শুক্রবার, ৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৫

শ্রীমদ্ভগবত গীতায় অর্জুন--১০

শ্রীমদ্ভগবত গীতায় অর্জুন --১০

দশম অধ্যায়ে শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বলছেন, হে অর্জুন, আমার এই অপার অন্তহীন, বহুত্ব জেনে তোমার কি প্রয়োজন ? প্রয়োজন যদিও আছে কিন্তু জানা যে অসম্ভব ! বৃহদারণ্যক উপনিষদ যেমন বলেছেন,
"ইদং মহোদ্ভুতম্ অনন্ত মদ্ অপারং বিজ্ঞানঘন এব ----" এই মহৎ সত্ত্বাটি অন্তহীন, অপার ; জ্ঞান স্বরূপ মাত্র। 
এই জন্য আমাকে 'তত্ত্বতঃ' জানাই শ্রেয়। এই যে বিরাট পুরুষ, নিখিল ভূবনের যা কিছু সাকার, নিরাকার, আলো-অন্ধকারের যিনি মূর্ত মূর্তিররূপে 'দণ্ডায়মান' তাঁকে সখা কৃষ্ণরূপে তো ধনঞ্জয় দেখে আসছেন‌ এতকাল, কিন্তু আজ তাঁর কথা শুনে বিস্ময়াবিভূত! অর্জুন বলছেন, হে সখা, অনুগ্রহ করে যে অধ্যাত্ম বিষয়ক উপদেশবাণী আমাকে প্রদান করেছেন তাতে আমার মোহ, আমার অজ্ঞতা বিনষ্ট হয়েছে। আমি ভূতজগতের সৃষ্টি, লয় এবং আপনার অবিনাশী মাহাত্ম্য শ্রবণ করবার সৌভাগ্য লাভ করেছি। তবু এখন ইচ্ছা করছে আপনার ঐশ্বর্য, অতুলনীয় রূপ স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করি।
"মন্যসে যদি তৎ শক্যম্ ময়া দ্রষ্টমিত প্রভো।
যোগেশ্বর তো মে তং দর্শনয়াত্মানমব্যয়ম্।।" 

আহা ! কী অপূর্ব প্রার্থনা ! আপন বাহুবলে পৃথিবীজয়ী, অরিন্দম ধনঞ্জয় বলছেন, হে প্রভো, ('প্রভু' শব্দ সম্বোধনে 'প্রভো') আপনার করুণার্দ্র হৃদয়ে যদি আমার স্থান থাকে, যদি মনে হয় আমি আপনার চরাচরপরিব্যপ্ত রূপ দেখবার যোগ্য্, তবে হে যোগেশ্বর, আপনার আত্মরূপ আমাকে দর্শন করান। অর্জুনের প্রার্থনার সন্তুষ্ট হয়ে ভগবান তাঁর দিব্যরূপ দেখবার আদেশ করলেন। সে শত শত সহস্র সহস্র আকৃতি, বর্ণ বিশিষ্ট বিচিত্র অলৌকিক রূপ। সে 'বিরাটের' মধ্যে বিশ্বভূবন। আদিত্যসহ অদিতির দ্বাদশ পুত্র, অষ্টবসু, একাদশ রুদ্র, আশ্বিনীকুমারদ্বয়, ঊনপঞ্চাশ পবন --- সমস্তই তাঁরই মধ্যে বিরাজিত ; অর্জুন যা কখনো দেখেননি। শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, এ তো একাংশ মাত্র। আমাকে পূর্ণত দেখবার জন্য আমি তোমার 'প্রাকৃত' নেত্রের পরিবর্তে তোমায় দিব্য নেত্র প্রদান করছি। দিব্য নেত্র লাভ করে দিব্য দৃষ্টিতে অর্জুন ভগবানের 'বিশ্বরূপ' দর্শন করছেন --- এই মহাদর্শনে অর্জুন আত্মসংবিদহারা, মুগ্ধ, নির্বাক। তাহলে ? কি দেখছেন ধনঞ্জয় ? কি ভাবেই বা বর্ণনা করবেন তিনি ? এখানেই মহাকবির লেখনীর অভাবনীয় মোচড়। কি দেখছেন অর্জুন তার বর্ণনা দেওয়া হোল সঞ্জয়ের মুখে। সঞ্জয়, যিনি ধর্মক্ষেত্র কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধারম্ভের প্রাক্ কাল থেকে সমস্ত ঘটনার বিবরণ রাজা ধৃতরাষ্ট্রের কাছে বিবৃত করে চলেছেন তিনি এখন 'বিশ্বরূপের বর্ণনা দিচ্ছেন ধৃতরাষ্ট্রকে।
হে রাজন, সঞ্জয় বলছেন, অর্জুনকে দিব্যদৃষ্টি দান করে মহাযোগেশ্বর শ্রীহরি তার মহৈশ্বর্যময় দিব্যরূপে প্রকটিত হোলেন ;  সে এক স্থানকালব্যপ্ত মহান পুরুষবিগ্রহ--- অসংখ্য মুখ, বহু নেত্র, দিব্যাভরণযুক্ত, দিব্যাস্ত্রধারী, মাল্যে-বস্ত্রে-গন্ধানুলেপনে অবর্ণনীয়, পরমাশ্চর্য সেই পরম ভগবৎসত্ত্বার রূপ দেখতে লাগলেন পার্থ, যে স্বর্গীয় রূপ থেকে প্রকাশিত হতে লাগল সহস্র সূর্যের জ্যোতিঃ-- 

