মঙ্গলবার, ৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৩

আনন্দ


আনন্দ 

আনন্দধারা বহিছে ভুবনে  


সূচনা

কলা বিদ্যায় আমরা মুখ্যত নবরসের অভিব্যক্তি লক্ষ্য করে থাকি। শৃঙ্গার, বীর, করুণ, অদ্ভুত, ভয়ানক, বীভৎস রৌদ্র ও হাস্য। বাৎসল্য যোগ করলে দশটি। তাহলে "আনন্দধারা বহিছে ভুবনে" -- রবীন্দ্রনাথের এই মহাভাবের একটি গীতিকবিতার প্রথম বাক্যটি যখন আলোচনার বা একটি রচনার বিষয় নির্ধারিত হয় তখন সেই রচনাকে কোন্ 'রসাশ্রিত' বলে আলোচনায় অগ্রসর হওয়া যায় ? এখানে হাস্যরসের সীমাবদ্ধতায় ওই মহাবাণীর অন্তর-নিঃসৃত ব্যঞ্জনাটি অধরাই থেকে যাবে। এবং সে জন্যই আমাদের এই গীতিকবিতাটির কথা আপাতত ভুলে শুধুমাত্র বাক্যটির  আক্ষরিক ও আলঙ্কারিক অর্থটি রচনার বিষয়বস্তুরূপে চিহ্নিত করাই শ্রেয় ; কেননা এই রবীন্দ্রসঙ্গীতটি গ্রহণ করা হলে আমাদের চেতনা রবীন্দ্রনাথের 'আনন্দবাদেই' এমন সমাচ্ছন্ন হয়ে যাবে যে 'আনন্দ' শব্দটি নিয়ে লেখা রবীন্দ্র রচনাবলীর অসংখ্য উদাহরণ শরৎকালের সূর্যকরোজ্বল খণ্ড খণ্ড জ্যোতির্ময় মেঘের মতই চিত্তাকাশে ভেসে ভেসে উঠবে। অবশ্য তাঁর থেকে নিষ্কৃতি পাওয়া সুকঠিন হবে জেনেও আমরা এই 'আনন্দধারার' উৎসে যাবার চেষ্টা করি।
এক

তৈত্তিরীয় উপনিষদ এই সত্য ঘোষণা করছেন যে
"আনন্দো ব্রহ্মেতি ব্যজনাৎ। আনন্দাদ্ধ্যেব খল্বিমানি ভূতানি জায়ন্তে। আনন্দেন জাতানি জীবন্তিঃ। আনন্দং প্রযন্তাভিসংবিশন্তীতি।।"
আনন্দই ব্রহ্ম, আনন্দ হতেই এই সকল ভূতগণ জন্মলাভ করে, আনন্দ দ্বারাই বর্ধিত হয়, এবং শেষে আনন্দেই প্রতিগমন করে।
শুধু মানুষ নয়, এই বিশ্বচরাচরের সমস্ত প্রাণ, এমনকি অপ্রাণও এক বিরাট, বিপুল, নিরন্তর চলমান আনন্দধারায় সমুদ্ভুত হয়ে, চির বহমানতার তরঙ্গস্রোতে ধাবিত হয়ে, পরিশেষে অসীম আনন্দসাগরে বিলীন হয়ে যায়।
তাই যদি নাই হোত তবে, জীব কি বাঁচার প্রেরণা পেত ?
উপনিষদ আবারও বলছেন,
"যদ্বৈ তৎ সুকৃতম্। রসো বৈ সঃ। রসং লব্ধ্বাহ আনন্দী ভবতি। কো হ্যেবানাৎ কঃ প্রাণাৎ। যদেষ আকাশ আনন্দো নস্যাৎ। এন হ্যেবাহহনন্দয়তি।।"
সুকৃতরূপে তিনি (ব্রহ্ম) আনন্দস্বরূপ। এই আনন্দস্বরূপকে যিনি লাভ করেছেন তিনি আনন্দমগ্ন, তিনি সুখী। আমাদের অন্তরের আত্মাই আনন্দের উৎস। এই আনন্দ না থাকলে কেউ কি বাঁচতে চাইত, একটি নিঃশ্বাসও কেউ গ্রহণ করত ?

এই হোল 'আনন্দধারা বহিছে ভূবনে' বাণীর যথার্থ অভিব্যক্তি। ভারতবর্ষের সুদূর অতীতে, তপোবন আশ্রমে, জ্ঞানতাপস মহর্ষিদের ধ্যানে লব্ধ, জীবনাচরণে উপলব্ধ এবং অনুশীলীত এই বোধ আমাদের জৈবিক ও বাস্তব জীবনে গ্রহণ করা দুরূহ ; অসম্ভব বলেই মনে হয়। কেননা সাধারণভাবে আমার কামনার বস্তুগুলি আহরণ ও সম্ভোগের মধ্যেই আনন্দ খুঁজি। ইন্দ্রিয়গুলির (কর্মেন্দ্রিয়, জ্ঞানেন্দ্রিয় এমনকি অন্তরিন্দ্রিও) মধ্যদিয়ে জৈবিক প্রবৃত্তির নিবৃত্তি লাভের প্রচেষ্টায় ও সফলতায় আমাদের আনন্দ। এই প্রবৃত্তি বা বাসনা বাধাপ্রাপ্ত হলে, অপূর্ণ থাকলে আনন্দ লুপ্ত হয়ে যায়। পরিবর্তে নিরানন্দ ঘিরে ধরে, বাঁচার ইচ্ছাটিকে নিরুৎসাহিত করে তোলে।
জরা, ব্যধি, মত্যু -- জীবনের অবধারিত এই পরিণাম থেকে তো নিস্কৃতি পাওয়ার উপায়ও নাই। তারপর আছে আধিভৌতিক, আধিদৈবিক, আধ্যাত্মিক বিপর্যয়। তাই শোক, দুঃখ, যন্ত্রণা, বিষাদ জীবনের নিত্য দিনের সঙ্গী ; কত যে পরাভব, কত অপূর্ণতা।
প্রাচীন গ্রীসের মহান তিন নাট্যকার ইউরিপিদিস, এসকাইলাস, সোফোক্লিস। তাঁদের বিয়োগান্তক নাটকগুলিতে (Tragedies) মানবজীবনের যে পরিণাম দৃশ্যগ্রাহ্য এবং অনুভবগম্য করে দিয়েছেন সেখানে তো নিষ্প্রশ্ন দুঃখবাদই (Pessimism) প্রতিষ্ঠিত ; এমনকি 'Catharsis'-য়েরও অবকাশ নেই। অস্কার ওয়াইল্ড তাঁর একটি কবিতায় ইউরিপিদিসকে বলেছেন, "প্রশস্ত অশ্রুনদী''। ইউরিপিদিস নিজেও তাঁর সৃজনধ্যানে স্বীকার করেছেন, "জীবনে কেউ সুখী নয়, ইহাই ট্রাজেডি (tragedy)."
পাশ্চাত্যের গ্রীক, হিব্রু, রোমান সাহিত্যে, দর্শনে, ধর্মধারণায় এবং শিল্পকলাতেও নৈরাশ্যবাদ যে কী পরিব্যপ্তভাবে ছেয়ে আছে তা সাহিত্য ও দর্শনের পাঠকমাত্রই জানেন। সম্পূর্ণ অস্বীকারও করা যায় না। নগন্যতম মানুষও বিপুল সম্ভাবনা নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। অথচ বিরাট সে সম্ভাবনার ভগ্নাংশের ভগ্নাংশ মাত্র রূপায়িত হয় তার অক্ষম সাধনায়, এবং অবন্ধু প্রাকৃতিক ও মানবিক পরিবেশে। শেষের দিকটায় মনে হয়, Life is an encounter with Nothingness.
"হতাশার ভিড় যেন আর না বাড়ে,
ছাই হয়ে যাবে যে স্বাদুতা আমার --
বিফল প্রয়াসে এখনো রয়েছে তা।"
                                           ----------- গালিব।
ঠিক এখানেই 'আনন্দধারা বহিছে ভুবনে' বাণীর উদ্ঘোষণা। জীবন সংগ্রামের সমস্ত ক্ষয় ক্ষত ক্ষতিকে তুচ্ছাতিতুচ্ছ ভেবে উপেক্ষা করবার মন্ত্র আমরা লাভ করেছি আমাদের পূর্বপুরুষদের --- ব্যাস, বাল্মীকি, বশিষ্ঠ, যাজ্ঞবল্ক প্রভৃতি মহান ঋষি ; গার্গী, মৈত্রেয়ী, অরুন্ধতী প্রভৃতি মহতী বিদুষীগণের কাছ থেকে, জন্ম জন্মান্তরের সুকৃতির ফলে। আমরা তাঁদেরই সন্ততি। ছান্দোগ্য উপনিষদে আমরা পরিচিত হয়েছি সত্যকাম, শ্বেতকেতু ও নারদ ঋষির মতো সুগভীর সত্যানুসন্ধিৎসুদের সঙ্গে, এবং আরুণি, সনৎ কুমার ও প্রজাপতির মতো শ্রেষ্ঠ আত্মবিদ্ আচার্যগণের সঙ্গে। গুরু শিষ্যের কথপোকথনের মাধ্যমে এই উপনিষদ্ আমাদের সৎ স্বরূপকে সৃষ্টির আপেক্ষিক বিকার থেকে পৃথক করতে শিখিয়েছেন। এতে গভীর আধ্যাত্মিক ও দার্শনিক তাৎপর্যপূর্ণ মহাবাক্য চতুষ্টয়ের অন্যতম --তৎ ত্বম্ অসি" -"তুমিই সেই"-- বাক্যটিতে সঙ্গীতের ধুয়ার মতো মানবের দেবত্ব কীর্তিত হয়েছে।
এতে জীবনের গভীর দুঃখগুলির নিবৃত্তির জন্য মানবের জন্মগত দেবত্ব জ্ঞানের উপদেশ দেওয়া হয়েছেঃ  "তরতি শোকম্ আত্মবিৎ। " আপন সত্তাকে, আপন অন্তরাত্মাকে যিনি সম্যকরূপে জেনেছেন, যিনি আপন জীবাত্মাকে স্রষ্টা পরমাত্মার সঙ্গে 'এক' করে ভাবতে পেরেছেন তিনি 'আত্মবিৎ' এবং তিনি জীবনের সমস্ত প্রকারের শোক দুঃখ যন্ত্রণা থেকে মুক্ত হয়ে চির আনন্দে আত্মস্থ হতে পারেন।
কিন্তু জীবনে ও জগতে এরূপ আনন্দ লাভ তো মহাজ্ঞানী, মহাসাধকদের ধ্যানলব্ধ। আমাদের মতো সাধারণ মানুষের আনন্দ লাভের উপায় কি ? এখানেই জীবাত্মা ও পরমাত্মার ভাবনা, দ্বৈত এবং দ্বৈতাদ্বৈত দর্শন। পরমাত্মা হলেন সাধকের কাছে ব্রহ্ম আর সাধারণ্যে তিনি ঈশ্বর বা ভগবান। এই ঈশ্বর বা ভগবান, তাঁকে স্বীকার করলে, আমার আমিত্বের অহং উৎসর্গ করলে চরাচর-প্লাবিত পরমানন্দ --- এই বিরাট সৃষ্টির অপরিমেয় রূপ এবং রসের ভোক্তা এই জীবাত্মা, এই আমি। আমার কাজ তাঁকে জানা, তাঁর 'চরণে' আত্মনিবেদন।
"তদ্বিজ্ঞানেন পরিপশ্যন্তি ধীরা।
আনন্দরূপম্ অমৃতং যদ্বিভাতি।।" 

দুই

এই দ্যুলোক ভূলোক পরিব্যপ্ত 'বিশ্বরূপ' - য়ের নিকট সম্পূর্ণ আত্মনিবেদনের একমাত্র শর্ত প্রেম। আর প্রেম যখন আসে তখন জোয়ারের জলতরঙ্গের মত আমাদের জীবন-নদীর সকল মালিন্য, আত্মপর ভেদ ধুয়ে দিয়ে যায়। একটি অতিমানবীয় ভালোবাসার বোধ জাগে, ভালোবাসার দৃষ্টি দিয়ে জগতের রূপ দেখতে পাই। আর এই সৃষ্টির যিনি স্রষ্টা, যিনি নিয়ন্তা, তাঁকে পাবার, তাঁর সঙ্গে একটি মধুর সম্পর্ক স্থাপন করবার জন্য দেহ মন চিত্ত ব্যাকুল হয়ে ওঠে। সমস্ত অন্তঃকরণ জুড়ে সেই প্রেমময়ের উপস্থিতি।
জগতের সঙ্গে প্রেমের যোগ সাধিত হলেই আনন্দ।  তখন আমার ক্ষুদ্র আমিত্বের বিনাশ ; বৃহতের মধ্যে 'আমি'র মুক্তি।
এবার আবার সেই বিশ্বাত্মা বিশ্বকবির ওই মহাবাণীর শেষ কথাগুলি অপরিহার্য হয়ে উঠলো, 
"চারিদিকে দেখ চাহি হৃদয় প্রসারি,
ক্ষুদ্র দুঃখ সব তুচ্ছ মানি 
প্রেম ভরিয়া লহ শূন্য জীবনে।। 
আনন্দধারা বহিছে ভুবনে.." 

ওই যে কথা আরম্ভের প্রথম উচ্চারণে রসের প্রসঙ্গ এসেছে তাই আনন্দ এবং এই জীবনে লাভ করবার যে আমিত্ব-মোহশূণ্য বাসনার নামই প্রেম। পাশ্চাত্যের বস্তুবাদী দর্শনে এমন নিষ্কামনার প্রেমের তেমন উচ্চমার্গীয় 'মীমাংসা' না থাকলেও পাশ্চাত্য সাহিত্যর রোমান্টিক অভিব্যক্তির মধ্যে বিমল আনন্দরসের নিঃসরণ আমরা পেয়েছি। কবি Wordsworth, Shelley, John Keats, Lord Tennyson এবং জার্মান মহাকবি Goethe -র কাব্য সম্ভারে বিষাদ ও বিরহের মধ্যেও আনন্দরসের ফল্গুধারা পরিদৃশ্যমান। এই যে বেদনার অভ্যন্তরে আনন্দবোধ এইটি রবীন্দ্রনাথ তাঁর উপনিষদীয় প্রজ্ঞার আলোকে অনুভব করেছেন এবং তার সাহিত্য দর্শনে সত্যরূপে, শাশ্বতরূপে, সুন্দররূপে প্রতিষ্ঠা করেছেন।
পরিশেষে তাঁরই কথা লিখে এই কথকথা শেষ করি,
"আনন্দ আজ কিসের ছলে
কাঁদিতে চায় নয়নজলে,
বিরহ আজ মধুর হয়ে 
করেছে প্রাণ ভোর।" 

                   সমাপ্ত
_____________________________________________



কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Recently published

অমূল্য

He ( Tagore) who sees all things in his own self and his own self in all things, he does not remain unrevealed.                     ...