সোমবার, ১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২২

বসন্ত জাগ্রত দ্বারে

সুপ্রিয় পাঠক,  
সে আজ যুগান্তর পূর্বের কথা , আমাদের জ্যাঠামশাই   গ্রামের বাড়িতে একটি ফুলের বাগান করেছিলেন। কত   জাতের, কত বিচিত্র ফুলের গাছ ছিল সেখানে । আর   বসন্তকাল এলেই ফুলে ফুলে ফুলময়ী হয়ে উঠতো বাগানটি । জ্যাঠামশাই নাম দিয়েছিলেন তাঁর ঠাকুমা'র  নামে 'রাণীকানন'। এখন সে বাগান আমার ধূসর  স্মৃতির দিগন্তের ওপারে। এই কবিতাটি সেই বাগানের বর্তমান !  

(কবিতাটিতে একাধিক ছন্দ ব্যবহার করা হয়েছে)। 

 বসন্ত বিড়ম্বনা !  

কবিগুরু ,
বেশ তো একটি গান বেঁধেছ , 
 "আজি বসন্ত জাগ্রত দ্বারে , 
তব অবগুণ্ঠিত কুণ্ঠিত জীবনে  
করো না বিড়ম্বিত তারে।"  

আচ্ছা কবি , তুমি না হয় স্বপ্নমধুর পালে, 
পাড়ি দিতে কালিদাসের কালে । 
যাও দেখে এই গুটিপোকার হাল, 
কেমন ধারা কাটল তার ফাল্গুনী সকাল । 


গুটি পোকা গুটিয়ে ছিল 
গুটির অন্তরালে 
সারাটি শীতকালে , 
হঠাৎ করে কোন বিরহীর তপ্ত দীর্ঘশ্বাস 
রূপ ধরে হোল 'মলয়ানিল' – বসন্ত বাতাস । 
 বইলো  ভূবনময়, ঊষার চরণ ধরে। 
জন্মান্তর পরে, 
মিলনের ‌অভিসারে, 
গুটির বাঁধন খুলে,  
নয়নাভিরাম বিচিত্র ডানা মেলে, 
ঠিক যেন দেবদূত, 
অপূর্ব অদ্ভুত, 
পবনের পিঠে চড়ে, 
বন উপবন পার হয়ে উড়ে উড়ে, 
পৌঁছাল এসে রাণীর কুসুম কাননে– 
গান ছিল তার পাখনায়, হাসি ছিল তার আননে। 

শুভ্রবসনা কেতকী, কামিনী কলিকা, 
যুঁই যুথি যাতি শেফালী মল্লিকা, 
স্বর্ণকুমারী স্বর্ণচাঁপার ঘরে , 
 রাতভোর তারা মাধবীর সাথে ‌মাধুরী পানের পরে, 
ভোরের শিশিরে স্নান সেরে সবে মদালসা আঁখি  খুলেছে,  
আর, অনাহুত ওই প্রজাপতিটিকে দেখেছে,  
মহা শঙ্কায় শঙ্কিত হয়ে পাতার আড়ালে লুকালো,  
সুন্দর মুখ মায়ের আঁচলে ‌জড়ালো ।  ‌

মায়েরা তাদের বলেছিল, "ডানাওয়ালা কেউ এলে, 
নাচ নাচে  বা গায় গান যদি, মন ভুলানোর ছলে, 
হোক্ প্রজাপতি, হোক্ তারা মৌমাছি, 
কিছুতে যাবি না কারো কাছাকাছি,  
বিদেশী পাখায় ভর দিয়ে এক অ-সুখ এসেছে দেশে ।" 

বিস্ময় ভরে' প্রজাপতি ফিরে আশাহত বেদনায়,  
মধুহারা অসহায়। 
ওদিকে রয়েছে অতসী অপরাজিতা, 
(ভালোবেসেছিল যাদের দুঃখিনী সীতা।)  
সুবাসিনী নয়, নয় মধুরিমা তারা, 
তাই চিরদিন‌ মধুপ-সঙ্গ হারা, 
জবারাও ছিল, ওদিকে গোলাপবালা, 
শুধুই তাদের বর্ণের শিখা জ্বলা । 
মধু নাই কারো কাছে – 
দেবতার পায়ে যাবে, মালা গাঁথা হবে  
তাই, কোন মতে বেঁচে আছে। 

এক কোনে আছে কেয়া 
কণ্টকবন বিহারিণী মহাশয়া , 
না যাওয়ায় ভালো সেখানে, 
শতেক শত্রু লুকিয়ে রয়েছে ওখানে। 
রয়েছে শুভ্রা এবং রক্তকরবী , 
অপরূপা তারা, কিন্তু আত্মগরবী ! 
দিশাহীন প্রজাপতি, 
শ্রান্ত, ভ্রান্ত গতি – 
বিবশ পাখায় বসল গিয়ে কল্কে ফুলের কানায়, 
ছলকে উঠে রাতের শিশির পড়ল তার ডানায়। 
কোথায় সুবাস, কোথায় মধু, কোথায় বাসন্তিকা ? 
 ভিজা ঘাসে পড়ে আছে প্রজাপতিটাই একা ! 

 এলো তো ফাগুন, প্রেমের আগুন – 
কোথায় মুক্তদ্বার ? 
বিষাদের অবগুণ্ঠনে ঢাকা 
মধুময় সংসার !

দুলাল বন্দ্যোপাধ্যায় , 
১৫/০২/২০২২
ব্যাঙ্গালোর ! 
_____________________________________________















 







কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Recently published

অমূল্য

He ( Tagore) who sees all things in his own self and his own self in all things, he does not remain unrevealed.                     ...