শ্রীমদ্ভগবত গীতায় অর্জুন --১১
নিয়তিবাদ ও প্রাচীনকালে আস্তিক ও নাস্তিক ধর্মবিশ্বাস
পর্ব ১০-এ আমরা 'নিয়তি'-বাদ নিয়ে আলোচনা করবার সময় বলেছিলাম প্রাচীন ভারতবর্ষের মত পৃথিবীর অন্যান্য দেশেও যে সভ্যতাগুলি গড়ে উঠেছিল সে সমস্ত স্থানের সাহিত্যে ও দর্শন চিন্তায় এই গীতোক্ত কথার প্রতিধ্বনি শোনা যায়। গ্রীক দর্শনে Stoicism (বৈরাগ্যদর্শন)-এর কথা আছে। প্রায় ৩০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে গ্রীস দেশে ও রোমে এই দর্শন প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল। জেনো নামের একজন দার্শনিক (Zeno of Cerium/Cyprus) এই Stoicism বা বৈরাগ্যবাদের প্রবর্তক ছিলেন। এই ষ্টোয়িক দর্শন বিশ্বাস করে যে মানুষের সিদ্ধান্তসমূহ এবং তার কর্ম নির্ভর করে এমন এক স্বর্গীয় পরিকল্পনার দ্বারা যা ঈশ্বর পূর্বেই ব্যবস্থা করে রেখেছেন।
অপর দিকে ঠিক একই সময়কালে, ৩০৭ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে, এপিকিউরাস (Epicurus) নামের আরেক এথেন্সবাসী দার্শনিক এই 'ষ্টোয়িক'বাদের বিপরীত আরেক দার্শনিক মতবাদের প্রবর্তনা করেন যা হেডোনিজম (Hedonism) বা এপিকিউরিয়ানিজম (Epicureanism) নামে আখ্যায়িত। এই দার্শনিক তত্ত্বের মূল কথা 'আনন্দবাদ' -- যেখানে মৃত্যুভীতি বা দৈবশক্তির ভয় (Fear of God) থাকবে না। আমাদের দেশের চার্বাকপন্থী মতবাদের মতই -- যাবৎ জীবেৎ সুখং জীবেৎ।
এখানে আমরা সুদূর গ্রীসদেশের দুটি বিপরীতমুখী দার্শনিক মতবাদের ( Philosophical Schools of Thoughts) সামান্যতম ইঙ্গিত দেবার প্রয়োজনীয়তা বোধ করেছি এই কারণেই যে জিজ্ঞাসু পাঠকের ঔৎসুক্য বর্ধিত হবে, এবং তিনি উপলব্ধি করবেন যে আজ থেকে প্রায় তিন/চার হাজার বছর আগে মানুষের চেতনার মধ্যে কী সমুন্নত জ্ঞানসূর্যের অভ্যুদয় ("তিমিরবিদার উদার অভ্যুদয়") ঘটেছিল এবং এই পুন্যভূমি ভারতবর্ষেও আরও উন্নততর দর্শন চিন্তার, বিপরীতমুখী ধর্মধারণার চরম বিকাশ সম্ভব হয়েছিল। বৈদান্তিক ব্রহ্মবাদ ও লোকায়ত নিরীশ্বরবাদের একই সাথে বিকাশ সম্ভব হয়েছিল ভারতবর্ষের প্রাচীন ধর্মচিন্তায়। আদি সাংখ্য, আদি পূর্বমীমাংসা, চার্বাকের বস্তুবাদ (materialism) বৌদ্ধ দর্শন, নাগার্জুনের শূন্যবাদ --- ঈশ্বরের অস্তিত্ব স্বীকার করে না।