"দিবি সূর্যসহস্রস্য ভবেদ যুগপদুত্থিতা।
যদি ভাঃ সদৃশী সা স্যাৎ ভাসস্তস্য মহাত্মন।।" 

কদাচিৎই এমন লোকাতীত দ্যুতিময় পরমাত্মার প্রকাশ সম্ভব হতে পারে। আত্মনিবেদিত মহাভক্ত কুন্তীনন্দন তৃতীয় পাণ্ডবের কী অপার সৌভাগ্য যিনি এ বিশ্বের আপাত বৈচিত্র্যময়, নানা ভেদ ও বিভিন্নতার মধ্যে  এক পূর্ণসত্ত্বাকে অবলোকন করছেন।
_______________________________________________
                          ব্যাখ্যা
অন্তরমধ্যে এই মহা দৈবসংঘটন চিন্তা করে 'শ্রীভাগবতম্'-এর সেই স্তবগান অনুরণিত হয়ে ওঠে নিখিল ভক্ত হৃদয়ে,
"যস্মিন্নিদং যতশ্চেতম্
যেনেদং য ইদং স্বয়ং।
যোহস্মাৎ পরস্মাৎ চ পরঃ।
তৎ প্রপেদ্য স্বয়ংভূবম্---।।" 

সেই আদি জন্মমৃত্যুহীন স্বয়ম্ভূ-সত্ত্বার আমি শরণাগত হই  যাঁর মধ্যেই এ-বিশ্বলোক বিধৃত, যাঁর দ্বারা বিশ্বলোকের উদ্ভব, এবং যিনি এই সৃষ্টির (ব্যক্ত জগতের পারে) এবং অব্যক্ত জগতেরও পারে।
এই পুন্যভূমি ভারতবর্ষে 'আবির্ভূত' বা রচিত শ্রুতি সংহিতা, ব্রাহ্মণ সংহিতা, আরণ্যক, উপনিষদ, শ্রীমদ্ভগবত গীতা, স্মৃতিশাস্ত্র ও পুরাণগুলি এই সাক্ষ্য  বহন করে যে যুগ যুগ ধরে অসংখ্য ঈশ্বরপ্রমাণ সাধক মনুষ্যজ্ঞানের শিখরবিন্দু ("The last phase of human knowledge" --- S. Radhakrishnan.) স্পর্শ করেছেন। তপস্যার দ্বারা, সাধনার দ্বারা সেই পবিত্র জ্ঞান আত্মস্থ করেছেন। তারপর সাধারণ্যে সে-সকল আহৃত জ্ঞানরাশী বিতরণ করেছেন যাতে মানুষ তার অন্তরস্থিত দেবতাকে চিনতে পারে। শ্রীমদ্ভগবত গীতা তেমনই এক জ্ঞানের বহতা নদী যা পরম জ্ঞানের চূড়া থেকে নিঃসৃত। এই শ্রীমদ্ভগবত গীতার বাণী বহু সাধকের দ্বারা বহুরূপে, বহুভাবে ব্যাখ্যাত হয়েছে, অনেকানেক সম্প্রদায়ের সৃষ্টি হয়েছে। সে সবের মধ্যে প্রধান আচার্য রামানুজের শ্রী সম্প্রদায়, আচার্য মধভাচার্যের ব্রহ্ম সম্প্রদায়,‌ আচার্য বিষ্ণুস্বামী ও বল্লভাচার্য প্রতিষ্ঠা করেছেন রুদ্র সম্প্রদায় এবং আচার্য নিম্বার্ক প্রতিষ্ঠিত কুমার সম্প্রদায়। এ ছাড়া মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্য প্রতিষ্ঠিত গৌড়ীয় বৈষ্ণব সম্প্রদায় এখন একটি আন্তর্জাতিক বৈষ্ণব ধর্ম প্রতিষ্ঠানে‌ পরিণত হয়েছে। সাধনা চলেছে, পরমব্রহ্মের সাধনা, শ্রীকৃষ্ণের আরাধনা। 'দ্বন্দ্বময় ভূমণ্ডলের নিয়ন্তারূপে, যোদ্ধৃরূপে, সখারূপে, সন্তানরূপে, প্রেমিকরূপে তিনি নিখিলমানবমানসমন্দিরে নিত্য বিরাজিত। তাই এই শ্রীকৃষ্ণের 'বিশ্বরূপ' যা কুরুক্ষেত্র সমরাঙ্গনে তাঁর প্রিয়সখা অর্জুন দেখছেন-- যুগ যুগান্তর ধরে ভক্তকুলও তাঁদের হৃদয়দেউলে দর্শন করে চলেছেন।
_______________________________________________

আবারও আমরা ফিরে আসি অর্জুনের 'বিশ্বরূপ' দর্শনের তীর্থ ভূমি কুরুক্ষেত্রে। এখন দর্শক পার্থ, বক্তা সঞ্জয়, শ্রোতা ধৃতরাষ্ট্র। সঞ্জয় বলছেন হে রাজন, পাণ্ডুনন্দন তখন নানা আকারে, প্রকারে, রঙে, রূপে বিভক্ত, খণ্ডিত জগতকে 'এক' এবং  একাকাররূপে দেখছেন 'দেবদেবস্য' ভগবান শ্রীকৃষ্ণের অভ্যন্তরে। আশ্চর্যান্বিত, বিস্ময়বিহ্বল, রোমাঞ্চিত কলেবর অর্জুন অর্ধাবনতদেহ, কৃতাঞ্জলীপুটে স্তবের ভঙ্গিমমায় উচ্চারণ করেছেন, হে কেশব, আপনার এই শরীরের মধ্যেই তো সকল দেবতা, ভূত জগৎ, কমলাসনে অধিষ্ঠিত ব্রহ্মা, স্বয়ং দেবাদিদেব মহাদেব, ঋষিগণ, দিব্য সর্পসমূহ --- সমস্তই বর্তমান। আপনি আদি মধ্য‌ অন্তহীন 'বিশ্বরূপ। হে বিষ্ণু, গদা-চক্রযুক্ত, প্রজ্বলিত হুতাশন বা জ্যোতির্ময় আদিত্বের ন্যায় এই অনন্য রূপ যেন এই মহাবিশ্বের সমস্তকিছুকে আবরিত করে আছে। 

"দ্যাবাপৃথিব্যোঃ ইদং অন্তরম্ হি
                     ব্যাপ্তং ত্বৈকেন দিশশ্চ সর্বাঃ।
দৃষ্ট্বা অদ্ভুতম্ রূপম্  উগ্রম্ তবেদং
                  লোকত্রয়ং প্রব্যথিতং মহাত্মন।।" 

