শনিবার, ২৫ মার্চ, ২০২৩

ওই যে গাঁ'টি যায় না দেখা

আমার বুকের পাথর নিয়ে
বইছে অজয় জীবন ধুয়ে। 
                        (দুলাল চ. বন্দো.)



মনে হোল লিখি যা তা-- 
কবিতা খাতার পাতা 
ভরে তুলি বৃথা শব্দজালে। 

বসন্তের সমীরণ 
ঘরে ঢোকে অকারণ 
কাঁদে চিল দিকচক্রবালে। 

মন উড়ে যায় দূরে 
ফেলে আসা বনপুরে 
নদী ঝোরা পাহাড়ের দেশে। 

সেখানে পলাশ ফুলে 
মাতাল ভ্রমর দুলে 
মহুলের গন্ধ আসে ভেসে। 

সেখানে অজয় নদী 
বহে যায় নিরবধি 
ঝিরঝির শীর্ণ স্রোত তার। 

অদূরে পাহাড় চূড়া 
যেন সাঁওতাল বুড়া 
নাই তার বয়সের ভার। 

ছাগল গরুর পাল, 
চাষী চলে কাঁধে হাল, 
মহিষের পিঠে তার বেটা। 

ধার্মিক সাধুর বেশে 
খাল পাড়ে বক বসে 
কোন দিকে নাই তার চেঠা। 

মেঠো পথ গেছে দূরে 
কত দূর দূরান্তরে 
সীমাহারা রাঙা ডাঙা পারে। 

রাঙাধূলা মাখা পা'য় 
ত্বরায় পথিক ধায়-- 
ছোট গ্রাম আছে তেপান্তরে। 

জটেশ্বর বট গাছে 
পেত্নি শাঁকচুন্নি নাচে, 
ভুত ছোঁড়া বাজায় ঢোলক। 

শ্যাওড়া ঝোপের তলে 
নাগিনী মাণিক জ্বেলে' 
খোঁজে তার নাকের নোলক। 

শহর নগর ছেড়ে 
অরণ্য নদীর পারে 
আমার সে গাঁয়ে যাবি ভাই ? 

সেখানে কল্পনা আছে, 
স্বপ্নরা মরে' বাঁচে, 
মানুষ দানব সেথা নাই।। 

দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
২৫/০৩/২০২৩ 


'চেঠা' এটি ঝাড়খণ্ডী বাঙলা বা দাদরি। 
অর্থ -- চেতনা/ মন/ সংবিদ। 

শুক্রবার, ১৭ মার্চ, ২০২৩

অন্বেষণ

গভীরে যাও, রত্ন পাবে। 
না পাও যদি, ফিরবে না আর, এই তো শুধু হবে। 
সবাই জানে রত্ন আছে অতল সাগর জলে, 
হীরা মাণিক জ্বলে নাকি আঁধার খনির তলে। 
অসীম নিঃসীম আকাশ পারে স্বর্গ রাজ্য আছে, 
নন্দন বনে চিরবসন্ত উর্বশীরা নাচে। 
পাতালে আবার শমন শ্মশান জীবন্ত বিভীষিকা, 
পুড়ছে পাপী, পুড়ছে তাপী-- নরকাগ্নিশিখা। 
ঝুলি ভরা পুণ্য নিয়ে সেখানে দাও পাড়ি, 
শুদ্ধিলোকে শুদ্ধ হয়ে 'বিয়াত্রিসের' বাড়ি। 
এমনি করে যতই তুমি গহন দেশে যাবে 
ফিরবে কিনা ধন্ধ আছে ; তবুও কিছু পাবে। 

কিন্তু যদি মানব-মনের জল মাপতে যাও 
তল পাবে না, কূল পাবে না মেপে হাজার বাঁও। 
সেথায় স্বর্গ, সেথায় নরক থাকেই পাশাপাশি, 
অসহ বিষাদ, দুঃসহ দুখ, বিপুল হর্ষরাশি। 
চিত্তে কোথাও প্রসন্ন আকাশ দীপ্ত চেতনা আলো, 
কোথাও রাহুর মুখ-ব্যদানের অন্ধ রাতের কালো। 
পাবে তুমি সেথা প্রেমসমীরণ, করুণা-পুষ্প সৌরভ ; 
আবার হঠাৎ কালবৈশাখী রুদ্র রোষের তাণ্ডব। 
মানুষের মন চিরদুর্গম তলাতলহারা ঠাঁই -- 
দেবতা দানব মিলে মিশে থাকে অথবা কিছুই নাই। 
সহস্র যুগের অজস্র ডুবুরি ডুবেছে অন্বেষণে, 
ব্যর্থ হয়েছে অথৈ গভীর ঠিকানার সন্ধানে। 

দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
১৮-০৩-২০২৩। 








 ‌             (ক্রমশঃ)

সোমবার, ১৩ মার্চ, ২০২৩

ছবি নয়, জীবন্ত চেতনা।

এখানে ভক্তি এখানে আশিষ 
মূর্ত মূর্তি ধরে', 
এই মধুমাসে মধুর লগ্নে 
বসেছে মাটির 'পরে। 
মধু সরলতা মধুর করুণা 
মধুমাখা স্নেহ মায়া, 
কেউ তো স্বর্গে দেখেনি কখনো-- 
মর্ত্যে ধরেছে কায়া। 
আভরণহীন, ধূলায় মলিন, 
ধনমানহীন দিদিমা, 
অবোধ বালক রাঙা ফাগ দিয়ে 
পূজা করে দেবী প্রতিমা। 
দেবদূত নয় মাটিমাখা শিশু 
আরাধনা তুমি শেখালে। 
অজান্তে তোমার চিরসুন্দর 
চেতনার রূপ দেখালে। 
প্রাণের উৎস 'ধরিত্রী জননী' 
বসেছেন তিনি যেখানে, 
(আমার) ভক্তিনম্র মুগ্ধ চিত্ত 
লুটিয়ে পড়েছে সেখানে। 

দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
১৩/ ০৩/২০২৩। 



শনিবার, ১১ মার্চ, ২০২৩

ক্রৌঞ্চমিথুন ও মহাকবি বাল্মীকি

ক্রৌঞ্চমিথুন ও মহাকবি বাল্মীকি 


মধু মাধবীর মিলন লগন বসন্তের এই কালে, 
ক্রৌঞ্চমিথুন গাইছিল গান প্রেম নিবেদন ছলে। 
সহসা ব্যাধের বিষাক্ত তীরে একটি পাখীর প্রাণ 
পড়ে গেল ঝরে যেন ঝরা পাতা, থেমে গেল প্রেমগান। 
সখাহারা পাখী কেঁদে কেঁদে ফিরে তমশা নদীর তীরে, 
সেই শোকাকুল হাহাকার শুনে ঋষি ভাসে আঁখি নীরে। 
মর্মবিদার শোকশেল-বেঁধা ঋষির কণ্ঠ হতে 
নিষাদের প্রতি অভিশাপ বাণী স্ফুরিত শোকাভিঘাতে।

"মা নিষাদ প্রতিষ্ঠানাং ত্বমগম শাশ্বতীঃ সমা। 
যৎ ক্রৌঞ্চমিথুনাদেকমবধীঃ কামমোহিতং।।" 

বিষাদমগ্ন মহাহৃদয়ের নিঃসৃত মহাবাণী, 
জন্ম দিয়েছে শাশ্বতকালের মহাগাথা রামায়ণী। 
পাদবদ্ধ অক্ষরে বাঁধা বীণার তন্ত্রী সুরে, 
পাতায় পাতায় সে মহাকাব্যে বিষাদ অশ্রু ঝুরে। 

রাম বনবাসে, মৃত দশরথ, শোকার্ত রাজপুরে 
ফিরেছে ভরত, ভাঙা মনোরথ বিষাদ রইল ঘিরে।  
বনবাসে সীতা, হোল অপহৃতা, বিরহী রামের কান্নায়, 
দ্যুলোক ভূলোক বিমথিত হোল অসহ শোকের বেদনায়। 

"কান্দিয়া বিফল রাম জলে ভাসে আঁখি। 
রামের ক্রন্দনে কান্দে বন্য পশু পাখি।" 

অপরূপ রূপ, রাজকুলবধূ, শ্রীরামঘরণী সতী। 
অশোক কাননে কাটায়েছে কাল দুখিনী অশ্রুমতী। 
সে অশ্রুভার হয়েছে অপার জীবনের শেষ অবধি, 
লোক অপবাদে, অনল দহনে, ধরাবুকে নিল সমাধি। 
বীরত্ব ছাপিয়ে শোকার্ত রামের মূর্তি দেখেছি বার বার, 
অভিষেক হতে অন্তিমে গিয়ে সরযুতে শেষ অভিসার। 
রঘুকুলমণি দাশরথী যিনি নারায়ণ নরচন্দ্রমা, 
জীবন-পাটনী অন্ধ নিয়তি তাঁরেও করেনি ক্ষমা। 

অনাদি কালের জীব-সংসারে জীবনের চিরছবি 
ক্রৌঞ্চমিথুন ভাগ্যের সাথে জুড়েছেন মহাকবি।। 

    ঋণ স্বীকার ঃ 
   'রাম কাহিনী '_স্রষ্টা মহাকবি বাল্মীকি, 'রামায়ণ' কথক কৃত্তিবাস।  
(কীর্তিবাস কবি, এ বঙ্গের অলংকার) তাঁদের শ্রীচরণরেণু প্রত্যাশী।

দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
১২. ০৩.২০২৩।




রবিবার, ৫ মার্চ, ২০২৩

বঙ্গভূমিচন্দ্র বিনা বিশ্ব অন্ধকার

প্রেমাবতার

"বৃন্দাবন চন্দ্র বিনা বৃন্দাবন ডুবিল আঁধারে।" 

সুদূর অতীত কালে কিশোর বেলায়, 
তখনো ফোটেনি আলো প্রথম ঊষার, 
বৃদ্ধা বৈরাগিনী তার খঞ্জনী ঝংকারে, 
আবেগ বিহ্বল কন্ঠে, লীলায়িত সুরে, 
গেয়েছিল গান বিরহের মন্দ্র মেদুর তানে, 
বৃন্দাবন চন্দ্রহারা ব্রজধাম ডুবে অন্ধকারে -- 

সেদিনের বৈতালিক আজও শুনি কানে। 
ব্রজগোপীমনচোর, শ্রীরাধাবল্লভ শ্যামরায় 
অকস্মাৎ অন্তর্হিত যমুনাপুলিন হতে। 
মাথুরের সে বিষাদ, শ্রীরাধার সেই অশ্রুজল, 
যুগান্তর পারে, কায়া ধরে', পূত জাহ্নবীর তীরে, 
উদ্ভাসিত গৌড়বঙ্গে শ্রীগৌরাঙ্গ রূপে। 
বসন্তপূর্ণিমা, নবদ্বীপে চন্দ্রোদয় শ্রীশচীনন্দন। 
চন্দ্রিমা চন্দন-মাখা অপরূপ তনু দেবশিশু, 
শঙ্খরব কুটীরে কুটীরে -- আবাহন যুগাবতারের। 

সাতটি শতাব্দী গেছে ভেসে সুরধুনী-তরঙ্গ ধারায়, 
তবু আজও কূলে কূলে চরণ-নুপূর ধ্বনি শুনি, 
শুনি প্রেমগান, আনন্দ মগন সংকীর্তন --হরিনাম। 
নাই জাতি, ধর্ম-বর্ণ-ভেদ, পঞ্চ'ম-কার নাই, 
নাই সমুদ্যত খড়্গ, পিশাচ উল্লাস। শুধু প্রেম, 
প্রেমামৃত ধারা, অচিন্ত্য-ভেদাভেদ তত্ত্ব সারাৎসার। 
আলিঙ্গন জনে জনে _ ব্রাহ্মণ চণ্ডাল একাকার। 

ফাল্গুনের পূর্ণচন্দ্রে দেখে বৈরাগিনী সেই গোরাচাঁদে, 
স্বর্গচ্যুত নরনারায়ণ, দ্বৈতাদ্বৈত ভাবের মিলন। 
আত্ম পর সমভাব, "ঈশাবাস্যমিদং সর্বম...। 
"মেরেছ কলসির কানা তাই বলে কি প্রেম দিব না?" 
শ্যামাঙ্গনা বাংলার মানস সন্তান আজও দিগ্বিজয়ী 
ধর্মযুদ্ধে। অহিংসার বাণী মন্দ্রিত জগতে নিত্য _ 
নাম সংকীর্তন পূর্বাশার দ্বার হতে পশ্চিমের 
 দিগন্তবলয়ে। আজ দোল, আবির-রঙিন বসুন্ধরা। 
আকাশে উঠেছে চাঁদ শান্তি-চন্দন মাখা প্রশান্ত বদন_ 
ভেসে ওঠে বুকে সেই অপূর্ব রূপ -- নদের নিমাই, 
সর্বত্যাগী নবীন সন্ন্যাসী, বীতরাগভয়ক্রোধ, 
মহামানবের মূর্তি মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্য, মর্ত্য লীলায়। 
আচার্য অদ্বৈত কোথা, কোথা নিত্যানন্দ সহচর, 
পরিকর শ্রীবাস, হরিদাস, দামোদর, রামানন্দ রায়? 
আছে তারা আছে, সংকীর্তন সভামধ্যে হৃদয়ে বিরাজে। 

গৌরভক্ত বৈষ্ণবের এমনি বিশ্বাস। 
ইথে কোন দোষ নাই, নাই আত্মনাশ।। 
শ্রীরাধার মহাপ্রেম করিতে আস্বাদন।
ব্রজ শ্যামসুন্দরের বঙ্গে আগমন।। 
অন্তরে গৌরাঙ্গ, কণ্ঠে সংকীর্তন গান। 
ঝাড়খণ্ডী কবি ভনে শুনে পুণ্যবান।। 

(দোল পূর্ণিমার পুন্য তিথিতে এই কবিতাটি ভক্তজন করকমলে অর্পিত হোল। 'শ্রীচৈতন্য চরিতামৃত' মহাগ্রন্থের স্রষ্টা বৈষ্ণব চূড়ামণি শ্রী শ্রী কৃষ্ণদাস কবিরাজ, পরম ভক্তের শ্রীচরণরেণু প্রত্যাশী আমি তাঁর চৈতন্য দর্শনের নিগূঢ় ভাব-প্রকাশক কিছু আখর যুগপোযোগী ভাষায় প্রকাশ করেছি যাতে আমার পাঠকগণ ,তাঁরা স্বয়ং অবগত, তবু আরও একবার যেন সেই মহাভাষ্যের আস্বাদন পান। 
আত্মভাষণের অপরাধ মার্জনা করুন। ) 

কবিতাটি পরিমার্জিতরূপে পুনঃপ্রকাশিত।‌ 
দোল পূর্ণিমা, 
২৯শে ফাল্গুন, ১৪৩১।










বুধবার, ১ মার্চ, ২০২৩

এসো বসন্ত, এসো

এস বসন্ত 


এসো, তুমি এসো, কৈশোর প্রেমের দূত হয়ে, 
কাঞ্চন ফুলের আভা মুখে, ওষ্ঠাধরে কিংশুক কুসুম, 
কনক চাঁপার দ্যুতি দিব্য অবয়বে, কর্ণমূলে 
কাঁঠালি চাঁপার দুল, মহুয়ার উগ্র গন্ধ থাক্। 
আপাতত  নাগকেশর, হেনা, নয়তো বা বেলি-- 
তাদেরই আতর মাখা, কৃষ্ণচূড়ার বর্ণছোপা 
উত্তরীয় কটিতে জড়ানো। নাই বা গাইলে গান 
কোকিলের স্বরে, তোমার চাঁচর কেশে রঙ তার 
নিও চুরি করে। ছিন্ন-জীর্ণ শুষ্ক পত্ররাশি -- 
উড়ে যায় যাক্, ফাল্গুনী কিশোর, তোমার নিঃশ্বাসে। 
নূতন পাতার কোলে অর্ধস্ফুট পুষ্পকলি, 
মদালসা আঁখির গড়ন, শরম-মেদুর শুভদৃষ্টি, 
থাক্ চেয়ে অপলক নবোদিত অরুণের চোখে। 
এসো বসন্ত চিরসুন্দর, আনন্দ-আবির মেখে। 

দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় 
০২/০৩/২০২৩





Recently published

অমূল্য

He ( Tagore) who sees all things in his own self and his own self in all things, he does not remain unrevealed.                     ...