শনিবার, ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৩

চরণ রেখা তব

চরণ রেখা তব 


(ঝরা ফুলের স্মৃতি)  


বহুশ্রুত এই রবীন্দ্রসঙ্গীতটি নিয়ে দু-চার কথা  বলবার  ইচ্ছা চেপে রাখতে পারলাম না। একে তো  সমস্ত রবীন্দ্রসঙ্গীতই বিশ্বসাহিত্যের শ্রেষ্ঠতম  গীতিকবিতা, তার উপর এমনিধারার কয়েকটি গান  সাহিত্য ও সঙ্গীত জগতের অপার্থিব সৃষ্টি।  আকাশের  নক্ষত্রের মতো চিরজ্যোতির্ময়। এই  গানটি প্রকৃতি পর্যায়ের। রচিত হয়েছিল ৩রা মার্চ,  ১৯২৭। ফুলের আগুন-লাগা ফাগুনে, সম্ভবত ১৯শে  ফাল্গুন। কবির  বয়স তখন তিন কুড়ি ছয়।  আমাদের  চোখে কবির বয়স বাড়েও নি, আবার  কমেও নি কোন কালেই। কেনই বা বাড়বে ? তিনি যে অখিলরসামৃতসিন্ধু। ওই শুভ্র শ্মশ্রুগুম্ফশোভিত মুখশ্রীমায়া, ওই আকর্ণপুরিত  চিরপ্রসন্ন চোখের আকাশগহন দৃষ্টি, ওই আ-চরণ  প্রলম্বিত জোব্বা আমাদের অন্তরাকাশে, রবিকরোজ্বোল শরতের মেঘাস্তরণের মতো এমনই দীপ্তিমান হয়ে আছে যে তাঁর কৈশোর কালের তাঁর যৌবন কালের গন্ধর্বনিন্দিত রূপ স্মরণেই আসে না। 
যাই হোক্, এই ছেষট্টি বসন্তের 'বসন্তসখা' গাইলেন  ওই গান। সম্পূর্ণ গানটি এই রকম --- 

"চরণ রেখা তব যে পথে দিলে লিখি  
চিহ্ন আজি তারি আপনি ঘুচালে কি।। 
অশোক রেণুগুলি  রাঙালো যার ধূলি  
তারে যে তৃণতলে আজিকে লীন দেখি।। 
ফুরায় ফুল -ফোটা,পাখীও গান ভোলে, 
দক্ষিণ বায়ু সেও উদাসী যায় চলে।। 
তবু কি ভরি তারে অমৃত ছিল না রে --- 
স্মরণ তারো কি গো মরণে যাবে ঠেকি।।" 

গানটির আঙ্গিক রবীন্দ্রনাথের সঙ্গীত রচনা  বৈশিষ্ট্যের পূর্ণ রূপ পেয়েছে। চারটি 'তুক' চারটি  কলি  (যুগল বাক্য)-তে বিভক্ত। আস্থায়ী, অন্তরা,  সঞ্চারী, আভোগ। "তুই ফেলে এসেছিস কারে"-এই  রকমের গানের মত একাধিক অন্তরা এ গানে নেই।  আটখানি পংক্তি, প্রতি পংক্তিতে দৌদ্দটি অক্ষর  (যুক্ত বা একক বর্ণের)। স্বরলিপি করেছেন দীনেন্দ্র  নাথ ঠাকুর। গানটি ভৈরবী রাগাশ্রয়ী এবং তাল  দাদরা। এই গান রবীন্দ্রসঙ্গীত সাধনায় মগ্নচিত্ত  শিল্পীদের কণ্ঠে আমরা শুনেছি। অনিতা সেন,  রাজশ্রী দত্ত, কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়, সুচিত্রা মিত্র,  সাগর সেন, অরবিন্দ বিশ্বাস, চিন্ময় চট্টোপাধ্যায়--  এমনই আরও কত। কিন্তু তবুও, যাঁর কণ্ঠে এই  গানটি  বাঙলার আকাশে বাতাসে সুধারসধারা  সিঞ্চন করে চলেছে দশকের পর দশক ধরে তিনি  আমাদের হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। আপনারা শুনেছেন,  আবারো শুনবেন আজীবন। 
এ গান ভৈরবী রাগে আশ্রিত হলেও আস্থায়ীর প্রথম  সু্র আমাদের বিস্মিত করে দেয়, দ্বিধান্বিত করে  রাখে। সুরের মূর্ছনায় এমনি বিহ্বলতা সৃষ্টি করে যে  মনে সুখের 'দুঃখবিলাস' জেগে ওঠে। শুদ্ধ স্বরের  চলনে অকস্মাৎ 'তীব্র মধ্যমের' ছোঁওয়া। তখন 'যে  পথে দিলে লিখি' -- 'দিলে' --- কাল নির্বাচনে যদি  অতীত কাল হয়, এমনকি পুরাঘটিত বর্তমানও হয়  তবে তো শ্রোতার কাছে সাংঘাতিক ! আর তা সত্যও।   
পরের অন্তরা এবং সঞ্চারীতে একই রকম কী-যেন-  হারানোর বেদনা ! পথে তোমার চরণচিহ্ন কোথায় ?  পথের যে ধূলিকণাগুলি অশোকরেণুর আলপনায়  রঙিন হয়ে উঠেছিল তারা দেখি আজ তৃণাস্তরণে  ঢাকা। ফুল-ফোটার প্রহর হোল কি শেষ ? পাখীরা  ভুলে গেল গান গাওয়া ? দখিনা বাতাস উদাস বাউল  হয়ে গেল হঠাৎই ! 

