নেপালী বৌদ্ধ সাহিত্য শার্দুলকর্ণাবদান , প্রভু বুদ্ধ নিরঞ্জন অনাথপিণ্ডদ- য়ের আতিথ্য গ্রহণ করে' শ্রাবস্তী নগরে। সঙ্গে প্রিয় শিষ্য আনন্দ, এক গৃহস্ত বাটীতে আহার ভোগ করে 'বিহারে, প্রত্যাবর্তনের পথে তৃষ্ণার্ত বোধ করলেন। অদূরে দেখেন, এক চণ্ডাল কন্যা কুয়ো থেকে জল ভরছে কলসিতে ; তৃষ্ণা তখন তাঁর বক্ষ জুড়ে। ত্বরিত পদবিক্ষেপে তার কাছে গিয়ে আকুল প্রার্থণা ,"জল দাও"। বৌদ্ধ ভিক্ষু, তরুণ সন্ন্যাসী আনন্দের সূর্যকরোজ্জ্বল, প্রদীপ্ত রূপ দেখে আত্মহারা সুকুমারী প্রকৃতি ।
না , আর নয়। এবার স্বয়ং সেই স্রষ্টার অবিস্মরণীয় আখরগুলিই তুলে দি' ,--
"প্রকৃতি ।।
কেবল একটি গণ্ডুষ জল নিলেন আমার হাত থেকে , অগাধ অসীম হল সেই জল। সাত সমুদ্র এক হয়ে গেল সেই জলে , ডুবে গেল আমার কূল, ধুয়ে গেল আমার জন্ম ।
মা ।। তোর মুখে এ-সব কী শুনছি ।
প্রকৃতি ।।
এ কাহিনী আমার নতুন জন্মের ।
মা ।।
হাসালি তুই । নতুন জন্ম ! ঘটল কবে ?"
নৃত্যনাট্য "চণ্ডালিকা ", রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ।
এই নাটকগুলি তো অনিঃশেষ সুধাপাত্র । ভোক্তা সুধীজন । আমি তৃষা-ভরা কণ্ঠ নিয়ে , লুব্ধ দৃষ্টি মেলে চেয়ে থাকি শুধু ; "জল দাও ", চাইবার সাধ জাগে , কিন্তু সাধনা যে নাই ! তবু মাঝে ,মাঝে সকালবেলায় দেখি , শিশিরসিক্ত ফুল আসে । সে সবই ছবি যদিওবা , তবুও তাতে পাই না-দেখা প্রাণের হৃদয়াবেগের
অনুভূতি, ভালোবাসার আমন্ত্রণ। বুক ভরে যায়
সুখে। নিঃসম্বল এই পথিকের পাথেয় দান করেন যাঁরা,
পান্থজনসখা , তাঁদের উদ্দেশে এই কবিতাটি :
প্রতিদান শুধু প্রীতি
নাদেখা ,অদেখা বন্ধুরা সবে মিলে
হৃদয়দুয়ার খুলে ,
দাঁড়িয়ে রয়েছে ফুল -ছবি হাতে নিয়ে ,
প্রভাত শিশিরে নিশার আঁধার ধুয়ে ,
প্রসন্ন মুখে নিমন্ত্রণের হাসি ।
"ভালোবাসি ভালোবাসি" --
এই সুর যেন ভেসে যায় নভ -নীলিমায় ,
দিগন্তপারের সীমায় ,
আলোক-বসনা দিগাঙ্গনার নূপুরের শিঞ্জিনী
এই সুরে পায় বাণী ।
ধরণীর বুকে মানস সরসীনীরে ,
ফোটে শতদল-- প্রেম সৌরভ বিলাতে
আপনার সাথে নিখিল বিশ্ব মিলাতে ।
আজ মনে হলো এই তো সেই, এতদিন যা চেয়েছি
''ক্ষেপার হারানো পরশপাথর'', আজ যেন খুঁজে
পেয়েছি ।
মরুতৃষা নিয়ে ছুটে গেছি কোন সুদূরে ,
মরীচিকামায়া নিয়ে গেছে মায়াপুরে ,
নির্জলা এক স্বর্ণপাত্র দিয়েছিল হাতে তুলে ,
কামনার বশে বিবশ চিত্ত ,শুধু ক্ষণিকের ভুলে ,
তাই নিয়ে বৃথা ফিরেছে জলের আশায় --
ব্যাকুল পিপাসা প্রকাশ পায়নি ভাষায় ।
ভিখারীর হাতে সোনার পাত্র ? সে পাত্রে জলপান ?
বিদ্রুপের হাসি হেসেছে সকলে, করে নাই জলদান ।
সোনার সে বাটি হারালো যেদিন তপ্ত দ্বিপ্রহরে,
"জল দাও", বলে ডাক দিয়েছিল আকুল কন্ঠস্বরে।
শুধু জল নয় "প্রকৃতির" দেওয়া জলে ছিল "ভালোবাসা"।
এতদিন পরে তেমনি আমার জুড়ায়েছে মরুতৃষা ।
এই জীবনের প্রতিটি ক্ষণের যত ক্ষতি ,যত ক্ষত ,
যত পরাভব , অপূর্ণ কামনা যত ,
আজ মনে হয় , সকলই মায়াবী ছায়া ;
মানুষ রয়েছে নিকটে ও দূরে ধরে' আনন্দ কায়া ,
সেই অপরূপ রূপধরে' আজ এসেছে প্রভাত কিরণে ,
অঞ্জলি ভরে আনন্দ -অশ্রু নিবেদন করি চরণে ।।
দুলাল বন্দ্যোপাধ্যায় ,
১০-০২ ২০২২,
ব্যাঙ্গালোর ।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন