রবিবার, ২৮ আগস্ট, ২০২২

খাঁচার পাখী

"খাঁচার ভিতর পাখীটি আমার কতই সুখে থাকে। 
ভোর না হতেই কৃষ্ণ কৃষ্ণ, রাধা রাধা ডাকে।" 

সত্যিই কি পাখী চেনে কৃষ্ণ কিংবা রাধা ? 
সত্যিই কি পাখীর কণ্ঠ সাধন সুরে সাধা ? 
হয়তো সে ডাক বিষাদ করুণ আশাহত ক্রন্দন ! 
হয়তো সে ডাকে তীক্ষ্ণ প্রশ্ন কেন এই বন্ধন ? 
অবচেতনের অদেখা গহনে উঁকি দেয় বনভূমি, 
হয়তো নিত্য মুক্তি সে চায় ঊষার চরণে নমি'। 
শূন্য আকাশ সুচির বিরহী ইঙ্গিতে বলে, "আয়, 
ডানার কাঁপন নাই ওরে পাখী, আমি কাঁদি বেদনায়।"

এমনি ভাবেই বাকহারা শত লক্ষ প্রাণের বুকে
না-বলা বাণীর অসহ বেদনা বৃথা মরে মাথা ঠুকে। 
এমনি করেই সত্য হারায় মিথ্যার অপলাপে। 
এমনি করেই দুর্বল মরে সবলের কৃত পাপে। 
চিরসুন্দর রূপমনোহর বিশ্বভূবনময় -- 
কবে আর হবে অবিনশ্বর চিরসত্যের জয় ? 

দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
২৮/০৮/ ২০২২ 
কলকাতা।



রবিবার, ১৪ আগস্ট, ২০২২

স্বাধীনতা




 স্বাধীনতা কোথায় ? 

স্বাধীনতা ? শাসনে পীড়নে ত্রাসনে, 
স্বাধীনতা ? গৃহহারাদের কাঁদনে। 
পথশিশুদের মুক্তি অকাল মরণে, 
পথনারীদের মুক্তি রক্তক্ষরণে, 
স্বেচ্ছা মরণে স্বাধীনতা সীমাহীন, 
অকুণ্ঠ হননে স্বাধীনতা সমীচীন। 

হিসাব হয়না বস্তিতে মরা প্রাণীদের, 
হিসাব হয়না রক্তপিপাসু খুনিদের। 
যেদিকে তাকাও বেহিসাবী অবলুণ্ঠন, 
উলঙ্গ লালসা, নাই কোন অবগুণ্ঠন, 
উধাও হয়েছে বনভূমি, পর্বত নিশ্চিহ্ন, 
নির্মূল যত অরণ্যপ্রাণ মূলাধার হতে ছিন্ন। 
স্বাধীনতা হেথা  নিঠুর শোষণ যন্ত্রে, 
স্বাধীনতা হেথা কাপালিকদের মন্ত্রে। 

                    দুই 
           (অথ মহাভারত কথা) 

স্বর্গ সভায় বসে দেবরাজ ইন্দ্র। 
সভামাঝে আছে সব দেবদেবীবৃন্দ।। 
ঘৃতাচী উর্বশীদের নৃত্য গীত শেষে। 
মহেন্দ্র সবারে ক'ন মৃদু হাসি হেসে।। 
মর্ত্যধামে মানুষেরা আছে না কি ভালো। 
জ্বল জ্বল করে সেথা সভ্যতার আলো।। 
মানুষে মানুষে নাকি নাই কোন ভেদ। 
দ্বেষ হিংসা মুক্ত তারা মননে নির্বেদ।। 
সত্যই এমন হোলে ঘোর পরিণাম। 
ধরাধামে লুপ্ত হবে দেবতার নাম।। 
কহিল নারদ তবে বাজাইয়া বীণা। 
মানুষ দেবতা হোক সহিতে পারিনা।। 
যে আলো দেখেন প্রভু নয় দিব্য আলো। 
তাহার নিচেই আছে নরকের কালো।। 
চেতনা নিয়েছি হরে অতি সুকৌশলে। 
ধর্মান্ধ করেছি নরে নানা ছলে বলে।। 
কামনা আগুন তার জ্বালায়েছি বুকে। 
হিংসার হলাহল ঢালিয়াছি মুখে।। 
কুরুক্ষেত্র নিরন্তর হবে ধরাতলে। 
ধন, প্রাণ পুড়িবেক যুদ্ধের অনলে।। 
সমর গৌরব গাথা গাহিবেক রাজা। 
তাহাতেই মজিবেক প্রবঞ্চিত প্রজা।। 
আত্মঘাতী অস্ত্রশস্ত্র করিয়া সৃজন। 
মহোল্লাসে করিবেক আত্মহনন।। 
আপনার কোন চিন্তা নাই দেবরাজ। 
নরক সৃজনে নর দুর্নিবার আজ।। 
নারদের কথা শুনে স্বর্গে মহোৎসব। 
অপ্সরা সঙ্গীত সুরা হর্ষ কলরব।। 

স্বাধীন জনতার কথা অমৃত সমান। 
নরাধম কবি কহে শুনে পুন্যবান।। 

দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
১৫ই আগষ্ট ২০২২ 
কলকাতা।





































 

শুক্রবার, ১২ আগস্ট, ২০২২

মহামিলন

(শ্রীঅরবিন্দের জন্মদিন আর একটি দিন পরে। তাই এই কবিতাটিতে তাঁর দিব্য জীবনের সুমহান দার্শনিক অনুভবের অতি সামান্য ইঙ্গিত আছে। কবিতাটির সাহিত্যমূল্য অপেক্ষা দার্শনিক ভাব অধিকতর। সুধী পাঠক বিচার করবেন।)

সারা জীবনের ভালোবাসা দিয়ে গড়েছি যে ঘর স্বপনে 
'আমি' ছাড়া আর কেউ তো থাকেনা সেখানে। 
তাই একদিন সঙ্গীবিহীন সঙ্গী পাবার প্রয়াসে 
ঘর ছেড়ে পথে ফেলেছি চরণ কঠিন কঠোর আয়াসে। 
মরুতীর হতে সাগরের কূলে শতেক যোজন গিয়েছি, 
পাহাড় চূড়ায়, ঘনবন দেশে আঁধারে আলোকে ফিরেছি। 
শত জনপদ, নগরী নগর, দেশে ও দেশান্তরে, 
আকুল আবেগে চেয়ে চেয়ে দেখি প্রতিজনে প্রতিঘরে। 
যে সখার ছবি হৃদয়ে এঁকেছি, চোখে যার মুখ ভাসে, 
কোনখানে তার পাইনা ঠিকানা, মন বলে, 'ওই আসে'। 
আলোর ঝলকে চমকে তাকাই, শিহরণ জাগে বাতাসে, 
পথিকের গানে তার আগমনী,‌‌ তনুবাস ফুল সুবাসে। 
বাদলের মেঘে প্রেমাশ্রুধারা, চাঁদের কিরণে হাসি, 
নির্ঝরিণীর কলতানে ডাকে, "ভালোবাসি ভালোবাসি"। 
যখন গহন রাত্রি, বজ্রঘোষণ, পথহারা কাঁদি একা --- 
ডাকি বার বার , "হে বন্ধু আমার, একবার দাও দেখা"। 
বিদ্যুতালোকে ক্বচিৎ দেখি যেই, চকিতে হারাই তাকে, 
বিরহ আঁধারে রেখেছে আমারে জীবন সঁপেছি যাকে। 
হঠাৎই একদা এলো শুভক্ষণ, দিব্য জ্যোতির প্রভা, 
চেতনার দীপ অন্তর্লোকে ছড়ালো বিমল আভা। 
চরাচর মাঝে যা কিছু বিরাজে সকলের সাথে বাস তার, 
অন্তরে তার নিত্য বিলাস প্রেমাতুর অভিলাষ যার। 
মহাবিশ্বের সুবিপুল নীড়ে একসাথে করি বাস, 
তবু কেন ভয় হারাই হারাই, শোকের দীর্ঘশ্বাস ? 

দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
১৩/০৮/২০২২ 
কলকাতা।

                                                                             
 






শুক্রবার, ৫ আগস্ট, ২০২২

সন্ধ্যা

    
মহামানবের মহাপ্রয়াণের সায়াহ্ন কালটি স্মরণ করে'--- 
২২শে শ্রাবণ, ১৩৪৮ 
৭ই আগষ্ট ১৯৪১ । 
_____________________________________________

অবিনশ্বর মুহূর্ত 

 এমনিই সন্ধ্যা ছিল সেদিন, 
বিরহিনী শোকাতুরা বিষণ্ণ মলিন। 
এমনি নির্বাক ছিল এ মহানগরী, 
অশ্রুজল অনর্গল -- মৃতবৎসা নারী।
অন্ধকার নেমেছিল পূর্বে পশ্চিমে, 
গঙ্গার স্রোতধারা গিয়েছিল থেমে। 
শোকে অন্ধ হয়েছিল আলোর দেবতা, 
চরাচরে ছেয়েছিল ঘোর নীরবতা। 

মহত্তম জীবনের সন্ধানী পথিক, 
অন্তহীন আনন্দের মূর্ত প্রতীক, 
প্রেমের পরিপূর্ণ রূপ, বেদনার বাণী, 
অসীমের সীমান্তপারে যাঁর গৃহখানি, 
চেতনার মন্ত্র যাঁর সৃষ্টির আখরে, 
স্বরে, সুরে, ছন্দে যাঁর সুধাবিন্দু ঝরে, 
তাঁর মহাপ্রস্থানের সেই দৈব ক্ষণ 
আবার এসেছে আজ বাইশে শ্রাবণ। 

দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
৭ই আগষ্ট, ২০২২ 
কলকাতা।





বৃহস্পতিবার, ৪ আগস্ট, ২০২২

স্মরণ সঙ্গীত

শিক্ষক হওয়ার বাসনা ছিল। হতে পারিনি। গ্রামদেশে  'সান্ধ্য বিদ্যালয়' আরম্ভ করেছিলাম। রাখতে পারিনি। 
শহরে এসে, স্বঘোষিত মাষ্টারমশাই হয়ে পাঠশালা খুলে  বসলাম। সেও একদিন ভাঙতে হোল ; কিন্তু শিশু  কিশোরদের সেই মায়াভরা মুখগুলি, তাদের সুকোমল  কলকণ্ঠস্বর অপরূপ স্মৃতি হয়ে আছে জেগে আজও ---  ভুলতে পারিনি। 




ছিল এক মালঞ্চ বিতান। 
বহুরঙা পাখিদের নিত্য কলতান। 
দুরন্ত প্রাণের দুর্নিবার, অমোঘ আহ্বানে 
অন্য কোথা, অন্য কোনখানে 
দূরে দূরান্তরে, সমুদ্র নদীর পারে, 
দেশে দেশান্তরে, 
বনে উপবনে কাননে কান্তারে 
স্বপ্নের ডানা মেলে উড়ে গেল তারা। 
আসেনা বসন্ত-সখা, ফুটে না কুসুম, 
কাকলি কূজনহীন নিস্তব্ধ নিঝুম, 
শূন্য মালঞ্চে আমি একা বসে -- 
শুকানো পাতারা উড়ে বিরহের বিষন্ন বাতাসে। 

 দিনান্তের রবি নামে অস্তাচলে, 
পুষ্প-পত্রহীন জীবনের জীর্ণকুঞ্জতলে 
গাঢ় হয় অন্ধকার, 
স্মৃতি লেখে পাণ্ডুলিপি মূক বেদনার। 
অকস্মাৎ দূরাগত কন্ঠস্বর একটি 🐦 পাখির --- 
"মাষ্টারমশাই"...! 
উদ্বেল হৃদয়ে ডাকি, "আয় ওরে আয়, 
ঝরে-পড়া কুসুমের মালঞ্চ শাখায়, 
এক দণ্ড থাকো বসে, গাও সেই গীত 
শত বিস্মরণ মাঝে স্মরণীয় মধুর সঙ্গীত। 


দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় 
০৪/৮/২০২২ 
কলকাতা।















Recently published

অমূল্য

He ( Tagore) who sees all things in his own self and his own self in all things, he does not remain unrevealed.                     ...