এ কী অতিলৌকিক, মহাভয়ঙ্কর রূপ! ঊর্দ্ধে আকাশ, নিম্নে ধরিত্রী, মধ্যিখানে সকল দিক-দিগন্ত পূর্ণ করে এই যে প্রদীপ্তময়, শঙ্কাবিধানকারী, মানব-নেত্রে অসহনীয় আপনার বিরাটত্ব দেখে "প্রব্যথিতম্ লোকত্রয়ম্"।।
এই বিশ্বপ্রসারিত আপনার অবয়বের মধ্যে দেবতারা কৃতাঞ্জলীপুটে প্রবেশ করছেন, মহর্ষিবৃন্দ স্বস্তি বাক্য উচ্চারণ করেছন, রুদ্রগণ, আদিত্যসকল, সুরাসুর, গন্ধর্ব --- ভীত-বিস্মিত আপনাকে অবলোকন করছেন। আপনার এরূপ একের মধ্যে বহু এবং বিচিত্র, করাল, ভীতিপ্রদ রূপ দেখে ত্রিলোকসহ আমিও আশঙ্কিত হয়ে উঠেছি। হে দেব,  আপনার ব্যাদিত জ্বলন্ত  মুখগহ্বরগুলির অভ্যন্তরে যেন আসন্ন প্রলয়ের পূর্বাভাস। এ যে অসহনীয় ! 

"দিশো ন জানে ন লভে চ শর্ম
প্রসীদ দেবেশ জগন্নিবাস।।" 

আমার দিগ্বিদিক চেতনা ভ্রান্তির অন্ধকারে অবলুপ্ত। হে ত্রিলোকাধিকারী, জগতের আশ্রয়, আপনি প্রসন্ন হোন্।
এ কী প্রলয় সমুত্থিত দেখছি প্রভু ! ঐ সব ধার্তরাষ্ট্রগণ, ভীষ্মদ্রোণাদি বীরসকল, কর্ম সহ আমাদেরও মহা মহা যোদ্ধারা, আপনার অসংখ্য করালদংষ্ট্র-বিশিষ্ট মুখের  ভিতরে সবেগে বিক্ষতদেহ, বিচুর্ণিতমস্তকে প্রবেশ করে চলেছে ---নদী যেমন সম্মুখস্থ, তটস্থিত প্রাণ অপ্রাণ সমস্তকিছুকে সমুদ্রসঙ্গমে নিয়ে যায়‌, ঠিক তেমনি এই আত্মম্ভরী নরলোক সুতীব্র গতিতে প্রধাবিত হয়ে আপনার ঐ মৃত্যুরূপী বিকট হাঁ মুখগুলিতে প্রবেশ করছে। পতঙ্গরা যেভাবে প্রদীপশিখার মোহে আচ্ছন্ন আবিষ্ট হয়ে জ্বলন্ত অগ্নিতে আত্মনাশ করবার জন্য ধাবিত হয় -- এ-দৃশ্য যেন তেমনি। এমন ভয়ঙ্কর 'প্রকাশে', হে বিষ্ণু আপনি কে, যাঁর লেলিহান অনন্ত মুখ বিশ্বজগতকে গ্রাস করে চলেছে ? যাঁর প্রজ্বলিত হুতাশন-সদৃশ তেজপুঞ্জ চরাচর পরিপূর্ণ করে দগ্ধ করে চলেছে ? হে ভয়াল, হে করাল, হে সৃষ্টিবিনাশী 'দেববর', আপনার শ্রীচরণে আমি প্রণত, আপনি কৃপা করে আপনার দিব্য পরিচয় ব্যক্ত করুন। আপনার প্রকৃতি, আপনার প্রবৃত্তি আমি কিছুই জানিনা। 

'আখ্যাহি মে কো ভবানুগ্ররূপো
                       নমোহস্তু তে দেববর প্রসীদ।
বিজ্ঞাতুমিচ্ছামি ভবন্তমাদ্যং
                    ন হি প্রজানামি তব প্রবৃত্তিম্।।" ১১।।৩৪ 

প্রত্যোত্তরে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ জানালেন, দেখ অর্জুন, এখন আমি কাল --- মহাকাল। এখন লোক সমূহ ধংস কর করা প্রয়োজন। এখন ধর্মের গ্লানি পরিলক্ষিত হচ্ছে। এখন যুদ্ধকাল, প্রতিপক্ষে যারা আছে তারা (তুমি ছাড়া) সকলেই বিনাশপ্রাপ্ত হবে। বিনাশ যাদের হবার তারা বিনষ্ট হবেই ; তুমি যোদ্ধারূপে নিমিত্ত মাত্র। যাদের তুমি আত্মীয়, সুহৃদ, গুরু বা স্বজন বলে, তাদের প্রতি বৈরিতায় ও অস্ত্রাঘাতে মোহবশতঃ অনীহা প্রকাশ করেছিলে তারা সকলেই (আমার দ্বারা) নিহত হয়েই আছে। এখন কষ্ট না পেয়ে (মা ব্যথিষ্ঠাঃ) শত্রুদের নাশ করার জন্য, জয় লাভ করবার জন্যই যুদ্ধ কর, ---'যুধ্যস্ব'।
_______________________________________________

                            ব্যাখ্যা
ভারতবর্ষের ধর্ম ও দর্শনশাস্ত্র একদিকে অনাদি, আবার অন্যদিকে বৈচিত্র্যময়। অসংখ্য মত ও পথ এবং অন্তহীন গভীরতা। এতক্ষণ (একাদশ অধ্যায়ে, শ্লোক ৩৪ পর্যন্ত), সঞ্জয় কথিত বিবরণ থেকে অন্ধ, নির্বাক ধৃতরাষ্ট্র কি নিশ্চিত হলেন যে 'যা অবশ্যম্ভাবী' তাই ঘটছে এবং 'ফলিবে যা ফলিবার আছে। নিয়তি কেন বাধ্যতে।' বস্তুত 'নিয়তিবাদ' ভারতীয় দর্শনে শুধু নয়, বিশ্বদর্শনেও  একটি অমোঘ সত্যরূপে পুরাণে, কাব্যে, মহাকাব্যে মানুষের অস্তিত্বের নিয়ন্ত্রকের ভূমিকা গ্রহণ করে এসেছে। 
নিয়তিবাদ বলে মানুষের (পরিব্যপ্ত আকারে ভূতজগতেরও) ভবিষ্যৎ পূর্বনির্ধারিত। তার উপর মানুষের কোন নিয়ন্ত্রণ নেই। সমস্ত পুরাণকাহিনীতে তো বটেই বিশেষ করে বায়ুপুরাণ ও মৎস্যপুরাণে 'নিয়তির শাসন'-এর উপর চরম গুরুত্ব আরোপিত হয়েছে। মৎস্যপুরাণ আবার 'নিয়তি ও কাল'কে সমার্থক বলে ঘোষণা করেছে। সে সত্য প্রতিপন্ন হয়েছে শ্রীকৃষ্ণ যখন বলছেন, "কালোহস্মি লোকক্ষয়কৃত প্রবৃদ্ধো"...।  এখানে তিনি আরও বলছেন, ঐ যে তোমার প্রতিপক্ষ, আমার দ্বারা তারা পূর্বেই মৃত হয়ে আছে। তুমি নিমিত্ত মাত্র। 
"ময়ৈবৈতি  নিহতাঃ পূর্বমেব
নিমিত্তমাত্রং ভব সব্যসাচিন্।।" 

কৃষ্ণ তো এখানে সাক্ষাৎ নিয়তি। অর্জুনের কী বা করার আছে ? শুধুমাত্র 'নিমিত্ত' হয়ে যুদ্ধটুকু করতে হবে। এত বিদ্যার সাধনা, এত অস্ত্রশিক্ষা, এত পরাক্রম, শৌর্য-বীর্য-ঐশ্বর্য -- সবই কি তবে নিষ্ফলা ? 'নিয়তি' শব্দটির কী বিভীসিকাময় তাৎপর্য্য ! এই শব্দের উচ্চারণে রক্তবীজের মত জন্ম নেয় বীভৎস সব কল্পমূর্তি ---- দৈব, ভাগ্য, কাল, বিধি, বিধিলিপি, কৃতান্ত, অদৃষ্ট ভবিতব্যতা ! মানবজীবনের কী বিষাদকরুণ পরিণতির (Tragedy) অবশ্যম্ভাবিতা !
পৃথিবীর অন্যান্য সভ্যতার দর্শনে, সাহিত্যে তো বটেই, গ্রীক সাহিত্যে ও দর্শনে এই নিয়তি বা destiny-র ভূমিকা প্রবল, যুগপৎ নিদারুণ।
পরের পর্বে এই বিষয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করে আমরা আবার 'শ্রীমদ্ভগবত গীতায় অর্জুন' বিষয়টিতে ফিরে আসব।
পরবর্তী একাদশ অধ্যায়ের পর্ব ১১।। ৩৫ থেকে। 
                    (ক্রমশঃ)


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Recently published

অমূল্য

He ( Tagore) who sees all things in his own self and his own self in all things, he does not remain unrevealed.                     ...