আমরা গীতার আলোচনাকালে এইসকল আধ্যাত্মিক জ্ঞান ও বিচারের কথা স্মরণে রাখতে চেষ্টা করব এই কারণেই যে গীতার অলৌকিক ঐশ্বরিক 'বিভূতি' বর্ণনায় 'যুক্তি ও বিশ্বাসের' সামঞ্জস্যতা অনেক স্থানেই দুর্লক্ষ্য এবং 'বিরোধাভাসে' আচ্ছন্ন মনে হয়। পরবর্তী কালে ভগবান শঙ্করাচার্যের 'অদ্বৈতবাদ' বা অদ্বৈত বেদান্তের আলোকে 'আস্তিক ও নাস্তিক' মতবাদের 'দ্বন্দ্ব' অবলুপ্ত হয় বলে ভক্তিবাদ স্বীকার করে। 'শ্রীমদ্ভগবতম্ পুরাণ' সৃষ্টির আদি কারণরূপে পরমপুরুষ শ্রীকৃষ্ণকেই ধারণ করেছেন ও প্রতিষ্ঠা করেছেন। 'শ্রীমদ্ভগবত গীতার' একাদশ অধ্যায় থেকে আমরা ভক্তিবাদের নির্দ্বন্দ্ব মন্দির-প্রাঙ্গনে প্রবেশ করব।
_____________________________________________
আমরা আবারও শ্রীমদ্ভগবত গীতায় প্রত্যাবর্তন করি।
দেখ অর্জুন, শ্রীকৃষ্ণ বলছেন,
"দ্রোণঞ্চ ভীষ্মঞ্চ জয়দ্রথঞ্চ
'কর্ণং তথা ন্যানপি যোধবীরান্।
ময়া হতাংস্ত্বং জহি মা ব্যথিষ্ঠাঃ
যুধ্যস্ব জেতাসি রণে সপত্নান্।।"
কৌরব পক্ষের সকল রথী মহারথীদের আমি যমালয়ে পাঠিয়ে দিয়েইছি ; এখন তোমার ভয়ের আর তো কোন কারণই নেই। অতএব 'নিঃসপত্ন' হবার জন্যই 'যুদ্ধ কর' ! জয়ী হবার জন্য 'যুদ্ধ কর'। (এখানেই নিয়তি নির্ধারিত কর্মের জন্যই বাধ্য হয়ে কর্ম করার বিধান ; অতএব ফলের আকাঙ্ক্ষা তো নিরর্থক। এক গভীরতম দার্শনিক তত্ত্বের অবতারণা করা হয়েছে। উপসংহারে আলোচ্য।)
এরপর শ্রীকৃষ্ণের এবম্প্রকার কথা শুনে সঞ্জয় বলছেন ধৃতরাষ্ট্রকে (সঞ্জয় উবাচ), হে রাজন, আমি তখন দেখলাম মহারথী অর্জুন, শিরোমুকুট পরিহিত অবস্থাতেই কৃতাঞ্জলিপুটে, শ্রদ্ধা ও শঙ্কায় প্রকম্পিত শরীরে সারথি কৃষ্ণকে আনত মস্তকে প্রণাম নিবেদন করে ভয় ও বিস্ময়বিগলিত কণ্ঠে বললেন,
"স্থানে হৃষিকেশ তব প্রকীর্তা
জগৎ প্রহৃষ্যতি অনুরজ্যতে চ।
রক্ষাংসি ভীতানি দিশো দ্রবন্তি
সর্বে নমস্যন্তি চ সিদ্ধসঙ্ঘা।।"
