সোমবার, ২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২২

তমসো মা জ্যোতির্গময়ো

জীবনে যা ছিল সে তো আজ নাই, 
যাও বা রয়েছে হারাই হারাই, 
তবু কেন চাই সোনার হরিণ 
অন্ধ আবেগে ছুটি ? 

যত হারাধন উল্কার মতো, 
বিস্মৃত স্মৃতির আগুনে নিয়ত
জ্বালিয়ে বক্ষ মিলায় শূণ্যে – 
শিথিল বজ্রমুঠি। 

ধরা অধরার মাঝখান দিয়ে
কত চাওয়া পাওয়া গেল যে হারিয়ে। 
মরীচিকা দীপ নিভিয়ে নিভিয়ে 
মরুঝড় বুকে নাচে। 

ধন-জন-মান-যশ, বৈভব, 
চিত্ত সুখের বৃথা গৌরব, 
ঝরা কুসুমের ক্ষণসৌরভ 
এই মরে এই বাঁচে। 

মিথ্যা এ ঘোর আমার আমার, 
মিথ্যা এ মায়া ছায়া সংসার, 
ব্যর্থ প্রয়াস শব সাধনার 
অমৃত লাভের আশায়। 

কাল নদীতীরে পেতেছি আসন, 
ঝুলিতে ভরেছি মণি কাঞ্চন, 
প্রলয় বন্যা দেখেও দেখিনা, 
যযাতির কামনায়। 

চোখের নিমেষে সবই যাবে ভেসে – 
নিঠুরা নিয়তি ওই ওঠে হেসে, 
বিরহ মিলন চিতার আগুনে  
যায় পুড়ে , থাকে ছাই। 

কোথা  আজ তুমি মানব দেবতা, 
গ্লানির নরকে কাঁদে মানবতা, 
'চেতনা হউক' কর গো ঘোষণা 
আঁধারে আলোক পাই। 

প্রভাত সূর্য আলো বন্যায় 
নিশার কালিমা মুছে দিয়ে যায়, 
অতল জলধি, অসীম আকাশ 
অনন্ত গ্রহ তারা, 

তবু প্রাণ কেন মরু পিপাসায়, 
কাঁদে অহরহ, বলে, নাই নাই, 
লালসা আগুণে পুড়ে হোল ছাই
শ্যামল বসুন্ধরা, 

০৩/০৩/২০২২ 
ব্যাঙ্গালোর। 
______________________________________

রবিবার, ২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২২

ব্রাত্য

 'ব্রাত্য' শব্দটির অর্থ হোল সমাজের পবিত্র, সংস্কারসিদ্ধ মানবগোষ্ঠীর সীমান্তপারের ‌মানুষ‌। ইংরেজিতে লিখলে – degraded or degenerated লিখতে হবে । আমি নিজেও বাহ্যিকভাবে সামাজিক মানুষ হলেও অন্তর- সত্তায় এই দলেই পড়ি । কেন ? 

এই গল্পটি গভীর মনোযোগ সহকারে পড়ুন ।






সংশোধন– শেষের বাক্যটি হবে , 
...বাহান্নটা বছর পৃথিবীর একটি সংরক্ষিত ভূমিতে জীবন কাটিয়ে এসেছে সে কোন ্ অধিকারে ? 'আইডেনটিটি' জোগাড় করতে পারে নি ? 
– কে‌ন? 

শনিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২২

ভালোবাসা – জনমে না হয় মরণে

তোমার দেওয়া ফুল উপহার 
__________________________

চৈত্র ঊষার উষ্ণ হাওয়ায় 
মরাডালে‌ ফুল ফুটে , 
হিংসা বিষের তপ্ত ধোঁয়ায় 
ফুলগুলি পড়ে টুটে । 
এই দুটি ছবি মিলাব কিভাবে, 
তাই বসে বসে ভাবি, 
এমনই সময়ে পূবের দুয়ারে 
দীপ্ত প্রভাত রবি । 
আলো তার ধুয়ে রক্তের রেখা, 
রাঙালো কুসুমকলিকা, 
সেই ফুল দিয়ে গেঁথেছ কি‌ তুমি 
অমর প্রেমের মালিকা ? 
তাই শেষ আশা আছে ভালোবাসা 
নিখিল হৃদয় কাননে, 
বাসন্তী বাতাসে পাবো তার ছোঁওয়া 
জীবনে না-হোক্ মরণে ।

দুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়, 
২৬/০২/'২২
ব্যাঙ্গালোর ।

শুক্রবার, ২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২২

TRAGEDY OF HUMANITY

(This composition is aiming at the horrendous war situations in and around the Middle East.)

“Looking around 
The battle scene was harsh, 

Bodies lay scattered on the ground, 

With the nauseating scent of blood, 

Surrounding me. 

I can hardly see, 

For smoke blinds my eyes, 

And as I look around, 

My heart sinks, 

And is filled with sorrow, sorrow …..”


By Alexis Malina 




ARMS AND TRAGEDY OF MANKIND


Dulal Ch. Bandyopadhyay



Put the knife in the sheath or in scabbard the sword ;

But remember, they are made of bloodthirst,  

And for decapitating, tearing asunder or to kill. 

Weapons bear in and with them our cruel intention. 

A boy with his toy-gun aims at a bird or a lizard ; 

Until his conscience gives birth to Love in his heart. 

No mortal knows of the aim in creating ‘Frankenstein’, 

But, for an instant only, he knows and light goes dim, 

And goes out forever, as the lightning lightens –  

The thunderbolt leaves the thunderstruck dead! 

Oh ! what a death, too brief and too insensate ! 

Before counting down seconds of impending doom, 

Count the mass-graves and piles of funeral ashes

That, man have sacrificed to Ares, the War God, 

Annihilating civilizations, one followed by another, 

Yet His thirst for blood remains unquenchable.  

When wisdom, in league with evil spirit,

And abides in and by a swooning demonocracy, 

Brings forth such fiendish spears that pierce  

The breast of God and herald as the Satan does --

“It is better to reign in hell than to serve in heaven.” 

O, The Son of God, Resurrect thy soul once again

Not at the stable, but in the conscience

of Man.

__________


  1. The quoted line is from 'Paradise Lost', by John Milton. 

  2. Ares = Ancient Greek God of war, son of Zeus and Hera, personifies sheer brutality and bloodlust. 

  3. Some revered religious communities bear arms, (swords and daggers) following their cult and culture individually or in solemn processions. Some ancient aborigines too, do the same. The subject, as well as, the theme of my poem is based only on warfare and arms for holocaust, mass destruction.

  4. Edited and republished (23/12/2023)


Dulal Ch. Bandyopadhyay, 

25-02-2022 

Bangalore . 


বৃহস্পতিবার, ২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২২

War !

Compassion ?

When you see millions of the mouthless Dead,

Across your dreams in pale battalions go , Say not Soft things as other men have said , 

That you will remember . For you need not so .  

Give them not praise . For , deaf, how should they know ;

It is not curses heaped on each gashed head ? 

Nor tears . Their blind eyes see not your tears flow . 

Nor honour . It is easy to be dead .” 


Charles Hamilton Sorley, an Iris soldier, died at the age of 2o , in 1915 , during First World war.



অস্তরাগে নয় , রক্তরাগে রঞ্জিত আবারো 

          পশ্চিমের আকাশ, 

                         — দুলাল বন্দ্যোপাধ্যায় 



কোষের ভিতর রেখে তরবারি , আস্তিনে রেখে ছুরি ,

শান্তিমন্ত্র শোনাও আমাকে , নির্লজ্জ

সাধুগিরি ।  

নিশিদিন ধরে মারণ হুঙ্কার , অস্ত্রের কারবার , 

স্বস্তি , শান্তি , প্রেম, মানবতা – সমস্ত ছারখার । 

বিস্মৃতিগর্ভে কোথায় লুকালে বিগত

অমানবতা , 

মহানরমেধ ঘটালে সেদিন নারকী বীভৎসতা । 

অস্ত্র যেখানে চাষের ফসল ,অস্ত্র যেখানে পণ্য , 

অস্ত্র যেখানে শাসন , ত্রাসন , শোষণ করারই জন্য , 

অস্ত্র যেথায় সঞ্চিত থাকে বিশ্বদাহন নেশায় , 

মহামানবের খান্ডববন ধংশ করার পেশায় ,

অস্ত্র সেখানে প্রাণহীন নয়, রক্তপিয়াসী

শয়তান , 

 জিঘাংসা যার জন্মদাত্রী ,হিংসাই তাকে দেয় প্রাণ । 

আত্মহনন ,ভ্রাতৃহননে মত্ত  যে সভ্যতা   ,

 লুব্ধ ,ক্ষুব্ধ গৃধ্রের দল – ভাঙে শান্তির নীরবতা । 

ক্রূরতা যেন সর্পবৃদ্ধ, লালসার মণি হারায়ে ,

বিষের অগ্নিশিখা জ্বালিয়েছে দুঃখীর আলয়ে কুলায়ে । 

মরে যারা, আর মারে যারা ,তারা কুরুক্ষেত্র শ্মশানে , 

মুখোমুখী হয়ে বসবে যেদিন রক্ত-সিক্ত আসনে , 

সান্ধ্য-সন্ধি মন্ত্রের ধ্বনি শুনবে কি সেই জননী


কোথা সন্তান? শব খুঁজে ফেরা ভদ্রা উন্মাদিনী ।। 


।) জিঘাংসা = Intention to kill ; blood thirstiness , হননপ্রবৃত্তি  

2) ভদ্রা  = এখানে সুভদ্রা ; কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ শেষে অসংখ্য শবদেহ  খুঁজে খুঁজে ফিরছিলেন – কোথায় অভিমন্যু ।

________________________________________


মঙ্গলবার, ২২ ফেব্রুয়ারি, ২০২২

মণিমৃগয়া

 






















Let there be Light

 Setting free my soul in the light of eternity

___________________________________

(The poem is a sudden outburst of momentary realisation. It is neither religious, nor philosophical.)



“Lock up your liberties if You like ; but there is no gate , no lock, no bolt that you can set upon the freedom of your mind” . 

                          – Virginia Woolf . 




I’ve taken an oath today to set my mind free, 

From all ties of the world , in reality solely , 

I live in a self designed-captivity of ignorance. 

The earth itself makes a gift of all 

that I’m in need of , without asking for return . 

There’s the light , light and light rains down 

From heaven limitless ; yet in dark I remain . 

Pride and prejudice and an evil thought of ‘Self

 Rites and rituals, I’ve pursued in vain . 

Light of love I had, in me, boundless , 

But a sense of mortal pleasure darkened 

My conscience. Now, let there be light ; 

May it be the End ; yet , that’ll burn out

What, in me – transitory, ephemeral . 

Only when infinite Light weds the finite thought, 

My soul surely be free from sensual propensity –

And live eternally in the light of the Divinity .  


Dulal Ch . Bandyopadhyay 

22- 02- 2022 

Bangalore .

_______________________________________





 

 Virginia Woolf and stream of consciousness. 

Virginia Woolf 1882 - 1941.








 



রবিবার, ২০ ফেব্রুয়ারি, ২০২২

মাতৃভাষা

২১শে ফেব্রুয়ারী

মা ও মাতৃভাষা 
________________

ওরে , মা বলেই ডাক‌ মা'কে । 
মা বলে ডাক্, মা বলেই ডাক্, মা বলে ডাক্ মা'কে । 

যেদিন থাকবে না ওই স্নেহের প্রতিমা , 
দুঃখ-তাপের রইবে না সীমা , 
পৃথিবীর কেউ দিবে নাকো সাড়া 'মা' 'মা' 'মা' ডাকে । 

ভাই , সে দিনের কথা ভাব একবার, ‌
যেদিন , খবর এসেছে ‌তোমার আসার , 
বিশ্বজগৎ ছিল একদিকে, একদিকে ছিল মা । 

চরম যাতনা পরমানন্দে সয়ে , 
দুর্বল দেহে রক্তপিণ্ড বয়ে , 
(তোমার) জীবন বাঁচাতে মৃত্যুর মাঝে জীবনের সাধনা । 

সে মায়ের ভাষা কণ্ঠে নে' তুলে , 
কেঁদে নে আবার 'মা মা' বলে , 
দরদে তোমার জননী যেন যন্ত্রণা ভুলে যায় । 

হৃদয় আবেগ বাদল ধারায় 
ঝরুক অঝোরে এই বাঙলায় , 
বাঙলার মাটি বাঙলার 'মা'-টি বেঁচে থাক্ মহিমায় । 

রাজরাজেশ্বরী বাঙলার ভাষা , 
 এতো প্রেম আছে এত ভালোবাসা 
ছন্দে , বাণীতে, সঙ্গীতে , সুরে বঙ্গভারতী শ্রীময়ী । 

রাখো তাঁরে বুকে ধরে' চিরদিন‌ , 
ঐশ্বর্য তাঁর অন্তবিহীন , 
(যার) ভাণ্ডার ভরা রত্ন মাণিক হবে সে বিশ্বজয়ী ।‌ 

সহস্র বর্ষ সাধনার ধনে,  
মহাকবিদের শব্দ সৃজনে, 
ভাষা শহীদের বুকের রক্তে গড়া সে দেউল খানি। 

রবি নজরুল কন্ঠের গানে,
আরো অসংখ্য চারণের তানে, 
গঙ্গা পদ্মা জোয়ারে ভাসুক অমর বঙ্গবাণী। 

(পরিমার্জিত রূপে প্রকাশিত। কবিতাটি আপনাদের সকল পরিচিত মানুষদের কাছে পৌঁছে যাক, এই কামনা করি।)

দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় , 
২১শে‌ফেব্রুয়ারী, ২০২৩। 
ব্যাঙ্গালোর ‌। 






বৃহস্পতিবার, ১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২২

মানসী (ছোট গল্প )

মানসী 

 কবিতা তো অনেক হোল। এবার একটি ছোট গল্প হয়ে  যাক্। স্মৃতিচারণা -- বার্ধক্য-বিড়ম্বিত জীবনে, দ্বিপ্রাহরিক অলস প্রহরগুলি কাটাতে নিষ্কলুষ অবলম্বন -- ফেলে আসা দিনের স্মৃতি। সারাটা বর্ষাকালে  মালিকের ফরমাইশমত মই -লাঙল বেয়ে, শরতে ছাড়া পেল চাষীর বলদ ; তারপর নব-অংকুরিত তৃণদলে  উদরপূর্তি করে, গাছের ছায়ায় বসে যেমন জাবর  কাটতে থাকে, তেমনি হোল বুড়াকালের স্মৃতিরোমন্থন ।  

--------------------------------------------------------------------------

মানসী  


"Till then I wandered careful and comfortless  
In secret sorrow and sad pensiveness."  
         Edmund Spenser -- Sonnet 34.  


এখন অনুগল্প, পরমাণু যুদ্ধের -- থুক্কুম্বা --পরমাণু গল্পের যুগ। এই ধর, তুমি চারচাকা বা দু'চাকায় ছুটছ, 
তেষ্টা পেয়েছে, সময় নষ্ট করার মতো সময়ও নেই হাতে।
চোখে পড়ল, রাস্তার ধারে বিক্রি হচ্ছে আঁখের রস। ক্ষণিক থামা, এক গেলাস রস গেলা, আবার 'হুস'! 
কিন্তু আমরা যখন (অর্ধ শতাব্দী আগেকার সে কথা)    আঁখের রস খেয়েছি তখন আঁখ পেড়ানো হোত  আঁখশালে, গরু বা কাড়া-টানা আঁখপেষা কলে। আঁখের লাঠি ঢুকতো একটা-দুটো, রস গড়াতো ঝির ঝির, টোপ টোপ, গ্রামের ভেতো, হাভাতে ছেলেগুলো দাঁড়িয়ে থাকতো দূরে ; বটপাতা, শালপাতার দোনা হাতে নিয়ে । কখন মালিক ঘটিতে রস নিয়ে আসবে, দেবে একটু একটু। রসের সঙ্গে সরস বাখানও।  
এমনই এক আঁখ মাড়ানো কলের কাছে, ওই যে‌  বললাম, বছর পঞ্চাশেক আগে, সতের আঠারো‌  বছরের একটি ছেলে, এই আমি, দাঁড়িয়ে ছিলাম  ভরতপুরের সরাণ পুকুরের পাড়ে, বিপুলদেহী‌ বটগাছের  শালবল্লির মতো একটি ঝুরিতে (এমন ঝুরি ‌কত যে ছিল -- গুনতে গেলে মাথা ঘুরে যাবে) হেলান  দিয়ে ওই আঁখশালের দিকে তাকিয়ে রয়েছি একাগ্র। দেখছিলাম সেই বিলম্বিত লয়ের কর্মকান্ড আর‌ রসপিপাসুদের প্রলম্বিত প্রতীক্ষা। আজ প্রথম দিন‌ এমন নয়। আজ তৃতীয় দিন। গরুর গাড়ি ঠাসা আঁখ‌ আছে, কাস্তে দিয়ে ঝাড়াই হচ্ছে, কলের মুখে বসা‌ একজন, তার কাছে বোঝা বোঝা জড়ো হচ্ছে। সে আঁখের দাঁড়ি কলের মুখে ঢুকিয়েই চলেছে, রস গড়িয়ে জমা হচ্ছে মাটিতে আধপোঁতা এক প্রকান্ড জালায়। সেখান থেকে বালতি বালতি তুলে ঢালা হচ্ছে বিশাল এক কড়াইয়ে। গূহামুখের মতো উনুন, আগুন জ্বলছে 
 দাউ দাউ, রস ফুটছে, গুড় হচ্ছে। গন্ধে ভরে উঠেছে  চতুর্দিক। আমার যেন ঘোর লেগেছে -- দেখেই চলেছি ,  চোখ ফেরাতে পারছি না।  
 
