বুধবার, ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৫

শ্রীমদ্ভগবত গীতায় অর্জুন -- পর্ব ১২

শ্রীমদ্ভগবত, অর্জুন --পর্ব ১২ 

                     ভক্তিযোগ

একাদশ অধ্যায় আমাদের সেখানেই শেষ হোল যেখানে শ্রীকৃষ্ণ ভগবান প্রাপ্তির সর্বশেষ এবং সর্বশ্রেষ্ঠ সাধনপন্থার দিশা নির্দিষ্ট করে দিলেন। অনন্যা ভক্তি এবং সর্বভূতে পরমাত্মা দর্শন। এখানে দ্বাদশ অধ্যায়ের আরম্ভের শ্লোকটি (প্রশ্নটি) অর্জুনের, 

"এবং সততযুক্তা যে ভক্তাঃ তাম পর্যুপাসতে।
যে চাপ্যক্ষরম অব্যক্তম্ তেষাং কে যোগবিত্তমাঃ।।" 

এবার ঈশ্বররূপে, ভগবৎসত্ত্বার মানববিগ্রহরূপে শ্রীকৃষ্ণকে কায়মনোবাক্যে স্বীকার করে নিয়ে তাঁর উপাসনার পন্থা‌ জানতে চাইছেন অর্জুন। হে মনোমোহন, এই যে সগুণরূপে আপনি দেখা দিয়েছেন, সেই মূর্তি ধ্যান করে যে ভক্ত আপনার উপাসনা করেন, আর অব্যক্ত নিরাকার 'ব্রহ্মরূপে' যে ভক্ত আপনার উপাসনা করেন --এনাদের মধ্যে কোন্ জন উত্তম 'যোগবিত্তমাঃ' ?
_______________________________________________

বিশেষ শব্দার্থ
এই 'যোগবিত্তমাঃ' বা যোগবেত্তা শব্দটি অতি তাৎপর্য্যবাহী। ঈশ্বর বা পরমাত্মার সঙ্গে ভক্তের অন্তরাত্মা যখন যুক্ত হয় তখন ভক্ত আর 'ভক্তের আরাধ্য'  একাকার। করুণাময়ের চিদানন্দঘন রূপ ভক্তের অন্তরে দিব্যমূর্তি ধারণ করে বিরাজ করে। ভক্ত তখন দেখেন চরাচর বিশ্ব জুড়ে তাঁরই লীলাবিলাস, তাঁরই উপস্থিতি। ভক্ত তখন বলতে পারেন, 

"জীবন মরণের সীমানা ছাড়ায়ে
বন্ধু হে আমার রয়েছ দাঁড়ায়ে।
এ মোর হৃদয়ের বিজন আকাশে
তোমার মহাসন আলোতে ঢাকা সে।
গভীর  কি আশায় নিবিড় পুলকে
তাহার পানে চাই দু'বাহু বাড়ায়ে।।"
                                 ---------- রবীন্দ্রনাথ।
ভক্ত বলতে পারেন, "তুমি তো বলেছ, যে মানুষ আমায় সব জায়াগায় দেখে, আমার মধ্যে সমস্তকে দেখে, সেও আমাকে ত্যাগ করে না, আমিও তাকে ত্যাগ করি নে।এই সাধনায় আমার যেন একটুও শৈথিল্য না হয়।"
--- রবীন্দ্রনাথ ('যোগাযোগ' উপন্যাসে কুমুদিনী)।
________________________________________ 


সগুণ বা সাকার, নির্গুণ বা নিরাকার উভয় রূপেই তাঁর আরাধনা করা যায়। তবে, শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, আমাতেই নিরন্তর ধ্যানমগ্ন হয়ে পরম শ্রদ্ধায় আমাকে সগুণরূপে যিনি ভজনা করেন তিনিই শ্রেষ্ঠ। সগুণরূপের বা সাকার ভগবানের কথা এই জন্যই শ্রীকৃষ্ণ বলছেন যে ব্যক্ত ভূতজগতও তো তাঁরই প্রকাশ। দশম অধ্যায়ের ৮ম  মন্ত্রে তিনি স্বয়ং সেকথা বলেওছেন, 

"অহং সর্ব স্যাৎ প্রভবো মত্তঃ সর্বং প্রবর্ততে।
ইতি মত্বা ভজন্তে মাং বুধা ভাব সমন্বিতা।।"

আবার জ্ঞানমার্গে (জ্ঞানযোগ) মন-বুদ্ধির অগোচর, নিত্য-ধ্রুব-অচল-অবিনাসী অব্যক্ত অক্ষরব্রহ্মরূপে  সর্বভূতের হিতার্থে , সর্বভূতে সমভাবাপন্ন হয়ে যে 'যোগী' ভগবৎ উপাসনা করেন, তিনিও আমাকে লাভ করেন। তবে, সেই নিরাকার পরমেশ্বররূপের সাধনা অত্যন্ত ক্লেশকর। কেননা, দেখ সখা, দেহধারী ব্যক্তি দেহাভিমানী হবেই। তাই নিজে দেহরূপে থেকে দেহশূন্য 'সত্ত্বায়' লীন হওয়া (দেহবদ্ভিঃ অব্যক্তা গতিঃ) দুশ্চর তপস্যার ব্রত। এ যোগসাধনা দুরূহ এবং সুকঠিন। অতএব সগুণরূপে ঈশ্বর উপাসনা ভক্তদের প্রিয় এবং তেমন ভক্ত আমারো প্রিয়। মৎপরায়ণ উপাসক সকল কর্ম আমাকে অর্পণ করে, অনন্যচিত্ত হয়ে, আমার সঙ্গে যুক্ত হয়ে (সর্বদা ঈশ্বরের গুণকীর্তন করতে করতে) পুরুষোত্তম পরমাত্মার দর্শন লাভ করেন।
আসলে স্বয়ং ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তো অর্জুনের সঙ্গেই আছেন। মানুষ অর্জুন মানবরূপী সর্বব্যপ্ত ঈশ্বরকে সর্বদা প্রত্যক্ষ করছেন। ঠিক তেমনি সাধক যিনি, ভক্ত যিনি তিনি যখন সকল মানবের মধ্যে, আরো পরিব্যপ্তরূপে সমস্ত জীব-অজীব ভূতজগতের মধ্যেই, এমনকি নিজের মধ্যেও ঈশ্বরসত্ত্বার অনুভব লাভ করবেন তখন 'সগুণ ভগবানই' সেই সাধকের বা ভক্তের আরাধ্য --- 'সাধনধন'। তখন তাঁর মোহ কিংবা শোক কিছুই থাকবে না। তখন তিনি এই সৃষ্টির ভিতর স্রষ্টাকে এবং আপন পরমসত্ত্বার ভিতরে সৃষ্টিকে লাভ করেছেন। তখন সেই সাধক উপলব্ধি করবেন তিনিও (তাঁর সঙ্গে বিশ্বচরাচর) অজ ও অমর --- চিদানন্দময় ব্রহ্ম। গীতাবাণীর দ্বিতীয় অধ্যায় থেকেই এই ভক্তিসংমিশ্রিত সাধন-যোগের কথাই 'নরলীল' বাসুদেব অর্জুনকে বলছেন। এই কথাগুলি ঈশা   উপনিষদের সপ্তম মন্ত্রটির প্রতিধ্বনি, --- 

"যস্মিন্ সর্ব আনি ভূতানি আত্মৈবাভূদ্ বিজানতঃ। ।
ত্র কো মোহঃ কঃ শোক একত্বম্ অনুপশ্যতঃ।।" 

(শ্রীমদ্ভগবত গীতার এই স্থানে, একাদশ অধ্যায় থেকেই, নিরাকার বা সাকার, নির্গুণ বা সগুণ ব্রহ্মোপাসনার ভেদরেখা এতই সূক্ষ্ম যে ব্রহ্মবিদ ঋষিগণ ও সাধকবৃন্দের হৃদয়েই তা প্রতিভাসিত হয়।)
শ্রীকৃষ্ণ বলে চলেছেন, আমাতে সগুণভাবে, ভক্তির দ্বারা একাত্মতা অনুভব করে যে ভক্ত নিত্য ধ্যান করে, ভজনা করে (উপাসতে) তাকে আমি হে অর্জুন, মৃত্যুরূপ সংসার সাগর থেকে উদ্ধার করি। মন, বুদ্ধি ,আমাতে নিবিষ্ট করলে আমাকেই প্রাপ্ত হবে, আমাতেই নিবাস করবে (নিবসিষ্যসি)। এইরূপ অনন্য, নিশ্চল একাগ্রতা অভ্যাস যোগের মাধ্যমে লাভ করা যায়। "আমার যা কিছু কর্ম আমি ঈশ্বরের জন্যই করছি" --- এই ভাবনায় স্থিত থেকে, অর্থাৎ 'ভগবদর্থ কর্মপরায়নতার' দ্বারা ভগবৎ প্রাপ্তির সিদ্ধি লাভ হয়। (নবম অধ্যায়ের ২৭তম শ্লোকেও এই কথাই  শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন।
যৎ করোষি যদশ্নাসি যজ্জুহোষি দদাসি যৎ।
যৎ তপস্যসি কৌন্তেয় তৎ কুরুষ্ব মদর্পণম্।।")
ভগবান বাসুদেবের উপদেশবাণীগুলির মধ্যে দ্বিরুক্তি, পুনরুক্তি আছে সত্য, কিন্তু তাঁর ভক্তের যে গুণাবলির উল্লেখ তিনি করেছেন সে সবই মানবতাবাদের পরাকাষ্ঠা। দ্বাদশ অধ্যায়ের ১৩-তম শ্লোক থেকে (১৩ থেকে ২০) ভগবান বলছেন, যে সাধক দ্বেষভাবরহিত, নিঃস্বার্থ, দয়ালু, প্রেমিক, নিরহঙ্কার, ব্যক্তিমমতাহীন, সুখ-দুঃখে সমভাবাপন্ন, ক্ষমাপ্রবন, সতত সন্তুষ্ট, জিতেন্দ্রিয়, আমাতে দৃঢ়নিশ্চয় ও আমাতেই মন-বুদ্ধি-সমর্পিত, যিনি উদ্বিগ্ন হন না, অপরের উদ্বেগের কারণও হন না, হর্ষ ও বিষাদ যাকে একইরূপে স্পর্শ করে, আকাঙ্ক্ষাহীন, অন্তরে বাহিরে শুদ্ধ, কর্মদক্ষ কিন্তু কর্তিত্বাভিমানী নন, যে  পুরুষ শত্রুমিত্রে, মান-অপমানে, শীতে উষ্ণতায় সমভাবযুক্ত এবং সংসারে আসক্তিশূন্য তিনি আমার প্রিয়। আমার প্রিয় ভক্ত আহারে, বিহারে, বাসস্থানে সর্বদা সন্তুষ্ট এবং আমাকেই আশ্রয় করে থাকেন।
এইভাবে নিজ ভক্তের গুণসমুহের বর্ণনা করার পর পরিশেষে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বললেন, 

যে তু ধর্ম্যামৃতং ইদম্ যথোক্তোং পর্যুপাসতে।
শ্রদ্দধানাঃ মৎপরমা ভক্তাঃ তেহতীব মে প্রিয়ঃ।।‌ ।।২০।। 

এই যে 'ভক্ত, ভক্তি, শ্রদ্ধা, প্রেম' প্রভৃতি শব্দগুলি শ্রীমদ্ভগবত গীতার দ্বাদশ অধ্যায়ে বিশেষভাবে উচ্চারিত হোল, তাতে আমাদের ধারণা হয়েছে ঋকবেদের সময়কাল থেকে (বেদ, ব্রাহ্মণ, আরণ্যক, উপনিষদ বা বেদান্ত পরবর্তী) পৌরাণিক কাল পর্যন্ত চলে‌ আসা স্মৃতিশাস্ত্র অনুসারী যে ধর্মাচরণের ধারা আর্যসমাজের এবং ভারতের লোকায়তিক সমাজের মধ্যে চলমান ছিল তার সম্পূর্ণ না হলেও বৃহদাংশিক বিবর্তন সম্ভাবিত হয়েছিল। (নিরীশ্বরবাদী জৈনধর্ম, বৌদ্ধ ধর্মধারণার ভিতরেও 'বেদ-ব্রাহ্মণ-স্মৃতি'র সংস্কারসর্বস্ব 'তান্ত্রিকতার অনুপ্রবেশ ঘটেছিল)। প্রথমত ধর্মাচরণ সর্বজনীন হতে পেরেছিল, এবং দ্বিতীয়ত 'ভক্তির প্লাবনে'  বর্ণবিভাজনের  নিষ্ঠুর কঠোরতা যথেষ্ট প্রশমিত হয়েছিল।
"বৎস, শুধু ব্রাহ্মণের আছে অধিকার
ব্রহ্মবিদ্যালাভে।" * সেখান থেকে হাজার হাজার বছর পর নানা বিবর্তনের মধ্যে দিয়ে এসে 'ভক্তিবাদ' বলতে পেরেছিল, "চণ্ডালোহপি দ্বিজশ্রেষ্ঠ হরিভক্তিপরায়নঃ।"
___________________________________________ 


বিশেষ আলোচনা
*(ঋষি গৌতম সত্যকাম জাবালের প্রতি, 'ব্রাহ্মণ'---রবীন্দ্রনাথ।
সত্যকামের সত্যনিষ্ঠায় ঋষি তাকে শিষ্যত্বে বরণ করেছিলেন। ছান্দোগ্য উপনিষদে গল্পটি অতি সংক্ষিপ্ত এবং ঋষি গৌতম মনে করেছিলেন সত্যাশ্রয়ী সত্যকাম অবশ্যই ব্রাহ্মণসন্তান। গল্পটি অত্যন্ত দ্বান্দ্বিক, কেননা আচার্য গৌতম সত্যকামকে চারশো ক্ষীণ ও দুর্বল গরু পৃথক করে তাদের চারণের নিমিত্ত বনে  পাঠিয়েছিলেন। "কৃশানামবলানাং চতুঃশতা গা নিরাকৃত্য উবাচ সৌম্যানুসংব্রজেতি।।" সত্যকামও বলেছিল এই গোধন সহস্র হলেই সে ফিরবে। গল্পটির বহুবিধ ব্যাখ্যা হয়েছে ঠিকই কিন্তু নির্মম ব্রাহ্মণ্যবাদী "হিন্দুদের" এই ধারণা এখনো আছে যে "শুধু ব্রাহ্মণের আছে অধিকার ব্রহ্মবিদ্যালাভে।" এর প্রমাণ 'ব্রাহ্মণ' কবিতাটিতেও বিদ্যমান। ঋষি গৌতমের জাবাল সত্যকামের সত্যনিষ্ঠার প্রতি অনুরাগ সত্বেও তার ব্রাহ্মণ গোত্রীয় শিষ্যগণের গোত্রহীন সত্যকামের প্রতি ঘৃণা উলঙ্গভাবে প্রকাশ পেয়েছে।
" দীক্ষাকামী সত্যকাম গোত্ররহিত, তার স্বমুখে এই 'নির্লজ্জ অনার্যসুলভ' ঘোষণা শুনে ঋষির শিষ্যবর্গের প্রতিক্রিয়া একটি মধুচক্রনির্ভর কল্পচিত্রে প্রকাশিত : 

                " .... শুনি সে বারতা
ছাত্রগণ মৃদুস্বরে আরম্ভিল কথা,
মধুচক্রে লোষ্ট্রপাতে বিক্ষিপ্ত চঞ্চল
পতঙ্গের মতো ; সবে বিস্ময়বিকল।
কেহ বা হাসিল, কেহ করিল ধিক্কার
লজ্জাহীন অনার্যের হেরি অহংকার।" 

মধুপগুঞ্জনের তুলনা দেওয়া হয়েছিল শান্ত সামগীতির সঙ্গে। সে গম্ভীর মধুর গীতিধ্বনি আর থাকল না। স্নিগ্ধ সুকুমার শিষ্যদের মূর্তি এক লহমায় মারমুখী হয়ে উঠল। তাদের ধিক্কার উপহাসের হুলের জ্বালায় সত্যকাম বিদ্ধ এবং দগ্ধ হতে থাকে। এমন যে হোল, তার কারণ রবীন্দ্রনাথ শিষ্যদের বিচারকের আসনে বসিয়ে দিলেন। শিষ্যরা যেন আগামী দিনের ব্রাহ্মণ, সেই সব সংস্কৃতি-নেতা, যাদের ধৃষ্ট প্রশাসন সংসারে সমাজে শান্ত শৃঙ্খলাবিন্যাস ও সুষমা ফিরিয়ে আনবে। রবীন্দ্রনাথ সেই শিষ্যদের একজন। এবং তিনি ব্রাত্য, সত্যকাম রবীন্দ্রনাথও।"
----(বীতশোক ভট্টাচার্য, 'পুরাণ প্রতিমায় রবীন্দ্রনাথ')

ছান্দোগ্য উপনিষদ 'শ্রুতি'র কাল লুপ্ত হয়েছে কবে, হাজার হাজার বছর পেরিয়েও এসেছে মানুষের সভ্যতা, তবু আজও দলিত, ব্রাত্য, দরিদ্র, অপাংক্তেয় 'গোত্রহীন'জনের বুকে অবমাননার রক্তপ্রস্রবন লাভাস্রোতের মত নিরন্তর উদ্গীর্ণ হয়ে‌ চলছে বর্ণান্ধ সমাজের অমানবিক উপেক্ষায়, নাসিকাকুঞ্চিত তাচ্ছিল্যে, নিষ্ঠুর ধিক্কারে --- এমনকি নারকীয় হনন-উল্লাসেও ! সত্যকাম জাবালের লাঞ্ছনা, রাম কর্তৃক শূদ্র শম্বুকের শিরশ্ছেদ, জতুগৃহে নিষাদ-সন্তানদের জীবন্ত দহন, রাজধানী পত্তনের আছিলায় বনবাসীসহ খাণ্ডববনদাহন --- পুরাণ ইতিবৃত্তের এ-সকল হিংস্র পৈশাচিক ঘটনার উদাহরণ বর্তমান ভারতবর্ষেও কি  অপ্রতুল ? 


রিচার্ড ফিক (R. Fick) একজন প্রখ্যাত বৌদ্ধসাহিত্য বিশেষজ্ঞ। তাঁর মতে,
"we do not hesitate to make use of the conditions of modern India which, on account of the stability of most Oriental cultures, have preserved so much of the past for comparison with, and for the explanation of, the entire periods. .
প্রাচ্য সংস্কৃতির স্থবিরতার দরুন ভারতের আধুনিক পরিস্থিতিতেও প্রাচীন অবস্থার অনেক কিছুই টিকে থেকেছে ; তাই প্রাচীন অবস্থার সঙ্গে তুলনা করবার জন্যে  ও প্রাচীন অবস্থাকে ব্যাখ্যা করবার জন্যে ভারতবর্ষের আধুনিক অবস্থার কথা ব্যবহার করতেও আমাদের দ্বিধা হয না।
          ('লোকায়ত দর্শন'--- দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়।) 

পরবর্তী ত্রোয়োদশ পর্ব (পর্ব ১৩), শ্রীমদ্ভগবত গীতায় অর্জুন, ত্রয়োদশ অধ্যায়। 

                     (ক্ৰমশঃ) 
____________________________________________










রবিবার, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৫

শ্রীমদ্ভগবত গীতায় অর্জুন-১১


শ্রীমদ্ভগবত গীতায় অর্জুন --১১

নিয়তিবাদ ও প্রাচীনকালে আস্তিক ও নাস্তিক ধর্মবিশ্বাস 


পর্ব ১০-এ আমরা 'নিয়তি'-বাদ নিয়ে আলোচনা করবার সময় বলেছিলাম প্রাচীন ভারতবর্ষের মত পৃথিবীর অন্যান্য দেশেও যে সভ্যতাগুলি গড়ে উঠেছিল সে সমস্ত স্থানের সাহিত্যে ও দর্শন চিন্তায় এই গীতোক্ত কথার প্রতিধ্বনি শোনা যায়। গ্রীক দর্শনে Stoicism (বৈরাগ্যদর্শন)-এর কথা আছে। প্রায় ৩০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে গ্রীস দেশে ও রোমে এই দর্শন প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল। জেনো নামের একজন দার্শনিক (Zeno of Cerium/Cyprus) এই Stoicism বা বৈরাগ্যবাদের প্রবর্তক ছিলেন। এই ষ্টোয়িক দর্শন বিশ্বাস করে যে মানুষের সিদ্ধান্তসমূহ এবং তার কর্ম নির্ভর করে এমন এক স্বর্গীয় পরিকল্পনার দ্বারা যা ঈশ্বর পূর্বেই ব্যবস্থা করে রেখেছেন।
অপর দিকে ঠিক একই সময়কালে, ৩০৭ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে, এপিকিউরাস (Epicurus) নামের আরেক এথেন্সবাসী দার্শনিক এই 'ষ্টোয়িক'বাদের বিপরীত আরেক দার্শনিক মতবাদের প্রবর্তনা করেন যা হেডোনিজম (Hedonism) বা এপিকিউরিয়ানিজম (Epicureanism) নামে আখ্যায়িত। এই দার্শনিক তত্ত্বের মূল কথা 'আনন্দবাদ' -- যেখানে মৃত্যুভীতি বা দৈবশক্তির ভয় (Fear of God) থাকবে না। আমাদের দেশের চার্বাকপন্থী মতবাদের মতই -- যাবৎ জীবেৎ সুখং জীবেৎ।
এখানে আমরা সুদূর গ্রীসদেশের দুটি বিপরীতমুখী দার্শনিক মতবাদের ( Philosophical Schools of Thoughts) সামান্যতম ইঙ্গিত দেবার প্রয়োজনীয়তা বোধ করেছি এই কারণেই যে জিজ্ঞাসু পাঠকের ঔৎসুক্য বর্ধিত হবে, এবং তিনি উপলব্ধি করবেন যে আজ থেকে প্রায় তিন/চার হাজার বছর আগে মানুষের চেতনার মধ্যে কী সমুন্নত জ্ঞানসূর্যের অভ্যুদয় ("তিমিরবিদার উদার অভ্যুদয়") ঘটেছিল এবং এই পুন্যভূমি ভারতবর্ষেও আরও উন্নততর দর্শন চিন্তার, বিপরীতমুখী ধর্মধারণার  চরম বিকাশ সম্ভব হয়েছিল। বৈদান্তিক ব্রহ্মবাদ ও লোকায়ত নিরীশ্বরবাদের একই সাথে বিকাশ সম্ভব হয়েছিল ভারতবর্ষের প্রাচীন  ধর্মচিন্তায়। আদি সাংখ্য, আদি পূর্বমীমাংসা, চার্বাকের বস্তুবাদ (materialism) বৌদ্ধ দর্শন, নাগার্জুনের শূন্যবাদ --- ঈশ্বরের অস্তিত্ব স্বীকার করে না।
আমরা গীতার আলোচনাকালে এইসকল আধ্যাত্মিক জ্ঞান ও বিচারের কথা স্মরণে রাখতে চেষ্টা করব এই কারণেই যে গীতার অলৌকিক ঐশ্বরিক 'বিভূতি' বর্ণনায় 'যুক্তি ও বিশ্বাসের' সামঞ্জস্যতা অনেক স্থানেই দুর্লক্ষ্য এবং 'বিরোধাভাসে' আচ্ছন্ন মনে হয়। পরবর্তী কালে ভগবান শঙ্করাচার্যের 'অদ্বৈতবাদ' বা অদ্বৈত বেদান্তের আলোকে 'আস্তিক ও নাস্তিক' মতবাদের 'দ্বন্দ্ব' অবলুপ্ত হয় বলে ভক্তিবাদ স্বীকার করে। 'শ্রীমদ্ভগবতম্ পুরাণ' সৃষ্টির আদি কারণরূপে পরমপুরুষ শ্রীকৃষ্ণকেই ধারণ করেছেন ও প্রতিষ্ঠা করেছেন। 'শ্রীমদ্ভগবত গীতার' একাদশ অধ্যায় থেকে আমরা ভক্তিবাদের নির্দ্বন্দ্ব মন্দির-প্রাঙ্গনে প্রবেশ করব।

_____________________________________________


আমরা আবারও শ্রীমদ্ভগবত গীতায় প্রত্যাবর্তন করি।
দেখ অর্জুন, শ্রীকৃষ্ণ বলছেন,
"দ্রোণঞ্চ ভীষ্মঞ্চ জয়দ্রথঞ্চ
             'কর্ণং তথা ন্যানপি যোধবীরান্।
ময়া হতাংস্ত্বং জহি  মা ব্যথিষ্ঠাঃ
            যুধ্যস্ব  জেতাসি  রণে সপত্নান্।।"
কৌরব পক্ষের  সকল রথী মহারথীদের আমি যমালয়ে পাঠিয়ে দিয়েইছি ; এখন তোমার ভয়ের আর তো কোন কারণই নেই। অতএব 'নিঃসপত্ন' হবার জন্যই 'যুদ্ধ কর' ! জয়ী হবার জন্য 'যুদ্ধ কর'। (এখানেই নিয়তি নির্ধারিত কর্মের জন্যই বাধ্য হয়ে কর্ম করার বিধান ; অতএব ফলের আকাঙ্ক্ষা তো নিরর্থক। এক গভীরতম দার্শনিক তত্ত্বের অবতারণা করা হয়েছে। উপসংহারে আলোচ্য।)
এরপর শ্রীকৃষ্ণের এবম্প্রকার কথা শুনে সঞ্জয় বলছেন ধৃতরাষ্ট্রকে (সঞ্জয় উবাচ), হে রাজন, আমি তখন দেখলাম মহারথী অর্জুন, শিরোমুকুট পরিহিত অবস্থাতেই কৃতাঞ্জলিপুটে, শ্রদ্ধা ও শঙ্কায় প্রকম্পিত শরীরে সারথি কৃষ্ণকে আনত মস্তকে প্রণাম নিবেদন করে ভয় ও  বিস্ময়বিগলিত কণ্ঠে বললেন, 

"স্থানে হৃষিকেশ তব প্রকীর্তা 
জগৎ প্রহৃষ্যতি অনুরজ্যতে চ।
রক্ষাংসি ভীতানি দিশো দ্রবন্তি
সর্বে নমস্যন্তি চ সিদ্ধসঙ্ঘা।।" 

তাই  হে হৃষিকেশ, আপনার এমত ঐশ্বর্যসমন্বিত নাম ও প্রকীর্তির (পরাশক্তি) জন্যই জগৎচরাচর আপনার গুণকীর্তনে আনন্দিত হয়, মানুষের অনিষ্টকারী রাক্ষসগণ সন্ত্রস্ত থাকে এবং সিদ্ধপুরষেরা আপনার প্রতি প্রণাম নিবেদন করে। আপনি আদি, ব্রহ্মারও পূর্বজাত, (আপনি বায়ু, যম, অগ্নি, শশাঙ্ক, প্রজাপতি-- সবই ; লক্ষণীয়, ঋগ্বেদীয় সকল ভিন্ন ভিন্ন দেবতারা উপনিষদের কালে এসে 'এক' হয়ে গিয়েছেন) আপনি দেবশ্রেষ্ঠ, সৃষ্টির আশ্রয়স্বরূপ, সদাসৎ গুণেরও পরপারে 'অক্ষরব্রহ্ম' -- সচ্চিদানন্দঘন সত্ত্বা। আপনাকে বার বার নমস্কার। হে অনন্তবীর্য, হে সর্বাত্মন (সর্ব আত্মার দশদিকে বিরাজমান একীভূত রূপ) আপনাকে সব দিক থেকে নমস্কার,
"নমঃ পুরস্তাৎ অথ পৃষ্ঠতস্তে
নমোহস্তু তে সর্বত্র এব সর্ব।" 

হে যদুকুল-অলঙ্কার, হে সখা, আপনার এই বিশ্বময় রূপের মহিমা পূর্বেই জ্ঞাত না হয়ে হয়তো আমি বয়স্যসুলভ ভালোবাসায় বা প্রমাদবশতঃ অশিষ্ট বাক্য বলেছি, হয়তোবা আহার-বিহার-শয়ন-উপবেশনকালে মিত্রবর্গ সন্নিকটে উপহাসছলে আমার কথিত প্রগলভ সম্বোধনে আপনি অবমানিত হয়েছেন ! আপনার প্রতি সে-সকল সাধারণোচিত ব্যবহারের জন্য হে অপ্রমেয়,  আজ আমাকে ক্ষমা করুন ! "ক্ষাময়ে ত্বাম অহম অপ্রমেয়ং।" আপনি এই সৃষ্টিচরাচরের পিতা, গুরুশ্রেষ্ঠ, এই ত্রিলোক আপনারই গুণৈশ্বর্যের প্রভাবদ্বারা বশীভূত ! আপনিই একোমেবাদ্বিতীয়ম্ পরাৎপরম্ ! (এখন সুধীজন ও ভক্ত পাঠকগণের হৃদয়ে অবশ্যই উপনিষদের মহামন্ত্র অনুরণিত) এইভাবে প্রার্থনারত হয়ে (সঞ্জয় কুরুরাজ ধৃতরাষ্ট্রকে বলছেন) সব্যসাচী অর্জুন ভক্তিবিগলিত আবেগে উচ্চারণ করলেন,‌ 

"তস্মাৎ প্রণম্য প্রণিধায় কায়ং
প্রসাদয়ে ত্বাম অহমীশম ঈড্যম্।
পিতেব পুত্রস্য সখেব সখ্যুঃ।
প্রিয়ঃ প্রিয়ায়ার্হসি দেব সোঢ়ুম।।" 
________________________________________


                  ব্যাখ্যা
(আহাঃ, কী অপূর্ব, কী মধুর, কী অনুরাগ-রঞ্জিত আত্মনিবেদন!)
হে প্রভু, আমার এই কায়া আপনার শ্রীচরণে সর্বান্তকরণে সমর্পণ করে আপনাকে প্রণাম করি। হে পরমেশ্বর, আপনি প্রসন্ন হোন। হে দেবশ্রেষ্ঠ, পিতা যেমন পুত্রের, সখা যেমন সখার, পতি যেরূপ প্রিয়তমা পত্নীর অপরাধ সহ্য করে আপনিও সেইরূপ আমার দোষসকল সহ্য করুন। আপনিই যে অপরাধ ক্ষমা করবার যোগ্য !
মনে হয় যেন এ-যুগের আমাদের আরেক মহাকবির পূজাসঙ্গীতের সুরে বলি, 

"ওহে জীবনবল্লভ, ওহে সাধনদুর্লভ,
আমি মর্মের কথা, অন্তরব্যথা কিছুই নাহি কব---
শুধু জীবন মন চরণে দিনু বুঝিয়া লহ সব।..."
                                        ---------রবীন্দ্রনাথ। 

শুধু এ-যুগের কবির কথা বলি কেন, বেদান্ত পরবর্তী যুগ থেকে যুগ যুগান্তর ধরে ভক্তি আন্দোলনের যে ঢেও "গঙ্গেচ যমুনেচৈব গোদাবরী সরস্বতী নর্মদে সিন্ধু কাবেরী-" জলধারা-সিঞ্চিত এই পুন্যভূমি ভারতবর্ষের চতুর্দিক উচ্ছ্বসিত আবেগে পরিপ্লাবিত করেছে -- শত সহস্র কবির কাব্যে, মহাকাব্যে, পুরাণে গাথায় গীতে যার তরঙ্গধ্বনি নিত্যদিন অনুরণিত হয়েই চলেছে অবিরাম তার উৎসমুখ ঐ পূর্বোদ্ধৃত শ্রীমদ্ভগবত গীতার একাদশ অধ্যায়ের ৪৪তম প্রার্থনামন্ত্রটি। 

যাই হোক্, বারান্তরে এই বিষয়টির উপর আমরা আলোচনা করব। এখন, এই যে গাণ্ডীবধন্বার অনুরাগ-রঞ্জিত ভক্তহৃদয়ের আত্মসমর্পণ, এখানে 'দীনতার অভিমান' নেই, আছে 'পরাশক্তির কাছে' 'অপরাশক্তির' দায়বদ্ধতা, কেননা 'শ্রীকৃষ্ণ প্রণম্য, স্তুতি করার যোগ্য' (প্রণম্য ত্বাম ঈড্যম) ; এবং সেই পরাৎপর মহাশক্তির আদেশ তিনি পালন অবশ্যই করবেন। যত বড়  শৌর্য-বীর্যশালী তিনি হোন না কেন, জগদ্ধৃত শ্রীকৃষ্ণ গোবিন্দের স্বরূপ তিনি প্রত্যক্ষ করেছেন যে ! সেই করাল --ভয়াল রূপে জগতপতির দর্শন লাভ করে একদিকে তিনি যেমন ধন্য হয়েছেন, অপরদিকে তেমনই ভয়ে বিস্ময়ে অভিভূত ! অতএব, 'হে বিষ্ণো, আপনি আপনার শঙ্খ-চক্র-গদা-পদ্মধারী চতুর্ভুজরূপ পরিগ্রহ করেই প্রকটিত হোন্। সখারূপে আপনি আমার কাছে যেমন চিরপরিচিত হয়ে আছেন, তেমন 'নরলীল' নয়, নিখিল নয়নাভিরাম নারায়ণ মূর্তিতে আপনাকে দেখতে চাই। 

"কিরীটিনং গদিনং চক্রহস্তমিচ্ছামি
তাং দ্রষ্টুমহং তথৈব।
তেনৈব রূপেণ চতুর্ভুজেন
সহস্রবাহো ভব বিশ্বমূর্তে।।" 

সুধী পাঠকদের স্মরণে আছে, কিছুপূর্বে আমরা আলোচনা করছি যে সেই পুরাণকাল থেকে অদ্যাবধি নারায়ণের এহেন রূপ আমাদের ধ্রুপদী সাহিত্যে বর্ণিত হয়ে তো এসেইছে, লোকায়তিক আখ্যান-উপাখ্যান-পাঁচালীতেও তার কীর্তন অফুরন্ত। আমাদের বাঙলায় (বাংলাদেশসহ অবিভক্ত বাংলা) নারায়ণ পূজার দুটি ধারা। একটি নারায়ণ পূজা, অপরটি সত্যনারায়ণ পূজা। সত্যনারায়ণ পূজার মধ্যে (ইসলামের সুফী ধর্মধারার) 'সত্যপীর ও হিন্দু ধর্মবিশ্বাসের নারায়ণ'-এর এক অসাম্প্রদায়িক সমন্বয়ের ধর্মীয় ঐতিহ্য প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। অপরদিকে নারায়ণ পূজা অসাম্প্রদায়িক ও সামাজিক ভাবে নির্দ্বন্দ্ব হলেও তন্ত্রমন্ত্র অনেকটাই 'ব্রাহ্মণ' (বেদের কর্মকাণ্ড) এবং স্মৃতিশাস্ত্রের আচার-উপচার ভিত্তিক। এই দুটি পূজার যে পাঁচালী তাও আংশিকভাবে ভিন্ন। দ্বিতীয়টি, অর্থাৎ নারায়ণ উপাসনার পাঁচালীতে আমরা শ্রীমদ্ভাগবৎ গীতায় বর্ণিত শ্রীকৃষ্ণের অর্জুন-প্রার্থিত রূপ দেখতে পাই। 

নারায়ণ পাঁচালীর অংশবিশেষ, 

"নিজরূপ ধরিলেন দেব নারায়ণ।
পূর্বজন্ম তপোফলে দেখিল ব্রাহ্মণ।।
বিরিঞ্চি বাসব ভব ভাবেন ধেয়ানে।
সেবেন নারদাদি অতুল চরণে।।
দ্বিজের ভাগ্যের কথা না যায়না কথনে।
কমলা-সেবিত পথ দেখিল নয়ানে।।
শঙ্খ চক্র গদা পদ্ম চতুর্ভুজ রূপ।
পরিধানে পীতপট্ট গলায় কৌস্তুভ।
কিরীটি মুকুট মাথে শিখীপুচ্ছ চূড়ে।
মকরন্দ লোভে কত মধুকর উড়ে।।
অলকা তিলকা ভালে শোভে শশীকলা।
মকর কুণ্ডল কর্ণে শোভে বন মালা।।
নিন্দি ইন্দুবরাননে নয়ন ভ্রুধনু।
কোটি চন্দ্র ছটা কিবা নবঘন তনু।।
কলধৌত মুকুতা খচিত মকরতে।
অঙ্গের ভূষণ শোভা করে নানামতে।।"
                          ----- পাঁচালীকার রামভদ্র।
_____________________________________________
একাদশ অধ্যায়ে ১থেকে ৪, ১৫ থেকে ৩১, এবং ৩৬ থেকে ৪৬ ও ৫১ -- এই শ্লোকসমূহে সখা শ্রীকৃষ্ণের কাছে অর্জুনের, ঔৎসুক্য, আর্তি, ভীত-বিস্মিত মুগ্ধতা, প্রার্থনা এবং অবশেষে নম্রচিত্ত আত্মসমর্পণের অঙ্গিকার ব্যক্ত হয়েছে। অর্জুন শ্রীকৃষ্ণকে সখা, অন্তর্যামী, প্রভু, গোবিন্দ, হরে, ভগবন্ , মহাবাহো, পরমেশ্বর, বিষ্ণো, মহাত্মন, বিশ্বেশ্বর, কমলনেত্র ইত্যাদি পরম ঐশ্বরিক গরিমাময় সম্বোধনে আহ্বান করেছেন। (অবশ্য সঞ্জয়ের দ্বারা রাজা ধৃতরাষ্ট্রের প্রতি উক্ত --সঞ্জয় উবাচ--- কথাগুলি তো সমস্ত গীতার আখ্যানভাগের অবিচ্ছেদ্য বিষয়, কেননা কৃষ্ণার্জুনের পূর্ণ কথোপকথনের মূল ও ধারাবাহিক বর্ণনার মূল বক্তা সঞ্জয় এবং শ্রোতা অন্ধ ধৃতরাষ্ট্র।)
(শ্লোক ৪৬-এ) এবার অর্জুন যখন প্রার্থনা করছেন চতুর্ভুজ নারায়ণরূপে তিনি সখার দর্শন লাভ করতে চান তখন  ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, দেখ অর্জুন, এই যে আদি-অন্তহীন, তেজোময় 'বিশ্বরূপ' (বিশ্ব এবং ঈশ্বরের সংযুক্ত, 'অপৃথক', অবিযুক্ত সত্ত্বা) তুমি দেখেছ তা তুমি ছাড়া আর কেও কখনো দেখবার সৌভাগ্য প্রাপ্ত হয়নি। বেদ পাঠ, যজ্ঞানুষ্ঠান, দান, শাস্ত্রানুমোদিত ক্রিয়াকর্ম --- এমনকি উগ্র তপস্যা দ্বারাও এই জগৎ-ব্যপ্ত রূপ, একমাত্র তুমি ব্যতিত কেও দেখতে সমর্থ হয়নি এবং হবেও না। আমার (ব্রহ্মের সৃষ্টি-স্থিতি-সংহারকারী বিরাট শক্তির একত্র বিস্ফার) ঘোর প্রলয়ঙ্কর প্রকাশ দেখে তুমি বিমূঢ়, ব্যাকুলিত হয়েছ জেনেই তোমার কাঙ্ক্ষিত রূপেই প্রত্যক্ষ কর। এই কথা বলে, (সঞ্জয় রাজা ধৃতরাষ্ট্রকে বলছেন) ভগবান বাসুদেব নিজের চতুর্ভুজ নারায়ণের দেবমূর্তি ধারণ করলেন। "স্বকং রূপম্ দর্শয়ামাস ভূয়ঃ"। 

আবারো শ্রীকৃষ্ণ যখন পুনরায় মনুষ্যদেহে অবতীর্ণ তখন অর্জুন প্রকৃতস্থ হলেন। ভীতিবিহ্বলতা হতে মুক্ত হলেন। 

দৃষ্টেদং মানুষং রূপং তব সৌম্যং জনার্দন।
ইদানীমস্মি সংবৃত্তঃ সচেতা প্রকৃতিং গতঃ।। 

মানুষের রূপে দেখি' ওগো জনার্দন।
চিত্ত হোল শান্ত প্রভূ, জুড়ালো জীবন। (১)

তারপর একাদশ অধ্যায়ের (৫২, ৫৩, ৫৪ এবং ৫৫) শেষ চারটি মহাবাণীর মধ্য‌ দিয়ে ভগবান বাসুদেব স্বয়ং ভগবৎসাধনার সর্বশ্রেষ্ঠ যোগ--- ভক্তিযোগের পথ ও প্রাপ্তির (পরমার্থ প্রাপ্তি) সান্ত্বনাসন্দেশ বিতরণ করেছেন।  (পরবর্তীকালে ভক্তিরসামৃতসিন্ধু ভাগবৎপুরাণে  তা অনুরাগরসসিক্ত কাব্যমাধুর্যে বাকমূর্তি লাভ করেছে)।
হে অর্জুন, আমার এই সুদুর্লভ, সুদর্শনধারী, চতুর্ভুজ দৈবপ্রকাশ যা তুমি তোমার শুভদৃষ্টিতে আস্বাদন করলে তার জন্য দেবতারাও চির আকাঙ্ক্ষিত। বেদ অধ্যয়ন, তপস্যা, দান ও যজ্ঞ-সংকল্প দ্বারাও এই রূপ প্রত্যক্ষগোচর হয় না। তুমি, হে অর্জুন, যেহেতু পরন্তপ (পরম তপোবিশিষ্ঠ), তাই তোমাকে জানাই একমাত্র অনন্যা ভক্তির পথেই, 'পরম গতি' -- এই ভাবের (তত্ত্বেন) দ্বারাই আমাকে লাভ করা যায়। 

"মৎকর্মকৃৎ মৎপরমঃ মদ্ভক্তঃ সঙ্গবর্জিতঃ।
নির্বৈরঃ সর্বভূতেষু যঃ স মামেতি পাণ্ডব।।" 

জীবনের সমস্ত কর্মই যে আমাতে অর্পণ করে, আমাতেই যার গতি --- এমন তন্মতায় যে লীন থাকে, আমার প্রেমেই যার প্রেমের চরিতার্থতা, যে জগৎসংসারের ভূত বস্তুর প্রতি আসক্তিরহিত, যে সকল প্রাণীতে আত্মভাব পোষণ করে (নির্বৈর বা বৈরীভাববিবিক্ত) সেই অনন্য- ভক্তিপরায়ণ মানুষ আমাকে (পরমগতি ভগবান কৃষ্ণকে) লাভ করে।
                    (ক্রমশঃ)

পরবর্তী 'দ্বাদশ পর্ব' দ্বাদশ অধ্যায় থেকে।
একাদশ অধ্যায়, 'বিশ্বরূপদর্শনযোগ' শ্রীমদ্ভগবত গীতার সর্বশ্রেষ্ঠ দ্বন্দ্বময় অধ্যায়গুলির একটি। বার বার পড়ুন, স্বজনদের পড়ান। বিশ্বের এক এবং অদ্বিতীয় ধর্ম ও দর্শন বিষয়ক গ্রন্থটি সর্বত্রগামী হোক্ --- প্রার্থনা করি।

দুলাল চন্দ্র বন্দোপাধ্যায়
১৪ই সেপ্টেম্বর, ২০২৫
ব্যাঙ্গালোর।
________________________________________



















শুক্রবার, ৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৫

শ্রীমদ্ভগবত গীতায় অর্জুন--১০

শ্রীমদ্ভগবত গীতায় অর্জুন --১০

দশম অধ্যায়ে শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বলছেন, হে অর্জুন, আমার এই অপার অন্তহীন, বহুত্ব জেনে তোমার কি প্রয়োজন ? প্রয়োজন যদিও আছে কিন্তু জানা যে অসম্ভব ! বৃহদারণ্যক উপনিষদ যেমন বলেছেন,
"ইদং মহোদ্ভুতম্ অনন্ত মদ্ অপারং বিজ্ঞানঘন এব ----" এই মহৎ সত্ত্বাটি অন্তহীন, অপার ; জ্ঞান স্বরূপ মাত্র। 
এই জন্য আমাকে 'তত্ত্বতঃ' জানাই শ্রেয়। এই যে বিরাট পুরুষ, নিখিল ভূবনের যা কিছু সাকার, নিরাকার, আলো-অন্ধকারের যিনি মূর্ত মূর্তিররূপে 'দণ্ডায়মান' তাঁকে সখা কৃষ্ণরূপে তো ধনঞ্জয় দেখে আসছেন‌ এতকাল, কিন্তু আজ তাঁর কথা শুনে বিস্ময়াবিভূত! অর্জুন বলছেন, হে সখা, অনুগ্রহ করে যে অধ্যাত্ম বিষয়ক উপদেশবাণী আমাকে প্রদান করেছেন তাতে আমার মোহ, আমার অজ্ঞতা বিনষ্ট হয়েছে। আমি ভূতজগতের সৃষ্টি, লয় এবং আপনার অবিনাশী মাহাত্ম্য শ্রবণ করবার সৌভাগ্য লাভ করেছি। তবু এখন ইচ্ছা করছে আপনার ঐশ্বর্য, অতুলনীয় রূপ স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করি।
"মন্যসে যদি তৎ শক্যম্ ময়া দ্রষ্টমিত প্রভো।
যোগেশ্বর তো মে তং দর্শনয়াত্মানমব্যয়ম্।।" 

আহা ! কী অপূর্ব প্রার্থনা ! আপন বাহুবলে পৃথিবীজয়ী, অরিন্দম ধনঞ্জয় বলছেন, হে প্রভো, ('প্রভু' শব্দ সম্বোধনে 'প্রভো') আপনার করুণার্দ্র হৃদয়ে যদি আমার স্থান থাকে, যদি মনে হয় আমি আপনার চরাচরপরিব্যপ্ত রূপ দেখবার যোগ্য্, তবে হে যোগেশ্বর, আপনার আত্মরূপ আমাকে দর্শন করান। অর্জুনের প্রার্থনার সন্তুষ্ট হয়ে ভগবান তাঁর দিব্যরূপ দেখবার আদেশ করলেন। সে শত শত সহস্র সহস্র আকৃতি, বর্ণ বিশিষ্ট বিচিত্র অলৌকিক রূপ। সে 'বিরাটের' মধ্যে বিশ্বভূবন। আদিত্যসহ অদিতির দ্বাদশ পুত্র, অষ্টবসু, একাদশ রুদ্র, আশ্বিনীকুমারদ্বয়, ঊনপঞ্চাশ পবন --- সমস্তই তাঁরই মধ্যে বিরাজিত ; অর্জুন যা কখনো দেখেননি। শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, এ তো একাংশ মাত্র। আমাকে পূর্ণত দেখবার জন্য আমি তোমার 'প্রাকৃত' নেত্রের পরিবর্তে তোমায় দিব্য নেত্র প্রদান করছি। দিব্য নেত্র লাভ করে দিব্য দৃষ্টিতে অর্জুন ভগবানের 'বিশ্বরূপ' দর্শন করছেন --- এই মহাদর্শনে অর্জুন আত্মসংবিদহারা, মুগ্ধ, নির্বাক। তাহলে ? কি দেখছেন ধনঞ্জয় ? কি ভাবেই বা বর্ণনা করবেন তিনি ? এখানেই মহাকবির লেখনীর অভাবনীয় মোচড়। কি দেখছেন অর্জুন তার বর্ণনা দেওয়া হোল সঞ্জয়ের মুখে। সঞ্জয়, যিনি ধর্মক্ষেত্র কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধারম্ভের প্রাক্ কাল থেকে সমস্ত ঘটনার বিবরণ রাজা ধৃতরাষ্ট্রের কাছে বিবৃত করে চলেছেন তিনি এখন 'বিশ্বরূপের বর্ণনা দিচ্ছেন ধৃতরাষ্ট্রকে।
হে রাজন, সঞ্জয় বলছেন, অর্জুনকে দিব্যদৃষ্টি দান করে মহাযোগেশ্বর শ্রীহরি তার মহৈশ্বর্যময় দিব্যরূপে প্রকটিত হোলেন ;  সে এক স্থানকালব্যপ্ত মহান পুরুষবিগ্রহ--- অসংখ্য মুখ, বহু নেত্র, দিব্যাভরণযুক্ত, দিব্যাস্ত্রধারী, মাল্যে-বস্ত্রে-গন্ধানুলেপনে অবর্ণনীয়, পরমাশ্চর্য সেই পরম ভগবৎসত্ত্বার রূপ দেখতে লাগলেন পার্থ, যে স্বর্গীয় রূপ থেকে প্রকাশিত হতে লাগল সহস্র সূর্যের জ্যোতিঃ-- 

"দিবি সূর্যসহস্রস্য ভবেদ যুগপদুত্থিতা।
যদি ভাঃ সদৃশী সা স্যাৎ ভাসস্তস্য মহাত্মন।।" 

কদাচিৎই এমন লোকাতীত দ্যুতিময় পরমাত্মার প্রকাশ সম্ভব হতে পারে। আত্মনিবেদিত মহাভক্ত কুন্তীনন্দন তৃতীয় পাণ্ডবের কী অপার সৌভাগ্য যিনি এ বিশ্বের আপাত বৈচিত্র্যময়, নানা ভেদ ও বিভিন্নতার মধ্যে  এক পূর্ণসত্ত্বাকে অবলোকন করছেন।
_______________________________________________
                          ব্যাখ্যা
অন্তরমধ্যে এই মহা দৈবসংঘটন চিন্তা করে 'শ্রীভাগবতম্'-এর সেই স্তবগান অনুরণিত হয়ে ওঠে নিখিল ভক্ত হৃদয়ে,
"যস্মিন্নিদং যতশ্চেতম্
যেনেদং য ইদং স্বয়ং।
যোহস্মাৎ পরস্মাৎ চ পরঃ।
তৎ প্রপেদ্য স্বয়ংভূবম্---।।" 

সেই আদি জন্মমৃত্যুহীন স্বয়ম্ভূ-সত্ত্বার আমি শরণাগত হই  যাঁর মধ্যেই এ-বিশ্বলোক বিধৃত, যাঁর দ্বারা বিশ্বলোকের উদ্ভব, এবং যিনি এই সৃষ্টির (ব্যক্ত জগতের পারে) এবং অব্যক্ত জগতেরও পারে।
এই পুন্যভূমি ভারতবর্ষে 'আবির্ভূত' বা রচিত শ্রুতি সংহিতা, ব্রাহ্মণ সংহিতা, আরণ্যক, উপনিষদ, শ্রীমদ্ভগবত গীতা, স্মৃতিশাস্ত্র ও পুরাণগুলি এই সাক্ষ্য  বহন করে যে যুগ যুগ ধরে অসংখ্য ঈশ্বরপ্রমাণ সাধক মনুষ্যজ্ঞানের শিখরবিন্দু ("The last phase of human knowledge" --- S. Radhakrishnan.) স্পর্শ করেছেন। তপস্যার দ্বারা, সাধনার দ্বারা সেই পবিত্র জ্ঞান আত্মস্থ করেছেন। তারপর সাধারণ্যে সে-সকল আহৃত জ্ঞানরাশী বিতরণ করেছেন যাতে মানুষ তার অন্তরস্থিত দেবতাকে চিনতে পারে। শ্রীমদ্ভগবত গীতা তেমনই এক জ্ঞানের বহতা নদী যা পরম জ্ঞানের চূড়া থেকে নিঃসৃত। এই শ্রীমদ্ভগবত গীতার বাণী বহু সাধকের দ্বারা বহুরূপে, বহুভাবে ব্যাখ্যাত হয়েছে, অনেকানেক সম্প্রদায়ের সৃষ্টি হয়েছে। সে সবের মধ্যে প্রধান আচার্য রামানুজের শ্রী সম্প্রদায়, আচার্য মধভাচার্যের ব্রহ্ম সম্প্রদায়,‌ আচার্য বিষ্ণুস্বামী ও বল্লভাচার্য প্রতিষ্ঠা করেছেন রুদ্র সম্প্রদায় এবং আচার্য নিম্বার্ক প্রতিষ্ঠিত কুমার সম্প্রদায়। এ ছাড়া মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্য প্রতিষ্ঠিত গৌড়ীয় বৈষ্ণব সম্প্রদায় এখন একটি আন্তর্জাতিক বৈষ্ণব ধর্ম প্রতিষ্ঠানে‌ পরিণত হয়েছে। সাধনা চলেছে, পরমব্রহ্মের সাধনা, শ্রীকৃষ্ণের আরাধনা। 'দ্বন্দ্বময় ভূমণ্ডলের নিয়ন্তারূপে, যোদ্ধৃরূপে, সখারূপে, সন্তানরূপে, প্রেমিকরূপে তিনি নিখিলমানবমানসমন্দিরে নিত্য বিরাজিত। তাই এই শ্রীকৃষ্ণের 'বিশ্বরূপ' যা কুরুক্ষেত্র সমরাঙ্গনে তাঁর প্রিয়সখা অর্জুন দেখছেন-- যুগ যুগান্তর ধরে ভক্তকুলও তাঁদের হৃদয়দেউলে দর্শন করে চলেছেন।
_______________________________________________

আবারও আমরা ফিরে আসি অর্জুনের 'বিশ্বরূপ' দর্শনের তীর্থ ভূমি কুরুক্ষেত্রে। এখন দর্শক পার্থ, বক্তা সঞ্জয়, শ্রোতা ধৃতরাষ্ট্র। সঞ্জয় বলছেন হে রাজন, পাণ্ডুনন্দন তখন নানা আকারে, প্রকারে, রঙে, রূপে বিভক্ত, খণ্ডিত জগতকে 'এক' এবং  একাকাররূপে দেখছেন 'দেবদেবস্য' ভগবান শ্রীকৃষ্ণের অভ্যন্তরে। আশ্চর্যান্বিত, বিস্ময়বিহ্বল, রোমাঞ্চিত কলেবর অর্জুন অর্ধাবনতদেহ, কৃতাঞ্জলীপুটে স্তবের ভঙ্গিমমায় উচ্চারণ করেছেন, হে কেশব, আপনার এই শরীরের মধ্যেই তো সকল দেবতা, ভূত জগৎ, কমলাসনে অধিষ্ঠিত ব্রহ্মা, স্বয়ং দেবাদিদেব মহাদেব, ঋষিগণ, দিব্য সর্পসমূহ --- সমস্তই বর্তমান। আপনি আদি মধ্য‌ অন্তহীন 'বিশ্বরূপ। হে বিষ্ণু, গদা-চক্রযুক্ত, প্রজ্বলিত হুতাশন বা জ্যোতির্ময় আদিত্বের ন্যায় এই অনন্য রূপ যেন এই মহাবিশ্বের সমস্তকিছুকে আবরিত করে আছে। 

"দ্যাবাপৃথিব্যোঃ ইদং অন্তরম্ হি
                     ব্যাপ্তং ত্বৈকেন দিশশ্চ সর্বাঃ।
দৃষ্ট্বা অদ্ভুতম্ রূপম্  উগ্রম্ তবেদং
                  লোকত্রয়ং প্রব্যথিতং মহাত্মন।।" 

এ কী অতিলৌকিক, মহাভয়ঙ্কর রূপ! ঊর্দ্ধে আকাশ, নিম্নে ধরিত্রী, মধ্যিখানে সকল দিক-দিগন্ত পূর্ণ করে এই যে প্রদীপ্তময়, শঙ্কাবিধানকারী, মানব-নেত্রে অসহনীয় আপনার বিরাটত্ব দেখে "প্রব্যথিতম্ লোকত্রয়ম্"।।
এই বিশ্বপ্রসারিত আপনার অবয়বের মধ্যে দেবতারা কৃতাঞ্জলীপুটে প্রবেশ করছেন, মহর্ষিবৃন্দ স্বস্তি বাক্য উচ্চারণ করেছন, রুদ্রগণ, আদিত্যসকল, সুরাসুর, গন্ধর্ব --- ভীত-বিস্মিত আপনাকে অবলোকন করছেন। আপনার এরূপ একের মধ্যে বহু এবং বিচিত্র, করাল, ভীতিপ্রদ রূপ দেখে ত্রিলোকসহ আমিও আশঙ্কিত হয়ে উঠেছি। হে দেব,  আপনার ব্যাদিত জ্বলন্ত  মুখগহ্বরগুলির অভ্যন্তরে যেন আসন্ন প্রলয়ের পূর্বাভাস। এ যে অসহনীয় ! 

"দিশো ন জানে ন লভে চ শর্ম
প্রসীদ দেবেশ জগন্নিবাস।।" 

আমার দিগ্বিদিক চেতনা ভ্রান্তির অন্ধকারে অবলুপ্ত। হে ত্রিলোকাধিকারী, জগতের আশ্রয়, আপনি প্রসন্ন হোন্।
এ কী প্রলয় সমুত্থিত দেখছি প্রভু ! ঐ সব ধার্তরাষ্ট্রগণ, ভীষ্মদ্রোণাদি বীরসকল, কর্ম সহ আমাদেরও মহা মহা যোদ্ধারা, আপনার অসংখ্য করালদংষ্ট্র-বিশিষ্ট মুখের  ভিতরে সবেগে বিক্ষতদেহ, বিচুর্ণিতমস্তকে প্রবেশ করে চলেছে ---নদী যেমন সম্মুখস্থ, তটস্থিত প্রাণ অপ্রাণ সমস্তকিছুকে সমুদ্রসঙ্গমে নিয়ে যায়‌, ঠিক তেমনি এই আত্মম্ভরী নরলোক সুতীব্র গতিতে প্রধাবিত হয়ে আপনার ঐ মৃত্যুরূপী বিকট হাঁ মুখগুলিতে প্রবেশ করছে। পতঙ্গরা যেভাবে প্রদীপশিখার মোহে আচ্ছন্ন আবিষ্ট হয়ে জ্বলন্ত অগ্নিতে আত্মনাশ করবার জন্য ধাবিত হয় -- এ-দৃশ্য যেন তেমনি। এমন ভয়ঙ্কর 'প্রকাশে', হে বিষ্ণু আপনি কে, যাঁর লেলিহান অনন্ত মুখ বিশ্বজগতকে গ্রাস করে চলেছে ? যাঁর প্রজ্বলিত হুতাশন-সদৃশ তেজপুঞ্জ চরাচর পরিপূর্ণ করে দগ্ধ করে চলেছে ? হে ভয়াল, হে করাল, হে সৃষ্টিবিনাশী 'দেববর', আপনার শ্রীচরণে আমি প্রণত, আপনি কৃপা করে আপনার দিব্য পরিচয় ব্যক্ত করুন। আপনার প্রকৃতি, আপনার প্রবৃত্তি আমি কিছুই জানিনা। 

'আখ্যাহি মে কো ভবানুগ্ররূপো
                       নমোহস্তু তে দেববর প্রসীদ।
বিজ্ঞাতুমিচ্ছামি ভবন্তমাদ্যং
                    ন হি প্রজানামি তব প্রবৃত্তিম্।।" ১১।।৩৪ 

প্রত্যোত্তরে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ জানালেন, দেখ অর্জুন, এখন আমি কাল --- মহাকাল। এখন লোক সমূহ ধংস কর করা প্রয়োজন। এখন ধর্মের গ্লানি পরিলক্ষিত হচ্ছে। এখন যুদ্ধকাল, প্রতিপক্ষে যারা আছে তারা (তুমি ছাড়া) সকলেই বিনাশপ্রাপ্ত হবে। বিনাশ যাদের হবার তারা বিনষ্ট হবেই ; তুমি যোদ্ধারূপে নিমিত্ত মাত্র। যাদের তুমি আত্মীয়, সুহৃদ, গুরু বা স্বজন বলে, তাদের প্রতি বৈরিতায় ও অস্ত্রাঘাতে মোহবশতঃ অনীহা প্রকাশ করেছিলে তারা সকলেই (আমার দ্বারা) নিহত হয়েই আছে। এখন কষ্ট না পেয়ে (মা ব্যথিষ্ঠাঃ) শত্রুদের নাশ করার জন্য, জয় লাভ করবার জন্যই যুদ্ধ কর, ---'যুধ্যস্ব'।
_______________________________________________

                            ব্যাখ্যা
ভারতবর্ষের ধর্ম ও দর্শনশাস্ত্র একদিকে অনাদি, আবার অন্যদিকে বৈচিত্র্যময়। অসংখ্য মত ও পথ এবং অন্তহীন গভীরতা। এতক্ষণ (একাদশ অধ্যায়ে, শ্লোক ৩৪ পর্যন্ত), সঞ্জয় কথিত বিবরণ থেকে অন্ধ, নির্বাক ধৃতরাষ্ট্র কি নিশ্চিত হলেন যে 'যা অবশ্যম্ভাবী' তাই ঘটছে এবং 'ফলিবে যা ফলিবার আছে। নিয়তি কেন বাধ্যতে।' বস্তুত 'নিয়তিবাদ' ভারতীয় দর্শনে শুধু নয়, বিশ্বদর্শনেও  একটি অমোঘ সত্যরূপে পুরাণে, কাব্যে, মহাকাব্যে মানুষের অস্তিত্বের নিয়ন্ত্রকের ভূমিকা গ্রহণ করে এসেছে। 
নিয়তিবাদ বলে মানুষের (পরিব্যপ্ত আকারে ভূতজগতেরও) ভবিষ্যৎ পূর্বনির্ধারিত। তার উপর মানুষের কোন নিয়ন্ত্রণ নেই। সমস্ত পুরাণকাহিনীতে তো বটেই বিশেষ করে বায়ুপুরাণ ও মৎস্যপুরাণে 'নিয়তির শাসন'-এর উপর চরম গুরুত্ব আরোপিত হয়েছে। মৎস্যপুরাণ আবার 'নিয়তি ও কাল'কে সমার্থক বলে ঘোষণা করেছে। সে সত্য প্রতিপন্ন হয়েছে শ্রীকৃষ্ণ যখন বলছেন, "কালোহস্মি লোকক্ষয়কৃত প্রবৃদ্ধো"...।  এখানে তিনি আরও বলছেন, ঐ যে তোমার প্রতিপক্ষ, আমার দ্বারা তারা পূর্বেই মৃত হয়ে আছে। তুমি নিমিত্ত মাত্র। 
"ময়ৈবৈতি  নিহতাঃ পূর্বমেব
নিমিত্তমাত্রং ভব সব্যসাচিন্।।" 

কৃষ্ণ তো এখানে সাক্ষাৎ নিয়তি। অর্জুনের কী বা করার আছে ? শুধুমাত্র 'নিমিত্ত' হয়ে যুদ্ধটুকু করতে হবে। এত বিদ্যার সাধনা, এত অস্ত্রশিক্ষা, এত পরাক্রম, শৌর্য-বীর্য-ঐশ্বর্য -- সবই কি তবে নিষ্ফলা ? 'নিয়তি' শব্দটির কী বিভীসিকাময় তাৎপর্য্য ! এই শব্দের উচ্চারণে রক্তবীজের মত জন্ম নেয় বীভৎস সব কল্পমূর্তি ---- দৈব, ভাগ্য, কাল, বিধি, বিধিলিপি, কৃতান্ত, অদৃষ্ট ভবিতব্যতা ! মানবজীবনের কী বিষাদকরুণ পরিণতির (Tragedy) অবশ্যম্ভাবিতা !
পৃথিবীর অন্যান্য সভ্যতার দর্শনে, সাহিত্যে তো বটেই, গ্রীক সাহিত্যে ও দর্শনে এই নিয়তি বা destiny-র ভূমিকা প্রবল, যুগপৎ নিদারুণ।
পরের পর্বে এই বিষয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করে আমরা আবার 'শ্রীমদ্ভগবত গীতায় অর্জুন' বিষয়টিতে ফিরে আসব।
পরবর্তী একাদশ অধ্যায়ের পর্ব ১১।। ৩৫ থেকে। 
                    (ক্রমশঃ)


Recently published

অমূল্য

He ( Tagore) who sees all things in his own self and his own self in all things, he does not remain unrevealed.                     ...