আমাদের এই মর্ত্যজীবনের সর্বব্যপ্ত অর্থহীনতার, হারিয়ে-ফেলার রবীন্দ্রনাথসুলভ রূপকল্পগুলি, কল্পচিত্রগুলি প্রভাতী বৈতালিকে 'ইমন বা মাড়োয়ার' ঔদাসীন্যভরা বেদনাবোধের বা নিরাসক্তি-র আবেশ সৃষ্টি করে না কি ? বসন্ত তো কবির প্রিয়তম ঋতু, তাঁর জীবনের  চিরদিনের 'রাজা'। তবে কেন এই মাঝ ফাল্গুনে যখন "বাজায়ে ব্যাকুল বেণু, মেখে পিয়াল ফুলের রেণু " সগৌরবে, সুরে সৌন্দর্যে সৌরভে তার আসবার  কথা, মঞ্জরিত শালতরুনিকুঞ্জে নৃত্য করবার কথা,  তখন তার অকাল অন্তর্হিত হবার কারণই বা কি ?  নাকি 'বসন্ত'ই হারিয়ে গেল কবির জীবন থেকে।  তাও তো সত্যি নয়। "শেষের কবিতা"-র দিন তো এখনো অনাগত। আসলে ১৯১৯ সাল থেকে ১৯৩০  সাল, এই সময় কালটি, যা আমরা আরেক  নোবেলজয়ী সাহিত্যিক, সুইজারল্যান্ড প্রবাসী রোমা  রঁলার সঙ্গে কবির চিঠি পত্র আদান-প্রদানের মধ্য  দিয়ে জানতে পারি, তাঁর (রবীন্দ্রনাথের) কাছে ছিল  বিশ্ব সভ্যতার সঙ্কটের কাল, নিষ্ঠুর রাষ্ট্র ক্ষমতার কাছে উদার মানবতাবোধের পরাভবের রক্তরাঙা সান্ধ্য দুঃসময়। 

মহাজীবনের সেই দীর্ঘ ইতিবৃত্ত আজ এখানে থাক্ ;  শুধু বলি ওই কালখণ্ডটির অসহ বেদনাবোধ  আমাদের আলোচিত সঙ্গীতটির সু্রে প্রচ্ছন্ন আছে।  কিন্তু আভোগ-য়ে এসে একটি সকৃতজ্ঞ প্রশ্ন, তবু কি  "ভরি তারে অমৃত ছিল না রে" - পাঠক বা শ্রোতাকে  আবিষ্ট করে দেয়, প্রকৃতির প্রতি প্রেমে মুগ্ধ করে  রাখে। উত্তর প্রৌঢ়কাল পর্যন্ত প্রকৃতির কাছ থেকে  যে  অমৃতরস তিনি আস্বাদন করেছেন সেই স্মৃতিও  কি "মরণে যাবে ঠেকি ?" এমন এটটি সুধাসিক্ত  অথচ  চিত্ত-আকুল-করা বাণী রবীন্দ্রনাথের অমর্ত্য  লেখনীই লিখে দিয়ে যেতে পারেন। অবর্ণনীয় ! শুধু  অনুভবের, শুধু হৃদয়ে সঞ্চয়ণের। 

এবার আসি প্রকৃতি পর্যায়ের এই গীতিকবিতাটির  কাব্যসুষমায়। প্রতিটি শব্দের কী অপার ব‌্যঞ্জনা, কী  মোহিনী মায়া ! চরণ রেখা এঁকে দিয়ে নয়, 'লিখে'  দিয়ে বিদায় নিল যে বসন্ত তার লিখন লীন হয়ে  রইল  'তৃণতলে' ; কিন্তু চির অমলিন হয়ে রয়ে গেল  মহাকালের শাশ্বত কাব্যের পত্রপুটে। 

(এই গানটির উপর সঙ্গীতজ্ঞ ও সঙ্গীত আলোচকদের  আলোচনা এবং সমালোচনা প্রার্থনা করি।) 

দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় 
১৬/০৯/২০২৩ 
ব্যাঙ্গালোর। 















1 টি মন্তব্য:

Recently published

অমূল্য

He ( Tagore) who sees all things in his own self and his own self in all things, he does not remain unrevealed.                     ...