তাই হে হৃষিকেশ, আপনার এমত ঐশ্বর্যসমন্বিত নাম ও প্রকীর্তির (পরাশক্তি) জন্যই জগৎচরাচর আপনার গুণকীর্তনে আনন্দিত হয়, মানুষের অনিষ্টকারী রাক্ষসগণ সন্ত্রস্ত থাকে এবং সিদ্ধপুরষেরা আপনার প্রতি প্রণাম নিবেদন করে। আপনি আদি, ব্রহ্মারও পূর্বজাত, (আপনি বায়ু, যম, অগ্নি, শশাঙ্ক, প্রজাপতি-- সবই ; লক্ষণীয়, ঋগ্বেদীয় সকল ভিন্ন ভিন্ন দেবতারা উপনিষদের কালে এসে 'এক' হয়ে গিয়েছেন) আপনি দেবশ্রেষ্ঠ, সৃষ্টির আশ্রয়স্বরূপ, সদাসৎ গুণেরও পরপারে 'অক্ষরব্রহ্ম' -- সচ্চিদানন্দঘন সত্ত্বা। আপনাকে বার বার নমস্কার। হে অনন্তবীর্য, হে সর্বাত্মন (সর্ব আত্মার দশদিকে বিরাজমান একীভূত রূপ) আপনাকে সব দিক থেকে নমস্কার,
"নমঃ পুরস্তাৎ অথ পৃষ্ঠতস্তে
নমোহস্তু তে সর্বত্র এব সর্ব।"
হে যদুকুল-অলঙ্কার, হে সখা, আপনার এই বিশ্বময় রূপের মহিমা পূর্বেই জ্ঞাত না হয়ে হয়তো আমি বয়স্যসুলভ ভালোবাসায় বা প্রমাদবশতঃ অশিষ্ট বাক্য বলেছি, হয়তোবা আহার-বিহার-শয়ন-উপবেশনকালে মিত্রবর্গ সন্নিকটে উপহাসছলে আমার কথিত প্রগলভ সম্বোধনে আপনি অবমানিত হয়েছেন ! আপনার প্রতি সে-সকল সাধারণোচিত ব্যবহারের জন্য হে অপ্রমেয়, আজ আমাকে ক্ষমা করুন ! "ক্ষাময়ে ত্বাম অহম অপ্রমেয়ং।" আপনি এই সৃষ্টিচরাচরের পিতা, গুরুশ্রেষ্ঠ, এই ত্রিলোক আপনারই গুণৈশ্বর্যের প্রভাবদ্বারা বশীভূত ! আপনিই একোমেবাদ্বিতীয়ম্ পরাৎপরম্ ! (এখন সুধীজন ও ভক্ত পাঠকগণের হৃদয়ে অবশ্যই উপনিষদের মহামন্ত্র অনুরণিত) এইভাবে প্রার্থনারত হয়ে (সঞ্জয় কুরুরাজ ধৃতরাষ্ট্রকে বলছেন) সব্যসাচী অর্জুন ভক্তিবিগলিত আবেগে উচ্চারণ করলেন,
"তস্মাৎ প্রণম্য প্রণিধায় কায়ং
প্রসাদয়ে ত্বাম অহমীশম ঈড্যম্।
পিতেব পুত্রস্য সখেব সখ্যুঃ।
প্রিয়ঃ প্রিয়ায়ার্হসি দেব সোঢ়ুম।।"
________________________________________
ব্যাখ্যা
(আহাঃ, কী অপূর্ব, কী মধুর, কী অনুরাগ-রঞ্জিত আত্মনিবেদন!)
হে প্রভু, আমার এই কায়া আপনার শ্রীচরণে সর্বান্তকরণে সমর্পণ করে আপনাকে প্রণাম করি। হে পরমেশ্বর, আপনি প্রসন্ন হোন। হে দেবশ্রেষ্ঠ, পিতা যেমন পুত্রের, সখা যেমন সখার, পতি যেরূপ প্রিয়তমা পত্নীর অপরাধ সহ্য করে আপনিও সেইরূপ আমার দোষসকল সহ্য করুন। আপনিই যে অপরাধ ক্ষমা করবার যোগ্য !
মনে হয় যেন এ-যুগের আমাদের আরেক মহাকবির পূজাসঙ্গীতের সুরে বলি,
"ওহে জীবনবল্লভ, ওহে সাধনদুর্লভ,
আমি মর্মের কথা, অন্তরব্যথা কিছুই নাহি কব---
শুধু জীবন মন চরণে দিনু বুঝিয়া লহ সব।..."
---------রবীন্দ্রনাথ।
শুধু এ-যুগের কবির কথা বলি কেন, বেদান্ত পরবর্তী যুগ থেকে যুগ যুগান্তর ধরে ভক্তি আন্দোলনের যে ঢেও "গঙ্গেচ যমুনেচৈব গোদাবরী সরস্বতী নর্মদে সিন্ধু কাবেরী-" জলধারা-সিঞ্চিত এই পুন্যভূমি ভারতবর্ষের চতুর্দিক উচ্ছ্বসিত আবেগে পরিপ্লাবিত করেছে -- শত সহস্র কবির কাব্যে, মহাকাব্যে, পুরাণে গাথায় গীতে যার তরঙ্গধ্বনি নিত্যদিন অনুরণিত হয়েই চলেছে অবিরাম তার উৎসমুখ ঐ পূর্বোদ্ধৃত শ্রীমদ্ভগবত গীতার একাদশ অধ্যায়ের ৪৪তম প্রার্থনামন্ত্রটি।
যাই হোক্, বারান্তরে এই বিষয়টির উপর আমরা আলোচনা করব। এখন, এই যে গাণ্ডীবধন্বার অনুরাগ-রঞ্জিত ভক্তহৃদয়ের আত্মসমর্পণ, এখানে 'দীনতার অভিমান' নেই, আছে 'পরাশক্তির কাছে' 'অপরাশক্তির' দায়বদ্ধতা, কেননা 'শ্রীকৃষ্ণ প্রণম্য, স্তুতি করার যোগ্য' (প্রণম্য ত্বাম ঈড্যম) ; এবং সেই পরাৎপর মহাশক্তির আদেশ তিনি পালন অবশ্যই করবেন। যত বড় শৌর্য-বীর্যশালী তিনি হোন না কেন, জগদ্ধৃত শ্রীকৃষ্ণ গোবিন্দের স্বরূপ তিনি প্রত্যক্ষ করেছেন যে ! সেই করাল --ভয়াল রূপে জগতপতির দর্শন লাভ করে একদিকে তিনি যেমন ধন্য হয়েছেন, অপরদিকে তেমনই ভয়ে বিস্ময়ে অভিভূত ! অতএব, 'হে বিষ্ণো, আপনি আপনার শঙ্খ-চক্র-গদা-পদ্মধারী চতুর্ভুজরূপ পরিগ্রহ করেই প্রকটিত হোন্। সখারূপে আপনি আমার কাছে যেমন চিরপরিচিত হয়ে আছেন, তেমন 'নরলীল' নয়, নিখিল নয়নাভিরাম নারায়ণ মূর্তিতে আপনাকে দেখতে চাই।
"কিরীটিনং গদিনং চক্রহস্তমিচ্ছামি
তাং দ্রষ্টুমহং তথৈব।
তেনৈব রূপেণ চতুর্ভুজেন
সহস্রবাহো ভব বিশ্বমূর্তে।।"
সুধী পাঠকদের স্মরণে আছে, কিছুপূর্বে আমরা আলোচনা করছি যে সেই পুরাণকাল থেকে অদ্যাবধি নারায়ণের এহেন রূপ আমাদের ধ্রুপদী সাহিত্যে বর্ণিত হয়ে তো এসেইছে, লোকায়তিক আখ্যান-উপাখ্যান-পাঁচালীতেও তার কীর্তন অফুরন্ত। আমাদের বাঙলায় (বাংলাদেশসহ অবিভক্ত বাংলা) নারায়ণ পূজার দুটি ধারা। একটি নারায়ণ পূজা, অপরটি সত্যনারায়ণ পূজা। সত্যনারায়ণ পূজার মধ্যে (ইসলামের সুফী ধর্মধারার) 'সত্যপীর ও হিন্দু ধর্মবিশ্বাসের নারায়ণ'-এর এক অসাম্প্রদায়িক সমন্বয়ের ধর্মীয় ঐতিহ্য প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। অপরদিকে নারায়ণ পূজা অসাম্প্রদায়িক ও সামাজিক ভাবে নির্দ্বন্দ্ব হলেও তন্ত্রমন্ত্র অনেকটাই 'ব্রাহ্মণ' (বেদের কর্মকাণ্ড) এবং স্মৃতিশাস্ত্রের আচার-উপচার ভিত্তিক। এই দুটি পূজার যে পাঁচালী তাও আংশিকভাবে ভিন্ন। দ্বিতীয়টি, অর্থাৎ নারায়ণ উপাসনার পাঁচালীতে আমরা শ্রীমদ্ভাগবৎ গীতায় বর্ণিত শ্রীকৃষ্ণের অর্জুন-প্রার্থিত রূপ দেখতে পাই।
নারায়ণ পাঁচালীর অংশবিশেষ,
"নিজরূপ ধরিলেন দেব নারায়ণ।
পূর্বজন্ম তপোফলে দেখিল ব্রাহ্মণ।।
বিরিঞ্চি বাসব ভব ভাবেন ধেয়ানে।
সেবেন নারদাদি অতুল চরণে।।
দ্বিজের ভাগ্যের কথা না যায়না কথনে।
কমলা-সেবিত পথ দেখিল নয়ানে।।
শঙ্খ চক্র গদা পদ্ম চতুর্ভুজ রূপ।
পরিধানে পীতপট্ট গলায় কৌস্তুভ।
কিরীটি মুকুট মাথে শিখীপুচ্ছ চূড়ে।
মকরন্দ লোভে কত মধুকর উড়ে।।
অলকা তিলকা ভালে শোভে শশীকলা।
মকর কুণ্ডল কর্ণে শোভে বন মালা।।
নিন্দি ইন্দুবরাননে নয়ন ভ্রুধনু।
কোটি চন্দ্র ছটা কিবা নবঘন তনু।।
কলধৌত মুকুতা খচিত মকরতে।
অঙ্গের ভূষণ শোভা করে নানামতে।।"
----- পাঁচালীকার রামভদ্র।
_____________________________________________
একাদশ অধ্যায়ে ১থেকে ৪, ১৫ থেকে ৩১, এবং ৩৬ থেকে ৪৬ ও ৫১ -- এই শ্লোকসমূহে সখা শ্রীকৃষ্ণের কাছে অর্জুনের, ঔৎসুক্য, আর্তি, ভীত-বিস্মিত মুগ্ধতা, প্রার্থনা এবং অবশেষে নম্রচিত্ত আত্মসমর্পণের অঙ্গিকার ব্যক্ত হয়েছে। অর্জুন শ্রীকৃষ্ণকে সখা, অন্তর্যামী, প্রভু, গোবিন্দ, হরে, ভগবন্ , মহাবাহো, পরমেশ্বর, বিষ্ণো, মহাত্মন, বিশ্বেশ্বর, কমলনেত্র ইত্যাদি পরম ঐশ্বরিক গরিমাময় সম্বোধনে আহ্বান করেছেন। (অবশ্য সঞ্জয়ের দ্বারা রাজা ধৃতরাষ্ট্রের প্রতি উক্ত --সঞ্জয় উবাচ--- কথাগুলি তো সমস্ত গীতার আখ্যানভাগের অবিচ্ছেদ্য বিষয়, কেননা কৃষ্ণার্জুনের পূর্ণ কথোপকথনের মূল ও ধারাবাহিক বর্ণনার মূল বক্তা সঞ্জয় এবং শ্রোতা অন্ধ ধৃতরাষ্ট্র।)
(শ্লোক ৪৬-এ) এবার অর্জুন যখন প্রার্থনা করছেন চতুর্ভুজ নারায়ণরূপে তিনি সখার দর্শন লাভ করতে চান তখন ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, দেখ অর্জুন, এই যে আদি-অন্তহীন, তেজোময় 'বিশ্বরূপ' (বিশ্ব এবং ঈশ্বরের সংযুক্ত, 'অপৃথক', অবিযুক্ত সত্ত্বা) তুমি দেখেছ তা তুমি ছাড়া আর কেও কখনো দেখবার সৌভাগ্য প্রাপ্ত হয়নি। বেদ পাঠ, যজ্ঞানুষ্ঠান, দান, শাস্ত্রানুমোদিত ক্রিয়াকর্ম --- এমনকি উগ্র তপস্যা দ্বারাও এই জগৎ-ব্যপ্ত রূপ, একমাত্র তুমি ব্যতিত কেও দেখতে সমর্থ হয়নি এবং হবেও না। আমার (ব্রহ্মের সৃষ্টি-স্থিতি-সংহারকারী বিরাট শক্তির একত্র বিস্ফার) ঘোর প্রলয়ঙ্কর প্রকাশ দেখে তুমি বিমূঢ়, ব্যাকুলিত হয়েছ জেনেই তোমার কাঙ্ক্ষিত রূপেই প্রত্যক্ষ কর। এই কথা বলে, (সঞ্জয় রাজা ধৃতরাষ্ট্রকে বলছেন) ভগবান বাসুদেব নিজের চতুর্ভুজ নারায়ণের দেবমূর্তি ধারণ করলেন। "স্বকং রূপম্ দর্শয়ামাস ভূয়ঃ"।
আবারো শ্রীকৃষ্ণ যখন পুনরায় মনুষ্যদেহে অবতীর্ণ তখন অর্জুন প্রকৃতস্থ হলেন। ভীতিবিহ্বলতা হতে মুক্ত হলেন।
দৃষ্টেদং মানুষং রূপং তব সৌম্যং জনার্দন।
ইদানীমস্মি সংবৃত্তঃ সচেতা প্রকৃতিং গতঃ।।
মানুষের রূপে দেখি' ওগো জনার্দন।
চিত্ত হোল শান্ত প্রভূ, জুড়ালো জীবন। (১)
তারপর একাদশ অধ্যায়ের (৫২, ৫৩, ৫৪ এবং ৫৫) শেষ চারটি মহাবাণীর মধ্য দিয়ে ভগবান বাসুদেব স্বয়ং ভগবৎসাধনার সর্বশ্রেষ্ঠ যোগ--- ভক্তিযোগের পথ ও প্রাপ্তির (পরমার্থ প্রাপ্তি) সান্ত্বনাসন্দেশ বিতরণ করেছেন। (পরবর্তীকালে ভক্তিরসামৃতসিন্ধু ভাগবৎপুরাণে তা অনুরাগরসসিক্ত কাব্যমাধুর্যে বাকমূর্তি লাভ করেছে)।
হে অর্জুন, আমার এই সুদুর্লভ, সুদর্শনধারী, চতুর্ভুজ দৈবপ্রকাশ যা তুমি তোমার শুভদৃষ্টিতে আস্বাদন করলে তার জন্য দেবতারাও চির আকাঙ্ক্ষিত। বেদ অধ্যয়ন, তপস্যা, দান ও যজ্ঞ-সংকল্প দ্বারাও এই রূপ প্রত্যক্ষগোচর হয় না। তুমি, হে অর্জুন, যেহেতু পরন্তপ (পরম তপোবিশিষ্ঠ), তাই তোমাকে জানাই একমাত্র অনন্যা ভক্তির পথেই, 'পরম গতি' -- এই ভাবের (তত্ত্বেন) দ্বারাই আমাকে লাভ করা যায়।
"মৎকর্মকৃৎ মৎপরমঃ মদ্ভক্তঃ সঙ্গবর্জিতঃ।
নির্বৈরঃ সর্বভূতেষু যঃ স মামেতি পাণ্ডব।।"
জীবনের সমস্ত কর্মই যে আমাতে অর্পণ করে, আমাতেই যার গতি --- এমন তন্মতায় যে লীন থাকে, আমার প্রেমেই যার প্রেমের চরিতার্থতা, যে জগৎসংসারের ভূত বস্তুর প্রতি আসক্তিরহিত, যে সকল প্রাণীতে আত্মভাব পোষণ করে (নির্বৈর বা বৈরীভাববিবিক্ত) সেই অনন্য- ভক্তিপরায়ণ মানুষ আমাকে (পরমগতি ভগবান কৃষ্ণকে) লাভ করে।
(ক্রমশঃ)
পরবর্তী 'দ্বাদশ পর্ব' দ্বাদশ অধ্যায় থেকে।
একাদশ অধ্যায়, 'বিশ্বরূপদর্শনযোগ' শ্রীমদ্ভগবত গীতার সর্বশ্রেষ্ঠ দ্বন্দ্বময় অধ্যায়গুলির একটি। বার বার পড়ুন, স্বজনদের পড়ান। বিশ্বের এক এবং অদ্বিতীয় ধর্ম ও দর্শন বিষয়ক গ্রন্থটি সর্বত্রগামী হোক্ --- প্রার্থনা করি।
দুলাল চন্দ্র বন্দোপাধ্যায়
১৪ই সেপ্টেম্বর, ২০২৫
ব্যাঙ্গালোর।
________________________________________
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন