গীতায় অর্জুন-৪
আমরা শ্রীমদ্ভগবত গীতার পঞ্চম অধ্যায়ে এসে উপস্থিত হয়েছি। বিগত অধ্যায়ের শেষে অর্জুন তার কিংকর্তব্যবিমূঢ়তার কথা জানিয়ে শ্রীকৃষ্ণকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন মানুষের নিষ্কাম কর্মযোগ ও কর্মবন্ধন ছিন্ন করার সাধনার মধ্যে কোনটি অধিকতর শ্রেয়ষ্কর। এখানে আবারো ওই "ওঠো, জাগো, যুদ্ধ কর" -- তত্ত্বের আপাত প্রয়োজনীয়তার নিরিখে 'নিষ্কাম কর্মযোগের' কথাই বলেছেন। বলেছেন 'নিষ্কাম কর্মযোগ'ই শ্রেষ্ঠ কিন্তু একই সঙ্গে বলছেন, যে পুরুষ অন্যকে দ্বেষ করেনা, আকাঙ্ক্ষা করে না, নিত্য সন্ন্যাসী, নির্দ্বন্দ্ব --- সে সংসার-বন্ধন থেকে আনন্দপূর্বক মুক্ত হয়ে যায়। এরপর পঞ্চম অধ্যায়ের 'শ্রীভগবানুবাচ' দ্বিতীয় শ্লোক থেকে নিষ্কাম কর্মযোগের, ও নিষ্কাম কর্মযোগীর প্রশংসা, সাংখ্যযোগের গূঢ় তত্ত্বের আলোচনার, ( সাংখ্যযোগ ও জ্ঞানযোগ অবিভাজ্যও বলা হয়েছে) বেদবাণী অনর্গল স্ফুরিত হয়েছে সমগ্র পঞ্চম অধ্যায় জুড়ে। কেমন হবে প্রকৃত সাংখ্যযোগীর লক্ষণগুলি। ভগবান বলছেনঃ
"নৈব কিঞ্চিৎ করোমীতি যুক্তো মন্যেত তত্ত্ববিৎ।
পশ্যন্ শৃন্বন্ স্পৃশন্ জিঘ্রন্নশ্নন্ গচ্ছন্ স্বপন্ শ্বসন্।।
প্রলপন্ বিসৃজন্ গৃহ্ণন্ন ন্মিষন্নিমিষন্নপি।
ইন্দ্রয়াণীন্দ্রিয়ার্থেষু বর্তন্ত ইতি ধারয়ন।"
ভাবুন একবার, কী ভয়ঙ্কর এই যোগসাধনা ! যিনি সাংখ্যযোগী হবেন তিনি দর্শন, শ্রবণ, স্পৃশন্ (স্পর্শ করা), আঘ্রাণ, ভোজন, গমন, শয়ন, শ্বাসগ্রহণ, কথন, ত্যাগ, গ্রহণ, চক্ষুরুন্মীলন এবং নীমিলন --- ইন্দ্রিয় আচরিত ও প্রবর্তিত সমস্ত কিছুই করবেন ; কিন্তু এইরকম ধারণা করবেন যে তিনি কিছুই করছেন না। দেহজ, দেহস্থ ইন্দ্রিয়গুলি যার যা স্বভাবজাত স্ফুরণ তাই ঘটছে, আমি কিছুই করছি না। 'সবই তার কাজ, তিনিই করাচ্ছেন' --- এমন নির্লিপ্ততার সঙ্গে যিনি কর্ম করেন জলের উপর পদ্মপত্রের মত তিনি পাপ দ্বারা লিপ্ত হন না --- "লিপ্যতে ন স পাপেন পদ্মপত্রমিব অম্ভসা"।
এই ভাবে পঞ্চম অধ্যায়ের ২৯তম শ্লোক পর্যন্ত শ্রীকৃষ্ণ কর্ম ও সন্ন্যাসযোগের গভীর থেকে গভীরতর, গভীরতম সাধন-ধ্যান-নিধিধ্যাসনের পন্থার বর্ণনা করেছেন, উদাহরণ দিয়েছেন এবং অনুরূপ তপশ্চর্যার মধ্য দিয়ে কি ভাবে পরমাত্মা পরমেশ্বরকে লাভ করা যায়, পরম শান্তি প্রাপ্ত হওয়া যায় তার উপদেশ প্রদান করেছেন -- এবং তিনিই যে সেই 'সর্বলোকমহেশ্বরম' সে কথাও স্বমুখে ব্যক্ত করেছেন। ইন্দ্রিয়গুলির আকর্ষণকারী, বাইরের বিষয়ভোগগুলি ত্যাগ করে, চক্ষুর দৃষ্টিকে ভ্রুযুগলের মধ্যিখানে ন্যস্ত করে শ্বাস-প্রশ্বাসের দ্বারা বিচরণকারী প্রাণ-বায়ুকে 'সমে' স্থাপনা করে, মন-বুদ্ধি-ইন্দ্রিয়-বিক্ষোভ সংহত করে 'পরমাত্মার নিরন্তর স্মরণে মগ্ন ' সদামুক্ত মুনি (মননযোগী) তাঁকে লাভ করেন।
ভোক্তারং যজ্ঞতপসাং 'সর্বলোকমহেশ্বম'।
সুহৃদং সর্বভূতানাং জ্ঞাতা মাং শান্তিমৃচ্ছতি।।
ষষ্ঠ অধ্যায়েও এই পঞ্চম অধ্যায়েরই বিস্তৃততর উপদেশ রয়েছে। আবারো ওই নিষ্কাম কর্মযোগ, যোগমার্গের নিয়ম, আত্মজ্ঞান, আত্ম উদ্ধারের আকুতি ও প্রেরণা, মনের চঞ্চলতা দূরিকরণ, মননিগ্রহ এবং পুরুষ যোগভ্রষ্ট হলে তার কি গতি হয় --- এ সমস্ত উপদেশামৃত বর্তমান অধ্যায়েও বর্ষিত হয়েছে। শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, তাঁর উপদেশমত ঐরূপ যোগ সাধনায় যিনি স্থিত হন তিনি সর্বত্র, সর্বসময়, সকল স্থানে, সকল ভূতে (সকল প্রাণের মধ্যে), আমাকেই দেখে, আমার মধ্যে সমস্তকে দেখে এবং সমস্ত কর্মে থেকেও আমাতেই থাকে ( সচ্চিদানন্দঘনরূপ জগতাত্মায় লীন হয়ে চিরশান্তি লাভ করে)। সুখ দুঃখ তাঁর কাছে একাকার, সকল প্রাণ তাঁর কাছে আত্মবৎ।
এতক্ষণ যোগ, যোগমার্গের নিয়ম, যোগমগ্নতা ও যোগীর লক্ষণ ও পরমপ্রাপ্তির পথনির্দেশ তন্ময়ভাবে শ্রবণ করবার পর ষষ্ঠ অধ্যায়ের ৩৩ ও ৩৪-তম শ্লোকে আবারও অর্জুন জানতে চাইছেন: "আপনার কথিত এই মহাভাবে আমি মনোযোগ দেব কি করে ? এই যে ধ্যানযোগে আপনি সমত্বভাবের কথা বলছেন তা আমার মনের মধ্যে দীর্ঘকাল স্থায়ী হবে না।
চঞ্চলং হি মনঃ কৃষ্ণ প্রমাথি বলবে দৃঢ়ম।
তস্যাহং নিগ্রহং মন্যে বায়োরিব সুদুষ্করম্।।"
মনের মধ্যে নিত্য আলোড়ন সৃষ্টি হয়, সে প্রবল শক্তিশালী, দার্ঢ্যভাবসম্পন্ন। বায়ুকে যেমন বশ করা যায় না, ঠিক তেমনি মনকেও স্ববশে রাখা "সুদুষ্কর্মম্ মন্যে।"
অর্জুনের এই কথাগুলি সর্বশক্তিমান, সর্বময়, পরমাত্মার পূর্ণ অবতার- (যদা যদাংহি ধর্মস্য গ্লানির্ভবতি ভারত..." স্মর্তব্য), -রূপে যিনি এস্থলে বিরাজমান, সেই ভগবান শ্রীকৃষ্ণের উপদেশবাণীগুলির জ্যোতিঃ বিচ্ছুরণে বেশ নিষ্প্রভ হয়ে গিয়েছে ; কিন্তু অর্জুনের কথাগুলিও কঠোর বাস্তবতার পরিচায়ক। গীতার আলোচনায়, শ্রীকৃষ্ণের উপদেশবাণী নিয়ে বার বার সাংখ্যযোগ, সাংখ্যদর্শনের কথা আসে যে 'সাংখ্য' আদিতে 'নিরীশ্বরবাদীই' ছিল। এমনকি কিছু কিছু পণ্ডিতদের মতে আদিতে সাংখ্য শুধুমাত্র 'নিরীশ্বরবাদীই' ছিল না, বস্তুবাদী বা জড়বাদীও ছিল। অর্থাৎ 'অচেতন প্রধানের' পক্ষে জগৎকারণ বা জগৎ সৃষ্টির কারণ হওয়া সম্ভব ছিল। এস্থলে অর্জুন শ্রীকৃষ্ণকে যে কথাগুলি বলেছেন (বায়ুকে যেমন বশ করা যায় না..... ইত্যাদি) সেগুলির মধ্যে বস্তুবিশ্বের মহাশক্তির যুক্তিই প্রাধান্য পেয়েছে, এবং শ্রীকৃষ্ণ যে বাণীসমূহ উচ্চারণ করেছেন, করছেন ও করবেন সেগুলির সঙ্গে সরাসরি বেদবাদী (ব্রহ্মবাদীও আখ্যা দেওয়া যায়) এবং বেদবিরোধী আদি সাংখ্যেয় দ্বন্দ্ব স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
"বৈদিক পুরোহিতের কাছে স্বর্গই ছিল পরম পুরুষার্থ। কিন্তু এর বিরুদ্ধে সাংখ্য প্রবল প্রতিবাদ ঘোষণা করতে থাকে এবং প্রমাণ করতে চায় স্বর্গের কথা অমূলক এবং বৈদিক যাগযজ্ঞ অনর্থক।"
------ পুরাণবিদ্ পুলিনবিহারী চক্রবর্তী
এখানে একটি শাস্ত্রীয় বিরোধের কথা বলে রাখা ভালো যে শ্রীমদ্ভগবত গীতায় যে সাংখ্য যোগের বর্ণনা ও ব্যাখ্যা আমরা পাই তা কপিল প্রবর্তিত আদি সাংখ্য দর্শনের নিরীশ্বরবাদের সাথে মেলে না। কপিল ছিলেন ঈশ্বরে 'অবিশ্বাসী', অর্থাৎ নাস্তিক, বস্তু তথা জড়বাদী যা সমকালের লোকায়ত দর্শনের অস্তিত্বের আত্মঘোষণা।
"... মহাভারত, ভাগবত ও পুরাণ, এই সকল গ্রন্থে কপিল সম্মন্ধে যেরূপ ইতিহাস প্রকটিত আছে তাহা দেখিলে কপিল ঈশ্বরনাস্তিক ছিলেন বলা দূরে থাকুক, তিনি সম্পূর্ণ আস্তিক, ঈশ্বরের প্রধান ভক্ত বা অবতার না বলিয়া থাকা যায় না। কিন্তু তাহার গ্রন্থ দেখিলে অনুভব হয়, তিনি ঈশ্বরনাস্তিকদের অগ্রগন্য।"
'সাংখ্যদর্শনম' -- পণ্ডিত কালিবর বেদান্তবাগীশ।
'সাংখ্য'-য়ে যে প্রকৃতিই বা অচেতন জড়-জগতই প্রধান তা নয়--- এমনটি বলেন আধুনিক বিদ্বানকুল। তাঁরা তাই সাংখ্যদর্শনকে বস্তুবাদী না বলে দ্বৈতবাদী বলতে চান এই কারণ দেখিয়েই যে কপিল প্রকৃতি ছাড়াও পুরুষকে স্বীকার করেছেন। এবং পুরুষকে স্বীকার করেছেন বলেই তিনিও, সাংখ্যকার কপিল চেতনকেও স্বীকার করছেন। আর চেতনকে স্বীকার করা মানেই পরম চৈতন্যময় ব্রহ্মকে স্বীকার করা। কিন্তু আদি সাংখ্যদর্শনের বিষয়টি 'এবম্প্রকার নহে' --- এরকম নয়। কপিল দর্শনে 'প্রকৃতি বা বস্তুবিশ্ব' এক, অভিন্ন এবং স্বয়ংনিয়ন্ত্রিত স্বতন্ত্র সত্ত্বা। সেখানে প্রজননগত কারণে প্রাকৃতিক নারী পুরুষ আলাদা আলাদা আছে বলেই পুরুষ নামক চেতন সত্ত্বাকে স্থাপনা করেছেন ব্রহ্মবাদীরা।
(যাই হোক্, আমরা অর্জুনের প্রশ্নগুলির গভীরতার প্রতি শ্রদ্ধাশীল পাঠকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করবার প্রয়াসেই এমন জটীল এক দার্শনিক তত্ত্বের অবতারণা করেছি।)
আবারও ফিরে আসি শ্রীকৃষ্ণ ও অর্জুনের কথপোকথনের প্রসঙ্গে। ৩৫ তম এবং ৩৬ তম শ্লোকে (ষষ্ঠ অধ্যায়) শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে মনের চঞ্চলতা নিরসনের উপায় সম্মন্ধে উপদেশ দান করে জানালেন যে 'অভ্যাসেন' আর 'বৈরাগ্যেন' ---- বার বার অভ্যাসের দ্বারা, বৈরাগ্যের দ্বারা চিত্তবিক্ষোভকে প্রশমিত করে, ধ্যানতন্ময়তার মাধ্যমে 'মন' নামক পরিবর্তনশীল 'বিকার'কে বশীভূত করা যায়। মন আত্ম নিয়ন্ত্রণে নেই এমন পুরুষ যোগ প্রাপ্ত হতে পারে না। স্ব- অধীনে থাকা, যত্নশীল পুরুষ, সাধনার বলে সহজেই মনকে বশীভূত করতে সক্ষম বলে আমি মনে করি।
(এখানে একটি গূঢ়ার্থ বিষয় আমাদের স্মরণে রেখে দিতে হবে যে এই যে 'অভ্যাস ও বৈরাগ্যের' কথা শ্রীকৃষ্ণ বলছেন সে কি এই ভয়ঙ্কর যুদ্ধারম্ভের প্রাক্ কালে অর্জুনের মত একজন যোদ্ধার পক্ষে গ্রহণ করা, আত্মস্থ করা এবং তা জীবনাচরণে পালন করে যুদ্ধ করা সম্ভব ? তৃতীয় পাণ্ডব পার্থর সঙ্গে তো কৃষ্ণের কতকালের সখ্য ; আগে তো কৃ্ষ্ণ এমন ধর্মোপদেশ কখনো সখার প্রতি উচ্চারণ করেন নি। এটি একটি গভীর আধ্যাত্মিক জ্ঞান ও আত্মান্বেষণের পাঠ। আমরা প্রবন্ধের শেষের দিকে তা আলোচনা করব।)
এখানে অর্জুন আরো সংশয়ান্বিত। পর পর তিনটি শ্লোকবাক্যে (৩৭, ৩৮, ৩৯তম) তার সংশয় আর্ত মানুষের মত অভিব্যক্ত হয়েছে। বলছেন শ্রদ্ধা আছে অথচ মনঃসংযোগ ছিন্ন হবার কারণে যদি কোন পুরুষের যোগসিদ্ধি লাভ না হয়।, যদি তার 'সংসিদ্ধিম' বা পরমাত্মার সঙ্গে একাত্মতা না ঘটে, যদি তেমন পরম সিদ্ধি লাভ না করে তবে তার কি গতি হবে ? সে কি পরমাত্মাকে (ব্রহ্ম বা ঈশ্বর) পাবে না ? জীবনে চরিতার্থতা লাভের পথে বিমূঢ়, আশ্রয়হারা হয়ে শারদাকাশের ছিন্ন বিচ্ছিন্ন মেঘের ন্যায় দিকভ্রষ্ট হয়ে দুকূলই হারাবে ? না হবে ভগবৎ (ব্রহ্মণঃ) প্রাপ্তি, না পাবে সংসারের ভোগ-সুখ ! (সেই ব্রহ্মতত্ত্ব অভিমুখে ধীরে ধীরে অভিগমন !) হে মহাবাহো, আমি অঙ্কিত সংশয়ক্লিষ্ট !
কচ্চিন্নোভয়বিভ্রষ্টঃ ছিন্নাভ্রম ইব নশ্যতি।
অপ্রতিষ্ঠো মহাবাহো বিমূঢ়ো ব্রহ্মণঃ পথি।।
এতন্মে সংশয়ং কৃষ্ণ ছেত্তুমর্হস্যশেষতঃ।
তদন্যঃ সংশয়সাস্য ছেত্তা ন হি উপপদ্যদে।।'
অর্জুন বলছেন, এই যে আমার চিত্ত-আচ্ছন্নকারী সংশয়, আপনি ছাড়া আর কেও নেই যিনি তা ছেদন করতে পারেন।
অসীম নীলিমায় ভাসমান, লক্ষহীন, দিকভ্রষ্ট মেঘখণ্ডের সাথে দেবরাজ ইন্দ্রের 'বর'পুত্র, কুন্তীনন্দন এখানে যেন মর্ত্য-মানবের প্রতিভূ --- যম সন্নিধানে নচিকেতার মত আত্মোৎসর্গ করে বলছেন,--- "আপনি ছাড়া আর কে আছে আমার মূঢ়তা দূরিভূত করতে পারে ?"
"কচ্চিন্নোভয়বিভ্রষ্টঃ ছিন্নাভ্রমিব" --- কী অপরূপ এই উপমা-অনুপ্রাস ঝংকৃত শব্দালঙ্কার, বাক্যালঙ্কার ! গীতার গীতধ্বনিময় বাণীগুলিই সমস্ত মন-প্রাণ-চিত্তকে মোহিত করে রাখে। তাই রসশাস্ত্রের পণ্ডিতেরা বলেন শ্রীমদ্ভগবত গীতা যেন ভগবান শ্রীকৃষ্ণের আবক্ষবিলম্বিত কণ্ঠহারের মধ্যস্থিত কৌস্তুভ মণি।
অর্জুনে সংশয় নিরসনের প্রয়াসে এবার সর্বজ্ঞাতা জনার্দন বলছেন এবং যেন 'অধিকারীরূপে' বলছেন, (তিনি ত্রিলোকাধিকারী অপরা শক্তির মূর্ত বিগ্রহ) শুভকর্মে, ভগবানের নিমিত্তে কর্মের সঙ্কল্পীদের দুর্গতি হয় না। যদি তাঁরা কখনো যোগভ্রষ্ট হন তবু তাঁরা স্বর্গ (উত্তম লোক) লাভ করেন, সেখানে কিছুদিন পরম শান্তিতে বাস করেন, তারপর আবার শুদ্ধাচারী ঐশ্বর্যবানদের ঘরে জন্মলাভ করেন। অথবা তাঁরা, যোগভ্রষ্ট অথচ বৈরাগ্যবান পুরুষগণ, স্বর্গপ্রাপ্ত না হলেও এই সংসারেই দুর্লভ যোগীকুলে জন্মগ্রহন করেন। সঙ্গে নিয়ে আসেন পূর্ব পূর্ব জন্মের সাধিত সংস্কার এবং আবারো ভগবান প্রাপ্তির আরাধনা করেন। তখন বিগত জন্মের ঐ সকল সংস্কার তাদেরকে 'সমত্ববুদ্ধিযোগে' সিদ্ধি লাভ করতে সাহায্য করে। জন্ম জন্ম ধরে অতি যত্ন সহকারে এমত যোগ অভ্যাসের দ্বারাই পরম গতি প্রাপ্ত হওয়া যায়। তপস্বীদের, জ্ঞানমার্গীদের চাইতে যোগীগণ শ্রেষ্ঠতর এবং তাদের চাইতেও ধ্যানযোগীরা আরও ঋদ্ধিবান --তাঁরা শ্রেষ্ঠতম। তাঁদের সঙ্গে আমার একাত্মতা।
------(কর্মফলানুসারী জন্মান্তরবাদ, বৌদ্ধদর্শন। পরে আলোচিত )।
"যোগিনামপি সর্বেষাং মদ্গতেন অন্তরাত্মনা।
শ্রদ্ধাবান ভজতে তো মাং স মে যুক্ততমো মতঃ।।
ষষ্ঠ অধ্যায় 'আত্মসংযমযোগ'। এখান থেকেই অধিকতর যুক্তিপূর্ণভাবে শ্রীকৃষ্ণ 'আমিত্বকে' (স্রষ্টাএবং দ্রষ্টা) অনাবৃত করেছেন এবং উপনিষদোক্ত 'অহম ব্রহ্মাস্মি'-র গুহ্য পথের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করেছেন। বলেছেন "শ্রদ্ধাবান হও, আমাকে ভজনা কর।"
অবশ্য পঞ্চম অধ্যায়ের ২৬তম শ্লোকেও বলেছেন, কামবিযুক্ত (এখানে কামনা অর্থে), ক্রোধরহিত, সংযতচিত্ত প্রজ্ঞাবান পুরুষেরাই পরমাত্মার সাক্ষাতে সক্ষম হন এবং অনুভব করেন সকল জগৎ ও জগদাতীত সংসারের সর্বত্র শান্ত, পরমব্রহ্ম স্থিত আছেন "অভিতো ব্রহ্মনির্বাণং বর্ততে।"
('ব্রহ্মনির্বাণম্ শান্তম্ পরমেশ্বরম্' --- এই শব্দগুচ্ছে পাঁচটি ভিন্ন ভিন্ন শব্দ। শ্রীমদ্ভগবত গীতার গূঢ়তম অর্থ নিহিত আছে এই শব্দগুলির অভ্যন্তরে। ভগবান শঙ্করাচার্যের ভাষ্যে তার অমৃতময় আলোকাভাস প্রতিভাসিত--- তাঁর দৈবকৃপা অযাচিত বর্ষিত হলে একদিন আমরা সামান্য ধারণা করবার প্রয়াস পাব)।
ষষ্ঠ অধ্যায়ের পর থেকে অর্জুনসারথি শ্রীকৃষ্ণকে নিখিল ভূবনের সারথিরূপে তাঁরাই দেখতে পাবেন, পেয়েছেন, রথারূঢ় অর্জুনের মত যাঁরা তাঁরই করুণায় তেমন দৈবদৃষ্টি লাভ করেছেন।
"অহম ব্রহ্মাস্মি" --- বৃহদারণ্যক উপনিষদের এই মহাবাক্যের আলোচনা শুধুমাত্র শব্দদ্বারা, বাক্য দ্বারা প্রকাশ করা বা ব্যাখ্যা করা যায় না। ঋষিগণ, মুনিগন যুগ যুগ ধরে এই মহামন্ত্রের সাধনা করেছেন। আমরা এই রচনার শেষ অংশে উপনিষদে বিধৃত, অমর্ত্য-বীণার সুরে নিত্য-ঝংকৃত মহাবাক্য চতুষ্টয়, 'উপনিষদগুলি' যেমন উচ্চারণ করেছেন তেমনই উদ্ধার করবার চেষ্টা করব। পরমেশ্বরের আশীর্বাদ ও করুণা জগৎসংসারে বর্ষিত হোক্।
আমাদের মহাকবির বাণীর অর্ঘ্য দিয়ে প্রার্থনা করি ---
"শ্রাবণের ধারার মত পড়ুক ঝরে,পড়ুক ঝরে
তোমারি সুরটি আমার মুখের 'পরে, বুকের 'পরে।
পূরবের আলোর সাথে পড়ুক প্রাতে দুই নয়ানে--
নিশীথের অন্ধকারে গভীর ধারে পড়ুক প্রাণে ।
নিশিদিন এই জীবনের সুখের 'পরে, দুখের 'পরে
শ্রাবণের ধারার মতো পড়ুক ঝরে, পড়ুক ঝরে।।
যে শাখায় ফুল ফোটে না, ফল ধরে না একেবারে,
তোমার ওই বাদল বায়ে দিক জাগায়ে সেই শাখারে।
যা কিছু জীর্ণ আমার, দীর্ণ আমার, জীবনহারা ---
তাহারি স্তরে স্তরে পড়ুক ঝরে সুরের ধারা।
নিশিদিন এই জীবনের তৃষার পরে, ভুখের 'পরে
শ্রাবণের ধারার মতো পড়ুক ঝরে, পড়ুক ঝরে।।"
--------- রবীন্দ্রনাথ।
ওঁ শান্তি, শান্তি, শান্তিহি ইতি।।
পরবর্তী পর্ব সপ্তম অধ্যায় থেকে।
(ক্রমশঃ)
দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
২০/৭/২০২৫
ব্যাঙ্গালোর।
____________________________________________
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন