শনিবার, ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৩

রাখাল


রাখাল

দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়

"হায় রে হৃদয়
তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়
নাই নাই নাই যে সময়।"

চেয়েছি, মনে প্রাণে চেয়েছি। সেই স্মৃতির সঞ্চয় জীবন পথে ফেলে দিতে চেয়েছি, ভুলে যেতে চেয়েছি। পারি নি।

রবি ঠাকুরের কবিতা দিয়ে শুরু করলাম এই কারণেই যে সেদিনও ছিল ২৫শে বৈশাখ। চল্লিশ বছর আগের বিশ্বকবির আরেক জন্মদিন।
পশ্চিমবঙ্গের পশ্চিম প্রান্তে, অজয় নদের ওপারে, ঝাড়খণ্ড সীমানায় একটি বর্ধিষ্ণু গ্রামের মাঝামাঝি,  কালী পুকুরের পশ্চিম পাড়ে, এক মাটির  দোতলা কোঠাবাড়ির উপর তলায়, ট্রাণজিস্টারে রবীন্দ্র সঙ্গীত শুনতে শুনতে রুদ্র গ্রীষ্মের উত্তপ্ত দিনান্তবেলার সান্ধ্য তন্দ্রাচ্ছন্নতার মৌতাত উপভোগ করছি। শুয়ে আছি তালপাতার চাটাইয়ে। হঠাৎই আমার বাহাত্তুরে মা-জননীর ডাক (আহা! মধুরতম সে ডাক হারিয়ে গিয়েছে জীবন  থেকে),
-- বাবু, দেখ তো কিসের কোলাহল। সনকা ছুটতে ছুটতে  ওপাড়ার দিকে দৌড়াল! কাউকে কিচ্ছুটি বলবি না। শুধু দেখবি সনকা মাসির কি হোল।

বাউরী পাড়ার সনকা। ফসল ক্ষেতে কাকতাড়ুয়ার গায়ে  সাদা শাড়ি লেপ্টে দিলে যেমন দেখাবে সনকা মাসিকে  দেখতে অবিকল তেমনি। শুধু মুখের হাসিটি তার দেহের সৌন্দর্য, তার অনাবিল মনের প্রকাশ। আমাদের ঘরের  সমস্ত রকম দায় তার উপর। মা'য়ের, শুধু রাতটুকু বাদ  দিয়ে, সর্বক্ষণের সঙ্গী। তার একমাত্র পিতৃহারা সন্তান খোঁড়া গাঁয়ের বাগাল। খোড়াঁ-ই তার নাম ; কেননা জন্ম হতেই তার একটি পা ছোট। খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়েই তার জীবন শুরু এবং এখনও চলমান --গরু, মোষ, ছাগল, ভেড়াদের সাথে, সমান তালে।
কোলাহলটি এ পাড়ারই, এই বামুন পাড়ার উপর মুড়ার দিক থেকেই আসছে। সঠিক অনুমান করেই এগিয়ে চললাম। কেষ্ট রায় (কৃষ্ণ চন্দ্র রায়)-দের বাড়ির কাছাকাছি এসে দেখি সিংহ দরজার বাইরে বাউরী বাগদি, ডোমপাড়ার সমস্ত ছেলে-বুড়া-মিয়া-মরদ। ভিড় ঠেলে ভিতরে ঢুকে যা দেখলুম তাতে ভয়ে কাঁপন ধরে গেল। হাত-পা বাঁধা খোঁড়া পড়ে আছে। হাত দুটো বাবুই দড়ি দিয়ে এমন ভাবে বাঁধা যে দড়ির দুদিকের ডগা লম্বা টেনে ওই দড়ি দিয়েই দুই পা মুড়ে বেঁধে দেওয়া। পায়ের ছোট বড় হাঁটু দুটো জোড়া হয়ে উঠে আছে খুঁটার মতন।কশাইখানায় গরু মোষ কাটার আগে যেভাবে পা বেঁধে ফেলে রাখা হয়, তেমন। মোষের সঙ্গে তুলনাই ঠিক, খোঁড়া মোষের মতই কালো। চিত করে রাখা হয়েছে দুপাশে দুটো ইঁট রেখে। হাঁ মুখ, শুকনো লালার সুতা ঠোঁটের দুই কোণায়।
কেষ্ট রায়ের ব্যাটা অকা (ঠিক নাম অক্রূর), বছর তিরিশের জোয়ান, পাতলুন-পরা, খালি গা, লোমশ বুকে ছাগল বাঁধা রশির মতন মোটা সোনার চেন। বাবরি কাটা চুল ঝাপুড় হয়ে নেমেছে চোখ মুখ ঢেকে। তারই ফাঁক দিয়ে বড় বড় চোখ, লাল যেন কাঠ-কয়লার আঙার, পুড়িয়ে দিতে চাইছে খোঁড়াকে। পাগলা কাড়ার মতন হুঁকরে উঠছে থেকে থেকে,
--- বল্ শালা, কোন্ ব্যাপারিকে বিকেছিস্ , বল্। 

সনকা লম্বালম্বি উবুড় পড়ে আছে তার পায়ের কাছে। ঠিক যেমন স্কুল মাস্টার রামধন তেওয়ারীর গিন্নি ছট্ পূজার সময় হত্যা দিয়ে পড়ে থাকে। সারা গাঁয়ের লোক দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছে, কিন্তু কিচ্ছুটি বলার সাহস কারোর নাই। অকার বাবা মুখিয়া, আবার বড় নেতাও। জজ সাহেব থেকে থানার দারোগা, সকলেই তাদের বৈঠকখানায় আসেন, বসেন, গল্প করেন।
হঠাৎই সনকা উঠে বসল, সর্বাঙ্গে ধূলা, শাড়ি খুলে গিয়েছে, কান্নাভাঙা গলা, হাত জোড় করে বলছে,
---হেই বাবা, জল, একটুকুও জল খেতে দাও খোঁড়াকে। অকা নির্বিকার। সনকা শাড়ি বুকের উপর চেপে ছুটতে লাগল। ঘরে ঘরে ঢুকছে, কেউ জল দেয়নি হয়তো। এবার নিজের ঘরের দিকে। কিছুক্ষণ পর আবার ফিরে এলো -- হাতে পিতলের ঘটি, ঘটিভর্তি জল। খোঁড়ার হাঁ মুখে ঢালতে গেল, অমনি অকার লাথি। ঘটি উড়ে গিয়ে একজনের বুকে... তারপর মাটিতে...কাত হয়ে গলগল জল গড়াতে থাকল মাটিতে। স্থির চেয়ে রইল সনকা, চেয়ে রইল, কম হলেও, দুকুড়ি চোখ।
দৃশ্যটি আমার কাছে অসহ্য হয়ে উঠেছে। এতো বড় অন্যায়, একজন পঙ্গু রাখাল, তার উপর এমন নিষ্ঠুর অত্যাচার ! আর আমি কাপুরুষের মতো দাঁড়িয়ে আছি, দেখছি। ওদিকে মায়ের কঠোর আদেশ, 'কোন ঝামেলায় জড়াতে যাবি না।' তা যুক্তিযুক্তও বটে। আমার আদর্শবান, স্কুলশিক্ষক, প্রতিবাদী বাবা অন্যায়, অবিচারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে করতে, মামলা মোকদ্দমায় জড়িয়ে, সর্বস্বান্ত, হতাশায় বিধ্বস্ত হয়ে অকালেই চলে গিয়েছেন বছর তিনেক আগে। মা বেঁচে আছেন শুধু আমার মুখ চেয়ে। আমি বাঁকুড়া খৃষ্টান কলেজের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র। ঘরে এসেছি গরমের ছুটি পড়েছে তাই। মায়ের ধারণা, গ্রামের জটীল, কুটীল সমাজের রীতি নীতি আমি বুঝি না। মায়ের এই ধারণা, যত বয়স বাড়ছে ততই দিবালোকের মতো স্পষ্ট হয়ে উঠছে আমার কাছে।
সব কিছু জেনেও থাকতে পারলাম না। এগিয়ে গেলাম অকাদার কাছে। আমার উদ্দেশ্য আন্দাজ করে, আমার দিকে এমন ভাবে চেয়ে রইল যে, আমার মুখ থেকে কথা বার হওয়া তো দূরের কথা, গলা শুকিয়ে কাঠ। মনে হলো ও যেন , তার গরিলার মতো লোমশ হাত দুটো দিয়ে আমার টুঁটি চেপে ধরেছে। 


হঠাৎই ভিড়ের মধ্যে ছটফটানি, সবার কান খাড়া। দূর থেকে গুম গুম শব্দ। দৌড়, যে যেদিকে পারে । মুহূর্তে ফাঁকা হয়ে গেল সেই অকুস্থান ; অকা আর আমি মুখোমুখি, মাঝখানে দড়িবাঁধা, মরা মোষছা-য়ের মতো পড়ে আছে খোঁড়া। অকার চোখ মুখ সাংঘাতিক ভাবে পাল্টে গেল। চ-কার উপসর্গ দিয়ে 'মারাণি' বলে' উৎকট চিৎকার করে উঠল। বুঝতে পারিনি সম্বোধনটি আমাকে করা। পরের কথাটিতে বুঝলাম,
-- এর দড়িটা খোল শালা,....বলে নিজেও হাত লাগালো। দড়ি খোলা হতেই খোঁড়ার মাথার চুল ধরে তুলে, আমাকে ইঙ্গিতে দেখালো পা ধরে তুলতে। চ্যাংদোলা করে 'সিংহ দুয়ারের' ভিতরে, বাঁদিকের একটি ঘুপচি ঘরে ঢুকিয়ে মেঝেতে ফেলেই দেওয়া হোল প্রায়।
-- পাহারা দে শালা...।
অস্থির হয়ে উঠেছে, ভয় পেয়ে যেমন হয়, তেমনি। বেরিয়ে গেল।
আমি হতভম্ব, স্তব্ধবাক। পেছনে ফিরে দেখি কোণায় মাটির কলসি, ঢাকনার উপর একটি টিনের গেলাসও রাখা। 'যা হবে দেখা যাবে' -- গেলাসে জল নিয়ে ঢেলে দিতে থাকলাম খোঁড়ার মুখে। মনে হোল যেন তপ্ত বালিতে জল পড়ছে। দু-গেলাস জল শুষে নিল খোঁড়া।  জামা খুলে ঝটিতি মুখটা দিলাম মুছে। ভাবছি, পালিয়ে যাব ! না, না, দেখি, খোঁড়াকে কি করে। ভাবতে ভাবতে অকা ঘরে ঢুকল, সঙ্গে চারজন মুনিষ, একটি খাটিয়া। তারা ধানের আঁটির মতো খোঁড়াকে তুলে দিল খাটে।
-- পেছন দরজা দিয়ে নিয়ে যা। ওদের উঠানে ফেলে, খাট নিয়ে তুরন্ত ফিরে আসবি। কাল হারামিকে কবুল করাবই। শালা দারোগা আবার এসেছে বাপের কাছে।
খোঁড়াকে তুলে নিয়ে যেতেই অকা এসে দাঁড়ালো ঠিক আমার মুখের সামনে।
-- এই যে বাপের সুপুত্তুর, এই ঘটনা নিয়ে কোথাও যদি মুখ খুলেছিস তবে তুইও তোর বাপের মতন উপরে  ...বুঝলি? বেরিয়ে যা ।
ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বড় দরজার বাইরে বার করে দিল আমাকে।
                           দুই

মনে প্রাণে বিধ্বস্ত , বাড়ির দিকে ফিরছি পুকুরের পাড় ধরে। সূর্য ডুবেছে বেশ কিছুক্ষণ। মু-আঁধারি সন্ধ্যা। তবুও পশ্চিম আকাশে দিগন্ত রেখা বরাবর একটি জমাট মেঘের স্তর । অস্তগত সূর্যের লাল আলো পড়েছে তার উপর। মহিষাসুরের দ্বিখন্ডিত দেহের রক্তস্রোত, গলগল গলে গলে পড়ছে এসে এই পুকুরের জলে। যেন দান্তে সাহেবের ইনফারনো !
একী ? এসব কী ভাবছি ! পুকুর পাড়ের ঢাল বেয়ে নীচে নামতেই দেখি বট গাছটার তলায়, অন্ধকারে অনেক মানুষের জটলা। আমাকে দেখেই সেখান থেকে ছুটে এলো সনকা মাসি। উন্মাদ হয়ে গিয়েছে।
-- ও বাবু, বাবুরে, ওরা কি খোঁড়াকে দারোগার হাতে  দিয়ে দিয়েছে ? মেরে দিয়েছে? বল্ বাবা, বল্।
না, মুখ বুজে সহ্য করা ঘোরতর অন্যায় হবে। মাসিকে খুলে বলে দিলাম সমস্ত কিছু। শুনে মাসি ছুটতে লাগল ঘরের দিকে। মাসির পেছনেই এসে দাঁড়িয়েছিল বলাই, মাসির ভাইপো। সব শুনে বলল সে ,
--- কাল আবার অশান্তি হবে গাঁয়ে।
আমি তার কাছে জানতে চাইলাম, কারণটা কি? সে যা জানালো তা তো আমার কাছে অভূতপূর্ব। এমত বিষয় এতখানি জীবনে এই প্রথম শুনছি।

কেষ্ট রায়ের ব্যাটা অকা বছর চারেক আগে একটি সদ্য বিয়োনো ভাগলপুরী গাই কিনেছিল। বাছুরটি ছিল বকনা। একমাস না যেতেই গাইটি গেল মরে। বাছুরটিকে দেখভাল করার দায়িত্ব পড়েছিল খোঁড়ার উপরেই। খোঁড়ার মায়া পড়ে গেছিল বাছুরটির উপর, বাছুরটিও খোঁড়ার গায়ে গায়ে সেঁটে থাকতো। গোয়াল ঘর থেকে ছাড়া পেয়েই সে দৌড়ে চলে যেতো খোঁড়াদের উঠানে। এখন বড় বকনা। শম্ভু লেগেছে উয়ার পিছনে। বাস্, ছটফটানি শুরু। এদিক ওদিক ছুটে বেড়ায়। ভিতর বনে, নদীর ধারে, দূরে দূরে। এমনিই তো হয়, গাবিন না হওয়া তক্। কিন্তু কেউ বলে দিয়েছে অকাকে যে খোঁড়া বকনটি বেচে দিয়েছে ব্যাপারীদের কাছে। এমনও হয়, যারা গরু কাড়ার কারবার করে, তারা বাগালদের হাতে কিছু পয়সা দিয়ে গরু কাড়া নিয়ে পালায়। কিন্তু খোঁড়াদাদা সেটি করে নাই, সে সকল গরু, কাড়া, ছাগল ভেড়াদের ভালবাসে, বকনটিকে তো নিজের বিটি মনে করে। তার নামও রেখেছে---  'বকুল'। আমার বাবা তাকে নিয়ে যেতে চেয়েছিল নদীপারের ইটভাটাতে। খোঁড়াদাদা যায় নাই। বলেছিল,
'বকুলকে কে যতন করবে ? আহা, মা-মরা ছা।'
--- আচ্ছা, শম্ভুটা কে ?
-- তুমি জান না ? শম্ভু আমাদের গাঁয়ের ষাঁড়। এক এক পালে একটি একটি করেই ষাঁড় থাকে। দুটা হলেই তো লড়াই -- রক্তারক্তি ! আমাদের শম্ভু এমনিতে শান্ত কিন্তু সে যদি কোন বকন ধরে, তবে তার খোরাক কেউ ছিনতে পারে না। দেখেছ তার সিং --- বাপ্ রে !  সেইটি তো খোঁড়া কাল থেকে বলে আসছিল। তা ছাড়াও, জংলা, খোঁড়ার কুকুর, খোঁড়ার পাল পাহারা দেয়। তার চোখকে ফাঁকি দিয়ে কেউ ভটকাতে পারবে একটি গরু-মোষ ? সে ওই মিশকালো গতর নিয়ে যখন ভুখে, তখন ভয়ে বাঘ পালায়। অকা কিছুতেই মানতে চায় না। কেবলই বলছে, 'খোঁড়া বেচে দিয়েছে, শালাকে মেরেই ফেলবো।' 

আমি বললাম, 'তোমরা গাঁয়ের লোক সকলে মিলে একথা তাদের বলছো না কেন?' বলাইয়ের কথা, 'কেউ বলতে পারবে না দাদা। যে বলতে যাবে হয় তার ঘর পুড়বে, নয় তাকে ঘর ছাড়তে হবে।'
বলাই এদিকে ওদিকে নজর ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে চলে গেল। বটগাছের তলাটাও ততক্ষণে ফাঁকা হয়ে গিয়েছে। আমিও ঘরের দিকে। ঘরে ঢুকতে গিয়ে দেখি মা হ্যারিকেন নিয়ে বেরোবার জন্য তৈরি।
-- কি বাবা, এতো দেরি ? চিন্তায় আকুল হয়ে পড়েছি। শুনলাম খোঁড়াকে রায়েরা ধরে রেখেছে। কেন, কি করেছে সে ?
--- মা, ঘরের ভিতরে এসো, বলছি সব।
বললাম ; শুনতে শুনতে মায়ের চোখদুটো রক্তাভ হয়ে উঠল। মা অক্রোধী, সুখে দুঃখে অবিচল ; কিন্তু আজ মনে হোল সংযমের বাঁধ ভেঙে গিয়েছে তাঁর। নির্বাক, কি যেন ভাবলেন স্বল্পক্ষণ। ঘরের ভিতরে গেলেন, বেরিয়ে এলেন থলিভর্তি কি যেন নিয়ে। আমার হাতে দিয়ে বললেন,
--- চল।
থলি হাতে নিয়ে বুঝতে পারি টিফিন ক্যারিয়ার। বেশ ভারি। এ সেই টিফিন ক্যারিয়ার যাতে বাবা খাবার নিয়ে যেতেন। মা হ্যারিকেন নিয়ে আগে আগে। দৃপ্ত সাহসী ভঙ্গিমা। সোজা সনকার ঘর। ঘর নয় -- উন্মুক্ত উঠানের পর খড়ের ছাউনি দেওয়া, দেওয়ালভাঙা কুটীর। দুয়ারে কপাট নাই, ভাঙা টিনের পাত দিয়ে আড়াল করার চেষ্টা ছিল হয়তোবা, সেটিও পড়ে আছে কাত হয়ে।
--- সনকা .... সনকা....!
কোন সাড়া নাই ! মা হ্যারিকেনটি সামান্য উস্কে ভিতরে ঢুকলেন। পিছনে আমিও।
---'আবার কেনে!'--- মারণ ভয়ে আর্ত চিৎকার!
--- আমি, আমি বাবুর মা...
মা আলো নিয়ে সামনে এগিয়ে যেতেই যে দৃশ্যটি আলো  -অন্ধকারের অদ্ভুত অস্পষ্টতায় প্রত্যক্ষ করেছিলাম , মনে হয়েছিল যেন সেই অমর ভাস্কর্য-- মাইকেল এঞ্জেলোর পিয়েটা। ক্রুশে বিদ্ধ ক্ষতবিক্ষত যীশুর মৃতদেহ-কোলে মা মেরী ---  পাথরের পাটাতনে বসে আছেন। সোমত্ত সন্তানের দীর্ঘ, অর্ধনগ্ন নিষ্প্রাণ শরীর কোলের ওপর, অবিন্যস্ত কেশরাশী সম্বলিত মাথা, আর উলঙ্গ পা দুটি দুই প্রান্তে ঝোলা, নিথর। মা মেরীর মুখ অবনত। কান্নার নৈঃশব্দ্য নাকি নৈঃশব্দ্যের কান্না-- মহাশিল্পী তা দেখাতে চান নি।
এখানেও সেই চিরন্তন প্রাণের প্রস্তরিভূত ভাস্কর্য। খোঁড়া , ওই মরা যীশুর মতোই দীর্ঘ, নির্মেদ অস্থির কাঠামো, শুধু একটি পা খাটো এইযা, চিৎ মেরে আছে পড়ে, মায়ের কোলে নয়, ছেঁড়া তালপাতার চাটাইয়ে। আর মরে নাই হয়তো, ঘুমিয়ে আছে নিঃসাড়।  সনকা একবার শুধু চোখ তুলে আর্ত স্বরে জানতে চেয়েছিল কে ঢুকেছে ঘরে ; তারপর স্থির দৃষ্টি আবার ছেলের উপরে, ঠিক যেমন মা মেরী। (ধুৎ, কী যে ভাবছি ! এই আমার সমস্যা। ঘটনা, দুর্ঘটনা -- যাই দেখি মন চলে যায় উপমা খুঁজতে।)
আমার মা থলিটি নিলেন, খুললেন, তুললেন টিফিন ক্যারিয়ার, রাখলেন সনকার সামনে। সনকা নির্বিকার। উঠে গিয়ে খোঁড়ার মাথার কাছটিতে গিয়ে বসলেন, মাথায় হাত রেখে বিড়বিড় করে কি যেন বলছেন-- শোনা যায় না। তবে উঠে দাঁড়িয়ে যা বললেন শুনতে পেলাম,
--- খোঁড়া উঠলে মা-ব্যাটায় খেয়ে নিবি। বাতিটাও রইলো। ভয় পাবি না।

আমরা যখন ঘরে ফিরে এলাম তখন রাত গাঢ় হয়েছে। গ্রামের বামুন পাড়ায় 'রাখালরাজ বংশীবদনের' মন্দিরে সন্ধ্যারতির কাঁসর ঘন্টা সবে স্তব্ধ হয়েছে। পেছনের বাঁশ বাগানে শিয়ালদের প্রথম প্রহরের ঘোষণা শেষ।
মা বললেন, 


--- আজ আর কিছু রান্না করবো না বাবু। আয়, গুড় মুড়ি খেয়ে ঘুমিয়ে পড়। কাল সকালবেলা আমরা দুজনেই যাব। খোঁড়াকে বাঁচাতেই হবে। আজ তোর বাবা বেঁচে থাকলে কি ঘরে বসে থাকতেন ?
শরীরের মনের ক্লান্তি ছিল। শুয়ে পড়লাম। ঘুম আসছে না। আচ্ছন্নতায় বার বার খোঁড়ার ওই দড়িবাঁধা, ঘামে ভেজা, ধূলি-কাদায়-লেপা আধনাঙা শরীর ; ওই তৃষ্ণাকাতর হাঁ-মুখ, ওই অসহায় চাহনি চোখের সামনে ভেসে ভেসে উঠছিল। ভোরের দিকে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম অঘোরে। চমকে জেগে উঠলাম মায়ের ডাকে। মায়ের সমস্ত কাজ সারা, যাবার জন্য প্রস্তুত। আমিও ঝটিতি তৈরি হয়ে নিলাম।
কিন্তু যেতে হোল না আমাদের। বাড়ির দরজা খুলতেই দেখি দাঁড়িয়ে আছে বলাই। এক হাতে হ্যারিক্যানটি আর অন্য হাতে টিফিন ক্যারিয়ারসহ থলিটি।
মা--- কি রে বলা, তুই ? তুর জেঠিমা, খোঁড়া ?
বলাই---তখন অনেক রাত, জেঠিমা আমদের ঘরে এই জিনিসগুলা দিয়ে বলে গেল তোমাকে দিতে। তারা চলে গেল। অন্য লোক যেন না জানতে পারে --- তাই কিচ্ছুটি বলে নাই।
আর কি হয়েছে জানো কাকিমা ? বকুল ফিরে এসেছে, সঙ্গে শম্ভুও। জেঠিমার উঠানে শম্ভু বসে বসে জাবর কাটছে আর বকুল দুয়ারে দাঁড়ায়ে। মাঝে মাঝে হাম্বা, হাম্বা --  খোঁড়া দাদাকে ডাকছে। গাঁ ভেঙে লোক--- দেখে তো অবাক। 
বলাই চলে গেল। মা নিশ্চুপ। একটি দীর্ঘ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বসলেন। আমি, একমাত্র আমিই জানি এই নীরবতা, এই দীর্ঘশ্বাস কতখানি গভীর অন্তর্বেদনার অভিব্যক্তি। সনকা মাসি, তার ছেলে -- তারা কাজের লোক ও বাগাল ছিল না, তারাই একমাত্র আপনাজন ছিল মায়ের কাছে, বহুদিনের সুখ-দুখের সাথী।
গাঢ় বিষাদঘন নৈঃশব্দ্যের নিশ্চলতা। কী করি ? রেডিওটাই খুলি। 

'আপনারা শুনছেন রবীন্দ্রসঙ্গীত ;  শিল্পী সন্তোষ সেনগুপ্তঃ
"দূরদেশী সেই রাখাল ছেলে।
আমার বাটের বটের ছায়ায় সারাবেলা গেল খেলে ...।'' 

অকস্মাৎ 'হো হো, হায় হায়' বুক কাঁপানো বহুকণ্ঠের আওয়াজ ! সনকা আসবে না। মা উঠোন ঝাঁট দিতে চাইছিলেন, আমিও চাইছি --এই নিয়ে মা-ব্যাটায় দ্বন্দ্ব চলছিল। থেমে গেল। দুজনেই ভয়-চকিত। অনড় দাঁড়িয়ে উঠানে। বেরোতে চাইছিলাম, মা ধরে রইলেন। আবারও উন্মত্ত চিৎকার, 'সব্বনাশ, সব্বনাশ', 'মরে গেল রে, মেরে দিয়েছে রে' -- বিকট, উৎকট সব মারণ রব ভেসে আসছে !  আমি বাইরে যাবার জন্য যতই ছটফট করছি মা ততই আমাকে দুই হাত দিয়ে টেনে নিয়ে আসতে চাইছে ঘরে।
একি ! দুটো ছোট ছোট, বছর সাত আট হবে, উলঙ্গ শিশুকে নিয়ে বলাইয়ের মা উন্মাদিনীর মতো ঢুকে পড়ল।
-- ও দিদি, দিদি গো, ঘরের ভিতরে চল গো। ও বাবু, বাবুরে, বাইরে যেয়ো না, দরজা বন্ধ করে দাও। আজ যে কি হবে, আরো মানুষ মরবে, গাঁ জ্বলবে !
-- হয়েছে কি, সেকথা তো বলবে !
মায়ের ধমক খেয়ে মাটিতেই বসে গেল বিমলা মাসি, বলাইয়ের মা। হাতের ইঙ্গিতে দেখালো 'জল দাও' ।  ঘটিভর্তি জল গলায় ঢেলে মাসি যা বলে গেল তা বিশ্বাস অবিশ্বাসের সীমাছাড়া, 

 
-- বলো না দিদি কাওকে। মাঝ রাতে তো চলে গেল সনকা আর খোঁড়া। সেটিও ভয়ের, চিন্তার। এবারে যা হোল, শুন,
তখনো ভুরকা তারা (ভোরের তারা) ডুবে নাই। 'হাম্বা হাম্বা' ডাক। আমরা উঠে দেখি, ওই বেপাত্তা বকুল সনকার উঠানে দাঁড়ানো, হামালছে একনাগাড়ে, আর তার পেছনেই শম্ভু। সে পা দিয়ে মাটি খুঁড়ছে -- পাগলা ষাঁড় যেমন করে। পাড়ার বেবাক লোক এসে হাজির। এসে দেখে ঘর খাঁ খাঁ। ঘরের দুয়ারে আগুড় ঠেসানো। সনকা, খোঁড়া নাই।
চৌকিদার এলো। রায়দের খবর দিতে গেল। অকা তার দলবল নিয়ে, হাতে লম্বা ছড়ি ঘুরাতে ঘুরাতে এসে দাঁড়াল। খুব জোরে জোরে বকতে থাকল। 'শালা ঠিক বেচেছিল, ভয়ে ফিরিয়ে এনেছে। কোথা পালাবে শালা। হয় মরাব, নয় জেলের ভাত খাওয়াব। আসছে আজ  দারোগা।'
এই সব বলতে বলতে ছড়িতে সাঁই সাঁই শব্দ করে বকনটিকে মারতে যায়। সবাই একসাথে চেঁচাতে লাগলো, 'যাবে নাই, যাবে নাই। ষাঁড় ক্ষেপে আছে। বকনা এখানেই থাক্, এখন ঘরে তাকে নিয়ে যেয়ো না। খোড়াকে নিয়ে আসো, ও ঠিক সামলাবে।'

শুনল না অকা। যেই বকনাটাকে এক ছড়ি মেরেছে অমনি শম্ভু খরিষ সাপের মতন ফুঁসতে ফুঁসতে তেড়ে  গেল ! ....ও মা গো, চোখে দেখা যায় না গো ! ওই শাবলের মতন সিং.. ফুঁড়ে দিল গো, ফেড়ে দিয়েছে গো ! বুক পেট ফাঁক করে দিল যে গো ! রক্তে রক্তে উঠান ভিজে গেল গো ! ওই দেখ, লোকেরা সবাই ছুটছে। কে কোথা যাবে জানে না। ছোট ছোট ছেলে পুলে ভয়ে কাঁপছে, হাঁও মাঁও কাঁদছে ! যদি খোঁড়া থাকত এমন বিপদ হোত নাই গো !
কি হবে দিদি? আমাদের ঘর পুড়বে, আমাদের মানুষ মরবে, আমাদেরকেও গাঁ ছাড়া হতে হবে গো দিদি !
আমার মাও মাথায় দুই হাত রেখে বসে পড়লেন বিমলা মাসির সামনে, বার বার শুধু একই কথা বলে গেলেন,
--- অক্রূর, একি করলে তুমি বাবা ! কেন খোঁড়াকে শাস্তি দিলে ? সে যে দেবতার চাইতেও ভালো মানুষ ! সে থাকলে শম্ভুকে ঠিক বশে রাখতো। 

আমি এই ঘটনার একটি উপমা খুঁজতে চেষ্টা করলাম ; কিন্তু বৃথাই !

দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
০৬-০৬-২০২২
শিলিগুড়ি।     
_____________________________________________















































শনিবার, ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৩

চরণ রেখা তব

চরণ রেখা তব 


(ঝরা ফুলের স্মৃতি)  


বহুশ্রুত এই রবীন্দ্রসঙ্গীতটি নিয়ে দু-চার কথা  বলবার  ইচ্ছা চেপে রাখতে পারলাম না। একে তো  সমস্ত রবীন্দ্রসঙ্গীতই বিশ্বসাহিত্যের শ্রেষ্ঠতম  গীতিকবিতা, তার উপর এমনিধারার কয়েকটি গান  সাহিত্য ও সঙ্গীত জগতের অপার্থিব সৃষ্টি।  আকাশের  নক্ষত্রের মতো চিরজ্যোতির্ময়। এই  গানটি প্রকৃতি পর্যায়ের। রচিত হয়েছিল ৩রা মার্চ,  ১৯২৭। ফুলের আগুন-লাগা ফাগুনে, সম্ভবত ১৯শে  ফাল্গুন। কবির  বয়স তখন তিন কুড়ি ছয়।  আমাদের  চোখে কবির বয়স বাড়েও নি, আবার  কমেও নি কোন কালেই। কেনই বা বাড়বে ? তিনি যে অখিলরসামৃতসিন্ধু। ওই শুভ্র শ্মশ্রুগুম্ফশোভিত মুখশ্রীমায়া, ওই আকর্ণপুরিত  চিরপ্রসন্ন চোখের আকাশগহন দৃষ্টি, ওই আ-চরণ  প্রলম্বিত জোব্বা আমাদের অন্তরাকাশে, রবিকরোজ্বোল শরতের মেঘাস্তরণের মতো এমনই দীপ্তিমান হয়ে আছে যে তাঁর কৈশোর কালের তাঁর যৌবন কালের গন্ধর্বনিন্দিত রূপ স্মরণেই আসে না। 
যাই হোক্, এই ছেষট্টি বসন্তের 'বসন্তসখা' গাইলেন  ওই গান। সম্পূর্ণ গানটি এই রকম --- 

"চরণ রেখা তব যে পথে দিলে লিখি  
চিহ্ন আজি তারি আপনি ঘুচালে কি।। 
অশোক রেণুগুলি  রাঙালো যার ধূলি  
তারে যে তৃণতলে আজিকে লীন দেখি।। 
ফুরায় ফুল -ফোটা,পাখীও গান ভোলে, 
দক্ষিণ বায়ু সেও উদাসী যায় চলে।। 
তবু কি ভরি তারে অমৃত ছিল না রে --- 
স্মরণ তারো কি গো মরণে যাবে ঠেকি।।" 

গানটির আঙ্গিক রবীন্দ্রনাথের সঙ্গীত রচনা  বৈশিষ্ট্যের পূর্ণ রূপ পেয়েছে। চারটি 'তুক' চারটি  কলি  (যুগল বাক্য)-তে বিভক্ত। আস্থায়ী, অন্তরা,  সঞ্চারী, আভোগ। "তুই ফেলে এসেছিস কারে"-এই  রকমের গানের মত একাধিক অন্তরা এ গানে নেই।  আটখানি পংক্তি, প্রতি পংক্তিতে দৌদ্দটি অক্ষর  (যুক্ত বা একক বর্ণের)। স্বরলিপি করেছেন দীনেন্দ্র  নাথ ঠাকুর। গানটি ভৈরবী রাগাশ্রয়ী এবং তাল  দাদরা। এই গান রবীন্দ্রসঙ্গীত সাধনায় মগ্নচিত্ত  শিল্পীদের কণ্ঠে আমরা শুনেছি। অনিতা সেন,  রাজশ্রী দত্ত, কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়, সুচিত্রা মিত্র,  সাগর সেন, অরবিন্দ বিশ্বাস, চিন্ময় চট্টোপাধ্যায়--  এমনই আরও কত। কিন্তু তবুও, যাঁর কণ্ঠে এই  গানটি  বাঙলার আকাশে বাতাসে সুধারসধারা  সিঞ্চন করে চলেছে দশকের পর দশক ধরে তিনি  আমাদের হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। আপনারা শুনেছেন,  আবারো শুনবেন আজীবন। 
এ গান ভৈরবী রাগে আশ্রিত হলেও আস্থায়ীর প্রথম  সু্র আমাদের বিস্মিত করে দেয়, দ্বিধান্বিত করে  রাখে। সুরের মূর্ছনায় এমনি বিহ্বলতা সৃষ্টি করে যে  মনে সুখের 'দুঃখবিলাস' জেগে ওঠে। শুদ্ধ স্বরের  চলনে অকস্মাৎ 'তীব্র মধ্যমের' ছোঁওয়া। তখন 'যে  পথে দিলে লিখি' -- 'দিলে' --- কাল নির্বাচনে যদি  অতীত কাল হয়, এমনকি পুরাঘটিত বর্তমানও হয়  তবে তো শ্রোতার কাছে সাংঘাতিক ! আর তা সত্যও।   
পরের অন্তরা এবং সঞ্চারীতে একই রকম কী-যেন-  হারানোর বেদনা ! পথে তোমার চরণচিহ্ন কোথায় ?  পথের যে ধূলিকণাগুলি অশোকরেণুর আলপনায়  রঙিন হয়ে উঠেছিল তারা দেখি আজ তৃণাস্তরণে  ঢাকা। ফুল-ফোটার প্রহর হোল কি শেষ ? পাখীরা  ভুলে গেল গান গাওয়া ? দখিনা বাতাস উদাস বাউল  হয়ে গেল হঠাৎই ! 

আমাদের এই মর্ত্যজীবনের সর্বব্যপ্ত অর্থহীনতার, হারিয়ে-ফেলার রবীন্দ্রনাথসুলভ রূপকল্পগুলি, কল্পচিত্রগুলি প্রভাতী বৈতালিকে 'ইমন বা মাড়োয়ার' ঔদাসীন্যভরা বেদনাবোধের বা নিরাসক্তি-র আবেশ সৃষ্টি করে না কি ? বসন্ত তো কবির প্রিয়তম ঋতু, তাঁর জীবনের  চিরদিনের 'রাজা'। তবে কেন এই মাঝ ফাল্গুনে যখন "বাজায়ে ব্যাকুল বেণু, মেখে পিয়াল ফুলের রেণু " সগৌরবে, সুরে সৌন্দর্যে সৌরভে তার আসবার  কথা, মঞ্জরিত শালতরুনিকুঞ্জে নৃত্য করবার কথা,  তখন তার অকাল অন্তর্হিত হবার কারণই বা কি ?  নাকি 'বসন্ত'ই হারিয়ে গেল কবির জীবন থেকে।  তাও তো সত্যি নয়। "শেষের কবিতা"-র দিন তো এখনো অনাগত। আসলে ১৯১৯ সাল থেকে ১৯৩০  সাল, এই সময় কালটি, যা আমরা আরেক  নোবেলজয়ী সাহিত্যিক, সুইজারল্যান্ড প্রবাসী রোমা  রঁলার সঙ্গে কবির চিঠি পত্র আদান-প্রদানের মধ্য  দিয়ে জানতে পারি, তাঁর (রবীন্দ্রনাথের) কাছে ছিল  বিশ্ব সভ্যতার সঙ্কটের কাল, নিষ্ঠুর রাষ্ট্র ক্ষমতার কাছে উদার মানবতাবোধের পরাভবের রক্তরাঙা সান্ধ্য দুঃসময়। 

মহাজীবনের সেই দীর্ঘ ইতিবৃত্ত আজ এখানে থাক্ ;  শুধু বলি ওই কালখণ্ডটির অসহ বেদনাবোধ  আমাদের আলোচিত সঙ্গীতটির সু্রে প্রচ্ছন্ন আছে।  কিন্তু আভোগ-য়ে এসে একটি সকৃতজ্ঞ প্রশ্ন, তবু কি  "ভরি তারে অমৃত ছিল না রে" - পাঠক বা শ্রোতাকে  আবিষ্ট করে দেয়, প্রকৃতির প্রতি প্রেমে মুগ্ধ করে  রাখে। উত্তর প্রৌঢ়কাল পর্যন্ত প্রকৃতির কাছ থেকে  যে  অমৃতরস তিনি আস্বাদন করেছেন সেই স্মৃতিও  কি "মরণে যাবে ঠেকি ?" এমন এটটি সুধাসিক্ত  অথচ  চিত্ত-আকুল-করা বাণী রবীন্দ্রনাথের অমর্ত্য  লেখনীই লিখে দিয়ে যেতে পারেন। অবর্ণনীয় ! শুধু  অনুভবের, শুধু হৃদয়ে সঞ্চয়ণের। 

এবার আসি প্রকৃতি পর্যায়ের এই গীতিকবিতাটির  কাব্যসুষমায়। প্রতিটি শব্দের কী অপার ব‌্যঞ্জনা, কী  মোহিনী মায়া ! চরণ রেখা এঁকে দিয়ে নয়, 'লিখে'  দিয়ে বিদায় নিল যে বসন্ত তার লিখন লীন হয়ে  রইল  'তৃণতলে' ; কিন্তু চির অমলিন হয়ে রয়ে গেল  মহাকালের শাশ্বত কাব্যের পত্রপুটে। 

(এই গানটির উপর সঙ্গীতজ্ঞ ও সঙ্গীত আলোচকদের  আলোচনা এবং সমালোচনা প্রার্থনা করি।) 

দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় 
১৬/০৯/২০২৩ 
ব্যাঙ্গালোর। 















সোমবার, ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৩

শাশ্বত প্রেম

শাশ্বত প্রেম 


আজ আমার পাঠকদের বিশ্বসাহিত্যের শরৎ প্রভাতের তৃণদলশীর্ষে সূর্যকরোজ্বল শিশিরকণার মত একটি কাব্যকণা উপহার দিতে চাই। উচ্চতর বিদ্যালয়ের ছাত্রমাত্রেই ইউরোপীয় নবজাগরণের ইতিহাস পড়েছেন এবং ইতালীয় শিল্পী সাহিত্যিকদের নামও জেনেছেন। তাঁদেরই একজন পেত্রার্কা, যাঁর 'সনেট' অনুসরণে আমাদের মধুকবি (মাইকেল মধুসূদন দত্ত) বাঙলায় চতুর্দশপদী কবিতা সৃষ্টি করে গিয়েছেন।

Francesco Petrarch, the poet is famous for his Sonnets. One of his Sonnets goes ---
(Sonnet xv, translated in English by Charlotte Smith.)

Where the green leaves exclude the summer beam,
And softly bend as balmy breezes blow,
And where, with liquid lapse, the lucid stream,
Across the fratted rock is heard to flow,
Pensive l lay : when she whom Earth conceals,
As if still living, to my eyes appears,
And piling Heaven her Angel from reveals,
To say -- Unhappy Petrarch, dry your tears.

Ah ! Why sad lover ! Thus before your time,
In grief and sadness should you life decay,
And like a blighted flower, your manly prime
In vain and hopeless sorrow fade away ?
Ah ! Yield not thus to culpable despair. 
But rise thine to heaven, and think I wait thee there.

মৎকৃত বাঙলা অনুবাদ --

             শাশ্বত প্রেম

মলয় বাতাসে তরুশাখাগুঋলি আনত রয়েছে যেখানে,
ঘনপল্লবে সূর্যের আলো উঁকি দিয়ে যায় সেখানে।
ক্ষীণধারা এক তটিনী চলেছে পাষাণের বুকে গেয়ে গান --
বিষাদমগ্ন আমার 'আমিটা' শুয়ে আছে সেথা মৃতপ্রাণ।
এ ধরণী যারে লুকায়ে রেখেছে আমার চোখে সে অ-মরা ;
হঠাৎ এখানে শুনি তার গান -- যদিও রয়েছে অধরা।
দেবদূতদের মায়ামেঘ ছিঁড়ে আসে তার বাণী করুণার, 
"নয়নের জল মুছে ফেল কবি, নাই প্রয়োজন কান্নার।"

বন্ধু আমার, বিষন্ন কুসুম, খেদ-ক্ষয় কেন জীবনে ?
আছে পৌরুষ, প্রবল শৌর্য, আমারে রেখেছ স্মরণে।
আলোকোজ্জ্বল অমর্ত্যধাম নিরাশার নিরালোক নাই,  
বিরহবিহীন দুখনিশাহীন চিরমিলনের সুখঠাঁই।
হে প্রিয়তম, মরণের পায়ে অর্ঘ্য দিওনা নিজেরে,
তোমারই তো আমি প্রতীক্ষায় আছি দাঁড়ায়ে স্বর্গ দুয়ারে। 


(এ কথা মনে রেখে পাঠ করতে হবে যে পেত্রার্কা চতুর্দশ শতকের কবি। 

তাঁর কবিতাগুলি রচিত হয়েছে আজ থেকে ন'শ বছর আগে।)

দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
১০/০৯/ ২০২৩
ব্যাঙ্গালোর।





রবিবার, ১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৩

কবিতা দিবস




কবিতা  দিবস 


সভ্যতার বর্জ্য বয়ে অকাল মরণ হতে বাঁচার প্রয়াস।

আজ নাকি কবিতার দিন ? 
তবে তাই হোক্, হৃদয় নিকুঞ্জে সমাসীন 
থাকো তুমি 'কবিতা কল্পনালতা,' একান্ত গোপনে। 
শুধু তুমি আর আমি -- সৃষ্টি হোক্ লয়, 
মসীকৃষ্ণ অন্ধকারে নামুক প্রলয়। 
 যদি পাপ নৃত্য করে প্রদীপ্ত আলোয়, 
পুন্য যদি ঢাকে মুখ নিশার কালোয়, 
যদি প্রেম রক্তসিক্ত নিষ্ঠুর ধর্ষনে, 
যদি সুর ভ্রষ্ট হয় দানব গর্জনে, 
শ্যামলিমা দগ্ধ হয় লালসা শিখায়, 
সভ্যতার ধূমকেতু জ্বলে নিলীমায় -- 
তবে কেন খুঁজে ফিরি আপনার জন, 
আত্মার আত্মীয় প্রাণ বন্ধু স্বজন ? 

আত্মনির্বাসনে থাকি আপন অন্তরে, 
নিভৃত নিলয়ে -- স্বপ্নময় নির্জন কুটীরে, 
তুমি আর আমি -- ছন্দোবদ্ধ গীতে আলাপন। 
সাজাবো সেই আগামীর স্বপ্নের ভূবন 
যেখানে আকাশে আকাশই হবে বাতাসে বাতাস, 
দিগন্ত বিস্তারী দৃষ্টি, বুকভরা শ্বাস। 
লুঠেরার আস্ফালন, লুন্ঠিতের হাহাকার রব, 
বিলাসের অপব্যয়, হিংসার জিঘাংসায় পুঞ্জীভূত শব, 
ছলনার কাষ্ঠহাসি, চৌর্যের ছদ্মবেশে সাধুতার মায়া, 
দহনের জ্বালা ঢাকে মেঘরূপী চিতাধূম ছায়া, 
'সভ্যতার' বর্জ্য বয়ে, অকাল মরণ হতে বাঁচার প্রয়াস, 
'স্বর্গরাজ্য আসে ওই',-- উচ্চনাদী নিয়ত আশ্বাস -- 
ডাকিনীর এই হাতছানি, আলেয়ার দিশাহারী শিখা-- 
রেখোনা রেখোনা প্রিয়া, আমদের নূতন জগতে। 

শুধু সুখ--তাও চাইবনা, নিয়তির দেওয়া দুখ, তাও থাক্ সাথে ; 
বিরহের বিষাদ থাক্, অপূর্ণ প্রত্যাশা থাক্ মিলনের। 
কিন্তু যেন পাই রাশি রাশি হাসি মুখ সুন্দর শিশুর, 
যৌবনের নিঃস্বার্থ গরীমা, বার্ধক্যের কণ্ঠভরা ভৈরবীর সুর। 
কবিতা, প্রেমের আরাধ্যা দেবী, তোমার সঙ্গীতে 
কল্পনার স্বর্গ হবে গড়া ছন্দে লয়ে তানে, নব নব বাণীর ভঙ্গিতে। 

দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
২১/০৩/২০২৩ 









মঙ্গলবার, ৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৩

আনন্দ


আনন্দ 

আনন্দধারা বহিছে ভুবনে  


সূচনা

কলা বিদ্যায় আমরা মুখ্যত নবরসের অভিব্যক্তি লক্ষ্য করে থাকি। শৃঙ্গার, বীর, করুণ, অদ্ভুত, ভয়ানক, বীভৎস রৌদ্র ও হাস্য। বাৎসল্য যোগ করলে দশটি। তাহলে "আনন্দধারা বহিছে ভুবনে" -- রবীন্দ্রনাথের এই মহাভাবের একটি গীতিকবিতার প্রথম বাক্যটি যখন আলোচনার বা একটি রচনার বিষয় নির্ধারিত হয় তখন সেই রচনাকে কোন্ 'রসাশ্রিত' বলে আলোচনায় অগ্রসর হওয়া যায় ? এখানে হাস্যরসের সীমাবদ্ধতায় ওই মহাবাণীর অন্তর-নিঃসৃত ব্যঞ্জনাটি অধরাই থেকে যাবে। এবং সে জন্যই আমাদের এই গীতিকবিতাটির কথা আপাতত ভুলে শুধুমাত্র বাক্যটির  আক্ষরিক ও আলঙ্কারিক অর্থটি রচনার বিষয়বস্তুরূপে চিহ্নিত করাই শ্রেয় ; কেননা এই রবীন্দ্রসঙ্গীতটি গ্রহণ করা হলে আমাদের চেতনা রবীন্দ্রনাথের 'আনন্দবাদেই' এমন সমাচ্ছন্ন হয়ে যাবে যে 'আনন্দ' শব্দটি নিয়ে লেখা রবীন্দ্র রচনাবলীর অসংখ্য উদাহরণ শরৎকালের সূর্যকরোজ্বল খণ্ড খণ্ড জ্যোতির্ময় মেঘের মতই চিত্তাকাশে ভেসে ভেসে উঠবে। অবশ্য তাঁর থেকে নিষ্কৃতি পাওয়া সুকঠিন হবে জেনেও আমরা এই 'আনন্দধারার' উৎসে যাবার চেষ্টা করি।
এক

তৈত্তিরীয় উপনিষদ এই সত্য ঘোষণা করছেন যে
"আনন্দো ব্রহ্মেতি ব্যজনাৎ। আনন্দাদ্ধ্যেব খল্বিমানি ভূতানি জায়ন্তে। আনন্দেন জাতানি জীবন্তিঃ। আনন্দং প্রযন্তাভিসংবিশন্তীতি।।"
আনন্দই ব্রহ্ম, আনন্দ হতেই এই সকল ভূতগণ জন্মলাভ করে, আনন্দ দ্বারাই বর্ধিত হয়, এবং শেষে আনন্দেই প্রতিগমন করে।
শুধু মানুষ নয়, এই বিশ্বচরাচরের সমস্ত প্রাণ, এমনকি অপ্রাণও এক বিরাট, বিপুল, নিরন্তর চলমান আনন্দধারায় সমুদ্ভুত হয়ে, চির বহমানতার তরঙ্গস্রোতে ধাবিত হয়ে, পরিশেষে অসীম আনন্দসাগরে বিলীন হয়ে যায়।
তাই যদি নাই হোত তবে, জীব কি বাঁচার প্রেরণা পেত ?
উপনিষদ আবারও বলছেন,
"যদ্বৈ তৎ সুকৃতম্। রসো বৈ সঃ। রসং লব্ধ্বাহ আনন্দী ভবতি। কো হ্যেবানাৎ কঃ প্রাণাৎ। যদেষ আকাশ আনন্দো নস্যাৎ। এন হ্যেবাহহনন্দয়তি।।"
সুকৃতরূপে তিনি (ব্রহ্ম) আনন্দস্বরূপ। এই আনন্দস্বরূপকে যিনি লাভ করেছেন তিনি আনন্দমগ্ন, তিনি সুখী। আমাদের অন্তরের আত্মাই আনন্দের উৎস। এই আনন্দ না থাকলে কেউ কি বাঁচতে চাইত, একটি নিঃশ্বাসও কেউ গ্রহণ করত ?

এই হোল 'আনন্দধারা বহিছে ভূবনে' বাণীর যথার্থ অভিব্যক্তি। ভারতবর্ষের সুদূর অতীতে, তপোবন আশ্রমে, জ্ঞানতাপস মহর্ষিদের ধ্যানে লব্ধ, জীবনাচরণে উপলব্ধ এবং অনুশীলীত এই বোধ আমাদের জৈবিক ও বাস্তব জীবনে গ্রহণ করা দুরূহ ; অসম্ভব বলেই মনে হয়। কেননা সাধারণভাবে আমার কামনার বস্তুগুলি আহরণ ও সম্ভোগের মধ্যেই আনন্দ খুঁজি। ইন্দ্রিয়গুলির (কর্মেন্দ্রিয়, জ্ঞানেন্দ্রিয় এমনকি অন্তরিন্দ্রিও) মধ্যদিয়ে জৈবিক প্রবৃত্তির নিবৃত্তি লাভের প্রচেষ্টায় ও সফলতায় আমাদের আনন্দ। এই প্রবৃত্তি বা বাসনা বাধাপ্রাপ্ত হলে, অপূর্ণ থাকলে আনন্দ লুপ্ত হয়ে যায়। পরিবর্তে নিরানন্দ ঘিরে ধরে, বাঁচার ইচ্ছাটিকে নিরুৎসাহিত করে তোলে।
জরা, ব্যধি, মত্যু -- জীবনের অবধারিত এই পরিণাম থেকে তো নিস্কৃতি পাওয়ার উপায়ও নাই। তারপর আছে আধিভৌতিক, আধিদৈবিক, আধ্যাত্মিক বিপর্যয়। তাই শোক, দুঃখ, যন্ত্রণা, বিষাদ জীবনের নিত্য দিনের সঙ্গী ; কত যে পরাভব, কত অপূর্ণতা।
প্রাচীন গ্রীসের মহান তিন নাট্যকার ইউরিপিদিস, এসকাইলাস, সোফোক্লিস। তাঁদের বিয়োগান্তক নাটকগুলিতে (Tragedies) মানবজীবনের যে পরিণাম দৃশ্যগ্রাহ্য এবং অনুভবগম্য করে দিয়েছেন সেখানে তো নিষ্প্রশ্ন দুঃখবাদই (Pessimism) প্রতিষ্ঠিত ; এমনকি 'Catharsis'-য়েরও অবকাশ নেই। অস্কার ওয়াইল্ড তাঁর একটি কবিতায় ইউরিপিদিসকে বলেছেন, "প্রশস্ত অশ্রুনদী''। ইউরিপিদিস নিজেও তাঁর সৃজনধ্যানে স্বীকার করেছেন, "জীবনে কেউ সুখী নয়, ইহাই ট্রাজেডি (tragedy)."
পাশ্চাত্যের গ্রীক, হিব্রু, রোমান সাহিত্যে, দর্শনে, ধর্মধারণায় এবং শিল্পকলাতেও নৈরাশ্যবাদ যে কী পরিব্যপ্তভাবে ছেয়ে আছে তা সাহিত্য ও দর্শনের পাঠকমাত্রই জানেন। সম্পূর্ণ অস্বীকারও করা যায় না। নগন্যতম মানুষও বিপুল সম্ভাবনা নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। অথচ বিরাট সে সম্ভাবনার ভগ্নাংশের ভগ্নাংশ মাত্র রূপায়িত হয় তার অক্ষম সাধনায়, এবং অবন্ধু প্রাকৃতিক ও মানবিক পরিবেশে। শেষের দিকটায় মনে হয়, Life is an encounter with Nothingness.
"হতাশার ভিড় যেন আর না বাড়ে,
ছাই হয়ে যাবে যে স্বাদুতা আমার --
বিফল প্রয়াসে এখনো রয়েছে তা।"
                                           ----------- গালিব।
ঠিক এখানেই 'আনন্দধারা বহিছে ভুবনে' বাণীর উদ্ঘোষণা। জীবন সংগ্রামের সমস্ত ক্ষয় ক্ষত ক্ষতিকে তুচ্ছাতিতুচ্ছ ভেবে উপেক্ষা করবার মন্ত্র আমরা লাভ করেছি আমাদের পূর্বপুরুষদের --- ব্যাস, বাল্মীকি, বশিষ্ঠ, যাজ্ঞবল্ক প্রভৃতি মহান ঋষি ; গার্গী, মৈত্রেয়ী, অরুন্ধতী প্রভৃতি মহতী বিদুষীগণের কাছ থেকে, জন্ম জন্মান্তরের সুকৃতির ফলে। আমরা তাঁদেরই সন্ততি। ছান্দোগ্য উপনিষদে আমরা পরিচিত হয়েছি সত্যকাম, শ্বেতকেতু ও নারদ ঋষির মতো সুগভীর সত্যানুসন্ধিৎসুদের সঙ্গে, এবং আরুণি, সনৎ কুমার ও প্রজাপতির মতো শ্রেষ্ঠ আত্মবিদ্ আচার্যগণের সঙ্গে। গুরু শিষ্যের কথপোকথনের মাধ্যমে এই উপনিষদ্ আমাদের সৎ স্বরূপকে সৃষ্টির আপেক্ষিক বিকার থেকে পৃথক করতে শিখিয়েছেন। এতে গভীর আধ্যাত্মিক ও দার্শনিক তাৎপর্যপূর্ণ মহাবাক্য চতুষ্টয়ের অন্যতম --তৎ ত্বম্ অসি" -"তুমিই সেই"-- বাক্যটিতে সঙ্গীতের ধুয়ার মতো মানবের দেবত্ব কীর্তিত হয়েছে।
এতে জীবনের গভীর দুঃখগুলির নিবৃত্তির জন্য মানবের জন্মগত দেবত্ব জ্ঞানের উপদেশ দেওয়া হয়েছেঃ  "তরতি শোকম্ আত্মবিৎ। " আপন সত্তাকে, আপন অন্তরাত্মাকে যিনি সম্যকরূপে জেনেছেন, যিনি আপন জীবাত্মাকে স্রষ্টা পরমাত্মার সঙ্গে 'এক' করে ভাবতে পেরেছেন তিনি 'আত্মবিৎ' এবং তিনি জীবনের সমস্ত প্রকারের শোক দুঃখ যন্ত্রণা থেকে মুক্ত হয়ে চির আনন্দে আত্মস্থ হতে পারেন।
কিন্তু জীবনে ও জগতে এরূপ আনন্দ লাভ তো মহাজ্ঞানী, মহাসাধকদের ধ্যানলব্ধ। আমাদের মতো সাধারণ মানুষের আনন্দ লাভের উপায় কি ? এখানেই জীবাত্মা ও পরমাত্মার ভাবনা, দ্বৈত এবং দ্বৈতাদ্বৈত দর্শন। পরমাত্মা হলেন সাধকের কাছে ব্রহ্ম আর সাধারণ্যে তিনি ঈশ্বর বা ভগবান। এই ঈশ্বর বা ভগবান, তাঁকে স্বীকার করলে, আমার আমিত্বের অহং উৎসর্গ করলে চরাচর-প্লাবিত পরমানন্দ --- এই বিরাট সৃষ্টির অপরিমেয় রূপ এবং রসের ভোক্তা এই জীবাত্মা, এই আমি। আমার কাজ তাঁকে জানা, তাঁর 'চরণে' আত্মনিবেদন।
"তদ্বিজ্ঞানেন পরিপশ্যন্তি ধীরা।
আনন্দরূপম্ অমৃতং যদ্বিভাতি।।" 

দুই

এই দ্যুলোক ভূলোক পরিব্যপ্ত 'বিশ্বরূপ' - য়ের নিকট সম্পূর্ণ আত্মনিবেদনের একমাত্র শর্ত প্রেম। আর প্রেম যখন আসে তখন জোয়ারের জলতরঙ্গের মত আমাদের জীবন-নদীর সকল মালিন্য, আত্মপর ভেদ ধুয়ে দিয়ে যায়। একটি অতিমানবীয় ভালোবাসার বোধ জাগে, ভালোবাসার দৃষ্টি দিয়ে জগতের রূপ দেখতে পাই। আর এই সৃষ্টির যিনি স্রষ্টা, যিনি নিয়ন্তা, তাঁকে পাবার, তাঁর সঙ্গে একটি মধুর সম্পর্ক স্থাপন করবার জন্য দেহ মন চিত্ত ব্যাকুল হয়ে ওঠে। সমস্ত অন্তঃকরণ জুড়ে সেই প্রেমময়ের উপস্থিতি।
জগতের সঙ্গে প্রেমের যোগ সাধিত হলেই আনন্দ।  তখন আমার ক্ষুদ্র আমিত্বের বিনাশ ; বৃহতের মধ্যে 'আমি'র মুক্তি।
এবার আবার সেই বিশ্বাত্মা বিশ্বকবির ওই মহাবাণীর শেষ কথাগুলি অপরিহার্য হয়ে উঠলো, 
"চারিদিকে দেখ চাহি হৃদয় প্রসারি,
ক্ষুদ্র দুঃখ সব তুচ্ছ মানি 
প্রেম ভরিয়া লহ শূন্য জীবনে।। 
আনন্দধারা বহিছে ভুবনে.." 

ওই যে কথা আরম্ভের প্রথম উচ্চারণে রসের প্রসঙ্গ এসেছে তাই আনন্দ এবং এই জীবনে লাভ করবার যে আমিত্ব-মোহশূণ্য বাসনার নামই প্রেম। পাশ্চাত্যের বস্তুবাদী দর্শনে এমন নিষ্কামনার প্রেমের তেমন উচ্চমার্গীয় 'মীমাংসা' না থাকলেও পাশ্চাত্য সাহিত্যর রোমান্টিক অভিব্যক্তির মধ্যে বিমল আনন্দরসের নিঃসরণ আমরা পেয়েছি। কবি Wordsworth, Shelley, John Keats, Lord Tennyson এবং জার্মান মহাকবি Goethe -র কাব্য সম্ভারে বিষাদ ও বিরহের মধ্যেও আনন্দরসের ফল্গুধারা পরিদৃশ্যমান। এই যে বেদনার অভ্যন্তরে আনন্দবোধ এইটি রবীন্দ্রনাথ তাঁর উপনিষদীয় প্রজ্ঞার আলোকে অনুভব করেছেন এবং তার সাহিত্য দর্শনে সত্যরূপে, শাশ্বতরূপে, সুন্দররূপে প্রতিষ্ঠা করেছেন।
পরিশেষে তাঁরই কথা লিখে এই কথকথা শেষ করি,
"আনন্দ আজ কিসের ছলে
কাঁদিতে চায় নয়নজলে,
বিরহ আজ মধুর হয়ে 
করেছে প্রাণ ভোর।" 

                   সমাপ্ত
_____________________________________________



শনিবার, ২ সেপ্টেম্বর, ২০২৩

বেতো মাস্টার

বেতো মাস্টার

টাড়রা-মোহনপুর গ্রাম। পশ্চিম বর্ধমানের একেবারে প্রান্ত অঞ্চলে, যেখানে চিত্তরঞ্জন রেলইঞ্জিন কারখানা গড়ে উঠেছে, তারও পরে পূর্বমুখী অজয় নদের উত্তর পাড়ের এই জনবসতি। উপরোক্ত দুটি গ্রাম ভিন্ন ভিন্ন হলেও দুই গ্রামের রাস্তা, কুঁয়ো-পুকুর, মাঠঘাট, খেলার মাঠ, কালিমন্দির , চণ্ডীমণ্ডপ -- সকল কিছুই এমনভাবে সর্বজনীন যে লোকে একবাক্যে, একসঙ্গে দু-গ্রামের নাম উচ্চারণ করে। এই অঞ্চল বিহার প্রদেশের অন্তর্ভুক্ত ছিল, এখন ঝাড়খণ্ডের।
আজ থেকে ষাট পঁয়ষট্টি বছর আগে এই গ্রামদেশ ছিল বনজঙ্গলে ঢাকা। যানবাহন বলতে পা দুটো আর গরু বা  মোষের গাড়ি। শিক্ষার ব্যবস্থা ছিল আশেপাশের পাঁচ গাঁয়ের একটি পাঠশালায়। দূর কোন বর্ধিষ্ণু পল্লী থেকে বা শহর থেকে একটি 'মাষ্টার' আসতেন, পড়াতেন। মেয়েদের পড়াশোনা কল্পনাতেও আনতো না কেও। শিশু কিশোর ছেলেরাই যেতো সেই পাঠশালায়। বই পত্তর বলতে বর্ণ পরিচয় প্রথম ভাগ, দ্বিতীয় ভাগ, একটি ধারাপাত, কোণা ভাঙা, তেলচিটে শ্লেট, ছোট ছোট টুকরা টুকরো খড়ি পেনসিল --- এই সমস্ত একখণ্ড ছেঁড়া চটে মুড়িয়ে এ-গ্রাম, ও-গ্রামের গোটা বিশেক ছেলে আমরা, সকালের জলখাবার খেয়ে হাজির হোতাম ঐ ছাত-ফাটা কাছারি ঘরের উঠোনে। মাস্টার যেদিন আসতেন সেদিন দুপুর পর্যন্ত থাকা, নইলে আম জাম পেয়ারা, যখন যেটা ফলে সেই বাগানের দিকে দৌড়। মাঝে মাঝে
মাসাবধিকাল আসতেনই না মাস্টার।
আমার আজ বেশ মনে পড়ে, সেটা ছিল শীতের সময়। সন্ধ্যাবেলায় ঘরে ফিরে খবর পেলাম দেশের ঘর থেকে মাস্টার ফিরে এসেছেন। কাল থেকে আবার পাঠশালায় যেতে হবে। রবিবার বা ছুটির দিন এসব ব্যাপার ছিল না।
তা, পরের দিন যথাসময়ে পাঠশালায় আমরা হাজির। বেতো মাস্টার (বাত নয়, তাঁর হাতে থাকতো এক লিকলিকে বেতের ছড়ি) আমাদের বললেন,
--- শোন্ তোরা, আজ একটি বিশেষ দিন, প্রজাতন্ত্র দিবস। আমি যা বলছি, মন দিয়ে শুনবি।
এরপর তিনি যে সব কথা বলতে আরম্ভ করলেন সে কথাগুলি আমরা আগে কোন দিন শুনিনি। ভারতবর্ষ, বিদেশি শাসন, স্বাধীনতা যুদ্ধ, স্বাধীনতা লাভ --- এমনি কত কথা তিনি বলেই গেলেন বহুক্ষণ ধরে। আর শেষে বললেন,
---  এতসব জানতে হলে এখানকার এই গ্রামের পাঠশালায় হবে না। শহরে যেতে হবে। তোদের মধ্যে যারা বড়, প্রথম ভাগ, দ্বিতীয় ভাগ শেষ করেছিস, যোগ বিয়োগ গুণ ভাগ জেনেছিস তাদেরকে আমি চিত্তরঞ্জনের
স্কুলে ভর্তি করব। ওখানকার শিক্ষকদের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। যাতায়াত করতে হবে নদী পেরিয়ে।
পারবি তো ?
আমরা কোন উত্তর দিতে পারিনি।

সেদিন সন্ধ্যায় দেখি, তিনি গ্রামের ঘরে ঘরে ঢুকছেন আবার বেরিয়ে আসছেন।
একদিন পরেই খুব সকালবেলা  আমাদের আটজন ছেলেকে আর কারো বাবা, কারো কাকা--- তাদের সঙ্গে নিয়ে বেতো মাস্টার চলতে লাগলেন।
মাঠের আলের উপর দিয়ে নদীর পাড়। এতদূর রাস্তা আমাদের জানা, কিন্তু নদী পেরিয়ে এক অন্য জগৎ। পাকা, কালো কালো পরিস্কার রাস্তা। দুপাশে কেমন সুন্দর সুন্দর ঘর। মানুষগুলো অন্যরকম যেন। ভালো ভালো জামাকাপড় পরে আছে।
গিয়ে দাঁড়ালাম যেখানে সেখানে এক মস্ত বড় ঘর। আমাদের গ্রামের ঠাকুর দালানের চাইতেও বড়।
আমাদেরকে বাইরে রেখে মাষ্টার সেই ঘরে ঢুকে গেলেন।
হঠাৎ শুনি ঢং ঢং ঢং শব্দ। একদল আমাদের মতই ছেলে হৈ হৈ করে বেরিয়ে এল। অবাক কাণ্ড, মেয়েরাও আছে।
মাস্টার বেরিয়ে এলেন, আমাদেরকে নিয়ে চললেন। একটি ঘরের ভিতরে ঢুকলাম আমরা সবাই। কী সুন্দর সাজানো ঘর। চৌকির (পরে জেনেছি টেবিল) ওপারে চেয়ারে বসে একজন, সাদা ধুতি, সাদা জামা পরা লোক।
বিস্ময়ের ঘোর, বিমূঢ়তায় আচ্ছন্ন (এ শব্দগুলি আজকের, সেদিন জানতাম না) আমরা ফিরে এলাম এবং পরের সোমবার থেকে আমাদের যাত্রা হোল শুরু।

বেতো মাস্টার তার পরও তিন বছর কি চার বছর থেকেছেন আমাদের গ্রামে। বছরে বছরে নূতন নূতন ছেলের দল পাঠিয়েছেন শহরের স্কুলে। তখনো আমরা ছোট, হঠাৎই গ্রামে আলোচনা, মাস্টার চলে গিয়েছেন। আর ফিরে আসবেন না।
বড় হয়ে বাবা, কাকাকে, অন্য বয়স্ক মানুষদের জিজ্ঞাসা করেছি, কেন মাষ্টার চলে গিয়েছিলেন। কেউই উত্তর দেন নি। আমার এই ঔৎসুক্য লক্ষ্য করে মা আমাকে চুপি চুপি একদিন বললেন,
--- মাস্টার নিজে থেকে চলে যান নি। তাঁকে গাঁয়ের লোক একজোট হয়ে তাড়িয়ে দিয়েছিল।
---কেন মা, ওনার হাতে একটা বেতের ছড়ি থাকতো ঠিকই, কিন্তু উনি তো কোন দিন কাউকে মারতেন না, এমন কি বকতেনও না।
------ উনি গ্রামসভায় জানতে চেয়েছিলেন, মেয়েদের কেন পাঠশালায় পাঠানো হয় না। মোড়ল বিনোদ মিশ্রর সাথে নাকি তর্কাতর্কিও হয়েছিল।
আমি হতবাক। ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগর মহাশয়ের কথা মনে পড়ল। মনে হোল, এদেশে শুধু একজন বিদ্যাসাগর জন্ম গ্রহণ করেন নি। গ্রামে গ্রামে, জনপদে জনপদে কত শত সহস্র বিদ্যাসাগর জন্ম নিয়েছেন, হারিয়েও গিয়েছেন ব্যর্থ প্রয়াসের গ্লানি বহন করে। তাঁদের মঙ্গলময় কর্মের ফল তাঁরা ভোগ করে যেতে পারেন নি, কিন্তু আজ সমগ্র সমাজ সে ফলের অমৃতরস আস্বাদন করে চলেছে।

সেদিনের সেই স্বল্পজ্ঞাত বেতো মাস্টারের মূর্তি আমার অন্তরজুড়ে ভাস্বর হয়ে উঠল। শিক্ষা-দীক্ষাহীন এই
পাণ্ডববর্জিত গ্রাম দেশে, অর্ধ শতাব্দী আগে, শিক্ষার আলোক বর্তিকা হাতে, অবোধ নির্বোধ কিশোর শিষ্যদের সঙ্গে নিয়ে, এক মাস্টার মশাই, উপনিষদের ঋষির মত এগিয়ে চলেছেন সেই সময়ের সুদুর্গম শিক্ষা তীর্থের পথে। 
আনত মস্তকে, ভক্তিবিহ্বল চিত্তে মনে মনে বললাম,
--- ওই বর্ণপরিচয়, ওই যোগ-বিয়োগ, গুণ-ভাগের যে  পাথেয় আপনি দিয়ে গিয়ে গিয়েছিলেন তাই আজও আমার বেঁচে থাকার সঞ্জীবনী। প্রতিদানে কিছুই দেওয়া হয়নি। মাস্টার মশাই, আপনি যেখানেই থাকুন,‌ দ্যুলোকে-ভূলোকে, আমার প্রণাম যেন পৌঁছাতে পারে আপনার চরণপ্রান্তে।

দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
২৬-০৮- ২০২৩
ব্যাঙ্গালোর।






Recently published

অমূল্য

He ( Tagore) who sees all things in his own self and his own self in all things, he does not remain unrevealed.                     ...