রবিবার, ১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২২

হাস্নুহানা

 কবিগুরুর শ্যামলী কাব্যগ্রন্থের 'হঠাৎ-দেখা' কবিতাটি মনে আছে ? 

"বাইরের আকাশের দিকে তাকিয়েই শুধোল , 
'আমাদের গেছে যে দিন 
একেবারেই কি গেছে - 
কিছুই কি নেই বাকি ?'  

একটু রইলেম চুপ করে ; 
তারপর বললেম , 
'রাতের সব তারাই আছে 
দিনের আলোর গভীরে'।" 

এই হোল রবীন্দ্রনাথের গদ্য কবিতার ধরণ । 
___________________________________________


হাস্নুহানার সাথে
______________

মস্ত সে‌‌ শহর ,
তারই এক কানা গলির শেষে 
এক টুকরো ঘর। 
আমার কথা ভেবেই বুঝি বিশ্বকর্মা নিজে, 
বনিয়ে দিয়ে গেছেন চলে চির অন্তরালে।‌
 সেথা আমিই থাকি একা – 
তাই বা বলি কেমন করে ; 
আরসোলা, টিকটিকি আর নেংটি ইঁদুর, 
তারাও ক'জন আমার সাথেই থাকে। 
'অফিস-পিয়ন' কাজ করি, আর 
ঘুমাই এখানেই। 
খওয়া-দাওয়া রাস্তা ঘাটেই সারি, 
গাঢ় সন্ধ্যায় ফিরিও ঘরে একা, 
কোন তাড়াই নাই । 
জীবন যেন মজে-যাওয়া খাল – 
পঁচিশ বছর পার ; 
জোয়ার ভাঁটার ইচ্ছাটিও ঢেকেছে জঞ্জালে। 

একদিন সে বাদল বেলার বিকেল , 
হেঁটে হেঁটে ফিরছি অফিস থেকে, 
এক বাগান-ঘেরা বাড়ির দেয়াল কোনায়, 
কেটে-ফেলা ঘাস-আগাছা হতে, 
চেনা ফুলের গন্ধ আসে ভেসে – 
হাস্নুহানাই ঠিক – আমার চেনা ফুল। 
কাটা-ছেঁড়া ডালের ডগা থেকে, 
ভেঙে-টুঙে নিলাম তিনটি শীষ্ । 
ঘরে ঢুকে ভাবছি আর হাসছি মনে মনে, 
কেন নিলাম, কোন সে ভাবের ঘোরে ! 
'দুচ্ছাই' , দুয়ো দিয়ে দিলাম তাদের রেখে, 
এক-পা ভাঙা , নড়বড়ে ওই টেবিলখানার উপর। 
ঘোর তন্দ্রা নামল চোখের পাতায় – 
রোজ এমনই নামে ; 
কিন্তু আজ যে স্বপ্ন এলো সাথে । 
''কেন আসো, কোন্ সে অজুহাতে ?"

শ্রাবণ রাত্রি বিকট অন্ধকার, 
ঝলকে ঝলকে বিদ্যুৎ, সাথে ঘন ঘন পড়ে বাজ, 
অঝোরধারায় ঝরঝর ঝরে জল, 
তার সাথে ওঠে পাড়াময় হাহাকার, 
শীলাবতী বাঁধ ভেঙেছে ওখানে, 
বান ঢোকে খলখল, 
জল আর শুধু জল, 
হু হু করে আসে, উঠোন ভাসাল, 
ঘরের ভিতরে ঢুকছে অনর্গল ! 

'ওরে কে আছিস আয়, চলে আয় ! 
আমাদেরটায় !'
ওই পাড়াটিতে ছিল সে একটি দালানকোঠা, 
কত লোক এলো, কারা জড়ো হলো, 
চেনা চিনি নাই কিছু। 
কানে ঢোকে রব– হায় হায়! বিকট কান্নাকাটি ! 
আমি, বাবা, মা তিন জন ভিজা কাক
ধরা ধরি করে আছি , 
না-মরা, না-বাঁচা – 'বাঁচাও, বাঁচাও' ডাক ; 
তবে তা ছিল মরণেরই কাছাকাছি। 
হঠাৎই কে যেন জড়াল আমাকে, 
চমক ভাঙল আর্ত কণ্ঠস্বরে ! 
"অমলদা !" চোখের পাতার জলের ঝরনা ঝেড়ে,
চেয়ে দেখি নুরি – একি রে, নূরুন্নাহার !
হাতে তার এক হাস্নুহানার ঝাড় ! 
"ধর এটি একবার, নিঙড়াই শাড়ি আমি।" 
বড় আদরের ফুলগাছ এটি তার , 
ঘর ডুববার আগে নিয়েছে সে তুলে , 
তারেও বাঁচাবে নিজেও বাঁচবে তবে। 
 তারপরে কী যে হোল, ঝড়..ঝড় ! 
বাজ ! বিদ্যুৎ ! প্রলয় ! এই কী নরক ! 
সর্বনাশের সীমা পারে তাকে পাবে– 
"না হোক্, না হোক্ কোন কালে মানুষের !" 

কেটে গেছে তারপর তিরিশ বছর। 
মনে আছে তিন দিন ছিল সেই ফুল-ধরা গাছ, 
কোন এক স্কুলের পেছাড়ের ঝোপের ভিতরে , 
আশ্রয় ছিল হা-ঘরে'দের, 
লুকিয়ে পুঁতেছি তাকে, 'নেবো পরে', 
এমনই ছিল এক আশা ! 
দুঃস্বপ্নের সে জীবন, স্বপ্নের সেই ভালোবাসা ! 
দূরে যাও, দূর হও হে অতীত ! "আঁ..আঁ !"
নিজেরই গলার স্বরে ফেটে গেল ঘুম ! 
কী ঘন গন্ধ আসে ঝরা অতীতের ! 
 আলো জ্বালি, জল খুঁজি । 
প্রথম নজর গেল টেবিলেরই উপর ।
দেখি, এখনও রয়েছে তাজা 
কাটা ছেঁড়া শাখা ক'টি – হাস্নুহানার । 
যেন দুবাহু বাড়ায়ে আছে নুরুন্নাহার।।

দুলাল বন্দ্যোপাধ্যায় 
১২/০২/২০২২ 
ব্যাঙ্গালোর । 



























কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Recently published

অমূল্য

He ( Tagore) who sees all things in his own self and his own self in all things, he does not remain unrevealed.                     ...