শুক্রবার, ৩১ জানুয়ারি, ২০২৫

জাত্যাভিমান, ধর্মান্ধতা ও গান্ধী

জাত্যাভিমান, ধর্মান্ধতা ও গান্ধী
(৩০শে জানুয়ারী, গান্ধীহত্যা স্মরণে) 


"আজ সঙ্ঘ পরিবার যে দাবি তুলছে তার অনেকগুলির উৎস গত শতাব্দীর ত্রিশের দশকের হিন্দু সত্তাসংকটে। হিন্দু মহাসভা বলতে থাকে ভারতীয় সংস্কৃতি ও হিন্দু সংস্কৃতি সমার্থক। ভারতীয় জাতীয়তাকে হিন্দু জাতীয়তা হতে হবে। সাভারকার বললেন হিন্দুস্থানকে শুধু পিতৃভুমি মানলে চলবে না, পুন্যভূমি বলেও মানতে হবে। এর অর্থ যে মুসলিমরা হবে দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক, তা অনুল্লেখ্য কিন্তু স্পষ্ট।"
                                       -----------অমলেশ ত্রিপাঠী।

১৯৩৯ সালে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের গুরু গোলওয়াকার এক পুস্তিকায় লেখেন ---- 

"The non-Hindu peoples in Hindustan must either adopt the Hindu Culture and language, must learn to respect and hold in reverence Hindu religion, must entertain no ideas but those of glorification of the Hindu race and culture. ... In one ward, they must cease to be foreigners, or may stay in the country, wholly subordinated to the Hidu Nation, claiming nothing, deserving no privileges ----- far less any preferential treatment ----- not even citizen's rights."
         (------We or Our Nationhood Defined) 


বিগত শতাব্দীর সেই ত্রিশের দশকের বিশ্বধংসী বিবাদ। স্লাভ ও ইহুদী জাতিকে অবদমিত করে বিশুদ্ধ আর্যত্বের শ্রেষ্ঠত্ব-ঘোষণা। হিটলার বিষাক্ত শাণিত বক্তব্যে প্রচার করতে লাগলেন সেমেটিক জাতির ষড়যন্ত্রে আর্য জার্মানী বিপন্ন। ভারতেও সেই একই উচ্চারণ, একই ঘোষণা ! আর এস এস-এর মুখপত্রে সেই একই আসন্ন জাতিদাঙ্গার নরমেধ যজ্ঞে ঘৃতাহুতি ! হিন্দু জাতি, হিন্দু সংস্কৃতির, হিন্দু ধর্ম বিপন্ন ! অপরদিকে, প্রথম দশক থেকেই সৈয়দ আহমদের প্রচার। তার আলীগড় দলের দাবী,--- পৃথক নির্বাচন, বিশেষ গুরুত্ব (weightage). নূতন করে মাথাচাড়া দিয়ে উঠল কুড়ি ও ত্রিশের দশকে। আরও তীব্র, তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল সাম্প্রদায়িক বিভাজন। এখানে উল্লেখ করা দরকার সেই ১৯০৫/'০৬ সাল থেকেই ইংরেজদের divide and rule. কার্জন, মিন্টো, রিজলেদের চক্রান্ত।  ফল হাতে হাতে। ১৯০৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল মুসলিম লিগ, পরের বছর হিন্দু মহাসভা। (প্রাতিষ্ঠানিক নামকরণ ১৯২১)। এর পরেকার ইতিহাস বিসর্পিল, জটীল এবং অমানবিক।

এইভাবে ভারত স্বাধীন হওয়ার বহু পূর্ব-সময়কাল থেকেই ভারতবাসীর ভাগ্য নিয়ন্ত্রণের দায় যাঁরা নিয়েছিলেন তাঁদের অবিমিশ্রকারিতা ও অদূরদর্শিতার  ফলে সাম্প্রদায়িকতা ধীরে ধীরে এমন এক নারকীয় পরিবেশ সৃষ্টি করল যার শেষ, বীভৎস পরিণতি এল ১৯৪৬-সালে। ওই বছর অক্টোবরে মহম্মদ আলি জিন্নার প্রত্যক্ষ সংগ্রামের ডাক, কলকাতার দাঙ্গা, বিহারের দাঙ্গা এবং সমুহ সর্বনাশ --- বাঙলার ইতিহাসের বীভিষিকা নোয়াখালীর গণসংহার---- লুণ্ঠন,  নারীধর্ষণ, শিশু-কিশোর-তরুণ-বৃদ্ধদের নির্বিচারে হত্যা --- ভারতের বুকে দুর্মোচনীয় ভেদরেখা এঁকে দিয়ে দিয়ে গেল চিরকালের জন্য। দাঙ্গা বন্ধ করার তাগিদ নিয়ে, দাঙ্গাবিধ্বস্ত মানুষের আর্তনাদ শোনার আন্তরিকতা নিয়ে, দেশের কোন হিন্দু বা মুসলমান নেতৃত্ব যান নি সেদিন। গিয়েছিলেন আশাহত, বিধ্বস্ত বৃদ্ধ গান্ধী আর দেশের মাতৃসমা নারীনেত্রী সুচেতা কৃপালিনী। কিন্তু তাঁদের দৌত্যও ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছিল কেননা গান্ধীজীর অনুপস্থিতিতেই কংগ্রেস তখন মেনে নিয়েছিল দেশভাগ। মারণলিপ্সার নরমেধ যজ্ঞে পূর্ণাহুতি ! বাঙলা আর পাঞ্জাবের উদ্বাস্তুদের জীবন হয়ে উঠল জীবন্ত নরক। 


(বাঙলার এই মর্মান্তিক ইতিহাসের পুনরাবৃত্তির অবকাশ এখানে নেই। একটি স্বতন্ত্র প্রবন্ধে সেটি লেখার ইচ্ছা রইল)। 


" দেশ স্বাধীন হল, দেশভাগ হল --- রেখে গেল কি গ্লানিময় পঙ্কসয্যা ---- দেশ হারাবার, প্রিয়জন বিচ্ছেদের, গণহত্যা, নারীধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ, লুণ্ঠনের কী দুর্মর দুঃস্বপ্ন ! এই দুঃস্বপ্নের‌ দুর্মোচনীয় অভিশাপ ভারতের  ধর্মীয় রাজনীতিকে পরিপুষ্ট করছিল, (আজও করে চলেছে)। 

গান্ধীর দিকে আঙুল তুলে সেদিন আর এস এস বলেছিল‌, 'হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের কথা বলে দেশের প্রতি  সবচেয়ে বিশ্বাঘাতকতা করেছেন তিনি।''
তাই কি 'হিন্দুদের ঈশ্বরের দূত' হয়ে এসেছিলেন তিনি, যিনি তাঁকে তাঁর উন্মুক্ত বুকে গুলি করলেন প্রার্থনা মন্দিরে ? যুগ যুগ আচরিত সনাতন ধর্মের ফরমান নিয়ে ? অহিংসার পূজারীর শোণিতার্ঘ্য দানের পরেও কি দেশমাতৃকার আরও বলি চাই ? আরও রক্তাঞ্জলি ?! 


সে দিনের পর থেকে বর্তমান সময়কাল পর্যন্ত দেশের বিধাতৃ যাঁরা, ঈশ্বরের দূত যাঁরা‌, তাঁরা গান্ধীজীর জন্মদিনে, মৃত্যুদিনে তাঁর‌ সমাধিস্থলে‌‌ পুষ্পস্তবক রাখেন, মালা দেন, নীরবতা পালন করেন।  তা অনুতাপের, না স্বস্তির  ? বোঝা যায়না।‌

সুধী পাঠকদের উপর বিচারের ভার রইল। 

ভারতীয় শাশ্বত ধর্মদর্শন কি একজন নিরস্ত্র সাধারণ মানুষকেও হত্যা সমর্থন করে ? 

দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
৩১শে জানুয়ারী,২০২৫
কলকাতা।
___________________________________________

বুধবার, ২৯ জানুয়ারি, ২০২৫

ধর্মসংকটের বলি মানবতা ---পর্ব ৫

ধর্মসংকটের বলি মানবতা --পর্ব ৫ 


এবার আসি ইসলাম ধর্মে। ইসলাম ধর্ম আলোচনার আরম্ভে একজন বিদগ্ধ পণ্ডিত ও প্রাবন্ধিক, যার সঙ্গে আমি সহমত পোষণ করি সেই শ্রদ্ধেয় সত্যেন্দ্রনাথ রায় মহাশয়ের কথাগুলি উদ্ধার করি, 


"ইসলাম একই সঙ্গে একটি ধর্ম, একটি রাজনৈতিক শক্তিকেন্দ্র এবং সেকালের পক্ষে (ষষ্ঠ শতক থেকে সম্পূর্ণ মধ্যযুগ) সুশৃঙ্খল সমাজগঠনের একটি ব্যবস্থা। ইসলামের সমাজ-পরিকল্পনায় দুটি বৈশিষ্ঠ বিশেষভাবে লক্ষণীয়। এক হোল দৃঢ়বদ্ধ সামাজিক সংহতি আর দুই সামাজিক সুবিচার ও সাম্য। এক সময় অন্য ধর্ম থেকে মানুষ যে দলে দলে ইসলামে ধর্মান্তরিত হয়েছে তার মধ্যে এই সাম্যের আকর্ষণ অনেকখানি ক্রিয়া করেছিল।" 


ইব্রাহিমীয় ধর্মীয় ধারায় ইসলামের অভ্যুদয় --- এমন একটি ইতিহাস সমর্থিত বিশ্বাস আছে। মহান আদম থেকে সুলেমান, এরা সকলেই ঈশ্বরের কছ থেকে বাণী লাভ করেন ও মানুষের মঙ্গলের জন্য সে বাণী প্রচার করেন। মহানবী হজরত মহম্মদ তেমনি  ঈশ্বরের বাণী- বাহক। সেই বাণী বিধৃত আছে কোরান ধর্মগ্রন্থে।
"La ilaha il Allah ; Muhammed Rasool Allah"
(There is none worthy of worship except God. Muhammed  is the Messenger of God). ---.......................................................................
This is not a new Message. It is the pristine message of all Prophets. The Qur'an affirms this again and again and emphasizes the continuity of the Divine Word.  The names of many of the Messengers ------- Adam, Abraham,  Moses, Jesus, Muhammed (peace be upon them) ---are explicitly stated in the Qur'an. The names of countless others are alluded to but are not spelled out. In this manner, The Qur'an upholds the Unity of all universal religions."
                                                  The Qur'an
                                   --------------Dr.Nazeer Ahmed.‌


নবী হজরত মহম্মদের জন্ম ৫৭০, মতান্তরে ৫৭১ খ্রীষ্টাব্দে। বাল্যকালেই তিনি পিতামাতাকে হারান এবং চাচা আবু তালিবের স্নেহ ও যত্নে বড় হয়ে ওঠেন।‌‌ প্রথম জীবনে 'চরবাহা' বা মেষপালকের ভূমিকায়, পরে তিনি ব্যবসায়ী হিসাবে কর্মজীবন অতিবাহিত করেন। কিন্তু জ্ঞানোন্মেষ হওয়ার সময়কাল থেকেই তিনি ছিলেন আত্মানুসন্ধানী ও সত্যানুসন্ধানী। তিনি নূর পর্বতের হেরো গুহায় নিয়মিত গভীর ধ্যানে মগ্ন থাকতেন। ৩৫ বছর বয়সে তাঁর‌ তপস্যা কঠোরতর হয় এবং যখন তার ৪০ বছর বয়েস তখন কুরআনের প্রথম আয়াত তার উপর‌ অরতীর্ণ হয়।  এই ভাবে ঈশ্বরের বা আল্লাহর বাণী লাভ করতে থাকেন। আয়াতগুলি ভক্তদেরকে দিকনির্দেশ করেন, বোধ বুদ্ধি দান করেন এবং স্বর্গীয় সংবাদ পৌঁছে দেন। তিনি বিশ্বাস করলেন এবং আপনজনদের জানালেন, আয়াতগুলি জিব্রাইল ফেরেস্তা দ্বারা প্রেরিত আল্লাহর (ঈশ্বরের) বাণী। তিনি নিজেকে আল্লাহর রাসুল ও নবী বলে ঘোষণা করেন এবং প্রচার করেন যে তিনি পূর্ববর্তী নবীদের পরম্পরায়, ঈশ্বরের বাণী প্রচার করবার আদেশ প্রাপ্ত হয়েছেন।
ধর্ম প্রচারের প্রথম দিকে মক্কায় কিছু গোষ্ঠী ও আত্মীয়দের কাছে বাধাপ্ৰাপ্ত হয়েছিলেন। তিনি মদিনায় আসেন। 'মদিনার সনদপত্র' নামক সংবিধানের মাধ্যমে ধর্মাদর্শ ঘোষণা করেন, সেখানকার ভিন্ন ভিন্ন জনগোষ্ঠীগুলিকে সঙ্ঘবদ্ধ করেন। এবার মক্কার‌ ঐ প্রকার গোষ্ঠী-সম্প্রদায় ও পৌত্তলিকদের সঙ্গে প্রায় আট বছর ধরে যুদ্ধ চলে। এই সময়কালে তার অনুসারির সংখ্যা অকল্পনীয়ভাবে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হতে থাকে। তিনি ৬৩০ খ্রীষ্টাব্দে দশ হাজার সাহাবির এক বিশাল মুশলিম বাহিনীর নেতৃত্বে মক্কা অবরোধ করেন। মক্কা বিজয় ঘটেছিল রক্তপাতহীন অভিযানের মাধ্যমেই। মক্কায় প্রবেশ করেই সমস্ত মূর্তিই ধংস করার আদেশ দেন।
এইভাবে বহু সফল অভিযানের নেতৃত্ব দিয়ে আরবের প্রায় সম্পূর্ণ অংশ দখল করেন এবং একই সাথে তাঁর ধর্মপ্রচারও অব্যাহত থাকে। ইসলাম বর্ষপঞ্জীর মতে ১০ম হিজরীতে, ৬৩২ খ্রীষ্টাব্দে জীবনে একমাত্র এবং শেষ হজ্জ পালন করার সময় আরাফাতের ময়দানে, জাবাল-এ-টিলার উপর দাঁড়িয়ে সমবেত লক্ষাধিক তাঁর অনুগমনকারী মুসলমানদের উদ্দেশে তিনি ভাষণ দেন। এই ভাষণ মহান মুসলমানগণ বিশ্ব ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ ভাষণ বলে বিবেচনা করেন, যে ভাষণে তিনি ইসলামের প্রকৃত মূল্যবোধ অনুযায়ী মুসলমানদের কী করণীয় সে সম্পর্কে চূড়ান্ত দিকনির্দেশনা দান করেন।
আমরা মহান নবী হজরত মহম্মদের প্রচারিত ধর্মধারণার ব্যাপ্তি, গভীরতা ও দর্শন নিয়ে আলোচনার স্পর্ধা সংবরণ করতে চাই এই কারণেই যে ইসলাম ধর্মের সাধক যাঁরা তাঁরাই এই ধর্মদর্শনের ও তার আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যার অধিকারী। তবে এই বিষয়ে অতি সামান্য  অধ্যয়নের ফলে এটুকু উপলব্ধি করেছি যে ইসলামধর্মেরও মূল আদর্শ ভ্রাতৃত্ব, সাম্য এবং মানবতা। মহান নবী তার শেষ বিদায়ী ভাষণে (খুৎবা) বলছেন, "মনে রেখো এক মুসলিম  আরেক মুসলিমের ভাই।" তাঁর‌ এই ঐতিহাসিক উপদেশগুলি "মানবাধিকারের শ্রেষ্ঠ সনদ।" 


ইউরোপের খ্রীষ্টানধর্ম যেমন যীশুখ্রীষ্টের প্রয়াণের প্রায় তিন শতাব্দী পরে রোম সাম্রাজ্যের শাসকদের, এবং ক্রমান্বয়ে অপরাপর রাষ্ট্রের শাসকদের, অভিজাতবর্গের পৃষ্টপোষকতা লাভ করেছিল মধ্যপ্রাচ্যের হজরত মহম্মদ প্রচারিত ধর্মধারণা কিন্তু জন্মলগ্ন থেকেই যোদ্ধার ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। এখানে সূচনাপর্ব থেকেই ইসলামে ধর্ম ও রাষ্ট্র অভিন্ন। ৬৬২ খ্রীষ্টাব্দে মহান নবী হজরত মহম্মদের মহা প্রয়াণের সঙ্গে সঙ্গেই ইসলামের  ধর্মশক্তি ও রাষ্ট্রশক্তির সম্পৃক্ততা-জনিত দ্বন্দ্ব প্রকট হয়ে ওঠে। রাষ্ট্র ব্যবস্থার প্রাতিষ্ঠানিক রূপের সঙ্গে ধর্মাচার ও ধর্মীয় আদর্শের মিলনের ফলে শাসকবর্গের মধ্যে ক্ষমতার অধিকার লাভের নিষ্ঠুরতা অনিবার্য হয়ে উঠল। অন্তর্কলহ, পররাজ্য আক্রমণের দ্বারা ধর্মাদর্শের প্রচার, পরধর্ম অসহিষ্ণুতা -- ধর্মের প্রাতিষ্ঠানিকতার যত কিছু লক্ষণ সবই যুক্ত হোল ঐসলামিক সাম্রাজ্য বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে। হজরত মহম্মদ পরবর্তী সময়ে কে খলিফা হবেন তাই নিয়ে ঘোরতর অন্তর্দ্বন্দ্ব দেখা দিয়েছিল। আবুবকর পক্ষের সাথে আলি পক্ষের মতবিরোধের পরিণতি ৬৮০ সালে কারাবালা প্রান্তরের যুদ্ধ। এখানে উমাইয়া সৈনদলের সঙ্গে যুদ্ধে আলির কনিষ্ঠ পুত্র হুসেনের পরাজয় ঘটে এবং আলি নিহত হন। সেই সময়েই সিয়া ও সুন্নী এই দুই শাখায় ইসলামের মূল স্রোত দ্বিধাবিভক্ত হয়ে যায়, শিয়া সুন্নী সম্প্রদায়ের এই বিচ্ছেদ চরম বৈরীতায় পর্যবসিত হয়। অন্তর্দ্বন্দ্বের এখানেই শেষ নয়, দ্বিতীয় খলিফা ওমর নিহত হন তাঁর‌ ক্রীতদাসের হাতে, তৃতীয় খলিফা ওসমান ও চতুর্থ খলিফা আলি দুজনই  নিহত হয়েছিলেন গুপ্তঘাতকের দ্বারাই। প্রাথমিক পর্যায়ে ইসলামের অভ্যন্তরে এমন শাসনক্ষমতা ও ধর্মগুরুর অধিকারের রক্তাক্ত সংগ্রাম যেমন ছিল তেমনি ছিল ইসলাম সাম্রাজ্যবাদের বিস্তার।  কালের বিবর্তনের সাথে সাথে ইউরোপখণ্ডের সম্প্রসারণবাদী খ্রীষ্টানধর্মের  মতই ইসলাম ধর্মও বিশ্ববিজয় অভিযানে উদগ্রীব হয়ে উঠল। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলেছিল (চলেছেও) এই আগ্রাসন। প্রভুত্বের দুর্মদ আকাঙ্ক্ষা-প্রসূত অন্তর্দ্বন্দ্বের ফলে গুপ্ত হত্যা, ভ্রাতৃহনন, আত্মজনহনন যেমন ছিল তেমনি ছিল ইসলাম  সাম্রাজ্যবাদের ক্রমসম্প্রসারণশীল প্রবনতা। খলিফা আবু বকর সর্বপ্রথম আরব-বিজয় সম্পূর্ণ করেছিলেন। তারপর দ্বিতীয় খলিফা ওমরের নেতৃত্বে আরম্ভ হোল প্রকৃতপক্ষেই এক দেশ হতে অন্যদেশে সমরাভিযান। অল্পকালের মধ্যেই প্যালেস্টাইন, ইরাক, সিরিয়াসহ সমগ্র মিশর। সাম্রাজ্যবিস্তারী ইসলাম মহান নবী মহম্মদের তিরোধানের পরবর্তী এক'শ বছরের মধ্যে ইউরোপখণ্ডের স্পেন থেকে এশিয়া মহাদেশের সিন্ধুনদের তীরবর্তী  অঞ্চল ছাপিয়ে চীন পর্যন্ত এবং  ওদিকে উত্তর আফ্রিকার সুবিশাল ভূখন্ডে ইসলামের আধিপত্য বিস্তৃত হোল।

ইসলাম ধর্মে সিয়া ও সুন্নী বিভাজনের কথা আমরা আগেই বলেছি। কোনও ধর্মের মূলিভূত যে রূপ তার বিবর্তন ঘটা স্বাভাবিক যখন সেই ধর্মের আচরণগত বৈসাদৃশ্য আসে। সেই বৈসাদৃশ্য উদ্ভুত হয় কালে কালে ভিন্ন ভিন্ন ধর্মগুরুদের নিজস্ব ব্যাখ্যার দ্বারা। ইহুদী ধর্মে তেমন ঘটেছে ; তেমন ঘটেছে খ্রীষ্টান ধর্মে। ইসলাম ধর্মেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। ইসলাম যখন ভৌগলিকভাবে বিভিন্ন ভূখন্ডে এবং বিভিন্ন জনজাতির লোকায়ত ধর্মধারণার ও ধর্মসংস্কারের সংস্পর্শে এসে পৌঁছাল তখন   কৌমচেতনা ও কৌমপ্রবনতার প্রভাবে ইসলামের ভিন্ন ভিন্ন শাখারও  উদ্গম অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠল। তাদের মধ্যে কয়েকটি --- যেমন খারিজি সম্প্রদায়, মুরজিয়া সম্প্রদায়, ইসমাইলী শিয়া সম্প্রদায়, মুতাজিলা গোষ্ঠী।কলকাতা পীর, ফকির, দরবেশ ইত্যাদী।

নবী হজরত মহম্মদ প্রচারিত ও প্রতিষ্ঠিত ইসলাম এক দৃঢ়সংবদ্ধ রাষ্ট্রশক্তি, না কি ধর্ম-শক্তি এই জটীল প্রশ্নের উত্তর ইতিহাসের জটাজালে জড়িয়ে রয়েছে। আমরাও তার মীমাংসায় যাবো না। তার বিচার করুক শাশ্বত  মহাকাল, কিন্তু এই রাষ্ট্রশক্তির পৃষ্টপোষকতায় প্রচারিত ও প্রসারিত  ইসলামের বিজয়াভিযানে মানবসভ্যতার কতখানি বিকশন সম্ভব হয়েছে, কতখানি মঙ্গলালোক বিকীর্ণ হয়েছে পৃথিবীর বুকে তাই যেন বিচার্য বিষয় হয় অনাগত ভবিষ্যতে। 


একথাও ঠিক যে ক্ষমতালিপ্সু রাজশক্তি বা আধিপত্যবাদী রাষ্ট্রশক্তি ধর্মধারণার আদি ও মূল আদর্শ ও উদ্দেশ্য বিস্মৃত‌ হয়, দয়া মায়া করুণা, শুশ্রূষা ও সহিষ্ণুতা প্রভৃতি কোমল মানবিক বৃত্তিগুলি ঢেকে যায় হিংস্রতা, জিঘাংসা, নির্মমতার অন্ধ অমানবিকতায়।
খ্রীষ্টানধর্মের এবং ইসলামধর্মের এবম্প্রকার বিশ্ববিজয়ী সাম্রাজ্যের শাসনতন্ত্রের অধীনে-থাকা দেশগুলির বিভিন্ন প্রকার উন্নতি-অবনতির আলোচনা করবার পরেও ধর্মতাত্ত্বিক ও ইতিহাসবিদ সত্যেন্দ্রনাথ রায় মন্তব্য করছেন,
"জানিনা কোন্ অধিকারে এক রাজ্য অপর রাজ্য জয়  করে, দিগ্বিজয়ী কোন্ অধিকারে পাইকেরি নরহত্যার পথে ধাবিত হয় ; জানি না এক ধর্ম কেন অপর সমস্ত ধর্মের বিরুদ্ধে আগ্রাসী অভিযান চালায়, তাতে জগতের কার কি হিত হয় ! শুধু জানি, এই সব আগ্রাসী অভিযান মানুষের যত ঘর ভেঙেছে, যত জনপদ শ্মশান করেছে, যত রক্ত ঝরিয়েছে কোন কিছুতেই তার দাম ওসুল হয় না। রক্তপাতের প্রসঙ্গে আবার ক্রুশেডের কথাও আসতে পারে, কেননা কয়েক শতাব্দীব্যাপী এই যুদ্ধ তো একা খ্রীষ্টীয় পক্ষেই  করেনি, অপর দিকে মুসলমানপক্ষও ক্রুশেড যুদ্ধে কখনই অনাগ্রহী ছিল না। খ্রীষ্টীয় পক্ষ যেমন লুব্ধ দস্যুর দৃষ্টিতে মধ্যপ্রাচ্যের দিকে বার বার দৃষ্টিপাত করেছিল, মুসলমান পক্ষীয়রাও ঠিক সেইরকমই আগ্রাসী মনোভাব নিয়েই ইউরোপে আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করেছিল। উভয় পক্ষের ধর্মীয় প্রাধান্য লাভের অভিপ্সাও তুল্যমূল্য।"

ধর্মের প্রভুত্ব মানবচেতনার কোন্ অনাগত প্রত্যুষে মানবপ্রেমের স্বর্গরাজ্য  স্থাপনা করবে তারই প্রতীক্ষায় আজ "হিংসায় উন্মত্ত পৃথ্বীর" ঘোরতামসময়ী অমানিশা-জাগরণ।
                    তমসো মা জ্যোতির্গময়।।
                            (ক্রমশঃ)
এরপর পর্ব ৬।
ভারতীয় ধর্ম (বর্তমানে যা 'হিন্দু' ধর্ম নামে আলোচিত)।

দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় 
২৯/০১/২০২৫
কলকাতা 
______________________________________________





শনিবার, ২৫ জানুয়ারি, ২০২৫

Searching in Self

Searching in self

Dived down into my self and found a world of light ;
Similar to the Sky above, illuminated by
Some star-like beings, whom I worship,
Whom I pray to and ask for blessings Divine !
Startled l discovered The Divinity in me !
Of a sudden, all my profanity, desecration,
That I had been suffering from and caused
My brethren suffer, burnt out. In me the Propitious ---
The Liberators, Prophets, Saints and Sages.
In me the Light of the Blessed and the Virtuous.
In vain I spewed venom of despised animous,
In vain I've slain the Lamb of innocence and humanity,
To live in the Promised Abode in the Paradiso -
That I find nowhere in the Empty space above ;
But in the heart of man -- vicious or pious.

Dulal Chandra Bandyopadhyay
25-01-2025
Kolkata
_______________________________________________

বৃহস্পতিবার, ২৩ জানুয়ারি, ২০২৫

ধর্মসংকটের বলি মানবতা --পর্ব ৪


St. Paul's Cathedral in Kolkata  


ধর্মসংকটের বলি মানবতা--- পর্ব ৪

যীশুর মৃত্যুর পর 'যীশুর রক্ত পান করে' (The last Supper, অন্তিম নৈশভোজ স্মর্তব্য) যীশুর পরিকর ও শিষ্য সম্প্রদায় আদম্য উৎসাহে প্রচারে আত্মোৎসর্গ করেছিলেন। ইউরোপ ছাড়িয়ে তাঁরা ছড়িয়ে পড়েছিলেন আফ্রিকায়, অস্ট্রেলিয়ায়, উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকায় এবং অবশ্যই রাশিয়া ও চীনসহ বিশাল এশিয়া মহাদেশেও। 

(আমাদের এই ভারতবর্ষে কেমন ছিল তাদের ধর্মপ্রচার তারি একটি অতি সংক্ষিপ্ত বিবরণ দেওয়াও যুক্তিযুক্ত।) 

Saint Thomas, the founder of Christianity in India. 

Christianity বা খ্রীষ্টধর্ম আলোচনা প্রসঙ্গে
ভারতে খ্রীষ্ট ধর্মের প্রচার, বিস্তার ও প্রভাবের কথা অবশ্যম্ভাবীরূপে আসবেই। ঐতিহাসিকেরা গবেষণা করে দেখেছেন সেন্ট টমাস নামের এক খ্রীষ্টান ধর্ম প্রচারক আনুমানিক ৫০ খ্রীষ্টাব্দে ভারতে আসেন এবং ৫৮ খ্রীঃ নাগাদ মালাবার উপকূলে খ্রীঃ ধর্ম প্রচার করতে থাকেন।
(Thomas the Apostle --- One of the Twelve Apostles of Jesus). 


বেশ কিছু মানুষ এই নূতন ধর্মের প্রতি আকৃষ্ট হন এবং একটি সম্প্রদায় গঠন করেন। অনেক ঐতিহাসিক মনে করেন তিনি জলপথে এসেছিলেন, আবার অনেকের ধারণা তিনি ইটালি থেকে পূর্বদেশের পথ ধরে এশিরিয়া হয়ে ধর্মপ্রচার করতে করতে স্থলপথে, বর্তমান আফগানিস্তানের মধ্য দিয়ে ভারতীয় উপমহাদেশে প্রবেশ করেছিলেন। পশ্চিমঘাট উপকূলের আদিবাসী সম্প্রদায়ের কাছে তিনি শ্রদ্ধার সঙ্গে সমাদৃত হন। সহজ সরল আবেদনে বিরাট এক জনগোষ্ঠীকে তিনি খ্রীঃ ধর্মে দীক্ষিত করেন। আনুমানিক ৭২ খৃষ্টাব্দে, দক্ষিণ ভারতে চোল বংশের রাজত্বকালে পারানজিমালায়, (সেন্ট টমাস মাউন্ট বর্তমান তামিলনাড়ুতে), তিনি প্রয়াত হন, যেখানে একটি সুন্দর চার্চ তৈরী করা হয়েছে। তারপর থেকে একাধিক ক্রমে জেসুইট সম্প্রদায়, সিরীয় ও রোমান ক্যাথলিক সম্প্রদায় ভারতবর্ষে আসেন। দক্ষিণ ভারতীয় উপকূল অঞ্চলেই মূলত তাদের ধর্মীয় প্রচার ও ধর্মান্তরিতকরণ সীমাবদ্ধ ছিল। 

জেসুইট সম্প্রদায়ের সঙ্গে বাঙলার প্রথম সংযোগ স্থাপিত হয় ১৫৭৬ খ্রীষ্টাব্দে, ফাদার এন্টনী ভাজ, ফাদার পিটার ডায়াস প্রভৃতি ধর্ম প্রচারকগণের প্রচেষ্টায়। রোমান ক্যাথলিকদের আগমন ঘটে ১৫৮০ খ্রীঃ নাগাদ। ওলন্দাজদের ব্যাবসায়িক কাজ শুরু হয়েছিল ব্যান্ডেল অঞ্চলে এবং তাদেরই প্রচেষ্ঠায় গড়ে ওঠে ব্যান্ডেল শহর। এখানেই ১৬২২ খ্রীষ্টাব্দে সেন্ট পল কলেজের রেক্টর নিযুক্ত হয়েছিলেন জনৈক ফাদার গোমেজ, এবং ধর্ম সংক্রান্ত শিক্ষারও সূচনা হয়েছিল। এখানেই বাংলার প্রাচীনতম খ্রীষ্টান গীর্জা ব্যান্ডেল চার্চ (The Basilica of the Holy Rosary, Bandel, West Bengal), ১৬৬০ খ্রীষ্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত। 

এ ছাড়া পরবর্তী সময়ে কোলকাতায় কয়েকটি ঐতিহাসিক গীর্জার অস্তিত্ব এখনো বর্তমান। সেগুলির মধ্যে 'মিশন চার্চ' সম্ভবত প্রাচীনতম। 'যোহান জাখারি' (Johnn Zachariah Kiernader) নামের এক মিশনারী, যিনি ১৮ বছর ধরে দক্ষিণ ভারতে খ্রীষ্টধর্ম প্রচার করছিলেন, তাঁকে এই একই কাজে লর্ড ক্লাইভ কোলকাতায় আমন্ত্রণ করেন। এই মিশনারী জোহান ১৭৭০ খৃষ্টাব্দে সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত খরচে একটি চার্চ নির্মাণ করেন। এটি মিশন চার্চ নামে পরিচিত। মূল নাম ছিল, Beth Tephillah (Hebrew -- House of Prayer). এই  চার্চটিতেই মাইকেল মধুসূদন দত্ত দীক্ষিত (baptized) হয়েছিলেন।
এরপর যে কয়েকটি প্রাচীন চার্চ কোলকাতায় নির্মিত হয়েছে ও আছে তাদের মধ্যে সেন্ট পল'স ক্যাথিচার্চ, আর্মেনিয়া চার্চ, সেন্ট জন'স চার্চ, সেন্ট এনড্রিউ'স চার্চ, সেন্ট থমাস (প্রোটেস্টান্ট) চার্চ, সেন্ট থমাস (অর্থডক্স) ক্যাথিড্রাল, স্যাক্রেড (ক্যাথলিক) চার্চ ইত্যাদি।
('ভারতভূমিতে চার্চ' -- বিষয়ে আলাদা আলোচনার অবকাশ রইল)

১৬৩৩ খ্রীষ্টাব্দে মোগল সম্রাট সাজাহানের এক ফরমানে খ্রীষ্টবিশ্বাসীদের ধর্মাচরণের জন্যে, গীর্জার রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ৭৭৭বিঘা নিষ্কর জমি দান করা হয়েছিল। এই দৃষ্টান্ত মোগল শাসকদের পরধর্মসহিষ্ণুতার উদাহরণ। বিশেষ করে এই বাঙলায় তথা সমগ্র ভারতবর্ষে খ্রীষ্টান ধর্মের যে প্রতিষ্ঠা ও বিস্তার তা ভারতবর্ষের সমকালীন ও পরবর্তীকালেও সমস্ত শাসকবর্গের, হিন্দু মুসলিম সকলের আনুকুল্য লাভ করেই সম্ভব হয়েছে। সেন্ট টমাসের সময়কাল (আনুমানিক ৫০খ্রীঃ) থেকে মোগল সাম্রাজ্যের তৃতীয় প্রজন্ম পর্যন্ত প্রায় দেড়হাজার বছরের অধিককাল ধরে ভারতবর্ষে শাসকদের ইসলাম ধর্মের ও বনিক ইংরেজদের খ্রীষ্টান ধর্মের প্রচার ও প্রসার হয়েছে সমান্তরালভাবে। অপর দিকে ভারতের আদি বেদান্ত ধর্মের পাশাপাশি, কিছুটা অনুচ্চগ্রামে হলেও শিখ, বৌদ্ধ, জৈন, পারসিক ও লোকায়ত বহু প্রকার গোষ্ঠী-সম্প্রদায়গত ধর্মের আচরণ ও ধর্মীয় সংস্কার পালনেরও প্রচলন ছিল ; কিন্তু নির্বাধ ছিল সর্বতোভাবে, তেমন কথা বলা যায় না। পুরাতন হিন্দু দেবদেবীদের অজস্র মন্দির, বিশেষ করে ভারতের উত্তর অর্ধাংশে, ধংস করা হয়েছিল। সেখানে নির্মিত হয়েছে বহু মসজিদ। অসংখ্য বৌদ্ধ মঠ, স্তুপ, প্যাগোডা, শিক্ষাকেন্দ্র ( যেমন নালন্দা বৌদ্ধ বিহার ও মহাবিদ্যালয়)। সেই সকল ধংসস্তুপের নিদর্শন আজিও প্রত্নতাত্বিকদের গবেষণার বিষয়।
এই সময়কালের মধ্যবর্তী অংশটি, অষ্টম থেকে পঞ্চদশ শতক, ইউরোপ ভূখন্ডে যখন অন্ধকারময় যুগ তখন সমগ্র ভারতবর্ষসহ এই বঙ্গদেশেও নানা কৌম ধর্মবিশ্বাস ও ধর্মীয় অনুষ্ঠান, ব্রাহ্মণ্য ধর্মের নানা মত, নানা পথ, বিভিন্ন বিচিত্র লোকসংস্কার, জৈন ও বৌদ্ধ ধর্মের নানা প্রকার আদর্শ, আচরণ লোকায়ত স্তরে প্রচলিত ছিল। একাদশ, দ্বাদশ ও ত্রয়োদশ শতকে উত্তর ভারতের সঙ্গে পূর্ব ভারতও যখন সামরিক শক্তিতে প্রবলতর বহির্দেশীয় মুসলিম অভিঘাতে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ল তখন সমগ্র বঙ্গভূমির সহস্রাব্দব্যাপী আচরিত ব্রাহ্মণ্যবাদী ও কৌম ধর্মাচরণ ছিন্ন বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল। 

এমনই এক‌ শিথিলগ্রন্থী, ভগ্নপ্রায় সমাজবন্ধনের সুযোগে ভারতবর্ষের উচ্চবর্ণের দ্বারা উপেক্ষিত নিম্নবর্ণের কৌম সম্প্রদায়ের বিরাট অংশ ইসলাম ও খ্রীষ্টান ধর্মের আশ্রয় গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছিল। তবে একথা ঠিক যে ভারতবর্ষে খ্রীষ্টান ধর্ম প্রচারণার ক্ষেত্রে আগ্রাসন ও রক্তপাতের তেমন ইতিহাস প্রায় নেই বললেই চলে।
অষ্টাদশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে (১৭৫৭ খ্রীষ্টাব্দে পলাশীর যুদ্ধ, ১৭৬৫ খ্রীষ্টাব্দে মোগল সম্রাট শাহ আলমের কাছ থেকে বাঙলা, বিহার ও ওড়িশার দেওয়ানী লাভ) ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর শাসন এবং পরবর্তী কালে ইংরেজ রাজত্বের সুদৃঢ় প্রতিষ্ঠার পর বাংলায় তথা ভারতবর্ষে, ক্রমান্বয়ে খৃষ্টান ধর্মের প্রচার ও প্রসার ঘটতে থাকে। এবং যেহেতু ভারতে বৃটিশ সাম্রাজ্যের শাসন প্রতিষ্ঠিত হোল একমাত্র সেই কারণেই এদেশে ক্যাথলিক ধর্মপ্রচার অনেকটাই স্তিমিত হয়ে এসেছিল, আর তার ব্যাপকতাও সীমাবদ্ধ হয়ে গিয়েছিল। পরিবর্তে ইংল্যান্ডের 'রাজধর্ম' প্রোটেস্ট্যান্ট খ্রীষ্টধর্ম প্রচারক পাদ্রীদের অপ্রতিহত প্রাধান্য কায়েম হোল। শুধু ভারতবর্ষে নয়, পৃথিবীর যে সকল অঞ্চলে প্রোটেস্টান্টবাদ (Protestantism) বিকাশলাভ করেছে, সেখানেই এই শাখার ধর্মপ্রচারকেরা রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আধিপত্য বিস্তার করবার চেষ্টা করেছে এবং রাজশক্তির অনুগ্রহে সফলও হয়েছে চুড়ান্তভাবেই।
তবে ক্যাথলিক সম্প্রদায়ভুক্ত মিশনারীদের দল যেভাবে আফ্রিকায়, চীনে, মেক্সিকোতে বা পেরুতে ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদের কনিষ্ঠ সহযোগীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে সে সব দেশের আদিবাসীদের উপর রক্তঝরা নির্যাতন চালিয়েছিল ভারতবর্ষের ক্ষেত্রে প্রোটেস্টান্ট সম্প্রদায় সে রকমটি করেনি, বা করতে চায় নি। তার অনেকগুলি কারণের মধ্যে ভারতের মূল ধর্মভাবনার ঔদার্য, গ্রহনক্ষমতা ও ভিন্ন ভিন্ন মতের আত্মীকরণ ও আঙ্গীকরণ মানসিকতা ; যদিও উচ্চবর্ণীয় ব্রাহ্মণ্যবাদীদের কাছে ইসলামধর্মের মতই খ্রীষ্টানধর্মও অচ্ছুৎ ছিল। কিন্তু বর্ণাভিমানের বাইরে যে যে বৃহত্তর মানবগোষ্ঠী বহিরাগত ধর্মপ্রচারকদের সহানুভূতি, সখ্য ও সহায়তা লাভ করছিলেন, প্রাণের স্পর্শ ও দানের আনন্দ ভোগ করার অযাচিত সুযোগ লাভ করেছিলেন, তাঁরা যীশুর বাণী গ্রহণ করতে দ্বিধা করেননি। এতৎসত্ত্বেও ভারতবর্ষে খ্রীষ্টানধর্মের দ্বারা প্রভাবিত ও ধর্মান্তরিত মানুষের সংখ্যা ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত ভারতবাসীর সংখ্যা অধিকতর। এবং তা সম্ভব হয়েছে রাষ্ট্রশক্তির শাসনে ও আনুকুল্যে। মুসলিম ধর্মবিস্তারের ক্ষেত্রে সেই রাষ্ট্রশক্তির অপ্রতিরোধ্যতা দশম, একাদশ ও দ্বাদশ শতাব্দী থেকে ঊনবিংশ শতাব্দী পর্যন্ত এবং অবিরামভাবে ভারতবর্ষকে কেন স্বীকার করে নিতে হয়েছে সে প্রসঙ্গে ইতিহাস গবেষক নীহার রঞ্জন রায় লিখছেনঃ 

"বাঙলাদেশ তথা সমগ্র উত্তর-ভারতে  হিন্দুরাষ্ট্র ও হিন্দু রাজত্বের পতন ও অবসানের প্রধান কারণ ব্যক্তিগত সাহস বা শৌর্য্যবীর্যের অভাব নয় ; সে-কারণ রাষ্ট্রীয় নেতৃত্ব এবং সঙ্ঘ শক্তির অভাব। কৌমচেতনা, আঞ্চলিক চেতনা, সামন্ততন্ত্র, বর্ণবিন্যাসের অসংখ্য স্তরভেদ, সংকীর্ণ স্থানীয় রাষ্ট্রবুদ্ধি প্রভৃতি সমস্তই তাহার মূলে ; এ সব কথা বিস্তৃত ব্যাখ্যার কোনও অবকাশ রাখে না।" 


তবু আমরা সেই আলোচনায় প্রবেশ করতে চাই।
কেন ? তার আলোচনা পরবর্তী পর্বে।
                             (ক্রমশঃ)
ধর্মসংকটের বলি মানবতা ---পর্ব ৫ 
_____________________________________________

সোমবার, ২০ জানুয়ারি, ২০২৫

মানবতীর্থ গঙ্গাসাগর



মানবতীর্থ গঙ্গাসাগর

ভারতভূমিতে জন্ম নিয়েছি প্রেমসিঞ্চিত ধূলিতে, 
অনাদিকালের পুন্য পাথেয় রয়েছে আমার ঝুলিতে। 
বিশ্বমানবে আপন জেনেছি, ভূবন ডাঙায় ঘর, 
শত্রু কোথাও দেখি না দুচোখে, কারেও দেখিনা পর। 
গঙ্গাসাগর সঙ্গমে দেখ অর্বুদ পদচিহ্ন ---- 
কোনটি তোমার কোনটি আমার কেমনে চিনিবে ভিন্ন? 
মন্দাকিনীর পবিত্র ধারায় কত না রক্ত বয়েছে, 
যুগ যুগ ধরে সাগরের জলে এক সাথে সবই মিলেছে। 
সগরের শত সহস্র পুত্র অভিশাপে যারা মরণে, 
বাজাও শঙ্খ ভগীরথ, তারা ফিরুক নূতন জীবনে। 

দুলাল চন্দ্র বন্দোপাধ্যায় 
পৌষ সংক্রান্তি, ১৪৩১
কলকাতা ।



শনিবার, ১৮ জানুয়ারি, ২০২৫

ধর্মসংকটের বলি মানবতা--- পর্ব -- ৩

ধর্মসংকটের বলি মানবতা -- পর্ব ৩ 

রোমান ক্যাথলিকরা একই সাথে ধর্মীয় সাম্রাজ্যবাদের সম্প্রসারণের জন্য যেমন পূর্বদেশ অভিযানে (Crushed war) নেমেছিল, ঠিক তেমনি আবার ঘর সামলাতেও এক নির্দয় পরিমার্জন কাজে আত্মনিয়োগ করেছিল --- যেটির নাম ইনকুইজিশন (Inquisition)। অর্থাৎ গৃহশত্রুর অনুসন্ধান। রোম সাম্রাজ্যের অভ্যন্তরে প্রজাদের মধ্যে অ-খ্রীষ্টানরা ও অ-ক্যাথলিক খুঁজে বের করে তাদের ইনকুইজিশন নামের ট্রাইবুনালে (Inquisition Tribunal) বিচারের ব্যবস্থা করা। ত্রয়োদশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে, ক্রুশেডের তীব্রতা যখন ধীরে ধীরে কিছুটা মন্দীভূত হয়ে এল, তখন রাজশক্তির সাহায্যপুষ্ট রোমান ক্যাথলিকরা 'বিধর্মী' এবং অবিশ্বাসীদের যথাযোগ্য শাস্তিবিধানে মরীয়া হয়ে উঠল। 


ব্যবস্থাটা এমনই ছিল যে, যে পুলিশ সেই বিচারক আবার সেইই ঘাতক। ইনকুইজিশনের তুলনাহীন বর্বরতার কাহিনী ইউরোপের ঐতিহাসিকেরাও আড়াল করতে পারেননি। "এমন একটি ষড়যন্ত্রপ্রবণ, রক্তলোলুপ, আপাদমস্তক অধার্মিক ট্রাইবুনাল কল্পনা করাও কঠিন।"
মানুষের শোণিতসিক্ত যন্ত্রণা যেন নেশার মতো বিচারক-ঘাতকেরা উপভোগ করত। আজীবন কারাবাসের ব্যবস্থা, সমস্ত সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের মত শাস্তি বিধান করেও সন্তুষ্ট হতে না পেরে বিভীসিকাময় দৈহিক যন্ত্রণা দিয়ে তারা আসামীকে (accused) মেরে, তারপর স্বস্তি। ট্রাইবুনালের প্রথম পর্যায়ের এই অমানবিক ব্যবস্থা চলেছিল প্রায় দু'শ বছর ধরে, ত্রয়োদশ শতক থেকে পঞ্চদশ শতক পর্যন্ত। 


দ্বিতীয় পর্যায়ে যখন ইটালি, ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, নরওয়ে প্রভৃতি দেশে নূতনতর ভাবনা চিন্তার বিকাশ হোল --- তখন এই নবজাগরণ (Renaissance)-এর তীব্র বিরোধিতায় নেমে পড়ল এই ইনকুইজিশন ট্রাইবুনাল।
কোপারনিকাসের বৈজ্ঞানিক মতবাদে বিশ্বাসীরা  যীশুকে ভার্জিন-শিশু না মানা প্রভৃতি বিজ্ঞানসম্মত যুক্তি থেকে সরে না আসার জন্য ব্রুনোকে (Giordano Bruno) প্রথমে নির্বাসন, পরে কারাগারে নিক্ষেপ এবং শেষে জীবন্ত পুড়িয়ে মারার নির্দেশ দেওয়া হল। তা কার্যকরও করা হোল। গ্যালিলিওর ক্ষেত্রেও  একই ঘটনা ঘটত যদি তিনি অনন্যোপায় হয়ে মিথ্যা না বলতেন।
গোড়ামী ও ধর্মান্ধতার এখানেই শেষ নয়, তৃতীয় পর্যায়ে   তারা আলোকপ্রাপ্তির উচ্চতম অবস্থারও (Enlightenment) বিরোধিতা করেছিল। মুক্তচিন্তা, উদার মানসিকতা, বিজ্ঞান, শিল্পকলার নব নব উদ্ভাবন ও অভিব্যক্তির চরম বিরোধিতা করাই যেন তাদের ধর্মাচরণের 'ধর্ম' (characteristic) হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
(পঞ্চদশ, ষোড়শ, সপ্তদশ এমনকি অষ্টাদশ শতকেও  এই বাঙলায় ব্রাহ্মণ্যবাদী হিন্দুদের সতীদাহ, অন্তর্জলী যাত্রা যেমন ধর্মধারণার অঙ্গ হয়ে উঠেছিল। এটিও বিশদে আলোচনা করার ইচ্ছা রইল।) 


যাই হোক্, ঘাত-প্রতিঘাত ও সম্প্রসারণের দুই সহস্রাব্দের ইতিহাস বর্ণনা করবার দায় যাঁরা‌ নিয়েছেন সেই চিরস্মরণীয় নামগুলির মধ্যে আছেন Eusebius of Caesarea, Walter Frederick Adeney, Randall Balmar, John M. G. Barclay প্রভৃতি প্রখ্যাত ঐতিহাসিকগণ। এনাদের মধ্যে ইউসেবিয়াসকে বলা হয় ফাদার অব চার্চ হিসটোরিওগ্রাফি। আমরা শুধু এই সমস্ত ধর্মধারণার অন্ধ ভক্তদের ধর্মের নামে অধর্মাচরণের, ভিন্নধর্মী মানুষদের প্রতি অমানবিক, নিষ্ঠুর আচরণের প্রতি আমাদের আলোচনা সীমাবদ্ধ রাখার চেষ্টা করছি।‌
তার অর্থ এই নয় যে আমাদের আলোচিত ইহুদী, পারসী, খ্রীষ্টান ও ইসলাম ধর্মের মঙ্গলময় অবদান সম্মন্ধে আমরা অনবহিত। কিন্তু যখন দেখি ক্ষয়িষ্ণু পশ্চিম রোম সাম্রাজ্যের ক্ষমতালিপ্সু সামন্ত প্রভূরা, অর্থলিপ্সু বণিকেরা ক্রুশেডের আড়ালে পূর্ব ভূমিখণ্ডের ঐশ্বর্য দখলের জন্য লক্ষ লক্ষ নিরীহ ধর্মবিশ্বাসী মানুষদেরকে, অবোধ শিশুদেরকে পবিত্রভূমি জেরুজালেম পুনরুদ্ধারের ছলনায় নিশ্চিত মৃত্যুর হাঁড়িকাঠে বলি দিয়েছিল, যখন মহান পোপ থেকে ছোট চার্চের ফাদার পর্যন্ত পূর্বী অর্থডক্স (Eastern Temple Orthodox)-দের প্রভাব নষ্ট করবার অহংকারী নির্দয় উচ্চমন্যতায় একপ্রকারের ভ্রাতৃহননে লিপ্ত হয়েছিল তখন ঈশ্বরপুত্র যীশুর পবিত্র বিধানগুলির সার্বজনীন মঙ্গলবোধের অবমূল্যায়ন হয়নি কি ? এইটিই ভাববার বিষয়।
১৪৫৩ খ্রীষ্টাব্দে কনস্টান্টিনোপলের পতন, অটোম্যান সাম্রাজ্যের ভয়ঙ্কর উত্থান (যা আরম্ভ‌ হয়েছিল চতুর্দশ শতকে এবং ছড়িয়ে পড়েছিল দক্ষিণপূর্ব ইউরোপ, পশ্চিম এশিয়া, উত্তর আফ্রিকা, সেন্ট্রাল ইউরোপের  দক্ষিণপূর্ব অঞ্চলে) ক্রুশেড যুদ্ধের তীব্রতাকে অনেকখানি প্রসমিত করে। চতুর্দশ শতক থেকে বিশ শতকের প্রথম দুই দশক পর্যন্ত এই তুর্কীদের অপ্রতিহত নিয়ন্ত্রণ বজাই ছিল সেন্ট্রাল ইউরোপের বিস্তৃত ভূমিখণ্ডের উপর।
পশ্চিম এশিয়ায় তুর্কীদের একছত্ৰ শাসন প্রতিষ্ঠিত হবার ফলে খ্রীষ্টানদের আগ্রাসন (ক্রুশেড) যেমন মন্দীভূত  হয়েছিল, ঠিক তেমনি গোঁড়া ক্যাথলিকদের স্বগোষ্ঠী, স্বজাতি ও স্বদেশবাসীর উপর (নির্মম ইনকুইজিশনের নামে) রক্তলোলুপ নিপীড়ন অনেকখানি অপ্রত্যাশিত বাধাপ্ৰাপ্ত হয়েছিল ১৭৮৯ খ্রীষ্টাব্দের ফরাসী বিপ্লবে শোষিত ও অভিজাত সম্প্রদায়ের দ্বারা নির্যাতিত  জনগণের জাগরণ লক্ষ্য করে‌। 


খ্রীষ্টিয় চতুর্থ শতকে পশ্চিম রোম সাম্রাজ্যের পৃষ্টপোষকতা পাবার পর খ্রীষ্টান ধর্মের অন্ধ বিশ্বাসীদের হাতে ইহুদীদের উপর নির্যাতন চলেছে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে। আর সেই নরমেধ যজ্ঞের পূর্ণাহুতি হোল হিটলারের হাতে। ইহুদী বিদ্বেষ নাৎসীদের এতটাই নরঘাতক করে তুলেছিল যে তারা ১৯৩৯ থেকে ১৯৪৫ সালের মধ্যে প্রায় ৮০ লক্ষের উপর পুরুষ মহিলা ও শিশুদর হত্যা করেছিল। জার্মানীরা নিজেদেরকে 'নর্ডিক' , বিশুদ্ধ আর্য জাতির উত্তরসুরী বলে দাবি করত। ইহুদীসহ অন্যান্য জাতি গোষ্ঠীর লোকেদের অবাঞ্ছিত ঘোষনা করে তাদেরকে নিশ্চিহ্ন করার লক্ষ্যে যে নারকীয় নির্যাতন ও  হননক্রিয়া চালিয়েছিল তার খতিয়ান এখনো সম্পূর্ণ পাওয়া যায়নি। পোলান্ডের আউশউইৎস অঞ্চলে চল্লিশটির অধিক Concentration ক্যাম্পে ষাট লক্ষের উপর  ইহুদীদেরকে হত্যা (Holocaust) করা হয়েছিল। তা ছাড়াও এই গণসংহারের বলি হয়েছিল সোভিয়েত কম্যুনিস্ট, যাযাবর সম্প্রদায়, রোমানিয়, শ্লাভিয় ভাষাগোষ্ঠীর মানুষ, প্রতিবন্ধি, বৃহন্নলা এবং অসুস্থ নারীও শিশু। পশুদের পালের (herd of cattle) মত বন্দীশিবির থেকে প্রথমে তাদের তাড়িয়ে নিয়ে যাওয়া হোত ; বৃদ্ধ, শিশু, নারী ও প্রতিবন্ধি যারা রাস্তায় পড়ে যেত তাদের ওখানেই গুলি করে বা বুকে বেয়নেট ঢুকিয়ে মেরে ফেলা হোত, আর বাকীদের নিয়ে গিয়ে গ্যাস চেম্বারে বা গণচুল্লিতে পোরা হোত--- extermination or final solution ! 


দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের এই জীবন্ত নরকের (Inferno in Earth) বিন্দুবৎ বর্ণনা দেবার চেষ্টা করা হোল শুধুমাত্র এ-টুকু বলবার জন্যে যে ধর্মান্ধতা-সঞ্জাত হিংসার বীভৎসা কোন্ স্তরে পৌঁছাতে পারে ! ধর্মের 'অধর্মাচার' মানব সভ্যতাকে, মনুষত্ববোধকে হতাশার কোন্ অতলান্ত অন্ধকারে বিসর্জন দিতে পারে মানুষ, দ্বিতীয় মহাসমরের ইতিবৃত্ত তার চিরশোচনীয় দৃষ্টান্ত হয়ে আছে এবং থাকবেও অনন্তকাল।
খ্রীষ্টানধর্মীদর গৃহযুদ্ধও শোণিতসিঞ্চিত। ক্যাথলিক আর প্রোটেস্ট্যান্টদের মধ্যে আত্মহননের দ্বন্দ্ব শতাব্দীর পর শতাব্দী চলেছে অবিরাম। এ-দ্বন্দ্ব এখনো অব্যাহত আয়ারল্যান্ডে, কখন মিটবে বা আদোও মিটবে কিনা তাও অনিশ্চিত, কেননা সেখানেও ধর্ম ক্রূর রাজনৈতিক স্বার্থপরতার কবলে।
যে ধর্ম বা জীবনাচরণের 'বিধান' একজন প্রকৃত অর্থেই দেবশিশুর আত্মদানের (বলা ভালো, রক্তপিপাসু হিংস্রতার যূপকাষ্ঠে বলিপ্রদত্ত হওয়ার) মধ্য দিয়ে ধরাধামে অভিব্যক্ত হয়েছিল, সর্বমানবের অন্তরে 'ভালোবাসার' আবেদন রেখেছিল, তাই হয়ে উঠল কিনা  ধর্মব্যাবসায়িকদের শাসনের, শোষনের, নির্যাতনের, মারণের হাতিয়ার !
কিন্তু যীশুর মৃত্যুর পর ‌যাঁরা তাঁর‌ বাণী প্রচারের দায় নিয়েছিলেন সেই সকল মহান সাধুগণ, যেমন সাধু (Saint) মথি, মার্ক, লূক, যোহান তাঁরা তো তরোয়াল নিয়ে বেরিয়ে পড়েন নি। আবার এমনো এমন সব বিশপ, ফাদার, নানদের আমরা পাই যাঁরা‌ মানব সেবায় নিজেদের জীবন উৎসর্গ করে। গিয়েছেন এবং এখনো করে চলেছেন। দক্ষিণপূর্ব এশিয়া, আফ্রিকা মহাদেশের সর্বত্র ( বিশেষ করে মধ্যে ও দক্ষিণ আফ্রিকার বিস্তৃত ভূমিখণ্ডে, উত্তর আফ্রিকায় প্রাধাণ্য ছিল ইসলামের) খ্রীষ্টান সম্প্রদায় সেই সমস্ত অঞ্চলের, অন্ধকারাচ্ছন্ন মানবতার সেবায় যে তন্নিষ্ঠ ছিল সে সত্যকথাও ইতিহাস  অস্বীকার করে না। 
                         (ক্রমশঃ)
      (পর্ব--৪পর্ব--৪, ভারতে খ্রীষ্ট ধর্ম)
_____________________________________

বৃহস্পতিবার, ১৬ জানুয়ারি, ২০২৫

স্মরণ


বন্ধু  কবি দুলাল সরকার মহাশয়ের স্মরণে

"আমারে যে জাগতে হবে  কি জানি সে আসবে কবে
                 যদি আমায় পড়ে তাহার মনে।"
                                              ------ রবীন্দ্রনাথ
                                স্মরণ
মানতে না চেয়ে, স্মৃতি বুকে নিয়ে আছি জেগে 
হয়তো হবে বা দেখা স-আবেগ সাহিত্যবাসরে, 
কোন এক বসন্ত সন্ধ্যায়, স্বল্পবাক, মৃদুহাসি, 
কবিত্বের সংযত উচ্ছ্বাসে ইঙ্গিতে ভঙ্গিতে কথা, 
"বন্ধু, আছো তো ভালো ?"--- এ কল্পনা মিলাবে কি 
নিরাশার শূন্যতায়, গেল যা তা কি গেল চিরতরে ? 
তবে কেন এত আয়োজন-- বুকভরা ভালোবাসা, 
প্রাণভরা প্রেম, অকথিত কথা খুঁজে ভরে তোলা 
দ্বন্দ্বভরা জীবনের পাণ্ডুলিপি ? বিলীন হবে কি 
শূন্যে আশা ভাষা, ছন্দোবদ্ধ সব কাব্যগীতি ? 
"না না।", ছুটে আসে মায়াময়ী শাশ্বতী আশ্বাস, 
আছো তুমি জ্যোতির্লোকে--- আমার বিশ্বাস। 

দুলাল চন্দ্র বন্দোপাধ্যায়
১৬/০১/২০২৫
কলকাতা।

রবিবার, ১২ জানুয়ারি, ২০২৫

ধর্মসংকটের বলি মানবতা ---পর্ব ২



ধর্মসংকটের বলি মানবতা --পর্ব ২ 


ইহুদী ধর্ম প্রাচীনতর। খ্রীষ্টধর্ম (Second Temple Judaism, বা দ্বিতীয় মন্দির পর্বের) ইহুদী ধর্মের মধ্যকার আন্দোলন হিসাবেই শুরু হয়েছিল। এখানে বলে রাখা ভালো যে এই Temple বা মন্দির হোল জেরুজালেমের হারাম আল শরিফে অবস্থিত ইহুদীদের কেন্দ্রীয় পবিত্র মন্দির, আনুমানিক ৫১৬ খ্রীষ্টাব্দ পূর্ব থেকে আনুমানিক ৭০ খৃষ্টাব্দ যার অস্তিত্ব ছিল। ইহুদী রোমান যুদ্ধে ৭০ খ্রীষ্টাব্দ সময়কালে মন্দিরটি ধংস হয়ে যায়। ইহুদী জাতির পবিত্র এই মন্দিরের ইতিহাস সুদীর্ঘ এবং জটীল। (যুগ যুগান্তর কাল ধরে এই মন্দির ইহুদী, খ্রীষ্টান ও ইসলাম ধর্মের বিশ্বাসীদের তীর্থভূমি হিসাবে পরিগণিত)  শুধুমাত্র ইহুদী ধর্ম অনুসরণকারীদের অস্তিত্ব রক্ষার যে হাজার হাজার বছরের সংগ্রাম তার সূচনা লগ্নটি জানানোর জন্য এই দ্বিতীয় মন্দিরের উল্লেখ।

এবার আমরা আসি খ্রীষ্টিয় প্রথম শতাব্দী কালের পরবর্তী অধ্যায়ে। যীশুর জীবনকালে যীশুর ধর্ম ছিল সরল সুন্দর এবং সহজভাবেই মানবীয় ও সামাজিক। তখন খৃষ্টান গোষ্ঠী সৃষ্টি হয়নি। ধর্মগ্রন্থ ছিল না। আলাদা সম্প্রদায় ছিল না। ইহুদীরা যীশু প্রচারিত বিধি-বিধানগুলিকে তাদের ধর্মীয় শাখার বাণী বলেই মনে করত। মনে করত (আগেই বলা হয়েছে) যীশু দ্বিতীয় মন্দিরের ধংসাবশেষ থেকে উঠে-আসা ইহুদী ধর্মেরই ধারাবাহিকতা। 

সে যাই হোক্, যীশুর বিচার ও ক্রুশবিদ্ধ হবার পর খৃষ্টান ধর্মের ঐতিহাসিক বিবর্তন সম্ভাবিত হতে আরম্ভ করল। এই বিবর্তন এবং পরিবর্তনের সূত্রপাত হোল সেন্ট পলের কঠিন আত্মত্যাগী প্রচেষ্টায়। খ্রীষ্ট বিশ্বাসীদের প্রতিষ্ঠান, দল বা সম্প্রদায় সৃষ্টি হোল। যীশুর বিধানগুলির লিখিত রূপ দেবার কাজ আরম্ভ হোল। কিন্তু প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই তাদের উপর নেমে এল রোমান শাসকদের বিরুদ্ধতা ও সন্ত্রাস। প্রায় সাড়ে তিন থেকে চার শতাব্দী ধরে এই অত্যাচার চলেছিল। এরূপ অত্যাচার ও নিপীড়নের ফলে   খ্রীষ্টানদের সংহতি জমাটবদ্ধ হোল। তার ফলে, অসংখ্য ধার্মিক-শহীদের আত্মোৎসর্গের বিনিময়ে খৃষ্টধর্ম ও খ্রীষ্টিয় প্রতিষ্ঠানের প্রভাব রোম সাম্রাজ্যের বিস্তৃততর অঞ্চলে সংক্রামিত হয়েছিল। সে-ধর্ম আর অকিঞ্চনের ধর্ম হয়ে রইল না। ৩৮০ খ্রীষ্টাব্দ নাগাদ খ্রীষ্টধর্মের মাথায় কন্টক মুকুটের পরিবর্তে উঠল রাজার মুকুট। রোম সাম্রাজ্যের রাষ্ট্রধর্ম হয়ে উঠল খ্রীষ্টধর্ম। এর পর থেকেই খ্রীষ্টান ধর্মের সর্বগ্রাসী রূপ ও বিচ্যূতির কাল। খ্রীঃ অষ্টম থেকে পঞ্চদশ শতক পর্যন্ত ইউরোপের যে অন্ধকারময় যুগ এবং একাদশ শতক থেকে ত্রয়োদশ শতক পর্যন্ত ধর্মযুদ্ধের (Crushed War) যে বীভৎসা তার জন্যে দায়ী খ্রীষ্টানধর্মীদের ঐ উপরিউক্ত দুইটি অন্যতম প্রধান প্রবনতা। 


একাদশ শতকের মাঝামাঝি সময় থেকেই রোম-কেন্দ্রিক ‌খ্রীষ্টধর্ম আর পূর্ব দেশের (যে অঞ্চলে যীশুর জন্ম ও কর্ম) আলাদা হয়ে গেল। এই দ্বিতীয় অংশটির নাম হোল পূর্বী- অর্থডক্স (Eastern Orthodox Church). এই ধর্মমত একেশ্বরবাদী হয়েও ত্রিত্ববাদে (Trinitarianism) বিশ্বাস করে। 


এখানেও, কিছুটা অপ্রাসঙ্গিক হলেও উল্লেখ করা যেতে পারে যে ইহুদী ধর্মের সঙ্গে খ্রীষ্টানদের ধর্মের মৌলিক ভিন্নতা বিদ্যমান। ভিন্নতাটি এই রকম :
"Christian Theology views the history of mankind as a progressive Covenant between God and Man. The covenant begins with Adam and manifests itself in different stages : Form Noah to Abraham, from Abraham to Moses, from Moses to Devid, from Devid to Son of Devid -- who is The Christ. In the ultimate sacrifice of Jesus of Nazareth who is The Christ, the Covenant is made final. The last step in the Covenant between God and Man, according to Christian theology is incarnation of God in the Son of God."
খ্রীষ্টান ধর্মে বিশ্বাসীরা ইহুদী ধর্মের পুরাতন বিধান (Old Testament) নিজেদের ধর্মগ্রন্থ বলেই মানেন। কিন্তু ইহুদীরা খ্রীষ্টানদের নব বিধান (New Testament) স্বীকার করেন না। এখানে ইহুদীদের ধর্ম (Jewish principles or Testament) এবং খ্রীষ্টানদের ধর্মের চিরকালের দ্বন্দ্ব। এই দ্বন্দ্ব বিদ্বেষের ক্রমঘটমান রক্তক্ষয়ী পরিণামের কাহিনী পরবর্তী সময়ে আবার আলোচনা করা হবে ; আপাতত খ্রীষ্টান ধর্মের ভয়ঙ্কর শক্তিসঞ্চার ও শাখা প্রশাখার সংক্ষিপ্ত ইতিবৃত্তান্ত বর্ণনা করা যাক্।
যাই হোক্ আমরা আবার 'ভাঙার' অধ্যায়ে ফিরে যাই। খ্রীষ্টান ধর্ম যখন রোমের রাজধর্মের স্বীকৃতি ও পৃষ্টপোষকতা লাভ করল তখন থেকেই (Religion added to monarchism) ধর্মের সঙ্গে শক্তির প্রভাব বিস্তার লাভ করতে আরম্ভ করল। (ঠিক এমনটি আমরা দেখব ইসলাম ধর্মের ক্ষেত্রেও। কিন্তু সে কথা কিছু পরে)।
এবার রাজা নিয়ন্ত্রিত ধর্মের সঙ্গে মহাপুরোহিত বা পোপের দ্বন্দ্ব। কয়েক শতাব্দীব্যাপী সেই দ্বন্দ্বের ইতিহাস অনুল্লেখ্য রেখে বলি, মধ্যযুগ বা অন্ধকারময় যুগের শেষভাগে ষোড়শ শতকে রোমান ক্যাথলিক চার্চ থেকে আলাদা হয়ে গেল মার্টিন লুথারের প্রোটেস্টান্ট চার্চ। তিনটি সমান্তরাল ধারায় বইতে লাগল খ্রীষ্টানদের প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মবিশ্বাস। রোমান ক্যাথলিক চার্চ, পূর্বী অর্থডক্স চার্চ এবং প্রোটেস্ট্যান্ট চার্চ।
মূল বা উৎস এক হোলেও এই বিচ্ছেদ মাঝে মাঝেই চরম শত্রুতায় পর্যবশিত হয়েছে। কিন্তু সেই অন্তর্কলহের (বিশেষ করে ক্যাথলিক প্রোটেস্ট্যান্ট বিবাদ), ইতিবৃত্ত বাদ দিয়ে সামগ্রিক খ্রীষ্টধর্মের মারণ রূপ ধর্মের ইতিহাসে কলঙ্কিত অধ্যায়। ক্রুশেড, ইনকুইজিশন, ইহুদী-দমন। 


এই সময়কালের মধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যে আরবের মরুময় ধরিত্রীর বুকে জন্ম নিয়েছেন আরও এক ঈশ্বরের দূত, (Prophet) হজরত মহম্মদ। তিনিও একেশ্বরবাদী এবং ধর্মবিশ্বাসীদের ধারনায় তিনি আদম, নোহা, আব্রাহাম,  মুশা ও যীশুর পরবর্তী ঈশ্বরের বাণী বহনকারী মুক্তিদাতা। অবিশ্বাসী ও পৌত্তলিক বিভিন্ন আরবীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সরাসরি সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে তার ধর্মযাত্রা আরম্ভ হয়েছিল এবং ৬২২ খ্রীষ্টাব্দে তাঁর‌ মৃত্যুর অত্যল্প কালের মধ্যেই শুধুমাত্র আরবীয় উপদ্বীপ নয়, এশিয়ার, ইউরোপ ও আফ্রিকার বিস্তৃত অঞ্চলে, এমনকি মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া প্রভৃতি সুদূর দক্ষিণপূর্ব এশিয়াতেও 'ইসলাম' ছড়িয়ে পড়েছিল। এবং অবশ্যই ইউরোপের খ্রীষ্টানধর্মের মত ইসলাম ধর্মেও সাম্রাজ্যবাদী চরিত্র এসে পড়ে। আর স্বাভাবিকভাবেই অন্যবিধ ধর্মধারণা, বিশেষ করে ইউরোপখণ্ডের সম্প্রসারণবাদী খ্রীষ্টানধর্মীদের সঙ্গে প্রলম্বিত যুদ্ধের পরিবেশ সৃষ্টি হয়ে যায়। এই যুদ্ধেরই সূচনাপর্ব ক্রুশেড, যা কিনা আরম্ভ হয়েছিল খ্রীষ্টান ধর্মগুরু পোপ, আরবান ২-এর ধর্মযুদ্ধের আহ্বানে, খৃষ্টানদের পবিত্র তীর্থভূমি জেরুজালেমকে  মুসলমানদের দখল থেকে উদ্ধারকল্পে। অন্য অঘোষিত উদ্দেশ্য ছিল ইউরোপ ভূখন্ডে ইসলাম ধর্মের আগ্রাসী সম্প্রসারণকে বাধা দেওয়া।

"The slaughter of the pagans continues,
The City has been liberated. ..."
(Gerusalemme Liberata --Torquato Tasso.)

এই ক্রুশেড বা খ্রীষ্টানদের ধর্মযুদ্ধ দিয়ে আরম্ভ করা যাক্। সূচনা ১০৯৫ খ্রীষ্টাব্দে। মাঝে মাঝে সামান্য বিরতির পর ধাপে ধাপে এই রক্তঝরা সংগ্রাম চলেছে সাত, মতান্তরে আট বা নয় দফায়। প্রায় দু'শ বছরের অধিক কাল ধরে চলা এই যুদ্ধে যে অপরিমেয় ক্ষয় ক্ষতি, যে সংখ্যাতীত প্রাণহানী ঘটেছিল তার হিসাব দিয়ে শেষ করতে পারেনি মহাকালের হিসাবরক্ষক ইতিহাস।
ইউরোপের খ্রীষ্টান ও প্রাচ্যের ইসলামের ‌মধ্যে পবিত্রভূমি জেরুজালেমের উপর (সাথে কনস্টান্টিনোপলও) প্রভুত্ব কায়েম করবার প্রয়াসে দু'শ বছরের যে বীভৎস সংগ্রাম চলেছিল, সেই ধর্মযুদ্ধের নিষ্ঠুরতম অমানবিকতার দৃষ্টান্ত দেখাবার একটি মাত্র উদাহরণই যথেষ্ট --- যা শিশুদের ক্রুশেড (Children's Crushed) নামে বিশ্ব ইতিহাসের পাতায় একটি রুদ্ধবাক অধ্যায়রূপে বিরাজিত। প্রথম রণাঙ্গণ যাত্রায় (1st. Movement) আনুমানিক ১২১২ খ্রীষ্টাব্দে জার্মান মেষপালক এক কিশোরের নেতৃত্বে ৩০,০০০ শিশুকিশোরদের একটি দল, এবং পরে ফরাসী মেষপালক বার বছরের কিশোর নিকোলাসের নেতৃত্বে  প্রায় সমসংখ্যক আরো একটি  শিশুকিশোরদের দল পবিত্র তীর্থভূমি জেরুজালেমের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছিল বা করানো হয়েছিল। পরিণতি কি হয়েছিল তা অনুমেয়,  প্রকাশিতব্য নয়। ঐতিহাসিকেরা পূর্ণ চিত্র প্রকাশ করেননি, বা বলা ভালো করতে পারেন নি। শিশু ক্রুশেড বিষয়ে বহুবিধ ও বিচিত্র রকমের কাহিনী প্রচারিত ও প্রকাশিত হয়েছে যা এক কথায় মর্মান্তিক !

                                 ক্রমশঃ
ধর্মসংকটের বলি মানবতা --পর্ব ৩
Inquisition বা রোমান ক্যাথলিক চার্চের বিচার।

বৃহস্পতিবার, ৯ জানুয়ারি, ২০২৫

Birthday of our Grandson


Birthday of our Grandson

As the digit of the moon, that moves by phases
Night by night slowly, silently and smilingly in joy,
Toward the amplitude and we get a full moon --
With silver light that flashes like a gem priceless, 
In our hut and hearts illuminating darkened woes,
So our Krishiv is ! Of him his grandma speaks.
But I feel jealous, why does he look so nice ?

Dadubhai & Thamma.
10-01-2025.
Kolkata.
________________________________________ 

বুধবার, ৮ জানুয়ারি, ২০২৫

ধর্মসংকটের বলি মানবতা--- পর্ব ---১


ধর্মসংকটের বলি মানবতা। 



১৯৯২ সালের ডিসেম্বর মাসের ৬ তারিখে অযোধ্যার বাবরি মসজিদ গুঁড়িয়ে দেওয়া হোল। বিশ্বহিন্দু পরিষদ ও তার কিছু শাখা সংগঠন 'করসেবক' নামের দল নিয়ে গিয়ে রাম জন্মভূমি উদ্ধারকল্পে ষোড়শ শতকে নির্মিত ওই মসজিদ উন্মত্ত উল্লাসে ধংস করেছিল। সংবাদ মাধ্যমে শোর উঠল 'হিন্দু' জাগরণের প্রথম লক্ষণ দেখা দিয়েছে।

সেই সমকালের একজন বিদগ্ধ ইতিহাসবিদ লিখছেন,
"তাহলে কি এতদিন 'হিন্দু'রা ঘুমিয়েছিল ? কেন সহসা তার নিদ্রাভঙ্গ হোল ? করল কে ? নিদ্রাভঙ্গের পর কুম্ভকর্ণের মত আচরণের কোন প্রমাণ ? তার গ্রাস থেকে ধর্মনিরপেক্ষতা, পরমত সহিষ্ণুতা, মানবিক ঔদার্য, সামাজিক শালিনতা --- কোনকিছুই রক্ষা পাচ্ছেনা। বাবরি মসজিদ দিয়ে শুরু। তার প্রতিক্রিয়ায়  প্রতিবেশী দেশে  কত মন্দির ভাঙা হোল। বোম্বাই ও কোলকাতায় ঘটল ভয়াবহ বিস্ফোরণ, দাঙ্গা, অগ্নিসংযোগ, লুঠপাট। ....বি জে পি মতাবলম্বী হিন্দুরা বলছে---- প্রধান মন্ত্রীর প্রতিশ্রুতিমত   অযোধ্যার ভাঙা মসজিদের জায়গায় কোন মসজিদ বানানো চলবে না। বিশ্বহিন্দু পরিষদ আওয়াজ তুলছে ভারতের কোথাও কোন মসজিদ বানানো চলবে না।
(যখন এই প্রতিবেদন লেখা হচ্ছে তখন অবশ্য অযোধ্যায়  রামমন্দির নির্মাণ প্রায় সারা এবং তার সামান্য ব্যবধানে একটি --- বাবরি মসজিদ স্মৃতি কল্পে,  নূতন মসজিদও নির্মিত হওয়া শুধু সময়ের অপেক্ষা।)
প্রায় সার্ধ শতাব্দী ধরে হিন্দুধর্মের আত্মীকরণের ঐতিহ্য, বৈচিত্রের মধ্যে ঐক্য, বিরোধের মাঝে মিলন মহান --- ইত্যাদি বাণীর আফিমে বুঁদ হয়ে ছিলাম আমরা। আজ হয়েছি বিশ্বের অবজ্ঞার পাত্র, প্রায় মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলির সমগোত্রীয়।"
এখানে লেখক সেই ঐতিহাসিক ঘটনার পরিণামের কথাও বলেছেন কিন্তু বলেননি যে ঐ মসজিদের ধংসাবশেষ যাদের মাথায় পড়ল, স্বদেশে ও প্রতিবেশী দেশগুলিতে যারা বিক্ষত, নিহত ও বিড়ম্বিত হোল তাদের দায় কিন্তু নিলেন না ওই বাবরি মসজিদ ধ্বংসের মহান সৈনিক ও তাদের সেনাপতিগণ। ভারতের স্বাধীনতা লাভের সময়কালটিও সমগ্র ভারতবর্ষের সামগ্রিক ভারতীয় জাতিসত্তার শুভলগ্ন ছিল না। "দেশ স্বাধীন হল,  দেশভাগ হল----রেখে গেল কি গ্লানিময় পঙ্কশয্যা ----- দেশ হারাবার, প্রিয়জন বিচ্ছেদের, গণহত্যা, নারীধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ, রাহাজানির কি দুর্মর দুঃস্বপ্ন।"
সেই সময়েও দ্বিজাতিতত্ত্বের প্রবক্তা যাঁরা ছিলেন এবং ভারতকে  দ্বিখণ্ডিত করবার আশু প্রয়াসে যাঁরা দুই ধর্ম গোষ্ঠীর হাতে অস্ত্র তুলে দিয়েছিলেন তাঁরাও লক্ষ লক্ষ নিরীহ, অসহায় মানুষের নির্মম মৃত্যুর, ভিটা-মাটি-ঘটি হারানো নরনারীর আর্তনাদের দায় নেননি। বাঙলা ও পাঞ্জাব প্রদেশের দেহ খণ্ডন করে মুসলমানদের সংখ্যাধিক্যের ভিত্তিতে পাকিস্তান রাষ্ট্রের উদ্ভব ঘটেছে। তাও দুটি আলাদা আলাদা ভূখন্ডে। ভারতের পূর্ব প্রান্তে পূর্ব পাকিস্তান এবং পশ্চিমে পশ্চিম পাকিস্তান। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তান থেকেই পূর্ব পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত হোত।  ভাষার ভিন্নতা হেতু এবং 'বাঙালী' জাতিসত্তার স্বতন্ত্রতার অন্তর্লীণ অভিপ্সার ফলে পশ্চিম পাকিস্তানের সঙ্গে পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রিক দ্বন্দ্ব জন্মলগ্ন থেকেই ছিল। ১৯৫২ খ্রীষ্টাব্দে ভাষা আন্দোলনে যার ধূমায়িত রূপ স্পষ্ট হয়েছিল এবং ১৯৭২ খ্রীষ্টাব্দের মুক্তিযুদ্ধে 'বাঙলাদেশ' নামে একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের জন্মের মধ্যে দিয়ে সেই রাষ্ট্রিক দ্বন্দ্বের পরিসমাপ্তি। (বর্তমানে সেই বাঙলাদেশ এক ভয়ঙ্কর সাম্প্রদায়িক শাসনতান্ত্রিক উপপ্লবের মধ্যে দিয়ে চলেছে।)
অখণ্ড পাকিস্তান রাষ্ট্রের আভ্যন্তরিণ দ্বন্দ্বের পরিণামে যে বিভাজন সেখানে ভারত রাষ্ট্রের ভূমিকা ছিল প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ; এবং তা অনিবার্য হয়ে উঠেছিল এই কারণেই যে পশ্চিম পাকিস্তানের সশস্ত্র অভিযান ও নিপীড়নের ফলে বিপুল সংখ্যক পূর্ববঙ্গীয়  উদ্বাস্তুর ঢেও আছড়ে পড়েছিল ভারতরাষ্ট্রে, বিশেষ করে পশ্চিম বাঙলা, আসাম এবং ত্রিপুরায়।
অতি সংক্ষিপ্ত আকারে স্বাধীনত্তোর ভারতবর্ষের বিখণ্ডিত হবার এই কাহিনীর সমাপ্তিতেই যদি অখণ্ড এই ভারতখণ্ডের 'সাম্প্রদায়িকতা' রোগের প্রশমন ঘটত তবে প্রতিবেশী ও পরস্পর সংলগ্ন এই তিনটি দেশের বৈষয়িক  এবং সাংস্কৃতিক উন্নতির কোন বাধা রইত না। কিন্তু 'বিধি বাম না ধর্ম বাম' তাই বিচার্য বিষয়। বিশ্ব-মানবজাতির একত্র মিলনের ঘোর অন্তরায় যে ধর্ম সে কথা স্বতঃসিদ্ধ। 
প্রথমে ইউরোপের ধর্মীয় দ্বন্দ্বের কথাই ধরা যাক। সেখানে যীশু খ্রীষ্টের জন্মের আগে তেমন কোন প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের ইতিহাস গড়ে ওঠেনি। ইহুদী ধর্মের প্রবর্তক মুশা, (খ্রীঃ পূঃ ১২০০) এবং প্রাচীন পারসিক ধর্মপ্রচারক জরাথুষ্ট্র (খ্রীঃ পূঃ ৬২৮--খ্রীঃ পূঃ ৫৫১)-- য়ের ইতিহাস স্বতন্ত্র। তবুও, যেহেতু আমরা খ্রীষ্টান ধর্ম নিয়ে আলোচনা করতে চাই তাই ইহুদীদের ধর্ম নিয়েও আলোচনা করতে হবে। 'হিব্রু' বলতে আমরা জেনেছি প্রাচীন ইহুদী জাতি ও প্রাচীন ইহুদীদের ভাষা। আর ইহুদী ধর্ম হোল একটি আব্রাহামিক (ইহুদীদের ধর্ম প্রবর্তক, আদিপুরুষ অব্রাহাম, আনুঃ ১৮০০ খ্রীঃ পূঃ) ধর্মধারণা।
এই ধর্মমত একেশ্বরবাদী (Monotheistic). ঈশ্বর এক এবং তিনি জিহোবা (Jehobva). মুশি বা মোশা হচ্ছেন এই ধর্মধারণার একজন অন্যতম বাণীবাহক(Messenger).
ইহুদীরা যীশুকে অপর একজন বাণীবাহক বলে স্বীকার করেন না। কিন্তু খ্রীষ্টান সম্প্রদায় ইহুদীদের সমস্ত পুরাতন ধর্মগ্রন্থগুলি (The Old Testament) নিজেদের ধর্মগ্রন্থ বলেই মানেন। ইউরোপের ধর্মতাত্বিকদের ধারণায় ইহুদী ধর্মের ধারাবাহিকতায় গড়ে উঠেছে খ্রীষ্টধর্ম ইসলাম ধর্ম, দ্রুজ ও বাহাই ধর্ম।
ইহুদী ধর্মধারণার মতই জরথ্রুস্ট (খ্রীঃ পূঃ ১২০০, মতান্তরে ১৮০০) প্রবর্তিত জরাথ্রুষ্টবাদও (Zarathustraism), যা পারসিক ধর্ম নামেই পরিচিত, একটি অতি প্রাচীন ধর্মধারণা। এই ধর্মীয় দর্শন এককালে  পারস্যের জাতীয় ধর্ম ছিল এবং বর্তমানের ইরান ছাড়াও তৃতীয় শতাব্দীর সময়কালে মধ্যপ্রাচ্যের বিস্তৃত অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছিল। এটিও একেশ্বরবাদী ধর্ম। উপাস্য দেবতা বা ঈশ্বর আহুর মাজদা এবং ধর্মগ্রন্থ আবেস্তা বা জেন্দাবেস্তা।
যাই হোক্ মধ্যপ্রাচ্য থেকে সমগ্র ইউরোপ ভূখন্ড জুড়ে উপরি উক্ত ধর্মগুলির প্রভাব ছিল ঠিকই কিন্তু বিস্তৃতস্তরে  অনুসৃত ও অনুশীলিত হোত ইহুদী ধর্ম আর খ্রীষ্টান ধর্ম।
ইসলাম এসেছে অনেক পরে।‌ (৫৭০খ্রীষ্টাব্দে ইসলাম ধর্মের প্রবর্তক হজরত মহম্মদের জন্ম)। তার উদ্ভব মধ্যপ্রাচ্যে।
                           ক্রমশঃ
পর্ব--২
ইহুদী ও খ্রীষ্টানী দ্বন্দ্ব
_______________________________________________





বৃহস্পতিবার, ২ জানুয়ারি, ২০২৫

New Year -- Hope and Despair

New Year --- Hope and Despair 

'Happy New Year' --- sounds all around,
With flute and red glasses in uprising hands, 
Are dancing a band of graceful youths.
Encircling a bevy of beauties, dazzling lights,
And deafening songs made the saloon
An unearthly environs --cheers, cheers  buzzing! 

There in a other world, roaring of war cries ---
Missiles falling down from nowhere,
Burn, singe and roast dwellings and dwellers 
Of some adumbral cities and shires and slums.

'O, poet, what and why 're you going to relate
the two !'
'Don't forget my brother, you're dancing for
A cost of your missiles, and they are the same !
At a cost ! equations are, a bit confusing ;
But the formar drink the Blood for ---
The latter fills the flute glasses or the red ones.'

Dulal Chandra Bandyopadhyay,
02/01/2025
Kolkata.

বুধবার, ১ জানুয়ারি, ২০২৫

বরণ নববর্ষের

বরণ নববর্ষের (২০২৫)

নূতন বছরে পুরানো দিনের
আছে যত দিনলিপি,
ফেলোনা তাদের রেখে দিও বুকে
অতীতের স্বরলিপি।
তাই দিয়ে গান বাঁধো নব সুরে
দাও নব তান, ছন্দ।
হৃদয়ে ফুটুক আশার কুসুম,
চিত্তে বিমলানন্দ।
'নাই' হোল যারা, ঝরে গেল যারা
রইল না যারা সাথে,
তারা হয়ে তারা আকাশ ভরায়
জীবনের কালো রাতে।
যতদিন আছি, যতদিন বাঁচি
ভালোবাসা যাব বিলায়ে,
এমন মধুর বিশ্ব নিখিল
মরণে যাবে যে মিলায়ে।
নূতন বছরে নূতন আলোকে
নব জাগ্রত চেতনায় --
নব মানবের রূপ দেখে যাব
রয়েছি সে আশা-ভরসায়।
                ________________

ইংরেজি নূতন বছরে সকলের জন্যে রইল আমার সশ্রদ্ধ ভালোবাসা।

দুলাল চন্দ্র বন্দোপাধ্যায়
০১/০১/২০২৫
কলকাতা ।

_______________________________________

Recently published

অমূল্য

He ( Tagore) who sees all things in his own self and his own self in all things, he does not remain unrevealed.                     ...