হটাৎই সেই মোটা গুঁড়ির পিছন থেকে একটি ‌
মেয়ে-হাত, হাতে ধরা ঘটি, ঘটিতে সফেন টলটলে ‌রস। 
চমকে উঠে মাথা ফেরাতেই দেখি ছিপ ছিপে এক   কিশোরী। ঘটি হাতা ফ্রকের মতো পিরান, আবার  গামছা পরার ধরণে কাপড়, যার আঁচল গোটানো অবস্থায় কাঁধের উপর ঝোলানো। আমাদের চিত্তরঞ্জনে  এমন অদ্ভূত পোশাক দেখিনি। এমন মেয়েও। তা সে‌ ঘটি ধরে অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে রয়েছে আমার দিকেই ।‌ গোল মুখ, বড় বড় চোখ ঝাঁকড়া চুল --মুখের দুপাশে  ঝুলে রয়েছে কাঁধ পর্যন্ত। হাসছে আর ওই ঝাঁকড়া  চুলওয়ালা মাথাটি উপর নীচ দুলিয়ে যেন বলতে  চাইছে..."খাও" ।  
আমি কিছুটা ঘাবড়েই গিয়েছি, আর তার ওই বিশাল  চোখ দুটির উপর আমার চোখ আটকে রয়েছে ।  কিছুক্ষণ পর হঠাৎই ধমক দিয়ে উঠল মেয়েটি ,  
--- কতক্ষণ ঘটি ধরে দাঁড়িয়ে থাকব ? খেয়ে নাও। কেও  এনে দেবে না এমন করে, এখানে পাতার ঠোঙা নিয়ে  দাঁড়াতে হয় ।  
--- আমি তো রস খেতে আসিনি ।  
--- উঁ, রস খেতে আসিনি তো ! ঠোঁট উল্টে ভেংচি  কাটছে আর বলছে , --এমনি এমনি দাঁড়িয়ে আছো ?  
কালও ছিলে, ছিলে না ?  
--- কাল তুমি আমাকে দেখেছিলে ?  
---হুঁ , দেখেছিলাম তো। আমি রোজ আসি। এখন  আমাদের আঁখ পেষাই হচ্ছে। আমি এক ঘাঁটি রস 
খাই। আর এক ঘাঁটি নিয়ে যাই --মা খায়। আজ ভাবলাম। তোমাকেও দিই, কাল থেকে হ্যাংলার মতো দাঁড়িয়ে আছ। ধর ঘটী, আমার হাত ধরে গেছে না ?  
অগত্যা ঘটিখানা নিতেই হলো। কিন্তু খাবো কি করে ?  উপরে তুলে খাওয়া অভ্যেস নেই ।  
বুঝে গেলো মেয়েটি বলে উঠলো ,  
--- চুমুক দিয়েও খাও। 
যেই না মুখে তুলে চুমুক দিয়েছি অমনি খিল খিল হাসি‌ ।  আমি খাওয়া বন্ধ করতেই আবার হাসি --হাসতে হাসতে‌ লুটিয়ে পড়ে, এমন তার অবস্থা। কোনো রকমে হাসি চেপে বলে উঠলো ,  
--- আমার দাদুর মতন বুড়া লাগছে ।  
বাঁ হাত মুখে দিতেই বুঝতে পারলাম রসের ফেনা   লেগেছে নাকের নীচেই --সাদা গোঁফের মতো দেখতে  ‌  লাগছিলো হয়তো ।  ‌ 
--- ফেনা মারতে জানো না ?  
আমি মাথা নাড়লাম -- না ।   
---দাও আমাকে ।   
ঘটি দু'হাতে ধরে ফুঁ দিয়ে অদ্ভুত কায়দায় ফেনা সরিয়ে,  আমার হাতে দিয়ে ,  
--- নাও , এবার খাও ।   

                          দুই 

সদ্য-পেষা, তাজা আঁখের রসের যে কী স্বাদ বুঝলাম  সেদিন। ভরা -ঘটি খেতে পারিনি , কিছুটা রেখেই  ঘটিটি  দিলাম তার হাতে। সে অবিচল দাঁড়িয়ে, নিষ্পলক দৃষ্টিতে দেখেই চলেছে আমাকে এখন আর চপলতা নেই। শান্ত,  ঔৎসুক্য-গাঢ় কন্ঠস্বরে জিজ্ঞাসা করল, 
--- ঘর কোথা তুমার ? কাদের ঘরে এসেছো ? 
বললাম সবই। ভাব এমন দেখালো যেন সব ঘরই তার দেখা আছে, সব পাড়াই তার জানা, গ্রামের প্রতিটি  মানুষই তার চেনা। তারপর বেশ জোরের সঙ্গে বলে  উঠল ,  
--- টিক আছে, আবার কাল আসবে, গুড় খাওয়াবো ।  আসবে কিন্তু , না এলে না..... হেসে ফেলল ।  
ততক্ষণে আমি অনেকটাই সহজ হয়ে গিয়েছি।  তবু  একটু গম্ভীর হওয়ার চেষ্টা করলাম। শুধালাম ,  
--- তোমার নাম কি ?  
--- আমার নাম পদ্ম । সবাই পদিবুড়ি বলে ডাকে ।  
--- কেন ?  
--- আমি বুড়িদের মতন কথা বলি --তাই। তুমি আমায়  এমন বলবেনা-- তা বলে' ...। আবার হেসে 
উঠল ।  
--- আমি তবে কি বলবো--পদ্ম ?  
--- না , তাও বলবে না।  তুমি পদ্মরাণী বলবে ।  
--- কেন ?  
--- আমি তোমাকে ভালোবেসেই তো রস দিয়েছি, আমি তুমার বউ হব যে ... বলেই দৌড়, আঁখ শালে গিয়ে  নাচতে লাগলো, হয়তো চিৎকার কোরে রসই চাইছিল ।‌  হুঁ তাই, ওই যে -- এবার ঘটি নিয়ে ছুটছে।   
যতদূর দেখা যায় চোখ দুটিকে ছোটানোর চেষ্টা করে  চলেছি আমিও ...না:, আর দেখা যাচ্ছে না ! হারিয়ে  গেল ! গাছ-গাছালির ফাঁক ফোঁকর দিয়ে ঘন  বাঁশঝাড়ের ভিতরে ! নাই ! আমি ফিরে এলাম ঘরে ।‌ দিদির ঘরে। 

দিদির ঘর। ভরতপুর গ্রাম, বর্ধমান জেলায়। বর্তমানে    পূর্ব বর্ধমান। পানাগড় স্টেশন থেকে মাইল আটেক  দক্ষিণে, দামোদর নদের তীরেই। হাঁটা পথ , সুদূরপ্রসারী ধান জমির আল ধরে। দিদির ঘরে দিদি,  জামাইবাবু আর দশ বছর বয়সের ভাগ্নে সুবল। সে  এখন স্কুলে। গ্রামেই তার স্কুল। আমি এগারো ক্লাসের‌  'ফাইনাল' পরীক্ষা দিয়ে চিত্তরঞ্জন থেকে এসেছি দিদির  বাড়িতে। আগেও এসেছি বহুবার, থেকেছি অনেক দিন  ধরে ; কিন্তু এই প্রথম বার ঘরের বাইরে, গ্রামের শেষে  নদীর ঘাটে , মাঠে হাটে, পুকুর পাড়ে, একা একা,  কখনও বা সুবলকে সঙ্গে নিয়ে ঘোরা ।  

দিদির কাছে ঘটনাটি বললাম না ।  
কেন জানিনা, বলতে গিয়ে বাধ বাধ ঠেকল। কিন্তু  মনের মধ্যে কিরকম যেন হতে থাকল। আনন্দের ভাব, চমকে চমকে ওঠার মতো শিহরণ। কেবলি মনে পড়তে  লাগলো ওই আঁখশাল, ওই রসের ঝির ঝির স্রোত, গুড়‌  ফোটার গন্ধ মাখা চৈত্রমাসের বাতাস, ওই রসে-ভরা,  ফেনা-ওঠা ঘটি আর পদ্মরাণী, শব্দটি মনে মনে  উচ্চারণ করে অজান্তেই এদিক ওদিক চেয়ে দেখছি ,  লজ্জা লজ্জা একটি সঙ্কোচ ! চোখ দুটি মনে পড়েছে  তার আর মনে পড়েছে ওই হাসি। আমি শহরে বড়  হয়েছি ; কিন্তু মেয়েটির কাছে অপ্রস্তুত মনে হচ্ছিলো  নিজেকে। এক বিন্দু লজ্জা -শরম নেই। বিদ্যুতের  আলো ওই বীজন গ্রামদেশে তখনও ছিল স্বপ্নের। সন্ধ্যা  হোতেই অন্ধকার নামতো মা কালীর রঙের 
মতো‌। দিদি রান্নাঘর থেকে মাঝে মাঝেই তাড়া দিতো , 
---আই, খেয়ে নিবি। দেবু , সুবল আয়, হ্যারিকেনে তেল থাকবে না। রেশনে কেরোসিন নাকি এ মাসে আসে নি। 
কাজেই শুয়ে পড়তেই হয় সন্ধ্যা গড়াতেই। শুয়ে পড়িও।  অন্য দিন ঘুমিয়েও যাই অঘোরে। আজ কিন্তু চোখে ঘুম নেই।  ছবির মতো মনের মধ্যে ভেসে ভেসে উঠছে আঁখশাল। বটগাছের তলা  আর পদ্ম  ...না , না  ...পদ্মরাণী  রাত্রিটা কাটলো আধো ঘুম ,আধো তন্দ্রাচ্ছন্নতায় । মাঝে মাঝেই উঠে বসেছি, জানালায়  চোখ রেখে দেখেছি আকাশ ফর্সা হোল কি না ।  প্রতীক্ষার অবসান , সামনের বাঁশ ঝাড়ে হাজার‌  চড়াইয়ের কলরব। জামাইবাবু ভোরবেলায় রেডিও‌ চালিয়ে দেন রোজ। সুন্দর গান বাজছে ," নূতন 
প্রভাত‌, জাগো সময় হলো"। মা আমার গান করে, আমাকেও চেষ্টা করে শেখানোর। আমার ভালো লাগে   না। এখন মনে হচ্ছে, শিখলে ভালো হোত । আজ  আবার যখন  দেখা হবে , একটা গান তাকে শুনিয়ে‌  অবাক করে‌ দিতাম ! ইস্, কী ভাবছি এ সব !   
 – দেবু, জামাইবাবুর ডাক, – ওঠ , তৈরি হয়ে নে‌ তাড়াতাড়ি, আজ তোকে নিয়েই বেরোব...।  



                         তিন  

আমাকে নিয়ে জামাইবাবু কোথায় বেরোবেন ? আমি আঁখ শালে যাবো যে ! মনে তীব্র উদ্বেগ নিয়ে উঠে  
এলাম । দিদি তখন তুলুসী তলায় গোবর মাড়ুলী দিচ্ছে ।   জামাইবাবু দিদিকেই উদ্দেশ্য করে বলছে , 
---শুনছো , আজ দেবুকে নিয়েই রনডিহার হাটে যাবো । 
--- অতখানি দূর , হাঁটতে পারবি দেবু ? 
---খুব পারবে , ইয়াং ম্যান । 

আমি চুপ। মনে হলো সূর্যটা ডুবে যাক্। আবার সন্ধ্যে হোক। তা হোল না , কিন্তু আমার চোখের সব আলো যেন নিভে গেলো। যাবো না যে , কিন্তু কেন ? তার তো কোনো উত্তর নেই। একবাটি মুড়ি খেয়ে জামাইবাবুর পিছন পিছন চলতে থাকলাম ওই আঁখশালের ডান দিক দিয়েই , তবে বেশ কিছুখানি দূরের ব্যবধান , লোকজনও দেখা যায় , চেনা যাচ্ছে না । না , না , এতো সকালে সে আসে নি। নদীর পাড় বরাবর মেঠো পথ , মাঝে মাঝে গ্রাম , ছোট ছোট বন, দিগন্তের সীমা ঘেরা প্রান্তর, গরু-মোষের পাল। শাঁখ সাদা বকের ঝাঁক , উড়তে উড়তে এসে বসলো মাঠ যেখানে নদীর চরটিতে মিশেছে ঠিক 
সেখানটিতে । ভালো লাগছে খুবই , কিন্তু মন উড়ে যাচ্ছে সেখানেই, সেই সে সরাণ পুকুরের পাড়ে, বটগাছের তলাটিতে। রোদ বেশ চড়া হোল, চৈত্র মাসের রোদ, সঙ্গে এলোমেলো হাওয়া, ঠিক এই সময়েই তো গতকাল সে এসে গিয়েছিল। এতক্ষণে সে এসেছে‌ হয়তো। খুঁজছে আমাকে কী। ওই বড় বড় চোখদুটি  নিয়ে ? আমি যদি বক হয়ে যাই ! দূর ! আবার সেই চিন্তা ! যাগ্গে, কাল সকালে তো দেখা হবেই ।  
রণডিহার হাট এসে গেল। এতো দোকান, এতো  শাকসবজি, ফলমূল, এতো লোক, এমন কোলাহল ,  কখনো না দেখেছি, না শুনেছি। জিনিসপত্র কেনা হোল,  চপ জিলিপি খাওয়া হোল। ফেরার পথে কেন 
যে আমারি এতো তাড়া। জামাইবাবু কেন যে এমন ধীরে ধীরে হাঁটেন ! শেষে কিনা তাই হোলো, বেলা ডুবেই  গেল ঘরে ফিরতে। আবারও একটি দীর্ঘ রাত্রির  
প্রতীক্ষা। অতখানি দূর, অতটা পথ হাঁটা অভ্যাস নেই,  ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। প্রথম দিকটায়, কিন্তু  ঘুম  ভেঙে গেল মাঝ রাত্রে। অন্ধকার যেন কাটাতেই চায়না। 

একসময় রাত ফুরাল, সকাল হোল। আরও কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতেই হবে। কেননা এত সকালে তো সে আসবে না। রোদ একটু চড়া হোতেই, বেরিয়ে গেলাম । কোন দিকে না তাকিয়ে সটান গিয়ে দাঁড়ালাম গিয়ে ওই  আঁখশালে, ওই বটগাছটির ওই ঝুরিতে, ওই ভাবে হেলান দিয়ে। তাকে যেন আর খুঁজতে না হয়। সেকি ! 
কোথায় সে ? 
বেলা বাড়ছে, বাড়তে বাড়তে সূর্য মাথার উপর, দুপুরবেলা, তাও পেরিয়ে যায় যায়। তবে কি সে আসে  নি ? শরীর খারাপ.হোল না তো ? ঘরের মানুষ, বন্ধু, কাছের মানুষদের জন্যও এমন উৎকণ্ঠা কোন দিন হয়নি আমার। পদ্মরাণী, কোথায় তুমি ? তার খবর জানার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছি। ছোট ছেলেদের একটি ছোট দল, বোধহয় রস খেয়ে নিয়েছে, আমার সামনে দিয়ে ফিরে যাচ্ছে । আমি থাকতে না 
পেরে , তাদেরই একজনকে হাতছানি দিয়ে ডাক 
দিলাম। 

(গল্পটির শেষের অংশটি )

---পদিদের গুড় কাল উঠে গেছে। আর আসবে না। কে  ওকে রস দেবে ? কাল ও কাউকে গুড় দেয়নি।  
আরেক জন বলল , 
--- নিজে এক দোনা গুড় নিয়ে এইখানে দাঁড়িয়ে একা একা খেয়েছে। 
অন্যজন ,
--- না না, দোনায় গুড় নিয়ে কাঁদছিল। খায় নাই। 

'জীবন নাট্যের সেই স্থান, কাল, কুশী-লব ; অস্ফুট 
কথা, অর্থহীন ব্যাকুলতা, নিষ্কলুষ আবেদন, নিষ্ফলা প্রয়াস, সকরুণ পরিণাম – প্রবেশ-প্রস্থানের তোরণদ্বার- সমন্বিত, জীবন প্রভাতের অমল রৌদ্রকরোজ্জ্বল  ক্ষণকালের সেই রঙ্গমঞ্চটি ফেলে এসেছি আজ থেকে  পঞ্চাশ বছর আগে। বুকের ভিতরের স্থায়ী মঞ্চটিতে  একান্তে বেজে চলেছে কখনো ইমন রাগে সানাই,  কখনো বা মাড়োওয়া-য় বাঁশী । কেনই যে পাওয়া , 
কেনই বা হারিয়ে যাওয়া !' 
নাট্যগুরু শেক্সপিয়ারের 'কিং লিয়র' নাটকের মতো ,  জনান্তিকে-য়ের স্বগতোক্তির মতো আপন মনে আওড়ে  বোতলের Last lees টুকুও গলায় দিলাম ঢেলে ! 

---বুঝলাম, আমার সাঙাৎ কেন কাব্যি করে' আর 'মধু' খেয়ে জীবনটা দিল কাটিয়ে । 
অখিল এরকম রোজই বোঝে আর রোজই বলে । ঘোরের কথা নয়, এ হোল বন্ধুত্বের জোরের কথা । 

হ্যাঁ, অখিল আর আমি দুই বন্ধু, কাঁচড়াপাড়া রেলকারখানা থেকে অবসর নেওয়ার পর থেকে কারখানার পিছন দিকের গেটের ঝুপড়িতে বসে' পরাণের গল্প করতে করতে ওই একটু আধটু পান - 
টান করে', যে যার ঘরে ঢুকে পড়ি আরকি ! অবসর নেওয়ার আগে থেকেই এই রেল শহরেই এক কুঠুরি 
ঘর ভাড়া নিয়ে আছি। ওই ঘর আর এই ঠেক। 
আমার জগৎ সংসার এই গন্ডীর মধ্যেই আবদ্ধ। 
মা-বাবা, দিদি- জামাইবাবু, এঁরা সবাই জগতাতীত ,  আর রক্তের সম্পর্কের যারা, তারা আমার জীবন ও সান্নিধ্য থেকে বহুদূরে আত্মনির্বাচিত স্থানে আত্মনির্বাসিত। ঠেকের বন্ধু তো ঠেকেই। 
ঠেকে মিলন বিরহ নাই। 

আমি একা। 
দিনের বেলা পরিবর্তিত, বিবর্তনীয় সমাজের, চলমান জনতার অরণ্যের মধ্যেও একা। কিন্তু রাত্রিবেলা   আমরা দুজন। আমি আর পদ্মরাণী। কোন্‌ সুদূর অতীতে ফেলে আসা সেই সরাণ পুকুরের পাড়, সেই  শতঝুরি বট গাছ, ডাগর দুটি চোখ, অনাবিল সেই  চাহনি, ঘটিভরা আঁখের রস, আর সেই মধুমাসে  মধুমাখা কথা, 
"কাল এসো, গুড় খাওয়াবো ।" 
 এসব যদি নেশার ঘোরে ভুলে যাইও কখনোও বা,  ভুলতে পারি না, 

---"গুড় খায় নাই, দোনায় গুড় নিয়ে কাঁদছিল ।" 

                       সমাপ্ত

(গল্পটি সংক্ষেপিত আকারে একটি পত্রিকায় , 'নীল পালক'  প্রকাশিত হয়েছে। এখানে পান্ডুলিপি থেকে মূল গল্পটি দেওয়া হোল ।) 
দুলাল বন্দ্যোপাধ্যায় 
২০/০২/২০২২ 
ব্যাঙ্গালোর ।





মঙ্গলবার, ১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২২

সন্ধ্যা স্তুতি



সঙ্গীত-সন্ধ্যা 
_____________


রাগ -রাগিনী  পরিশুদ্ধ , কন্ঠ মাধুর্যে সুললিত সঙ্গীতের দিব্য রূপ ছিলেন সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় । তাঁর সমগোত্রীয় সঙ্গীতশিল্পী , সঙ্গীতজগতে দুর্লভ । 

"অতি দুর্গম সৃষ্টি শিখরে 
অসীম কালের মহাকন্দরে 
সতত বিশ্ব নির্ঝর ঝরে 
ঝর্ঝরসঙ্গীতে, 

স্বর-তরঙ্গ যত গ্রহতারা 
ছুটিছে শূণ্যে উদ্দেশহারা – 
সেথা হতে টানি লব গীতধারা 
ছোট এই বাঁশরীতে।।"  রবীন্দ্রনাথ। 

বিশ্বসৃষ্টির মূলে আছে সঙ্গীত।‌ বিশ্বব্রহ্মান্ডের ছন্দিত গতির সঙ্গে আছে সঙ্গীত। এই সঙ্গীতের সাধনা করেন যাঁরা , তাঁরা প্রকৃত অর্থেই সাধক। তাঁদের সাধনা অন্বেষণ । অন্বেষণ সুরের । এই সাধন জগতের 
একটি একান্ত ,পার্থিব লোভ-মোহ মুক্ত, অনন্যসাধারণ   সাধিকা.  ছিলেন সদ্যপ্ৰয়াত সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় । 

 গোমুখনিঃসৃতা গঙ্গার আমি 
 কুলুকুলু ধ্বনি শুনি নাই , 
কোথা বৃন্দাবন, কোথা শ্যামরায় ! 
বাঁশরীর ধ্বনি কোথা পাই ? 

ইন্দ্রসভায় বেহুলা চরণে  
অমর নূপুরনিক্কণ , 
বাসর-গামিনী রুক্মিণী - তাঁর  
দিব্যাভরণ শিঞ্জন । 

না দেখেছি চোখে, না শুনেছি কানে  
সকলি কল্প জগতের । 
স্বর্গের সেই সুর-তান সুধা 
অধরাই ছিল মর্ত্যের ।  
তুমি এলে , ওই ইন্দ্রধনুর 
সাত রাগ দিলে ছড়ায়ে , 
কলগান আর কলতানে দিলে
 নিখিল হৃদয় ভরায়ে । 
কন্ঠে তোমার কুহুতান শুনে 
কোকিল পেয়েছে লাজ , 
'পিউ কাঁহা' শুনে বনপাপিয়ার  
তন্দ্রা টুটেছে আজ । 
ত্বর সইত না সন্ধ্যা তারার -  
সন্ধ্যা না হোতেই উঠতো , 
গোধূলির আলো শেষ না হোতেই  
সন্ধ্যামণিরা ফুটতো । 
তুমি তা জানো না, চির-উদাসীন  
সুরসাধনায় মগ্ন , 
তোমার সুরের মায়াজালে ধরা 
বাংলার শুভ লগ্ন । 
তোমার গানের সাত সুর দিয়ে 
কত যে আসর রচনা , 
"কোথায় শুরু কোথায় বা শেষ" --  
রয়ে গেল আজও অজানা ।। 

স্মর্তব্য : 
 ১। মনসামঙ্গল কাব্যে লখীন্দরের পুনর্জীবন প্রার্থনায় দেবরাজের শর্ত পূরণের জন্য দেবরাজের  রাজসভায় দেবতাদের চিত্তজয়ী নৃত্য প্রদর্শণ করেছিলেন বেহুলা । 
২। শ্রীকৃষ্ণজায়া রুক্মিণী , এমন দিব্য অলঙ্কার লাভ করেছিলেন যার ধ্বনি কৃষ্ণকেও মুগ্ধ করেছিল । 
৩। "ও মন কোথায় শুরু কোথায় যে শেষ কে জানে",  এই গানটি 'কমললতা' ছবিতে শ্যামল মিত্র ও সন্ধ্যা যুগলে গেয়েছিলেন । 

দুলাল বন্দ্যোপাধ্যায় , 
১৬-০২-২০২ 
ব্যাঙ্গালোর । 
______________________________________________
















সঙ্গীতের মূর্ত বিগ্রহ – সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় , বিসর্জন !

বিদায় সন্ধ্যা ! 

"বিদায় সন্ধ্যা আসিল ওই 
ঘনায় নয়নে অন্ধকার, 
হে প্রিয়, আমার যাত্রাপথ 
অশ্রুপিছল করোনা আর।।"

এসেছিলে সুরের স্বর্গ হতে !
যাবে কী ফিরে সেখানেই ? 
যাও দেবী , থাকো সেই পুরে – 
স্মৃতি টুকু পড়ে থাক্ এখানেই । 
সুরের যে অমৃতধারা রেখে গেলে – 
থাক্ তাই শোকার্ত হৃদয় জুড়ে , 
সুরধুনী গঙ্গার একূলে , ওকূলে ! 

দুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়, 
১৫/০২/২০২২
ব্যাঙ্গালোর । 

সোমবার, ১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২২

বসন্ত জাগ্রত দ্বারে

সুপ্রিয় পাঠক,  
সে আজ যুগান্তর পূর্বের কথা , আমাদের জ্যাঠামশাই   গ্রামের বাড়িতে একটি ফুলের বাগান করেছিলেন। কত   জাতের, কত বিচিত্র ফুলের গাছ ছিল সেখানে । আর   বসন্তকাল এলেই ফুলে ফুলে ফুলময়ী হয়ে উঠতো বাগানটি । জ্যাঠামশাই নাম দিয়েছিলেন তাঁর ঠাকুমা'র  নামে 'রাণীকানন'। এখন সে বাগান আমার ধূসর  স্মৃতির দিগন্তের ওপারে। এই কবিতাটি সেই বাগানের বর্তমান !  

(কবিতাটিতে একাধিক ছন্দ ব্যবহার করা হয়েছে)। 

 বসন্ত বিড়ম্বনা !  

কবিগুরু ,
বেশ তো একটি গান বেঁধেছ , 
 "আজি বসন্ত জাগ্রত দ্বারে , 
তব অবগুণ্ঠিত কুণ্ঠিত জীবনে  
করো না বিড়ম্বিত তারে।"  

আচ্ছা কবি , তুমি না হয় স্বপ্নমধুর পালে, 
পাড়ি দিতে কালিদাসের কালে । 
যাও দেখে এই গুটিপোকার হাল, 
কেমন ধারা কাটল তার ফাল্গুনী সকাল । 


গুটি পোকা গুটিয়ে ছিল 
গুটির অন্তরালে 
সারাটি শীতকালে , 
হঠাৎ করে কোন বিরহীর তপ্ত দীর্ঘশ্বাস 
রূপ ধরে হোল 'মলয়ানিল' – বসন্ত বাতাস । 
 বইলো  ভূবনময়, ঊষার চরণ ধরে। 
জন্মান্তর পরে, 
মিলনের ‌অভিসারে, 
গুটির বাঁধন খুলে,  
নয়নাভিরাম বিচিত্র ডানা মেলে, 
ঠিক যেন দেবদূত, 
অপূর্ব অদ্ভুত, 
পবনের পিঠে চড়ে, 
বন উপবন পার হয়ে উড়ে উড়ে, 
পৌঁছাল এসে রাণীর কুসুম কাননে– 
গান ছিল তার পাখনায়, হাসি ছিল তার আননে। 

শুভ্রবসনা কেতকী, কামিনী কলিকা, 
যুঁই যুথি যাতি শেফালী মল্লিকা, 
স্বর্ণকুমারী স্বর্ণচাঁপার ঘরে , 
 রাতভোর তারা মাধবীর সাথে ‌মাধুরী পানের পরে, 
ভোরের শিশিরে স্নান সেরে সবে মদালসা আঁখি  খুলেছে,  
আর, অনাহুত ওই প্রজাপতিটিকে দেখেছে,  
মহা শঙ্কায় শঙ্কিত হয়ে পাতার আড়ালে লুকালো,  
সুন্দর মুখ মায়ের আঁচলে ‌জড়ালো ।  ‌

মায়েরা তাদের বলেছিল, "ডানাওয়ালা কেউ এলে, 
নাচ নাচে  বা গায় গান যদি, মন ভুলানোর ছলে, 
হোক্ প্রজাপতি, হোক্ তারা মৌমাছি, 
কিছুতে যাবি না কারো কাছাকাছি,  
বিদেশী পাখায় ভর দিয়ে এক অ-সুখ এসেছে দেশে ।" 

বিস্ময় ভরে' প্রজাপতি ফিরে আশাহত বেদনায়,  
মধুহারা অসহায়। 
ওদিকে রয়েছে অতসী অপরাজিতা, 
(ভালোবেসেছিল যাদের দুঃখিনী সীতা।)  
সুবাসিনী নয়, নয় মধুরিমা তারা, 
তাই চিরদিন‌ মধুপ-সঙ্গ হারা, 
জবারাও ছিল, ওদিকে গোলাপবালা, 
শুধুই তাদের বর্ণের শিখা জ্বলা । 
মধু নাই কারো কাছে – 
দেবতার পায়ে যাবে, মালা গাঁথা হবে  
তাই, কোন মতে বেঁচে আছে। 

এক কোনে আছে কেয়া 
কণ্টকবন বিহারিণী মহাশয়া , 
না যাওয়ায় ভালো সেখানে, 
শতেক শত্রু লুকিয়ে রয়েছে ওখানে। 
রয়েছে শুভ্রা এবং রক্তকরবী , 
অপরূপা তারা, কিন্তু আত্মগরবী ! 
দিশাহীন প্রজাপতি, 
শ্রান্ত, ভ্রান্ত গতি – 
বিবশ পাখায় বসল গিয়ে কল্কে ফুলের কানায়, 
ছলকে উঠে রাতের শিশির পড়ল তার ডানায়। 
কোথায় সুবাস, কোথায় মধু, কোথায় বাসন্তিকা ? 
 ভিজা ঘাসে পড়ে আছে প্রজাপতিটাই একা ! 

 এলো তো ফাগুন, প্রেমের আগুন – 
কোথায় মুক্তদ্বার ? 
বিষাদের অবগুণ্ঠনে ঢাকা 
মধুময় সংসার !

দুলাল বন্দ্যোপাধ্যায় , 
১৫/০২/২০২২
ব্যাঙ্গালোর ! 
_____________________________________________















 







রবিবার, ১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২২

হাস্নুহানা

 কবিগুরুর শ্যামলী কাব্যগ্রন্থের 'হঠাৎ-দেখা' কবিতাটি মনে আছে ? 

"বাইরের আকাশের দিকে তাকিয়েই শুধোল , 
'আমাদের গেছে যে দিন 
একেবারেই কি গেছে - 
কিছুই কি নেই বাকি ?'  

একটু রইলেম চুপ করে ; 
তারপর বললেম , 
'রাতের সব তারাই আছে 
দিনের আলোর গভীরে'।" 

এই হোল রবীন্দ্রনাথের গদ্য কবিতার ধরণ । 
___________________________________________


হাস্নুহানার সাথে
______________

মস্ত সে‌‌ শহর ,
তারই এক কানা গলির শেষে 
এক টুকরো ঘর। 
আমার কথা ভেবেই বুঝি বিশ্বকর্মা নিজে, 
বনিয়ে দিয়ে গেছেন চলে চির অন্তরালে।‌
 সেথা আমিই থাকি একা – 
তাই বা বলি কেমন করে ; 
আরসোলা, টিকটিকি আর নেংটি ইঁদুর, 
তারাও ক'জন আমার সাথেই থাকে। 
'অফিস-পিয়ন' কাজ করি, আর 
ঘুমাই এখানেই। 
খওয়া-দাওয়া রাস্তা ঘাটেই সারি, 
গাঢ় সন্ধ্যায় ফিরিও ঘরে একা, 
কোন তাড়াই নাই । 
জীবন যেন মজে-যাওয়া খাল – 
পঁচিশ বছর পার ; 
জোয়ার ভাঁটার ইচ্ছাটিও ঢেকেছে জঞ্জালে। 

একদিন সে বাদল বেলার বিকেল , 
হেঁটে হেঁটে ফিরছি অফিস থেকে, 
এক বাগান-ঘেরা বাড়ির দেয়াল কোনায়, 
কেটে-ফেলা ঘাস-আগাছা হতে, 
চেনা ফুলের গন্ধ আসে ভেসে – 
হাস্নুহানাই ঠিক – আমার চেনা ফুল। 
কাটা-ছেঁড়া ডালের ডগা থেকে, 
ভেঙে-টুঙে নিলাম তিনটি শীষ্ । 
ঘরে ঢুকে ভাবছি আর হাসছি মনে মনে, 
কেন নিলাম, কোন সে ভাবের ঘোরে ! 
'দুচ্ছাই' , দুয়ো দিয়ে দিলাম তাদের রেখে, 
এক-পা ভাঙা , নড়বড়ে ওই টেবিলখানার উপর। 
ঘোর তন্দ্রা নামল চোখের পাতায় – 
রোজ এমনই নামে ; 
কিন্তু আজ যে স্বপ্ন এলো সাথে । 
''কেন আসো, কোন্ সে অজুহাতে ?"

শ্রাবণ রাত্রি বিকট অন্ধকার, 
ঝলকে ঝলকে বিদ্যুৎ, সাথে ঘন ঘন পড়ে বাজ, 
অঝোরধারায় ঝরঝর ঝরে জল, 
তার সাথে ওঠে পাড়াময় হাহাকার, 
শীলাবতী বাঁধ ভেঙেছে ওখানে, 
বান ঢোকে খলখল, 
জল আর শুধু জল, 
হু হু করে আসে, উঠোন ভাসাল, 
ঘরের ভিতরে ঢুকছে অনর্গল ! 

'ওরে কে আছিস আয়, চলে আয় ! 
আমাদেরটায় !'
ওই পাড়াটিতে ছিল সে একটি দালানকোঠা, 
কত লোক এলো, কারা জড়ো হলো, 
চেনা চিনি নাই কিছু। 
কানে ঢোকে রব– হায় হায়! বিকট কান্নাকাটি ! 
আমি, বাবা, মা তিন জন ভিজা কাক
ধরা ধরি করে আছি , 
না-মরা, না-বাঁচা – 'বাঁচাও, বাঁচাও' ডাক ; 
তবে তা ছিল মরণেরই কাছাকাছি। 
হঠাৎই কে যেন জড়াল আমাকে, 
চমক ভাঙল আর্ত কণ্ঠস্বরে ! 
"অমলদা !" চোখের পাতার জলের ঝরনা ঝেড়ে,
চেয়ে দেখি নুরি – একি রে, নূরুন্নাহার !
হাতে তার এক হাস্নুহানার ঝাড় ! 
"ধর এটি একবার, নিঙড়াই শাড়ি আমি।" 
বড় আদরের ফুলগাছ এটি তার , 
ঘর ডুববার আগে নিয়েছে সে তুলে , 
তারেও বাঁচাবে নিজেও বাঁচবে তবে। 
 তারপরে কী যে হোল, ঝড়..ঝড় ! 
বাজ ! বিদ্যুৎ ! প্রলয় ! এই কী নরক ! 
সর্বনাশের সীমা পারে তাকে পাবে– 
"না হোক্, না হোক্ কোন কালে মানুষের !" 

কেটে গেছে তারপর তিরিশ বছর। 
মনে আছে তিন দিন ছিল সেই ফুল-ধরা গাছ, 
কোন এক স্কুলের পেছাড়ের ঝোপের ভিতরে , 
আশ্রয় ছিল হা-ঘরে'দের, 
লুকিয়ে পুঁতেছি তাকে, 'নেবো পরে', 
এমনই ছিল এক আশা ! 
দুঃস্বপ্নের সে জীবন, স্বপ্নের সেই ভালোবাসা ! 
দূরে যাও, দূর হও হে অতীত ! "আঁ..আঁ !"
নিজেরই গলার স্বরে ফেটে গেল ঘুম ! 
কী ঘন গন্ধ আসে ঝরা অতীতের ! 
 আলো জ্বালি, জল খুঁজি । 
প্রথম নজর গেল টেবিলেরই উপর ।
দেখি, এখনও রয়েছে তাজা 
কাটা ছেঁড়া শাখা ক'টি – হাস্নুহানার । 
যেন দুবাহু বাড়ায়ে আছে নুরুন্নাহার।।

দুলাল বন্দ্যোপাধ্যায় 
১২/০২/২০২২ 
ব্যাঙ্গালোর । 



























শনিবার, ১২ ফেব্রুয়ারি, ২০২২

এসো বসন্ত

বার্ধক্য প্রলাপ 
_________________



যাক্ ঝরে যাক্ বিবর্ণ পাতা –
শুষ্ক অসুন্দর , 
নব বসন্ত , তোমারই সঙ্গে 
বাঁধবো নূতন ঘর। 

শ্যামলী, সোনালী বন লতিকারা 
শিমুল পলাশ ধরে' , 
গরমে বাদলে হিমানীতে শীতে 
ছিল জড়াজড়ি করে' । 

এখন দেখেছে বুড়োগুলো সব 
হারায়েছে ধন-মান,
উলঙ্গ যার‌ কলেবর তা‌র 
কি বা আছে সম্মান ? 

বুড়োদের ছেড়ে আদুরী বধুরা 
বাসা ভেঙে, খোঁজে আনবাস , 
সারা বনময় জীর্ণ পাতার 
  বিদীর্ণ হিয়ার হা-হুতাশ !  

সে বিরহ-শ্বাসে উষ্ণ বাতাস 
উচ্ছ্বসি' ওঠে বনময়, 
দোলা লেগে তার পলাশ শিমুল 
ফুলে ফুলে হোল ফুলময়। 

আনন্দ আসে তাই ফুল হাসে, 
জানে এই কথা আনজনায় ;
 কবি জানে সেই অ-বাক কাহিনী 
ফোটে ফুল কার বেদনায় ! 


আনজনা = অন্য জন(একটি সুন্দর পুরাতন গ্রাম্য বাংলা শব্দ)। 
আনবাস =অন্য বাসা, (এখানে অন্য বাস বা সুগন্ধ এবং অন্য ভালোবাসা , এই তিনটি সাংকেতিক ব্যঞ্জনায় ব্যবহৃত)। 
অ-বাক=বাক বা কথাহারা । 
শ্যামলী= বনমল্লিকা ।
সোনালী= স্বর্ণলতা ।

দুলাল বন্দ্যোপাধ্যায় 
১২/০২/২০২২
ব্যাঙ্গালোর। 








বৃহস্পতিবার, ১০ ফেব্রুয়ারি, ২০২২

প্রভাত

নেপালী বৌদ্ধ সাহিত্য শার্দুলকর্ণাবদান , প্রভু বুদ্ধ  নিরঞ্জন অনাথপিণ্ডদ- য়ের আতিথ্য গ্রহণ করে' শ্রাবস্তী ‌ নগরে। সঙ্গে প্রিয় শিষ্য আনন্দ, এক গৃহস্ত বাটীতে  আহার ভোগ করে 'বিহারে, প্রত্যাবর্তনের পথে তৃষ্ণার্ত‌  বোধ করলেন। অদূরে দেখেন, এক চণ্ডাল কন্যা কুয়ো   থেকে জল ভরছে কলসিতে ; তৃষ্ণা তখন তাঁর বক্ষ  জুড়ে। ত্বরিত পদবিক্ষেপে তার কাছে গিয়ে আকুল  প্রার্থণা ,"জল দাও"। বৌদ্ধ ভিক্ষু, তরুণ সন্ন্যাসী‌ আনন্দের সূর্যকরোজ্জ্বল, প্রদীপ্ত রূপ দেখে আত্মহারা‌  সুকুমারী প্রকৃতি ।  
না , আর নয়। এবার স্বয়ং সেই স্রষ্টার অবিস্মরণীয়  আখরগুলিই তুলে দি' ,--  

"প্রকৃতি ।।  
কেবল একটি গণ্ডুষ জল নিলেন আমার হাত থেকে ,   অগাধ অসীম হল সেই জল। সাত সমুদ্র এক হয়ে গেল   সেই জলে , ডুবে গেল আমার কূল, ধুয়ে গেল আমার   জন্ম ।  

মা ।।  তোর মুখে এ-সব কী শুনছি ।  

প্রকৃতি ।।  
এ কাহিনী আমার নতুন জন্মের ।  

মা ।।  
হাসালি তুই । নতুন জন্ম ! ঘটল কবে ?"  
             
                                   
নৃত্যনাট্য  "চণ্ডালিকা ", রবীন্দ্রনাথ  ঠাকুর ।   

এই নাটকগুলি তো অনিঃশেষ সুধাপাত্র । ভোক্তা  সুধীজন । আমি তৃষা-ভরা কণ্ঠ  নিয়ে , লুব্ধ দৃষ্টি মেলে  চেয়ে থাকি শুধু ; "জল দাও ", চাইবার সাধ জাগে ,  কিন্তু  সাধনা যে  নাই ! তবু মাঝে ,মাঝে সকালবেলায়  দেখি , শিশিরসিক্ত ফুল আসে । সে সবই ছবি যদিওবা ,  তবুও তাতে পাই না-দেখা প্রাণের হৃদয়াবেগের  
অনুভূতি, ভালোবাসার আমন্ত্রণ। বুক ভরে যায় 
সুখে। নিঃসম্বল এই পথিকের পাথেয় দান করেন যাঁরা,   
পান্থজনসখা , তাঁদের উদ্দেশে এই কবিতাটি :   


প্রতিদান শুধু প্রীতি  
------------------------

 নাদেখা ,অদেখা বন্ধুরা সবে মিলে  
হৃদয়দুয়ার খুলে ,  
দাঁড়িয়ে রয়েছে ফুল -ছবি হাতে নিয়ে , 
প্রভাত শিশিরে নিশার আঁধার ধুয়ে ,  
প্রসন্ন মুখে নিমন্ত্রণের হাসি ।  
"ভালোবাসি ভালোবাসি" --  
এই সুর যেন ভেসে যায় নভ -নীলিমায় ,  
দিগন্তপারের সীমায় ,  
আলোক-বসনা দিগাঙ্গনার নূপুরের শিঞ্জিনী   
এই সুরে পায় বাণী ।  
ধরণীর বুকে মানস সরসীনীরে ,  
ফোটে শতদল-- প্রেম সৌরভ বিলাতে  
আপনার সাথে নিখিল বিশ্ব মিলাতে ।  

আজ মনে হলো এই তো সেই, এতদিন যা চেয়েছি  
''ক্ষেপার হারানো পরশপাথর'', আজ যেন খুঁজে 
পেয়েছি ।  
মরুতৃষা নিয়ে ছুটে গেছি কোন সুদূরে ,  
মরীচিকামায়া নিয়ে গেছে মায়াপুরে ,  
নির্জলা এক স্বর্ণপাত্র দিয়েছিল হাতে তুলে , 
কামনার বশে বিবশ চিত্ত ,শুধু ক্ষণিকের ভুলে ,  
তাই নিয়ে বৃথা ফিরেছে জলের আশায় -- 
ব্যাকুল পিপাসা প্রকাশ পায়নি ভাষায় ।  
ভিখারীর হাতে সোনার পাত্র ? সে পাত্রে জলপান ?  
বিদ্রুপের হাসি হেসেছে সকলে, করে নাই জলদান ।  
সোনার সে বাটি হারালো যেদিন তপ্ত দ্বিপ্রহরে,  
"জল দাও", বলে ডাক দিয়েছিল আকুল কন্ঠস্বরে।  
শুধু জল নয় "প্রকৃতির" দেওয়া জলে ছিল   "ভালোবাসা"। 
এতদিন পরে তেমনি আমার জুড়ায়েছে মরুতৃষা । 
এই জীবনের প্রতিটি ক্ষণের যত ক্ষতি ,যত  ক্ষত ,  
যত পরাভব , অপূর্ণ কামনা যত ,  
আজ মনে হয় , সকলই মায়াবী ছায়া ;   
মানুষ রয়েছে নিকটে ও দূরে ধরে' আনন্দ কায়া ,  
সেই অপরূপ রূপধরে' আজ এসেছে প্রভাত কিরণে  ,  
অঞ্জলি ভরে আনন্দ -অশ্রু নিবেদন করি চরণে ।।   

দুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়  ,  
১০-০২ ২০২২, 
ব্যাঙ্গালোর ।  

































মঙ্গলবার, ৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২২

বিস্ময়

এই বহুশ্রুত রবীন্দ্রসঙ্গীতটি কার বা অচেনা , অজানা ? 

"আমার   সকল নিয়ে বসে আছি সর্বনাশের আসায়। 
আমি   তার লাগি পথ চেয়ে আছি পথে যেজন ভাসায় । 
যে জন   দেয় না দেখা যায় যে দেখে , 
                ভালোবাসে আড়াল থেকে ,
আমার   মন মজেছে সেই গভীরের গোপন ভালোবাসায় ।" 

এই গানটির একটি ইংরেজী অনুবাদ আমি করেছি , আমার প্রবাসী ছাত্র ও পরিচিতদের অনুরোধে : 

All, that I have in me and around,  
Waiting only to fall into ruins . 
And yearning for Him to get robbed of 
All of my possessions. 
He, though unseen, loves me incognite, 
And I too, have fallen solely in love 
With Him, The Infinite. 

(Incognito or incognite= lurking, taken the latter for rhythm.) 

ওই গানটির বাণী , ধ্বনি , সুর , কেন জানিনা সমস্ত প্রাণ-মন জুড়ে জাগালো গভীর এক জিজ্ঞাসা ।  
সত্যই তো , স্রষ্টার এ কেমন ধারা বিচার ? সবই নিবে কেড়ে , দিবেনা কিছু ছেড়ে । আবার তোমার সর্বনাশা , সর্বগ্রাসী ভালোবাসার অচ্ছেদ্য বাঁধনটিও রাখবে বেঁধে আমার 'আমিটিকে' ! 

এমনই এক আবেগে , আবেশে নিম্নোক্ত কবিতাটি রচিত । 





অবশিষ্ট  শূন্য 
___________________

সকালে উঠেই দেখি, 
দেয়াল-কোণায় এ কী, 
অচেনা একটি গাছে, 
          ছোট ফুল ফুটে আছে। 

 প্রজাপতি তার কোলে, 
পাখনা দুটি খুলে' 
হাল্কা হাওয়ায় দুলে' 
             খায় মধু আর নাচে। 

অবাক হলাম ভেবে, 
ব্যবস্থা কি তবে 
ছিলই অনুভবে, 
         স্রষ্টা যিনি, তাঁর ? 

মধু থাকবে ফুলে, 
নাচ দেখানোর ছলে , 
রাঙা ডানা মেলে , 
         আসবে প্রজাপতি । 

আনন্দ আর মধু 
সৃষ্টি সুখের যাদু –
তাদেরই যে শুধু, 
          তা চাননি বিশ্বপতি ।

জগৎজুড়ে আছে , 
সকল প্রাণের কাছে , 
দুঃখ শোকের মাঝে 
           সুধার পাত্র ভরা । 

হায়, সুধা ছেড়ে বিষ 
আমি খুঁজি অহর্নিশ 
তাই নাগিনী দেয় শিশ  – 
           তার ছোবলেই মরা । 

আমি স্বর্ণমৃগ চেয়ে, 
সুখ ফেলে, দুখ নিয়ে 
(মরি) হারাই, হারাই ভয়ে – 
                তবুও নাই চেতন । 

উজা়ড করে বুক 
যা আছে সবটুক্ – 
আমার যত সুখ 
     (কবে) দিব ফুলের মতন । 

হে, জগৎ-প্রজাপতি, 
তুমি নিঠুর অতি , 
 এমনই দিলে মতি – 
          চাওয়ার নাইকো শেষ  । 

যা চাই তাই দিবে 
আবার কেড়ে নিবে ,
 হঠাৎই 'শূন্য' ফেলে 
      শেষে মিলাবে ভাগশেষ ?! 

(প্রজাপতি = পুরাণ মতে  ব্রহ্মা , সৃষ্টিকর্তা।) 



দুলাল বন্দ্যোপাধ্যায় 
০৮/০২/ ২০২২ 
ব্যাঙ্গালোর । 






















 












সোমবার, ৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২২

The Bird that's flown away singing


                           An elegy  

(In memoriam -- Lata, an embodiment of music)  
------------------------------------------------------------

 The sun ☀ is sunken and the wearied Bird, 
Soaking her wings into the golden light, 
Disappeared from my eyes leaving songs, 
Those she's sung and sung for the day, so long. 
She'll sing no more, no more I'll see in the least, 
Those feathers white, that smile bright,  
That grace and loveliness, that not once, 
But many a time made gods and lords 
Bow their crowned heads down on her feet. 
O, the muse, Bird you weren't ever, 
And never were an earthly being, were rather, 
An embodied spirit made out of sur divine. 
Not my lips, as I can't sing, in my heart will ring 
Your mellow melodies unending and undying. 


For the readers : 
The Muse -- (Greek & Roman myths. one of the 
nine sister goddesses that inspires music). 
In this poem, ' the muse' -- poet's inspiration.  
Mellow--(here) full and pure without harshness. 
Style – A Shakespearean sonnet. 
             (Oxford Dictionary)







 




রবিবার, ৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২২

গান ও লতা – অবিনশ্বর।

লতা– সঙ্গীত প্রতিমা । 


যে-কটা দিন ছিলে এ-ধরার বুকে, 
 সঙ্গীত হয়ে রয়ে গেলে তুমি মানুষের সুখে দুঃখে। 
 এক সাধনায় যেমন মগ্ন একান্তে বনের লতা , 
ফুটাতে কুসুম সৌরভঘন নিঙাড়ি' বুকের ব্যথা। 
নন্দন-বন-বিকশিত শত সঙ্গীত-মঞ্জরি— 
অঞ্জলি ভরে দিয়ে গেলে তুমি–মর্তে সুরেশ্বরী। 

এ-ভূবন জুড়ে নর ও নারীর হৃদয় সাগর তলে, 
বিরহ মিলন অদেখা রতন, মণি-কাঞ্চন জ্বলে ; 
 আধাঁরে ছড়ানো রত্নকণায় গেঁথেছ সুরের হার---  
দিয়ে গেলে চির-স্মরণকালের গীতিমালা উপহার ।‌ 

কমলাসনার মানবী মূরতি, বাণীর প্রতিমা লতা, 
'নাই' হোলে আজ, রেখে গেলে দেবী, কণ্ঠের মধুরতা ।। 

দুলাল বন্দ্যোপাধ্যায় ।
৬/০২/ ২০২২ 
ব্যাঙ্গালোর ।











শনিবার, ৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২২

ভারতী বন্দনা

আমাকে দাও মা বেদনার ভার  
____________________________




মরুতৃষা বুকে ছুটেছি জননী 
শুধুই তোমার শরণে, 
যা ছিল আমার ধন-মান-যশ, 
সঁপেছি কালের চরণে। 
তোমার দেউলে কোন সুখ নাই, 
কেবলি দুঃখ নিশিদিন, 
ভক্ত তোমার আবাহন করে 
নিখিল বেদনা সীমাহীন। 
বিরহী প্রাণের বিষাদ গরল 
পান করে গান গায়, 
শোকার্ত হিয়ার হাহাকার খুঁজে 
রাত কাটে, দিন যায়। 
চির-জ্বলন্ত রাবনের চিতা 
বুকে নিয়ে ঘুরে ঘুরে, 
খাগের কলম হাতে ধরে বসে 
মৃত হস্তিনা পুরে । 
কোন্ ‌অনাথিনী কুটীর প্রান্তে 
মাথা কুটে সারা নিশীভোর, 
কোন্ বালিকার বিকায়নি মালা 
একান্তে মোছে আঁখিলোর‌।  
এসকল ব্যথা আপনার করে' 
যে নিয়েছে সেইই পায় বর, 
সুখের স্বর্গ কল্পনা মাগো,  
দুঃখই অবিনশ্বর । 
দু'দিনের প্রাণে যে জন দিয়েছে 
কামনা জলাঞ্জলি , 
অর্পনে তার আছে অধিকার 
চরণে পুষ্পাঞ্জলি । 
তবে তাই হোক যত দুখ শোক 
নিত্য জগৎজুড়ে , 
তোমার আশিষে সবই যেন আসে 
আমার হৃদয়পুরে ।। 

দুলাল বন্দ্যোপাধ্যায় , 
০৫/০২/২০২২ 
ব্যাঙ্গালোর ।






শুক্রবার, ৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২২

পুরুলিয়া

 ( এই লেখাটি গতকাল পরিমার্জণ ও সংশোধন করার সময় হঠাৎই মুছে যায়। আজ লেখাটি নূতন রূপে প্রকাশিত হোল। )

ঝাড়খন্ড, সেখানের জনজাতির বিভিন্নতা, ভাষার  বৈচিত্র, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও প্রকৃতিদত্ত অফুরাণ 
ঐশ্বর্য , সুদীর্ঘ লালিত সংস্কৃতি -- উন্নাসিক , ভদ্র , ধূর্ত  
ও তথাকথিত শিক্ষিত, বহিরাবরণে পরিশীলিত কিছু   শহুরে মানুষের লুন্ঠনের সম্পদ বিনোদনের সামগ্রী ।   দক্ষিণ বাংলার পশ্চিম অঞ্চল হতে ওই চাকায়   পর্বতমালা, মানভূম থেকে সিংভূম, পাহাড়, টিলা, নদ    নদী ঝোরা , ঝোপ জঙ্গল আকীর্ণ, উদ্গীরিত লাভা-   স্রোতে সৃষ্ট এই আদিম ভূমিখন্ডটির সমস্তটুকুই ,   অন্ধকার খনিগহ্বরে সুগুপ্ত, হীরক খন্ডের মতোই ছিল.   বহুকাল । হীরকখন্ডই --- সে একটি দুটি নয়,
 অসংখ্য, অনন্ত --- ভূতলে ,ভূ -অভ্যন্তরে। অফুরন্ত  খনিজ সম্পদ  গর্ভে ধারণ করে, একান্তে ছিল এই  অনাদ্যন্ত কালের ধরিত্রী ।  
ছোটনাগপুরের মালভুমি, শুধুমাত্র খনিজ সম্পদ,   বনজসম্পদ নয়, জলসম্পদেরও বিপুল উৎস ।   খরস্রোতা, ভয়ঙ্করী সব নদ নদী – অজয়, দামোদর,   ময়ূরাক্ষী, কংসাবতী, দ্বারকেশ্বর, শীলাবতী, সুবর্ণরেখা,   কালিন্দী আরো কত। সে সকল নদ, নদীর পাড়ে,   পাড়ে,  পাহাড়, টিলার কোলে কোলে শত সহস্ৰ গ্রামে,   বস্তিতে সহস্রযুগের, নানা জাতি গোষ্টির, ভিন্ন ভিন্ন   জীবন ছন্দের বৈচিত্রময় সহাবস্থান। ভাষা ও.  সংস্কৃতির  বর্ণময় বিভিন্নতা তো অতুলনীয় ।  
ভাদু, টুসু, কর্মা, আখান, ঘেঘান, ছেঁচরী বা ছেঁচান,  বাঁদনা, শিকার –- এমন কতো সব উৎসব। আছে ঝুমুর,  কীর্ত্তন, কবিগান, তরজা, চটকা, ছৌ নাচ...।  

এদেশেই পুরুলিয়া। অভিশপ্ত দেশভাগ। কাটা পড়ল   বাংলা ,পাঞ্জাব। বাঙলাকে তো বার বার ছেঁড়াছেঁড়ি।   মানভূম কেটে কিছুটা তৎকালীন উত্তর বিহারের   ধানবাদে, আর কিছুটা পশ্চিমবঙ্গের পুরুলিয়া।   ছায়াঢাকা, মায়াময়ী পুরুলিয়ার উপর দৃষ্টি পড়ল  "সভ্য" জগতের।  

"গর্বে যারা অন্ধ তোমার সূর্যহারা অরণ্যের চেয়ে ।  
সভ্যের বর্বর লোভ  
নগ্ন করল আপন নির্লজ্জ অমানুষতা।"  
                                               –রবীন্দ্রনাথ। 
 
পুরুলিয়ার সঙ্গে আমার নাড়ীর সম্পর্ক। আমার  পূজনীয় পিতৃদেব এখানে চাকুরীরত ছিলেন। আমার   মামাবাড়ি পুরুলিয়ায়। আমার এক ভাইয়েরও সেখানে   চাকরি ছিল, এখন বাস ও সপরিবারে বসবাস  ওখানেই।  আজ থেকে বছর তিনেক আগে ওখানেই,   ভামোরিয়ায়, একটি সংস্কৃতি মেলায় পুরুলিয়ার  কয়েকজন  স্বভাবকবির সঙ্গে দেখা হয়েছিল। তাঁদের  কাব্যাবেগের অনুপ্রেরণায় প্রাণিত হয়ে আমিও একটি  কবিতা রচনা করে' পাঠ করেছিলাম । 

আজ আপনাদেরও তা শুনাতে মন চাইছে ।  

লুণ্ঠিত অবগুণ্ঠন  
-–------------------------

এক  

ভালই হয়েছে বন্ধু এসেছে 
চৈত্রের বেলাশেষে, 
ভালই লাগছে বন্ধু এসেছে 
প্রণয়ের হাসি হেসে। 

সাজায়ে রেখেছি প্রেমের অর্ঘ্য 
শিমুল পলাশ রাঙা, 
মহুয়ার বনে বাসর শয়ান – 
বিয়া ছেড়ে আজ সাঙা। 

নিলাজ মনের মাধুরী ছড়াব 
ভাদু আর তুসু গানে, 
ঝুমুর বোলের তুলে ঝংকার 
ঘুঙুরের মিঠা তানে । 

হলুদ পাখীর নরম গলায় 
পিরীতি সুরভি বিলাব, 
চাঁদের আলাতে, মাদলের তালে 
 অঙ্গে অঙ্গ মিলাব। 

 শাল পিয়ালের ছায়ায় মায়ায়, 
লুকায়ে লুকায়ে খেলা, 
তুমি আর আমি কাটাব জীবন 
বসাব প্রাণের মেলা। 

দুই

ভাঙল হঠাৎ স্বপনের ঘোর 
ভেঙে গেল খেলাঘর, 
প্রণয়ী আমার ঘাতকের বেশে, 
এ কোন মায়াবী বর ! 

বিক্ষত করে অক্ষত বুক, 
নিঠুর নখর আঘাতে, 
সঞ্চিত চিত-সম্পদ সবই 
লুন্ঠন করে দু'হাতে। 

ঘনবন-কেশ লালসা আগুনে 
জ্বলে জ্বলে পুড়া চিতা – 
পঞ্চকোটের পঞ্চবটীতে 
আমি ধর্ষিতা সীতা। 

ঝুড়ি ঝুড়ি ভরা সহমর্মিতা, 
সমব্যথী কত আসে, 
মায়া কান্নার অভিনয় শেষে 
পিশাচের হাসি হাসে। 

বন্য প্রেমের মত্ত আবেগে 
কারে যে ডেকেছি অবেলায়, 
রূপের লালচে আসে নাই সে যে, 
এসেছে রক্ত পিপাসায়। 

ঘরের মরদ যত কালো হোক 
সে আমার মরমিয়া, 
তারই হাতে থাক্ মরণ বাঁচন – 
আমি সতী পুরুলিয়া ।। 

দুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়, 
০৫/০২/২০২২ 
ব্যাঙ্গালোর । 
–--------------------–-------------------------------------------------





Recently published

অমূল্য

He ( Tagore) who sees all things in his own self and his own self in all things, he does not remain unrevealed.                     ...