিসের বিষাদময়তা "তত্র কা পরিদেবনা) !
শ্রীমদ্ভগবত গীতায় প্রায় প্রায় সাড়ে সাত শত শ্লোকের মধ্যে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ মুখ নিঃসৃত শ্লোক ছয়শত কুড়িটি, 'অর্জুনোবাচ' সাতান্নটি, সঞ্জয়োক্ত সাতষট্টি এবং মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র কর্তৃক উচ্চারিত শ্লোক মাত্র একটি। প্রথম বাণীটিই অন্ধ ধৃতরাষ্ট্রের,
ধর্মক্ষেত্রে কুরুক্ষেত্রে সমবেতা যুযু্ৎসবাঃ।
মামকা পাণ্ডবাশ্চৈব কিমকুর্বত সঞ্জয়।।"
লক্ষণীয়, ধৃতরাষ্ট্র একটিই প্রশ্ন করেছেন সঞ্জয়কে এবং তারপরই তিনি শ্রোতা, সঞ্জয় বক্তা। অর্জুন সারথি শ্রীকৃষ্ণকে কি কি বললেন, তাঁর মানসিক, দৈহিক অবস্থা, কৃষ্ণের প্রতিক্রিয়া, কৃষ্ণের সমস্ত বক্তব্যের হুবুহু অসম্পাদিত (unedited) বর্ণনা শুনে গিয়েছেন ধৃতরাষ্ট্র কিন্তু উক্তি, এমন কি স্বগতোক্তিও করেন নি একটি বারের জন্যও। গীতায় রাজা ধৃতরাষ্ট্রের এই পাষাণ-মৌনতার কোন ব্যখ্যা গীতায় নেই। তবে কি তিনি জেনেই গিয়েছিলেন পরিণাম,
"...... এখন তো আর
বিচারের কাল নাই নাই প্রতিকার,
নাই পথ ---- ঘটেছে যা ছিল ঘটিবার,
ফলিবে যা ফলিবার আছে।"
--- গান্ধারীর আবেদন (রবীন্দ্রনাথ)
আমাদের মনে রাখতে হবে গীতার শেষ কথা এই নিয়তি, যার মূর্ত বিগ্রহ শ্রীকৃষ্ণ। নইলে ঐ প্রথম অধ্যায়ে এবং দ্বিতীয় অধ্যায়ের ৬তম শ্লোকটিতে আপন ইচ্ছা দৃঢ়তার সঙ্গে প্রকাশ করবার পর অর্জুন যেন শ্রীকৃষ্ণেরই ইচ্ছার দাস হয়ে গিয়েছিলেন। বললেন, আমি ধর্মসংমূঢ়চেতাঃ, কি করতে হবে বল। "তোমার ইচ্ছা হউক পূর্ণ আমার জীবনমাঝে" (শ্লোক-সপ্তম)। অষ্টম শ্লোকে শোকে মুহ্যমান অর্জুন তো যুদ্ধ অপেক্ষা বৈরাগ্যই শ্রেয়তর মনে করেছিলেন।
এরপর থেকে আবার (প্রথম অধ্যায়ের অনুবর্তন) ঐ যোগশাস্ত্র সম্মন্ধীয় সাঙ্খ্যযোগের তত্ত্ব বর্ণনা করেছেন শ্রীকৃষ্ণ। এই দ্বিতীয় অধ্যায়ের চুয়ান্নতম ও পঞ্চান্নতম শ্লোকে অর্জুন শ্রীকৃষ্ণকে 'স্থিরপ্রজ্ঞ' পুরুষের বিষয়ে চারটি প্রশ্ন করেছেন। তৃতীয় অধ্যায়ে আবার অর্জুনের দুটি জিজ্ঞাসা (শ্লোক প্রথম ও দ্বিতীয় -- এই শ্লোকগুলি আমরা প্রবন্ধের শেষ অংশে আলোচনা করব)। এই অধ্যায়েই আবার অর্জুন ছত্রিশতম শ্লোকে জানতে চাইছেন, হে বার্ষ্ণেয়, তুমি বল, মানুষ কার দ্বারা নিয়োজিত হয়ে অর্থাৎ কার প্রেরণায় অনিচ্ছা সত্তেও পাপ কাজে প্রবৃত্ত হয় ?
অর্জুনের এই প্রশ্নের উত্তরে শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন অনিচ্ছা সত্ত্বেও মানুষ পাপকর্মে যে লিপ্ত হয় তার জন্য দায়ী তার নিজেরই অন্তরের রজোগুণ --- কাম, ক্রোধ, অতৃপ্ত ভোগাকাঙ্ক্ষা। এই অধ্যায়ের ৩৭তম শ্লোক থেকে ৪১তম শ্লোকে মানুষের ইন্দ্রিয়পরতাই যে মানুষের বুদ্ধি ও বিবেককে ধূম্রাচ্ছন্ন করে, তাকে পাপকাজে প্রবৃত্ত করে, সে কথাই নানাভাবে উদাহরণ সহযোগে অর্জুনে কাছে ব্যাখ্যা করেছেন।
(এস্থলে আমার দীনতা স্বীকার করে নেওয়া, ক্ষমা প্রার্থনা করবার অবকাশ আছে। আমি ভগবান শ্রীকৃষ্ণের উপদেশবাণীগুলির গভীরে আলোচনা করিনি, করার মতো বিদ্যা, জ্ঞান, সাধনোচিত পুন্যবল এবং দার্শনিক অধিকার --- কিছুই আমার নেই। ঈশ্বরবাণীর প্রসঙ্গানুক্রমে তৃতীয় পাণ্ডব যখন যে প্রশ্ন করেছেন শুধু সেই প্রশ্নগুলিই পুনরাবৃত্তি করেছি।)
'কর্মযোগ' নামক তৃতীয় অধ্যায়ের পর চতুর্থ অধ্যায় থেকে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ আরও গভীর দার্শনিক তত্ত্বে প্রবেশ করেছেন। এবার তিনি 'অহম বা আমি' শব্দ ব্যবহার করে যোগশাস্ত্র সম্মন্ধীয় জ্ঞানের বর্ণনা ও ব্যাখ্যা দিয়েছেন। এবম্প্রকার যোগের কথা তিনি সূর্যকে জানিয়েছিলেন, সূর্য তার পুত্র মনুকে জানিয়েছেন, মনু রাজা ইক্ষ্বাকুকে বলেছেন। পরে রাজা ইক্ষ্বাকুর কাছ থেকে রাজর্ষিগণ জেনেছিলেন বটে, কিন্তু সেই যোগসাধনার পরম্পরা এক সময় লুপ্ত হয়ে গিয়েছিল। এবার তুমি, (অর্জুনকে উদ্দেশ করে শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন) যেহেতু আমার ভক্ত ও সখা তাই আবার এই যোগের কথা তোমাকে জানালাম।
এইখানে, চতুর্থ অধ্যায়ের ৪র্থ শ্লোকে, মহারথী অর্জুন শ্রীকৃষ্ণকে একটি মোক্ষম প্রশ্ন করে বসলেন যাতে সারথি কৃষ্ণ তাঁর দৈবসত্ত্বার অবগুণ্ঠন খুলতে বাধ্য হলেন।
অপরং ভবতো জন্ম পরং জন্ম বিবস্বতঃ।
কথমেতদ্বিজানীয়াং ত্বমাদৌ প্রোক্তবানিতি।।
আপনার জন্ম তো এখন হয়েছে, বিবস্বান সূর্যদেব তো কত পুরাতন। তাহলে এই যোগের কথা আপনি কল্পাদিতে বলেছিলেন -- এ আমি কি প্রকারে জানব ?
('আদৌ' -- আদি কালে বা কল্পের আদিতে, মহাকালের জন্মের সূচনালগ্নে। ঋকবেদের একটি মন্ত্রের প্রতিধ্বনি এই শ্লোকে প্রচ্ছন্ন আছে। পরে আলোচিত হবে)।
শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনের এমন প্রশ্নের উত্তরে যা বললেন সেই বাণীগুলিই শ্রীমদ্ভগবত গীতার সার। তিনি বলছেন, দেখ অর্জুন, তুমি ও আমি কত অনন্ত জন্ম পেরিয়ে এসেছি। সে সকল গত-হয়ে-যাওয়া জন্মের কথা তোমার স্মরণে থাকার কথা নয় ; কিন্তু 'আমি' তা সবই জানি --' এই আমি অবিনশ্বর, অবিনাশী। জন্মমৃত্যুরহিত, সর্বজীবে, সর্ববস্তুতে ঈশ্বররূপে চিরবিরাজমান এবং স্বীয় প্রকৃতিকে (জীবোচিত প্রবনতাকে) যোগমায়া বা আত্মমায়ার দ্বারা বশীভূত করে আমি আবির্ভূত হই। এরপর সেই বহু আলোচিত, বহুচর্চিত ভগবানের আবির্ভাব প্রসঙ্গ। অবতারবাদের ঘোষণা,
যদা যদা হি ধর্মস্য গ্লানির্ভবতি ভারত।
অভ্যুত্থানমধর্মস্য তদাত্মানং সৃজাম্যহম।।
হে ভারত (অর্জুন), যখন যখন ধর্ম গ্লানিময় হয়, অধর্মের অভ্যুত্থান হয়, তখনই আমি নিজ রূপের বা নিজেকে সৃষ্টি করি -- 'সৃজাম্যহম'।
কেন ?
না, সাধু যাঁরা, জগতের হিতাকাঙ্ক্ষী যাঁরা তাদের রক্ষা করবার নিমিত্তে এবং পাপীদের, অধর্মাচারীদের বিনাশের জন্যই আমার এরূপ দিব্য আবির্ভাব।
(এখানে আর সখারূপে নয়, এক 'দিব্যম' অর্থাৎ অলৌকিক যুগপৎ অতিলৌকিক, সর্বশক্তিমান, অজ, অবিনাশী পরমাত্মারূপে স্বয়ং পরমেশ্বর নিখিল ধরাধামের দ্বন্দ্বক্ষুব্ধ মানুষের প্রতিনিধি স্থানীয় অর্জুনকে বলছেন।) এবং আমার এই দিব্যরূপ, জন্ম ও কর্ম 'তত্ত্বতঃ' যে জানে সে জন্মচক্রের নিরন্তর ঘূর্ণাবর্তের মধ্যে আর নিপতিত হয়ে না ---- 'আমাকেই'' প্রাপ্ত হয়। তবে সেই -ই আমাকে লাভ করে যে, (শ্রীভগবানের নিজের শ্রীমুখনিঃসৃত গীতধ্বনিময় সেই বাণীই শ্রবণ করি)
বিতরাগভয়ক্রোধাঃ মন্ময়া মাম উপাশ্রিতাঃ।
বহবঃ জ্ঞানতপসা পূতাঃ মদ্ভাবমাগতাঃ।।
হে অর্জুন, অনুরাগ, ভয়, ক্রোধ--- এ সকল ইন্দ্রিয়বিকার থেকে মুক্ত হয়ে বহু বহু জ্ঞানতাপস, তপস্যার মধ্যে দিয়ে পবিত্রচিত্ত হয়ে আমার স্বরূপকে প্রাপ্ত হয়েছেন।
তৃতীয় অধ্যায়ের এই শ্লোক থেকে সমস্ত (শেষ ৪২তম) শ্লোকে ভগবান অত্যন্ত জটীল এবং অত্যুচ্চ জ্ঞান সাধনার, 'জ্ঞানকর্মসন্ন্যাসযোগের' মহামন্ত্রসমূহ উচ্চারণ করেছেন। বহুপ্রকার যজ্ঞের বিধান আছে, যেমন ব্রহ্মযজ্ঞ, দেবযজ্ঞ, জ্ঞানযজ্ঞ, ইন্দ্রিয়সংযমরূপ যজ্ঞ, বিষয়হবনরূপ যজ্ঞ, দ্রব্যযজ্ঞ, যোগযজ্ঞ, স্বাধ্যায়রূপ যজ্ঞ প্রভৃতি। জ্ঞানমার্গের সাধনার পথে এসকল 'যজ্ঞ' শুধু যজ্ঞক্রিয়ারূপ কর্মানুষ্ঠান নয়, সে সকল বিমূর্ত ধ্যান ও ভাবরূপ যজ্ঞ, মননের ক্ষেত্রেই যা সাধারণের কাছে দুরূহ দুর্গম দুর্বোধ্য। ব্রহ্মযজ্ঞে যেমন ভগবান বলছেন,
"ব্রহ্মার্পণং ব্রহ্ম হবির্ব্রহ্মাগ্নো ব্রহ্মণাহুতম্।" ---
ব্রহ্মরূপ হবি ব্রহ্মরূপ অগ্নিতে ব্রহ্মণারূপ কর্তার দ্বারা হোম (ঘৃতাহুতি)করা হয়। ব্রহ্মবিদ ঋষি, দেবর্ষি, রাজর্ষিগণ ছাড়া এই অতলস্পর্শী ভাবব্যঞ্জক বাণীর অর্থোদ্ধার করা দুঃসাধ্য নয়, অসাধ্য। এই ভাবে সুগভীর জ্ঞানযোগ ও কামনা-বাসনা-শূন্য কর্মযোগের দীক্ষায় দীক্ষিত করে এই অধ্যায়ের শেষ বাণীতে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে আবারো আদেশ দিচ্ছেন,
অতএব, হে ভরতবংশীয় বীর, 'সমত্ববুদ্ধিযোগে' স্থিত হও, অজ্ঞান-সম্ভুত সংশয় জ্ঞানরূপ অসি দ্বারা ছেদন কর, ওঠো, যুদ্ধের জন্যে প্রস্তুত হও। এই মন্ত্রে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ শুধুমাত্র যে অর্জুনকে আসন্ন অনারব্ধ কর্মে প্রবৃত্ত ও উদ্বুদ্ধ করতে চাইলেন তাই নয়, নিখিল মানবচেতনার প্রতি এ যেন বিশ্ববিধাতার আদেশ। ঠিক যেমনটি আমরা পাই কঠ উপনিষদে, যেখানে যম নচিকেতাকে বলছেন,
"উত্তিষ্ঠিত জাগ্রত প্রাপ্য বরান্ নিবোধত।
ক্ষুরস্য ধারা নিশিতা দুরত্যয়া।
দুর্গম পথস্তৎ কবয়ো বদন্তি।।"
এই আহ্বানের মধ্যে দিয়ে উদ্ঘোষিত হয়েছে যুদ্ধযাত্রার তূর্যনিনাদ, ডাক দেওয়া হয়েছে মানবজীবনের মহত্তম অভিযানের, সাধনলব্দ অভিজ্ঞতার উচ্চতম শৃঙ্গে আরোহন করে জীবনযুদ্ধে জয়ী হওয়ার জন্যে ধ্বনিত হয়েছে মহামন্ত্র --- মাভৈঃ।
এইবার আবারও, পঞ্চম অধ্যায়ে, রথীন্দ্র অর্জুন এক সাধনমার্গের তাত্ত্বিক প্রশ্ন করলেন,
সন্ন্যাসং কর্মনাং কৃষ্ণ পুনঃ যোগং চ শংসসি।
"যচ্ছ্রেয় এতয়োরেকং তন্মে ব্রূহি শুনিশ্চিতম্ ।।
হে কৃষ্ণ, (এখন কৃষ্ণ যেন তার গুরু) আপনি কর্মের প্রতি সন্ন্যাস ভাব থাকার কথা বলছেন এবং একই সঙ্গে নিষ্কাম কর্মযোগের প্রশংসা করছেন। এই দুইয়ের মধ্যে যেটি নিশ্চয়রূপে কল্যাণকর সেইটি আমাকে বলুন-- ''তৎ মে ব্রূহি সুনিশ্চিতম।''
অর্জুন দ্বিধাগ্রস্ত, সংশয়ক্লিষ্ট ; কেননা এই কিছুক্ষণ আগেই শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন, 'সমত্ববুদ্ধিযোগে' সকল কর্ম যিনি ঈশ্বরে উৎসর্গিত করে 'দিয়েছেন', আর জ্ঞানযোগে যার সংশয় দূর হয়েছে (সংছিন্ন) এমন পরমাত্মাপরায়ণ পুরুষকে কর্মসকল আবদ্ধ করে না। এ তো কর্মবন্ধন ছিন্ন করবার সাধনা, কর্ম থেকে সন্ন্যাস নেওয়ার সাধনা। যার চাইবার কিছু নেই, পাবারও কিছু নেই, যে 'দুঃখেষু নিরুদ্বিগ্নমনা, সুখেষু বিগতস্পৃহ', যার কর্মফলের আকাঙ্ক্ষা নেই, যিনি 'পরমাত্মায়' আত্মসমর্পণ করেছেন নিঃসংশয়চিত্তে --- সংসারে কর্মবন্ধনছিন্ন সেই সন্ন্যাসীকে কেন বলা --- 'ওঠো, যুদ্ধের জন্যে প্রস্তুত হও।'
আসলে বেদান্ত বা উপনিষদের যুগ হতে পৌরাণিক যুগের মাঝখানের সময়কালেই মূল 'আর্য' জীবনদর্শনের সাথে ন-আর্য জনগোষ্ঠীর জীবনদর্শনে দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়, যা 'বুদ্ধদেবের আবির্ভাব ও তাঁর ধর্মবিপ্লবের সময়কালে সুস্পষ্ট রূপ ধারণ করে। তাই transition - (অন্তর্বর্তীকালীন অবস্থান্তর দশা)-এর কালে বেদ ও বেদান্তবাদীগণ (বিশেষ করে ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয় জনগোষ্ঠী) ওই ন-আর্য সম্প্রদায়ের ইহলোক সংক্রান্ত বস্তুবাদী জীবনদর্শনের বিপরীতে ব্রহ্ম বা পরমাত্মা কেন্দ্রিক জীবনাচরণের আদর্শ প্রতিষ্ঠা করার জটীল আস্তিক্যবাদী দর্শনের বহুবিধ যুক্তির অবতারণা করেছেন। অপর দিকে অনার্য জনগোষ্ঠীর ইহলোক সংক্রান্ত জীবনদর্শনই হোল লোকাৎয়ত দর্শন। "যারা আত্মা মানে না, পরলোক মানে না, ধর্ম (বৈদিক ও বৈদান্তিক) মানে না, মোক্ষ মানে না, তাদেরই বলে লোকায়তিক। তারা মনে করে জল-মাটি-আগুন-হাওয়া দিয়ে গড়া এই মূর্ত পৃথিবীটাই একমাত্র সত্য, আত্মা বলতে দেহ ছাড়া আর কিছুই বোঝায় না। কথায় বলা হয়েছে বটে, আমি আর দেহ আলাদা কিছু ; কিন্তু এ হোল নেহাতই কথার কথা। ... এই মানে অনুসারে লোকায়ত হোল দেহাত্মবাদ বা বস্তুবাদ।"
(লোকায়ত দর্শন-- দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়।)
শ্রীকৃষ্ণে উত্তরের মধ্যে তাত্ত্বিক বৈপরিত্য লক্ষ্যে করে অর্জুন যে প্রশ্নগুলি করছেন বা করবেন সেগুলি সমকালের লোকায়ত দর্শনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। যুদ্ধ যদি করতেই হয় লোকায়ত দর্শনেই তো তার সমর্থন আছে।
" অধ্যাপক রাধাকৃষ্ণণ বলছেন, মহাকাব্যের যুগে ---- অর্থাৎ তাঁর হিসাবে খ্রিষ্টপূর্ব ৬০০ থেকে ২০০-র মধ্যে --- ভারতের সমাজ-ব্যবস্থায় নানারকম তোলপাড় শুরু হয়েছিল এবং পরিণাম হিসাবে চিন্তাক্ষেত্রে লোকায়ত-মতের আবির্ভাব হয়। এই যুগটিতে (যাকে আমরা transition-যুগ বলেছি) অনেক শতাব্দীর পুরাতন বিশ্বাস ভেঙে পড়েছিল।"
(ঐ)
এই প্রশ্নের উত্তরে শ্রীকৃষ্ণ আরও গভীরতরভাবে সাংখ্যযোগ ও নিষ্কাম কর্মযোগের উপদেশ দিয়েছেন। পরের পর্বে পঞ্চম অধ্যায় ও পরবর্তী।
(ক্রমশঃ)
_________________________________________
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন