বুধবার, ২৮ জুন, ২০২৩

খুন - ৩

খুন-৩ 

আলোচনা হচ্ছিল ব্যক্তিহত্যা নিয়ে। ব্যক্তির দ্বারা  বিশেষ কোন ব্যক্তিকে হত্যা করার বহু কারণ  উপস্থাপিত করা হয়। যাকে 'হত' করা বা যাকে তার  প্রকৃতি প্রদত্ত (allotted) জীবনের পূর্ণতা থেকে  বঞ্চিত করা হচ্ছে তার বিচার যে হয়না এমন নয়।  বিচার হয়। বিচারক সেখানে রাজা, রাজার লোক,  আদালত, সমাজ বা 'ঘাতক স্বয়ং' । এই শেষ
বিচারক একজন মানুষ হতে পারে, আবার একটা  ছোট দলও হতে পারে। একজন মানুষ শুধু মাত্র তার  যে শত্রু বা তার জীবনের ঘোর অন্তরায় কেই খুন  করে এমন নয়, তার ভালোবাসার মানুষটিকেও হত্যা  করতে পারে। 
এই শেষের সংঘটনটির উদাহরণ আগে, অর্থাৎ  প্রচার মাধ্যমের মাকড়শার জাল আজকের দিনের  মত সর্বব্যপ্ত হবার আগে, তেমন বহুল পরিমাণে  পাওয়া যেত না, জানাও যেত না। আমরা আমাদের  যৌবনকালে গল্প, উপন্যাস, নাটক ইত্যাদি অসংখ্য  সাহিত্যকর্মে এবং পাশ্চাত্যের কিছু শিল্পকর্মে  পেয়েছি। বাঙলার বহু নাটক, উপন্যাস, ছোট গল্পে 
এই হনন-ক্রিয়া এবং হনন-প্রক্রিয়ার বর্ণনা আছে  যেগুলির ভয়ঙ্করতা অসহনীয়। বিদেশী সাহিত্য ও  নাটকে খুনের যা শব্দচিত্র অঙ্কন করা হয়েছে সে  সবের  নিষ্ঠুর action তো বীভৎসতার সীমান্ত  অতিক্রম করে গিয়েছে। মহাকবি, মহানাট্যকার  Shakespeare এই 'সৃজন' জগতে একমেবাদ্বিতীয়ম্।  
    তাঁর Othello নাটকে Act 5, Scene ll --তে  সুন্দরী  প্রেয়সী Desdemona-কে হত্যা করার জন্য  উদ্যত  Othello -র সেই শিহরণ-জাগানো, হৃদয়- মন্থনকারী,  মায়া-নির্মমতা মেশানো স্বগতোক্তি  (soliloquy) ঃ 

"It is the cause, it is the cause , my soul, 
Let me not name it to you, you chaste star ! 
It is the cause : yet l will not shed her blood ; 
Not scar that whiter skin of hers than snow. 
And smooth as monumental Alabaster. 
Yet she must die, else she shall betray more   men. 
Put out the light, and then put out the light ; 
If l quench thee, thou flaming minister, 
I can again thy former light restore. 
Should I repent me : but once put out thy  light, 
Show cunningest pattern of excelling nature, 
I know not why is that Promethean heat 
That can thy light relume when l have plucked  the rose, 
I can not give it vital growth again. 
It must needs wither : I'll smell it on the tree. 
Ah balmy breath that dost almost persuade 
Justice to break her sword ! One more one  more. 
Be thus when thou art dead, and I will kill  thee, 
And love thee after, one more, and this is the
 last : 
So sweet was never so fatal. I must weep, 
But they are cruel tears : this sorrow's heavenly ; 
It strikes where it doth love...."  

"This sorrow's (sorrow is) heavenly ; 
It strikes where it doth love..."  

চিন্তনীয় -- ঠিক  এই জায়গাটিই, যদিও সাহিত্যের  ভাষায় বীভৎস রস, নারীহত্যার একটি নারকীয়,  নাটকীয় অজুহাত (excuse or in other word-- cause). 

খুন প্রসঙ্গে আলোচনায় হঠাৎই 'নারী হত্যা' বিষয়টি  কেন এসে গেল ? এলো এই জন্যই যে  প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে সারা বিশ্বে যত নারী  বলবত্তর পুরুষের হাতে খুন হয়েছে তার হিসাব  রেখেছেন মহাকাল, (যদি বিশ্বাস করি) যিনি সৃষ্টি-  স্থিতি-লয়, জন্ম-জীবন-মৃত্যু প্রত্যক্ষ করে চলেছেন  নিরন্তর। ‌‌
আরো একটি শিল্পীত হনন ক্রিয়া ঃ 

"ঘুরিতে ঘুরিতে আবার জলতলে চলিয়াছে। সুখীর   কঠিন বন্ধনে তরিণীর দেহও অসাড় হইয়া   আসিতেছে। বুকের মধ্যে হৃদপিন্ড যেন ফাটিয়া   গেল। তারিণী সুখীর দৃঢ় বন্ধন শিথিল করিবার  চেষ্টা  করিল। কিন্তু সে আরও জোরে জড়াইয়া  ধরিল।  বাতাস ---বাতাস। যন্ত্রনায়  তারিণী জল  খামচাইয়া  ধরিল। পর মুহূর্তেই হাত পড়িল সুখীর  গলায়। দুই  হাতে প্রবল আক্রোশে সে সুখীর গলা  পেষণ করিয়া ধরিল। সে তাহার উন্মত্ত ভীষণ  আক্রোশ। হাতের  মুঠিতেই তাহার শক্তি পুঞ্জিত  হইয়া  উঠিয়াছে। যে  বিপুল ভারটা পাথরের মত  টানে তাহাকে অতলে টানিয়া চলিয়াছিল, সেটা  খসিয়া গেল, সঙ্গে সঙ্গে  সে জলের উপর ভাসিয়া  উঠিল। আঃ আঃ --- বুক ভরিয়া বাতাস টানিয়া  লইয়া আকুলভাবে সে  কামনা  করিল, আলো ও  মাটি।" 

               'তারিণী মঝি ' --তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়। 

চিন্তনীয় -- 'সে তাহার উন্মত্ত ভীষণ আক্রোশ।' 

প্রথম উদ্ধৃতিটি (Othello)-র 'হেতু'র (cause)সঙ্গে রামচন্দ্র  কতৃক ভর্ৎসিত সীতার পাতাল প্রবেশ ( অসহ্য  অবমাননায় আত্মহন) এবং রামচন্দ্রের বিলাপ -- কোথায় যেন অন্তর্গত মিল। 
মীমাংসা ও মন্তব্যের ভার আমার সুধী পাঠকবৃন্দের উপর রইল। 

দ্বিতীয় উদ্ধার এই প্রশ্নের সম্মুখে উপস্থিত করে যে,  ঘটনাটি যদি বিপরীত হোত ? পুরুষটি দুর্বল হলেও  ওই নারীর দ্বারা এরূপ হত্যা... ? 
পাঠক অবশ্যই ভাববেন। 

উদ্ধৃতিগুলি দীর্ঘ বটে ; কিন্তু এই মর্মবিদারী লেখা  মরমী পাঠক বার বার পাঠ করেও অতৃপ্তই থেকে   যান।
এবার বলি 'ব্যক্তি খুন' প্রসঙ্গে আলোচনায় নারী  হত্যা  বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য কেন ? একটি তথ্য  দেওয়া যাক্।

''বিশ্বজুড়ে পরিবার বা নিজের সঙ্গীর হাতে প্রতিদিন  গড়ে অন্তত ১৩৭ জন করে মহিলা খুন হন। 
২০১৭ সালে একটি রিপোর্টে বলা হয়েছে গোটা  বিশ্বে  এই বছরে ৮৭ হাজার মহিলাকে মেরে ফেলা  হয়েছে। এদের মধ্যে ৫০ হাজার মহিলা নিজের  স্বামী  বা  নিজের নিকটাত্মীয়দের হাতেই খুন  হয়েছেন। 
মহিলাদের উপর এমন পাশবিক হিংসা বন্ধ করার  জন্য আন্তর্জাতিক দিবস ছিল ২৭শে নভেম্বর ২০১৮।   ঐ দিন রাষ্ট্রপুঞ্জের 'অফিস অন ড্রাগস এন্ড ক্রাইম 
-য়ের প্রধান য়ুরি ফেদোতোফ বলেছেন, 
এখনও লিঙ্গ বৈষম্যের নিদারুণ মূল্য দিতে হচ্ছে  মহিলাদের।' 

আনন্দবাজার পত্রিকা, 
২৮শে নভেম্বর ২০১৮। 

                                  (ক্রমশঃ) 
লিখতেও কষ্ট হচ্ছে, তবু আরও কিছুটা লেখার ইচ্ছা  রইল।















রবিবার, ২৫ জুন, ২০২৩

খুন-- ২য় পর্ব

খুন ২ 

গতকাল (২৪-০৬-'২৩)  'খুন' --এই প্রসঙ্গে, আমার   তাৎক্ষণিক শোকাবেগ -সঞ্জাত একটি প্রতিবেদন   blog -য়ে পাঠিয়েছি। আমার শ্রদ্ধেয় পাঠকবৃন্দ   সেটি  সযত্নে পাঠ করেছেন এবং তাঁদের সুচিন্তিত   মতামত ব্যক্ত করেছেন। আমি ধন্য। ধন্য এইজন্য  যে  এই নিষ্ঠুর, নিষ্কারণ হনন প্রবৃত্তি থেকে  হননকারীর  মুক্তি হোক্ -- এটি সকলেই কামনা  করেন শুধু নয়,  নিয়ত প্রার্থনা করেন। 

এই প্রার্থনায় কি সভ্যতার ক্রুরতম, ঘৃণ্যতম নরহত্যা  নামক 'অনুষ্ঠানটি'র সমাপ্তি ঘটবে ? না, সেটি হবে  না,  হবার নয়। কেন না, যুদ্ধকে, মানব সভ্যতার  আদিকাল থেকেই মহিমান্বিত (glorified) করে  দেখানোর একটি ভয়ঙ্কর প্রবনতা আছে। তাই যুদ্ধ-- 
সমর, মহাসমর, সংগ্রাম, আহব, রণ, মহারণ  শব্দগুলির অভ্যন্তরে মাদকতা-জারিত যে উত্তেজনা 
নিহিত আছে সেটি শুধু সৈনিকদেরই উন্মাদ করে  তোলে তাই নয় সাধারণ মানুষের মধ্যেও সেই  উন্মত্ততা সঞ্চারিত হয়ে যায়। হাতের কাছেই আছে  তার উদাহরণ। যখন প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে  আমাদের দেশের যুদ্ধ বাধে তখন দুই দেশের প্রায়  সমস্ত মানুষই সৈনিক হয়ে ওঠে। যুদ্ধক্ষেত্রের  উত্তেজনায় মনে প্রাণে তারাও প্রতিপক্ষ দেশের  পরাজয় এবং স্বদেশের বিজয় কামনা করে। কিন্তু  আসল সৈনিকদের অবস্থা কি হয় ? 

Henri Barbusse-র কথায়, 
"Two armies that fiqht each other is like one  large army that Commit Suicide." 

সৈনিকদের এই 'আত্মঘাতী হওয়া'কে martyrdom  আখ্যা দিয়ে সমর প্রাঙ্গনের বীভৎসতাকে আড়াল করে  রাখার চেষ্টা। 
আমি এই প্রতিবেদনের প্রথম পর্বে যুদ্ধকে 'বিষয়'  করে যে কাব্য, মহাকাব্যেগুলির উল্লেখ করেছি  সেখানে বা সেসব কালে যুদ্ধ যাঁরা করাতেন, রাজা  ও  রাজপুত্র, তাঁরা স্বয়ং যুদ্ধে সামিল হতেন, যুদ্ধ  পরিচালনা করতেন এবং রণাঙ্গনে মৃত্যু বরণও 
করতেন। এখন যুদ্ধের চরিত্র পাল্টেছে, ধরণ  পাল্টেছে, কারণও পাল্টে গিয়েছে। রাজা ও তাঁর  আমাত্যরা এখন নিজেরা থাকেন যুদ্ধক্ষেত্র থেকে  শত শত মাইল দূরে। সৈনিকগণ জৈবিক জীবনে  বেতনভুক কর্মচারী, আত্মিক জীবনে বা অন্তরে  দেশপ্রেমিক। তাঁদের আর একটি পরিচয় তাঁরা  দেশের বা রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব রক্ষাকারী। যতদিন  থেকে শাসক অর্থে 'রাজা' শব্দের চল আর নেই,  ততদিন হোল দেশ বা রাষ্ট্র গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। 
স্বাভাবিক ভাবেই 'রাষ্টশক্তি' একটি রাষ্ট্রের বা দেশের 
সর্বশক্তিমান নিয়ন্ত্রক এবং রাষ্ট্রের যাঁরা প্রতিভূ,  (রাষ্ট্রের চরিত্র যাই হোক-- একনায়কতন্ত্র, গণতন্ত্র,  সমাজতন্ত্র) তাঁরাই সেই বিমূর্ত রাষ্ট্র শক্তির মূর্ত বিগ্রহ।      তাঁদের ইচ্ছাই রাষ্ট্রের ইচ্ছা। তাঁরা যুদ্ধ চাইলে  যুদ্ধ,  তাঁরা শান্তি চাইলে শান্তি। এখানে ঐ রণাঙ্গনে  'মার  অথবা মর' প্রাণকনিকারা নিরুপায় এবং  অসহায়। 
যুদ্ধের আরম্ভটা তাঁরা জানেন কিন্তু পরিণাম জানতে  পারেন না ; কেননা ঃ 
"Only the dead have seen the end of war" 
কথাটির তাৎপর্য গভীর। মৃতরা ছাড়া, যারা জীবিত  আছেন বা থাকবেন তারা কেউ কখনো, কোনদিনও  যুদ্ধ নামের গণচিতার পরিনির্বাণ দেখে যেতে পারেন  না। 
কারণ, এ চিতা চির বহ্নিমান। 
আমি এই গণহত্যা, গণ আত্মহননের চিতাগ্নিশিখা  নির্বাপনের আশায় এহেন অকথা কুকথা লিখতে  চাইছি না। চাইছি না এজন্যই যে রাষ্ট্র এবং উগ্র  রাষ্ট্রবাদের অস্তিত্বের সঙ্গে, ব্যবসায়িক আগ্রাসনের  সঙ্গে, ভৌগলিক (অখণ্ডতা ?) সীমাবদ্ধতার সঙ্গে  স্বাজাত্যবোধ, সরলার্থে জাতি ও মৌলবাদের সঙ্গে  এই গণহত্যা (holocaust), যুগপৎ নরকাগ্নি  প্রজ্বলনের ঐতিহাসিক সম্পর্ক অস্বীকার করবার  উপায় নেই। 
আমি পারমাণবিক আকারের (micro level) খুন,  ব্যক্তির দ্বারা ব্যক্তিহত্যা নিয়েই আলোচনাটি  ফেঁদেছি। এগুলিও নাটকে, নভেলে, কাব্য কাহিনীতে  ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। সেখানেও হত্যাকারীর যে  পরিণাম সেখানে বিষাদ ও সন্তাপ-সঞ্জাত বোধের  (catharsis) উদয় হয়েই থাকে। কিন্তু... 

ক্রমশঃ 
(আলোচনাটি বিশদভাবে করবার চেষ্টা করবো)





শুক্রবার, ২৩ জুন, ২০২৩

খুন --১

খুন ১ 

"বসো আসি দীর্ঘ যুগ মহাশত্রুসনে  
প্রিয়সম মিত্রসম এক দুঃখাসনে।" 
                         'নরকবাস' -- রবীন্দ্রনাথ। 

বড় বড় যুদ্ধগুলির কাহিনী তো লেখা হয়ে আছে ইতিহাসে, কাব্যে, মহাকাব্যে। ব্যাস, বাল্মীকি, হোমার, ভার্জিল, কোয়ার্তো তাসো অমর হয়ে আছেন, অমর হয়ে আছেন প্রথম বিশ্বযুদ্ধ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, আরও শত সহস্র মাঝারি, ছোট নরমেধ যজ্ঞের ইতিবৃত্ত রচয়িতারা। তা,  সে সকল গণহত্যার বা গণ-নরবলির কিছুটা পূর্ব প্রস্তুতি থাকে, সঙ্কল্প থাকে। বলির জন্য উৎসর্গকৃত প্রাণীদের কপালে আগেভাগে সিঁদুর, চন্দনের টিপ দিয়ে বরণ করা হয়।  আতপ চাল, বেলপাতা, দেবতার বা বকলমে রাজার পাদোদক খাইয়ে/পান করিয়ে উন্মাদ এবং জাগতিক মায়া থেকে মুক্ত করা হয়। তারপর " ক্লিব মাস্ম গম পার্থ"--- ঝাঁপিয়ে পড়, মার কিংবা মর। হারাবার কিছুই নাই। জয় লাভ করে সাম্রাজ্য ভোগ অথবা সমরাঙ্গনে 'বীরগতি' প্রাপ্ত হয়ে শোক-দুঃখ-বিষাদ বিহীন স্বর্গবাস -- অক্ষয় সুখ, অপরিমেয় ভোগ্যোপকরণ, সুরধুনীতীরে, চিরবসন্ত-বিরাজিত নন্দন কাননে অপ্সরা গন্ধর্বদের নৃত্যগীতে অ-মৃত সে জীবন ; ঠিক যেমনটি তোমার রাজা এই মর্ত্যধামে রসাস্বাদন করে চলেছেন। 
King is the representative of God. তিনিই তোমাকে recommendation দিয়ে সেই "ধর্মক্ষেত্রে কুরুক্ষেত্রে"
পাঠাচ্ছেন। 'যাও বৎস, পৃষ্ঠে যেন নাহি লাগে অস্ত্রের আঘাত।' 

সৈনিকগণ ভাগ্যবান, কিন্তু যারা ধর্মগুরুর সৈনিক,  রাজনীতির নেতাদের সৈনিক তাদের জন্য এই জীবন  এবং এই জগৎ ছাড়া তেমন কোন আনন্দময়  দিব্যস্থানের ঠিকানা তো জানা যায়নি। তাদের জন্য পাপ  বা পুন্য, পুরস্কার বা তিরস্কার -- ঠিক কতখানি জোটে  তারও তেমন বিবরণ কোন শাস্ত্রগ্রন্থে লেখা নেই। তাই,  আমার মতে এই যে ধর্মোন্মাদ ধর্মগুরুদের (যুক্তিহীন  সাম্প্রদায়িক বিষ-মেশানো ধর্মের সওদাগর),  রাজনৈতিক নেতাদের (কপট, প্রবঞ্চক জনগণের  মঙ্গলাকাঙ্ক্ষীদের) সৈনিক হিসেবে শুধুমাত্র 'খুনি' হয়ে  আত্মবিসর্জন দিয়ে দুকূল হারানোর মধ্যে না আছে 
পার্থিব, না আছে পরমার্থিব -- কোন সুচির আনন্দময় 
 প্রাপ্তি। বরং তার পরিণতি বেশ উদ্বেগের -- দৈহিক এবং
 মানসিক নরকবাস। 
বন্দীশালায় দেহ আর অনুতাপের কামারশালায় মন। 
মন কেবলই বলবে, 

"হে নরক, হেন দাহ কোথা আছে তোমার অনলে 
যে জিনিতে পারে এ সন্তাপ !" 

কিংবা Shakespeare -য়ের Macbeth যেমন বলেছেন, 
"Will all Neptune's ocean wash this blood
From my hand ?" 

অনেক রক্ত ঝরে গেল ভাই, 
ভাইয়ের বক্ষ হতে, 
এবার তো স্নেহের হাতখানি রাখ 
মৃত দেহটির ক্ষতে। 
তারপর দেখ নিজের সে হাত -- 
শোণিত সোহাগে লেখা, 
"তবে তাই হোক্, বন্ধু ব্রুটাস, 
নরকেই হবে দেখা !" 

দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
২৪/০৪/'২৩ 

______________________________________















রবিবার, ১৮ জুন, ২০২৩

আষাঢ়স্য প্রথম দিবসে

আষাঢ় কালিদাসস্য


কোথা মন্দাক্রান্তা ছন্দ, অমৃতনিস্যন্দ রসাভাস, 
সুতীব্র বিরহ ব্যথা প্রেমিক প্রাণের ? কোথায় অলকা,  
কুবের আলয় -- অকলঙ্ক সুন্দরের চির লীলাভূমি। 
উজ্জয়িনী -- মর্ত্যে অমর্ত্যধাম ? কোথা যক্ষ -- 
  অক্ষয়যৌবন ? যক্ষপ্রিয়া -- "তন্বী শ্যামা শিখরদশনা, 
পক্কবিম্বাধরোষ্ঠী" ? সন্ধ্যারতি মহাকাল মন্দিরপ্রাঙ্গনে ? 
অচ্ছোদ সরসীনীর, মন্দাকিনী-শিপ্রা স্রোতস্বতী ? 
আকাশ নির্মল নীল ঊর্বসীবসন মেঘ যার চঞ্চল অঞ্চল। 
সুগন্ধবহ বাতাসের স্পর্শে লাগে প্রেমিকের শুশ্রূষা-সোহাগ। 
দুঃখ শুধু মিলনের ক্লান্তি বহে' থাকে স্বল্পকাল, 
অশ্রু ঝরে আনন্দের মিলন উচ্ছ্বাসে। বিশ্রম্ভ- 
সংলাপে, নৃত্য-গীতে রতিরঙ্গে প্রমত্ত-যৌবন নরনারী। 

হে কবি, ভারতীর বরপুত্র, সবই মিথ্যা, কল্পনার কায়া ? 
কিংবা তা মায়ার সৃজন ? দুঃখ শোক জরা মৃত্যু ব্যাধি ? 
দ্বন্দ্ব যুদ্ধ রক্তস্নান ? ছিল না কি ঝঞ্ঝা কি প্লাবন ? 
দাবানল ? শাসন ত্রাসন ? দুর্ভিক্ষ শ্রাবস্তী নগরে ? 
মহামারি ? সবলের আস্ফালন, দুর্বলের নরক যন্ত্রনা ? 
সবই ছিল তবু তাপদগ্ধ পৃথিবীর বুকে, উজ্জয়িনী পু্রে 
পড়েছিল নবমেঘ ছায়া, নেচেছিল শীতল সমীর, 
শীর্ণস্রোত তরঙ্গ লহরী তুলে ছুঁয়েছিল তটিনীর কূল। 
তুমি কবি, কল্পমায়ার কোলে অকস্মাৎ ঘুমে অচেতন -- 
   স্বপ্নাবেশে খুঁজেছিলে প্রিয়ার ভবন -- বিরহের বেদনার  পারে।


আজ আবার আষাঢ়ের প্রথম প্রভাত। পূবের বাতাস, 
শিপ্রা নয়, অজয়ের উৎসমূলে, পাহাড়ের চূড়ায় চূড়ায়, 
দিগন্তরেখায় নবঘনশ্যাম মেঘ বিদ্যুৎ লেখায় লেখে 
তোমার কাহিনী কালিদাস, কালজয়ী মহাকবি। 
তাই হোক্, নিয়ে চল কল্পনার চিরানন্দ ভূবনভ্রমনে 
মেঘদূত সাথে। থাক্ পড়ে রসহীন তৃষ্ণার্ত জীবন। 
নামুক তোমার নামে আষাঢ়ের কামনার নবীন বর্ষণ। 

দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
১লা আষাঢ়, ১৪২৯ সাল। 
 









শনিবার, ১০ জুন, ২০২৩

নববর্ষার আগমনী




নববর্ষার আগমনী 
___________________

ধূসর আকাশ, তপ্ত বাতাস, দগ্ধ ধরণী ছেয়ে 

শ্যামল, কোমল, সজল মায়ার সান্ত্বনা এলো ধেয়ে। 

বর্ষণধারা, শীতল সমীর, তরুলতা নবকান্তি, 

বাইরে ও ঘরে চরাচর জুড়ে বিরাজে অপার শান্তি। 

দিগন্তরেখায় কাজল লেখায় কালোচোখ মেঘবালা 

বিদ্যুৎ-পাড় কালো শাড়ি পরা, হংস সারির মালা। 

নাচে আনন্দে, তোটক ছন্দে, দেয়া গরজন গীতে 

 প্রান্তরে বনে জাগে শিহরণ নটিনী তটিনী মাতে। 

  অঞ্চলে ঢাকা দিনের তপন রাতের চন্দ্র তারা 

  প্রিয়া পরদেশে গাইছে হতাশে পাপিয়া তন্দ্রাহারা। 


আমি বাংলার, অনাদিকালের পিয়াসী চাতক কবি, 

মরু মরীচিকা সইতে পারিনা, চাই ছায়াঘন ছবি। 

ঝর ঝর জল ঝরে অবিরল ছল ছল শ্যাম ধরা, 

'রবিরাগে' সাধা মেঘ মল্লারে দিবস রজনী ভরা। 

নদ নদী স্রোতে কল কল সুর টল টল ঝিল বিল, 

ঘরের ছাঁচায় ডানাভেজা কাক, গাঙ পাড়ে গাঙচিল। 

সাঁঝের বেলায় ভিজা আঙিনায় দাঁড়ায়ে উতলা জননী, 

"কোথা গেলি ওরে, আয় বাছা ফিরে, ঘনায় আঁধার রজনী।" 

বাঙলা মায়ের সব সন্তান হাসি মুখে এসো ঘরে, 

সিক্ত স্নিগ্ধ শ্যামলাঞ্চলে রক্ত না যেন ঝরে। 


দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় 
১০/০৬/২০২৩







Recently published

অমূল্য

He ( Tagore) who sees all things in his own self and his own self in all things, he does not remain unrevealed.                     ...