সুদূর অতীত কালে কিশোর বেলায়,
তখনো ফোটেনি আলো প্রথম ঊষার,
বৃদ্ধা বৈরাগিনী তার খঞ্জনী ঝংকারে,
আবেগ বিহ্বল কন্ঠে, লীলায়িত সুরে,
গেয়েছিল গান বিরহের মন্দ্র মেদুর তানে,
বৃন্দাবন চন্দ্রহারা ব্রজধাম ডুবে অন্ধকারে --
সেদিনের বৈতালিক আজও শুনি কানে।
ব্রজগোপীমনচোর, শ্রীরাধাবল্লভ শ্যামরায়
অকস্মাৎ অন্তর্হিত যমুনাপুলিন হতে।
মাথুরের সে বিষাদ, শ্রীরাধার সেই অশ্রুজল,
যুগান্তর পারে, কায়া ধরে', পূত জাহ্নবীর তীরে,
উদ্ভাসিত গৌড়বঙ্গে শ্রীগৌরাঙ্গ রূপে।
বসন্তপূর্ণিমা, নবদ্বীপে চন্দ্রোদয় শ্রীশচীনন্দন।
চন্দ্রিমা চন্দন-মাখা অপরূপ তনু দেবশিশু,
শঙ্খরব কুটীরে কুটীরে -- আবাহন যুগাবতারের।
সাতটি শতাব্দী গেছে ভেসে সুরধুনী-তরঙ্গ ধারায়,
তবু আজও কূলে কূলে চরণ-নুপূর ধ্বনি শুনি,
শুনি প্রেমগান, আনন্দ মগন সংকীর্তন --হরিনাম।
নাই জাতি, ধর্ম-বর্ণ-ভেদ, পঞ্চ'ম-কার নাই,
নাই সমুদ্যত খড়্গ, পিশাচ উল্লাস। শুধু প্রেম,
প্রেমামৃত ধারা, অচিন্ত্য-ভেদাভেদ তত্ত্ব সারাৎসার।
আলিঙ্গন জনে জনে _ ব্রাহ্মণ চণ্ডাল একাকার।
ফাল্গুনের পূর্ণচন্দ্রে দেখে বৈরাগিনী সেই গোরাচাঁদে,
স্বর্গচ্যুত নরনারায়ণ, দ্বৈতাদ্বৈত ভাবের মিলন।
আত্ম পর সমভাব, "ঈশাবাস্যমিদং সর্বম...।
"মেরেছ কলসির কানা তাই বলে কি প্রেম দিব না?"
শ্যামাঙ্গনা বাংলার মানস সন্তান আজও দিগ্বিজয়ী
ধর্মযুদ্ধে। অহিংসার বাণী মন্দ্রিত জগতে নিত্য _
নাম সংকীর্তন পূর্বাশার দ্বার হতে পশ্চিমের
দিগন্তবলয়ে। আজ দোল, আবির-রঙিন বসুন্ধরা।
আকাশে উঠেছে চাঁদ শান্তি-চন্দন মাখা প্রশান্ত বদন_
ভেসে ওঠে বুকে সেই অপূর্ব রূপ -- নদের নিমাই,
সর্বত্যাগী নবীন সন্ন্যাসী, বীতরাগভয়ক্রোধ,
মহামানবের মূর্তি মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্য, মর্ত্য লীলায়।
আচার্য অদ্বৈত কোথা, কোথা নিত্যানন্দ সহচর,
পরিকর শ্রীবাস, হরিদাস, দামোদর, রামানন্দ রায়?
আছে তারা আছে, সংকীর্তন সভামধ্যে হৃদয়ে বিরাজে।
গৌরভক্ত বৈষ্ণবের এমনি বিশ্বাস।
ইথে কোন দোষ নাই, নাই আত্মনাশ।।
শ্রীরাধার মহাপ্রেম করিতে আস্বাদন।
ব্রজ শ্যামসুন্দরের বঙ্গে আগমন।।
অন্তরে গৌরাঙ্গ, কণ্ঠে সংকীর্তন গান।
ঝাড়খণ্ডী কবি ভনে শুনে পুণ্যবান।।
(দোল পূর্ণিমার পুন্য তিথিতে এই কবিতাটি ভক্তজন করকমলে অর্পিত হোল। 'শ্রীচৈতন্য চরিতামৃত' মহাগ্রন্থের স্রষ্টা বৈষ্ণব চূড়ামণি শ্রী শ্রী কৃষ্ণদাস কবিরাজ, পরম ভক্তের শ্রীচরণরেণু প্রত্যাশী আমি তাঁর চৈতন্য দর্শনের নিগূঢ় ভাব-প্রকাশক কিছু আখর যুগপোযোগী ভাষায় প্রকাশ করেছি যাতে আমার পাঠকগণ ,তাঁরা স্বয়ং অবগত, তবু আরও একবার যেন সেই মহাভাষ্যের আস্বাদন পান।
আত্মভাষণের অপরাধ মার্জনা করুন। )
কবিতাটি পরিমার্জিতরূপে পুনঃপ্রকাশিত।
দোল পূর্ণিমা,
২৯শে ফাল্গুন, ১৪৩১।